ভাষাবিজ্ঞান/প্রথাগত ব্যাকরণ ও আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান
প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে উভয় স্থানেই ভাষা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার সূত্রপাত প্রথমে ধর্মীয় ও পরে দার্শনিক চিন্তার হাত ধরে ঘটেছিল। পরবর্তীকালে তা ক্রমশ স্বতন্ত্র ভাষাচিন্তার রূপ নেয় এবং পৃথক শাস্ত্র হিসেবে ব্যাকরণের জন্ম হয়।
পাশ্চাত্য ব্যাকরণ
[সম্পাদনা]- গ্রিক ব্যাকরণ
ইউরোপে প্রথম স্বতন্ত্র ব্যাকরণ রচনা করে গ্রিকরা। প্রথম তিন গ্রিক বৈয়াকরণ হলেন দিওনুসিওস থ্রাক্স (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক), আপোলোনিওস দুসকোলোস (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক) ও তাঁর পুত্র হেরোদিয়ানুস।
থ্রাক্স প্রধানত রূপতত্ত্বের মূল কাঠামোর বিধিবদ্ধ আলোচনা করেন। তিনি বাক্যের আট প্রকার পদবিভাগ করেছিলেন: noun, pronoun, article, verb, adverb, participle, preposition ও conjunction. পরবর্তীকালে আপোলোনিওস দুসকোলোস এর সঙ্গে যোগ করেন বাক্যতত্ত্বের বিধিবিদ্ধ আলোচনা এবং হেরোদিয়ানুস গ্রিক ভাষার স্বরাঘাত-বিধি ও বিরাম-বিধি নিয়ে আলোচনা করেন।
এই তিন বৈয়াকরণের হাতে গ্রিক ভাষার ব্যাকরণ পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে এবং সেই পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণের ছাঁদটিই ইউরোপের অন্যান্য ভাষার ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে আদর্শ (model) বলে গণ্য হয়। লাতিন ভাষার বৈয়াকরণেরা এই ছাঁদ অনুসরণ করে লাতিন ব্যাকরণ প্রণয়ন করেন এবং তাঁর অনুকরণে এই কাঠামো দীর্ঘকাল পর্যন্ত আধুনিক ভাষাগুলির ব্যাকরণ রচনাতেও অনুসৃত হয়।
গ্রিক ব্যাকরণের তিনটি সীমাবদ্ধতা ছিল:
- এই ব্যাকরণে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অপেক্ষা দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বেশি ছিল।
- গ্রিকরা তাঁদের ব্যাকরণের কাঠামোকে সব ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অর্থাৎ সর্বজনীন জ্ঞান করতেন।
- এই ব্যাকরণের আলোচ্য ভাষা ছিল সাহিত্যের ভাষা, কথ্য ভাষা নয়।
- লাতিন ব্যাকরণ
গ্রিক আদর্শে রচিত লাতিন ব্যাকরণের চরম বিকাশ ঘটেছিল প্রিস্কিয়ানের লাতিন ব্যাকরণে (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতক)। তিনি ক্লাসিকাল লাতিন ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ প্রণয়ন করেছিলেন। তাঁর বর্ণিত বাক্যের আট প্রকার পদ হল: noun, pronoun, verb, participle, adverb, preposition, conjunction ও interjection.
মধ্যযুগে বিদ্বজ্জনেদের আভিজাত্যের মাপকাঠি ছিল ক্লাসিকাল লাতিন চর্চা এবং তার সহায়ক প্রিস্কিয়ানের ব্যাকরণ অনুসরণ। এমনকি পরবর্তী যুগের ব্যাকরণগুলিও মূলত এই ব্যাকরণেরই অনুসারী। লাতিন ব্যাকরণের কাঠামো সব ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য—এমন একটি ভ্রান্ত ধারণাও সেই সময় গড়ে ওঠে। বলা বাহুল্য, এই ধারণার জন্ম গ্রিক ব্যাকরণের সীমাবদ্ধতা থেকেই। তাই কোনও কোনও লাতিন ব্যাকরণে স্পষ্ট উল্লেখ করা থাকত যে, সেই ব্যাকরণটি প্রাচীন ইংরেজি ভাষার ব্যাকরণের ভূমিকা রূপেও গৃহীত হতে পারে।
শুধু ইংরেজি নয়, পরবর্তীকালে ফরাসি, ইতালীয়, স্পেনীয় ইত্যাদি আধুনিক ইউরোপীয় ভাষার ব্যাকরণও রচিত হয় মূলত প্রিস্কিয়ানের লাতিন ব্যাকরণের কাঠামো অনুসরণ করে। এমনকি ইংরেজি, জার্মান, আইরিশ ইত্যাদি যে-সব ভাষা লাতিন থেকে উদ্ভূত হয়নি, সেগুলির ব্যাকরণেও লাতিনের প্রভাব খুব বেশি। লাতিন ব্যাকরণের কাঠামো সব ভাষার সাধারণ ব্যাকরণের আদর্শ—মধ্যযুগের এই বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারণাটিই ছিল এসবের কারণ।
- পাশ্চাত্য ব্যাকরণের সমস্যা
লাতিন ব্যাকরণ হল সকল ভাষার ব্যাকরণের আদর্শ—মধ্যযুগের এই ভ্রান্ত বদ্ধমূল ধারণার ফলে এমন এক মনোভাব গড়ে উঠেছিল যে, এই ব্যাকরণের নিয়মবিরুদ্ধ হলে সেই প্রয়োগ অশুদ্ধ। এভাবে শুদ্ধাশুদ্ধ বিচার ও মনগড়া শুদ্ধ প্রয়োগের নির্দেশ দিতে থাকায় পাশ্চাত্য ব্যাকরণের ভিত্তি গোড়ায় দার্শনিকতার উপর স্থাপিত হলেও ক্রমশ তা হয়ে ওঠে নির্দেশমূলক ব্যাকরণ। প্রায় আধুনিক কাল পর্যন্ত স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ মূলত মধ্যযুগীয় লাতিন ব্যাকরণের আদলে রচিত নির্দেশমূলক ব্যাকরণ, যার প্রধান নিদর্শন একালে ইংরেজি ভাষায় বহুল প্রচলিত নেসফিল্ডের ব্যাকরণ।
প্রথাগত ইংরেজি ব্যাকরণে আটটি পদের (Parts of Speech) অস্তিত্ব: noun, pronoun, adjective, verb, adverb, preposition, conjunction ও interjection. এই আটটি পদের চরিত্র বৈচিত্র্যময়, তাই এগুলির বৈধতার মাপকাঠিও সমান বিচিত্র। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হল এই আটটি পদের সংজ্ঞা কোথাও পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায় (overlapping), কোথাও পরস্পর-বিরোধী (conflicting), আবার কোথাও যথেষ্ট অস্পষ্ট (vague)। অর্থাৎ, যথেষ্টই অবৈজ্ঞানিক।
এই অবৈজ্ঞানিক ফলের অন্যতম কারণ হল প্রথাগতভাবে পদের শ্রেণীকরণ অর্থভিত্তিক। যেমন, noun হল ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, গুণ, কার্য, সম্পর্ক ইত্যাদির নাম; adjective হল গুণবাচক; verb-এর দ্বারা কাজ, অবস্থা, অনুভূতি ইত্যাদি নির্দিষ্ট করা হয়। এবার কয়েকটি উদাহরণের দিকে তাকানো যাক:
- The tall boy is coming.
- Tallness is desired.
- I always walk fast.
- I am going for a walk.
প্রথম বাক্যে ‘tall’ (লম্বা) সংজ্ঞানুসারে গুণবাচক শব্দ অর্থাৎ adjective এবং দ্বিতীয় বাক্যে ‘tallness’ (দীর্ঘত্ব) সংজ্ঞানুসারে গুণনামবাচক শব্দ অর্থাৎ noun. কিন্তু সমস্যা এখানেই যে, ‘tall’ কেন গুণনির্দেশক এবং কেনই বা ‘tallness’ গুণনাম-নির্দেশক তার হদিশ সংজ্ঞায় পাওয়া যায় না। শব্দ দুটির চেহারায় ও বাক্যে সেগুলির ব্যবহারে শুধুমাত্র তার হদিশ পাওয়া যায়। সংজ্ঞা অর্থনির্ভর এবং অর্থের দিক থেকে শব্দ দুটির মধ্যে প্রভূত মিল। অর্থাৎ, সংজ্ঞা শ্রেণীকরণের মূল সূত্রটিকে ধরতে পারেনি।
আবার তৃতীয় বাক্যে ‘walk’ (হাঁটা) কার্যবাচক অর্থাৎ সংজ্ঞানুসারে verb এবং চতুর্থ বাক্যে ‘walk’ (পায়চারি) কার্যনাম-বাচক অর্থাৎ সংজ্ঞানুসারে noun. এই দুই উদাহরণে সমস্যাটি আরও ভালোভাবে পরিস্ফুট। বাক্যে উপস্থিতি বা পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া দুটি ‘walk’-এর কোনটি verb আর কোনটি noun, তা বোঝা আদৌ সম্ভব নয়। অর্থাৎ, সংজ্ঞা এখানে শব্দের পদ চেনাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই প্রথাগত ব্যাকরণে পদের সংজ্ঞার বৈধতার প্রশ্ন ওঠেই। এছাড়াও সংজ্ঞায় ইত্যাদির (etc.) প্রয়োগ যুক্তিবিদ্যার নিয়মানুসারে সংজ্ঞার গুরুত্ব খর্ব করে।
প্রথাগত ব্যাকরণের অন্যান্য অনেক সীমাবদ্ধতাও আছে। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান এইসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য অর্থ নয়, শব্দের গঠন, বাক্যে তার ব্যাবহের উপর ভিত্তি করে পদের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করে। এর একটি অতি-সরলীকৃত উদাহরণ হল: ইংরেজিতে সেই পদভুক্ত শব্দগুলি adjective বলে গণ্য হবে, যেগুলি প্রথমত ‘-er’ ও ‘-est’ প্রত্যয় গ্রহণ করে। যেমন, “tall – taller –tallest”, “rich – richer – richest”, “strong – stronger – strongest”, “weak – weaker – weakest” ইত্যাদি। এবং দ্বিতীয়ত, যেগুলি বাক্যে adjective-এর জন্য নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবহৃত হবে। যেমন, “The handsome man is coming.” এই নিয়ম অনুযায়ী, ‘handsome’ শব্দটি প্রথম শর্ত পূরণ না করলেও (ইংরেজিতে ‘handsome’-এর সঙ্গে ‘-er’ ও ‘-est’ প্রত্যয় যুক্ত হয় না), দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করে।
আসলে মধ্যযুগের নির্দেশমূলক ব্যাকরণের রচয়িতারা সমাজে প্রচলিত ভাষার বাস্তব রূপটি না দেখেই ঐতিহ্যগত বা মনগড়া তত্ত্বের মানদণ্ডে ভাষার তথাকথিত শুদ্ধ রূপটি ধরে রাখার জন্য নির্দেশমূলক ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। তাতে ভাষার জীবন্ত রূপের স্বাভাবিক পরিবর্তনকে রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এর ফলে লাতিন ভাষা ক্রমশ ব্যাকরণের জালে বাঁধা পড়ে কৃত্রিম হয়ে মৃত ভাষায় পরিণত হয়, অন্যদিকে লোকমুখে ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তন ব্যাকরণের শাসন উপেক্ষা করেই চলতে থাকে। এর ফলে জীবন্ত ভাষার সঙ্গে ব্যাকরণের একটা দুস্তর ব্যবধান গড়ে ওঠে এবং লাতিন ব্যাকরণ কৃত্রিম ভাষার ব্যাকরণে পর্যবসিত হয়।
ভারতীয় ব্যাকরণ
[সম্পাদনা]ভারতে ব্যাকরণচর্চার ইতিহাস এক সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। ভারতীয় ব্যাকরণচর্চা শুধু ভাষার বিশ্লেষণ নয়, বরং দার্শনিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশও বটে। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ভারতে ব্যাকরণচর্চার ক্রমবিকাশ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলে বিষয়টি পরিস্ফুট হতে পারে।
- প্রাচীন ভারতে ব্যাকরণচর্চার সূত্রপাত।
ভারতে ব্যাকরণচর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল বৈদিক যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৬০০ অব্দ)। ব্রাহ্মণ গ্রন্থাবলিতে ভাষার ধ্বনি, সন্ধি, পদবিভাগ, বিভক্তি, বচন ও ক্রিয়ার কাল সম্পর্কে কিছু আলোচনা পাওয়া যায়। বেদাঙ্গ সাহিত্যে শিক্ষা, নিরুক্ত ও ব্যাকরণ গ্রন্থগুলিতে ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দ-ব্যুৎপত্তি ইত্যাদি কিছুটা আলোচিত হয়েছিল। যাস্ক তাঁর নিরুক্ত গ্রন্থে শব্দ-ব্যুৎপত্তি নিয়ে বিশদে আলোচনা করেছিলেন। ভারতীয় ভাষাচিন্তার ভিত্তি সেই সময়েই গড়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে পাণিনি তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থে প্রথম সংস্কৃত ভাষার একটি সুবিন্যস্ত ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাকরণ রচনা করেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কাত্যায়নের ব্যাকরণ এবং পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’ পাণিনির গ্রন্থের সারমর্ম অনুধাবনে বিশেষ সহায়ক হয়। পাণিনির ভাষা-বিশ্লেষণ আজও বিশ্বব্যাপী ভাষাবৈজ্ঞানিকদের বিস্ময় উৎপাদন করে।
- মধ্যযুগে ব্যাকরণচর্চার বিকাশ
মধ্যযুগে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন পণ্ডিতদের রচনায় ব্যাকরণচর্চা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। ত্রয়োদশ শতকে ব্যোপদেবের ‘মুগ্ধবোধ’, চতুর্দশ শতকে পদ্মনাভের ‘ধাতুকৌমুদী’, পঞ্চদশ শতকে রূপগোস্বামীর ‘হরিনামামৃত ব্যাকরণ’ এই সময়কার বিখ্যাত ব্যাকরণগ্রন্থ। এছাড়াও জৈন হেমচন্দ্রের ‘সিদ্ধ-হেম-শব্দানুশাসন’ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধদের মধ্যে চন্দ্রগোমিন সংস্কৃত ব্যাকরণ রচনা করেন। মহারূপ, বুদ্ধঘোষ, বুদ্ধদত্ত, কচ্চায়ন, মোগ্গল্লান ও সদ্দনীতি প্রাকৃত ও পালি ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা করেন এবং বিশেষ করে পালি ভাষার প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মধ্যযুগে অন্যান্য ভাষার ব্যাকরণও রচিত হয়। পালি ব্যাকরণগুলি সংস্কৃতের আদলেই রচিত হয়। সেকালে শুধু সংস্কৃত বা পালিই নয়, প্রাকৃত, অপভ্রংশ প্রভৃতি ভাষার ব্যাকরণ রচনাতেও বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়।
- আধুনিক যুগে ব্যাকরণর্চার প্রসার
আধুনিক ভারতে ব্যাকরণচর্চা আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। ইউরোপীয় পণ্ডিতদের প্রভাবে নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির ব্যাকরণ রচনার সূত্রপাত ঘটে। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন পর্তুগিজ পাদ্রি মানোএল দ্য আসসুম্পসাঁও। এই গ্রন্থ রচিত হয়েছিল পর্তুগিজ ভাষায়। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ভাষাবিজ্ঞানী ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় বাংলা ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যে বইটির নাম ছিল ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। এরপর থেকে বিভিন্ন ভাশাবিদের মাধ্যমে বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনা ও প্রকাশের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে। আধুনিক যুগে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের 'ভাষা প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ' (১৯৩২) বাংলা ব্যাকরণচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
- ভারতীয় ব্যাকরণচর্চার দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
ভারতীয় ব্যাকরণচর্চা শুধুমাত্র ভাষার বিশ্লেষণ নয়, বরং দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার প্রকাশও বটে। পাণিনির ব্যাকরণে ভাষার স্বরূপ, উৎপত্তি ও কার্যপদ্ধতি ইত্যাদি দার্শনিক বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’-এ ব্যাকরণ ও দর্শনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়। এভাবেই ভারতীয় ব্যাকরণচর্চার সঙ্গে ধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যের যোগসূত্রটি সুদৃঢ় হয়েছে।
- সমকালীন যুগের ব্যাকরণচর্চা
বর্তমান যুগে ভারতীয় ব্যাকরণচর্চা আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নোয়াম চমস্কির ন্যায় পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞানীদের তত্ত্ব ভারতীয় ব্যাকরণচর্চাকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। ভাষার মনস্তত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভারতীয় ব্যাকরণচর্চা আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। এখন ভারতীয় ব্যাকরণচর্চা কেবল শ্রেণীকক্ষের বিষয়ই নয়, বরং একটি বিজ্ঞানসম্মত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
- উপসংহার
ভারতে ব্যাকরণরচ্চার ইতিহাস এক অতুলনীয় সমৃদ্ধির দৃষ্টান্ত। পাণিনি থেকে আরম্ভ করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানীদের যুগ পর্যন্ত ভারতে ব্যাকরণচর্চা ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি অনন্য সেতু গড়ে তুলেছে। ভারতীয় ব্যাকরণচর্চার এই সুসমৃদ্ধ ঐতিহ্য আজ সমগ্র বিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত।
বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণ
[সম্পাদনা]বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণে সংস্কৃত প্রভাব
[সম্পাদনা]বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণের উপর দুটি প্রধান ব্যাকরণগত প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। একটি সংস্কৃত ব্যাকরণের এবং অন্যটি ইংরেজি ব্যাকরণের প্রভাব। উনিশ শতকের বাংলা ব্যাকরণ-রচয়িতারা সংস্কৃত ব্যাকরণের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হওয়ায় পূর্বসূরী সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের আদর্শে বাংলা ব্যাকরণের কিয়দংশ প্রণীত হয়। ফলস্বরূপ আজও বাংলা স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণে এই প্রভাব অক্ষুণ্ন রয়েছে। কিন্তু বাংলা ও সংস্কৃত দুটি ভিন্ন ভাষা। তাই একটি ভাষার ব্যাকরণের আদর্শে আর-একটি ভাষার ব্যাকরণ প্রণীত হলে তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ কিছু সমস্যা এসে পড়েই। নীচে সেই সমস্যাগুলির উপর আলোকসম্পাত করা হল।
- প্রত্যয় বিশ্লেষণে সংস্কৃত প্রভাব
বাংলা ব্যাকরণে প্রত্যয় যোগে শব্দ-গঠনের আলোচনায় প্রতিটি তৎসম শব্দের সংস্কৃত ব্যাকরণানুগ কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয়ের বিশ্লেষণ করা হয়। যেমন:
- নয়ন = √ নী + ল্যুট্/ অনট্;
- ভীষণ = √ ভীষ্ + ল্যুট/ অনট্;
- কৃতি = √ কৃ + ক্তি;
- শান্তি = √ শম্ + ক্তি;
- সুপ্তি = √ স্বপ্ + ক্তি;
- গ্লানি = √ গ্লা + ক্তি;
- মৃত = √ মৃ + ক্ত;
- নত = √ নস্ + ক্ত;
- উক্ত = √ বচ্ + ক্ত;
- ছিন্ন = √ ছিদ্ + ক্ত;
- রূঢ় = √ রুহ্ + ক্ত;
- জিজ্ঞাসা = √ জ্ঞা + সন্ + টাপ্;
- সহিষ্ণু = √ সহ + ইষ্ণু;
- জিষ্ণু = √ জি + ষ্ণুক ইত্যাদি।
শব্দ-বিশ্লেষণের এই রীতি সাধারণ বাংলাভাষীদের কাছে যথেষ্ট অস্বচ্ছ। বাংলা ব্যাকরণে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণহীন অবস্থায় এহেন সংস্কৃত প্রত্যয়-আলোচনার সংযুক্তি কোনও সম্পূর্ণ ধারণার জন্ম দেয় না, আবার এগুলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও বাংলা ব্যাকরণের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত দুর্বোধ্য। উপরিউক্ত শব্দগুলির সহ অনেক তৎসম শব্দই সম্পূর্ণ গঠিত শব্দ রূপেই বাংলায় গৃহীত হয়েছে। তাছাড়া যে ধাতুগুলি থেকে শব্দগুলি নিষ্পন্ন হয়েছ (যেমন নী, ধা, সৃ, বচ্, জ্ঞা, কৃ, গ্লা ইত্যাদি), সেই ধাতুগুলির অস্তিত্বও বাংলায় নেই। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে, যেমন শব্দের আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ জানতে হলে, সংস্কৃত ব্যাকরণ দেখাই যথেষ্ট। তাই সাধারণ বাংলা ব্যাকরণে এগুলির সংযুক্তির কোনও যৌক্তিকতা নেই।
- কারক বিশ্লেষণে সংস্কৃত প্রভাব
সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরণে বাংলা ব্যাকরণে কারক ছ-টি। যেমন কর্তা, কর্ম, করণ, সম্প্রদান, অপাদান ও অধিকরণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে পবিত্র সরকার পর্যন্ত বিভিন্ন চিন্তাবিদ যথেষ্ট যুক্তি সহকারে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় সম্প্রদান কারক নেই। তাই নিছক সংস্কৃত ব্যাকরণে আছে বলে বাংলা ব্যাকরণে সম্প্রদান কারকের সংযুক্তি অযৌক্তিক।
- বর্ণমালা, বানান ও ধ্বনি-বিশ্লেষণে সংস্কৃত প্রভাব
বাংলা বর্ণমালায় বর্ণসংখ্যা ও ক্রম এবং বানান-পদ্ধতি সংস্কৃতানুগ হওয়ায় বাংলা ব্যাকরণে ধ্বনি-বর্ণনা ও বানান-সংক্রান্ত আলোচনা ইত্যাদি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে। ধ্বনি-আলোচনায় ধ্বনির সঙ্গে বর্ণসংখ্যার সামঞ্জস্য নেই। যেমন বাংলায় স্বরধ্বনি সাতটি, কিন্তু স্বরবর্ণ এগারোটি; নাসিক্যধ্বনি তিনটি, কিন্তু নাসিক্যবর্ণ পাঁচটি। এছাড়াও বানানের ক্ষেত্রে ণত্ব-ষত্বের বিধান ইত্যাদি শুধুমাত্র তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়ায় এইসব সংযুক্তিও বাংলা ব্যাকরণকে জটিল ও অবৈজ্ঞানিক করে তুলেছে।
- অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কৃত প্রভাব
এছাড়াও বাংলা ব্যাকরণের সন্ধি, সমাস, বিশেষণের তারতম্যের (তর-তম), লিঙ্গ, ক্রিয়া ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই এমন কিছু নিয়ম আছে, যেগুলি কেবল সাধুভাষার লিখনপদ্ধতির ক্ষেত্রেই কিয়দংশে প্রযোজ্য; কথ্যভাষা বা চলিত লিখনরীতির ক্ষেত্রে নেহাতই বাহুল্য।
- উপসংহার
উপরে আলোচিত বিভিন্ন সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষেপে বলা যায় যে, সংস্কৃত ব্যাকরণ দ্বারা প্রভাবিত বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণ বাংলা ভাষার নিজস্ব চালচলন থেকে অনেকটাই দূরবর্তী। তাই যদিও স্কুলপাঠ্য বাংলা ব্যাকরণ এই প্রথাগত ব্যাকরণেরই প্রতিধিনি, তবুও সেটিকে বাংলা ভাষার যথাযথ নিজস্ব ব্যাকরণ বলা চলে না।
বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণে ইংরেজি প্রভাব
[সম্পাদনা]বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা প্রথম শুরু হয়েছিল বিদেশী ভাষায়, বিদেশীদের বাংলা শিক্ষার উদ্দেশ্যে এবং বিদেশীদের দ্বারা। উনিশ শতকের বাঙালি চিন্তাবিদেরাও পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শে দীক্ষিত হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে দীর্ঘকাল এদেশে ব্রিটিশ শাসন কায়েম থাকায় ইংরেজ-সহবাসের ফলে বাংলা ব্যাকরণের বেশ কিছু উপকরণ আমরা গ্রহণ করেছি ইংরেজি ব্যাকরণ থেকে। এই ধরনের গ্রহণের সুফল ও কুফল দুইই রয়েছে। নীচে সেই প্রসঙ্গেই বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
- লিখনরীতি ও বিরামচিহ্ন গ্রহণ
মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষায় দাঁড়ি ছাড়া আর কোনও ছেদচিহ্নের ব্যবহার ছিল না। ইংরেজি ব্যাকরণ থেকে যথোপযুক্ত রূপে গৃহীত উপকরণের মধ্যে তাই একটি হল অনুচ্ছেদ, পঙ্ক্তিবিভাগের ন্যায় লিখনরীতি এবং কমা, সেমিকোলন, কোলন, ড্যাশ, হাইফেন, উদ্ধৃতিচিহ্ন, বিস্ময়বোধক ও প্রশ্নবোধক চিহ্ন ইত্যাদির ব্যবহার। এতে বাংলা লেখার সৌষ্ঠব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে।
- অযথা উপকরণ গ্রহণে জটিলতা
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজি ব্যাকরণ থেকে অযথা উপকরণ আমদানি করে বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণের চেষ্টার ফলে ব্যাকরণে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। নীচে তার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হল।
- বাচ্য-পরিবর্তন
বাংলায় বাচ্য-পরিবর্তনের পদ্ধতি ইংরেজির মতো নয়। অনেক সময়েই ইংরেজির ধাঁচে কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে রূপান্তরের নিয়ম বাংলায় প্রয়োগ করে এক ধরনের কৃত্রিম বাচ্য-বিশ্লেষণ বাংলা ব্যাকরণে করা হয়। যেমন:
- রেবা মালা গাঁথে রেবা কর্তৃক মালাটি গাঁথা হয়।
- কে তোমাকে দোকানে পাঠিয়েছিল? তুমি কার দ্বারা দোকানে প্রেরিত হয়েছিলে?
কর্মবাচ্যে রূপান্তরিত ডানদিকের বাক্যগুলি বাংলার স্বাভাবিক নিজস্ব বাক্য নয়, তাই সেটি শুনতেও অত্যন্ত কৃত্রিম। ইংরেজি বাচ্য-পরিবর্তনের অনুকরণ করতে গিয়েই এই বিপর্যয় ঘটেছে।
- বাক্য-বিশ্লেষণ
বাক্য-বিশ্লেষণের অনেক ক্ষেত্রেও বাংলা ব্যাকরণ ইংরেজি ব্যাকরণের দ্বারা প্রভাবিত। সংস্কৃত ব্যাকরণে বাক্য-বিশ্লেষণের পরম্পরা আদৌ উল্লেখযোগ্য নয়, আবার এটির রীতিপদ্ধতি ইংরেজি ব্যাকরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাংলা ব্যাকরণে বাক্য-বিশ্লেষণের ধারনাটির সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি বাক্য-বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি ও নিয়মকানুনও ঢুকে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে:
- বাংলা ব্যাকরণে বাক্যের subject ও predicate নির্ধারণের ধারণা ছিল না। এই ধরনের বিশ্লেষণে ইংরেজি ব্যাকরণের পদ্ধতি অনুসৃত হয়। যেমন: “আমি বই পড়ি” Subject: “আমি”, Predicate: “বই পড়ি”।
- বাংলা ব্যাকরণে বাক্যের clause ও phrase বিশ্লেষণের ধারণাও ইংরেজি ব্যাকরণ থেকে গৃহীত। বাংলায় আগে এই ধরনের বিশ্লেষণ ছিল না।
- ইংরেজি ব্যাকরণের প্রভাবে বাংলা ব্যাকরণে ক্রিয়ার ভাবের (mood) ধারণাটি এসেছে। যেমন, ইঙ্গিতবাচক, অনুজ্ঞাবাচক, প্রশ্নবোধক ভাব ইত্যাদি।
- বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ্য বা বিশেষণের শ্রেণীকরণও ইংরেজি ব্যাকরণের আদর্শে করা হয়। যেমন, ব্যক্তিবাচক, জাতিবাচক, ভাববাচক, বস্তুবাচক বিশেষ্য এবং সংখ্যাবাচক, গুণবাচক, আদেশবাচক বিশেষণ ইত্যাদি।
- ইংরেজি ব্যাকরণের ধাঁচে বাংলা ব্যাকরণেও বাক্যকে সরল বাক্য (Simple Sentence), মিশ্র বাক্য (Complex Sentence) ও যৌগিক বাক্য (Compound Sentence) এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়।
- উপসংহার
বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণে ইংরেজি ব্যাকরণের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইংরেজি ব্যাকরণের প্রভাবে মূলত বাচ্য-পরিবর্তন, বাক্য-বিশ্লেষণ, ছেদচিহ্নের ব্যবহার এবং পদের শ্রেণীবিন্যাস বাংলা ব্যাকরণে আলোচিত ও প্রযুক্ত হয়েছে। ছেদচিহ্নের ব্যবহার ও লিখনপদ্ধতি অনুসরণের ফলে বাংলা লেখার সৌষ্ঠব যেমন বৃদ্ধি হয়েছে, তেমনই বাচ্য-পরিবর্তন বা বাক্য-বিশ্লেষণেরন্যায় কয়েকটি দিক বাংলা ব্যাকরণকে অযথা জটিল, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কৃত্রিমও করে তুলেছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণে ইংরেজি নিয়মের কয়েকটি দিকের যুক্তিগ্রাহ্যতা থাকলেও বেশ কয়েকটি দিক বাংলা ভাষার স্বকীয় ভঙ্গিকে ক্ষুণ্ন করেছে।
প্রথাগত ব্যাকরণ থেকে তুলনামূলক, ঐতিহাসিক ও বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত
[সম্পাদনা]ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথাগত ব্যাকরণের চর্চা ছিল প্রধানত ভাষার তথাকথিত শুদ্ধ রূপটি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নির্দেশমূলক ব্যাকরণের চর্চা। ভাষার মৌলিক কাঠামো-নির্ধারণে এই ব্যাকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আধুনিক ভাষার পরিবর্তনশীল ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে প্রায়ই তা ব্যর্থ হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে ভাষার উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে আরও গভীর ও বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনার প্রয়োজন অনুভূত হলে তারই প্রেক্ষাপটে আধুনিক তুলনামূলক, ঐতিহাসিক ও বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূচনা ঘটে। ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, এই শাখাগুলির মাধ্যমেই ক্রমশ প্রথাগত ব্যাকরণের সীমাবদ্ধগুলি কাটিয়ে উঠে ভাষার প্রকৃত রূপ ও বিবর্তন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।
- প্রথাগত ব্যাকরণ-চর্চার সমস্যা
প্রথাগত ব্যাকরণ-চর্চার ধারাটি ক্রমশ হয়ে উঠেছিল নির্দেশমূলক ব্যাকরণের চর্চা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় অঞ্চলেই এর কারণ ছিল প্রধানত সংস্কৃত, গ্রিক ও লাতিনের ন্যায় প্রাচীন ও মৃত ভাষাগুলির আদর্শে ভাষার শুদ্ধ রূপটিকে বজায় রাখার চেষ্টা। ফলে মধ্যযুগেই জীবন্ত ভাষার সঙ্গে ব্যাকরণের দুস্তর ব্যবধানের সূত্রপাত ঘটে।
ইউরোপে রেনেসাঁর পর ব্যাকরণের এই নির্দেশমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র প্রাচীন ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং লাতিন ব্যাকরণের আদলে আধুনিক ইউরোপীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনার প্রচেষ্টাও শুরু হয়। ইংরেজি প্রথাগত ব্যাকরণের মধ্যে নেসফিল্ডের ব্যাকরণ তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অন্যদিকে একই কারণে বাংলা প্রথাগত ব্যাকরণে আজও সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় সংস্কৃত ও ইংরেজি ব্যাকরণের প্রভাব।
- তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপট
আধুনিক ব্যাকরণ-চর্চার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের ধারাটির সূত্রপাত ঘটে ইউরোপীয় মনীষীদের হাত ধরেই। পাশ্চাত্যে রেনেসাঁর যুগে বিভিন্ন দেশে ভৌগোলিক অভিযান ও মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলনের ফলে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর জনসাধারণের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে মিল ও অমিলের দিকগুলি যতই স্পষ্ট হতে থাকে ততই ক্রমে ভাষাবিদদের মধ্যে তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার উইলিয়াম জোনস কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটির তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতায় গ্রিক, লাতিন, গথিক, কেলটিক, প্রাচীন পারসিক, আবেস্তান ইত্যাদি ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতের সাদৃশ্যের সূত্রটি প্রথম ধরিয়ে দেন এবং এই সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে এই ভাষাগুলির এক অভিন্ন বংশগত উৎসেরও ইঙ্গিত দেন।
- ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান
পরবর্তীকালে সাদৃশ্যের এই সূত্রের উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান, বিশেষত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের তুলনামূলক অধ্যয়ন। আরও পরবর্তীকালে এরই পাশাপাশি গড়ে ওঠে ভাষার কালানুক্রমিক বিবর্তনের চর্চা বা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান।
তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান সব সময়েই একটি ভাষা বা একটি সময়কালকে অতিক্রম করে ভাষার ব্যাকরণ-চর্চা করে চলেছে। ফলে সর্বদাই একাধিক সংস্কৃতির অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্ব এই ধরনের ব্যাকরণ-চর্চাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। তাই এই ধারাকে সাংস্কৃতিক ভাষাবিজ্ঞান নামেও অভিহিত করা হয়।
- গঠনমূলক বা বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান
আরও পরবর্তীকালে গঠনমূলক বা বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের ধারার সূত্রপাত ঘটে। এই ধারায় কোনও একটি নির্দিষ্ট কালের একটি নির্দিষ্ট ভাষার বিভিন্ন গঠনগত উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়। অর্থাৎ, ভাষার গঠনগত বিশ্লেষণ করে এই বর্ণমামূলক ভাষাবিজ্ঞান; বিভিন্ন ভাষার অথবা একই ভাষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা এটির উদ্দেশ্য নয়।
- উপসংহার
প্রথাগত ব্যাকরণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য আধুনিক তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ধারাগুলি ভাষার বিবর্তন, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব অনুধাবনে সহায়ক হয়েছে। এরপর গঠনমূলক বা বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ভাষার গঠনগত দিক বিশ্লেষণ করে ভাষার প্রকৃত ব্যবহার ও বিকাশের উপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেছে। এই ধারাগুলির সমন্বয়েই আজ ভাষাবিজ্ঞান হয়ে উঠেছে ভাষাচর্চার একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র।
গঠনমূলক বা বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান
[সম্পাদনা]উনিশ শতকের শেষভাগে পাশ্চাত্যে বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত। বিশ শতকে সুইস ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের হাত ধরে এই শাখার প্রতিষ্ঠালাভ। এই শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশক থেকে প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চর্চিত এই শাখাটি ভাষাবিজ্ঞানের জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ করে।
- সংজ্ঞা
বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানে কোনও ভাষার একটি নির্দিষ্ট কালের রূপ অর্থাৎ গঠনগত উপাদান বিশ্লেষণ ও বর্ণনা করা হয়। তাই একে গঠনমূলক বা এককালিক ভাষাবিজ্ঞান নামেও অভিহিত করা হয়। ভাষার বিভিন্ন মাপের এককগুলিকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলির শ্রেণীকরণও এই রূপ-বিশ্লেষণের বিভিন্ন পদ্ধতি।
- বিভাগসমূহ
বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ভাষার গঠনগত উপাদানগুলিকে তিনটি স্তরে ভাগ করে বিশ্লেষণ করে। যেমন: ধ্বনি, রূপ ও বাক্য। এই তিন স্তর অনুসারে এই শাখাটি তিনটি উপশাখায় বিভক্ত। যেমন: ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্ব।
- ধ্বনি, রূপ ও বাক্যের পার্থক্য
মানুষের বাক্প্রবাহকে বিশ্লেষণ করে প্রথম যে নিটোল অর্থপূর্ণ বৃহত্তম এককটি পাওয়া যায়, তা হল বাক্য। বাক্যকে ক্ষুদ্রতর অংশে বিশ্লেষণ করলে শব্দ, আবার শব্দও আরও ক্ষুদ্রতর অংশে বিশ্লিষ্ট করলে কয়েকটি ধ্বনি পাওয়া যায়। ধ্বনিই ভাষার ক্ষুদ্রতম উপাদান তথা ভাষা-বিশ্লেষণের সর্বশেষ ধাপ। একাধিক ধ্বনি যুক্ত করে যে অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম এককটি পাওয়া যায়, ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকে বলে রূপিম বা মূলরূপ। এই মূলরূপই হল অর্থপূর্ণ ক্ষুদ্রতম ধ্বনিসমষ্টি তথা ভাষা-বিশ্লেষণের দ্বিতীয় স্তর। একাধিক মূলরূপ ও শব্দ মিলে গঠিত হয় এক-একটি বাক্য, যা ভাষার শেষ স্তর।
- ধ্বনিতত্ত্ব
মানুষের বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ও ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনির আলোচনাই ধ্বনিতত্ত্ব। এই আলোচনা আবার দুটি উপবিভাগে বিন্যস্ত। যথা: ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিবিচার বা ধ্বনিতত্ত্ব।
- ধ্বনিবিজ্ঞান
ভাষার প্রতিটি ধ্বনিই বক্তা কর্তৃক বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত হয়ে ধ্বনিতরঙ্গ সৃষ্টি করে বাতাসে ভাসতে ভাসতে শ্রোতার কানে এসে পৌঁছায় এবং অবশেষে শ্রোতার কানের পর্দা থেকে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে স্নায়ুতরঙ্গের রূপে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায়। বাগ্ধ্বনির এই তিন অবস্থা অনুসারে ধ্বনিবিজ্ঞানকে তিনটি উপশাখায় আলোচনা করা হয়। যেমন: উচ্চারণমূলক, ধ্বনিতরঙ্গমূলক ও শ্রবণমূলক ধ্বনিবিজ্ঞান।
- ধ্বনিবিচার বা ধ্বনিতত্ত্ব
এই শাখায় ভাষার মোট কটি মূলধ্বনি বা ধ্বনিকল্প আছে, সেই ধ্বনিকল্পগুলির অবস্থান বা প্রতিবেশ বিশেষে কী কী উচ্চারণ-বৈচিত্র্য বা ধ্বনিবিকল্প হয়, সেগুলির শর্তাধীনতা, প্রতিটি ধ্বনিকল্পের ভূমিকা এবং অন্যান্য ধ্বনিকল্পের সঙ্গে সেগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করে। যেমন: বাংলা বাগ্ধ্বনি "শ" একটি অঘোষ উষ্ম-তালব্য ধ্বনি। ধ্বনিতত্ত্ব অনুসারে, বাংলা উচ্চারণে "শ"-এর বিভিন্ন অবস্থান বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, বাংলায় "শ" একটি মূলধ্বনি বা ধ্বনিকল্প, প্রতিবেশ বিশেষে "শ"-এর অপর একটি উচ্চারণ-বৈচিত্র্য বা ধ্বনিবিকল্প আছে, যা হল "স্" উচ্চারণে "শ্"-এর অব্যবহিত পরে "র্" বা "ল্"-এলে "শ্" পরিণত হয় "স্"-এ। যেমন "শ্রী" বা "শ্লীল" শব্দের বানান যাই হোক, উচ্চারণ "সৃ" বা "স্লীল"।
- রূপতত্ত্ব
ভাষায় কতরকম রূপমূল আছে, বিভিন্ন প্রতিবেশে তাদের কী কী রূপবিকল্প আছে, বিভিন্ন রূপকল্প জুড়ে কীভাবে শব্দ তৈরি হয়, শব্দ ও ধাতুর সঙ্গে কী কী শব্দ-বিভক্তি, ক্রিয়া-বিভক্তি ও প্রত্যয় যুক্ত হয়ে কীরকম শব্দরূপ ও ক্রিয়ারূপ তৈরি হয় ইত্যাদি আলোচনা করে রূপতত্ত্ব। যেমন: বাংলায় সম্বন্ধ পদ-সূচক রূপকল্প হল "র", এর দুটি বিকল্প "-র" ও "-এর"। "নদী" ও "ঘর" এই দুই রূপকল্পের সঙ্গে সম্বন্ধ-রূপকল্প যোগ করে আমরা "নদীর" ও "ঘরের" এই শব্দরূপ পাই।
- বাক্যতত্ত্ব
এক বা একাধিক রূপকল্প ও শব্দকে জুড়ে ভাবপ্রকাশের উদ্দেশ্যে বাক্যনির্মাণের নিয়ম নির্ধারণ করে বাক্যতত্ত্ব। বাক্যতত্ত্ব বাক্যের বিভিন্ন উপাদানকে অন্বিত করার নীতি নির্ণয় করে বলে এর অপর নাম অন্বয়তত্ত্ব। যেমন: চলিত বাংলায় নঞর্থক বাক্য বা বাক্যাংশে নঞর্থক শব্দটি বসে সমাপিকা ক্রিয়ার পরে, কিন্তু অসমাপিকা ক্রিয়ার আগে। যেমন: তুমি না ডাকলে সে আসবে না।
- উপসংহার
বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের নানা শাখা ভাষার রূপ, গঠন ও ব্যবহার বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ধ্বনি, রূপ ও বাক্যের স্তর—ভাষার এই তিন গঠনমূলক উপাদানকে বিশ্লেষণ করে ভাষা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করে ভাষাবিজ্ঞানের এই শাখাটি।
সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ
[সম্পাদনা]সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ (Transformational Generative Grammer) ভাষাবিজ্ঞান ও ব্যাকরণ-বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। বিশ শতকের মধ্যভাগে নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্ব প্রবর্তন করে ভাষার উৎপত্তি, গঠন ও জটিল বাক্যরূপ বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনয়ন করেন। এই ব্যাকরণ-তত্ত্ব বাক্যের উৎপাদনশীলতা ও পরিবর্তনশীলতার দিকটি সম্যক অনুধাবনে সহায়ক হয়, যার ফলে প্রথাগত ব্যাকরণের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সহজসাধ্য হয়। বিশেষত অধোগঠন ও অধিগঠনের মধ্যে পার্থক্য এবং সেই সঙ্গে রূপান্তরের নিয়ামবলি ভাষার অন্তর্নিহিত গঠন ও কার্যকারিতা বিশ্লেষণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। বাংলা ভাষার প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বের প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা বাক্যের গঠনতন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক সমস্যা আরও গভীরভাবে বোঝা গিয়েছে, যার ফলে আধুনিক কালের বাংলা ভাষাচর্চার বিকাশেও এটির অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
- পরিচিতি
সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ এমন এক ভাষাবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা মূলত ভাষার উৎপত্তি ও গঠন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। চমস্কি তাঁর সিনট্যাকটিক স্ট্রাকচারস (১৯৫৭) গ্রন্থে এই তত্ত্বের প্রথম অবতারণা করেন। এই তত্ত্বের ভিত্তি হল ভাষাকে এমন এক উৎপাদনশীল নিয়মের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা, যা অসংখ্য শব্দার্থ ও বাক্য সৃজনে সক্ষম।
- প্রথাগত ব্যাকরণ ও সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণের পার্থক্য
প্রথাগত ব্যাকরণ নির্দেশমূলক হলেও ভাষার সৃষ্টিশীলতা কিংবা সেটির অন্তর্নিহিত জটিল গঠনপ্রণালী ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। এই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠন ও গতিশীলতাকে শুধু বর্ণনাই করে না, বরং ভাষার উৎপাদনশীলতার নিয়মাবলিও প্রস্তাব করে।
- মৌলিক ধারণা ও কাঠামো
সঞ্জননী ব্যাকরণ মূলত দুটি স্তরে কাজ করে। যেমন: অধোগঠন (deep structure) ও অধিগঠন (surface structure)। অধোগঠন শব্দার্থ ও সম্পর্ক প্রকাশ করে এবং অধিগঠন হল যা উচ্চারিত বা লিখিত হয়। এই স্তরদুটির মধ্যে থাকে রূপান্তরের নিয়মাবলি (Transformational rules), যা পরিবর্তন ঘটায়।
- রূপান্তরের নীতি
রূপান্তরের নীতি বাক্যের আকার পরিবর্তনে ব্যবহৃত হয়। যেমন, সদৃশ রূপান্তর, সশরীরে স্থানান্তর ও নির্মূলকরণ। উদাহরণস্বরূপ, সচরাচর বাক্য থেকে প্রশ্নবোধক বাক্য গঠন করা হয় রূপান্তরের মাধ্যমে।
- প্রধান শাখা
সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত। যেমন:
- পদগুচ্ছ সংগঠনের নীতি (phrase struture rules)
- রূপান্তরের নীতি (transformational rules)
- সীমান্ত নীতি (constraints)
- ভাষাতাত্ত্বিক প্রয়োগ ও গুরুত্ব
এই ব্যাকরণ প্রাথমিকভাবে ভাষার গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ, ভাষা-শিক্ষা, অনুবাদ ও কম্পিউটার ভাষাবিজ্ঞান উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রস্বরূপ। এটি ভাষা শেখানো ও বোঝার পদ্ধতিতে অনেক মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।
- সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
কয়েকটি দিক থেকে তত্ত্বটির সমালোচনাও করা হয়। যেমন, প্রয়োগানুগ পদক্ষেপে এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং এর বিশাল ব্যাখ্যামূলক কাঠামোয় জটিলতা বৃদ্ধি পায়।
- বাংলা ভাষায় সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ-চর্চা
বিশ শতকের শেষভাগ থেকে বাংলা ভাষায় সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ-চর্চা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই তত্ব বাংলা ভাষার গঠন ও ব্যাকরণ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলায় এই ব্যাকরণ প্রয়োগের প্রথম ধাপটি ছিল আমাদের ভাষার মৌলিক গঠন ও রূপতত্ত্বগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ। যেমন, বাংলা বাক্যের অধোগঠন ও অধিগঠনের পার্থক্য বোঝাতে এই তত্ত্ব বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বাংলা বাক্যের ক্রিয়া-বিন্যাস, অর্থগত সম্পৃক্ততা ও বাক্য-রূপান্তরের ক্ষেত্রে রূপান্তরের নিয়ম ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাংলা ভাষায় এই ব্যাকরণ প্রয়োগে এখনও কিছু অসুবিধা রয়েছে। যেমন, বাংলা বাক্যের ধ্রুপদী কাঠামো ও প্রচলিত ভাষা-ব্যবহারের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে, যা রূপান্তরের নিয়ম প্রয়োগ কঠিন করে তোলে।
- উপসংহার
সংবর্তনী সঞ্জননী ব্যাকরণ ভাষাবিজ্ঞানের একটি বিপ্লবাত্মক ধারনা, যা ভাষার রহস্যময় গঠন ও পরিবর্তনশীল রূপ-বিশ্লেষণে বিশেষভাবে সহায়ক। বাংলা ভাষায় এর প্রয়োগে ভাষার জটিল গঠন-বিশ্লেষণ ও ভাষাতত্ত্ব-গবেষণার নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই তত্ত্বের মধ্যে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে এই তত্ত্বের সমন্বয়ে বাংলা ও অন্যান্য ভাষার বিশ্লেষণ আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস
[সম্পাদনা]অষ্টাদশ শতকে বাংলা ব্যাকরণ-চর্চা
[সম্পাদনা]অষ্টাদশ শতকে বাংলা ব্যাকরণ-চর্চার প্রথম সূত্রপাত হয়েছিল বিদেশিদের দ্বারা, বিদেশিদের শিক্ষার জন্য ও বিদেশি ভাষায়। এই শতকে রচিত দুটি ব্যাকরণ-গ্রন্থই রচিত হয় ইউরোপীয় ভাষার ব্যাকরণের আদর্শে।
- আস্সুম্পসাঁও-র ব্যাকরণ
পর্তুগিজ মিশনারি মানোএল দ্য আস্সুম্পসাঁও ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ ভাষায় দুই খণ্ডে বাংলা ব্যাকরণ ও শব্দকোষ রচনা করেন। এটিকেই প্রথম বাংলা ব্যাকরণ-গ্রন্থের মর্যাদা দেওয়া হয়। তবে এটি মূলত বিদেশিদের বাংলা শেখানোর উদ্দেশ্যে রচনা করা হয়েছিল বলে বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্রের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, বরং ইউরোপীয় ধারায় বাংলা ব্যাকরণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল এই গ্রন্থে।
- হ্যালহেডের ব্যাকরণ
ইংরেজ ভাষাবিদ ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে আ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাংগুয়েজ নামে একটি বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন। এটিই বাংলা ভাষার প্রথম মুদ্রিত ব্যাকরণ হিসেবে পরিচিত এবং বইটি ইংরেজিতে লেখা হলেও এতেই প্রথম বাংলা হরফ ব্যবহার করে বাংলা উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল। হ্যালহেডের ব্যাকরণ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রচিত এবং সেই যুগে বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
- প্রভাব
অষ্টাদশ শতকে রচিত এই দুই ব্যাকরণের মাধ্যমে বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সূচনা হয় বলে বই দুটি বাংলা ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে উন্নততর ব্যাকরণ-চর্চা বাংলা সাহিত্য ও ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন সাধন করেছে এবং বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিতকরণে যে ভূমিকা পালন করেছে, তারই প্রথম পদক্ষেপ ছিল এই দুই গ্রন্থ।
- উপসংহার
অষ্টাদশ শতকে আস্সুম্পসাঁও ও হ্যালহেডের ব্যাকরণ বাংলা ব্যাকরণ-চর্চার প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য হয়। এগুলি বাংলা ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সূত্রপাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল।