বিষয়বস্তুতে চলুন

মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/সংজ্ঞা

উইকিবই থেকে

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “আনুমানিক খ্রীষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী হইতে আরম্ভ করিয়া অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ভারতচন্দ্রের কাল পর্যন্ত বঙ্গসাহিত্যে যে বিশেষ এক শ্রেণীর ধর্মবিষয়ক আখ্যান-কাব্য প্রচলিত ছিল, তাহাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত।” (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য, এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, পৃ. ৮-৯) মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটির উৎস বাংলার লৌকিক সংস্কৃতির মধ্যে; কিন্তু শেষপর্যন্ত তা রাজসভাতেও প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন লৌকিক-পৌরাণিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য-বিষয়ক আখ্যানকাব্য হলেও, এ-জাতীয় কাব্যের প্রেরণা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মতবাদ থেকে উদ্ভূত হয়নি; বরং যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলায় স্থানীয় লৌকিক ও বহিরাগত ধর্মমতগুলির মধ্যে যে অভিনব সমন্বয় ঘটেছিল, তারই সাক্ষ্য বহন করে এই মঙ্গলকাব্যগুলি। সেই কারণেই এই কাব্যগুলিতে বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার-আচরণ, ধর্মীয় সংস্কার, নিজস্ব সংস্কৃতি ও মতবিস্তারের এক বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে শুরু করে খ্রিস্টীয় প্রায় পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত যে উদ্দেশ্যে সংস্কৃত ভাষায় একাধিক মহাপুরাণ ও উপপুরাণ রচিত হয়, মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে মঙ্গলকাব্যের উৎপত্তিও সেই কারণেই। প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তা ও একাধিপত্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের লৌকিক ধর্মবিশ্বাস ও হিন্দুধর্মের মৌলিক আদর্শের সামঞ্জস্য বিধান করে হিন্দুধর্মের এক সংস্কারের সূত্রপাত ঘটেছিল। উপনিষদ্‌-প্রতিপাদ্য পরব্রহ্ম ভাবসর্বস্ব ও ব্যক্তিসত্ত্বাহীন; মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে বৈদিক দেবতাদের উদ্দেশ্যে আয়োজিত ক্রিয়াকাণ্ডও ছিল অনুষ্ঠানবহুল ও ব্যয়সাধ্য। সেই আচার-সর্বস্বতার যুগে গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেছিলেন যে, কেবলমাত্র সদ্ধর্ম অর্থাৎ সদাচারের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভ সম্ভব। প্রাচীন ভারতের রাজন্যবর্গ থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরের মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিল সেই অভিনব তত্ত্বের প্রতি। তারই প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, পুরাণসাহিত্যে আর্য ও অনার্য দেবদেবীদের নির্দিষ্ট মূর্তিরূপ প্রদান করে মানবসমাজে তাঁদের কর্তব্যপালনের কাজে প্রবৃত্ত করানো হচ্ছে।

মধ্যভারতে আনুমানিক খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যভাগ থেকে বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রতিক্রিয়ার সূচনা হয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর প্রথম ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি এই অঞ্চলে পদার্পণ করে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং উত্তরবঙ্গে বৌদ্ধ মহাযান ও হীনযান সম্প্রদায়ের সঙ্গে জৈনধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যধর্মকেও বাংলার প্রভাবশালী ধর্মবিশ্বাস বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল সম্রাটগণ প্রায় চারশো বছর বাংলায় রাজত্ব করেন। তাঁরা নিজধর্মের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও তাঁদের রাজত্বকালের সমাপ্তি অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকের আগে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বাংলায় একক প্রাধান্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তার কারণ, বাংলার পার্শ্ববর্তী বিহার অঞ্চল বৌদ্ধধর্মের একটি প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় মধ্যভারতের ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বাংলায় প্রসার লাভ করতে কিছুটা হলেও বাধার সম্মুখীন হয়েছিল এবং বৌদ্ধধর্মের একটি শাখা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাংলায় প্রচলিত ছিল।

সম্ভবত পাল রাজত্বকালেই বাংলায় মহাযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকটি লোকধর্মের সংমিশ্রণ শুরু হয়। এরই ফলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকটি মিশ্র লোকধর্মের উদ্ভব ঘটে। রাঢ়-সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গে সেন রাজত্বকালের বহু পরেও অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়-ভাষী জাতির প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। সেন রাজত্বেই ব্রাহ্মণ্যধর্ম বাংলার সামাজিক জীবনে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কিন্তু বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এই ব্রাহ্মণ্যধর্মের মধ্যেও বিবর্তন ঘটতে থাকে। এইভাবেই বাংলায় বিভিন্ন ধরনের লোকধর্মের উৎপত্তি ঘটেছিল। এরপর সমাজের উপর ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব যতই প্রবল হতে শুরু করে ততই এই-সব ধর্ম এক কেন্দ্রীয় আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এরই ফলে বাঙালি হিন্দুসমাজে পঞ্চোপাসক সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে।

সেন রাজত্বে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি বাঙালি সমাজে বিস্তার লাভ করলেও ততদিনে লোকধর্ম ও লোকসংস্কৃতির যে উপাদানগুলি সমাজের গভীরে স্থান অর্জন করে ফেলেছিল, সমাজের রক্ষণশীল অংশও সেগুলিকে একেবারে পরিত্যাগ করতে পারল না। ফলে বৌদ্ধধর্মের পরিবর্তে যে নতুন ধর্ম বাঙালি সমাজে গৃহীত হল, তা আসলে পুরোনো ধর্মেরই এক রূপান্তর মাত্র। মধ্যযুগের বাঙালি সমাজে এই নতুন ও পুরোনোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে বিপরীতমুখী দুটি সংস্কারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়াস এবং বাংলার জনসমাজে দেশীয় লোকসংস্কারের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যসংস্কারের মিলন কীভাবে ঘটেছিল, তারই পরিচয় পাওয়া যায় মঙ্গলকাব্যগুলিতে।