বিশ্বের ইতিহাস/বিশাল ভূগোল
মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার
আদি মানব
[সম্পাদনা]এই বিভাগে আদি মানবের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। এটি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা না করার দুটি কারণ রয়েছে—প্রথমত, এই যুগের অনেকটা সময়ই ছিল ভাষা-পূর্ববর্তী সময়, তাই এই সময় সম্পর্কে যা কিছু আমরা জানি তা মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্ত। দ্বিতীয়ত, এপি ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি পরীক্ষায় এই বিষয়ের ভূমিকা খুব একটা বিশাল নয়।
মানুষের সব আদি পূর্বপুরুষদের উৎপত্তি হয়েছিল আফ্রিকায়। অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যাফারেন্সিসের মতো কিছু প্রজাতি সেখানেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। আদি মানবের অন্যান্য মহাদেশে পরিযান বা অভিবাসন শুরু হয় প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে হোমো ইরেক্টাসের মাধ্যমে। আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স প্রায় ১,০০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে বের হয়ে আসে, প্রায় ৬০,০০০ বছর আগে এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনে এবং সবশেষে তাত্ত্বিক বেরিং প্রণালীর স্থলসেতু ব্যবহার করে আমেরিকা মহাদেশে পৌঁছায়।
অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যাফারেন্সিস
[সম্পাদনা]অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যাফারেন্সিস হলো আদি মানবের অন্যতম পরিচিত একটি প্রজাতি। এরা প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে থেকে বসবাস শুরু করেছিল এবং প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়। লুসি হলো এই প্রজাতির সবচেয়ে বিখ্যাত একটি ফসিল। ১৯৭১ সালে (মতান্তরে ১৯৭৪) আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় আবিষ্কৃত এই ফসিলটি কয়েকশ অস্থির টুকরো দিয়ে গঠিত, যা একজন নারী অস্ট্রালোপিথেকাস অ্যাফারেন্সিসের দেহের ৪০% অংশ পূর্ণ করে।
হোমো হ্যাবিলিস
[সম্পাদনা]হোমো হ্যাবিলিস যার অর্থ দক্ষ মানুষ পুরা প্রস্তর যুগের সূচনা চিহ্নিত করে। এরা প্রায় ২০ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে বসবাস করত। হোমো গণের মধ্যে এই প্রজাতিটিই আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সের সাথে সবচেয়ে কম সাদৃশ্যপূর্ণ। পূর্ব আফ্রিকায় প্রথম হোমো হ্যাবিলিসের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এই প্রজাতিটিই প্রথম পাথর ব্যবহার করে খুব সাধারণ মানের ধারালো হাতিয়ার তৈরি করতে শিখেছিল।
হোমো ইরেক্টাস
[সম্পাদনা]প্রায় ১৯ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় আদি মানবের এক নতুন প্রজাতি হিসেবে হোমো ইরেক্টাস যার অর্থ সোজা হয়ে দাঁড়ানো মানুষ আবির্ভূত হয়। তাদের উন্নত শিকার করার দক্ষতা এবং আগুন জ্বালানোর ক্ষমতার কারণে তারা ইউরোপ বা এশিয়ার মতো শীতল অঞ্চলে পরিযান করতে সক্ষম হয়েছিল। তারা কয়েকশ বছর ধরে *হোমো হ্যাবিলিস*-এর সমসাময়িক ছিল, কিন্তু উন্নত দক্ষতার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা হোমো হ্যাবিলিসের স্থান দখল করে নেয়।
নিয়ানডার্থাল
[সম্পাদনা]হোমো নিয়ানডার্থালেনসিস ছিল আদি মানবের একটি প্রজাতি যারা প্রায় ২,০০,০০০ থেকে ৩০,০০০ বছর আগে ইউরেশিয়ায় বসবাস করত। শারীরতাত্ত্বিক দিক থেকে এরা আধুনিক মানুষের মতোই ছিল। যদিও মাঝে মাঝে এদের অসভ্য হিসেবে চিত্রিত করা হয়, কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখেছেন যে তারা হাতিয়ার ব্যবহার করত, আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে জানত এবং এমনকি তাদের মৃতদেহ কবর দিত। এটি তাদের জটিল চিন্তা করার ক্ষমতা এবং পরকাল সম্পর্কে কোনো ধারণার ইঙ্গিত দেয়।
আধুনিক মানুষ
[সম্পাদনা]হোমো স্যাপিয়েন্স
[সম্পাদনা]হোমো স্যাপিয়েন্স হলো আধুনিক মানুষ। আবিষ্কৃত কিছু প্রাচীনতম ফসিল প্রায় ১,৬০,০০০ বছর পুরনো, যা প্রমাণ করে যে তারা নিয়ানডার্থালদের পরে আসেনি বরং তাদের সমসাময়িক ছিল। হোমো স্যাপিয়েন্সের আদি নিবাস ছিল আফ্রিকায়।
১,৫০,০০০ থেকে ৪০,০০০ বছর আগের সময়কালে হোমো স্যাপিয়েন্সদের মধ্যে আচরণগত আধুনিকতা প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা লক্ষ্য করেছেন যে এই পরিবর্তনের পর তাদের আচরণের মধ্যে আরও জটিলতার প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশেষ করে তাদের তৈরি হাতিয়ারগুলো আরও বৈচিত্র্যময় ও সূক্ষ্ম কারুকার্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনটি ধীর গতিতে হয়েছিল নাকি মাত্র ১০,০০০ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে ঘটেছিল তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ১১,৫০০ বছর আগে পর্যন্ত অন্যান্য আদি মানব প্রজাতির মতো তারাও শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে জীবনযাপন করত।
বিস্তার
[সম্পাদনা]অন্যান্য মানব প্রজাতির তুলনায় হোমো স্যাপিয়েন্স বিভিন্ন জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অনেক বেশি দক্ষ ছিল। প্রায় ৭০,০০০–৫০,০০০ বছর আগে তারা আফ্রিকা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আচরণগত আধুনিকতা অর্জনকারী মানুষরা পূর্ববর্তী মানব প্রজাতির তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় জলবায়ু ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছিল।
আধুনিক মানুষের এই বিস্তারের সময়কালটি নিয়ানডার্থাল এবং ডেনিসোভানদের মতো আদি মানব প্রজাতির বিলুপ্তির সাথেও যুক্ত। যদিও ধারণা করা হয় যে আধুনিক মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা এবং তাদের বয়ে আনা রোগের কারণে এই প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়েছিল, তবে আধুনিক মানুষের সাথে তাদের সংমিশ্রণ বা মিলনের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
আধুনিক মানুষ যেখানেই ছড়িয়েছে, সেখানেই তাদের মধ্যে ছোট ছোট জেনেটিক পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রথম দিকের আধুনিক মানুষের ত্বক ছিল কৃষ্ণবর্ণ, কারণ বিষুবরেখার কাছের প্রখর সূর্যালোকে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষার জন্য তাদের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। যারা বিষুবরেখা থেকে দূরে সরে গেছে, ভিটামিন ডি উৎপাদনের সুবিধার্থে তাদের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ কমে গিয়ে গায়ের রঙ হালকা হয়ে গেছে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ুর উপযোগী গায়ের রঙ অর্জন করতে মানুষের প্রায় ২০,০০০ বছর বা কখনও কখনও তার চেয়েও কম সময় লেগেছে। আরেকটি উদাহরণ হলো এপিক্যান্থিক ফোল্ড (চোখের পাতায় ভাঁজ) যা শেষ তুষার যুগে মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের মতো শীতল ও ঝড়ো জলবায়ুর মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল। যদিও বর্তমানে পূর্ব এশিয়ার জনসংখ্যা উষ্ণ জলবায়ুতে বাস করে, তবুও তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে তারা এই বৈশিষ্ট্যটি পেয়েছে।
৬৫,০০০ বছর আগের মধ্যে আধুনিক মানুষ অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখন পর্যন্ত ইউরোপের মতো শীতল অঞ্চলে পৌঁছায়নি। শেষ তুষার যুগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম থাকায় বর্তমানের অনেক সমুদ্র-বিচ্ছিন্ন এলাকা তখন স্থলপথ দিয়ে যুক্ত ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর জন্য তারা সম্ভবত সাধারণ নৌকাও ব্যবহার করেছিল। ৩০,০০০ বছর আগের মধ্যে আধুনিক মানুষ এশিয়া ও ইউরোপের প্রায় সব অঞ্চলেই (খুব শীতল জায়গাগুলো বাদে) বসতি স্থাপন করে। ১৪,০০০ বছর আগে তারা এশিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণে পৌঁছে যায় এবং বেরিং প্রণালীর স্থলসেতু ব্যবহার করে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে। শেষ তুষার যুগ প্রায় ১১,৭০০ বছর আগে শেষ হয়। অন্যান্য বিচ্ছিন্ন দ্বীপে মানুষ অনেক পরে পৌঁছেছিল, বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অস্ট্রোনেশীয় জাতির সমুদ্র অভিযানের মাধ্যমে।