মানব শারীরতত্ত্ব/নারী প্রজননতন্ত্র
হোমিওস্ট্যাসিস — কোষ শারীরতত্ত্ব — ত্বকতন্ত্র — স্নায়ুতন্ত্র — ইন্দ্রিয় — পেশীতন্ত্র — রক্ত শারীরবিদ্যা — সংবহনতন্ত্র — অনাক্রম্যতন্ত্র — মূত্রতন্ত্র — শ্বসনতন্ত্র — পরিপাকতন্ত্র — পুষ্টি — অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র — প্রজনন (পুরুষ) — প্রজনন (নারী) — গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসব — জিনতত্ত্ব ও বংশগতি — জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি বেড়ে উঠা — উত্তরমালা
ভূমিকা
[সম্পাদনা]সমস্ত জীবিত প্রাণীই প্রজনন করে। এটি জীবিতদেরকে অজীবদের থেকে আলাদা করে তোলে। যদিও প্রজনন প্রক্রিয়া একটি প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে অত্যাবশ্যক, তবে এটি কোনো ব্যক্তির জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য নয়। এই অধ্যায়ে নারী প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ, প্রজননের সাথে যুক্ত অঙ্গসমূহ, নারীর শরীর নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনসমূহ, ঋতুচক্র, ডিম্বস্ফোটন ও গর্ভাবস্থা, জিনগত বিভাজনে নারীর ভূমিকা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, যৌন সংক্রমিত রোগসমূহ এবং অন্যান্য রোগ ও ব্যাধি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রজনন
[সম্পাদনা]প্রজনন হল সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো জীব তার প্রজাতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। মানব প্রজনন প্রক্রিয়ায় দুটি ধরণের যৌন কোষ (গ্যামেট) জড়িত থাকে: পুরুষ গ্যামেট (শুক্রাণু) এবং নারী গ্যামেট (ডিম্বাণু বা ওভাম)। এই দুটি গ্যামেট নারীর ঊর্ধ্ব পেলভিক গহ্বরের প্রতিটি পাশে অবস্থিত ডিম্বনালীতে মিলিত হয়ে একটি নতুন জীবের সৃষ্টি করে। ডিম্বাণু নিষিক্ত করতে নারীর একজন পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজন হয়; এরপর সে গর্ভধারণ ও প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়।
নারী ও পুরুষ প্রজননতন্ত্রের সাদৃশ্য
[সম্পাদনা]নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননতন্ত্রের কিছু মৌলিক সাদৃশ্য এবং কিছু বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। উভয় লিঙ্গের প্রজনন অঙ্গ একই ধরনের ভ্রূণীয় টিস্যু থেকে গঠিত হয়, অর্থাৎ তারা হোমোলগাস। উভয় ব্যবস্থায় গোনাড থাকে যা (শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) উৎপন্ন করে এবং যৌন অঙ্গ থাকে। এবং উভয় প্রজননতন্ত্রের যৌন হরমোন নিঃসরণের ফলে প্রজনন অঙ্গসমূহ কৈশোরে পরিপক্ক হয়ে কার্যকর হয়।


সংক্ষেপে, মানুষের জীবদ্দশায় যেসব যৌন অঙ্গ একই টিস্যু থেকে গঠিত হয় তাদের একটি পরিচিত তালিকা নিচে দেওয়া হল।
| অবিভক্ত | পুরুষ | নারী |
|---|---|---|
| গোনাড | অণ্ডকোষ | ডিম্বাশয় |
| মুলেরিয়ান নালী | অ্যাপেন্ডিক্স টেস্টিস | ফ্যালোপিয়ান টিউব |
| মুলেরিয়ান নালী | প্রোস্টেটিক ইউট্রিকল | জরায়ু (প্রক্সিমাল) |
| ওলফিয়ান নালী | রেটে টেস্টিস | রেটে ওভারি |
| মেসোনেফ্রিক টিউবিউল | এফারেন্ট ডাক্ট | ইপুওফোরন |
| ওলফিয়ান নালী | ইপিডিডিমিস | গার্টনার’স ডাক্ট |
| ওলফিয়ান নালী | ভ্যাস ডিফারেন্স | |
| ওলফিয়ান নালী | সেমিনাল ভেসিকল | |
| ওলফিয়ান নালী | প্রোস্টেট | স্কিন’স গ্ল্যান্ড |
| ইউরোজেনিটাল সাইনাস | মূত্রাশয়, মূত্রনালী | মূত্রাশয়, মূত্রনালী (ডিস্টাল) |
| ইউরোজেনিটাল সাইনাস | বাল্বোইউরেথ্রাল গ্ল্যান্ড | বার্থোলিন’স গ্ল্যান্ড |
| জেনিটাল সোয়েলিং | স্ক্রোটাম | ল্যাবিয়া মেজোরা |
| ইউরোজেনিটাল ফোল্ড | ডিস্টাল ইউরেথ্রা | ল্যাবিয়া মাইনোরা |
| জেনিটাল টিউবার্কল | পেনিস | ক্লিটোরিস |
| প্রিপিউস | ক্লিটোরাল হুড | |
| পেনিসের বাল্ব | ভেস্টিবুলার বাল্ব | |
| গ্লান্স পেনিস | ক্লিটোরাল গ্লান্স | |
| ক্রুস অব পেনিস | ক্লিটোরাল ক্রুরা |
নারী ও পুরুষ প্রজননতন্ত্রের পার্থক্য
[সম্পাদনা]নারী ও পুরুষ প্রজননতন্ত্রের পার্থক্যগুলো মূলত প্রত্যেকের প্রজনন চক্রে ভূমিকার উপর নির্ভর করে। একজন সুস্থ এবং যৌন পরিপক্ব পুরুষ ক্রমাগত শুক্রাণু উৎপাদন করে। অন্যদিকে নারীর "ডিম্বাণু" গঠন গর্ভাবস্থার সময়েই থেমে যায়। অর্থাৎ, সে নির্দিষ্ট সংখ্যক ওউসাইট নিয়ে জন্মায় এবং নতুন করে আর তৈরি হয় না।
গর্ভাবস্থার প্রায় ৫ মাসে ডিম্বাশয়ে প্রায় ৬-৭ মিলিয়ন ওগোনিয়া থাকে, যেগুলো মেইওসিস প্রক্রিয়া শুরু করে। ওগোনিয়া প্রাইমারি ওউসাইটে রূপান্তরিত হয় যা জন্ম থেকে কৈশোর পর্যন্ত মেইওসিসের প্রথম ধাপ (প্রোফেজ I)-এ স্থগিত থাকে। কৈশোরের পর প্রতি ঋতুচক্রে একটি বা একাধিক ওউসাইট মেইওসিস পুনরায় শুরু করে এবং ডিম্বস্ফোটনের সময় প্রথম মেইওটিক বিভাজন সম্পন্ন করে। এর ফলে একটি সেকেন্ডারি ওউসাইট ও একটি পোলার বডি তৈরি হয়। মেইওটিক বিভাজন মেটাফেজ -২ এ থেমে যায়। নিষেক ঘটলে দ্বিতীয় মেইওটিক বিভাজন সম্পন্ন হয় এবং একটি ওভাম ও একটি অতিরিক্ত পোলার বডি তৈরি হয়।
একটি নবজাতক কন্যাশিশুর ডিম্বাশয়ে প্রায় ১০ লক্ষ ওউসাইট থাকে। কৈশোরে এ সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লক্ষে নেমে আসে। একজন নারীর প্রজনন জীবনে গড়ে ৫০০ থেকে ১০০০ ওউসাইট ডিম্বস্ফোটিত হয়।
যখন একজন কিশোরী প্রায় ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সে কৈশোরে পৌঁছে, তখন প্রতি ২৮ দিনে একটি প্রাইমারি ওউসাইট ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয়। এটি চলতে থাকে যতদিন না সে প্রায় ৫০ বছর বয়সে মেনোপজে পৌঁছে। জন্মের সময় ওউসাইট বিদ্যমান থাকে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা বার্ধক্যে পৌঁছায়।
- নারী প্রজননতন্ত্র
- ডিম্বাণু (ওভা) তৈরি করে
- যৌন হরমোন নিঃসরণ করে
- পুরুষের শুক্রাণু গ্রহণ করে
- নিষিক্ত ডিম্বাণুকে পূর্ণাঙ্গ ভ্রূণে পরিণত হওয়া পর্যন্ত রক্ষা ও পুষ্টি প্রদান করে
- জন্মনালীর মাধ্যমে ভ্রূণ প্রসব করে
- স্তনে অবস্থিত দুধ গ্রন্থি থেকে দুধ নিঃসরণ করে শিশুকে পুষ্টি প্রদান করে।
বাহ্যিক যৌনাঙ্গ
[সম্পাদনা]
ভাল্ভা
নারী বাহ্যিক যৌনাঙ্গকে ভাল্ভা বলা হয়। এটি ল্যাবিয়া মেজোরা ও ল্যাবিয়া মিনোরা (যদিও এদের নাম "বড়" ও "ছোট" ঠোঁট হিসেবে অনূদিত হয়, প্রায়ই দেখা যায় "মিনোরা" বাহিরে "মেজোরা" থেকে বেশি প্রসারিত থাকে), মন্স পিউবিস, ক্লিটোরিস, মূত্রনালীর মুখ (মিয়েটাস), যোনি উপদ্বার, ভেস্টিবুলার বাল্ব ও ভেস্টিবুলার গ্রন্থিসমূহ নিয়ে গঠিত।
"যোনি" শব্দটি প্রায়শই ভুলভাবে ভাল্ভা বা নারী যৌনাঙ্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যদিও আসলে যোনি একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামো এবং ভাল্ভা শুধুমাত্র বাহ্যিক যৌনাঙ্গ। ভাল্ভাকে যোনি বলা ঠিক যেমন মুখকে গলা বলা।
মন্স ভেনেরিস
মন্স ভেনেরিস, লাতিনে যার অর্থ "ভেনাসের ঢিবি" (ভেনাস ছিলেন প্রেমের রোমান দেবী), এটি ভাল্ভার সামনের দিকের একটি কোমল, চর্বিযুক্ত ঢিবি যা পিউবিক হাড়কে আবৃত করে রাখে। একে মন্স পিউবিসও বলা হয়। এটি যৌন সহবাসের সময় পিউবিক হাড় ও ভাল্ভাকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। বয়ঃসন্ধির পরে এটি সাধারণত ত্রিভুজাকৃতির যৌন লোম দ্বারা আবৃত থাকে। যৌন লোমের পরিমাণ অনেকাংশে বংশগতির ওপর নির্ভর করে।
ল্যাবিয়া মেজোরা
ল্যাবিয়া মেজোরা ভাল্ভার বাহ্যিক "ঠোঁট"। এগুলো হল শিথিল সংযোজক ও চর্বিযুক্ত টিস্যু, কিছু মসৃণ পেশিসহ। ল্যাবিয়া মেজোরা মন্স পিউবিস থেকে পেরিনিয়াম পর্যন্ত ভাল্ভাকে ঘিরে রাখে। সাধারণত এগুলো ভাল্ভার অন্যান্য অংশগুলোকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে। এগুলোর মাঝে লম্বালম্বি একটি বিভাজন থাকে যাকে পুডেন্ডাল ক্লেফট বলা হয়। সাধারণত এই ঠোঁট যৌন লোমে আবৃত থাকে। বাইরের ত্বকের রঙ সাধারণত ব্যক্তির গায়ের রঙের কাছাকাছি হলেও কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। ভেতরের ত্বক সাধারণত গোলাপি থেকে হালকা বাদামি। এগুলোতে প্রচুর ঘাম ও তৈল গ্রন্থি থাকে। ধারণা করা হয়, এই তেল থেকে নির্গত গন্ধ যৌন উত্তেজক হতে পারে।
ল্যাবিয়া মিনোরা
ল্যাবিয়া মেজোরার অভ্যন্তরে অবস্থিত হল ল্যাবিয়া মিনোরা। ল্যাবিয়া মিনোরা হল ভাল্ভার অভ্যন্তরীণ ঠোঁট। এগুলো পাতলা টিস্যু যা যোনি, মূত্রনালী ও ক্লিটোরিসকে ঢেকে রাখে ও সুরক্ষা দেয়। এদের আকৃতি ভিন্ন হতে পারে—কখনো ছোট যা ল্যাবিয়া মেজোরার ভেতরে থাকে, আবার কখনো বড় যা বাইরে প্রসারিত থাকে। ল্যাবিয়া মিনোরায় যৌন লোম থাকে না, তবে সেবেসিয়াস গ্রন্থি থাকে। এই ছোট ঠোঁট দুটি লম্বালম্বি একত্রিত হয়ে প্রিপিউস তৈরি করে, যা ক্লিটোরিসকে আংশিক ঢেকে রাখে। ল্যাবিয়া মিনোরা যোনি ও মূত্রনালীর মুখ রক্ষা করে। উভয় ল্যাবিয়া স্পর্শ ও চাপে সংবেদনশীল।
ক্লিটোরিস

ক্লিটোরিস হল একটি ছোট স্পঞ্জি টিস্যু যা শুধুমাত্র যৌন আনন্দের জন্য। এটি ল্যাবিয়া মিনোরার উপরের অংশে প্রিপিউসের নিচে অবস্থিত একটি ছোট সাদা উপবৃত্ত হিসেবে দৃশ্যমান। বাহ্যিকভাবে শুধু ক্লিটোরাল গ্লান্স দৃশ্যমান হলেও এর মূল অংশ অনেক বড়, প্রায় ৪ ইঞ্চি লম্বা এবং এটি দুইটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যোনি প্রান্ত বরাবর নিচের দিকে প্রসারিত হয়।
ক্লিটোরাল গ্লান্স বা বাহ্যিক টিপকে প্রিপিউস বা ক্লিটোরাল হুড আচ্ছাদিত রাখে, যা পুরুষের লিঙ্গের ফোরস্কিনের মতো। তবে, ক্লিটোরিসে মূত্রনালী নেই।
যৌন উত্তেজনার সময় ক্লিটোরিস উত্থিত হয় ও প্রসারিত হয়, হুড সরে যায় এবং ক্লিটোরাল গ্লান্স বেশি দৃশ্যমান হয়। ক্লিটোরিসের আকার মহিলাভেদে ভিন্ন হয়।
মূত্রনালী
মূত্রনালীর মুখ ক্লিটোরিসের ঠিক নিচে অবস্থিত। যদিও এটি যৌন বা প্রজননের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তবুও এটি ভাল্ভার অংশ। মূত্রনালী মূত্র ত্যাগের পথ। এটি মূত্রাশয়ের সঙ্গে যুক্ত। নারীদের মূত্রনালী প্রায় ১.৫ ইঞ্চি দীর্ঘ, যেখানে পুরুষদের ৮ ইঞ্চি। যেহেতু এটি মলদ্বারের খুব কাছে, তাই সংক্রমণ রোধে নারীদের সবসময় সামনের দিক থেকে পেছনে মুছা উচিত। এই কারণে নারীদের মধ্যে মূত্রাশয় সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
হাইমেন
হাইমেন হল একটি পাতলা মিউকাস ঝিল্লি যা যোনির লুমেনকে মূত্রনালীর সিনাস থেকে আলাদা করে। এটি কখনো আংশিকভাবে যোনির মুখ ঢেকে রাখতে পারে। সাধারণত এটি ভ্রূণের শেষ দিকে ছিদ্রযুক্ত হয়ে যায়।
এক সময় মনে করা হতো, প্রথম যৌন সঙ্গমে এই ঝিল্লি ছিঁড়ে যায় ও রক্তপাত হয়, তাই এর অক্ষত অবস্থাকে কুমারীত্বের প্রমাণ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু, হাইমেন কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে না। এছাড়া, প্রথমবার যৌন সঙ্গমে সবসময় রক্তপাত নাও হতে পারে।
হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে "ট্রানসেকশন" বলা হয়। এটি যোনিতে কোনো আঘাতজনিত কারণে হতে পারে। স্বমেহন বা ট্যাম্পনের ব্যবহার সাধারণত এটি ঘটায় না। তাই হাইমেন দেখে কুমারীত্ব নির্ধারণ করা নির্ভরযোগ্য নয়।
পেরিনিয়াম
পেরিনিয়াম হল ভাল্ভার নিচ থেকে মলদ্বার পর্যন্ত ত্বকের ছোট একটি অংশ। এটি একটি হীরাকৃতি অঞ্চল যা সিম্ফাইসিস পিউবিস ও কক্সিক্সের মাঝে থাকে। এটি পেলভিসের তলা তৈরি করে এবং বাহ্যিক যৌনাঙ্গ ও মলদ্বারকে ধারণ করে। এটিকে দুটি অংশে ভাগ করা যায়: সামনের ইউরোজেনিটাল ত্রিভুজ এবং পেছনের অ্যানাল ত্রিভুজ।
শিশুর জন্মের সময় কিছু নারীর পেরিনিয়াম ছিঁড়ে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক। কিছু চিকিৎসক অবশ্য এটি কাটেন (এপিসিওটমি) যাতে ছিঁড়ে যাওয়া ক্ষত আরও ক্ষতিকর না হয়।
অভ্যন্তরীণ যৌনাঙ্গ
[সম্পাদনা]যোনি
[সম্পাদনা]যোনি হল একটি পেশিযুক্ত, ফাঁপা নালিকা যা যোনি মুখ থেকে গর্ভাশয়ের সারভিক্স পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূত্রাশয় ও রেকটামের মাঝখানে অবস্থিত। একটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর যোনি প্রায় ৩-৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। এর পেশিপ্রাচীর প্রসারণ ও সংকোচনে সক্ষম। এই পেশির ভেতর স্নিগ্ধ ঝিল্লি থাকে, যা যোনিকে আর্দ্র ও সংরক্ষিত রাখে। হাইমেন নামক একটি পাতলা টিস্যু এর মুখকে আংশিকভাবে ঢেকে রাখতে পারে। যৌন মিলনে যোনি লিঙ্গ গ্রহণ করে ও শুক্রাণু প্রবেশ করায়। টিকে থাকা শুক্রাণুগুলো ফ্যালোপিয়ান টিউবে পৌঁছে নিষিক্তকরণ ঘটাতে পারে।
যোনি তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত—ভিতরের মিউকাস স্তর, মাঝের মাংসপেশি স্তর ও বাইরের আঁশযুক্ত স্তর। ভিতরের স্তর রুগা নামক গঠন দ্বারা গঠিত যা প্রসারণে সাহায্য করে এবং যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই স্তর থেকেও অম্লীয় স্রাব নিঃসৃত হয় (pH ~4.0), যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে। বাইরের পেশি স্তর সন্তান প্রসবের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- যোনির কার্যাবলি
- পুরুষের উত্থিত লিঙ্গ ও বীর্য গ্রহণ করে।
- সন্তান জন্মের সময় শিশুর শরীর যোনির পথেই বাহির হয়।
- মাসিক রক্ত (মেন্সেস) নির্গমনের পথ।
- ডায়াফ্রাম, ফেমক্যাপ, নুভা রিং বা মহিলা কনডমের মতো জন্মনিয়ন্ত্রণের উপায় ধারণ করে।
পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (পিআইডি) হল একটি বিস্তৃত সংক্রমণ যা যোনি ও গর্ভাশয়ে শুরু হয় এবং জরায়ু নালী, ডিম্বাশয়, ও পরিশেষে পেলভিক পারিটোনিয়াম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১০% নারীর মধ্যে দেখা যায়, সাধারণত ক্ল্যামিডিয়া বা গনোরিয়ার সংক্রমণ এর জন্য দায়ী, তবে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াও যুক্ত থাকতে পারে। লক্ষণসমূহের মধ্যে রয়েছে—নিম্ন পেট ব্যথা, জ্বর, ও যোনি স্রাব। একটি পিআইডি সংক্রমণও বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করতে পারে, কারণ এটি জরায়ু নালীতে দাগ ফেলে। তাই পিআইডি সন্দেহ হলে রোগীকে তৎক্ষণাৎ ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
জরায়ু
[সম্পাদনা]জরায়ু একটি উল্টো নাশপাতির মতো আকৃতির, মোটা আস্তরণ ও পেশিবহুল প্রাচীরবিশিষ্ট অঙ্গ। এটি পেলভিক গহ্বরের নিচের দিকে অবস্থিত এবং ভেতরে একটি গহ্বর থাকে যাতে নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন ও বিকাশ লাভ করতে পারে। যদি নিষিক্ত না হয়, তবে জরায়ুর আস্তরণ মাসিকের সময় ঝরে পড়ে।
নারীদেহে সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু পেশি জরায়ুতে থাকে। এই পেশিগুলো প্রসবের সময় শিশুকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে সাহায্য করে এবং যৌন মিলনের সময় সঙ্গতিসূচক সংকোচন সৃষ্টি করে যা শুক্রাণুকে ডিম্বানু পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করে।
জরায়ু প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা ও দুই ইঞ্চি চওড়া হলেও গর্ভাবস্থায় এটি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। জরায়ুর উপরের প্রান্তকে ফান্ডাস বলা হয় যা গর্ভাবস্থার অগ্রগতি পরিমাপে চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। জরায়ু গহ্বর বলতে ফান্ডাস ও মূল শরীরকে বোঝানো হয়।
জরায়ুকে ধরে রাখার জন্য লিগামেন্ট বা বন্ধনী থাকে যা জরায়ুর শরীর থেকে পেলভিক ও অ্যাবডোমিনাল প্রাচীরে সংযুক্ত থাকে। গর্ভাবস্থায় এই লিগামেন্টগুলো প্রসারিত হয় এবং প্রসবের পর আবার সঙ্কুচিত হয়। তবে মেনোপজের পর এসব লিগামেন্টের স্থিতিস্থাপকতা কমে গেলে জরায়ু ঝুলে পড়তে পারে, একে সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করা হয়।
জরায়ুর কিছু সাধারণ সমস্যা হলো ইউটারাইন ফাইব্রয়েড, পেলভিক ব্যথা (যেমন এন্ডোমেট্রিওসিস, অ্যাডেনোমায়োসিস), পেলভিক প্রস্রাবজনিত সমস্যা, অতিরিক্ত বা অস্বাভাবিক রক্তস্রাব এবং ক্যান্সার। বিকল্প চিকিৎসা ব্যর্থ হলে জরায়ু অপসারণের (হিস্টেরেক্টমি) পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে এক বা দুইটি ডিম্বাশয়ও অপসারণ করা হতে পারে। এটি একবার করলে স্থায়ী হয়। ডিম্বাশয় না থাকায় হরমোন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়, তাই অনেক নারী বিকল্প হরমোন থেরাপি শুরু করেন।

গর্ভমুখ
[সম্পাদনা]গর্ভমুখ(সারভিক্স) (ল্যাটিন "ঘাড়" শব্দ থেকে উদ্ভূত) হলো জরায়ুর নিম্নাংশ, যা যোনির শীর্ষ প্রান্তে সংযুক্ত থাকে। সংযুক্ত স্থানটি প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁকানো। এটি নলাকার বা শঙ্কু আকৃতির এবং যোনির উপরের সম্মুখ প্রাচীর দিয়ে উঁকি দেয়। উপযুক্ত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ছাড়া এর প্রায় অর্ধেক অংশ দৃশ্যমান হয় না। একে মাঝে মাঝে "সারভিক্স ইউটারি" বা "জরায়ুর ঘাড়"ও বলা হয়।
ঋতুস্রাবের সময় গর্ভমুখ সামান্য প্রসারিত হয় যাতে এন্ডোমেট্রিয়াম (জরায়ুর আস্তরণ) বেরিয়ে যেতে পারে। এই প্রসারণকে অনেক সময় সেই ক্র্যাম্প বা ব্যথার কারণ হিসেবে মনে করা হয় যা অনেক নারীর হয়। প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, প্রথম সন্তান প্রসবের পর কিছু নারীর এই ব্যথা কমে যায় বা পুরোপুরি চলে যায় কারণ গর্ভমুখের ছিদ্র প্রসারিত হয়ে যায়।
যোনিতে যে অংশটি প্রবেশ করে সেটিকে পোর্টিও ভ্যাজাইনালিস বা এক্টোসারভিক্স বলা হয়। গড়পড়তা হিসেবে, একটোসার্ভিক্স প্রায় তিন সেমি দীর্ঘ এবং আড়াই সেমি প্রশস্ত। এটি একটি উত্তল, উপবৃত্তাকার পৃষ্ঠবিশিষ্ট এবং সম্মুখ ও পশ্চাৎ ঠোঁটে বিভক্ত। একটোসার্ভিক্সের ছিদ্রটিকে বলা হয় external os। নারীর বয়স, হরমোনের অবস্থা এবং প্রসবের ইতিহাস অনুসারে এর আকার পরিবর্তিত হয়। যেসব নারীর প্রসব হয়নি, তাদের external os গোলাকার থাকে; আর প্রসবের অভিজ্ঞতা থাকলে এটি চওড়া, ফাটল সদৃশ ও ফাঁকা দেখায়।
external os ও জরায়ু গহ্বরের মধ্যবর্তী পথকে endocervical canal বলা হয়। এটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ভিন্ন হতে পারে। সম্মুখ ও পশ্চাৎ প্রাচীর চ্যাপ্টা অবস্থায় এই নালীর গড় প্রস্থ প্রজননক্ষম নারীদের ক্ষেত্রে ৭-৮ মিমি। এই নালী জরায়ুর অভ্যন্তরীণ মুখ বা internal os এ গিয়ে শেষ হয়।
শিশু জন্মের সময় জরায়ুর সংকোচন গর্ভমুখকে প্রায় ১০ সেমি পর্যন্ত প্রসারিত করে শিশুর প্রবেশের পথ করে দেয়। যৌন উত্তেজনার সময় গর্ভমুখ কাঁপতে থাকে এবং external os প্রসারিত হয়।
ফ্যালোপিয়ান টিউব
[সম্পাদনা]জরায়ুর উপরের কোণ দুটিতে থাকে দুটি ফ্যালোপিয়ান টিউব, যাদের uterine tubes বা oviductsও বলা হয়। প্রতিটি টিউব জরায়ুর একপাশে সংযুক্ত থাকে এবং একটি করে ডিম্বাশয়ের দিকে যায়। তারা জরায়ুর সহায়ক লিগামেন্টগুলোর মাঝে অবস্থিত। এই টিউব প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা এবং স্প্যাঘেটির মতো সরু। প্রতিটি টিউবের ভেতরে একটি সূচের ছিদ্রের মতো সরু পথ থাকে। প্রতিটি টিউবের শেষপ্রান্তে একটি ফানেলের মতো অংশ থাকে যাকে ইনফান্ডিবুলাম বলা হয়, যা ডিম্বাশয়ের কাছাকাছি থাকে কিন্তু সংযুক্ত নয়।
ডিম্বাশয় পর্যায়ক্রমে একটি ডিম্বাণু নির্গত করে। যখন ডিম্বাশয় একটি ডিম্বাণু নির্গত করে, তখন টিউবের ফিমব্রিয়া একে ফ্যালোপিয়ান টিউবের ভেতরে নিয়ে আসে।
একবার ডিম্বাণু টিউবে প্রবেশ করলে, টিউবের ভেতরের সিলিয়া বা ক্ষুদ্র চুল ডিম্বাণুকে জরায়ুর দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু প্রায় ৪-৫ দিন সময় নেয়। যদি যৌন মিলনের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে শুক্রাণু প্রবেশ করে এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবে একটি ডিম্বাণু থাকে, তবে নিষেক ঘটে। নিষিক্ত ডিম্বাণুটি (জাইগোট) এরপর জরায়ুতে গিয়ে নিজেকে স্থাপন করে এবং বৃদ্ধি লাভ করে।
যদি জাইগোট জরায়ুতে না গিয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবেই স্থাপন করে, তবে একে বাহ্যিক বা টিউবাল গর্ভধারণ (ectopic pregnancy) বলা হয়। এটি হলে গর্ভপাত করাতে হয়, না হলে ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং মা মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্তন্যগ্রন্থি
[সম্পাদনা]
স্তন্যগ্রন্থি বা ম্যামারি গ্ল্যান্ড হলো এমন অঙ্গ যা শিশুর পুষ্টির জন্য দুধ উৎপাদন করে। এই এক্সোক্রাইন গ্রন্থিগুলি একটি পরিবর্তিত ঘর্মগ্রন্থি যা স্তনের মধ্যে থাকে এবং দুধ নিঃসরণে সহায়তা করে।
গঠন
[সম্পাদনা]স্তন্যগ্রন্থির মৌলিক উপাদান হলো অ্যালভিওলাই (ফাঁপা গহ্বর, কয়েক মিলিমিটার আকারের), যেগুলি দুধ স্রাবকারী অ্যাপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা আবৃত এবং মায়োএপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। এই অ্যালভিওলাই একত্রিত হয়ে লোবিউল নামে পরিচিত গুচ্ছ গঠন করে এবং প্রতিটি লোবিউলের একটি ল্যাকটিফেরাস নালি থাকে যা নিপলের ছিদ্রগুলিতে গিয়ে শেষ হয়। মায়োএপিথেলিয়াল কোষগুলি পেশি কোষের মতো সঙ্কোচন করতে পারে এবং এভাবেই দুধ অ্যালভিওলাই থেকে ল্যাকটিফেরাস নালির মাধ্যমে নিপলের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে এটি নালির প্রশস্ত স্থানে (সাইনাসে) জমা হয়। একটি দুধপানকারী শিশু মূলত এই সাইনাসগুলো থেকে দুধ চেপে বের করে।
স্তন্যগ্রন্থির বিকাশ হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। স্তন্যগ্রন্থি উভয় লিঙ্গেই থাকে, তবে তা জন্মের সময় অপরিপক্ব থাকে এবং বয়ঃসন্ধির সময় ডিম্বাশয়ের হরমোনের প্রভাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে এর বিকাশ শুরু হয়। ইস্ট্রোজেন বিকাশে সহায়তা করে, আর টেস্টোস্টেরন তা দমন করে।
জন্মের সময় শিশুর ল্যাকটিফেরাস নালি থাকলেও অ্যালভিওলাই থাকে না। বয়ঃসন্ধির পূর্বে খুব অল্প শাখা গঠন হয়, কিন্তু বয়ঃসন্ধির সময় ডিম্বাশয়ের ইস্ট্রোজেনের কারণে নালিগুলির শাখা সৃষ্টি হয় এবং কোষের গোলাকার গুচ্ছ তৈরি হয় যা অ্যালভিওলাই হয়ে উঠবে। প্রকৃত স্রাবকারী অ্যালভিওলাই শুধুমাত্র গর্ভাবস্থায় গঠিত হয়, যখন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, ফলে নালির কোষের আরও শাখা ও বিভাজন ঘটে, অ্যাডিপোজ টিস্যু বৃদ্ধি পায় এবং রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি পায়।
কোলস্ট্রাম দেরিতে গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের পর প্রথম কয়েক দিনে স্রাব হয়। প্রকৃত দুধ স্রাব (ল্যাকটেশন) কয়েকদিন পরে শুরু হয়, যা রক্তে প্রোজেস্টেরনের পরিমাণ হ্রাস এবং প্রোল্যাকটিন হরমোনের উপস্থিতির ফলে ঘটে। শিশুর দুধপান অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ ঘটায়, যা মায়োএপিথেলিয়াল কোষের সঙ্কোচন উদ্দীপিত করে।
স্তন্যগ্রন্থির কোষ হরমোন দ্বারা সহজেই বৃদ্ধি ও বিভাজনে প্ররোচিত হতে পারে। এই বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। স্তনের প্রায় সকল ক্যান্সার স্তন্যগ্রন্থির লোবিউল বা নালিতেই শুরু হয়।
| গঠন | অবস্থান ও বর্ণনা | কার্যাবলি |
|---|---|---|
| স্তন | উপরের বুকে, প্রতিটি পাশে; অ্যালভিওলার কোষ (দুধ উৎপাদন), মায়োএপিথেলিয়াল কোষ (দুধ নির্গমনে সহায়ক), ও নালির প্রাচীর রয়েছে। | দুধ উৎপাদন, নবজাতকের পুষ্টি। |
| জরায়ুমুখ | জরায়ুর নিচের সরু অংশ। | সন্তান প্রসবের সময় জরায়ুর সংকোচনে জরায়ুমুখ ১০ সেমি পর্যন্ত প্রসারিত হয় যাতে শিশু বাইরে আসতে পারে। যৌন উত্তেজনার সময় জরায়ুমুখ সঙ্কুচিত হয় ও বাইরের ছিদ্র প্রসারিত হয়। |
| ক্লাইটোরিস | ভেস্টিবিউলের ঠিক সামনে একটি ছোট উত্থিত অঙ্গ। | যৌন উত্তেজনা, রক্তে স্ফীত হয়। |
| ফলোপিয়ান নালি | জরায়ুর উপরিভাগ থেকে দুই পাশে বিস্তৃত। | ডিম্বাণু জরায়ুতে পৌঁছাতে সহায়তা করে (সাধারণত এখানেই নিষেক ঘটে)। |
| হাইমেন | অল্পবয়সী নারীদের যোনিপথ আংশিকভাবে আবৃত একটি পাতলা ঝিল্লি। | |
| ল্যাবিয়া ম্যাজোরা | যোনিপথের প্রবেশপথ ঘিরে বাইরের ত্বকের ভাঁজ। | মিলনের সময় স্নিগ্ধতায় সহায়তা। |
| ল্যাবিয়া মাইনোরা | যোনিপথের প্রবেশপথ ঘিরে ভেতরের ত্বকের ভাঁজ। | মিলনের সময় স্নিগ্ধতায় সহায়তা। |
| মন্স | ত্বক ও চর্বিযুক্ত টিস্যুর ঢিবি; নিম্ন পেলভিক অঞ্চলের কেন্দ্রে। | |
| ডিম্বাশয় (নারীর গনাড) | জরায়ুর উভয় পাশে পেলভিক অঞ্চলে। | ডিম্বাণুর পরিপক্বতায় সহায়তা করে; যৌন হরমোন (ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন) উৎপাদন ও নিঃসরণ করে। |
| পেরিনিয়াম | ভলভার নিচ থেকে মলদ্বার পর্যন্ত চামড়ার ছোট একটি অঞ্চল। | |
| ইউরেথ্রা | মূত্রথলির উপর পেলভিক গহ্বরে, কিছুটা কাত। | মূত্র নির্গমনের পথ। |
| জরায়ু | পেলভিক গহ্বরের কেন্দ্রে। | ভ্রূণ ধারণ ও পুষ্টির জন্য। |
| যোনি | প্রায় ৮-১০ সেমি দীর্ঘ নালি, জরায়ুমুখ থেকে শরীরের বাইরের দিকে। | যৌনমিলনের সময় পুরুষাঙ্গ গ্রহণ করে; প্রসবের সময় শিশুর বের হওয়ার পথ; মাসিক রক্ত নির্গমনের পথ; জন্মনিয়ন্ত্রণের যন্ত্র ধারণ করতে পারে (যেমন IUD, ডায়াফ্রাম, নেভা রিং, বা মহিলা কনডম)। |
| ভলভা | প্রজননপথের প্রবেশপথ ঘিরে থাকে (সব বাহ্যিক জননাঙ্গকে বোঝায়)। | |
| এন্ডোমেট্রিয়াম | জরায়ু প্রাচীরের অন্তঃস্তর। | তরল নিঃসরণকারী গ্রন্থি থাকে যা জরায়ুর অভ্যন্তরকে স্নান করায়। |
| মায়োমেট্রিয়াম | জরায়ু প্রাচীরের মসৃণ পেশি। | শিশু প্রসবের সময় সংকোচনে সহায়তা করে। |
নারী প্রজনন চক্র
[সম্পাদনা]কিশোরী বয়সের শেষ দিকে মেয়েরা একটি মাসিক চক্রের অংশ হিসেবে ডিম্বাণু নিঃসরণ শুরু করে, যেটিকে নারী প্রজনন চক্র বা মাসিক চক্র (menstrual অর্থ "মাসিক") বলা হয়। প্রায় প্রতি ২৮ দিন অন্তর, ডিম্বস্ফোটন চলাকালে, একটি ডিম্বাণু ডিম্বাশয় থেকে নির্গত হয়ে একটি ফ্যালোপিয়ান টিউবে যায়। যদি ডিম্বাণুটি ডিম্বস্ফোটনের পরবর্তী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত না হয়, তাহলে এটি শুকিয়ে যায় এবং প্রায় দুই সপ্তাহ পর যোনির মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় মাসিক বা ঋতুস্রাব। জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) থেকে রক্ত ও টিস্যু বের হয়ে মাসিক স্রাব তৈরি করে, যা সাধারণত চার থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। প্রথম মাসিককে বলা হয় মেনার্ক।
মাসিক চলাকালে জরায়ুর আস্তরণে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিগুলি সংকুচিত হয় এবং কৈশিক ধমনিগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালীগুলির থেকে রক্তপাতের ফলে আস্তরণটি সম্পূর্ণ নয় বরং এলোমেলোভাবে খসে পড়ে। জরায়ু থেকে নির্গত এন্ডোমেট্রিয়াল মিউকাস ও রক্ত মিশে তৈরি হয় মাসিক স্রাব।

প্রজনন চক্রকে ডিম্বাশয় চক্র ও জরায়ু চক্রে ভাগ করা যায় (ডান পাশের চিত্রে ডিম্বাশয় ও জরায়ু হিস্টোলজির তুলনা দেখুন)। জরায়ু চক্র চলাকালে, জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াল আস্তরণ এস্ট্রোজেন (চিত্রে এস্ট্রাডিয়ল নামে চিহ্নিত) বৃদ্ধির প্রভাবে গঠিত হয়। ডিম্বাণু ধারণকারী ফোলিকলগুলো বিকাশ লাভ করে, এবং কয়েক দিনের মধ্যে একটি পরিপক্ব হয়ে ডিম্বাণুতে রূপ নেয়। এরপর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণুটি নিঃসৃত হয়, এই ঘটনাকে বলা হয় ডিম্বস্ফোটন। ডিম্বস্ফোটনের পরে জরায়ুর আস্তরণ নিঃসরণ পর্যায়ে প্রবেশ করে, যেটি ডিম্বাশয় চক্র নামে পরিচিত, এবং এটি নিষেকের প্রস্তুতি হিসেবে প্রোজেস্টেরনের প্রভাবে ঘটে। প্রোজেস্টেরন কর্পাস লুটিয়াম (ডিম্বস্ফোটনের পরের ফোলিকল) দ্বারা উৎপাদিত হয় এবং এটি জরায়ুকে পুষ্ট ও রক্তনালীর আস্তরণে সমৃদ্ধ করে যাতে ভ্রূণ বেড়ে উঠতে পারে। যদি নিষেক ও প্রতিস্থাপন ঘটে, তাহলে ভ্রূণ হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন (HCG) উৎপাদন করে, যা কর্পাস লুটিয়ামকে সক্রিয় রাখে এবং এটি তখন পর্যন্ত প্রোজেস্টেরন উৎপাদন চালিয়ে যায় যতক্ষণ না প্লাসেন্টা সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই, প্রোজেস্টেরন "প্রোজেস্টেশনাল" এবং এটি পুরো গর্ভকালীন জরায়ুর আস্তরণ ধরে রাখে। যদি নিষেক ও প্রতিস্থাপন না ঘটে, তাহলে কর্পাস লুটিয়াম কর্পাস অ্যালবিক্যানসে পরিণত হয়, এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা হ্রাস পায়। এই হ্রাসের ফলে এন্ডোমেট্রিয়াল আস্তরণ ভেঙে যায় ও যোনিপথে ঝরে পড়ে। এটিকে বলা হয় মাসিক, যা এস্ট্রোজেনের কার্যকারিতার সর্বনিম্ন স্তর নির্দেশ করে এবং একটি নতুন চক্রের সূচনা করে।
সাধারণভাবে, মাসিক বা ঋতুস্রাবকে "পিরিয়ড" বলা হয়। এই রক্তপাত সাধারণত একজন নারীর গর্ভধারণ না হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। তবে এটি নিশ্চিত বলা যায় না, কারণ কখনো কখনো গর্ভাবস্থার শুরুতেও কিছুটা রক্তপাত হতে পারে। প্রজননকালীন সময়ে মাসিক না হওয়া অনেক সময় গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
মাসিক একটি প্রাকৃতিক চক্রের স্বাভাবিক অংশ যা স্বাস্থ্যবান নারীদের মধ্যে কিশোরী বয়স থেকে প্রজনন বয়সের শেষ পর্যন্ত ঘটে। প্রথম মাসিক, যা মেনার্ক নামে পরিচিত, গড়ে ১২ বছর বয়সে হয়, তবে ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সের মধ্যে যে কোনো সময় এটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। বংশগতি, খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ইত্যাদি কারণ মেনার্কের সময়কে ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত করতে পারে।
ডিম্বস্ফোটনের লক্ষণসমূহ
নারী দেহে ডিম্বস্ফোটনের সময় কিছু বাহ্যিক লক্ষণ দেখা যায় যা সহজেই চেনা যায়। এর মধ্যে দুটি প্রধান লক্ষণ হলো জরায়ু গলদেশের শ্লেষ্মার পাতলা হওয়া ও শরীরের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তন।
জরায়ু গলদেশের শ্লেষ্মার পাতলাতা
মাসিক শেষ হওয়ার পর ও ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগে নারীর গলদেশীয় শ্লেষ্মার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। প্রথমে এটি ঘন ও হলুদাভ রঙের হয় এবং খুব বেশি থাকে না। ডিম্বস্ফোটনের দিকে যেতে যেতে এটি পাতলা ও স্বচ্ছ হয়ে যায়। ডিম্বস্ফোটনের দিন বা তার কাছাকাছি সময়ে এই শ্লেষ্মা খুব পাতলা, স্বচ্ছ ও টানটান হয়ে যায়। এর প্রকৃতি কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো হয়। এই অবস্থাকে 'স্পিনবারকাইট' বলা হয়।
তাপমাত্রার পরিবর্তন
একজন নারী প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার আগে খুব সংবেদনশীল থার্মোমিটার দিয়ে নিজের বেসাল শরীরের তাপমাত্রা মেপে ডিম্বস্ফোটনের সময় নির্ধারণ করতে পারেন। তাপমাত্রাটি প্রতিদিন রেকর্ড করা হয় যাতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। জরায়ু চক্রে সাধারণ তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৯৭.০ – ৯৮.০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ডিম্বস্ফোটনের দিন তাপমাত্রা হঠাৎ কমে ৯৬.০ – ৯৭.০ এর মধ্যে চলে যায় এবং পরের দিন সকালে আবার বেড়ে গিয়ে প্রায় ৯৮.৬ ডিগ্রিতে পৌঁছায় এবং মাসিক শুরু হওয়া পর্যন্ত ঐ স্তরে থাকে।
এই দুটি পদ্ধতি উর্বরতা নির্ধারণ ও গর্ভধারণ রোধ উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। গর্ভধারণের ক্ষেত্রে এগুলো তুলনামূলকভাবে কার্যকর, কারণ শুক্রাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। একজন নারী গণনায় কয়েকদিন ভুল করলেও গর্ভবতী হতে পারেন।
রজোনিবৃত্তি (Menopause) হল বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মাসিক চক্রের প্রাকৃতিক সমাপ্তি। এটি কখনো কখনো "জীবনের পরিবর্তন" বা ক্লাইম্যাকটেরিক নামেও পরিচিত। রজোনিবৃত্তি ঘটে যখন ডিম্বাশয় এস্ট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং প্রজননতন্ত্র ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। শরীর যখন এই হরমোন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে, তখন গরম লাগা, হৃদকম্পন, হতাশা, উদ্বেগ, রাগ, মেজাজ পরিবর্তন, মনোযোগের অভাব, যোনি শুষ্কতা ও প্রস্রাবের তাগিদসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এদের পাশাপাশি মাসিক অনিয়মিত ও কম হতে থাকে।
প্রযুক্তিগতভাবে, রজোনিবৃত্তি বলতে মাসিক চক্রের স্থায়ী বন্ধ হওয়াকে বোঝানো হয়; এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত এক বছর সময় নেয়, তবে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, এবং একে ক্লাইম্যাকটেরিক বলা হয়। স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক রজোনিবৃত্তি হলো যা নারীর বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটে। তবে হিস্টেরেকটমির মতো শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে রজোনিবৃত্তি ঘটানো সম্ভব।
রজোনিবৃত্তির গড় সময় ৫০.৫ বছর, তবে কিছু নারী ক্যান্সার বা গুরুতর অসুস্থতা ও কেমোথেরাপির কারণে আগেই রজোনিবৃত্তিতে পৌঁছান। ৪০ বছরের আগেই রজোনিবৃত্তি হলে একে অকাল রজোনিবৃত্তি (premature menopause) বলা হয় এবং এটি ১% নারীর ক্ষেত্রে ঘটে। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে অটোইমিউন রোগ, থাইরয়েড রোগ এবং ডায়াবেটিস মেলিটাস।
অকাল রজোনিবৃত্তি নির্ধারণ করা হয় ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন (FSH) ও লুটিনাইজিং হরমোন (LH) পরিমাপ করে। রজোনিবৃত্তি ঘটলে এই হরমোনগুলোর মাত্রা বৃদ্ধি পায়। দেখা গেছে, যমজ (ভ্রাতৃ বা একজাইগোটিক) বোনদের মধ্যে প্রায় ৫% ক্ষেত্রে রজোনিবৃত্তি ৪০ বছরের আগেই ঘটে, তবে এর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। রজোনিবৃত্তি-পরবর্তী নারীরা হাড় ক্ষয় রোগে (osteoporosis) বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
পেরিমেনোপজ বলতে রজোনিবৃত্তির পূর্ববর্তী সময়কে বোঝানো হয়, যখন এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোন উৎপাদন কমতে শুরু করে এবং অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এই সময়ে নারীর উর্বরতা কমে যায়। রজোনিবৃত্তিকে সাধারণভাবে অন্তত ১২ মাস মাসিক না হওয়া হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পেরিমেনোপজ ৩৫ বছর বয়স থেকে শুরু হলেও সাধারণত তার পর অনেক পরে শুরু হয়। এটি কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর সময়কাল পূর্বানুমানযোগ্য নয়।
প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (পিএমএস)
অনেক নারী মাসিক শুরুর আগের কয়েক দিনে কিছু অস্বস্তি অনুভব করে থাকেন। প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম সাধারণত মাসিক শুরুর সাত দিন আগে সবচেয়ে বেশি প্রকট হয় এবং পুরো মাসিককালীন সময়জুড়ে স্থায়ী হতে পারে। প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম-এ শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়: ব্রণ, পেট ফাঁপা, ক্লান্তি, পিঠে ব্যথা, স্তনে ব্যথা, মাথাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, খাবারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বিষণ্ণতা, রাগ, মনোযোগের ঘাটতি বা মানসিক চাপ সামলাতে অসুবিধা।
গর্ভধারণ না হওয়া নারীর ডিম্বাশয় ও জরায়ুচক্র
[সম্পাদনা]
| ডিম্বাশয় চক্র | ঘটনা | জরায়ু চক্র | ঘটনা |
|---|---|---|---|
| ফলিকুলার পর্যায় - দিন ১-১৩ | FSH নিঃসরণ শুরু হয়। | মাসিক - দিন ২-৫ | এন্ডোমেট্রিয়াম ভেঙে পড়ে। |
| ফলিকলের পরিপক্বতা ঘটে। | প্রোলিফারেটিভ পর্যায় - দিন ৬-১৩ | এন্ডোমেট্রিয়াম পুনর্গঠিত হয়। | |
| ইস্ট্রোজেন নিঃসরণ প্রবল থাকে। | |||
| ডিম্বস্ফোটন - দিন ১৪* | LH হরমোনের মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। | ||
| লুটিয়াল পর্যায় - দিন ১৫-২৮ | LH নিঃসরণ চলতে থাকে। | সিক্রেটরি পর্যায় - দিন ১৫-২৮ | এন্ডোমেট্রিয়াম পুরু হয় এবং গ্রন্থিগুলি নিঃসরণশীল হয়। |
| কর্পাস লুটিয়াম গঠিত হয়। | |||
| প্রোজেস্টেরনের নিঃসরণ প্রবল থাকে। |
(*) ২৮ দিনের চক্র ধরে নিয়ে।
ডিম্বাশয় চক্রে দুটি পর্যায় রয়েছে: ফলিকুলার পর্যায় ও লুটিয়াল পর্যায়। ফলিকুলার পর্যায়ে প্রায় ১০-২৫টি প্রাক-অ্যান্ট্রাল বা প্রাথমিক অ্যান্ট্রাল ফলিকল বেছে নিয়ে আরও উন্নয়নের জন্য প্রস্তুত করা হয়। প্রায় সাত দিন পরে একটি প্রধান ফলিকল নির্বাচন করা হয় পূর্ণ পরিপক্বতার জন্য, যা ডিম্বস্ফোটনের পূর্বপ্রস্তুতি। ফলিকলগুলি নিজেই FSH ও ইস্ট্রোজেন নিঃসরণ করে, যা ফলিকল বৃদ্ধির জন্য উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। ডিম্বস্ফোটনই লুটিয়াল পর্যায়ের সূচনা করে। এটি ঘটে গ্রাফিয়ান ফলিকলের প্রাচীর ফেটে গিয়ে অ্যান্ট্রাল তরলের প্রবাহ সৃষ্টি করার মাধ্যমে, যা ডিম্বাণুকে ডিম্বাশয়ের পৃষ্ঠে নিয়ে আসে। এরপর ফেটে যাওয়া ফলিকল একটি গ্রন্থিতে (কর্পাস লুটিয়াম) রূপান্তরিত হয়, যা ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নিঃসরণ করে। এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ করে রক্তে LH মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে শুরু হয়। ডিম্বস্ফোটনের পরে মুক্ত ডিম্বাণু জরায়ু নালিতে প্রবেশ করে, যেখানে এটি নিষিক্ত অথবা বর্জিত হতে পারে।
জরায়ু চক্রটি ডিম্বাশয় চক্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে চলে এবং এটি তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথমটি হলো মাসিক বা ঋতুচক্রের পর্যায়। এটি এ কারণে এমন বলা হয় যে, এই সময় জরায়ুর আবরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) খসে পড়ে, যাকে সাধারণভাবে মাসিক বলা হয়। কর্পাস লুটিয়াম ক্ষয়প্রাপ্ত হলে রক্তে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা হ্রাস পায়, যা মাসিক আরম্ভ করে। এন্ডোমেট্রিয়ামের বাইরের স্তরের রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয় এবং টিস্যুগুলির রক্তপ্রবাহ কমে যায়, ফলে টিস্যুগুলো মারা যায়। মৃত টিস্যুগুলি মূল এন্ডোমেট্রিয়াম থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত খসে পড়ে। এই টিস্যুর খসে পড়া রক্তনালিগুলো ছিঁড়ে ফেলে এবং রক্তপাত হয়।
পরবর্তী পর্যায় হলো প্রোলিফারেটিভ পর্যায়। এই সময় জরায়ু নিজেকে পুনরায় গঠন করে এবং গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত করে। মাসিকের পরে যে এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু বাকি থাকে তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এন্ডোমেট্রিয়াল গ্রন্থিগুলি বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে আরও রক্তনালির গঠন হয়। জরায়ুমুখ নালিতে থাকা গ্রন্থিগুলো পাতলা শ্লেষ্মা নিঃসরণ করে যা শুক্রাণুকে জমা হতে সাহায্য করে। ইস্ট্রোজেন এই পর্যায়ে জরায়ুর পরিবর্তনকে উৎসাহিত করে।
শেষ পর্যায় হলো সিক্রেটরি পর্যায়। এই সময় এন্ডোমেট্রিয়ামকে এমনভাবে রূপান্তর করা হয় যাতে এটি ভ্রূণের সংযুক্তি ও পরবর্তী পুষ্টির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। এই কাজের জন্য এন্ডোমেট্রিয়াম রক্তসরবরাহ সমৃদ্ধ করে, গ্লাইকোজেন সমৃদ্ধ তরল নিঃসরণ করে, এমনকি জরায়ুমুখে একটি প্লাগ তৈরি করে যাতে জীবাণু প্রবেশ করতে না পারে। এই পরিবর্তনগুলি প্রোজেস্টেরনের কারণে ঘটে, যা কর্পাস লুটিয়াম নিঃসরণ করে। সিক্রেটরি পর্যায়ের শেষে কর্পাস লুটিয়াম ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে মাসিক আরম্ভ হয়।
যৌন প্রজনন
[সম্পাদনা]যৌন প্রজনন হলো এমন এক ধরনের প্রজনন পদ্ধতি যার মাধ্যমে সন্তানের জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। এই প্রজননে, প্রতি প্রজন্মে দুই ব্যক্তির জিন এলোমেলোভাবে মিশ্রিত হয়। এন্ডোক্রাইন সিস্টেম থেকে নিঃসৃত যৌন হরমোন শরীরকে সংকেত দেয় কখন বয়ঃসন্ধি শুরু হবে। নারী ও পুরুষের প্রজননতন্ত্র এতটাই ভিন্ন যে প্রতিটি লিঙ্গের নিজস্ব আলাদা অঙ্গ রয়েছে। অন্যান্য সমস্ত শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থায় "ইউনিসেক্স" বা উভয়লিঙ্গে সাধারণ অঙ্গ থাকে।
প্রজনন দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রথমটি হলো মিয়োসিস, যার মাধ্যমে ৪৬টি ক্রোমোজোমের সংখ্যা অর্ধেকে কমানো হয়। দ্বিতীয়টি হলো নিষেক, যার মাধ্যমে দুটি গ্যামেট একত্রিত হয়ে ২৩টি পিতৃসূত্র এবং ২৩টি মাতৃসূত্র ক্রোমোজোম মিলে আসল সংখ্যা পুনরুদ্ধার করে। মিয়োসিস চলাকালে, সাধারণত প্রতিটি ক্রোমোজোম জোড়া পুনঃসংযোজনের জন্য একে অপরের সঙ্গে অদলবদল হয়।
যৌন প্রজননের জন্য প্রয়োজন যৌন অঙ্গ, যাকে গোনাড বলা হয়। উভয় লিঙ্গেই গোনাড থাকে: নারীদের গোনাড হলো ডিম্বাশয়। নারী গোনাড নারীর গ্যামেট (ডিম্বাণু) উৎপন্ন করে; পুরুষ গোনাড পুরুষ গ্যামেট (শুক্রাণু) উৎপন্ন করে। ডিম্বাণু নিষিক্ত হলে, তাকে জাইগোট বলা হয়।
সাধারণত নিষেক ঘটে ডিম্বনালিতে, তবে এটি জরায়ুর মধ্যেও হতে পারে। জাইগোট এরপর নিজেকে জরায়ুর দেয়ালে স্থাপন করে এবং সেখানেই ভ্রূণজ এবং আকৃতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। নারীর শরীর এই প্রজনন প্রক্রিয়া ৪০ সপ্তাহ পর্যন্ত বহন করে, এরপর প্রসবের সময় জরায়ু থেকে যোনিপথ (বার্থ ক্যানাল) দিয়ে ভ্রূণ নির্গত হয়। এমনকি জন্মের পরেও, নারী দুধ সরবরাহের মাধ্যমে শিশু পুষ্টি দিয়ে প্রজনন প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়।
বন্ধ্যত্ব
[সম্পাদনা]বন্ধ্যত্ব হলো স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে অক্ষমতা বা গর্ভধারণ হওয়ার পর তা পূর্ণ মেয়াদে নিয়ে যেতে না পারা। অনেক কারণেই একটি দম্পতি চিকিৎসা ছাড়া সন্তান ধারণ করতে পারে না। আনুমানিকভাবে ১৫% দম্পতি বন্ধ্যত্বের শিকার। প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে পুরুষের অবদান থাকে, ৪০% ক্ষেত্রে নারীর, এবং অবশিষ্ট ২০% ক্ষেত্রে উভয়ের। ২০-এর দশকের মাঝামাঝি সুস্থ দম্পতিরা নিয়মিত যৌন মিলনের মাধ্যমে প্রতি মাসে গর্ভধারণের ২৫% সুযোগ পান। একে "ফেকান্ডিটি" বলা হয়।
প্রাথমিক বনাম গৌণ বন্ধ্যত্ব
[সম্পাদনা]আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ৬.১ মিলিয়ন মানুষ বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভোগে, যা প্রজননক্ষম জনগোষ্ঠীর ১০%। এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে নারীর কারণে বন্ধ্যত্ব হয়, আরেক তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে পুরুষের, ১৫% ক্ষেত্রে উভয়েই দায়ী, এবং অবশিষ্ট ক্ষেত্রে কারণ অনির্ধারিত।
"গৌণ বন্ধ্যত্ব" হলো পূর্বে স্বাভাবিক গর্ভধারণ ও প্রসবের পর আবার সন্তান ধারণে সমস্যা হওয়া। বিভিন্ন চিকিৎসাজনিত কারণ (যেমন: হরমোনজনিত), বয়স এবং প্রথম সন্তানের জন্য ভাইবোন দেওয়ার মানসিক চাপ এর জন্য দায়ী হতে পারে। তবে, সঙ্গী বদল হয়ে থাকলে এটি প্রযুক্তিগতভাবে গৌণ বন্ধ্যত্ব হিসেবে গণ্য হয় না।
বন্ধ্যত্বের কারণসমূহ
[সম্পাদনা]নারী বন্ধ্যত্বের সাথে সম্পর্কিত কারণগুলো:
- সাধারণ কারণসমূহ:
- ডায়াবেটিস মেলিটাস, থাইরয়েড রোগ, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির রোগ
- গুরুতর লিভার বা কিডনি রোগ
- মনস্তাত্ত্বিক কারণ
- হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি কারণ:
- ক্যালম্যান সিনড্রোম
- হাইপোথ্যালামাসের ক্রিয়াক্ষমতা হ্রাস
- হাইপারপ্রোল্যাক্টিনেমিয়া
- হাইপোপিটুইটারিজম
- ডিম্বাশয়-সংক্রান্ত কারণ:
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম
- অনোভ্যুলেশন (ডিম্বস্ফোটন না হওয়া)
- ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ হ্রাস
- লুটিয়াল ডিসফাংশন
- প্রিম্যাচিউর মেনোপজ
- গোনাডাল ডিজেনেসিস (টার্নার সিনড্রোম)
- ডিম্বাশয়ের টিউমার
- ডিম্বনালী/পেরিটোনিয়াল কারণ:
- এন্ডোমেট্রিওসিস
- পেলভিক অ্যাডহিশন
- পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID, সাধারণত ক্ল্যামিডিয়া সংক্রমণজনিত)
- ডিম্বনালীর বন্ধ হয়ে যাওয়া
- জরায়ু সংক্রান্ত কারণ:
- জরায়ুর গঠনগত ত্রুটি
- জরায়ুর ফাইব্রয়েড (লাইওমাইওমা)
- অ্যাশারম্যান সিনড্রোম
- জরায়ুমুখ সংক্রান্ত কারণ:
- জরায়ুমুখ সংকোচন
- অ্যান্টিস্পার্ম অ্যান্টিবডি
- জরায়ুমুখে যথেষ্ট শ্লেষ্মা না থাকা
- যোনি সংক্রান্ত কারণ:
- যোনিস্পন্দ (ভ্যাজিনিসমাস)
- যোনি অবরোধ
- জিনগত কারণ:
- বিভিন্ন ইন্টারসেক্স অবস্থান, যেমন: অ্যান্ড্রোজেন ইনসেনসিটিভিটি সিনড্রোম
যৌথ বন্ধ্যত্ব
[সম্পাদনা]কিছু ক্ষেত্রে, নারী ও পুরুষ উভয়ই বন্ধ্যা বা সেমি-বন্ধ্যা হতে পারেন এবং দম্পতির বন্ধ্যত্ব তাদের উভয়ের মিলিত সমস্যার কারণে হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে কারণ ইমিউনোলজিক্যাল বা জিনগত হতে পারে; এতে উভয়ই আলাদাভাবে সক্ষম হলেও একত্রে গর্ভধারণে অক্ষম হন।
অজ্ঞাত বন্ধ্যত্ব
[সম্পাদনা]প্রায় ১৫% বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে, পরীক্ষা করেও কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা থাকতে পারে যা বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে শনাক্ত করা যায় না। সম্ভাব্য কারণ হলো: ডিম্বাণু নিষেকের উপযুক্ত সময়ে মুক্তি না পাওয়া, ডিম্বনালীতে না পৌঁছানো, শুক্রাণুর ডিম্বাণুতে পৌঁছাতে না পারা, নিষেক ব্যর্থ হওয়া, জাইগোটের পরিবহন বিঘ্নিত হওয়া, অথবা ইমপ্লান্টেশন ব্যর্থ হওয়া। বর্তমানে ডিম্বাণুর গুণমান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত।
বন্ধ্যত্ব নির্ণয়
[সম্পাদনা]বন্ধ্যত্ব নির্ণয় শুরু হয় চিকিৎসার ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিচের পরীক্ষা করা হয়:
- এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি (জরায়ুর আস্তরণ পরীক্ষা)
- হরমোন পরীক্ষা (নারী হরমোনের মাত্রা নির্ণয়)
- ল্যাপারোস্কপি (পেলভিক অঙ্গ দেখার জন্য)
- ডিম্বস্ফোটন পরীক্ষা (ডিম্বাণু নির্গত হয়েছে কিনা)
- প্যাপ স্মিয়ার (সংক্রমণ শনাক্তকরণ)
- পেলভিক পরীক্ষা (অস্বাভাবিকতা বা সংক্রমণ খোঁজার জন্য)
- পোস্টকোইটাল টেস্ট (যৌনমিলনের পর নির্গত রস পরীক্ষা)
- বিশেষ এক্স-রে পরীক্ষা
চিকিৎসা
[সম্পাদনা]- ডিম্বাশয়কে ডিম্বাণু প্রস্তুত ও নির্গত করতে উদ্দীপিত করে এমন ফার্টিলিটি মেডিকেশন (যেমন: ক্লোমিফেন সাইট্রেট)
- ডিম্বনালীর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে অস্ত্রোপচার (টিউবোপ্লাস্টি)
- ডোনার ইনসেমিনেশন (নারীকে কৃত্রিমভাবে শুক্রাণু প্রয়োগ করা হয়, ডোনার বা সঙ্গীর)
- ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF): ডিম্বাণু সংগ্রহ করে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষিক্ত করে জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এর বিভিন্ন রূপ:
- ডোনার ডিম্বাণু বা শুক্রাণু ব্যবহার (যখন নিজেদের ডিম্বাণু বা শুক্রাণু অনুপযুক্ত)
- ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (ICSI): একক শুক্রাণু ডিম্বাণুতে ঢুকিয়ে নিষিক্ত করা হয়, এরপর IVF-এর মতো জরায়ুতে স্থাপন
- জাইগোট ইনট্রাফ্যালোপিয়ান ট্রান্সফার (ZIFT): নিষিক্ত ডিম্বাণু ডিম্বনালীতে স্থাপন
- গ্যামেট ইনট্রাফ্যালোপিয়ান ট্রান্সফার (GIFT): ডিম্বাণু ও শুক্রাণু একসঙ্গে ডিম্বনালীতে স্থাপন, নিষেক শরীরের ভেতরেই ঘটে
- অন্যান্য সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (ART):
- অ্যাসিস্টেড হ্যাচিং
- প্রজনন সংরক্ষণ
- শুক্রাণু, ডিম্বাণু ও প্রজনন টিস্যু সংরক্ষণ (ক্রায়োপ্রিজারভেশন)
- হিমায়িত ভ্রূণ স্থানান্তর (FET)
- বিকল্প এবং পরিপূরক চিকিৎসা:
- আকুপাংচার – Fertility and Sterility পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় এটি IVF সাফল্য ৬০% পর্যন্ত বাড়াতে পারে; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (২০০২) অনুসারে এটি অনোভ্যুলেটরি বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায়ও কার্যকর।
- খাদ্য ও পরিপূরক গ্রহণ
- স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
জন্মনিরোধ পদ্ধতি
[সম্পাদনা]জন্মনিরোধ হলো এক বা একাধিক কর্মপদ্ধতি, যন্ত্র বা ওষুধ অনুসরণ করার একটি নিয়মাবলি, যার উদ্দেশ্য একজন নারীর গর্ভধারণকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিরোধ বা সম্ভাবনা হ্রাস করা। পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে জন্মনিয়ন্ত্রণকে ধরা হয়। যেসব পদ্ধতির উদ্দেশ্য শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণের সম্ভাবনা কমানো, সেগুলিকে নির্দিষ্টভাবে গর্ভনিরোধ (কন্ট্রাসেপশান) বলা হয়। গর্ভনিরোধ গর্ভপাতের (এবোর্সান) থেকে ভিন্ন, কারণ গর্ভনিরোধ নিষিক্তকরণকে প্রতিরোধ করে, আর গর্ভপাত একটি স্থাপিত গর্ভাবস্থাকে সমাপ্ত করে। কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন: পিল, আইইউডি, ইমপ্ল্যান্ট, প্যাচ, ইনজেকশন, যোনি রিং ইত্যাদি) নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করেও কাজ করে; এগুলিও চিকিৎসাগতভাবে গর্ভনিরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। গর্ভনিরোধ পদ্ধতি বেছে নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যদি কারো জেনেটিক সমস্যা বা রক্তজনিত অসুবিধা (যেমন factor V leiden) থাকে, তবে কিছু গর্ভনিরোধক প্রাণঘাতী হতে পারে।
| ধরন | পদ্ধতি | কার্যপ্রণালী | কার্যকারিতা | ঝুঁকি |
|---|---|---|---|---|
| সংযম | যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা | যোনিতে শুক্রাণুর প্রবেশ হয় না | ১০০% | কোনো ঝুঁকি নেই |
| ঋতুচক্র পদ্ধতি | মাসে প্রায় ৮ দিনের জন্য (ডিম্বস্ফোটনের ৫ দিন পূর্ব থেকে ৩ দিন পর পর্যন্ত) যৌন সম্পর্ক পরিহার | এই ৮ দিনের মধ্যেই নিষিক্তকরণ সম্ভব | ৭০-৮০% | কোনো ঝুঁকি নেই |
| প্রত্যাহার পদ্ধতি | বীর্যস্খলনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পুরুষ লিঙ্গ যোনি থেকে প্রত্যাহার করেন | যদি সঠিক সময়ে প্রত্যাহার করা যায়, তাহলে শুক্রাণু প্রবেশ করতে পারে না | ৭০-৮০% | কোনো ঝুঁকি নেই |
| টিউবাল লিগেশন (পুরুষদের জন্য ভ্যাসেক্টমি) | ডিম্বনালী কেটে ও বাঁধা হয় | ডিম্বনালীতে ডিম্বাণু থাকে না | প্রায় ৯৯% | প্রায় ৭৫% ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় |
| হরমোন যুক্ত অন্তঃগর্ভযন্ত্র (IUD) | চিকিৎসক দ্বারা প্রবিষ্ট নমনীয় প্লাস্টিকের কুণ্ডলী | স্বল্প পরিমাণ ইস্ট্রোজেন নিঃসরণ করে, যা ডিম্বাণু গঠনে বাধা দেয় বা নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করে | প্রায় ৯৯% | সংক্রমণ, জরায়ু ছিদ্র হওয়ার ঝুঁকি |
| মৌখিক গর্ভনিরোধক | দৈনিক গ্রহণযোগ্য হরমোন জাতীয় ওষুধ | FSH ও LH নিঃসরণ বন্ধ করে, বা নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করে | ৯০% এর বেশি | রক্ত জমাট বাঁধা, বিশেষ করে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে |
| গর্ভনিরোধক ইমপ্ল্যান্ট | ত্বকের নিচে প্রোজেস্টেরন টিউব স্থাপন | FSH ও LH নিঃসরণ বন্ধ করে, বা নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করে | ৯০% এর বেশি | জানা কোনো ঝুঁকি নেই |
| গর্ভনিরোধক ইনজেকশন | হরমোন ইনজেকশন | FSH ও LH নিঃসরণ বন্ধ করে, বা নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করে | প্রায় ৯৯% | হাড় ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) সম্ভাবনা |
| ডায়াফ্রাম | যৌন সম্পর্কের আগে যোনিতে প্রবেশ করানো ল্যাটেক্স কাপ | জরায়ুতে শুক্রাণুর প্রবেশ রোধ করে | স্পার্মিসাইড সহ প্রায় ৯০% | ল্যাটেক্স বা স্পার্মিসাইডে অ্যালার্জি |
| সার্ভিক্যাল ক্যাপ | জরায়ুমুখে শোষণক্ষম ল্যাটেক্স কাপ | স্পার্মিসাইড সরবরাহ করে | প্রায় ৮৫% | মূত্রনালির সংক্রমণ, অ্যালার্জি |
| নারী কনডম | যোনিতে ব্যবহৃত পলিউরেথিন আস্তরণ | জরায়ুতে শুক্রাণুর প্রবেশ ও যৌনরোগ প্রতিরোধ | প্রায় ৮৫% | জানা ঝুঁকি নেই |
| পুরুষ কনডম | ল্যাটেক্স বা পশুমেমব্রেনের তৈরি মোটা আস্তরণ, লিঙ্গে ব্যবহৃত | যোনিতে শুক্রাণু প্রবেশ ও যৌনরোগ প্রতিরোধ করে | ৯০% | কোনো ঝুঁকি নেই |
| জেলি, ক্রিম, ফোম | যৌন সম্পর্কের আগে প্রয়োগযোগ্য স্পার্মিসাইড | শুক্রাণু ধ্বংস করে | প্রায় ৭৫% | মূত্রনালির সংক্রমণ, অ্যালার্জি |
| প্রাকৃতিক পরিবার পরিকল্পনা | ডিম্বস্ফোটনের সময় নির্ণয় ও রেকর্ড রাখা | ডিম্বস্ফোটনের সময় যৌন সম্পর্ক এড়ানো | প্রায় ৭০% | জানা ঝুঁকি নেই |
| ডুচ | যৌন সম্পর্কের পর যোনি ধোয়া | শুক্রাণু ধুয়ে ফেলা | ৭০% এর কম | জানা ঝুঁকি নেই |
| প্ল্যান বি পিল | যৌন সম্পর্কের পর গ্রহণযোগ্য পিল | ডিম্বাণু নিঃসরণ বা নিষিক্তকরণ রোধ করে, বা নিষিক্ত ডিম্বাণুর স্থাপন প্রতিরোধ করে | প্রায় ৮৯% | মৌখিক গর্ভনিরোধকের মতো ঝুঁকি |
যৌন সংক্রমিত রোগ
[সম্পাদনা]যৌন সংক্রমিত রোগ (এসটিডি) হলো এমন রোগ বা সংক্রমণ যা মূলত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়: যেমন- যোনি পথে যৌনসঙ্গম, মৌখিক যৌনসঙ্গম বা পায়ুপথে যৌনসঙ্গম।
অনেক যৌন সংক্রমিত রোগ পুরুষাঙ্গ, যোনি ও (কম পরিমাণে) মুখের মিউকাস ঝিল্লির মাধ্যমে সহজে ছড়ায়। পুরুষাঙ্গের মাথার উপর যে দৃশ্যমান ঝিল্লিটি থাকে তা একটি মিউকাস ঝিল্লি, যদিও খৎনা করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত শুষ্ক থাকে এবং কোনো মিউকাস উৎপন্ন করে না (মুখের ঠোঁটের মতো)। মিউকাস ঝিল্লি সাধারণ ত্বকের থেকে আলাদা কারণ এগুলো নির্দিষ্ট কিছু রোগজীবাণু (ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া) শরীরে ঢুকতে সহজ করে তোলে।
যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাবনা অযৌন যোগাযোগ—যেমন স্পর্শ, একসাথে খাওয়া, হাত মেলানো—এর তুলনায় অনেক বেশি। যদিও মুখ এবং যৌনাঙ্গ উভয় স্থানেই মিউকাস ঝিল্লি থাকে, অনেক যৌনবাহিত রোগ মৌখিক যৌনসঙ্গমের মাধ্যমে গভীর চুম্বনের চেয়ে সহজে ছড়ায়। অনেক সংক্রমণ মুখ থেকে যৌনাঙ্গে বা যৌনাঙ্গ থেকে মুখে সহজে ছড়ালেও, এক মুখ থেকে আরেক মুখে ছড়ানো অনেক কঠিন। এইচআইভি-এর ক্ষেত্রে, যৌন তরলে লালা অপেক্ষা অনেক বেশি পরিমাণে রোগজীবাণু থাকে। কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণ সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শেও ছড়াতে পারে। হার্পিস সিমপ্লেক্স এবং এইচপিভি (HPV) এর উদাহরণ। কোনো এসটিডি-এর ক্ষেত্রে, সংক্রমিত ব্যক্তি লক্ষণবিহীন হলেও তিনি রোগ ছড়াতে পারেন বা নাও পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ হার্পিস থাকলে ফুসকুড়ি থাকাকালীন অন্যকে সংক্রমিত করার সম্ভাবনা বেশি। তবে, একজন ব্যক্তি যেকোনো সময় এইচআইভি ছড়াতে পারেন, এমনকি তার শরীরে এইডসের কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও।
যেসব যৌন আচরণে অন্য ব্যক্তির শরীরের তরলের সংস্পর্শ ঘটে, সেগুলো সবই যৌনবাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বহন করে। অধিকাংশ মনোযোগ এইচআইভি (এইডস্ সৃষ্টি করে)-এর প্রতিরোধে কেন্দ্রীভূত হলেও, প্রতিটি যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভিন্ন।
যৌনবাহিত রোগের নাম থেকেই বোঝা যায়, এগুলো নির্দিষ্ট যৌন কার্যকলাপের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়, কিন্তু এই কার্যকলাপ সরাসরি রোগের কারণ নয়। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া বা ভাইরাস এসব সংক্রমণের প্রকৃত কারণ। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলেও যদি তিনি সংক্রমিত না হন, তবে রোগ ছড়াবে না; আবার যার শরীরে সংক্রমণ রয়েছে, তিনিই অন্যকে সংক্রমিত করেছেন—যৌন বা অন্যান্য উপায়ে।
যৌন কার্যকলাপের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা নানা রকম হলেও, সাধারণভাবে প্রতিটি যৌন আচরণকে যৌনবাহিত রোগের পারস্পরিক সংক্রমণের পথ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত (অর্থাৎ, "দেওয়া" বা "গ্রহণ করা"—উভয়ই ঝুঁকিপূর্ণ)।
যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ
[সম্পাদনা]স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা পরামর্শ দেন যে, কনডমের মতো নিরাপদ যৌনাচরণ যৌন কার্যকলাপ চলাকালীন যৌনবাহিত রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাসে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, তবে এটি কোনোভাবেই সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে না। শরীরের তরলের সংক্রমণ এবং এক্সপোজার—যেমন রক্ত সঞ্চালন, ইনজেকশন সুঁই ভাগ করে নেওয়া, চিকিৎসাকালে সুচ বিদ্ধ হওয়া, উল্কি দেওয়ার সুঁই ভাগাভাগি করা, ও সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া—সবই রোগ সংক্রমণের পথ। এই উপায়গুলো কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে—যেমন চিকিৎসক, হিমোফিলিয়া রোগী ও মাদকাসক্তদের—বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি)
[সম্পাদনা]এই ভাইরাসের ১০০টিরও বেশি ধরন রয়েছে, যা প্রায়শই কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রতি ৪ জন আমেরিকানের মধ্যে ৩ জনেরই কোনো এক সময় এই ভাইরাসে সংক্রমণ ঘটে। এটি একজন সঙ্গীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে নিষ্ক্রিয়ভাবে অবস্থান করতে পারে এবং পরে অন্য সঙ্গীর মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। কিছু ধরন জরায়ুর ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।
যৌনাঙ্গে এইচপিভি সংক্রমণ হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট একটি যৌনবাহিত রোগ। হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস একটি ভাইরাস গোষ্ঠীর নাম, যাতে ১০০টিরও বেশি বিভিন্ন স্ট্রেইন রয়েছে। এদের মধ্যে ৩০টির বেশি যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায় এবং পুরুষ ও নারীর যৌনাঙ্গ সংক্রমিত করতে পারে। প্রায় ২ কোটি মানুষ বর্তমানে এই ভাইরাসে সংক্রমিত এবং অন্তত ৫০% যৌনসক্রিয় পুরুষ ও নারীরা জীবনের কোনো না কোনো সময় এইচপিভি সংক্রমণ লাভ করবেন। ৫০ বছর বয়সের মধ্যে অন্তত ৮০% নারী এই ভাইরাসে সংক্রমিত হবেন এবং প্রতিবছর প্রায় ৬.২ মিলিয়ন আমেরিকান নতুন করে সংক্রমিত হন। অধিকাংশ সংক্রমিত ব্যক্তি জানেন না যে তারা ভাইরাস বহন করছেন। এই ভাইরাস সাধারণত ত্বক বা মিউকাস ঝিল্লিতে অবস্থান করে এবং কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। কিছু মানুষের মধ্যে দৃশ্যমান যৌনাঙ্গের আঁচিল দেখা যায় বা জরায়ু, যোনি, পায়ুপথ বা পুরুষাঙ্গে প্রাক-ক্যান্সার ধরনের পরিবর্তন ঘটে। খুব কম ক্ষেত্রেই এই ভাইরাস পায়ুপথ বা যৌনাঙ্গের ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
যৌনাঙ্গে আঁচিল সাধারণত নরম, স্যাঁতসেঁতে, গোলাপি বা মাংসল রঙের ফোলাভাব হিসেবে দেখা যায়। এগুলো উঁচু, চ্যাপ্টা, একক বা একাধিক, ছোট বা বড় এবং কখনো কখনো ফুলকপি-আকৃতির হতে পারে। আঁচিল অনেক সময় সপ্তাহ বা মাস পরেও দেখা যায় না, এমনকি কখনো দেখা না-ও যেতে পারে, এবং এগুলো চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় হলো দৃশ্যমান পরিদর্শন।
অধিকাংশ নারী এইচপিভি সংক্রমণের বিষয়টি জানতে পারেন প্যাপ টেস্টে অস্বাভাবিক ফল পাওয়ার মাধ্যমে। পুরুষদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই। এই ভাইরাসের কোনো নিরাময় নেই। এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে এড়ানোর সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় হলো, অন্য কারও সঙ্গে কোনো প্রকার যৌনাঙ্গ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। যারা যৌনভাবে সক্রিয় থাকতে চান, তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল হলো, একজন অসংক্রমিত সঙ্গীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী একগামী সম্পর্ক রাখা। পরবর্তী সেরা পন্থা হলো কনডম ব্যবহার, তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়।
এইচপিভি ও জরায়ু ক্যান্সারের মধ্যে সম্পর্ক কী? সব ধরনের এইচপিভি প্যাপ টেস্টে হালকা অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে, যা সাধারণত গুরুতর নয়। সনাক্তকৃত ৩০ ধরনের মধ্যে প্রায় ১০টি ধরনের ভাইরাস জরায়ুর ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রে ৯০% জরায়ুর এইচপিভি সংক্রমণ দুই বছরের মধ্যে আর শনাক্তযোগ্য থাকে না। যদিও অল্প সংখ্যক নারীর মধ্যে এই সংক্রমণ স্থায়ী হয়, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভি ধরনগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণই জরায়ু ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
একটি প্যাপ টেস্ট জরায়ুর প্রাক-ক্যান্সার এবং ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করতে পারে। নিয়মিত প্যাপ টেস্ট এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা ও নিবিড় ফলোআপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় যে, এইচপিভি সংক্রমণের ফলে জরায়ুতে যে কোষগত পরিবর্তন ঘটে, তা যেন প্রাণঘাতী ক্যান্সারে পরিণত না হয়। যুক্তরাষ্ট্রে জরায়ু ক্যান্সার নিরীক্ষণের জন্য ব্যবহৃত প্যাপ টেস্ট মৃত্যুহার হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
নারী প্রজননতন্ত্রের রোগ ও ব্যাধি
[সম্পাদনা]নারীরা সাধারণভাবে প্রজননতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের রোগ ও ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। নিচে কিছু সাধারণ সমস্যার তালিকা দেওয়া হলো:
- ভালভোভ্যাজাইনাইটিস (উচ্চারণ: ভাল-ভো-ভা-জু-না-ই-টিস) হল ভালভা ও যোনির প্রদাহ। এটি কাপড় ধোয়ার সাবান, বুদবুদযুক্ত গোসল বা পিছন দিক থেকে সামনে মুছার মতো বিরক্তিকর উপাদান দ্বারা বা অপরিচ্ছন্নতার কারণে হতে পারে। লক্ষণগুলির মধ্যে এই স্থানে লালচে ভাব ও চুলকানি এবং কখনো যোনি থেকে স্রাব অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটি ক্যান্ডিডা নামক ছত্রাকের অতিবৃদ্ধির কারণেও হতে পারে, যা সাধারণত যোনিতে উপস্থিত থাকে।
- অ-মাসিক যোনি রক্তপাত সাধারণত যোনির মধ্যে কোনো বহিরাগত বস্তুর উপস্থিতির কারণে ঘটে। এটি ইউরেথ্রাল প্রোল্যাপ্সের কারণেও হতে পারে, যেখানে ইউরেথ্রার শ্লেষ্মা ঝিল্লি যোনির ভিতর প্রবেশ করে এবং ছোট, ডোনাট আকৃতির একটি টিস্যু গঠন করে যা সহজেই রক্তক্ষরণ করে। এটি পা ফাঁক করার আঘাত বা যৌন নির্যাতনজনিত যোনি আঘাত থেকেও হতে পারে।
- এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি তখন ঘটে যখন নিষিক্ত ডিম্বাণু বা জাইগোট জরায়ুতে না গিয়ে দ্রুত ফ্যালোপিয়ান টিউবে বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থায় নারীদের তীব্র পেট ব্যথা হতে পারে এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
- ডিম্বাশয়ের টিউমার, যদিও বিরল, তবুও হতে পারে। এই অবস্থায় নারীদের পেটে ব্যথা এবং পেটের মধ্যে টিউমারের অস্তিত্ব অনুভব করা যেতে পারে। টিউমার অপসারণে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
- ডিম্বাশয়ের সিস্ট হল অ-ক্যানসারযুক্ত থলি যেগুলো তরল বা আধা-ঠাসা পদার্থে পূর্ণ থাকে। সাধারণত এগুলো ক্ষতিকর নয়, তবে বড় হয়ে গেলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বড় সিস্ট আশেপাশের অঙ্গগুলোতে চাপ সৃষ্টি করে পেটে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিস্ট নিজে নিজে সেরে যায় এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে যদি সিস্ট ব্যথাযুক্ত হয় এবং ঘন ঘন দেখা দেয়, তবে ডাক্তার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দিতে পারেন। প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারেও তা অপসারণ করা যায়।
- পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) হল একটি হরমোনজনিত সমস্যা যেখানে ডিম্বাশয় খুব বেশি হরমোন তৈরি করে। এর ফলে ডিম্বাশয় বড় হয়ে যায় এবং অনেক তরলভর্তি সিস্ট তৈরি হয়। সাধারণত এটি কিশোর বয়সে প্রথম প্রকাশ পায়। চিকিৎসায় হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে ও মাসিক স্বাভাবিক রাখতে ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- ট্রাইকোমোনাস ভ্যাজিনালিস একটি প্রদাহজনিত যোনি সংক্রমণ, যা সাধারণত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (ভ্যাজিনোসিস) নামে পরিচিত।
- ডিসমেনোরিয়া হল বেদনাদায়ক মাসিক।
- মেনোরেজিয়া তখন হয় যখন নারীর অতিরিক্ত রক্তপাতসহ ভারী মাসিক হয়।
- অলিগোমেনোরিয়া হল এমন একটি অবস্থা যেখানে নারীর অনিয়মিত বা অনুপস্থিত মাসিক হয়, যদিও সে কিছুদিন ধরে মাসিক পাচ্ছিল এবং গর্ভবতী নয়।
- অ্যামেনোরিয়া তখন হয় যখন কোনো মেয়ের বয়স ১৬ বছর হয়ে গেছে তবুও মাসিক শুরু হয়নি বা মাসিক শুরু হওয়ার ৩ বছর পরও শুরু হয়নি, অথবা যখন ১৪ বছর বয়সেও যৌবনের চিহ্ন দেখা যায়নি কিংবা আগে নিয়মিত মাসিক হচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে, গর্ভাবস্থা ছাড়া অন্য কোনো কারণে।
- টক্সিক শক সিনড্রোম হল একটি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণজনিত বিষক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট অবস্থা, যা সাধারণত ট্যাম্পন দীর্ঘ সময় রেখে দিলে হয়। এটি উচ্চ জ্বর, ডায়রিয়া, বমি ও শকে পরিণত হতে পারে।
- ক্যান্ডিডিয়াসিস ছত্রাকজনিত সংক্রমণের লক্ষণগুলির মধ্যে চুলকানি, জ্বালাভাব ও স্রাব অন্তর্ভুক্ত। এই ছত্রাক সব মানুষের শরীরে থাকে, কিন্তু সাধারণত অন্যান্য প্রাকৃতিক অণুজীবের মাধ্যমে এদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত থাকে।
প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় ক্যান্ডিডিয়াসিসে আক্রান্ত হন। Candida albicans ছত্রাক প্রায় সব নারীর যোনিতে থাকে এবং সাধারণত কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে যখন এই ছত্রাকের ভারসাম্য ল্যাক্টোব্যাসিলি জাতীয় "স্বাভাবিক ফ্লোরা"র সঙ্গে বিঘ্নিত হয় (যেমন ডুচ ব্যবহারেও হতে পারে), তখন অতিবৃদ্ধির ফলে লক্ষণ দেখা দেয়। গর্ভাবস্থা, মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, মলদ্বার সঙ্গমের পর অপরিষ্কারভাবে যোনি সঙ্গম, গ্লিসারিনযুক্ত লুব্রিকেন্ট ইত্যাদি কারণ হিসেবে যুক্ত। ডায়াবেটিস ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঙ্গেও এটি জড়িত। ক্যান্ডিডিয়াসিস যৌন সঙ্গমের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। কিছু প্রাণীতে খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও এটি সম্পর্কযুক্ত। হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ও বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসাও কারণ হতে পারে।
নারী প্রজননতন্ত্রের ক্যানসারসমূহের মধ্যে রয়েছে:
- জরায়ুর মুখের ক্যানসার (Cervical cancer)
- ডিম্বাশয়ের ক্যানসার (Ovarian cancer)
- জরায়ুর ক্যানসার (Uterine cancer)
- স্তন ক্যানসার (Breast cancer)
এন্ডোমেট্রিওসিস
এন্ডোমেট্রিওসিস হল সবচেয়ে সাধারণ স্ত্রীরোগ, যা শুধুমাত্র উত্তর আমেরিকায় ৫.৫ মিলিয়নেরও বেশি নারীর উপর প্রভাব ফেলে! প্রধান দুইটি উপসর্গ হল ব্যথা ও বন্ধ্যাত্ব।
এই রোগে, সাধারণত জরায়ুর ভেতরে যে বিশেষ ধরণের টিস্যু থাকে (এন্ডোমেট্রিয়াম), তা জরায়ুর বাইরের অংশে প্রতিস্থাপিত হয়, সাধারণত ফ্যালোপিয়ান টিউব, ডিম্বাশয় বা পেলভিসের ঝিল্লিতে। মাসিক চক্র চলাকালীন, হরমোনের সংকেতে জরায়ুর আস্তরণ গর্ভধারণের জন্য পুরু হয়। গর্ভধারণ না হলে হরমোনের মাত্রা কমে গিয়ে পুরু আস্তরণটি ঝরে পড়ে।
কিন্তু যখন এই টিস্যু অন্য স্থানে থাকে তখনও তা একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়: এটি পুরু হয়, ভাঙে এবং রক্তপাত করে। কিন্তু এই রক্ত শরীর থেকে বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় তা আটকে থাকে এবং আশেপাশের টিস্যুতে জ্বালাভাব সৃষ্টি করে। আটকে থাকা রক্ত সিস্ট তৈরি করতে পারে। সিস্টগুলো দাগ ও আঠালো টিস্যু (adhesions) তৈরি করতে পারে। সাধারণত পেলভিস অঞ্চলে এই ব্যথা হয়। এই রোগ বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করতে পারে কারণ ডিম্বাশয় বা ফ্যালোপিয়ান টিউবে দাগ ও আঠালো টিস্যু গর্ভধারণে বাধা দেয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস হালকা, মাঝারি অথবা মারাত্মক হতে পারে এবং চিকিৎসা না করলে সময়ের সাথে সাথে খারাপ হতে পারে। সাধারণ উপসর্গগুলো হল:
- ব্যথাযুক্ত মাসিক – পেলভিক ব্যথা, তীব্র ব্যথা, পিঠ ও পেটে ব্যথা।
- অন্য সময়ে ব্যথা – ডিম্বস্খলনের সময় ব্যথা, যৌনমিলনের সময় গভীর ব্যথা, প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় ব্যথা।
- অতিরিক্ত রক্তপাত – ভারী মাসিক বা দুই মাসিকের মাঝে রক্তপাত।
- বন্ধ্যাত্ব – প্রায় ৩০-৪০% নারীর ক্ষেত্রে
এন্ডোমেট্রিওসিসের সঠিক কারণ এখনো অজানা। গবেষকরা হরমোন ও ইমিউন সিস্টেমের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করছেন। একটি তত্ত্ব মতে, মাসিকের রক্তে থাকা এন্ডোমেট্রিয়াল কোষ ফ্যালোপিয়ান টিউব দিয়ে পিছন দিকে প্রবাহিত হয়ে গিয়ে অন্যত্র গিয়ে গজিয়ে ওঠে। আরেকটি মতে, রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে এই কোষ শরীরের অন্য স্থানে চলে যায়। আবার কিছু গবেষক মনে করেন, কিছু নারীর উদরে থাকা কিছু কোষ এন্ডোমেট্রিয়াল কোষে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখে, যা ভ্রূণ অবস্থায় প্রজনন অঙ্গ তৈরি করেছিল। জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণেও এটি হতে পারে।
প্রায় প্রতি ১০ জন মার্কিন সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীর মধ্যে ১ জনের এন্ডোমেট্রিওসিস রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আগের কোনো কোষীয় ক্ষতি থেকেও এই রোগ হতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিস নির্ণয়ের পদ্ধতিগুলো:
- পেলভিক পরীক্ষা
- আল্ট্রাসাউন্ড
- ল্যাপারোস্কোপি – সবচেয়ে নির্ভুল
- রক্ত পরীক্ষা
চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো:
- ব্যথানাশক ওষুধ
- হরমোন থেরাপি
- মৌখিক গর্ভনিরোধক
- গোনাডোট্রপিন-রিলিজিং হরমোন (Gn-Rh) অ্যাগনিস্ট ও অ্যান্টাগনিস্ট
- ড্যানাজোল (Danocrine)
- মেড্রক্সিপ্রোজেস্টেরন (Depo-Provera)
- কনজারভেটিভ সার্জারি – যেখানে শুধুমাত্র এন্ডোমেট্রিয়াল বৃদ্ধিগুলো সরানো হয়।
- হিস্টেরেকটমি – জরায়ু অপসারণ।
আপনার বোঝাপড়া যাচাই করুন
[সম্পাদনা]- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে এখানে
১. সদৃশতার (homology) ক্ষেত্রে, নারীদের মধ্যে ___________ পুরুষদের লিঙ্গের সমতুল্য
- ক) বড় ল্যাবিয়া (ল্যাবিয়া মজোরা)
- খ) ক্লিটোরাল হুড
- গ) ক্লিটোরিস
- ঘ) ছোট ল্যাবিয়া (ল্যাবিয়া মিনোরা)
- ঙ) উপরোক্ত কোনোটিই নয়
২. এটি মানবদেহের সবচেয়ে শক্তিশালী পেশিগুলোর কিছু ধারণ করে
- ক) গর্ভাশয়
- খ) ক্লিটোরিস
- গ) সার্ভিক্স (গর্ভমুখ)
- ঘ) বড় ল্যাবিয়া
৩. এটি যোনি এবং মূত্রনালির মুখ রক্ষা করে
- ক) বড় ল্যাবিয়া
- খ) ছোট ল্যাবিয়া
- গ) ক্লিটোরিস
- ঘ) মূত্রনালি
৪. স্যালি লক্ষ্য করেছে যে তার সার্ভিক্যাল মিউকাস এখন ডিমের সাদার মতো দেখাচ্ছে—এটি থেকে স্যালি ধারণা করতে পারে
- ক) তার মাসিক শিগগিরই শুরু হবে
- খ) কিছুই না, এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা
- গ) তার ইয়িস্ট ইনফেকশন হয়েছে
- ঘ) সে এখন ডিম্বস্ফোটনের মধ্যে আছে
৫. ডেবি সম্প্রতি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছিল এবং তার পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (PCOD) হয়েছে বলে নির্ণয় করা হয়েছে, এর অর্থ
- ক) কিছু না, এটি নারীদের মধ্যে স্বাভাবিক
- খ) শুক্রাণুবিরোধী অ্যান্টিবডি রয়েছে
- গ) এলএইচ (LH) হরমোন অতিরিক্ত উৎপাদিত হচ্ছে
- ঘ) তার স্তনগ্রন্থি থেকে দুধ চুঁইয়ে পড়ছে
- ঙ) গর্ভধারণে সমস্যা হচ্ছে
৬. অ্যাঞ্জি সম্প্রতি তার পায়ে ব্যথা অনুভব করছে—এর কারণ হতে পারে
- ক) ডিম্বস্ফোটনজনিত ব্যথা
- খ) আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া মাসিক
- গ) প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম
- ঘ) জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া
৭. সু সম্প্রতি তার মাসিক শুরু করেছে এবং লক্ষ্য করেছে যে তা খুব ভারী, ব্যথাযুক্ত এবং অনিয়মিত। এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে
- ক) এন্ডোমেট্রিওসিস
- খ) ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার
- গ) ক্যান্ডিডিয়াসিস
- ঘ) টক্সিক শক সিনড্রোম
- ঙ) অ্যামেনোরিয়া
৮. ম্যারি বিয়ে করতে যাচ্ছে এবং এখনই মা হতে চায় না—উচ্চ কার্যকারিতার কারণে সে এই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেছে নিয়েছে
- ক) প্রাকৃতিক পরিবার পরিকল্পনা
- খ) ডায়াফ্রাম
- গ) গর্ভনিরোধক ইনজেকশন
- ঘ) স্পার্মিসাইড ফোম
৯. নারীদের মধ্যে LH নিঃসরণ ঘটায়
- ক) মাসিক
- খ) ডিম্বস্ফোটন
- গ) এন্ডোমেট্রিয়াল স্তর পুরু হওয়া
- ঘ) এন্ডোমেট্রিয়াল স্তর পাতলা হওয়া
- ঙ) কিছু না, LH শুধুমাত্র পুরুষদের প্রজনন প্রক্রিয়ায় কাজ করে
১০. যখন ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তখন ঘটে
- ক) ডিম্বস্ফোটন
- খ) নিষেক
- গ) প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম
- ঘ) মেনোপজ
১১. বন্ধ্যত্ব কত শতাংশ দম্পতিকে প্রভাবিত করে?
- ক) ৫%
- খ) ১০%
- গ) ১৫%
- ঘ) ২০%
১২. একমাত্র ১০০% কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কী?
- ক) টিউবাল লিগেশন
- খ) আইইউডি
- গ) প্রাকৃতিক পরিবার পরিকল্পনা
- ঘ) অবস্থান (যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা)
শব্দকোষ
[সম্পাদনা]আডহিশন (Adhesions): অস্বাভাবিক টিস্যু যা অঙ্গগুলোকে একসাথে যুক্ত করে
অ্যাভিওলি (Alveoli): স্তনগ্রন্থির মৌলিক উপাদান; দুধ নিঃসরণকারী এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা আবৃত
জন্মনিয়ন্ত্রণ (Birth Control): এক বা একাধিক পদক্ষেপ, যন্ত্র বা ওষুধ যা গর্ভধারণ প্রতিরোধ বা সম্ভাবনা হ্রাসের উদ্দেশ্যে অনুসরণ করা হয়
সার্ভিক্যাল মিউকাস: জরায়ুমুখ থেকে নিঃসৃত মিউকাস, যা ডিম্বস্ফোটনের সময় যোনির অম্লতা হ্রাসে সাহায্য করে
সার্ভিক্স: জরায়ুর নিচের সরু অংশ যা যোনির সঙ্গে যুক্ত থাকে
ক্লিটোরিস: একটি ছোট স্পঞ্জের মতো টিস্যু যা শুধুমাত্র যৌন আনন্দের জন্য থাকে
ক্রোমোজোম: নিউক্লিয়াসে থাকা গঠন যা জিন ধারণ করে
এক্টোসার্ভিক্স: যোনির মধ্যে বের হওয়া জরায়ুমুখের অংশ
এন্ডোসার্ভিক্যাল ক্যানাল: বাইরের ওস এবং জরায়ুমুখ গহ্বরের মধ্যকার পথ
এন্ডোমেট্রিয়াম: জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আবরণ
ফ্যালোপিয়ান টিউব: যোনির উপর প্রান্তে অবস্থিত, ডিম্বাণু বহনের জন্য পথ
ফ্যাক্টর V লাইডেন: মানব ফ্যাক্টর V-এর একটি রূপ যা হাইপারকোয়াগুলেশনজনিত ব্যাধি সৃষ্টি করে। এটি সক্রিয় প্রোটিন সি দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয় না। এটি ইউরেশীয়দের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ বংশগত হাইপারকোয়াগুলেশন ব্যাধি। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন শহরে প্রথম চিহ্নিত হওয়ায় এটি এই নাম পেয়েছে (১৯৯৪ সালে প্রফেসর আর. বার্টিনা প্রমুখ কর্তৃক)।
গ্যামেট: একটি হ্যাপলয়েড যৌন কোষ; ডিম্বাণু বা শুক্রাণু
জিন: ডিএনএর সেই অংশ যা নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ধারণ করে
গনাড: প্রজনন অঙ্গ, যেমন: ডিম্বাশয় বা অণ্ডকোষ যা গ্যামেট এবং যৌন হরমোন উৎপন্ন করে
হরমোন: অন্তঃক্ষর গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ যা রক্তপ্রবাহে মিশে নির্দিষ্ট কোষে কাজ করে
হাইমেন: যোনি এবং মূত্রথলির মধ্যবর্তী পাতলা মিউকাস ঝিল্লি
বন্ধ্যত্ব: স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে না পারা বা পূর্ণমেয়াদে গর্ভধারণ ধরে রাখতে অক্ষমতা
বড় ল্যাবিয়া (ল্যাবিয়া মজোরা): বাহ্যিক যৌনাঙ্গের বাইরের "ঠোঁট", শিথিল সংযোগকারী টিস্যু, চর্বি এবং কিছু মসৃণ পেশি দ্বারা গঠিত
ছোট ল্যাবিয়া (ল্যাবিয়া মিনোরা): অভ্যন্তরীণ ঠোঁট, যোনি, মূত্রনালি এবং ক্লিটোরিসকে রক্ষা করে
স্তনগ্রন্থি (Mammary Glands): দুধ উৎপাদনকারী অঙ্গ যা শিশুদের পুষ্টি দেয়
মিওসিস: এক ধরনের বিশেষ কোষ বিভাজন যার মাধ্যমে গ্যামেট (যৌন কোষ) তৈরি হয়
মেনার্ক: প্রথম মাসিক রক্তস্রাব; সাধারণত ৯ থেকে ১৭ বছর বয়সে ঘটে
মেনোপজ: নারীদের মাসিক চক্রের স্থায়ী বন্ধ হওয়ার সময়কাল
মাসিক চক্র: নারীদের প্রজনন চক্র, যা জরায়ু আবরণের শারীরিক পরিবর্তন দ্বারা চিহ্নিত
মাসিক (Menstruation): মাসিক চক্রের শেষে জরায়ু থেকে রক্ত ও টিস্যু নিঃসরণ
মিটেলশমার্জ: ডিম্বস্ফোটনের সময় নিচের পেটের ব্যথা; জার্মান শব্দ যার অর্থ ডিম্বস্ফোটনজনিত ব্যথা
মন্স ভেনেরিস: ভুলভার সম্মুখে কোমল উঁচু অংশ (জঘ স্থান ঢেকে রাখা চর্বিযুক্ত টিস্যু)
ডিম্বাশয়ের চক্র (Ovarian Cycle): প্রজনন চক্রের শেষ পর্যায়; নিষেক না হলে জরায়ুর আস্তরণ ভেঙে যায় এবং মাসিক ঘটে
ডিম্বস্ফোটন (Ovulation): ডিম্বাশয়ের ফোলিকল ফেটে ডিম্বাণু নিঃসরণ
পেরিনিয়াম: পুরুষের অণ্ডকোষ ও মলদ্বারের মধ্যবর্তী বা নারীদের ভুলভা ও মলদ্বারের মধ্যবর্তী বাহ্যিক অঞ্চল
প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (PMS): মাসিকের আগের সময়; শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়: ব্রণ, ফোলা, ক্লান্তি, পিঠব্যথা, স্তনের ব্যথা, মাথাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, খাওয়ার আগ্রহ, বিষণ্ণতা, রাগ, মনোযোগের অভাব, চাপ সামলাতে অসুবিধা
যৌবন: একটি বিকাশকাল যখন প্রজনন অঙ্গ সক্রিয় হয় এবং গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়
প্রজনন: জীবের নিজ প্রজাতি টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া
যৌনবাহিত রোগ (STDs): এমন রোগ যা যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়
মূত্রনালি: ক্লিটোরিসের নিচে অবস্থিত, প্রস্রাব নিঃসরণের পথ
জরায়ু চক্র (Uterine Cycle): প্রজনন চক্রের প্রথম অংশ; এই সময়ে এন্ডোমেট্রিয়াল আবরণ গড়ে ওঠে এবং ফোলিকল তৈরি হয়
জরায়ু: প্রধান প্রজনন অঙ্গ; নিষিক্ত ডিম্বাণু গৃহীত হয় ও জরায়ুর আস্তরণে সংযুক্ত হয়, যা ভ্রূণের পুষ্টি জোগায়; নারীদের শরীরের শক্তিশালী পেশিগুলোর একটি ধারণ করে এবং গর্ভাবস্থায় প্রসারিত হয়
যোনি: একটি পেশিবহুল, ফাঁপা নল যা যোনিমুখ থেকে সার্ভিক্স পর্যন্ত বিস্তৃত
ভাল্ভা: নারীদের বাহ্যিক যৌনাঙ্গ; এর মধ্যে রয়েছে বড় ল্যাবিয়া, ছোট ল্যাবিয়া, মন্স পিউবিস, ক্লিটোরিস, মিয়েটাস, যোনি অঙ্গভূমি, অঙ্গভূমির বাল্ব ও গ্রন্থি
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- Essentials of Anatomy and Physiology. Fourth Edition. Valerie C. Scanlon and Tina Sanders.
- Human Anatomy. Sixth Edition. Van De Graaff.
- উইকিবই: যৌন স্বাস্থ্য
- http://www.fda.gov/cder/drug/infopage/planBQandAhtm
- http://www.goplanb.com/Forconsumers
- American Social Health Association; ashastd.org
- http://www.cdc.gov
- http://www.mayoclinic.com