মঙ্গলকাব্য/ধর্মমঙ্গল/ময়ূর ভট্ট
ধর্মমঙ্গল কাব্যের পরবর্তী যুগের কবিগণ লাউসেনের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁদের এক পূর্বসূরি কবিকে এই কাহিনির আদি-রচয়িতা বলে উল্লেখ করেছেন। এই কবির নাম ময়ূর ভট্ট। পরবর্তী কবিদের রচনায় তাঁর ও তাঁর রচনার যৎসামান্য উল্লেখ ছাড়া সে-বিষয়ে বিস্তারিত কিছুই জানা যায় না:
- রূপরাম চক্রবর্তী তাঁর ধর্মমঙ্গল কাব্যে লিখেছেন:
|
ময়ূর ভট্ট কৃপান্বিত হৈল করতার। |
- মাণিক গাঙ্গুলী লিখেছেন:
|
বন্দিয়া ময়ূর ভট্ট কবি সুকোমল। |
- ঘনরাম চক্রবর্তী তাঁর গীত আরম্ভের পূর্বেই লিখেছেন:
|
হাকন্দ পুরাণ মতে ময়ূর ভট্টের পথে |
- গোবিন্দরাম বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ধর্মমঙ্গলে লিখেছেন:
|
আছিল ময়ূর ভট্ট সুকবি পণ্ডিত। |
- সীতারাম দাস লিখেছেন:
|
ময়ূর ভট্টকে বন্দিয়া মস্তকে |
এগুলি ছাড়াও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাচীন পুথিশালায় রক্ষিত একটি নাম-তারিখ-বিহীন খণ্ডিত ধর্মমঙ্গল পুথিতে পাওয়া যায়:
|
যথা তুমি উপনীত তথায় * গীত |
মাণিক গাঙ্গুলীর ধর্মমঙ্গল থেকে উদ্ধৃত পদ দুটিতে ময়ূর ভট্টের সঙ্গে রূপরাম নামে অন্য এক কবিরও বন্দনা আছে। কিন্তু রূপরামও ময়ূর ভট্টের পরবর্তী কবি এবং তিনিও যে তাঁকেই বন্দনা করে নিজের কাব্য রচনায় হাত দিয়েছিলেন, তা-ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাচীন পুথিশালায় রক্ষিত রূপরামের ধর্মমঙ্গল থেকেই জানা যায়। রূপরাম লিখেছেন, "ময়ূরভট্টের পদ মনে অনুমানি"। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ধর্মমঙ্গলের সকল কবিই তাঁদের কাহিনি মূলত ময়ূর ভট্টের কাব্য থেকেই গ্রহণ করেছেন।
বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় ময়ূর ভট্টের নামাঙ্কিত একটি কাব্য শ্রীধর্মপুরাণ নাম দিয়ে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করেছিলেন। এটির মূল পুথি অথবা তার কোনো অনুলিপি পাওয়া যায়নি। ১৩১০ বঙ্গাব্দে লিখিত একটি মাত্র পুথির উপর নির্ভর করে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়েছিল। সম্পাদক এটিকে ধর্মমঙ্গলের আদি কবি ময়ূর ভট্টের রচনা বলে মনে করেন। গ্রন্থে কবি নিজের পরিচয় দিয়েছেন লাউসেনের পৌত্র ধর্মসেনের সমসাময়িক বলে। সেই হিসেবে সম্পাদক তাঁকে খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের লোক ধরেছেন।
কিন্তু নানা কারণে এই পুথিটির প্রামাণিকতা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। পুথিটির ভাব ও ভাষা অত্যন্ত আধুনিক। অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, "দ্বিজ চণ্ডীদাসের পদগুলি ব্যাপক প্রচলনের জন্য আধুনিকতা প্রাপ্ত হইয়াছে স্বীকার করা যায়, কিন্তু এত প্রাচীন পুঁথি-সংগ্রহের মধ্যে ময়ূরভট্টের আর একখানিও সম্পূর্ণ কিংবা খণ্ডিত পুঁথির পাতাও আবিষ্কৃত হয় নাই। অতএব যদি ইহা খাঁটি পুঁথিই হইত, তাহা হইলে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর মতো ইহারও ভাষার প্রাচীনত্ব রক্ষা পাইত। বিশেষত এই আধুনিক পুস্তকখানি যাহার নিকট হইতে পাওয়া গিয়াছে, স্বর্গত যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয় তাহার যে ব্যক্তিগত পরিচয় আবিষ্কার করিয়াছেন তাহাও এই পুস্তকখানির উপর বিশ্বাস স্থাপনের অনুকূল নহে। অতএব সেই পুস্তকখানিকে কোনমতেই মাণিক-ঘনরাম-বন্দিত ময়ূরভট্টের রচিত বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে না। ইহা সম্ভবত অত্যন্ত আধুনিক কালে ময়ূরভট্টের নামের উপর অন্য কোন কবি রচনা করিয়া চালাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছেন। স্বর্গত যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয় মনে করেন, ইহা আধুনিককালের শ্রীআশুতোষ পণ্ডিত নামক এক ব্যক্তির রচিত। এই রকম প্রয়াস আমাদের দেশে নূতন নহে।" (আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, এ মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৯ সংস্করণ, পৃ. ৫৮৮)
অধ্যাপক সুকুমার সেনের মতে, এটি অষ্টাদশ শতকে কবি রামচন্দ্র বাঁড়ুজ্জের রচনা। মুদ্রিত সংস্করণের আকর পুথির ভণিতা "দ্বিজ রামচন্দ্র" ছাপার অক্ষরে হয়েছে "দ্বিজময়ূরক"। ভাষা বিচার করে অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পুথিটিকে অত্যন্ত আধুনিক বলে মনে করেছেন।
তবে পুথিটির ভাষা আধুনিক হলেও এতে ধর্মমঙ্গল কাব্যের আখ্যানবস্তুর প্রাচীনতর ধারাটিই অনুসৃত হয়েছে। পুথিটি খণ্ডিত, চরিতখণ্ড বা লাউসেনের কাহিনি এতেও নেই। তবে সংজাত খণ্ডের শেষে প্রদত্ত চরিতখণ্ডের দ্বাদশ অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত সূচিটি দৃষ্টে অনুমিত হয় পুথিটি খণ্ডিত বলেই পরবর্তী কাহিনি এতে পাওয়া যায়নি। সম্ভবত ময়ূর ভট্টের কোনো লুপ্তপ্রায় কাহিনির অবশিষ্ট স্মৃতির অবলম্বন করেই এটি আধুনিক কালে রচিত হয়েছিল; কারণ ময়ূর ভট্টের কোনো পুথি আবিষ্কৃত না হলেও তাঁর লেখা অসংলগ্ন কয়েকটি পদের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। বীরভূম রতন লাইব্রেরির অধ্যক্ষ শিবরতন মিত্র প্রাচীন পুথি সংগ্রহের মধ্যে ময়ূর ভট্টের ধর্মপুরাণও এক খণ্ড সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি পুথিটি দিয়েছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির পুথি সংগ্রাহক রাখালদাস কাব্যতীর্থকে, কিন্তু তারপর আর পুথিটির কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা গ্রন্থে পুথিটিকে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অনুমান, পুথিটি পঞ্চদশ শতকে লেখা। কিন্তু তিনিও পুথিটির আর কোনো সন্ধান দিতে পারেননি, পুথিটি কখনও প্রকাশিতও হয়নি। সাহিত্য-পরিষদ-পত্রিকা-র ১৩১২ বঙ্গাব্দের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত "মাণিক গাঙ্গুলি ও ধর্মমঙ্গল" শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক জানিয়েছিলেন যে, ময়ূর ভট্টের গ্রন্থ তখনও বাঁকুড়া জেলায় প্রচলিত ছিল। কিন্তু তিনিও এর আর কোনো পরিচয় দিতে পারেননি।
ময়ূর ভট্ট জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ধর্মমঙ্গল কাব্যের কয়েকজন কবি তাঁকে "দ্বিজ ময়ূরভট্ট" বলে উল্লেখ করেছেন। যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী রচিত কুলশাস্ত্র-দীপিকা গ্রন্থে বারেন্দ্র কুল-পঞ্জিকায় বাৎস্য গোত্রীয় ভট্টশালী গাঞির আদিপুরুষ মহীধরের পুত্র জনৈক ময়ূরভট্টের উল্লেখ পাওয়া যায়। অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এঁকেই ধর্মমঙ্গল কাব্যের আদি কবি বলে অনুমান করে এঁকে ১১৭৯ বা ১১৮০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছির লোক ধরেছেন। এই ময়ূরভট্ট কবি ছিলেন বলেও জানা যায়। কিন্তু অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, "…তিনি বরেন্দ্রভূমির লোক, সেখানে ধর্মপূজাও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। সেখান থেকে কোনও ধর্মমঙ্গল আবিষ্কৃত হয় নাই—ধর্মমঙ্গল একমাত্র রাঢ়েই রচিত হইয়াছিল—অন্যত্র কোথাও ইহা রচিত হয় নাই। অতএব এই ময়ূরভট্টের সহিত ধর্মমঙ্গল কাব্যের আদি কবি ময়ূরভট্টের কোন সম্পর্ক কল্পনা করা যাইতে পারে না।" (আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস, এ মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ২০০৯ সংস্করণ, পৃ. ৫৮৯) অধ্যাপক ভট্টাচার্যের অনুমান, ময়ূর ভট্ট কোনো বাঙালি কবির প্রকৃত নাম নয়। ধর্মঠাকুরের পূজা তখনও নিম্নবর্ণীয় সমাজের মধ্যে আবদ্ধ ছিল বলে সম্ভবত ব্রাহ্মণ কবি ছদ্মনামে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় সূর্যশতক এক গ্রন্থের রচয়িতার নাম ময়ূরভট্ট; ধর্মমঙ্গল কাব্যও এক হিসেবে সূর্যদেবতার মাহাত্ম্যসূচক কাব্য হওয়ায় সম্ভবত কোনো বাঙালি কবি প্রাগুক্ত সংস্কৃত কবির নামটি গ্রহণ করেছিলেন। ময়ূর ভট্ট নামধারী এই কবিই ব্রাহ্মণ কবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম ধর্মমঙ্গল রচনার পথ দেখান। তাঁর দৃষ্টান্তে উৎসাহিত হয়েই পরবর্তীকালে মাণিকরাম, ঘনরাম প্রমুখ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ কবিরা এই কাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
ময়ূর ভট্টের কাব্যের নাম হাকন্দপুরাণ। ঘনরাম চক্রবর্তী লিখেছেন: "হাকন্দপুরাণ মতে ময়ূরভট্টের পথে"। কিন্তু হাকন্দপুরাণ নামে কোনো স্বতন্ত্র কাব্য নেই। রামাই পণ্ডিতের শূণ্যপুরাণের নামও হাকন্দপুরাণ নয়। কারণ তাতে পশ্চিমে সূর্যোদয়ের কথা নেই। অথচ ঘনরাম বলেছেন:
|
হাকন্দপুরাণে লেখা সাক্ষাৎ আমার দেখা |
লাউসেন যেখানে দেহ নয় খণ্ড করে কেটে ধর্মের পূজা করেছিলেন, সেই স্থানটির নামই হাকন্দ। ঘনরাম লিখেছেন:
|
দিবস দ্বাদশ দণ্ডে হাকন্দেতে নব খণ্ডে |
ময়ূর ভট্টই এই হাকন্দ-আখ্যানের রচয়িতা বলে তাঁর কাব্যের নামও হাকন্দপুরাণ। যে ময়নাপুর গ্রামের যাত্রাসিদ্ধি নামক ধর্মঠাকুরের ডোম পুরোহিতেরা নিজেদের রামাই পণ্ডিতের বংশধর বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন, সেই গ্রামেই হাকন্দপোখর নামে একটি অতি প্রাচীন ও বৃহৎ পুকুর আছে। বারুণীর সময় এর তীরে মেলা বসে। যাত্রীরা এতে স্নানের জয় পায় না, কাদা জলই মাথায় দেয়। ময়ূর ভট্টের বর্ণিত হাকন্দের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকতেও পারে। আধুনিক ময়ূর ভট্ট তাঁর কাব্যকে সর্বত্রই "ধর্মপুরাণ", শ্রীধর্মপুরাণ", কখনও বা "অনাদিপুরাণ" বলে উল্লেখ করেছেন, "হাকন্দপুরাণ" একবারও বলেননি। এর থেকেই বোঝা যায় যে কাব্যটি অর্বাচীন।