বিষয়বস্তুতে চলুন

ভাষাবিজ্ঞান/ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস

উইকিবই থেকে

ভাষাবিজ্ঞানের চর্চা একালে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও শিক্ষাক্ষেত্রে এটির একটি ধারাবাহিক প্রাচীন ঐতিহ্য বিদ্যমান। ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসকে আমরা তিনটি যুগপর্যায়ে ভাগ করতে পারি: (১) প্রাচীন যুগ, (২) মধ্যযুগ ও প্রাক্‌-আধুনিক পর্ব এবং (৩) আধুনিক যুগ (উনিশ ও বিশ শতক)। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিক থেকে ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় ব্যাপক দিক পরিবর্তন ঘটে। অতঃপর আধুনিক যুগে এসে এই ধারাটি একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ভাষার নানা দিক নিয়ে আলোচনা প্রতিষ্ঠা অর্জন করে।

ভাষাবিজ্ঞান সামগ্রিকভাবে মানুষের মুখের ভাষার অথবা বিভিন্ন ভাষাভাষীদের ভাষাগুলির সাধারণ রীতিনীতি ও বৈশিষ্ট্যগুলি অনুসন্ধান করে। সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে করা হয় এই অনুসন্ধান। এই কারণেই ভাষাবিজ্ঞানকে ভাষার বিজ্ঞানসম্মত অধ্যয়ন আখ্যা দেওয়া হয়। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই ভাষাবিজ্ঞান সর্বদা প্রগতিশীল (progressive) ও সদা সক্রিয় (dynamic) একটি বিদ্যা (academic discipline)।

ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার পদ্ধতিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলি হল:

  1. তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান (Comparative Linguistics): এই শাখায় একাধিক ভাষার বৈশিষ্ট্য তুলনা করে দেখা হয়। উনিশ শতকে এই পদ্ধতির সাহায্যে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সাদৃশ্যের সম্পর্কটি অনুসন্ধান করে সেগুলিকে গোষ্ঠীবদ্ধ করা হয়েছিল এবং সেগুলির বংশগত উৎসও নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এই তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের পথ ধরেই ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা হয়েছে।
  1. ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (Historical Linguistics): এই পদ্ধতির সাহায্যে কোনও ভাষার বিভিন্ন কালের বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করা হয়। অর্থাৎ, একটি ভাষার প্রাচীনতর সাহিত্য থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত লিখিত রচনার ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের ক্রমবিকাশ এই ধারায় আলোচিত হয়। তাই এটিকে কালানুক্রমিক আলোচনা (Diachronic Study) নামেও অভিহিত করা হয়।
  1. বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান (Descriptive Linguistics): এই পদ্ধতির দ্বারা কোনও একটি ভাষা-সম্প্রদায়ের সাধারণ ভাষার এককালের রূপ বিশ্লেষণ করা হয়। তাই একে এককালিক আলোচনা (Synchronic Study) বলা হয়। আবার ব্যাপক অর্থে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের অপর নাম গঠনমূলক ভাষাবিজ্ঞান (Structural Linguistics)। কারণ, ভাষার এককালের গঠন (structure) বিশ্লেষণ বা বর্ণনা করাই বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। তবে এখানে মনে করা হয় যে, ভাষার প্রতিটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং সব কিছুকে নিয়ে ভাষা একতি সামগ্রিক প্রক্রিয়ারূপে কাজ করে। তাই এটির কোনও উপাদানকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবা যায় না। কোনও একটি উপাদানে পরিবর্তন সাধিত হলে তা ভাষার শরীরের অন্য উপাদানকে প্রভাবিত করে। ভাষাকে এইভাবে একটি সামগ্রিক অবয়ব (structure) রূপে দেখা হয় বলে এই শাখাটির অপর এক নাম অখণ্ড ভাষাবিজ্ঞান (Macro-linguistics)। এই শাখার অপর বৈশিষ্ট্য হল এখানে ভাষার অর্থের দিকটিকে উপেক্ষা করা হয়।

প্রাচীন যুগে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

[সম্পাদনা]

প্রাচীন গ্রিসে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

[সম্পাদনা]

প্রাচীন গ্রিসে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা সমগ্র পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল অধ্যায়। গ্রিক ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন খ্রিস্টপূর্ব ১৪শ শতকের, যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন বলে পরিগণিত হয়। প্রাচীন গ্রিসে ভাষার সাহিত্যিক, দার্শনিক, ব্যাকরণিক ও সামাজিক ব্যবহারের বিশ্লেষণ এবং ব্যাকরণ রচনার মাধ্যমে ভাষাবিজ্ঞানের প্রথম ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই নিবন্ধে গ্রিক ভাষার ঐতিহাসিক পর্ব, ভাষাচর্চার সূত্রপাত, ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্ব, দার্শনিক বিশ্লেষণ, প্রভাব ও উত্তরাধিকার এবং ভাষার প্রযুক্তি ও সাহিত্যের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

প্রাচীন গ্রিক ভাষার ইতিহাস

গ্রিক ভাষার ইতিহাসকে চারটি প্রধান পর্বে ভাগ করা যায়: প্রাচীন গ্রিক (খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০-৩০০ অব্দ), হেলেনীয় গ্রিক (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ-৩০০ খ্রিস্টাব্দ), মধ্য গ্রিক (৩০০-১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ) ও আধুনিক গ্রিক (১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ-বর্তমান)। প্রাচীন গ্রিক ভাষার মধ্যে মাইসিনীয় গ্রিক, হোমারীয় মহাকাব্যের ভাষা ইওনীয় গ্রিক এবং ধ্রুপদী গ্রিক উল্লেখযোগ্য। ধ্রুপদী গ্রিক ভাষা ইওনীয় ও আয়েওলীয় উপভাসষার মিশ্রণে গঠিত ছিল। এই ভাষাতেই প্লাতো, হেরোদোতুস, থুকিদিসেস, এস্কিলাস, এউরিপিদেস, সফোক্লেস, আরিস্তোফানেস প্রমুখ চিন্তাবিদ তাঁদের গ্রন্থাবলী রচনা করেন। হেলেনীয় গ্রিক পর্বে আলেকজান্ডার মহানের সময়ে কোইনি (Koine) গ্রিক ভাষা সামগ্রিক ভাবে বিস্তৃত হয় এবং এটি সাম্রাজ্য জুড়ে সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে, যা ভূমধ্যসাগরীয় ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রিক সংস্কৃতি ও ভাষার প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করে। কোইনি গ্রিক ভাষার প্রভাব ছিল এতটাই ব্যাপক যে এটি প্রাচীন বিশ্বের যোগাযোগের ভাষা (lingua franca) হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং বিভিন্ন সাহিত্য, দর্শন ও ধর্মীয় গ্রন্থের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ভাষার দার্শনিক বিশ্লেষণ

প্লেটো ও অ্যারিস্টটল দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাষা-সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন আলোচনা করেছিলেন। প্লেটো ভাষার সত্যতা, অর্থ ও প্রতীকের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি মনে করতেন, ভাষা মানুষের চিন্তার প্রতিফলন এবং ভাষার মাধ্যমেই সত্য জানা সম্ভব। অ্যারিস্টটল তাঁর পেরি হারমেনিয়াস (Peri Hermeneias) গ্রন্থে ভাষার ধ্বনি, শব্দ, বাক্যের গঠন ও অর্থ-নির্ধারণের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেন। তিনি ভাষাকে যুক্তির মাধ্যম হিসেবে গণ্য করেন।

ভাষাচর্চার সূত্রপাত

প্রাচীন গ্রিসে ভাষাচর্চার প্রধানত দর্শন, সাহিত্য ও ব্যাকরণ-চর্চার মাধ্যমে শুরু হয়। সোফিস্টরা ভাষার সঠিক ব্যবহার, বাক্যবিন্যাস ও অর্থ-নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের মধ্যে প্রোটাগোরাস, গোরগিয়াস, প্রোডিকাস প্রমুখ ছিলেন অগ্রণী। তাঁরা ভাষাকে যুক্তি ও বাক্যবিন্যাসের মাধ্যমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন। সোফিস্টদের চর্চা ভাষাকে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং চিন্তার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্ব

প্রাচীন গ্রিসে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ব্যাকরণের প্রাধান্য ছিল। দিয়োনিসিয়াস থ্রাক্স খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে প্রথম গ্রিক ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেন, যা পরবর্তীকালে লাতিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার ব্যাকরণের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর রচনায় শব্দ, বাক্য, ধ্বনি, বাক্যবিন্যাস ও অর্থ-নির্ধারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। তবে তিনি ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে দেখেছিলেন, কথ্য ভাষা হিসেবে নয়।

গ্রিক ভাষাচর্চার প্রভাব ও উত্তরাধিকার

প্রাচীন গ্রিসের ভাষাচর্চার প্রভাব ছিল বিশ্বব্যাপী। রোমান ভাষাবিজ্ঞান চর্চা প্রাচীন গ্রিসের ভাষাবিদদের চিন্তাধারার প্রভাবেই গড়ে ওঠে। গ্রিক ব্যাকরণ রোমানদের মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা গ্রিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ভিত্তির উপরেই স্থাপিত হয়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, যেমন ব্যাকরণ, ধ্বনিবিজ্ঞান, শব্দার্থতত্ত্ব ইত্যাদির মূল ভিত্তি গ্রিক ভাষাতত্ত্বের মধ্যেই পাওয়া যায়।

ভাষাচর্চার প্রায়োগিক দিক ও সাহিত্য

প্রাচীন গ্রিসের ভাষাবিজ্ঞান চর্চা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোমারের মহাকাব্য গ্রিক সাহিত্যের উৎকর্ষের উদাহরণ। এ-দুটিতে ভাষার সৌন্দর্য, অভিব্যক্তি ও বাক্যবিন্যাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়। প্রাচীন গ্রিক নাটক, কাব্য ও দর্শনশাস্ত্রেও ভাষার সঠিক ব্যবহার ও নতুন শব্দগঠনের প্রয়োগগত দিকটি প্রদর্শিত হয়েছে।

উপসংহার

প্রাচীন গ্রিসে ভাষাচর্চা ছিল এক বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যা সাহিত্য, দর্শন ও ব্যাকরণ-চর্চার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। এই চর্চা শুধুমাত্র গ্রিক ভাষাকেই উন্নত করে তোলেনি, বরং পরবর্তীকালে সমগ্র পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। গ্রিক ভাষাবিজ্ঞানের প্রভাব আজও বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞান চর্চায় প্রতিফলিত হয়। তাই প্রাচীন গ্রিসের এই ভাষাচর্চার ইতিহাসকে ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

[সম্পাদনা]

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা ছিল সেই যুগের রোমান সাম্রাজ্যে শিক্ষার অপরিহার্য একটি অঙ্গ। রোমান চিন্তাবিদেরা লাতিন ভাষার ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেছিলেন। রোমান ভাষাবিজ্ঞান চর্চার উদ্ভব, বিকাশ, প্রধান চিন্তাবিদদের অবদান, শিক্ষা-পদ্ধতি এবং সমগ্র ভাষাচর্চার প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার উদ্ভব ও বিকাশ

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা মূলত গ্রিক ভাষাচর্চার প্রভাবে আরম্ভ হয়েছিল। গ্রিক দার্শনিক ও বৈয়াকরণদের ন্যায় রোমান বৈয়াকরণেরাও ভাষার কাঠামো, শব্দ-বিশ্লেষণ ও ব্যাকরণ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। রোমান সাম্রাজ্যে লাতিন ভাষা ছিল প্রশাসন, আইন-প্রণয়ন, সাহিত্য ও শিক্ষার মাধ্যম। রোমান বৈয়াকরণেরা গ্রিক ব্যাকরণ-পদ্ধতি গ্রহণ করে লাতিন ভাষার নিয়ম ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত গ্রন্থ রচনা করেন। রোমান সাম্রাজ্যে অবশ্য লাতিন ছাড়াও গ্রিক ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যরচনার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাবশালী ছিল।

প্রধান ভাষাবিজ্ঞানী ও তাঁদের অবদান

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান অবদান রেখেছিলেন মার্কাস টেরেন্টিয়াস ভারো। তিনি লাতিন ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব ও শব্দতত্ত্ব নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন, যেগুলির মধ্যে ‘De Lingua Latina’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারো ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। এছাড়াও মার্কাস ফেবিয়াস কুইন্টিলিয়ান ভাষাশিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর ‘Institutio Oratoria’ গ্রন্থটি ভাষাচর্চা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

ভাষাবিজ্ঞান চর্চার পদ্ধতি ও শিক্ষা

প্রাচীন রোমে ভাষাচর্চা মূলত শিক্ষার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষায় লাতিন ব্যাকরণ, বানান, ছন্দ ও বাক্যগঠন শেখানো হত। শিক্ষকেরা কবিতা, গদ্য ও বক্তৃতা রচনার মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার শেখাতেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের রোমান সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত করা এবং তাদের সুন্দরভাবে সঠিক ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রে দক্ষ করে তোলা। সামগ্রিকভাবে, ভাষাবিজ্ঞান চর্চার মধ্যে ছিল শব্দের ব্যুৎপত্তি, ধ্বনি-বিশ্লেষণ, বাক্য-গঠন ও ব্যাকরণের নিয়ম নিয়ে আলোচনা।

ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে শুধু ভাষার নিয়মাবলিই শেখানো হত না, বরং রোমান সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধও প্রচার করা হত। ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে রোমান সমাজের ঐক্য সুনিশ্চিত হয়, শাসন দৃঢ় হয় এবং সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। লাতিন ভাষায় ভাষাচর্চার এই সমুন্নতি পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞান চর্চাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, মধ্যযুগ পর্যন্ত মনে করা হত অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও কোনও ব্যাকরণ-সংক্রান্ত প্রয়োগ লাতিন ব্যাকরণ-সম্মত না হলে তা অশুদ্ধ।

রোমান ভাষাবিজ্ঞান চর্চার উত্তরাধিকার

প্রাচীন রোমের ভাষাবিজ্ঞান চর্চার প্রভাব মধ্যযুগ হয়ে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। লাতিন বৈয়াকরণদের রচনা ও শিক্ষাপদ্ধতি ইউরোপে মধ্যযুগীয় শিক্ষার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের অনেক ধারণাও রোমান ভাষাবিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত। ভারো ও কুইন্টিলিয়ানের গ্রন্থাবলী আজও ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র ও গবেষকদের কাছে অনেক অমূল্য তথ্যের উৎস।

উপসংহার

প্রাচীন রোমে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা ছিল রোমান সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অপরিহার্য অঙ্গ। ভারো, কুইন্টিলিয়ান ও অন্যান্য ভাষাবিজ্ঞানীদের অবদানের মাধ্যমে লাতিন ভাষার ব্যাকরণ, ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়। রোমানদের ভাষাচর্চা একদিকে যেমন রোমান সমাজের সংস্কৃতি, ঐক্য ও সাম্রাজ্য রক্ষায় বিশেষ সহায়ক হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনই তা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিল। তাই প্রাচীন রোমের ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস আজও ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র ও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

প্রাচীন ভারতে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

[সম্পাদনা]
ভূমিকা

প্রাচীন ভারতে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস হল মানব-মনীষার এক বিস্ময়কর পরিচয়। বৈদিক যুগ থেকেই ভারতীয় পণ্ডিতসমাজ ভাষার উৎপত্তি, গঠন, উচ্চারণ ও ব্যবহার নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করেছেন। বৈদিক সাহিত্যে এই চিন্তার বিভিন্ন স্তরে ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সূত্রপাত ঘটেছিল। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ও তাঁর পরবর্তীকালের ব্যাকরণচর্চা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের সম্মুখে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

বৈদিক সাহিত্যে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

প্রাচীন ভারতে ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল বৈদিক যুগেই (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৬০০ অব্দ)। বৈদিক সাহিত্যের ব্রাহ্মণ অংশে সংহিতার কোনও কোনও সূক্তের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এবং বেদের সঠিক উচ্চারণ রক্ষার জন্য ধ্বনির উচ্চারণ, সন্ধির বিধান, পদবিভাগ, বিভক্তি, বচন ও ক্রিয়ার কাল সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা হয়েছে। প্রাচীন ভারতে ভাষাজিজ্ঞাসার সূত্রপাত এখানেই। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ভাষাবিজ্ঞানের নানা শাখার সুস্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায় বেদাঙ্গ সাহিত্যের শিক্ষা, নিরুক্ত ও ব্যাকরণ অংশে। শিক্ষায় আলোচিত হয়েছে ধ্বনির প্রকৃতি, হ্রস্বতা-দীর্ঘতা, মাত্রাভেদ, স্বরাঘাত ইত্যাদি। এটি আধুনিক ধ্বনিবিজ্ঞানের (Phonetics) অনুরূপ। শিক্ষার পরিপূরক রূপে বিভিন্ন বেদের জন্য রচিত হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রাতিশায্য গ্রন্থ। শিক্ষা ও প্রাতিশায্য ছিল ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে স্বতন্ত্র শাখা। নিরুক্ত গ্রন্থে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ের পাশাপাশি শব্দার্থ প্রতিপন্ন করতে বেদ থেকে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতিও দেওয়া হত। যাসের নিরুক্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিধিবদ্ধভাবে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণীত হয়েছে। বৈদিক ভাষায় অপ্রচলিত দুর্বোধ্য শব্দের তালিকা নিঘণ্টু নামে প্রকাশ করা হয়েছিল। এই তালিকার রচয়িতার নাম অবশ্য জানা যায় না। ব্যাকরণ বলতে সেকালে প্রধানত রূপতত্ত্বকেই বোঝানো হত। তবে বেদাঙ্গ ব্যাকরণের কোনও নিদর্শন পাওয়া যায়নি।

পাণিনি

প্রাচীন ভারতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেন পাণিনি। তাঁর ব্যাকরণের নাম অষ্টাধ্যায়ী। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, তিনি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তাঁর ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থে আটটি অধ্যায়ে বীজগণিতের সূত্রের আকারে প্রায় চার হাজার সূত্র আছে। যথাসম্ভব কম কথায় মূল বক্তব্যকে তুলে ধরাই এগুলির বৈশিষ্ট্য এবং এগুলির বিন্যাসরীতিও পাণিনির নিজস্ব। এতে গ্রন্থটি সংক্ষিপ্ত ও সংহত হয়েছে। সংক্ষিপ্ততার কারণে অবশ্য প্রথমে এগুলিকে অর্থহীন ধ্বনিসমষ্টি মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাখ্যা করলেই এর তাৎপর্য ধরা পড়ে। পতঞ্জলির মহাভাষ্য হল সেই টীকা, যাকে বলা হয়েছে “commentary of commentaries”. এই অভিনবত্বের জন্য পাণিনি পাশ্চাত্য বিদগ্ধমহলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। বর্তমান রূপতত্ত্বে zero-morpheme বা শূন্য-বিভজতির ধারণাটির পূর্বাভাসও পাণিনি দিয়েছেন। তাঁর মতে, সব শব্দের মূলে রয়েছে একটি করে ধাতু। এমনকি নামশব্দও ধাতু থেকেই নিষ্পন্ন। অনেক সময় দেখা যায়, ধাতু থেকে জাত শব্দটির কোনও পরিবর্তনই হয়নি; অর্থাৎ, সেখানে শূন্য-বিভক্তি যোগ করে শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিকেরা একে বলেছেন পাণিনির root-theory. পাণিনি সংস্কৃত ভাষার গঠনমূলক বিশ্লেষণই করেছেন এবং সেই সূত্রে তিনি প্রাচীন কালেই যে মনীষা ও পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অসামান্য। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আধুনিক যুগের বিশিষ্ট বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানী লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড বলেছেন, “The grammar of Panini... is one of the greatest monuments of human intelligence.”

উপসংহার

প্রাচীন ভারতে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা নিছক ব্যাকরণ বা ব্যবহার-বিধি ছিল না, তা ছিল ভাষার গভীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের প্রয়াস। বৈদিক যুগের ব্রাহ্মণ, বেদাঙ্গ সাহিত্যের শিক্ষা, নিরুক্ত ও ব্যাকরণ ধ্বনি, শব্দ, ব্যুৎপত্তি ও বাক্যগঠনের বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হয়েছিল। পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক, যেখানে গাণিতিক পদ্ধতি ও সংক্ষিপ্ততা আজও ভাষাবিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে এই গ্রন্থের অবদান অপরিসীম। ভারতীয় চিন্তাবিদেরা যে প্রাচীনকালেই ভাষার সূক্ষ্মতম দিকগুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন, তার প্রমাণও আমরা পাই এইসকল গ্রন্থ পাঠ করে।

মধ্যযুগে ও প্রাক্‌-আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

[সম্পাদনা]

পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে মধ্যযুগ (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ-চতুর্দশ শতক) এবং প্রাক্‌-আধুনিক যুগ (পঞ্চদশ-অষ্টাদশ শতক) হল দুইটি গুরুত্বপূর্ব সময়পর্ব, যখন ইউরোপীয় ভাষাগুলির ব্যাকরণ, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে শুরু করে। এই দুই পর্বের ভাষাবিজ্ঞান চর্চার মূল প্রবণতা, চিন্তাবিদদের অবদান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল।

মধ্যযুগে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

মধ্যযুগে পাশ্চাত্যে ভাষাচর্চা মূলত লাতিন ব্যাকরণের প্রভাবেই পরিচালিত হয়েছিল। তবে মধ্যযুগে ভাষার মূল উৎস ও স্বরূপ নিয়ে আলোচনা গ্রিক দার্শনিকদের প্রভাবে শুরু হয়েছিল, যা মধ্যযুগে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। এই সময়ে ভাষার মূল উৎস, স্বরূপ ও ব্যবহার নিয়ে দার্শনিক আলোচনা চলছিল। সেযুগে ভাষাকে মানব-চিন্তার অভিব্যক্তি রূপে গণ্য করা হত। রোমান ব্যাকরণবিদ আইলিয়ুস দোনাতুস ও প্রিস্কিয়ান খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে গ্রিক ব্যাকরণের আদলে লাতিন ভাষার ব্যাকরণ ও প্রয়োগবিধি রচনা করেন। তাঁদের রচনা মধ্যযুগের শিক্ষাব্যবস্থা ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেযুগে ব্যাকরণ যুক্ত ছিল ভাষার নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা ও শুদ্ধতা রক্ষার সঙ্গে। তাছাড়া ধর্মশিক্ষা ও বিদ্যালয়-শিক্ষাতেও ব্যাকরণের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

মধ্যযুগীয় ইউরোপের অন্যান্য ভাষার ব্যাকরণও রচিত হয়েছিল লাতিন ব্যাকরণের আদর্শে। এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত ব্যাকরণগত প্রয়োগ অশুদ্ধ বলে বিবেচিত হত। এই পদ্ধতি মধ্যযুগীয় ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ত্রুটি হিসেবে গণ্য হয়।

প্রাক্‌-আধুনিক যুগে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা

প্রাক্‌-আধুনিক যুগে ইউরোপে রেনেসাঁ ও বিজ্ঞান-চেতনার প্রসারের ফলে ভাষাবিজ্ঞান চর্চা নতুন মাত্রা লাভ করে। এই সময়ে ভাষার উৎস, বিকাশ ও বিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। রেনেসাঁর প্রভাবে ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ ও পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা শুরু হয়।

পঞ্চদশ শতকে মানবতাবাদের প্রসারের ফলে ভাষার দর্শন ও তত্ত্বের ক্ষেত্রে নতুন একটি ধারার সৃষ্টি হয়। এযুগে ব্যাকরণকে আরও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়। সপ্তদশ শতকে দার্শনিক রেনে ডেকার্ট ও জন লক ভাষা সম্পর্কে গভীর দার্শনিক চিন্তাভাবনা উপস্থাপিত করেন। ডেকার্ট ভাষাকে মানব-চিন্তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি হিসেবে দেখেন এবং লক ভাষাকে চিন্তার মাধ্যম হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।

অষ্টাদশ শতকে ভাষাচর্চা আরও বিজ্ঞানসম্মত হয়ে ওঠে। এই সময়ে ভাষার ঐতিহাসিক বিকাশ, বিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। এই শতকেই জার্মান ভাষাবিজ্ঞানী জোহান ক্রিস্টফ আডেলুং জার্মান ব্যাকরণ ও শব্দকোষ রচনা করেন, যা জার্মান ভাষার প্রমিতকরণ ও ঐতিহাসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক জার্মান উপভাষাগুলির ইতিহাসের উপরেও তিনি আলোক সম্পাত করেন। তাঁর রচনা পরবর্তীকালের ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

প্রধান চিন্তাবিদদের অবদান
  1. আইলিয়ুস দোনাতুস ও প্রিস্কিয়ান মধ্যযুগে লাতিন ব্যাকরণ রচনা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
  2. রেনে ডেকার্ট ভাষাকে মানুষের চিন্তার অভিব্যক্তি হিসেবে দেখান এবং ভাষা ও চিন্তার সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক আলোচনা শুরু করেন।
  3. জন লক ভাষাকে চিন্তার মাধ্যম হিসেবে বিশ্লেষণ করেন এবং ভাষা ও শব্দার্থের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।
  4. জোহান ক্রিস্টফ আডেলুং অষ্টাদশ শতকে জার্মান ভাষার ব্যাকরণ ও শব্দকোষ রচনা করেন, যা জার্মান ভাষার প্রমিতকরণ ও ঐতিহাসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রভাব

মধ্যযুগের ভাষাচর্চা মূলত ধর্মীয় ও শিক্ষমূলক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু প্রাক্‌-আধুনিক যুগে তা বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপটে বিকাশ লাভ করে। রেনেসাঁ ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রভাবে এক স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে ভাষাবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয়, যা সম্পূর্ণ হয় আধুনিক যুগে। এই প্রক্রিয়ায় ভাষার উৎস, বিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

উপসংহার

মধ্যযুগ ও প্রাক্‌-আধুনিক যুগে পাশ্চাত্য ভাষাচর্চা ব্যাকরণ, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগে লাতিন ব্যাকরণের অন্ধ অনুকরণ অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে এক ধরনের অচলায়তনের সৃষ্টি করলেও প্রাক্‌-আধুনিক যুগের বিজ্ঞানচেতনা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভাষাচর্চার সারসত্যটুকু গ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক আলোচনার মাধ্যমে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দ্বার উন্মোচিত করে দেয় এবং তারই ফলে ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়।