বিষয়বস্তুতে চলুন

উইকিশৈশব:মানবদেহ/রক্তনালী

উইকিবই থেকে

রক্তবাহী নালীগুলি হল তোমার দেহের ভিতরে ক্ষুদ্র নালিকা যেগুলি তোমার সারা শরীরে রক্ত ​​পরিবহন করে।

রক্তবাহী নালীগুলি দেখতে কেমন?

[সম্পাদনা]

রক্তবাহী নালীগুলি দীর্ঘ সূক্ষ্ম নলের মত, যেগুলি সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কয়েকটি নালিকা অন্যদের থেকে বড়, কিন্তু অধিকাংশই খুব ছোট। কিছু কিছু এত ছোট যে তুমি অণুবীক্ষণ যন্ত্র (মাইক্রোস্কোপ) ছাড়া তাদের দেখতেও পাবে না। তুমি যদি তোমার কব্জি বা পায়ের দিকে দেখো, তুমি ত্বকের ঠিক নিচে নীল রেখা দেখতে পাবে। এগুলো তোমার রক্তনালী। যেভাবে তোমার ত্বকের মধ্যে দিয়ে আলো ভেতরে যায় এবং রক্ত ​​প্রবাহের মধ্যেকার কার্বন ডাই অক্সাইড সমৃদ্ধ কণিকাগুলিকে আলোকিত করে তোলে, তার কারণেই এগুলি নীল দেখায়। কিন্তু রক্তনালীর মধ্যেকার রক্তরসের রঙ লালই। অক্সিজেনযুক্ত রক্ত ​​হিমোগ্লোবিন থাকার কারণে উজ্জ্বল লাল হয়, অক্সিজেন-হীন রক্ত ​​আসলে গাঢ় লাল রঙের কিন্তু দেখতে লাগে নীল।

তোমার শরীরে প্রচুর সংখ্যায় রক্তবাহী নালী রয়েছে। যদি তাদের সব প্রসারিত করা রাখা হয়, তাহলে সেখানে ৬০,০০০ মাইল দীর্ঘ রক্তবাহী নালী থাকবে!

এটি খুব প্রাথমিক একটি ছবি, যেখানে দেখা যাচ্ছে তোমার ধমনী দেখতে কেমন এটি খুব প্রাথমিক একটি ছবি, যেখানে দেখা যাচ্ছে তোমার শিরা দেখতে কেমন

রক্তনালীর অংশগুলি কি কি?

[সম্পাদনা]

রক্তবাহী নালীগুলি হল ফাঁপা নল যার মধ্য দিয়ে রক্ত ​​প্রবাহিত হয়। তাদের দেওয়াল পেশী দিয়ে তৈরি হয়েছে। রক্তনালীর ভেতরের ফাঁকা জায়গা, যেখান দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়, তাকে লুমেন বলা হয়।

শিরাগুলিতে কলা দিয়ে তৈরি ছোট বেষ্টনী থাকে যাকে কপাটিকা (ভালভ) বলে। এগুলি রক্তের প্রবাহ সঠিক দিকে চালিত রাখে, যদি কোনভাবে রক্ত প্রবাহ ​​পিছনের দিকে চালিত হওয়ার চেষ্টা করে তবে এগুলি ​​বন্ধ হয়ে যায় যার ফলে বিপরীত প্রবাহ হতে পারেনা। এগুলি না থাকলে, আমাদের রক্ত ​​যে কোন দিকে দিকে প্রবাহিত হবার সম্ভাবনা থাকত।

রক্তনালীর কাজ কি?

[সম্পাদনা]

রক্তবাহী নালীর প্রধান কাজ হল সারা শরীরে রক্ত ​​বহন করে নিয়ে যাওয়া। রক্ত অক্সিজেন এবং পুষ্টি বহন করে যাদের সারা শরীরে সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়, এছাড়া রক্ত বর্জ্যও বহন করে নিয়ে যায় শরীর থেকে বার করে দেবার উদ্দেশ্যে। তিন ধরনের রক্তবাহী নালী আছে, সেগুলি হল: ধমনী, শিরা এবং কৈশিক নালী

ধমনীগুলি হৃৎপিণ্ড থেকে বিশুদ্ধ রক্ত ​​বহন করে নিয়ে আসে এবং শরীরের বাকি অংশে তা ছড়িয়ে দেয়। ধমনীর রক্ত ​​শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন এবং পুষ্টি বহন করে (ফুসফুসীয় ধমনী বাদে)। তাদের কপাটিকা আছে যার ফলে রক্ত ​​শুধুমাত্র এক দিকে প্রবাহিত হয়।

শিরাগুলি বিপরীত দিকে রক্ত ​​বহন করে, অর্থাৎ শরীরের বাকি অংশ থেকে দূষিত রক্ত নিয়ে হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসে। শিরায় রক্ত ​​এমন বর্জ্য বহন করে যেগুলিকে শরীর থেকে বের করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় (ফুসফুসীয় শিরা বাদে)।

ধমনীগুলির প্রাচীর খুব পুরু হয় এবং এর ফাঁপা অংশের মাপ শিরার মাপের চেয়ে কম থাকে। এর কারণ হল ধমনী যে রক্ত ​​বহন করে তাকে সারা শরীরে পাম্প করে ছড়িয়ে দিতে হয়। পাম্প করার জন্য হৃৎপিণ্ডের প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। এর ফলে উচ্চ চাপের সৃষ্টি হয় এবং তাই ধমনীর দেয়ালগুলি পুরু ও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয় ধরনের রক্তবাহী নালীগুলির নাম কৈশিক। এরা খুবই ছোট মাপের হয়। একটি কৈশিক দেখার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হবে। এরা ধমনীকে শিরাগুলির সাথে সংযুক্ত করে। এছাড়া এরা বহন করে আনা অক্সিজেন এবং পৌষ্টিক পদার্থকে রক্ত ​​থেকে শরীরের কোষে পৌঁছতে সাহায্য করে। এরা কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য বর্জ্যগুলিকে কোষ থেকে সংগ্রহ করে রক্তে ফিরিয়ে আনে। কৈশিকের দেয়ালগুলি এতই পাতলা থাকে যে পদার্থগুলির পক্ষে সহজেই সেই দেওয়াল অতিক্রম করতে পারা সম্ভব হয়। এটি ব্যাপন (ডিফিউশন) নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। কৈশিকগুলি হল ক্ষুদ্রতম রক্তনালী, যাদের দেওয়াল একটি কোষের সমান পুরু।


রক্তবাহী নালীগুলি শরীরের অন্যান্য অংশের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করে?

[সম্পাদনা]

রক্তবাহী নালীগুলি হৃৎপিণ্ড থেকে শুরু হয় এবং শরীরের বাকি অংশে প্রসারিত হয়ে যায়। রক্তবাহী নালীর মাধ্যমে রক্ত ​​পাম্প করার জন্য হৃৎপিণ্ড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে রক্তনালীগুলি ​​পুষ্টি সংগ্রহ করে আনে।

রক্তবাহী নালীগুলি শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশকে স্পর্শ করে যায়। তারা শরীরের অন্য সব অঙ্গের মধ্যে অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করে। রক্তবাহী নালী ছাড়া, আমাদের শরীরের বাকি অংশ বেঁচে থাকতে পারত না, কারণ পুষ্টি বহন করে নিয়ে যাবার জন্য শরীরে আর কোন অঙ্গ নেই।

কিভাবে তুমি তোমার রক্তবাহী নালীগুলিকে সুস্থ রাখতে পারো?

[সম্পাদনা]

তোমার রক্তনালীগুলিকে সুস্থ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সঠিকভাবে এবং সঠিক মাত্রায় খাওয়া দাওয়া করা।

তুমি হয়তো কোলেস্টেরলের নাম শুনেছো। যদি তুমি মাখন, চীজ, চিপস বা খাস্তা ভাজার মত খুব বেশি চর্বিযুক্ত খাবার খাও, এই চর্বিগুলির কিছু অংশ ধমনী এবং শিরাগুলির চারপাশে জমে যায়। এটি কোলেস্টেরল নামে পরিচিত। যদি শরীরে খুব বেশি মাত্রায় কোলেস্টেরল থাকে, এটি জমতে থাকতে পারে এবং অবশেষে তোমার ধমনীগুলির মধ্যে দিয়ে রক্ত চলাচলের পথ আটকাতে বা বন্ধ করতে শুরু করে। এখানে দুটি ছবিতে এটি দেখা যাচ্ছে:

তোমার ধমনীতে কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা অধিক মাত্রায় কোলেস্টেরলে ধমনীর মুখ বন্ধ হয়ে এসেছে

প্রথম ছবিতে রক্ত চলচল ​​বেশি করছে এবং কোলেস্টেরলও কম। দ্বিতীয় ছবিতে, ধমনীতে রক্তের প্রবাহ ​​কমে গেছে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেশি। এর কারণ হল কোলেস্টেরল ধমনীগুলির দেওয়ালে জমে গিয়ে লুমেন অংশকে ছোট করে দেয় এবং তাদের মধ্যে প্রবাহিত রক্তের পরিমাণ কমে যায়। যেহেতু ধমনীগুলি হৃৎপিণ্ড থেকে সারা শরীরে রক্ত ​​বহন করে, প্রবাহ কমে গেলে তোমার শরীরের কোষে সরবরাহ করা রক্তের পরিমাণ হ্রাস হয়ে যায়।

এটি বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী প্রভাব ফেলতে পারে। অবশেষে, এটি এমনকি হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হবার কারণ হতে পারে। তুমি খাদ্যে চর্বিযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলে তার থেকে কোলেস্টেরল কমতে পারে। ট্রান্স-ফ্যাট, যেটি খুব অস্বাস্থ্যকর ধরনের চর্বি, এড়ানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফল এবং শাকসবজি খাওয়া ও কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে। ব্যায়াম করলেও ভাল কাজ হতে পারে। এছাড়া বাইরে খেলা, সাইকেল চালানো, অথবা তোমার পছন্দের খেলাধুলো করা সবই ভাল কার্যকলাপ।