বিষয়বস্তুতে চলুন

লুইস ক্যারল/শিশু বন্ধু ও প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধু

উইকিবই থেকে

সম্ভবত লুইস ক্যারল সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো—তিনি কখনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রতি কোনো ভালোবাসা বা মমতা অনুভব করেননি। বলা হয়, তিনি ছোট মেয়েদের (ছেলে নয়) প্রতি অস্বাভাবিক রকমের আকৃষ্ট ছিলেন, এমনকি অনেকে তাকে পেডোফাইল বলেও অভিহিত করেছেন। আরও বলা হয়, তার শৈশববন্ধুরা বড় হয়ে গেলে তিনি তাদের আর চিনতে চাইতেন না। এসব অভিযোগ তার স্মৃতির ওপর এক নির্মম কলঙ্ক।

আসলে, তিনি অনেক নারীর সঙ্গেই গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, এমনকি তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বহু বছর পরেও। তাছাড়া, তার শিশু বন্ধুদের মধ্যে কিছু ছেলেও ছিল। যেমন—গ্রেভিল ম্যাকডোনাল্ড, হলাম টেনিসন (কবির পুত্র) এবং অভিনেতা বার্ট কুট।

হতে পারে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের সঙ্গে সহজে বন্ধুত্ব করতে লজ্জা পেতেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি তাদের সঙ্গ উপভোগ করতেন না। যখন কোনো মেয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তৈরি হতো, তখন সে মেয়ে যদি দূরে সরে না যেত, তিনি সেই সম্পর্ক প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও টিকিয়ে রাখতেন।

মেরি ব্রাউন

[সম্পাদনা]

মেরি ব্রাউন (১৮৬১–?) ছিলেন দীর্ঘদিনের বন্ধু। ১৮৮২ সালের ১১ অক্টোবরের এক চিঠিতে ক্যারল লেখেন, "তুমি যে এখনো আমার প্রতি শৈশববন্ধুত্বের টান রেখে চলেছ, এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে। অনেকেই তো বড় হয়ে গেলে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে।" এর থেকে বোঝা যায়, বন্ধুত্ব নষ্ট হতো সাধারণত তার তরুণ বন্ধুদের পক্ষ থেকেই। তিনি নিজে খুশিমনে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চাইতেন।

এস. ডি. কলিংউড তার 'লাইফ অ্যান্ড লেটারস'-এ (পৃষ্ঠা ৪১৩) বলেন, "সে এমন বন্ধুত্ব কামনা করত যা টিকে থাকে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় সে তা পায়নি।"

১৮৮৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর (তখন মেরি ২৮) তারিখে লেখা চিঠিতে ক্যারল বলেন, "বৃদ্ধ বয়সে—৫৭ বছর বয়সে নিজেকে বৃদ্ধ বলা চলে কিনা জানি না—আমার একটা আনন্দ হলো, শৈশববন্ধুরা যখন নারী হয়ে ওঠে, তখন তাদের জীবনের গোপন দুঃখের অংশীদার হতে পারা, আর তাদের যতটা পারি সান্ত্বনা ও পরামর্শ দিতে পারা।"

জারট্রুড চ্যাটাওয়ে

[সম্পাদনা]

জারট্রুড চ্যাটাওয়ে (১৮৬৬–১৯৫১) ছিলেন ক্যারলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু। ক্যারল তার ‘দ্য হান্টিং অফ দ্য স্নার্ক’ গ্রন্থটি তাকে উৎসর্গ করেন। ১৮৭৬ সালের প্রথম সংস্করণে লেখা থাকে: "এক প্রিয় শিশুকে উৎসর্গকৃত: রৌদ্রোজ্জ্বল গ্রীষ্মের ঘন্টার এবং গ্রীষ্মের সমুদ্রের মৃদু শব্দের স্মৃতিতে।" উৎসর্গের পরের কবিতায় তার নাম লুকানো আছে দুটি ভিন্ন উপায়ে।

ক্যারল পরে যখন ১৮৮৩ সালে 'রাইম অ্যান্ড রিজন' সংকলনে বইটি অন্তর্ভুক্ত করেন, তখনো তিনি উৎসর্গপত্রটি রেখে দেন।

তারা আজীবন বন্ধু ছিলেন। মেয়েরা বড় হলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন—এই কথার কোনো প্রমাণ এখানে নেই। ১৮৯৩ সালের ১৯–২৩ সেপ্টেম্বর জারট্রুড ২৭ বছর বয়সে ইস্টবোর্নে ক্যারলের সঙ্গে ছিলেন। আরও থাকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সদ্য বিধবা হওয়া পিতা একা ছিলেন বলে ফিরে যান।

তাদের সম্পর্কে কখনো কিছু অনুচিত ঘটনার সন্দেহ উত্থাপন করা হয়নি। ১৮৯৫ সালের ১ জানুয়ারির একটি চিঠিতে (তখন তার বয়স ২৮), ক্যারল চিঠি শুরু করেন “আমার প্রিয় জারট্রুড” এবং শেষ করেন “তোমার ভালোবাসার পুরনো বন্ধু” বলে।

ইডিথ রিক্স

[সম্পাদনা]

ইডিথ রিক্স (১৮৬৬–১৯১৮) ছিলেন আরেকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ক্যারল যখন ‘আ ট্যাঙ্গলড টেল’ নামে দশ পর্বের সিরিজ প্রকাশ করছিলেন (১৮৮০–৮৫), তখন তিনি ইডিথের নাম জানেন।

প্রতিটি পর্বে একটি গল্প থাকত, যার মধ্যে গণিত সম্পর্কিত ধাঁধা থাকত। পাঠকেরা তাদের সমাধান পাঠাতেন এবং ক্যারল তাদের উত্তর শ্রেণিবদ্ধ করতেন—গ্রেড I, II, III (বা ভুল হলে ফেল)। বেশির ভাগ পাঠক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কিন্তু ই. এম. রিক্স শেষ প্রশ্নে উত্তর দিয়ে গ্রেড I অর্জন করেন।

তারা প্রথম দেখা করেন ১৮৮৫ সালের ২৫ জুনে (তখন ইডিথের বয়স ১৯)। ক্যারল তার ডায়রিতে লেখেন, “ইডিথ ও আমি যেন বহুদিনের চেনা বন্ধু।” ২৭ জুন তিনি ও ইডিথ এবং তার মা একসাথে রয়্যাল একাডেমি ভিজিট করেন। দুপুরে ইডিথের মা চলে যান, আর ইডিথ রাত ৮টা পর্যন্ত ক্যারলের সঙ্গেই থাকেন।

১৮৮৫ সালে ‘আ ট্যাঙ্গলড টেল’ এক খণ্ডে প্রকাশিত হলে ক্যারল সেখানে একটি কবিতায় তার নাম লুকিয়ে দিয়ে উৎসর্গ করেন, শুরু করেন “প্রিয় শিক্ষার্থী” বলে।

১৮৮৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে লেখা শেষ চিঠিতেও ক্যারল তাকে সম্বোধন করেন “অতি প্রিয় ইডিথ” বলে। ১৮৯৭ সালের ২১ আগস্ট তিনি ইডিথের সঙ্গে চা খান—মৃত্যুর কয়েক মাস আগেই।

থিওডোসিয়া হিফি

[সম্পাদনা]

থিওডোসিয়া হিফি (১৮৫৯–১৯২০; পরে মিসেস রাসেল-মরিস) ছিলেন আরেকজন, যার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও বন্ধুত্ব অটুট থাকে। ১৮৮৪ সালের ১৪ এপ্রিল এক বন্ধুকে ক্যারল লেখেন, “এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই মিসেস জি—আমার আরেক তরুণী বন্ধুর কথা বলছেন। সে তো কেবল ২৫–২৬ বছর বয়সী!”

বিয়ের পরও তারা বন্ধু ছিলেন। থিওডোসিয়ার ছেলে ভিভিয়ান যখন হাসপাতালে ছিল, ক্যারল তাকে দেখতে যান। ক্যারলের বোন ভিভিয়ানকে ‘নার্সারি অ্যালিস’ বইটি উপহার দেন, তাতে লেখা ছিল: “ভিভিয়ানের জন্য, এল. ডজসনের ভালোবাসাসহ।”

দ্যা ড্রুরি সিস্টার্স

[সম্পাদনা]

লুইস ক্যারল ১৮৬৯ সালে এক ট্রেনযাত্রায় তিন ড্রুরি বোনের সঙ্গে পরিচিত হন। তারা ছিলেন মেরি (১৮৫৯–১৯৩৫), ইসাবেলা (১৮৬২–১৮৮৪), এবং এমিলি (১৮৬৪–১৯৩০)। বিয়ের পরও তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। এমনকি মৃত্যুর তিন মাস আগেও, ১৮৯৭ সালের ৩০ অক্টোবর মেরির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন।

কেন এই কল্পকাহিনীর উদ্ভব ?

[সম্পাদনা]

সম্ভবত ক্যারলের বোন মেরি তার তরুণী বন্ধুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। জারট্রুড চ্যাটাওয়ে ১৮৯৩ সালে যখন ক্যারলের সঙ্গে ছিলেন, তখন তার কাছ থেকে একটি চিঠি আসে। ক্যারল উত্তর দেন ২১ সেপ্টেম্বর: “তোমার মতো চিঠি পেলে খুব ভালো লাগে। তুমি আমার মেয়ে অতিথিদের নিয়ে যে কথাগুলো বলেছ, সেগুলো খুব দয়ালু ও বোনসুলভ... তবে আমি এ নিয়ে কোনো বিতর্কে যেতে চাই না।”

তিনি আরও লেখেন, তিনি অন্যদের মতামত নিয়ে চিন্তিত নন। তার নিজের বিবেকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মেরির ছেলে স্টুয়ার্ট কলিংউড ছিলেন ক্যারলের জীবনীকার। পরে তিনি স্বীকার করেন, তার মা ও খালারা ভাইকে এত ভালোবাসতেন যে তার কোনো মানবিক দুর্বলতার কথা কেউ বলুক, এটা তারা সহ্য করতে পারতেন না।

তাদের মৃত্যুর পরও, যখন রজার ল্যান্সেলিন গ্রিন ১৯৫৩ সালে ক্যারলের ডায়েরি প্রকাশ করেন, তখন ক্যারলের জীবিত ভাতিজিরা তাকে মূল পাণ্ডুলিপি দেখাতে দেননি। তাকে একটি ছাঁটাইকৃত প্রতিলিপি থেকেই কাজ করতে হয়।

যখন আসল ডায়েরিগুলি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে জমা পড়ে, তখন দেখা যায় কিছু খণ্ড নিখোঁজ এবং কিছু পাতাও ছেঁড়া।

সুতরাং, ক্যারলের পরিবার সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে তার প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গোপন করতে চেয়েছিল, যেন বোঝায় যায় তিনি কেবল নিষ্পাপ, শিশুসুলভ সম্পর্কই করতেন। কিন্তু এতে উল্টো প্রভাব পড়েছে।

টেমপ্লেট:Lewis Carroll/Navigation