মঙ্গলকাব্য/মনসামঙ্গল/হরিদত্ত
অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত বরিশাল অঞ্চলের মনসামঙ্গল কাব্যের কবি বিজয় গুপ্ত হরিদত্ত সম্পর্কে যা বলেছেন তা থেকে বোঝা যায়, হরিদত্ত খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের পূর্ববর্তী সময়ের লোক ছিলেন। বিজয় গুপ্ত হরিদত্তকেই মনসামঙ্গলের আদি কবি বলেছেন: "প্রথমে রচিল গীত কানা হরিদত্ত।" বিজয় গুপ্ত তাঁর সময়ে অর্থাৎ খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষভাগেই হরিদত্তের কাব্য লুপ্ত হওয়ার সংবাদও দিয়েছেন: "হরিদত্তের যত গীত লুপ্ত হইল কালে।" এই দুই পংক্তি থেকে দীনেশচন্দ্র সেন অনুমান করেছেন যে, হরিদত্তের গীত বহুকাল প্রচলিত থাকার পর লুপ্ত হয়েছিল এবং সেই হিসেবে তিনি সম্ভবত বিজয় গুপ্তের দুই থেকে তিনশো বছর আগেকার মুসলমান-বিজয়ের অব্যবহিত পূর্ব যুগের কবি ছিলেন। তবে অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের অনুমান, হরিদত্ত সম্ভবত ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগের বা চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকের লোক ছিলেন। তাছাড়া, বিজয় গুপ্তের সময়ও যে হরিদত্তের কাব্য সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়নি, তা বিজয় গুপ্ত রচিত কাব্যের নিম্নোক্ত অংশ থেকেই পরিষ্কার:
হরিদত্তের যত গীত লুপ্ত হইল কালে।
জোড়া গাঁথা নাহি কিছু ভাণ্ডে বোলে চালে।।
কথার সঙ্গতি নাই নাহিক সুস্বর।
এক গাইতে আর গায় নাহি মিত্রাক্ষর।।
গীতে মতি না দেয় কেহ মিছা লাফ ফাল।
দেখিয়া শুনিয়া মোর উপজে বেতাল।।
হরিদত্ত সম্পর্কে বিজয় গুপ্ত সশ্রদ্ধ মন্তব্য না করলেও, পুরুষোত্তম নামে অপর এক কবি সম্ভবত বিজয় গুপ্তের পরবর্তী সময় পর্যন্তও হরিদত্তের গান করেন বলে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন:
কানা হরিদত্ত, হরির কিঙ্কর
মনসা হউক সহায়।
তাঁর অনুবন্ধ, লাচারীর ছন্দ
কবি পুরুষোত্তমে গায়।।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অন্তত বিজয় গুপ্তের সময়ে হরিদত্তের পদ লুপ্ত হয়নি। বিজয় গুপ্ত নিজের কাব্যের প্রচারের জন্য পূর্বসূরির মুখে কালি লেপেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হরিদত্তের অনেক উপাদানই আত্মসাৎ করেছেন তাঁর কাব্যে। এই উদ্ধৃতিগুলিই প্রমাণ করে হরিদত্তের মূল্যায়ন তিনি যথার্থভাবে করেননি।
ভণিতায় ‘দাস’ উপাধিযুক্ত এক হরিদাসের বাংলা কালিকাপুরাণ-এর তিনটি পুথি ময়মনসিংহ জেলা থেকে আবিষ্কৃত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন পুথিশালায় সংগৃহীত হয়েছে। এটি আসলে মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত সপ্তশতী চণ্ডী অংশের বঙ্গানুবাদ। পুথি তিনটির মধ্যে দুটি খণ্ডিত ও একটি পূর্ণাঙ্গ। এই গ্রন্থের আরেকটি পুথি এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারেও সংগৃহীত হয়েছে। প্রাগুক্ত পদটিতে পুরুষোত্তম মনসামঙ্গলের কবি হরিদত্তকে কেন "হরির কিঙ্কর" বলেছেন তা বোঝা যায় না বটে, কিন্তু কালিকাপুরাণ-এর অধিকাংশ ভণিতায় দাস হরিদত্তকে এক পরম বৈষ্ণব রূপেই দেখা যায়। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য এই পুথির কালিকাপুরাণ-এর দশাবতার বন্দনার পদটি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, দাস হরিদত্ত প্রাক্-চৈতন্য যুগের বৈশিষ্ট্যসূচক বিষ্ণুর ঐশ্বর্যরূপই দেখিয়েছেন; কারণ, কৃষ্ণের মাধুর্য রূপ বর্ণনার আদর্শ চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাবের ফলেই বাংলা সাহিত্যে এসেছিল। সেই হিসেবে কালিকাপুরাণ-কে তিনি প্রাক্-চৈতন্য যুগের রচনা বলেছেন। হরিদত্তের একটি পদ নারায়ণদেবের মনসামঙ্গলেও গৃহীত হয়েছিল। এই পদেও কবি নিজেকে ‘দাস’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। ‘দাস’ তাঁর কুলপদবী নয়, বৈষ্ণব ভক্তেরাই নিজেদের দাস বলে উল্লেখ করে থাকেন। নারায়ণদেবের মনসামঙ্গলে উদ্ধৃত হরিদত্তের পদটি মনসা-বিষয়ক নয়, দেবীমাহাত্ম্য-বিষয়ক; সম্ভবত এটি কালিকাপুরাণ-এর বঙ্গানুবাদের অংশ।