মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/পুরাণ ও মঙ্গলকাব্য
মঙ্গলকাব্যের আখ্যানগুলি বাংলার যে সামাজিক স্তর থেকেই উঠে আসুক না কেন, কালে তা শিক্ষিত হিন্দুসমাজের চর্চার বিষয় দাঁড়ায়। ফলে সেগুলির উপর সংস্কৃত পুরাণের প্রভাবও অনিবার্য হয়ে ওঠে। মঙ্গলকাব্য ও পুরাণ দুইই আখ্যানমূলক রচনা। সেই সূত্রেই মঙ্গলকাব্যের লৌকিক আখ্যানের মধ্যে পৌরাণিক কাহিনি এসে প্রবেশ করতে শুরু করে। কালক্রমে মঙ্গলকাব্যের কাহিনিগুলি নির্দিষ্ট সংখ্যক পালায় বিভক্ত হয়ে আট দিন, বারো দিন বা এক মাস ধরে গাওয়ার রীতি চালু হয়; তখন এই নির্দিষ্ট সময়কাল পূরণ করার জন্য মঙ্গলকাব্যের মৌলিক কাহিনিগুলির মধ্যে নির্বিচারে পৌরাণিক কাহিনি এনে যোগ করা হতে থাকে। কিন্তু এই-সব পৌরাণিক কাহিনি কোনো দিনই মঙ্গলকাব্যের মূল লৌকিক কাহিনির সঙ্গে সহজ সামঞ্জস্য স্থাপন করে উঠতে পারেনি। কারণ, পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যের উদ্দেশ্য এক নয়। এক কথায় বললে, পুরাণের লক্ষ্য দেবতার মাহাত্ম্যকীর্তন আর মঙ্গলকাব্য প্রধানত বাস্তবজীবনাশ্রয়ী। যে মঙ্গলকাব্য বাস্তব জীবন পরিত্যাগ করে পুরাণের মতো একান্তই দেবতাশ্রয়ী হয়ে পড়েছে, মধ্যযুগের বাংলার বিদগ্ধ সমাজে তার স্থান হয়নি। অতএব মঙ্গলকাব্য যেখানে পুরাণের ব্যতিক্রম, সেখানেই এই কাব্যের সার্থকতা।
বহিরঙ্গের বিচারে পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যের মধ্যে অন্তত একটি মিল আছে। উভয় ধারার সাহিত্যই দেবতার মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত। কিন্তু এই ব্যাপারেও উভয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য দেখা যায়। পৌরাণিক দেবতার মাহাত্ম্য দৈব উপায়ে প্রতিষ্ঠিতই থাকে, পুরাণে তিনিই নায়ক, তাঁর আচরণ দেবসুলভ এবং তিনি মর্ত্যমানবের উপর নির্ভরশীল নন। কিন্তু মঙ্গলকাব্যের নায়ক স্বর্গভ্রষ্ট মানুষ, তাঁর আচরণও মানুষসুলভ। পুরাণে লব্ধপ্রতিষ্ঠ দেবতাকে বিরোধের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে হয় না; কিন্তু মঙ্গলকাব্যের দেবতা মানুষের অবিশ্বাস ও প্রতিকূল মনোভাব করে তবেই আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন—এই-জন্য মঙ্গলকাব্যে একটি উচ্চাঙ্গের নাটকীয় দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে। পুরাণের দেবতা নিজ মাহাত্ম্যে স্বয়ংপ্রতিষ্ঠ; কিন্তু মঙ্গলকাব্যের দেবতা মানুষের স্বীকৃতি ও আনুকূল্য লাভ করতে না পারলে মর্ত্যলোকে নিজের পূজা প্রচার করতে সক্ষম হন না। সুতরাং পরোক্ষে মানুষকেই মঙ্গলকাব্যে দেবতার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাই মঙ্গলকাব্য পুরাণ হয়েও কাব্য, কিন্তু পুরাণ নিছকই ধর্মগ্রন্থ। পুরাণসাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কালক্রমে পুরাণগুলির মধ্যে এক ধরনের ছকে-বাঁধা বিষয় পরিবেশনের রীতি গড়ে উঠেছিল। কূর্মপুরাণে পুরাণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে পুরাণসাহিত্যের পঞ্চলক্ষণের কথা উল্লিখিত হয়েছে:
সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরাণি চ।
বংশানুচরিতঞ্চৈব পুরাণং পঞ্চলক্ষণম্।।
অর্থাৎ, ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি, প্রজা সৃষ্টি, রাজবংশ বা ঋষিবংশ, মন্বন্তর, রাজবংশ বা ঋষিবংশ-জাত চরিত্রের কার্যাবলির বিবরণ—এই হল পুরাণের পাঁচটি লক্ষণ। এর মধ্যে শেষোক্ত চরিত্র-বর্ণনার মধ্যে যে সামান্য সুযোগ আছে, কেবল তার মধ্যে দিয়েই সামান্য লৌকিক তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। কিন্তু তাও দেবতার মাহাত্ম্যে এতটাই ভারাক্রান্ত যে তার ভিতর দিয়ে কোনো মানবিক বা সামাজিক পরিচয় উদ্ধার করা দুঃসাধ্য। মঙ্গলকাব্যগুলিও কালক্রমে রচনা ও বিষয়বস্তু পরিবেশনের দিক থেকে একটি বিশেষ আদর্শ গ্রহণ করেছিল। তা সত্ত্বেও দেখা যায়, মঙ্গলকাব্যে স্বর্গভ্রষ্ট দেবতা যখন মর্ত্যমানবীর গর্ভে আশ্রয় নেন, তখনই কবির কল্পনা নেমে আসে পৃথিবীর মাটিতে। পুরাণকারের দৃষ্টি কখনও পৃথিবীর মাটিতে বা মানবসমাজের দিকে নামার সুযোগই পায়নি। শাস্ত্রবিধির নিগড়ে ও দেবমহিমার ভারে পুরাণগুলি প্রাণের স্পন্দন হারিয়েছে, কিন্তু মানুষের সংস্রব রক্ষার ফলে মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে প্রাণের স্পন্দনের অভাব কোনওদিনই অনুভূত হয়নি। কাব্যের অন্তরে ও বহিরঙ্গে এই স্পন্দন চিরকালই সুপরিস্ফুট।
পুরাণের পাঁচটি লক্ষণের কয়েকটি পরবর্তীকালের মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যেও দেখা দিয়েছিল। তবু এগুলি মঙ্গলকাব্যের মূল কাহিনির অন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি বা তার অংশও হতে পারেনি; কেবল বহিরঙ্গের অনাবশ্যক ভার হয়েই রয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক মঙ্গলকাব্য ‘দেবখণ্ড’ ও ‘নরখণ্ড’ নামে দুটি সুস্পষ্ট খণ্ডে বিভক্ত। প্রথমটি পুরাণ ও দ্বিতীয়টি কাব্য। প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যের মধ্যেই পুরাণ ও কাব্য পরস্পর এই রকম স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। কিন্তু ‘দেবখণ্ড’ পুরাণই রয়ে গিয়েছে, তার কাব্যমূল্য কিছুই নেই।
মঙ্গলকাব্যের উৎপত্তি পুরাণের অনুপ্রেরণা থেকেই। কিন্তু মানব ও সমাজজীবনের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার জন্য কয়েকশো বছর চর্চার পরেও পুরাণ ধর্মগ্রন্থই থেকে গিয়েছে; কিন্তু মানুষের কাহিনি নিয়ে শুরু হওয়ার ফলে মঙ্গলকাব্য পুরাণের স্তর পেরিয়ে উন্নীত হয় কাব্যের স্তরে। কিন্তু কাব্যের পথে মঙ্গলকাব্যের ক্রমোন্নতি বজায় থাকেনি; মঙ্গলকাব্যের মৌলিক প্রেরণা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে পৌরাণিক আদর্শ একটা সময়ে আবার এটিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে। তখন কেবল পুরাণের অনুকরণই নয়, মঙ্গলকাব্যের নামে পুরাণের অনুবাদও এই কাব্যধারাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।
পুরাণ রচনার প্রেরণা থেকেই মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব ঘটলেও পৌরাণিক আদর্শ বা কাহিনির প্রতি মঙ্গলকাব্যের কবিদের একনিষ্ঠতা কোনোদিনই প্রকাশ পায়নি। পৌরাণিক আদর্শ রক্ষার জন্য তাঁরা লৌকিক উদ্দেশ্যকে বলি দেননি। তাই দেখা যায়, মহাভারতের জরুৎকারু অতি সহজেই মনসামঙ্গলের মনসায় পরিণত হচ্ছেন, চণ্ডীমঙ্গলে শিব দাম্পত্যজীবনের ভিতর দিয়ে বাঙালিসুলভ মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছেন, শিবমঙ্গলে তো তিনি নিজের ত্রিশূল গালিয়ে লাঙল, জোয়াল, মই ইত্যাদি তৈরি করাচ্ছেন। পৌরাণিক আদর্শ মঙ্গলকাব্যের কবিদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি বলেই তা ঘটেছে। পুরাণ শুধুমাত্র আখ্যায়িকা নয়, তার মধ্যে স্মৃতিশাস্ত্র ও দর্শনতত্ত্ব পরিবেশনার দায়িত্বও পুরাণকার নিয়েছিলেন। পৌরাণিক কাহিনি মঙ্গলকাব্যের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করলেও, মঙ্গলকাব্যের কবি পুরাণকারের মতো তত্ত্ব প্রচারের দায়িত্বে নেননি। আখ্যানের মাধ্যমে বাস্তবজীবনের বিশ্লেষণই ছিল মঙ্গলকাব্য রচনার উদ্দেশ্য। পুরাণ ও মঙ্গলকাব্যের মৌলিক আদর্শের পার্থক্য এখান থেকেই বোঝা যায়। পুরাণের আখ্যায়িকা অংশটুকুর কাছেই মঙ্গলকাব্যের সামান্য ঋণ। আঙ্গিকের ক্ষেত্রে পুরাণের কাছে মঙ্গলকাব্য আদৌ ঋণী নয়, সে-দিক থেকে বরং সংস্কৃত কাব্যের কাছে কিছুটা ঋণী। পুরাণের উদ্দেশ্য এই কারণেই মঙ্গলকাব্যের দ্বারা পূরণ হয়নি। সেই সঙ্গে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছিল বলে বাংলায় পুরাণ রচনার ধারাও লুপ্ত হয়নি। পরবর্তীকালে এই ধারা লুপ্ত হওয়ার যে কারণ তা বাংলা সহ সারা ভারতে অভিন্ন।
হিন্দু-বৌদ্ধ সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় সংস্কৃত পুরাণগুলি রচিত হয়; তেমনই বাংলা হিন্দু ও মুসলমান সমাজের প্রথম সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভব ঘটে মঙ্গলকাব্যগুলির। আদি যুগের সংস্কৃত পুরাণগুলি ছিল ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা-নিরপেক্ষ, এগুলির বিষয়বস্তু ছিল মানুষের মহিমাকীর্তন। পরবর্তী যুগের পুরাণের পাঁচ লক্ষণের বদলে এই যুগের পুরাণগুলিতে একটিই লক্ষণ ছিল—মানবচরিত্রের মাহাত্ম্য কীর্তন। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে বীর পুত্রসন্তান লাভের উদ্দেশ্যে নারীর সীমন্তোন্নয়ন উপলক্ষ্যে মানুষের বীরত্বগাথা কীর্তিত হত এবং সেই কাহিনিগুলিই ছিল আদি সংস্কৃত পুরাণগুলির ভিত্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কীর্তিগাথা পুরাণে গৌণ হয়ে পড়ে, দেবমাহাত্ম্য কীর্তনই হয়ে ওঠে তার মুখ্য উদ্দেশ্য। এইভাবে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে একান্ত দৈবনির্ভর হয়ে পড়ার ফলে সংস্কৃত পুরাণগুলি ক্রমে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। মঙ্গলকাব্যের লৌকিক কাহিনিগুলিও প্রথমে অলৌকিকতা-বর্জিত সাধারণ মানুষের কাহিনিই ছিল। কালে এই কাহিনিগুলির মধ্যেও দেবচরিত্র ও অলৌকিক ঘটনার ঘনঘটা দেখা ছিল ঠিকই, কিন্তু পুরাণের মতো মঙ্গলকাব্য মানুষ ও মানবসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে ত্যাগ করল না। পৌরাণিক কাহিনি এগুলির উপলক্ষ্য হয়ে রইল মাত্র, কিন্তু দৃষ্টি স্থির রইল মানুষের দিকেই।
সেন রাজত্বের অবসানে অপর এক বিদেশি রাজশক্তি বাংলা অধিকার করে। এই রাজন্যবর্গের বৈদেশিক ধর্মমতের সঙ্গে বাংলা নিজস্ব লৌকিক ধর্মমতগুলির মতাদর্শগত পার্থক্য এতটাই বেশি ছিল যে, ক্রমে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সমাজের মধ্যে এক বিপুল ব্যবধানের সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সামনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন হিন্দু বাঙালিরা নিজেদের অত্যন্ত অসহায় মনে করত। তখনই মঙ্গলকাব্যের লৌকিক ও অসাম্প্রদায়িক কাহিনিগুলির মধ্যে এক অলৌকিক দেবশক্তি কল্পনা করে ঐহিক জীবনের সকল দুঃখ-দুর্দশা তাঁদের ইচ্ছাধীন বলে সান্ত্বনা লাভের একটা প্রয়াস দেখা গেল হিন্দুদের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "তখন সমাজের মধ্যে যে উপদ্রব-উৎপীড়ন, আকস্মিক উৎপাত, যে অন্যায় যে অনিশ্চয়তা ছিল, মঙ্গলকাব্য তাহাকেই দেবমর্যাদা দিয়া সমস্ত দুঃখ-অবমাননাকে ভীষণ দেবতার অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছার সহিত সংযুক্ত করিয়া কথঞ্চিৎ সান্ত্বনালাভ করিয়াছিল এবং দুঃখক্লেশকে ভাঙাইয়া ভক্তির স্বর্ণমুদ্রা গড়িতেছিল। এই চেষ্টা কারাগারের মধ্যে কিছু আনন্দ কিছু সান্ত্বনা আনে বটে, কিন্তু কারাগারকে প্রাসাদ করিয়া তুলিতে পারে নাই। এই চেষ্টা সাহিত্যকে তাহার বিশেষ দেশকালের বাহিরে লইয়া যাইতে পারে না।" (প্রবন্ধ: "বঙ্গভাষা ও সাহিত্য", গ্রন্থ: সাহিত্য) এই অবস্থায় বিধর্মী বিদেশি রাজশক্তির দ্বারা পীড়িত জাতি অল্পকালের মধ্যেই জীবনের সব উচ্চ আদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, নিজের মধ্যে নিজের পরিত্রাণের পথ খুঁজতে গিয়ে সর্বপ্রকারে আত্মসমর্পণ করে বসে দৈব সহানুভূতির কাছে। সামাজিক জীবনের এই অবস্থা থেকেই লৌকিক মঙ্গলকাব্যে অনুপ্রবেশ করে দেবতার মাহাত্ম্যসূচক আখ্যানগুলি।
বাংলায় আর্যসভ্যতা স্থাপিত হওয়ার আগে জনসমাজে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের কিছু আভাস মঙ্গলকাব্যগুলি থেকে পাওয়া যায়। মানুষের মনের একটি আদিম প্রবৃত্তি হল ভয়; মানবসভ্যতার আদি লগ্নেও সর্বপ্রথম ভয় থেকেই ঈশ্বর ও দেবতার পরিকল্পনার করা হয়েছিল। বাংলার প্রাচীনতম দেব-পরিকল্পনাও এই অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক আদিম সমাজের এই প্রবৃত্তি থেকেই উদ্ভূত। উন্নত আর্যসমাজে দেবতাকে কল্পনা করা হয়েছিল পরম করুণাময় ও কল্যাণকারী ঐশী-সত্তা রূপে। কিন্তু সেই আদর্শ মঙ্গলকাব্যের নিম্নস্তরের সমাজের দৃষ্টিতে সম্যক বোধগম্য হয়নি। এই জন্যই মঙ্গলকাব্যের দেবতা স্বার্থপর, ক্রূর, প্রতিহিংসাপরায়ণ, অকৃতজ্ঞ ও ছলনাময়। শ্রদ্ধায় বা তাঁদের মহিমায় আকর্ষিত হয়ে কেউ তাঁদের শরণাপন্ন হন না, শুধু তাঁদের অকারণ নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পেতে ভয়ে তাঁদের পূজা করেন। এই দেবতারাও সামান্যতম অবজ্ঞায় নিদারুণ প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয়ে ওঠেন, আবার কখনও অল্পে তুষ্ট হয়েই পূজককে করুণা করেন। বহুদিন পরে সওদাগর ঘরে ফিরলে উৎকণ্ঠিত পরিজন যদি প্রসাদ ফেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ছোটেন, তাহলে তীরে এসেও সওদাগরের তরী ডুববে। কিন্তু অনুতপ্ত ভক্ত ফিরে এসে সেই প্রসাদ কুড়িয়ে গ্রহণ করলেই দেবতা মুহূর্তে করুণাময় হয়ে উঠবেন এবং প্রাণ ফিরে পাবেন সওদাগর। তাই অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, "সামান্য অমর্যাদা হইতে আত্মরক্ষার্থে মঙ্গলকাব্যের দেবতাদিগের এত সতর্কতা হইতে কি ইহাই মনে হয় না যে বস্তুতঃ সেকালের সমাজে কোন মর্যাদারই তাঁহারা অধিকারী ছিলেন না?" (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য, এ. মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ২০০০, পৃ. ৫৪) মঙ্গলকাব্যের প্রত্যেক দেবতাই একান্ত অনিচ্ছুক ভক্তের কাছ থেকে জোর করে পূজা আদায় করতে তৎপর হয়েছেন, স্বেচ্ছায় ভক্তিপরায়ণ হয়ে কেউ তাদের পূজা করেননি। শক্তির যথেচ্ছ প্রয়োগ করে সমাজকে ভয় দেখানো, নির্যাতনের হুমকি দেওয়া, নানা চক্রান্তে দণ্ড হাতে সম্মান আদায় করে নেওয়া—এ যেন মধ্যযুগীয় বাংলার রাজশক্তির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। শক্তি দিয়ে অনেক কিছুই করা যায়, কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় না; কারণ আতঙ্ক ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভক্তি চিরন্তন। বাংলায় ষোড়শ শতকের নবজাগরণের পর নব-সংস্কারে দীক্ষিত হিন্দুসমাজে এই ভয়ের অস্তিত্ব থাকলেও, শ্রদ্ধার লেশ কোনও কালেই ছিল না। শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভগবৎ-প্রেম মানুষের উচ্চতর প্রবৃত্তি থেকে জন্মায়; কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক সমাজের যে মানসিকতা থেকে মঙ্গলকাব্যের দেব-পরিকল্পনার উৎপত্তি এবং মুসলমান শাসনের যে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই পরিকল্পনার বিকাশ, তার মধ্যে কোনও উচ্চতর আদর্শ থাকার কথা নয়।
তবে এ-ক্ষেত্রেও মঙ্গলকাব্যের কয়েকজন দেবতার কিছু স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়। যেমন মনসামঙ্গলের দেবতা কাব্যের নায়কের সঙ্গে বিরোধের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা করলেও, ধর্মমঙ্গলের দেবতার সঙ্গে নায়ক লাউসেনের কোনও বিরোধ নেই, বরং ধর্মঠাকুরের আশীর্বাদ ও সহায়তার ফলেই লাউসেন আদর্শ যুবক হয়ে ওঠেন এবং জীবনে প্রতি পদে সাফল্য অর্জন করেন। ধর্মঠাকুরের উদ্ভব কোনও অনার্য দেবতার ছায়ায় হয়েছে কিনা তা গবেষকদের আলোচনার বিষয় হলেও, সৃজন যুগ ও ঐশ্বর্যের যুগের ধর্মমঙ্গল কাব্যের দেব-পরিকল্পনা যে পুরাণ-প্রভাবিত করুণাময় কল্যাণকামী দেবতার আদর্শেই ঘটেছিল, তা স্পষ্ট। উক্ত দুই যুগে মঙ্গলকাব্যের দেব-পরিকল্পনার উপর সংস্কৃত পুরাণের আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। উদ্ভব যুগের মঙ্গলকাব্যের দেবতাদের প্রকৃতির সঙ্গে পুরাণ-প্রভাবিত মঙ্গলকাব্যের দেবতাদের প্রকৃতিগত পার্থক্যের কারণ এটিই।