বিষয়বস্তুতে চলুন

সমাজবিজ্ঞানের পরিচিতি/সমাজ

উইকিবই থেকে
একটি খামারভিত্তিক সমাজ হিসেবে মাসাই জনগণের জীবনধারা তাদের পশুসম্পদের চারপাশেই আবর্তিত হয়। কেনিয়া ও তানজানিয়ার আধা-শুষ্ক এবং শুষ্ক ভূমিতে তারা প্রায়শই শত শত মাইল ভ্রমণ করে। গবাদিপশুর জন্য চারণভূমি ও পানির উৎস খুঁজে বেড়ায়। গরু মাসাইদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কারণ এগুলো তাদের মাংস, রক্ত ও দুধের মাধ্যমে প্রোটিনের একটি নিরবচ্ছিন্ন উৎস সরবরাহ করে এবং তাদের আধা-স্থায়ী কুঁড়েঘর নির্মাণে শুকনো গোবর সরবরাহ করে।

মাসাই সমাজে গরুর গুরুত্ব বিবেচনায় একজন মাসাই পুরুষের সম্পদ এবং স্ত্রীর সংখ্যা সাধারণত নির্ধারিত হয় তার গবাদিপশুর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে। মাসাইরা এমন একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেটি শিল্প বিপ্লব এবং আধুনিক উত্তর-শিল্পায়িত যুগের অনেক আগে থেকেই টিকে আছে—যে যুগে প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই তীব্র সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও মাসাইদের ঐতিহ্যবাহী খামারভিত্তিক জীবনধারা এখনো টিকে আছে। তারা কীভাবে এটি সম্ভব করেছে?

আজও আপনি মাসাইদের দেখবেন মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়াতে, তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে—চেক প্রিন্টের চাদর ও পুরুষ ও নারীদের জন্য বাহারি কাঁকনের সঙ্গে। তবে এখন একটি নতুন জিনিস যোগ হয়েছে—মোবাইল ফোন। বর্তমানে মাসাইরা তাদের মোবাইল ফোনে জিপিএস ব্যবহার করে গবাদিপশুর জন্য চারণভূমি ও পানির উৎস খুঁজে পায়। তারা এমনকি এমন মোবাইল অ্যাপও ব্যবহার করে যা কাছাকাছি শিকারি প্রাণীর অবস্থান নির্দেশ করে।

মোবাইল ফোন মাসাইদের জন্য সিংহ এড়ানো এবং শিকার করাকে অনেক সহজ করে তুলেছে। তাদের সমাজের অনেক সদস্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পর্যটন ব্যবসাও গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে বাইরের মানুষদের মাসাই জীবনের স্বাদ দেওয়া হয়। তাই বৈপরীত্যের মধ্যেও মোবাইল ফোন বিশ্বায়ন যুগের তীব্র সামাজিক পরিবর্তনের মুখেও মাসাইদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা টিকিয়ে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

মাসাই জনগণ একটি চমৎকার উদাহরণ, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সমাজ একই সঙ্গে দুটি সমাজিক উন্নয়নের ধাপ—একদিকে খামারভিত্তিক, অন্যদিকে উত্তর-শিল্পায়িত—একত্রে ধারণ করতে পারে। এই অধ্যায়ে "সমাজ" বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে, শুরুতে সমাজের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে এবং পরে ওয়েবার, মার্কস ও দুর্খেইমের শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেখানো হয়েছে কীভাবে প্রাক-শিল্প সমাজ (যেমন মাসাই জনগণ) থেকে বর্তমান শিল্পোন্নত সমাজে রূপান্তর ঘটে এবং এর ফলে কী ধরনের সামাজিক পরিবর্তন এসেছে।

মাসাই পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী নাচ (লাফানোর দৃশ্য)।

পরিচিতি

[সম্পাদনা]

সমাজ বলতে সহজভাবে বোঝায় এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও সংস্কৃতি ভাগ করে। সমাজবিজ্ঞানে, আমরা এই সংজ্ঞাটিকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করি—সমাজ হল একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো ও পারস্পরিক সম্পর্কের সমষ্টি।

সামাজিক কাঠামো বলতে বোঝায় সমাজে টেকসই আচরণ ও সম্পর্কের ধরণ।[] তাই, একটি সমাজ কেবল লোকজন ও তাদের সংস্কৃতির সমষ্টি নয়, বরং সেই সমাজের লোকজনের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝেও গড়ে ওঠা সম্পর্ক।

সমাজবিজ্ঞানে "সমাজ" ও "সংস্কৃতি"র মধ্যে পার্থক্য করা হয়। সংস্কৃতি বলতে বোঝায় সমাজে প্রচলিত নিয়ম, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচরণ এবং প্রতীকের প্রতি প্রদত্ত অর্থ।[] সংস্কৃতি সমাজ থেকে আলাদা, কারণ এটি সম্পর্কের মধ্যে অর্থ যুক্ত করে।

উদাহরণস্বরূপ, বোস্টনের সমকামী দম্পতির জন্য "স্বামী" হওয়ার অর্থ এবং দক্ষিণ ইউটার এক গ্রামীণ বহুবিবাহ প্রথার অনুসারীর জন্য "স্বামী" হওয়ার অর্থ এক নয়। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই "স্বামী" সম্পর্কটি আছে (অর্থাৎ সামাজিক কাঠামো রয়েছে), কিন্তু সম্পর্কের অর্থ সংস্কৃতিভেদে আলাদা হয়।

সব মানবসমাজেই একটি সংস্কৃতি থাকে এবং সংস্কৃতি কেবল তখনই টিকে থাকতে পারে যখন কোনো সমাজ থাকে। সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত হলেও সমাজবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আলাদা করে বিবেচনা করেন—কারণ এতে সমাজগত উন্নয়নকে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন থেকে কিছুটা স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ করা যায় (যা পরবর্তী অধ্যায়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে), যদিও বাস্তবিক অর্থে সমাজগত পরিবর্তন ও উন্নয়ন সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল।

এই অধ্যায়ে মানবসমাজের কিছু ধরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে—যেগুলো অতীতে ছিল এবং এখনও বিদ্যমান। এরপর সমাজ বুঝতে কিছু শাস্ত্রীয় তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন একজন ব্যক্তির জীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সামাজিক বিকাশ

[সম্পাদনা]

সমাজগত বিকাশ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের বোঝাপড়া অনেকাংশেই গারহার্ড লেন্সকির কাজের ওপর নির্ভর করে।[] লেন্সকি মানবসমাজে দেখা যাওয়া কিছু সাধারণ সাংগঠনিক কাঠামো চিহ্নিত করেন। মানব সমাজকে দুইটি বিষয়ে ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়: (১) জীবিকার প্রধান মাধ্যম এবং (২) রাজনৈতিক কাঠামো। এই অধ্যায়ে রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে জীবিকা অর্জনের উপায়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যদিও নিচে আলোচিত প্রতিটি ধাপের মধ্য দিয়ে সব সমাজই যাবে—এমন দাবি কিছুটা অতিরঞ্জিত, তবে অধিকাংশ সমাজই এই ধাপগুলো অনুসরণ করে বলে মনে হয়। মানব গোষ্ঠী সাধারণত শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে শুরু করে, পরে গৃহপালন বা উদ্যানচর্চা অভিমুখে অগ্রসর হয়, তারপর কৃষিনির্ভর সমাজে রূপ নেয় এবং শেষপর্যন্ত শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে যায় (যার পরে সেবা খাত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে)।[] তবে সব সমাজই এই প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে না। কিছু সমাজ গৃহপালন বা উদ্যানচর্চার স্তরেই থেমে থাকে (যেমন: বেদুইন যাযাবররা), যদিও এই স্থবিরতা অনেক সময় সাময়িক, কারণ এসব অর্থনৈতিক ক্ষেত্র একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

কিছু সমাজ আবার অন্য সমাজ থেকে প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে কিছু ধাপ একেবারে লাফিয়ে অতিক্রম করে ফেলে। এটা মনে রাখা জরুরি যে, এই শ্রেণিগুলো পরস্পর থেকে পুরোপুরি আলাদা নয়। কারণ অনেক সময় একটি সমাজে একাধিক জীবিকা পদ্ধতি একসঙ্গে চালু থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক গৃহপালন নির্ভর সমাজে উদ্যানচর্চাও দেখা যায় এবং বেশিরভাগ শিল্প ও উত্তর-শিল্প সমাজেও কৃষি বিদ্যমান, যদিও কম পরিমাণে।

শিকারি-সংগ্রাহক

[সম্পাদনা]

শিকারি-সংগ্রাহক জীবনধারা নির্ভর করে বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর। এজন্য শিকারি-সংগ্রাহকরা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি চলাফেরা করে এবং তাদের গোষ্ঠীগুলোর সীমা ও গঠনও খুব বেশি স্থায়ী নয়। সাধারণত এসব সমাজে পুরুষরা বড় বন্য প্রাণী শিকার করে এবং নারীরা ফল, বাদাম, কন্দমূল, ও অন্যান্য ভক্ষণযোগ্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করে এবং ছোট প্রাণী শিকার করে।

শিকারি-সংগ্রাহকরা বনের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আশ্রয় বানায় অথবা প্রাকৃতিক গুহা বা ঢালের নিচে আশ্রয় নেয়। এসব আশ্রয় তাদের শিকারি প্রাণী এবং প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।

প্রাচীন শিকারি।

বেশিরভাগ শিকারি-সংগ্রাহক সমাজই যাযাবর প্রকৃতির। এই ধরনের জীবিকা নির্ভর পদ্ধতিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করা কঠিন, কারণ এক অঞ্চলের সম্পদ খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে, এই সমাজগুলোর জনসংখ্যার ঘনত্বও অনেক কম থাকে।

অন্যদিকে, কৃষিনির্ভর সমাজগুলো অনাবাদী জমির তুলনায় ৬০ থেকে ১০০ গুণ বেশি জনসংখ্যা ধারণ করতে পারে, যার ফলে সেখানে ঘনবসতিও গড়ে ওঠে।

শিকারি-সংগ্রাহক সমাজগুলোতে সাধারণত শ্রেণিভিত্তিক সামাজিক কাঠামো থাকে না, যদিও সব সময় তা নয়। যেহেতু তারা যাযাবর, তাই তারা খাদ্য সঞ্চয় করে রাখতে পারে না। ফলে, পুরো সময়ের নেতা, আমলা বা শিল্পী গড়ে তোলার সুযোগ সেখানে খুব কম।

এদের সমাজে পুরুষ ও নারীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে সমতা থাকে। যদিও বিষয়টি বিতর্কিত, অনেক নৃতাত্ত্বিক মনে করেন এই লিঙ্গভিত্তিক সমতা এসেছে খাদ্য উৎপাদনের ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ না থাকা, খাদ্য উদ্বৃত্ত না থাকা (যা সাধারণত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়), এবং নারী-পুরুষ উভয়েরই আত্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বে সমান অবদান রাখার ফলে।

এ পর্যন্ত পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ১৩,০০০ সালের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর সব মানুষই ছিল শিকারি-সংগ্রাহক। যদিও সংখ্যায় কমে আসছে, বর্তমানে কিছু শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠী এখনও বিদ্যমান।

এসব গোষ্ঠী প্রধানত আর্টিক, গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃষ্টিঅরণ্য এবং মরুভূমির মতো এলাকায় দেখা যায়, যেখানে অন্য কোনো জীবিকা পদ্ধতি চালানো অসম্ভব কিংবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের পূর্বপুরুষরা কৃষিজীবী ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে যুদ্ধ বা অভিবাসনের কারণে তারা কম উর্বর এলাকায় ঠেলে পড়ে এবং শিকারি-সংগ্রাহক জীবনযাত্রায় ফিরে যায়।

বর্তমানে টিকে থাকা শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীর উদাহরণ:

কৃষিনির্ভর সমাজ ও শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানা যায় না। অনেক শিকারি-সংগ্রাহক নিজেরা পরিবেশ বদলে ফেলে—যেমন অপ্রয়োজনীয় উদ্ভিদ কেটে বা পুড়িয়ে দিয়ে, যেসব উদ্ভিদ তারা ব্যবহার করে সেগুলোর বাড়তি বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।

একইভাবে, বেশিরভাগ কৃষিনির্ভর মানুষও শিকার ও সংগ্রহের কিছুটা চর্চা করে। কেউ কেউ শীতকালে শিকার করে এবং উষ্ণ মৌসুমে চাষাবাদে মনোযোগ দেয়।

পশুপালনভিত্তিক সমাজ

[সম্পাদনা]
২০০৬ সালে ইরানের যাযাবররা

পশুপালনভিত্তিক সমাজ হলো এমন এক ধরনের সমাজ যেখানে জীবিকার প্রধান মাধ্যম হলো গৃহপালিত পশুপাখি। শিকারি-সংগ্রাহকদের মতোই পশুপালকরাও প্রায়ই যাযাবর প্রকৃতির হয়ে থাকেন। তারা সাধারণত ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পশুদের জন্য তাজা ঘাস ও পানি খুঁজে চলাফেরা করেন।

এই ধরনের জীবিকা ব্যবস্থায় খাদ্যের উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে সমাজে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং শ্রম বিভাজন ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস গড়ে ওঠে।

আজও অনেক পশুপালনভিত্তিক সমাজ টিকে আছে। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার বিশাল আধা-শুষ্ক অভ্যন্তরীণ এলাকায় রয়েছে পশুপালন খামার যেগুলোকে ‘শিপ স্টেশন’ বলা হয়। এসব খামার হাজার হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত। পশুর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির নিশ্চয়তা বজায় রাখতে এসব স্থানে পশু পালনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হয়। আজকের দিনে যে পশুপালনভিত্তিক সমাজগুলো টিকে আছে তাদের মধ্যে রয়েছে:

উদ্যানচাষভিত্তিক সমাজ

[সম্পাদনা]

উদ্যানচাষভিত্তিক সমাজ হলো সেইসব সমাজ, যাদের জীবিকার প্রধান উৎস হলো হাতে ধরে সরঞ্জাম ব্যবহার করে ফসল ফলানো। পশুপালনভিত্তিক সমাজের মতোই, ফসল উৎপাদনের ফলে জনসংখ্যা বেড়ে যায় এবং খাদ্যের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। এতে সমাজে শ্রম বিভাজনের সুযোগ তৈরি হয়।

উদ্যানচাষ ও কৃষি এক নয়। কৃষিতে পশু, যন্ত্র বা অন্যান্য অমানবীয় উপায় ব্যবহৃত হয় ফসল উৎপাদনের জন্য। কিন্তু উদ্যানচাষে সম্পূর্ণভাবে মানুষই ফসল উৎপাদনের কাজ করে থাকে।

কৃষিভিত্তিক সমাজ

[সম্পাদনা]
১৯২১ সালের দিকে আলফালফা ক্ষেত চাষ করছে একটি ট্রাক্টর
ঘানার একটি আনারস চাষি

কৃষিভিত্তিক সমাজ হলো সেইসব সমাজ, যাদের জীবিকার প্রধান উপায় হলো ফসল উৎপাদন, যেখানে মানুষ ছাড়াও পশু বা যন্ত্র ব্যবহৃত হয়। কৃষি হলো উদ্ভিদ চাষ এবং গৃহপালিত পশুপালনের মাধ্যমে খাদ্য, পশুখাদ্য, তন্তু এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদনের প্রক্রিয়া।

কৃষি বলতে বোঝানো হতে পারে আত্মনির্ভর কৃষি বা শিল্প-ভিত্তিক কৃষি।

আত্মনির্ভর কৃষি হলো এমন কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে কৃষক ও তার পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্যই মূলত ফসল উৎপাদন করা হয়। এই ধরনের কৃষি সাধারণত প্রাকৃতিক ও অর্গানিক পদ্ধতিতে হয়, যেখানে স্থানীয় জাতের বীজ, ফসল পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন, এবং সহজ কিছু কৌশল ব্যবহৃত হয়।

ইতিহাসে দেখা যায়, অধিকাংশ কৃষকই আত্মনির্ভর কৃষিতে যুক্ত ছিল, এবং আজও অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।

উন্নত দেশে কেউ যদি ছোট জমিতে সহজ কৌশলে চাষ করে, তবে তাকে সাধারণত "মালী" হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তার কাজকে পেশা নয়, বরং শখ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কিছু মানুষ দারিদ্র্যের কারণে এমন প্রথাগত চাষে বাধ্য হয়।

বর্তমানে অর্গানিক, জেনেটিক্যালি-মডিফায়েড না করা এবং কীটনাশক মুক্ত খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বলে বৃহৎ পরিসরে অর্গানিক কৃষিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উন্নত দেশে, একজন কৃষক বা শিল্প-ভিত্তিক কৃষক সাধারণত এমন একজন ব্যক্তি যিনি জমি বা পশুসম্পদের মালিক, এবং চাষাবাদ বা ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত। যারা কেবল শ্রম দেন, কিন্তু মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার অংশ নন, তাদের বলা হয় ফার্মহ্যান্ড বা, কেউ যদি শুধুমাত্র একটি ফসল ফলানো জমি ভাড়া নিয়ে কাজ করেন তবে তাকে বলা হয় শেয়ারক্রপার

কৃষি ব্যবস্থা শিকার ও সংগ্রহের চেয়ে অনেক বেশি জনসংখ্যা বহন করতে সক্ষম এবং উদ্বৃত্ত খাদ্য জমিয়ে রাখা বা বিক্রয় করে লাভ অর্জনের সুযোগ দেয়। কৃষকেরা যখন এমন অনেক মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করতে সক্ষম হন, যারা সরাসরি কোনো উৎপাদনে যুক্ত নয়, তখনই সমাজে উদ্বৃত্ত, পেশাগত বিশেষায়ন, উন্নত প্রযুক্তি, শ্রেণিবিন্যাস, বৈষম্য এবং স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।[]

উদ্যানচাষ ও কৃষির বিকাশ

[সম্পাদনা]

উদ্যানচাষ ও কৃষিভিত্তিক জীবিকা মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১০,০০০ থেকে ৮,০০০ সালের মধ্যে, মধ্যপ্রাচ্যের উর্বর উপত্যকা অঞ্চলে।[][]

এই রূপান্তরের পেছনের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং উপহার হিসেবে খাদ্যের উদ্বৃত্ত জমা করার প্রবণতা একটি কারণ হতে পারে। বেশিরভাগ গবেষক মনে করেন, কৃষির বিকাশ ছিল ধাপে ধাপে সংঘটিত। প্রথমে কিছু ফসল ইচ্ছাকৃতভাবে রোপণ করা হতো, আর অন্য খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করা হতো।

উর্বর উপত্যকার বাইরে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬৮০০ সালের মধ্যে পূর্ব এশিয়ায় (চালের চাষ), এবং পরে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় (ভুট্টা ও স্কোয়াশ চাষ) কৃষি গড়ে ওঠে। ভারত (চাল) ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (টারো) ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষির বিকাশ ঘটে নিওলিথিক যুগে।

গৃহপালিত ফসল ও প্রাণীর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা, অর্থাৎ খাদ্য তালিকায় বন্য উৎসের অবদান একেবারে নগণ্য হয়ে পড়ে, তা ঘটে ব্রোঞ্জ যুগে। যদি আমরা কৃষিকে ব্যাখ্যা করি বৃহৎ পরিসরে জমি চাষ, এক ফসলভিত্তিক চাষ, নিয়মিত সেচ এবং বিশেষায়িত শ্রম ব্যবস্থার মাধ্যমে, তাহলে বলা যায় সুমেরীয়রাই কৃষির প্রকৃত আবিষ্কারক, প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫,৫০০ সালের দিকে।

১৮০০ সালের শুরুর দিকে চাষের কৌশল, বিশেষ করে টেকসই জাত নির্বাচন এবং উন্নত চাষ পদ্ধতির কারণে ফসলের উৎপাদন মধ্যযুগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কুমারী জমিগুলোতে এ উৎপাদন ছিল উল্লেখযোগ্য।

আজকের কৃষি

[সম্পাদনা]

আজকের দিনে উন্নত জাতের ফসল, মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় শ্রম কমেছে।

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এইসব বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তাদের উৎপাদনও কম। এখনো বিশ্বের অনেক মানুষ কৃষিকে তাদের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে করে চলেছেন। যদিও বিশ্ব জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ৪ শতাংশ।

বিশেষ করে ২০শ শতকে ট্রাক্টরের মতো যন্ত্রের আবির্ভাব কৃষিকাজে মানুষের কষ্ট অনেক কমিয়ে দেয়। বীজ বপন, ফসল তোলা এবং গম ঝাড়া—এইসব কাজ এখন যন্ত্র দিয়ে দ্রুত ও বড় আকারে করা যায়।

ফলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং উন্নত দেশগুলোতে কৃষিতে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। যেমন নিচের পাই চার্ট অনুযায়ী, আমেরিকায় মাত্র ১% মানুষ কৃষিতে কাজ করেন, কিন্তু তারা বাকি ৯৯% মানুষের খাদ্যের যোগান দেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিতে নিযুক্ত মানুষের শতাংশ। তথ্যসূত্র: মার্কিন জনগণনা, ২০০০

শিল্পায়নভিত্তিক সমাজ

[সম্পাদনা]
নেদারল্যান্ডসের একটি ইট কারখানা, যা শিল্পায়নের একটি উদাহরণ।

একটি শিল্পায়নভিত্তিক সমাজ হলো এমন একটি সমাজ যেখানে জীবিকার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে শিল্প। শিল্প বলতে বোঝায় যন্ত্রনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, যা পণ্য উৎপাদনের উপর কেন্দ্রীভূত। কৃষিভিত্তিক সমাজের মতো, শিল্পায়নভিত্তিক সমাজেও খাদ্য উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি পায়, ফলে সমাজে আরও উন্নত স্তরের শ্রেণিবিন্যাস এবং শ্রমের বিভাজন দেখা যায়।

শিল্পায়নভিত্তিক সমাজে শ্রমের বিভাজন একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য, যা সম্পর্কের গঠনে পরিবর্তন আনতে পারে। পূর্বশিল্প সমাজে সম্পর্ক গড়ে উঠত ধর্মীয় উপাসনাস্থল বা প্রতিবেশীর মাধ্যমে, কিন্তু শিল্পায়নভিত্তিক সমাজে একই পেশার মানুষদের একত্রে কাজ করার ফলে কর্মক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।[]

"শিল্প বিপ্লব" শব্দটি মূলত ইউরোপে ১৮শ ও ১৯শ শতকে সংঘটিত প্রথম শিল্প বিপ্লবকে নির্দেশ করে। পরবর্তীতে, "দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব" শব্দটি ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ ও অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের ব্যাপক ব্যবহারজনিত পরিবর্তন বোঝাতে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবে শিল্পায়ন শুরু করে।

বর্তমানে, উন্নত দেশগুলোর কর্মশক্তির একটি ছোট অংশই শিল্প খাতে নিয়োজিত, যার প্রধান কারণ উন্নত যান্ত্রিকীকরণ। যন্ত্র ও রোবটের ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, ফলে কম সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এর ফলে, অধিকাংশ উন্নত দেশ এখন পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল বা সেবা-ভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ

[সম্পাদনা]

একটি পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ হলো এমন একটি সমাজ যেখানে জীবিকার প্রধান মাধ্যম কৃষি বা শিল্প নয়, বরং সেবা-ভিত্তিক কাজ।[] "পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল" শব্দটির ব্যবহার এখনও বিতর্কিত কারণ এটি বর্তমান সমাজের অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়; চলমান একটি প্রক্রিয়ার নামকরণ করা কঠিন।

পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজের বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • সেবা খাতের আকার বৃদ্ধি, যেখানে পণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে সেবা প্রদান করা হয়।
  • উৎপাদন খাতে আউটসোর্সিং বা যান্ত্রিকীকরণের ব্যাপক ব্যবহার।
  • তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, যা তথ্য যুগের সূচনা করে।
  • অর্থনীতিতে তথ্য, জ্ঞান ও সৃজনশীলতা নতুন কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত হয়।

অধিকাংশ উন্নত দেশ এখন পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল, যেখানে কর্মশক্তির বড় অংশ সেবা খাতে যেমন অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা বা বিক্রয়ে নিয়োজিত, শিল্প বা কৃষিতে নয়। যুক্তরাষ্ট্রেও এই চিত্র দেখা যায়, যেমন উপরের পাই চার্টে প্রদর্শিত হয়েছে।

পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সমাজ শব্দটি মাঝে মাঝে সমালোচনামূলকভাবে ব্যবহৃত হয়। যারা শিল্প উন্নয়নে ফিরে যেতে চায়। তবে বর্তমানে অনেক ব্যক্তি ও সম্প্রদায় পরিত্যক্ত কারখানাগুলিকে নতুন আবাসন ও বিপণন কেন্দ্র হিসেবে দেখছে। পুঁজিপতিরাও এই স্থানগুলিকে বিনোদন ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।

সমাজের উন্নয়নের প্রভাব

[সম্পাদনা]
সমাজের উন্নয়নের ধাপসমূহ।

উপরের আলোচনা অনুযায়ী, সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন - যেমন জীবিকার প্রধান মাধ্যম - সমাজের অন্যান্য দিকেও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ থেকে পশুপালন ও উদ্যানচর্চায় রূপান্তরের ফলে খাদ্য উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। যদিও বর্তমানে উন্নত বিশ্বে খাদ্য উদ্বৃত্ত সাধারণ, আমরা প্রায়ই ভাবি না এই অতিরিক্ত খাদ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকলে সমাজের আরও শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হতে পারে। এছাড়া, কৃষিভিত্তিক সমাজে খাদ্য উৎপাদন বাড়লে, জনসংখ্যার ছোট অংশই বাকিদের জন্য খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত থাকে। ফলে, যারা খাদ্য উৎপাদনে নয়, তারা পোশাক বা বাসস্থান উৎপাদনের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে পারে।

এই বিশেষায়িতকরণ প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নে সহায়তা করে, কারণ মানুষ তাদের অধিকাংশ সময় খাদ্য সংগ্রহ বা উৎপাদনে ব্যয় না করে তাদের বিশেষত্বে উন্নতি করতে পারে। উদ্বৃত্ত ও প্রযুক্তির মধ্যে সম্পর্ক প্রথমে স্পষ্ট না হলেও, উদ্বৃত্ত স্পষ্টভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পূর্বসূরি।

ডানদিকে প্রদর্শিত চিত্রে এটি বোঝানো হয়েছে। চিত্রটি উপরে সমাজের উন্নয়ন এবং নিচে তার প্রভাব দেখায়। দুটি সারির মধ্যে তীরচিহ্নগুলি এই সম্পর্কগুলির জটিলতা নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশেষায়িতকরণ শুধুমাত্র কৃষি থেকে নয়, ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যা ও উদ্বৃত্ত থেকেও আসে এবং শিল্পে উদ্দীপনা দেয়। মূলত, এগুলি পারস্পরিক নির্ভরশীল সমাজ উন্নয়নের দিক, যা একসাথে বিকশিত হয়।

উদ্বৃত্তের আরেকটি ফলাফল হলো অসমতা। এই বইয়ের পরবর্তী অংশে অসমতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, তবে উল্লেখযোগ্য যে, উদ্বৃত্ত থাকলেই কিছু মানুষের জন্য বেশি উদ্বৃত্ত থাকবে, এবং কিছু মানুষ - যেমন বর্তমান উন্নত সমাজে দেখা যায় - পর্যাপ্ত সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে না, যদিও বৃহত্তর সমাজে উদ্বৃত্ত বিদ্যমান। যাদের বেশি উদ্বৃত্ত আছে, তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা বেশি, কারণ তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেশি, এবং অনেক ক্ষেত্রে - এভাবেই সামাজিক অসমতা জন্ম নেয়।

সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি

[সম্পাদনা]

যখন পশ্চিমা সমাজগুলি ১৯শ শতকে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্পায়িত সমাজে রূপান্তরিত হয়, তখন কিছু মানুষ এই পরিবর্তনের সমাজ ও ব্যক্তির উপর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। তিনজন প্রাথমিক সমাজবিজ্ঞানী, ওয়েবার, মার্কস, এবং দুর্খেইম, শিল্প বিপ্লবের ব্যক্তি ও সমাজের উপর বিভিন্ন প্রভাব দেখেছিলেন এবং তাদের কাজে তা বর্ণনা করেছেন।

ওয়েবার এবং যুক্তিকরণ

[সম্পাদনা]

ম্যাক্স ওয়েবার বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন শিল্প বিপ্লব থেকে উদ্ভূত সমাজের যুক্তিকরণ ও আমলাতন্ত্র নিয়ে এবং এই দুটি পরিবর্তন কীভাবে মানুষের স্বাধীনতা ও সুখকে প্রভাবিত করবে তা নিয়ে।[] ওয়েবারের মতে, বিশেষ করে ১৯শ শতকের শেষভাগে শিল্প বিপ্লবের সময় তিনি যে সমাজে বাস করতেন, সেই সমাজে যুক্তিবোধপূর্ণ ধারণাগুলো সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে পড়ে সমাজকে ধীরে ধীরে একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করছিল।

আমলাতন্ত্র হল এমন এক ধরনের সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পদ্ধতি, যা ওয়েবারের দৃষ্টিতে আইনগত-যুক্তিনির্ভর কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। আমলাতন্ত্র একটি জটিল পদ্ধতি যা সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নিয়ম, নীতিমালা, ধারা ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজে চালনা করা।

একটি উদাহরণ হলো, আয়কর জমা দেওয়ার জন্য যে ফর্ম পূরণ করতে হয়—সে ফর্মে নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু সেই ফর্মের ভিতরে থাকে অসংখ্য নিয়ম-কানুন ও আইন, যা বলে দেয় কী কর ছাড় দেওয়া যাবে আর কী যাবে না। ফলে, একদিকে যেমন ফর্মটি কর দেওয়ার প্রক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে সহজ করে, অন্যদিকে এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া নিয়ম-নীতিগুলো প্রক্রিয়াকে আবার জটিলও করে তোলে।

ওয়েবার বিশ্বাস করতেন, আমলাতন্ত্রই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সবচেয়ে যুক্তিসংগত পদ্ধতি। আর যেহেতু তার মতে সমাজ যুক্তিকরণের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে, তাই তিনি মনে করতেন যে সমাজে আমলাতন্ত্রের প্রভাব ক্রমাগত বাড়বে এবং এক সময় সমাজের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আমলাতন্ত্রের হাতেই চলে যাবে।

ওয়েবারের মতে, আমলাতন্ত্র থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই। এর ফলাফল হবে একটি লোহার খাঁচা—যেখানে মানুষ আটকে পড়বে, কিন্তু সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ থাকবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণী ওয়েবারের কাছে ছিল এক বিষণ্ণ পরিণতি। কারণ এই খাঁচায় মানুষকে খুব কঠোর নিয়ম ও নিয়মাবলীর মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত সুখ বা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না।

ওয়েবার এমন কোনো শক্তির কথা কল্পনাও করতে পারেননি যা সমাজের এই গতি থামাতে পারবে—শুধুমাত্র কোনো শক্তিশালী ক্যারিশমাটিক নেতার কারণে সাময়িকভাবে এই কাঠামো ভাঙতে পারে। তাই, তার দৃষ্টিতে এই লোহার খাঁচা ছিল একটি অনিবার্য পরিস্থিতি, যার কোনো সমাধান নেই। সম্পূর্ণ যুক্তিক সমাজ গড়ে উঠলে এবং আমলাতন্ত্র সবচেয়ে যুক্তিসংগত পদ্ধতি হিসেবে টিকে থাকলে, সমাজ একদিন একটি বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিণত হবে—যা মানুষের জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করবে।

মার্কস এবং বিচ্ছিন্নতা

[সম্পাদনা]

কার্ল মার্কস শিল্প বিপ্লবের প্রভাব নিয়ে ওয়েবারের চেয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন।[১০] তবে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য আগে এটা বোঝা জরুরি যে তিনি সুখ বা প্রকৃত মানব স্বভাবকে কীভাবে ব্যাখ্যা করতেন।

মার্কসের মতে, মানুষের প্রকৃত স্বরূপ বা প্রকৃত সুখের চূড়ান্ত রূপ হলো প্রজাতিগত সত্তা—যাকে আমরা অর্থবহ ও সৃজনশীল শ্রমের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধি হিসেবে বুঝতে পারি। কিন্তু শুধু অর্থবহ শ্রম করলেই হবে না, আত্ম-উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন সেই শ্রমের ফলাফলের মালিকানা এবং সেই ফল কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা নির্ধারণের স্বাধীনতা।

কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ যা শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে একযোগে গড়ে উঠেছে সেখানে শ্রমজীবী শ্রেণি তাদের শ্রমের ফলাফলের মালিক নয়। তারা শুধু নিজের শ্রমশক্তির মালিক। শ্রমের যে ফল (পণ্য) তারা তৈরি করে, তা তাদের মালিকানায় থাকে না। পুঁজিপতিরা বা বুর্জোয়া শ্রেণি শ্রমিকদের মজুরি দেয়, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের মালিক তারাই হয়। ফলে শ্রমিক শ্রেণি তাদের নিজ শ্রমের ফলাফলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

মার্কস বিশ্বাস করতেন যে প্রজাতিগত সত্তা বা প্রকৃত মানব স্বরূপ কেবল তখনই অর্জন করা যায় যখন মানুষ তার শ্রমের ফলাফলের ওপর অধিকার রাখে। তাই, শ্রমিকরা যখন সেই ফলের মালিক হতে পারে না, তখন তারা নিজেদের প্রকৃত রূপে বিকশিত হতে পারে না—ফলে তারা হয় আরও বেশি অসুখী ও আত্মবিচ্ছিন্ন।

তবে শ্রমের ফল থেকে বিচ্ছিন্নতা শুধু একটি দিক। মার্কস বলেছিলেন, প্রলেতারিয়েত আরও কয়েকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুঁজিপতিরা তাদের নিজেদের স্বার্থে শ্রমিকদের একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়।

এই প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় কারণ কাজের সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়—যাতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সুযোগ না থাকে। যদি বাড়তি শ্রমিক না থাকে, তাহলে পুঁজিপতিদের শ্রমিকদের দাবিকৃত মজুরি মেনে নিতে হতো। কাজেই, শ্রমিকরা যখন সীমিত চাকরির জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধ্য হয়, তখন তারা একে অপরের থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা শ্রমিক শ্রেণির দুঃখ-কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যদিও মার্কস বিচ্ছিন্নতা সমস্যার একটি সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন, তিনি তা খুব বেশি বিশদভাবে আলোচনা করেননি। মার্ক্সের প্রস্তাবিত সমাধান ছিল শ্রমজীবী শ্রেণি। যেন ঐক্যবদ্ধ হয় এবং প্রতিবাদ, বিপ্লব (বা গণতান্ত্রিক দেশে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে) বুর্জোয়া শ্রেণিকে অপসারণ করে একটি নতুন সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে — সমাজতন্ত্র। এই সরকারব্যবস্থা হবে কমিউনালভাবে মালিকানাধীন এবং উচ্চপর্যায়ে বিকশিত উৎপাদনপ্রণালী ও স্ব-শাসনের উপর ভিত্তি করে। উৎপাদনপ্রণালী পুঁজিবাদের মাধ্যমেই এতটা উন্নত হবে যে সমাজের প্রত্যেকের হাতে পর্যাপ্ত 'অবসরের সময়' থাকবে, যা তাদেরকে কমিউনিটির প্রয়োজনীয় শাসন-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম করে তুলবে।

যখন ব্যক্তির সঙ্গে তার নিজের শ্রমের ফলের পুনঃসংযোগ ঘটবে এবং সে প্রকৃত স্ব-শাসনের দিকে ক্ষমতায়িত হবে। তখন প্রজাতিগত সত্তা উপলব্ধি করা যাবে এবং সুখ ফিরে আসবে।

এখানে দুটি অতিরিক্ত মন্তব্য প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনে (এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে) যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তা মার্ক্সের কল্পিত সমাজতন্ত্র ছিল না। বরং তারা এমন একটি সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যা মার্ক্স পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, মার্ক্স বিশ্বাস করতেন যে, যদিও পুঁজিবাদ প্রজাতিগত সত্তা-এর জন্য ক্ষতিকর, তবে উৎপাদনপ্রণালীকে এমন এক স্তরে উন্নীত করার জন্য তা প্রয়োজনীয় ছিল, যেখানে তার কল্পিত সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। ফলে, মার্ক্স পুঁজিবাদকে কঠোরভাবে সমালোচনা করলেও, তিনি এর উপযোগিতাকে স্বীকার করেছিলেন।

দুর্খেইম ও সংহতি

[সম্পাদনা]

দুর্খেইম সমাজের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পায়নের ফলে যে পরিবর্তন আসছিল, তা থেকে তিনি মনে করেছিলেন যে, অসন্তোষ একটি সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে। দুর্খেইম বিশ্বাস করতেন যে সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সামাজিক সংহতি, যার অর্থ হচ্ছে একটি সম্প্রদায়বোধ

তাঁর বিখ্যাত গবেষণা, দ্য ডিভিশন অফ লেবার ইন সোসাইটিতে,[১১] দুর্খেইম যুক্তি দেন যে আত্মহত্যার মূল কারণগুলোর একটি ছিল সামাজিক সংহতির হ্রাস। যাকে তিনি এনোমি ফরাসি শব্দ যার অর্থ নৈরাজ্য বলেছিলেন। তিনি আরও বলেন প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের উপর যে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা ক্যাথলিসিজমের তুলনায় বেশি ছিল এবং তা এনোমি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল। যার ফলে প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা গেছে।

অন্য এক রচনায়, দ্য ডিভিশন অফ লেবার ইন সোসাইটিতে,[] দুর্খেইম প্রস্তাব করেন যে, শিল্প-পূর্ব সমাজগুলো তাদের সামাজিক সংহতি বজায় রাখত যান্ত্রিক সম্প্রদায়বোধ এবং ধর্মীয় সংযোগের মাধ্যমে। অধিকাংশ মানুষ তখন সাধারণত সব ধরণের কাজ করত তারা কৃষিকাজ করত এবং নিজেরাই তাদের সরঞ্জাম ও পোশাক তৈরি করত। যেহেতু তারা তাদের সাধারণ দক্ষতার কারণে একে অপরের মতো ছিল, তাই তারা একটি সম্প্রদায়বোধ ভাগ করে নিত। যেটিকে দুর্খেইম সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করতেন। এছাড়া, অধিকাংশ মানুষ একই ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সামাজিক সংহতিকে আরও জোরদার করত।

শিল্পায়ন অভিমুখী সমাজগুলোতে দুর্খেইম বিশেষায়নএর অবশ্যম্ভাবিতা স্বীকৃতি দেন। বিশেষায়নের অর্থই হলো ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরণের পেশায় নিযুক্ত থাকবে। এই বিশেষায়ন ধর্মীয় ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে। শিল্প সমাজে, ধর্ম হবে জীবনের কেবল একটি অংশ যা বাড়ি, পরিবার, কাজ, বিনোদন, ধর্ম ইত্যাদিতে বিভক্ত হয়ে পড়বে।

দুর্খেইম বিশ্বাস করতেন যে, শিল্পায়ন অভিমুখী সমাজে সামাজিক সংহতির হ্রাস কমাতে দুটি উপাদান কার্যকর হতে পারে: অর্গানিক সংহতি এবং কর্মস্থলের মাধ্যমে সচেতনভাবে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। যেখানে প্রাক-শিল্প সমাজে সামাজিক সংহতি তৈরি হতো যান্ত্রিক সমানতা এবং ধর্মীয় একাত্মতার মাধ্যমে, সেখানে শিল্পায়িত সমাজে এই সংহতি বজায় থাকবে বিশেষজ্ঞদের পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতার মাধ্যমে।

যেমন কেউ যদি চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হন, তবে তার পক্ষে শস্য ফলানো বা খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। সেই চিকিৎসক কৃষকের উপর নির্ভর করবেন খাদ্যের জন্য এবং কৃষক নির্ভর করবেন চিকিৎসকের উপর চিকিৎসার জন্য। এটি একটি জৈবিক সংহতির জন্ম দেবে জৈবিক এই অর্থে যে এটি প্রাণীর অঙ্গগুলোর মতো একে অপরের উপর নির্ভরশীল।

এই অবশ্যম্ভাবী পারস্পরিক নির্ভরশীলতার পাশাপাশি, দুর্খেইম বিশ্বাস করতেন, কর্মস্থলে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন চেষ্টা সামাজিক সংহতির এক নতুন রূপ গড়ে তুলবে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবর্তে কর্মস্থল-ভিত্তিক বন্ধুত্ব। বিশেষায়িত ব্যক্তি তাদের সহকর্মীদের সাথে অনেক কিছুতেই মিল খুঁজে পাবেন এবং যেভাবে প্রাক-শিল্প সমাজে ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকতেন, তেমনি কর্মীরা তাদের পেশার মাধ্যমে সামাজিক সংহতির দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন।

সুতরাং দুর্খেইমের মতে, যান্ত্রিক সংহতির হ্রাস এবং বৃদ্ধি পাওয়া এনোমি সমস্যার উত্তর হলো অর্গানিক সংহতি এবং পেশাগত বন্ধুত্বের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক সংহতি।

উপসংহার

[সম্পাদনা]

সমাজবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে সমাজ একটি পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে, শ্রমের বিভাজন ঘটেছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হয়েছে এবং সেই সঙ্গে বেড়েছে অসমতা।

ভেবার, মার্ক্স এবং দুর্খেইম তাদের জীবদ্দশায় যেসব সমাজের মধ্যে প্রাক-শিল্প সমাজ থেকে শিল্পায়িত সমাজে রূপান্তর ঘটতে দেখেছিলেন, সেই পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন।

উইবার বলেন সমাজে যুক্তিবাদ ও আমলাতন্ত্র বেড়েছে। মার্ক্স দেখিয়েছেন মানুষ তার শ্রম ও একে অপরের থেকে ক্রমশ疎 হয়ে পড়ছে। আর দুর্খেইম ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে প্রাক-শিল্প সমাজের যান্ত্রিক সংহতি ধীরে ধীরে অর্গানিক বা জৈব সংহতিতে রূপ নিচ্ছে।

তবে সমাজবিজ্ঞানীরা অতীতে যে একটি বিষয় পূর্বানুমান করতে পারেননি, তা হলো বিশ্বায়ন-এর গভীর প্রভাব সমাজের বিকাশের ওপর।

বর্তমানে দ্রুত বিশ্বায়ন-এর প্রেক্ষাপটে কিছু সমাজ এমন অবস্থানে রয়েছে, যেটি একাধিক উন্নয়নধারার স্তরের মধ্যবর্তী। যেমন, এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করা মাসাই জনগোষ্ঠী। আবার কিছু সমাজ হয়তো একটি বা একাধিক ধাপ পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছে।

সমাজ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে, রূপান্তরিত হচ্ছে। এর ফলে সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য নতুন নতুন বিশ্লেষণ ও গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, যা বিদ্যমান তত্ত্বগুলোকে আরও পরিশীলিত ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।

অতিরিক্ত পাঠ

[সম্পাদনা]
  • Collins, Randall. 2004. *Interaction Ritual Chains*
  • Giddens, Anthony. 1984. *The Constitution of Society: Outline of the Theory of Structuration*
  • Gramsci, Antonio. 1971. *Selections from the Prison Notebooks*. New York: International Publishers.
  • Weber, Max. 1920. *Economy and Society: An Outline of Interpretive Sociology*
  • Wright, Erik Olin. 1997. *Class Counts: Comparative Studies in Class Analysis*
  • Berger, Peter and Thomas Luckmann. 1967. *The Social Construction of Reality*. New York: Doubleday

আলোচনার প্রশ্নসমূহ

[সম্পাদনা]
  • একটি সমাজ কিভাবে একটি জাতি বা রাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন?
  • সমাজ কেন একটি নির্দিষ্ট ধারায় বিকাশ লাভ করে?
  • উদ্বৃত্ত ও অসমতার মধ্যে কী সম্পর্ক?
  • বিকাশ কি অবশ্যই অগ্রগতি নির্দেশ করে?
  • কিছু সমাজ যদি পরিবর্তন এড়িয়ে চলে, আবার কিছু সমাজ যদি প্রত্যাশিত ধাপগুলো এড়িয়ে চলে, তাহলে সমাজ বিকাশ ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কিত আমাদের বিদ্যমান বোঝাপড়া কীভাবে আরও উন্নত করা যায়?
  • বিশ্বায়ন কীভাবে সমাজের বিকাশ ও পরিবর্তন সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণার সঙ্গে খাপ খায়?

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Merton, Robert. 1938. Social Structure. Filipino Sociological Review, Vol. 3, No.5, pp.672-682
  2. Swidler, A. (2003). Talk of Love: How Culture Matters. University Of Chicago Press.
  3. Lenski, Gerhard; Nolan, Patrick; and Lenski, Jean. 1995. Human Societies: An Introduction to Macrosociology. 7th edition. New York: McGraw-Hill. আইএসবিএন 1594510237
  4. ৪.০ ৪.১ Diamond, Jared. 2005. Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies. 1st ed. W.W. Norton & Co.
  5. Price, T. Douglas [ed.]. 2000. Europe's First Farmers. Cambridge University Press. আইএসবিএন 0521665728
  6. Harris, David R. [ed.]. 1996. The Origins and Spread of Agriculture in Eurasia. UCL Press. আইএসবিএন 1560986751
  7. ৭.০ ৭.১ Durkheim, Emile, and Lewis A. Coser. 1997. The Division of Labor in Society. Free Press.
  8. Bell, D. (1973). The Coming of Post-Industrial Society : a Venture in Social Forecasting. Basic Books.
  9. Weber, Max. 1997. The Theory Of Social And Economic Organization. Free Press.
  10. Marx, Karl. 1906. Capital: A Critique of Political Economy. Modern Library Giant. The Modern Library.
  11. Durkheim, Emile. 1997. Suicide. Free Press.

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

সমাজবিজ্ঞানের তত্ব · সংস্কৃতি