মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস/পুনর্গঠন
পুনর্গঠনের সূচনা
[সম্পাদনা]
১৮৬৭ সালের ২ মার্চতারিখে কংগ্রেস প্রথম পুনর্গঠন আইন পাস করে। দক্ষিণকে পাঁচটি সামরিক জেলায় ভাগ করা হয়। প্রতিটিতে একজন মেজর জেনারেল নিযুক্ত হন। প্রতিটি রাজ্যে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেখানে মুক্তিপ্রাপ্ত পুরুষ দাসদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। এই আইনে একটি সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাতে বলা ছিল যে, দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলো ১৪তম সংশোধনী অনুমোদন এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করলে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে পারবে। রাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রু জনসন তৎক্ষণাৎ এই বিলটিতে ভেটো দেন, কিন্তু কংগ্রেস একই দিনেই এটি আবার পাস করে।
অ্যান্ড্রু জনসন সামরিক জেলার প্রশাসকের পদে নিয়োগের আগে জেনারেল ইউলিসিস এস গ্রান্টের পরামর্শ নেন। পরে তিনি নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেন: জন স্কোফিল্ড (ভার্জিনিয়া), ড্যানিয়েল সিকলস (দ্য ক্যারোলিনাস), জন পোপ (জর্জিয়া, আলাবামা এবং ফ্লোরিডা), এডওয়ার্ড অর্ড (আর্কানসাস এবং মিসিসিপি), এবং ফিলিপ শেরিডান (লুইজিয়ানা এবং টেক্সাস)।
মার্কিন গৃহযুদ্ধ চলাকালে জাতি সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল কীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোকে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হবে এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের (ফ্রিডম্যান) অবস্থান কী হবে।টেমপ্লেট:Fix বেশিরভাগ গবেষক ১৮৬৫-১৮৭৭ সালকে পুনর্গঠনের সময়সীমা হিসেবে মেনে নেন।
এই যুগটি ছিল বিতর্কিত এবং মার্কিন সমাজের বিভিন্ন অংশ একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। কনফেডারেট অঙ্গরাজ্যগুলোকে কীভাবে পুনরায় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের মর্যাদা কী হবে — এই প্রশ্নে বিভিন্ন মতবিরোধ দেখা দেয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্বাধীনতার অর্থ নিয়েই দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সদ্য গঠিত রিপাবলিকান পার্টির একটি প্রধান অংশ চেয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য কিছুটা সুরক্ষা, আর র্যাডিকালরা ]'চেয়েছিল দক্ষিণের সমাজব্যবস্থার সম্পূর্ণ পুনর্গঠন। এই সময়ে কনজারভেটিভ (বিশেষত ডেমোক্র্যাটরা) বিশ্বাস করত যে, অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে এবং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে পূর্ববর্তী সম্পর্কের ব্যবস্থাই টিকে থাকা উচিত।
বেশিরভাগ আফ্রিকান-মার্কিন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং অনেকক্ষেত্রে জমির পুনর্বন্টন এবং কারখানা ব্যবস্থার ভাঙনের দাবি করেছিল। এই বিভিন্ন মতামতের মধ্য দিয়ে ১৮৬৫ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত সময়কাল এক অর্থে আন্তবর্ণীয় গণতন্ত্রের একটি বিশাল পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু এই সময়জুড়ে দক্ষিণে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সহিংসতাও বিরাজ করেছিল।
সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে পুনর্গঠন বলতে সেই সময়কালকে বোঝায় যা মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর শুরু হয়েছিল, যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকার রাজ্যগুলোকে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং এটি সেই প্রক্রিয়াকেও বোঝায় যার মাধ্যমে এটি সম্পন্ন হয়।
মার্কিন গৃহযুদ্ধে বিজয় অর্জনের জন্য, উত্তরাঞ্চলের মধ্যপন্থী রিপাবলিকান এবং র্যাডিকাল রিপাবলিকানরা একমত হয়েছিল যে কনফেডারেসি এবং এর দাসপ্রথার ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হবে এবং যাতে এটি আর কখনও ফিরে আসতে না পারে সে নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই লক্ষ্যগুলো কীভাবে অর্জন করা হবে এবং কখন তা অর্জিত হয়েছে তা নির্ধারণ করবে কে—এই বিষয়গুলো নিয়েই মূল বিতর্ক ছিল। র্যাডিকাল রিপাবলিকানরা বিশ্বাস করত যে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনই ছিল স্লেভ পাওয়ার ধ্বংস করার জন্য অপরিহার্য এবং এটি অঙ্গরাজ্যগুলোর চিরস্থায়ী ঐক্য নিশ্চিত করার জন্য এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের (ফ্রিডম্যান) নানা সমস্যার সমাধানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাসাচুসেটসের মার্কিন সিনেটর চার্লস সামনার একজন র্যাডিক্যাল রিপাবলিকান ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন যে কংগ্রেসকে দাসপ্রথার সাথে সাথে কনফেডারেসিও বিলুপ্ত করতে হবে, কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার দিতে হবে এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের একসাথে শিক্ষা দিতে হবে।
“মধ্যপন্থীরা” দাবি করেছিল যে, কনফেডারেটরা বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করেছে এবং দাসপ্রথা বিলুপ্ত করেছে—এই নিশ্চয়তার মাধ্যমে তারা লক্ষ্য পূরণে প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করেছে। আব্রাহাম লিংকন এবং অ্যান্ড্রু জনসনের মতো বেশিরভাগ মধ্যপন্থী চাইতেন শুধু কৃষ্ণাঙ্গ সাবেক সৈনিকদের ভোটাধিকার প্রদান করতে, অন্য আফ্রিকান-আমেরিকানদের নয়। দক্ষিণের রাজনৈতিক নেতারা বিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করে এবং দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে, কিন্তু ১৮৬৭ সালে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যখন তাদের অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোকে ফেডারেল সামরিক বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সেগুলোর স্থলে র্যাডিক্যাল রিপাবলিকান সরকার গঠন করে, যেগুলোর নেতৃত্বে ছিল ফ্রিডম্যান, কার্পেটব্যাগার এবং স্ক্যালাওয়াগ।
তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ব্ল্যাক কোডস (১৮৬৫)। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার সীমিত করে অর্থনৈতিক ও শিক্ষার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণে চাকরির সুযোগ প্রায় ছিলই না। ইয়াঙ্কিরা দাসপ্রথা বিলুপ্ত করার জন্য যুদ্ধ জিতলেও পুনর্গঠনকাল চাকরির জন্য সংগ্রাম করা কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের উপকারে আসেনি।
পুনর্গঠনের সমস্যা
[সম্পাদনা]
পুনর্গঠন ছিল দাসশ্রমের পরিবর্তে মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে দক্ষিণকে পুনর্গঠন করার একটি প্রয়াস। উত্তরের রাজনীতিকদের জন্য প্রধান প্রশ্ন ছিল—এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। গৃহযুদ্ধের শেষে কংগ্রেস ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রস্তাব করে। এটি দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়। সংশোধনীটি অনুমোদন করা ছাড়া তখন কোনো রাজ্যকে পুনরায় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কিন্তু মিসিসিপির মতো কিছু রাজ্য সংশোধনীটি অনুমোদন না করেও অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৬৫ সালের ৬ ডিসেম্বরে সংশোধনীটি সংবিধানের অংশ হয়ে যায়।
এই সময় বহু উত্তরাঞ্চলীয় ব্যক্তি নতুন জীবন শুরু করতে দক্ষিণে চলে যান। অনেকে কার্পেট দিয়ে তৈরি ব্রিফকেসে তাদের মালপত্র বহন করতেন। এজন্য কনফেডারেট দক্ষিণবাসীরা তাদের "কার্পেটব্যাগার" নামে ডাকত। দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ রিপাবলিকানদের জন্যও তাদের কাছে একটি অবমাননাকর নাম ছিল—"স্ক্যালাওয়াগ"। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে "ব্ল্যাক কোডস" নামক আইন চালু হয়, যা মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের মৌলিক মানবাধিকার সীমিত করে। এসব আইনের মধ্যে সাধারণ কিছু ছিল: জাত নির্ধারণে রক্তের ভিত্তি প্রযোজ্য—মানে শরীরে সামান্য পরিমাণ কৃষ্ণাঙ্গ রক্ত থাকলেও তাকে কৃষ্ণাঙ্গ গণ্য করা হতো; মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গের অনুপস্থিতিতে একত্র হতে পারত না; গণশৌচাগারসহ অন্যান্য সুবিধা ছিল পৃথক।[১]
এই সময় ছিল অত্যন্ত অস্থির। দেশজুড়ে বহু জাতিগত সহিংস দাঙ্গা শুরু হয়। দক্ষিণে উত্তরের প্রতি এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের প্রতি বিদ্বেষ ক্রমেই বৃদ্ধি পায়।
কু ক্লাক্স ক্লান
[সম্পাদনা]
- কু ক্লাক্স ক্লান" (Ku Klux Klan বা KKK) যুক্তরাষ্ট্রে গঠিত বেশ কয়েকটি সংগঠনের নাম, যেগুলো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, ইহুদিবিদ্বেষ, ক্যাথলিকবিদ্বেষ, বর্ণবাদ, সমকামবিদ্বেষ, সাম্যবাদবিরোধিতা এবং জাতীয়তাবাদ প্রচারে বিশ্বাসী ছিল। এই সংগঠনগুলো প্রায়শই সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কাজ করত, যেমন: আগুনে ক্রুশ দাহ, লিঞ্চিং ইত্যাদি, যার লক্ষ্য ছিল আফ্রিকান-আমেরিকান এবং অন্যান্য সামাজিক ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর উপর নিপীড়ন চালানো।
প্রথম কু ক্লাক্স ক্লান গঠিত হয় টেনেসির পুলাস্কিতে, ১৮৬৬ সালের মে মাসে। এক বছর পর, ১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে ন্যাশভিলে স্থানীয় ক্লানগুলোকে একত্র করে একটি সাধারণ সংগঠন গঠিত হয়। অধিকাংশ নেতাই ছিলেন কনফেডারেট সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য এবং প্রথম "গ্র্যান্ড উইজার্ড" ছিলেন নাথান ফরেস্ট, যিনি গৃহযুদ্ধে একজন বিশিষ্ট জেনারেল ছিলেন। পরবর্তী দুই বছরে, মুখোশ পরা ক্লান সদস্যরা, সাদা টুপি ও চাদরে আবৃত হয়ে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান এবং সহানুভূতিশীল শ্বেতাঙ্গদের নির্যাতন ও হত্যা করে। তারা অভিবাসীদেরও লক্ষ্যবস্তু করে, যাদের তারা র্যাডিকাল রিপাবলিকানদের নির্বাচনের জন্য দায়ী মনে করত। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে কু ক্লাক্স ক্লান উত্তর ক্যারোলিনা, টেনেসি এবং জর্জিয়ায় শ্বেতাঙ্গ শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই সংগঠনের প্রথম আবির্ভাব ঘটে ১৮৬৬ সালে। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কনফেডারেট সেনার সাবেক সৈনিকেরা। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুনর্গঠনের বিরোধিতা। তারা "কার্পেটব্যাগার" ও "স্ক্যালাওয়াগ" দমন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের দমন করার চেষ্টা করে। ক্লান দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। দক্ষিণের অভিজাত শ্রেণি ক্লানকে ত্যাগ করে, কারণ তারা এটি ফেডারেল সেনার দক্ষিণে থাকার একটি অজুহাত হিসেবে দেখত। সংগঠনটি ১৮৬৮ থেকে ১৮৭০ সালের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ১৮৭১ সালের "সিভিল রাইটস অ্যাক্ট" (যা "কু ক্লাক্স ক্লান অ্যাক্ট" নামেও পরিচিত) এর আওতায় প্রেসিডেন্ট উলিসিস এস. গ্রান্টের দৃঢ় পদক্ষেপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
আমেরিকান গৃহযুদ্ধের শেষে, কংগ্রেস বিদ্রোহী রাজ্যগুলোর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ধ্বংস করার চেষ্টা করে। ১৮৬৫ সালের ৩ মার্চ কংগ্রেস "ফ্রিডম্যান ব্যুরো" প্রতিষ্ঠা করে। এর লক্ষ্য ছিল মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের স্বার্থ রক্ষা করা। এর মধ্যে ছিল নতুন চাকরি খুঁজতে সাহায্য করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন। পরবর্তী এক বছরে ব্যুরো প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ৪,০০০ স্কুল, ১০০ হাসপাতাল স্থাপন করে এবং দাসদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করে।
আফ্রিকান-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা পুনর্গঠনের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় এবং ১৮৬৭ সালের পর আরও সংগঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্লান পুনর্গঠন ব্যর্থ করতে এবং মুক্তি পাওয়া দাসদের দমন করতেই কাজ করত। কিছু অঞ্চলে সন্ত্রাস এতটাই প্রচলিত হয়ে পড়ে যে, রাতের বেলা হেনস্তা, চাবুক মারা, মারধর, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ছিল সাধারণ ঘটনা। ক্লানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক—যদিও তারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচার করত যারা তাদের অধিকার রক্ষায় দাঁড়াত। সক্রিয় রিপাবলিকানরা ছিল অন্ধকার রাতের আইনবহির্ভূত আক্রমণের মূল লক্ষ্য। যখন দক্ষিণ ক্যারোলিনার একজন স্ক্যালাওয়াগের অধীনে কাজ করা মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গরা ভোট দিতে শুরু করে, তখন সন্ত্রাসীরা সেই বাগানে গিয়ে, এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, “যে যত কৃষ্ণাঙ্গকে পেয়েছে, সবাইকে চাবুক মেরেছে।”
লিংকন ও পুনর্গঠন
[সম্পাদনা]
লিংকন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে দক্ষিণী অঙ্গরাজ্যগুলো প্রকৃতপক্ষে কখনোই ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি, কারণ সংবিধান অনুযায়ী তারা তা করতে পারে না। তিনি আশা করেছিলেন যে বিচ্ছিন্ন হওয়া ১১টি অঙ্গরাজ্য কিছু রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত পূরণ করে পুনরায় "পুনঃঅঙ্গীভূত" হতে পারে। লিংকন পুনঃঅঙ্গীভুক্তি নিয়ে অনেক আগেই ভাবতে শুরু করেছিলেন। ১৮৬৩ সালে তাঁর জারি করা ক্ষমার ঘোষণা ও পুনর্গঠন প্রস্তাবে তিনি একটি সহজ প্রক্রিয়া স্থাপন করেন, যাতে ইউনিয়নপন্থীরা রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসতে পারে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নয়। এই পরিকল্পনায় সকল দক্ষিণী (সে সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের বাদে) যারা ভবিষ্যতে ইউনিয়নের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেবে, তাদের রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদান করা হতো। ১৮৬০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানকারী জনগণের ১০ শতাংশ এই শপথ গ্রহণ করলেই কোনো অঙ্গরাজ্যকে বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যেত এবং দাসমুক্তির নীতিকে মেনে একটি সরকার গঠন করা যেত।
লিংকনের এই রাষ্ট্রপতি পুনর্গঠন পরিকল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেসের র্যাডিকাল রিপাবলিকানরা দাবি করেছিল এটি খুবই কোমল। তারা ১৮৬৪ সালে ওয়েড-ডেভিস বিল পাশ করে, যা অনেক কঠোর শর্ত আরোপ করে। এই বিলে ৫০ শতাংশ ভোটারকে আনুগত্যের শপথ নিতে বলা হয় এবং শুধুমাত্র যারা কখনো কনফেডারেসিকে সমর্থন করেননি তারাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন বা ফেডারেল চাকরি পেতেন। লিংকন এই বিলটি গ্রহণ না করে পকেট ভেটো করেন। ১৮৬৫ সালের মার্চে কংগ্রেস ফ্রিডম্যান ব্যুরো নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করে। এই সংস্থা কৃষ্ণাঙ্গ ও দরিদ্র শ্বেতাঙ্গদের জন্য খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা, চাকরি খোঁজার সহায়তা, শিক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করত। এটি ছিল সে সময়ের বৃহত্তম সরকারি সাহায্য কার্যক্রম। এটি ছিল প্রথম বড় আকারের ফেডারেল কল্যাণ কর্মসূচি।

১৮৬৪ সালে লিংকনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত হন টেনেসির অ্যান্ড্রু জনসন, যিনি ছিলেন একমাত্র দক্ষিণী সেনেটর যিনি ইউনিয়নের প্রতি অনুগত ছিলেন। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল লিংকন নিহত হলে জনসন রাষ্ট্রপতি হন এবং কংগ্রেসের র্যাডিকাল রিপাবলিকানদের জন্য তিনি একটি প্রধান বাধা হয়ে ওঠেন। তারা দক্ষিণের সরকার ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিলেন, যা আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করত।
১৮৬৫ সালের মে মাসে জনসন নিজস্ব এক ঘোষণা জারি করেন, যা লিংকনের ঘোষণার সঙ্গে খুবই মিল ছিল। তিনি ইউনিয়নের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়া প্রায় সকল কনফেডারেটকে ক্ষমা প্রদানের প্রস্তাব দেন এবং ফ্রিডম্যানদের জন্য জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত শার্মানের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। জনসন রাষ্ট্রপতি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তার পরিকল্পনার আওতায় সব প্রাক্তন কনফেডারেট অঙ্গরাজ্য পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গীভূত হয়। ১৮৬৬ সালে জনসন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল ভেটো করেন — একটি ছিল ফ্রিডম্যান ব্যুরোর সুরক্ষা জোরদার করার জন্য এবং অন্যটি ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য একটি নাগরিক অধিকার বিল।
পরে রিপাবলিকানরা বুঝতে পারে যে মধ্যপন্থী ও র্যাডিকাল রিপাবলিকানরা একত্রিত হলে তারা জনসনের ভেটো অতিক্রম করতে পারবে, এবং তারা ১৮৬৬ সালে নাগরিক অধিকার আইন এবং চতুর্দশ সংশোধনী পাশ করে। এই সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সকল ব্যক্তিকে নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে তাদের অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য করে। নাগরিক অধিকার আইন দক্ষিণে প্রচলিত ব্ল্যাক কোডসমূহকে অবৈধ ঘোষণা করে।
জনসনের ভেটোর পরও কংগ্রেস ১৮৬৭ সালে তিনটি পুনর্গঠন আইন পাশ করে। এতে দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যগুলোকে পাঁচটি সামরিক জেলায় বিভক্ত করা হয় এবং সেখানে ইউনিয়ন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। প্রতিটি জেলার সামরিক কমান্ডার নিশ্চিত করতেন যে সংশ্লিষ্ট রাজ্য চতুর্দশ সংশোধনী অনুমোদন করছে এবং বর্ণবৈষম্যহীন ভোটাধিকার প্রদান করছে। টেনেসি ১৮৬৬ সালেই সংশোধনী অনুমোদন করায় এটি সামরিক জেলার বাইরে রাখা হয়।
১৮৬৮ সালে প্রতিনিধি পরিষদ অ্যান্ড্রু জনসনকে অভিশংসিত করে। এর আগে কংগ্রেস টেনিওর অফ অফিস অ্যাক্ট পাশ করেছিল (জনসনের ভেটোর পর), যেখানে বলা হয় রাষ্ট্রপতির নিয়োগে সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতির মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার জন্যও একই পরামর্শ ও সম্মতি লাগবে। জনসন এই আইনের সাংবিধানিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন (এবং ১৯২৬ সালে সুপ্রিম কোর্টও একমত হয়) এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইনটি লঙ্ঘন করেন একটি পরীক্ষা করার জন্য। র্যাডিকাল রিপাবলিকানরা এটি একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তাঁকে অভিশংসন করে, কিন্তু সেনেট এক ভোটের ব্যবধানে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
১৮৬৮ সালের নির্বাচনে উলিসিস গ্রান্ট রিপাবলিকান প্রার্থী হন এবং অল্প ব্যবধানে জয়লাভ করেন। রিপাবলিকানরা বুঝতে পারে, তারা যদি দ্রুত কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত না করে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। তাই কংগ্রেস ১৮৬৯ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী পাশ করে, যা বর্ণের কারণে পুরুষ নাগরিকদের ভোটাধিকার অস্বীকার করা যাবে না বলে বলে। এটি নারীবাদী আন্দোলনের জন্য একটি বড় আঘাত ছিল, কারণ এই প্রথমবার লিঙ্গকে ইচ্ছাকৃতভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রিপাবলিকানরা দাবি করে, যদি এই সংশোধনীতে বর্ণ ও লিঙ্গ উভয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকত, তবে এটি কংগ্রেসে পাশ হতো না।
কংগ্রেসে আফ্রিকান-আমেরিকানরা
[সম্পাদনা]
এই সময়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনেক আফ্রিকান-আমেরিকান কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। পুনর্গঠন আইন অনুসারে ফেডারেল সেনাবাহিনী দক্ষিণী অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রেরিত হয় এবং সাউথ ক্যারোলাইনা ও মিসিসিপিতে আফ্রিকান-আমেরিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং লুইজিয়ানা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও আলাবামায় শ্বেতাঙ্গদের প্রায় সমান সংখ্যায় ছিল, ফলে এসব রাজ্য থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা কংগ্রেসে নির্বাচিত হন।
জন উইলিস মেনার্ড ১৮৬৮ সালে লুইজিয়ানার ২য় জেলা থেকে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যালেব হান্ট নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান এবং উভয় প্রার্থীর বক্তব্য শুনে প্রতিনিধি পরিষদ কাউকেই আসন দেয়নি।
হাইরাম রেভেলস মিসিসিপির সিনেট দ্বারা ৮১-১৫ ভোটে নির্বাচিত হন, গৃহযুদ্ধ চলাকালে পদত্যাগকারী সেনেটর আলবার্ট জি. ব্রাউনের শূন্য আসন পূরণে। তিনি ১৮৭০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮৭১ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
জোসেফ রেইনি ১৮৭০ সালের নির্বাচনে সাউথ ক্যারোলাইনার ১ম জেলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫০-এর দশকে উইলিয়াম এল. ডসনের আগে পর্যন্ত কংগ্রেসে দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী আফ্রিকান-আমেরিকান সদস্য ছিলেন।
ব্লাঞ্চ ব্রুস ১৮৭১ সালে মিসিসিপির স্টেট সিনেট দ্বারা পূর্ণ মেয়াদে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হন। ব্রুস ছিলেন একমাত্র প্রাক্তন দাস, যিনি মার্কিন সিনেটে দায়িত্ব পালন করেন।
আলাস্কা ক্রয়
[সম্পাদনা]
১৭৭০-এর দশক থেকে রুশ সাম্রাজ্য আলাস্কা উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে।[২] ১৮৬৭ সালের ৩০ মার্চ মার্কিন সরকার রুশ সাম্রাজ্য থেকে আলাস্কা ৭.২ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়।[৩] সে সময় এই সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে উপহাস করা হয়েছিল, কিন্তু পরে যখন সেখানে সোনা ও তেলের সন্ধান মেলে, তখন এটি একটি লাভজনক চুক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়।[৩] সেই অঞ্চলে থাকা অল্পসংখ্যক রুশ বসবাসকারীকে তিন বছরের মধ্যে রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার অথবা থেকে গিয়ে আমেরিকান নাগরিক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।[৩]
১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দা
[সম্পাদনা]
১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দা ছিল গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপে অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত প্রথম মন্দা। এই মন্দা আন্তর্জাতিকভাবে রূপার চাহিদা হ্রাস পাওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়া যুদ্ধের পর জার্মানি রুপা মানদণ্ড ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭৩ সালের কয়েনেজ আইন পাশ করে, যা আমাদের মুদ্রা ব্যবস্থাকে সোনা ও রুপার পরিবর্তে কেবলমাত্র সোনার ওপর নির্ভর করে তৈরি করে। এই আইন রুপার মান তৎক্ষণাৎ কমিয়ে দেয় এবং পশ্চিমাঞ্চলের খনিশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১৮৭৩ সালের মন্দার আরেকটি কারণ ছিল ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেলপথ কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত বিনিয়োগ, যা দ্রুত লাভ এনে দিতে পারেনি। জে কুক অ্যান্ড কোম্পানি নামক একটি মার্কিন ব্যাংক ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮৭৩ সালে দেউলিয়া ঘোষণা করে। ব্যাংকটি অতিরিক্ত রেলপথ ব্যবসায় বিনিয়োগ করার কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ২০ সেপ্টেম্বর ১৮৭৩ থেকে দশ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সেই মন্দার সময়ে ৩৬৪টি রেলপথ কোম্পানির মধ্যে ৮৯টি ব্যর্থ হয়।
মন্দার সময়ে রিয়েল এস্টেটের মূল্য, মজুরি এবং কর্পোরেট মুনাফা হ্রাস পায়। হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও এই মন্দায় বন্ধ হয়ে যায়। এই মন্দা প্রেসিডেন্ট গ্রান্টের দ্বিতীয় মেয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল।
১৮৭৭ সালের মহা রেল ধর্মঘট
[সম্পাদনা]
১৮৭৭ সালের ১৪ জুলাই পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মার্টিন্সবার্গে এই ধর্মঘট শুরু হয়। এই ধর্মঘটের কারণ ছিল বাল্টিমোর অ্যান্ড ওহিও রেলরোড কোম্পানির বেতন কর্তন। শ্রমিকরা রেলপথ চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। ধর্মঘট দমন করতে রাজ্য মিলিশিয়া পাঠানো হলেও তারা ধর্মঘটকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। গভর্নর হেনরি ম্যাথিউস ধর্মঘট দমন ও রেল চলাচল পুনরায় শুরু করতে ফেডারেল সেনা মোতায়েনের আহ্বান জানান।
ধর্মঘটটি কুম্বারল্যান্ড, মেরিল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সেনারা ধর্মঘটকারীদের একটি জনতার ওপর গুলি চালায় এবং দশজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়। এই ধর্মঘট ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, পিটসবার্গ এবং এমনকি সেন্ট লুইস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মঘটে কোটি কোটি ডলারের সম্পদের ক্ষতি হয় এবং বহু প্রাণহানি ঘটে।
এই মহা ধর্মঘট ৪৫ দিন স্থায়ী হয়, শেষ পর্যন্ত শহর থেকে শহরে ফেডারেল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে এটি দমন করা হয়।
রিপাবলিকানদের ক্ষমতাচ্যুতি
[সম্পাদনা]গ্রান্টের শাসনামলেই রিপাবলিকান পার্টির পতনের সূত্রপাত ঘটে। তিনি ফেডারেল পদ ও মন্ত্রিসভায় বিপুল সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেন। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেকেই পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যরা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ক্লান্ত হয়ে দক্ষিণের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পুনর্মিলনের প্রস্তাব দেন। এরা নিজেদের 'লিবারেল রিপাবলিকান' বলে পরিচয় দেন এবং ১৮৭২ সালে গ্রান্টের বিরুদ্ধে হোরেস গ্রিলিকে মনোনয়ন দেন। ডেমোক্র্যাটরাও গ্রিলিকে সমর্থন করে। তবে ব্যাপক সমর্থন সত্ত্বেও, গ্রান্ট ১৮৭২ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হন।
নির্বাচনের মৌসুমে, লিবারেল রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে 'অ্যামনেস্টি অ্যাক্ট' (ক্ষমাপ্রদান আইন) পাশ করাতে ব্যস্ত ছিল এবং ১৮৭২ সালের মে মাসে এই আইন পাশ হয়। এই আইনটি অধিকাংশ সাবেক কনফেডারেট নাগরিকদের ক্ষমা করে দেয় এবং তাদের জন্য রাজনৈতিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ উন্মুক্ত করে। এর ফলে দক্ষিণে ডেমোক্রেটদের রাজনৈতিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে। শীঘ্রই ভার্জিনিয়া ও নর্থ ক্যারোলিনার সরকারগুলো ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যেসব অঙ্গরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকানদের সংখ্যা ছিল বেশি, সেসব স্থানে কু ক্লুক্স ক্লান (গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী) রিপাবলিকানদের আতঙ্কিত করে তোলে এবং তাদেরকে ডেমোক্রেটদের ভোট দিতে অথবা ভোট না দিতে বাধ্য করে। ১৮৭৬ সালের মধ্যে দক্ষিণে রিপাবলিকানরা কেবল তিনটি রাজ্যে—ফ্লোরিডা, লুইজিয়ানা এবং সাউথ ক্যারোলিনায়—ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়, যার সবকটিতেই তখনো ইউনিয়ন সেনা মোতায়েন ছিল।
গ্রান্টের দ্বিতীয় মেয়াদকালে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি প্রকাশ পেলে রিপাবলিকানদের পতন আরও ত্বরান্বিত হয়। জনসাধারণের কাছে সবচেয়ে আঘাতকর ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও যুদ্ধসচিবকে জড়িত করে কেলেঙ্কারির ঘটনা। একই বছরে দেশ একটি মহামন্দার কবলে পড়লে উত্তরাঞ্চলের জনমত রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে চলে যায়।
১৮৭৪ সালের কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষে ব্যাপক আসন হারায় এবং গৃহযুদ্ধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়ের পর এই প্রথম ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি কক্ষে (প্রতিনিধি পরিষদ) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ফলে কংগ্রেস আর পুনর্গঠনের প্রতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকল না।

১৮৭৬ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা নিউ ইয়র্কের গভর্নর এস. জে. টিলডেনকে প্রার্থী করে এবং রিপাবলিকানরা ওহাইওর গভর্নর রাদারফোর্ড বি. হেইসকে মনোনয়ন দেয়। নির্বাচনের দিন দেখা যায়, টিলডেন ২৫০,০০০-এরও বেশি ভোটে এগিয়ে আছেন। কিন্তু সাউথ ক্যারোলিনা, ফ্লোরিডা এবং লুইজিয়ানার যথাক্রমে সাত, চার ও আটটি ইলেকটোরাল ভোট নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় (এই তিন রাজ্যে তখনো উত্তরীয় সেনা মোতায়েন ছিল)। এছাড়াও, ওরেগনের তিনটি ইলেকটোরাল ভোটের একটি নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। যদি হেইস সব ২০টি ভোট পেতেন, তাহলে তিনি নির্বাচনে জয়ী হতেন। কংগ্রেস একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে, যাতে সাতজন ডেমোক্র্যাট, সাতজন রিপাবলিকান এবং একজন স্বাধীন সদস্য ছিলেন। তবে স্বাধীন সদস্য পদত্যাগ করলে তার স্থানে একজন রিপাবলিকান নিযুক্ত হন। কমিশন দলীয় বিভাজনের ভিত্তিতে ভোট দিয়ে হেইসকে বিজয়ী ঘোষণা করে, কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হুমকি দেয়।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতারা গোপনে একত্র হয়ে একটি সমঝোতা খসড়া করেন, যা ‘১৮৭৭ সালের সমঝোতা’ নামে পরিচিত। এতে হেইসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, দক্ষিণ থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয় এবং দক্ষিণে আরও সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়; এটি পুনর্গঠনের অবসান নির্দেশ করে। তবে শেষ পর্যন্ত এই সমঝোতা ব্যর্থ হয়, কারণ ডেমোক্র্যাটরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং দক্ষিণে আফ্রিকান আমেরিকানদের অধিকারের সুরক্ষা দেয়নি।
পুনর্গঠন-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণে ডেমোক্র্যাট ‘রিডিমার’দের উত্থান ঘটে। রিডিমাররা দক্ষিণে রিপাবলিকান শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা পুনর্দখলের প্রতিজ্ঞা করে। তারা ‘জিম ক্রো’ আইন প্রণয়ন করে, যা কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের পৃথকীকরণ করে এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার সীমিত করে, যা পরবর্তী শতাব্দীর আগে বিলুপ্ত হয়নি। জিম ক্রো আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হয় "প্লেসি বনাম ফার্গুসন" মামলায়। এতে সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে বৈধতা দেয় এই শর্তে যে পৃথক সুবিধাসমূহ হতে হবে "পৃথক কিন্তু সমান"।
সিঞ্চিমইয়াংগো
[সম্পাদনা]
১৮৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোরিয়ার প্রতি অভিযান, যাকে সিঞ্চিমইয়াংগো বা 'সিনমি বর্ষের পশ্চিমা গোলযোগ' বলা হয়, ছিল কোরিয়ায় প্রথম আমেরিকান সামরিক অভিযান। এটি প্রধানত কোরিয়ার গাংহওয়া দ্বীপ ও এর আশেপাশে সংঘটিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক অভিযাত্রী বাহিনী কোরিয়ায় প্রেরণ করেছিল একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলকে সহায়তা করার জন্য, যা কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, জেনারেল শেরম্যান বাণিজ্যিক জাহাজের ভাগ্য নির্ণয় এবং জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার নাবিকদের সাহায্যের জন্য একটি চুক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদী জোসিয়ান রাজবংশের সরকার ও চাপদাতা আমেরিকানদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়, যা কূটনৈতিক অভিযানকে সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত করে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে সামান্য বিজয় লাভ করলেও, কোরিয়ারা দেশটি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্বীকৃতি জানায়। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যথেষ্ট ক্ষমতা বা শক্তি ছিল না, তারা তাদের কূটনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি।
১৯শ শতাব্দীর ধর্ম
[সম্পাদনা]ইহুদি নতুন তরঙ্গ অভিবাসন
[সম্পাদনা]
১৮২০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে প্রায় ২,৫০,০০০ ইহুদি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। অভিবাসন ছিল কেবল ইউরোপীয় অর্থনীতির সঙ্কটের কারণে নয়, ১৮৪৮ সালের জার্মান রাজ্যের লিবারেল বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণে।[৪]
রেলপথ এবং বৃহৎ স্টিমার জাহাজগুলো ১৮০০ এবং ১৯০০ সালের শেষের দিকে আমেরিকায় অভিবাসনকে সহজতর করে। তবু যাত্রাটি ছিল অস্বচ্ছন্দকর, অসুস্থকর ও বিপজ্জনক। ধনী পরিবার যারা শীর্ষ বর্গের কামরায় ছিলেন, তাদের ব্যক্তিগত কেবিন ছিল, কিন্তু অধিকাংশ অভিবাসী স্টিয়ারেজ শ্রেণীতে যাতায়াত করতেন: তিনশো মানুষ, পুরুষ, নারী ও শিশু, ঘনিষ্ঠভাবে গাদাগাদি করে, দ্বৈত বা ত্রৈত বেডে ঘুমাতেন। বেডগুলো প্রায় ছয় ফুট লম্বা এবং দুই ফুট চওড়া ছিল, বেডের মাঝে মাত্র দুই-আধা ফুটের ব্যবধান। তাদের সামান্য মালপত্র বেডের ওপর রাখা হতো। পানীয় জল ছিল খুবই কম বা ছিল না, দুর্গন্ধ অসহনীয় ছিল, এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে মুক্ত থাকার উপায় ছিল না। এক প্রত্যক্ষদর্শী সোফিয়া ক্রেইটসবের্গ বলেছিলেন, "আপনি যখন মাথা খোঁচাতেন [...] তখন হাতেই লাউস ধরতো।"[৫] এই ঘনিষ্ঠ পরিবেশ, অভাব-অনটন ও দীর্ঘ যাত্রার চাপের কারণে রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটত। ইহুদিরা অশুদ্ধ (কোষের নিয়মে নিষিদ্ধ) মাংস ও স্যুপ পরিবেশন পেত, যা অনেকেই খেতেন না। তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা শুকনো ফল, শক্ত রুটি, বা বেয়ানো পনির খানিক খেতেন।[৬]
অন্য প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের কয়েকটি বন্দর ছিল। ১৮৫৫ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত এটি মূলত ক্যাসেল গার্ডেন ছিল, ম্যানহাটনের প্রান্তে, যা পরবর্তীতে নিউইয়র্ক সিটি হিসেবে পরিচিত। ১৮৯০ সাল থেকে ব্যাপক সংখ্যক অভিবাসী এলিস দ্বীপে প্রবেশ করত।[৭] এই জায়গাগুলোতে মানুষকে যথাযথভাবে জাহাজ, উৎপত্তি দেশ, পূর্ব কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ করা হতো।[৮]
ক্যাথলিক আমেরিকা
[সম্পাদনা]

ক্যাথলিক অভিবাসন
[সম্পাদনা]আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং রাশিয়ান সাম্রাজ্য (বিশেষ করে পোল্যান্ড) থেকে ব্যাপক অভিবাসনের ফলে ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাথলিক জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৮৪০ থেকে ১৮৫১ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে দুর্ভিক্ষ ও অত্যাচার চলছিল। অন্যান্য অভিবাসন জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে হয়েছিল। ১৮৫০ সালের মধ্যে ক্যাথলিক ধর্ম যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সেক্টর হয়ে ওঠে; ১৮৬০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পায়, প্রধানত অভিবাসনের কারণে। এই ব্যাপক ক্যাথলিক অভিবাসনের ফলে ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
নির্যাতন
[সম্পাদনা]আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্টরা ক্যাথলিকদের ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়ে প্রায়ই উদ্বিগ্ন থাকত। গৃহযুদ্ধের আগে আমেরিকায় অ্যান্টি-ক্যাথলিক পূর্বাগ্রহ "নোথিংস" দল এবং আমেরিকার অরেঞ্জ ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে প্রকাশ পেত। যুদ্ধের পর আমেরিকান প্রোটেকটিভ অ্যাসোসিয়েশন ও কু ক্লাক্স ক্লান ক্যাথলিকদের নিয়মিতভাবে নির্যাতন ও বৈষম্য করত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ফিলাডেলফিয়ার নেটিভিস্ট দাঙ্গা, "ব্লাডি মান্ডে", এবং নিউইয়র্ক সিটির অরেঞ্জ দাঙ্গা ১৮৭১ ও ১৮৭২ সালে।[৯]
নেটিভিজম
[সম্পাদনা]কঠোর অ্যান্টি-ক্যাথলিক কার্যক্রম নেটিভিজমের অনুভূতিকে প্রকাশ করত, যা সমস্ত "দেশজ জন্মানো আমেরিকান পুরুষদের" বিদেশিদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে উৎসাহিত করত। (অর্থাৎ, এখানে আসল দেশীয় আমেরিকানদের নয়, বরং ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত প্রোটেস্ট্যান্টদের কথা বলা হচ্ছে যারা এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন।)
প্রথম নেটিভিস্ট প্রকাশনা ছিল The Protestant; এর প্রথম সংখ্যা ১৮৩০ সালের ২ জানুয়ারি বিক্রি হয়। সম্পাদক ছিলেন জর্জ বর্ন, যিনি লিখেছিলেন, "পত্রিকার লক্ষ্য ক্যাথলিক বিশ্বাসের সমালোচনায় কেন্দ্রীভূত।"[১০] অ্যান্টি-ক্যাথলিক বক্তব্য মাঝে মাঝে সহিংসতায় পরিণত হতো; ১৮৩৪ সালের আগস্ট ১০ তারিখে ৪০-৫০ জন মানুষ ইউর্সুলাইন কনভেন্ট স্কুলের বাইরে জমায়েত হয়ে সেটি আগুনে পুড়িয়ে দেয়।[১১] ১৮৩৪ সালে এফ.বি. মরস, যিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ও চিত্রকলার অধ্যাপক ছিলেন এবং নেটিভিস্ট নেতা ছিলেন, "The Foreign Conspiracies Against the Liberties of the United States" গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষার কথা বলেন।
প্রোটেস্ট্যান্টদের ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে আশঙ্কা ও ভয় মূলত ক্যাথলিক ধর্মের রাজতান্ত্রিক প্রবণতা নিয়ে ছিল। এই সময়ে শহরগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল অভিবাসীদের ব্যাপক আগমনের কারণে যারা একত্রিত হয়ে একই এলাকায় বসবাস করত। নেটিভিস্টরা এটিকে "গোষ্ঠীবদ্ধতা" হিসেবে দেখত এবং "আমেরিকানীকরণ" এড়ানোর বা প্রতিরোধের প্রচেষ্টা বলে মনে করত। মরস এবং তাঁর সমকালীন লিম্যান বীচারদের সফলতার সঙ্গে নেটিভিস্ট আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে জনতা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য না করে কাল্পনিক কাহিনীকেও সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
১৮৩৬ সালে মারিয়া মঙ্ক "Awful Disclosures of the Hotel Dieu Nunnery of Montreal" নামক গ্রন্থ রচনা করেন। এতে তিনি ক্যাথলিক ধর্মের সঙ্গে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন পাদরিদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক এবং নন ও শিশুদের হত্যা ঘটেছিল; বইয়ের শেষ অংশে তিনি তার গর্ভে থাকা শিশুকে বাঁচানোর জন্য পালিয়ে গেছেন। মঙ্কের মা এই লেখাকে অস্বীকার করেন এবং বলেন, মারিয়া কখনো কোন কনভেন্টে ছিলেন না, এবং মারিয়ার শৈশবে যে মস্তিষ্ক আঘাত হয়েছিল তা তার গল্পের কারণ হতে পারে। উত্তর-মধ্য আমেরিকা ও দেশের উত্তরের অংশে ক্যাথলিকদের স্বাধীন চিন্তার অক্ষম বলে মনে করা হত এবং তাদের "অ্যান্টি-আমেরিকান প্যাপিস্ট" বলা হতো, কারণ তারা রোমের পোপের আদেশ পালন করতেন বলে ধারণা ছিল।
মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধে মেক্সিকান ক্যাথলিকদের "প্যাপিস্ট কুসংস্কার" কারণে মিডিয়ায় হাস্যকর বা বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমেরিকার ক্যাথলিকদের সম্পর্কে সাধারণ মনোভাবের কারণেই প্রায় ১০০ জন আমেরিকান ক্যাথলিক, যাদের বেশিরভাগই সদ্য অভিবাসিত আইরিশ, মেক্সিকানের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন; তাদের "সেন্ট প্যাট্রিকস ব্যাটালিয়ন"
শিক্ষা
[সম্পাদনা]
সারাদেশে প্রাক্তন দাসেরা শিক্ষা অর্জনের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সব বয়সের কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বইয়ে কী লেখা আছে তা জানার প্রবল আগ্রহ ছিল, যেগুলো একসময় শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্যই অনুমোদিত ছিল। স্বাধীনতা পাওয়ার পর তারা নিজেদের স্কুল শুরু করে এবং দিনে ও রাতে ক্লাস গুলো উপচে পড়ত। তারা গুঁড়ি গুঁড়ি বসত গাছের গুঁড়ির আসনে বা মাটির মেঝেতে। পুরানো পঞ্জিকা বা বাতিল হয়ে যাওয়া অভিধানে তারা অক্ষর চর্চা করত। দাসত্বের অজ্ঞতা থেকে মুক্তির প্রবল ইচ্ছার কারণে, দারিদ্র্য উপেক্ষা করেও অনেক কৃষ্ণাঙ্গ মাসে $১ বা $১.৫০ করে টিউশন ফি দিত।[১২]
কৃষ্ণাঙ্গরা এবং তাদের শ্বেতাঙ্গ মিত্ররাও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষক, পাদ্রি ও পেশাজীবী নেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। আমেরিকান মিশনারি অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় ফিস্ক এবং আটলান্টা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি কলেজ ১৮৬৬ থেকে ১৮৬৯ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রিডম্যান ব্যুরো ওয়াশিংটন ডিসিতে হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে। মেথডিস্ট, ব্যাপটিস্ট ও কনগ্রেগেশনালিস্টদের মতো উত্তরাঞ্চলীয় ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোও ডজনখানেক ধর্মতাত্ত্বিক ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজকে সমর্থন করে।[১৩]
কৃষ্ণাঙ্গদের প্রাথমিক শিক্ষা মূলত মিশনারিদের মাধ্যমে আসত, যাদের উদ্দেশ্য ছিল তাদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন কৃষ্ণাঙ্গদের শিক্ষার হার খুবই কম ছিল, যতক্ষণ না আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালে মুক্তিপত্র ঘোষণা করেন। ১৮৬৭ সালে শিক্ষা বিভাগ গঠিত হয়, যাতে আরও কার্যকরী বিদ্যালয় ব্যবস্থা চালু করা যায়। হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ওয়াশিংটন ডিসিতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের জন্য “লিবারেল আর্টস ও বিজ্ঞানে” শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৯ সালে বোস্টনে প্রথম পাবলিক স্কুল ডে পালিত হয়।
প্রযুক্তি
[সম্পাদনা]
গৃহযুদ্ধের ঠিক আগে পেনসিলভানিয়ার টাইটাসভিল ও আশেপাশে প্রচুর পরিমাণে পেট্রোলিয়াম আবিষ্কৃত হয় এবং যুদ্ধের পরে এটি ব্যবহার শুরু হয়। প্রথমদিকে তেল শুধুমাত্র ঔষধি কাজে ব্যবহার হতো। কিন্তু পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে এটি শিল্পক্ষেত্রে এবং তিমির তেলের পরিবর্তে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বিপজ্জনক ও ব্যয়বহুল তিমি শিকার শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যায়। কিছু শহর রাতের আলো জ্বালানোর জন্য কয়লা গ্যাস ব্যবহার করলেও অন্য শহরগুলো তেল বাতি ব্যবহার শুরু করে এবং বড় বড় শহরগুলো রাতের আলোতে আলোকিত হয়। পেট্রোলিয়াম, বাতি তেল (বড় ইঞ্জিন বাতির জন্য) এবং যন্ত্র তেল রেলপথের কার্যকারিতা বাড়ায়।

দূরত্ব অতিক্রম করে তথ্য পরিবহন করা যেত টেলিগ্রাফের মাধ্যমে। ১৮৭০ ও ১৮৮০ দশকে আবিষ্কর্তারা মানুষের কণ্ঠস্বর পরিবহন করার প্রযুক্তি তৈরি করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল এবং এলিশা গ্রে। ১৮৭৫ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল একটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক যন্ত্র ব্যবহার করে একটি স্টিলের রিডের শব্দ প্রেরণ করেন। ১৮৭৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলের এক সহযোগী তাঁর পেটেন্ট ওয়াশিংটন ডিসির পেটেন্ট অফিসে জমা দেন, ঠিক একই দিনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী এলিশা গ্রে ও পেটেন্ট দাখিল করেন। তিন সপ্তাহ পর, ৭ মার্চ, বেলের পেটেন্ট জয়ী হয়ে অনুমোদিত হয়।
যুদ্ধের পরে আদিবাসীরা
[সম্পাদনা]গৃহযুদ্ধ চলাকালীন আদিবাসীদের সাথে যে অবিচার হয়েছিল তা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দূর হয়নি। মার্কিন জাতীয় সরকার স্পষ্ট করেছিল যে এই মানুষগুলো যদিও এই মহাদেশের স্থানীয় অধিবাসী, তবে তারা দেশের নাগরিক হবে না। আদিবাসীদের পশ্চিমের আর্থসীমার বাইরে সংরক্ষিত জমিতে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়। তাদের চলাচল সরকারি এজেন্টরা নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি করত। শিকার করতে, মাছ ধরতে বা পাশের সংরক্ষিত জমিতে যাওয়ার জন্য সংরক্ষিত জমির বাইরে যাওয়া ভারতীয় বিষয়ক দফতর কর্তৃক নিষেধ ছিল। পরবর্তীতে, আদিবাসীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই দফতর একটি পাস ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থায় আদিবাসীদের সংরক্ষিত জমির বাইরে যেতে পাস নিতে হতো এজেন্টদের কাছ থেকে।
সাদা বসবাসকারীদেরও ট্রেনে আদিবাসীদের চলাচলে আপত্তি ছিল। তবে, নেভাডার সেন্ট্রাল প্যাসিফিক রেলরোড আদিবাসীদের ট্রেনের ওপর চড়ে যাত্রা করার অনুমতি দেয় বিনিময়ে তাদের রেললাইন সংরক্ষিত জমির মধ্য দিয়ে চলার সুযোগ পায়। অনেক ভারতীয় এজেন্ট এই বিনামূল্যের যাত্রা ব্যবস্থা পছন্দ করতেন না এবং এটিকে বন্ধ করার জন্য দফতরে চিঠি লেখা শুরু করেন। একজন এজেন্ট মন্তব্য করেছিলেন, "এই সীমাহীন স্বাধীনতা এবং বারবার অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আদিবাসীদের জন্য অতিরঞ্জিত করা যাবে না।"
১৪তম সংশোধনী এর মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে আদিবাসীদের জন্য তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলা হয়। ১৮৬৬ সালের সিভিল রাইটস অ্যাক্টে উল্লেখ আছে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সমস্ত ব্যক্তি, যারা কোনো বিদেশি ক্ষমতার অন্তর্গত নয়, এবং কর প্রদানে অব্যাহত ভারতীয়রা ব্যতীত, তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বলে ঘোষণা করা হলো।”
লিটল বিঘর্নের যুদ্ধ
[সম্পাদনা]
১৮৭৬ সালে কয়েকটি কম গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের পর, কর্নেল জর্জ এ. কাস্টার এবং তার ছোট ক্যাভ্যালারি দল লিটল বিঘর্ন নদীর কাছে সিউক্স ও তাদের কিছু মিত্রের সাথে মুখোমুখি হন। বড় ভারতীয় বাহিনীকে সংরক্ষিত জমিতে ফিরিয়ে পাঠানোর জন্য সেনাবাহিনী তিনটি ফৌজ পাঠায় আক্রমণের জন্য। একটি দলের মধ্যে ছিল লেফটেন্যান্ট কাস্টার ও সেভেন্থ ক্যাভ্যালারি। তারা সিউক্স গ্রামের সন্ধান পায়, যা প্রায় পনেরো মাইল দূরে রোজবাড নদীর পাশে ছিল। কাস্টার আরও একটি প্রায় চল্লিশ সদস্যের দলও দেখতে পান। তিনি আদেশ অগ্রাহ্য করে আগ্রাসী হয়ে উঠেন, কারণ তিনি মনে করতেন তারা মূল দলকে সতর্ক করে দেবে। তিনি বুঝতে পারেননি যে সংখ্যায় তারা তাকে তিন গুণে বেশি। কাস্টার তার বাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করেন। তিনি ক্যাপ্টেন ফ্রেডরিক বেন্টিনকে আদেশ দেন যাতে তারা লিটল বিঘর্ন নদীর উপরের উপত্যকায় ভারতীয়দের পালানোর পথ আটকায়। মেজর মার্কাস রেনো তার গ্রুপকে তাড়া করার এবং তারপর নদী পার হয়ে ভারতীয় গ্রাম আক্রমণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যেখানে তার অধীনে থাকা বাকি সৈন্যরা ছিল। তিনি উত্তর ও দক্ষিণ থেকে ভারতীয় শিবির আঘাত করার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তিনি জানতেন না যে তাকে কঠোর ভৌগলিক বাধা অতিক্রম করতে হবে।
যখন ভারতীয়রা আক্রমণ করতে নেমে আসে, কাস্টার তার সৈন্যদের নির্দেশ দেন ঘোড়াগুলোকে গুলি করতে এবং তাদের লাশ সামনে গড়িয়ে দেয়াল বানাতে। কিন্তু এটি গুলির বিরুদ্ধে তাদের রক্ষা করতে পারেনি। এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে কাস্টার ও তার সকল সৈন্য নিহত হন, যা আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যে একটি। একদিনের অতিরিক্ত লড়াইয়ের পর রেনো ও বেন্টিনের একত্রিত বাহিনী ভারতীয়রা যুদ্ধ থামানোর পর পালিয়ে যায়। তারা জানত যে আরও দুইটি সৈন্যদল তাদের দিকে আসছে, তাই দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।
কাস্টারের এই শেষ যুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা তার গৃহযুদ্ধে অর্জিত যেকোনো সাফল্যকে ছাপিয়ে যায়। কাস্টার ২৫ জুন, ১৮৭৬ সালে লিটল বিঘর্ন যুদ্ধে পরাজিত হন ও নিহত হন, যা "কাস্টারের শেষ প্রতিরোধ" নামে পরিচিত।
ঐ সময়কার নারীর ইতিহাস
[সম্পাদনা]ভিক্টোরিয়া উডহাল
[সম্পাদনা]
১৮৭২ সালে ভিক্টোরিয়া উডহাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মহিলা হিসেবে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হন। তিনি মে ১০ তারিখে ইকুয়াল রাইটস পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও এটি অনস্বীকার্য যে তিনি প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রার্থী, তার প্রার্থিতার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল; কারণ তার নাম আসলে ভোটের তালিকায় ছিল না এবং সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতে হলে ৩৫ বছরের নিচে থাকা উচিত নয়। উডহাল কোনো ইলেক্টোরাল ভোট পাননি, তবে প্রমাণ আছে যে তিনি কিছু জনপ্রিয় ভোট পেয়েছিলেন যা গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
উইমেনস ক্রিশ্চিয়ান টেম্পারেন্স ইউনিয়ন
[সম্পাদনা]উইমেনস ক্রিশ্চিয়ান টেম্পারেন্স ইউনিয়ন গঠিত হয় ২২ ডিসেম্বর, ১৮৭৩ সালে। নিউ ইয়র্কের ফ্রেডোনিয়াকে এই গোষ্ঠীর জন্মস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। টেম্পারেন্স আন্দোলন ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন যা মদ্যপানের পরিমাণ কমানোর জন্য কাজ করেছিল। এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং নারীরা বার ও ওষুধের দোকানে গিয়ে গান গেয়ে এবং প্রার্থনা করত। ১৮৭৪ সালে ক্লিভল্যান্ড, ওহায়োতে ন্যাশনাল উইমেনস ক্রিশ্চিয়ান টেম্পারেন্স ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। নারীরা অ্যালকোহল সেবনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে সেলুনে গিয়ে প্রার্থনা করত। অনেক সময় তাদের প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত এবং বারকর্মীদের গালিগালাজ সহ্য করতে হত। এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আমেরিকার ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা আইন প্রণয়নে সহায়ক হয়।
সূত্রসমূহ
[সম্পাদনা]- ↑ http://www.u-s-history.com/pages/h411.html
- ↑ "Russians in Alaska and U.S. Purchase Federal Indian Law for Alaska Tribes"। www.uaf.edu। সংগ্রহের তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।
- ↑ ৩.০ ৩.১ ৩.২ "The myth—and memorabilia—of Seward's Folly"। NewsCenter। ২৯ মার্চ ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।
- ↑ Stone, Amy. Jewish Americans. Milwaukee, Wisconsin: World Almanac Library, 2007. Pp. 6-9.
- ↑ Stone, p.15
- ↑ Stone.
- ↑ http://genealogy./od/ports/p/castle_garden.htm Retrieved on March 15, 2015.
- ↑ http://www.castlegarden.org/manifests.php Retrieved on March 15, 2015.
- ↑ Michael Gordon, The Orange riots: Irish political violence in New York City, 1870 and 1871 (1993
- ↑ Baker, Sean. The American Religious Experience, American Nativism, 1830-1845.
- ↑ Baker, Sean
- ↑ A People and A Nation, Eighth Edition
- ↑ A People and A Nation, Eighth Edition