বিষয়বস্তুতে চলুন

মঙ্গলকাব্য/শিবমঙ্গল বা শিবায়ন/আখ্যানবস্তু

উইকিবই থেকে

শিবমঙ্গল বা শিবায়ন কাব্যের উপাদানে পৌরাণিক ও লৌকিক সংস্কৃতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। এই কাব্যের আখ্যানটি নিম্নরূপ:

একদিন সমবেত দেবসভায় শিব তাঁর শ্বশুর দক্ষ প্রজাপতিতে সম্মান প্রদর্শন করলেন না। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে দক্ষ এক যজ্ঞের আয়োজন করলেন; সেই যজ্ঞে অন্য সব দেবতাদের নিমন্ত্রণ করলেও তিনি শিবকে আমন্ত্রণ জানালেন না। পিতৃগৃহে যজ্ঞের কথা শুনে সতী বিনা নিমন্ত্রণেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। দক্ষ তাঁর সম্মুখেই শিবের নিন্দা করতে লাগলেন। পতিনিন্দা শুনে সতী দেহত্যাগ করলেন। এ-কথা শুনে শিব যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর অনুচরবর্গ যজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করে দিল। সতী গিরিরাজের ঔরসে মেনকার গর্ভে গৌরী রূপে জন্মগ্রহণ করলেন। আশৈশব তিনি শিবকে পতিরূপে কামনা করতে লাগলেন। গিরিরাজ ভিক্ষুক শিবের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিলেন। প্রাসাদ ত্যাগ করে গৌরী স্বামীর কুটিরে এসে বাস করতে লাগলেন। কিন্তু তাঁদের সংসার চলে না। ভিক্ষুক শিবের পুঁজি শেষ হয়ে আসছিল, অনাহারের ভয়ে গৌরী শিবকে চাষ করার পরামর্শ দিলেন। অলস প্রকৃতির শিব প্রথমে অসম্মত হলেও পরে রাজি হলেন।

ইন্দ্রের থেকে তিনি জমি পাট্টা নিলেন। বিশ্বকর্মাকে দিয়ে নিজের ত্রিশূল গালিয়ে লাঙল, জোয়াল, মই ইত্যাদি চাষের সরঞ্জাম তৈরি করিয়ে নিলেন। তারপর গৌরীকে কুবেরের কাছে পাঠাতে চাইলেন বীজ ধান ধার করার জন্য। গৌরী নিজে যেতে অসম্মত হলে শিব নিজেই গিয়ে কুবেরের কাছ থেকে বীজ ধান ধার করে আনলেন।

মাঘ মাসের শেষ দিকে খুব বৃষ্টি হল। অনুচর ভীমকে নিয়ে শিব জমি চাষ করলেন। যথাসময়ে ধান রোপণ করা হল, প্রচুর ধান হল। নারদের কাছ থেকে ঢেঁকি ধার করে এনে ভীম ধান ভানল। গৌরীর সংসারেও আর অভাব রইল না। কিন্তু শিব মর্ত্যে গিয়ে চাষবাসে এমন মত্ত হয়ে পড়েছেন যে কৈলাসে ফেরার আর নামও করেন না। এদিকে মর্ত্যে আবার তাঁর কতগুলি কুটনী সঙ্গিনীও জুটেছে। গৌরী তাঁকে কৈলাসে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলেন। তিনি উঙানি মশা দিয়ে মর্ত্য ছেয়ে ফেললেন। মশার কামড়ে শিব অস্থির হলেন, তবুও কৈলাসে ফেরার নাম করলেন না। গৌরী তখন ডাঁশ ও মাছি পাঠালেন। সর্বাঙ্গে ঘি মেখে শিব তাদের কামড় থেকে অব্যহতি পেলেন। তারপর জোঁকের উপদ্রব আরম্ভ হল। তবু শিব গৌরীর প্রতি উদাসীন, মেতে রইলেন চাষবাসেই।

অবশেষে গৌরী বাগদিনীর রূপ ধরে শিবের কৃষিক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। শিবের ক্ষেতে তিনি মাছ ধরতে লাগলেন; তাতে ছড়া থেকে ধান ঝরে পড়তে লাগল। তবু বাগদিনীকে কিছু বললেন না শিব; বরং তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ে করতে চাইলেন। বললেন, বিবাহ করলে তিনি খেতের জল সেঁচে বাগদিনীকে মাছ ধরতে সাহায্য করবেন। এমনকি বাগদিনীকে খুশি করতে শিব খেতের জল সেঁচে মাছও ধরতে লাগলেন। বাগদিনী শিবের কাছ থেকে একটি পিতলের আংটি চেয়ে নিলেন। এইবার শিব বাগদিনীর আলিঙ্গন প্রার্থনা করলেন। আলিঙ্গন দেওয়ার ছল করে বাগদিনী শিবকে কৈলাসের পথে নিয়ে যেতে শুরু করলেন; শিবও তাঁর পিছু নিলেন। বাগদিনী গৌরীর রূপ ধরে কৈলাসে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু শিবকে তিনি ঘরে ঢুকতে দিলেন না। বললেন, বাগদিনীর প্রেমপাশে আবদ্ধ হয়ে শিব তাঁকে আংটি উপহার দিয়েছেন। শিব অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন; চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। এমন সময় নারদ সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। গৌরী তাঁর কাছে শিবের ব্যভিচারের কথা জানালেন। ঝগড়া আরও পাকা করে তোলার জন্য নারদ গৌরীকে পরামর্শ দিয়ে বললেন স্বামীর কাছে একজোড়া শাঁখা চাইতে। কারণ, শাঁখা পরলেই স্বামীর চিরদিন তাঁর বশ থাকবে। কিন্তু শিব ভিখারি, তিনি স্ত্রীর শাঁখা কী করে জোগাড় করবেন, ভেবে পেলেন না।

অভিমান করে গৌরী বাপের বাড়ি চলে গেলেন। বাপের বাড়িতে তখন দুর্গোৎসব। নারদ শিবকে পরামর্শ দিলেন, গৌরীকে ফিরিয়ে আনতে তিনি যেন শাঁখারি সেজে হিমালয়ে যান, তারপর নিজে হাতে শাঁখা পরিয়ে তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে আনেন।

অগত্যা শিব তাই করলেন। শাঁখারির বেশ ধরে তিনি হিমালয়ে গেলেন। শাঁখা দেখে গৌরীর আহ্লাদের সীমা রইল না। শাঁখার মূল্য জিজ্ঞাসা করলে শিব বললেন, এর মূল্য আত্মসমর্পণ। গৌরী শিবকে চিনলেন। তিনি দশ হাত বাড়িয়ে দিলেন, শিবও তাঁর হাতে শাঁখা পরিয়ে দিলেন। গৌরীর অভিমান দূর হল। তিনি কৈলাসে ফিরে এলেন।