বিষয়বস্তুতে চলুন

মঙ্গলকাব্য/ধর্মমঙ্গল/আখ্যানবস্তু

উইকিবই থেকে

ধর্মঠাকুরের "ঘরভরা" অনুষ্ঠানের বারো দিনে চব্বিশ পালায় গীত কাহিনিটি নিচে দেওয়া হল:

গৌড়ে ধর্মপাল নামে এক বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গৌড়ের সম্রাট হলেন। গৌড়ের মন্ত্রী মহামদ ছিলেন সম্পর্কে গৌড়েশ্বরের শ্যালক। একদিন গৌড়েশ্বর হাতির পিঠে চড়ে শিকার করতে বেরিয়েছেন, এমন সময় দেখলেন, তাঁর অত্যন্ত অনুগত প্রজা সোম ঘোষ মন্ত্রীর চক্রান্তে কারারুদ্ধ হয়েছেন। মন্ত্রীকে কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেন না। রেগে গৌড়েশ্বর মন্ত্রীকে প্রচুর ভর্ৎসনা করলেন এবং অবিলম্বে সোম ঘোষকে মুক্তি দিলেন। রাঢ়ে অজয় নদের তীরে ত্রিষষ্ঠীর গড়ে কর্ণসেন নামে এক সামন্ত রাজা বাস করতেন। সোম ঘোষকে তিনি কর্ণসেনের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে সেখানে পাঠালেন। সোম ঘোষ তাঁর শিশুপুত্র ইছাইকে নিয়ে ত্রিষষ্ঠীর গড়ে এলে কর্ণসেন সাদরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার গৌরাঙ্গপুরের ইছাই ঘোষের দেউল। দেবী ভগবতীর উদ্দেশ্যে নির্মিত এই মন্দিরটি ইছাই ঘোষ কর্তৃক নির্মিত বলে কথিত আছে।

কিন্তু কালক্রমে ইছাই ঘোষ অত্যন্ত দুর্দান্ত হয়ে উঠল। একদিন সে আচমকা কর্ণসেনের প্রাসাদ আক্রমণ করে তাঁকে ভয় দেখিয়ে গড় থেকে তাড়িয়ে দিল। কর্ণসেন সপরিবারে গৌড়ে পালিয়ে এলেন এবং ইছাই নতুন গড় নির্মাণ করে তার নাম রাখল ঢেকুর। গৌড়েশ্বরের কর্মচারী রাজকর আদায় করতে এলে ইছাই তাকে অপমান করে দূর করে দিল। গৌড়েশ্বর এর জন্য ইছাইকে উচিত শাস্তি দেবেন বলে ঠিক করলেন। তিনি নয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে ঢেকুর আক্রমণ করলেন। কিন্তু অজয় নদের বন্যায় তাঁর বহু সৈন্য নষ্ট হল। অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে তিনি কোনোক্রমে গৌড়ে ফিরে এলেন। এর ফলে কর্ণসেনের ছয় পুত্র নিহত হল, ছয় পুত্রবধূ সহমরণে গেল, শোকে ছয় রানি আত্মঘাতিনী হলেন; কর্ণসেনও সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে পাগল হয়ে গেলেন।

কর্ণসেনের অবস্থা দেখে গৌড়েশ্বরের অনুকম্পা হল। তিনি তাঁকে আবার সংসারী হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কর্ণসেন সে-কথায় কান দিলেন না। গৌড়েশ্বর ভাবলেন তাঁর কুমারী শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে কর্ণসেনের বিবাহ দিলে তাঁকে আবার সংসারে আসক্ত করা যাবে। কিন্তু এই বিবাহের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা ছিলেন মন্ত্রী মহামদ। তিনি যে তাঁর প্রিয় ভগিনীর সঙ্গে বৃদ্ধ কর্ণসেনের বিবাহে রাজি হবেন না, সে-কথা ভালোই জানতেন গৌড়েশ্বর। তাই তিনি রানির সঙ্গে পরামর্শ করে একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। কোনো রাজকার্যের ছুতোয় তিনি মহামদকে পাঠিয়ে দিলেন কামরূপে এবং সেই সুযোগে কর্ণসেনের সঙ্গে রঞ্জাবতীর বিবাহ দিয়ে কর্ণসেনকে সুদূর দক্ষিণে ময়নানগরের সামন্তরাজা নিযুক্ত করে নবদম্পতিকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন। কামরূপ থেকে ফিরে মহামদ জানতে পারলেন এই বিবাহের কথা। রাজা কৌশলে তাঁর ভগিনীকে এক বৃদ্ধের হাতে সমর্পণ করেছেন জেনে রাজার উপর তাঁর রাগ হল। কিন্তু রাজাকে তিনি কিছুই বলতে পারলেন না; তাই শেষে রাগ গিয়ে পড়ল তাঁর ভগিনীপতির উপর। মহামদ প্রতিজ্ঞা করলেন যে, জীবনে তিনি কর্ণসেনের মুখদর্শন করবেন না এবং রঞ্জাবতীর সঙ্গেও সব সম্পর্ক ঘুচিয়ে দেবেন।

অনেক দিন পিতামাতার সংবাদ না পেয়ে; বিশেষত যে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে, তিনি ফিরে সব শুনে কী বলেছেন তা জানার জন্য উৎকণ্ঠিত রঞ্জাবতীর কর্ণসেনকে গৌড়ে যেতে অনুরোধ করলেন। কর্ণসেন প্রথমে বিনা আমন্ত্রণে সেখানে যেতে না চাইলেও শেষে পত্নীর কাতর অনুনয় উপেক্ষা করতে পারলেন না। কিন্তু গৌড়ের রাজসভায় উপস্থিত হলে মহামদ প্রকাশ্য সভাতেই তাঁকে আঁটকুড়ে ও তাঁর পত্নীকে বন্ধ্যা বলে গালি দিলেন, গৌড়েশ্বর কোনো প্রতিবাদ করতে পারলেন না। লজ্জায় অপমানে কর্ণসেন ফিরে এলেন নিজের রাজধানীতে।

সব শুনে রঞ্জাবতী স্বামীর নিদারুণ অপমানে ব্যথিত হয়ে পড়লেন। তিনিও প্রতিজ্ঞা করলেন এমন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে আর মনে রাখবেন না। সেই সঙ্গে বন্ধ্যা অপবাদ ঘোচানোর জন্য নানারকম তুকতাক ও ঔষধের সাহায্য নিতেও শুরু করলেন। একদিন ধর্মঠাকুরের পুরোহিত রমাই পণ্ডিত ধর্মেরই গাজন নিয়ে সেই নগরে প্রবেশ করলেন। তাঁকে ডেকে রঞ্জাবতী জানলেন যে, ধর্মঠাকুরের পূজা করলে পুত্রলাভ হয়। শুনে রঞ্জাবতীও ধর্মঠাকুরের পূজা করবেন বলে স্থির করলেন। তিনি নগরে ধর্মের মন্দির নির্মাণ করিয়ে দিলেন। কিন্তু নানাভাবে ধর্মঠাকুরের পূজা করেও রঞ্জাবতী পুত্রলাভ করতে পারলেন না। অবশেষে তিনি রমাই পণ্ডিতের শরণাপন্ন হলেন। রমাই বললেন, ধর্মঠাকুরের পূজা করতে যদি রঞ্জাবতী শালে ভর দিতে পারেন তবে অবশ্যই তাঁর পুত্রলাভ হবে। শালে ভর দেওয়ার অর্থ লৌহশলাকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। রঞ্জাবতী তাতেই রাজি হলেন। কর্ণসেন তাঁকে এই কঠিন ব্রত উদ্‌যাপন করতে নিষেধ করলেন। কিন্তু রঞ্জাবতী শুনলেন না। অবশেষে কর্ণসেনও আর বাধা দিতে পারলেন না, ব্রতের সব আয়োজন করে দিতে লাগলেন। রঞ্জাবতী পূজার সামগ্রী নিয়ে চাঁপাই নদীর তীরে এসে ধর্মঠাকুরের পূজা করলেন এবং পূজাশেষে লৌহশলাকায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করলেন। তাঁর নিষ্ঠা ও ভক্তি দেখে ধর্মঠাকুরের দয়া হল। তিনি সশরীরে আবির্ভূত হয়ে রঞ্জাবতীর প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁকে পুত্রবর দিয়ে গেলেন।

যথাসময়ে রঞ্জাবতীর একটি পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হল, তার নাম রাখা হল লাউসেন। ছেলেবেলাতেই লাউসেনের খেলার এক সঙ্গী জুটল, তার নাম কর্পূরসেন। দুই পুত্র নিয়ে সুখে রঞ্জাবতীর জীবন কাটতে লাগল। লাউসেন ও কর্পূরসেন মল্লবিদ্যা শিক্ষা করলেন। ধর্মঠাকুরের কৃপায় তাঁরা অল্পদিনেই মল্লবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠে বড়ো বড়ো মল্লবীরকে বাহুবলে পরাজিত করতে লাগলেন। পিতামাতার শিক্ষার গুণে ও ধর্মঠাকুরের আশীর্বাদে লাউসেন আদর্শ যুবক হয়ে উঠলেন। কর্পূরসেনকে সঙ্গে নিয়ে গৌড়ে গিয়ে তিনি তাঁদের মেসোমশাই গৌড়েশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। বৃদ্ধ রাজা কর্ণসেন ও রঞ্জাবতী তাতে বড়োই শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কিন্তু লাউসেন কোনো কথা শুনলেন না। বাধ্য হয়ে পিতামাতাকে সম্মতি দিতেই হল।

শুভদিন দেখে লাউসেন ও কর্ণসেন গৌড়ের পথে যাত্রা করলেন। পথে লাউসেন একটি দুর্দান্ত বাঘ ও এক নরমাংসভোজী কুমিরকে বধ করলেন। কিন্তু পথের বিপদ সেখানেই শেষ হল না। জামতী নামক স্থানে এক কুচরিত্রা নারী লাউসেনকে বিপন্ন করার জন্য চক্রান্ত করল। কিন্তু তার চক্রান্ত ব্যর্থ হল। তার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে লাউসেন ও কর্পূরসেন প্রবেশ করলেন নারীর রাজ্য গোলাহাটে। সেখানকার রানি সুরীক্ষা কতগুলি হেঁয়ালি জিজ্ঞাসা করে লাউসেনকে বন্দী করে রাখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাউসেন সব-কটি হেঁআলিরই সন্তোষজনক উত্তর দিয়ে তাঁর হাত থেকে মুক্তি লাভ করলেন।

এদিকে রাজমন্ত্রী মহামদ ভাগিয়েনের আগমনের সংবাদ আগেই পেয়েছিলেন। তিনিও লাউসেনকে বিপন্ন করার জন্য নানারকম চক্রান্তে লিপ্ত হলেন। লাউসেন ও কর্পূরসেনকে চোর প্রতিপন্ন করার জন্য তিনি নগরে ঘোষণা করে দিলেন, কারও বাড়িতে যদি কোনো প্রবাসী ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে তাকে রাজদণ্ড ভোগ করতে হবে। লাউসেন ও কর্পূরসেন এক পান-ব্যবসায়ীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গৃহস্বামী বিপদের মধ্যে ফেলতে চাইলেন না তিনি। বরং বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিলেন গাছতলায়। মহামদের নির্দেশে রাজার পাটহস্তী তাঁর শিয়রে বেঁধে রাখা হল। তারপর তাঁকে হাতিচোর অপবাদ দিয়ে কারারুদ্ধ করা হল। লাউসেন রাজার সম্মুখে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করলেন। রাজাও তাঁর পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। নিজের আস্তাবল থেকে সবচেয়ে ভালো ঘোড়াটি তাঁকে পুরস্কার দিলেন। গৌড়েশ্বরের দেওয়া বিবিধ সম্মানে ভূষিত হয়ে লাউসেন ও কর্পূরসেন স্বদেশের পথে যাত্রা করলেন। পথে তেরো জন ডোমকে সঙ্গে করে তাঁরা রাজ্যে নিয়ে গেলেন। তাদের প্রধান কালু ডোমকে লাউসেন নিজের সেনাপতি পদে স্থাপন করলেন। ডোমেরা পরম ভক্তিভরে লাউসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সেবা করতে লাগল।

এদিকে রাজমন্ত্রী মহামদ লাউসেনকে অপদস্থ করার নতুন কোনো উপায় খুঁজতে লাগলেন। কামরূপের রাজা ইতিমধ্যেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। মহামদ গৌড়েশ্বরকে পরামর্শ দিলেন লাউসেনকে তাঁর বিরুদ্ধে পাঠানোর জন্য। নিতান্ত ব্যক্তিত্বহীন গৌড়েশ্বর মন্ত্রীর কথায় ওঠেন বসেন। তিনিও লাউসেনকে এসে কামরূপ আক্রমণ করার জন্য চিঠি লিখে পাঠালেন। লাউসেন তাঁর সেনাপতি কালু ডোমকে সঙ্গে নিয়ে গৌড়ে যাত্রা করলেন, তারপর গৌড় থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে কামরূপরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে এসে লাউসেন দেখলেন নদীর জল কানায় কানায় পূর্ণ এবং নদী পার হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। অবশেষে তিনি জানতে পারলেন যে গৌড়েশ্বরের মায়ের কাছে একটি কাটারি ও একটি জপমালা আছে। সেই কাটারির স্পর্শে ব্রহ্মপুত্রের জল শুকিয়ে যায় এবং জপমালার সাহায্যে সহজেই কামরূপ জয় করা যায়। লাউসেন গৌড়েশ্বরের মায়ের কাছ থেকে সেই কাটারি ও জপমালা আনালেন। তারপর কাটারির সাহায্যে সহজেই ব্রহ্মপুত্র অতিক্রম করলেন এবং জপমালার সাহায্যে কামরূপের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে মন্দির থেকে দূর করে দিয়ে সহজেই সেই রাজ্য অধিকার করলেন। কামরূপরাজ লাউসেনের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নিজের পরমাসুন্দরী কন্যা কলিঙ্গার সঙ্গে তাঁর বিবাহ দিলেন। লাউসেন সগৌরবে গৌড়ে ফিরে এলেন। তারপর গৌড় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি মঙ্গলকোটের রাজা গজপতির কন্যা অমলাকে বিবাহ করে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। বর্ধমানের রাজাও তাঁর কন্যা বিলমাকে লাউসেনের হাতে সমর্পণ করলেন। কর্ণসেন ও রঞ্জাবতী সবাইকে সাদরে বরণ করে নিলেন।

সিমুলার রাজা হরিপালের কন্যা কানড়ার রূপযৌবনে মুগ্ধ হয়ে গৌড়েশ্বর বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। হরিপালের কাছে ঘটক পাঠানো হল। হরিপাল বিবাহে সম্মতি দিলেন, কিন্তু কানড়া রাজি হলেন না; তিনি গৌড়েশ্বরের ঘটককে অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন। গৌড়েশ্বর এই অপমানে ক্রুদ্ধ হয়ে নয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে সিমুলায় উপস্থিত হলেন। কানড়া গৌড়েশ্বরকে লোহার তৈরি একটি গণ্ডার দিয়ে বললেন, যে সেটি এক আঘাতে দু-টুকরো করতে পারবে, কানড়া তাকেই বিবাহ করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। বৃদ্ধ রাজা প্রাণপণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু লোহার গণ্ডারের গায়ে একটি আঁচড়ও কাটতে পারলেন না। মহামদের পরামর্শে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে ডেকে পাঠালেন। লাউসেন এসে অনায়াসেই লোহার গণ্ডার দু-টুকরো করে ফেললেন। কানড়া লাউসেনকে বিবাহ করতে চাইলেন, কিন্তু গৌড়েশ্বর তাতে লাউসেনের উপর চটলেন। অবশেষে লাউসেনের সঙ্গে কানড়ার এই চুক্তি হল যে, লাউসেন যদি কানড়ার হাতে পরাজিত হন, তবেই কানড়া তাঁকে বিবাহ করবেন। যুদ্ধে লাউসেন কানড়ার হাতে পরাজিত হয়ে তাকে বিবাহ করতে বাধ্য হলেন। গৌড়েশ্বর নিরাশ হয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন। লাউসেন কানড়াকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন নিজের রাজধানী ময়নানগরে।

এইভাবে বারংবার চেষ্টা করেও যখন লাউসেনের ক্ষতি মহামদ করতে পারলেন না, তখন তিনি আবার এক নতুন ফন্দি আঁটলেন। তিনি গৌড়েশ্বরকে পরামর্শ দিলেন যে, ঢেকুর গড়ে ইছাই গোয়ালা অনেক দিন স্বাধীনভাবে বাস করছে, গৌড়ে রাজকর পাঠাচ্ছে না; সুতরাং লাউসেনকে তার বিরুদ্ধে পাঠিয়ে তাঁকে দিয়ে রাজকর আদায় করা হোক। গৌড়েশ্বর ভাবলেন, এ অতি উত্তম প্রস্তাব; তিনিও অবিলম্বে লাউসেনকে গৌড়ে আসতে বলে চিঠি দিলেন। রঞ্জাবতী ও কর্ণসেন এই খবর শুনে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়লেন; কারণ, এই ঢেকুরেই একদিন কর্ণসেন ইছাই ঘোষের হাতে পরাজিত হয়ে ছয় পুত্রকে হারিয়েছিলেন। লাউসেন কিন্তু সবার আপত্তি উপেক্ষা করে গৌড়েশ্বরের অনুমতিক্রমে নয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে অজয় নদের তীরে এসে উপস্থিত হলেন। সেখানে ইছাই ঘোষের সেনাপতি লোহাটা বজ্জরের সঙ্গে লাউসেনের তুমুল যুদ্ধ হল। লোহাটা পরাজিত হল, লাউসেন লোহাটার ছিন্নমুণ্ড গৌড়েশ্বরের কাছে উপহার হিসেবে পাঠালেন। মহামদ এই মুণ্ড দ্বারা লাউসেনের একটি মায়ামুণ্ড প্রস্তুত করে ময়নানগরে পাঠালেন। মায়ামুণ্ড দেখে লাউসেনের বৃদ্ধ পিতামাতা পুত্রশোকে কাতর হয়ে পড়লেন এবং লাউসেনের চার স্ত্রী স্বামীর চিতায় আত্মবিসর্জন করার জন্য প্রস্তুত হলেন। ধর্মঠাকুর তা জানতে পেরে হনুমানকে ছদ্মবেশে সেখানে পাঠিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটিত করে দিলেন। সত্য জেনে সকলে নিশ্চিন্ত হলেন। এদিকে ইছাই ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের ভয়ানক যুদ্ধ হল। দু-জনেই দু-জনের সমকক্ষ বীর। লাউসেন ধর্মঠাকুরের অনুগৃহীত, আর ইছাই ঘোষ পার্বতীর আশ্রিত। অতএব সেখানে মানুষকে উপলক্ষ্যে করে আসল যুদ্ধ বাধল দুই দেবতার মধ্যে—একদিকে ধর্মঠাকুর লাউসেনকে রক্ষা করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট, অন্যদিকে পার্বতীও তাঁর ভক্ত ইছাই ঘোষকে রক্ষা করতে তৎপর। অবশেষে লাউসেনেরই জয় হল যুদ্ধে। বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেই ইছাই নিহত হল তার হাতে।

মহামদ দেখলেন লাউসেন ধর্মঠাকুরের ভক্ত বলেই অমন শক্তিশালী হয়েছেন, তাই তিনিও শক্তিলাভের আশায় ধর্মঠাকুরের পূজা করতে গেলেন। কিন্তু তাঁর সকাম ভক্তিতে বিরক্ত হয়ে ধর্মঠাকুর পূজায় বিঘ্ন সৃষ্টি করলেন: গৌড় নগরে অবিরাম বৃষ্টি আরম্ভ হল, কিছুতেই থামল না সেই বৃষ্টি, সমস্ত নগর জলস্রোতে ভেসে যেতে লাগল। বিপন্ন হয়ে গৌড়েশ্বর লাউসেনের শরণাপন্ন হলেন। লাউসেন গৌড় রাজ্যের সমস্ত পাপ দূর করার জন্য ধর্মপূজার শ্রেষ্ঠ সাধনা পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয় ঘটাবার জন্য হাকন্দ নামক স্থানে গিয়ে কঠিন তপস্যা আরম্ভ করলেন। তিনি ধর্মঠাকুরের নামে নিজের দেহ নয় খণ্ডে বিভক্ত করে তা দিয়ে আহুতি দিলেন। লাউসেন যখন ধর্মপূজার এই কঠিনতম সাধনায় নিমগ্ন, তখন তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মহামদ ময়নানগর আক্রমণ করলেন। কালু ডোমের পত্নী লখাই ডোমনীর সঙ্গে মহামদের তুমুল যুদ্ধ হল। একা লখাই মহামদের বিপুল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাঁকে সসৈন্যে নদীর তীর পর্যন্ত তাড়িয়ে দিয়ে এল। কালু ডোম নিজের সত্যরক্ষা করার জন্য বিশ্বাসঘাতকের হাতে নিজের প্রাণ বলি দিল। লাউসেনের অক্লান্ত সাধনায় তুষ্ট হয়ে ধর্মঠাকুর সূর্যদেবতাকে অমাবস্যার রাতে পশ্চিম দিকে উদিত হওয়ার আদেশ দিলেন। রাজ্যের সকল অমঙ্গল দূর হয়ে গেল। লাউসেন সগৌরবে গৌড়েশ্বরের দরবারে এসে উপস্থিত হলেন। মহামদ লাউসেনের পশ্চিমে সূর্যোদয়ের ব্যাপারটিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য হরিহর নামে এক বাদ্যকরকে ঘুষ দিয়ে বাধ্য করে রাখলেন। কিন্তু ধর্মভয়ে হরিহর সত্য কথা প্রকাশ করে ফেলল। মহামদ প্রকাশ্য রাজসভায় চরম লজ্জিত হয়ে পড়লেন। এই-সব অপকর্মের জন্য মহামদের উপর ধর্মঠাকুর অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। ধর্মঠাকুরের অভিশাপে তাঁর সর্বাঙ্গে কুষ্ঠরোগে ছেয়ে গেল। লাউসেন দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে রোগ থেকে মুক্ত করে দিলেন, কিন্তু তাঁর দুষ্কর্মের শাস্তিস্বরূপ তাঁর মুখে একটি শ্বেতকুষ্ঠের চিহ্ন রেখে দিলেন। ধর্মঠাকুরের পূজা প্রচার করে লাউসেন যথাকালে পুত্র চিত্রসেনকে রাজ্যভার দিয়ে স্বর্গারোহণ করলেন।