বিষয়বস্তুতে চলুন

মানব শারীরতত্ত্ব/সংবহন তন্ত্র

উইকিবই থেকে
← সংবহন তন্ত্র — মানব শারীরতত্ত্ব — অনাক্রম্যতন্ত্র →

হোমিওস্ট্যাসিসকোষ শারীরতত্ত্বত্বকতন্ত্রস্নায়ুতন্ত্রইন্দ্রিয়পেশীতন্ত্ররক্ত শারীরবিদ্যাসংবহনতন্ত্রঅনাক্রম্যতন্ত্রমূত্রতন্ত্রশ্বসনতন্ত্রপরিপাকতন্ত্রপুষ্টিঅন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্রপ্রজনন (পুরুষ)প্রজনন (নারী)গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবজিনতত্ত্ব ও বংশগতিজন্ম থেকে মৃত্যু অবধি বেড়ে উঠাউত্তরমালা

মানব হৃদপিণ্ডের মডেল

ভূমিকা

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ড হল আমাদের বুকে অবস্থিত একটি জীবন্ত ও অবিরাম স্পন্দিত পেশি। গর্ভের ভেতর থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এটি থেমে থাকে না। গড়ে একজন মানুষের হৃদপিণ্ড প্রায় ৩ বিলিয়ন বার সংকোচন-প্রসারণ করে। প্রতি বার্তায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের বিরতিতে। ৮০ বছর বয়সে পৌঁছালেও এটি প্রতিদিন প্রায় ১,০০,০০০ বার স্পন্দিত হয়। অনেক গবেষক মনে করেন হৃদপিণ্ডই হলো প্রথম অঙ্গ যা গঠনের পরপরই কার্যকর হয়। গর্ভধারণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এমনকি ভ্রূণটি একটি বড় হাতের অক্ষরের চেয়েও ছোট থাকা অবস্থায়, এটি শরীরকে পুষ্টি সরবরাহের কাজ শুরু করে। হৃদপিণ্ডের প্রধান কাজ হলো ধমনি, কৈশিক ও শিরার মাধ্যমে রক্ত পাম্প করা। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে আনুমানিক ৬০,০০০ মাইল দীর্ঘ রক্তনালী রয়েছে। এই রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন, পুষ্টি, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, হরমোন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পরিবহন করা হয়। এই রক্তচলাচল ঠিক রাখতে সাহায্য করে হৃদপিণ্ডের পাম্পিং ব্যবস্থা। আজকের দিনে মার্কিন নাগরিকদের হৃদপিণ্ড ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার যত্ন নেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়ন এই কাজটিকে সহজ করে তুলেছে। এই অধ্যায়টি হৃদপিণ্ড এবং এর বিভিন্ন অংশ নিয়ে আলোচনা করার জন্য নিবেদিত।

হৃদপিণ্ড

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ড একটি ফাঁপা, পেশিবহুল অঙ্গ, যার আকার একটি মুষ্টির মতো। এটি নিয়মিত এবং ছন্দময় সংকোচনের মাধ্যমে রক্তনালিতে রক্ত পাম্প করে। হৃদপিণ্ডের পেশিগুলো কার্ডিয়াক মাংসপেশি দ্বারা গঠিত, যা একটি অনৈচ্ছিক পেশি এবং শুধুমাত্র হৃদপিণ্ডেই পাওয়া যায়। “কার্ডিয়াক” শব্দটি গ্রিক শব্দ "কার্ডিয়া" থেকে এসেছে। এর অর্থ “হৃদয়”। এটি চার-প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট একটি ডাবল পাম্প যা বক্ষগহ্বরের মধ্যে, ফুসফুসের মাঝখানে অবস্থান করে। কার্ডিয়াক পেশি স্বনির্বেশিত অর্থাৎ এটি নিজস্ব স্নায়ুবাহিত সংকেতের মাধ্যমে সংকোচন করে। এটি কঙ্কালপেশির থেকে আলাদা, কারণ কঙ্কালপেশিকে সংকোচনের জন্য সচেতন বা প্রতিফলিত স্নায়ু উদ্দীপনা প্রয়োজন। হৃদপিণ্ডের সংকোচন নিজে নিজেই ঘটে, তবে হৃদস্পন্দন হার বা স্নায়ুর সংকোচনের গতি বা হরমোনের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন ব্যায়াম বা ভয় পেলে।


এন্ডোকার্ডিয়াম

[সম্পাদনা]

এন্ডোকার্ডিয়াম হলো হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ স্তর, যা এন্ডোথেলিয়াল কোষ দ্বারা গঠিত। এটি কোথাও মসৃণ ঝিল্লির মতো আবার কোথাও (বিশেষত নিলয়ে) ছোট ছোট গহ্বর ও অসমতা নিয়ে গঠিত হয়।

মায়োকার্ডিয়াম

[সম্পাদনা]

মায়োকার্ডিয়াম হলো হৃদপিণ্ডের পেশিবহুল টিস্যু। এটি এমন বিশেষ ধরণের কার্ডিয়াক কোষ দ্বারা গঠিত যা শরীরের অন্য কোনো পেশিতে দেখা যায় না। এই কোষগুলো সংকোচনের পাশাপাশি স্নায়ুর মতো বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। মায়োকার্ডিয়ামে রক্ত সরবরাহ করে করোনারি ধমনি। যদি এই ধমনি অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা রক্ত জমাটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে এনজাইনা পেক্টরিস বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে। যদি হৃদপিণ্ড ঠিকভাবে সংকোচন না করে, তাহলে তা হার্ট ফেলিওর নামে পরিচিত। এর ফলে শরীরে তরল জমে যাওয়া, ফুসফুসে পানি জমা, কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস, লিভার বড় হয়ে যাওয়া, জীবনকাল হ্রাস ও জীবনমান নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এপিকার্ডিয়াম

[সম্পাদনা]

মায়োকার্ডিয়ামের পাশের বাইরের স্তরকে এপিকার্ডিয়াম বলা হয়। এটি একটি পাতলা সংযোজক টিস্যু ও চর্বির স্তর নিয়ে গঠিত, যা এন্ডোকার্ডিয়াম ও মায়োকার্ডিয়ামের পরবর্তী স্তর।

পেরিকার্ডিয়াম

[সম্পাদনা]

পেরিকার্ডিয়াম হলো হৃদপিণ্ডকে ঘিরে থাকা ঘন, ঝিল্লিবিশিষ্ট আবরণ। এটি হৃদপিণ্ডকে সুরক্ষা ও স্নিগ্ধতা প্রদান করে। পেরিকার্ডিয়ামের দুটি স্তর থাকে: ফাইব্রাস পেরিকার্ডিয়াম ও সিরাস পেরিকার্ডিয়াম। সিরাস পেরিকার্ডিয়াম আবার দুটি স্তরে বিভক্ত, এবং এই দুটি স্তরের মাঝে একটি ফাঁকা জায়গা থাকে যাকে পেরিকার্ডিয়াল ক্যাভিটি বলে।

হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ডে চারটি প্রকোষ্ঠ থাকে দুইটি আলিন্দ এবং দুইটি নিলয়। আলিন্দগুলো ছোট এবং পাতলা দেয়ালের হয়, অন্যদিকে নিলয়গুলো বড় এবং অনেক বেশি শক্তিশালী।

অলিন্দ

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ডের দুই পাশে দুটি অলিন্দ থাকে। ডান পাশে অবস্থিত অলিন্দে অক্সিজেন-স্বল্প রক্ত থাকে। বাম অলিন্দে থাকে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত, যা শরীরের দিকে পাঠানো হয়। ডান অলিন্দ রক্ত গ্রহণ করে সুপিরিয়ার ভেনাকাভা ও ইনপিরিয়র ভেনাকাভা থেকে। বাম অলিন্দ রক্ত গ্রহণ করে বাম ও ডান পালমোনারি ভেইন থেকে। আলিন্দ মূলত ধারাবাহিকভাবে শিরার রক্ত প্রবাহ হৃদপিণ্ডে প্রবেশ করতে দেয়, যাতে প্রতিবার নিলয় সংকোচনের সময় রক্ত প্রবাহে বাধা না পড়ে।

নিলয়

[সম্পাদনা]

নিলয় হলো এমন একটি প্রকোষ্ঠ যা অলিন্দ থেকে রক্ত গ্রহণ করে এবং তা হৃদপিণ্ডের বাইরে পাঠায়। দুটি নিলয় আছে: ডান নিলয় রক্ত পাঠায় পালমোনারি ধমনিতে, যা পালমোনারি সার্কিটে প্রবাহিত হয়। বাম নিলয় রক্ত পাঠায় অ্যাওর্টায়, যা সারা শরীরে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছে দেয়। নিলয়ের দেয়াল অলিন্দের চেয়ে মোটা হয়, যার ফলে এগুলো বেশি রক্তচাপ তৈরি করতে পারে। বাম ও ডান নিলয় তুলনা করলে দেখা যায়, বাম নিলয়ের দেয়াল বেশি মোটা, কারণ এটি সারা শরীরে রক্ত পাঠাতে হয়। এই কারণে অনেকের ভুল ধারণা হয় যে হৃদপিণ্ড বাম দিকে অবস্থিত।

সেপ্টাম

[সম্পাদনা]

ইন্টারভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাম (ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাম, যা বিকাশের সময় সেপ্টাম ইনফেরিয়াস নামে পরিচিত) হলো হৃদপিণ্ডের নিচের দুটি প্রকোষ্ঠ (নিলয়) এর মধ্যে থাকা পুরু প্রাচীর। এই সেপ্টাম পেছনের দিকে এবং ডান দিকে বাঁকানো, এবং ডান নিলয়ের দিকে বক্রাকারভাবে চলে গেছে। এর বড় অংশটি পুরু এবং পেশিবহুল, যাকে মাংসপেশিযুক্ত ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাম বলা হয়। এর উপরের এবং পশ্চাদ্বর্তী অংশটি পাতলা ও তন্তুযুক্ত, যা অ্যাওয়ার্টিক ভেস্টিবিউল কে ডান অলিন্দের নিচের অংশ এবং ডান নিলয়ের উপরের অংশ থেকে পৃথক করে। এই অংশকে বলা হয় মেমব্রেনাস ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাম।

কপাটিকাসমূহ

[সম্পাদনা]

দুটি অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার কপাটিকা একমুখী কপাটিকা, যেগুলো নিশ্চিত করে যে রক্ত শুধু অলিন্দ থেকে নিলয়ে প্রবাহিত হয়, বিপরীত দিকে নয়। দুটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা হৃদপিণ্ড থেকে বেরিয়ে যাওয়া ধমনীতে অবস্থান করে; এগুলো রক্তকে আবার নিলয়ে ফিরে যেতে বাধা দেয়। হৃদস্পন্দনে যেসব শব্দ শোনা যায়, সেগুলো হলো হৃদপিণ্ডের কপাটিকা বন্ধ হওয়ার শব্দ। ডান দিকের অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার কপাটিকাকে ট্রাইকাসপিড কপাটিকা বলা হয় কারণ এতে তিনটি ফ্ল্যাপ থাকে। এটি ডান অলিন্দম এবং ডান নিলয়ের মাঝখানে থাকে। হৃদপিণ্ড যখন বিশ্রামে থাকে অর্থাৎ ডায়াস্টলের সময়, তখন ট্রাইকাসপিড কপাটিকা ডান অলিন্দম থেকে ডান নিলয়ে রক্ত চলাচল করতে দেয়। পরে, হৃদপিণ্ড সংকোচনের পর্যায়ে যায় যাকে সিস্টল বলা হয় এবং অলিন্দম রক্ত নিলয়ে ঠেলে দেয়। এরপর নিলয় সংকুচিত হয় এবং ভেতরের রক্তচাপ বেড়ে যায়। যখন নিলয়ের চাপ অলিন্দমের চেয়ে বেশি হয়, তখন ট্রাইকাসপিড কপাটিকা বন্ধ হয়ে যায়। বাম দিকের অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার কপাটিকাকে বাইকাসপিড কপাটিকা বলা হয় কারণ এতে দুটি ফ্ল্যাপ থাকে। এটি মাইট্রাল কপাটিকা নামেও পরিচিত, কারণ এটি বিশপদের মাথার টুপির মতো দেখতে। এই কপাটিকা বাম নিলয়ের রক্তকে বাম অলিন্দমে ফিরে যেতে বাধা দেয়। যেহেতু এটি হৃদপিণ্ডের বাম পাশে থাকে, তাই এটিকে অনেক চাপ সহ্য করতে হয়; এজন্য এটিকে মাত্র দুটি ফ্ল্যাপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, কারণ সহজ গঠন মানে কম জটিলতা এবং কম ত্রুটির সম্ভাবনা। আরো দুটি কপাটিকা থাকে যেগুলোকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা বলা হয়। এদের ফ্ল্যাপ অর্ধচন্দ্রাকার। পালমোনারি অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা ডান নিলয় ও পালমোনারি ট্রাঙ্কের মাঝে থাকে। অ্যাওর্টিক অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা বাম নিলয় ও অ্যাওর্টার মাঝখানে অবস্থান করে।

সাবভ্যালভুলার যন্ত্রাংশ

[সম্পাদনা]

কর্ডে টেনডিনি প্যাপিলারি মাংসপেশিতে সংযুক্ত থাকে, যেগুলো কপাটিকাকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে। প্যাপিলারি মাংসপেশি ও কর্ডে টেনডিনিকে একত্রে সাবভ্যালভুলার যন্ত্রাংশ বলা হয়। এর কাজ হলো কপাটিকা যখন বন্ধ হয় তখন তা অলিন্দমে ঢুকে পড়া থেকে রক্ষা করা। তবে, এই যন্ত্রাংশ কপাটিকার খোলা-বন্ধের প্রক্রিয়ায় সরাসরি কোনো প্রভাব ফেলে না। এটি সম্পূর্ণরূপে কপাটিকার দুই পাশে চাপের পার্থক্যের মাধ্যমে ঘটে।

হৃদপিণ্ড সংক্রান্ত জটিলতা

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ডের সবচেয়ে সাধারণ জন্মগত ত্রুটি হলো বাইকাসপিড অ্যাওর্টিক কপাটিকা। এই অবস্থায়, অ্যাওর্টিক কপাটিকাতে স্বাভাবিক তিনটি ফ্ল্যাপের বদলে মাত্র দুটি ফ্ল্যাপ থাকে। এই সমস্যা অনেক সময় শনাক্তই হয় না যতক্ষণ না রোগীর অ্যাওর্টিক স্টেনোসিস নামে পরিচিত একটি অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে কপাটিকাতে ক্যালসিয়াম জমে এটি সংকীর্ণ হয়ে যায়। সাধারণত এই সমস্যা ৪০ বা ৫০ বছর বয়সে দেখা দেয়, যা স্বাভাবিক কপাটিকা থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ১০ বছর আগে হয়। রিউম্যাটিক জ্বরের আরেকটি সাধারণ জটিলতা হলো মাইট্রাল কপাটিকার পুরু হওয়া ও সংকীর্ণতা (আংশিকভাবে বন্ধ হওয়া)। যারা রিউম্যাটিক জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন, তাদের জন্য দাঁতের চিকিৎসার আগে ডেন্টিস্টরা অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যাতে ব্যাকটেরিয়াল এনডোকার্ডাইটিস প্রতিরোধ করা যায়। এটি ঘটে যখন দাঁতের ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে এবং হৃদপিণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কপাটিকায় সংযুক্ত হয়।

অ্যাওর্টিক কপাটিকা একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা, কিন্তু একে বাইকাসপিড বলা হয় কারণ এটি সাধারণত তিনটি “ফ্ল্যাপ” বা “অর্ধচন্দ্রাকৃতির” অংশ নিয়ে গঠিত হয়। এটি বাম অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার কপাটিকার সঙ্গে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়, যেটি সাধারণত মাইট্রাল কপাটিকা নামে পরিচিত এবং এটি দুটি কাস্পযুক্ত কপাটিকার একটি।

হৃদপিণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্তপ্রবাহ

[সম্পাদনা]
মানব হৃদপিণ্ডের চিত্র

যদিও বর্ণনার সুবিধার্থে আমরা প্রথমে ডান পাশে রক্তপ্রবাহ এবং পরে বাম পাশে রক্তপ্রবাহ ব্যাখ্যা করি, আসলে উভয় অলিন্দম একসাথে সংকুচিত হয় এবং উভয় নিলয়ও একসাথে সংকুচিত হয়। হৃদপিণ্ড মূলত দুইটি পাম্প হিসেবে কাজ করে—ডান পাশে একটি এবং বাম পাশে একটি—যেগুলো একযোগে কাজ করে। ডান পাশের পাম্প রক্তকে ফুসফুসে (পালমোনারি সিস্টেমে) পাঠায় এবং একই সময়ে বাম পাশের পাম্প রক্তকে পুরো দেহে (সিস্টেমিক সিস্টেমে) পাঠায়। দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা অক্সিজেনবিহীন শিরার রক্ত সিস্টেমিক সার্কুলেশন থেকে সুপিরিয়র এবং ইনফেরিয়র ভেনা কাভার মাধ্যমে ডান অলিন্দমে প্রবেশ করে। ডান অলিন্দম সংকুচিত হয়ে রক্তকে ট্রাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে ডান নিলয়ে পাঠায়। এরপর ডান নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্তকে পালমোনারি অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকার মাধ্যমে পালমোনারি ট্রাঙ্ক এবং পালমোনারি ধমনিতে পাঠায়। এই রক্ত ফুসফুসে যায়, যেখানে এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছেড়ে দিয়ে নতুন অক্সিজেন গ্রহণ করে। এই নতুন অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত পালমোনারি শিরার মাধ্যমে বাম অলিন্দমে ফিরে আসে। বাম অলিন্দম সংকুচিত হয়ে রক্তকে বাম অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার কপাটিকা, বাইকাসপিড বা মাইট্রাল কপাটিকার মাধ্যমে বাম নিলয়ে পাঠায়। এরপর বাম নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্তকে অ্যাওর্টিক অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকার মাধ্যমে অ্যাসেন্ডিং অ্যাওর্টায় পাঠায়। এরপর অ্যাওর্টা বিভিন্ন ধমনীতে শাখা হয়ে রক্তকে শরীরের প্রতিটি অংশে পৌঁছে দেয়।

হৃদপিণ্ড থেকে রক্তপ্রবাহের পথ

[সম্পাদনা]

অ্যাওর্টা → ধমনী → আর্টিরিওল → কৈশিকনালী → ভেনিউল → শিরা → ভেনা কাভা

কৈশিকনালীর মধ্য দিয়ে রক্তপ্রবাহ

[সম্পাদনা]

আর্টিরিওল থেকে রক্ত এক বা একাধিক কৈশিকনালীতে প্রবেশ করে। কৈশিকনালীর প্রাচীর এতটাই পাতলা ও ভঙ্গুর যে রক্তকণিকা কেবল এক সারিতে চলাচল করতে পারে। কৈশিকনালীর ভেতরে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিনিময় ঘটে। লাল রক্তকণিকা তাদের মধ্যে থাকা অক্সিজেন কৈশিকনালীর দেয়াল দিয়ে টিস্যুতে ছেড়ে দেয়। এরপর টিস্যু তার বর্জ্য পদার্থ যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড দেয়ালের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করিয়ে দেয়।

রক্ত সঞ্চালন তন্ত্র

[সম্পাদনা]

রক্ত সঞ্চালন তন্ত্র আমাদের জীবিত থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করলে শরীরের সব কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছে যায়, এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়া যায়। এটি শরীরের পিএইচ মাত্রা ঠিক রাখে এবং রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান, প্রোটিন ও কোষগুলোর চলাচল নিশ্চিত করে। উন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুর প্রধান দুটি কারণ— হৃদরোগ (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন) ও স্ট্রোক— দুটোই ধীরে ধীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত ধমনী ব্যবস্থার ফলাফল।

ধমনী হলো পেশিবহুল রক্তনালী, যা হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত বাইরে বহন করে। এটি অক্সিজেনযুক্ত ও অক্সিজেনবিহীন উভয় ধরনের রক্ত বহন করতে পারে। ফুসফুস ধমনীগুলো অক্সিজেনবিহীন রক্ত ফুসফুসে নিয়ে যায় এবং সিস্টেমিক ধমনীগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে। ধমনীর প্রাচীর তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত। ভেতরের স্তরকে বলা হয় এন্ডোথেলিয়াম, মাঝের স্তরটি প্রধানত মসৃণ পেশি দিয়ে গঠিত এবং বাইরের স্তরটি সংযোগকারী কলা (কনেকটিভ টিস্যু) দিয়ে তৈরি। ধমনীর প্রাচীর পুরু হয়, যাতে উচ্চচাপে রক্ত প্রবেশ করলে এটি প্রসারিত হতে পারে।

আর্টেরিওল

[সম্পাদনা]

আর্টেরিওল হলো ধমনীর ছোট রূপ, যা শেষ পর্যন্ত কৈশিকনালীতে নিয়ে যায়। এর পেশিবহুল প্রাচীর পুরু হয়। এই পেশিগুলো সংকোচন (রক্তনালী সঙ্কুচিত হওয়া) এবং প্রসারণ (রক্তনালী প্রসারিত হওয়া) করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয়; যত বেশি রক্তনালী প্রসারিত হয়, তত কম রক্তচাপ হয়। আর্টেরিওল চোখে সামান্য দেখা যায়।

কৈশিকনালী

[সম্পাদনা]

কৈশিকনালী হলো দেহের সবচেয়ে ছোট রক্তনালী, যা ধমনী ও শিরার মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এবং টিস্যুগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। এগুলো শরীরজুড়ে বিস্তৃত, মোট পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল প্রায় ৬,৩০০ বর্গমিটার। তাই কোনো কোষই কৈশিকনালী থেকে খুব বেশি দূরে নয়— সাধারণত ৫০ মাইক্রোমিটারের মধ্যেই থাকে। কৈশিকনালীর প্রাচীর একক স্তরের কোষ নিয়ে গঠিত, যাকে এন্ডোথেলিয়াম বলে। এটি এত পাতলা যে অক্সিজেন, পানি ও লিপিডের মতো অণু সহজেই ছড়িয়ে পড়ে (ডিফিউশন) এবং টিস্যুতে প্রবেশ করে। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ইউরিয়ার মতো বর্জ্য পদার্থও ছড়িয়ে পড়ে রক্তে ফিরে আসে, যাতে শরীর থেকে অপসারণ করা যায়।

"কৈশিকনালী বিছানা" হলো সারা শরীরে বিস্তৃত এই কৈশিকনালীগুলোর জাল। প্রয়োজনে এই বিছানাগুলো "খুলে" বা "বন্ধ" করা যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে অটো-রেগুলেশন। সাধারণত কৈশিকনালী বিছানাগুলো তাদের ধারণক্ষমতার মাত্র ২৫% রক্ত ধারণ করে। যে কোষগুলো বেশি কাজ করে, তাদের বেশি কৈশিকনালী দরকার হয়।

শিরা হলো সেই রক্তনালী যা রক্ত হৃদপিণ্ডে ফেরত নিয়ে আসে। ফুসফুস শিরাগুলো অক্সিজেনযুক্ত রক্ত হৃদপিণ্ডে ফেরত আনে এবং সিস্টেমিক শিরাগুলো অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃদপিণ্ডে ফেরত নিয়ে আসে। শরীরের মোট রক্তের প্রায় ৭০% শিরা ব্যবস্থায় থাকে। শিরার বাইরের প্রাচীর ধমনীর মতো তিনটি স্তরেই গঠিত, তবে এর ভেতরের স্তরে মসৃণ পেশি কম এবং বাইরের স্তরে সংযোগকারী কলাও কম থাকে। শিরায় রক্তচাপ কম থাকে, তাই রক্ত ফেরত আনার জন্য কঙ্কাল পেশির সহায়তা লাগে। বেশিরভাগ শিরায় একমুখী ভাল্ব থাকে, যাকে ভেনাস ভাল্ব বলে, যা রক্তকে উল্টো দিকে যাওয়া থেকে রোধ করে। বাইরের পুরু কোলাজেন স্তর রক্তচাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং রক্ত জমে যাওয়া ঠেকায়। যদি কেউ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে বা শয্যাশায়ী হয়, তাহলে শিরায় রক্ত জমে যেতে পারে এবং ভেরিকোজ শিরা তৈরি হতে পারে। শিরার মধ্যখানের ফাঁপা জায়গাকে বলে লুমেন, যেখানে রক্ত প্রবাহিত হয়। পেশিময় স্তর শিরাকে সংকুচিত করতে সাহায্য করে, ফলে রক্ত দ্রুত চলাচল করে। চিকিৎসায় শিরা ব্যবহার করা হয় রক্ত নেওয়া এবং ওষুধ, পুষ্টি বা তরল দেওয়ার (ইন্ট্রাভেনাস ডেলিভারি) জন্য।

ভেনিওল

[সম্পাদনা]

ভেনিওল হলো ছোট শিরা, যা কৈশিকনালী বিছানা থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত বড় শিরায় ফেরত নিয়ে যায় (ফুসফুস চক্র ব্যতীত)। ভেনিওলের তিনটি স্তর থাকে; এটি ধমনীর মতো গঠিত হলেও মসৃণ পেশি কম থাকে বলে এটি তুলনামূলকভাবে পাতলা।

হৃদরক্ত নালির পথ

[সম্পাদনা]
মানব রক্ত সঞ্চালন তন্ত্র। ধমনীগুলো লাল, শিরাগুলো নীল রঙে দেখানো হয়েছে।

রক্তপ্রবাহের দ্বৈত সঞ্চালন ব্যবস্থা বলতে ফুসফুস সঞ্চালন এবং সিস্টেমিক সঞ্চালন দুইটি পৃথক ব্যবস্থাকে বোঝায়, যা উভচর, পাখি ও স্তন্যপায়ীদের (মানুষসহ) মধ্যে থাকে। এর বিপরীতে, মাছের একক সঞ্চালন ব্যবস্থা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদপিণ্ড দুটি আলাদা পাম্প নিয়ে গঠিত। ডান পাশে ডান অলিন্দ ও ডান নিলয় থাকে (যা অক্সিজেনবিহীন রক্ত ফুসফুসে পাঠায়), এবং বাম পাশে বাম অলিন্দ ও বাম নিলয় থাকে (যা অক্সিজেনযুক্ত রক্ত শরীরের অন্যান্য অংশে পাঠায়)। একটি সার্কিট থেকে অন্যটিতে যেতে হলে রক্তকে অবশ্যই হৃদপিণ্ড অতিক্রম করতে হয়। রক্ত প্রতিমিনিটে দুই-তিনবার সারা শরীর ঘুরে আসে। প্রতিদিন রক্ত প্রায় ১৯,০০০ কিমি (১২,০০০ মাইল) পথ অতিক্রম করে, যা আমেরিকার উপকূল থেকে উপকূল পর্যন্ত দূরত্বের চার গুণ।

ফুসফুস সঞ্চালন পথ

[সম্পাদনা]

ফুসফুস সঞ্চালন পথে হৃদপিণ্ডের ডান নিলয় থেকে রক্ত ফুসফুসে পাম্প করা হয়। এটি ফুসফুস ধমনীর মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। ফুসফুসে অ্যালভিওলাইতে থাকা অক্সিজেন আশেপাশের কৈশিকনালীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং রক্তে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড অ্যালভিওলাইতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে রক্ত অক্সিজেনযুক্ত হয় এবং এটি ফুসফুস শিরার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের বাম অলিন্দে ফিরে আসে। এই অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া অক্সিজেন ব্যবহার করে জৈব পদার্থ থেকে শক্তি উৎপন্ন করে।

সিস্টেমিক সঞ্চালন পথ

[সম্পাদনা]

সিস্টেমিক সঞ্চালন পথ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে। ফুসফুস থেকে আসা অক্সিজেনযুক্ত রক্ত বাম অলিন্দে প্রবেশ করে, এরপর নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্তকে মহাধমনীতে পাঠায়। সিস্টেমিক ধমনীগুলো মহাধমনী থেকে শাখায় বিভক্ত হয়ে কৈশিকনালীতে রক্ত পৌঁছায়। কোষগুলো অক্সিজেন ও পুষ্টি গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড, বর্জ্য, এনজাইম ও হরমোন তৈরি করে। শিরাগুলো কৈশিকনালী থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত সংগ্রহ করে ডান অলিন্দে ফেরত পাঠায়।

মহাধমনী

[সম্পাদনা]

মহাধমনী হলো সিস্টেমিক সঞ্চালন পথের সবচেয়ে বড় ধমনী। বাম নিলয় থেকে রক্ত এতে পাম্প করা হয় এবং এটি শরীরের সব অংশে শাখা তৈরি করে রক্ত সরবরাহ করে। মহাধমনী একটি স্থিতিস্থাপক ধমনী, যার ফলে এটি প্রসারিত হতে পারে। যখন বাম নিলয় সংকুচিত হয়ে রক্ত এতে পাঠায়, তখন এটি প্রসারিত হয়। এই প্রসারণে সঞ্চিত শক্তি ডায়াস্টল অবস্থায় রক্তচাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে, কারণ তখন এটি প্যাসিভভাবে সংকুচিত হয়।

ঊর্ধ্ব মহাশিরা

[সম্পাদনা]

ঊর্ধ্ব মহাশিরা একটি ছোট শিরা, যা দেহের উপরের অর্ধাংশ থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে নিয়ে আসে। এটি ডান ও বাঁ ব্র্যাকিওসেফালিক শিরার সংমিশ্রণে তৈরি হয়, যা হাত, মাথা ও ঘাড় থেকে রক্ত সংগ্রহ করে। অ্যাজাইগাস শিরা (যা পাঁজরের খাঁচা থেকে রক্ত আনে) এটিতে যুক্ত হয়, ঠিক ডান অলিন্দে ঢোকার আগে।

নিম্ন মহাশিরা

[সম্পাদনা]

নিম্ন মহাশিরা একটি বড় শিরা, যা দেহের নিচের অর্ধাংশ থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃদপিণ্ডে নিয়ে আসে। এটি ডান ও বাঁ কমন ইলিয়াক শিরার সংমিশ্রণে তৈরি হয় এবং রক্তকে হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে পাঠায়। এটি উদর গহ্বরের পেছনে অবস্থান করে এবং মেরুদণ্ডের ডান পাশে চলে।

করোনারি ধমনীসমূহ

[সম্পাদনা]
Heart showing the Coronary Arteries

হৃদপিণ্ডের করোনারি ধমনীসমূহ করোনারি রক্ত সঞ্চালন বলতে হৃদপিণ্ডের নিজস্ব পেশীতে রক্ত সরবরাহ এবং সেই রক্ত অপসারণকারী রক্তনালীগুলিকে বোঝানো হয়। যদিও হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠগুলো রক্তে পূর্ণ থাকে, তবুও হৃদপেশি বা মায়োকার্ডিয়াম এতটাই পুরু হয় যে, মায়োকার্ডিয়ামের গভীরে রক্ত পৌঁছাতে করোনারি রক্তনালীর প্রয়োজন হয়। যে রক্তনালীগুলো মায়োকার্ডিয়ামে উচ্চমাত্রায় অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছে দেয়, সেগুলোকে করোনারি ধমনী বলা হয়। আর যে শিরাগুলো হৃদপেশি থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত অপসারণ করে, সেগুলো কার্ডিয়াক ভেইন বা হৃদীয় শিরা নামে পরিচিত। যেসব করোনারি ধমনী হৃদপিণ্ডের উপরিভাগ দিয়ে চলে, সেগুলোকে এপিকার্ডিয়াল করোনারি ধমনী বলা হয়। এই ধমনীগুলো যদি সুস্থ থাকে, তবে হৃদপিণ্ডের প্রয়োজনে উপযুক্ত হারে রক্তপ্রবাহ বজায় রাখতে এটি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে এই অপেক্ষাকৃত সরু রক্তনালীগুলো সাধারণত অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত হয় এবং রুদ্ধ হতে পারে, যা অ্যাঞ্জাইনা বা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। করোনারি ধমনীগুলোকে "চূড়ান্ত রক্ত সরবরাহকারী" ধমনী বলা হয়, কারণ এগুলোর মাধ্যমেই একমাত্র রক্ত সরবরাহ হয় মায়োকার্ডিয়ামে। অতিরিক্ত বা বিকল্প রক্ত সরবরাহ খুবই সীমিত, এজন্য এই ধমনীগুলো রুদ্ধ হলে তা মারাত্মক হতে পারে। সাধারণভাবে দুটি প্রধান করোনারি ধমনী রয়েছে—বাম ও ডান। • ডান করোনারি ধমনী • বাম করোনারি ধমনী উভয় ধমনীর উৎপত্তি অ্যার্টার ধমনীর গোড়া (মূল) থেকে, ঠিক অ্যার্টিক ভালভের উপরে। নিচে আলোচনা অনুযায়ী, বাম করোনারি ধমনীর উৎপত্তি বাম অ্যার্টিক সাইনাস থেকে, আর ডান করোনারি ধমনীর উৎপত্তি ডান অ্যার্টিক সাইনাস থেকে। প্রায় ৪% মানুষের ক্ষেত্রে একটি তৃতীয় ধমনী থাকে, যাকে পোষ্টেরিয়র করোনারি ধমনী বলা হয়। খুব বিরল ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তির একটি মাত্র করোনারি ধমনী থাকে, যা অ্যার্টার মূলের চারপাশ ঘিরে থাকে।

হেপাটিক শিরাসমূহ

[সম্পাদনা]

মানব দেহতত্ত্বে হেপাটিক শিরাগুলো এমন রক্তনালী যেগুলো যকৃত থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত এবং যকৃতে পরিষ্কারকৃত রক্ত (যা পেট, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদন্ত্র থেকে আসে) নিম্ন মহাশিরাতে প্রবাহিত করে। এই শিরাগুলোর উৎপত্তি যকৃতের গভীর অংশ থেকে হয়, বিশেষ করে লিভার লোবিউলের কেন্দ্রীয় শিরা থেকে। এগুলোকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় উপরের ও নিচের দল। উপরের দলে সাধারণত তিনটি শিরা থাকে যেগুলো যকৃতের পশ্চাদ্ভাগ থেকে উৎপন্ন হয়ে কোয়াড্রেট লোব ও বাম লোব থেকে রক্ত নিঃসরণ করে। নিচের দল ডান লোব ও কডেট লোব থেকে উৎপন্ন হয়, সংখ্যা ভেদে পরিবর্তনশীল এবং এগুলো সাধারণত উপরের দলের চেয়ে ছোট হয়। কোনো হেপাটিক শিরাতেই ভাল্ব থাকে না।

হৃদচক্র

[সম্পাদনা]

হৃদচক্র বলতে হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও প্রশমনের পুরো প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে রক্ত শরীরজুড়ে প্রবাহিত হয়। "হার্ট রেট" বলতে বোঝায় হৃদচক্রের হার বা ঘনত্ব, যা চারটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনী সংকেতের একটি। এটি সাধারণত প্রতি মিনিটে হৃদ্পিণ্ড কতবার সংকুচিত হয়, তা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এবং "বিটস পার মিনিট" বা বিপিএম এ প্রকাশ করা হয়। বিশ্রামরত অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের হৃদস্পন্দন প্রায় ৭০ বিপিএম এবং নারীর ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ বিপিএম হয়। তবে এই হার ব্যক্তি ভেদে পরিবর্তিত হয়। সাধারণত এর পরিসীমা ৬০ বিপিএম (এর চেয়ে কম হলে ব্র্যাডিকার্ডিয়া বলা হয়) থেকে ১০০ বিপিএম (এর বেশি হলে ট্যাকিকার্ডিয়া বলা হয়) পর্যন্ত ধরা হয়। ক্রীড়াবিদদের বিশ্রামকালীন হার অনেক কম হতে পারে এবং স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি হতে পারে। শরীর বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি করতে পারে, যাতে হৃদ্পিণ্ড থেকে নির্গত রক্তের পরিমাণ (কার্ডিয়াক আউটপুট) বৃদ্ধি করা যায়। ব্যায়াম, পরিবেশগত চাপ বা মানসিক চাপের কারণে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যেতে পারে। পালস বা নাড়ি হৃদ্স্পন্দন পরিমাপের সহজ উপায় হলেও কিছু ক্ষেত্রে প্রতিটি স্পন্দনে যথেষ্ট রক্ত বের না হলে এটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এরকম কিছু অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের (আরিথমিয়া) ক্ষেত্রে, বাস্তব হৃদ্স্পন্দন হার পালস থেকে অনেক বেশি হতে পারে। প্রতিটি 'বিট' বা স্পন্দন তিনটি বড় ধাপে সম্পন্ন হয় আট্রিয়াল সিস্টোল, ভেন্ট্রিকুলার সিস্টোল এবং সম্পূর্ণ কার্ডিয়াক ডায়াস্টোল। পুরো চক্রজুড়ে রক্তচাপ ওঠানামা করে। যখন নিলয় সংকুচিত হয়, চাপ বেড়ে যায়, ফলে এভি ভালভগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।

সিস্টোল

[সম্পাদনা]
হৃৎপিণ্ডের সঙ্কোচনের পর্যায়

সিস্টোল অবস্থায় হৃদপিণ্ড হৃদপিণ্ডের সঙ্কোচন বা সিস্টোল প্রক্রিয়া শুরু হয় সাইনোআলিন্দল নোডের বৈদ্যুতিক কোষগুলোর মাধ্যমে, যা হৃদ্পিণ্ডের প্রাকৃতিক পেসমেকার হিসেবে কাজ করে। এই কোষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তেজনার নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে ডিপোলারাইজ হয়। তখন, কোষের ঝিল্লিতে থাকা ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল খোলে এবং ক্যালসিয়াম আয়ন কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। কিছু ক্যালসিয়াম আয়ন সারকোপ্লাজমিক রেটিকুলামের রিসেপ্টরে যুক্ত হয়ে আরো ক্যালসিয়ামকে সারকোপ্লাজমে প্রবেশ করায়। এরপর এই ক্যালসিয়াম ট্রোপোনিনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ট্রপোমায়োসিন ও অ্যাক্টিন প্রোটিনের মাঝে থাকা বন্ধনকে ভেঙে দেয়, ফলে মায়োসিন হেডগুলো অ্যাক্টিনে যুক্ত হতে পারে। মায়োসিন হেডগুলো অ্যাক্টিন ফিলামেন্ট টেনে সংকোচন ঘটায়। এরপর এটিপি যুক্ত হয়ে মায়োসিন হেডগুলোকে ছাড়িয়ে পুনরায় প্রস্তুত অবস্থানে নিয়ে যায়, এটিপি ভেঙে এডিপি ও ফসফেট উৎপন্ন করে। এই সংকেত প্রতিবেশী মায়োকার্ডিয়াল কোষের গ্যাপ জাংশনের মাধ্যমে সোডিয়াম আয়নের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়ে। সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুর টার্মিনাল থেকে নিঃসৃত নরএপিনেফ্রিন (নরঅ্যাড্রেনালিন) সাইনোআলিন্দল ও অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোডে গিয়ে β1-অ্যাড্রেনোরিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়, যেগুলো জিপ্রোটিন-যুক্ত রিসেপ্টর। এই সংযুক্তি রিসেপ্টরের গঠন পরিবর্তন করে, যা G-প্রোটিনকে সক্রিয় করে। সক্রিয় G-প্রোটিন এটিপি থেকে সিএএমপি তৈরি করে, যা β-অ্যাড্রেনোরিসেপ্টর কিনেস এনজাইম সক্রিয় করে। এই এনজাইম ক্যালসিয়াম চ্যানেলকে ফসফোরাইলেট করে, ফলে আরো বেশি ক্যালসিয়াম প্রবাহ ঘটে, ট্রোপোনিনের সঙ্গে আরো বেশি ক্যালসিয়াম যুক্ত হয় এবং সংকোচন আরও শক্তিশালী ও দ্রুত হয়। [ফসফোডায়েস্টারেজ এনজাইম সিএএমপি-কে ভেঙে এএমপি-তে পরিণত করে, ফলে এটি আর প্রোটিন কিনেস সক্রিয় করতে পারে না। এএমপি আবার এটিপি-তে পরিণত হয়ে পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে।] নরএপিনেফ্রিন এভি নোডেও কাজ করে, সংকেত পরিবহণের বিলম্ব কমিয়ে দেয় এবং বুন্ডল অব হিজ দিয়ে দ্রুত গমন নিশ্চিত করে।

ডায়াস্টোল

[সম্পাদনা]
হৃৎপিণ্ডের প্রসারণের পর্যায়

ডায়াস্টোল অবস্থায় হৃদপিণ্ড কার্ডিয়াক ডায়াস্টোল হলো সেই সময়কাল যখন হৃদপিণ্ড সংকোচনের পর শিথিল হয় এবং পুনরায় রক্ত ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। যখন নিলয় শিথিল হয়, তখন সেটিকে ভেন্ট্রিকুলার ডায়াস্টোল বলা হয়; আর যখন আলিন্দ শিথিল হয়, তখন সেটিকে আলিন্দল ডায়াস্টোল বলা হয়। উভয় একসাথে সম্পূর্ণ কার্ডিয়াক ডায়াস্টোল গঠন করে। মনে রাখতে হবে, এই শিথিলতাও একটি সক্রিয় এবং শক্তি-ব্যয়ী প্রক্রিয়া। ভেন্ট্রিকুলার ডায়াস্টোল চলাকালে (বাম ও ডান) নিলয়ের চাপ সিস্টোল অবস্থায় প্রাপ্ত সর্বোচ্চ চাপ থেকে কমে যায়। যখন বাম নিলয়ের চাপ বাম অলিন্দের চেয়ে কমে যায়, তখন মাইট্রাল ভালভ খুলে যায় এবং বাম অলিন্দে জমা হওয়া রক্ত বাম নিলয়ে প্রবেশ করে। একইভাবে, ডান নিলয়ের চাপ যখন ডান অলিন্দের চেয়ে কমে যায়, তখন ট্রাইকাসপিড ভালভ খুলে যায় এবং ডান অলিন্দের রক্ত ডান নিলয়ে চলে আসে।

লাব-ডাব

[সম্পাদনা]

প্রথম হার্ট টোন বা S1, যাকে "লাব" বলা হয়, তা ঘটে তখন যখন হৃৎপিণ্ডের অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার ভাল্বগুলো (মাইট্রাল ও ট্রাইকাসপিড) বন্ধ হয়ে যায়। এটি ঘটে নিলয় সংকোচনের শুরুতে বা সিস্টোল পর্বে। যখন নিলয়ের চাপ অলিন্দর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন এই ভাল্বগুলো বন্ধ হয়ে যায় যাতে রক্ত আবার নিলয় থেকে অলিন্দমে ফিরে যেতে না পারে। দ্বিতীয় হার্ট টোন বা S2 (A2 ও P2), যাকে "ডাব" বলা হয়, তা ঘটে ভেন্ট্রিকুলার সিস্টোল শেষ হওয়ার সময় অ্যায়োরটিক ভাল্ব ও পালমোনারি ভাল্ব বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। যখন বাম নিলয় খালি হয়ে যায়, তখন তার চাপ অ্যায়োরটার চেয়ে কমে যায়, ফলে অ্যায়োরটিক ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে, ডান নিলয়ের চাপ পালমোনারি ধমনী অপেক্ষা কমে গেলে পালমোনারি ভাল্ব বন্ধ হয়ে যায়। শ্বাস নেওয়ার সময় (ইনস্পিরেশন), বুকে ঋণাত্মক চাপ তৈরি হয়, যা ডান দিকের হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ডান নিলয়ে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং পালমোনারি ভাল্ব কিছুটা বেশি সময় ধরে খোলা থাকে। ফলে S2-এর P2 অংশটি কিছুটা দেরিতে হয়। শ্বাস ছাড়ার সময় (এক্সপিরেশন), পজিটিভ চাপের কারণে ডান দিকে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। এতে পালমোনারি ভাল্ব আগে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে P2 তাড়াতাড়ি ঘটে এবং A2-র আরও কাছাকাছি সময়ে ঘটে। তরুণদের ক্ষেত্রে এবং শ্বাস নেওয়ার সময় S2-এর দুটি অংশের আলাদা শোনা একেবারে স্বাভাবিক। শ্বাস ছাড়ার সময় এই ব্যবধান ছোট হয়ে একত্রে একটি শব্দ হিসেবে শোনা যায়।

হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেত পরিচালনা ব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

হৃৎপিণ্ড মূলত পেশি টিস্যু দিয়ে তৈরি। একটি স্নায়ুবিন্যাস এই পেশি টিস্যুর সংকোচন ও শিথিলতা সমন্বয় করে যাতে হৃৎপিণ্ডে ঢেউয়ের মতো কার্যকর রক্ত পাম্পিং সম্ভব হয়।

How Stuff Works (The Heart)

হৃদস্পন্দনের নিয়ন্ত্রণ

[সম্পাদনা]

হৃৎপিণ্ডে দুটি প্রাকৃতিক পেসমেকার (কার্ডিয়াক পেসমেকার) থাকে, যেগুলো নিজের থেকেই হৃৎপিণ্ডকে স্পন্দিত করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র এবং অ্যাড্রেনালিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। যদি হৃদপেশিগুলো স্বাভাবিক ছন্দে এলোমেলোভাবে সংকোচন-শিথিলতা করত, তবে তা বিশৃঙ্খল হয়ে যেত এবং পাম্প হিসেবে হৃৎপিণ্ডের কাজ ব্যাহত হতো। কখনো কখনো যদি হৃৎপিণ্ডের কোনো অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা কেউ বৈদ্যুতিক শকে আক্রান্ত হয়, তবে হৃদচক্র এলোমেলো ও অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। তখন হৃৎপিণ্ডের কিছু অংশ সংকুচিত হয় আর কিছু অংশ শিথিল থাকে, ফলে পুরো হৃৎপিণ্ড একসঙ্গে সংকোচন-শিথিলতা না করে অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে থাকে। একে বলা হয় ফাইব্রিলেশন এবং যদি ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে চিকিৎসা না করা হয় তবে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।

সিনোআলিন্দল নোড ও এট্রিওভেন্ট্রিকুলার বান্ডেল অব হিস-এর স্কিম্যাটিক চিত্র। SA নোড-এর অবস্থান নীল রঙে দেখানো হয়েছে। বান্ডেলটি, যা লাল রঙে দেখানো হয়েছে, করোনারি সাইনাসের কাছাকাছি একটি বিস্তৃত অংশ তৈরি করে AV নোড গঠন করে। AV নোডটি হিশ বান্ডেলে পরিণত হয়, যা ভেন্ট্রিকুলার সেপটামে প্রবেশ করে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়—বাম ও ডান বান্ডেল। এর চূড়ান্ত বিস্তার এই চিত্রে সম্পূর্ণভাবে দেখানো সম্ভব নয়।

SA নোড সিনোআলিন্দল নোড (SA নোড বা SAN), যাকে সাইনাস নোডও বলা হয়, এটি একটি পেসমেকার টিস্যু যা হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দে অবস্থিত এবং বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। যদিও হৃৎপিণ্ডের সব কোষই সংকোচন সৃষ্টি করার মতো বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে পারে, তবু SA নোড সবচেয়ে দ্রুত সংকেত তৈরি করে বলে এটি সাধারণত হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন শুরু করে। কারণ, SA নোড অন্যান্য পেসমেকার অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি গতি নিয়ে সংকেত তৈরি করে। হৃৎপিণ্ডের মায়োসাইটগুলোও অন্যান্য স্নায়ুকোষের মতো একটি পুনরুদ্ধারকাল পেরিয়ে অতিরিক্ত সংকোচনে সাড়া দেয় না, তাই SA নোড আগেভাগেই নতুন সংকেত পাঠিয়ে পুরো হৃদপিণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। SA নোড হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দের প্রাচীরে, ঊর্ধ্ব মহাশিরার প্রবেশ মুখের কাছে অবস্থিত কোষের একটি দল। এই কোষগুলো কিছুটা সংকোচনশীল ফাইবার রাখে, তবে এগুলো প্রকৃতপক্ষে সংকুচিত হয় না। SA নোডের কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবে মিনিটে প্রায় ৭০–৮০ বার বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করে। এই নোড পুরো হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপের জন্য দায়ী, তাই একে প্রাইমারি পেসমেকার বলা হয়। যদি SA নোড কাজ না করে বা এর সংকেত নিচের দিকে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে হৃৎপিণ্ডের নিচের দিকে থাকা অন্য একদল কোষ সংকেত তৈরি শুরু করে। এরা এট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড (AV নোড) গঠন করে, যা ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝখানে অবস্থিত। AV নোড মিনিটে ৪০–৬০ বার সংকেত পাঠাতে পারে। যদি AV নোড বা পারকিঞ্জি ফাইবারে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে হৃৎপিণ্ডের অন্য কোথাও একটপিক পেসমেকার তৈরি হতে পারে, যেটি সাধারণত SA নোডের চেয়েও দ্রুত সংকেত দেয় এবং অস্বাভাবিক সংকোচন সৃষ্টি করে। SA নোড ভেগাল (প্যারাসিম্প্যাথেটিক) ও সিম্প্যাথেটিক স্নায়ু দ্বারা ঘনভাবে ঘেরা থাকে। ফলে এটি স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভেগাস স্নায়ুর উদ্দীপনা SA নোডের গতি কমিয়ে দেয়, অর্থাৎ হৃদস্পন্দন কমিয়ে দেয়। সিম্প্যাথেটিক স্নায়ু এর বিপরীতে গতি বাড়িয়ে দেয়। সিম্প্যাথেটিক স্নায়ুগুলো হৃৎপিণ্ডের প্রায় সব অংশে বিস্তৃত থাকে, বিশেষ করে ভেন্ট্রিকুলার পেশিতে। প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ু প্রধানত SA ও AV নোড, কিছু আলিন্দল পেশি এবং ভেন্ট্রিকুলার পেশিতে কাজ করে। ভেগাস স্নায়ুর উদ্দীপনা AV নোডের গতি কমিয়ে দেয় এবং অ্যাসিটাইলকোলিন নিঃসরণ করে K+ আয়নের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো এই ভেগাল উদ্দীপনা SA নোড বন্ধ করে দিতে পারে, একে বলা হয় "ভেন্ট্রিকুলার এস্কেপ"। তখন AV বান্ডেলের পারকিঞ্জি ফাইবার নিজেদের সংকেত তৈরি করে নিজস্ব ছন্দে কাজ শুরু করে। অধিকাংশ মানুষের SA নোডে রক্ত সরবরাহ করে ডান করোনারি ধমনী। ফলে, যদি কোনো হার্ট অ্যাটাক এই ধমনী বন্ধ করে দেয় এবং বাম ধমনীর মাধ্যমে পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহ না থাকে, তবে SA নোডে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে কোষগুলো মারা যেতে পারে। এতে SA নোড থেকে সংকেত পাঠানো বন্ধ হয়ে যায় এবং হৃদস্পন্দন থেমে যেতে পারে।

এভি নোড

[সম্পাদনা]

অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড সংক্ষেপে এভি নোড হল হৃদপিণ্ডের আলিন্দ ও নিলয় এর মধ্যবর্তী একটি টিস্যু, যা আলিন্দ থেকে নিলয় পর্যন্ত স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবাহিত করে। এভি নোড দুটি উৎস থেকে সংকেত পায় — পেছনের দিকে ক্রিস্টা টার্মিনালিস এর মাধ্যমে এবং সামনের দিকে ইন্টারআলিন্দল সেপটামের মাধ্যমে। এভি নোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল "ডিক্রিমেন্টাল কন্ডাকশন"। এর ফলে দ্রুত আলিন্দল রিদম (যেমন আলিন্দল ফিব্রিলেশন বা ফ্লাটার) এর ক্ষেত্রে নিলয়ে অতিরিক্ত সংকেত প্রবাহ প্রতিরোধ করা যায়। এভি নোড ০.১ সেকেন্ডের জন্য সংকেত বিলম্ব করে রাখে, তারপর তা নিলয়ের দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিলম্বটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি নিশ্চিত করে যে নিলয় সংকোচনের আগে আলিন্দ সম্পূর্ণভাবে খালি হয়ে গেছে। প্রায় ৮৫% থেকে ৯০% মানুষের এভি নোডে রক্ত সরবরাহ আসে ডান করোনারি ধমনীর একটি শাখা থেকে এবং ১০% থেকে ১৫% মানুষের ক্ষেত্রে আসে বাম সার্কামফ্লেক্স ধমনীর একটি শাখা থেকে। কিছু নির্দিষ্ট ধরনের সুপ্রাভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া তে একজন ব্যক্তির দুটি এভি নোড থাকতে পারে। এর ফলে বৈদ্যুতিক প্রবাহে একটি লুপ তৈরি হয় এবং হার্টবিট অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত হয়। যখন এই বিদ্যুৎ প্রবাহ নিজেকেই ছুঁয়ে ফেলে তখন এটি ছড়িয়ে পড়ে এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসে।

এভি বান্ডল

[সম্পাদনা]

বান্ডল অফ হিজ হল একটি বিশেষ ধরণের হৃদপেশির কোষসমষ্টি, যা বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবহণে দক্ষ এবং এভি নোড থেকে সংকেত গ্রহণ করে তা নিচের দিকের ফ্যাসিকুলার শাখা পর্যন্ত পাঠিয়ে দেয়। এই শাখাগুলো পরে পারকিঞ্জি ফাইবার এর দিকে যায়, যেগুলো নিলয় ইননারভেট করে এবং নির্ধারিত ছন্দে নিলয় সংকোচন করায়। এই বিশেষ ধরনের ফাইবার আবিষ্কার করেছিলেন সুইস কার্ডিওলজিস্ট উইলহেলম হিজ জুনিয়র, ১৮৯৩ সালে।হৃদপেশি একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পেশি, কারণ এটি নিজে থেকেই সংকোচন ও প্রসারণ করতে পারে এটিকে মায়োজেনিক বলা হয়। দুটি হৃদপেশি কোষ পাশাপাশি রাখা হলে তারা একসাথে স্পন্দিত হয়। বান্ডল অফ হিজ এর ফাইবারগুলো সাধারণ হৃদপেশির তুলনায় দ্রুত ও সহজে বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবাহিত করতে পারে। এগুলি এভি নোড (যা নিলয়ের পেসমেকার হিসেবেও কাজ করে) থেকে সংকেত নিয়ে পুরো হৃদপিণ্ডে ছড়িয়ে দেয়। এই বান্ডল তিনটি শাখায় বিভক্ত হয় — ডান, বাম অ্যান্টেরিয়র ও বাম পস্টেরিয়র বান্ডল ব্রাঞ্চ, যেগুলো ইন্ট্রাভেন্ট্রিকুলার সেপটাম বরাবর চলে যায়। এই শাখাগুলো থেকে পারকিঞ্জি ফাইবার উৎপন্ন হয়, যেগুলো সংকেত নিলয়ের পেশিতে পৌঁছে দেয়। বান্ডল ব্রাঞ্চ ও পারকিঞ্জি নেটওয়ার্ক মিলে ভেন্ট্রিকুলার কন্ডাকশন সিস্টেম গঠন করে। বান্ডল অফ হিজ থেকে সংকেত নিলয় পেশিতে পৌঁছাতে প্রায় ০.০৩–০.০৪ সেকেন্ড সময় লাগে। এই সব নোড থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এরা হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ ও সংকোচন-প্রসারণের সঠিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে এবং সঠিক অনুক্রম বজায় রাখে।

পারকিঞ্জি ফাইবার

[সম্পাদনা]

পারকিঞ্জি ফাইবার ( পারকাইন টিস্যু) হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ ভেন্ট্রিকুলার দেয়ালে অবস্থিত, এন্ডোকার্ডিয়াম এর ঠিক নিচে। এগুলো বিশেষ ধরনের মায়োকার্ডিয়াল ফাইবার যা বৈদ্যুতিক সংকেত বহন করে এবং হৃদপিণ্ডকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে সংকুচিত হতে সাহায্য করে। এসএ নোড ও এভি নোডের সঙ্গে একত্রে কাজ করে পারকিঞ্জি ফাইবার হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে। কার্ডিয়াক সাইকেল এর ভেন্ট্রিকুলার সংকোচনের সময়, পারকিঞ্জি ফাইবার ডান ও বাম বান্ডল ব্রাঞ্চ থেকে সংকেত গ্রহণ করে তা নিলয়ের মায়োকার্ডিয়ামে পৌঁছে দেয়। এর ফলে নিলয়ের পেশি সংকুচিত হয় এবং রক্ত বাহিরে নির্গত হয় — ডান নিলয় থেকে ফুসফুসে এবং বাম নিলয় থেকে শরীরের অন্য অংশে। ১৮৩৯ সালে ইয়ান ইভানজেলিস্টা পারকিঞ্জি এই ফাইবার আবিষ্কার করেন এবং তার নামেই এগুলোর নামকরণ করা হয়।

পেসমেকার

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রিত হয় বৈদ্যুতিক সংকেত দ্বারা, যেগুলো একটি নির্দিষ্ট হারে নির্গত হয় এবং হৃদস্পন্দনের হার নিয়ন্ত্রণ করে। এই সংকেত উৎপাদনকারী কোষগুলোকে বলা হয় পেসমেকার কোষ এবং এরা সরাসরি হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণ করে। যখন স্বাভাবিক কন্ডাকশন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন কৃত্রিম পেসমেকার ব্যবহার করা হয়, যা কৃত্রিমভাবে এই সংকেত তৈরি করে।

ফিব্রিলেশন

[সম্পাদনা]

ফিব্রিলেশন হল হৃদপিণ্ডের অস্বাভাবিক ঝাপটানি বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্পন্দন। এটি ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) এর মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়, যা হৃদপিণ্ডে বৈদ্যুতিক উত্তেজনার তরঙ্গ পরিমাপ করে এবং একটি গ্রাফে ভোল্টেজ বনাম সময় প্রদর্শন করে। যদি হৃদপিণ্ড ও কার্ডিয়াক সাইকেল ঠিকমতো কাজ করে, তাহলে ইসিজি একটি নিয়মিত ও পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন দেখায়। কিন্তু ফিব্রিলেশন হলে কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখা যায় না। এটি হতে পারে আলিন্দল ফিব্রিলেশন (সবচেয়ে সাধারণ) অথবা ভেন্ট্রিকুলার ফিব্রিলেশন (অল্প দেখা যায়, তবে বেশি বিপজ্জনক)। হাসপাতালে ভিএফ এর সময় মনিটর এলার্ম বাজিয়ে ডাক্তারদের সতর্ক করে। তারপর একটি শক্তিশালী বৈদ্যুতিক শক বুকের ওপরে প্রয়োগ করে হৃদপিণ্ডকে ফিব্রিলেশন অবস্থা থেকে বের করে আনা হয়। এতে হৃদপিণ্ড ৫ সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে এটি আবার স্বাভাবিক ছন্দে স্পন্দিত হতে শুরু করে। ফিব্রিলেশন একটি "সার্কাস মুভমেন্ট"-এর উদাহরণ, যেখানে বৈদ্যুতিক সংকেত একটি নির্দিষ্ট চক্রাকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং আবার সেই স্থানে ফিরে এসে পুনরায় উত্তেজিত করে। এই সংকেত থামে না। সার্কাস মুভমেন্ট হয় যখন একটি সংকেত হৃদপিণ্ডের কোনো এক স্থানে শুরু হয় এবং হৃদপিণ্ডের ভেতর দিয়ে ঘুরে আবার সেই কোষে ফিরে আসে, তখন যদি কোষটি পুনরায় উত্তেজিত হওয়ার উপযুক্ত অবস্থায় থাকে, তাহলে সংকেত আবার চালু হয়। এর ফলে সংকেতের অনন্ত চক্র তৈরি হয়। ফ্লাটার হল একটি ধরণের সার্কাস মুভমেন্ট, যেখানে কম ফ্রিকোয়েন্সির সমন্বিত তরঙ্গে দ্রুত হৃদস্পন্দন ঘটে। যদি বান্ডল অফ হিজ ব্লক হয়ে যায়, তাহলে আলিন্দ ও নিলয়ের কার্যকলাপে বিচ্ছিন্নতা দেখা যায়, যাকে তৃতীয় ডিগ্রি হার্ট ব্লক বলা হয়। ডান, বাম অ্যান্টেরিয়র এবং বাম পস্টেরিয়র বান্ডল ব্রাঞ্চ ব্লক হলেও তৃতীয় ডিগ্রি ব্লক হতে পারে। এটি একটি গুরুতর অবস্থা, এবং সাধারণত একজন রোগীর জন্য কৃত্রিম পেসমেকার প্রয়োজন হয়।

ইসিজি

[সম্পাদনা]

ইসিজি বা ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম হলো হৃদপিণ্ডের ইলেকট্রোফিজিওলজির একটি চিত্র। কার্ডিয়াক ইলেকট্রোফিজিওলজি হলো হৃদপিণ্ডের নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক কার্যক্রমের পদ্ধতি, কার্যকারিতা এবং কর্মক্ষমতা নিয়ে একটি বিজ্ঞান। ইসিজি হচ্ছে হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের একটি গ্রাফিকাল রেকর্ড। এই গ্রাফ হৃদস্পন্দনের হার এবং ছন্দ দেখাতে পারে, এটি হৃদপিণ্ডের আকার বড় হয়ে যাওয়া, রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া অথবা বর্তমান কিংবা অতীতের হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করতে পারে। ইসিজি একটি সস্তা, অ আক্রমণাত্মক, দ্রুত এবং ব্যথাহীন প্রক্রিয়া। ফলাফলের উপর ভিত্তি করে, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োজনে আরও কিছু পরীক্ষা কিংবা ওষুধ ও জীবনধারার পরিবর্তন নির্ধারণ করা হতে পারে।

ইসিজি কিভাবে পড়তে হয়

[সম্পাদনা]
ইসিজি তরঙ্গচিত্র

P
P তরঙ্গ - নির্দেশ করে যে আলিন্দ বৈদ্যুতিকভাবে উদ্দীপ্ত (ডিপোলারাইজড) হয়েছে যাতে রক্ত নিলয়ে পাম্প করা যায়।
QRS
QRS কমপ্লেক্স - নির্দেশ করে যে নিলয় বৈদ্যুতিকভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছে যাতে রক্ত বাহিরে পাম্প হয়।
ST
ST সেগমেন্ট - নিলয়ের সংকোচনের শেষ থেকে T তরঙ্গের শুরু পর্যন্ত সময় নির্দেশ করে।
T
T তরঙ্গ - নিলয়ের পুনরুদ্ধারের সময়কাল (রিপোলারাইজেশন) নির্দেশ করে।
U
U তরঙ্গ - খুব কমই দেখা যায়, এবং ধারণা করা হয় এটি প্যাপিলারি মাসলের রিপোলারাইজেশন নির্দেশ করতে পারে।

হৃদপেশি সংকোচন

[সম্পাদনা]

হৃদপেশি সেলের প্লাজমা মেমব্রেন অ্যাকশন পোটেনশিয়াল দ্বারা উদ্দীপ্ত হওয়ার পর, সংকোচন ঘটে যখন সেলের ভিতরের তরলে ক্যালসিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এটি কঙ্কাল পেশির মতোই, যেখানে সারকোপ্লাজমিক রেটিকুলাম থেকে Ca+ আয়ন নির্গত হয়ে ট্রোপোনিনে আবদ্ধ হয় এবং এটি অ্যাকটিনকে মায়োসিনের সাথে যুক্ত হতে দেয়। তবে, হৃদপেশিের সঙ্গে পার্থক্য হলো যখন অ্যাকশন পোটেনশিয়াল T-টিউবুলে অবস্থিত ভোল্টেজ গেইটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল খুলে দেয়। এর ফলে সেলের ভিতরের ক্যালসিয়াম বেড়ে যায় এবং এটি সারকোপ্লাজমিক রেটিকুলামের রিসেপ্টরের সাথে আবদ্ধ হয়। এটি আরও ক্যালসিয়াম চ্যানেল খুলে দেয় এবং ক্যালসিয়াম নির্গত হয়ে ট্রোপোনিনে যুক্ত হয় এবং অ্যাকটিন ও মায়োসিনের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে, যার ফলে সংকোচন ঘটে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলে ক্যালসিয়াম-প্ররোচিত ক্যালসিয়াম নিঃসরণ। সংকোচন তখনই শেষ হয় যখন সেলের ভিতরের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।

রক্তচাপ

[সম্পাদনা]

রক্তচাপ হলো রক্ত যখন রক্তনালীর দেয়ালে চাপ সৃষ্টি করে। সাধারণভাবে রক্তচাপ বলতে ধমনীতে থাকা চাপ বোঝানো হয়, যেমন বাহুর ব্র্যাকিয়াল ধমনিতে। শরীরের অন্য অংশে রক্তনালীতে চাপ সাধারণত কম থাকে। রক্তচাপ সাধারণত মিলিমিটার অফ মার্কিউরি (mmHg) এককে প্রকাশ করা হয়। সিস্টলিক চাপ হলো হৃদস্পন্দনের সময় ধমনিতে রক্তচাপের সর্বোচ্চ মাত্রা; ডায়াস্টলিক চাপ হলো বিশ্রামের সময় সর্বনিম্ন চাপ। এছাড়াও, গড় ধমনিক চাপ এবং পালস চাপও গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ। একজন বিশ্রামরত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য সাধারণ চাপ প্রায় ১২০/৮০ mmHg। তবে, এই মান হৃদস্পন্দন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয় এবং দিনভর বিভিন্ন কারণে (যেমন: স্ট্রেস, খাদ্য, ওষুধ, কিংবা রোগ) ওঠানামা করে।

সিস্টলিক চাপ

[সম্পাদনা]

সিস্টলিক চাপ সর্বোচ্চ হয় যখন বাম নিলয় থেকে রক্ত মহাধমনিতে পাম্প হয়। গড়ে এই চাপ ১২০ mmHg হয়।

ডায়াস্টলিক চাপ

[সম্পাদনা]

ডায়াস্টলিক চাপ ধীরে ধীরে কমে গিয়ে গড়ে ৮০ mmHg হয়, যখন নিলয় বিশ্রামরত অবস্থায় থাকে।

হৃদরোগ

[সম্পাদনা]

হৃদরোগ বলতে এমন রোগগুলিকে বোঝায় যা হৃদপিণ্ড এবং/অথবা রক্তনালী (ধমনী ও শিরা) কে প্রভাবিত করে। যদিও কার্ডিওভাসকুলার রোগ বলতে প্রযুক্তিগতভাবে সমস্ত হৃদরোগ সংক্রান্ত রোগ বোঝানো হয়, এটি সাধারণত ধমনীর রোগ (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের রোগের কারণ, পদ্ধতি এবং চিকিৎসা অনেকটাই একরকম। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ হৃদরোগ ভুগছে এবং এ হার দিন দিন বাড়ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের মৃত্যুর প্রধান কারণ। যখন হৃদরোগ শনাক্ত হয়, তখন সাধারণত এর মূল কারণ (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস) অনেকটা অগ্রসর হয়ে যায়। তাই বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কারণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় জোর দেওয়া হয়, যেমন: স্বাস্থ্যকর খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, এবং ধূমপান পরিহার।

উচ্চ রক্তচাপ

[সম্পাদনা]

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হলো এমন একটি চিকিৎসাজনিত অবস্থা যেখানে রক্তচাপ দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। কিছু গবেষক উচ্চ রক্তচাপকে সংজ্ঞায়িত করেন এইভাবে সিস্টলিক চাপ ১৩০ মিমি পারদচাপের বেশি এবং ডায়াস্টলিক চাপ ৮৫ মিমি পারদচাপের বেশি। [] উচ্চ রক্তচাপ প্রায়ই নীরবেই শুরু হয়, তাই একে মাঝে মাঝে নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ এটি ধমনীগুলোকে প্রসারিত করে, ফলে ধমনির দেয়ালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিঁড়ে যাওয়া সৃষ্টি হয় এবং ত্বরণ ঘটে বিভিন্ন অবক্ষয়জনিত পরিবর্তনের। স্থায়ীভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা স্ট্রোক, হৃদরোগ, হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতা এবং ধমনিতে অস্বাভাবিক ফোলাভাব (অ্যানিউরিজম) এর ঝুঁকি বাড়ায়। এটি দীর্ঘমেয়াদী কিডনি অকর্ম্যতার একটি প্রধান কারণও।

অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস

[সম্পাদনা]
মহাধমনীতে গুরুতর অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। ময়নাতদন্তের নমুনা।

অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হলো একটি রোগ যা ধমনী রক্তনালিকে প্রভাবিত করে। একে সাধারণভাবে ধমনীর "কঠিন হয়ে যাওয়া" বা "চর্বি জমে যাওয়া" হিসেবেও বলা হয়। এটি ধমনির ভেতরে একাধিক প্লাক গঠনের কারণে হয়। আর্টেরিওস্ক্লেরোসিস (ধমনীর শক্ত হয়ে যাওয়া) হয় যখন রক্তনালির দেয়ালের ভেতরে এবং অ্যাথেরোমার চারপাশে শক্ত, অনমনীয় কোলাজেন জমা হয়। এতে ধমনির প্রাচীরের নমনীয়তা কমে যায় এবং শক্ত হয়ে পড়ে। অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস সাধারণত কৈশোরকালেই শুরু হয় এবং এটি প্রায় সব বড় ধমনীতেই দেখা যায়, তবে জীবিত অবস্থায় বেশিরভাগ সময়ই এর কোনো লক্ষণ ধরা পড়ে না। যখন এটি হৃদপিণ্ড বা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে তখন এটি গুরুতর আকার ধারণ করে। এটি স্ট্রোক, হৃদরোগ, কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউরসহ প্রায় সব কার্ডিওভাসকুলার রোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্লাক

[সম্পাদনা]

প্লাক বা অ্যাথেরোমা হলো একটি অস্বাভাবিক প্রদাহজনিত উপাদান যা ধমনির দেয়ালের ভেতরে সাদা রক্তকণিকা ম্যাক্রোফেজ জমে তৈরি হয়।

সার্কুলেটরি শক

[সম্পাদনা]

সার্কুলেটরি শক হলো এক ধরনের গুরুতর অবস্থা, যেখানে শরীরের রক্তসঞ্চালন মারাত্মকভাবে কমে যায়।

থ্রম্বাস

[সম্পাদনা]

থ্রম্বাস বা রক্ত জমাট একটি রক্তপাত বন্ধের প্রক্রিয়ায় তৈরি চূড়ান্ত রূপ। এটি প্লেটলেটগুলোর একত্রিত হয়ে প্লেটলেট প্লাগ তৈরি করার মাধ্যমে এবং রক্তজমাট সংক্রান্ত রাসায়নিক উপাদান (ক্লটিং ফ্যাক্টর) সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়। আঘাতজনিত অবস্থায় থ্রম্বাস স্বাভাবিক হলেও, অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এটি রোগজনিত (থ্রম্বোসিস)। রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও পালমোনারি এম্বোলিজমের ঝুঁকি হ্রাস পায়। হেপারিন এবং ওয়ারফারিন প্রায়ই ব্যবহৃত হয় বিদ্যমান রক্ত জমাট প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে, যাতে দেহ নিজে স্বাভাবিকভাবে ওই জমাট ভেঙে ফেলতে পারে।

এম্বোলিজম

[সম্পাদনা]

এম্বোলিজম তখন ঘটে যখন দেহের এক অংশ থেকে কোনো বস্তু (এম্বোলাস) রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে অন্য অংশে গিয়ে কোনো রক্তনালিকে বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে সাধারণ এম্বোলিক উপাদান হলো রক্ত জমাট। এছাড়া চর্বির কণিকা (ফ্যাট এম্বোলিজম), বাতাসের বুদবুদ (এয়ার এম্বোলিজম), পুঁজ ও ব্যাকটেরিয়া (সেপটিক এম্বোলি) অথবা অ্যামনিয়োটিক তরলও এম্বোলিজমের কারণ হতে পারে।

স্ট্রোক

[সম্পাদনা]

স্ট্রোক, যাকে সেরিব্রোভাসকুলার অ্যাকসিডেন্ট -ও বলা হয়, হলো একটি তীব্র স্নায়বিক আঘাত, যেখানে মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। স্ট্রোক সাধারণত দুইটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: ইস্কেমিক এবং হেমোরেজিক। স্ট্রোকের প্রায় ৮০% ঘটে ইস্কেমিয়ার কারণে।

  • ইস্কেমিক স্ট্রোক: এটি ঘটে যখন কোনো রক্তনালি ব্লক হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ইস্কেমিক স্ট্রোককে আবার থ্রম্বোটিক স্ট্রোক, এম্বোলিক স্ট্রোক, সিস্টেমিক হাইপোপারফিউশন (ওয়াটারশেড স্ট্রোক), অথবা ভেনাস থ্রম্বোসিস হিসেবে ভাগ করা যায়।
  • হেমোরেজিক স্ট্রোক: হেমোরেজিক স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে যখন মস্তিষ্কে কোনো রক্তনালি ফেটে যায় বা রক্তপাত হয়। এতে করে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়। উপরন্তু, রক্ত মস্তিষ্কের কোষে রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং অতিরিক্ত রক্তচাপ সৃষ্টি করে যা মস্তিষ্কের কোষে চাপ সৃষ্টি করে।

এই কারণে হেমোরেজিক স্ট্রোককে ইস্কেমিক স্ট্রোকের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। এটি আবার দুই ভাগে ভাগ হয়: ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ ও সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ। যুক্তরাষ্ট্রে এখন স্ট্রোককে "ব্রেইন অ্যাটাক" নামে অভিহিত করা হচ্ছে, যেমন হৃদরোগের ক্ষেত্রে "হার্ট অ্যাটাক" বলা হয়। অনেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগে "ব্রেইন অ্যাটাক" টিম থাকে, যারা দ্রুত স্ট্রোকের চিকিৎসা দেয়। স্ট্রোকের উপসর্গ প্রথম দিকেই শনাক্ত করা গেলে বিশেষ ধরনের "ক্লট-বাস্টিং" ওষুধ ব্যবহার করা যায়, যা রক্ত জমাট ভেঙে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনে। প্রথম দিকের একটি ক্লট-বাস্টিং ওষুধ ছিল স্ট্রেপ্টোকাইনেজ। তবে এর ব্যবহারে শরীরের অন্য অংশেও জমাট ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা গুরুতর রক্তপাত ঘটাতে পারে। বর্তমানে আরও নিরাপদ তৃতীয় প্রজন্মের থ্রোম্বোলাইটিক ওষুধ রয়েছে।

হার্ট অ্যাটাক

[সম্পাদনা]

হার্ট অ্যাটাক বা অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটে যখন হৃদযন্ত্রের কোনো অংশে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, সাধারণত করোনারি ধমনিতে জমাট বাঁধা রক্তের কারণে। এটি প্রায়ই হৃদস্পন্দনের অনিয়ম (অ্যারিদমিয়া) ঘটায়, যার ফলে হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা হঠাৎ কমে যেতে পারে এবং তাৎক্ষণিক মৃত্যুও ঘটতে পারে। যদি দ্রুত চিকিৎসা না হয়, তাহলে সেই অংশের হৃদপেশি মারা যায় এবং চিরস্থায়ীভাবে দাগে পরিণত হয়। এটি পুরুষ ও নারীদের জন্য বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ।

অ্যাঞ্জাইনা পেক্টরিস

[সম্পাদনা]

অ্যাঞ্জাইনা পেক্টরিস হলো এক ধরনের বুকের ব্যথা যা হৃদপেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে হয়। সাধারণত এটি করোনারি ধমনির বাধা বা খিঁচুনি থাকার ফলে হয়।

করোনারি বাইপাস

[সম্পাদনা]

করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি, করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফট সার্জারি এবং হার্ট বাইপাস—এই সমস্ত শল্যচিকিৎসাগুলি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের উপর প্রয়োগ করা হয় অ্যাঞ্জাইনার ব্যথা থেকে উপশম এবং হৃদপেশীর কার্যক্ষমতা উন্নত করার জন্য। রোগীর শরীরের অন্য কোনো অংশ থেকে শিরা বা ধমনী নিয়ে মহাধমনী থেকে করোনারি ধমনিতে সংযুক্ত করা হয়, যার ফলে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস-জনিত করোনারি ধমনির সংকোচন এড়িয়ে গিয়ে হৃদপেশীতে রক্ত সরবরাহ বাড়ে।

কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিউর

[সম্পাদনা]

কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিউর যাকে কনজেস্টিভ কার্ডিয়াক ফেলিউর বা শুধু হার্ট ফেলিউরও বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যা হৃৎপিণ্ডের গঠনগত বা কার্যগত যে কোনো গোলযোগের কারণে দেখা দিতে পারে, যার ফলে হৃদপিণ্ড পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত পাম্প করতে বা ভর্তি করতে অক্ষম হয়। এটিকে হার্টবিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া (যাকে অ্যাসিস্টোলি বলে) বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। যেহেতু অনেক রোগীর শরীরে রক্তের পরিমাণ বেশি না-ও থাকতে পারে রোগ নির্ণয়ের সময়, তাই "হার্ট ফেলিউর" শব্দটি "কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিউর"-এর তুলনায় বেশি ব্যবহৃত হয়। এই রোগ প্রাথমিক বা হালকা অবস্থায় সনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অনির্ণীত থেকে যায়। ডানদিকে হার্ট ফেলিউর সাধারণত হাত-পা ফুলে যাওয়া বা পারিফেরাল ইডিমা ঘটায়। বাঁদিকে হলে তা ফুসফুসে তরল জমা (পালমোনারি ইডিমা) ঘটায়।

অ্যানিউরিজম

[সম্পাদনা]

অ্যানিউরিজম হল রক্তনালির একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্বাভাবিক ব্যাসের চেয়ে ৫০% বা তার বেশি স্ফীতি বা ফোলাভাব, যা যেকোনো সময় হঠাৎ মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এটি সাধারণত মস্তিষ্কের বেসে থাকা ধমনিগুলিতে (উইলিসের বৃত্তে) এবং মহাধমনীতে (হৃদপিণ্ড থেকে বের হওয়া প্রধান ধমনী) ঘটে এটিকে অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম বলা হয়। এটি একটি অত্যধিক ফোলানো ইনার টিউবের মতো রক্তনালিতে একটি ফোলাভাব সৃষ্টি করে যা হঠাৎ ফেটে যেতে পারে। অ্যানিউরিজম যত বড় হয়, ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা তত বাড়ে। অ্যানিউরিজমের গঠন অনুসারে এদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়: স্যাকুলার (ছোট থলির মতো) এবং ফিউসিফর্ম (চাকুর মতো লম্বাটে)।

রক্ত জমাট গলিয়ে ফেলা

[সম্পাদনা]

রক্ত জমাট গলাতে এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয় যা রক্তে থাকা প্লাজমিনোজেনকে প্লাজমিন-এ রূপান্তরিত করে। প্লাজমিন একটি উৎসেচক যা রক্ত জমাট গলিয়ে দেয়।

রক্তনালির রুদ্ধতা দূর করা

[সম্পাদনা]

করোনারি ধমনী (অন্য কোনো রক্তনালি) খুলে দেওয়ার একটি উপায় হল পারকিউটেনিয়াস ট্রান্সলুমিনাল করোনারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি। যার প্রথম প্রয়োগ হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে একটি তার পায়ের ফিমোরাল আর্টারি বা হাতের রেডিয়াল আর্টারি থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত করোনারি ধমনির ভিতর দিয়ে চালানো হয়। এরপর সেই তারের ওপর দিয়ে একটি বেলুনযুক্ত ক্যাথেটার পাঠানো হয় সংকুচিত অংশের ভিতরে। ক্যাথেটারের মাথায় একটি ছোট ভাঁজ করা বেলুন থাকে। জলচাপ প্রয়োগ করে বেলুনটি ফুলিয়ে দেওয়া হলে, এটি প্লাক চেপে দিয়ে ধমনির প্রাচীর প্রসারিত করে। যদি একইসঙ্গে একটি সম্প্রসারণযোগ্য জালাকার নল (স্টেন্ট) বেলুনে লাগানো থাকে, তাহলে সেটি ধমনির ভেতরে রেখে দেওয়া হয় যাতে খোলা অংশটি সাপোর্ট পায়।

স্ফীত ও প্রদাহযুক্ত শিরা

[সম্পাদনা]

ভ্যারিকোজ শিরা

[সম্পাদনা]

ভ্যারিকোজ শিরা হল পায়ের বড়, মোচড়ানো, দড়ির মতো দেখতে শিরাগুলি যা ব্যথা, ফোলাভাব বা চুলকানি সৃষ্টি করতে পারে। এগুলো টেল্যাংজিয়েক্টেশিয়া বা স্পাইডার ভেইন-এর একটি গুরুতর রূপ। ভ্যারিকোজ শিরার মূল কারণ হল যোগাযোগকারী শিরাগুলোর ভালভের ত্রুটি। এই শিরাগুলো পায়ের উপরের এবং গভীর শিরাগুলিকে সংযুক্ত করে। সাধারণত রক্ত উপরের দিক থেকে গভীর শিরায় প্রবাহিত হয়ে হৃদপিণ্ডে ফেরে। কিন্তু যখন ভালভ বিকল হয়ে যায়, তখন পেশির চাপে রক্ত ভুল পথে ফিরে গিয়ে উপরের শিরায় জমে যায়। যাদের এই সমস্যা থাকে তাদের ডিপ ভেইন থ্রোম্বোসিস এবং পালমোনারি এম্বোলিজমের ঝুঁকি বেশি।

ফ্লেবাইটিস

[সম্পাদনা]

ফ্লেবাইটিস হল শিরার প্রদাহ, যা সাধারণত পায়ে হয়। এটি সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায় পৌঁছায় যখন গভীর শিরায় এই প্রদাহ হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই নারী। এটি বংশানুক্রমিক হতে পারে কারণ এই রোগ পরিবারে ছড়াতে দেখা গেছে।

জন্মগত হৃদযন্ত্রের ত্রুটি

[সম্পাদনা]
ভিএসডি এর চিত্রণ

জন্মের সময় যে হৃদযন্ত্রের ত্রুটি থাকে তাকে জন্মগত হৃদরোগ বলা হয়। মোট শিশুর প্রায় ১% -এর একটু কম জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জন্মায়। আটটি প্রধান ত্রুটি রয়েছে, যেগুলো একত্রে ৮০% জন্মগত হৃদরোগের জন্য দায়ী, বাকি ২০% নানা বিরল এবং মিশ্র ত্রুটি দ্বারা গঠিত।

অসায়ানোটিক ত্রুটি

[সম্পাদনা]

অসায়ানোটিক হৃদযন্ত্রের ত্রুটিতে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ সাধারণ থাকে। সবচেয়ে সাধারণ জন্মগত ত্রুটি হল ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট। যা জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত ২০% শিশুর মধ্যে দেখা যায়। ভিএসডিতে বাম নিলয় (নিলয়) থেকে ডান নিলয়ে রক্ত চলে যায়, ফলে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত আবার ফুসফুসে ফিরে যায়। এর ফলে পালমোনারি হাইপারটেনশন হতে পারে।

সায়ানোটিক ত্রুটি

[সম্পাদনা]

সায়ানোটিক হৃদযন্ত্রের ত্রুটিতে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। এই ধরনের ত্রুটিতে অক্সিজেনবিহীন রক্ত ডান নিলয় থেকে সরাসরি দেহে প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে ফ্যালট টেট্রালজি এবং ট্রান্সপোজিশন অফ গ্রেট আর্টারিজ অন্যতম।

হোমিওস্টেসিস

[সম্পাদনা]

হোমিওস্টেসিস বজায় রাখতে হলে কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের সঠিক কাজ করা আবশ্যক। এই সিস্টেম টিস্যু ফ্লুইডে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে এবং বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণ করে। হৃদপিণ্ড ধমনির মাধ্যমে রক্ত পাম্প করে এবং শিরার মাধ্যমে রক্ত গ্রহণ করে। এটি রক্তকে দুটি সার্কিটে পাম্প করে: পালমোনারি এবং সিস্টেমিক সার্কিট। পালমোনারি সার্কিটে ফুসফুসের মধ্য দিয়ে গ্যাস বিনিময় হয় এবং সিস্টেমিক সার্কিট দেহের সমস্ত অংশে রক্ত পাঠায়। কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম হোমিওস্টেসিস বজায় রাখতে দেহের অন্যান্য সিস্টেমের সঙ্গে কাজ করে।

লসিকা তন্ত্র

[সম্পাদনা]

লসিকা তন্ত্র কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই দুটি সিস্টেম তিনটি উপায়ে হোমিওস্টেসিস রক্ষা করে: লসিকা তন্ত্র অতিরিক্ত টিস্যু ফ্লুইড গ্রহণ করে রক্তে ফিরিয়ে দেয়; ল্যাকটিয়াল ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলি থেকে চর্বি গ্রহণ করে রক্তপ্রবাহে পৌঁছে দেয়; এবং উভয় সিস্টেম একত্রে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। লসিকা তন্ত্র সাদা রক্তকণিকা তৈরি করে, যা সংক্রমণ এবং রোগ প্রতিহত করে।

দারুণ কিছু তথ্য

[সম্পাদনা]

• হৃদরোগ আমেরিকান নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ।
• প্রতি বছর ১৬.৭ মিলিয়ন মানুষ হৃদরোগ এবং স্ট্রোকে মারা যায়।
• চাপ, চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, স্থূলতা, তামাক ও মদ্যপান হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
• সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন সামান্য অ্যাসপিরিন খেলে হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ হতে পারে (অ্যাসপিরিন রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করে)।
• আমাদের সমস্ত রক্তনালিকে এক লাইনে সাজালে সেটি প্রায় ৬০,০০০ মাইল দীর্ঘ হবে! পৃথিবীর পরিধি প্রায় ৪০,০৭৫ কিমি—অর্থাৎ রক্তনালির দৈর্ঘ্য পৃথিবীকে দুইবার ঘুরে আসতে পারে।

সুস্থ হৃদপিণ্ডের জন্য করণীয়

[সম্পাদনা]

• স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা।

• ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করা।

• স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন; ধূমপান, মাদক ও মদ্যপান পরিহার করা।

• এলডিএল কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ কমানো।

• চর্বি, সোডিয়াম ও ক্যালোরি কমিয়ে খাওয়া।

বৃদ্ধাবস্থা

[সম্পাদনা]

বয়স বাড়ার সাথে সাথে হৃদপেশী কম দক্ষ হয়ে পড়ে, ফলে হার্টের সর্বোচ্চ আউটপুট ও হৃৎস্পন্দনের হার কমে যায়, যদিও বিশ্রামের সময় এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট থাকে। মায়োকার্ডিয়ামের সুস্থতা নির্ভর করে এর রক্ত সরবরাহের ওপর, কিন্তু বয়স বাড়লে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের কারণে করোনারি ধমনির সংকোচন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এই রোগে রক্তনালির ভেতরে এবং প্রাচীরে কোলেস্টেরল জমে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত করে ও রুক্ষ পৃষ্ঠ তৈরি করে, যা রক্ত জমাট বাঁধার কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) বাম নিলয়কে বেশি পরিশ্রম করতে বাধ্য করে, যার ফলে এটি বড় হয়ে রক্ত সরবরাহের বাইরে চলে যেতে পারে ও দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল নিলয় কার্যকর পাম্পিং করতে পারে না এবং এটি কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিউর-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই প্রক্রিয়া ধীরে বা দ্রুত হতে পারে। হৃদপিণ্ডের ভালভগুলো ফাইব্রোসিসের কারণে ঘন হতে পারে, যার ফলে হার্ট মারমার শব্দ তৈরি করে এবং পাম্পিং দক্ষতা কমে যায়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অ্যারিথমিয়া বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে, কারণ কন্ডাকশন সিস্টেমের কোষগুলো কম কার্যকর হয়।

শারীরবৃত্তীয় চাপ

শারীরবৃত্তীয় চাপ যে কোনো আঘাত যেমন পোড়া, হাড় ভাঙা ইত্যাদির কারণে হতে পারে। এর দুটি ধাপ রয়েছে: "ইবিবি" ধাপ (প্রাথমিক ধাপ) যা আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এবং "প্রবাহ" ধাপ যা আঘাতের ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পরে শুরু হয়। "ইবিবি" (শক) ধাপে দেখা যায়: রক্তচলাচলে ঘাটতি, ইনসুলিনের পরিমাণ কমে যাওয়া, অক্সিজেন গ্রহণ হ্রাস, হাইপোথার্মিয়া (নিম্ন শরীরের তাপমাত্রা), হাইপোভোলেমিয়া (রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়া), এবং হাইপোটেনশন (নিম্ন রক্তচাপ)। "প্রবাহ" ধাপে দেখা যায়: ক্যাটেকোলামিন, গ্লুকোকর্টিকয়েডস, এবং গ্লুকাগনের মাত্রা বৃদ্ধি; ইনসুলিনের স্বাভাবিক বা উচ্চ মাত্রা; বিপাকীয় ভাঙন বৃদ্ধি; হাইপারগ্লাইসেমিয়া (রক্তে চিনি বৃদ্ধি); শ্বাসপ্রশ্বাস ও অক্সিজেন গ্রহণ বৃদ্ধি; হাইপারথার্মিয়া (উচ্চ তাপমাত্রা); জ্বর; হাইপারমেটাবলিজম এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি; হার্টের আউটপুট বৃদ্ধি।

নিলয়ের অপরিপক্ক সঙ্কোচন

[সম্পাদনা]

SA নোড থেকে AV নোডের মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ায়। কিন্তু যদি AV নোডে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় বা কোনো ওষুধের প্রভাবে AV নোডের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়, তবে নিলয়গুলো প্রাথমিক উত্তেজনা পাবে না। তখন বান্ডেল শাখাগুলোর অটো-রিদমিক কোষগুলো নিজেরাই সংকেত তৈরি করতে শুরু করে এবং নিলয়ের জন্য পেসমেকার হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সঞ্চালন ব্যবস্থায় গোলযোগ সৃষ্টি হয়। যেসব সঞ্চালন সমস্যায় বান্ডেল শাখাগুলো আক্রান্ত হয়, সেখানে ডান ও বাম ধরনের নিলয়ের আগেভাগেই সঙ্কোচন হওয়া দেখা যায়। ডান দিকের পিভিসি সাধারণত বেশি দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাম দিকের পিভিসি সবসময়ই গুরুতর সমস্যা এবং চিকিৎসা অবশ্যই প্রয়োজন।

হৃদস্পন্দনের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

• SA নোড (ডান অলিন্দের মধ্যে, ঊর্ধ্ব মহাশিরার প্রবেশপথের কাছে অবস্থিত)
• AV নোড (ডান অলিন্দের নিচের অংশে অবস্থিত)

• AV বান্ডেল (দুইটি নিলয়ের মাঝখানের ইন্ট্রাভেন্ট্রিকুলার সেপটামে অবস্থিত, যেখান থেকে ডান ও বাম দুটি বান্ডেল শাখা বেরিয়ে আসে এবং নিলয়ের দেয়ালে প্রবেশ করে)

• বান্ডেল শাখা (সেপটাম থেকে নিলয়ের দেয়ালে ছড়িয়ে পড়া শাখা, যা পরবর্তীতে পারকিঞ্জি ফাইবারে পৌঁছে যায় এবং ভেন্ট্রিকুলার মায়োকার্ডিয়াল কোষের সঙ্গে সংযোগ করে সংকেত ছড়িয়ে দেয়)

একটি স্বাভাবিক ইসিজি তরঙ্গের অ্যানিমেশন

ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম

[সম্পাদনা]

• P তরঙ্গ অলিন্দের ডিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে
• QRS তরঙ্গ নিলয়ের ডিপোলারাইজেশন এবং অলিন্দের রিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে
• T তরঙ্গ নিলয়ের রিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে

একটি স্বাভাবিক ইসিজি এর স্কিম্যাটিক উপস্থাপন

হৃদস্পন্দনের বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

[সম্পাদনা]

স্বায়ত্ত্বশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের দুটি শাখা থাকে: সিমপ্যাথেটিক বিভাগ এবং প্যারাসিমপ্যাথেটিক বিভাগ।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে হরমোনীয় প্রভাব রয়েছে:

  • এপিনেফ্রিন
  • নরএপিনেফ্রিন
  • ANP : আলিন্দল ন্যাট্রিওরেটিক পেপটাইড
  • ADH: অ্যান্টিডায়িউরেটিক হরমোন
  • রেনিন-অ্যাংজিওটেনসিন সিস্টেম

ঘটনাভিত্তিক বিশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

হৃদপিণ্ডের প্রযুক্তির উন্নতির একটি বাস্তব উদাহরণ হলো এই গল্পটি: ১৯৫৫ সালে, যখন আমার বয়স ছিল পাঁচ, তখন পারিবারিক চিকিৎসক জানান যে আমার হৃদপিণ্ডে মারমার শব্দ আছে এবং ভবিষ্যতে তা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ১৯৬৫ সালে, আমি যখন পনেরো, তখন রোড আইল্যান্ড হাসপাতালে দুইবার কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন করা হয়। কিন্তু পরীক্ষা থেকে কিছু নির্দিষ্টভাবে বোঝা যায়নি। আমাকে বলা হয়েছিল, স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে এবং দেখা যাক কোনো সমস্যা দেখা দেয় কিনা। ১৯৭৫ সালে আবার আমার পারিবারিক চিকিৎসক বলেন যে আবার হৃদপিণ্ড পরীক্ষা করা দরকার। ড. ডেভিড কিটজেস (মেরিয়াম হাসপাতাল) আবার একটি ক্যাথেটারাইজেশন করেন। এবার নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে জানা যায়, আমার জন্মগতভাবে বিকৃত ভালভের কারণে মহাধমনী স্টেনোসিস হয়েছে। তিনি বলেন, আমি পঞ্চাশ বা ষাট বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারব, তারপর অপারেশনের দরকার হতে পারে। ১৯৯৬ সালে ইকোকার্ডিওগ্রামে দেখা যায় আমার হৃদপিণ্ড বড় হয়ে গেছে। আমার চিকিৎসক বলেন, একজন কার্ডিওলজিস্টের কাছে যেতে হবে। আমি গুরুত্ব দিইনি, কারণ আগেও এমন শুনেছি। কিন্তু ড. জন ল্যামব্রেক্টের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আমার জীবন বদলে যায়। তিনি আমার ক্লান্তি, দুর্বলতা, হাঁপানির উপসর্গ, বিবর্ণ ত্বক ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ শুনে জানান, অবস্থা গুরুতর এবং একমাত্র সমাধান হলো জরুরি ওপেন-হার্ট সার্জারি করে মহাধমনী ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করা। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম কারণ মনে হয়েছিল জীবন শেষ। কিন্তু তিনি বলেন, এটি নিরাময়যোগ্য এবং আমি মরণব্যাধিতে আক্রান্ত নই। ১০ দিনের মধ্যেই আমি মেডিট্রনিক হল কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করি। অপারেশনটি করেন ড. রবার্ট ইনডেগ্লিয়া, মেরিয়াম হাসপাতালে, প্রভিডেন্স, আর.এ তে, ২০ মার্চ ১৯৯৬ সালে। অপারেশনের পর তিন বছর কেটে গেছে এবং আমি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো আছি। ১৯৭৭ সালে আমার ছেলে কেভিন জন্মায় অপূর্ণ বিকশিত বাম হৃদযন্ত্র সিন্ড্রোম নিয়ে। সে মাত্র ২ দিন বেঁচেছিল কারণ তখন এই ধরনের সার্জারি হতো না। আমি কৃতজ্ঞ যে এখনকার উন্নত প্রযুক্তির যুগে বেঁচে আছি, যা আমাকে দ্বিতীয় জীবনের সুযোগ দিয়েছে। এই অধ্যায়ে আমাদের লক্ষ্য আপনাকে হৃদপিণ্ড ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার প্রতিটি অংশ বোঝানো, যেন আপনিও শিখে হৃদপিণ্ডের অসাধারণ কার্যকারিতা উপলব্ধি করতে পারেন।

স্টোক

[সম্পাদনা]

সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিজ হলো মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ — হৃদরোগ ও ক্যান্সারের পরে। স্ট্রোক (সেরিব্রোভাসকুলার অ্যাকসিডেন্ট) হলো এমন একটি রোগ যা হঠাৎ করে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ বা হ্রাস পাওয়ার কারণে ঘটে। রক্তপ্রবাহ হ্রাস, যাকে আইসকেমিয়া বলা হয়, শরীরের যেকোনো টিস্যুর জন্য বিপজ্জনক, তবে মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়ংকর, কারণ এখানে বিপাকক্রিয়া খুব দ্রুত ঘটে। মাত্র তিন মিনিট রক্তপ্রবাহ বন্ধ থাকলেই বেশিরভাগ মস্তিষ্ক কোষ মারা যেতে পারে। এই কারণেই স্ট্রোক কয়েক মিনিটেই মৃত্যু ঘটাতে পারে বা মারাত্মক মস্তিষ্ক ক্ষতি করতে পারে।

স্ট্রোক দুইভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়: অক্লুসিভ এবং হেমোরেজিক। এটি মস্তিষ্কের ভেতরে বা উপরিভাগে ঘটতে পারে। অক্লুসিভ স্ট্রোকে রক্তনালিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। হেমোরেজিক স্ট্রোকে রক্তনালির ফেটে যাওয়ায় রক্তক্ষরণ হয়।

সারাংশ

[সম্পাদনা]

শরীরের অন্যান্য ব্যবস্থার মতো, কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম হোমিওস্টেসিস বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্নায়ুতন্ত্র হৃদপিণ্ডের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, যা হৃদপিণ্ডের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদনে সাহায্য করে। হৃদপিণ্ডের পাম্পিং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে এবং টিস্যুগুলিকে যথাযথভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে। রক্তনালির মাধ্যমে রক্ত চলাচলের পথ তৈরি হয়, তবে এগুলো কেবল পাইপলাইন নয়। শিরা ও ধমনিগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং কৈশিক নালিগুলো রক্ত ও টিস্যুর মধ্যে প্রয়োজনীয় পদার্থ আদান-প্রদানের স্থান তৈরি করে।

পুনরালোচনা প্রশ্নাবলী

[সম্পাদনা]
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে এখানে

১. এটি স্নায়ুর মতোই বিদ্যুৎ পরিবহন করে

ক) এপিকার্ডিয়াম
খ) পেরিকার্ডিয়াম
গ) মায়োকার্ডিয়াম
ঘ) সাবভ্যালভুলার অ্যাপারেটাস
ঙ) এদের কেউ নয়, কেবল স্নায়ুই বিদ্যুৎ পরিবহন করে

২. শরীরের যেকোনো সময়ে সর্বাধিক পরিমাণ রক্ত এতে বহন হয়

ক) শিরা
খ) কৈশিকনালীর জালিকা
গ) শিরা
ঘ) অ্যাওর্টা
ঙ) ভেনা কেভা

৩. নিচের কোনগুলো একসাথে সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করে

ক) ডান অলিন্দ ডান ভেন্ট্রিকেলের সাথে এবং বাম অলিন্দ বাম ভেন্ট্রিকেলের সাথে
খ) ডান অলিন্দ ও বাম অলিন্দ এবং ডান ভেন্ট্রিকেল ও বাম ভেন্ট্রিকেল
গ) ট্রাইকাসপিড ভাল্ভ ও মাইট্রাল ভাল্ভ
ঘ) অ্যাওর্টা ও পালমোনারি আর্টারি
ঙ) অ্যাওর্টা, পালমোনারি আর্টারি এবং পালমোনারি ভেইন

৪. এটি হৃদপিণ্ডের পেসমেকার

ক) এভি নোড
খ) পারকিনজে ফাইবার
গ) এভি বান্ডল
ঘ) এসএ নোড
ঙ) এদের কেউ নয়, পেসমেকার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানো হয়

৫. ইসিজি পড়ার সময়, এই অক্ষরটি এভি নোড থেকে এভি বান্ডলের দিকে ডিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে

ক) S
খ) P
গ) U
ঘ) T
ঙ) Q

৬. ইসিজিতে T তরঙ্গ নির্দেশ করে

ক) বিশ্রাম সম্ভাবনা
খ) অলিন্দের ডিপোলারাইজেশন
গ) এসএ নোড উদ্দীপনা
ঘ) ভেন্ট্রিকেলের রিপোলারাইজেশন
ঙ) পারকিনজে উদ্দীপনা

৭. রক্তচাপ হলো

ক) রক্তের দ্বারা রক্তনালীর প্রাচীরে প্রদত্ত চাপ
খ) রক্তের দ্বারা ধমনীতে প্রদত্ত চাপ
গ) রক্তের দ্বারা শিরায় প্রদত্ত চাপ
ঘ) রক্তের দ্বারা অ্যাওর্টাতে প্রদত্ত চাপ
ঙ) রক্তের দ্বারা কেশিকায় প্রদত্ত চাপ

৮. সিস্টলিক চাপ হলো

ক) গড়ে ১২০ mm Hg
খ) ভেন্ট্রিকুলার সিস্টলের সময় ক্রমাগত কমে যায়
গ) যখন বাম ভেন্ট্রিকেল থেকে অ্যাওর্টায় রক্ত পাম্প হয় তখন সর্বোচ্চ হয়
ঘ) গড়ে ৮০ mm Hg
ঙ) উভয় ক এবং গ
চ) উভয় খ এবং ঘ

৯. হৃদপিণ্ডে মোট কতটি প্রকোষ্ঠ থাকে?

ক) একটি
খ) দুটি
গ) তিনটি
ঘ) চারটি
ঙ) পাঁচটি

শব্দকোষ

[সম্পাদনা]


তীব্র মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন: সাধারণভাবে হার্ট অ্যাটাক নামে পরিচিত, এটি একটি রোগ অবস্থা যখন হৃদপিণ্ডের কিছু অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং হৃদপেশীতে ক্ষতি বা কোষমৃত্যু ঘটতে পারে।
অ্যাওর্টা: সিস্টেমিক রক্ত চলাচল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ধমনী
অ্যাওর্টিক ভাল্ভ: বাম ভেন্ট্রিকেল এবং অ্যাওর্টার মধ্যবর্তী ভাল্ভ
অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন: এটি পেছনের পিটুইটারি গ্রন্থিতে উৎপন্ন হয়। এডিএইচ বা ভ্যাসোপ্রেসিন মূলত কিডনির মাধ্যমে পানি ধরে রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
অ্যার্টেরিওল: একটি ছোট ব্যাসের রক্তনালী যা ধমনীর শাখা হয়ে কৈশিকনালীতে প্রবেশ করে
আলিন্দল ন্যাট্রিউরেটিক পেপটাইড: হৃদপিণ্ডের আলিন্দতে উৎপন্ন হয়, এটি সোডিয়ামের প্রস্রাব নির্গমণ বাড়ায়, ফলে পানির ক্ষয় ঘটে এবং রক্তের সান্দ্রতা কমে যায়, এতে রক্তচাপও কমে।
অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার নোড (AV নোড): আলিন্দ এবং ভেন্ট্রিকেল এর মাঝখানে অবস্থান করা টিস্যু যা আলিন্দ থেকে ভেন্ট্রিকেল পর্যন্ত স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক সংকেত চালিত করে
অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার ভাল্ভসমূহ: বড়, বহু-কাপযুক্ত ভাল্ভ যা সিস্টলের সময় ভেন্ট্রিকেল থেকে অলিন্দে রক্ত ফেরত যাওয়া প্রতিরোধ করে
AV বান্ডেল: হার্টের পেশির বিশেষ কোষের একত্রিত রূপ যা AV নোড থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত পরিবহন করে
বার্বিচুরেটস: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র দমনকারী, ঘুম ও প্রশমনের জন্য ব্যবহৃত ঔষধ
রক্তচাপ: রক্তনালীর প্রাচীরে রক্তের প্রদত্ত চাপ
কৈশিকনালীজ: শরীরের সবচেয়ে ছোট রক্তনালী যা ধমনী ও শিরাকে সংযুক্ত করে
কার্ডিয়াক সাইকেল: হৃদপিণ্ডের মাধ্যমে রক্ত পাম্প করার ক্রমান্বিত কার্যপ্রবাহ
সেরিব্রাল ভাসকুলার অ্যাকসিডেন্ট : স্ট্রোক নামেও পরিচিত, এটি হঠাৎ করে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের ব্যাঘাতের কারণে স্নায়ুর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর বিভিন্ন কারণ এবং প্রভাব থাকতে পারে।
কর্ডি টেন্ডিনাই: কর্ডের মতো টেনডন যা প্যাপিলারি মাসলকে ট্রাইকাসপিড এবং মাইট্রাল ভাল্ভের সাথে যুক্ত করে
করোনারি আর্টারিজ: হৃদপেশীতে রক্ত সরবরাহ ও রক্ত অপসারণে সহায়ক ধমনী
কনটিনিউয়াস কৈশিকনালীজ: এদের এপিথেলিয়াম সিল করা থাকে এবং কেবল ছোট অণু, পানি ও আয়ন ছাড়তে পারে
ডিপ-ভেইন থ্রম্বোসিস: একটি গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা যা সাধারণত পা বা পেলভিক অঞ্চলের শিরায় ঘটে
ডায়াস্টোল: হৃদপিণ্ডের বিশ্রামের সময়, যখন এটি আবার রক্তে পূর্ণ হয়
ডায়াস্টোলিক চাপ: রক্তচাপের সর্বনিম্ন বিন্দু যখন হৃদপিণ্ড বিশ্রামে থাকে
ইডিমা: অতিরিক্ত টিস্যু তরল জমে যাওয়ায় সৃষ্টি হওয়া ফোলাভাব
ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম: হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের গ্রাফিক রেকর্ড
এপিনেফ্রিন: অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির মেডুলা থেকে উৎপন্ন হয়। এটি ধমনীর সংকোচনের মাধ্যমে শ্বাস এবং হৃদস্পন্দন বাড়ায়
ফেনেস্ট্রেটেড কৈশিকনালীজ: এদের ছিদ্র থাকে যা বড় অণুকে প্রবাহের সুযোগ দেয়
ফাইব্রাস পেরিকার্ডিয়াম: একটি ঘন সংযোজক টিস্যু যা হৃদপিণ্ডকে রক্ষা করে, স্থিতি দেয় এবং অতিরিক্ত রক্তে পূর্ণ হওয়া রোধ করে
হার্ট রেট: প্রতি মিনিটে হৃদপিণ্ডের ধাক্কা দেওয়ার হার
হেপাটিক ভেইন: যকৃত থেকে বিশুদ্ধকৃত ও অক্সিজেনবিহীন রক্তকে হার্টে ফেরত নিয়ে আসে
হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘস্থায়ীভাবে উচ্চ রক্তচাপের অবস্থা
ইনফেরিয়র ভেনা কাভা: দেহের নিচের অংশ থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃদপিণ্ডে নিয়ে আসা বড় শিরা
ইনট্রাভেন্ট্রিকুলার সেপটাম: হার্টের নিচের দুটি প্রকোষ্ঠকে পৃথককারী প্রাচীর
বাম অলিন্দ: ফুসফুস থেকে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত গ্রহণ করে
লাব: প্রথম হৃদস্পন্দন শব্দ, যা সিস্টলের শুরুতে অ্যাট্রিওভেন্ট্রিকুলার ভাল্ভ বন্ধ হলে সৃষ্টি হয়
লুমেন: রক্তপ্রবাহের জন্য রক্তনালীর অভ্যন্তরীণ ফাঁপা গহ্বর
লিম্ফ: রক্ত প্লাজমা থেকে উৎপন্ন তরল যা টিস্যু কোষগুলোর মাঝে প্রবাহিত হয়
মাইট্রাল ভাল্ভ: বাইকাসপিড ভাল্ভ নামেও পরিচিত; বাম ভেন্ট্রিকেল থেকে বাম অলিন্দে রক্ত ফেরত যাওয়া রোধ করে
মায়োকার্ডিয়াম: হৃদপিণ্ডের পেশি টিস্যু
নরএপিনেফ্রিন: অ্যাড্রেনাল মেডুলা থেকে উৎপন্ন একটি শক্তিশালী ধমনী সংকোচকারী হরমোন
পেসমেকার কোষ: হৃদপিণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সংকোচনের জন্য দায়ী কোষ
প্লাক: ধমনীর প্রাচীরে সাদা রক্তকণিকার (ম্যাক্রোফাজ) অস্বাভাবিক জমাট
পালমোনারি ভাল্ভ: ডান ভেন্ট্রিকেল এবং পালমোনারি আর্টারির মধ্যে অবস্থিত; রক্তের পুনঃপ্রবাহ রোধ করে
পালস: প্রতি মিনিটে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন সংখ্যা
পারকিনজে ফাইবার (বা পারকিনজে টিস্যু): হৃদপিণ্ডের ভেতরের প্রাচীর বরাবর বিশেষ পেশি টিস্যু যা বৈদ্যুতিক সংকেত বহন করে
রেনিন-অ্যাঞ্জিওটেনসিন সিস্টেম:
ডান অলিন্দ: ওপরের ও নিচের ভেনা কেভা থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত গ্রহণ করে
সেরাস পেরিকার্ডিয়াম: হৃদপিণ্ডকে ঘর্ষণ থেকে রক্ষা করতে এটি তরল নিঃসরণ করে
অর্ধচন্দ্রাকৃতির ভাল্ভ: পালমোনারি আর্টারি এবং অ্যাওর্টার উপর স্থাপিত ভাল্ভ
সাইনোআলিন্দল নোড (SA নোড/SAN): হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে অবস্থিত সংকেত উৎপাদক কোষ
সাইনুসয়েডাল কৈশিকনালীজ: বৃহৎ খোলা ছিদ্রবিশিষ্ট বিশেষ কৈশিকনালী যা লোহিত রক্তকণিকা ও প্রোটিন প্রবেশে সহায়ক
সিস্টোল: হৃদপিণ্ডের সংকোচনের প্রক্রিয়া
সিস্টোলিক চাপ: ভেন্ট্রিকুলার সিস্টলের সময় বাম ভেন্ট্রিকেল থেকে অ্যাওর্টায় রক্ত পাম্প হওয়ার সময় রক্তচাপের সর্বোচ্চ বিন্দু
সুপেরিয়র ভেনা কাভা: দেহের ওপরের অংশ থেকে হৃদপিণ্ডের ডান অলিন্দে অক্সিজেনবিহীন রক্ত আনার ছোট কিন্তু বড় শিরা
থ্রম্বাস: সুস্থ রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধা
ট্রাইকাসপিড ভাল্ভ: হৃদপিণ্ডের ডান পাশে, ডান অলিন্দ এবং ডান ভেন্ট্রিকেলের মাঝে অবস্থিত; রক্তকে অলিন্দ থেকে ভেন্ট্রিকেলে যাওয়ার অনুমতি দেয়
ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন: রক্তনালীর সংকোচন
ভ্যাসোডাইলেশন: রক্তনালীর প্রশস্ত হওয়া
ভেইন: কৈশিকনালী থেকে ডান দিকে রক্ত ফিরিয়ে আনে
ভেন্ট্রিকেল: অলিন্দ থেকে রক্ত গ্রহণকারী হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ
ভেনিউল: ছোট শিরা যা কৈশিকনালী থেকে ডিঅক্সিজেনেটেড রক্ত বৃহৎ শিরায় ফেরত নিয়ে যায়

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Van De Graaff, Kent M. Human Anatomy. McGraw Hill Publishing, Burr Ridge, IL. 2002.
  2. Essentials of Anatomy and Physiology, Valerie C. Scanlon and Tina Sanders
  3. Tortora, G. & Grabowski, S. (2000) Principles of Anatomy & Physiology. Wiley & Sons. Brisbane, Singapore & Chichester.
  4. Anderson, RM. The Gross Physiology of the Cardiovascular System (1993) <http://cardiac-output.info>.
  1. Tortora, G. & Grabowski, S. (2000)Principles of anatomy and physiology. Ninth Edition. Wiley page 733.