উইকিশৈশব:ইংল্যান্ডের রাজা ও রানি/নর্ম্যানস

উইকিবই থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
উইকিশৈশব:ইংল্যান্ডের রাজা ও রানি
আরও অ্যাংলো-স্যাক্সন নর্ম্যানস প্ল্যান্টজেনেটস

এই অধ্যায়ে আমরা নরম্যান-দের দিকে নজর দেব। ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড আক্রমণ করার পর নরম্যানরা ক্ষমতায় আসেন, এবং তারা ১১৫৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর সিংহাসনের অধিকার মহিলা ধারার মধ্য দিয়ে প্ল্যান্টজেনেটসের দিকে চলে যায়। চারজন নরম্যান রাজা ছিলেন – প্রথম উইলিয়াম, দ্বিতীয় উইলিয়াম, প্রথম হেনরি ও স্টিফেন। এরপর, সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একজন মহিলা শাসক ছিলেন – মাটিল্ডা। আমরা পরপর এঁদের সম্বন্ধে জানব।

প্রথম উইলিয়াম (১০৬৬ - ১০৮৭)[সম্পাদনা]

প্রথম উইলিয়াম, অথবা উইলিয়াম দ্য কঙ্কারার এবং উইলিয়াম দ্য বাস্টার্ড নামেও পরিচিত, ১০২৮ সাল নাগাদ নরম্যান্ডির ফালাইসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এখন অঞ্চলটি উত্তর ফ্রান্সে অবস্থিত। তিনি নরম্যান্ডির ডিউক রবার্ট দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং তার উপপত্নী হারলেভারের একমাত্র পুত্র ছিলেন। উইলিয়াম রানি এম্মার নাতিও ছিলেন। রানি এম্মা ছিলেন প্রথমে রাজা ইথেলরেড দ্য আনরেডির স্ত্রী এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের রাজা ক্যানুটের স্ত্রী। উইলিয়ামের বাবা ১০৩৫ সালে মারা গেলে, সাত বছর বয়সে তিনি নরম্যান্ডির ডিউক পদে অভিষিক্ত হন। এত কম বয়সে উইলিয়ামের উপর দায়িত্ব এসে পড়ায়, তার অভিভাবকের সংখ্যা অনেক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেইসঙ্গে ছিল ডিউক পদলোভী ভবিষ্যৎ খুনিরাও। উইলিয়ামকে ছোটবেলা থেকেই শারীরিক হুমকির সম্মুখীন হতে শিখতে হয়েছিল, এবং তার তিনজন অভিভাবক তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে মারা যান। উইলিয়াম যখন ১৫ বছর বয়েসের হলেন, ফ্রান্সের রাজা প্রথম হেনরি তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন, এবং ১৯ বছর বয়সে তিনি নিজেই সফলভাবে বিদ্রোহ এবং আক্রমণের হুমকির মোকাবিলা করেছেন। রাজা হেনরির সহায়তায়, উইলিয়াম অবশেষে ১০৪৭ সালে ভ্যাল-এস-ডিউনসের যুদ্ধে কঁ তে বিদ্রোহী নরম্যান ব্যারনদের পরাজিত করে নরম্যান্ডির নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন।

ইংল্যান্ডের নরম্যান বিজয়[সম্পাদনা]

১০৬৬ সালে অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা, কিং এডওয়ার্ড দ্য কনফেসার মারা যান। উইলিয়াম এডওয়ার্ডের জ্ঞাতি ভাই ছিলেন। তিনি দাবি করেন যে নিঃসন্তান এডওয়ার্ড, ফ্রান্স সফরের সময় তাঁকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে গেছেন এবং সিংহাসনের অন্য দাবিদার, হ্যারল্ড গডউইনসন, নরম্যান্ডিতে জাহাজ ডুবির পর উইলিয়ামকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; যদিও উইলিয়ামের এই দাবীটি সত্য নাও হতে পারে। ইংল্যান্ডের নেতৃস্থানীয় রাজন্যবর্গ একটি বৈঠকে অনুমোদন করার পর, ৫ই জানুয়ারি হ্যারল্ডকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা হয়। উইলিয়াম অবশ্য পোপের সমর্থন পেয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৬০০টি জাহাজের একটি আক্রমণ বহর এবং ৭০০০ জন লোকের একটি সেনাবাহিনী তৈরি করেছিলেন। তিনি ১০৬৬ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর সাসেক্সের পেভেনসিতে অবতরণ করেন এবং হেস্টিংসের কাছে একটি পূর্বনির্মিত কাঠের দুর্গে অবস্থান শুরু করেন। হ্যারল্ড লন্ডনে থেকে সৈন্য এনে শক্তিবৃদ্ধির জন্য অপেক্ষা না করে অবিলম্বে এবং দ্রুত আক্রমণ করতে প্ররোচিত হলেন।

রাজা হ্যারল্ড গডউইনসন ইংল্যান্ডের উত্তরে ছিলেন এবং সদ্য অন্য এক প্রতিদ্বন্দ্বী নরওয়ের রাজা হারাল্ড হার্দ্রাদাকে পরাজিত করেছিলেন। হ্যারল্ড গডউইনসনের নিজের ভাই টোস্টিগ নরওয়ের রাজাকে সমর্থন করেছিলেন। হ্যারল্ড উইলিয়ামের সমান আকারের একটি সৈন্যবাহিনী নিয়ে, ৯ দিনের মধ্যে ২৫০ মাইল পথ অতিক্রম করে, সেনলাকে তাঁকে যুদ্ধার্থে আহ্বান করলেন, এই যুদ্ধটি পরবর্তীকালে হেস্টিংসের যুদ্ধ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। যুদ্ধটি হয়েছিল ১০৬৬ সালের ১৪ই অক্টোবর। কিছু হিসাব অনুযায়ী, সম্ভবত নরম্যান বিজয়কে স্মরণ করে রচিত বায়ো টেপেস্ট্রির একটি ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে, হ্যারল্ডের চোখের মধ্যে দিয়ে একটি তীর চলে গিয়েছিল যার ফলে তিনি নিহত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে ইংরেজ বাহিনী পালিয়ে যায় এবং উইলিয়াম বিজয়ী হন। হ্যারল্ডকে তরোয়ালের আঘাতে মেরে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি। সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনে প্রবেশ করতে না পেরে উইলিয়াম ওয়ালিংফোর্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এবং এখানেই অ্যাংলো-স্যাক্সন অভিজাতদের প্রথম দল উইলিয়ামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। বাকি অ্যাংলো-স্যাক্সন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা হার্টফোর্ডশায়ারের বার্খামস্টেডে উইলিয়ামের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং তিনি সেখানে ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে ঘোষিত হন। ১০৬৬ সালে ক্রিসমাসের দিনে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে উইলিয়ামের মাথায় মুকুট পরানো হয়।

প্রতিরোধ অতিক্রম করা[সম্পাদনা]

যদিও ইংল্যান্ডের দক্ষিণ অংশ দ্রুত নর্মান শাসনের বশ্যতা স্বীকার করেছিল, কিন্তু বিশেষ করে উত্তরে প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল, অন্তত আরও ছয় বছর অর্থাৎ ১০৭২ সাল পর্যন্ত। হ্যারল্ডের অবৈধ সন্তানেরা দক্ষিণ-পশ্চিম উপদ্বীপে আক্রমণের চেষ্টা করেছিল। ওয়েলশ মার্চেস এবং স্টাফোর্ডে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। দিনেমার এবং স্কটদের দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে আক্রমণের প্রচেষ্টা হয়েছিল। নরম্যান শাসনের বিরুদ্ধে শেষ গুরুতর প্রতিরোধ এসেছিল ১০৭৫ সালে, আর্লদের বিদ্রোহের সাথে। অনুমান করা হয় যে ইংল্যান্ডের এক পঞ্চমাংশ মানুষ এই বছরগুলিতে যুদ্ধ, গণহত্যা বা অনাহারে নিহত হয়েছিল। উইলিয়ামের রাজত্বকালে, প্রায় সমস্ত জমির মালিকানা এবং ইংল্যান্ডে ধর্মীয় ও সরকারি অফিসের সবরকম উপাধি নরম্যানদের দেওয়া হয়েছিল। অনেক বেঁচে থাকা অ্যাংলো-স্যাক্সন অভিজাতরা অন্যান্য ইউরোপীয় রাজ্যে চলে যান। ইংরেজ জনগণ বা তার অনুসারীদের দ্বারা বিদ্রোহ যাতে সফল না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি ইংল্যান্ড জুড়ে অনেক দুর্গ, রক্ষক এবং পরিখা, (যার মধ্যে টাওয়ার অফ লন্ডন একটি) নির্মাণের নির্দেশ দেন। তার বিজয়ের ফলে প্রায় ৩০০ বছর ধরে চলে আসা শাসক শ্রেণীর ভাষা হিসেবে ইংরেজির পরিবর্তে নরম্যান ফরাসি ভাষা চালু হয়েছিল।

ডুম্সডে পুস্তক[সম্পাদনা]

১০৮৫ সালের ডিসেম্বরে, তার নতুন আধিপত্যের প্রকৃত ব্যাপ্তি খুঁজে বের করার জন্য এবং সর্বোচ্চ কর আরোপ করার জন্য, উইলিয়াম ডোম্সডে (উচ্চারণ ডুম্সডে) পুস্তক নিয়োগ করেছিলেন, এটি ছিল ইংল্যান্ডের উৎপাদন ক্ষমতার সমীক্ষা, অনেকটা আধুনিক লোক গণনার মতো। এটি ১০৮৬ সালের আগস্টে সম্পন্ন হয়েছিল। "ডোমসডে" ("ডুমসডে" এর মধ্য ইংরেজি বানান) নামটি এসেছিল শুধুমাত্র ১২ শতকে, বইটির নির্দিষ্টতা এবং কর্তৃত্বের উপর জোর দেওয়ার জন্য। (সাদৃশ্যটি খ্রিস্টান ধারণার শেষ বিচারকে বোঝায়)। ডুম্সডে পুস্তক সত্যিই দুটি স্বাধীন কাজ। একটি, ছোট ডুমসডে নামে পরিচিত, সেটি নরফোক, সাফোক এবং এসেক্সের ইংরেজ কাউন্টিগুলিকে জুড়ে কাজ করেছিল। অন্যটি, বৃহৎ ডুমসডে, উত্তরের ভূমি ছাড়া বাকি ইংল্যান্ড জুড়ে কাজ করেছিল। পরবর্তীকালে উত্তর ইংল্যাণ্ডের এই অংশগুলি ওয়েস্টমোরল্যান্ড, কাম্বারল্যান্ড, নর্দাম্বারল্যান্ড এবং কাউন্টি ডারহাম হয়ে উঠেছিল। এই জমিগুলির মধ্যে কিছু সেই সময়ে স্কটিশ নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে এখানে ডুম্সডে কাজ করতে পারেনি। এছাড়াও লন্ডন, উইনচেস্টার এবং অন্যান্য কিছু শহরের কোন জরিপ হয়নি। প্রতিটি কাউন্টির তালিকা শুরু হয়েছিল রাজার নাম দিয়ে; তারপর গির্জা এবং ধর্মীয় ঘরের যারা তাদের নাম এসেছিল; পরবর্তীতে সাধারণ টেনান্টস-ইন-চিফ (ব্যারন)দের নাম ছিল; এবং সবার শেষে নাম ছিল মহিলাদের, রাজার আইনজীবীদের, কয়েকজন ইংরেজ রাজসেবকদের যারা জমি ধরে রেখেছিল ইত্যাদি। প্রায় সম্পূর্ণ গ্রামীণ অংশ দিয়ে এর পুরোটাই তৈরি ছিল।

সন্তানেরা[সম্পাদনা]

১০৫৩ সালে পোপ লিও নবম এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে উইলিয়াম নিজের জ্ঞাতি বোন ফ্ল্যান্ডার্সের মাটিল্ডাকে বিবাহ করেন। তার বয়স ছিল ২৬, তার স্ত্রীয়ের বয়স ছিল ২২। উইলিয়াম এবং মাটিল্ডার চারটি পুত্র সন্তান ছিল। প্রথম সন্তানের নাম ছিল রবার্ট কার্থোজ এবং দ্বিতীয়জন উইলিয়াম। তৃতীয়টির নাম ছিল রিচার্ড, যে ১০৮৫ সালে প্রথম উইলিয়াম জীবিত থাকাকালীন মারা যায়, এবং শেষ জনের নাম ছিল হেনরি। প্রথম উইলিয়াম এবং মাটিল্ডার বেশ কয়েকটি কন্যা সন্তানও ছিল, তবে ঠিক কতজন ছিল তা জানা যায়নি।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

১০৮৭ সালের ৯ই ​​সেপ্টেম্বর, ফ্রান্সের রুয়েনের কাছে সেন্ট গারভাইসের কনভেন্টে ৬০ বছর বয়সে উইলিয়ামের মৃত্যু হয়। মেন্টেস অবরোধে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে পেটে আঘাতের কারণে তিনি মারা যান এবং নরম্যান্ডির কঁ তে সেন্ট পিটার চার্চে তাঁকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু এই সময় একটি ঘটনা ঘটেছিল। তার শরীর বেশ মোটা ছিল, তার জন্য প্রস্তুত করা পাথরের সমাধিতে দেহ ঢোকানো যাচ্ছিল না। কয়েকজন বিশপ জোর করে ঢোকানোর চেষ্টা করায় দেহটি ফেটে গিয়েছিল। এর ফলে একটি দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় শোকার্তরা স্থানত্যাগ করে। রাজা প্রথম উইলিয়াম মারা যাওয়ার আগে তার সমস্ত জমি ও সম্পদ নিজের অবশিষ্ট তিন পুত্রের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। সবচেয়ে বড়, রবার্ট, নরম্যান্ডির ডিউক হয়েছিলেন; দ্বিতীয়জন, উইলিয়াম, ইংল্যান্ডের রাজা হন; সর্বকনিষ্ঠ হেনরি রৌপ্য পেয়েছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় উইলিয়াম মারা যাওয়ার পর তিনি রাজা হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় উইলিয়াম (১০৮৭ - ১১০০)[সম্পাদনা]

মালমেসবারির উইলিয়ামের মতে, "উইলিয়াম রুফুস সব থেকে মোটা এবং পেশীবহুল পুরুষ ছিলেন, তার প্রশস্ত উদর ছিল; অতিশৌখিন কেতাদুরস্ত পোশাক পরিহত, যদিও আপত্তিকর, তার লম্বা স্বর্ণাভ কেশ ছিল, মাঝখানে বিভক্ত করে মুখের দুপাশে আঁচড়ানো ছিল, যাতে তার কপাল উন্মুক্ত হয়ে থাকত; এবং তার লাল, রাগান্বিত উজ্জ্বল মুখের মধ্যে ছিল পরিবর্তনশীল বর্ণের চোখ"।

দ্বিতীয় উইলিয়াম ১০৫৬ থেকে ১০৬০ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে নরম্যান্ডিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে ডাকা হত "রুফুস" বলে, লাতিন ভাষায় এর অর্থ "লাল", সম্ভবত তার মুখের লাল আভার কারণে এই নাম হয়েছিল। তিনি ছিলেন উইলিয়াম দ্য কঙ্কারারের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ১০৮৭ সাল থেকে ১১০০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন, নরম্যান্ডির উপরও তার ক্ষমতা চলত এবং স্কটল্যান্ডে তার প্রভাব ছিল। ওয়েলসের ওপর তার খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ ছিলনা।

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব[সম্পাদনা]

উইলিয়াম দ্য কঙ্কারারের জমিগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করার ফলে, যাঁদের ভাগের উভয় পাশেই জমি ছিল, সেই রকম কিছু অভিজাতদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। যেহেতু উইলিয়াম রুফুস এবং রবার্ট স্বভাবসিদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, এই অভিজাতরা চিন্তিত থাকতেন যে তারা উভয়কে খুশি করতে পারবেন না, এবং এইভাবে একজন শাসকের বা অন্যের (বা উভয়ের) অনুগ্রহ হারানোর ঝুঁকি ছিল। একমাত্র সমাধান, তাঁদের যা মনে হয়েছিল, ইংল্যান্ড এবং নরম্যান্ডিকে আবার এক শাসকের অধীনে একত্রিত করা। তাই তারা ১০৮৮ সালের বিদ্রোহে, বায়েক্সের শক্তিশালী বিশপ ওডোর নেতৃত্বে, রবার্টের পক্ষ নিয়ে উইলিয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বিশপ ওডো ছিলেন উইলিয়াম দ্য কঙ্কারারের সৎভাই। রবার্ট তার সমর্থকদের উৎসাহিত করতে ইংল্যান্ডে উপস্থিত হতে পারেন নি, এবং উইলিয়াম রৌপ্য এবং উন্নত সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইংরেজদের সমর্থন জিতেছিলেন। এইভাবে তিনি বিদ্রোহ দমন করেন, এবং তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। ১০৯০ সালে তিনি নরম্যান্ডি আক্রমণ করে রবার্টের বাহিনীকে চূর্ণ করেন এবং তাঁকে তার জমির একটি অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। ১০৯১ সালে, উইলিয়ামের ছোট ভাই হেনরি, উইলিয়ামকে পদচ্যুত করার চেষ্টা করেছিলেন। এর পরে রবার্ট এবং উইলিয়াম তাঁদের মতপার্থক্য মিটিয়ে নেন এবং উইলিয়াম রবার্টকে ফ্রান্সের কাছে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করতে সম্মত হন। পরবর্তীতে, রবার্ট ১০৯৬ সালে প্রথম ক্রুসেডে (ধারাবাহিক ধর্মীয় যুদ্ধের প্রথমটি) চলে গেলে উইলিয়ামকে তার হয়ে নরম্যান্ডি শাসন করার জন্য নিযুক্ত করে যান। উইলিয়ামের রাজত্বকালের বেশিরভাগ সময় গির্জার সাথে বিবাদ করেই কেটেছে। ১০৮৬ সালে, ক্যান্টারবারির ইতালীয়-নরমান আর্চবিশপ ল্যানফ্রাঙ্কের মৃত্যুর পর, উইলিয়াম গির্জার কিছু অর্থ নিজের কাছে রেখে নতুন আর্চবিশপ নিয়োগ করতে বিলম্ব করেছিলেন, এবং ১০৯৩ সালে, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার উইলিয়াম পরবর্তী আর্চবিশপ হিসেবে আরেকজন নরম্যান-ইতালীয় আনসেলম অফ বেককে নিযুক্ত করেন। এই সব কারণে গির্জা এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদি একটি শত্রুতা চলেছিল। উইলিয়াম এবং আনসেলমের অনেক বিষয়ে মতানৈক্য ছিল, এবং ইংরেজ পাদরিরা, যাঁরা নিজেদের জীবনধারণের জন্য রাজার উপর নির্ভর করতেন, তারা প্রকাশ্যে আনসেলমকে সমর্থন করতে পারেননি। উইলিয়াম ১০৯৫ সালে রকিংহামে একটি পরামর্শসভা ডাকেন আনসেলমকে ধরে আনার জন্য, কিন্তু আনসেলম রোমের কাছে আবেদন করেন। ১০৯৭ সালের অক্টোবরে, আনসেলম নির্বাসনে যান, এবং তার এই মামলা পোপের কাছে নিয়ে যান। নতুন পোপ ছিলেন দ্বিতীয় পোপ আরবান। তিনি আরও রাজ শত্রু তৈরি করার মত অবস্থানে ছিলেন না। জার্মানির সম্রাট একজন পোপ বিরোধীকে সমর্থন করেছিলেন। তখন আরবান উইলিয়ামের সাথে একটি চুক্তিতে আসেন। উইলিয়াম আরবানকে পোপ হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং আরবান আনসেলমের সাথে বিরোধে উইলিয়ামের পক্ষ গ্রহণ করেন। যতদিন আনসেলম নির্বাসনে ছিলেন ততদিন উইলিয়াম ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপের থেকে আয় নিজের কাছে রেখেছিলেন, এবং উইলিয়ামের উত্তরসূরি প্রথম হেনরির রাজত্বকাল পর্যন্ত আনসেলম নির্বাসিত ছিলেন।

উইলিয়াম ১০৯১ সালে স্কটিশ রাজা তৃতীয় ম্যালকমের সাথে বিরোধ বাধিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য করেছিলেন এবং ১০৯২ সালে কুমব্রিয়ার উত্তর-পশ্চিম কাউন্টি দখল করেছিলেন। ১০৯৩ সালের ১৩ই নভেম্বর অ্যালনউইকের যুদ্ধে ম্যালকম এবং তার ছেলে নিহত হন। ম্যালকমের মৃত্যুর পর উইলিয়াম স্কটিশ সিংহাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন, সেখানে তিনি এডগার নামক একজনকে রাজা হতে সমর্থন করেছিলেন, এডগার ১০৯৭ থেকে ১১০৭ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। নিজের দেশে নরম্যান অভিজাতদের সাথে উইলিয়ামের বেশ কিছু বিরোধ ছিল। ১০৯৫ সালে, উইলিয়ামকে নর্দামব্রিয়ার আর্লের বিরুদ্ধে একটি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল। আরেকজন সম্ভ্রান্ত, ইইউ-এর উইলিয়ামকেও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাঁকে অন্ধ ও নপুংসক করা হয়েছিল। একই বছর দ্বিতীয় উইলিয়াম ওয়েলসে একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে তিনি ব্যর্থ হন। তিনি ১০৯৭ সালে আবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হতে পারেন নি। তিনি ১০৯৭ সালে নরম্যান্ডিতে যান এবং তারপর থেকে ১০৯৯ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সে অভিযান চালিয়েছিন, সেখানে কিছু সীমিত সাফল্য এসেছিল। মৃত্যুর সময় তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের আকিতেন দখল করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

১১০০ সালের ২রা আগস্ট, দ্বিতীয় উইলিয়াম নিউ ফরেস্টে শিকার করার সময় নিহত হন। কি পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছিল তা অস্পষ্ট ছিল। শিকারের সময়, শিকারী দলটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাদের শিকারকে তাড়া করছিল, এবং উইলিয়াম ছিলেন পয়েক্সের লর্ড ওয়াল্টার টিরেলের (বা টাইরেলের) সঙ্গে। তারা অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। তখনই শেষবারের মতো উইলিয়ামকে জীবিত দেখা গিয়েছিল। পরের দিন স্থানীয় কৃষকদের একটি দল উইলিয়ামকে খুঁজে পায়, তিনি জঙ্গলে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন, তার ফুসফুসে তীরের আঘাতে ছিল। উইলিয়ামের মৃতদেহ যে স্থানে পড়েছিল সেখানে ফেলে রেখেই অভিজাতরা সে স্থান ত্যাগ করেন, কারণ রাজার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা শেষ হয়ে গেছে। তাই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁদের ইংরেজ বা নরম্যান সাম্রাজ্যে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। কথিত আছে যে রাজার মরদেহ পুরকিস নামক স্থানীয় কাঠকয়লা প্রস্তুতকারকের কাছে রেখে দেওয়া হয়েছিল, তার গাড়িতে করে মৃতদেহ উইনচেস্টারের প্রধান গির্জায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। রুফুস স্টোন নামে পরিচিত একটি পাথরকে চিহ্নিত করে রাখা আছে, কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে তিনি সেখানে পড়ে গিয়েছিলেন।

ঘটনার কিছু পরের বছরে লেখকেরা বলেছেন উইলিয়ামের মৃত্যু হত্যা ছিল না। ওয়াল্টার এবং উইলিয়াম একসাথে শিকার করছিলেন। যখন ওয়াল্টার একটি হরিণ শিকার করার জন্য তীর ছুঁড়েছিলেন, সেটি হরিণকে আঘাত করার পরিবর্তে উইলিয়ামের বুকে আঘাত করেছিল। ওয়াল্টার তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কিছুই করা যায়নি। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হবে এই ভয়ে, ওয়াল্টার আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, তিনি ঘোড়ার উপর উঠে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। যেহেতু দ্বিতীয় উইলিয়াম কখনো বিয়ে করেননি, এবং তাই তার কোন বৈধ উত্তরাধিকারী ছিল না। সুতরাং পরবর্তী রাজা হয়েছিলেন তার ভাই হেনরি।

প্রথম হেনরি (১১০০ - ১১৩৫)[সম্পাদনা]

ইংলণ্ডের প্রথম হেনরি ১০৬৮ সালের মে থেকে ১০৬৯ সালের মে মাসের মধ্যে কোনো এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার জন্মস্থান ছিল সম্ভবত ইয়র্কশায়ারের সেলবি। তিনি ছিলেন উইলিয়াম দ্য কঙ্কারারের চতুর্থ পুত্র, এবং তিনি ১১০০ থেকে ১১৩৫ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন। তার পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি হেনরি বিউকলার্ক নামে পরিচিত হন, এবং তার করা আইনি সংস্কারের কারণে তাঁকে ডাকা হত লায়ন অফ জাস্টিস নামে। প্রথম হেনরি তার ভাই দ্বিতীয় উইলিয়ামের মৃত্যুর পর রাজা হন। তার বড় ভাই রবার্ট কার্থোজের সিংহাসন অধিকার করার কথা ছিল, কিন্তু প্রথম ক্রুসেডের কারণে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। রবার্টের অনুপস্থিতি, এবং সেই সঙ্গে নরম্যান অভিজাতদের মধ্যে তার অখ্যাতি, হেনরিকে সিংহাসনে বসার সুযোগ করে দেয়। নেতৃস্থানীয় ব্যারনদের দ্বারা রাজা হিসাবে গৃহীত হওয়ার তিন দিন পর, হেনরিকে মুকুট পরানো হয়। তিনি স্বাধীনতার সনদ জারি করে ব্যারনদের সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, স্বাধীনতার সনদে ব্যারনদের নির্দিষ্ট কিছু অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। প্রথম হেনরির রাজনৈতিক দক্ষতা, সরকার ব্যবস্থার উন্নতি, নিজের রাজ্যের মধ্যে বিভক্ত অ্যাংলো-স্যাক্সন এবং নরম্যানদের একীভূতকরণ এবং তার পিতার মত আধিপত্য স্থাপনের জন্য তার শাসনকালকে উল্লেখ করা হয়। প্রথম হেনরি সম্ভবত প্রথম নর্মান শাসক যিনি ইংরেজি ভাষায় সাবলীল ছিলেন।

হেনরির রাজত্বকাল[সম্পাদনা]

প্রথম হেনরি কাসেল'স হিস্ট্রি অফ ইংল্যান্ড (১৯০২) এ চিত্রিত

১১০১ সালে, হেনরি রাজা হওয়ার এক বছর পর, তার বড় ভাই, রবার্ট, রাজা হওয়ার চেষ্টায় ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন। তারা আলটনের চুক্তির মাধ্যমে শান্তিতে সম্মত হয়েছিলেন, এর পরে রবার্ট হেনরিকে ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে স্বীকার করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নরম্যান্ডিতে ফিরে আসেন। বিনিময়ে হেনরি প্রতি বছর রবার্টকে ২০০০ মার্ক দিতে রাজি হন। তা সত্ত্বেও, চার বছর পরে হেনরির সেনাবাহিনী ইংলিশ চ্যানেল পার হয়। ১১০৬ সালে, তিনি টিনচেব্রের যুদ্ধে তার ভাইয়ের নরম্যান সেনাবাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। তিনি তার ভাই রবার্টকে বন্দী করেন এবং ডুচি অফ নরম্যান্ডিকে ইংল্যান্ডের অধিকার হিসাবে দাবি করেন, ফলস্বরূপ তার পিতার সাম্রাজ্য পুনরায় একত্রিত হয়।

হেনরি নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র উইলিয়াম অ্যাডেলিনকে আনজাউয়ের কাউন্ট ফুলক ভি এর কন্যার সাথে বিবাহ দিয়ে নরম্যান্ডিতে তার সমস্যা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। কাউন্ট সেই সময়ে হেনরির শত্রু ছিলেন। এর আট বছর পরে, উইলিয়ামের মৃত্যুর পর, হেনরি তার মেয়ে মাটিল্ডাকে ফুলকের ছেলে জিওফ্রে প্লান্টেজেনেটের সাথে বিবাহ দেন। এর ফলে পরবর্তীতে প্ল্যান্টজেনেট রাজ্যের অধীনে দুটি দেশ একত্রিত হয়েছিল।

হেনরি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য আরও অর্থের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, এবং এই উদ্দেশ্যে আরও বেশি করে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত শাসনব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছিলেন। হেনরি স্বাধীনতার সনদ সহ বেশ কিছু আইনি সংস্কারও করেছিলেন এবং রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসারের অনেক আইন পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

হেনরি কিছু নৃশংস কাজের জন্যও পরিচিত ছিলেন। রাজা হেনরির জামাতা ইউস্টেস ডি প্যাসি এবং ইভরির কনস্টেবল রাল্ফ হারনেক একে অপরের সন্তানদের বন্দী করেছিলেন, ১১১৯ সালে তারা একে অপরের সন্তানকে মুক্তি দিতে রাজী হন। ইউস্টেস হারনেকের ছেলেকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন, যার পরে হারনেক প্রতিশোধ দাবি করেন। রাজা হেনরি তখন ইউস্টেসের দুই মেয়েকে অন্ধ ও বিকলাঙ্গ করার জন্য হারনেককে অনুমতি দেন, যদিও তারা হেনরির নিজের নাতনি ছিল। ইউস্টেস এবং তার স্ত্রী জুলিয়ান ক্ষুব্ধ হন এবং বিদ্রোহ করার হুমকি দেন। হেনরি মেয়ের সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করেছিলেন, সেই সময় জুলিয়ান একটি আড় ধনুক চালিয়ে নিজের বাবাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ধরা পড়েন এবং একটি দুর্গে তাঁকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু একটি জানালা থেকে নীচের পরিখায় লাফ দিয়ে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর পরে হেনরি তার মেয়ে এবং জামাইয়ের সাথে মিটমাট করে নিয়েছিলেন।

বিবাহ এবং সন্তান[সম্পাদনা]

১১০০ সালে হেনরি স্কটল্যান্ডের রাজা তৃতীয় ম্যালকমের কন্যা এডিথকে বিবাহ করেন। এডিথ এডগার অ্যাথেলিং-এর ভাগ্নি ছিলেন, এই এডগারের পুত্র ছিলেন রাজা এডগার যাঁকে দ্বিতীয় উইলিয়াম স্কটল্যান্ডের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। সুতরাং এই বিবাহের ফলে নরম্যান বংশধারা এবং পুরানো অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজাদের বংশধারা একত্রিত হয়েছিল। এই বিবাহের জন্য নরম্যান ব্যারনেরা খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তাঁদের খুশি করার জন্য এডিথ রানি হওয়ার পর নিজের নাম পরিবর্তন করে মাটিল্ডা রেখেছিলেন। প্রথম হেনরি এবং এডিথ-মাটিল্ডার দুটি সন্তান ছিল, - প্রথম জন মাটিল্ডা, যিনি ১১০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং দ্বিতীয়জন উইলিয়াম অ্যাডলিন, যিনি ১১০৩ সালের নভেম্বরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মাটিল্ডা ১১১৮ সালে মারা যান, ১১২০ সালে নরম্যান্ডির উপকূলে 'হোয়াইট শিপ' ডুবে গেলে উইলিয়াম মারা যান। ১১২১ সালে, প্রথম হেনরি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। তার নতুন স্ত্রীর নাম ছিল অ্যাডেলিজা, তিনি লোয়ার লোথারিংগিয়ার ডিউক এবং ব্রাবান্টের ল্যান্ডগ্রেভ, লিউভেনের প্রথম গডফ্রের কন্যা ছিলেন, কিন্তু এই বিবাহ থেকে তাঁদের কোন সন্তান হয়নি। যদিও রাজা প্রথম হেনরির মাত্র দুটি বৈধ সন্তান ছিল, তিনি যে কোন ইংরেজ রাজার তুলনায় সর্বাধিক অবৈধ সন্তানের জন্মদানকারী পিতার হওয়ার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তার অবৈধ সন্তানের সংখ্যা ছিল ২০ বা ২৫।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

১১৩৫ সালে হেনরি নিজের কিশোর নাতি-নাতনিদের দেখতে নরম্যান্ডিতে যান। তিনি তাদের মধ্যে থেকে খুব আনন্দ পেতেন, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মেয়ে এবং জামাইয়ের সাথে তার বিরোধ শুরু হয় এবং এই বিরোধের জন্য তাঁকে তার মূল পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি দিন নরম্যান্ডিতে থেকে যেতে হয়। এখানেই ১১৩৫ সালের ডিসেম্বরে নরম্যান্ডির সেন্ট ডেনিস লে ফার্মন্টে বিষাক্ত ল্যাম্প্রে (এক ধরণের মাছ) খাওয়ার ফলে বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়। তার দেহ ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে আনা হয় এবং রিডিং অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়, এই অ্যাবেটি হেনরি ১৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পুত্র উইলিয়াম মারা যাওয়ার পর বৈধ পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায়, হেনরি তার ব্যারনদের শপথ করালেন তার মেয়ে মাটিল্ডাকে সম্রাজ্ঞী হিসেবে গ্রহণ করার জন্য, মাটিল্ডা পবিত্র রোমান সম্রাট হেনরি পঞ্চমের বিধবা স্ত্রী এবং উত্তরাধিকারীও ছিলেন। কিন্তু তিনি নারী ছিলেন এবং নরম্যানদের শত্রু হাউস অফ আনজাউতে তার পুনর্বিবাহ হয়েছিল বলে, হেনরির ভাগ্নে, ব্লোইসের স্টিফেন ইংল্যান্ডে চলে আসেন এবং সকলের সমর্থনে সিংহাসন দাবি করেন।

স্টিফেন (১১৩৫ - ১১৪১, ১১৪১ - ১১৫৪)[সম্পাদনা]

রাজা স্টিফেন।

স্টিফেন ১০৯৬ সাল নাগাদ ফ্রান্সের ব্লোইসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা ও মাতা ছিলেন যথাক্রমে ব্লোইসের কাউন্ট স্টিফেন এবং উইলিয়াম দ্য কঙ্কারারের কন্যা অ্যাডেলা। তিনি ইংল্যান্ডের শেষ নরম্যান রাজা ছিলেন এবং ১১৩৫ থেকে ১১৫৪ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, এরপর তার স্থলাভিষিক্ত হন তার জ্ঞাতি ভাই দ্বিতীয় হেনরি, যিনি অ্যাঞ্জেভিন বা প্ল্যান্টজেনেট রাজাদের মধ্যে প্রথম। প্রায় ১০ বছর বয়সে, স্টিফেন তার মামা রাজা প্রথম হেনরির ইংরেজ দরবারে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। কাউন্ট অফ বোলোনের এক কন্যা মাটিল্ডাকে বিবাহ করার পর, তিনি ১১২৮ সালে বোলোনের যৌথ শাসক হন। ১১৩৫ সালে প্রথম হেনরির মৃত্যুর পর, প্রথম হেনরির কন্যা, সম্রাজ্ঞী মাতিল্ডা, রানি হতে পারার আগেই স্টিফেন সিংহাসন দখল করেন।

নৈরাজ্য[সম্পাদনা]

রাজা হওয়ার পর স্টিফেন বেশিরভাগ ব্যারনের পাশাপাশি পোপ দ্বিতীয় ইনোসেন্টের সমর্থন অর্জন করেছিলেন। তার রাজত্বের প্রথম কয়েক বছর শান্তিপূর্ণ ছিল, কিন্তু ১১৩৯ সালের মধ্যে তাঁকে দুর্বল এবং সিদ্ধান্তহীন হিসাবে দেখা গেল, দেশে মাটিল্ডার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের অবস্থা শুরু হয়েছিল, সেই সময়টিকে সাধারণত দ্য অ্যানার্কি বা নৈরাজ্য বলা হয়। ১১৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি গ্লুচেস্টারের প্রথম আর্ল ও সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডার সৎ ভাই স্টিফেন রবার্ট এবং চেস্টারের দ্বিতীয় আর্ল রানুলফ ডি গার্ননের বিরুদ্ধে লিংকনের যুদ্ধে অংশ নেন। স্টিফেন পরাজিত হন, তিনি সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডা কর্তৃক ব্রিস্টলে বন্দী হন এবং কারারুদ্ধ হন। মাটিল্ডা "লেডি অফ দ্য ইংলিশ" উপাধি নিয়ে ইংল্যান্ডের শাসক হয়েছিলেন। সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডা সম্পর্কে আরও জানার জন্য নিচে দেখো। সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডা বেশিদিন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। শীঘ্রই তাঁকে জোর করে লন্ডন থেকে বের করে দেওয়া হয়, এবং তার দক্ষ লেফটেন্যান্ট আর্ল অফ গ্লুসেস্টারকে বন্দী করার পরে, মাটিল্ডা স্টিফেনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ১১৪১ সালের নভেম্বরে স্টিফেন সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন এবং ১১৪২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি অক্সফোর্ডে মাটিল্ডাকে আটকে রেখেছিলেন, কিন্তু মাটিল্ডা পালাতে সক্ষম হন।

১১৪৭ সালে, সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডার পুত্র, হেনরি, একটি ছোট সেনাবাহিনী তৈরি করেন এবং ইংল্যান্ড আক্রমণ করে মাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সেনাবাহিনীর আকারের গুজব স্টিফেনের সমর্থকদের আতঙ্কিত করেছিল, যদিও আসলে সৈন্যবাহিনী খুবই ছোট ছিল। হেনরি দুবার যুদ্ধে পরাজিত হন, এবং সৈন্যদের প্রদানের জন্য কোন অর্থ না থাকায়, হেনরি নিজের কাকা গ্লুসেস্টারের প্রথম আর্ল রবার্টকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গ্লুচেস্টারের রবার্টের মৃত্যুর পর মাটিল্ডা অবশেষে ফ্রান্সে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

সন্তান[সম্পাদনা]

ইউস্টেস স্টিফেন এবং তার রানি ছাড়াও, স্টিফেনের আরও দুটি পুত্র ছিল। তারা ছিল বাল্ডউইন এবং উইলিয়াম। এদের মধ্যে বাল্ডউইন ১১৩৫ সালের আগে কোন সময়ে মারা যায়, এবং উইলিয়াম কাউন্ট অফ মর্টেন এবং বোলোন এবং আর্ল অফ সারে বা ওয়ারেন হন। তার দুটি কন্যা ছিল, মাটিল্ডা এবং বোলোনের মারি। এই শিশুরা ছাড়াও, স্টিফেনের অন্তত তিনটি অবৈধ সন্তান ছিল।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

স্টিফেন সারা জীবন অস্বস্তিকরভাবেই সিংহাসন ধরে রেখেছিলেন। ১১৫০ সালে স্টিফেন বোলোনের শাসক হিসাবে পদত্যাগ করেন, এবং ১১৫১ সালে, তার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী ইউস্টেস সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যাইহোক, ইউস্টেস ১১৫৩ সালে মারা যান এবং এর পরেই তিনি সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডার সাথে একটি সমঝোতায় সম্মত হন যাতে মাটিল্ডার পুত্র হেনরি ইংল্যান্ডের পরবর্তী রাজা হবেন। ১১৫৪ সালের ২৫শে অক্টোবর স্টিফেন ডোভারে মারা যান। তাকে ফাভারশাম অ্যাবেতে সমাহিত করা হয়, এই অ্যাবে তিনি ১১৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল স্টিফেনের রাজত্ব সম্পর্কে এটি বলেছে:

"এই রাজার আমলে কলহ, অমঙ্গল, ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, সেই জন্য বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তিরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। যখন বিশ্বাসঘাতকরা দেখল যে স্টিফেন একজন রসিক, দয়ালু এবং সহজ-সরল মানুষ যিনি কোন শাস্তি দেননা, তখন তারা সব ধরনের জঘন্য অপরাধ শুরু করে দিল . . . এবং তাই স্টিফেন রাজা থাকাকালীন উনিশ বছর ধরে এই অব্যবস্থা চলেছিল, যতক্ষণ না এই ধরনের কৃতকর্মের দ্বারা সমস্ত ভূমি পূর্বাবস্থায় এবং অন্ধকার হয়ে যায়, এবং লোকেরা প্রকাশ্যে বলেছিল যে খ্রিস্ট এবং তার স্বর্গদূতেরা ঘুমিয়েছিলেন"।

ক্রনিকল দ্য অ্যানার্কি সম্পর্কে বলেছিল, "এটি এবং আরও অনেক কিছু আমরা আমাদের পাপের জন্য উনিশটি বছর ধরে ভোগ করেছি"।

মাটিল্ডা (বা মড) (১১৪১)[সম্পাদনা]

সম্রাজ্ঞী মাটিল্ডা (বা মড)

সম্রাজ্ঞী মড হল মাটিল্ডার উপাধি, তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম হেনরির একমাত্র কন্যা এবং দ্বিতীয় সন্তান। তখন মাটিল্ডা একটি খুব সাধারণ নাম ছিল, তাই মড নামে আমরা তাঁকে আলাদা করে বলতে পারি। মাটিল্ডা হল "মড" নামের লাতিন রূপ। তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম নারী শাসক।

জীবন[সম্পাদনা]

মাটিল্ডা (পরে 'সম্রাজ্ঞী মড' নামেও পরিচিত), প্রথম হেনরির কন্যা, তার ভাই উইলিয়াম অ্যাথেলিং ১১২০ সালের হোয়াইট শিপ বিপর্যয়ে ডুবে যাওয়ার পরে সিংহাসনের একমাত্র অবশিষ্ট বৈধ উত্তরাধিকারী ছিলেন। আট বছর বয়সে, তাঁকে পবিত্র রোমান সম্রাট হেনরি পঞ্চম এর ভবিষ্যত বধূ হিসেবে জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল। তার বয়স যখন ১২ বছর তখন তাঁদের বিবাহ হয়েছিল। মাটিল্ডা অল্প বয়স থেকেই শাসন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন – উদাহরণস্বরূপ, তাঁকে তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে ইতালির বিষয়গুলির ভার দেওয়া হয়েছিল। ১১২৫ সালে হেনরি মারা গেলে, মাটিল্ডা 'সম্রাজ্ঞী' উপাধি নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন - এটা ছিল তার সহজাত ঔদ্ধত্যের ইঙ্গিত।

১১২৭ সালে, ইংরেজ অভিজাতরা তাঁকে প্রথম হেনরির উত্তরসূরি হিসাবে গ্রহণ করার শপথ করেছিলেন, কিন্তু পরের বছর আনজাউয়ের কাউন্ট, জিওফ্রে প্ল্যান্টজেনেটের সঙ্গে তার বিয়ে, তার বিপক্ষে গিয়েছিল: অ্যাঞ্জেভিন্স এবং নরম্যানরা দীর্ঘদিনের শত্রু ছিল। অনেক নেতৃস্থানীয় অভিজাতদের নিজের পক্ষে আনতে তার ব্যর্থতার ফলে তার জ্ঞাতি ভাই স্টিফেনের পক্ষ ভারি হয়েছিল, স্টিফেনকে হেনরির মৃত্যুতে রাজা ঘোষণা করা হয়েছিল। তার একজন মূল সমর্থক ছিলেন তার সৎ ভাই রবার্ট অফ গ্লুসেস্টার, এবং তার পরামর্শে, ১১৩৯ সালে তার দাবিকে অনুসরণ করে তিনি চ্যানেল অতিক্রম করেন। আসন্ন গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ১৪ বছরের জন্য ইংল্যান্ডকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

১১৪১ সালে স্টিফেন লিংকনে বন্দী হওয়ার পর মাটিল্ডার মুকুট দখল করার প্রধান সুযোগ এসেছিল – তিনি নিজেকে 'লেডি অফ দ্য ইংলিশ' ঘোষণা করেছিলেন এবং ৮ই এপ্রিল উইনচেস্টারে রানি নির্বাচিত হন। কিন্তু তিনি নিজের অহংকারের ফলে এবং কর কমানোর দাবি বিবেচনা করতে অস্বীকৃতির জন্য লন্ডনের সম্ভাব্য সমর্থনকে হারান। তিন মাসেরও কম সময়ে, তাঁকে শহরের বাইরে বার করে দেওয়া হয়েছিল। স্টিফেন সিংহাসনে পুনরুদ্ধার করার পর, মাটিল্ডা দুবার গ্রেপ্তার এড়িয়ে ছিলেন: উইনচেস্টারে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গিয়ে; এবং অক্সফোর্ড দুর্গ থেকে সাদা পোশাকে বরফ এবং তুষার অতিক্রম করে। ১১৪৮ সালে, অবশেষে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি কখনই সত্যিকারের রানি হতে পারবেন না, তিনি নরম্যান্ডিতে ফিরে যান। যখন তার ছেলে - 'হেনরি ফিটজএমপ্রেস' – ১১৫৪ সালে দ্বিতীয় হেনরি নাম নিয়ে রাজা হন, পুত্রের অনুপস্থিতিতে তিনি ডাচি শাসন করেছিলেন। এর ১৩ বছর পরে, রুয়েনে তিনি মারা যান।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

তিনি অবসর নিয়ে নরম্যান্ডির রুয়েনে চলে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র হেনরি এবং দ্বিতীয় পুত্র জিওফ্রির মধ্যে তর্ক-বিতর্কে মধ্যস্থতা করেছিলেন, কিন্তু ভাইদের মধ্যে শান্তি বেশিদিন থাকেনি। জিওফ্রে ১১৫৮ সালে তার আকস্মিক মৃত্যুর আগে হেনরির বিরুদ্ধে দুবার বিদ্রোহ করেছিলেন। মড ১১৬৭ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর রুয়েনে মারা যান, এবং সেখানে প্রধান গির্জায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। তার সমাধিস্তম্ভে লেখা আছে, "এখানে হেনরির কন্যা, স্ত্রী এবং মা রয়েছে"।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

This text is based on information in the Wikibook and in Wikipedia.