ইসলামি জীবনধারা/নির্দেশনা

উইকিবই থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

কুরআন সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ সত্যকথা আছে। আর সেটা হলো কুরআনে শুধু নির্দেশনাই নয়, কৌশলও রয়েছে! কুরআনের তৃতীয় অধ্যায়ের শুরুতে এই সতর্কতা বা দাবিত্যাগের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহপাক বলেন, “তিনিই তোমার উপর এমন কিতাব নাযিল করেছেন, যার কতিপয় আয়াত মৌলিক-সুস্পষ্ট অর্থবোধক, এগুলো হল কিতাবের মূল আর অন্যগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়; কিন্তু যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা গোলযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে উক্ত আয়াতগুলোর অনুসরণ করে যেগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মূলত: এর মর্ম আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে যে, আমরা তার উপর ঈমান এনেছি, এ সবকিছুই আমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এসেছে, মূলতঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিরা ছাড়া কেউই নসীহত গ্রহণ করে না।”[১]

আল্লাহর পক্ষ থেকে, এটা একটা কৌশল যে, তিনি সেই সমস্ত লোকদেরকে প্রকাশ্যভাবে পরীক্ষা যাদের হৃদয়ে রোগ আছে, যেমন ধর্মান্ধ ও ভণ্ড। এটি একটি দরকারী বৈশিষ্ট্য ও ন্যায্যতা বা খারাপ লোকদের চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। উক্ত বাণী তিনটি বিষয় স্পষ্ট করে। যথা

  1. মুহকাম বা সুদৃঢ় আয়াত
  2. অন্তরের রোগ
  3. মুতাশাবিহাত বা সন্দেহযুক্ত আয়াত।

এই অধ্যায়টি দৃঢ় আয়াতের উপর ফোকাস করতে,অন্তরের রোগ নিরাময় করতে এবং সন্দেহযুক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাকে বুঝতে করতে সাহায্য করবে। এই পদ্ধতিটি কুরআনের আক্ষরিক উপলব্ধি বিষয়ে মৌলবাদী বা এসেনশিয়ালিস্টদের ধ্যানধারনার পরিচয় দেবে।

মুহকাম বা সুদৃঢ় আয়াত[সম্পাদনা]

  • আল্লাহ পথ দেখান

ইসলামের সবচেয়ে মূল্যবান পাঁচটি গ্রন্থ আছে। সেগুলো হলো কোরান, ২টি হাদিসের বই এবং দুটি ইতিহাসের বই। এগুলো বুঝতে জীবনেরও বেশি সময় লাগে। কিন্তু এ পাঁচটি বই থেকে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো, পাঁচ মিনিট থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেখা যাবে, যদি আপনি এই অধ্যায়ের নির্দেশিকা অনুসরণ করেন। কুরআনের ৩০ নং সুরার ৩০ নং আয়াত অনুসারে বুঝা যায়, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জন্মগ্রহণ করে। এই বইয়ের ১নং অধ্যায়ে আল্লাহর ধারণা, চূড়ান্ত ন্যায়বিচার, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আদেশগুলো বাস্তবায়নের বিশদ বিবরণ এবং অদেখা জগতের আনুমানিক বর্ণনা জানা যায়।

  • সত্য কথা

আল্লাহপাক বলেন, “আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদের সরল পথ দেখাও। সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।[২] সুতরাং আল্লাহ মহান যিনি সত্যিকার অধিপতি; তোমার প্রতি ওহী সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তুমি কুরআন পাঠে তাড়াহুড়া করো না এবং তুমি বল, ‘হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।[৩]

  • মৌলিক কথা

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর রসূল বলেছেনঃ "সর্বোত্তম বাণী (খায়রুল হাদীছ) হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথপ্রদর্শন হল মুহাম্মাদ (সাঃ)। আর সবচেয়ে খারাপ বিষয় হল বিদআত। প্রতিটি বিদআতই ভ্রান্ত।"[৪] আল্লাহপাক বলেন, “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী, সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব (আল কুরআন), যা বারবার আবৃত্তি করা হয়। যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের গা এতে শিহরিত হয়, তারপর তাদের দেহ ও মন আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়ে যায়। এটা আল্লাহর হিদায়াত, তিনি যাকে চান তাকে এর দ্বারা হিদায়াত করেন। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য কোন হিদায়াতকারী নেই।”[৫]

  • অপেক্ষা না করা

আল্লাহপাক বলেন,“তিনিই তোমার উপর এমন কিতাব নাযিল করেছেন, যার কতিপয় আয়াত মৌলিক-সুস্পষ্ট অর্থবোধক, এগুলো হল কিতাবের মূল আর অন্যগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়; কিন্তু যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা গোলযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে উক্ত আয়াতগুলোর অনুসরণ করে যেগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মূলত: এর মর্ম আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না। যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে যে, আমরা তার উপর ঈমান এনেছি, এ সবকিছুই আমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এসেছে, মূলতঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিরা ছাড়া কেউই নসীহত গ্রহণ করে না।”[৬]

আইনের আয়াত বা অনুরূপ আয়াতগুলোর একটি ভাল উদাহরণ হল কুরআনের ৪:৩ নং আয়াত ও ৪:১২৯ নং আয়াতে বহুবিবাহ সম্পর্কে আলোচনা। যদিও প্রথমটি একটি আইনের আয়াত, যা স্পষ্টভাবে বাধ্যতামূলক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তীটি হল নিছক তথ্যের বিবৃতি। কিন্তু, পণ্ডিতরা বহুবিবাহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাখ্যা তৈরি করে পরবর্তী আয়াত দ্বারা মেরুকরণ করেছেন।

  • প্রমাণ তালাশ করা

আল্লাহর কথা বুঝতে কয়েক প্রজন্ম সময় লাগতে পারে। আমাদের জীবদ্দশায় তা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যদি এতে বহু-অর্থের (মুতাসাবেহ) আয়াত নিয়ে গবেষণা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই শেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আপনি সরল পথ বুঝতে পারলে এটির অনুশীলন করা শুরু করুন এবং আপনার প্রয়োজনে আরও জ্ঞান অর্জন করুন।

আল্লাহপাক বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ আর তোমাদের সন্তানাদি তোমাদেরকে যেন আল্লাহর স্মরণ হতে গাফিল করে না দেয়। যারা এমন করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। যে রিযক আমি তোমাদেরকে দিয়েছি তাত্থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে। নচেৎ (মৃত্যু এসে গেলে) সে বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে আরো কিছুকালের অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদাক্বাহ করতাম আর সৎকর্মশীলদের মধ্যে শামিল হয়ে যেতাম।’ আল্লাহ কাউকে কক্ষনো অবকাশ দেন না যখন তার নির্ধারিত সময় এসে যায়। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ পুরোপুরি খবর রাখেন।[৭]

প্রত্যাখ্যানকৃত ব্যাখ্যা[সম্পাদনা]

  • পারিপার্শ্বিক সম্পর্কিত আয়াত শেখা

“আর তুমি যখন কুরআন পড় তখন তোমার ও যারা আখিরাতে ঈমান আনে না তাদের মধ্যে আমি এক অদৃশ্য পর্দা দিয়ে দেই। আর আমি তাদের অন্তরের উপর ঢাকনা রেখে দিয়েছি, যাতে তারা তা বুঝতে না পারে এবং তাদের কানে দিয়েছি বধিরতা। আর যখন তুমি কুরআনে তোমার রব এক হওয়ার কথা উল্লেখ কর, তখন তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালায়।”[৮] “আর কাফিররা বলে, ‘তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শুন না এবং এর আবৃত্তি কালে শোরগোল সৃষ্টি কর, যেন তোমরা জয়ী হতে পার।’”[৯]

  • একাধিক অর্থ থেকে সাবধান করা

“হে বস্ত্রাবৃত! রাত জাগরণ কর কিছু অংশ ব্যতীত। অর্ধ রাত কিংবা তদপেক্ষা কিছু কম। অথবা তদপেক্ষা বেশী। আর কুরআন আবৃত্তি কর ধীরে ধীরে স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে।“[১০] “তোমার প্রতিপালক জানেন যে, তুমি কখনও রাতের দু’তৃতীয়াংশ ‘ইবাদাতের জন্য দাঁড়াও, কখনও অর্ধেক, কখনও রাতের এক তৃতীয়াংশ, তোমার সঙ্গী-সাথীদের একটি দলও (তাই করে)। আল্লাহ্ই রাত আর দিনের পরিমাণ নির্ধারণ করেন। তিনি জানেন, তোমরা তা যথাযথ হিসাব রেখে পালন করতে পারবে না। কাজেই তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হয়েছেন। কাজেই কুরআনের যতটুকু পড়া তোমার জন্য সহজ হয়, তুমি ততটুকু পড়। তিনি জানেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হবে, আর কতক আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে যমীনে ভ্রমণ করবে, আর কতক আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবে। কাজেই তোমাদের জন্য যতটুকু সহজসাধ্য হয় তাই তাত্থেকে পাঠ কর, আর নামায প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত দাও আর আল্লাহকে ঋণ দাও উত্তম ঋণ। তোমরা যা কিছু কল্যাণ নিজেদের জন্য আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর নিকট (সঞ্চিত) পাবে, তাই উত্তম এবং পুরস্কার হিসেবে খুব বড়। তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু।”[১১]

  • উদাহরণ শেখা

“তুমি যখনি কুরআন পাঠ করবে তখন অভিশপ্ত শয়ত্বান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে। যারা ঈমান এনেছে তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটে না, আর তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে। তার প্রভাব কেবল তাদের উপরই খাটে যারা তাকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে আর যারা তাকে আল্লাহর শরীক করে।”[১২] “যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শুনে আর এর উত্তমগুলো মেনে চলে। ওরাই হল তারা আল্লাহ যাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন আর ওরাই হল জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন।”[১৩] “সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার প্রতিপালকের বাণী পরিপূর্ণ। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই। আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের অনুসরণ কর তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করে ফেলবে, তারা তো কেবল আন্দাজ-অনুমানের অনুসরণ করে চলে, তারা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু করে না।”[১৪] “তুমি কি দেখ না কীভাবে আল্লাহ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন? উৎকৃষ্ট বাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছের ন্যায় যার মূল সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত আর শাখা-প্রশাখা আকাশপানে বিস্তৃত। তার প্রতিপালকের হুকুমে তা সব সময় ফল দান করে। মানুষদের জন্য আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। মন্দ বাক্য মন্দ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনীয়, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগেই যাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার কোন স্থায়িত্ব নেই। যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত বাণীর অবলম্বনে দুনিয়ার জীবনে ও আখেরাতে প্রতিষ্ঠিত রাখবেন আর যালিমদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেবেন। তিনি যা ইচ্ছে করেন তাই করেন।”[১৫]

  • পরিসীমা জানা (হুদুদ)

“আমি তোমার কাছে সর্বোত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, এ কুরআন তোমার কাছে ওয়াহী যোগে পাঠিয়ে, যদিও এর পূর্বে তুমি না-জানা লোকদের মধ্যেই শামিল ছিলে।”[১৬] “আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য যাবতীয় দৃষ্টান্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই ঈমান গ্রহণ করতে অস্বীকার করে কেবল কুফরিই করল।”[১৭]

পিছনের কথা[সম্পাদনা]

যেমন চোরের হাত কাটা সর্বোচ্চ শাস্তি। পরে সর্বনিম্ন ঠিক করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. কুরআন, ৩ঃ৬
  2. কুরআন, ৫-৭
  3. কুরআন, ২০ঃ ১১৪
  4. http://www.usc.edu/dept/MSA/fundamentals/hadithsunnah/muslim/004.smt.html#004.1885 Sahih Muslim Book 004, Number 1885
  5. কুরআন, ৩৯ঃ ২৩
  6. কুরআন, ৩ঃ ৭
  7. কুরআন, ৬৩ঃ ৯-১২
  8. কুরআন, ১৭ঃ ৪৫-৪৬
  9. কুরআন, ৪১ঃ ২৬
  10. কুরআন, ৭৩ঃ ১-৪
  11. কুরআন, ৭৩ঃ ২০
  12. কুরআন, ১৬ঃ ৯৮-১০০
  13. কুরআন, ৩৯ঃ ১৮
  14. কুরআন, ৬ঃ ১১৫-১১৬
  15. কুরআন, ১৪ঃ ২৪-২৭
  16. কুরআন, ১২ঃ ৩
  17. কুরআন, ১৭ঃ ৮৯