মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস/ট্রুম্যান এবং স্নায়ু যুদ্ধ
জয়ের তিক্ত পরিণতি
[সম্পাদনা]সোভিয়েত ইউনিয়ন
[সম্পাদনা]
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে ছিল বিশ্বের ইতিহাসে দেখা সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী। তবুও "মাদার কান্ট্রি" ছিল বিধ্বস্ত। দেশের এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ৩২,০০০ কারখানা ধ্বংস হয়ে পড়েছিল ৬৫,০০০ কিলোমিটার (৪০,০০০ মাইল) রেলপথ তখন বেকার হয়ে পড়েছিল এবং অসংখ্য নাগরিক নিহত হয়েছিল। রেলপথ অকেজো হয়ে পড়েছিল। অগণিত নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। ১৭,১০০টি শহর ও নগর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ৭০,০০০টি গ্রাম ও পল্লী এলাকা পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। সামরিক দখলের সময় ১,০০,০০০টি সমবায় খামার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যারা বেঁচে ছিলেন তারা না খেতে পেয়ে দুর্দশায় নানান অমানবিক উপায়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছিলেন।
বহু বছর ধরে ওয়েহরমাখ্টের সঙ্গে কঠিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নকে নাৎসিবাদ ধ্বংসের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে রেড আর্মির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা গড়ে ওঠে। ইউরোপ ও আমেরিকায় "আঙ্কেল জো" স্তালিন হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় এক নেতা। অনেক ইউরোপীয় ভাবতে থাকেন যুদ্ধ জেতার পর স্তালিন হয়তো এবার শান্তিও প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।[১]
যুক্তরাষ্ট্র
[সম্পাদনা]যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী বাজারে বিস্তারের জন্য প্রস্তুত ছিল। যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের বহু দেশ আমেরিকার কাছে ঋণী হয়ে পড়েছিল। তাই যুদ্ধ শেষ হলে সাবেক মিত্ররা আর্থিক সহায়তার জন্য আমেরিকার দিকে ফিরে তাকায়। ব্রিটেন ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চেয়ে আলোচনা করে। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নও জরুরি পুনর্গঠনের জন্য ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চেয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করে।[১]
১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনে যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে মার্কিন ডলারকে বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাউন্ড দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়। ডলারই ছিল একমাত্র মুদ্রা যা বিশ্বের সর্বত্র অবাধে রূপান্তরযোগ্য ছিল। তাই অনেক দেশ আমেরিকার কাছ থেকে ঋণ ও সহায়তার আশায় তাকিয়ে ছিল। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রই তখন একমাত্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী শক্তি ছিল। ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বকে গঠনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল বড় ধরনের সুবিধা।[১]
স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে চাকরির সুযোগ তৈরি করে দেয়। তবে শর্ত ছিল যেসব দেশ কমিউনিজমকে সমর্থন করবে না কেবল তাদেরই সহায়তা দেওয়া হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রেরও উপকার হয়। কারণ অনেক দেশ পরোক্ষভাবে কমিউনিজমবিরোধী লড়াইয়ে আমেরিকাকে সাহায্য করতে শুরু করে।
রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস. ট্রুম্যান
[সম্পাদনা]
হ্যারি এস. ট্রুম্যান মাত্র ৮২ দিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মারা গেলে তিনি প্রেসিডেন্ট হন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন "মনে হচ্ছিল চাঁদ, তারা আর সব গ্রহ যেন আমার ওপর পড়ে গেছে।" বিশ্ব রাজনীতি বা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তার সঙ্গে রুজভেল্টের খুব কমই আলোচনা হতো। যুদ্ধ সম্পর্কিত বড় কোনো উদ্যোগ, এমনকি তখনকার গোপন 'ম্যানহাটন প্রকল্প' সম্পর্কেও তিনি কিছু জানতেন না। ওই প্রকল্পেই বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। ট্রুম্যানকে নিরাপত্তা দেওয়া গোপন নিরাপত্তা সংস্থার (সিক্রেট সার্ভিস) জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ হুইলচেয়ারে বসা রুজভেল্টের চেয়ে ট্রুম্যান ছিলেন বেশ সক্রিয়। তিনি নিয়মিত হেঁটে ওয়াশিংটন ঘুরে বেড়াতেন। ট্রুম্যান ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি আরেকবার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মিসৌরির ইন্ডিপেন্ডেন্স শহরে নিজ বাড়িতে অবসর জীবন শুরু করেন।
ট্রুম্যান মতবাদ
[সম্পাদনা]দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আন্তর্জাতিক পরিসরে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের প্রভাব কমে যায়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বেড়ে যায় এবং তারা বিশ্বের পরাশক্তিতে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রাথমিক মনোভাব ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মিত্র দেশগুলো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গঠন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জাতিসংঘ। জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গঠনের পক্ষে মত দেয়। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করবে যাতে আরেকটি বৈশ্বিক মন্দা ঠেকানো যায়, যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে "মহামন্দা"র সময় দেখা গিয়েছিল। ১৯৪৪ সালে মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং পরে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংগঠনগুলো বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় সহজ করা ও আন্তর্জাতিক ঋণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত হয়। সোভিয়েত সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অত্যন্ত সন্দেহ পোষণ করে। তারা মনে করত পশ্চিমা বিশ্ব এইসব সংস্থার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর উপর পুঁজিবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে। তাই তারা এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমর্থন দেয়নি।
সোভিয়েত ইউনিয়নের IMF ও বিশ্বব্যাংকে অংশগ্রহণ না করায় কূটনৈতিকভাবে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। যা পরে গিয়ে স্নায়ু যুদ্ধ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বাস করত পূর্ব ইউরোপের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ তাদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তারা বলেছিল "আমরা স্তালিনগ্রাদে যে ভয়াবহ কষ্ট পেয়েছি তা থেকে আমাদের এই অধিকার তৈরি হয়েছে।" ইয়াল্টা সম্মেলনে মিত্র শক্তির মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রত্যেকে একটি করে অংশ পায়। সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলটি ছিল পূর্ব জার্মানি। পরে এটি একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। কারণ একটি ঐক্যবদ্ধ জার্মানির ব্যাপারে কোনো চুক্তি হয়নি।অন্য তিনটি অঞ্চল একত্রিত হয়ে পশ্চিম জার্মানি গঠন করে। প্রথমে এটি অর্থনৈতিকভাবে একীভূত হয় ১৯৪৮ সালের মার্কিন মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে। বার্লিন শহর যা পূর্ব জার্মানির মধ্যে অবস্থিত ছিল তা পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। সমালোচকরা সঠিকভাবেই বলেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন গ্রিসের গৃহযুদ্ধে খুব একটা জড়িত ছিল না। গ্রিসের কমিউনিস্টরা স্তালিনের চেয়ে টিটোর প্রতি বেশি অনুগত ছিল। সেখানে প্রতিরোধ আন্দোলনে কমিউনিস্ট ছাড়াও অন্য মতাদর্শের লোকজন ছিল। তুরস্ককেও সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন হুমকি দিচ্ছিল না। কেউ কেউ বলেছিলেন এই ধরনের সহায়তা জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রদান করা উচিত ছিল।
১৯৪৭ সালে গ্রিস স্নায়ু যুদ্ধ-এর কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে ব্রিটেন গ্রিসের রাজতন্ত্রকে সমর্থন জানিয়ে আসছিল। তবে গ্রিসের কমিউনিস্টরা এই সরকার উৎখাতের হুমকি দিচ্ছিল। কারণ এই সরকার ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করত না। "কমিউনিজমের হুমকি" থেকে রক্ষা পেতে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তার করতে, প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ট্রুম্যান মতবাদ ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এমন দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে যেগুলো বিপ্লবী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত। কংগ্রেস এই মতবাদে সম্মতি দেয় এবং গ্রিস ও তুরস্কের জন্য ৪০ কোটি ডলারের সাহায্য অনুমোদন করে। ১৯৪৯ সালের মধ্যে গ্রিসে কমিউনিস্ট বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়। ১৯৫২ সালে গ্রিস ও তুরস্ক ন্যাটোতে যোগ দেয়।
মার্শাল পরিকল্পনা
[সম্পাদনা]
মার্শাল পরিকল্পনা ছিল পশ্চিম ইউরোপে আমেরিকার লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রথম উদ্যোগ। ইউরোপীয় দেশগুলো তখনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অস্থির ছিল। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো অবস্থায় ছিল না। আমেরিকার জনগণ ও সরকার দুশ্চিন্তায় ছিল। তারা ভয় পাচ্ছিল যে ইউরোপের এই অর্থনৈতিক অস্থিরতা যদি চলতেই থাকে তবে আরেকটি বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিতে পারে। ১৯৩০ এর দশকের মহামন্দার দুঃসহ স্মৃতি তখনো সবার মনে সতেজ ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিদ্ধান্ত নেয় এই ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে একটি বিশাল ইউরোপ পুনর্গঠন কর্মসূচি নেওয়া হবে। এর নাম ছিল মার্শাল পরিকল্পনা। ১৯৪৮ সালে এই কর্মসূচির মাধ্যমে পশ্চিম ইউরোপে ১২.৪ বিলিয়ন ডলার পাঠানো হয়। এই পরিকল্পনার একটি শর্ত ছিল ইউরোপীয় দেশগুলো এই অর্থ আমেরিকান পণ্য কেনার জন্য ব্যয় করবে। এই কর্মসূচি ১৯৫১ সালে শেষ হয়। মার্শাল পরিকল্পনা ছিল একদিক দিয়ে সফল আবার অন্যদিক দিয়ে ব্যর্থ। এটি পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে বিভাজন আরও গভীর করে তোলে এবং মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করে। ফলে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। তবে এই পরিকল্পনা পশ্চিম ইউরোপে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগকে উৎসাহ দেয় এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে সহায়তা করে।[২]
নতুন বিশ্বের পুনর্গঠন
[সম্পাদনা]
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব তখন নিজেদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল। দুই দিকের বিশাল মহাসাগর দিয়ে আলাদা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল যুদ্ধ থেকে কার্যত নিরাপদ। যুদ্ধ চলাকালে কেবল কিছু সাবমেরিনের গোলা বা শত্রু বেলুনই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পেরেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানির সংখ্যা অন্য সব প্রধান যুদ্ধে জড়িত দেশের তুলনায় অনেক কম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় তা ছিল অনেক কম। দেশের কারখানা ও অবকাঠামো অক্ষত ছিল। সম্পদ ছিল প্রচুর। একমাত্র পরমাণু বোমার মালিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হয়ে ওঠে।
তবুও ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা একে আত্মতুষ্টির সময় হিসেবে দেখেননি। তারা ভাবছিলেন কোনো একটি শক্তি সম্ভবত সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপ ও এশিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি হুমকিতে পড়তে পারে। এই সম্ভাবনা রোধে ওয়াশিংটন বিদেশে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলতে চাইল। যাতে আকাশপথে আসা শত্রু প্রতিরোধ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা, সোভিয়েতদের থেকে ভিন্নভাবে দ্রুত জাতিগুলোর পুনর্গঠনের পক্ষে ছিলেন। এর মধ্যে ছিল যুদ্ধপরবর্তী জার্মানি ও জাপানের মতো শত্রু দেশও। তারা একটি মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কারণ তারা মনে করতেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এ যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই প্রতিষ্ঠান দুটি ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে ব্রেটন উডস সম্মেলনে ৪৪টি দেশের অংশগ্রহণে গঠিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতা আনা। সোভিয়েতরা মনে করত যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধিপত্য করছে। তারা এগুলোকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও মুক্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের হাতিয়ার বানাচ্ছে। মস্কোর দৃষ্টিতে এগুলো ছিল পুঁজিবাদের শোষণের যন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বব্যাংকের সবচেয়ে বড় দাতা। এই ব্যাংক ১৯৪৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে এবং পুনর্গঠন প্রকল্পে ঋণ প্রদান করে। IMF ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সদস্যদের মুদ্রা ঋণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
জাপানের পুনর্গঠন
[সম্পাদনা]
১৯৪৫ সালে জাপান আত্মসমর্পণ করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দেশটিকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব পায়। এই পুনর্গঠনের নেতৃত্ব দেন আমেরিকান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার। তবে প্রতিটি ধাপে তাঁকে সহায়তা করেন নৃতত্ত্ববিদ এবং জাপানের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা। এই প্রচেষ্টা শুধু পরাজিত জাপানিদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নয় বরং গোটা সমাজকে নতুনভাবে গঠন করার জন্য। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক আধুনিকীকরণ এবং স্বৈরতন্ত্র-পূর্ব ইতিহাসের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
ম্যাকআর্থার এমন একটি সমাজের মুখোমুখি হন যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। জাপানি স্বৈরশাসকরা সম্রাটকে শিন্তো ধর্মের প্রধান হিসেবে ব্যবহার করত। জনগণ তাকে দেবতা মনে করত। আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেওয়ার সময়ই তারা প্রথমবার সম্রাটের কণ্ঠস্বর রেডিওতে শোনে। জাপানের অবকাঠামোতে বোমা বর্ষণ এবং মাসের পর মাস খাদ্য ও জ্বালানির ঘাটতি বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। ফ্যাট ম্যান ও লিটল বয়ের আগেও আমেরিকার টোকিও বোমা হামলায় বহু সাধারণ নাগরিক নিহত, আহত ও আতঙ্কিত হয়। পারমাণবিক বোমা হিরোশিমা ও নাগাসাকির কিছু অংশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দেয়। যারা সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়নি তারা পরে রেডিয়েশনজনিত বিষক্রিয়া ও ক্যানসারে ভুগে মারা যায়।
১৯৪৭ সালে জাপানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। এই সংবিধানে সম্রাটের ভূমিকা একেবারে বদলে যায়। তিনি আর সক্রিয় নেতা নন বরং জাতির প্রতীক হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন। আইনসভা বা ‘ডায়েট’ গঠিত হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আদলে। এই সংবিধানে জাপানিদের অনেক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ধরনের সামরিক সংঘর্ষকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং জাপানকে সশস্ত্র বাহিনী রাখার অধিকার থেকে বিরত রাখা হয়।
জাপানের পুনর্গঠনে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। উদাহরণস্বরূপ শ্রমিক ইউনিয়ন চালু করা হয় এবং একচেটিয়া বড় ব্যবসাগুলোর প্রভাব কমানো হয়।
স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকা চেয়েছিল জাপানকে তার মিত্রে পরিণত করতে। তখন পুনর্গঠনের নীতি একেবারে উল্টে যায়। বড় ব্যবসাগুলোর ক্ষমতা হ্রাসের পরিবর্তে নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেই চুক্তিতে আমেরিকাকে জাপানে কিছু সামরিক ঘাঁটি রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। এই চুক্তি কার্যকর হয় ১৯৫২ সালে।
চীনে সাম্যবাদের উত্থান
[সম্পাদনা]চিং রাজবংশ পতনের পর চীনে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখা দেয়। তখন দেশটির কোনো সুসংগঠিত নেতৃত্ব ছিল না। দেশটি বিশাল এক দিকহীন দৈত্যে পরিণত হয়। বহু জমিদার যাদের আধিপত্য অস্ত্রের জোরে প্রতিষ্ঠিত ছিল তারা এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। তারা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। এতে জাতীয় ঐক্য ও স্বার্থ ত্যাগ করে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই সময়টিকে চীনের ‘ওয়ারলর্ড’ যুগ বলা হয় যা ১৯১৬ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এটি চীনের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়।
এই সময়েই দেশে সাম্যবাদের নীতিমালা ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশিরভাগ মানুষের আকর্ষণ তৈরি হয় এই আদর্শের প্রতি। সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষ বিশেষভাবে এই নীতিতে আকৃষ্ট হয় বিশেষত সমতার আইনের কারণে।
চীনে সাম্যবাদের উত্থানের মূল কারিগর ছিলেন একজন ব্যক্তি তিনি হলেন মাও সে তুং। একজন কৃষকের সন্তান মাও ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান। ১৯১১ সালের বিপ্লবের সময় তিনি বাড়ি ছেড়ে পড়াশোনা করতে যান এবং পরে জাতীয়তাবাদী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখান থেকেই তিনি মার্কসবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং জাপানের আগ্রাসনের পর মাও এর নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয়। বিপর্যস্ত জাতীয়তাবাদীরা পালিয়ে তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়। ১৯৪৯ সালে মাও এর নেতৃত্বে চীনে সাম্যবাদ ক্ষমতায় আসে। এটি ছিল এমন একটি আন্দোলন যা শ্রমজীবী শ্রেণির মুক্তির পথ খুলে দেয়। শ্রমজীবী শ্রেণি হলো সেই জনগোষ্ঠী যারা কেবলমাত্র শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের কোনো পুঁজিতে মুনাফা নেই। তাদের জীবন সাফল্য কিংবা দুঃখ সবকিছু নির্ভর করে শ্রমের চাহিদার ওপর। এই শ্রেণিই উনিশ শতকের ‘প্রলেতারিয়েত’ বা শ্রমজীবী শ্রেণি।
মাও একদিকে বিশৃঙ্খলতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনেন তবে তিনি বহুবার ব্যর্থতাও হন। তাঁর উদ্যোগে চীনে একধরনের সমতা তৈরি হয় কিন্তু সেই সমতা সবার জন্য সুফল বয়ে আনে না। অনেকেই চরম দারিদ্র্যে পড়েন। আবার জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে চীন পিছিয়ে পড়ে। ফলে চীন একটি আধুনিক ও বৈশ্বিক পরিসরে কার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি।
রেড স্কেয়ার ও ম্যাকার্থিবাদ
[সম্পাদনা]
চীনে সাম্যবাদের বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে এই মতাদর্শ সরকারের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এই সন্দেহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। চীন ও আশপাশের অঞ্চলের বিশেষজ্ঞদের অনেককেই বরখাস্ত করা হয় কারণ তাঁদেরকে এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী করা হয়। কোরিয়া যুদ্ধ চলাকালীন এটি আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রেড স্কেয়ার নামে পরিচিত এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে অনেক মানুষের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে।
১৯৫০ সালে কংগ্রেস ম্যাককারান ইন্টারনাল সিকিউরিটি আইন পাস করে যা প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের ভেটো অগ্রাহ্য করে। এই আইনে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয় যার দায়িত্ব ছিল কমিউনিস্ট কার্যক্রম নজরদারি ও তদন্ত করা।
এই সময় উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জোসেফ ম্যাকার্থি কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে কমিউনিস্ট এবং দেশদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করেন। যদিও স্টেট ডিপার্টমেন্টে কিছু কর্মচারীর মধ্যে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে তবুও বেশিরভাগ অভিযোগ ছিল ভিত্তিহীন। ম্যাকার্থিবাদ শব্দটি এখন নির্দোষদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক অভিযানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ভেনোনা নামে এক গুপ্তচরবিরোধী প্রকল্পের নথি থেকে জানা যায়, ম্যাকার্থির অভিযানের কয়েকটি লক্ষ্য আসলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করেছিল। তবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এই বিষয়ে বিতর্ক এখনো চলছে।
১৯৪৭ সালে প্রতিনিধি পরিষদ জাতিসংঘ-আমেরিকান কার্যকলাপ কমিটি গঠন করে। এই কমিটি অভিনেতা পরিচালক ও লেখকদের তদন্ত করার জন্য গঠিত হয়। রেড সামার এর মতো এখানে কেবল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়াই সন্দেহের কারণ ছিল না। অনেক সময় জাতীয় কৃষ্ণাঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা বা আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের সদস্য হওয়াটাও সন্দেহজনক বলে ধরা হতো। নির্দোষ দাবি করলেই চলত না অন্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনতে হতো। এই অভিযানে যারা ধরা পড়েছিল তাদের মধ্যে কিছু সত্যিই কমিউনিস্ট ছিলেন কেউ আদর্শগতভাবে কেউ আবার স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময়কার মতাদর্শগত বিভক্তির কারণে।
তবে এই কমিটির সমালোচকরা সবাই কমিউনিস্ট ছিলেন না। অনেকেই অভিযোগ তোলেন যে এই কমিটি মানুষের সংবিধানস্বীকৃত আত্মপক্ষ সমর্থনের ও মত প্রকাশের অধিকার লঙ্ঘন করছে। বিনোদন জগৎ এই কমিটির ভয়ে বহু মানুষকে বরখাস্ত করে। কারও নাম তদন্তে উঠে আসা মাত্র তাদের চাকরি চলে যায়। অনেকে ইউরোপ বা অন্যত্র পালিয়ে যান। কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেন। ডাল্টন ট্রাম্বো ও রিং লার্ডনার জুনিয়রসহ ১০ জন নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান যাঁরা পরে হলিউড টেন নামে কালো তালিকাভুক্ত হন।
কিছু স্থানীয় এলাকায় এমন সাহিত্য নিষিদ্ধ করা হয় যা কমিউনিজমে উৎসাহ দিতে পারে বলে মনে করা হয়। সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকদের একটি বিশ্বাসযোগ্যতার অঙ্গীকার করতে বাধ্য করা হয়। যারা এটি করতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। অনেকেই মিথ্যা অভিযোগে চাকরি হারান। এফবিআই পরিচালক জে. এডগার হুভার যিনি প্রথম কমিউনিস্ট আতঙ্কের সময় ক্ষমতায় আসেন তিনিও কমিউনিজম সন্দেহে বহু আমেরিকানকে নজরদারিতে রাখেন। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহেইমারকেও তাঁর পূর্ব কমিউনিস্ট সংযোগের জন্য তাঁর নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে এই সময়েই ম্যাকার্থির নিজের ক্যারিয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫৪ সালে সেনেট তাকে দায়িত্বের অপব্যবহার এবং নির্দোষ কর্মকর্তাদের হয়রানির জন্য নিন্দা জানায়।
১৯৫০ এর দশকের শুরুর দিকে ম্যাকার্থিবাদের চরম সময়েও এই কমিউনিস্ট বিরোধী আন্দোলন তুলনামূলকভাবে সহনীয় ছিল। অনেক মামলাই আপিলে বাতিল হয়ে যায়। কেবল কয়েকজন বিদেশি বংশোদ্ভূত বিপ্লবীকেই বহিষ্কার করা হয়। জুলিয়াস ও এথেল রোজেনবার্গ ব্যতীত আর কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। প্রায় ১৫০ জন জেলে গিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই এক-দু’বছরের মধ্যেই মুক্তি পান। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বহু বছর ধরে টিকে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যখন যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে তখন তারা অনেক কিছু বুঝতে পারেনি কারণ এই অঞ্চলের বহু বিশেষজ্ঞ রেড স্কেয়ারের সময় হারিয়ে গিয়েছিল।
কোরিয়া যুদ্ধ
[সম্পাদনা]পটভূমি
[সম্পাদনা]দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ান উপদ্বীপে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে দক্ষিণ অংশে সৈন্য মোতায়েন করে। এই অংশটি পরে দক্ষিণ কোরিয়া নামে পরিচিত হয়। আর অপর অংশটি হয় উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়া দ্রুতই কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ
[সম্পাদনা]
১৯৪৯ সালের মে মাসে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে কমিউনিস্ট বিশ্বে যুক্ত করার জন্য আক্রমণ চালায়। চীনের পিপলস রিপাবলিক এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে সহায়তা করে। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন একটি বিশাল সামরিক বাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৮তম অক্ষরেখা অতিক্রম করে। ১৯১০ সাল থেকে কোরিয়া দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল যা ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের পর নিশ্চিত হয়। কোরিয়া যুদ্ধ ছিল এক অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ যেখানে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় সশস্ত্র উত্তরের সেনাবাহিনী কম সজ্জিত দক্ষিণে আক্রমণ চালায়। এই সময় দক্ষিণে সরকারবিরোধী সংঘর্ষও জোরদার হয়।
১৯৫০ সালের ২৭ জুন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করে। নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে দক্ষিণ কোরিয়াকে সহায়তার পক্ষে ভোট দিলে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ান উপদ্বীপে সৈন্য পাঠাতে সম্মত হয়। জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারকে কোরিয়ায় জাতিসংঘ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ৩০ জুন সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং একইসঙ্গে ইন্দোচীনে কমিউনিস্ট বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সহায়তাও বৃদ্ধি করে। ম্যাকআর্থার ৮ জুলাই কমান্ড গ্রহণ করেন। প্রথমদিকে মার্কিন সেনাদের প্রশিক্ষণ ছিল দুর্বল এবং তারা শারীরিকভাবে অপ্রস্তুত ছিল। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে তারা পেছনে সরে গিয়ে পুসানের আশপাশে একটি প্রতিরক্ষা ঘের তৈরি করতে বাধ্য হয়।[৩]
সামনে ও পিছনে
[সম্পাদনা]১৯৫০ সালের শরতের সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। অক্টোবর মাসে জেনারেল ম্যাকআর্থার উত্তর কোরিয়ায় সেনা প্রবেশের নির্দেশ দেন। সেই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়াং দখল করে।

তবে জাতিসংঘ বাহিনী পিয়ংইয়াং দখলের মাত্র ছয় দিন পরেই গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রায় দুই লক্ষ পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ডিসেম্বর মাসে চীনা "স্বেচ্ছাসেবকরা" পিয়ংইয়াং দখল করে নেয়। এরপর জানুয়ারি ১৯৫১ সালের মধ্যে তারা দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলও দখল করে।
যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ার যুদ্ধ জেতার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত ছিল। এমনকি তারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনাও করেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান জেনারেল ম্যাকআর্থারের উপর আস্থা রাখতে পারেননি যে তিনি পারমাণবিক বোমা ব্যবহারে যথাযথ নির্দেশ মানবেন। তাই তিনি ম্যাকআর্থারের পদত্যাগ চান এবং ম্যাকআর্থার তা মেনে নেন।
অচলাবস্থা
[সম্পাদনা]১৯৫৩ সালে ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। নির্বাচনী প্রচারে কোরীয় যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার পথ অব্যাহত রাখেন। সেইসঙ্গে "ব্রিংকম্যানশিপ" কৌশল ব্যবহার করে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছান যা সংশ্লিষ্ট সকল দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া এতে সন্তুষ্ট ছিল না এবং কোরিয়া একত্রীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিল।
স্নায়ু যুদ্ধের অস্ত্র
[সম্পাদনা]পারমাণবিক অস্ত্র
[সম্পাদনা]
পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা ছিল স্নায়ু যুদ্ধের কেন্দ্রে। অনেকে মনে করত যত বেশি পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে তত বেশি শক্তিশালী দেশ হবে। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই প্রচুর পরিমাণে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করে।
বিশ্ব তখন কেঁপে ওঠে যখন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫২ সালে এইচ-বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এই বোমা হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার চেয়ে ছোট হলেও এর শক্তি ছিল ২৫০০ গুণ বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৩ সালে এইচ-বোমা তৈরি করে এবং বিশ্ব আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
পারমাণবিক ত্রয়ী
[সম্পাদনা]
স্নায়ু যুদ্ধে অস্ত্র পরিবহণের ক্ষেত্রেও নতুনত্ব দেখা যায়। স্থলভিত্তিক, জলভিত্তিক ও আকাশভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে পারমাণবিক ত্রয়ী গঠন করা হয়। এতে প্রথম হামলায় একটি দেশের সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিরোধ
[সম্পাদনা]১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মনে করেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি গুরুতর শত্রু। তাই NSC-68 রিপোর্টে বলা হয় যে, অস্ত্র মজুদের মাধ্যমে তাকে প্রতিরোধ করাই শ্রেষ্ঠ উপায় হবে।[৪] প্রচুর অস্ত্র তৈরি করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র একটি বোমারু বিমান তৈরি করে B52 যা ৬,০০০ মাইল উড়তে পারত এবং পারমাণবিক বোমা বহন করতে পারত। এ ধরনের উন্নয়নের জন্য বিশাল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল যা যুক্তরাষ্ট্র বহন করতে পারত কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন পারত না। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন বড় আকারের বোমা তৈরিতে মনোযোগ দেয় এটি ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা প্রক্রিয়া।
১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাসে সোভিয়েত উপগ্রহ স্পুটনিক উৎক্ষেপণ করে বিশ্বকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয় দেখায়। এর ফলে সৃষ্টি হয় আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ICBM। এর প্রতিকারে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে গড়ে তোলে ডিস্ট্যান্ট আর্লি ওয়ার্নিং বা DEW লাইন।
১৯৫০ দশকের শেষের দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ধারণা করে যে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ২০ মিলিয়ন আমেরিকান নিহত হবে এবং ২২ মিলিয়ন আহত হবে।
১৯৬০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বৃহৎ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অর্থ ব্যয় করে। তারা তৈরি করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বোমা 'জার বোমা'। আমেরিকা তুলনায় কম কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে যেমন অ্যাটলাস ক্ষেপণাস্ত্র যা ৫,০০০ মাইল পাড়ি দিতে পারত ১৬,০০০ মাইল গতিতে। ১৯৬১ সালের মধ্যে বিশ্বের ধ্বংস ঘটানোর মতো যথেষ্ট বোমা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
তবুও নতুন অস্ত্র ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চার তৈরি করা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র রাখা হয় মাটির নিচে তৈরি সাইলোতে। ১৯৬০ সালে প্রথম পোলারিস সাবমেরিন চালু হয় যেটি ১৬টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করত। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রে ছিল চারটি ওয়ারহেড যা আলাদা আলাদা শহরে আঘাত হানতে পারত। ফলে একটি সাবমেরিনেই ৬৪টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন সম্ভব হতো।
১৯৬০ এর দশকে "MAD" তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি পশ্চিমে আক্রমণ করত তবে পশ্চিম থেকেও পাল্টা আক্রমণে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হতো। কেউই এতে জয়ী হতো না।

১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ৮,০০০ ICBM এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল ৭,০০০ ICBM।
১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪,০০০ বিমান পারমাণবিক বোমা ফেলতে পারত। সোভিয়েত ইউনিয়নের ছিল ৫,০০০।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট ১৯৮১ সালে ছিল ১৭৮ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৭ বিলিয়ন ডলারে।
১৯৮৬ সাল নাগাদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট প্রায় ৪০,০০০ পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল। যার শক্তি ছিল প্রায় দশ লক্ষ হিরোশিমা বোমার সমান।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা অনুমান করে একটি মাঝারি আকারের এইচ-বোমা লন্ডনে ফাটালে ৩০ মাইল পর্যন্ত সব জীবন্ত জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে।
এ ধরনের ভয়াবহ তথ্য সামনে আসায় বিশ্ব নেতারা একে অপরের ওপর বিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করেন। ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে "ডিটেন্ট" নীতির মাধ্যমে পরস্পরের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা হয়। এর চূড়ান্ত রূপ ছিল রেইকিয়াভিক বৈঠক যেখানে প্রেসিডেন্ট রেগান ও গর্বাচেভ পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের বিষয়ে ভবিষ্যতে বাস্তব অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপন করেন যদিও ঐ বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি অর্জিত হয়নি।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ ১.০ ১.১ ১.২ Isaacs, Jeremy, Taylor Downing, Markus Schurr, Heike Schlatterer, and Norbert Juraschitz. DerKalte Krieg: Ein Illustrierte Geschichte, 1945-1991. Mu%u0308nchen, etc.: Diana Verlag, 1999. Print.
- ↑ A People and A Nation Eighth Edition
- ↑ "Don't Know Much About History" by Kenneth C. Davis
- ↑ "Milestones: 1945–1952 - Office of the Historian"। history.state.gov। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০২১।