হিন্দু ধর্ম/হিন্দু দর্শন
ভারতীয় দর্শন শুরু হয় বেদবেদাদির থেকে, আনুমানিক ১০০০ বিসিই (BCE) ও তার আগে। বেদকে ভাগ করা হয় সংহিতা, ব্রাহ্মণ, অরন্যক ও উপনিষদে। যদিও প্রাচীন বেদের মধ্যে আশ্চর্যকর অনেক আচার আচরণ আছে, কিছু কিছু অংশে অনেক সাধারণীকরণ আছে। উপনিষদের মধ্যে অনেক একত্ববাদী ও দ্বৈত বাদী চিন্তাধারা আসতে শুরু করে দেয়। এই সময়টা প্রায় ৫০০ বিসিই থেকে ৭০০ বিসিইর সময় যখন বৌদ্ধ দর্শন ও জৈন দর্শনও আসতে শুরু করে দেয়। প্রাথমিক ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা আসতে শুরু করে প্রায় ৬০০ বিসিই থেকে ১০০ বিসিই সময় থেকে। যদিও হিন্দু দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শনের মধ্যে অনেক যোগাযোগ হয়, জৈন দর্শন নিজের মত আরেকটা অংশে বাস করতে থাকে। প্রাথমিক বেদাদির বয়স অনেক প্রাচীন। ধরা হয় ৪০০০ বিসিই থেকে ১২০০ বিসিইর মধ্যে বলা ও তৈরি হয়েছিলো বেদ ও সেই ধর্মগ্রন্থগুলো। ভিন্ন ভিন্ন ঋষিরা, যারা মন্ত্রদ্রষ্টা হিসেবে এই বৈদিক মন্ত্রগুলোকে প্রথম আস্বাধন করেন। যদিও সময়টা অনেক অতীতের আর আমরা কখনই সেই সময়টা সঠিকভাবে বলতে পারবো না, তাই আমরা বেদের তৈরি বলে থাকি সময়ের অতীতে। কিন্তু গত ৩০০০ বছর ধরে এই ধর্মগ্রন্থ সনাতনীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এমন কি, যেই মন্ত্র একজন সনাতনী সকালে ঘুমের পর উঠে বলছে, সেই মন্ত্র গত ৩০০০ বছর ধরে একইভাবে বলে চলছে সনাতনীরা। হিন্দু ধর্মের দর্শনকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয় যা হচ্ছে আস্তিক ও নাস্তিক দর্শন। সেই আস্তিক দর্শনগুলোকে আবার ছয় ভাগে ভাগ করা হয় যা যথাক্রমেঃ সাংখ্য, যোগ, বৈশেষিক, ন্যায়, মীমাংসা (কর্ম মীমাংসা) ও বেদান্ত (জ্ঞান মীমাংসা)। নাস্তিক দর্শনের মধ্যে প্রধানত বৌদ্ধ, জৈন, ও চার্বক মতকেই জানা যায়। এই আস্তিক ও নাস্তিক মতের ভাগ প্রধানত স্থাপিত হয় বেদবাদের ও বেদের মতবাদের থেকে বাহিরে থাকা দর্শন থেকেই। বেদ চারটিঃ ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, ও অথর্ববেদ। দার্শনিক মতভাবের শুরু হয় ঋগ্বেদের সময় থেকেই যখন প্রাকৃতিক অনেক পরিবর্তনকে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে আর এই প্রশ্নের মাধ্যমেই তার উত্তর মানুষ পেতে শুরু করে। যদিও ঋগ্বেদ সংহিতার সময় থেকেই এই পরিবর্তনগুলো মানুষের মধ্যে আসতে শুরু করে, দার্শনিক প্রশ্নগুলো মানুষ করতে শুরু করে উপনিষদের সময় থেকে।
সাংখ্য দর্শন
[সম্পাদনা]সাংখ্য দর্শনের উৎপত্তি উপনিষদ থেকেই এসেছে। উপনিষদে ব্রহ্ম বা সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যকে বুঝাতে গিয়ে অদ্বয়বাদে রূপান্তরিত হয়েছে। সাংখ্য দর্শন প্রায় ২০০ সিয়ি সাংখ্য কারিকাতে লিপিবদ্ধ হয়। যদিও এই মতাদর্শের উৎপত্তি কপিল মুনিকে দেওয়া হয়, ঈশ্বরকৃষ্ণ প্রথম এটাকে লিপিবদ্ধ করেন। পূর্ব সাংখ্য মতে বলা হয় পুরুষ একটি অব্যাক্ত অবস্থায় অবস্থিত। এই অব্যাক্ত অবস্থার থেকে মিলিত হয়ে এটা জীবন বা জীবিত প্রাণী তৈরি করে। রাজসিক ও তামসিক গুণের ভাব খারাপ চিন্তা মনের ভিতর তৈরি করে, যে সত্ত্বগুণে মুছে যায় আর সর্বশেষ চেষ্টা হচ্ছে এই মতভাবের থেকে রাজসিক ও তামসিক মনোভাব একেবারে দুরে করে দেওয়া। সেই সময়ের ইন্দ্রিয়গুলো ভৌতিক পদার্থ দিয়ে তৈরি। প্রধানত, সত্য বুঝতে হলে সেটাকে অনুভব করতে হয়। যেখানে যগ্নের মাধ্যমে সত্য বোঝার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেখানেই বেদের উৎপত্তিও হয়েছে। সাংখ্য কারিকার উৎপত্তি প্রায় ২০০ সাধারণ অব্দে মনে করা হয়। চরকের বইয়ে এই মতাদর্শ প্রায় ৭৮ সিয়িতেই পাওয়া যায়। চারকের মতে ছয়টি ধাতু দিয়ে বিশ্ববহ্মান্ড তৈরি হয়েছে - পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ ও চেতনা (যেটাকে পুরুষ ও বলা হয়)। তিনই বলেন পুরুষ অব্যক্ত অবস্থায় অবস্থিত। সেই অব্যাক্ত ব্যাক্ত-র সাথে মিলে জীবন তৈরি করে। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ দ্বারা সেই চিত্তকে বোঝান হয়। সর্বশেষ অবস্থানে পুরো ধ্বংস যেখানে কোন জ্ঞান নেই। সেই অবস্থায় নিজ মিলে যায় বুদ্ধি ও অহংকারের সাথে আর ভৌতিক জ্ঞানের দ্বারা জ্ঞান তৈরি হয়। কপিল মুনির শিষ্য অসুরী, আর তার শিষ্য পঞ্চশিখা একটি অন্তিম সত্য নইয়ে বলেন যেটা অব্যাক্ত (সেটাকে পুরুষাবস্থামাভ্যাক্তম ও বলে)। মানুষ এমন উপাদান দিয়েই তৈরি এবং সে সংমিশ্রণেই দেহ, মন এবং চেতনা তৈরি হয়। যেহেতু আমরা মনে করই আমাদের দুঃখ নিজের, তাই আমরা দুঃখ অনুভব করি। পঞ্চশিখা আরও বলেন যে এই সংমিশ্রণটা এক একটি ক্ষেত্রতে হয়। যেখানে শেষ ত্যাগ হয়, সেটাকেই সংযোগবাধা বলে। সাংখ্য দর্শন সংখ্যার থেকে এসেছে। এই দর্শন তিনটি ধাপে এসেছে – [১] বৈদিক সময় থেকে ১৫০০ বিসিই যার মধ্যে মৌরীয় সাম্রাজ্যের সময় গিয়েছে। নীতিশাস্ত্র ও রাজধর্মের মধ্যে সাংখ্য দর্শনের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বিষ্ণুগুপ্ত তার বইয়ে আন্বীক্ষিকীর তিনটি পথের একটি পথ হিসেবে গ্রহণ করে। আন্বীক্ষিকীর শব্দের অর্থ যার দ্বারা পর্যায়ক্রমে পদ্ধতিগত যুক্তি দেওয়া যায়। যুক্তিকে বৈজ্ঞানিক রূপে আনার জন্য তার উদ্দেশ্য, নির্দেশ (অবস্থানের ব্যাখ্যা), নির্বাচন (ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যা), বিধান (একটি বিষয় গণনার ক্রম) উঠে আসে। পরবর্তীতে চারক ও সুশ্রুত তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত লেখায় এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে, এবং একে তন্ত্রের সাথে তুলনা দেওয়া হয়। [২] বৌদ্ধধর্মের আগে, প্রায় ৮০০ বিসিই থেকে দ্বিতীয় সাংখ্য সময় দেখা যায়। এই সময় বলিপ্রথার বিপক্ষে যুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছিলো বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম। এর মধ্যে একটি প্রধান নিয়ম ছিলো যে সত্য বুঝতে হলে আমাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে হবে।
সাংখ্য কারিকা
[সম্পাদনা]ঈশরকৃষ্ণ বলেন সাংখ্য দর্শন বুঝিয়েছেন পরমঋষি কপিল, যা তিনই অসুরীকে শিখিয়ে যান, যা পরে পঞ্চশিখার কাছে আসে। যদিও অনেক চেষ্টা করা হয়েছে সাংখ্য দর্শনের একটা ক্রমবিন্যাস করার, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। কপিল মুনি যখন অসুরীর কাছে আসে, সে তখন একজন গৃহস্ত ব্যক্তি যে যগ্ন করত। কপিল মুনি একজন আদি বিদ্যান যে একটি নির্মাণচিত্ত থেকে অসুরীকে সাংখ্য দর্শন বোঝান। সাংখ্য কারিকায় পুরুষ ও প্রকৃতির ভাগ, সেটার বিন্যাস, পরিবর্তন, পাঁচটি বিপ্রায় (মিথ্যা জ্ঞান), নয়টি তুষ্টি, ২৮টি অঙ্গের অক্ষমতা ও আটটি সিদ্ধি নিয়ে বলা হয়েছে। পাঁচটি বিপ্রায় হচ্ছে- অবিদ্যা (অজ্ঞতা), অস্মিতা (অহংকার), রাগ (আসক্তি), দ্বেষ, ও অভিনিবেশ (আত্মপ্রেম)।