ব্যবহারকারী:তুষার কান্তি ষন্নিগ্রহী
।। ষন্নিগ্রহী পদবির উৎস ।। কৃষ্টিকিরণ প্রতিবেদনঃ হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে ষড়রিপু বা ছয় শত্রু হল, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এই রিপুগুলির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য মানুষের মোক্ষলাভে বাধা দেয় বলে বিশ্বাস। ষড়রিপু আত্মাকে জন্ম-মৃত্যু চক্রের সাথে আবদ্ধ করে। ষড়রিপু পরিত্যাগ বা এড়িয়ে চললে সুন্দর জীবন ও আধ্যাত্মিক মুক্তি বা মোক্ষলাভ মানুষের হয় বলে হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে। ষড় রিপু যিনি নিগ্রহ বা দমন করেন তিনি হলেন 'যন্নিগ্রহী'। অনেকের ধারণা ষড়রিপুর দমন বা নিগ্রহ থেকেই 'যন্নিগ্রহী' পদবি এসেছে।
আবার অনেকের মতে প্রাচীনকালের রাজাদের বিশিষ্ট মন্ত্রী 'সন্ধিবিগ্রহিক' কথা থেকেই 'যন্নিগ্রহী' পদবির উৎপত্তি ঘটেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, 'সন্ধিবিগ্রহিক মহাপাত্র' একটি প্রাচীন ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ। এটি সাধারণত যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ের মন্ত্রী বোঝায়। 'মহাপাত্র' উপাধি উচ্চ পদ মর্যাদা নির্দেশ করে যা রাজসভার প্রধান অমাত্য বা মন্ত্রীর সমান। এঁরা রাজার আস্থাভাজন হয়ে বৈদেশিক নীতি ও যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। পাল ও সেন রাজবংশের সময়ে এই পদ খুবই প্রচলিত ছিল।
পাল ও সেন রাজত্বের (৭৮০- ১১৬০) আমলে 'কুমারামাত্য' 'দণ্ডনায়ক' ইত্যাদির মতো উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে 'সন্ধিবিগ্রহিক' ও 'মহাপাত্র' -এর উল্লেখ আছে।
পাল রাজা রামপালের সময়ে (১০৮২-১১২৪) প্রজাপতি সন্ধি বিগ্রহিক ছিলেন। ত্রিপুরার রাজা দেবাদিত্য ও একজন 'সন্ধিবিগ্রহিক' ছিলেন বলে জানা যায়।
ভবদেব ভট্ট ছিলেন প্রাচীন বঙ্গদেশের একজন প্রখ্যাত ধর্মশাস্ত্র রচয়িতা। তিনি বর্মণ রাজ হরিবর্মার 'মহা সন্ধিবিগ্রহিক' মন্ত্রী ছিলেন। উল্লেখ্য, বর্মণ রাজবংশ (৩৫০-৬৫৫) পৃষ্যবর্মণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কামরূপ রাজ্যের প্রথম ঐতিহাসিক রাজবংশ ছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন বর্তমান ওড়িশার দক্ষিণ অংশ আগেকার দিনে কলিঙ্গ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল।
তখনকার দিনে বিশ্বনাথ কবিরাজ ছিলেন একজন সাহিত্যিক এবং সংস্কৃত আলঙ্কারিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সাহিত্য দর্পণ। কলিঙ্গের গঙ্গাবংশীয় শাসকদের সাথে তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশ্বনাথ কবিরাজের সঠিক জন্ম তারিখ জানা যায়নি। তবে তিনি পরপর দুজন গঙ্গাবংশীয় শাসক-রাজা চতুর্থ নরসিংদেব (১৩৭৮-১৪১৪) এবং রাজা চতুর্থ নিশঙ্ক ভানুদেবের (১৪১৪-১৪৩৪) আমলে বিশিষ্ট সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ফলে দুজন শাসকের আমলকে বিশ্বনাথ কবিরাজের জীবনের অনেক অংশ কেটেছে বলে ধরা হয়। সময়টা ছিল ১৩৭৮ থেকে ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
উল্লেখ্য বিশ্বনাথের পিতা চন্দ্রশেখর এবং বিশ্বনাথ নিজে কলিঙ্গের রাজ দরবারে যুদ্ধ ও শান্তি মন্ত্রীর উপাধি (সন্ধিবিগ্রহিকা মহাপাত্র) উপাধি লাভ করেছিলেন। এই সন্ধি বিগ্রহিকা উপাধি থেকেই কালক্রমে বন্নিগ্রহী / সন্নিগ্রহী পদবী এসেছে বলে মনে করা হয়।