বিশ্বের ইতিহাস/ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতা ও সাম্রাজ্য
মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার
উৎস
[সম্পাদনা]প্রায় ৬৫,০০০ বছর আগে আধুনিক মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশে বসতি স্থাপন করে। এই অঞ্চলে সভ্যতার পথে যাত্রা শুরু হয় যখন খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম সহস্রাব্দের দিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চাষাবাদ পদ্ধতি বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে পৌঁছায়। যেহেতু শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের তুলনায় কৃষিভিত্তিক সমাজ অনেক বেশি মানুষের ভার বহন করতে পারত, তাই চাষাবাদের প্রসারের সাথে সাথে এই অঞ্চলে প্রচুর নতুন মানুষেরও আগমন ঘটে। তবে জলবায়ুর পার্থক্যের কারণে এই পদ্ধতিটি এ অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে বেশ সময় লেগেছিল।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের দিকে দক্ষিণ ভারতের তৎকালীন শিকারি-সংগ্রাহকরা স্থানীয় জাতের মিলেট চাষ শুরু করে। ঠিক সেই সময়েই স্থানীয় বুনো ধানের সাথে চীন থেকে আসা উন্নত ধানের সংকরায়ণ ঘটানো হয়, যার ফলে গঙ্গা উপত্যকায় ধান চাষ ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে এই অঞ্চলের বর্তমান জনগোষ্ঠী মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কৃষক এবং প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় শিকারি-সংগ্রাহকদের বংশধর। তবে এরপরও সময়ের সাথে সাথে আরও বিভিন্ন গোষ্ঠী এই অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছে।
সিন্ধু নদ উপত্যকার সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৮০০ - ১৮০০ অব্দ)
[সম্পাদনা]খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৮০০ অব্দ নাগাদ ভারতের সিন্ধু নদের তীরে এক নতুন সভ্যতার উদয় হয় (অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার মতোই যা একটি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল)। এই সভ্যতার বিকাশের জন্য জায়গাটি ছিল অত্যন্ত আদর্শ এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার প্রাকৃতিক সীমানা দিয়ে এটি বেশ সুরক্ষিত ছিল। যদিও এর ফলে বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ কিছুটা সীমিত ছিল, তবে জানা যায় যে প্রাচীন ভারতীয়রা অন্যান্য সভ্যতার সাথে যোগাযোগের জন্য এই পর্বতশ্রেণীর খাইবার পাস ব্যবহার করত। পরবর্তীতে বিভিন্ন গোষ্ঠী এই একই পথ ব্যবহার করে ভারত আক্রমণ করেছিল।

সিন্ধু সভ্যতার দুটি প্রধান শহর আবিষ্কৃত হয়েছে: হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো। এই শহর দুটি মিশর ও মেসোপটেমিয়ার শহরগুলোর সমসাময়িক হলেও আকারে ছিল অনেক বড়। শহর দুটিতে হয়তো প্রায় ১ লক্ষ মানুষ বাস করত এবং পুরো সভ্যতাটি হয়তো ৫০ লক্ষ মানুষের বিশাল এক জনপদ ছিল। এই শহরগুলোর চমৎকার সুশৃঙ্খল গঠন দেখে বোঝা যায় যে, সিন্ধু সভ্যতাই সম্ভবত প্রথম পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেখানে সুবিন্যস্ত নর্দমা ব্যবস্থা, আবর্জনা সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং সম্ভবত জনসাধারণের জন্য শস্যভাণ্ডার ও স্নানাগার ছিল। শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা ছিলেন কারিগর ও বণিক। এই সভ্যতাতেই প্রথম নিখুঁত এবং মানসম্মত ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছিল, যার কোনো কোনোটি এমনকি ০.০০১ মিলিমিটার পর্যন্ত সূক্ষ্ম ছিল। সিন্ধু সভ্যতার মানুষ ধাতুর ব্যবহারেও বেশ দক্ষ ছিল; তারা ব্রোঞ্জ, টিন, তামা ও সিসার উন্নত ব্যবহার জানত।
সিন্ধু সভ্যতার অর্থনীতি মূলত বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে চলত। পণ্য বহনের জন্য তারা গরু টানা গাড়ি ব্যবহার করত, যা আজও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গায় দেখা যায়। সিন্ধু সভ্যতার মানুষ নৌকা তৈরি করেছিল যেগুলোতে সম্ভবত পাল খাটানো থাকত। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিকরা লোথাল নামক উপকূলীয় শহরে একটি বিশাল কৃত্রিম খাল ও জাহাজ ভেড়ানোর জেটি বা ডকইয়ার্ডের সন্ধান পেয়েছেন।
সিন্ধু সভ্যতার এত সব অর্জন থাকা সত্ত্বেও আমরা তাদের সম্পর্কে খুব সামান্যই জানি। তাদের লিখন পদ্ধতি অর্থাৎ 'সিন্ধু লিপি' আজও পড়া সম্ভব হয়নি। তাদের কৃষিকাজ সম্পর্কেও আমরা বিশেষ কিছু জানি না, তবে ধারণা করা হয় যে তারা নদীর প্লাবন থেকে জমা পলিমাটি চাষে ব্যবহার করত এবং তাদের কাছে প্রচুর উদ্বৃত্ত শস্য জমা থাকত। তারা কীভাবে শাসিত হতো সেখানে কোনো রাজা, পুরোহিত, সেনাবাহিনী, মন্দির বা প্রাসাদ ছিল কি না সে সম্পর্কেও কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও শহরগুলোতে বিশাল "দুর্গ" ছিল, তবে সেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মূলত আত্মরক্ষা করা, এমনকি হয়তো বন্যার পানি সরিয়ে দেওয়ার কাজেও সেগুলো ব্যবহৃত হতো। বিজ্ঞানীরা এমনকি এটাও জানেন না যে সিন্ধু সভ্যতার মানুষ নিজেদের কী নামে ডাকত। এছাড়া খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের দিকে তাদের এই সভ্যতা কেন হঠাত ধ্বংস হয়ে গেল, তা-ও আমাদের অজানা। তবে আমরা এটুকুই জানি যে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এক বিশাল, সুসংগঠিত এবং অত্যন্ত উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলেছিল।
আর্য এবং বৈদিক সংস্কৃতি (খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৮০০ - ৫০০ অব্দ)
[সম্পাদনা]খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ থেকে ১৫০০ অব্দের দিকে আর্য নামে পরিচিত এক যাযাবর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়া থেকে ভারতের উপমহাদেশে আসে, সম্ভবত খাইবার পাসের ভেতর দিয়ে। ওই অঞ্চলের আগের উপজাতিগুলোর তুলনায় আর্যরা ঘোড়ায় চড়তে এবং চাকাওয়ালা যানবাহন ব্যবহার করতে পারত, যা তাদের সামরিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছিল। আর্যরা ছিল সিন্ধু সভ্যতার ঠিক উল্টো; তারা প্রচুর পরিমাণে লিখিত এবং পাঠোদ্ধারযোগ্য তথ্য রেখে গেছে, কিন্তু পরীক্ষার জন্য কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রায় নেই বললেই চলে। আর্যদের আগমনের সাথে সিন্ধু সভ্যতার পতনের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না তা স্পষ্ট নয়।
আর্যরা তাদের সাথে বহুঈশ্বরবাদী বিশ্বাস নিয়ে এসেছিল। তাদের এই সংস্কৃতি থেকেই বৈদিক সংস্কৃতির জন্ম হয়, যার মূল ভিত্তি ছিল বেদ এবং উপনিষদ নামক কিছু ধর্মগ্রন্থ। তারা সংস্কৃত ভাষায় কথা বলত, যা বর্তমানের অধিকাংশ ভারতীয় ভাষার আদি উৎস। সে সময় লেখার প্রচলন ছিল না বলে আর্যরা এই গ্রন্থগুলো মুখে মুখে মুখস্থ রাখার জন্য এক বিশেষ দলকে প্রশিক্ষণ দিত। সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় ভাষাগুলো বদলে গেলেও যারা এগুলো আবৃত্তি করতেন, তারা পুরনো উচ্চারণ যতটা সম্ভব বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। পরবর্তীতে এগুলো লিখে রাখা হলেও আজও শ্রুতি বা এই মৌখিক পরম্পরা টিকে আছে।
বহু শতাব্দী ধরে এই বিশ্বাসগুলো বিবর্তিত হয়ে হিন্দুধর্মে রূপ নেয়। বৈদিক ধর্মের একটি অংশ ছিল শ্রেণী বিভাজনের ধারণা, যা পরবর্তীতে ভারতীয় বর্ণপ্রথার পূর্বসূরি হয়ে দাঁড়ায়। শুরুতে এই বর্ণপ্রথা তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল: সবার উপরে যোদ্ধা, মাঝে পুরোহিত এবং একদম নিচে ছিল বিশাল জনসমষ্টি বা কৃষক সমাজ। এক সময় কৃষকদের উপরে ভূস্বামী ও বণিকদের একটি নতুন শ্রেণী তৈরি হয় এবং ব্রাহ্মণ (যাকে হিন্দুধর্মের পরমাত্মা বা ব্রহ্মের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না) হিসেবে পরিচিত পুরোহিতদের যোদ্ধাদের উপরে স্থান দেওয়া হয়। তবে তখনকার বর্ণপ্রথা পরবর্তী সময়ের সংস্করণগুলোর চেয়ে আলাদা ছিল। যেমন, তখন কোনো 'অস্পৃশ্য' শ্রেণী ছিল না এবং মানুষ চাইলেই এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে যেতে পারত।
বৈদিক সভ্যতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল পাণিনি নামক এক পণ্ডিতের লেখা সংস্কৃত ব্যাকরণের নির্দেশিকা অষ্টাধ্যায়ী। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো ভাষার ব্যাকরণ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার প্রথম দিককার একটি উদাহরণ।
মৌর্য সাম্রাজ্য
[সম্পাদনা]পরবর্তী সময়ে বৈদিক সংস্কৃতি ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয় যেগুলোকে বলা হতো জনপদ। পরে এই জনপদগুলো একত্রিত হয়ে মহাজনপদ গড়ে তোলে। এই মহাজনপদগুলো থেকেই মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থান হয়, যা বর্তমান ভারতের মতো এক বিশাল ভূখণ্ড শাসন করা প্রথম সাম্রাজ্য। মৌর্য যুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনা হলো অর্থশাস্ত্র, যা রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামরিক কৌশল বিষয়ক এক বিস্তারিত পরামর্শ গ্রন্থ। সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে স্থানীয় উন্নয়নের পাশাপাশি বাইরের দেশের সাথে যোগাযোগও প্রভাব ফেলেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেন। তিনি সিন্ধু উপত্যকায় একটি যুদ্ধে জয়ী হলেও তাঁর সৈন্যরা বিদ্রোহের হুমকি দেওয়ায় তিনি আর সামনে অগ্রসর হননি।
এরপর মৌর্য সাম্রাজ্য সিন্ধু ও গঙ্গা অববাহিকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের শাসনামলে এই সাম্রাজ্য আরও শক্তিশালী হয় এবং এর সীমানা সর্বোচ্চ বিস্তৃতি লাভ করে। অশোক তাঁর আইনগুলো পাথর ও স্তম্ভে খোদাই করে রেখেছিলেন, যা সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত নিদর্শন। সেখানে ব্যবহৃত লিখন পদ্ধতিটি ছিল ব্রাহ্মী লিপি, যা বর্তমান ভারতের প্রায় সব আদি লিপির জননী। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রসারেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে তাঁর উত্তরসূরিরা এই বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পারেননি। অশোকের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যটি দুর্বল হতে শুরু করে এবং এর ৫০ বছর পর মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।