সমাজবিজ্ঞানের পরিচিতি/শিক্ষা
শিক্ষা একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা শিক্ষাদান ও শেখার মাধ্যমে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। এই ক্ষেত্রে যারা শিক্ষকতা করেন, তাঁরা বিভিন্ন পদ্ধতি ও উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম শেখান। শিক্ষা বিষয়ে প্রচুর পরিমাণে সাহিত্য ও গবেষণা হয়েছে। যেখানে এই শিক্ষাদান পদ্ধতির নানা দিক আলোচনা করা হয়েছে। এই লেখাগুলিতে সাধারণত যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে তা হলো: পাঠদানের কৌশল, আচরণ নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, অনুপ্রেরণামূলক কৌশল এবং প্রযুক্তি ব্যবহার। তবে একজন শিক্ষকের কার্যকারিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর আচরণিক রীতি ও ব্যক্তিত্ব। কারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্কের গুণগত মানই মূলত তাদের অনুপ্রেরণার ভিত্তি তৈরি করে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরা ভালো বিচারবুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন। যা শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাঁদের সহানুভূতি, আবেগ, এবং সৃজনশীলতার শক্তিই শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে নিজেদের এবং সমাজের প্রতি উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করতে। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা একটি গতিশীল ও পরিবর্তনশীল সমাজের সক্রিয় নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতি হস্তান্তরের মাধ্যমে (সামাজিকীকরণ দেখুন) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক পরিপক্বতা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজের চাহিদা বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ
[সম্পাদনা]সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় শিক্ষা জন্মের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় এবং জীবনব্যাপী চলতে থাকে। কেউ কেউ মনে করেন গর্ভাবস্থাতেই শিক্ষা শুরু হয়।যেমন অনেক অভিভাবক শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য গর্ভে থাকা অবস্থায় গান শোনান বা বই পড়ে শোনান।
‘শিক্ষা’ শব্দটি প্রায়শই শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (নিচে দেখুন)। তবে এটি জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার বিস্তৃত একটি প্রক্রিয়া। অবশেষে আমরা যা কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি তাই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষার অংশ।
একজন ব্যক্তি বিভিন্ন উৎস থেকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা পেতে পারে। পরিবারের সদস্য ও সমাজ তার শিক্ষায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
"Education" শব্দের উৎপত্তি
[সম্পাদনা]"Education" শব্দটি ল্যাটিন শব্দ educare থেকে এসেছে যার অর্থ “নিয়ে আসা” বা “সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া”। এই ধারণাটি শিক্ষার একটি মূল তত্ত্বকে প্রকাশ করে অন্তর্নিহিত সক্ষমতাকে বিকাশ ঘটানো এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে সাহায্য করে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
[সম্পাদনা]প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তখনই শুরু হয় যখন সমাজ কোনো গোষ্ঠী অথবা কোনো ব্যক্তি একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করে মানুষকে বিশেষ করে, শিশুদের শিক্ষিত করার জন্য। এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি অনেক বেশি নিয়মিত ও গঠনমূলক হতে পারে। এটি জ্ঞান ছাড়াও আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচারে ব্যবহৃত হতে পারে যা কখনো কখনো অপব্যবহারের কারণও হতে পারে।
জীবনব্যাপী শিক্ষা বা প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা অনেক দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তবে এখনো অনেকের দৃষ্টিতে ‘শিক্ষা’ কেবল শিশুদের জন্যই প্রযোজ্য বলে মনে করা হয়। এ কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষাকে প্রায়ই ‘প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা’ বা ‘জীবনব্যাপী শিক্ষা’ হিসেবে আলাদা করে বলা হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা নানা রূপে হতে পারে কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিকক্ষে আবার কখনো স্বনির্দেশিত উপায়ে। গ্রন্থাগারগুলো বই ও অন্যান্য আত্ম-অধ্যয়নের উপকরণ সহজে পাওয়ার সুযোগ দিয়ে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কম্পিউটার ব্যবহারের বিস্তার ও ইন্টারনেট অ্যাকসেসের সুবিধা নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের শিক্ষিত করেছেন।
শিক্ষার ইতিহাস
[সম্পাদনা]১৯৯৪ সালে ডিটার লেনজেন যিনি ছিলেন ফ্রাই ইউনিভার্সিটেট বার্লিন এর প্রেসিডেন্ট তিনি বলেন শিক্ষা হয়তো কয়েক মিলিয়ন বছর আগে শুরু হয়েছে। অথবা ১৭৭০ সালের শেষ দিকে। (কারণ পেডাগজি বা শিক্ষাবিজ্ঞানের প্রথম অধ্যাপক পদ তৈরি হয়েছিল জার্মানির হালে বিশ্ববিদ্যালয় এ ১৭৭০-এর দশকের শেষদিকে।) লেনজেনের এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে শিক্ষাবিজ্ঞানকে পূর্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপদ্ধতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
প্রাচীন সভ্যতাগুলো টিকে থাকার ও উন্নতি করার জন্য যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতো তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ছিল শিক্ষা। প্রাপ্তবয়স্করা তাদের সমাজের শিশুদের শেখাতেন কীভাবে বাঁচতে হয় কীভাবে সমাজে টিকে থাকতে হয় এই জ্ঞান ও দক্ষতা তারা অর্জন করতেন। পরবর্তী প্রজন্মকেও তা শেখাতেন।এইভাবে জ্ঞান হস্তান্তরের মধ্য দিয়েই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে আর মানবজাতির উন্নতি হয়েছে। লিখন-পূর্ব সমাজগুলোতে এই জ্ঞান হস্তান্তর হতো মৌখিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে গল্পের মাধ্যমে। পরে যখন ভাষা লিখিত রূপ পায় তখন সংরক্ষিত জ্ঞান অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত হয়।
যখন সমাজ মৌলিক দক্ষতার বাইরে (যেমন যোগাযোগ, লেনদেন, খাদ্য সংগ্রহ, ধর্মীয় আচরণ ইত্যাদি) আরও জটিল জ্ঞান অর্জন শুরু করে। তখনই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় যা স্কুলিং হিসেবে পরিচিত। প্রমাণ পাওয়া গেছে যে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে মিশরে এমন স্কুলিং চালু ছিল।
মৌলিক শিক্ষা বলতে আজকাল এমন দক্ষতাগুলোকে বোঝানো হয় যা সমাজে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে একাধিক সমালোচক মতামত দিয়েছেন[১] সরকারগুলো গণশিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে শিশুদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য গড়ে তুলতে। বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও চায় শিক্ষার মাধ্যমে শিশুরা যেন "ম্যানেজারদের" (অর্থাৎ শিক্ষকদের) কথা শুনতে শেখে, নির্দেশ মেনে চলে, সময়মতো ক্লাসে আসে, কাজ সম্পন্ন করে যা ভবিষ্যতের কর্মজীবনের মতো অভ্যাস তৈরি করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে স্কুলগুলোকে দেখা হয় এমন এক যন্ত্র হিসেবে যেগুলো শিশুদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামোর ভেতরে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় জাতীয় রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষা
[সম্পাদনা]উন্নয়নশীল দেশগুলোতে
[সম্পাদনা]উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা বেশি এবং তা আরও গুরুতর। অনেক সময় মানুষ শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। আবার অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের কাছ থেকে অর্থ আয়ের প্রত্যাশা করে। যার ফলে শিশুরা স্কুল ছেড়ে কাজে যোগ দেয়। তবে শিশু শ্রম ও দারিদ্র্যের উপর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যখন দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়। তখন তারা শিশুদের স্কুলে ফেরত পাঠায়। এমনকি যদি স্কুলে ফেরার পর শিশুদের উপার্জনের সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেড়ে যায় তারপরও তারা স্কুলেই ফিরে যায়। শিক্ষকরা অনেক সময় অন্য পেশার তুলনায় কম বেতন পান।
জনবহুল দেশগুলোতে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম এবং সেখানে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াও কঠিন। কিছু দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একঘেয়ে অনমনীয় পাঠ্যক্রম থাকে যা শিক্ষাব্যবস্থার সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে।
- বিশ্বায়নের কারণে শিক্ষার্থীদের উপর পাঠ্যবিষয়ক চাপের ব্যাপক বৃদ্ধি
- শিক্ষা উন্নয়নের জন্য কিছু নির্দিষ্ট শতাংশ শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া (এটি সাধারণত দশম শ্রেণির পর স্কুলগুলোতে দেখা যায়)
ভারত এখন এমন প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছে যা ফোন ও ইন্টারনেট ল্যান্ডলাইন ছাড়াই কাজ করবে। তারা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে যা দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কম খরচে শিক্ষা পৌঁছে দিতে পারবে। এছাড়া এএমডি ও কিছু কোম্পানি মিলে এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করছে যার দাম মাত্র ১০০ ডলার। এটি ২০০৬ সালের মধ্যে প্রস্তুত হওয়ার কথা। এই কম্পিউটার একবারে ১০ লক্ষ ইউনিটে বিক্রি হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশেই এটি সংযোজন করা হবে। এই কম্পিউটারটি MIT এর তৈরি কম্পিউটার থেকে আলাদা যদিও দাম একই। এটি সম্ভবত জেনারেটর ও ক্লকওয়ার্ক চালিত হবে। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলোর শিশুরাও ডিজিটাল শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে এবং বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল বৈষম্য কমে আসবে।
আফ্রিকাতে এনইপিএডি একটি "ই-স্কুল প্রোগ্রাম" চালু করেছে। এর লক্ষ্য হলো ১০ বছরের মধ্যে আফ্রিকার ৬ লাখ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে কম্পিউটার, শিক্ষাসামগ্রী ও ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান।
- বিশ্বব্যাপী শিক্ষা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত করা উচিত
- দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক তুলে ধরা দরকার
- কয়েকটি দেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরাও যেতে পারে
প্রযুক্তি এবং শিক্ষা
[সম্পাদনা]প্রযুক্তি বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছে। উন্নত দেশগুলোতে কম্পিউটার এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিকে সমর্থন করার পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা (দূরশিক্ষার একটি ধরন) ইত্যাদি নতুন শিক্ষাপদ্ধতি উন্নয়নে। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য শক্তিশালী শিক্ষাসামগ্রী প্রদান করে তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের শেখার মান উন্নত করে কিনা সে বিষয়ে মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে।
শিক্ষা এবং সামাজিক তত্ত্ব
[সম্পাদনা]শিক্ষার কার্যাবলি
[সম্পাদনা]শিক্ষার প্রকাশ্য উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞান প্রদান করা যাতে তারা সমাজে অবদান রাখতে পারে। হয়তো নিজেরাই জ্ঞান উৎপাদক হিসেবে (যেমন বিজ্ঞানী) বা ব্যবসা বা শিল্পক্ষেত্রে অন্যান্যভাবে। তবে শিক্ষার একটি গোপন উদ্দেশ্যও রয়েছে যা আর্থিক ফলাফলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গণশিক্ষা ব্যবস্থার একটি গোপন উদ্দেশ্য হলো সামাজিক দক্ষতা বিকাশ করা। দেখা গেছে যারা সামাজিক দক্ষতার মাপকাঠিতে উচ্চ স্কোর করে, তারা বুদ্ধিমত্তায় সমান হলেও কম সামাজিক দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি অর্থ উপার্জন করে এবং বেশি শিক্ষা লাভ করে।[২]
- সামাজিকীকরণ
- সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন
- সামাজিক সংহতি
- জ্ঞান স্থানান্তর
- কর্মজীবী অভিভাবকদের জন্য শিশু পরিচর্যা
শিক্ষা এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া
[সম্পাদনা]- আত্ম-সম্পূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী
শিক্ষা এবং বৈষম্য
[সম্পাদনা]লিঙ্গ
[সম্পাদনা]যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক নীতিগত বিতর্কের একটি বিষয় হলো "ছেলেদের সংকট" কারণ ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় হাইস্কুল থেকে স্নাতক হওয়া এবং কলেজে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে জুডিথ ক্লেইনফেল্ড এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে শুধুমাত্র ছেলেদের সংকট হিসেবে এটি চিত্রিত করা কিছুটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।[৩] প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায় যেমন কম সাক্ষরতা হার, কম গ্রেড, স্কুলে কম সম্পৃক্ততা, উচ্চ ড্রপআউট হার, বিশেষ শিক্ষায় বেশি স্থানান্তর, মানসিক সমস্যা, শেখার অক্ষমতা, স্কুল থেকে বহিষ্কার এবং কলেজে ভর্তি হওয়ার হার কম।[৩] স্কুলের বাইরে, ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যা, আচরণগত সমস্যা, অল্প বয়সে মৃত্যু, এবং গ্রেফতার বা কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর হার বেশি। স্পষ্টতই ছেলেদের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে।[৩] তবে মেয়েদেরও তাদের নিজস্ব সমস্যাগুলি রয়েছে যা কম গুরুতর নয় যেমন উচ্চ হতাশা হার, খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি, আত্মহত্যার প্রচেষ্টা, গণিত ও বিজ্ঞানে কম স্কোর এবং সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা কম।[৩]ক্লেইনফেল্ড উপসংহারে বলেন ছেলেদের সমস্যাগুলি সম্ভবত আরও গুরুতর (যেমন ২৫% আমেরিকান পুরুষ হাইস্কুল স্নাতকরা একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধ বুঝতে পারে না যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এটি ১০%) তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে নারীরাও অনেক গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন।
১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ব্যাচেলর ডিগ্রির ৬৫% পুরুষদের হাতে ছিল ১৯৮২ সালে এটি পুরুষ ও নারীদের মধ্যে সমতা অর্জন করে। ২০০৪ সালে নারীরা ব্যাচেলর ডিগ্রির ৫৮% অর্জন করে।[৪] ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশক ছিল পুরুষ ও নারীদের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্যের বিপরীতমুখী পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে [৪] এই বৈষম্যের বিপরীতমুখী পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো চার বছরের কলেজ থেকে পুরুষদের উচ্চ ড্রপআউট হার। বিশেষ করে যাদের পিতার শিক্ষাগত যোগ্যতা কেবল হাইস্কুল বা যারা পরিবারের বাইরে। এছাড়াও নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আগেই শিক্ষাগত সাফল্য অর্জন করে। এই সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন দক্ষতা ও প্রতিশ্রুতি কলেজেও তাদের সহায়তা করে। এই পরিবর্তনের অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে নারীদের জন্য কলেজের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি (ফলে তারা শিক্ষা সম্পন্ন করে আরও উপকৃত হয়) এবং বিবাহবিচারের হার বৃদ্ধি। যা নারীদের আরও স্বাধীন হতে বাধ্য করে। নারীদের এই সাফল্যের হার সমাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শিক্ষা ও আয় বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।[৫]
শ্রেণি ও আয়
[সম্পাদনা]যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাগত বৈষম্য এবং সাধারণভাবে দারিদ্র্যের প্রধান কারণগুলির মধ্যে একটি হলো পাবলিক শিক্ষার অর্থায়ন ব্যবস্থা।[৬] যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ এলাকায় পাবলিক স্কুলগুলি প্রধানত স্থানীয় সম্পত্তি করের মাধ্যমে অর্থায়ন পায়। ফলে ধনী সমাজের স্কুলগুলোর বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়। যা উন্নত সুবিধা, ভালো শিক্ষক এবং উন্নত সম্পদের রূপ নেয়। এই আর্থিক সুবিধাগুলি নিরাপদ, সহায়ক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশের সঙ্গে মিলিত হয়। যা সম্পদের সঙ্গে আসে [৬] এটি আশ্চর্যজনক নয় যে ভালো অর্থায়িত পাবলিক স্কুলে পড়া শিশুরা কম অর্থায়িত স্কুলে পড়া শিশুদের তুলনায় বেশি সফল হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলিতে ট্র্যাকিং সাধারণত ব্যবহৃত হয় (শিক্ষার্থীদের তাদের দক্ষতা ও ক্ষমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা)। ট্র্যাকিং শিক্ষাগত অর্জনের বৈষম্য বৃদ্ধি করে বরং এই বৈষম্য হ্রাস করার পরিবর্তে।[৭]
এছাড়াও কিছু প্রমাণ রয়েছে যে বেশিরভাগ শিশুর জীবদ্দশায় শিক্ষাগত সম্ভাবনা ছয় বছর বয়সেই নির্ধারিত হয়।[৮] এর কারণ হলো কয়েকটি পারিবারিক পটভূমির বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যতের শিক্ষাগত অর্জনের শক্তিশালী পূর্বাভাসক যার মধ্যে রয়েছে পিতামাতার সমর্থন, শিক্ষার জন্য পিতামাতার প্রত্যাশা, পারিবারিক আয়, এবং পিতামাতার শিক্ষাগত অর্জন, যার মধ্যে শেষ দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণায় আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় হলো প্রথম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় পটভূমির বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতের শিক্ষাগত অর্জনের পূর্বাভাস দেওয়া হাইস্কুলে থাকা অবস্থায় একই ভেরিয়েবল ব্যবহার করে পূর্বাভাস দেওয়ার মতোই কার্যকর। কিছু ক্ষেত্রে আরও ভালো হয়। বাস্তব অর্থে এটি বোঝায় যে দরিদ্র পাড়াগুলিতে বসবাসকারী শিশুরা মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পাড়াগুলিতে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় কম শিক্ষা পায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবদ্দশায় শিক্ষাগত অর্জন শিশুদের স্কুল শুরু করার সময়েই নির্ধারিত হয় শেষ করার সময় নয়।
বৈষম্য থেকে উদ্ভূত শিক্ষাগত ঘাটতি ভবিষ্যতের জীবনের গতিপথকেও প্রভাবিত করে। কলেজগুলি সাধারণত অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত পটভূমির শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে, কারণ তাদের উচ্চ খরচ এবং ভর্তি হওয়ার জন্য কঠোর একাডেমিক প্রয়োজনীয়তা।[৯] আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কলেজগুলি বিভিন্ন কলেজ র্যাঙ্কিং সিস্টেমে (যেমন, U.S. News & World Report) তাদের র্যাঙ্কিং বজায় রাখতে চায়। ফলে তারা উচ্চ মানের পরীক্ষার স্কোরসহ শিক্ষার্থীদের পছন্দ করে এবং "মেধা" ভিত্তিক স্কলারশিপের মাধ্যমে তাদের আগ্রাসিভাবে নিয়োগ করে। ২০০০ সালে ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীরা যারা নিজেরাই কলেজের খরচ বহন করতে সক্ষম তারা "মেধা" বৃত্তি পেয়েছিল যার পরিমাণ ছিল সবচেয়ে কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার ৮২%।[৭] অর্থাৎ যারা কলেজে পড়ার সামর্থ্য রাখে, তাদের অনেক সময় পড়ার খরচ বহন করতে হয় না, কারণ তারা সাধারণত ভালো প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়ে এসেছে। ফলে তারা মানসম্মত পরীক্ষায় উচ্চ স্কোর করে যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দৃষ্টিতে আকর্ষণীয়।
ফলে প্রকৃতপক্ষে যেসব শিক্ষার্থীর আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন তাদের জন্য বরাদ্দ কমে যায়। এতে ধনীরা আরও সুবিধাভোগী থাকে এবং দরিদ্ররা কলেজে পড়ার সুযোগ পায় না।যার মাধ্যমে সমাজের বিদ্যমান বৈষম্য আরও দৃঢ় হয়। অনেক অস্বচ্ছল যুবক ভিন্ন একটি পথ বেছে নেয়। স্বেচ্ছাসেবী এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী একটি আকর্ষণীয় বিকল্প রয়ে গেছে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবার ও পাড়ার তরুণদের জন্য। তারা সামরিক বাহিনীতে যোগদানকে কলেজ ডিগ্রি ছাড়াই কর্মজীবনে ঢোকার তুলনায় ভালো বিকল্প মনে করে। মেধার দিক থেকে এই তরুণরা গড় মানের হলেও তারা আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকে। এটাই প্রধান কারণগুলোর একটি যার ফলে তারা আর্থিক সফলতার জন্য কলেজের পরিবর্তে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের পথ বেছে নেয় এবং অনেকে তাতে কিছুটা সফলতাও পায়।[৯]
স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু
[সম্পাদনা]জনসংখ্যাতত্ত্ব অধ্যায়ে যেমন বলা হয়েছে শিক্ষা মানুষের দীর্ঘায়ুর একটি শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কেউ যত বেশি বছর লেখাপড়া করে তার সুস্থ জীবনের সম্ভাবনা ততই বাড়ে। তারা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে বেশি যুক্ত হয় (আর তার বিপরীতে ধূমপানের মতো অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে জড়ানোর সম্ভাবনা কম থাকে)।[১০]
শিক্ষার সমস্যা (মার্কিন প্রেক্ষাপটে)
[সম্পাদনা]চার্টার স্কুল
[সম্পাদনা]চার্টার স্কুল হলো যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেগুলো সরকারিভাবে অর্থায়িত হলেও ঐতিহ্যবাহী পাবলিক স্কুলগুলোর কিছু নিয়ম-নীতি ও আইন থেকে অব্যাহতি পায়। তবে এর বিনিময়ে তাদের নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল অর্জনের দায়িত্ব নিতে হয়। যা প্রতিটি স্কুলের চার্টারে নির্ধারিত থাকে। এই স্কুলগুলোর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণত শিক্ষক, অভিভাবক বা এমন কিছু ব্যক্তি যারা ঐতিহ্যবাহী পাবলিক স্কুলের সীমাবদ্ধতায় অসন্তুষ্ট। রাজ্য-চালিত চার্টার স্কুল যেগুলো স্থানীয় স্কুল জেলাগুলোর অধীন নয় সাধারণত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কিছু সরকারি সংস্থা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়।[১১]
চার্টার স্কুলের মূল ধারণা হলো স্বাধীনতার বিনিময়ে বেশি দায়িত্ব। তাদেরকে শিক্ষাগত ফলাফল এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দায়বদ্ধ থাকতে হয়। যেমন সেই সংস্থা যেটি তাদের অনুমোদন দেয় অভিভাবকরা যারা তাদের সন্তানদের সেখানে পাঠান এবং সাধারণ জনগণ যারা করের মাধ্যমে স্কুলগুলোকে অর্থ দেয়। তত্ত্ব অনুযায়ী যদি তারা চার্টারে উল্লেখিত লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয় তবে তাদের স্কুল বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটা অনেক সময় জটিল, মতভেদপূর্ণ এবং বিতর্কিত হয়ে ওঠে। একটি উদাহরণ হলো সান ফ্রান্সিসকো ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের “আর্বান পায়োনিয়ার” নামের একটি স্কুল যার চার্টার ২০০৩ সালে বাতিল করা হয়েছিল। কারণ একটি বনভ্রমণে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটেছিল। যা নিয়ে পরে তদন্ত শুরু হয়।[১২] একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায় স্কুলটির আর্থিক অব্যবস্থাপনা ছিল চরম,[১৩] এবং এটি ছিল জেলা-ভিত্তিক স্কুলগুলোর মধ্যে পরীক্ষার সর্বনিম্ন ফলাফলপ্রাপ্ত শুধুমাত্র পুরোপুরি ইংরেজি না জানা শিক্ষার্থীদের স্কুলগুলো বাদে।[১৪] এছাড়াও স্কুলটির বিরুদ্ধে একাডেমিক জালিয়াতির অভিযোগ ছিল। যেখানে শিক্ষার্থীদের যথাযথ ক্রেডিট ছাড়াই স্নাতক ঘোষণা করা হয়েছিল।
চার্টার স্কুল বিরোধীরা বলেন এগুলো মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থার বড় কোনো সমস্যা সমাধানে সক্ষম নয়। বরং এতে সমাজে জাতিগত বা শ্রেণিগত বিভাজন আরও বাড়ে এবং এটি পাবলিক স্কুল ব্যবস্থার অর্থ খরচ করে ফেলে।[১১] এছাড়াও সাম্প্রতিক তথ্য বলছে চার্টার স্কুলের শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন পরীক্ষায় পাবলিক স্কুলের তুলনায় ভালো করছে না। সর্বোচ্চ যা হচ্ছে তা হলো তারা পাবলিক স্কুলের সমতুল্য ফল করছে। কিন্তু যখন চার্টার স্কুল কোনো পাবলিক স্কুল জেলার সাথে যুক্ত নয় তখন তাদের শিক্ষার্থীদের ফলাফল পাবলিক স্কুলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।[১১] সব মিলিয়ে চার্টার স্কুল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার সমাধান নয় বলেই প্রতীয়মান হয়।
উচ্চ বিদ্যালয় সম্পন্ন করা
[সম্পাদনা]জটিল ও বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ বিদ্যালয় সম্পন্ন করার হার প্রায়ই সঠিকভাবে বোঝা যায় না।[১৫] এই হার রাজ্যভিত্তিতে গণনা করা হয় এবং পরে তা কেন্দ্রীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৮৫% শিক্ষার্থী উচ্চ বিদ্যালয় শেষ করে। কিন্তু বাস্তব সংখ্যা প্রায় ৭১%।[১৫] ৭১% একটি চিন্তাজনক সংখ্যা অর্থাৎ প্রতি ৪ জনের মধ্যে প্রায় ১ জন শিক্ষার্থী উচ্চ বিদ্যালয় শুরু করেও তা শেষ করতে পারে না। ফলে এই শিক্ষার্থীরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা ছাড়াই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ করে। উচ্চ বিদ্যালয়ের ডিপ্লোমার অভাব তাদের আয় কমিয়ে দেয়, দারিদ্র্যের হার বাড়ায় এবং সমাজ, স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানের বিষয়ে তাদের বোঝাপড়া দুর্বল করে তোলে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শিক্ষায় যাওয়ার দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে এটি শিল্পোন্নত ২৭টি দেশের মধ্যে ৫ম ও ১৬তম স্থানে ছিল যারা কলেজে ভর্তি হয়ে তা শেষ করে।[১৬] এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে অনেক কম দক্ষ শিক্ষার্থী আছে যেমন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। যা একটি বিশ্বায়িত ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে কাজ করতে হলে দরকার।[১৬]
সরকারি বনাম বেসরকারি বিদ্যালয়
[সম্পাদনা]অনেকদিন ধরে ধারণা করা হয়েছিল যে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় ভালো শিক্ষা দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছে।[১৭] যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি বিবেচনায় নেওয়া হয় তখন দেখা যায় সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গড়ে গণিতে বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো ফল করছে।[১৭] দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী দেখায় যে গণিতে শুরুতে সরকারি ও ক্যাথলিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমান অবস্থানে থাকলেও পঞ্চম শ্রেণি নাগাদ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায় অর্ধবছরের সমান অগ্রগতি অর্জন করে।[১৭] বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক বিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা সীমিত হওয়ায় তুলনা কঠিন হলেও রক্ষণশীল প্রটেস্টান্ট বিদ্যালয়গুলোর গণিত ফলাফল সবচেয়ে খারাপ।[১৭] গণিত এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি এমন একটি বিষয় যা বাসাবাড়ির পরিবেশ দ্বারা কম প্রভাবিত হয়। বিদ্যালয়ের গুণমান দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়।[১৭] তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো বিদ্যালয় ধরণ গণিত ফলাফলের মাত্র ৫% ভিন্নতার জন্য দায়ী। বেশিরভাগ পার্থক্য আসে জনমিতিক বৈশিষ্ট্য থেকে।[১৭] এই গবেষণার সারমর্ম হলো বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো হয়তো নির্দিষ্ট ধরণের শিক্ষা দেয় (যেমন ধর্মীয় শিক্ষা) কিন্তু তারা সাধারণভাবে ভালো মানের শিক্ষা দেয় এমন প্রমাণ খুব কম।
অন্যান্য বিষয়
[সম্পাদনা]- হোম-স্কুলিং
- ট্র্যাকিং
- প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা
- শিক্ষকের ঘাটতি ও গুণগত মান
এই বিষয়গুলোর কিছু আলোচনা সমসাময়িক শিক্ষা মনোবিজ্ঞান নামক উইকিবই এ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
[সম্পাদনা]শিক্ষা শুধু শিক্ষার্থীদের তথ্য সরবরাহের বিষয় নয়। শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা কার্যকর পড়াশোনার কৌশল ব্যবহার করেও শিক্ষা প্রক্রিয়ায় অবদান রাখে। দুঃখজনকভাবে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে পড়াশোনার কৌশল নিয়ে। যেমন অনেক শিক্ষক জটিল পড়াশোনা কৌশলের পরামর্শ দেন যেমন ধারণামূলক মানচিত্র আঁকা, যাতে মনে করা হয় এতে তথ্য স্মৃতিতে ভালোভাবে বসে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে তথ্য মনে রাখার জন্য বারবার তথ্য উদ্ধারের অনুশীলন করা অনেক বেশি কার্যকর।[১৮] অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের সময় জটিল কৌশলে নয় বরং তথ্য মনে করার অনুশীলনে ব্যয় করাই অধিক ফলদায়ক।
শিক্ষার চ্যালেঞ্জ
[সম্পাদনা]শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো ধারণা ও দক্ষতা একজন ব্যক্তি থেকে আরেকজন বা একটি গোষ্ঠীতে স্থানান্তর করা। বর্তমানে শিক্ষার কিছু বড় প্রশ্ন হলো: কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর? কী শেখানো উচিত? কোন জ্ঞান বেশি প্রাসঙ্গিক? এবং শিক্ষার্থী সেই জ্ঞান কতটা ধরে রাখতে পারবে? জর্জ কাউন্টস ও পাওলো ফ্রেইরি-এর মতো শিক্ষাবিদরা বলেছেন যে শিক্ষা একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যার ফলাফলও রাজনৈতিক। শিক্ষায় কার ধারণা স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং তা কার স্বার্থে এই প্রশ্ন সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে।
"থ্রি আর" অর্থাৎ পঠন, লিখন, এবং গণনা ছাড়াও পশ্চিমা স্কুলগুলোতে ইতিহাস, ভূগোল, গণিত (সাধারণত ক্যালকুলাস ও বীজগণিতসহ), পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনীতি শেখানো হয়। এই আশা নিয়ে শেখানো হয় যেন তারা ভবিষ্যতে এই জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে। অথবা অর্জিত দক্ষতা অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীর যোগ্যতা পরিমাপ করে পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে এবং তাতে প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে তার মূল্যায়ন করা হয়। এই নম্বর সাধারণত অক্ষর বা শতাংশ আকারে প্রকাশ করা হয় যাতে শিক্ষার্থী কতটা বিষয় বুঝেছে তা বোঝানো যায়।
শিক্ষার অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে অনেক বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, গ্রেড শিক্ষার্থীর আসল দক্ষতা ও দুর্বলতা তুলে ধরে না। তারা বিশ্বাস করেন শিক্ষায় তরুণ কণ্ঠস্বর খুবই কম। অনেকে মনে করেন, বর্তমান গ্রেডিং ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে, বিশেষত যখন খারাপ ফলাফলের পেছনে দারিদ্র্য, শিশু নির্যাতন, বা পক্ষপাতদুষ্টতার মতো কারণ থাকে।
অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন শিক্ষা সংস্কারে "মূল বিষয়গুলোতে ফেরা" দরকার। তাদের মতে পাঠ্যক্রম সহজ করে দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা আর আগ্রহী বা চ্যালেঞ্জড বোধ করছে না। তারা মনে করেন, আত্মবিশ্বাস আসে বাধা না সরিয়ে বরং সেগুলো ন্যায়সঙ্গত করে তুললে এবং শিক্ষার্থীদের সেটা পার করে দেখার সুযোগ দিলে।
একদিকে আলবার্ট আইনস্টাইন—যিনি আধুনিক পদার্থবিদ্যাকে বদলে দিয়েছেন তাকে বিদ্যালয়ে খুব মনোযোগী শিক্ষার্থী বলা যেত না। তিনি ক্লাসে অংশ নিতেন না এবং পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিলেন না। তবুও, তার প্রতিভা একসময় উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায় এবং মানবজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। অন্যদিকে বহু বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে কঠোরভাবে শিক্ষিত অনেকে জীবনে সফল হয়েছে এবং শিখতে ভালোবাসে। তাদের মন আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে এবং তারা বিভিন্ন দক্ষতায় পারদর্শী হয়েছে।
শিক্ষায় কিছু বিতর্কিত প্রশ্ন সব সময়ই থাকবে। কিছু জ্ঞান কি ভুলে যাওয়া উচিত? আমরা কী শেখাবো পরমাণু বোমা তৈরির জ্ঞান রাখা উচিত নাকি তা ভুলে যাওয়াই ভালো?
অভিভাবকদের অংশগ্রহণ
[সম্পাদনা]অভিভাবকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শিক্ষাগত বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শিশুর জীবনে প্রথম থেকে নিয়মিতভাবে অভিভাবকরা অংশ নিলে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন ছোটবেলায় বই পড়ে শোনানো, প্যাটার্ন শেখানো, যোগাযোগ দক্ষতা শেখানো, বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে শেখানো ইত্যাদি। একজন শিশুর সামাজিক ও একাডেমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় যখন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজ ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একসাথে কাজ করে।
অতিরিক্ত পঠন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Spring, Joel. 1998. A Primer of Libertarian Education. Montreal: Black Rose Books
- ↑ Lleras, Christy. 2008. “Do Skills and Behaviors in High School Matter? The Contribution of Noncognitive Factors in Explaining Differences in Educational Attainment and Earnings.” Social Science Research 37 (3): 888-902.
- ↑ ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ Kleinfeld, Judith. 2009. The State of American Boyhood. Gender Issues. 26:113-120.
- ↑ ৪.০ ৪.১ Buchmann, C., and DiPrete, T.A. 2006. The Growing Female Advantage in College Completion: The Role of Family Background and Academic Achievement. American Sociological Review, 71 (4), 515-541.
- ↑ Paul, A.M. 2006. The Real Marriage Penalty. The New York Times. Retrieved November 19, 2006.
- ↑ ৬.০ ৬.১ Taylor, Kay Ann. 2009. Poverty's Multiple Dimensions. Journal of Educational Controversy. 4(1). http://www.wce.wwu.edu/Resources/CEP/eJournal/v004n001/a002.shtml
- ↑ ৭.০ ৭.১ Sacks, Peter. 2007. Tearing Down the Gates: Confronting the Class Divide in American Education. University of California Press.
- ↑ Entwisle, Doris R., Alexander, Karl L., and Steffel Olson, Linda. 2005. First Grade and Educational Attainment by Age 22: A New Story. American Journal of Sociology, 110 (5):1458–502.
- ↑ ৯.০ ৯.১ Elder, G. H., L. Wang, N. J. Spence, D. E. Adkins, and T. H. Brown. 2010. “Pathways to the All-Volunteer Military*.” Social Science Quarterly 91:455-475.
- ↑ Kolata, G. 2007. A Surprising Secret to a Long Life: Stay in School. The New York Times. Retrieved January 3, 2007. [১]
- ↑ ১১.০ ১১.১ ১১.২ Renzulli, Linda A., and Vincent J. Roscigno. 2007. “Charter Schools and the Public Good.” Contexts: Understanding People in Their Social Worlds 6:31-36.
- ↑ Delgado, Ray. "District suspends wilderness trips: School could lose charter if safety lapses found", San Francisco Chronicle, 2003-03-07. Retrieved on 2008-01-21.
- ↑ Schevit, Tanya. "Audit finds faults in charter school: Board set to vote on troubled Urban Pioneer", 2003-08-26. Retrieved on 2008-01-21.
- ↑ Academic Performance Index (API) Base Report: School Report: Urban Pioneer Experiential. California Department of Education (2004-06-14). Retrieved on 2008-01-21.
- ↑ ১৫.০ ১৫.১ Dillon, Sam. 2008. “States’ Data Obscure How Few Finish High School.” The New York Times, March 20 http://www.nytimes.com/2008/03/20/education/20graduation.html (Accessed March 20, 2008).
- ↑ ১৬.০ ১৬.১ Fiske, Edward B. 2008. “A Nation at a Loss.” The New York Times, April 25 http://www.nytimes.com/2008/04/25/opinion/25fiske.html (Accessed February 8, 2010).
- ↑ ১৭.০ ১৭.১ ১৭.২ ১৭.৩ ১৭.৪ ১৭.৫ Lubienski, Christopher, Corinna Crane, and Sarah Theule Lubienski. 2008. What Do We Know About School Effectiveness? Academic Gains in Public and Private Schools. Phi Delta Kappan. 89, 9.
- ↑ Karpicke, Jeffrey D., and Janell R. Blunt. 2011. “Retrieval Practice Produces More Learning than Elaborative Studying with Concept Mapping.” Science.
