মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/নাম-ব্যুৎপত্তি
প্রাচীন ভারতীয় রাগরাগিণীগুলির মধ্যে অন্যতম রাগ হল মঙ্গল। বাংলা বৈষ্ণব পদাবলিও মঙ্গল রাগে গাওয়া হত বলে জানা যায়। অবশ্য প্রাচীন ভারতীয় সংগীতশাস্ত্র-বিষয়ক গ্রন্থগুলিতে মঙ্গল রাগের উল্লেখ বিশেষ পাওয়া যায় না। তাই মনে করা হয়, এটি ছিল একটি স্থানীয় রাগ। বস্তুত কোনো সংগীতশাস্ত্রকারই মঙ্গল রাগটিকে ষড়রাগ বা জনক-রাগের অন্যতম বলে গ্রহণ করেননি; করেছেন রাগিণী বা উপরাগের পর্যায়ে। ক্ষেমকর্ণ পাঠক রচিত রাগমালা গ্রন্থে মঙ্গল রাগকে হিন্দোল রাগের অন্তর্গত একটি উপরাগ (পুত্র) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার নারদ রচিত চত্বারিংশচ্ছত-রাগ-নিরূপণম্ গ্রন্থে ভৈরব রাগের পুত্রবধূ রূপে মঙ্গলকৌশীকী নামে এক রাগিণীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই রাগটি সম্ভবত মঙ্গল ও কৌশীকী রাগিণীর একটি মিশ্র রূপ। কিন্তু ক্ষেমকর্ণ পাঠক বা নারদের পুথি দুটি খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের আগে লেখা হয়নি এবং এগুলির প্রচারও খুব বেশি ছিল না। প্রাচীন ও মধ্যযুগের পদ্যসাহিত্য মাত্রই গানের উদ্দেশ্যে লেখা হত, মঙ্গলকাব্যও তার ব্যতিক্রম ছিল না এবং সেইজন্যই মঙ্গলকাব্য মঙ্গলগান নামেও অভিহিত হয়েছে। সাধারণভাবে মনে হতে পারে আদ্যোপান্ত মঙ্গলরাগে গীত হত বলেই এই কাব্য মঙ্গলকাব্য বা মঙ্গলগান নামে অভিহিত হয়। তবে মঙ্গলকাব্যের প্রাচীন পুথিগুলিতে অন্যান্য রাগরাগিণীরও উল্লেখ পাওয়া যায়; তাই এই কাব্য যে আদ্যোপান্ত মঙ্গল রাগেই গীত হত তা বলা চলে না। হয়তো প্রধানত মঙ্গল রাগেই এগুলি গীত হত। যেমন প্রাচীন বাংলায় পাঁচালির সুরে গীত গানগুলিকে পাঁচালি বলা হত, তেমনই সম্ভবত প্রধানত মঙ্গল রাগে গীত গান মঙ্গলগান নামে অভিহিত হয়েছিল। সুপ্রাচীন কাল থেকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত নানা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে; তবে বর্তমানে মঙ্গল রাগের যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাও প্রাগুক্ত ধারণার অনুকূল নয়। কারণ বর্তমানে মঙ্গল রাগকে ভৈরোঁ অর্থাৎ ভৈরব রাগের অন্তর্গত ধরা হয়; যা শুধু ভোরবেলাতেই গেয়। কিন্তু মঙ্গলগান আদৌ ভোরে গীত হত না। তাই এই বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। মঙ্গলগানের মধ্যে পাঁচালির সুরও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত বলে প্রাচীনতম মঙ্গলগানগুলিকে শুধু পাঁচালি বলেও অভিহিত করা হয়েছে। ক্রমে পাঁচালির উপর মঙ্গল রাগের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলেই সম্ভবত এটি মঙ্গলগান নামে অভিহিত হতে থাকে।
দেবী মনসার অপর নাম পদ্মা। তাই মনসার গীতের উপর পুরাণের প্রভাবের কারণে এই গান পদ্মপুরাণ নামেও পরিচিত। অবশ্য এই কাব্যের মনসামঙ্গল নামটিও যথেষ্ট প্রচলিত।
মধ্যযুগীয় বাংলায় দেবমাহাত্ম্য-প্রচারকারী যে-কোনো গানই মঙ্গলগীত নামে অভিহিত হত। এই অর্থে মঙ্গল শব্দটি প্রথম এই দেশে ব্যবহার করেন জয়দেব তাঁর গীতগোবিন্দম্ কাব্যে: শ্রীজয়দেবকবেবিদং কুরুতে মুদঃ মঙ্গলমুজ্জ্বলগীতি। পরবর্তীকালে অন্যান্য কবিরাও একই অর্থে মঙ্গল শব্দটি ব্যবহার করেন। যেমন: প্রভু কন গাও কিছু কৃষ্ণের মঙ্গল। মুকুন্দ গায়েন প্রভু শুনিয়া বিহ্বল।। (বৃন্দাবনদাস, চৈতন্যভাগবত, ২।২৫)
বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের গাওয়া গানকেও সাধারণভাবে মঙ্গলগান বলা হত বলে মনে করা হয়। কৃত্তিবাসী রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে শিবদুর্গার বিবাহ উপলক্ষ্যে বর্ণিত হয়েছে: নানা মঙ্গল নাট গীত হিমালয়ের ঘরে। পরম আনন্দে লোক আপনা পাসরে।। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, "মঙ্গল" শব্দটি "আঙ্গুল", "লাঙ্গুল", "গঙ্গা" ইত্যাদি শব্দের মতোই কোনো অনার্য ভাষা থেকে আগত বলে মনে করা হয়। হিন্দি ভাষায় বিবাহ শব্দের একটি প্রতিশব্দ হল মঙ্গল। আবার দক্ষিণ ভারতের একাধিক ভাষায় মঙ্গল শব্দটি বিবাহ অর্থে বহুল প্রচলিত।
মঙ্গলকাব্য নামের পিছনে আরও একটি তত্ত্ব উত্থাপিত হয়: কোনো অপ্রিয় বিষয় বা নামকে অনেক সময় সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। ইংরেজিতে একে বলে euphemism. প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের দেবতার চরিত্র মাত্রই ছিল অমঙ্গলকারী (malignant). অতএব এঁদের মঙ্গলকারিণী শক্তিকে প্রশমিত (pacify) করার কিংবা মনে স্থান না দেওয়ার প্রবৃত্তি থেকেই এঁদের মাহাত্ম্যসূচক গীতিকে মঙ্গলগান নামে অভিহিত করা হতে পারে। কালে সকল শ্রেণির দেবতার মাহাত্ম্যকীর্তনই মঙ্গলগান নামে পরিচয় লাভ করে।