বিষয়বস্তুতে চলুন

মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/যুগবিভাগ

উইকিবই থেকে

খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত সময়কাল বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের যুগটির অন্তর্গত। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য এই যুগটিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন: উদ্ভব যুগ (age of origin), সৃজন যুগ (age of creation) ও ঐশ্বর্যের যুগ (age of glory). উদ্ভবের যুগে হরি দত্ত, মানিক দত্ত, ময়ূর ভট্ট প্রমুখ কবিদের হাতে মঙ্গলকাব্যের জন্ম হয় এবং ঐশ্বর্যের যুগেই অন্নদামঙ্গল কাব্যের কবি ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটে।

মঙ্গলকাব্যের সৃজন যুগে লৌকিক দেবতাদের প্রবেশাধিকার সমাজে অনেকটা সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই নতুন মঙ্গলকাব্য রচনার জন্য কবিদের সংস্কৃত পুরাণসাহিত্যের শরণাপন্ন হতে হল। এই সময় থেকেই পৌরাণিক দেবতার মাহাত্ম্যসূচক মঙ্গলকাব্য রচনার সূত্রপাত। এরপর খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতক থেকে ব্যাপক হারে পৌরাণিক দেবতাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয় মঙ্গলকাব্যে। এই-সব রচনায় মৌলিক কল্পনা এবং উচ্চমানের কাব্যগুণের অভাব সর্বত্রই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলি সংস্কৃত পুরাণ ইত্যাদির ভাবানুবাদ মাত্র। যেমন, রূপনারায়ণের দুর্গামঙ্গল মার্কণ্ডেয় পুরাণের অনুবাদ এবং রতিদেবের মৃগলুব্ধ শিবপুরাণোক্ত একটি কাহিনির পুনরাবৃত্তি। সেই হিসেবে মৌলিক কবিত্বের বিকাশ মধ্যযুগে একমাত্র লৌকিক দেবদেবীদের মাহাত্ম্যসূচক মঙ্গলকাব্যগুলিতেই দেখা যায়। রমেশচন্দ্র দত্ত তাই এই কাব্যগুলিকেই "গান ও অনুবাদ সাহিত্য বাদে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌকিক কাব্যসাহিত্য" বলে উল্লেখ করেছেন।

উদ্ভব যুগ

[সম্পাদনা]

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতককে মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব যুগ বলে ধরেছেন। ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে বাংলা অঞ্চলে রচিত হয় বৃহদ্ধর্মপুরাণ নামে একটি উপপুরাণ। এই গ্রন্থের চণ্ডীস্তোত্রে একটি শ্লোকে বলা হয়েছে: ত্বং কালকেতু বরদা চ্ছলগোধিকাসি যা ত্বং শুভা ভবসি মঙ্গলচণ্ডিকাখ্যা। শ্রীশালবাহন নৃপাদ বণিজঃ সসূনো রক্ষেঽম্বুজে করিচয়ং গ্রসতী বমন্তী।। অর্থাৎ, এই পুরাণেই দেবী মঙ্গলচণ্ডীর গোধিকারূপ ধারণ করে ব্যাধ কালকেতুকে বর প্রদান, সিংহলরাজ শালবাহন কর্তৃক বণিকপুত্রের হাতে নিজ কন্যাকে সমর্পণ, কমলেকামিনী রূপে দেবী চণ্ডীর হস্তী গ্রাস ও বমনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বৃহদ্ধর্মপুরাণ রচনার কালেই যে চণ্ডীমঙ্গল নিজস্ব রূপ ধারণ করেছিল, তা এই শ্লোকটি থেকেই প্রমাণিত হয়। কারণ চণ্ডীমঙ্গলে ব্যাধ কালকেতুর ও ধনপতি সদাগরের যেমন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুটি আখ্যান একত্রে গ্রথিত হয়েছে, ঠিক তেমনই এই একটি শ্লোকেও উভয় আখ্যানের সারাংশ উল্লিখিত হয়েছে।

এই যুগের সাহিত্যিক নিদর্শন প্রায় কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরবর্তীকালের কবিদের রচনায় এই যুগে মঙ্গলকাব্যের অস্তিত্ব, সেই কাব্যের কবিদের নাম ও তাঁদের রচনাবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু আভাস দেওয়া হয়েছে:

মনসামঙ্গল
পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে মনসামঙ্গল-রচয়িতা বিজয় গুপ্ত তাঁর পূর্বসূরি হরি দত্তের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন: "মূর্খে রচিত গীত না জানে মাহাত্ম্য। প্রথমে রচিল গীত কানা হরি দত্ত।। হরি দত্তের যত গীত লুপ্ত হইল কালে। যোড়া গাঁথা নাহি কিছু ভাবে মোরে ছলে।। কথার সঙ্গতি নাই নাহিক সুস্বর। এক গাইতে আর গায় নাহি মিত্রাক্ষর।। গীতে মতি না দেয় কেহ মিছা লাফ ফাল। দেখিয়া শুনিয়া মোর উপজে বেতাল।।" অর্থাৎ, হরি দত্তের অচলিত বৈশিষ্ট্যহীন রচনার আধারেই বিজয় গুপ্ত নতুন করে মনসামঙ্গল রচনায় প্রয়াসী হয়েছিলেন।
চণ্ডীমঙ্গল
ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে কবিকঙ্কণ চণ্ডীর রচয়িতা অবশ্য তাঁর পূর্বসূরি মানিক দত্তকে যথোচিত শ্রদ্ধা-সহকারে উল্লেখ করেছেন: "মানিক দত্তেরে বন্দোঁ করিয়া বিনয়। যাহা হইতে হইল গীত-পরিচয়।" সম্ভবত চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি মানিক দত্ত খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের লোক ছিলেন।
ধর্মমঙ্গল
ঘনরাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গলের আদিকবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ময়ূর ভট্টের নাম: "ময়ূর ভট্টেরে বন্দি সঙ্গীত আদ্য কবি।"

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রাক্‌-চৈতন্যযুগের কবি বিজয় গুপ্তের রচনায় পূর্বসূরির যে রূঢ় সমালোচনা দেখা গিয়েছে। চৈতন্য-পরবর্তী যুগের বৈষ্ণব-প্রভাবিত বাংলার কবিরা সমকালীন শিক্ষার প্রভাবে পূর্বসূরিদের কাব্য-সমালোচনার পথে হাঁটেননি। তবে বিজয় গুপ্তের উক্তিটি মনসামঙ্গল কাব্যের উদ্ভব যুগের কাব্যবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করে।

সৃজন যুগ

[সম্পাদনা]

উদ্ভব যুগে মঙ্গলকাব্য পরিপূর্ণতা লাভ করেনি; বরং সৃজন যুগে অর্থাৎ পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে এসে তা অনেকটা সংহত হয়। এই যুগেই মনসামঙ্গল-রচয়িতা বিজয় গুপ্ত, নারায়ণ দেব, দ্বিজ বংশী দাস; চণ্ডীমঙ্গলকার দ্বিজ মাধব, মুকুন্দ চক্রবর্তী; ধর্মমঙ্গলের কবি মানিক গাঙ্গুলী, খেলারাম চক্রবর্তীর প্রমুখ আবির্ভূত হন। এঁদের হাতে মঙ্গলকাব্য সুসংহত রূপ লাভ করলেও, তার কাব্যসৌন্দর্যের উন্নতির আরও অবকাশ থেকেই যায়।

সৃজন যুগেই মঙ্গলকাব্যের উপর সংস্কৃত পুরাণসাহিত্য ও কাব্যের প্রভাব প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেই সময় উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজে পুরাণ-বহির্ভূত লোককথার কোনো আবেদন ছিল না বলে বিভিন্ন লোককথা ও পুরাণকথার মিশেলে লৌকিক কাহিনির মাধ্যমে পৌরাণিক দেবদেবীর মহিমা প্রচার শুরু হয়। আর এইভাবেই মঙ্গলকাব্যে ফুটে ওঠে এক আভিজাত্যের ভাব। তবে ভাষায় ও কল্পনায় তখনও গ্রাম্যতাদোষ থেকে সম্পূর্ণ মুখ হয়ে উঠতে পারেনি মঙ্গলকাব্য। সেই কাজ অষ্টাদশ শতকে ঘনরাম চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্র করেছিলেন।

ঐশ্বর্যের যুগ

[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ শতক হল মঙ্গলকাব্যের ইতিহাসে ঐশ্বর্যের যুগ। ঘনরাম চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্র রায় এই যুগের স্রষ্টা। সহজ-সরল ভাষা ও বাস্তব কল্পনার সৃজন যুগ পেরিয়ে ঐশ্বর্যের যুগে একই বিষয়বস্তুর উপর যুক্ত হল শব্দের ঝংকার ও রচনার পারিপাট্য; ফলে মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে দেখা দিল এক কৃত্রিম বাহ্য-সৌন্দর্য। এই কারণেই অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য সৃজন যুগকে "ভাবযুগ" ও ঐশ্বর্যের যুগকে "শব্দযুগ" নামে অভিহিত করেছেন। এই ঐশ্বর্যের যুগেই মঙ্গলকাব্য তথা বাংলা সাহিত্য গ্রাম্যতাদোষ থেকে মুক্ত হয়। বিষয়বস্তুর মধ্যে বৈচিত্র্য হয়তো এই যুগে নেই, কিন্তু চরিত্রগুলিকে অভিনব রূপ দিয়ে এবং নতুন ছন্দ ও অলংকারের প্রয়োগ ও ধ্বনিঝংকার যে অভিনব কাব্যের সৃষ্টি হল, তা সমগ্র মধ্যযুগের সাহিত্যে এক মূল্যবান সম্পদ বলে বিবেচিত হয়।

মঙ্গলকাব্যের বিলোপ

[সম্পাদনা]

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন, "ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যে বাংলার মধ্যযুগের জাতীয় কাব্যসাহিত্যের উপরই যবনিকাপাত হইয়া গেল, তাহা নহে—সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যচিহ্নিত যে একটা বিরাট সাহিত্য প্রায় পাঁচ শত বৎসরের সাধনার ফলে গড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহা চিরতরে গতিশক্তিহীন হইয়া পড়িল।" (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য, এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, পৃ. ১৪০) ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর তিন বছর আগে ব্রিটিশ বণিক শক্তি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করে এবং ক্রমশ বাংলা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এরপর শতাধিক বছর ইংরেজের সাহচর্যে ও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে বাঙালি হিন্দুসমাজের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটে। ফলে মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্যসূচক দেবতাকেন্দ্রিক সাহিত্যের পরিবর্তে বাংলা সাহিত্য ক্রমশ সর্বতোভাবে মানবজীবন-কেন্দ্রিক হয়ে উঠতে শুরু করে।

অবশ্য মঙ্গলকাব্যের ধারাটির বিলোপের এটিই একমাত্র কারণ ছিল না। ঐশ্বর্যের যুগে মঙ্গলকাব্যের শিল্পগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল বটে, কিন্তু তার ভাবদৈন্য সম্পূর্ণ ঘোচেনি। মঙ্গলকাব্যের রচনাগত শৈথিল্য দূর হয়েছিল বটে, কিন্তু এই সাহিত্যধারাটিকে আরও দূরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তি তা হারিয়ে ফেলেছিল। সেটিই বাংলা সাহিত্য আধুনিক যুগে পদার্পণের পূর্বেই মঙ্গলকাব্যের ধারাটি বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।