বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের ইতিহাস/প্রাচীন গ্রিস ও মহামতি আলেকজান্ডার

উইকিবই থেকে

মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার


প্রাচীন ইতিহাস

[সম্পাদনা]

গ্রিসে গত দশ হাজার বছর ধরে মানুষের বসবাস রয়েছে। গ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিস্টোস সুন্টাস (১৮৫৭-১৯৩৪) থেসালিতে (মধ্য গ্রিস) সেসকলো নামক আধুনিক একটি গ্রামে নব্যপ্রস্তর যুগের এক বিশাল বসতি আবিষ্কার করেন। এই বসতিটি সপ্তম সহস্রাব্দের পুরনো। সেসকলোর এই বসতিতে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত মানুষের বসবাস ছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী কিছু উপজাতি আক্রমণ শুরু করে। তারা নিজেদের হেলেনস বলে পরিচয় দিত। এই উপজাতিরা দুটি আলাদা ধাপে গ্রিসে প্রবেশ করে এবং ওই অঞ্চলের সংস্কৃতি পুরোপুরি বদলে দেয়। প্রথম দলটি মাইসেনীয় সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করে, যারা মিশর এবং লেবানন বা সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য করত এবং বিখ্যাত ট্রোজান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। দ্বিতীয় দলটি, যারা মূলত ডোরিক গ্রিক হিসেবে পরিচিত, ট্রোজান যুদ্ধের পর গ্রিসে প্রবেশ করে। তারা মাইসেনীয় সভ্যতা ধ্বংস করে দেয় এবং একটি অন্ধকার যুগের সূচনা করে। এই অন্ধকার যুগ শেষ হয় খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে, যখন গ্রিক সংস্কৃতির নবজাগরণ শুরু হয়। গ্রিসের আদি ইতিহাসে আমরা আজ যে গ্রিস দেশকে চিনি, তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এর বদলে এটি ছিল কতগুলো বিবাদমান নগর-রাষ্ট্রের (যাকে বলা হতো পলিস) সমষ্টি। এই রাষ্ট্রগুলো কেবল তাদের ভাষা, ধর্ম এবং অভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল। দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর-রাষ্ট্র ছিল এথেন্স এবং স্পার্টা। তারা গ্রিক ভাষার আলাদা আলাদা উপভাষা (ডোরিক এবং আয়নীয়) ব্যবহার করত এবং তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসও ছিল ভিন্ন। শেষ পর্যন্ত, এই পার্থক্যগুলোই তাদের শাসনব্যবস্থায় ভিন্নতা তৈরি করে।

সৌজন্যে: ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি একাডেমি ডিপার্টমেন্ট অফ হিস্ট্রি

আদি এথেন্স

[সম্পাদনা]

এথেন্স প্রতিষ্ঠার ইতিহাস খুব একটা স্পষ্টভাবে জানা যায় না। ধারণা করা হয়, ডোরিয়ানরা মূলত এই শহরের পত্তন করেছিল। তারা উত্তর দিক থেকে আসা একটি উপজাতি যারা গ্রিস আক্রমণ করে সেখানে বসতি স্থাপন করে এবং ঘোড়ার ব্যবহার শুরু করে। এই কারণে এথেন্সে কিছু উপজাতীয় রীতি টিকে ছিল, যেমন গণপরিষদ (যা পরবর্তীকালে এথেনীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়)। প্রথম দিকে এথেনীয় সমাজ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল: সাধারণ কৃষক এবং ধনী 'হিপ্পিস'। কৃষকরা চাষাবাদের জন্য এই হিপ্পিসদের কাছ থেকে শস্য ধার নিত এবং ফসল কাটার পর তা ফেরত দিত। যদিও সমস্ত সিদ্ধান্ত ভোটের মাধ্যমে নেওয়া হতো, সেখানে দুটি পরিষদ ছিল: একটিতে সবাই অংশ নিতে পারত, আর অন্যটি ছিল কেবল হিপ্পিসদের জন্য সংরক্ষিত। এর ফলে আদি এথেন্সে রাজনৈতিক ক্ষমতার সিংহভাগই ছিল হিপ্পিসদের হাতে। ভূমধ্যসাগরীয় দাস ব্যবসা এথেন্সে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সমাজ এভাবেই চলছিল। একবার দাস ব্যবসা শুরু হওয়ার পর কৃষকরা তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে দাস কিনতে শুরু করে এবং তাদের দিয়ে চাষবাস করাতে থাকে। কৃষকরা যাতে তাদের সম্পদের সমান হতে না পারে, সেই ভয়ে হিপ্পিসরা ঋণ পরিশোধে দেরি করা কৃষকদের দাস বানাতে শুরু করে। এর ফলে একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা হিপ্পিস এবং কৃষকদের মিলিশিয়া বাহিনীর মধ্যে প্রায় বিশ বছর ধরে চলেছিল। এই মিলিশিয়ারা স্পার্টার কাছে সাহায্য চায়। স্পার্টা হিপ্পিসদের ক্ষমতাচ্যুত করে এবং এথেন্স পরিচালনার জন্য কিছু আইন জারি করে। এর মধ্যে একটি ছিল এথেনীয় নাগরিকদের দাসে পরিণত না করার অধিকার (যদিও দাসপ্রথা তখনও বৈধ ছিল)। পরবর্তীতে এথেনীয়রা একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলে এবং পারসিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আয়নীয়দের সাহায্য করে।

আদি স্পার্টা

[সম্পাদনা]
মহামতি আলেকজান্ডারের তৈলচিত্র।

স্পার্টা ছিল গ্রিসের অন্যতম সামরিক শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্র। স্পার্টার অস্তিত্ব আগে থেকেই থাকলেও এর প্রকৃত ইতিহাস শুরু হয় লাইকারগাসের হাত ধরে। লাইকারগাস ছিলেন একজন স্পার্টান অভিজাত ব্যক্তি, যিনি স্পার্টার সমাজে বেশ কিছু সংস্কার আনেন যা একে একটি অনন্য রূপ দেয়। লাইকারগাসের সংস্কারগুলোর মধ্যে ছিল লোহা ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, পুরুষদের জন্য জনসমক্ষে ভোজনালয়ে খাবার খাওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং বাড়ির সিলিং খোদাই করার বদলে কুড়াল দিয়ে তৈরি করার নিয়ম। স্পার্টানরা তাদের কৃষিকাজ করানোর জন্য প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো আক্রমণ করে হেলট (দাস) সংগ্রহ করত, যাতে তারা নিজেরা পুরোপুরি সামরিক বিষয়ে মনোনিবেশ করতে পারে। পরবর্তীতে তারা পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এথেনীয়দের সাথে যোগ দেয়।

সাফল্য ও অবদান

[সম্পাদনা]

গ্রিক সভ্যতা শিল্প ও বিজ্ঞানের অনেক শাখায় প্রথম না হলেও, তারা ছিল প্রথম দিকের "পাশ্চাত্য" জাতি যারা এসব বিষয়ে স্থায়ী কৌশল ও পদ্ধতি তৈরি করেছিল। তাদের এই পদ্ধতিগুলো রেনেসাঁ পর্যন্ত জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের স্থাপত্যশৈলী এবং রোমানদের কাজ পরবর্তীকালের অনেক স্থপতি ও প্রকৌশলীকে অনুপ্রাণিত করেছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো পার্থেনন—যা গ্রিক জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনার উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি মন্দির।

পতনের শুরু

[সম্পাদনা]

এথেন্স, থিবস বা স্পার্টার মতো স্বতন্ত্র নগর-রাষ্ট্র এবং তাদের শিথিল জোটগুলো মেসিডোনিয়ার ফিলিপ বা তাঁর ছেলে আলেকজান্ডারের সামরিক কৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তারা ছিল উদীয়মান রোমান শক্তির অগ্রদূত, যারা তাদের জেনারেলদের নেতৃত্বে শেষ পর্যন্ত গ্রিস জয় করে নেয়। তবে রোমানরা গ্রিস জয় করলেও তাদের উন্নত সংস্কৃতি গ্রহণ করে নিয়েছিল, যা গ্রিক ঐতিহ্যকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।