বিষয়বস্তুতে চলুন

মঙ্গলকাব্য/মঙ্গলকাব্য-পরিচয়/নাথসাহিত্য ও মঙ্গলকাব্য

উইকিবই থেকে

মধ্যযুগীয় বাংলায় নাথসাহিত্য নামে অন্য এক শ্রেণির আখ্যানকাব্যও প্রচলিত ছিল। মঙ্গলকাব্য যেমন শাক্ত সম্প্রদায়ের কাব্য, নাথসাহিত্য তেমনই ছিল নাথ সম্প্রদায়ের সাহিত্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় সাহিত্যধারার মধ্যে থেকেই সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ মনোভাব দূরীভূত হয়েছিল। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা নাথসাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হননি; উচ্চবর্ণীয় হিন্দু সমাজেও এই সাহিত্য জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। তাই নাথসাহিত্য যখন জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বৃহত্তর জনসমাজে প্রচারিত হয়, তখন বাংলার হিন্দু ও মুসলমান কৃষক সমাজে তা বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সাহিত্যে হিন্দুশাস্ত্র, রামায়ণ, মহাভারত বা পুরাণের কথা কিছুই নেই; শুধু নাথ সম্প্রদায়ের ভিত্তি যোগশাস্ত্র বলে এই শাস্ত্রের কথা কিছু পাওয়া যায়।

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য নাথ আখ্যায়িকাগুলিকে গীতিকা বা ব্যালাড (ballad) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করে এগুলিকে নাথ-গীতিকা নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এগুলি মঙ্গলকাব্যের মতো বিস্তৃত না হলেও, মঙ্গলকাব্যের মতো একাধিক পালায় বিভক্ত নয়; বরং গীতিকা যেমন একটানা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রচিত হয়, ঠিক সেভাবেই লেখা হয়েছে। এ-জন্য তিনি এই আখ্যায়িকাগুলিকে লোকসাহিত্যধর্মী বলেও উল্লেখ করেছেন।

নাথ-গীতিকাগুলি প্রধানত দুই অংশে বিভক্ত: এক অংশে আছে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী সিদ্ধ নাথগুরুদের জীবনী ও মাহাত্ম্যের বর্ণনা; অন্য অংশে আছে মাণিকচন্দ্র রাজার পুত্র গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাসগ্রহণের আখ্যান। এই দুই বিষয় ছাড়া নাথসাহিত্যে অন্য কোনো প্রসঙ্গ নেই। কবিরা এই দুই বিষয়কে অবলম্বন করেই তাঁদের কাব্য রচনা করেছেন।

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, মঙ্গলকাব্য লোকসাহিত্যের স্তর অতিক্রম করে শিল্পসাহিত্যের স্তরে প্রবেশ করে একটি শিল্পসম্মত কাব্যরূপ লাভ করেছিল, কিন্তু নাথসাহিত্য তা করতে পারেনি। লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত বলেই এই সাহিত্যের গুণাবলি নাথসাহিত্যে প্রস্ফুটিত। অপর পক্ষে মঙ্গলকাব্য আদিতে লোকসাহিত্যের থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করলেও পরবর্তীকালে বিদগ্ধ কবিদের হাতে পড়ে তা শিল্পরূপ লাভ করেছিল। স্যার জন গ্রিয়ারসন রংপুর জেলার নিরক্ষর কৃষকদের মুখে শুনে নাথগীতিকাগুলি প্রথম লিপিবদ্ধ করেন। তার আগে দীর্ঘকাল পর্যন্ত নিরক্ষর গায়েনরা রাত্রিজাগরণ করে শুধুমাত্র স্মৃতির ভিত্তিতে এই গানগুলি শ্রোতাদের কাছে পরিবেশন করতেন। কিন্তু মঙ্গলকাব্যের ক্ষেত্রে সর্বত্রই লিখিত পুথির সন্ধান পাওয়া যায় আর এই সব পুথির রচয়িতা ও লিপিকারেরা ছিলেন বিদগ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। নাথসাহিত্য সমাজের উচ্চস্তরে পৌঁছাতে পারেনি বলে এতে শাস্ত্রকথা কম, বরং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথাই বেশি শোনা যায়।

মঙ্গলকাব্যে দেবদেবীদের বিরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়; কিন্তু নাথসাহিত্যে কোনো দেবদেবীর কথা বলা হয়নি। শিবের কথা আছে বটে, কিন্তু শিব-মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়নি; বরং শিবের চরিত্রে মানবিক দুর্বলতাগুলিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘সিদ্ধা’ বা ‘সিদ্ধাচার্য’ নামে পরিচিত নাথগুরুদের কথাই এই সাহিত্যে প্রচারিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের মতো তাঁরা ভক্তের কল্যাণ করেন না; শুধু অলৌকিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য সাধনা করেন। এই সাধনার কোনো গুহ্য তত্ত্ব নেই; শুধু ব্রহ্মচর্য অভ্যাসই করে যোগসাধনাই নাথ সম্প্রদায়ের মতে শ্রেষ্ঠ সাধনা। এ-ভাবে সিদ্ধিলাভ করে নাথগুরুরা কীভাবে অলৌকিক শক্তি লাভ করেন, তা-ই নাথসাহিত্যের একটি অংশে বর্ণিত হয়েছে। নাথগুরু গোরক্ষনাথের চরিত্রবলের কাছে যে দেবী পার্বতীও পরাজয় স্বীকার করেছিলেন, তাও এই কাব্যে সগৌরবে উল্লিখিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যে দেবদেবীদের ছলনার আশ্রয় নিতে দেখা যায়; নাথসাহিত্যে তা নেই। মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীরা প্রথম থেকেই অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী; কিন্তু নাথগুরুরা সেই ক্ষমতা অর্জন করেন সাধনা করে। মঙ্গলকাব্য ব্যক্তির আত্মশক্তিতে বিশ্বাস করে না, সমগ্র সমাজকে দৈবনির্ভর হতে শেখায়; কিন্তু নাথসাহিত্য মানুষকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তুলে জীবনের সংকট থেকে মুক্তিলাভের পথ খুঁজে নিতে বলে। তাই নাথসাহিত্যের দ্বিতীয় অংশে একান্ত ভোগাসক্ত রাজপুত্র গোপীচন্দ্রের অকালমৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠলে তাঁর মা মঙ্গলকাব্যের নায়িকার মতো দেবতার আশীর্বাদ ভিক্ষা না করে পুত্রকে সংযম ও ত্যাগের আদর্শে দীক্ষা দিয়ে ভোগ থেকে নিবৃত্ত করেন এবং তাতেই গোপীচন্দ্রের পরমায়ু বৃদ্ধি পায়। এই কারণে আদর্শগত দিক থেকেও মঙ্গলকাব্য ও নাথসাহিত্যের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।

মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে নাথসাহিত্যের গঠনগত সাদৃশ্যও পাওয়া যায় না। মঙ্গলকাব্য পয়ার, ত্রিপদী ও একাবলী ছন্দে রচিত; কিন্তু নাথসাহিত্য আগাগোড়াই স্বরবৃত্ত বা শ্বাসাঘাত-প্রধান ছন্দে রচিত। ছন্দের এমন বৈচিত্র্যহীনতা লোকসাহিত্যের লক্ষণ। নাথসাহিত্যে করুণরসের অবতারণার জন্য বিশেষ কোনো ছন্দ অর্থাৎ লঘু বা দীর্ঘ ত্রিপদীর আশ্রয় নেওয়া হয়নি, শুধুমাত্র সার্থক শব্দ চয়ন করেই বিভিন্ন রস যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আবার মঙ্গলকাব্যের ভূমিকায় দেব-বন্দনার রীতি থাকলেও, নাথসাহিত্যে তেমন কিছু নেই।

মঙ্গলকাব্যে বিরহের সুরটিই প্রধান; কিন্তু নাথসাহিত্য মিলনান্তক। বারো বছর সন্ন্যাসজীবন যাপন করে গোপীচন্দ্র গৃহে ফিরে সংসারী হলেন; সন্ন্যাসজীবনও তিনি সংসারের চিন্তা করেই কাটিয়েছিলেন। নাথসাহিত্য দেবতার অলৌকিক লীলাকীর্তন থেকে বিরত থেকেছে বলে এখানে পার্থিব মানবজীবন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে ধরা দিয়েছে। নাথসাহিত্যের ‘গোপীচন্দ্রের গান’ অংশে দেখা যায়, ভগবৎ-প্রেমের বদলে নারীপ্রেমই গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস রক্ষা করেছিল। মঙ্গলকাব্যে ক্ষেত্রবিশেষে পার্থিব প্রেম চরিত্রগুলির মধ্যে আভাসে ইঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে বটে, কিন্তু আখ্যানে তার ভূমিকায় নগন্যই থেকে গিয়েছে। আবার নাথসাহিত্যের ‘গোরক্ষবিজয়-মীনকেতন’ ধারার কাব্যগুলিতে প্রেমের কথা না থাকলেও, পার্থিব জীবনের পথেই সাধনার সার্থকতার কথা প্রচারিত হয়েছে।

মঙ্গলকাব্যের প্রধান গুণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান এবং সাধারণভাবে গীতিকার প্রধান গুণ বর্ণনার সংক্ষিপ্ততা। কিন্তু মঙ্গলকাব্যের প্রভাবে নাথসাহিত্যে বা ময়মনসিংহ গীতিকার অন্তর্গত পালাগুলিতে এই সংক্ষিপ্ততা প্রকাশ পায়নি; মঙ্গলকাব্যের মতো সেখানেও ঘটনা বর্ণিত হয়েছে বিস্তারিতভাবে। ‘গোরক্ষবিজয়-মীনকেতন’ কাব্যগুলিতে গীতিকাসুলভ প্রেমের কথা নেই, আছে উচ্চ নৈতিক আদর্শের কথা; তবু এগুলি সংক্ষিপ্ত নয়, শুধুমাত্র ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এর মতো বিস্তার এখানে দেখা যায় না।

মঙ্গলকাব্যের মহাকাব্য-ধর্মী বিষয়-বর্ণনা নাথসাহিত্যের অন্তর্গত ‘গোপীচন্দ্রের গান’ ও ‘ময়নামতীর গান’-এও আছে। এটিরও কারণ মঙ্গলকাব্যের প্রভাব। মঙ্গলকাব্যে জাতকর্ম থেকে অন্ত্যেষ্টি পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কারের যে বর্ণনা আছে, তা ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এও পাওয়া যায়। মঙ্গলকাব্যে বহু ক্ষেত্রেই যুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে; ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এও ময়নামতীর সঙ্গে যমের যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এ মঙ্গলকাব্যের আরও কয়েকটি প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায়:

  1. ময়নামতীর হেতালের লাঠি ব্যবহার মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগরের হেতালের লাঠি ব্যবহারের অনুরূপ;
  2. সাদা কাপড় পরার কথা ধর্মমঙ্গলেও পাওয়া যায়;
  3. স্ত্রীলোককে গুরু বলে স্বীকারের অনিচ্ছা মনসামঙ্গলে চাঁদের এবং চণ্ডীমঙ্গলে ধনপতির স্ত্রী-দেবতা পূজায় অনিচ্ছার অনুরূপ;
  4. ময়নামতীর সতীত্ব পরীক্ষা মনসামঙ্গলে বেহুলার ও চণ্ডীমঙ্গলে খুল্লনার সতীত্ব পরীক্ষার অনুরূপ।

এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন, মঙ্গলকাব্য লোকসাহিত্যের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিল বলে লোকসাহিত্যের কয়েকটি উপকরণ স্বাভাবিক কারণেই মঙ্গলকাব্যে রয়ে গিয়েছে। তাই মঙ্গলকাব্য ও নাথসাহিত্য প্রত্যক্ষভাবে একে অপরের থেকে এই-সব উপকরণ গ্রহণ করেছে, তা বলা যায় না।

তাছাড়া মঙ্গলকাব্য ও নাথসাহিত্য উভয়ই আত্মনির্লিপ্ত বস্তুনিষ্ঠ রচনা। মঙ্গলকাব্যের উদ্দেশ্য বিভিন্ন দেবদেবীর মাহাত্ম্যপ্রচার হলেও চরিত্রসৃষ্টির ক্ষেত্রে কবিরা আত্মনির্লিপ্ত থেকে তাদের সৃষ্টি করেছেন। আবার নাথসাহিত্যের অনেক কবিই নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন না, তাই তাঁরাও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাননি। ফলে তাঁরাও আত্মনির্লিপ্ত থেকে ঘটনাগুলির বর্ণনা দিয়েছেন। এই কারণে মঙ্গলকাব্য ও নাথসাহিত্য উভয়েরই সাহিত্যগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ‘গোরক্ষবিজয়-মীনকেতন’ কাব্যগুলিতে যোগসাধনার গূঢ় ইঙ্গিত অনেক সময় আখ্যানের ধারাটিকে অস্পষ্ট করে তুলেছে, অবশ্য ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এ তা হয়নি।