উপস্থাপনা/কয়েক জন বাঙালি উপস্থাপক

উইকিবই থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বাঙালী উপস্থাপক পরিচিতি[সম্পাদনা]

উপস্থাপনার সাথে যারা জড়িত ছিলেন এবং স্টেজ পারফর্মেন্স কে যারা জনপ্রিয় করে গেছেন বা করে চলেছেন তাদের সম্পর্কে জানার জন্য এই বাঙালী উপস্থাপক পরিচিতি। প্রথম পর্বেই আছেন প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ফজলে লোহানী স্যার।

ফজলে লোহানী[সম্পাদনা]

অন্যতম বাঙালী উপস্থাপক এবং বিশিষ্ট টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানী ১৯২৮ সালের ১২ মার্চ সিরাজগঞ্জ জেলার কাউলিয়া গ্রামে এক শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবু লোহানী ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। মা ফাতেমা লোহানী ছিলেন কলকাতা করপোরেশন স্কুলের শিক্ষিকা।ফজলে লোহানী ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, লেখক, টিভি উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক। বড় ভাই ফতেহ লোহানী ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা, আবৃত্তিকার, চিত্রপরিচালক, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও বেতার ব্যক্তিত্ব। ফজলে লোহানী সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ক্লাসে ভর্তি হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেননি। ভারত বিভাগের পর তিনি অন্য কয়েকজনের সাথে ঢাকা থেকে সাপ্তাহিক পূর্ববাংলা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে তার সম্পাদনায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা অগত্যা। পঞ্চাশের দশকে তিনি ইংল্যান্ড যান এবং লন্ডনের বিবিসি’র ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে চাকরি করেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফিরে এসে ফজলে লোহানী সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং মওলানা ভাসানীর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিক্ষা ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও পরিচালনা করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তার পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’ সে সময়ে দর্শক-শ্রোতা মহলে খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে।বাংলাদেশের টিভি রিপোর্টার হিসাবে ফজলে লোহানী মতো প্রতিভার সাক্ষাৎ আর কখনো মিলবে কিনা সন্দেহ আছে। ‘‘যদি কিছু মনে না করেন’’ এই শিরোনামে প্রতি মাসে পাক্ষিক দুটি টিভি রিপোর্টিং দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ টিভি দর্শক বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতো। ভয়েস অব আমেরিকা ও রয়টারের জগত বিখ্যাত টিভি রিপোর্টারদের সমকক্ষ ফজলে লোহানী অপূর্ব ভঙ্গিমায় টিভি পর্দায় হাজির হয়ে দর্শকবৃন্দের বিপুল করতালির মধ্যে কখনো হাসি আনন্দ, কখনো বেদনা ভারাক্রামত্ম টিভি রিপোর্টিং এর মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতেন। সেই আশির দশকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে টিভি রিপোর্টিং এর প্রবর্তন ঘটানোর মতো যুগান্তকারী কাজ তিনি করেছেন। এসিড-নিক্ষেপের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতার শুরুটা তাঁর হাত ধরেই। লেখক হিসেবেও তিনি অনেক সুনামের অধিকারী ছিলেন। সর্বশেষ ফজলে লোহানী পেনশন নামে একটি সৃজনশীল চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। উল্লেখ করার বিষয় হলো বিবিসির “ইউ আস্ক ফর ইট” নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের অনুকরণে প্রয়াত ফজলে লোহানী বিটিভির জন্য “যদি কিছু মনে না করেন” নামে ঐ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি করতেন। সে সময় হানিফ সংকেত ছিলেন একজন কৌতুকাভিনেতা এবং যদি কিছু মনে না করেন অনুষ্ঠানে তিনি ফজলে লোহানীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। ফজলে লোহানী প্রয়াত হওয়ার পর তিনি এখনকার সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন “ইত্যাদি” অনুষ্ঠানটি শুরু করেন। ৩০ অক্টোবর ১৯৮৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৫৮ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

উপস্থাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে মনস্বী, রুচিমান ও বিনোদন-সক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভুত হন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব। টিভি-উপস্থাপনায় জড়িত হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, '১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাস। হঠাৎ একদিন মুস্তফা মনোয়ার আর জামান আলী খান (পাকিস্তান টেলিভিশনের কর্মকর্তা)) আমার ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজের (বিজ্ঞান কলেজ) হোস্টেলের কক্ষে এসে হাজির। তাদের অনুরোধ : কবি জসীমউদ্দীনের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। রাজি হয়ে গেলাম। টিভিতে সেই আমার প্রথম আসা। পরবর্তীকালে কুইজ প্রোগ্রাম, শিশুদের প্রোগ্রাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে টিভির সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছি। তবে ১৯৭৩ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টিভির সাথে পুরোপুরি জড়িত ছিলাম।'

একটি সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়েছিল, একজন উপস্থাপকের কী কী গুণ আবশ্যক বলে মনে করেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'উপস্থাপক ঠিক ঘোষক নন, উপস্থাপনা হল উজ্জ্বল উৎকর্ষময় ব্যক্তিত্বের একধরনের বর্ণোজ্জ্বল প্রকাশ। শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেউ ভালো উপস্থাপক হতে পারে না। এটাকে দক্ষতা ভাবলে ভুল হবে। একজন উপস্থাপকের ব্যক্তিত্ব হতে হবে রুচিশীল, সপ্রাণ, সপ্রতিভ, হাস্যময় ও বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁর স্বভাবের মধ্যে একধরনের সারল্য থাকতে হবে; যা দিয়ে তিনি দর্শকদের আপন করে নেবেন। মনে রাখতে হবে যিনি দর্শকদের ড্রইংরুমে গিয়ে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথা বলেন, তাঁকে কোনোমতেই কৃত্রিম বা আড়ষ্ট হলে চলবে না। এই জিনিসগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো কঠিন। খানিকটা জন্মগতভাবে, খানিকটা শিক্ষা, রুচি ও ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষ থেকেই একজন উপস্থাপক এগুলো পেতে পারেন। অবশ্য অনেক জিনিশ, যেমন উচ্চারণ, উপস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এমনি আরো অনেক কিছু প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া যেতে পারে।'

উপস্থাপক হিসেবে আপনার দর্শকদের কাছে এত গ্রহণযোগ্য হওয়ার কারণ কী? প্রশ্নের উত্তরে বললেন, 'আমি যখন ক্লাসের ছাত্রদের পড়াই তখন আমার মনের কথাগুলো এমনভাবে বলার চেষ্টা করি, যাতে ক্লাসের সবচেয়ে মধোহীন এবং বোকা ছাত্রটিও তা বুঝতে পারে। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করি কতটা সহজে, স্বচ্ছন্দে ও হাস্যপরিহাসের মধ্যদিয়ে সরল ভাষায় তার হৃদয়ের কাছে পৌছানো যায়। এতে সাধারণ ছেলেরাও যেমন আমার কথা বুঝতে পারবে তেমনি ভালো ছেলেদের বোঝার পথেও কোনো বাধা থাকবে না। টেলিভিশনেও আমি অমনটাই করি। দর্শকদের কাছে গভীর কিছু হুলে ধরতে চাইলেও তার উপস্থাপনা করি রম্য উপভোগ্য ও সহজ ভঙ্গিতে। আমার বলার বিষয় যতই গভীর হোক-না কেন, আমি প্রাণপণে চেষ্টা করি, যাতে সবচেয়ে সাধারণ দর্শকটিও তা বুঝতে পারে। এর ফলে লাভ হয় দুটো। সাধারণ দর্শকের কাছেও আমার বক্তব্য কমবেশি পৌছে যায়। আর বুদ্ধিমান, শিক্ষিত দর্শকেরা তো নিজগুণেই তা বুঝে নিতে পারেন।'

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু পুরস্কারের কথা তুলে ধরা হলো : ১৯৭৭ সালে পেয়েছেন 'জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার' , ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন মাহবুব উল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার; ১৯৯৯ সালে পান রোটারি সিড পুরস্কার; ২০০০ সালে পান বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার। ২০০৪ সালে পেয়েছেন র‌্যামন ম্যাগস্যাসে পুরস্কার, ২০০৫ সালে পেয়েছেন একুশে পদক-২০০৫ এবং ২০০৮ সালে অর্জন করেন পরিবেশ পদক-২০০৮।