মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/শ্রেণিবিভাগ
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে "মঙ্গল" নামে অভিহিত কাব্যগুলি বিষয়গত দিক থেকে তিনটি শ্রেণির অন্তর্গত: (১) বৈষ্ণব কাব্য, (২) পৌরাণিক কাব্য, ও (৩) লৌকিক কাব্য। বৈষ্ণব কাব্যগুলি হল চৈতন্যমঙ্গল, অদ্বৈতমঙ্গল, গোবিন্দমঙ্গল, কৃষ্ণমঙ্গল, রাধিকামঙ্গল, জগৎমঙ্গল, কিশোরীমঙ্গল, স্মরণমঙ্গল, গোকুলমঙ্গল, রসিকমঙ্গল, জগন্নাথমঙ্গল ইত্যাদি। পৌরাণিক কাব্যগুলির হল গৌরীমঙ্গল, ভবানীমঙ্গল, দুর্গামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, কমলামঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, চণ্ডিকামঙ্গল ইত্যাদি। লৌকিক কাব্যগুলি হল শিবায়ন বা শিবমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর, শীতলামঙ্গল, রায়মঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, সারদামঙ্গল, সূর্যমঙ্গল ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে শেষোক্ত শ্রেণির কাব্যগুলিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম রচিত হয়। পরবর্তীকালে এগুলির প্রভাব পৌরাণিক কাব্যগুলিতেও প্রসার লাভ করে এবং তারই ফলে সৃষ্টি হয় পৌরাণিক কাব্যগুলি। এগুলির মধ্যে লৌকিক দেবতাদের মাহাত্ম্যকে কেন্দ্র করে রচিত যে কাব্যগুলিতে বাংলার সমাজজীবন ও সাধারণ নরনারীদের জীবনের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেগুলিই মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত।
বৈষ্ণব সাহিত্যের অন্তর্গত "মঙ্গল" নামধেয় কাব্যগুলি হয় চৈতন্য মহাপ্রভু বা তাঁর কোনো পার্ষদের জীবনী অথবা কৃষ্ণের লীলামাহাত্ম্যের বিবরণ। সমসাময়িক মঙ্গলকাব্যগুলির জনপ্রিয়তার প্রভাবে এগুলির নামে "মঙ্গল" শব্দটি যুক্ত হয়েছিল। বৃন্দাবনদাস তাঁর চৈতন্যভাগবত গ্রন্থটিকে প্রথমে চৈতন্যমঙ্গল আখ্যা দিয়েছিলেন, এমন প্রবাদ আছে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত কাব্যে বৃন্দাবনদাসের গ্রন্থটিকে সর্বদাই চৈতন্যমঙ্গল নামে উল্লেখ করেছেন। বৈষ্ণব কবি লোচনদাস ও জয়ানন্দের চৈতন্যজীবনী কাব্যও চৈতন্যমঙ্গল নামে পরিচিত। এগুলি সবই বৈষ্ণব জীবনীকাব্য ধারার সাহিত্য। এগুলি এবং অন্যান্য বৈষ্ণব কাব্যগুলির মধ্যে কয়েকটি উচ্চ কাব্যগুণসম্পন্ন হলেও বাঙালির জাতীয় চরিত্রের বিকাশ এগুলিতে দেখা যায় না। শাক্ত সম্প্রদায়ের মঙ্গলকাব্যগুলির প্রচার ও জনপ্রিয়তা সে-যুগের সমাজে এতটাই ছিল, শাক্ত-বিদ্বেষী বৈষ্ণব কবিরাও তাঁদের বৈশিষ্ট্যসূচক সাম্প্রদায়িক কাব্যেও অন্তত নামকরণের ক্ষেত্রে সেই শাক্ত-প্রভাব এড়াতে পারেননি। তাই এগুলিকে মঙ্গলকাব্য আলোচনার মধ্যেও ধরা হয় না।
পাশ্চাত্য সমালোচকেরা মহাকাব্যকে আদি মহাকাব্য (primitive epic বা epic of growth) এবং সাহিত্যিক মহাকাব্য (literary epic বা epic of art) এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। আদি মহাকাব্য সর্বতোভাবে একজনেরই রচনা নাও হতে পারে। অনেক সময়েই দেখা যায় এটি লোক-পরম্পরায় প্রচলিত বিষয়বস্তুর ক্রমবিকাশ ও ক্রমপরিণতির ফল; যা দানা বেঁধে উঠেছে সমাজমানসে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত লোকসাহিত্যের বহু উপকরণ অবলম্বন করে। কিন্তু সাহিত্যিক মহাকাব্য ব্যক্তি-প্রতিভার সচেতন শিল্পসৃষ্টি। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যও অনুরূপভাবে বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলিকে খাঁটি অর্থাৎ আদি মঙ্গলকাব্য ও সাহিত্যিক মঙ্গলকাব্য এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, প্রাক্-চৈতন্য যুগের মঙ্গলকাব্যগুলিই আদি মঙ্গলকাব্য; কারণ এগুলিতে কবির ব্যক্তি-মানসের চেয়ে বৃহত্তর সমাজ-মানসের ছবি অধিকতর প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রায় প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যেরই একটি কেন্দ্রীয় কাহিনি এই যুগে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু উপকরণের মাত্রাতিরিক্ত বৈচিত্র্যে এগুলির গতি রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল বলে মনে করা হয়। ব্যক্তি-প্রতিভার বিকাশ এগুলির মধ্যে তখনও ঘটেনি। এরপর খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের কবি দ্বিজ মাধব ও মুকুন্দ চক্রবর্তী জনশ্রুতি বা tradition-এর ধারা সহজভাবে অনুসরণ করে এসেও তার মধ্যে স্বকীয় প্রতিভার সাক্ষর প্রদান করেছিলেন। এঁরা সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিদের মতো কাব্যের বহিরঙ্গে শিল্পরূপ দিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা এগুলির মানসে এক বিশেষ ঔজ্জ্বল্য প্রদান করেছিলেন। তাই এঁদের রচনাকে আদি ও সাহিত্যিক মহাকাব্যের মধ্যবর্তী স্তরের রচনা মনে করেছেন অধ্যাপক ভট্টাচার্য। এরপর সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে কবির ব্যক্তিগত রসচেতনার অনুভূতিও সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। ভারতচন্দ্রের মধ্যে সাহিত্যিক মঙ্গলকাব্যের শিল্প-সচেতনতা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে।