সংযুক্ত বিশ্বে বসবাস/নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে প্রযুক্তি
ভূমিকা
[সম্পাদনা]জিটাল প্রযুক্তি আমাদের জানামতে সব সময়ই মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। সময়ের সাথে সাথে আমাদের তৈরি করা এই প্রযুক্তি মুখোমুখি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করেছে। ফলে মানুষ শুধু সাধারণ যোগাযোগের বাইরে গিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে বসবাস করতে শুরু করেছে। আমরা এর সাথে একটি স্থায়ী সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছি। আজ আমরা অনলাইনে একাধিক ডিভাইসে একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের বা অন্যদের দ্বারা উপস্থাপিত, বিচারিত, মূল্যায়িত এবং নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। আমরা কোনো দিনই বার্তা, নোটিফিকেশন, টেক্সট বা সব ধরনের আপডেটের জন্য নিজেদের ব্যক্তিগত স্ক্রিন চেক না করে কাটাই না। আমরা এমন এক ঝড়ের মধ্যে আটকে আছি যা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। এর কমার বা থামার কোনো লক্ষণ নেই।
প্রযুক্তি এবং মানুষের মধ্যকার জটিল ও অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা এবং গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে আমরা কীভাবে আমাদের তৈরি করা যন্ত্রের অংশে পরিণত হচ্ছি তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই অধ্যায়ে প্রাসঙ্গিক তত্ত্বগুলোর সাহায্যে মানুষ এবং প্রযুক্তির সম্পর্কের চারপাশের আলোচনার বিষয়গুলো অন্বেষণ করা হবে। এটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ধারণাগুলো সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি এগুলো কীভাবে আমাদের নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণ হয়ে উঠছে (বা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে) তা-ও তুলে ধরবে।
তাত্ত্বিক
[সম্পাদনা]জ্যারন ল্যানিয়ার
[সম্পাদনা]জ্যারন ল্যানিয়ার একজন কম্পিউটার এবং প্রযুক্তি তাত্ত্বিক। তার দর্শনগুলো মানুষের সাথে কম্পিউটারের সম্পর্কের বিষয়ে সমালোচনামূলক। প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের অভিজ্ঞতা এবং যোগাযোগের নির্দিষ্ট উপাদানগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তা তিনি তুলে ধরেছেন। ল্যানিয়ার বিশ্বাস করেন প্রযুক্তি আমাদের নিজস্ব সত্তার একটি সম্প্রসারণ। তবে তিনি আরও একটি বিতর্কের অবতারণা করেছেন। তার মতে প্রযুক্তি মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করছে। ল্যানিয়ারের লেখা ইউ আর নট আ গ্যাজেট: আ ম্যানিফেস্টো বইয়ের মিসিং পারসনস অংশে তিনি একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন প্রযুক্তি নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণ হওয়ার বদলে নিজেই সত্তায় পরিণত হতে পারে। [১] ল্যানিয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রযুক্তি পরিবর্তনের ক্ষমতা ও অর্থ যাদের কাছে আছে, তাদের উচিত প্রযুক্তির চেয়ে মানবতাবাদকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন প্রযুক্তি এবং মানবজাতির মধ্যে কোনো স্থিতিশীল ও স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য নেই, বরং এদের মধ্যে একটি বিরোধ রয়েছে।
জ্যারন ল্যানিয়ারের নিবন্ধ ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজমে[২] তিনি অনলাইন সামষ্টিকতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তা তুলে ধরেছেন। এর একটি উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন অনলাইনে আপনি কী হিসেবে পরিচিত হবেন তার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ না-ও থাকতে পারে। তিনি তার উইকিপিডিয়া পাতার একটি তথ্য নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তাকে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি অতীতে কেবল একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলেন। "...আমি প্রায় দেড় দশক আগে একটি পরীক্ষামূলক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছিলাম।" "উইকিপিডিয়ার মতো বিকল্প জগতে আমি চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে অবসর নেওয়ার চেষ্টা করেছি।" অনলাইনে মানুষ সাধারণত কীভাবে প্রথম দর্শনের ভিত্তিতে পরিচিত হয়, এটি তার একটি ভালো উদাহরণ। এরপর আপনি কী করেছেন তা কোনো ব্যাপার না। এমনকি আপনি যে জন্য পরিচিতি পেয়েছেন, আপনার বর্তমান কাজ তার থেকে যতই আলাদা হোক না কেন। সেই একটি কাজই আপনাকে সংজ্ঞায়িত করে। ল্যানিয়ার ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে এই সামষ্টিকতা মূলত একটি সত্তায় পরিণত হয়। "উইকিপিডিয়ার কোনো ভুক্তি পড়া অনেকটা বাইবেল গভীরভাবে পড়ার মতো। সেখানে বিভিন্ন বেনামি লেখক এবং সম্পাদকের কণ্ঠস্বরের ক্ষীণ আভাস পাওয়া যায়, যদিও নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।" এই আলোচনার সূত্র ধরে ল্যানিয়ার নতুন অনলাইন সামষ্টিকতা এবং ব্যান্ডওয়াগন প্রভাব কীভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত তা নিয়ে কথা বলেছেন। "...এটি এই ধারণারই পুনরুত্থান যে এই সামষ্টিক সত্তাটি সর্বজ্ঞানী, এবং এতে প্রভাব বিস্তার করা বাঞ্ছনীয়..." এই ধারণাটি বিশেষ করে মানুষের সামাজিক প্রাণী হওয়ার স্বভাবের সাথে সম্পর্কিত। মানুষ কোনো দলের অংশ হতে বা কোনো কিছুর অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন প্রেক্ষাপটই সবকিছু। আলোচ্য ওয়েবসাইটের কুখ্যাতি প্রদান করা তথ্যের উদ্দেশ্য বদলে দিতে পারে। "যদি সিনেমা ধ্বংস করার জন্য নিবেদিত কোনো ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট দাবি করে যে আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, তবে এটি হঠাৎ করেই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে।"

মার্শাল ম্যাকলুহান
[সম্পাদনা]হার্বার্ট মার্শাল ম্যাকলুহান একজন কানাডিয়ান দার্শনিক এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি মিডিয়া প্রযুক্তি বিষয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি করেছেন। তিনি মূলত ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি মারা যান। তাই তার কাজ পুরোপুরি ইন্টারনেট-পূর্ববর্তী সময়ের। তা সত্ত্বেও, ম্যাকলুহানের তুলে ধরা মতামত এবং ধারণাগুলো আজকের ডিজিটাল মিডিয়া নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। ম্যাকলুহান মিডিয়া বিষয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলো মিডিয়া প্রযুক্তির সাথে কীভাবে কাজ করে এবং প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের সাথে ব্যাপকভাবে সম্পর্কিত। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত তার বই আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া: দি এক্সটেনশনস অব ম্যানে[৩] ম্যাকলুহান বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। এগুলো কীভাবে আমাদের নিজেদের এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের সম্প্রসারণের সাথে সম্পর্কিত তা তিনি আলোচনা করেছেন। ম্যাকলুহান বিশ্বাস করতেন যেকোনো সময়ের সামাজিক গোষ্ঠীকে সংজ্ঞায়িত করা এবং রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। এটিই প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের পেছনের মূল ধারণা। ম্যাকলুহানের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিতর্কিত হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ এর সাথে সাংঘর্ষিক অন্যান্য মতামতও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি ধারণা দেয় প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যার বদলে সমাজই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোতে প্রভাব ফেলে।
জিল ওয়াকার রেটবার্গ
[সম্পাদনা]জিল ওয়াকার রেটবার্গ নরওয়ের বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল কালচারের একজন অধ্যাপক। তিনি সিয়িং আওয়ারসেল্ভস থ্রু টেকনোলজি বইটি প্রকাশ করেছেন। এটি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপন করার বিষয়টি অন্বেষণ করে। তিনি আমরা কীভাবে নিজেদের উপস্থাপন করি তা নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি স্ব-উপস্থাপনার তিনটি মোড (লিখিত, দৃশ্যমান এবং পরিমাণগত) পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিভিন্ন স্ব-উপস্থাপনার পদ্ধতিগুলো ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে কীভাবে কাজ করে তা তিনি অধ্যয়ন করেছেন। তিনি প্রতিটি মোডের 'প্রাক-ডিজিটাল' ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। বর্তমান স্ব-উপস্থাপনার পদ্ধতিগুলো কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা-ও তিনি তুলে ধরেছেন। রেটবার্গের বই "সিয়িং আওয়ারসেল্ভস থ্রু টেকনোলজি"তে[৪] তিনি সেলফির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন। যারা সেলফি তোলেন তারা কীভাবে চূড়ান্ত ছবিটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন তা তিনি বলেছেন। তিনি আধুনিক সেলফির সাথে সুজান সাজুকের ছবির গ্যালারির তুলনা করেছেন। সুজানের গ্যালারিতে ৫৪৭৫টি ছবি রয়েছে। এটি ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন একটি করে তোলা ছবির সংগ্রহ। এই ছবিগুলো সাজুকের জীবনের সব দিকের সাথে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে মানসিক অস্থিরতা থেকে শুরু করে জিভ বের করা মজার ছবিও ছিল। রেটবার্গ সাজুকের প্রকল্প এবং ইনস্টাগ্রামের মতো আধুনিক ছবি শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যকার মিল নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
এরিকা ডি'অ্যামিকো
[সম্পাদনা]এরিকা ডি'অ্যামিকো ইতালির উরবিনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিগুলো নিয়ে গবেষণায় বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো পর্যবেক্ষণ করেন। ডি'অ্যামিকো "দি এলিমেন্টস অব লিবিডিনাল ইকোনমি ইন ইনস্টাগ্রাম: আ নিউ ওনটোলজিকাল স্ট্যাটাস অব ফটোগ্রাফি" লিখেছেন। এই গবেষণাপত্রে তিনি নির্দিষ্ট ঘরানার ছবির অন্তর্নিহিত অর্থ অন্বেষণ করেছেন। তিনি নান্দনিকতা, ছবির মধ্যকার সম্পর্ক এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নির্দিষ্ট ধরনের ছবি আপলোড করার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণাপত্রটির মূল ফোকাস হলো ইনস্টাগ্রাম। ডি'অ্যামিকো ছবির স্রষ্টা এবং আপলোডারের সাথে সেগুলো দেখা দর্শকদের মধ্যকার সম্পর্ক অন্বেষণ করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন ইনস্টাগ্রাম এবং অন্যান্য ছবি শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো তিন ধাপের একটি প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। প্রথম ধাপ হলো অন্যদের "ছবির মাধ্যমে আপনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন তা বুঝতে দেওয়া"।[৫] এর অর্থ হলো অভিজ্ঞতার সবচেয়ে নিখুঁত চিত্র তৈরি করা আপনার দায়িত্ব। দ্বিতীয় ধাপ হলো "একটি কল টু অ্যাকশন হিসেবে হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা এবং আরও দৃশ্যমানতা পাওয়া"।[৬] তিনি যুক্তি দেন হ্যাশট্যাগ ব্যবহারের ফলে এমন সব ছবিও তাদের যোগ্যতার জন্য স্বীকৃতি পায়, যেগুলো অন্যথায় হাজার হাজার ছবির সাথে ডিজিটাল স্তূপে হারিয়ে যেত। তৃতীয় ধাপের সাথে যুক্ত রয়েছে "নির্দিষ্ট কিছু ফিল্টারের সাথে আমার ছবির মিল রাখা"।[৭] তিনি বলেছেন ছবির জন্য সেরা দর্শক পেতে আপলোডারকে অবশ্যই উপযুক্ত ট্যাগ এবং ফিল্টার দিয়ে এটি আপলোড করতে হবে।
জিজি পাপাচরিসসি
[সম্পাদনা]জিজি পাপাচরিসসি একজন যোগাযোগ পণ্ডিত। তার কমিউনিকেশন স্টাডিজে পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে। তার কাজগুলো মূলত সমাজে নতুন মিডিয়া এবং প্রযুক্তির প্রভাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। তিনি 'আ নেটওয়ার্কড সেল্ফ: আইডেন্টিটি, কমিউনিটি অ্যান্ড কালচার অন সোশ্যাল নেটওয়ার্কস সাইটস' সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন। আমরা এই মডিউলের জন্য সেটি অধ্যয়ন করেছি। এতে তিনি অ্যান্ড্রু এল. মেন্ডেলসনের সাথে মিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার সাথে আসা আত্মরতি নিয়ে একটি অধ্যায় লিখেছেন। বিশেষ করে কলেজ শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। মানুষ কীভাবে বিভিন্নভাবে ছবি পোস্ট করে এবং তাদের সামাজিক অর্থ কী তা তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি পুরুষ ও নারীদের পোস্ট করা ছবির মধ্যকার পার্থক্যগুলোর ওপরও নজর দিয়েছেন। তিনি তার বইগুলোতে আমাদের সমাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আসা পরিবর্তনগুলো নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। তিনি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ওপর এসব প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন। আ নেটওয়ার্কড সেল্ফ বইয়ে তিনি এমন এক সময়ে সামাজিক সংযোগ কীভাবে তৈরি হয় তা পরীক্ষা করেছেন, যখন সবকিছুই অনলাইনে চলে। পুরো একটি পরিচয় অনলাইনে থাকার পরিণতি এটি অন্বেষণ করে। আজকাল মানুষ কেবল অনলাইনেই নিজেদের উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। তারা তাদের সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোকে নিজস্ব পরিচয়ের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহার করে।
শেরি টার্কল
[সম্পাদনা]শেরি টার্কল ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সামাজিক মনোবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। তিনি এমআইটি ইনিশিয়েটিভ অন টেকনোলজি অ্যান্ড সেল্ফ-এর একজন প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালকও। শেরি টার্কল সমাজবিজ্ঞান এবং ব্যক্তিত্ব মনোবিজ্ঞানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুগ্ম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। অধ্যাপক টার্কল প্রযুক্তির সাথে মানুষের সম্পর্ক অন্বেষণ করেন। এটি মানুষের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা তিনি বিশ্লেষণ করেন। ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কীভাবে মানুষের সংযোগ এবং যোগাযোগকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে তা তিনি অধ্যয়ন করেন। ১৯৮৪ সালে তার বই দ্য সেকেন্ড সেল্ফ: কম্পিউটারস অ্যান্ড দ্য হিউম্যান স্পিরিট প্রকাশের পর থেকে, শেরি টার্কল প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের জীবন পরিবর্তন করে এবং এটি কীভাবে আমাদের পরিচয়কে প্রভাবিত করে তা অন্বেষণ করছেন। তার কাজ অ্যালোন টুগেদার (২০১১) এবং লাইফ অন দ্য স্ক্রিন, দ্য সেকেন্ড সেল্ফ (২০০৫)-এ তিনি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে মানুষের বিচ্ছিন্নতা এবং সংযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি 'টেদার্ড সেল্ফ' বা 'আবদ্ধ সত্তা'-এর ধারণাও অন্বেষণ করেন। এটি হলো প্রযুক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগে গড়ে ওঠা মানুষের নতুন পরিচয়। শিক্ষায়তনিক পরিবেশে অধ্যাপক টার্কল "ডিজিটাল সংস্কৃতির মার্গারেট মিড" হিসেবে পরিচিত। তার গবেষণায় তিনি মূলত সেই প্রযুক্তিগুলোর ওপর মনোযোগ দেন যেগুলোকে তিনি "আমাদের ঘনিষ্ঠতার স্থপতি" বলে অভিহিত করেন। এগুলোর মধ্যে সামাজিক মিডিয়া, চ্যাটবট, মিশুক রোবট এবং ডিজিটাল কর্মক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত। তিনি পরামর্শ দেন ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ এবং পুনর্নির্মাণের জন্য মানুষের কাছে এখনো সময় আছে। কারণ এটি এখনো তুলনামূলকভাবে নতুন। শেরি টার্কলের কাজ পাঠকদের প্রযুক্তির সাথে মানুষের সম্পর্ককে একটি নতুন ও সতেজ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
আদ্রিয়ান আথিক
[সম্পাদনা]আদ্রিয়ান আথিক অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল স্টাডিজের একজন সহযোগী অধ্যাপক। তিনি মিডিয়া স্টাডিজে বিশেষজ্ঞ। তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে একাধিক নিবন্ধ, অধ্যায় এবং বিশ্বমানের পাঠ্যবই লিখেছেন। তিনি মনস্তাত্ত্বিক-সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে মুগ্ধ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটের (এসএনএস) সাথে মানুষের মিথস্ক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে নিজের তত্ত্বে "আমি" (আমাদের নিজস্ব বিষয়) এবং "আমাকে" (আমাদের সর্বজনীন রূপ) সংজ্ঞায়িত করেছেন। এটি তিনি ২০১৩ সালে প্রকাশিত তার পাঠ্যবইয়ে[৮] তুলে ধরেছেন। আথিকের শুধু এসএনএস-এ নয়, বাস্তব জীবনে মানুষের মিথস্ক্রিয়া এবং ভার্চুয়াল মিথস্ক্রিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের প্রতিও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সমাজতাত্ত্বিকভাবে এটি সমাজে যে প্রভাব ফেলছে তা নিয়েও তিনি আগ্রহী। তথাকথিত নিউ মিডিয়া (এবং এই শব্দের প্রতি তার সমালোচনা) নিয়ে তার আগ্রহ বর্তমান মিডিয়া রূপগুলোর ধ্রুবক অভিসারের সাথে সম্পর্কিত। মানুষ কীভাবে শুধু ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ করেনি, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহারকে আরও বিকশিত করেছে, তার এই পর্যবেক্ষণ বর্তমান সামাজিক রীতিনীতিগুলোর একটি আকর্ষণীয় দিক তুলে ধরে।

রেমন্ড উইলিয়ামস
[সম্পাদনা]রেমন্ড উইলিয়ামস একজন তাত্ত্বিক এবং সমালোচক ছিলেন। তিনি সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তার আগ্রহ এবং লেখালেখি চালিয়েছেন। তিনি নিউ লেফট-এর একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। তিনি সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের সূচনার পথ প্রশস্ত করেছিলেন। তার বই 'টেলিভিশন, টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ফর্ম' (১৯৭৪) মানুষ এবং প্রযুক্তির মধ্যকার ক্ষমতার সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেছে।[৯] উইলিয়ামস প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের বিপরীতে একটি তত্ত্ব হিসেবে সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাই তিনি প্রস্তাব করেছিলেন প্রযুক্তির ওপর মানুষের ক্ষমতা রয়েছে। কারণ সামাজিক গোষ্ঠীতে আগে থেকেই থাকা মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি, ব্যবহৃত এবং অভিযোজিত হয়। তিনি আরও যুক্তি দিয়েছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা এবং উদ্দেশ্য অনুযায়ী একই প্রযুক্তি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারে।
ইতিহাস
[সম্পাদনা]স্ব-উপস্থাপনা
[সম্পাদনা]
প্রাক-ডিজিটাল ইতিহাস
স্ব-উপস্থাপনা হলো আমরা একে অপরকে এবং নিজেদের কীভাবে দেখি। এটি আমাদের যে বিশ্বে বাস করছি তা বুঝতে সাহায্য করে। স্ব-উপস্থাপনা এবং নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে আমরা কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করি তা নতুন কোনো ধারণা নয়, বরং একটি সর্বজনীন চর্চা যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। জিল ওয়াকার রেটবার্গ তার "সিয়িং আওয়ারসেল্ভস থ্রু টেকনোলজি" গবেষণাপত্রে 'প্রাক-ডিজিটাল' ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি যুক্তি দেন অতীতের পদ্ধতিগুলোই বর্তমান ডিজিটাল স্ব-উপস্থাপনার পদ্ধতিতে বিবর্তিত হয়েছে।[১০]
সারা বিশ্বে আবিষ্কৃত প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রগুলো আমাদের আদিম মানুষের জীবনের একটি ঝলক দিয়েছে। তারা যে বিশ্বে বাস করত তা তারা কীভাবে দেখত, তা এই চিত্রগুলো দেখায়। সেখানে বাইসন, সিংহ এবং ঘোড়ার মতো বিশাল প্রাণীর ছবি আঁকা রয়েছে। চিত্রগুলোতে মানুষ খুব কমই দেখা যায়। এগুলো প্রধানত হাতের স্টেনসিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গুহাচিত্রের পেছনের অর্থ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে অনেকে যুক্তি দেন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এগুলো কোনো ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। ধর্মকে নিজস্ব সত্তার একটি সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। আপনার বিশ্বাস এবং রীতিনীতি আপনার কাজ, পোশাক এবং কথা বলাকে প্রভাবিত করে। শেষ পর্যন্ত মানুষ আপনাকে কীভাবে দেখে তা-ও এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
আপনি ফেসবুক প্রোফাইলকে গুহার দেয়ালের মতো দেখতে পারেন যা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে 'আঁকা' হয়েছে। সবাই তাদের ফেসবুক দেয়াল নিজেদের আগ্রহ এবং বিশ্বাস দিয়ে সাজায়। তাদের কার্যকলাপ এবং লক্ষ্যগুলো তাদের দেয়ালে কী থাকবে তা প্রভাবিত করে। 'লাইক' পেতে বা একই ধরনের বিশ্বাস এবং আগ্রহের অধিকারীদের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য তারা এটি করে।
প্রাক-ডিজিটাল সময় থেকে স্ব-উপস্থাপনার মূল উদাহরণ হলো ছোট মূর্তি এবং ভাস্কর্য। যদি আপনি ৩৫,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি নারীর ছোট মূর্তি ভেনাস অব হোল ফেলস-এর আবিষ্কারের দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন কীভাবে শারীরিক কাঠামো উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষক অ্যালান এফ ডিক্সন এবং বার্নাবি জে ডিক্সন তাদের নিবন্ধ "ভেনাস ফিগারিন্স অব ইউরোপিয়ান প্যালিওলিথিক: সিম্বলস অব ফার্টিলিটি অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভনেস?"-এ 'ভেনাস ফিগারিন্স' বা ভেনাসের ছোট মূর্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে যারা এই ছোট মূর্তিগুলো তৈরি করেছেন তাদের ব্যক্তিগত শৈলী এবং পছন্দগুলো এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে 'এটি চ্যালেঞ্জ করা হয় যে এগুলো নারীদের দ্বারা তৈরি হয়ে থাকতে পারে, যারা তাদের নিজস্ব শরীরের প্রতিচ্ছবি তৈরি করছিলেন।' স্ব-উপস্থাপনার এই ধারণাটি আজও ফিল্টার এবং অন্যান্য ক্যামেরা প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দেখা যায়। নারী ও পুরুষরা এমন ছবি তৈরি করতে পারে যা তাদের নিজস্ব শৈলী এবং পছন্দগুলো প্রতিফলিত করে বা এমন কিছু তৈরি করতে পারে যা তারা মনে করে তাদের নিজস্ব শরীরকে তুলে ধরে।
প্রাচীন গ্রিক থিয়েটার-এ ব্যবহৃত মুখোশগুলো দর্শকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এবং অতিরঞ্জিত আবেগ প্রদর্শন করত। এগুলো একজন অভিনেতাকে নিজের পরিচয় গোপন রেখে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দিত। এই প্রাচীন মুখোশগুলোকে আধুনিক সেলফির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ এটি কেবল তাই দেখায় যা সেলফি তোলা ব্যক্তি তার দর্শকদের দেখাতে চান (একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা আবেগ)।
আত্মপ্রতিকৃতি হলো স্ব-উপস্থাপনার আরেকটি উদাহরণ। একে সেলফি এবং ইনস্টাগ্রামের মতো দৃশ্যমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। ফ্রিদা কাহলো (১৯০৭-১৯৫৪) ছিলেন একজন মেক্সিকান চিত্রশিল্পী যিনি তার আত্মপ্রতিকৃতির জন্য পরিচিত ছিলেন। তার দ্য টু ফ্রিদাস (১৯৩৯) নামক চিত্রকর্মে পাশাপাশি বসে থাকা তার নিজের দুটি রূপ দেখা যায়। উভয় রূপেরই হৃদয় অনাবৃত রয়েছে। সাদা পোশাক পরা রূপটি কাঁচি দিয়ে তার হৃদয় কেটে ফেলেছে বলে মনে হয় এবং রক্ত তার পোশাকে গড়িয়ে পড়ছে। অন্য রূপটি উষ্ণ রঙের পোশাক পরে আছে এবং তার হৃদয়টিকে সতেজ লাল রঙের ও শক্তিশালী মনে হচ্ছে। দ্য টু ফ্রিদাস হলো নিজস্ব সত্তার একটি সম্প্রসারণ, ফ্রিদা নিজেকে যেভাবে দেখতেন। বলা হয়ে থাকে চিত্রকর্মটি ভালোবাসাহীন এবং ভালোবাসায় পূর্ণ ফ্রিদাকে তুলে ধরে। অনলাইনে ব্যক্তিরা যেভাবে নিজেদের উপস্থাপন করেন তার সাথে তুলনা করলে বলা যায়, তারা ফ্রিদার মতোই কাজ করছেন। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ছবিগুলো সেই বাস্তবতাকে চিত্রিত করে যা ব্যক্তিরা মানুষকে দেখাতে চান। প্রোফাইল পিকচারগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায় (এগুলো ব্যক্তির বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে)।
প্রযুক্তি
[সম্পাদনা]প্রযুক্তি এবং নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণ সম্পর্কিত ধারণাগুলো আমাদের ডিজিটাল বিশ্বের বহু বছর আগের। ১৯৬০-এর দশক থেকে, ইন্টারনেট বিকাশের অনেক আগে থেকেই, মার্শাল ম্যাকলুহান তার আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া বইয়ে মানুষের সম্প্রসারণ নিয়ে লিখেছিলেন। প্রযুক্তি এবং মানবজাতির একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হওয়ার বিষয়ে ম্যাকলুহান বেশ কয়েকটি মূল ধারণার রূপরেখা দিয়েছেন। ম্যাকলুহান প্রযুক্তির বেশ কয়েকটি দিকের রূপরেখাও দিয়েছেন যা সরাসরি আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাথে সম্পর্কিত। এর মধ্যে চলচ্চিত্র, মোটরগাড়ি এবং টেলিফোনসহ আরও অনেক কিছু রয়েছে।
পরিবহন
[সম্পাদনা]পরিবহন নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণের উপাদানগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবহন মানুষের চলাচলের সীমাবদ্ধতা দূর করে ব্যক্তিকে স্বাধীনতা দেয়। সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে, আক্ষরিক অর্থে বলা যেতে পারে চাকা পায়ের সম্প্রসারণ করে, তাই গাড়িও তা-ই করে। এটি সমসাময়িক সমাজে স্পষ্ট এবং ১৯৬৪ সালে ম্যাকলুহানও বলেছেন মোটরগাড়ি হলো মর্যাদার প্রতীক। গাড়িকে প্রায়শই নিজস্ব সত্তার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। যদিও আজ কেবল একটি গাড়ির মালিক হওয়ার চেয়ে গাড়ির মানের ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয় বলে মনে হয়। ম্যাকলুহান মনে করেন গাড়িকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখাটা ভুল। কারণ তিনি বলেছেন এটি গাড়ি যে সমান সুবিধা দেয় তাকে উপেক্ষা করে। আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়াতে তিনি এই ধারণাটি বর্ণনা করেছেন যে বর্ণ, বয়স বা পটভূমি নির্বিশেষে, গাড়ি আমাদের সবার জন্য একই সম্প্রসারণ প্রদান করে। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হতে পারে যখন ইন্টারনেট সক্ষম ডিভাইসগুলো পাওয়া কঠিন ছিল। তবে যখন এ ধরনের ডিভাইসগুলো আরও বেশি সাধারণ হয়ে উঠেছে, তখন এটি যে স্বাধীনতা দেয় তা মর্যাদার প্রতীকের যেকোনো গুণের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষণীয়।

চলচ্চিত্র
[সম্পাদনা]চলচ্চিত্র প্রযুক্তির বিকাশ বিভিন্ন উপায়ে নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণের চিত্রায়নের সুযোগ দেয়। যুক্তরাজ্যে, প্রথম দিকের সিনেমা হলগুলো বায়োস্কোপ নামে পরিচিত ছিল। এটি গ্রিক শব্দ বায়োস থেকে এসেছে যার অর্থ জীবন। এটি এই ধারণার সাথে সম্পর্কিত যে চলচ্চিত্র জীবনকে ধারণ করে এবং দর্শকদের তার সাথে যুক্ত হতে দেয়। যান্ত্রিক প্রযুক্তি এমন বিষয়বস্তু প্রদান করে যা দেখতে জৈব বা স্বাভাবিক মনে হয়। এর ফলে বাস্তব জীবন এবং জৈব অভিজ্ঞতার সাথে সংযোগ তৈরি হয়। নির্মাতার দিক থেকে, চলচ্চিত্র মনের একটি চিত্রায়ন বা নিজস্ব সত্তার সম্প্রসারণের সুযোগ দেয়। স্ব-সম্প্রসারণের ইতিহাসে চলচ্চিত্র কীভাবে জায়গা করে নিয়েছে তা বুঝতে হলে মুদ্রণ কীভাবে এর সাথে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ তা আমাদের দেখতে হবে। ম্যাকলুহানের মতে, মিগুয়েল দে থের্ভান্তেস (ডন কুইক্সোট-এর রচয়িতা) মুদ্রণকে সেভাবেই দেখতেন যেভাবে আমরা চলচ্চিত্রকে দেখি। সমাজকে এগিয়ে নিতে নতুন প্রযুক্তি নতুন, সহজ এবং আরও আকর্ষণীয় উপায় প্রদান করে পুরনো প্রযুক্তিকে হটিয়ে দেয়। মিডিয়া উল্লেখ করার সময় মার্শাল ম্যাকলুহান "হট এবং কোল্ড" বা "উষ্ণ এবং শীতল" শব্দ ব্যবহার করেন। উষ্ণ মিডিয়া হলো সেগুলো যা সামান্য প্রচেষ্টায় বিপুল পরিমাণ তথ্য পৌঁছে দিয়ে একটি মাত্র ইন্দ্রিয়কে প্রসারিত করে। অন্যদিকে শীতল মিডিয়া হলো সেগুলো যা কম তথ্য পৌঁছে দেয়। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এটি একটি উষ্ণ মাধ্যম। কারণ এটি দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করে এমন অনেক ডেটা সরবরাহ করে যা দর্শকের পক্ষে সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ম্যাকলুহানের চলচ্চিত্রের ওপর কাজের একটি সমালোচনা হলো তিনি চলচ্চিত্র দর্শকদের নিষ্ক্রিয় হিসেবে দেখেন। অ্যানিটে হিল তার ১৯৯৭ সালের বই শকিং এন্টারটেইনমেন্ট: ভিউয়ার রেসপন্স টু ভায়োলেন্ট মুভিজ-এ[১১] একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি মিডিয়ার সহিংসতার প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন। দর্শকরা কীভাবে সহিংসতাকে গ্রহণ করে ও ব্যাখ্যা করে এবং সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তারা কীভাবে সক্রিয় থাকে তা তিনি আলোচনা করেছেন।

যোগাযোগ
[সম্পাদনা]আমাদের বর্তমান সমাজ যেভাবে কাজ করছে তা রূপ দিতে বৈদ্যুতিক যোগাযোগ অত্যন্ত ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। বৈদ্যুতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন মানুষের কথাবার্তাকে এমনভাবে সম্প্রসারিত করেছে যা ডাকব্যবস্থা বা বৈদ্যুতিক নয় এমন যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রায় তাৎক্ষণিক গতিতে করতে পারেনি। একইভাবে বলা যায় ইন্টারনেটের ভিত্তি এই ধরনের যোগাযোগ মাধ্যমগুলো থেকেই এসেছে। কারণ অনলাইন যোগাযোগের প্রথম দিকে, ডায়াল-আপ ইন্টারনেট তথ্য পাঠানোর জন্য টেলিফোন লাইন ব্যবহার করত। ১৯১০ সালে টেলিগ্রাফের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। কারণ এটি ড. হাওলি এইচ ক্রিপেনকে গ্রেপ্তার করতে সাহায্য করেছিল। তিনি একজন মার্কিন চিকিৎসক ছিলেন যিনি বেতার যোগাযোগ সম্পন্ন একটি নৌকায় চড়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আর টেলিফোন বিখ্যাতভাবে ১৮৭৬ সালে আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল আবিষ্কার করেছিলেন। এই প্রযুক্তিগুলো যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছিল তার অর্থ হলো একটি সমাজের একাধিক প্রতিষ্ঠান একে অপরের সাথে কাজ করতে এবং একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারে। এটি সমাজ আগে যেভাবে কাজ করত তা পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাই এটি প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের ধারণাগুলোকে সমর্থন করে। ১৯৬৪ সালে যখন মার্শাল ম্যাকলুহান আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া: দি এক্সটেনশনস অব ম্যান লিখছিলেন, তখন তিনি ভয়েস যোগাযোগ ডিভাইসগুলো যে সম্প্রসারণের সুযোগ দেয় তা নিয়ে কথা বলেছেন। মানুষ কেবল কথা শুনে কীভাবে অন্য ব্যক্তির কার্যকলাপ সম্পর্কে নিজস্ব চিন্তাভাবনা তৈরি করে তা তিনি আলোচনা করেছেন। যেহেতু এটি ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগের কথা, এখন আমরা স্কাইপের মতো পরিষেবাগুলো সম্পর্কে জানি যা আমাদের একই সাথে অন্য ব্যক্তিকে দেখতে এবং শুনতে সাহায্য করে। এটি উষ্ণ মিডিয়ার আগের ধারণাগুলোর সাথে যুক্ত হয় কারণ এখন প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর দিক থেকে কম প্রচেষ্টার দাবি করে।
স্ব-উপস্থাপনার রূপ
[সম্পাদনা]সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
[সম্পাদনা]অনেক মানুষের জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম মানুষকে তাদের ইচ্ছামতো যেকোনো কিছু পোস্ট করার ক্ষমতা দেয় এবং তা বিশ্বের সাথে শেয়ার করার সুযোগ করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুবই ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা হতে পারে। এটি আপনার দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা, ছবি এবং লিংক আপনার বন্ধু ও ফলোয়ারদের সাথে শেয়ার করার সুযোগ দেয়। এই অনলাইন প্রোফাইলগুলো ডায়েরির মতো। তবে অনলাইন ডায়েরিগুলো ডিজিটাল এবং এগুলো কেবল একটি নয় বরং একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। কোনো ব্যবহারকারী ইন্টারনেটে যে তথ্য পোস্ট করেন তা একত্রিত করে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা তৈরি করা হয়। ব্যবহারকারী যদি তার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন তবে এটি বিশেষভাবে ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, ইনস্টাগ্রাম সহজেই ফেসবুকের সাথে যুক্ত করা যায়। ইনস্টাগ্রামে আপলোড করা যেকোনো কিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার ফেসবুক প্রোফাইলে পুনরায় পোস্ট করার একটি বিকল্প এটি অফার করে।
এটি পৃথক ব্যবহারকারীদের অনলাইন ডেটা এবং আপলোডগুলো খুঁজে পাওয়া এবং একত্রিত করা সহজ করে তোলে। এটি কারও জীবন সম্পর্কে একটি গভীর ও বিকশিত রূপ তুলে ধরে, যা সাধারণত কাগজের ডায়েরিতে পাওয়া যায় না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায়শই কারও বাস্তব জীবনের নিখুঁত উপস্থাপনা প্রদান করে না। আমরা যা আপলোড করি তা ফিল্টার এবং সম্পাদনা করার ক্ষমতা দৈনন্দিন জীবনের একটি মিথ্যা চিত্রায়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ফেসবুক
[সম্পাদনা]ফেসবুক হলো সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেটওয়ার্ক। এটি ১.৮ বিলিয়নেরও বেশি মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেয়। এই প্ল্যাটফর্মটি অনলাইনে বন্ধুদের মধ্যে লিংক, ছবি এবং টেক্সট শেয়ার করতে উৎসাহিত করে। এগুলো আপলোড করার সহজ প্রকৃতির কারণে, ব্যবহারকারীদের "দেয়াল" বা টাইমলাইন প্রায়শই এমন জিনিস দিয়ে ভরা থাকে যা তারা আকর্ষণীয় বলে মনে করেন এবং অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটে নিয়মিত পোস্ট করা কীভাবে একটি প্রোফাইল তৈরি করতে পারে এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিত্বকে প্রসারিত করতে পারে তার একটি বিশিষ্ট উদাহরণ হলো ফেসবুক। প্রতিটি পোস্টে টাইমস্ট্যাম্প বা সময় উল্লেখ করা থাকে। ঠিক যেমন একটি কাগজের ডায়েরিতে তারিখ লেখা থাকে। যদিও একজন ব্যবহারকারীর টাইমলাইন ফেসবুক দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। ওয়েবসাইট আপনার পছন্দগুলো গ্রহণ করে এবং সেগুলো আপনার ফিডে প্রদর্শন করে। তবে প্ল্যাটফর্মের অন্য সবকিছু খুব বেশি ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এর মধ্যে অন্য ব্যবহারকারীদের সাথে তথ্য শেয়ার করা অন্তর্ভুক্ত। গোপনীয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অপরিহার্য হলেও, এটি ফেসবুক প্রোফাইলগুলোর প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ তাদের জীবনের কেবল ভালো দিকগুলোই শেয়ার করতে চায়। যেমন বন্ধুদের সাথে রাতের বেলা বাইরে কাটানো সময়, পরীক্ষায় সাফল্য এবং পরিবারের ইতিবাচক খবর। তাই কেবল যা ইচ্ছা তা-ই আপলোড করার এই ক্ষমতা তাদের জীবনের নেতিবাচক জিনিসগুলো, যেমন মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা বা পারিবারিক সংগ্রামগুলো বাদ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে প্ল্যাটফর্মে মানুষের একটি অত্যন্ত ফিল্টার করা বা বাছাই করা উপস্থাপন দেখা যায়। প্রায়শই পোস্টে "লাইক" পাওয়ার বা প্ল্যাটফর্মে ফলোয়ার বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা একে পরিচালিত করে। মানুষ ইতিবাচকতার দিকে আকৃষ্ট হয়। নেতিবাচক বিষয় পোস্ট করা হলে তারা সম্ভবত একজন ব্যবহারকারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট আনফলো করে দেবে।
কাগজের ডায়েরির তুলনায়, ফেসবুক বাস্তব জীবনের অনেক কম বাস্তবসম্মত উপস্থাপন। কাগজের ডায়েরিতে লেখক সাধারণত পুরোপুরি সৎ থাকেন। কারণ তিনি অন্য কাউকে তার তত্ত্বাবধান ছাড়া এটি পড়তে দিতে চান না। যেখানে ফেসবুক অনেকাংশেই একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। আপনি যা পোস্ট করেন তা প্রায় যে কেউ দেখতে পারে। ব্যবহারকারীরা ফেসবুকে যা পোস্ট করেন তার পরিশুদ্ধ প্রকৃতি তাদের আপলোড করা ছবিতেও দেখা যায়, বিশেষ করে তাদের প্রোফাইল পিকচারে। ব্যবহারকারীর প্রোফাইল পিকচার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেখা প্রথম জিনিসগুলোর মধ্যে একটি। এটি করা প্রতিটি পোস্টে, প্রোফাইল পেজে এবং ব্যবহারকারীর করা যেকোনো মন্তব্যে দৃশ্যমান থাকে। এর কারণে ব্যবহারকারীরা প্রায়শই নিজেদের সম্পাদিত ছবি আপলোড করেন। নিজেদের আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মাধ্যমে ছবিগুলো পরিবর্তন করেন। ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীর পছন্দযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য ছবি বিকৃত করার এই চর্চা প্রমাণ করে কেন ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ডিজিটাল জগতের বাইরের কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বাস্তবসম্মত উপস্থাপন হিসেবে বিশ্বাস করা যায় না।
টুইটার
[সম্পাদনা]
টুইটার এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যা ব্যবহারকারীদের ১৪০ অক্ষর পর্যন্ত টেক্সট পোস্ট করতে দেয়। এটি দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা শেয়ার করার জন্য এবং আপনার কাছে আকর্ষণীয় মনে হওয়া ও শেয়ার করতে চাওয়া বিষয়বস্তুর হাইপারলিংক পোস্ট করার জন্য এটি আদর্শ। ফেসবুকের মতো অন্যান্য সাইটের চেয়ে টুইটারে আপনার বর্তমান চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিগুলো দিয়ে প্রতিদিন আপনার প্রোফাইল আপডেট করা প্রায়শই বেশি গ্রহণযোগ্য। এর কারণে টুইটার সাধারণত তাদের বেশি আকৃষ্ট করে যারা তাদের অনলাইন প্রোফাইলগুলো নিয়ে বেশি উন্মুক্ত এবং অন্যদের সাথে তাদের ব্যক্তিত্ব শেয়ার করতে পছন্দ করেন। টুইটারে আপনার জীবনের খুঁটিনাটি বিবরণ শেয়ার করার এই গ্রহণযোগ্যতা একে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ডায়েরির মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। তবে এই অভিজ্ঞতায় ছবি এবং ভিডিও আপলোডিংও বিদ্যমান রয়েছে। আগের পোস্টগুলো ফিরে দেখার ক্ষমতা টুইটারের প্রচলিত ডায়েরি ফরম্যাটের সাথে আরেকটি মিল। এটি ব্যবহারকারীদের সময়ের সাথে তাদের নিজস্ব বৃদ্ধি দেখতে সাহায্য করে। টুইটারে পোস্টগুলোর নিয়মিত প্রকৃতি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্বকে আরও গভীরভাবে ফুটে ওঠার সুযোগ করে দেয়, যা সাধারণত ফেসবুকের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে পাওয়া যায় না।
এর একটি উদাহরণ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর টুইটার অ্যাকাউন্ট। সেখানে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থান সম্পর্কে পোস্ট করেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় মাধ্যম। এটি ইতিবাচক কারণ টুইটার একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম। এটি যে কাউকে তার প্রোফাইল খুঁজে বের করতে এবং তার বর্তমান এজেন্ডা সম্পর্কে জানতে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত অকার্যকর প্ল্যাটফর্মও। কারণ ১৪০ অক্ষরের সীমাবদ্ধতা ট্রাম্পের টুইট করার বিস্তারিত বলার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেয়। এর ফলে প্রায়শই টুইটগুলোর একাধিক ব্যাখ্যা তৈরি হয়, যা ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা কঠিন করে তোলে। প্ল্যাটফর্মটির তাৎক্ষণিকতা এবং ব্যবহারের সহজতার মানে হলো ট্রাম্প যেকোনো মুহূর্তে তার মনে আসা যেকোনো চিন্তাভাবনা পোস্ট করতে সক্ষম। সাহসিকতার এই ডিজিটালাইজড মুহূর্তগুলো দেখায় কীভাবে টুইটার ব্যবহারকারীদের তাদের ব্যক্তিত্বকে একটি অনলাইন স্পেসে প্রসারিত করার প্ল্যাটফর্ম দেয়।
ইনস্টাগ্রাম
[সম্পাদনা]ইনস্টাগ্রাম হলো একটি ছবি-কেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যা ব্যবহারকারীদের ছবি পোস্ট ও সম্পাদনা করতে দেয়। প্ল্যাটফর্মটি আধুনিক ডিজিটাল ফটো অ্যালবামের মতো কাজ করে। এটি ব্যবহারকারীদের ছবিতে ট্যাগ এবং লোকেশন যোগ করে তাদের ছবিগুলো শ্রেণিবদ্ধ করতে দেয়। অ্যাপটি আপলোড করা ছবিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যোগ করে, যেমন ছবি তোলার সময় ব্যবহৃত ক্যামেরা সেটিংস। যদিও এই তথ্য খুব বেশি নয়, তবে এটি অনলাইন পরিচয়ের সামগ্রিক ছবির আরেকটি অংশ প্রদান করে। ইনস্টাগ্রাম অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ হলো একটি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে আপলোড করা ছবি সম্পাদনা করার ক্ষমতা। এই এডিটর ইমেজের কনট্রাস্ট এবং স্যাচুরেশন সামঞ্জস্য করার মতো অনেক শক্তিশালী ফাংশন অফার করে। তবে এডিটরের প্রধান আকর্ষণ হলো ফিল্টার যোগ করার বিকল্প। এই ফিল্টারগুলো ছবির সামগ্রিক টোন পরিবর্তন করে, প্রায়শই ছবির ত্রুটিগুলো ঢেকে দেয়। অনেক ব্যবহারকারী সাধারণত যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, এটি তারই প্রতিচ্ছবি। তারা তাদের প্রোফাইল পিকচার এবং আপলোড করা অন্যান্য ছবিতে ছবির ফিল্টার ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। একই সাথে তারা অন্য মানুষের সাথে যে তথ্য শেয়ার করতে চান না তা ফিল্টার করে বাদ দেন।
এরিকা ডি'অ্যামিকোর গবেষণাপত্র "দি এলিমেন্টস অব লিবিডিনাল ইকোনমি ইন ইনস্টাগ্রাম: আ নিউ ওনটোলজিকাল স্ট্যাটাস অব ফটোগ্রাফি" ব্যবহারকারীরা কীভাবে তাদের অনলাইন প্রোফাইল এবং ছবির মাধ্যমে তাদের সম্পদ উপস্থাপন করেন সে সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। গবেষণাপত্রটি যুক্তি দেয় যখন আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটগুলোতে ছবি আপলোড করেন, তখন এটি অন্য মানুষদের আপনার অভিজ্ঞতাগুলোর স্বাদ নেওয়ার সুযোগ দেয়। যদিও তা একটি দ্বিমাত্রিক, বেছে নেওয়া মাধ্যমের মধ্য দিয়ে হয়। ইনস্টাগ্রামে ছবি আপলোড করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে, আপনি আপনার বাস্তব জীবনকে অন্যদের যাচাই-বাছাই ও বিচারের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এটি প্রায়শই মানুষকে তাদের দামি জিনিসপত্র বা তারা জড়িত ছিলেন এমন রোমাঞ্চকর ইভেন্টের ছবি পোস্ট করার দিকে পরিচালিত করে। ইনস্টাগ্রামে প্রায় যেকোনো কিছুর ছবি পোস্ট করার ক্ষমতা "দ্য রিচ কিডস অব ইনস্টাগ্রাম" ঘটনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি এটি নিয়ে একটি চ্যানেল ৪ ডকুমেন্টারিও তৈরি হয়েছে। এই মানুষেরা ইনস্টাগ্রামকে তাদের অহংকার করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা নিয়মিত তাদের সম্পদের ছবি শেয়ার করেন। তারা কেবল দৃশ্যমানভাবেই তাদের সম্পদ প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন তা নয়, বরং একটি অনলাইন পরিবেশেও তাদের এই প্রদর্শন প্রসারিত করেন।

এআই-এর প্রতি অবিশ্বাস অনেক প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের পণ্যের জন্য 'এআই' তৈরি করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে মাইক্রোসফট এবং অ্যাপল যথাক্রমে সেরা উদাহরণ। যদিও (এখানে উদাহরণ হিসেবে ২০০৬ সালের ল্যানিয়ারের এজ নিবন্ধটি[১২] ব্যবহার করে) কিছু তাত্ত্বিক পরামর্শ দিয়েছেন ইন্টারনেটে সত্যিকারের এআই-এর অস্তিত্ব রয়েছে। প্রতিটি ওয়েবসাইটের থাকা সম্প্রদায়গুলোর কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। আমরা দেখতে পারি কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটগুলোতে, যেমন টুইটারে, এআই বিভিন্ন মাত্রায় সাফল্যের সাথে পরীক্ষা করা হয়েছে। ল্যানিয়ারের নিবন্ধ থেকে[১৩] যারা এমনটি মনে করেন তাদের উদাহরণ হলো জর্জ ডাইসন। তিনি অনুমান করেন ইন্টারনেটে আগে থেকেই একটি এআই বিদ্যমান রয়েছে। ল্যারি পেজ পরামর্শ দেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে (২০০৬ সাল থেকে) ইন্টারনেটে একটি সত্যিকারের এআই আবির্ভূত হবে।
ল্যানিয়ার এটি প্রত্যাশা করার বিপদও তুলে ধরেছেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেছেন,[১৪] "ব্যক্তিগত মানুষের বুদ্ধির প্রতি আমাদের প্রত্যাশা কমিয়ে আনা কতটা অকালপক্ব এবং বিপজ্জনক।" কেউ যুক্তি দিতে পারে এটি এই বলে খণ্ডন করা যায় যে এআই তৈরি করার জন্যই মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন।
সংবাদপত্রের পতন

যুক্তি দেওয়া যেতে পারে সংবাদপত্রের পতন পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরি হওয়ার পর থেকে একটি স্বাভাবিক বিবর্তন। আসলে, কেউ বলতে পারে আমরা সংবাদপত্র বলতে যা বুঝি তা ছাপাখানা আবিষ্কারের ফল এবং টেক্সটের মাধ্যমে তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি তারও কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই ছিল। এটি উল্লেখ করা উচিত গুগল নিউজের মতো 'সংবাদ' ওয়েবসাইটগুলো সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রচলিত ওয়েবসাইটগুলোর তুলনায় বেশি অর্থায়িত এবং নিরাপদ বলে বলা হয়। এভাবেই বিষয়টি উঠে আসে "...বিষয়বস্তু নির্মাতাদের জন্য নতুন ব্যবসায়িক মডেলের প্রশ্ন..."[১৫]
তবে, তার নিবন্ধের একই অংশে ল্যানিয়ার এ-ও বলেছেন ব্লগিং মানেই লেখা নয়। কারণ লেখার জন্য সময় প্রয়োজন। এই বিষয়টির সাথে একমত হওয়া যেতে পারে। কারণ ব্লগ, ভ্লগ এবং যেকোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। এটি ইন্টারনেটে কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় তথ্য বিদ্যমান থাকে সে সম্পর্কে ল্যানিয়ারের আগের উদ্ধৃতির সাথে সম্পর্কিত। যেখানে 'আসল' লেখার জন্য কিছু পরিমাণ গবেষণা প্রয়োজন হয়।
একদিকে যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যদি বেশিরভাগ সংবাদ যেভাবে পরিবেশিত হয় ব্লগগুলোও সেভাবে চলত, তবে বিশ্ব বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। ল্যানিয়ার ব্যাখ্যা করেছেন তৎকালীন বিষয়াদি এই পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কারণ "...সব মেটা জিনিসের একটি কৃত্রিম উত্থান... আমেরিকায় কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে"[১৬]। এর একটি উদাহরণ হতে পারে কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু রাজনীতিবিদের এখন 'জনগণের সাথে আরও ভালোভাবে যোগাযোগ করতে' নিজস্ব অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে। বা কীভাবে কিছু জিনিস পপ-সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়, যেমন মিম। ব্লগিং এবং 'আসল' লেখার মধ্যকার পার্থক্যের একটি উদাহরণ জ্যারন ল্যানিয়ারের কথায় দেখা যায়। তিনি বলেছেন, "আমি আগের চেয়ে অনেক কম বলছি এবং করছি... আমি এখনো একই পরিমাণ অর্থ পাচ্ছি।"[১৭]
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি
[সম্পাদনা]প্রযুক্তি বছরের পর বছর ধরে বিকশিত হচ্ছে এবং প্রতিদিন তা অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই বা না চাই এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, গত কয়েক বছরে মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের ব্যবহার বিরল হওয়ার চেয়ে বেশি সাধারণ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের বিকাশের প্রভাব আমাদের জীবনের বিভিন্ন দিকেও পড়ে। যেমন শিক্ষার ক্ষেত্রে, যেখানে ক্লাস নেওয়ার জন্য ল্যাপটপের ওপর নির্ভর করা হয়। নতুন নতুন উন্নতির সাথে সাথে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি অব্যাহত রয়েছে বলে মনে হয়, তা হলো যে বয়সে প্রযুক্তি কারও জীবনের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়। আজকাল বেশিরভাগ শিশুই প্রযুক্তিকে তাদের জীবনের একটি মূল অংশ হিসেবে নিয়ে বেড়ে উঠছে। আর এখন যে সমস্ত অব্যাহত উন্নয়ন ঘটছে, তাতে মনে হয় না এটি শিগগিরই কোনো সময় পরিবর্তিত হবে।
গত কয়েক বছরে অনেক আকর্ষণীয় নতুন উন্নতি ঘটেছে যা আমাদের 'নিজস্ব সত্তা'র অনুভূতি কীভাবে বজায় রাখতে পারি তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তা 'অনলাইন' অর্থেই হোক বা 'বাস্তব জীবনে'।
স্মার্ট ঘড়ি
[সম্পাদনা]
স্মার্ট ঘড়ি অনেক কোম্পানির জন্য তাদের মোবাইল প্রযুক্তিতে উদ্ভাবন আনার ক্ষেত্রে পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ধারাবাহিকভাবে তাদের মোবাইল ফোনের উন্নয়ন করার পাশাপাশি, বেশিরভাগ কোম্পানি এখন স্মার্ট ঘড়িও রিলিজ করছে। এগুলো মূলত মোবাইল ফোনের সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে।
স্মার্ট ঘড়ির বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্য আজকালকার বেশিরভাগ স্মার্টফোনের মতোই। উদাহরণস্বরূপ, ঘড়িটিও আপনাকে কল করতে, আবহাওয়া দেখতে, আপনার সেভ করা ছবিগুলো দেখতে (খুব সম্ভবত অন্য ডিভাইস থেকে স্থানান্তরিত) এবং মানুষকে বার্তা পাঠাতে দেবে। যদিও বেশিরভাগ মানুষ প্রায় সব জায়গায় তাদের ফোন সাথে নিয়ে যায়, তবে স্মার্ট ঘড়ি প্রযুক্তি এবং মানব শরীরকে আগের চেয়ে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। মানুষ সবসময় অন্যদের 'মোবাইল ফোনে আঠার মতো লেগে থাকা' নিয়ে কথা বলে। তবে স্মার্ট ঘড়ির ক্ষেত্রে এই কথাটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সত্য হয়েছে। দুটি ডিভাইসের মধ্যকার মিলগুলো মূলত দেখায় কীভাবে স্মার্ট ঘড়ি ফোনের একটি ছোট সংস্করণে পরিণত হয়েছে যা আক্ষরিক অর্থেই সবসময় আপনার সাথে সংযুক্ত থাকে। এটি এ-ও দেখায় প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠছে। ঘড়ির মতো একটি জিনিস এখন আরও বেশি ফোনের মতো কাজ করার জন্য 'আধুনিকীকরণ' করা হয়েছে। এটি প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশকে তুলে ধরে।
ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি)
[সম্পাদনা]
যদিও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী সবসময়ই বেশ পরিচিত ছিল, তবে গত কয়েক বছরেই এটি বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক বাজারে সঠিকভাবে একীভূত হতে শুরু করেছে। স্যামসাং হলো সেই কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি যারা এখন তাদের ফোনগুলোর সাথে ভিআর হেডসেট দিচ্ছে (যা মাত্র কয়েক বছর আগে অকল্পনীয় ছিল)। সনি নিজস্ব ভিআর হেডসেট তৈরি করে এবং তাদের প্লেস্টেশন ৪-এর নতুন মডেলের সাথে দিয়ে এই প্রোগ্রামের পুরো সুবিধা নিয়েছে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো এটি কীভাবে একাধিক ভিন্ন উপায়ে কাজ করতে পারে। এটি কিছু ক্ষেত্রে আমাদের 'জীবনের কাছাকাছি' নিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে। এটি এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে (যেমন পানির নিচে হাঙরের আক্রমণের শিকার হওয়া) যা আমরা খুব কমই দেখতে পেতাম, তবে এগুলোকে যতটা সম্ভব 'বাস্তবসম্মত' করে তোলে। তবে প্রযুক্তির ক্ষমতার ব্যাপ্তি এটিকে বাস্তবতার ক্ষেত্রে বিপরীত দিকে যাওয়ারও সুযোগ দেয়। এটি একপ্রকার পলায়নের পথ দিতে পারে। মূলত এটি এমন সব জগতের প্রবেশদ্বার যার কোনো অস্তিত্ব নেই। তবুও আমরা সেগুলোর ভেতরে 'বাস্তব' অনুভব করতে পারি।
মূল তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান প্রায়শই বলতেন কীভাবে মিডিয়া আমাদের সংবেদনশীল সম্প্রসারণ প্রদান করার ক্ষমতা রাখে। যা আমাদের নিজেদের এবং একে অপরের সাথে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা রাখে। এর দ্বারা তিনি কী বুঝিয়েছেন তা ব্যাখ্যা করতে তিনি প্রায়শই উদাহরণ ব্যবহার করতেন। যেমন যানবাহন কীভাবে আমাদের পা প্রসারিত করতে পারে, যা আমাদের অনেক দ্রুত দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণের ক্ষমতা প্রদান করে। তিনি মূলত মনে করতেন সমস্ত নতুন প্রযুক্তি মানবদেহের একটি নির্দিষ্ট অংশের প্রতিফলন ঘটায়। তাই কোনো না কোনোভাবে আমাদের সেই শারীরিক অংশের একটি উন্নত সংস্করণ প্রদান করে। তাই প্রযুক্তি মানুষের সাথে অন্তর্নিহিতভাবে জড়িত। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির দিকে তাকালে মনে হয় এটি সামগ্রিকভাবে মানবদেহের সম্ভাবনাগুলোকে প্রসারিত করে। বর্তমানে পুরো শরীরের সংবেদনশীল অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করার ক্ষেত্রে এটি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কাছাকাছি কোনো বিষয়। প্রযুক্তি আমাদের সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে সক্ষম। তাই অন্বেষণ করার জন্য শরীরকে একটি সম্পূর্ণ নতুন 'জগৎ' উপহার দেয়।
পার্সোনাল ট্র্যাকার
[সম্পাদনা]
পার্সোনাল ট্র্যাকার হলো উন্নয়নশীল প্রযুক্তির আরেকটি রূপ যা বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতাকে প্রসারিত করে। এদের প্রধান ব্যবহার হলো মানুষ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করতে সক্ষম হওয়া। অথবা, যদি আপনি নিজের ওপর এটি ব্যবহার করেন, তবে যারা সফটওয়্যারটি সম্পর্কে সচেতন তারা যেকোনো মুহূর্তে আপনি কোথায় আছেন তা খুঁজে বের করতে পারবে। যদিও আপনি জিপিএস ট্র্যাকার আলাদাভাবে কিনতে পারেন। তবে আইওএস-এ 'ফাইন্ড মাই ফ্রেন্ডস'-এর মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারকারীদের তাদের বন্ধুরা কোথায় আছে তা দেখতে দেয়, যদি উভয়ের ফোনেই সঠিক সেটিংস চালু থাকে।
এই নতুন প্রযুক্তির অনেক ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ তাদের সন্তানদের সাথে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যাতে তারা তাদের নিরাপদ রাখতে সব সময় তারা কোথায় আছে তা জানতে পারে। এটি বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের শারীরিকভাবে তাদের সাথে না থাকলেও সুরক্ষিত রাখার সুযোগ দেয়। এর নেতিবাচক দিক হলো মানুষ কাউকে অনুসরণ করতে বা সম্মতি না নিয়ে নজর রাখতে এই ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তির প্রভাব যা-ই হোক না কেন, এটি মূলত বিশ্বের মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দেয়। যখনই ইচ্ছা হয় আমরা আর সবসময় মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে পারি না। আমাদের মোবাইল ফোনে এই সফটওয়্যারের বাস্তবায়ন বিবেচনা করলে, কেউ শারীরিকভাবে আপনার থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন সে কোথায় আছে তা জানা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ।
ব্লগ/অনলাইন ডায়েরি
[সম্পাদনা]অনলাইনে আপনার পরিচয় প্রকাশ করার আরেকটি রূপ হলো ব্লগ এবং অনলাইন ডায়েরি। মানুষ এগুলো ছবি পোস্ট করার জন্য ততটা ব্যবহার করে না, যতটা তাদের অনুভূতি, চিন্তাভাবনা, এমনকি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে ব্যবহার করে। কিছু মানুষ কেবল তাদের জীবন নিয়ে লেখে। আজকাল এমন ব্লগের সংখ্যা বাড়ছে যেখানে মানুষ তাদের সমস্যা বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা শেয়ার করে। এমন কিছু ব্লগ রয়েছে যেখানে মানুষ বিষণ্নতা, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি এমনকি উদ্বেগের সমস্যার সাথে তাদের লড়াই বর্ণনা করে। এই ব্লগগুলো প্রায়শই এমন লোকেরা তৈরি করেন যারা আরও মানুষকে সাহায্য করার জন্য তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সবসময় এই সমালোচনা থাকতে পারে যে কিছু মানুষ কেবল মনোযোগ পাওয়ার জন্য বা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার জন্য এটি করে। কিছু মানুষ নিজেদের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্লগ ব্যবহার করে। ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো পার হতে, তাদের চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করতে তারা এটি ব্যবহার করে, যদিও এটি একটি সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম। মানুষ যদি অনেক ফলোয়ার থাকে এবং মানুষের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকে তবে ব্লগ থাকার জন্য এবং নির্দিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্যও তাদের অর্থ প্রদান করা হয়। অনলাইন ডায়েরি লেখালেখির একটি বেশি ব্যক্তিগত রূপ। কারণ এর সাথে ইন্টারনেটে মানুষের অন্তরঙ্গ চিন্তাভাবনা শেয়ার করার বিষয়টি জড়িত। মানুষ এর মিথস্ক্রিয়ামূলক ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে মানুষ একই ধরনের অভিজ্ঞতা হলে মন্তব্য করতে এবং শেয়ার করতে পারে। ব্লগাররা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পেতে পারে। মানুষ যদি তাদের পরিচয় শেয়ার করার বিষয়ে নিশ্চিত না হয় তবে এটি বেনামিও হতে পারে। তবে কিছু মানুষ যদি তারা কে তা মানুষকে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তবে তাদের পরিচয় দেখাতে পারে। তবে, আজকাল মানুষ ব্লগ বা অনলাইন ডায়েরি তেমন ব্যবহার করে না। ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুক সেগুলোর জায়গা দখল করেছে। মনে হয় মানুষ এটি নিয়ে লেখার চেয়ে ছবি দিয়ে তাদের জীবন শেয়ার করতে বেশি আগ্রহী।
ওয়ার্ডপ্রেস
[সম্পাদনা]
ওয়ার্ডপ্রেস হলো ওয়েবসাইট তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত একটি ওয়েবসাইট। এটি অনেক বিখ্যাত ব্লগ, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের ব্লগের মতো সংবাদ ওয়েবসাইট, মিউজিট আউটলেট এবং গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে।
মানুষ এটি এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে ব্যবহার করে যা তাদের ব্যবসার জন্য দরকারী হবে। অথবা এমনকি ইন্টারনেটে একটি ছাপ তৈরি করতে এবং তাদের ব্লগের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থাপন করতে এটি ব্যবহার করে।
গেমিং
[সম্পাদনা]আজকাল কোনো না কোনো গেমিং প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমাদের ফোনে ছোট টাচ-ভিত্তিক অ্যাপ খেলা থেকে শুরু করে অনলাইনে এবং বিভিন্ন সম্মেলনে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া পর্যন্ত, গেমিং অনেক মানুষের প্রযুক্তির সাথে মিথস্ক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভার্চুয়াল মহাবিশ্বে একটি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো চরিত্র হিসেবে খেলতে অন্য জগতে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা লক্ষ লক্ষ খেলোয়াড়ের জন্য বিনোদন এবং প্রায়শই শিথিল হওয়ার একটি মাধ্যম। একটি সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও একটি আকর্ষণীয় দিক। এটি ভিডিও গেমের ব্যবহারকারীদের কেবল অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে মানুষ হিসেবে যোগাযোগ করতেই দেয় না, বরং সহযোগী গেমারদের মধ্যে একতা বোধ তৈরি করতেও সাহায্য করে।
প্ল্যাটফর্ম
[সম্পাদনা]স্টিম
পিসিতে প্রধান গেমিং প্ল্যাটফর্ম হলো স্টিম। এটি ভালভ দ্বারা তৈরি একটি গেম ক্লায়েন্ট এবং স্টোর। প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীর প্রোফাইল এবং স্টোর উভয়েরই ব্যাপক কাস্টমাইজেশনের সুযোগ দেয়। এটি ব্যবহারকারীদের গেমিং জগতে তাদের ব্যক্তিত্বকে প্রসারিত করার ক্ষমতা দেয়। স্টিম প্রোফাইল পিকচার আপলোড করার ক্ষমতা দেয়। ভালভের দেওয়া আগে থেকে ইনস্টল করা স্টক ছবি থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীর আপলোড করা ছবি পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি রয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আপনার প্রোফাইলের ছবিটি অন্যান্য ব্যবহারকারীরা আপনার অ্যাকাউন্ট পেজে আসার সময় প্রথম দেখা জিনিসগুলোর মধ্যে একটি। স্টিম ব্যবহারকারীদের তাদের প্রোফাইলে ছবি, ভিডিও এবং টেক্সট আপলোড করার সুযোগও দেয়। অনেক ব্যবহারকারী তাদের গেমিং সেটআপ এবং প্রিয় গেমের স্ক্রিনশট অন্তর্ভুক্ত করতে পছন্দ করেন। কাস্টমাইজেশনের এই স্তরটি স্টিম ব্যবহারকারীকে ডিজিটাল গেমিং জগতে তার ব্যক্তিত্ব প্রসারিত করার সুযোগ দেয়।
স্টিমের আরেকটি দিক হলো এর যোগাযোগের সুবিধা। কাউন্টার স্ট্রাইক: গ্লোবাল অফেন্সিভ-এর মতো অনেক গেমে খেলোয়াড়রা ভয়েস চ্যাট এবং টেক্সট চ্যাট উভয়ের মাধ্যমেই যোগাযোগ করে। স্টিম ব্যবহারকারীদের তাদের প্রোফাইল ব্যক্তিগত করার সুযোগ দেয়। এর মানে হলো অন্য লোকেরা তাদের অ্যাকাউন্টে আপলোড করা তথ্য দেখতে পারবে না। স্টিম যে বেনামি থাকার সুবিধা দেয় তা খেলোয়াড়দের মধ্যে অত্যন্ত বৈরী মিথস্ক্রিয়া তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যখন গেমগুলো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। এই ভয়েস চ্যাট প্ল্যাটফর্ম প্রায়শই মানুষের সবচেয়ে খারাপ দিকটি বের করে আনে। এর মধ্যে আক্রমণাত্মক ভাষা এবং গালাগাল অন্যতম প্রধান সমস্যা। তবে এটি দলের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত দরকারী হতে পারে এবং প্রায়শই গেমের আনন্দ বাড়িয়ে তুলতে পারে। যারা অনলাইন মিথস্ক্রিয়ায় অমায়িক তাদের এটি ভয়েস যোগাযোগের সুবিধা দেয়। যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক জিনিসের মতো এখানেও প্রায়শই আবেগ প্রবল থাকে। এটি মানুষের এমন একটি দিক বের করে আনে যা সচরাচর দেখা যায় না। কোনো অনলাইন গেম হারার সময় মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা প্রায়শই বাস্তব জীবনে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিত্বের একটি শক্তিশালী নির্দেশক।
পিএসএন (প্লেস্টেশন নেটওয়ার্ক)
সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও গেম কনসোলগুলোর মধ্যে একটি হলো প্লেস্টেশন। বহু বছর ধরে উন্নয়ন এবং বিবর্তনের পর - মূল প্লেস্টেশন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কনসোলটির সবচেয়ে সাম্প্রতিক সংস্করণ প্লেস্টেশন ৪ পর্যন্ত - এই কনসোলটি এখন কেবল ব্যক্তিগত গেমিংয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই কাজ করে না, বরং ব্যবহারকারীকে একটি সম্প্রদায়ও প্রদান করে। অন্যান্য অনেক ভিডিও গেম প্ল্যাটফর্মের মতো পিএসএন ব্যবহারকারীকে একটি অবতার, একটি ছদ্মনাম এবং একটি ব্যাকগ্রাউন্ড (স্ক্রিনে) বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। এই সমস্ত পছন্দগুলো কাস্টমাইজযোগ্য। এটি পিএসএন-কে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে যা প্রতিটি ব্যবহারকারীকে স্ব-উপস্থাপনার জন্য অনেক জায়গা দেয়। প্রতিটি ব্যবহারকারী তাদের ইচ্ছামতো বেনামি বা সর্বজনীন থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটগুলোর মতো তথ্য এবং গেমিং ইতিহাস (ট্রফির আকারে) শেয়ার করার বিকল্পও রয়েছে।
যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, পিএসএন-এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সম্প্রদায়। অনেক গেমার যারা নিয়মিত খেলেন তারা নিজেদের এই সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারা সমমনা ব্যক্তিদের একটি দল, যারা ভিডিও গেমের প্রতি তাদের ভাগ করা আগ্রহের মাধ্যমে কথা বলতে এবং একতা বোধ করতে পারে। হেডফোন এবং মাইক্রোফোনের মাধ্যমে, পিএসএন ব্যবহারকারীদের (অনলাইনে খেলার সময়) তাদের সাথে যোগাযোগ করতে দেয় যারা তাদের মতো একই গেম খেলছে - এবং ফলস্বরূপ একই লবিতে আছে - অথবা যদি ব্যক্তি অন্য কোনো খেলোয়াড়ের বন্ধু হয়। স্ব-উপস্থাপনার এই রূপটি গেমারদের কেবল তাদের অবতার এবং বেছে নেওয়া স্ক্রিন নাম দ্বারাই নয় বরং তাদের ভয়েস দ্বারাও বিচার না করার সুযোগ দেয়। এটি যুক্তিসঙ্গতভাবেই ভিডিও গেমিংকে প্রযুক্তির সাথে আরও মানবতাবাদী সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায়। পিএসএন-এর ইউজার ফেস পরিচালনা করা এবং ব্যক্তিগত রাখা অবিশ্বাস্যভাবে সহজ। এটি প্রতিটি খেলোয়াড়কে তাদের ব্যক্তিগত স্থান এবং ফলস্বরূপ অন্যদের দ্বারা দেখা স্থান সম্পূর্ণভাবে কাস্টমাইজ করার সুযোগ দেয়।
এক্সবক্স লাইভ

এক্সবক্স হলো মূলধারায় পরিণত হওয়া একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উদাহরণ। অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে এর এই কুখ্যাতি ম্লান হয়ে যায় এটি তারও উদাহরণ। এই কুখ্যাতির একটি উদাহরণ হলো "এক্সবক্স" শব্দটি কীভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে যেকোনো কিছু বোঝাতে পারে। আজ মূলধারার সংস্কৃতিতে এটি গেমিংয়ের সমার্থক হয়ে উঠেছে। তবে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে এক্সবক্স লাইভ-এর পেছনের পুরো গল্পটি বাস্তব জগতের প্রতিনিধিত্ব করে। যা নিয়ে ল্যানিয়ার[১৮] বলেছেন "এই বিভ্রম যে আমাদের কাছে যা আছে তা যথেষ্ট ভালো হওয়ার কাছাকাছি..." কারণ প্ল্যাটফর্মটি এরই মধ্যে বিস্মৃতিতে হারিয়ে গেছে। এটি দেখায় গেমিং সংস্কৃতি কীভাবে মূলধারার সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। পিউডিপাই-এর উদাহরণটি দেখুন। এক্সবক্স লাইভ-এর উদাহরণ দেখায় সামগ্রিকভাবে ইন্টারনেট সংস্কৃতি আজ কীভাবে মূলধারার সংস্কৃতির দ্বারা গৃহীত হয়েছে। এটি কীভাবে সম্ভব তা দেখতে আপনাকে ফেসবুক-এর উদাহরণের বাইরে আর তাকাতে হবে না। এটি তার কাঠামোর মধ্যে থাকা সমস্ত আলাদা আলাদা গোষ্ঠীর সাথে মিলে কীভাবে কাজ করে এবং এটি মূলত আজকালকার থাকার জায়গা হয়ে উঠেছে।
পরিচয় এবং সনাক্তকরণ
[সম্পাদনা]ভিডিও গেমের বিপুল জনপ্রিয়তা এবং খেলোয়াড়ের অফলাইন জীবনের ওপর তাদের প্রভাব থেকে বোঝা যায় যে এগুলোকে কেবল পলায়নের পথ এবং সময় কাটানোর উপায়ের চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে দেখা উচিত। ম্যাকগোনিগাল (২০১০)-এর মতে, সারা বিশ্বের মানুষ প্রতি সপ্তাহে তিন বিলিয়ন ঘণ্টা গেম খেলে[১৯]। তাই একজন সাধারণ খেলোয়াড় প্রতি সপ্তাহে ১৩ ঘণ্টা ভিডিও গেমে ব্যয় করে, অন্য জগতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করে। সাইবারস্পেস খেলোয়াড়ের পরিচয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্বেষণ করার জন্য নিরাপদ পরিবেশ প্রদান করে। তাই ভিডিও গেমগুলোকে পরিচয় গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ এগুলো গেমারকে পরিচয় পুনরায় ধারণা করতে সাহায্য করে। ভিডিও গেমে পরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া বুঝতে 'সাইবর্গ' ধারণাটি অন্বেষণ করা দরকার। খেলোয়াড় সেই পরিচয় পালনে যে চরিত্র সনাক্তকরণ ব্যবহার করে তা বোঝাও দরকার। সাইবর্গ হলো এমন একজন ব্যক্তি যার ক্ষমতা শরীরের অংশগুলোকে যান্ত্রিক অংশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে এটি বলাই যায় যে আমরা সবাই তারহীন প্রযুক্তিগত ডিভাইসের সর্বত্র উপস্থিত সঙ্গ নিয়ে সাইবর্গে পরিণত হয়েছি। আমরা এগুলো সব জায়গায় বহন করি। মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যকার রেখাটি অস্পষ্ট। ভিডিও গেমে, খেলোয়াড়রা আক্ষরিক অর্থেই যন্ত্রে পরিণত হয়, অবতারে পরিণত হয়। বিশ্বের চারপাশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে, পরিচয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ অসীম। খেলোয়াড় নারী বা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে। সে অফলাইনের চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক বা অনেক বেশি তরুণ, অনেক বেশি বা কম দৃশ্যমানভাবে আকর্ষণীয়, শক্তিশালী, সাহসী, আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারে। মজার বিষয় হলো, 'অবতার হিসেবে খেলার মাধ্যমে আমরা সবচেয়ে প্রকাশ্য উপায়ে নিজেদেরই তুলে ধরি' ([২০])।
সিমস অনলাইন বা সেকেন্ড লাইফে আমাদের অবতার তৈরি করার সময় আমরা কাঙ্ক্ষিত শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো বেছে নিতে পারি। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিত্বও তৈরি করতে পারি। বাস্তব জীবনে লাজুক এবং সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর হওয়ার পরও, আমরা একটি আত্মবিশ্বাসী পার্টি অ্যানিম্যালে পরিণত হতে পারি এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজস্ব সত্তার এই নতুন ধারণাটি চেষ্টা করতে পারি। এটি করার মাধ্যমে এমন হতে পারে যে আমরা এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের অফলাইন জীবনে স্থানান্তর করি। গেমে 'নতুন সত্তা' তৈরি করা খেলোয়াড়কে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, উদ্বেগ এবং ট্রমা মোকাবিলা করতেও সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রান্সজেন্ডার মানুষ গেমে কাঙ্ক্ষিত লিঙ্গ ব্যবহার করার পর জনসমক্ষে আসার বিষয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে পারে। শেরি টার্কলের মতে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার জন্য অনলাইন জীবন ব্যবহার করার দুটি উপায় রয়েছে। আমরা আমাদের বাস্তব জীবন থেকে সংঘাতগুলো নিয়ে এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে সেগুলো বারবার প্রকাশ করে 'অ্যাক্ট আউট' বা অভিনয় করতে পারি ([২১])। তবে আমরা আরও উৎপাদনশীল সমাধান বেছে নিতে পারি, 'ওয়ার্ক থ্রু' বা সমাধান করতে পারি। তাই নতুন সমাধান খোঁজার জন্য বাস্তব বিশ্বের সংঘাতগুলোর মোকাবিলা করতে অনলাইন ক্ষেত্রটি ব্যবহার করতে পারি।
মার্ফির তত্ত্বও ([২২]) উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি বলে যে ভিডিও গেমে চরিত্রগুলোর সাথে সনাক্তকরণ একটি 'সিনেমাটিক অবস্থার' দ্বারা শক্তিশালী হয়। তাই, এমনকি মর্টাল কমব্যাট-এর মতো ফাইটিং গেমের ক্ষেত্রেও, যেখানে কোনো জটিল বর্ণনা নেই, খেলোয়াড়রা অবতারের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের কারণে এখনো এর সাথে একাত্ম বোধ করে।
তার প্রবন্ধ 'সাইবারস্পেস অ্যান্ড আইডেন্টিটি'-তে শেরি টার্কল একাধিক পরিচয়ের ধারণা নিয়ে লিখেছেন। সাইবারস্পেস যোগাযোগের মাধ্যমে এগুলো কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তা তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। শেরি টার্কলকে উদ্ধৃত করে ([২৩]): "যদি প্রথাগতভাবে, পরিচয় বলতে একত্বকে বোঝায়, তবে আজকের কম্পিউটারের পর্দায় জীবন বলতে বহুত্ব এবং বৈচিত্র্যকে বোঝায়"। ভিডিও গেমগুলোকে পরিচয় গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ এগুলো গেমারকে বাস্তবতাকে পুনরায় ধারণা করতে সাহায্য করে।
ডেটিং সাইট
[সম্পাদনা]ইন্টারনেটে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পগুলোর মধ্যে অনলাইন ডেটিং অন্যতম। ইন্টারনেট ডেটিং সাইট ম্যাচ.কম-এর মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে এটি শুরু হওয়ার [২৪] পর থেকে এর মূল্য ২ বিলিয়ন ডলারের [২৫] বেশি হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়িক মডেলে আপনার নিজস্ব প্রোফাইল তৈরি করার স্থান এবং অন্য ব্যবহারকারীদের প্রোফাইল দেখার বিনিময়ে একটি ছোট সাবস্ক্রিপশন ফি প্রয়োজন হয়। অন্যান্য ব্যবহারকারীদের তালিকাভুক্ত সাধারণ আগ্রহ এবং লোকেশনের মতো পরিমাপক ব্যবহার করে তাদের সামঞ্জস্যতার দ্বারা প্রচার করা হয়। এলিট সিঙ্গেলস, ইউনিফর্ম ডেটিং এবং ক্রিশ্চিয়ান কানেকশনস-এর মতো অনেক বিশেষায়িত অনলাইন ডেটিং পরিষেবা রয়েছে যা একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত সঙ্গী খুঁজছেন এমন মানুষের সেবা দেয়। অনলাইনে ডেটিংয়ের আবির্ভাব সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং ব্যাপক ব্যক্তিগত যোগাযোগের একটি সম্পূর্ণ নতুন শাখা তৈরি করেছে। এটি মানুষের নিজেদের উপস্থাপন করার জন্য একটি নতুন পরিবেশ তৈরি করেছে। ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্ব বোঝাতে এবং অন্য ব্যবহারকারীদের সাথে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টায় অনলাইন শিষ্টাচার ও চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। জুস্ক এবং ম্যাচ.কম-এর মতো সাইটগুলো ব্যবহারকারীদের কীভাবে তাদের প্রোফাইলকে আরও আকর্ষণীয় করা যায় সে সম্পর্কে পরামর্শ দেয়। যেমন কোন শব্দগুলো ব্যবহার করতে হবে এবং কোনগুলো করা যাবে না, তাদের কী ধরনের ছবি ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে কতটা তথ্য প্রকাশ করা উচিত তার পরামর্শ দেয়। ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর কার্যবিবরণী দ্বারা গত বছর প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ বিবাহ অনলাইনে শুরু হয়। [২৬]। অনেকেই অনলাইন ডেটিংকে একটি আত্মরতিমূলক, অগভীর, "হুক-আপ" সংস্কৃতির [২৭] জন্ম দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন। অন্যদিকে অনেকেই এমন মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করার জন্য প্রযুক্তির অগ্রগতির প্রশংসা করেন যারা আগে কখনো একে অপরের সাথে দেখা করতে সক্ষম হতেন না।
ম্যাচ.কম/টিন্ডার ইত্যাদি
[সম্পাদনা]
বিভিন্ন অনলাইন ডেটিং সাইটের বৈচিত্র্য একটি অনলাইন সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এখানে ব্যবহারকারীদের নিজেদের ধরন নির্দিষ্ট করতে বলা হয়। তারা কেমন মানুষ খুঁজছেন, সেটিও জানাতে হয়। পাপাচারিসির মতে, "[অনলাইন ডেটিংয়ের] কিছু বিশেষ পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো সম্পর্ক গড়ার উদ্দেশ্যে বেছে বেছে নিজেকে তুলে ধরতে সহায়তা করে..." (পাপাচারিসি, জিজি, ২০১০)।
ই-হারমোনি এবং ম্যাচ.কমের মতো সাইটগুলো নিজেদের প্রচার করে। এগুলো সমমনা মানুষের সাথে যুক্ত হতে চাওয়া অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সব বয়সের মানুষের জন্য তৈরি। এসব সাইটের ব্যাপক সাফল্য ইন্টারনেটের কারণে পারস্পরিক যোগাযোগের উন্নতিকে প্রশংসিত করেছে। প্রযুক্তির অভাব থাকলে বাস্তব জগতে যেসব জুটির কখনো দেখাই হতো না, এগুলো তাদের এক করেছে। অনলাইন সম্পর্কের বড় সাফল্য এর কার্যকারিতা প্রমাণ করে। তাত্ত্বিক পার্কস এবং ফ্লয়েডস অনলাইন ডেটিংয়ের শুরুর দিকে লক্ষ্য করেছিলেন যে, অনলাইনে যোগাযোগের ফলে সরাসরি সাক্ষাতের পরিমাণ মোট নিয়মিত যোগাযোগের এক-তৃতীয়াংশ। তারা উপসংহার টানেন, "এসব তথ্য বোঝায় যে অনলাইনে শুরু হওয়া সম্পর্ক খুব কমই সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে" (পার্কস ও ফ্লয়েডস, ১৯৯৬)। ড্যাচের মতো সাইটগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরির জন্য প্রশংসিত হয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট একটি ছোট জনগোষ্ঠী, যেমন সমকামী নারীরা সক্রিয়ভাবে অনলাইনে সঙ্গী খুঁজতে পারেন। [২৮] অনেকেই এই অন্তর্ভুক্তির প্রশংসা করেন। এটি সমকামী মানুষের বাইরে গিয়ে একই যৌন অভিমুখিতার মানুষের সাথে দেখা করার অসুবিধা দূর করে। তাছাড়া বেশিরভাগ সাইট বিষমকামীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। যুক্তরাজ্যের ৭০ শতাংশ সমকামী জুটির সম্পর্ক অনলাইনে শুরু হয়। [২৯] অনলাইন যোগাযোগের প্রাথমিক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল যে, মানুষ সাধারণত অভিন্ন আগ্রহের কারণে অনলাইনে যুক্ত হবে (রাইনগোল্ড, ১৯৯৩)। তবে ইন্টারনেট ডেটিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থান দুজন ব্যবহারকারীকে যুক্ত করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। টিন্ডার ও গ্রিন্ডারের মতো অ্যাপগুলো এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যবহারকারীদের দূরত্বের ভিত্তিতে যুক্ত করে। টিন্ডার ২০১২ সালে শুরু হয়। প্রতিদিন এতে ১০০ কোটিরও বেশি "সোয়াইপ" হয়। অ্যাপটি ব্যবহারকারীকে তার এলাকার নারী ও পুরুষদের ছবি দেখায়। ব্যবহারকারী সেই ব্যক্তির চেহারা পছন্দ বা অপছন্দ করতে পারেন। দুজন ব্যবহারকারী একে অপরের ছবি এবং সংক্ষিপ্ত জীবনী পছন্দ করলে তারা যুক্ত হন এবং একে অপরকে বার্তা পাঠাতে পারেন। গ্রিন্ডার সমকামী পুরুষদের ওপর লক্ষ্য রেখে একইভাবে কাজ করে। দুটি সাইটকেই অগভীর সম্পর্ক তৈরি এবং কখনো কখনো ক্ষণস্থায়ী যৌন মিলনের প্রচারের জন্য বিতর্কিত মনে করা হয়। অন্যান্যেরা এই অ্যাপগুলোকে একটি বৃহত্তর সমস্যার লক্ষণ হিসেবে দেখেন। তারা সহস্রাব্দ প্রজন্মের অনুমোদন ও স্বীকৃতি খোঁজার মানসিকতা বোঝাতে মাসলোর চাহিদার সোপান তত্ত্বের পাশাপাশি ব্যবহার ও তৃপ্তি তত্ত্বের উল্লেখ করেন। [৩০]
সমালোচনা ও বিতর্ক
[সম্পাদনা]
অনলাইন ডেটিংয়ের প্রকৃতি স্বভাবতই বিচারমূলক। কারো সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য এ ধরনের মাধ্যম ব্যবহারকে অনেকেই অত্যন্ত বাহ্যিক বলে সমালোচনা করেছেন। বেশিরভাগ ডেটিং সাইটে ব্যবহারকারীরা একে অপরের বাহ্যিক রূপ দেখে মূল্যায়ন করেন। এটি মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। একদল এটিকে খুবই অগভীর মনে করেন। অন্যদিকে আরেকদল আকর্ষণহীন অস্বস্তিকর প্রথম ডেট এড়ানোর সুবিধা পছন্দ করেন। পাপাচারিসির মতে, নেটওয়ার্কযুক্ত প্রযুক্তি মানুষের জন্য সামাজিক শিষ্টাচার উপেক্ষা করা সহজ করে দেয়। সাধারণত সরাসরি আলাপে এসব শিষ্টাচার বজায় রাখতে হয়। [৩১]
সাধারণত ডেটিং সাইটগুলো ব্যবহারকারীদের মিথ্যা বলা এবং ভুয়া তথ্য ব্যবহারের কারণে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। নিজেদের ভালোভাবে উপস্থাপন করতে এবং মনোযোগ আকর্ষণ করতে তারা এমনটা করে। অনলাইন ডেটিংয়ের প্রতিযোগিতামূলক প্রকৃতি একটি ভিন্ন সমাজ তৈরি করেছে। টোমা ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যের সাথে এর তুলনা করেছেন। তার মতে, "...অনলাইন ডেটিং সাইটে কখনো কখনো প্রতারণামূলক আত্ম-উপস্থাপন দেখা যায়..." (টোমা, হ্যানকক এবং এলিসন, ২০০৮)। চরম ক্ষেত্রে ক্যাটফিশিং হতে পারে। এটি অনলাইনে ডেটিং করার সময় অবিশ্বাস এবং প্রতারণার অনুভূতি তৈরি করে।
অনলাইন ডেটিং আত্মপ্রেম এবং বাহ্যিক বিচার প্রচারের কারণে সমালোচিত হয়েছে। ম্যাচ.কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্রেগ ব্ল্যাট স্বীকার করেছেন যে, অনলাইন ডেটিং লোভ বাড়ায়। কেউ একবার সাইটটি ব্যবহার শুরু করলে তার পক্ষে এটি ছাড়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ সেখানে "সব সময়ই আরো ভালো কেউ থাকে"। [৩২] গবেষণায় দেখা গেছে, এত বেশি বিকল্প থাকায় মানুষের মধ্যে সঙ্গীর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার প্রবণতা কমছে। তারা প্রায়শই ইন্টারনেটের তাৎক্ষণিক তৃপ্তির দিকে আকৃষ্ট হন। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, টিন্ডার ব্যবহারকারী পুরুষরা মনে করেন তাদের "নারীদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার" অধিকার রয়েছে, যদি তারা প্রোফাইলের মতো আকর্ষণীয় না হন। এটি মূলত লিঙ্গবৈষম্যমূলক এবং ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ড সংস্কৃতির ভিত্তি শক্ত করে। এই ধরনের ফলাফল সমর্থনকারীরা ম্যাকলুহানের মতো তাত্ত্বিকদের বিশ্বাস গ্রহণ করেন। তারা মনে করেন, মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক রাজনীতি থেকে পুরোপুরি আলাদা করা যায় না (ম্যাকলুহান, ১৯৬৪)। তবে অনেকেই এখনো এই সাইটগুলোকে এ ধরনের আচরণের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন। ২৪ শতাংশ টিন্ডার ব্যবহারকারী আগে থেকেই অন্য সম্পর্কে যুক্ত। [৩৩]
ভিডিও ভিত্তিক উপস্থাপন
[সম্পাদনা]ইউটিউব
[সম্পাদনা]
বিনামূল্যে ভিডিও আদান-প্রদানের জন্য ২০০৫ সালে ইউটিউব তৈরি করা হয়। প্রতি মিনিটে ১০০ ঘণ্টা ভিডিও আপলোড হওয়ার মাধ্যমে এটি ইন্টারনেটের অন্যতম জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে পরিণত হয়। ইউটিউবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরো অনেক ব্যবহারকারী ভ্লগিং বা ভিডিও ব্লগিং করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা নিজেদের ভিডিও ধারণ করে দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে তারা নানা গল্প, ধরন এবং আখ্যান তৈরি করেন। প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহারকারীদের নিজেদের পরিচয় বিকাশ, পরীক্ষা এবং অন্বেষণের সুযোগ দেয়। একইসাথে এটি একে অপরের সাথে যোগাযোগ এবং মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানেরও সুবিধা দেয়। প্রকাশ্যে নানা পরিচয় প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাজিক নিয়ম ভাঙার জন্য এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ইউটিউবে ব্যবহারকারীরা নিজেদের ছবি দেখান এবং কথা বলেন। এ কারণে এখানে নাম গোপন রাখা বেশি কঠিন। তারপরও তারা নিজেদের পরিচয় নতুনভাবে তৈরি করতে পারেন। বাস্তব জগতে তারা যেমন, তার চেয়ে ভিন্ন কেউ হয়ে উঠতে পারেন। [৩৪]
এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ব্যবহারকারীদের তৈরি আধেয়র নান্দনিকতা বিশেষ করে ভিডিওর ধরন নিয়ে পরীক্ষার ওপর জোর দেয়। এটি ভ্লগারদের নিয়ম ভাঙার সুযোগ দেয়। তারা গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে অন্যদেরও একই কাজ করতে উৎসাহিত করতে পারেন।
ভ্লগকে আত্মজীবনী বা দিনলিপির ডিজিটাল রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি ব্যবহারকারীদের নিজেদের প্রকাশ ও উপস্থাপন করার সুযোগ দেয়। একইসাথে ক্যামেরায় "নতুন সত্তা" নির্মাণেরও সুযোগ দেয়। প্রতিটি ভিডিও ব্লগে নিজেকে প্রকাশের বৈশিষ্ট্য থাকে। আধেয়র মূল বিষয়বস্তু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়, বিশেষত্ব বা আগ্রহকেন্দ্রিক হলেও এটি ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, মেকআপ টিউটোরিয়াল ভিডিওর নির্মাতারা প্রায়শই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন। তারা অডিও-ভিডিও উপাদানের পাশাপাশি লিখিত পাঠ্য ব্যবহার করে ভক্তদের সাথে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করেন।
ভ্লগিংয়ের আরেকটি দিক হলো 'ইউটিউব তারকাদের' ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা। ইউটিউব আবেগ, ইচ্ছা এবং আকর্ষণ ক্ষমতা থাকা সাধারণ মানুষদের নিজেদের চ্যানেলকে পণ্যে রূপান্তর করার সুযোগ দেয়। এটি তাদের মুনাফা অর্জনে সহায়তা করে। এর অনেক সুবিধা থাকলেও ভ্লগারদের পরিচয় এই জনপ্রিয়তার ধারণার কারণে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের "প্রকৃত সত্তা" বা "আমি" হারিয়ে যেতে পারে।
ভিমিও

২০০৪ সালে ভিমিও ভিডিও আদান-প্রদানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তৈরি হয়। এটি মূলত শিল্পসম্মত ভিডিওর ওপর জোর দেওয়ার কারণে ইউটিউব থেকে আলাদা। এটিকে অধিকতর পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিল্পীদের জন্য তৈরি ওয়েবসাইট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি আধেয়র মানের ওপর জোর দেয়। এটি এইচডি ভিডিও সমর্থনকারী প্রথম প্ল্যাটফর্ম। ভিমিওর অনিয়মিত ব্যবহারকারীর (মাসে ৭ কোটি দর্শক) তুলনায় ইউটিউবের ব্যবহারকারী অনেক বেশি (মাসে ৮০ কোটি দর্শক)। মানের ওপর এই গুরুত্ব পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্ল্যাটফর্মটিতে গুরুত্বের সাথে কাজ করার সুযোগ দেয়। ইউটিউবে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ভিডিও আপলোড হওয়ায় এটি সেখানে খুব একটা দেখা যায় না। যারা ভিডিও তৈরিতে আগ্রহী, ভিমিও তাদের সেই আগ্রহকে অনলাইন পরিবেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দেয়। অন্য সাইটগুলোর তুলনায় এটি উন্নত মানের আধেয় প্রকাশ করে।
উপস্থাপনের ভ্রান্ত ধারণা/সম্পাদিত উপস্থাপন
[সম্পাদনা]ইউটিউব, ভিমিও বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা ভিডিওগুলোকে মানুষের চোখের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এগুলো আমাদের নিজেদের, একে অপরের এবং চারপাশকে দেখার সুযোগ দেয়। এগুলো আমাদের পরিচয় তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নিজেকে প্রকাশের সুযোগ দেয়। ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো আয়নার মতো কাজ করে। আমরা নিজেদের যে রূপটি দেখতে চাই, তার ওপর ভিত্তি করে এটি আমাদের ছবি বিকৃত করতে পারে। ভিডিওর মাধ্যমে আমরা নিজেদের এবং বাস্তবতাকে তৈরি করতে পারি।
প্রতিটি মাধ্যমস্থ ছবি বা ভিডিও যে বাস্তবতার সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ রূপ নয়, তা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি উপস্থাপন যা চিত্র নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। ভিডিওর ক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট ক্যামেরা কোণ এবং সম্পাদনা কৌশল দিয়ে বাস্তবতাকে বিকৃত করতে পারি। তাছাড়া আমরা যে বিষয়টি ধারণ করি, সেটি নতুন করে তৈরি করেও এমনটি করতে পারি। তাই একটি ভ্লগ পোস্ট করার সময় আমরা কী পোশাক পরব এবং চুলের স্টাইল কেমন হবে, তা বেছে নিতে পারি। আমরা আমাদের কথা বলার ধরন পরিবর্তন করতে পারি এবং শারীরিক ভাষা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমরা কী দেখাই না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আমাদের শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্যের নির্দিষ্ট দিকগুলো বাদ দিতে পারি। এসব ভিডিওতে শারীরিক উপস্থিতির অভাবের কারণে আমাদের এই নিয়ন্ত্রণ থাকে। আমরা নিজেদের উপস্থাপন করছি। আমরা নির্দিষ্ট দর্শকদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে চাই, তার ওপর আমাদের পছন্দগুলো নির্ভর করে। তাই আমরা সামনের মঞ্চে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব অর্জনের জন্য পিছনের মঞ্চে কাজ করে ইম্প্রেশন ম্যানেজমেন্ট বা প্রভাব ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করি।
মিথস্ক্রিয়াবাদী ঐতিহ্য অনুযায়ী, অন্যদের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে আমাদের সত্তার অস্তিত্ব থাকে। গফম্যানের পাবলিক থিয়েটারের ধারণাটি এখানে আলোচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটের সাথে মানিয়ে নিতে ভিন্ন সামাজিক ভূমিকা গ্রহণ করি। আমরা কাদের জন্য ভিডিও পোস্ট করছি, তার ওপর নির্ভর করে আমরা ভিন্ন ভিন্ন "মুখোশ" পরি ([৩৫])।
ভিডিওতে আমাদের এই প্রদর্শন ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচয়ের মধ্যকার পার্থক্য মুছে ফেলতে পারে। তাই ব্যক্তিগত "আমি" এবং সামাজিক "আমার" মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। "আমার" কর্তৃক "আমি"-কে নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি রয়েছে। এমনটি হলে আমাদের আত্মসত্তার প্রকৃত অনুভূতি বদলে যেতে পারে। এটি মারাত্মক পরিচয় সংকট তৈরি করতে পারে ([৩৬])।
নির্দিষ্ট দূরত্ব এবং সচেতনতার সাথে আমাদের "ডিজিটাল চোখ" ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা যা কিছু দেখছি, তা কেবল একটি উপস্থাপন। এটি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা গল্প। তাই বাস্তবতা বোঝার জন্য আমাদের সমালোচনামূলক এবং (আত্ম) বিশ্লেষণাত্মক হতে হবে।
জনমিতি
[সম্পাদনা]আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে সমাজের সকল স্তরের উপস্থিতি রয়েছে। বয়স, লিঙ্গ থেকে শুরু করে যৌন অভিমুখিতা এবং ধর্ম পর্যন্ত আমাদের সবাইকেই শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। আমরা পছন্দ করি বা না করি, এই জনমিতির অংশ হিসেবে আমাদের উপস্থাপন এবং নিজেদের উপস্থাপন প্রযুক্তির সাথে আমাদের সম্পর্ককে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
বয়স
[সম্পাদনা]ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান। প্রায় সব বয়সী মানুষের (সম্ভবত শিশু ও অতি অল্পবয়সীরা ছাড়া) ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের চাপ রয়েছে। যোগাযোগ, মিথস্ক্রিয়া এবং নিজেকে প্রকাশের জন্য সব বয়সের মানুষ ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। শেরি টার্কলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায় ([৩৭]), "আমরা সাইবর্গ"। বৃদ্ধ ও তরুণ সবাই নিজেদের প্রিয় ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাথে যুক্ত। প্রযুক্তিগুলো আমাদেরই সম্প্রসারণ। অনলাইনে থাকা প্রায়শই প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের অংশ। তবে তারা প্রায়ই স্বীকার করেন যে যোগাযোগ ডিভাইসের প্রতি আসক্তি নিয়োগকর্তার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিশু ও কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। তবে স্পষ্টতই তারা বিনোদন এবং বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের জন্যও এটি ব্যবহার করে। সব বয়সী মানুষ অনলাইনে একাধিক পরিচয় তৈরি করে সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সামগ্রিকভাবে, সার্বক্ষণিক যুক্ত থাকার সংস্কৃতির চাহিদা থেকে কেউই পালাতে পারে না।
তবে বয়স অনুসারে প্রযুক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হয়।
তরুণরা এমন এক পৃথিবীতে বেড়ে উঠেছে যা ইতোমধ্যেই প্রযুক্তির দখলে। তারা একটি নেটওয়ার্কে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত জীবনযাপন করে। তারা অনলাইন জীবনকে দ্বিতীয় সেরা বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে না। তারা একে বাস্তব জীবনের সমান গুরুত্ব দেয়। ভার্চুয়াল এবং বাস্তব জগতের মিশ্রণই তারা জন্ম থেকে দেখে আসছে এবং একে স্বাভাবিক হিসেবেই গ্রহণ করে। এছাড়া তরুণরা সবসময় সংযুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। প্রতিটি খুদে বার্তাই হলো নতুন যোগাযোগের শুরু, কোনো বাধা নয়। এমনকি বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সভায় পাঠানো হলেও এটি সংযোগ হিসেবেই দেখা হয়।
ডিজিটাল যুগে তরুণদের জীবনে আত্মবিশ্লেষণের সময়ের অভাব রয়েছে। কৈশোরে পরিচয় গঠনের জন্য নিজের চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ একা কাটানোর সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেরি টার্কল ([৩৮]) এরিক এরিকসনের "মোরাটোরিয়াম" ধারণাটি ব্যবহার করেছেন। এটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত ফলাফলমুক্ত স্থান বা বিরতির সময় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি সমবয়সী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে দূরে কাটিয়ে কিশোর-কিশোরীদের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীদের একান্তে আবেগ বিশ্লেষণের ক্ষমতার অভাব রয়েছে। সংযোগ ছাড়া তারা নিজেদের অস্তিত্ব অনুভব করে না। একে যৌথ বুদ্ধিমত্তার অংশ হতে শেখার বা "সহযোগী সত্তা" গঠনের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে "প্রকৃত সত্তার" অনুভূতি খোঁজার জন্য একা থাকার সময়টি অত্যন্ত জরুরি। এটি ছাড়া বিশ্বে "প্রকৃত" সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পরিপক্কভাবে কাজ করা খুব কঠিন। পরিচয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অনলাইন জীবন যে সুযোগ দেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যন্ত উপকারী। এটি ভিন্ন ধরনের মানুষ হওয়ার চর্চা করার এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নানা পরিচয় কীভাবে কাজ করে তা যাচাই করার সুযোগ দেয়। তবে মনে রাখা জরুরি যে একজন সম্পূর্ণ পরিপক্ক মানুষ তৈরি করতে এটি যথেষ্ট নয়। তরুণরা প্রায়শই বিচ্ছেদ এবং একাকীত্বের উদ্বেগের সাথে মোকাবিলা করতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। দিনে পনেরোবার বাড়িতে ফোন করা কোনো কিশোরের আচরণকে এক দশক আগে রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অথচ আজ এটি সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। তরুণরা প্রতিনিয়ত খুদে বার্তা পাঠায় এবং এর বড় অংশই বাবা-মাকে পাঠানো হয়।
অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্করা প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং খুদে বার্তার ক্ষমতা দেখে অভিভূত হন। তারা অনেক সময় পিছিয়ে পড়েছেন বলে অনুভব করেন। ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের জ্ঞান অর্জনের জন্য তাদের সন্তানদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। যারা সারাক্ষণ যুক্ত থাকার সংস্কৃতির বাইরে বেড়ে উঠেছেন, তারা কখনো কখনো ডিজিটাল দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি পান। তবে নতুন প্রযুক্তিগুলো কীভাবে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে হয় তা শেখার পরপরই তারা তরুণ প্রজন্মের মতো যোগাযোগ এবং আদান-প্রদানের চাহিদা অনুভব করেন। তারাও প্রায়শই তরুণদের মতো সমানভাবে অনলাইন জগতে আকৃষ্ট হন। তারা নিজেদের সন্তানদের সাথে বাস্তব যোগাযোগের কথাও ভুলে যান। তখন সন্তানদের প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হয়।
ড্যানাহ বয়েড ([৩৯]) উল্লেখ করেছেন, প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি এবং সারাক্ষণ যুক্ত থাকা "প্রজন্মের চেয়ে মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার মাধ্যমে বেশি সংজ্ঞায়িত হয়"। এমন অনেক তরুণ আছেন যারা অনলাইন জগত থেকে মুক্ত হতে চান এবং প্রতিনিয়ত যুক্ত থাকার চাপে ক্লান্ত। আবার কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। তবে তরুণদের ডিজিটাল বিশ্ব অন্বেষণে বেশি আগ্রহী বলে মনে করা হয়।
বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং যোগাযোগের ধরনগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার থাকতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে তারা সেই প্ল্যাটফর্মে কাদের সাথে যুক্ত, তার ওপর এটি নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুক হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে মানুষ পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মীদের সাথে যুক্ত থাকে। তাই এখানে নিজেকে আরও নিয়ন্ত্রিত বা রক্ষণশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্ম নিজেকে সাধারণভাবে তুলে ধরতে কম সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা হতে পারে। বয়স্ক প্রজন্ম প্রায়শই এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে না। কারণ এটি মূলত তরুণ প্রজন্মের জন্য তৈরি এবং অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
লিঙ্গ
[সম্পাদনা]নারী ও পুরুষের মধ্যে আত্মসত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পাপাচারিসির লেখা আ নেটওয়ার্কড সেল্ফ-এ এটি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নারীরা পুরুষদের চেয়ে ভিন্নভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। তাদের ছবি পোস্ট করার ধরন দেখলেই তা বোঝা যায়। পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি "যৌন আবেদনময়ী" ভঙ্গিতে ছবি তুলতে পছন্দ করেন। একা হোক বা বন্ধুদের সাথে, নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় ছবিতে নিজেদের রূপ তুলে ধরতে বেশি এগিয়ে থাকেন। নারীরা সমলিঙ্গের কাউকে গালে চুমু খাওয়ার ছবি পোস্ট করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পুরুষরা এ ধরনের ছবি খুব কমই পোস্ট করেন। পুরুষরা নিজেদের পোস্ট করা ছবি নিয়ে কম মাথা ঘামান। অন্যদিকে নারীদের এ বিষয়ে বেশি যত্নশীল মনে হয়। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিজেদেরই সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন। এ কারণে তাদের "নিখুঁত" মুহূর্তের ছবি পোস্ট করতে থাকা জরুরি মনে হয়। তারা এটিকে বেশি গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে পুরুষরা অনলাইনে নিজেদের উপস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিক আচরণ করেন। এটি বাস্তব জীবনের সাথেও সম্পর্কিত। সেখানে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অনেক উচ্চ মানদণ্ডে বিচার করা হয়। পুরুষরা যেখানে নিজেদের মতো থাকতে পারেন, সেখানে নারীদের সমান বিবেচিত হওয়ার জন্যও অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এছাড়াও নারীদের সমাজে নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। তাদের ওপর প্রতিনিয়ত সুন্দর এবং বিশেষ করে নারীসুলভ দেখানোর সামাজিক চাপ থাকে। পুরুষরা শার্টবিহীন অবস্থায় বা শরীর প্রদর্শন করা ছবিতে উপস্থিত হলে কখনো কখনো কম সমালোচনার শিকার হন। অন্যদিকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার জন্য নারীদের বেশি সমালোচনা করা হয়। সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামের ছবিতে পপ গায়ক জাস্টিন বিবারকে নগ্ন অবস্থায় দেখা যাওয়ার পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। মানুষ তাকে এর জন্য প্রশংসা এবং সাধুবাদ জানিয়েছিল। মানুষ তার পাওয়া মন্তব্যগুলোর সাথে ডেমি লোভাটোর মতো নারী গায়কদের পাওয়া মন্তব্যের তুলনা করেছে। সেসব মন্তব্যে ডেমিকে শালীনতা বজায় রাখতে এবং শরীর ঢেকে রাখতে বলা হয়েছিল। এটি এমন একটি আচরণ যার জন্য পুরুষদের প্রশংসা করা হয় আর নারীদের তিরস্কার করা হয়। ইনস্টাগ্রামে পুরুষদের বুক প্রদর্শন করা ছবি পোস্ট করার অনুমতি দেওয়ায় এটি সমালোচিত হয়েছিল। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে সেগুলো ঝাপসা করে দিতে হতো। পুরুষদের ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিজেদের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহারের বেশি স্বাধীনতা রয়েছে। অন্যদিকে নারীদের সমালোচনা এড়াতে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়।
যৌন অভিমুখিতা
[সম্পাদনা]ডিজিটাল প্রযুক্তি বরাবরই কেবল পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতেই নয়, বরং বিষমকামী দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রধানত তৈরি হয়েছে। অনলাইনে যেকোনো পৃষ্ঠায় গেলে দেখা যায়, ওয়েবসাইটগুলো স্বল্পবসনা নারীদের যৌন আবেদনময়ী ভঙ্গির ছবি দিয়ে বিষমকামী ডেটিং সাইটের বিজ্ঞাপন দেয়। অথবা সুগন্ধি বা চুলের প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে বিষমকামী যুগল একে অপরকে জড়িয়ে ধরে থাকে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রচুর পরিমাণ আয় এবং স্ক্রিনের জায়গা দখল করে। এর ফলে অ-বিষমকামী মানুষদের প্রতিনিধিত্ব অনুভব করার ক্ষেত্রে যে সংগ্রাম রয়েছে তা স্পষ্ট।
কেবল গত দশকে ডিজিটাল প্রযুক্তির অ-বিষমকামী ব্যবহারকারীদের নিজেদের উপস্থাপনের বিষয়ে গুণগত গবেষণা করা হয়েছে। সমাজের অ-বিষমকামী সদস্যরা ডেটিং সাইট এবং চ্যাট রুম ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে তাদের অনলাইন পরিচয় তুলে ধরেন, সে সম্পর্কে আগ্রহ সম্প্রতি বেড়েছে। একইসাথে এই মানুষগুলো বাস্তব জীবনে এবং অনলাইনে নিজেদের উপস্থাপনের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন, তা নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণাও বেড়েছে।
অ-বিষমকামী মানুষরা কেবল সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব অনুভব করার জন্যই নয়, বরং এমন একটি সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অনুভূতি পাওয়ার জন্যও এলজিবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তৈরি করেছেন। সেখানে মানুষের নিজেদের উপস্থাপন অ-বিষমকামিতার কোনো বাঁধাধরা নিয়মের অধীনে পড়ে না। তারা "প্রধানত বিষমকামী সমকক্ষ সংস্কৃতি" থেকে নিজেদের সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ওয়েবসাইটগুলো নিরাপদ স্থানে যোগাযোগের একটি উপায়। এগুলো ব্যবহারকারীদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে নাম গোপন রাখার সুবিধা দেয়।[৪০] ২০১৩ সালে "অ-বিষমকামী তরুণদের ইন্টারনেট ব্যবহার" বিষয়ক গবেষণার পর তাত্ত্বিক গ্যারি ডাউনিং এই উপসংহারে পৌঁছান যে, "অনলাইন এবং অফলাইন সম্পর্কের মধ্যে সম্পর্ক কোনো একমুখী 'মহড়া' নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া যা ভার্চুয়াল এবং বাস্তবতার মধ্যকার সীমানা মুছে দেয়"। [৪১] এটি প্রমাণ করে যে অ-বিষমকামী মানুষরা নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইট এবং চ্যাটরুমের (টিনচ্যাট.কম, এলজিবিটিচ্যাট.নেট) মাধ্যমে নিজেদের ব্যবহৃত প্রযুক্তির সাহায্যে সফলভাবে নিজেদের প্রসারিত করার উপায় খুঁজে পাচ্ছেন। যদিও তারা নিজেদের এমন একটি অনলাইন দুনিয়ায় দেখতে পান যা মূলত বিষমকামিতা এবং বিজ্ঞাপন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তবুও তারা নিজেদের একটি রূপ উপস্থাপন করেন।
ধর্ম
[সম্পাদনা]
ইন্টারনেটের আগেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জীবনকে প্রভাবিত করত এবং এখনো করে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ দিকনির্দেশনার জন্য কার কাছে যাবে, তা নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট হলো একটি সম্পদ, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্য সদস্যরা ব্যবহার করেন। তারা ইন্টারনেটকে লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, যা কারো কারো কাছে আবশ্যক। বাইবেলকে প্রায়শই যেভাবে বর্ণনা করা হয়, সেটির মতোই, [৪২]"উইকিপিডিয়ার একটি ভুক্তি পড়া বাইবেল গভীরভাবে পড়ার মতো। এতে বিভিন্ন অজ্ঞাত লেখক এবং সম্পাদকের কণ্ঠের ক্ষীণ ছাপ রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।" এটি একটি ছোট উপসংস্কৃতির প্রকাশিত ধারণার অনুরূপ ([৪৩]"...প্রাচীন মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা")।
যদিও সামগ্রিকভাবে ইন্টারনেটকে তুলনামূলক বেশি ধর্মনিরপেক্ষ স্থান বলে মনে হয়, যেখানে কারো বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। এমনকি ভুল সম্প্রদায় অর্থাৎ মেসেজ বোর্ড, মিম পেজ ইত্যাদিতে না যাওয়া পর্যন্ত এসব বিশ্বাসের কারণে কাউকে উপহাসও করা হয় না। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কারো কারো কেবল এই বিষয়ে সমস্যা থাকতে পারে যে ওয়েবে মানুষের যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। [৪৪]"...প্রকৃত মানুষের সাথে সংযোগ থেকেই সর্বদা মূল্যবোধ তৈরি হয়।" যারা কম-বেশি প্রথাগত চিন্তার অধিকারী, তারা উত্তম পুরুষে লেখা অপেক্ষাকৃত নতুন ধারণা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন। জিল ওয়াকার রেটবার্গ তার ২০১৪ সালের বইয়ে এটি তুলে ধরেছেন [৪৫]। তিনি সেখানে বলেন যে মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় মানুষ খুব কমই নিজেদের নিয়ে লিখেছে।
যদিও একই অধ্যায়ে [৪৬] রেটবার্গ ইন্টারনেটের ব্যবহার কীভাবে ধর্মের জন্য উপকারী হতে পারে তা নিয়েও কথা বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ ভিভিয়ান সারফাটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন কীভাবে বর্তমানের ব্লগগুলো আঠারো শতকের পিউরিটানদের দিনলিপির মতো হয়ে উঠেছে। এগুলো ছিল [৪৭]'ধর্মীয় আত্মশৃঙ্খলার একটি প্রয়োজনীয়তা।'
তবে এসব সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীদের মতো একই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। [৪৮] ল্যানিয়ার যেমন উল্লেখ করেছেন, "...উইকিপিডিয়ায় থাকা বেশিরভাগ প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য আগে থেকেই ওয়েবে ছিল..."।
তত্ত্ব
[সম্পাদনা]অনলাইন বনাম বাস্তব জীবনের পার্থক্য
[সম্পাদনা]অনলাইন এবং বাস্তব জীবনের মধ্যে পার্থক্য তৈরির অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো অনলাইনে যাদের সাথে আমাদের দেখা হয় তাদের বেশিরভাগের সাথেই ব্যক্তিগত যোগাযোগের অভাব। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইনে আমি যাদের সাথে গেম খেলি, তাদের বেশিরভাগের সাথেই আমার কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ নেই। তারা অল্প সময়ের জন্য আমার দলের সদস্য থাকে এবং এরপর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাস্তব জগতে দেখা হওয়া মানুষগুলোর সাথে প্রায়ই উন্নত সম্পর্ক তৈরি হয়। সাধারণত এটি বন্ধুত্ব, প্রেম বা সংঘাতের দিকে গড়ায়। অনলাইনে পরিচিতদের প্রতি এই মানসিক বিনিয়োগের অভাব তাদের প্রতি হতাশ হওয়া সহজ করে তোলে। মানুষ প্রায়ই এমন কঠোর ভাষা ব্যবহার করে, যা তারা স্বাভাবিকভাবে বাস্তব জগতে ব্যবহার করত না।
অনলাইন দুনিয়া এমন এক নামহীনতা দেয়, যা বাস্তব জগতে পাওয়া যায় না। এটি ব্যবহারকারীদের কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই যা খুশি তা পোস্ট করার সুযোগ দেয়। ফোরচ্যান এবং সেভেনচ্যানের মতো সাইটগুলো ব্যবহারকারীদের সম্পূর্ণ গোপনীয়তা এবং নামহীনতার সুবিধা দেয়। এর ফলে এসব সাইটে অত্যন্ত ভয়ংকর পোস্ট দেখা যায়। এসব সাইটে (এবং ইউটিউব ও টাম্বলারের মতো অন্যান্য সাইটে) থাকা ব্যবহারকারীদের অন্যদের প্রতি বৈরী আচরণ করার আশঙ্কা অনেক বেশি। কারণ এর জন্য তাদের কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয় না। এটি প্রায়শই মানুষের ভেতরের সবচেয়ে খারাপ দিকটি বের করে আনে। কোনো প্রতিক্রিয়ার ভয় না থাকায় তারা ইন্টারনেটে নিজেদের অন্ধকার চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাস্তব জগতে কাউকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার হুমকি দিলে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে। অন্যদিকে অনলাইনে প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটলেও এর বিরুদ্ধে খুব একটা ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। কারণ হুমকিদাতা ব্যবহারকারী সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়।
এটি নিঃসন্দেহে সত্য যে আমাদের জীবনের একটি বড় অংশ ভার্চুয়াল জগতে কাটে। আমরা বাস্তব জীবনের সাইবর্গ হয়ে উঠেছি। ফোন নিয়ে ঘুমানো, সবসময় অনলাইনে থাকা, মেসেজ করা, স্কাইপ বা ফেসটাইমে কথা বলা এবং সারাবিশ্বের মানুষের সাথে অনলাইন গেম খেলা এর প্রমাণ। কখনো কখনো অনলাইন এবং বাস্তব জীবনের মধ্যকার সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইনে আমরা নিজেদের উন্নত রূপ হতে পারি। আমরা যেভাবে চাই, সেভাবে নিজেদের নতুন করে তৈরি করতে পারি। অনেকেই ফেসবুকে কাটানো সময়কে নিজেদের যেকোনো বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়েও ভালো বলে বর্ণনা করেন। তাছাড়া অনলাইনে আমরা দৈনন্দিন কাজও করতে পারি। যেমন যোগাযোগ করা, কেনাকাটা, খাবার অর্ডার করা (আমরা এখনো অনলাইনে খেতে পারি না, তবে এক দশকে কী হবে তা কে জানে...), বিল পরিশোধ, গান শোনা, সিনেমা দেখা, তথ্য খোঁজা ইত্যাদি। অনলাইনে যুক্ত থাকার জন্য সামাজিক, শিক্ষাগত এবং কাজের জায়গার চাপও থাকে। ভার্চুয়াল এবং বাস্তবের মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্য মুছে গেছে। সমাজ হিসেবে আমরা এখন কেবল বাস্তব জগতকে উন্নত করতে অনলাইন পরিবেশ ব্যবহার করতে পারি। সমষ্টিগত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাস্তবকে পুরোপুরি ভার্চুয়াল জগতের দখলে যেতে না দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল যুগে অনলাইনে থাকা আমাদের কেবল একসঙ্গে অনেক কাজ করার সুযোগই দেয় না। শেরি টার্কলের ভাষায় এটি আমাদের 'একাধিক জীবনযাপনের' সুযোগ দেয়। খুদে বার্তা পাঠানো এবং গ্রহণ করা আমাদের একইসাথে আরেকটি কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। আমরা কফি অর্ডার করার সময়ও ফেসবুকে অর্থাৎ গভীরভাবে ডিজিটাল জগতে থাকতে পারি। একসঙ্গে অনেক কাজ করার ক্ষমতা এখন সফল হওয়ার একটি শর্ত।
বাস্তবে মুখোমুখি যোগাযোগের মূল্যকে ডিজিটাল মাধ্যমে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা অসম্ভব। কারো সাথে শারীরিকভাবে সময় কাটানোর ক্ষমতা, সঙ্গীর বাস্তব কণ্ঠস্বর শোনার সুযোগ (ফেসটাইম কথোপকথনের মতো ডিজিটালভাবে পরিবর্তিত নয়), শারীরিক ভাষা বোঝা বা একে অপরকে স্পর্শ করার সক্ষমতা কেবলই অতুলনীয়। ফোরকে রেজোলিউশনের ভিডিওতে যুক্ত হলেও ডিজিটাল যোগাযোগে সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং অঙ্গভঙ্গি হারিয়ে যায়। রোমান্টিক ডেট বা গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সভাতেও আমরা যখন একসাথে না থেকে ফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকি বা অন্য কোনো ডিজিটাল দুনিয়ায় অন্যের সাথে থাকি, তখনই সমস্যা দেখা দেয়।
গোপনীয়তা
[সম্পাদনা]নিজেদের সম্প্রসারণ হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ স্বেচ্ছায় নিজেদের চিন্তাভাবনা এবং পরিচয়ের বিভিন্ন দিক ভাগ করে নেয়। আবার অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবেও ডাটা ট্রেইলের মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত যুক্ত থাকার সংস্কৃতি প্রকাশ্য এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যকার সীমানা মুছে দিয়েছে। বাস্তব জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি সব সময় অনলাইন জগতের সাথে যুক্ত থাকছে। সীমানা মুছে যাওয়ার বিষয়টি অনলাইনে মানুষের বাধা দূর করেছে। পর্দার আড়ালে থাকার অর্থ হলো অন্য মানুষের কাছাকাছি না থাকা। তাই শারীরিকভাবে আমরা স্বাভাবিক সামাজিক নিয়ম এবং দায়িত্ব থেকে দূরে থাকি। জীবন এবং চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেওয়ার সুবিধার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা এক অর্থে স্বেচ্ছায় নিজেদের গোপনীয়তা বিসর্জন দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি কীভাবে আত্মসত্তার সম্প্রসারণ হয়ে উঠেছে। তবে কখনো কখনো প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের তাদের ইচ্ছা বা স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে উৎসাহিত করে। তখন ব্যবহারকারীরা হয় অসচেতন থাকেন অথবা এই ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে এবং কেন ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
অনলাইনে দৃশ্যমান হওয়ার একটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের যুগে সন্ত্রাসীরা প্রায়শই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। আইএসিস তাদের গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করার জন্য টুইটার ব্যবহার করে পরিচিতি পেয়েছিল। অপরাধ রোধে অপরাধ দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। তবে সন্ত্রাসবাদ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত নয়, এমন সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘনে এটি প্রায়শই ব্যবহৃত হয়। মাদক ব্যবসায়ী বা মানব পাচারকারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। অপরাধ দমনে সরকারের কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত বিতর্ক চলছে। তবে মনে রাখা জরুরি যে অতিরিক্ত অনলাইন নজরদারি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার সম্পূর্ণ অভাব তৈরি করতে পারে। এটি কেবল ম্যাকলুহানের 'বৈশ্বিক গ্রাম' ধারণার কথাই মনে করিয়ে দেয় না, বরং অরওয়েলের সেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের কথাও মনে করিয়ে দেয়। সেখানে কুখ্যাত বিগ ব্রাদার প্রতিনিয়ত সবাইকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।
'গোপনীয়তাকে একা থাকার অধিকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অথবা জীবনের কোন অংশগুলো অন্যদের কাছে প্রবেশযোগ্য হওয়া উচিত তা নিজের জন্য নির্ধারণ করার অধিকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অথবা এ দুটির সমন্বয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে (তাভানি, ২০০৮)'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ইন্টারনেটের ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার বিষয়টি আজকাল বারবার উঠে আসছে। আমরা এখন বুঝতে পারছি যে আমরা যে ওয়েবসাইটে থাকি না কেন, প্রতিনিয়ত আমাদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। বিষয়টি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি তথ্য শেয়ার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং যেকোনো তথ্য কীভাবে সহজলভ্য হয়ে যায়, তার সাথে সম্পর্কিত। আজকাল বেশিরভাগ ওয়েবসাইটে প্রবেশের জন্য আমাদের নাম বা ইমেইল ঠিকানার মতো তথ্য দিতে হয়। কখনো কখনো বয়স এবং লিঙ্গও জানাতে হয়। অনেক সময় এটি জরুরি হয়। এটি ওয়েবসাইট থাকা নির্দিষ্ট কোম্পানিগুলোকে দর্শনার্থীর ধরন এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। কোনো ওয়েবসাইটের অংশ হতে গেলে এখন তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়ে আমাদের আরও বেশি চিন্তিত হতে 'উৎসাহিত' করা হচ্ছে বলেও মনে হতে পারে। এনএসএ ফাইল এবং স্নোডেনের বিষয়ে সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। স্নোডেন সবার সব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পেতেন। মুখোমুখি হলে এনএসএ এই যুক্তির ওপর নির্ভর করেছিল যে, যদি মানুষের লুকানোর কিছু না থাকে তবে তাদের ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। মিস্টার রোবট এবং ব্ল্যাক মিররের মতো অনেক টিভি শোতে গোপনীয়তার সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে। পপ সংস্কৃতিতেও আমরা এই বিষয়টি দেখতে পাই। শাট আপ অ্যান্ড ড্যান্স নামক ব্ল্যাক মিররের একটি পর্বে দেখা যায়, একজন যুবককে ওয়েবক্যামের সামনে বিব্রতকর কাজ করতে ধারণ করা হয়। ভিডিওটি অনলাইনে ফাঁস হওয়া ঠেকাতে তাকে বিপজ্জনক কাজ করতে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। অনেক পর্যালোচনায় এই পর্বটিকে বাস্তবসম্মত বলা হয়েছে। বাস্তব জীবনে মানুষদের ব্ল্যাকমেইল করা এবং ব্যক্তিগত ও বিব্রতকর তথ্য ফাঁস করার হুমকি দেওয়ার ঘটনা থেকে এটি অনুপ্রাণিত। অনলাইনে পরিচয় গড়ে তোলার জন্য হলেও আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য শেয়ার করতে উৎসাহিত করা হয়। সম্ভাব্য বিপদের তোয়াক্কা না করে আমরা যে অনলাইনকে নিজেদের সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহার করি, এটি তার সাথে সম্পর্কিত। অনলাইনে যত বেশি তথ্য পাওয়া যায়, আমরা তত বেশি নজরদারির ঝুঁকিতে পড়ি। এমনকি এটি কখনো কখনো আমাদের সুরক্ষার দাবি করা সংস্থাগুলোর দ্বারাও ঘটে।
সংযোগ
[সম্পাদনা]ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার পদ্ধতিতে বিপ্লব এনেছে। একাধিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার কারণে সংযোগ এখন তাৎক্ষণিক এবং সার্বক্ষণিক। মানুষ যেকোনো সময় একসঙ্গে অনেকের সাথে যুক্ত থাকতে পারে। এই প্রযুক্তি আমাদের একে অপরের সাথে আরও দ্রুত এবং প্রায়শই যুক্ত হতে সাহায্য করেছে। তবে ড্যানাহ বয়েডের মতে, সার্বক্ষণিক অনলাইন সংযোগ এবং প্রতিনিয়ত যুক্ত থাকার সংস্কৃতি বাস্তব বিশ্বের সংযোগ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমাদের মাঝে মাঝে অনলাইন সংযোগ থেকে বিরতি নিয়ে অনলাইন এবং অফলাইন সংযোগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। [৪৯] একইভাবে ল্যানিয়ার বর্ণনা করেছেন যে "খণ্ডিত, নৈর্ব্যক্তিক যোগাযোগের এই ব্যাপক চর্চা আন্তঃব্যক্তিক মিথস্ক্রিয়াকে ছোট করেছে"। তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে সংযোগ একটি ইতিবাচক শক্তি। যদি আমরা বাস্তব মানবিক সংযোগ তৈরি করতে একে সৃজনশীল এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করি, তবে এটি উপকারী। [৫০] সংযোগের মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহার এবং জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে মানুষের সংযোগ আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই আগ্রহ বা অভিন্ন রুচির গোষ্ঠীগুলো এখন তাদের অবস্থান নির্বিশেষে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। একে অপরের সাথে সংযোগ ব্যবহারকারীদের অন্যদের কাছে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে এবং নিজেদের কাছে পরিচয় প্রমাণ করতে সাহায্য করেছে। সংযোগের অনলাইন বিশ্ব নিজেই একটি সম্প্রদায় হয়ে উঠেছে। এখানে মানুষ তারা কে এবং বিশ্বের কোথায় আছেন, তা বিবেচনা না করেই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
হাইভ মাইন্ড
[সম্পাদনা]অনেকেই বলবেন যে হাইভ মাইন্ডের ধারণাটি বহু বছর ধরেই রয়েছে। তবে আজকের দিনে প্রযুক্তি, ফ্যানডম এবং ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হলে এই ধারণাটি বিশেষ করে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
হাইভ মাইন্ডের শক্তি জারন ল্যানিয়ারের লেখা ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম[৫১] প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এতে ল্যানিয়ার আলোচনা করেছেন যে, তার উইকিপিডিয়া পাতায় তাকে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক বলা হয়েছে। এর কিছুটা সত্যতা রয়েছে। ল্যানিয়ার আরও জানান যে তিনি এটি সরানোর চেষ্টা করেছিলেন। "আমি উইকিপিডিয়ার বিকল্প দুনিয়ায় চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে অবসর নেওয়ার চেষ্টা করেছি।" তবে তিনি এও জানান যে পরের দিনই সাধারণত তার সম্পাদনা বাতিল করা হয়। তাই ব্যক্তির ক্ষমতার তুলনায় সমষ্টিগত ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হতে পারে, এটি তা প্রমাণ করে।

পরবর্তী অংশে ল্যানিয়ার[৫২] দেখিয়েছেন যে, সমষ্টির সাথে অসংখ্য মানুষের মন যুক্ত থাকলেও সেটি কীভাবে বোকা হতে পারে। তিনি বহু মানুষের মধ্যে থাকা এই ধারণার কথা বলেন যে, 'কেউ একজন এটি ঠিক করে দেবে' এবং এই সব তথ্য যে কারও কাছে সহজেই পাওয়া যায়। এর ওপর অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করা হয়। "...বিপুল পরিমাণ বৈচিত্র্যময় বিষয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা করার জন্য সঠিক লেখক খুঁজে পেতে পরিশ্রম করতে হয়।"
একই প্রবন্ধে[৫৩] ল্যানিয়ার আরও উল্লেখ করেছেন যে প্রতিটি সমষ্টিই সৎ উদ্দেশ্যে শুরু হয়। এর একটি উদাহরণ হতে পারে তথ্য যুগের শুরুর দিকের কথা। তখন ইয়াহুর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলো একটি সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু গুগল এবং এর উন্নত পরিসেবা আসার পর কে সবচেয়ে বেশি মেটা সাইট হতে পারবে, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। শুরুর দিকে এই কোম্পানিগুলোতে সবকিছুর দায়িত্বে একজন ব্যক্তি থাকলেই চলত। আর এখন একই কাজ করার জন্য অনেক আলাদা মানুষ রয়েছেন। যেমন কমিউনিটি ম্যানেজার, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার ইত্যাদি। রেডিট-এর মতো সাইটগুলোর দায়িত্বে এখন বিভিন্ন অ্যালগরিদম রয়েছে। কারণ হাইভ মাইন্ড একজন ব্যক্তির পক্ষে সামলানো অসম্ভব।
কেউ কেউ বলতে পারেন যে এই সমষ্টিগুলো এখন নিজেদের এবং অন্যান্য ব্যবসাকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করছে। কারণ অ্যালগরিদমগুলো সমষ্টির ওপর তথ্য সংগ্রহ করে হাইভ মাইন্ডের ভেতরের ব্যক্তিদের চাহিদা পূরণ করতে পারে। সরাসরি ব্যক্তির কাছে বিক্রি বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য এমনটি করা হয়। এটি পরোক্ষভাবে এই বিশ্বাসে ভূমিকা রাখে যে, সবচেয়ে বড় মেটা সাইটের অফুরন্ত তহবিল রয়েছে। ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রে আমরা এরই মধ্যে এর শুরু দেখতে পাচ্ছি। এটি বিপরীতটি প্রমাণ করে যে [৫৪]"সমষ্টি সবসময় বোকা নয়।" [৫৫] ল্যানিয়ারের মতে, "সমষ্টির মূল্যবান হওয়ার কারণটিই হলো এর বুদ্ধিমত্তা এবং মূর্খতার চূড়া ব্যক্তিরা সচরাচর যা প্রদর্শন করে, তার মতো নয়।" এখানে তিনি সংখ্যার শক্তির ধারণাকে মেসেজ বোর্ড এবং এ জাতীয় জিনিসগুলোর সাথে যুক্ত করেছেন। এগুলো যাদের ধারণা আছে এবং যারা সেই ধারণাগুলো বাস্তবায়ন করবে, তাদের যুক্ত করতে সাহায্য করে। স্বাধীন প্রকল্প এবং মূলধারার মধ্যে সংযোগ দেখাতে পিউডিপাই-এর উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি ইন্টারনেটে একটি স্বাধীন উপাদান হিসেবে শুরু করেছিলেন। এরপর তার চ্যানেলটিকে ডিজনি মালিকানাধীন কোম্পানি মেকার স্টুডিওস অধিগ্রহণ করলে তিনি দ্রুত মূলধারায় চলে আসেন।
তবে [৫৬] ল্যানিয়ার উল্লেখ করেছেন, অনেকের ক্ষমতা যখন একজনকে দেওয়া হয়, তখন কীভাবে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। "...যখন কাউকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং নিজের কাজের ফলাফল থেকে আড়াল করা হয়।"
সেন্সরিং
[সম্পাদনা]
বাস্তব জীবনের তুলনায় ইন্টারনেটে মতামত প্রকাশের অনেক বেশি স্বাধীন পরিবেশ রয়েছে। তারপরও এটি নির্দিষ্ট উপায়ে সেন্সর করা হয়। ইউটিউব, টুইচ এবং ফেসবুকের মতো নির্দিষ্ট সাইটগুলো অনুপোযোগী বা বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত আধেয় মুছে ফেলবে। এই আধেয়গুলোর মধ্যে যৌন ছবি এবং ভিডিও, আক্রমণাত্মক ভাষা থেকে শুরু করে অন্যান্য অনুপযোগী আধেয় থাকতে পারে। ফোরচ্যান নেটওয়ার্কের মতো কিছু ইন্টারনেট সাইট কোনোভাবেই সেন্সর করে না। এটি সম্পূর্ণ নামহীনভাবে ছবি, লিংক এবং আধেয় পোস্ট করার সুযোগ দেয়। তাই এটি ধারণা এবং চিন্তাভাবনা প্রকাশের জন্য অনেক বেশি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। এটি প্রায়শই এমন জিনিসগুলোকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শেয়ার করার সুযোগ দেয়, যা বাস্তব জীবনে অনুপযোগী বলে বিবেচিত হবে।
টুইচ, ফেসবুক এবং ইউটিউব-এর মতো সাইটগুলোতে ব্যবহারকারীদের সেন্সর করার একাধিক উপায় রয়েছে। আক্রমণাত্মক আধেয়র জন্য টুইচে ব্যবহারকারীদের নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। এটি তাদের সম্প্রচার করতে এবং দর্শকদের সাথে যোগাযোগ করতে বাধা দেয়। টুইচ সাধারণত আধেয়র ক্ষেত্রে বেশ শিথিল। এটি বেশিরভাগ গালি এবং আক্রমণাত্মক আধেয় অনুমোদন করে। এর তুলনায় ফেসবুক অনেক বেশি কঠোর। সহিংস বা যৌনতাপূর্ণ আধেয় পোস্ট করা ব্যবহারকারীদের এটি নিষিদ্ধ করে। বিশেষ করে যেসব দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর সরকারের বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেসব দেশে এটি বেশি দেখা যায়। ইউটিউব ফেসবুকের চেয়ে বেশি শিথিল। এটি এখনো স্পষ্ট যৌন আধেয় সেন্সর করে। তবে এটি কিছুটা সহিংসতা এবং খারাপ ভাষার প্রদর্শন অনুমোদন করে।
প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদ
[সম্পাদনা]প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদ হলো এমন একটি তত্ত্ব, যা প্রস্তাব করে যে ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রযুক্তি এবং মিডিয়া উদ্ভাবনের কারণে ঘটেছে। এটি জানায় যে সামাজিক ভূমিকা এবং রীতিনীতিতে বিপ্লব আনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সমাজের ওপর বাস্তব রূপান্তরমূলক ক্ষমতা রয়েছে। প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্তৃত সংজ্ঞায় একে এমন যেকোনো হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা যায়, যা শারীরিক এবং মানসিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ে কোনো (মানবিক) সমস্যার সমাধান করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ প্রযুক্তি সময়ের সাথে বিকশিত হয়েছে। এটি এখন কেবল ১৪৩৯ সালের গুটেনবার্গের ছাপাখানার মতো বাহ্যিক যন্ত্রপাতির সাথেই যুক্ত নয়। বরং এটি আধুনিক সময়ের কম্পিউটার সফটওয়্যারের মতো ভার্চুয়াল প্রযুক্তির সাথেও যুক্ত।
প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদ নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করা সবচেয়ে বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ছিলেন মার্শাল ম্যাকলুহান। ১৯৬৪ সালের [৫৭] গ্রন্থে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রযুক্তির বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের জীবনযাপন এবং একে অপরের সাথে যোগাযোগের ধরন নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি (যা মূলত থরস্টেইন ভেবলেন তৈরি করেছিলেন) প্রযুক্তিকে ইতিহাসের এবং সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপান্তরকারী নিয়ামক হিসেবে তুলে ধরেছে। ম্যাকলুহান ব্যাখ্যা করেছেন যে মুদ্রণের মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মৌখিক থেকে লিখিত যোগাযোগে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। এরপর টেলিভিশন (চাক্ষুষ যোগাযোগের রূপ হিসেবে) এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটের (বিশ্বব্যাপী তথ্যের একটি সর্বব্যাপী মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম) দিকে এই বিকাশ সহজেই বোঝা যায়।
প্রযুক্তি বিভিন্ন সময়ের প্রধান সময়কালগুলো চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন প্রস্তর যুগ, ব্রোঞ্জ যুগ, যান্ত্রিক যুগ এবং বর্তমানের ডিজিটাল যুগ। প্রতিটি যুগই সে সময়ের প্রধান প্রযুক্তিগত প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত। ম্যাকলুহান প্রযুক্তি এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের ধারণাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন: "যেকোনো মাধ্যমের (আমাদের সত্তার যেকোনো সম্প্রসারণের) ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিণতি প্রতিটি সম্প্রসারণের প্রবর্তিত নতুন মাপকাঠি থেকে জন্ম নেয়"। [৫৮] এখানে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে যে মানবজাতির বর্তমান রূপটি পূর্ববর্তী প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলাফল। একইভাবে পরবর্তী উন্নয়ন হলো সেই সমাজ দ্বারা গঠিত সমাজের ফলাফল। এই সম্পর্ককে মিথোজীবী প্রকৃতির হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কারণ প্রযুক্তি সামগ্রিকভাবে মানবজাতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রযুক্তি এবং মানবতার সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে আরও অনেক সমালোচক এবং লেখক প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের তত্ত্ব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। রোজালিন্ড উইলিয়ামস একে বর্ণনা করেছেন এভাবে: "..একটি তিন শব্দের যৌক্তিক প্রস্তাব: 'প্রযুক্তি ইতিহাস নির্ধারণ করে'"। আরেক তাত্ত্বিক লেলিয়া গ্রিন (প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে) যুক্তি দেন যে, "'আপনি অগ্রগতি থামাতে পারবেন না', এর অর্থ হলো আমরা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম"। নিয়ন্ত্রণের এই ধারণাটি প্রায়শই প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদ বোঝার ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বেশি কট্টর তাত্ত্বিকরা বিশ্বাস করেন যে মানবতা প্রযুক্তির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অথবা আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, মানবতা আমাদের জীবনে প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতার প্রতি নিজের মনোভাব ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করেছে। আত্মসত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের যুক্তিগুলো মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিকাশমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ধারণাকে আকর্ষণ করতে দেখা যায়। প্রযুক্তি আমাদের নিজেদেরই একটি সংস্করণ হিসেবে কাজ করে এবং নতুন রীতিনীতি ও প্রথা তৈরি করে, যা সামাজিকভাবে আমাদের মেনে চলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেবল নিজেদের সক্রিয় মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতেই নয়, বরং অন্যদের সাথে অনলাইন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইটগুলোর প্রায় সর্বজনীন ব্যবহার।
সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ
[সম্পাদনা]সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ হলো একটি সাংস্কৃতিক তত্ত্ব। এটি মূল্যায়ন করে যে সমাজ এবং ইতিহাস কীভাবে কোন প্রযুক্তি তৈরি হবে এবং সেগুলো কী কাজে ব্যবহার হবে তা প্রভাবিত করে। সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদের সংজ্ঞায়নের জন্য প্রথমে সংস্কৃতির সংজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কৃতিকে একটি সমাজের মধ্যে অংশীদার করা মানব চিন্তার পণ্য এবং বিন্যাস হিসেবে বর্ণনা করা যায়।
সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ নিয়ে রেমন্ড উইলিয়ামসের তত্ত্বগুলো প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদ নিয়ে মার্শাল ম্যাকলুহানের পূর্ববর্তী লেখার সমালোচনামূলক ছিল। সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ প্রযুক্তিগত নিয়তিবাদের এই ধারণাগুলোকে কিছুটা প্রত্যাখ্যান করে যে প্রযুক্তি সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায় বা প্রভাবিত করে। এর বদলে প্রযুক্তিকে সমাজের চাহিদার প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিকশিত হতে দেখা যেতে পারে। তাই প্রযুক্তি সমাজের মধ্যে আগে থেকে থাকা বিন্যাসের সাথে একটি সমন্বয় মাত্র। উইলিয়ামস বর্ণনা করেছেন যে "সমস্ত প্রযুক্তি জানা মানবিক চর্চা বা পূর্বাভাসিত এবং কাঙ্ক্ষিত চর্চায় সাহায্য করার জন্য বিকশিত এবং উন্নত করা হয়েছে"। তাই সমাজ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিবর্তিত হওয়ার বদলে প্রযুক্তি সমাজকে অনুসরণ করে। [৫৯] আত্মসত্তার সম্প্রসারণ হিসেবে প্রযুক্তির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ তত্ত্বগুলো বিবেচনা করলে এটি বলা যায় যে, মানুষ স্বভাবতই সামাজিক এবং ভাগ করে নেওয়ার ও যোগাযোগের আগে থেকে থাকা ইচ্ছার জন্যই প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ তত্ত্ব বলে যে সংস্কৃতি 'আমাদের আচরণগত এবং আবেগীয় বিন্যাস' রূপ দেয়। সমাজের ওপর গণমাধ্যমের প্রভাবের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করে রেমন্ড উইলিয়ামস দাবি করেছিলেন যে, সামাজিক প্রক্রিয়া এবং কাঠামো প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে প্রভাবিত করে। ম্যাকলুহানের বিপরীতে উইলিয়ামস প্রমাণ করার লক্ষ্য রেখেছিলেন যে প্রযুক্তি কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। মিডিয়া স্টাডিজ উইলিয়ামসের তত্ত্বকে সমর্থন করার এবং ম্যাকলুহান ও উইলিয়ামসের লেখার মিলগুলোকে উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখায়। উইলিয়ামস যখন লেখেন তখন তার কাছে 'মানুষের সম্প্রসারণ' ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: 'একটি প্রযুক্তি অর্জিত হওয়ার পর একে সাধারণ মানবিক সম্পত্তি, মানব সক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে' ([৬০])। তবে তিনি প্রযুক্তির বিকাশের কারণগুলো নিয়ে ম্যাকলুহানের চেয়ে বেশি আগ্রহী। উইলিয়ামসের মতে প্রযুক্তিগুলো সমাজকে সাহায্য করার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং সেগুলো 'নির্দিষ্টভাবে জড়িত' ([৬১])। তার যুক্তি সমাজতাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল। ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা এবং এজেন্ডা থাকা ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী প্রযুক্তির ব্যবহার গ্রহণ করে, রূপ দেয় বা প্রত্যাখ্যান করে। তাছাড়া উইলিয়ামস দাবি করেন যে প্রযুক্তির চূড়ান্ত প্রভাব এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া কখনো কখনো পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব। তার প্রযুক্তির সম্পূর্ণ ধারণায় নির্দিষ্ট হাতিয়ার বা যন্ত্র ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং দক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তাই সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদ তত্ত্ব প্রযুক্তিকে 'মানুষের সম্প্রসারণ' হিসেবেও বিবেচনা করে। তবে মানুষেরাই সিদ্ধান্ত নেয় যে সমাজের জন্য উপযোগী হওয়ার জন্য কোন প্রযুক্তির বিকাশ প্রয়োজন। এটি রাজনৈতিক এবং আর্থিকভাবে সমস্যাযুক্ত হতে পারে। কারণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং দক্ষতা ছাড়া প্রযুক্তির সাধারণ ব্যবহারকারী আরও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবশালী আদর্শ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত গণমাধ্যমের প্রচারিত চিত্র সামাজিক মানসিকতাকে প্রভাবিত করে।
অন্যান্য প্রভাবশালী চিন্তাবিদ যাদের কাজ সাংস্কৃতিক নিয়তিবাদের সাথে সম্পর্কিত: গোয়েথে, ফিখটে, অগাস্ট, শ্লেগেল, প্যাট্রিক বুকানন এবং রবার্ট বারো। [৬২]
ভবিষ্যৎ
[সম্পাদনা]প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানবজাতিকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে তা বলা কঠিন। অতীতের দিকে তাকালে ম্যাকলুহানের মতো শিক্ষাবিদরা নির্দিষ্ট প্রযুক্তি সম্পর্কে সফল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ভবিষ্যতের মাধ্যম সম্পর্কে তার লেখাগুলো ইন্টারনেট আবিষ্কারের প্রায় তিরিশ বছর আগে ইন্টারনেটের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল বলে মনে হয়। পরবর্তী মাধ্যম যাই হোক না কেন, অতীত ভবিষ্যদ্বাণীগুলো নির্দেশ করে যে প্রযুক্তি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোকে আরও বেশি প্রসারিত করতে থাকবে। ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি)-এর মতো অগ্রগতিগুলো এখন খেলোয়াড়দের অন্য দুনিয়ায় নিমজ্জিত করার লক্ষ্য রাখছে, যা চলচ্চিত্রের জগত বা তার আগের মুদ্রণ মাধ্যম করতে পারেনি। গল্প এবং গেমে নিমজ্জন যদি অর্জিত হয়ে থাকে, তবে সম্ভবত পরবর্তী পদক্ষেপটি যোগাযোগের দুনিয়ায় নিজেদের নিমজ্জিত করা। ইন্টারনেট বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিয়েছে এবং অন্যদের সাথে আমাদের যোগাযোগের ধরন পরিবর্তন করে চলেছে। উচ্চ স্তরের নিমজ্জনের সাথে এই যোগাযোগ যুক্ত করলে তা নিজেদের পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি প্রসারিত করবে। যদি যোগাযোগ ম্যানুয়াল এবং যান্ত্রিক মাধ্যম থেকে ইমেইল এবং ইনস্ট্যান্ট মেসেঞ্জারের সাথে বৈদ্যুতিক মাধ্যমে সরে আসে, তবে সম্ভবত যোগাযোগের সম্প্রসারণের পরবর্তী মাধ্যম আসন্ন।
শব্দকোষ
[সম্পাদনা]- এআই - [৬৩] কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা, যা কম্পিউটারে বুদ্ধিমান আচরণের সিমুলেশন নিয়ে কাজ করে। বুদ্ধিমান মানব আচরণের অনুকরণ করার যন্ত্রের সক্ষমতা।
- অ্যাপ - [৬৪]একটি অ্যাপ্লিকেশন। এটি সাধারণত মোবাইল ডিভাইসে ডাউনলোড করা একটি ছোট, বিশেষায়িত প্রোগ্রাম।
- অবতার - ভিডিও গেম, ইন্টারনেট ফোরাম ইত্যাদিতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বকারী একটি আইকন বা চিত্র। [৬৫]
- সাইবর্গ ("সাইবারনেটিক অর্গানিজম"-এর সংক্ষিপ্ত রূপ) হলো এমন একটি সত্তা, যার জৈব এবং বায়োমেকাট্রনিক উভয় শরীরের অংশ রয়েছে। [৬৬]
- গেমার - [৬৭] একজন ব্যক্তি যিনি গেম খেলেন। বিশেষ করে: একজন ব্যক্তি যিনি নিয়মিত কম্পিউটার বা ভিডিও গেম খেলেন।
- বৈশ্বিক গ্রাম - প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে বিশ্বকে একটি ছোট ভৌত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে ম্যাকলুহানের তৈরি করা একটি শব্দ।
- হাইভ মাইন্ড - অনেক মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি ধারণাগত সত্তা। এরা নিজেদের জ্ঞান বা মতামত একে অপরের সাথে ভাগ করে নেয়। একে নির্বিচার সাদৃশ্য বা যৌথ বুদ্ধিমত্তা তৈরির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। [৬৮]
- ইম্প্রেশন ম্যানেজমেন্ট - একটি সচেতন বা অবচেতন প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে মানুষ কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। [৬৯]
- গণ ব্যক্তিগত যোগাযোগ - বৃহত্তর দর্শকদের সাথে ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ভাগ করে নেওয়া বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ।
- মিডিয়া কনভারজেন্স -[৭০] তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এবং মিডিয়া আধেয়র আন্তঃসংযোগ জড়িত একটি প্রপঞ্চ। এটি "তিনটি সি"-কে (কম্পিউটিং, কমিউনিকেশন এবং কনটেন্ট) একত্র করে। এটি মিডিয়া আধেয়র ডিজিটাইজেশন এবং ইন্টারনেটের জনপ্রিয়তার প্রত্যক্ষ পরিণতি।
- মেটা - <ref>
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। (২০১০)। "মিসিং পারসনস"। ইন ইউ আর নট আ গ্যাজেট: আ ম্যানিফেস্টো। (পৃষ্ঠা ৩-২৩)। নিউ ইয়র্ক: ভিন্টেজ।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ম্যাকলুহান, এম. (১৯৬৪)। আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া: দি এক্সটেনশনস অব ম্যান। নিউ ইয়র্ক: ম্যাকগ্র-হিল
- ↑ ওয়াকার রেটবার্গ, জিল। "সিয়িং আওয়ারসেল্ভস থ্রু টেকনোলজি", ২০১৪।
- ↑ ডি'অ্যামিকো, এরিকা। "হোয়াই ইনস্টাগ্রাম" ইন "দি এলিমেন্টস অব লিবিডিনাল ইকোনমি ইন ইনস্টাগ্রাম", পৃষ্ঠা ১, ২০১৫।
- ↑ ডি'অ্যামিকো, এরিকা। "হোয়াই ইনস্টাগ্রাম" ইন "দি এলিমেন্টস অব লিবিডিনাল ইকোনমি ইন ইনস্টাগ্রাম", পৃষ্ঠা ১, ২০১৫।
- ↑ ডি'অ্যামিকো, এরিকা। "হোয়াই ইনস্টাগ্রাম" ইন "দি এলিমেন্টস অব লিবিডিনাল ইকোনমি ইন ইনস্টাগ্রাম", পৃষ্ঠা ১, ২০১৫।
- ↑ আথিক, আদ্রিয়ান। (ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন। পলিটি। আইএসবিএন 978-0-7456-6228-2
- ↑ উইলিয়ামস, আর. (১৯৯০ [১৯৭৪]) টেলিভিশন: টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ফর্ম। লন্ডন: রাউটলেজ।
- ↑ ওয়াকার রেটবার্গ, জিল। "সিয়িং আওয়ারসেল্ভস থ্রু টেকনোলজি", ২০১৪
- ↑ হিল, এ. (১৯৯৭)। শকিং এন্টারটেইনমেন্ট: ভিউয়ার রেসপন্স টু ভায়োলেন্ট মুভিজ। লুটন, বেডফোর্ডশায়ার, যুক্তরাজ্য: ইউনিভার্সিটি অব লুটন প্রেস।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জ্যারন। "ডিজিটাল মাওইজম: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ http://fansconf.a-kon.com/dRuZ33A/wp-content/uploads/2013/07/Who-You-Want-to-Be-Video-Games-as-Identity-Reflexive-Texts-by-James-Bales.pdf
- ↑ টার্কল, এস. অ্যালোন টুগেদার: হোয়াই উই এক্সপেক্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার, ২০১১, পৃষ্ঠা ১৫৪
- ↑ টার্কল, এস. অ্যালোন টুগেদার: হোয়াই উই এক্সপেক্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার, ২০১১, পৃষ্ঠা ২১৪
- ↑ ব্রুকস, ডেভিড। "ওভারস্টিমুলেটেড সাবারবিয়া।" পিকচারিং টেক্সটস। এড লেস্টার ফাইগলি, ডায়ানা জর্জ, আনা পালচিক এবং সিনথিয়া সেলফ। নিউ ইয়র্ক: ডব্লিউ.ডব্লিউ. নর্টন অ্যান্ড কোম্পানি। ২০০৪। ৩৬৬- ৩৭৩
- ↑ টার্কল, এস. অ্যালোন টুগেদার: হোয়াই উই এক্সপেক্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার, ২০১১
- ↑ http://pegasus.cc.ucf.edu/~smathews/history.html
- ↑ http://waitbutwhy.com/table/online-dating-good-thing-bad-thing
- ↑ http://www.nydailynews.com/life-style/one-third-u-s-marriages-start-online-dating-study-article-1.1362743
- ↑ http://www.vanityfair.com/culture/2015/08/tinder-hook-up-culture-end-of-dating
- ↑ https://www.theguardian.com/lifeandstyle/womens-blog/2014/mar/24/online-dating-lesbians-app-dattch-women
- ↑ http://www.telegraph.co.uk/science/2016/03/15/the-science-of-dating-why-we-should-stop-dating-online/
- ↑ https://medium.com/media-theory-and-criticism/tinder-ya-or-nah-1b0b02c2c9e1#.kl77wy7o1
- ↑ পাপাচারিসি, জিজি। আ নেটওয়ার্কড সেল্ফ, জিজি পাপাচারিসি সম্পাদিত, টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস, ২০১০
- ↑ http://www.telegraph.co.uk/science/2016/03/15/the-science-of-dating-why-we-should-stop-dating-online/
- ↑ http://www.buryfreepress.co.uk/news/opinion/shallow-pitfalls-of-online-dating-1-7357235
- ↑ https://books.google.co.uk/books?id=8erNPbPQdDoC&pg=PA33&lpg=PA33&dq=youtube+and+creation+of+identity&source=bl&ots=qWiT45CyxN&sig=ewP2f-EtSjY8ziHpmsemETUGGOM&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwj9jaCT2MLSAhUmKcAKHTWuCK04ChDoAQgfMAE#v=onepage&q=youtube%20and%20creation%20of%20identity&f=false
- ↑ আথিক, এ. ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন, ২০১৩, হোবোকেন, এনজে, পৃ. ২২৪ - ২৪৪
- ↑ আথিক, এ. ডিজিটাল মিডিয়া অ্যান্ড সোসাইটি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন, ২০১৩, হোবোকেন, এনজে, পৃ. ২২৪ - ২৪৪
- ↑ টার্কল, এস. অ্যালোন টুগেদার: হোয়াই উই এক্সপেক্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার, ২০১১, পৃ.২৬৫
- ↑ টার্কল, এস. অ্যালোন টুগেদার: হোয়াই উই এক্সপেক্ট মোর ফ্রম টেকনোলজি অ্যান্ড লেস ফ্রম ইচ আদার, ২০১১
- ↑ মাইকেল ম্যান্ডিবার্গ, আমেরিকান কাউন্সিল অব লার্নড সোসাইটিজ, দ্য সোশ্যাল মিডিয়া রিডার, ২০০১, পৃ.৭১
- ↑ |author=ডাউনিং, গ্যারি |year=২০১৩ |title=ভার্চুয়াল ইয়ুথ: নন-হেটেরোসেক্সুয়াল ইয়াং পিপলস ইউজ অব দ্য ইন্টারনেট টু নেগোশিয়েট দেয়ার আইডেন্টিটিজ অ্যান্ড সোশিও-সেক্সুয়াল রিলেশনস |url=http://www.tandfonline.com/doi/pdf/10.1080/14733285.2013.743280?needAccess=true |publisher=রুটলেজ |doi=10.1080/14733285.2013.743280
- ↑ |author=ডাউনিং, গ্যারি |year=২০১৩ |title=ভার্চুয়াল ইয়ুথ: নন-হেটেরোসেক্সুয়াল ইয়াং পিপলস ইউজ অব দ্য ইন্টারনেট টু নেগোশিয়েট দেয়ার আইডেন্টিটিজ অ্যান্ড সোশিও-সেক্সুয়াল রিলেশনস |url=http://www.tandfonline.com/doi/pdf/10.1080/14733285.2013.743280?needAccess=true |publisher=রুটলেজ |doi=10.1080/14733285.2013.743280
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ওয়াকার রেটবার্গ, জিল। "সিয়িং আওয়ারসেলভস থ্রু টেকনোলজি", ২০১৪।
- ↑ ওয়াকার রেটবার্গ, জিল। "সিয়িং আওয়ারসেলভস থ্রু টেকনোলজি", ২০১৪।
- ↑ ওয়াকার রেটবার্গ, জিল। "সিয়িং আওয়ারসেলভস থ্রু টেকনোলজি", ২০১৪।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ বয়েড, ডি. (২০১২)। পার্টিসিপেটিং ইন দ্য অলওয়েজ-অন কালচার। এম. ম্যান্ডিবার্গ (সম্পাদিত), দ্য সোশ্যাল মিডিয়া রিডার (পৃ. ৭১-৭৬)। নিউ ইয়র্ক: এনওয়াইইউ প্রেস
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। (২০১০)। মিসিং পারসনস। ইউ আর নট আ গ্যাজেট: আ ম্যানিফেস্টো। (পৃ. ৩-২৩)। নিউ ইয়র্ক: ভিন্টেজ।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ ল্যানিয়ার, জারন। "ডিজিটাল মাওবাদ: দ্য হ্যাজার্ডস অব দ্য নিউ অনলাইন কালেক্টিভিজম", ২০০৬।
- ↑ |author=ম্যাকলুহান, মার্শাল |year=১৯৬৪ |title=আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া: দ্য এক্সটেনশনস অব ম্যান |location=কানাডা |publisher=ম্যাকগ্র-হিল |isbn=81-14-67535-7
- ↑ |author=ম্যাকলুহান, মার্শাল |year=১৯৬৪ |title=আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া: দ্য এক্সটেনশনস অব ম্যান |location=কানাডা |publisher=ম্যাকগ্র-হিল |isbn=81-14-67535-7
- ↑ উইলিয়ামস, আর. (১৯৯০ [১৯৭৪]) টেলিভিশন: টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ফর্ম। লন্ডন: রুটলেজ।
- ↑ উইলিয়ামস, আর. (১৯৯০ [১৯৭৪]) টেলিভিশন: টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ফর্ম। লন্ডন: রুটলেজ।
- ↑ লিস্টার, মার্টিন, ডাভে, জন, গিলিংস, সেথ নিউ মিডিয়া: আ ক্রিটিক্যাল ইন্ট্রোডাকশন, হোবোকেন, ২০০৮ পৃ. ৭৭ - ৭৫
- ↑ https://en.wikipedia.org/wiki/Cultural_determinism
- ↑ https://www.merriam-webster.com/dictionary/artificial%20intelligence
- ↑ http://www.dictionary.com/browse/app
- ↑ https://en.oxforddictionaries.com/definition/avatar
- ↑ https://en.wikipedia.org/wiki/Cyborg
- ↑ https://www.merriam-webster.com/dictionary/gamer
- ↑ http://www.dictionary.com/browse/hive-mind
- ↑ https://en.wikipedia.org/wiki/Impression_management
- ↑ https://www.britannica.com/topic/media-convergence