উইকিশৈশব:রাসায়নিক মৌল/ফ্লোরিন

উইকিবই থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
পর্যায় সারণীতে ফ্লোরিনের অবস্থান।
পর্যায় সারণীতে ফ্লোরিনের প্রতীক

মৌলটি দেখতে, স্পর্শে, স্বাদে, অথবা গন্ধে কেমন লাগে?[সম্পাদনা]

অতি শীতল তাপমাত্রায় তরল ফ্লোরিন

ফ্লোরিন বা ফ্লুরিন একটি ফ্যাকাশে হলুদ রঙের গ্যাস। এর তীব্র গন্ধ আছে। এর স্বাদ অনুভব করা খুব বিপজ্জনক। তার কারণ এটি বিষাক্ত।

মৌলটি কিভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল?[সম্পাদনা]

হেনরি মোয়াসঁ

১৮৮৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি মোয়াসঁ বিশুদ্ধ ফ্লোরিনকে আলাদা করতে সক্ষম হন। হেনরি মোয়াসঁর পুরো নাম ফের্দিনঁ-ফ্রেদেরিক-অঁরি মোয়াসঁ। অন্য অনেক বিজ্ঞানী হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড থেকে ফ্লোরিনকে আলাদা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কেউ কেউ বিপজ্জনক এই গ্যাসটির সংস্পর্শে এসে দুর্ঘটনাক্রমে মারা যান। বিজ্ঞানী মোয়াসাঁ তড়িৎবিশ্লেষণের সাহায্যে ফ্লোরিনকে আলাদা করেছিলেন। তার পদ্ধতি সফল হয়েছিল। তিনি বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে ফ্লোরাইড আয়নকে ফ্লোরিন গ্যাসে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। ফ্লোরিন মৌলের অনুসন্ধান ও পৃথকীকরণ কাজের মৌলিক অবদানের জন্য ১৯০৬ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এবং পরের বছর ৫৪ বছর বয়সে মারা যান।

মৌলটির নাম কোথা থেকে এসেছে?[সম্পাদনা]

ফ্লোরিন নামটি ল্যাটিন শব্দ ফ্লুয়ের (fluere) থেকে এসেছে, যার অর্থ "প্রবাহিত হওয়া"। ফ্লুরস্পার আকরিকগুলি বিগলক পদার্থ হিসাবে ব্যবহৃত হতো। আকরিকে বিগলক পদার্থ মিশিয়ে বিগলন করার সময় এটি আকরিকগুলিকে প্রবাহিত করতে সহায়তা করে। পরবর্তীকালে ফ্লুরস্পার খনিজে ফ্লোরিনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

তুমি কি জান?

  • ফ্লোরিন হলো অতি বিক্রিয়াশীল মৌল।
  • পৃথিবীর ভূত্বকে প্রাচুর্যের দিক থেকে ফ্লোরিন ১৩তম স্থানে রয়েছে।
  • ফ্লুরস্পার আকরিক দেখতে অনেকটা পান্না বা অ্যামিথিস্ট পাথরের মতো। ফ্লোরিনের পারমাণবিক সংখ্যা হলো ৯।

মৌলটি কোথায় পাওয়া যায়?[সম্পাদনা]

ফ্লোরিন হলো অতি বিক্রিয়াশীল মৌল। তাই একে মৌলিক অবস্থায় পাওয়া যায় না। ফ্লোরিনকে সর্বদাই যৌগ অবস্থায় পাওয়া যায়। কিছু সাধারণ খনিজ যা থেকে ফ্লোরিন বের করা যায় তার মধ্যে রয়েছে ফ্লুরোপাটাইট, ক্রায়োলাইট এবং হর্নব্লেন্ড। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরাইড আকরিক খনন করার মতো কোনো খনি নেই। ফ্লোরাইড আকরিকের শেষ খনিটি ১৯৯৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ফ্লোরিন আমদানি করতে হয়।

এর ব্যবহার কোথায়?[সম্পাদনা]

টেফলনের ত্রিমাত্রিক মডেল
ফ্লোরিন এবং এর কিছু যৌগ অত্যন্ত বিষাক্ত

মৌলিক পদার্থ হিসাবে ফ্লোরিন খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না। তার কারণ এটি অতি বিক্রিয়াশীল। তবে রকেট জ্বালানীতে মৌলিক ফ্লোরিনের ব্যবহার দেখা যায়। জ্বালানী পোড়াতে সাহায্য করার জন্য অক্সিজেনের পরবর্তে মৌলিক ফ্লোরিন ব্যবহার করা হয়।

ফ্লোরিনের আয়নিক অবস্থা হলো ফ্লোরাইড। দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে করার জন্য টুথপেস্টে অনেক সময় ফ্লোরাইড লবণ মেশানো থাকে।

রান্না করার ফ্রাইং প্যানে খাবার যাতে সেঁটে না যায় তার জন্য ফ্রাইং প্যানের উপর টেফলন নামক পদার্থের একটি প্রলেপ দেওয়া হয়। এই টেফলন পদার্থটি একটি পলিমার। এতে ওজন অনুসারে শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ ফ্লোরিন থাকে। টেফলনের বৈজ্ঞানিক নাম পলিটেট্রাফ্লুরোইথিলিন বা পিটিএফই। এর প্রতিটি কার্বন পরমাণুর সাথে দুটি ফ্লোরিন পরমাণু যুক্ত হয়ে কার্বন পরমাণুর একটি শৃঙ্খল গঠন করে।

হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড তৈরি করতে ফ্লোরিন কাজে লাগে। এই অম্লটি কাচ, কম্পিউটার চিপস প্রভৃতি সিলিকেটযুক্ত যৌগ দ্রবীভূত করতে সক্ষম। এই কারণে এই অম্লটিকে কাঁচের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয় না। হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিড কাচের উপর নকশাকাটা এবং খোদাই করার জন্য ব্যবহৃত হয়।

ইউরেনিয়ামের সাথে ফ্লোরিন বিক্রিয়া করে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড তৈরি করে। এই যৌগটির থেকে বিশেষ উপায়ে ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপগুলিকে আলাদা করা যায়। তাই ইউরেনিয়াম শিল্পে ফ্লোরিন কাজে লাগে।

আগে ফ্লোরিনের একটি প্রধান ব্যবহার ছিল ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (সিএফসি) উৎপাদনে। এগুলি একসময় বিভিন্ন অ্যারোসল এবং রেফ্রিজারেটরের হিমায়ক তরল হিসাবে বেশ জনপ্রিয় ছিল। এই ক্লোরোফ্লুরোকার্বন যৌগটি বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের ক্ষতি করে। তাই মন্ট্রিল প্রোটোকল অনুসারে উন্নত দেশগুলিতে বর্তমানে এই যৌগটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ফ্লোরিন অনেক ধরনের যৌগ তৈরি করে। পরিচিত যৌগগুলির মধ্যে একটি হলো সালফার হেক্সাফ্লোরাইড। এটি একটি গ্যাস। তবে মজার ব্যাপার হলো বেশিরভাগ ফ্লোরিন যৌগগুলির চেয়ে সালফার হেক্সাফ্লোরাইড নাড়াচাড়া করা অনেক নিরাপদ। এটি দীর্ঘকাল ধরে রকেট প্রপেলান্ট হিসাবে ব্যবহৃত হতো। তবে এটি একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হওয়ায় এর ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে।

মৌলটি কি বিপজ্জনক?[সম্পাদনা]

ফ্লোরিন গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত। এর সংস্পর্শে ত্বক পুড়ে যেতে হতে পারে। হাইড্রোফ্লুরিক অ্যাসিড খুবই বিপজ্জনক। সালফিউরিক অ্যাসিড এবং অন্যান্য অ্যাসিডের মতো হাইড্রোফ্লুরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে ত্বক পুড়ে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। এটি সহজেই ত্বকে শোষিত হয়। একবার শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এটি শরীরের অঙ্গ ক্ষতি করতে পারে। তাছাড়া ঘনীভূত হাইড্রোফ্লোরিক অ্যাসিডের সাথে শরীরের শতকরা মাত্র ২ ভাগ এর কম সংস্পর্শও মারাত্মক হতে পারে। টুথপেস্ট এবং শোধিত জলে অল্প মাত্রার ফ্লোরাইড আয়ন বিপজ্জনক নয় তবে বেশি মাত্রায় এটি দাঁতের ক্ষত ও মাড়ির ক্ষতি করতে পারে। যাকে 'ফ্লুরোসিস' অসুখ বলে।