বিষয়বস্তুতে চলুন

লুইস ক্যারল/মিস্টার ডজসন ও মিস্টার ক্যারল

উইকিবই থেকে

লুইস ক্যারল সাধারণত তার "বাস্তব জীবনের" পরিচয় সি. এল. ডজসন খুব সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখতেন। তিনি এই বিষয়ে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তিনি একটি মুদ্রিত নোটিশ তৈরি করেছিলেন, যা "Stranger circular" নামে পরিচিত। যখন তিনি সি. এল. ডজসনের নামে লেখা এমন চিঠি পেতেন, যেখানে লুইস ক্যারলের প্রসঙ্গ থাকত, তিনি সেই চিঠিগুলো এই নোটিশসহ ফেরত পাঠাতেন। সেই নোটিশে সংক্ষেপে লেখা ছিল, "মিস্টার ডজসন . . . কোনো ছদ্মনাম বা এমন কোনো বইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক দাবি করেন না বা স্বীকার করেন না, যা তার নিজের নামে প্রকাশিত হয়নি।"

ল্যাংফোর্ড রিড এবং এভলিন হ্যাচ

[সম্পাদনা]

ল্যাংফোর্ড রিড তার জীবনীতে এমনকি এই পরামর্শও দেন যে, তাকে যেন দুই জন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়—"প্রফেসর" (sic) ডজসন, যিনি গাণিতিক বিষয়ে খুবই বিরক্তিকর বই লিখতেন, এবং লুইস ক্যারল, যিনি শিশুদের গল্প লিখতেন। কিন্তু বাস্তবে তা মোটেই সত্য নয়। লুইস ক্যারল নামেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও গম্ভীর লেখা এবং কিছু গাণিতিক কাজ প্রকাশিত হয়েছে। আবার সি. এল. ডজসনের নামে অন্তত একটি হাস্যরসাত্মক কাজও প্রকাশিত হয়েছে। আরও কিছু লেখা অন্যান্য ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

ক্যারলের বন্ধু এভলিন হ্যাচ ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত তার চিঠির সংগ্রহে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন: "এই পৃষ্ঠাগুলিতে 'মিস্টার ডজসন' এর উপস্থিতি আছে, যিনি 'অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড'-এর লেখকের মতোই অনন্য এবং মনোমুগ্ধকর এক চরিত্র।" এই বইতে আছে কল্পনাপ্রসূত হাস্যরস, কিছু 'লুইস ক্যারল', কিছু 'সি. এল. ডজসন' নামে স্বাক্ষরিত, আর একটি ক্ষেত্রে দুজনের নামেই।

"লুইস ক্যারল" নামেই প্রকাশিত গণিত ও যুক্তিবিদ্যার কাজ

[সম্পাদনা]

এ ট্যাংগলড টেল

[সম্পাদনা]

এ ট্যাংগলড টেল ছিল একটি ধারাবাহিক গল্প, যা ১৮৮০-৮১ সালে দশটি পর্বে প্রকাশিত হয় এবং ১৮৮৫ সালে বই হিসেবে পুনর্মুদ্রিত হয়। এটি একটি রসিক গল্প, বলা ভাল তিনটি গল্প, যা ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয় এবং শেষ অধ্যায়ে একত্রিত হয়। প্রতিটি পর্বে গল্পের সঙ্গে এক বা একাধিক গাণিতিক ধাঁধা সংযোজিত ছিল। পাঠকদের উত্তর পাঠাতে আহ্বান জানানো হতো। তিনি এসব উত্তর মূল্যায়ন করতেন—I, II, III বা ফেল হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করতেন এবং নিজের সমাধান ও সমালোচনাও প্রকাশ করতেন। গল্পটি ছিল পুরোপুরি ক্যারলীয় ধাঁচের। কিছু ধাঁধাও রসিকতা ছিল, তবে বেশিরভাগ ধাঁধা ছিল গম্ভীর গাণিতিক সমস্যাভিত্তিক। সুতরাং এটি একধরনের গাণিতিক শিক্ষা উপাদান, যেটি তার অন্যান্য পাঠ্যপুস্তকের মতোই গুরুত্ব বহন করে, পাশাপাশি এটি একটি লুইস ক্যারলের উপন্যাস।

সংক্ষেপে, এই কাজটি ক্যারল এবং ডজসন দুই চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

দ্যা গেম অফ লজিক

[সম্পাদনা]

দ্যা গেম অফ লজিক প্রথমে ১৮৮৬ সালে একটি ব্যক্তিগত সংস্করণে প্রকাশিত হয়, পরে ১৮৮৭ সালে সাধারণ বিক্রির জন্য প্রকাশিত হয়। এটি ছিল শিশুদের যুক্তিবিদ্যার পাঠ শেখানোর একটি চেষ্টা, যাতে বোর্ড ও কাউন্টার ব্যবহার করা হতো। যদিও বিশ্লেষণযোগ্য যুক্তি প্রস্তাবে কিছুটা ক্যারলীয় রসিকতা আছে, যেমন:

সব ড্রাগন অদ্ভুত
সব স্কটসম্যান বুদ্ধিমান
অতএব
সব ড্রাগন স্কটসম্যান নয়
সব স্কটসম্যান ড্রাগন নয়

তবুও এটি মূলত প্রাথমিক যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে একটি আলোচনা।

সিম্বলিক লজিক

[সম্পাদনা]

সিম্বলিক লজিক, প্রথম খন্ড ১৮৯৬ সালে লুইস ক্যারলের বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। ক্যারল আরও দুটি পর্ব পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তা শেষ করতে পারেননি। যে পরিমাণ লেখা পাওয়া যায়, তা ১৯৭৭ সালে W. W. Bartley সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন (২য় সংস্করণ ১৯৮৬)। এটি একটি গুরুত্ববহ যুক্তিবিদ্যার পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা, যা সাম্প্রতিক কালে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আবারও, বিশ্লেষণযোগ্য প্রস্তাবে কিছু হাস্যরস রয়েছে, কিন্তু "দুই ব্যক্তির তত্ত্ব" অনুযায়ী এটি মূলত ডজসনের কাজ, যাতে ক্যারলের অবদান সামান্য।

"লুইস ক্যারল" দ্বারা প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ন কাজ

[সম্পাদনা]

কবিতা

[সম্পাদনা]

"লুইস ক্যারল" ছদ্মনামটি শুধু অ্যালিস বইয়ের জন্য তৈরি হয়নি। অনেক বছর আগে তিনি এই নামে "The Train" নামক একটি পত্রিকায় বেশ কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। এর কিছু যেমন—"Solitude", "The Path of Roses", এবং "The Sailor's Wife"—সম্পূর্ণরূপে গম্ভীর কবিতা। তার শেষ বই "Three Sunsets" (তার মৃত্যুর পরপরই প্রকাশিত) এই কবিতাগুলো এবং আরও কয়েকটি গম্ভীর কবিতা অন্তর্ভুক্ত করে।

ভিভিসেকশনের বিরোধিতা

[সম্পাদনা]

ক্যারল ভিভিসেকশনের দৃঢ় বিরোধী ছিলেন। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৫ সালে Pall Mall Gazette-এ "Vivisection as a sign of the Times" শিরোনামে একটি চিঠি প্রকাশ করেন এবং The Fortnightly Review-এ ১ জুন ১৮৭৫-এ "Some Popular Fallacies about Vivisection" শিরোনামে একটি বিশদ প্রবন্ধ লেখেন। দশ বছর পরে তিনি আবার "Vivisection Vivisected" শিরোনামে The St. James's Gazette-এ ১৯ মার্চ ১৮৮৫-এ লিখেছিলেন। এই সবগুলো লেখা ভিভিসেকশনের বিরুদ্ধে গুরুতর যুক্তি প্রদর্শন করে। সবগুলোতেই স্বাক্ষর ছিল "লুইস ক্যারল" নামে।

নির্বাচনে স্বচ্ছতা

[সম্পাদনা]

১৮৮১ সালের ৪ মে St. James's Gazette-এ "Purity of Election" শিরোনামে লুইস ক্যারলের স্বাক্ষরসহ একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। এটি নির্বাচনে ঘুষ ও দুর্নীতি এড়ানোর উপায় নিয়ে একেবারেই গম্ভীর আলোচনা।

ইউক্লিড এবং তাঁর আধুনিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা

[সম্পাদনা]

এই বইটি ১৮৭৯ সালে (২য় সংস্করণ ১৮৮৫) সি. এল. ডজসনের নামে প্রকাশিত হয়। এটি উনিশ শতকের বিভিন্ন জ্যামিতির পাঠ্যবইয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ। শুনতে বিরক্তিকর মনে হলেও এতে অনেক উপাদান রয়েছে, যা উল্টো দিক নির্দেশ করে। পুরো বইটি একজন পরীক্ষক মিনোসের স্বপ্ন হিসেবে উপস্থাপিত, যার সহকর্মী রাধামান্থাসের মতোই নাম গ্রিক পুরাণের বিচারকদের নাম থেকে নেওয়া। মিনোস ইউক্লিডের ভূতের সঙ্গে দেখা করে এবং একজন জার্মান অধ্যাপক হার নিঅমান্ড (মি. নোবডি) এর সঙ্গে কথা বলেন, যিনি স্পষ্টতই Sylvie and Bruno বইয়ের Mein Herr এর অনুরূপ চরিত্র। বইটিতে প্রচুর রসিকতা আছে, যেমন (পৃষ্ঠা ৩):

Minos: সে যেমন বলতে পারে, কোনো তরুণী, যদি একজন যুবকের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাহলে সে ‘সমানভাবে ও সদৃশভাবে’ সকল যুবকের প্রতিই আকৃষ্ট!
Rhadamanthus: সে সম্ভবত সবার সঙ্গে ‘সমান কোণে ঝুঁকে’ থাকতে পারে, যাই হোক।

এবং Through the Looking-Glass-এর আলোচনার অনুরূপ একটি অংশ, যেখানে White King ও Haigha "Nobody" নিয়ে কথা বলেন (পৃষ্ঠা ১৮২):

Niemand: চূড়ান্ত তালিকাটি? আচ্ছা, আপনার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করুন, সেই তালিকা তৈরি হওয়ার পর থেকে কেউ যুক্ত হয়েছে কি না: সে বলবে ‘কেউ যুক্ত হয়নি।’
Minos: ঠিক তাই।
Niemand: আপনি বুঝতে পারছেন না। "Nobody - Niemand - আপনি দেখছেন না?"
Minos: কী? আপনি বলতে চাইছেন—
Niemand (গম্ভীরভাবে): হ্যাঁ, আমার বন্ধুরা। আমিই যুক্ত হয়েছি!
Minos (নম্রভাবে): কমিটি অবশ্যই অত্যন্ত গর্বিত।
Niemand: তা তো উচিতও, কারণ আমি নিউটনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ এবং আমার ম্যানুয়াল ইউক্লিডের চেয়েও বেশি পরিচিত! আমাকে মাফ করবেন, আত্মপ্রশংসা করলাম, তবে যে কোনো নীতিবিদ বলবেন, আমিই একমাত্র মানুষ, যার নিজেকে প্রশংসা করা উচিত।

এই লেখকের কি সত্যিই কোনো হাস্যরস নেই? তিনি কি শুধু একঘেয়ে শিক্ষক ছিলেন?

অন্যান্য ছদ্মনাম

[সম্পাদনা]

লুইস ক্যারল আরও অনেক ছদ্মনামে লেখালেখি করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনা নিয়ে D. C. L. নামক স্পষ্ট একটি ছদ্মনামে কিছু ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছেন (যা তার নামের আদ্যক্ষরের পুনর্বিন্যাস)। এই লেখাগুলোর কিছু যেমন "The New Method of Evaluation as Applied to Π" এবং "The Dynamics of a Parti-cle" অনেক গণিত নিয়ে আলোচনা করে। এসব কাজ "দুই ব্যক্তি" তত্ত্বে খাপ খায় না, যদি না আমরা ধরে নেই যে D. C. L. ছিল তৃতীয় কোনো ব্যক্তি।

টেমপ্লেট:Lewis Carroll/Navigationলুইস ক্যারল