ঝিঙে দিয়ে মুসুর ডাল
| ঝিঙে দিয়ে মুসুর ডাল | |
|---|---|
| পরিবেশন | ৪-৫ জন |
| তৈরির সময় | ৩০-৪০ মিনিট |
| কষ্টসাধ্য | |
রন্ধনপ্রণালী | প্রস্তুতপ্রণালী | উপকরণ | যন্ত্রপাতি | কৌশল | রন্ধনপ্রণালী দ্ব্যর্থতা নিরসন পাতা | প্রস্তুতপ্রণালী
ঝিঙে দিয়ে মুসুর ডাল বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়, পুষ্টিকর, আর নিরামিষ বা আমিষ উভয়ভাবেই রান্নার উপযোগী একটি ঐতিহ্যবাহী তরকারি। গ্রাম বাংলার হেঁশেল থেকে শুরু করে শহুরে রেস্তোরাঁর মেন্যু, সর্বত্রই এর কদর সমান। সহজপাচ্য এই ডালটি গরম গরম ভাতের সঙ্গে খেতে যেমন অসাধারণ, তেমনি পেটের সমস্যা কিংবা অসুখ-বিসুখের দিনে পথ্য হিসেবেও এর জুড়ি নেই। মুসুর ডালের আমিষের সঙ্গে ঝিঙের হালকা মিষ্টি স্বাদ আর নরম আঁশ এক অনন্য স্বাদের সমন্বয় গড়ে তোলে। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে যখন বাজারে সুলভে তাজা ঝিঙে পাওয়া যায়, তখন বাংলার ঘরে ঘরে এই পদটি নিয়মিত রান্না হয়। এটি রান্না করতে সময় কম লাগে, উপকরণও হাতের কাছে পাওয়া যায়, তাই ব্যস্ত দিনের রান্নাঘরে এটি যেন এক আর্শীবাদ। চলুন জেনে নেওয়া যাক সহজ এই রেসিপিটি।
উপকরণ
[সম্পাদনা]| নাম | উপকরণ |
|---|---|
| মুসুর ডাল | ১ কাপ |
| ঝিঙে (তাজা ও কচি) | ২টি (বড় সাইজের হলে ১টি) |
| পেঁয়াজ (মাঝারি, কুচি করা) | ২টি |
| রসুন কোয়া (থেঁতলানো) | ৪-৫ কোয়া |
| শুকনা মরিচ | ২-৩টি |
| হলুদের গুঁড়া | ১ চা-চামচ |
| জিরা (গোটা) | আধা চা-চামচ |
| লবণ | স্বাদমতো |
| সরিষার তেল | ২ টেবিল-চামচ |
| পানি | পরিমাণমতো (প্রায় ২-৩ কাপ) |
| তেজপাতা | ১টি (ইচ্ছামতো) |
| ধনে পাতা কুচি | সাজানোর জন্য প্রয়োজনমতো |
রন্ধনপ্রণালী
[সম্পাদনা]- প্রথমেই মুসুর ডাল ভালোভাবে বেছে পরিষ্কার করে নিন। ডালের মধ্যে অনেক সময় ছোট পাথর বা কাঁকর মিশানো থাকে। এরপর পানি দিয়ে ২-৩ বার ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রাখুন। ডাল কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে দ্রুত সেদ্ধ হয়, তবে সময়াভাবে সরাসরি সেদ্ধ করলেও চলে।
- এবার ঝিঙে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিন। খোসা ছাড়ানোর সময় খেয়াল রাখবেন যেন খুব পুরো না ছাড়ান। ঝিঙের উপরের সবুজ খোসাটুকু হালকা করে ছাড়ালেই হবে। তারপর ঝিঙে ধুয়ে ছোট ছোট চৌকো টুকরো কিংবা চিকন লম্বা আঙুলের মতো করে কেটে নিন। কচি ঝিঙে হলে বিচি ফেলার দরকার নেই, তবে বেশি পাকা হলে ভেতরের নরম বিচি অংশটুকু চামচ দিয়ে ফেলে দিয়ে ভালো অংশ কেটে নিতে হবে।
- একটি পাত্র বা কড়াই গ্যাসের চুলায় বসিয়ে তাতে ধুয়ে রাখা মুসুর ডাল দিন। এরপর পরিমাণমতো পানি দিন— খেয়াল রাখবেন পানি যেন ডালের উপরিভাগ থেকে প্রায় ১ ইঞ্চি ওপরে থাকে। পানি বেশি দিলে ডাল পাতলা হয়ে যাবে, আর কম দিলে পুড়ে যেতে পারে। এই পর্যায়ে হলুদের গুঁড়া ও স্বাদমতো লবণ দিয়ে ডাল সেদ্ধ করতে দিন। প্রাথমিকভাবে আঁচ মিডিয়াম রাখুন।
- ডাল ফুটতে শুরু করলে আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিন। ১০-১২ মিনিটের মধ্যে ডাল সেদ্ধ হতে শুরু করবে। ডাল সেদ্ধ হয়ে এলে একটি খুন্তি বা হাতা দিয়ে হালকাভাবে ঘুটে নিন, যেন ডালগুলো ভেঙে যায় এবং মিশ্রণটি ঘন হয়। যদি প্রয়োজন মনে হয়, অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে ডালের ঘনত্ব নিজের পছন্দমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যাঁরা পাতলা ডাল পছন্দ করেন, তাঁরা একটু বেশি পানি দেবেন; আর ঘন ডাল পছন্দ করলে পানি কমিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে রাখুন।
- ডাল যখন প্রায় সেদ্ধ হয়ে মাখা মাখা ভাব চলে এসেছে, ঠিক তখনই কেটে রাখা ঝিঙের টুকরোগুলো ডালের মধ্যে ছেড়ে দিন। ঝিঙে খুব তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়, তাই এটি দেরিতে দিতে হবে। ঝিঙে দিয়ে আরও ৫-৭ মিনিট ঢেকে সেদ্ধ হতে দিন। খেয়াল রাখবেন ঝিঙে যেন গলে না যায়, বরং কামড় দেওয়ার মতো একটু মচমচে ভাব থাকে। ঝিঙের এই ক্রাঞ্চিনেস ডালটির স্বাদ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
- পাশাপাশি অন্য একটি ছোট কড়াইয়ে ফোড়ন বা তড়কা তৈরি করে নিন। কড়াইয়ে সরিষার তেল দিন। তেল গরম হয়ে ধোঁয়া উঠতে শুরু করলে আঁচ একটু কমিয়ে তেজপাতা ও গোটা জিরা দিন। জিরার গন্ধ বের হলে শুকনা মরিচ ছিঁড়ে দিন অথবা আস্ত দিন। কিছুক্ষণ নেড়ে নিন, লক্ষ্য রাখবেন শুকনা মরিচ যেন পুড়ে কালো না হয়ে যায়।
- এবার এর মধ্যে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে দিন। পেঁয়াজের রং হালকা সোনালি বা বাদামি না হওয়া পর্যন্ত ভাজতে থাকুন। পেঁয়াজ ভালোমতো ভাজা হলে ডালের স্বাদ অসাধারণ হয়। পেঁয়াজ ভাজা হয়ে এলে থেঁতলানো রসুন দিয়ে আরও ১ মিনিট নেড়েচেড়ে ফোড়নের কড়াই নামিয়ে ফেলুন। তেল এবং মসলার সুগন্ধ বের হলে বোঝা যাবে ফোড়ন পারফেক্ট হয়েছে।
- তৈরি ফোড়নটি পুরোপুরি সেদ্ধ হওয়া ঝিঙে-মেশানো মুসুর ডালের ওপর ঢেলে দিন। ফোড়ন ঢালার সময় সাবধানে থাকবেন, গরম ডালে তেল দিলে ছিটে আসতে পারে। ফোড়ন দিয়ে একটি হাতা বা খুন্তি দিয়ে পুরো ডালটি ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। একবার নেড়ে ঢাকনা দিয়ে আরও ২-৩ মিনিট চুলায় রেখে দিন, যেন ফোড়নের সব সুগন্ধ ডালের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
- রান্না শেষে ওপরে ধনে পাতা কুচি ছড়িয়ে দিন। ধনে পাতার সবুজ রং লালচে ডাল ও সাদাটে ঝিঙের মধ্যে দারুণ একটি বৈপরীত্য আনে, যা দেখতেও অত্যন্ত লোভনীয় লাগে।
পরামর্শ
[সম্পাদনা]ঝিঙে কেনার সময় সবসময় আকারে ছোট এবং কচি ঝিঙে বেছে নিন, কারণ এগুলোতে আঁশ কম হয় ও দ্রুত সেদ্ধ হয়। ডাল রান্নার আগে চাইলে ডাল ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখতে পারেন, এতে ডাল দ্রুত সেদ্ধ হবে এবং ঝুরঝুরে হবে। যাঁরা নিরামিষ রান্না করতে চান, তাঁরা পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া শুধু জিরা ও শুকনা মরিচের ফোড়ন দিয়ে ডাল রান্না করতে পারেন। আবার আমিষ পদের জন্য চাইলে ফোড়নে ১টি পেঁয়াজ কুচি ও ২ কোয়া রসুন হালকা ভেজে নিতে পারেন, তাতেই স্বাদ বদলে যাবে। অনেকেই ডালে রসুন বাটা দিয়ে খেতে ভালোবাসেন, সেক্ষেত্রে ফোড়নের সময় পেঁয়াজের সঙ্গে এক চা-চামচ রসুন বাটা দিতে পারেন। রান্নার শেষে কয়েক ফোঁটা কাঁচা সরিষার তেল দিয়ে দিলে সোঁদা একটা গন্ধ আসে, যা ভাতের সঙ্গে দারুণ মানানসই। ডালে যদি একটু টক স্বাদ আনতে চান, তাহলে পরিবেশনের আগে সামান্য লেবুর রস ছিটিয়ে দিন। মনে রাখবেন, মুসুর ডাল বেশিক্ষণ রান্না করলে এর পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়, তাই মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট রান্নাই যথেষ্ট। এই ডালটি ফ্রিজে রেখে পরের দিন গরম করে খেলেও স্বাদ ঠিক থাকে, তবে ঝিঙে পুনরায় গরম করলে নরম হয়ে যেতে পারে বলে তা তাজা অবস্থাতেই খাওয়ার চেষ্টা করাই ভালো।