বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের ইতিহাস/দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

উইকিবই থেকে

মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এ যাবৎকালের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। যুদ্ধের সময় যেসব বিধ্বংসী প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল—বিশেষ করে পারমাণবিক বোমা—সেগুলো বড় দেশগুলোর মধ্যে একই মাত্রার কোনো দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। কারণ এ ধরণের যুদ্ধে লিপ্ত সব পক্ষই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

১৯৪৫ সালের পর থেকে কোনো উন্নত শিল্পোন্নত দেশে আর বিদেশি আক্রমণ ঘটেনি। সেই সময় থেকে পরবর্তী সব যুদ্ধ ছিল মূলত অনুন্নত দেশগুলোতে গেরিলা যুদ্ধ, অথবা উন্নত দেশের সাথে কোনো অনুন্নত দেশের লড়াই, কিংবা এই দুই ধরণের পরিস্থিতির সংমিশ্রণ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, ১৯৪০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রকৃত ও সম্ভাব্য শিল্পোৎপাদনের বড় অংশই এই যুদ্ধ এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতির পেছনে ব্যয় হয়েছিল। তবে এর ব্যতিক্রম ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মূল ভূখণ্ড এই যুদ্ধে আক্রান্ত না হওয়ায় ১৯৪৫ সালের পর তারা তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সাধারণ অর্থনীতি উভয়কেই খুব দ্রুত সমৃদ্ধ করতে পেরেছিল। অন্যদিকে ইউরোপ এবং জাপান পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সহযোগিতায় তাদের অর্থনৈতিক জীবনের ভিত্তি পুনরায় গড়ে তুলতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লেগেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন যুদ্ধে জয়ী হলেও তারাও ছিল ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত।

বিশ্বের বিভাজন

[সম্পাদনা]
"লৌহ পর্দার" মানচিত্র

ইউরোপ "লৌহ পর্দার" মাধ্যমে দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এটি জার্মানিকে দুই ভাগে "ভাগ" করে দেয় এবং চেকোস্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি থেকে অস্ট্রিয়াকে, আর যুগোস্লাভিয়া থেকে ইতালিকে আলাদা করে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব পোল্যান্ডকে নিজেদের সাথে যুক্ত করে নেয় এবং এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে জার্মানির বিশাল এক এলাকা পোল্যান্ডের শাসনের অধীনে দিয়ে দেয়। পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট দলগুলোকে ক্ষমতায় বসাতে মস্কো সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল। ফিনল্যান্ড নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও ১৯৪০ সালের শীতকালীন যুদ্ধে সোভিয়েতদের কাছে হারানো জমি আর ফেরত পায়নি। মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে যুগোস্লাভিয়া আগে থেকেই কমিউনিস্ট দেশ হলেও তারা সরাসরি মস্কোর প্রভাব মানতে রাজি হয়নি। তারা একটি স্বতন্ত্র পথ বেছে নেওয়ায় স্টালিন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বলকান অঞ্চলের অন্যান্য দেশ যেমন বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং আলবেনিয়াকেও সোভিয়েত ব্লকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

পশ্চিম দিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র গণতান্ত্রিক দেশগুলো: যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, নরওয়ে এবং পশ্চিম জার্মানি। তবে ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে ইউরোপের বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নৈকট্যের কারণে ওয়াশিংটন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা ভয় পাচ্ছিল যে ফ্রান্স, ইতালি এবং গ্রিসে হয়তো স্থানীয় কমিউনিস্ট দলগুলো ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। ফরাসি নেতা চার্লস দ্য গলকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোরালো সমর্থন দেয় এবং ইতালির কমিউনিস্ট-বিরোধী দলগুলোকে প্রচুর অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই পশ্চিমা প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যায়নি।

এশিয়ায় চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া এবং মঙ্গোলিয়া ছিল কমিউনিস্ট দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকার সময় জাপানকে তাদের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হয়। তারা সামরিকবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ থেকে সরে এসে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে হাঁটে। উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক জোট গঠন করে। ১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবে ন্যাটো গঠিত হয়। এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া এবং স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে ১৯৫৫ সালের ১৪ই মে সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্গানাইজেশন অফ ওয়ারশ ট্রিটি গঠন করে, যা ওয়ারশ প্যাক্ট নামেই বেশি পরিচিত।

পশ্চিমা, পূর্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার একটি পথ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে লিগ অফ নেশনসের ব্যর্থতা (যার উদ্যোক্তাও ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম একটি কারণ। এই সংস্থাগুলোর পেছনে থাকা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, বিশেষ করে তারা কাদের বেশি সুবিধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে শেষ পর্যন্ত তারা বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি শক্তি হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য মার্কিন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং সাম্প্রতিককালের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। ১৯৪৭ সালের জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা গঠনের যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তারই বিবর্তিত রূপ হলো আজকের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।