ভাষাবিজ্ঞান/সমাজভাষাবিজ্ঞান: প্রাথমিক ধারণা
ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের সম্পর্ক
[সম্পাদনা]ভাষার সমাজতত্ত্ব (Sociology of Language) ও সমাজভাষাবিজ্ঞান (Sociolinguistics) পরস্পর-সম্পর্কিত অথচ ভিন্ন দুটি বিদ্যা। উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়, কিন্তু সেই পর্যালোচনার পদ্ধতি, আলোচ্য বিষয় এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
- ভাষার সমাজতত্ত্বের ধারণা ও আলোচনার ক্ষেত্র
ভাষার সমাজতত্ত্ব মূলত ভাষার সামাজিক ভূমিকা, ভাষার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষার স্বীকৃতি, ভাষানীতি, ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার এবং ভাষার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে। কীভাবে সমাজ ভাষাকে নির্ধারণ করে, ভাষা সমাজের কাঠামোকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং ভাষার প্রতি সমাজের মনোভাব কীভাবে গঠিত হয়, তা এই শাখার আলোচ্য বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনও দেশে কোনও ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন কীভাবে সেই সিদ্ধান্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্কে প্রভাবিত করে এবং কীভাবে একটি ভাষার স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে—তা ভাষার সমাজতত্ত্বের গবেষকেরা খতিয়ে দেখেন।
- সমাজভাষাবিজ্ঞানের ধারণা ও ক্ষেত্র
সমাজভাষাবিজ্ঞান হল ভাষাবিজ্ঞানের একটি শাখা। এই শাখায় ভাষার সামাজিক বৈচিত্র্য, সামাজিক উপভাষা (social dialect), ভাষা ব্যবহারের সামাজিক প্রেক্ষাপট, ভাষার বিবর্তন ও ভাষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলোচিত হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী, বয়স, লিঙ্গ, সাক্ষরতা এবং সামাজিক পরিস্থিতি ভাষার ব্যবহারকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা পর্যালোচনা করেন সমাজভাষাবিজ্ঞানীরা। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত শ্রেণীর ভাষার পার্থক্য, নারী ও পুরুষের ভাষার পার্থক্য, শহরবাসী ও গ্রামবাসীর ভাষার পার্থক্য ইত্যাদি সমাজভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।
- ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য ও সম্পর্ক
ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। উভয় শাখাই ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু ভাষার সমাজতত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে ভাষার সামাজিক প্রভাব ও ভাষার সামাজিক ভূমিকা পর্যালোচনা করে, অন্যদিকে সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষাবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে ভাষাকেন্দ্রিক সামাজিক বৈচিত্র্য ও ভাষা-ব্যবহারের পার্থক্য আলোচনা করে।
সংক্ষেপে বলা যায়:
- ভাষার সমাজতত্ত্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল সমাজ-কাঠামো, সামাজিক নীতি, সামাজিক শক্তি ও সামগ্রিক ক্ষেত্রে সমাজে ভাষা ও ভাষা-ব্যবহারের প্রভাব।
- সমাজভাষাবিজ্ঞানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হল ভাষার বৈচিত্র্য, ভাষা-ব্যবহারের সামাজিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক উপভাষা ও ভাষার উপর সামাজিক প্রভাব।
- গবেষণা পদ্ধতি
ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের গবেষণা-পদ্ধতি আলাদা। ভাষার সমাজতত্ত্ব সাধারণত সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতি—সমীক্ষা, সাক্ষাৎকার, নথি বিশ্লেষণ ইত্যাদি ব্যবহার করে, আর সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—ভাষার নমুনা সংগ্রহ, কথোপকথন বিশ্লেষণ, ভাষার ব্যবহারের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ ইত্যাদি অনুসরণ করে। এই পদ্ধতির পার্থক্য উভয় শাখার গবেষণার প্রকৃতি ও ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলে।
- পারস্পরিক সম্পর্কের বিস্তারিত আলোচনা
ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করলেও উভয় শাখার দৃষ্টিভঙ্গি ও রীতিপদ্ধতি আলাদা। ভাষার সমাজতত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা ও ভাষা-ব্যবহারের সামাজিক প্রভাব আলোচনা করে, অন্যদিকে সমাজভাষাবিজ্ঞান ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা ও ভাষা-ব্যবহারের সামাজিক বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করে। বস্তুত উভয় শাখাই একে অপরের সম্পূরক। ভাষার সমাজতত্ত্ব সমাজের কাঠামো ও নীতির সঙ্গে ভাষার সম্পর্কটি বুঝতে সাহায্য করে, আবার সমাজভাষাবিজ্ঞান সমাজের প্রেক্ষাপটে ভাষার বৈচিত্র্য ও ব্যবহারগত পার্থক্যের দিকটি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।
- উপসংহার
ভাষার সমাজতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞান হল দুটি সম্পর্কিত অথচ ভিন্ন শাখা। উভয় শাখাই ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে, কিন্তু উভয় শাখার দৃষ্টিভঙ্গি, পদ্ধতি ও আলোচ্য বিষয় আলাদা। এই দুই শাখা একে অপরের সম্পূরক এবং ভাষা ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে অপরিহার্য।