সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান/নৃবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ইতিহাস
ইতিহাস
[সম্পাদনা]প্রাথমিক সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন
[সম্পাদনা]হেরোডোটাস

হেরোডোটাস পশ্চিমা ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাচীন নৃবিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তাঁর কাজ প্রাচীনতম নৃবৈজ্ঞানিক অধ্যয়নগুলোর অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। তিনি “বহু দূর ভ্রমণ করে অন্যান্য মানুষ ও সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।” [৬] তিনি আজকের মতো নৃবিজ্ঞানের চর্চা করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি অন্যান্য সংস্কৃতির কিংবদন্তি এবং জীবনযাত্রার একটি নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ বিবরণ তৈরি করেছিলেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ভ্রমণ করে এবং প্রাথমিক বিষয় সম্পর্কিত পরোক্ষ বিবরণ ব্যবহার করে তিনি এটি করেছিলেন।
“হ্যালিকার্নাসাসের হেরোডোটাস এখানে তাঁর অনুসন্ধান তুলে ধরেছেন। সময়ের সাথে মানুষের অর্জনগুলো যেন বিস্মৃত না হয়। গ্রিক বা অসভ্যদের দ্বারা প্রদর্শিত মহান ও চমৎকার কাজগুলো যেন তাদের গৌরব না হারায়।” –দ্য হিস্ট্রিজের প্রারম্ভিক বাক্য, হেরোডোটাস
তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিকে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দ) দ্য হিস্ট্রিজ নামে নয়টি খণ্ড লিখেছিলেন। হেরোডোটাস এতে গ্রিক ও পারসিকদের মধ্যে সংঘাতের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে প্রায়শই তিনি কৃষ্ণ সাগরের কাছে বসবাসকারী সিথিয়ানদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে শেখা বিষয়গুলো বর্ণনা করতে তাঁর মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যান। তিনি সিথিয়ানদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জেনেছিলেন এবং তা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি সিথিয়ানদের আরও উত্তরের যাযাবরদের সম্পর্কেও জানতে পেরেছিলেন। তাঁর বর্ণিত তথ্যগুলো প্রতিলিপি করার আগে অনেকবার অনুবাদ করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও রাশিয়া এবং কাজাখস্তানে আধুনিক খননকাজে তাঁর বর্ণিত নিদর্শনগুলোর মতো নিদর্শন পাওয়া গেছে।
ইতিহাসের দিকে একটি দৃষ্টি
[সম্পাদনা]১৯শ শতাব্দী
[সম্পাদনা]আধুনিক সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের উদ্ভব ১৯শ শতাব্দীর "জাতিতত্ত্ব" বা সংস্কৃতির তুলনামূলক অধ্যয়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হয়েছিল। এটি মানব সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশ্লেষণাত্মক সাধারণীকরণ উপস্থাপন করে। ইংল্যান্ডের ই.বি. টাইলর এবং জে.জি. ফ্রেজারের মতো পণ্ডিতরা অন্যদের সংগৃহীত উপকরণ নিয়ে কাজ করেছিলেন। মিশনারি, ব্যবসায়ী, অভিযাত্রী বা ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। এর কারণে তারা বর্তমানে "আর্ম-চেয়ার নৃবিজ্ঞানী" উপাধি অর্জন করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী মানুষের বিশ্বাস এবং প্রথায় মিল থাকার কারণ নিয়ে জাতিতাত্ত্বিকদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। এই প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে ১৯শ শতাব্দীর জাতিতাত্ত্বিকরা দুটি চিন্তাধারায় বিভক্ত হয়েছিলেন। গ্রাফটন এলিয়ট স্মিথের মতো কয়েকজন যুক্তি দিয়েছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠী পরোক্ষভাবে হলেও কোনো না কোনোভাবে একে অপরের কাছ থেকে শিখেছিল। তাদের মতে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে বা "প্রসারিত" হয়েছিল। স্কুলের খেলার মাঠের প্রেক্ষাপটে এই চিন্তাধারাটি আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। সবাই সবচেয়ে জনপ্রিয় বা "কুল" বাচ্চার মতো হতে চায়। তারা তার জিনিসগুলো দেখে সেগুলো পেতে চায়। এই ধারণাটি একটি সমগ্র সংস্কৃতিতে প্রসারিত করা যেতে পারে। মানুষ অন্য একটি গোষ্ঠীকে নিজেদের চেয়ে ভালোভাবে কিছু করতে দেখে। এরপর তারা জীবনযাপনের নতুন ও কার্যকর উপায় শেখে।
অন্যান্য জাতিতাত্ত্বিকরা দাবি করেছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠী স্বাধীনভাবে একই ধরনের বিশ্বাস এবং প্রথা উদ্ভাবনে সক্ষম। "স্বাধীন উদ্ভাবনের" সমর্থনকারী মর্গানের মতো কয়েকজন ভিন্ন মত পোষণ করতেন। তাদের মতে এই মিলের অর্থ হলো বিভিন্ন গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক বিবর্তনের একই পর্যায় অতিক্রম করেছে। মর্গান বিশেষভাবে স্বীকার করেছিলেন যে সমাজ এবং সংস্কৃতির কিছু নির্দিষ্ট রূপ অন্যদের আগে উদ্ভূত হওয়া সম্ভব ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ কৃষিকাজের আগে শিল্পভিত্তিক কৃষিকাজ উদ্ভাবন করা সম্ভব ছিল না। ধাতু জড়িত পূর্ববর্তী গলনবিহীন প্রক্রিয়া (যেমন মাটি থেকে সংগ্রহ বা খনন) ছাড়া ধাতুবিদ্যার বিকাশ সম্ভব ছিল না। মর্গান ১৯শ শতাব্দীর অন্যান্য সামাজিক বিবর্তনবাদীদের মতোই আদিম থেকে সভ্যতায় একটি সুশৃঙ্খল অগ্রগতির ধারণায় বিশ্বাস করতেন।
২০শ শতাব্দী
[সম্পাদনা]২০শ শতাব্দীর নৃবিজ্ঞানীরা একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সমস্ত মানব সমাজকে একই ক্রমানুসারে একই পর্যায়গুলো অতিক্রম করতে হবে বলে ধারণাটি ছিল। বাস্তব তথ্য প্রমাণের সাথে ধারণাটি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার কারণে তারা এটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মানব সমাজের এমন ব্যাপক বিকাশ দেখার পর আমরা এখন জানি যে সংস্কৃতিগুলো বিভিন্ন হারে পরিবর্তিত হয়। পরিবেশগত কারণ, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং শিক্ষাগত উন্নয়নের কারণে এটি ঘটে। জুলিয়ান স্টুয়ার্ডের মতো ২০শ শতাব্দীর কয়েকজন জাতিতাত্ত্বিক ভিন্ন যুক্তি দিয়েছিলেন। তাদের মতে এই মিলগুলো মূলত একই ধরনের পরিবেশের সাথে একই ধরনের মানিয়ে নেওয়াকে প্রতিফলিত করে।
ক্লদ লেভি-স্ট্রসের মতো অন্যরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে বিকাশের আপাত ধরনগুলো মানুষের চিন্তার কাঠামোগত মৌলিক মিলগুলোকে প্রতিফলিত করে (কাঠামোবাদ দেখুন)। তিনি আমেরিকান সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান এবং ফরাসি দ্যুর্কাইমীয় সমাজবিজ্ঞান উভয় দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ২০শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পর্যায়গুলো এড়িয়ে যাওয়া মানুষের অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, এক প্রজন্মে শিকারী-সংগ্রাহক থেকে শিল্প-পরবর্তী পরিষেবা পেশায় যাওয়ার কথা বলা যায়। এই উদাহরণগুলো এত বেশি ছিল যে ১৯শ শতাব্দীর বিবর্তনবাদ কার্যকরভাবে খণ্ডিত হয়েছিল।[১]
২০শ শতাব্দীতে বেশিরভাগ সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক নৃবিজ্ঞানী এথনোগ্রাফি বা জাতিতত্ত্ব রচনায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। এথনোগ্রাফি হলো কোনো সংস্কৃতির একটি কেস স্টাডি। কোনো গবেষক সেই সংস্কৃতিতে নিজেকে নিমজ্জিত করে এটি তৈরি করেন। সাধারণত নৃবিজ্ঞানী যথেষ্ট সময়ের জন্য অন্য একটি সমাজের মধ্যে বাস করেন। একইসাথে তিনি সেই গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণ করেন এবং তা পর্যবেক্ষণ করেন। সংস্কৃতি অধ্যয়নের এই উপায়টি সংস্কৃতির একটি অনেক বেশি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। ইতিহাস জুড়ে থাকা আর্মচেয়ার নৃবিজ্ঞানীদের আগের পদ্ধতির বিপরীতে এই পণ্ডিতরা সেখানে গিয়ে মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। কোনো সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার উপায় হিসেবে এই এথনোগ্রাফিগুলো একটি দুর্দান্ত সম্পদ।
তবে আরও বেশ কয়েকটি এথনোগ্রাফিক কৌশলের মাধ্যমে এথনোগ্রাফিক লেখা বা বিবরণ সংরক্ষিত হয়েছে। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা উপকরণ সংগ্রহ করেন। তারা পাঠাগার, চার্চ এবং স্কুলে রেকর্ড পড়ার জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। এছাড়া তারা কবরস্থান অনুসন্ধান করেন এবং প্রাচীন লিপি পাঠোদ্ধার করেন। একটি সাধারণ এথনোগ্রাফিতে প্রাকৃতিক ভূগোল, জলবায়ু এবং আবাসস্থল সম্পর্কিত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটি আলোচিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে একটি সামগ্রিক লেখা হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে প্রায়শই এতে অতীত ঘটনাগুলোর সম্ভাব্য দীর্ঘতম সময়কাল অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রাথমিক এবং গৌণ গবেষণার মাধ্যমে এথনোগ্রাফার এটি পেতে পারেন।
ব্রনিস্ল ম্যালিনোস্কি ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জে মাঠপর্যায়ের গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন এবং ইংল্যান্ডে শিক্ষকতা করেছিলেন। তিনি এই পদ্ধতিটি তৈরি করেছিলেন। ফ্রাঞ্জ বোয়াস এটির প্রচার করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান বিকাশের জন্য বোয়াসের শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতি এবং সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। একই সময়ে ম্যালিনোস্কি এবং এ.আর. র্যাডক্লিফ-ব্রাউনের শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যে সামাজিক নৃবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটাচ্ছিলেন। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান প্রতীক এবং মূল্যবোধের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। অন্যদিকে সামাজিক নৃবিজ্ঞান সামাজিক গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। বর্তমানে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা এই সমস্ত উপাদান নিয়ে কাজ করেন।
১৯শ শতাব্দীর জাতিতাত্ত্বিকরা "প্রসারণ" এবং "স্বাধীন উদ্ভাবন"কে পরস্পর বিরোধী এবং প্রতিযোগিতামূলক তত্ত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। তবে বেশিরভাগ এথনোগ্রাফার দ্রুত একমত হয়েছিলেন যে উভয় প্রক্রিয়াই ঘটে। উভয় প্রক্রিয়াই সম্ভবত আন্তঃসাংস্কৃতিক মিলের কারণ হতে পারে। কিন্তু এই এথনোগ্রাফাররা এ ধরনের অনেক মিলের অতি সাধারণ দিক নির্দেশ করেছিলেন। এমনকি প্রসারণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বৈশিষ্ট্যগুলো এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে যাওয়ার সময় প্রায়শই তাদের অর্থ এবং কাজ পরিবর্তন করে।
সেই অনুযায়ী এই নৃবিজ্ঞানীরা সংস্কৃতির তুলনা, মানব প্রকৃতির সাধারণীকরণ বা সাংস্কৃতিক বিকাশের সর্বজনীন নিয়ম আবিষ্কারে কম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এর বদলে তারা নির্দিষ্ট সংস্কৃতিগুলোকে তাদের নিজস্ব শর্তে বোঝার দিকে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এ ধরনের এথনোগ্রাফার এবং তাদের শিক্ষার্থীরা "সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ" ধারণার প্রচার করেছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস এবং আচরণ কেবল তার বসবাসের সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটেই বোঝা সম্ভব।
২০শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছিল। ইউরোপীয় "সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা" পর্যবেক্ষণ করা সামাজিক আচরণ এবং "সামাজিক কাঠামোর" ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। অর্থাৎ তারা সামাজিক ভূমিকার মধ্যে সম্পর্ক (যেমন- স্বামী-স্ত্রী বা পিতামাতা-সন্তান) এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন- ধর্ম, অর্থনীতি এবং রাজনীতি) ওপর জোর দিয়েছিলেন। আমেরিকান "সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা" মানুষের নিজেদের এবং তাদের বিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের উপায়গুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। বিশেষ করে শিল্পের এবং অতিকথার মতো প্রতীকী রূপের ওপর তারা জোর দিয়েছিলেন। এই দুটি পদ্ধতি প্রায়শই একত্রিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, আত্মীয়তা এবং নেতৃত্ব একইসাথে প্রতীকী ব্যবস্থা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। এগুলো সাধারণত একে অপরের পরিপূরক ছিল। বর্তমানে প্রায় সমস্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী উভয় পূর্বসূরিদের কাজের উল্লেখ করেন। মানুষ কী করে এবং মানুষ কী বলে তার প্রতি তাদের সমান আগ্রহ রয়েছে।
বর্তমান সময়
[সম্পাদনা]বর্তমানে এথনোগ্রাফি সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে আধিপত্য বজায় রেখেছে। তা সত্ত্বেও অনেক সমসাময়িক সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এথনোগ্রাফির আগের মডেলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী এই মডেলগুলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে "সীমাবদ্ধ" এবং "বিচ্ছিন্ন" হিসেবে বিবেচনা করত। এই নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন স্থানের মানুষের জীবন যাপনের স্বতন্ত্র উপায়গুলো নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা প্রায়শই দাবি করেন কেবল স্থানীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবনের এই বিশেষ উপায়গুলো বোঝা যায় না। এর পরিবর্তে তারা বৃহত্তর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামো বোঝার প্রচেষ্টার সাথে স্থানীয় মনোযোগকে একত্রিত করেন। এসব বৃহত্তর কাঠামো স্থানীয় জীবনযাত্রার বাস্তবতায় প্রভাব ফেলে। এই পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য সমর্থকদের মধ্যে রয়েছেন অর্জুন আপাদুরাই, জেমস ক্লিফোর্ড, জর্জ মার্কাস, সিডনি মিন্টজ, মাইকেল টসিগ এবং এরিক উলফ।
নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বিশ্লেষণে বহুমুখী এথনোগ্রাফির ব্যবহার একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা বলে মনে হয়। জর্জ মার্কাসের "এথনোগ্রাফি ইন/অফ দ্য ওয়ার্ল্ড সিস্টেম: দ্য ইমার্জেন্স অফ মাল্টি-সাইটেড এথনোগ্রাফি" নিবন্ধে এটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বহুমুখী এথনোগ্রাফি সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক সামাজিক শৃঙ্খলার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখে। এটি স্থানিক এবং কালগত উভয়ভাবে বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ব্যবহার করে। স্থানীয় এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়গুলোতে বিশ্ব-ব্যবস্থার প্রভাব পরীক্ষা করার সময় এই পদ্ধতির মাধ্যমে আরও ভালো অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যেতে পারে।
বহুমুখী এথনোগ্রাফিতে মাঠপর্যায়ের কাজের জন্য বৃহত্তর আন্তঃবিভাগীয় পদ্ধতিও উঠে আসছে। এটি সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন, মিডিয়া অধ্যয়ন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি অধ্যয়নসহ অন্যান্য পদ্ধতি নিয়ে আসে। বহুমুখী এথনোগ্রাফিতে গবেষণা স্থানিক এবং কালগত সীমানা পেরিয়ে একটি বিষয় অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি বহুমুখী এথনোগ্রাফি কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা "জিনিস"কে অনুসরণ করতে পারে। এটি বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় তাকে ট্র্যাক করে।
বহুমুখী এথনোগ্রাফি ডায়াস্পোরাতে থাকা জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকেও অনুসরণ করতে পারে। এটি একাধিক স্থানে এবং একাধিক সময়ে উপস্থিত হওয়া গল্প বা গুজবকে অনুসরণ করতে পারে। একাধিক এথনোগ্রাফিক স্থানে উপস্থিত রূপক বা স্থান এবং সময়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জীবনীকেও এটি ট্র্যাক করতে পারে। এটি সীমানা অতিক্রমকারী সংঘাতগুলোকেও অনুসরণ করতে পারে। মানব অঙ্গ ব্যবসার আন্তর্জাতিক কালোবাজার নিয়ে করা ন্যান্সি শেপার-হিউজেসের এথনোগ্রাফিটি বহুমুখী এথনোগ্রাফির একটি উদাহরণ। এই গবেষণায় তিনি পুঁজিবাদের বিভিন্ন আইনি ও বেআইনি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়া অঙ্গগুলোকে অনুসরণ করেন। শিশু অপহরণ এবং অঙ্গ চুরি সম্পর্কে দরিদ্র সম্প্রদায়গুলোতে প্রচলিত গুজব এবং শহুরে কিংবদন্তিগুলোও তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানীরা ক্রমশ "পশ্চিমা" সংস্কৃতির দিকে তাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপ বোর্গোয়া ১৯৯৭ সালে মার্গারেট মিড পুরস্কার জিতেছিলেন। হারলেমের একটি ক্র্যাক-ডেনের উদ্যোক্তাদের নিয়ে করা গবেষণা ইন সার্চ অফ রেসপেক্টের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান। পেশাদার সম্প্রদায়ের এথনোগ্রাফিগুলোও ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। পরীক্ষাগার গবেষক, ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগকারী, আইন সংস্থা বা আইটি কম্পিউটার কর্মীদের এথনোগ্রাফি এর অন্তর্ভুক্ত।[২]
ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী
[সম্পাদনা]
লুইস হেনরি মর্গান
[সম্পাদনা]লুইস হেনরি মর্গান ১৮১৮ সালের ২১ নভেম্বর নিউ ইয়র্কের অরোরার কাছে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৪০ সালে শেনেকট্যাডির ইউনিয়ন কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং পেশায় অ্যাটর্নি হন। পরে তিনি পশ্চিম নিউ ইয়র্কের ইরোকোইস আদিবাসীদের নিয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি ইরোকোইস কনফেডারেশন সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি আত্মীয়তা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর কাজ, সামাজিক বিবর্তনের তত্ত্ব এবং ইরোকোইসদের এথনোগ্রাফির জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। আত্মীয়তা হলো ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের জাল। এটি বেশিরভাগ সমাজের অধিকাংশ মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজকে কী একত্রে ধরে রাখে তা নিয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন। তিনি একটি ধারণা প্রস্তাব করেছিলেন যে আদিম মানব গার্হস্থ্য প্রতিষ্ঠান পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ছিল না, বরং সেটি ছিল মাতৃতান্ত্রিক গোত্র।[৩]
তাঁর লেখা “লিগ অফ দ্য হো-ডি-নো-সাউ-নি, অর ইরোকোইস” (১৮ ৫১) আদিবাসীদের প্রথম দিককার বস্তুনিষ্ঠ এথনোগ্রাফিক কাজগুলোর মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়। আত্মীয়তা ব্যবস্থার অধ্যয়ন বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগামী অর্জন। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে সেনেকারা তাদের আত্মীয়দের পশ্চিমা সংস্কৃতির চেয়ে ভিন্নভাবে উল্লেখ করে। পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো না হয়ে তারা চাচাতো ভাইবোন, ভাগ্নি এবং ফুফুদের মতো সমান্তরাল আত্মীয়দের পিতার, বোন এবং কন্যাদের মতো প্রত্যক্ষ বংশের সাথে একীভূত করে।

এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর
[সম্পাদনা]স্যার এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর (১৮৩২-১৯১৭) ইংল্যান্ডের লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েলে ১৮৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্রোভ হাউস হাই স্কুল থেকে স্নাতক হন। তবে পিতামাতার মৃত্যুর কারণে তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাননি। পিতামাতার মৃত্যুর পর টাইলরের যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। উষ্ণ জলবায়ুর সন্ধানে তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে মধ্য আমেরিকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখানেই তিনি প্রথম নৃবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর গবেষণা শুরু করেছিলেন। তাকে নৃবিজ্ঞানে সাংস্কৃতিক বিবর্তনবাদের প্রাথমিক প্রবক্তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৭১ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮৭৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অফ সিভিল লজের সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১২ সালে তাঁর অবদানের জন্য তিনি নাইট উপাধি পেয়েছিলেন। এগুলো ছিল তাঁর পুরস্কার এবং অর্জন।
তাঁর প্রথম বইটির যথাযথ নামকরণ করা হয়েছিল অ্যানথ্রোপলজি (১৮৮১)। এটি এর সাংস্কৃতিক ধারণা এবং তত্ত্বগুলোতে বেশ আধুনিক হিসেবে বিবেচিত। ১৮৮৩ সালে টাইলর অক্সফোর্ডের ইউনিভার্সিটি মিউজিয়ামে যোগ দেন। তিনি ১৮৯৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। টাইলরের বেশিরভাগ কাজে আদিম সংস্কৃতি এবং মানুষের মন, বিশেষত সর্বপ্রাণবাদ জড়িত ছিল। সর্বপ্রাণবাদ একটি দার্শনিক, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ধারণা। এই ধারণা অনুযায়ী কেবল মানুষ এবং প্রাণী নয়, বরং উদ্ভিদ, শিলা এবং প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যেও আত্মা বা আত্মার অস্তিত্ব রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের ভিত্তি ছিল তাঁর কাজ। তাঁর পরবর্তী কিছু কাজের মধ্যে রয়েছে: রিসার্চেস ইনটু দ্য আর্লি হিস্ট্রি অফ ম্যানকাইন্ড (১৮৬৫) এবং আনাহুয়াক (১৮৬১)। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ "প্রিমিটিভ কালচার" (১৮৭১)। এটি ডারউইনের জৈবিক বিবর্তন তত্ত্ব দ্বারা আংশিকভাবে প্রভাবিত ছিল। এটি আদিম থেকে আধুনিক সংস্কৃতির একটি বিবর্তনীয় এবং প্রগতিশীল সম্পর্কের তত্ত্ব তৈরি করেছিল। এটি "সংস্কৃতি বা সভ্যতা"কে "সেই জটিল সামগ্রিকতা যা জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নৈতিকতা, আইন, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত অন্য যেকোনো ক্ষমতা এবং অভ্যাসকে অন্তর্ভুক্ত করে" হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে এটি করেছিল। এই সংজ্ঞা একটি ধারণাকে উৎসাহিত করেছিল। আদিমদেরও এমন ক্ষমতা এবং অভ্যাস ছিল যা সম্মান পাওয়ার যোগ্য বলে ধারণাটিতে বলা হয়। এভাবে আদিমদের সম্পর্কে থাকা গতানুগতিক ধারণা পরিবর্তিত হয়েছিল।[৪] ভ্রমণের সময় তাঁর হেনরি ক্রিস্টি নামের একজনের সাথে দেখা হয়েছিল। ক্রিস্টি একজন কোয়েকার ছিলেন। তিনি জাতিতত্ত্ব এবং প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী ছিলেন। এটি এই ক্ষেত্রগুলোতে টাইলরের আগ্রহকে প্রভাবিত করেছিল।
ফ্রাঞ্জ বোয়াস
[সম্পাদনা]
আমেরিকান নৃবিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত ফ্রাঞ্জ বোয়াস ১৮৫৮ সালে জার্মানির মিনডেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৮১ সালে কিয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে মাইনরসহ পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে তিনি অধ্যাপক হন এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নৃবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।[৫]
কানাডার উত্তর ভ্যাঙ্কুভার এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় স্থানীয় জনসংখ্যার ওপর অধ্যয়নের জন্য বোয়াস সুপরিচিত। চার্লস ডারউইনের লেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বোয়াস সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন। মানুষ কী বলে এবং কী করে তা বুঝতে আমাদের নিজেদের মানদণ্ড ব্যবহার না করে বরং ওই সংস্কৃতির নিজস্ব লক্ষ্য, মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস ব্যবহার করে তার ব্যাখ্যা করাই হলো সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ। তিনি তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় এই ক্ষেত্রে বর্ণগত পার্থক্যের গুরুত্বকে অস্বীকার করতে ব্যয় করেছিলেন। একসময় আর্মচেয়ার নৃবিজ্ঞান এবং বর্ণগত কুসংস্কার ব্যাপক ছিল। সেই সময় বোয়াস নিরপেক্ষ তথ্যের গুরুত্ব এবং তাঁর গবেষণায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি পশ্চিমা সভ্যতার কথিত "সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের" ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বোয়াস আধুনিক নৃবিজ্ঞানকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ধাঁচে তার কঠোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দিয়েছিলেন। তিনি শেখা আচরণ হিসেবে "সংস্কৃতি"র ধারণারও প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি সাধারণীকরণের চেয়ে গবেষণার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এটি বড় তত্ত্ব তৈরির ওপর জোর দিয়েছিল (যা কেবল মাঠপর্যায়ের কাজের মাধ্যমেই পরীক্ষা করা হয়েছিল) লিঙ্ক: বোয়াস। বোয়াস সত্যই এথনোগ্রাফি তৈরি করা প্রথম ব্যক্তি ছিলেন। এথনোগ্রাফি হলো নৃবৈজ্ঞানিক অধ্যয়নের একটি বর্ণনামূলক বিবরণ। বোয়াসের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে রয়েছেন নৃবিজ্ঞানী আলফ্রেড এল. ক্রোয়েবার, মার্গারেট মিড, জুলস হেনরি এবং অ্যাশলে মন্টাগু। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৩৭ সালে বোয়াস এমেরিটাস অধ্যাপক হন। তিনি ১৯৪২ সালে মারা যান।
রুথ বেনেডিক্ট
[সম্পাদনা]
রুথ বেনেডিক্ট একজন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ছিলেন। আমেরিকান নৃবিজ্ঞানের জনক তাঁর পরামর্শদাতা এবং শিক্ষক ফ্রাঞ্জ বোয়াস দ্বারা তাঁর কাজ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। তিনি ১৮৮৭ সালের ৫ জুন নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মারা যান। তিনি ১৯০৯ সালে ভাসার কলেজ থেকে স্নাতক হন। ১৯১৯ সালে তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শুরু করেন। ফ্রাঞ্জ বোয়াসের অধীনে পড়াশোনা করে তিনি ১৯২৩ সালে পিএইচডি লাভ করেন। তাঁর বই প্যাটার্নস অফ কালচার (১৯৩৪) চৌদ্দটি ভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল এবং বহু বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবহৃত হয়েছিল। বইটির মূল ধারণা হলো প্রতিটি সংস্কৃতি "মানবিক ব্যক্তিত্বের বৃহৎ বৃত্ত" থেকে বেছে নেয়। তবে মানুষের চরিত্রের পাশাপাশি সমাজের সামগ্রিক চরিত্রে কেবল প্রভাবশালী বৈশিষ্ট্যগুলোই আবির্ভূত হয়। রুথ বেনেডিক্ট একটি ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন যে ব্যক্তি-বিকাশ জাতি-বিকাশের পুনরাবৃত্তি করে। এই ধারণা অনুযায়ী ব্যক্তির বৃদ্ধি বা পরিবর্তন হলো প্রজাতির বৃদ্ধি বা পরিবর্তনের একটি প্রতিফলন। প্রতিটি সংস্কৃতির নিজস্ব নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন। কোনো সংস্কৃতিকে সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন করলেই কেবল এগুলো বোঝা সম্ভব। বেনেডিক্ট নিউ মেক্সিকোতে স্থানীয় আমেরিকান পুয়েবলোদের সাথে মাঠপর্যায়ে গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। তিনি তার গবেষণার পরিপূরক হিসেবে ফ্রাঞ্জ বোয়াস এবং মার্গারেট মিডের মতো অন্যান্য সহকর্মীদের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন।
মার্গারেট মিড
[সম্পাদনা]
মার্গারেট মিড (১৯০১-১৯৭৯) পাঁচ বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন। মিড ১৯০১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বার্নার্ড কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন৩। সেখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা নৃবিজ্ঞানী রুথ বেনেডিক্ট এবং ফ্রাঞ্জ বোয়াসের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তাঁর জীবনে তিনবার বিয়ে করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক লুথার শেলি ক্রেসম্যানের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল। তাঁর তৃতীয় এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিয়ে (১৯৩৬-১৯৫০) ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী গ্রেগরি বেটসনের সাথে হয়েছিল। তাদের মেরি ক্যাথরিন বেটসন নামে একটি মেয়ে ছিল। তিনিও একজন নৃবিজ্ঞানী হয়েছিলেন। মার্গারেট মিড মূলত সামোয়া, নিউ গিনি এবং বালিতে সন্তান পালন এবং ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। এখানেই তিনি তাঁর গবেষণায় একটি ইতিবাচক পদ্ধতি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মিড তাঁর কাজের বক্তা এবং লেখিকা হিসেবে গণমাধ্যমেও জনপ্রিয় ছিলেন।
১৯৩০-এর দশকে মার্গারেট মিড নিয়ন্ত্রিত তুলনা নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে অনুমান পরীক্ষা করা হতো। প্রতিটি পরিবেশ একটি পৃথক পরীক্ষার সাথে মিলে যেত। এটি মিডের মতো নৃবিজ্ঞানীদের কৃত্রিম ল্যাবের পরিবেশের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানবজীবন অধ্যয়নের সুযোগ করে দিয়েছিল। লিঙ্গ ভূমিকার পরিসর এবং কারণ আবিষ্কারের প্রয়াসে তিনি চারটি ভিন্ন সমাজ অধ্যয়ন করার সময় এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করেছিলেন। এটি আজও ব্যবহৃত হয়। মার্গারেট মিড প্রগতিশীল প্রস্তাব প্রবর্তন এবং একজন কর্মী হওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তাঁর খোলামেলা সমর্থন ছিল তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় অবস্থানগুলোর মধ্যে একটি। তাঁর প্রাপ্ত তথ্য থেকে তিনি অনেক এথনোগ্রাফিক লেখা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কামিং অফ এজ ইন সামোয়া (১৯২৮) এবং সেক্স অ্যান্ড টেম্পারামেন্ট ইন থ্রি প্রিমিটিভ সোসাইটিস (১৯৩৫)৩ এর মধ্যে অন্যতম।
জুলিয়ান স্টুয়ার্ড
[সম্পাদনা]
জুলিয়ান স্টুয়ার্ড ১৯০২ সালের ৩১ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসিতে জন্মগ্রহণ করেন। স্টুয়ার্ড ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯২৫ সালে তিনি প্রাণিবিদ্যায় বিএসসি নিয়ে স্নাতক হন। স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য তিনি বার্কলেতে ফিরে আসেন। ১৯২৯ সালে তিনি দ্য সেরিমোনিয়াল বাফুন অফ দ্য আমেরিকান ইন্ডিয়ান, আ স্টাডি অফ রিচ্যুয়ালাইজড ক্লাউনিং অ্যান্ড রোল রিভার্সালস শিরোনামের একটি গবেষণাপত্র নিয়ে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। এরপর স্টুয়ার্ড মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নৃবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি ১৯৩০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছিলেন। লেসলি হোয়াইটের নিয়োগ এবং নির্দেশনায় বিভাগটি পরে পরিচিতি লাভ করে। স্টুয়ার্ড লেসলি হোয়াইটের "সর্বজনীন" সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মডেলের সাথে দ্বিমত পোষণ করতেন। ১৯৪৬ সালে স্টুয়ার্ডের কর্মজীবন শীর্ষে পৌঁছায়। তখন তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব নেন। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নৃবিজ্ঞানের কেন্দ্র ছিল। স্টুয়ার্ড দ্রুত এমন একদল শিক্ষার্থী তৈরি করেছিলেন যারা নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এদের মধ্যে সিডনি মিন্টজ, এরিক উলফ, রয় র্যাপাপোর্ট, স্ট্যানলি ডায়মন্ড, রবার্ট ম্যানার্স, মর্টন ফ্রিড এবং রবার্ট এফ. মারফি ছিলেন। তিনি মারভিন হ্যারিসের মতো অন্যান্য পণ্ডিতদেরও প্রভাবিত করেছিলেন। এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই পুয়ের্তো রিকো প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এটি পুয়ের্তো রিকোয় আধুনিকায়নের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা আরেকটি বড় আকারের দলগত গবেষণা ছিল। স্টুয়ার্ড কলম্বিয়া ছেড়ে আরবানা-শ্যাম্পেইনের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। ১৯৬৮ সালে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা চালিয়ে যান। সেখানে তিনি আরেকটি বড় আকারের গবেষণা গ্রহণ করেছিলেন। এটি তৃতীয় বিশ্বের এগারোটি সমাজে আধুনিকায়নের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছিল। এই গবেষণার ফলাফল কন্টেম্পোরারি চেঞ্জ ইন ট্র্যাডিশনাল সোসাইটিস শিরোনামে তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। স্টুয়ার্ড ১৯৭২ সালে মারা যান।
স্টুয়ার্ড তার পদ্ধতি এবং সাংস্কৃতিক বাস্তুবিদ্যার তত্ত্বের জন্য সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকে আমেরিকান নৃবিজ্ঞান সাধারণীকরণের ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। নৃবিজ্ঞানীদের তৈরি অত্যন্ত বিস্তারিত মনোগ্রাফগুলো থেকে তারা প্রায়শই বৃহত্তর উপসংহার টানতে অনিচ্ছুক ছিল। স্টুয়ার্ড নৃবিজ্ঞানকে এই বিশেষায়িত পদ্ধতি থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য। তিনি একটি আরও নিয়মতান্ত্রিক ও সামাজিক-বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা তৈরি করেছিলেন। তার "বহুমুখী" সাংস্কৃতিক বিবর্তন তত্ত্ব সমাজগুলো কীভাবে তাদের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয় তা পরীক্ষা করেছিল। সমাজের বিবর্তনের প্রতি স্টুয়ার্ডের আগ্রহ তাকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়াগুলো পরীক্ষা করতেও পরিচালিত করেছিল। সমাজের জাতীয় এবং স্থানীয় স্তর একে অপরের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত তা পরীক্ষা করা প্রথম নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। মানবতার সমগ্র বিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করে এমন একটি সামাজিক তত্ত্ব তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে নৃবিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট বা বিদ্যমান সংস্কৃতির বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। স্টুয়ার্ড বিশ্বাস করতেন নির্দিষ্ট যুগ বা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী সাধারণ বা প্রচলিত সংস্কৃতি বিশ্লেষণ করে তত্ত্ব তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া তিনি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে কিছু নির্ধারক কারণ (প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি) এবং গৌণ কারণ (রাজনৈতিক ব্যবস্থা, মতাদর্শ, ধর্ম ইত্যাদি) কোনো প্রদত্ত সংস্কৃতির বিকাশ নির্ধারণ ও প্রভাবিত করে।
রে বার্ডহুইস্টেল
[সম্পাদনা]রে এল. ১৯১৮ সালে ওহাইওর সিনসিনাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি টরন্টো, লুইসভিলে এবং বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর তিনি পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হন। সেখানে তিনি অশাব্দিক যোগাযোগ এবং কাইনেসিসে তাঁর আগ্রহ নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। বার্ডহুইস্টেল চলচ্চিত্রে মানুষের মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাঁর অধ্যয়নের বেশিরভাগ অংশ পেয়েছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো উপসংহারে পৌঁছেছিল যে লোকেরা তথ্য জানাতে চোখের নড়াচড়া, মুখের অভিব্যক্তি এবং বুক ব্যবহার করে। বার্ডহুইস্টেল কাইনেসিসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সাংস্কৃতিকভাবে বিন্যাসিত দৃশ্যমান যোগাযোগ হিসেবে মানুষের পরিবেশের অধ্যয়নই হলো কাইনেসিস। তিনি কাইনেসিস সম্পর্কে দুটি পাঠ্য প্রকাশ করেছিলেন। এগুলোর একটি হলো ইন্ট্রোডাকশন টু কাইনেসিস এবং অন্যটি হলো বেশি পরিচিত কাইনেসিস ইন কনটেক্সট। বার্ডহুইস্টেল প্রখ্যাত লোককথাবিদ এবং এথনোমিউজিকোলজিস্ট অ্যালান লোম্যাক্সের পরামর্শদাতা ছিলেন। যোগাযোগ ও ভাষা অধ্যায়ে কাইনেসিস সম্পর্কে আরও জানুন।
মারভিন হ্যারিস
[সম্পাদনা]মারভিন হ্যারিস (১৯২৭-২০০১) ১৯২৭ সালের ১৮ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্মগ্রহণ করেন। হ্যারিস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং এরপর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। স্নাতক হওয়ার পর হ্যারিস কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সহকারী অধ্যাপক হন। সংস্কৃতির আদর্শিক বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁর অধ্যয়নের মূল ফোকাস ছিল। পরে হ্যারিস ১৯৫৭ সালে মোজাম্বিকে মাঠপর্যায়ের কাজ করেছিলেন। তখন তিনি আচরণগত দিকগুলোর ওপর আরও বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করেন। ভারতীয় সংস্কৃতির ‘পবিত্র গরু’ সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যার জন্যও তিনি সুপরিচিত। হ্যারিস তাঁর মাঠপর্যায়ের বেশিরভাগ কাজ ব্রাজিল, মোজাম্বিক, ভারত এবং ইকুয়েডরে করেছিলেন।
হ্যারিস একজন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ছিলেন। সাংস্কৃতিক বস্তুবাদে তাঁর লেখা এবং প্রভাবের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। হ্যারিসের অধ্যয়নগুলো মূলত লাতিন আমেরিকা এবং ব্রাজিলের ওপর ভিত্তি করে ছিল। হ্যারিস তাঁর নিজস্ব মতামত এবং ধারণা তৈরিতে সাহায্য করতে কার্ল মার্কস এবং ম্যালথাসের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন। হ্যারিসের ১৬টিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছিল। হ্যারিসের লেখা দ্য রাইজ অফ অ্যানথ্রোপলজিকাল থিওরি প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর আমেরিকান অ্যানথ্রোপলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন তাঁর তত্ত্ব নিয়ে প্রচুর আলোচনা এবং সমালোচনা করেছিল। হ্যারিসের কাজ নৃবিজ্ঞানীদের তাঁর অধ্যয়ন সম্পর্কে জানতে এবং আরও তথ্য সংগ্রহ করতে সাহায্য করেছে।
নেপোলিয়ন শ্যাগনন
[সম্পাদনা]
নেপোলিয়ন শ্যাগনন ১৯৩৮ সালে মিশিগানের পোর্ট অস্টিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী। ভেনেজুয়েলা এবং ব্রাজিলের মধ্যে থাকা আমাজনের ইয়ানোমামি উপজাতির সাথে এথনোগ্রাফিক কাজের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের বিবর্তনীয় তত্ত্ব বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি প্রথমে ইয়ানোমামি উপজাতিকে অসভ্য হিসেবে নথিভুক্ত করেছিলেন। তারা তাঁর সাথে খুব খারাপ আচরণ করেছিল। সময়ের সাথে সাথে তিনি উপজাতির কার্যকলাপ সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন। তিনি শাকি ডাকনাম পান যার অর্থ "বিরক্তিকর মৌমাছি"।
ইয়ানোমামিদের নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে শ্যাগনন এই লোকদের বংশতালিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। কে বিবাহিত, কে কার আত্মীয় এবং তাদের সহযোগিতা ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে তিনি এটি করেছিলেন। এই গবেষণার মাধ্যমে তিনি সমাজবিজ্ঞান এবং মানব আচরণগত বাস্তুবিদ্যা ক্ষেত্রে একজন পথিকৃৎ ছিলেন। ইয়ানোমামি মানুষ এবং তাদের সমাজ নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করে তিনি দৃশ্যমান নৃবিজ্ঞানেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে টিম অ্যাশের সাথে তৈরি করা দ্য ইয়ানোমামো সিরিজ। ইয়ানোমামো সংস্কৃতির ওপর ২২টি পৃথক চলচ্চিত্র এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন- দ্য অ্যাক্স ফাইট (১৯৭৫), চিলড্রেনস ম্যাজিকাল ডেথ (১৯৭৪), ম্যাজিকাল ডেথ (১৯৮৮), আ ম্যান কলড বি: আ স্টাডি অফ দ্য ইয়ানোমামো (১৯৭৪) এবং ইয়ানোমামো অফ দ্য অরিনোকো (১৯৮৭)। তিনি ইয়ানোমামি সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইয়ানোমামো: দ্য ফিয়ার্স পিপল (১৯৬৮)। নিউ ইয়র্কে লেখা এন. শ্যাগননের (১৯৭৪) স্টাডিং দ্য ইয়ানোমামো, হোল্ট, রাইনহার্ট অ্যান্ড উইনস্টনও এর মধ্যে আছে। এছাড়া রয়েছে ইয়ানোমামো - দ্য লাস্ট ডেজ অফ ইডেন (১৯৯২)।
তাঁর কাজের বেশিরভাগই সংস্কৃতির বিকাশ নথিভুক্ত করার উদ্দেশ্যে ছিল। তবে তাঁকে সংস্কৃতির ধ্বংসকারী হিসেবেও কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে। প্যাট্রিক টিয়ার্নির লেখা ডার্কনেস ইন এল ডোরাডো বই অনুসারে, শ্যাগনন ইয়ানোমামিদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন। টিয়ার্নির সমস্ত দাবি খণ্ডন করা হয়েছে। তবে এটি সত্য যে বাইরের অন্যান্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে এই উপজাতির লোকেরা এমন কিছু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল যার বিরুদ্ধে তাদের শরীর লড়তে পারেনি। শ্যাগনন কেবল তাঁর এথনোগ্রাফির জন্যই পরিচিত ছিলেন না। তিনি তাঁর কাজ এবং মতামত নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কের জন্যও সুপরিচিত ছিলেন।
পল ফার্মার
[সম্পাদনা]
পল ফার্মার একজন সুপরিচিত চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ডিগ্রির জন্য কাজ করার সময় তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কাজ শুরু করেছিলেন। এটি বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সঠিক চিকিৎসা প্রদানের বিষয়ে তাঁর আজীবন মনোযোগের সূচনা করেছিল। অলাভজনক কাজের মাধ্যমে এবং দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিবর্তনকে নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মাধ্যমে তিনি এটি করেছিলেন। হার্ভার্ডে ফার্মার সংক্রামক রোগে বিশেষজ্ঞ হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি যক্ষ্মার মতো এমন রোগগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন যা দরিদ্রদের অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৮৭ সালে ফার্মার পার্টনার্স ইন হেলথ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। আজ পর্যন্ত সংস্থাটি হাইতির গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১,০০০ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়। এছাড়া এটি সাইবেরিয়ার বন্দিদের এবং লিমা ও পেরুর বস্তিগুলোতে ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে কাজ করে। ফার্মার তাঁর নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং এথনোগ্রাফিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে অভাবীদের জন্য টেকসই ও ব্যবহারিক স্বাস্থ্যসেবা তৈরি করেন। সামাজিক এবং কাঠামোগত সহিংসতার কারণে সেই সমাজগুলোতে হওয়া নেতিবাচক প্রভাবগুলো দূর করতে তিনি কাজ করেন। ফার্মার "ব্যবহারিক সংহতি" ধারণার জন্য সুপরিচিত। এই ধারণাটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের প্রয়োজন মেটাতে কাজ করার কথা বলে। ফার্মারকে বেশ কয়েকটি সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। কনরাড এন. হিলটন হিউম্যানিটারিয়ান প্রাইজ, আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ান অ্যাওয়ার্ড এবং ২০০৭ সালের অস্টিন কলেজ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড এর মধ্যে অন্যতম।
মূল শব্দের অধ্যায়ভিত্তিক শব্দকোষ
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ ডায়মন্ড, জ্যারেড। "Guns, Germs and Steel" (গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিল)
- ↑ গবেষণামূলক প্রবন্ধের সারাংশ
- ↑ https://en.wikipedia.org/wiki/Lewis_H._Morgan
- ↑ ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়া
- ↑ "Franz Boas" [ফ্রাঞ্জ বোয়াস]। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৩-০২।
- http://www.mnsu.edu/emuseum/information/biography/abcde/birdwhistell_ray.html>
- দেল মন্ট, ক্যাথলিন, কারেন বাচম্যান, ক্যাথরিন ক্লেইন এবং ব্রিজেট ম্যাককর্প। "মার্গারেট মিড"। সেলিব্রেটিং উইমেন অ্যানথ্রোপলজিস্টস। ২৬ জুন ১৯৯৯। ৯ মার্চ ২০০৯ <http://anthropology.usf.edu/women/>।
- অ্যাবসোলিউট অ্যাস্ট্রোনমি। "রে বার্ডহুইস্টেল" ৯ মার্চ ২০০৯ <http://www.absoluteastronomy.com/topics/Ray_Birdwhistell>
- এনএনডিবি: ট্র্যাকিং দ্য এনটায়ার ওয়ার্ল্ড। "ফ্রাঞ্জ বোয়াস।" <http://www.nndb.com/people/861/000097570/>
- “‘সিনফুল’ সংস অফ দ্য সাউদার্ন নিগ্রো”। সাউথওয়েস্ট রিভিউ ১৯, ২ (শীতকাল ১৯৩৪): ১০৫–১৩১।