বিশ্বের ইতিহাস/মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্য
মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার
ইসলাম-পূর্ব আরব
[সম্পাদনা]ইসলামের উত্থানের আগে আরব উপদ্বীপ মূলত যাযাবর বেদুইন সংস্কৃতির অধীনে ছিল। এই বহুঈশ্বরবাদী বেদুইন গোষ্ঠীগুলো মূলত আত্মীয়তার বন্ধন বা স্বগোত্রীয় সংহতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিত এবং প্রতিটি গোষ্ঠী বিভিন্ন উপজাতির অধীনে সংঘবদ্ধ ছিল। বেদুইনদের মধ্যে গোত্রে-গোত্রে যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয় এবং যুদ্ধবিদ্যাকে অত্যন্ত সম্মানজনক মনে করা হতো। আরব উপদ্বীপের প্রতিকূল জীবনযাত্রা মানুষকে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল, যা এই গোত্র প্রথাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
আরবের অধিকাংশ মানুষ যাযাবর হলেও বাণিজ্য ও ধর্মের কেন্দ্র হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরের বিকাশ ঘটেছিল; যেমন ইয়াসরিব (মদিনা), মক্কা, কারবালা এবং দামেস্ক। এই শহরগুলোর মধ্যে মক্কা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেমন ওই অঞ্চলের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল, তেমনি এখানে অবস্থিত ছিল পবিত্র কাবা যা ইসলাম-পূর্ব আরবের বহুঈশ্বরবাদীদের কাছে অন্যতম শ্রদ্ধেয় উপাসনালয় ছিল।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইসলাম-পূর্ব আরবের সাথে পরবর্তী সময়ের আরবের অনেক মিল থাকলেও কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল। ইসলামের আগে অধিকাংশ বেদুইন উপজাতি ছিল বহুঈশ্বরবাদী এবং সর্বপ্রাণবাদী, যদিও এর কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল (যেমন ইয়াসরিবের শাসন ক্ষমতায় থাকা তিনটি প্রধান গোত্র ছিল ইহুদি)। কিছু উপজাতি 'আল্লাহ' নামক এক পরম সত্তার উপাসনা করত, তবে এটি খুব একটা প্রচলিত ছিল না। পরবর্তী সংস্কৃতির মতো তৎকালীন বেদুইন সমাজেও কবিতা এবং মৌখিক পরম্পরার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
মুহাম্মদ এবং ইসলামের সূচনা
[সম্পাদনা]মুহাম্মদ কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের কিছুকাল পরেই তাঁর পিতা মারা যান এবং তাঁর বয়স যখন ছয় বছর, তখন তাঁর মাতাও মৃত্যুবরণ করেন। আট বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর দাদা তাঁকে লালন-পালন করেন এবং দাদার মৃত্যুর পর তিনি তাঁর চাচার আশ্রয়ে বড় হন। মুহাম্মদ একজন বণিক বা ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে ওঠেন।
তরুণ বয়সে মুহাম্মদ এক ধনী বিধবা খাদিজার অধীনে ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ শুরু করেন, যাঁকে তিনি কয়েক বছর পর বিয়ে করেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করার সময় তিনি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের (বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্ম) সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর জীবনদর্শনে প্রভাব ফেলেছিল বলে ধারণা করা হয়।
৬১০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মুহাম্মদ ফেরেশতা জিবরাঈলের মাধ্যমে প্রথম ঐশী বাণী বা ওহি লাভ করেন; এই বাণীগুলোই পরবর্তীতে আরবি ভাষায় কুরআন হিসেবে সংকলিত হয়, যা ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি। শুরুতে এই নতুন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম, যার মধ্যে প্রধানত ছিলেন তাঁর স্ত্রী, কিছু নিকটাত্মীয় এবং কয়েকজন দাস ও ভৃত্য। এরপর মুহাম্মদ তাঁর নিজের গোত্র ও মক্কার সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের প্রচার শুরু করেন।
ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকলে মক্কার প্রভাবশালী উমাইয়া গোত্র এই নতুন ধর্মকে তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে; কারণ কাবার বহুঈশ্বরবাদী উপাসনালয়গুলো তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ধর্মের প্রচার যত বাড়তে থাকে, উমাইয়াদের পক্ষ থেকে মুহাম্মদের ওপর হুমকির মাত্রাও তত বাড়তে থাকে। ইয়াসরিবের মতো মক্কাতেও ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কারণে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মক্কায় মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়লে তারা ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিই হিজরত নামে পরিচিত। ইয়াসরিবে মুহাম্মদকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে স্বাগত জানানো হয় এবং শহরের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় কলহ নিরসনে তাঁর ভূমিকার কারণে শহরটির নামকরণ করা হয় "মদিনা"। মদিনায় ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি নতুন এই ধর্মের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে মুহাম্মদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
মুহাম্মদের নেতৃত্বে মদিনা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শীঘ্রই মক্কার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মক্কার বণিকদের ওপর মুসলিমদের অভিযানের ফলে উমাইয়ারা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ৬২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ হয়। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ উমাইয়াদের সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কাবাসীরা সেই চুক্তি ভঙ্গ করলে মুহাম্মদ ১০,০০০ অনুসারী নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। কোনো রক্তপাত ছাড়াই তিনি মক্কা বিজয় করেন। আল্লাহর ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতীক হিসেবে কাবার চারপাশের বহুঈশ্বরবাদী মিথ্যা উপাস্যদের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয়। মুহাম্মদ মক্কার শাসনভার নিজের হাতে না রেখে তা উমাইয়াদের হাতেই ন্যস্ত করেন এবং মদিনায় ফিরে যান। কালক্রমে উমাইয়া এবং মক্কার অন্যান্য অধিবাসীরাও ইসলাম গ্রহণ করেন।
উমাইয়া সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন
[সম্পাদনা]
৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুসলিম বাহিনী আরবের অধিকাংশ অঞ্চল জয় করে নেয় এবং ইসলামের প্রসার আরও বৃদ্ধি পায়। শীঘ্রই তারা উত্তর আফ্রিকা, আইবেরীয় উপদ্বীপের অংশবিশেষ, মেসোপটেমিয়া এবং পারস্য জয় করে, যা বিশ্ব ইতিহাসে ইসলামের প্রসারের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী কে হবেন তা নিয়ে গোত্রীয় নেতাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। মুহাম্মদের জামাতা আলী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রথমদিককার ইসলাম গ্রহণকারী প্রভাবশালী নেতা আবু বকর এই দুজনের মধ্য থেকে কাকে নেতা নির্বাচন করা হবে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আবু বকরকে প্রথম খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়। এই সিদ্ধান্তটি পরবর্তীতে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। আলী অবশ্য পরবর্তীতে চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আবু বকরের খিলাফতকালে (৬৩২-৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) যোদ্ধা বেদুইন গোত্রগুলো ইসলামের প্রসারে ঐক্যবদ্ধ হয়। তৎকালীন সমৃদ্ধ বাইজেন্টাইন এবং পারস্য সাম্রাজ্যের দুর্বলতা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহিত করেছিল। আরব নেতারা বিজিত শহরগুলোর ওপর এমন কর আরোপ করেছিলেন যা বাইজেন্টাইনদের তুলনায় অনেক কম ছিল এবং বিনিময়ে আরবরা তাঁদের সামরিক সুরক্ষা প্রদানের নিশ্চয়তা দিত। আরবরা ইসলামের প্রচার চালিয়ে যেতে থাকে এবং আহলে কিতাব বা কিতাবী সম্প্রদায়ভুক্ত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত। তবে তারা সেই সব ধর্মকে সমাজ থেকে দূর করতে চেয়েছিল যেগুলোকে তারা বহুঈশ্বরবাদী হিসেবে বিবেচনা করত। এই সব নতুন বিজিত অঞ্চলগুলো জিহাদের মাধ্যমে আরব নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল (পশ্চিমা বিশ্বের একটি ভুল ধারণা হলো যে জিহাদ কেবল ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যবহৃত হয়; প্রকৃতপক্ষে জিহাদ হলো একটি সংগ্রাম যা শারীরিক ও মানসিকসহ বিভিন্ন রূপে হতে পারে)।