ভাষাবিজ্ঞান/ভাষার শ্রেণীবিভাগ
ভাষার বংশগত শ্রেণীবিভাগ
[সম্পাদনা]সমগ্র বিশ্বের ভাষাগুলিকে এক-একটি উৎস ভাষার নিরিখে নির্দিষ্ট পরিবারে ভাগ করাকেই ভাষার বংশগত শ্রেণীবিভাগ বলে। এই পদ্ধতিতে ভাষাগুলিকে ধ্বনি, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডারের সাদৃশ্যের ভিত্তিতে এক-একটি ভাষা-পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ধরনের শ্রেণীবিভাগ ভাষাতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র, যার মাধ্যমে একটি উৎস ভাষা থেকে একাধিক ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও বিবর্তনের ধারাটি স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়।
- ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার - পটভূমি ও গুরুত্ব
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার হল বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা-পরিবার। সমগ্র বিশ্বেই এই ভাষা-পরিবারের ভাষাগুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এই ভাষা-পরিবারের উৎস ভাষাটির নাম দেওয়া হয়েছে প্রত্ন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। এই ভাষার কোনও লিখিত নিদর্শন আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কুরগান তত্ত্ব অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০-৩৫০০ অব্দ নাগাদ এই ভাষা পূর্ব ইউরোপের পন্টিক-কাস্পিয়ান অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে এই ভাষাটিই নানা শাখা-উপশাখায় বিভক্ত হয়ে বর্তমান ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলির জন্ম দিয়েছে।
- ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার বিভিন্ন শাখার পরিচয়
- কেলটিক: কেলটিক জাতির সঙ্গে যুক্ত এই শাখাটি প্রধানত মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে আইরিশ, স্কটিশ, গেলিক, ওয়েলশ ইত্যাদি ভাষা এই শাখাভুক্ত।
- গ্রিক: গ্রিক ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অন্তর্গত একটি স্বাধীন শাখা। প্রাচীন কালে এই ভাষায় রচিত ইলিয়াড, ওডিসি এবং দার্শনিকদের রচনাবলী বিশ্বসাহিত্যে অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে।
- ইতালিক: ইতালিক শাখার প্রধান ভাষা ছিল লাতিন। রোমান সাম্রাজ্যের প্রসারের ফলে এই ভাষা ইউরোপের ধর্ম, বিজ্ঞান ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে ইতালীয়, ফরাসি, স্পেনীয়, পর্তুগিজ, রোমানীয় ইত্যাদি ভাষা এই ভাষা থেকে উদ্ভূত হয়।
- জার্মানিক: জার্মানিক বা টিউটনিক ভাষার প্রাচীনতম রূপটি হল গথিক। ইংরেজি, জার্মান, সুইডীয়, নরওয়েজীয়, ডেনীয় ইত্যাদি ভাষা এই শাখা থেকে উদ্ভূত। ইংরেজি এই শাখার বৃহত্তম ভাষা।
- হিট্টীয়: প্রাচীন আনাতোলিয়ার হিট্টীয় সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হিট্টীয় ভাষার লিখিত নিদর্শন মূলত উক্ত অঞ্চলেই পাওয়া যায়। তবে এই ভাষা আজ বিলুপ্ত।
- তোখারীয়: প্রাচীন মধ্য এশিয়ার তোখারীয় জাতির এই মাতৃভাষাও আজ বিলুপ্ত। এই ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চীনের তুর্কিস্তান থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে।
- বাল্টো-স্লাভীয়: পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে প্রচলিত রাশিয়ান, পোলিশ, চেক, স্লোভাক, সার্বিয়ান, লিথুয়ানিয়ান, লাতভিয়ান ইত্যাদি ভাষা এই শাখার অন্তর্গত।
- আলবেনীয়: আধুনিক আলবেনিয়ার মাতৃভাষা আলবেনীয় ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার একটি স্বতন্ত্র শাখা।
- আর্মেনীয়: আর্মেনিয়ার মাতৃভাষা আর্মেনীয়ের প্রাচীনতম নিদর্শন পঞ্চম শতকে বাইবেলের অনুবাদ।
- ইন্দো-ইরানীয়: এই শাখার অন্তর্গত ভাষাগুলি ভারতীয় আর্য ভাষা (হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, অসমীয়া, ওড়িয়া, নেপালি ইত্যাদি) এবং ইরানীয় ভাষা (ফারসি, পাশতো, কুর্দি, বালোচ, লুরি ইত্যাদি) দুই উপশাখায় বিভক্ত। এই শাখার সাহিত্যিক উত্তরাধিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেদ ও আবেস্তা এই শাখার প্রাচীন সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নিদর্শন।
- ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবার বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল এটির ব্যাপক ভৌগোলিক বিস্তার ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য। এই ভাষাগুলি ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস ও সাহিত্যে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করেছে। এই ভাষা-পরিবার অধিকাংশ ভাষাই বর্তমানে জীবিত, শুধুমাত্র হিট্টীয় ও তোখারীয়ের ন্যায় কয়েকটি শাখা বিলুপ্ত। বাংলা ভাষাও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় শাখার অন্যতম নব্য ভারতীয় আর্যভাষা।
- উপসংহার
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের বংশগত শ্রেণীবিভাগ ভাষাতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই শ্রেণীবিভাগ ভাষাগুলির ঐতিহাসিক বিকাশ ও সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে এবং ভাষার মূল উৎসটি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ভাষা-পরিবার বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সমগ্র বিশ্বে ভাষার ইতিহাসে একটি অনন্য স্থানের অধিকারী।
ভাষার রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগ
[সম্পাদনা]ভাষার রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগ (Morphological Classification of Language) বলতে ভাষার গঠন বা আকৃতির ভিত্তিতে বিশ্বের ভাষাগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করার প্রক্রিয়াটিকে বোঝায়। এই পদ্ধতিতে ভাষার সাংগঠনিক অবয়ব, শব্দ-গঠন ও বাক্য-গঠনের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়। রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগ মূলত ভাষার বাহ্যিক গঠন বা আকৃতির উপর ভিত্তি করে করা হয়, যা ভাষার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলিকে স্পষ্ট করে তোলে।
- রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগের প্রকারভেদ
রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগে পৃথিবীর ভাষাগুলিকে মূলত দুটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যেমন: সমবায়ী (synthetic) ও অসমবায়ী (analytic) ভাষা। সমবায়ী ভাষাগুলিকে আবার তিনটি উপশ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যেমন: মুক্তান্বয়ী (agglutinative), অত্যন্বয়ী (polysynthetic) ও সমন্বয়ী (fusional)।
- অসমবায়ী ভাষা
অসমবায়ী ভাষাগুলিতে শব্দের গঠনে বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ ইত্যাদির আলাদা কোনও অস্তিত্ব থাকে না। এই ভাষাগুলিতে শব্দার্থ ও বাক্যে শব্দের ভূমিকা মূলত শব্দের অবস্থান ও অন্যান্য শব্দের সঙ্গে সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। অসমবায়ী ভাষায় প্রতিটি শব্দ সাধারণত একটি মাত্র অর্থ বহন করে এবং বাক্যের অর্থ বোঝার জন্য শব্দের ক্রম বা অবস্থান এই ধরনের ভাষায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চীনা ভাষা এই শ্রেণীর ভাষার একটি উদাহরণ।
- সমবায়ী ভাষা
সমবায়ী ভাষাগুলিতে শব্দ-গঠনে বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ ইত্যাদির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এই ভাষাগুলিতে একটি শব্দের সঙ্গে এক বা একাধিক প্রত্যয় যুক্ত করে নতুন শব্দ বা নতুন অর্থ গঠন করা যায়। সমবায়ী ভাষাগুলিকে আবার চারটি উপশ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যেমন: মুক্তান্বয়ী, অত্যন্বয়ী ও সমন্বয়ী।
- মুক্তান্বয়ী ভাষা
মুক্তান্বয়ী ভাষাগুলিতে শব্দের সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যয় বা উপসর্গ যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয়। এই প্রত্যয়গুলি স্বাধীন পদ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এই ভাষাগুলিতে প্রত্যেকটি প্রত্যয় একটি নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে এবং শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ গঠন করে। তুর্কি, সোয়াহিলি, দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাগুলি মুক্তান্বয়ী ভাষার উদাহরণ।
- অত্যন্বয়ী ভাষা
অত্যন্বয়ী ভাষাগুলিতে একটি শব্দের মধ্যে বাক্যের অর্থ প্রকাশ করা হয়। এই ভাষাগুলিতে শব্দের সঙ্গে অনেকগুলি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে একটি জটিল শব্দ গঠন করে, যা একটি পূর্ণ বাক্যের সমতুল্য হয়। এই ভাষাগুলিতে বাক্যের বাইরে শব্দের স্বাধীন ব্যবহার খুব কম। এস্কিমো ভাষা এই শ্রেণীর উদাহরণ।
- সমন্বয়ী ভাষা
সমন্বয়ী ভাষাগুলিতে প্রত্যয় বা উপসর্গগুলি শব্দ বা পদ গঠনে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু বাক্যে স্বাধীন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। এই ভাষাগুলিতে প্রত্যয় একাধিক অর্থ বহন করতে পারে এবং শব্দের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। সংস্কৃত, লাতিন, গ্রিক ভাষা এই শ্রেণীর উদাহরণ।
- রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগের গুরুত্ব
রূপতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগের মাধ্যমে ভাষার সাংগঠনিক অবয়ব স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণও সম্ভব হয়। এই পদ্ধতিতে ভাষায় শব্দ-গঠনের প্রক্রিয়া এবং বাক্যে শব্দ-ব্যবহারের পদ্ধতি, ভাষার অন্তর্নিহিত ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যও গভীরভাবে বোঝা যায়। ভাষাবিজ্ঞানের অন্তর্গত ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দার্থবিদ্যা, বাক্যতত্ত্ব ও অভিধানবিজ্ঞানের ন্যায় বিভিন্ন শাখার সঙ্গে এই শ্রেণীবিভাগ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এছাড়াও এই পদ্ধতি ভাষার ইতিহাস ও বিকাশের ধারাটি বোঝার ক্ষেত্রেও সহায়ক।
- উপসংহার
রূপগতত্ত্বগত শ্রেণীবিভাগ ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পদ্ধতি অনুযায়ী ভাষাগুলিকে প্রধানত অসমবায়ী ও সমবায়ী এবং সমবায়ী ভাষাকে আবার মুক্তান্বয়ী, অত্যন্বয়ী ও সমন্বয়ী ভাষায় ভাগ করা হয়। ভাষার গঠন ও বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে এই ধরনের শ্রেণীবিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।