নাক্ষত্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান/নিম্ন ভরের তারায় হিলিয়াম দহন

উইকিবই থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

আমাদের সূর্য একটি নিম্ন ভরের তারা। সুতরাং নিম্ন ভর বলতে এখানে সূর্যের সাথে তুলনীয় ভরই বলা হচ্ছে। উল্লেখ্য ছায়াপথের অধিকাংশ তারার ভরই এর কাছাকাছি।

অনুভূমিক শাখায় অবস্থিত নিম্ন ভরের তারাদের বিবর্তনের পথ বেশ সহজেই বোঝা যায়। তারার ভেতরে পাশাপাশি দুটি নিউক্লীয় বিক্রিয়া চলে: কোরের হিলিয়াম দহন এবং শেলের হাইড্রোজেন দহন। সময়ের সাথে সাথে হিলিয়াম দহনের হার বাড়তে থাকে এবং হাইড্রোজেন দহনের হার কমতে থাকে। যতদিন হাইড্রোজেন দহন হার থ্রি-আলফা বিক্রিয়া হারের চেয়ে বেশি থাকে ততদিন তারাটি হেরাডে (হের্ডসব্রং রাসেল ডায়াগ্রাম) উত্তপ্ত প্রান্তের দিকে যেতে থাকে। হিলিয়াম দহন হার যখন হাইড্রোজেন দহন হারের চেয়ে বেড়ে যায় তখন ঘটে উল্টো ঘটনা, তারাটি শীতল হতে থাকে। অর্থাৎ হেরাডে তারাটি একটি চক্র তৈরি করে, প্রথমে বামে (উত্তপ্ত) এবং পরে ডানে (শীতল) যায়। চক্রটি কেমন হবে তা নির্ভর করে শেলের হাইড্রোজেন দহন হারের উপর, যা আবার নির্ভর করে এনভেলপের ভর এবং এনভেলপে হিলিয়াম প্রাচুর্যের উপর।

পরিচলনীয় কোর এবং ওভারশুটিং[সম্পাদনা]

কোরে থ্রি-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়াম দহন ঘটে। কিন্তু থ্রি-আলফা প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রার উপর উৎপাদিত শক্তি নির্ভরতা হচ্ছে এমন,

অর্থাৎ তাপমাত্রা একটু বাড়লেই বিক্রিয়ার হার অনেক বেড়ে যায়। এতে তাপমাত্রা গ্র্যাডিয়েন্ট অ্যাডায়াবেটিক গ্র্যাডিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায় এবং কোর হয়ে পড়ে পরিচলনীয়। পুরো হিলিয়াম দহন দশাতেই কোর পরিচলনীয় তথা কনভেকটিভ থাকে, তথা কোরে পরিচলনের মাধ্যমে শক্তি স্থানান্তর ঘটতে থাকে। কোর সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা খুব দরকার কারণ কোরের হিলিয়াম দহন হারের উপরই নির্ভর করে: তারাটি হিলিয়াম দহন দশায় কোনদিকে যাবে, পরবর্তী দশাগুলো কেমন হবে ইত্যাদি।

কোরে হিলিয়াম (পারমাণবিক সংখ্যা, ) পুড়ে কার্বন () তৈরি হচ্ছে। এখানে তাপমাত্র যেহেতু অনেক বেশি সেহেতু অনচ্ছতার সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হচ্ছে ফ্রি-ফ্রি ট্রানজিশন (মুক্ত ইলেকট্রনের গতি বাড়া বা কমার কারণে যেসব বিকিরণ শোষিত বা নিসৃত হয়)। ফ্রি-ফ্রি অনচ্ছতার নির্ভরতার সমীকরণ,

থেকে দেখা যায় পারমাণবিক সংখ্যা বাড়লে তা অনেকটা বেড়ে যায়। এজন্যই হিলিয়াম ধ্বংস হয়ে কার্বন তৈরি হওয়ার কারণে কোরে অনচ্ছতা বাড়ে, যে কারণে রেডিয়েটিভ গ্র্যাডিয়েন্ট অনেক বাড়ে এবং পরিচলনের কার্যক্ষমতা বাড়ে।

১,২,৩,৪ চারটি ভিন্ন ভিন্ন সময়, ১ থেকে ৪ এর দিকে। সময়ের সাথে সাথে রেডিয়েটিভ গ্র্যাডিয়েন্ট বেড়ে যাচ্ছে।

কার্বন বৃদ্ধি এক ধরণের রাসায়নিক বিবর্তন। এর পারমাণবিক সংখ্যা হিলিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কারণে এর উপর রাসায়নিক বিবর্তনের প্রভাব অন্য সব প্রভাবকে ছাড়িয়ে যায়। এজন্য প্রতিনিয়ত বেড়েই চলে, যে কারণে পরিচলনীয় কোরের ভর আর কমতে পারে না। পরিচলনের মাধ্যমে কোরের এক প্রান্তের পদার্থ আরেক প্রান্তের পদার্থের সাথে মিশে যেতে যত সময় লাগে তা নিউক্লীয় বিক্রিয়ার আয়ুষ্কালের চেয়ে অনেক কম। এজন্য নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন পদার্থ তৈরি করে তার মাধ্যমে রাসায়নিক বিবর্তন ঠেকিয়ে দেয়ার কোন উপায় থাকে না।

ডানের লেখচিত্রটি আঁকা হয়েছে, পরিচলনীয় কোর এবং শেলের সীমানায় ওভারশুটিং নগণ্য ধরে নিয়ে। দেখা যাচ্ছে, রেডিয়েটিভ গ্র্যাডিয়েন্টের নিম্নমুখী যাত্রা প্রতিবার যেখানে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেটিই কোর এবং শেলের সীমানা। এ পর্যন্তই হিলিয়াম দহন এবং রাসায়নিক বিবর্তনের কারণে তারাটি পরিচলনীয় থাকে।

কিন্তু বাস্তবে ওভারশুটিং ঘটে। কোর এবং শেলের শোয়ারৎসশিল্ড সীমানায় পরিচলনীয় অঞ্চল থেকে ওভারশুটিং এর মাধ্যমে কিছু পদার্থ শেলে চলে যায়। কারণ, পরিচলনীয় কোরের অনচ্ছতা বেশি এবং এতে রাসায়নিক অসমাঞ্জস্য রয়েছে। ওভারশুটিং কারণে, স্থানীয়ভাবে অনচ্ছতা বাড়ে, কোর থেকে কার্বন শেলে গেলে সেখানেও অনচ্ছতা বাড়বে। শেলের যে অংশ কোরের সাথে মিশে সেটিও পরিচলনীয় কোরের অংশ হয়ে যায়। এতে করে, শোয়ারৎসশিল্ড সীমানায় পরিচলনের অস্থিরতার কারণেই পরিচলনীয় অঞ্চলের আকার বেড়ে যায়। এটি এক ধরণের স্বতঃপ্রণোদিত প্রক্রিয়া। এই অস্থায়িত্বের কারণেই শেল ও কোরের সাধারণ অঞ্চলটিতে রেডিয়েটিভ গ্র্যাডিয়েন্ট অ্যাডায়াবেটিক গ্র্যাডিয়েন্টের সমান হয়। বিকিরণীয় গ্র্যাডিয়েন্ট আবার সর্বনিম্নে (অ্যাডায়াবেটিকের সমান) পৌঁছানোর পর একটু বাড়ে, কারণ মিশ্রণের কারণে কোর-শেল সীমানার পরেও খানিকটা অঞ্চলে পরিচলন শুরু হয়।

আবেশিত অর্ধ-পরিচলন[সম্পাদনা]

নিচের চিত্রগুলোতে সংখ্যাগুলো সময়ের বিবর্তন বোঝাচ্ছে। ১ থেকে ৭ এর দিকে সময় বাড়ছে। ১ নং সময়ে কোর-শেল সীমানায় সমান ছিল। এর পর থেকে থেকে ৪ পর্যন্ত বৃদ্ধির কারণ ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সময় যখন ৪ নম্বরে তখন ওভারশুটিং এর কারণে পরিচলনীয় কোর এবং বিকিরণীয় শেল মিশ্রিত হয়ে যাবে, শেলে তৈরি হওয়া কিছু হিলিয়াম কোরে চলে যাওয়ায় সমগ্র কোরের অনচ্ছতা কমে যাবে, যে কারণে ও কমে যাবে। সুতরাং ৫ নম্বর সময়ের গ্র্যাডিয়েন্ট ৪ এর নিচে হবে। এ সময় থেকে কমতেই থাকবে এবং ৬ নম্বরে গিয়ে আবার এর সমান হবে।

এই মুহূর্তে তারার এনভেলপের ভেতরে তিনটি অঞ্চল রয়েছে: পরিচলনীয় কোর, পরিচলনীয় শেল এবং বিকিরণীয় শেল। ১ থেকে ৪ পর্যন্ত দেখা যায়, এর পুরো বক্ররেখাগুলো উপরের দিকে উঠে, আর শেষের দিকে রেখাগুলোর গঠন হয়, একটি সর্বনিম্ন বিন্দু এবং তারপর আবার তাপমাত্রা বৃদ্ধি। ৪ এর পর বক্ররেখাগুলো আকার ঠিক রেখে নিচে নামতে শুরু করে। ৭ নং এ দেখা যায়, অনেক দূরত্ব পর্যন্ত এর সমান থাকে। এর কারণ: প্রথমত দুটি গ্র্যাডিয়েন্ট সমান হওয়ায় পরিচলনীয় কোর ও পরিচলনীয় শেল পুরো মিশে যেতে পারে না, তাদের মধ্যে একটি সীমানা তৈরি হয়। সর্বনিম্ন বিন্দুর পরের পরিচলনীয় অংশটুকুতে পরিচলনের হার বেশ কম থাকে, কারণ দুটি গ্র্যাডিয়েন্ট সমান। এই নিম্ন পরিচলনের অঞ্চলটিকে বলা হয় "অর্ধ-পরিচলনীয় অঞ্চল" বা সেমি-কনভেকটিভ জোন। এ পর্যায়ে এনভেলপের ভেতরের অঞ্চলগুলো হচ্ছে: পরিচলনীয় কোর, অর্ধ-পরিচলনীয় শেল এবং বিকিরণীয় শেল।

মোট কথা, প্রথমে পরিচলনীয় কোরের বাইরে একটি সুস্থিত হাইড্রোজেন দহন শেল ছিল। পরিচলনীয় কোর সম্প্রসারিত হয়ে সেই শেলেও পরিচলনের জন্ম দিয়েছে, তৈরি হয়েছে অর্ধ-পরিচলনীয় অঞ্চল। কোরের সক্রিয় অংশগ্রহনে হয়েছে বলে একে বলা হয় "আবেশিত অর্ধ-পরিচলন" প্রক্রিয়া। উচ্চ ভরের তারায় কোরে হাইড্রোজেন দহনের সময় এর কাছাকাছি একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে সেক্ষেত্রে পরিচলনীয় কোরের চারদিকের হিলিয়াম দহন অঞ্চলটি অস্থিত থাকে এবং পরিচলনীয় কোরের সাথে মিশে যাওয়ার মাধ্যমে সুস্থিত হয়। এজন্য ভারী তারার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার নাম "স্বতঃস্ফূর্ত অর্ধ-পরিচলন"।

অর্ধ-পরিচলন অঞ্চলের দুই প্রান্তকে A এবং B দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। A তে সর্বনিম্নে পৌঁছায়। AB অঞ্চল সময়ের সাথে সাথে বাইরের দিকে আরও প্রসারিত হতে থাকে, কারণ হিলিয়াম পুড়ে কার্বন-অক্সিজেন তৈরি হচ্ছে যারা হিলিয়ামের তুলনায় বেশি অনচ্ছ। এই অঞ্চলের ব্যসার্ধ্য বাড়তে বাড়তে একটি সর্বোচ্চ মানে পৌঁছে।

অনুভূমিক শাখার তারাদের উপর অর্ধ-পরিচলনের প্রভাবগুলো হচ্ছে:

  1. এইচআর চিত্রে তারাগুলো যে চক্র তৈরি করে তা আরও বিস্তৃত হয়। তারার তাপমাত্রা আরও বাড়ে এবং তারপর কমতে থাকে। ব্রিদিং পালসের মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা যায়।
  2. শেল থেকে হিলিয়াম কোরে আসতে পারায় থ্রি-আলফা বিক্রিয়ার জ্বালানী বেড়ে যায়। আরও বেশিকাল ধরে হিলিয়াম দহন চলতে পারে।
  3. হিলিয়াম শেষ হয়ে আসার সময় হিলিয়াম কোরের ভর আগের তুলনায় বেশি হয়।

ব্রিদিং পালস[সম্পাদনা]

দহনের কারণে কোরে হিলিয়ামের পরিমাণ কমতে থাকে। হওয়ার পর হিলিয়াম দহনের মাধ্যমে যতোটা না কার্বন তৈরি হয় আলফা-ক্যাপচারের মাধ্যমে কার্বন থেকে তারচেয়ে বেশি অক্সিজেন তৈরি হয়। অর্থাৎ আলফা-ক্যাপচার প্রক্রিয়া থ্রি-আলফা কে ছাড়িয়ে যায়। অক্সিজেনের অনচ্ছতা কার্বনের চেয়েও বেশি হওয়ার কারণে পরিচলন আরও সক্রিয় হয়, অর্ধ-পরিচলন অঞ্চল আরও প্রশস্ত হয়। এতে শেল থেকে আরও নতুন হিলিয়াম কোরে আসতে শুরু করে। কোরে যেহেতু হিলিয়াম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে সেহেতু সামান্য হিলিয়াম বৃদ্ধির প্রভাবই অনেক হয়ে দাঁড়ায়। এতে আবার নিউক্লীয় বিক্রিয়া গতি বাড়ে, তারার প্রভা বাড়ে এবং বিকিরণীয় গ্র্যাডিয়েন্ট আবারও বাড়তে থাকে।

পরিচলন অঞ্চলের এই বৃদ্ধিকে বলা হয় "ব্রিদিং পালস"। কোরে হিলিয়াম একেবারে নিঃশ্বেষ হওয়ার আগে তিনবার ব্রিদিং পালস ঘটে। এ কারণে হেরাডে তারাটি তিনটি চক্র তৈরি করে। প্রতি পালসের সময় প্রভা বাড়তে শুরু করে। তারপর ধিরে ধিরে হিলিয়াম কমে আসতে থাকায় আবার প্রভা কমে যায়। তারার বিবর্তনের উপর ব্রিদিং পালসের নেট প্রভাব তিনটি:

  1. প্রতি পালসের সময় তারাটি হেরাডে একটি চক্র তৈরি করে।
  2. হিলিয়াম দহনের আয়ুষ্কাল বাড়ে, যেহেতু অর্ধ-পরিচলন অঞ্চল হয়ে নতুন হিলিয়াম আসে।
  3. হিলিয়াম একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার সময় কার্বন-অক্সিজেন কোরের মোট ভর আগের চেয়ে বাড়ে। খুব স্বাভাবিক: বেশি সময় ধরে হিলিয়াম দহন চললে বেশি বেশি কার্বন-অক্সিজেন তৈরি হবে।

অনুভূমিক শাখার পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে এজিবি তথা অসমতটীয় দানব শাখা। এইচবি এবং এজিবি শাখার তারা সংখ্যার অনুপাত অনেকটাই ব্রিদিং পালসের উপর নির্ভর করে। অনুপাতটি এভাবে প্রকাশ করা যায়:

ব্রিদিং পালস না ধরলে মডেল থেকে পাওয়া যায়, . কিন্তু ব্রিদিং পালস হিসেব করলে এইচবি তারার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আর২ প্যারামিটার কমে যায়: . গ্লোবিউলার ক্লাস্টার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এর মান আনুমানিক . এই মান দেখে মনে হয় ব্রিদিং পালসের প্রভাব তারার উপর খুব বেশি নয়।