বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের ইতিহাস/দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও গতিপথ

উইকিবই থেকে

মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ

[সম্পাদনা]

১৯১৯ সাল নাগাদ ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে তাদের লক্ষ্যগুলো অর্জন করে ফেলেছিল। তারা জার্মানিকে সামরিকভাবে পুরোপুরি শক্তিহীন করে দেয় এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো ইউরোপসহ পুরো বিশ্বকে নতুন করে সাজায়। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নীতি নিয়ে ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা দিত। এই শান্তির বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা তাদের আছে কি না, তা নিয়ে তারা নিজেরাই নিশ্চিত ছিল না। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে মানুষের মধ্যে এক ধরণের অনীহা তৈরি হয়, যা থেকে জন্ম নেয় তোষণ নীতি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল শান্তি বজায় রাখার জন্য কোনো আগ্রাসী শক্তির অন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া। অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধের ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পুনরায় বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতির দিকে ফিরে যায়।

ভার্সাই চুক্তি অনেক দেশের মধ্যেই অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। যুদ্ধের বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত বেকার সৈন্যদের মানবেতর জীবন এই বিরূপ পরিস্থিতিগুলো সমাজে নতুন ও চরমপন্থী চিন্তাধারার জন্ম দেয়। ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ছিল এরই একটি ফল। মুসোলিনির এই ফ্যাসিস্ট পার্টিই পরবর্তীতে জার্মানিতে হিটলারের জন্য একটি আদর্শ বা মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শান্তি প্রচেষ্টার ব্যর্থতা

[সম্পাদনা]

১৯২০-এর দশকে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী লীগ অব নেশনস (১৯২০) বা জাতিপুঞ্জ গঠন করা। দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য এটি একটি সাধারণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করার কথা ছিল। তবে এই সংস্থার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। তারা কেবল আলোচনার মাধ্যমে বোঝানো অথবা বিভিন্ন স্তরের নৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারত। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর করা বা না করা পুরোপুরি সদস্য দেশগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত। মজার ব্যাপার হলো, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই কখনও এই লীগে যোগ দেয়নি। এছাড়া জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নও শুরুতে এর সদস্য ছিল না।

১৯২১-২২ সালের ওয়াশিংটন সম্মেলনে শক্তিশালী দেশগুলো একটি নির্দিষ্ট অনুপাত অনুযায়ী নিজেদের নৌ-বাহিনীর শক্তি সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি হয়। এরপর ১৯২৫ সালের লোকর্নো সম্মেলনে জার্মানি ও ফ্রান্সের সীমানা রক্ষার নিশ্চয়তা এবং জার্মানি ও পোল্যান্ডের মধ্যে বিরোধ মেটানোর একটি সালিশি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯২৮ সালের কেলগ-ব্রিয়াঁ চুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাদে বিশ্বের সব বড় শক্তিসহ মোট ৬৩টি দেশ জাতীয় নীতির অংশ হিসেবে যুদ্ধ করার পথ বর্জন করার অঙ্গীকার করে। তারা প্রতিজ্ঞা করে যে, নিজেদের মধ্যে যেকোনো সমস্যা তারা "শান্তিপূর্ণ উপায়ে" সমাধান করবে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলো আগেই একমত হয়েছিল যে, "আত্মরক্ষার খাতিরে" যুদ্ধ করা এই চুক্তির আওতামুক্ত থাকবে।

ফ্যাসিবাদের উত্থান

[সম্পাদনা]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী দেশগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল "বিশ্বকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করা"। এর ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হয় এবং যুদ্ধের পর পুনর্গঠিত বা নতুনভাবে সৃষ্টি হওয়া অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোও একই পথ অনুসরণ করে। তবে ১৯২০-এর দশকে ভবিষ্যতের ধারাটি গণতন্ত্রের বদলে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সামরিক সর্বাত্মকবাদের দিকে মোড় নিতে শুরু করে, যা ইতালীয় নাম অনুসারে 'ফ্যাসিবাদ' নামে পরিচিত হয়। এই মতবাদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা গণতন্ত্রের চেয়েও কার্যকরভাবে মানুষের চাহিদা মেটাতে পারবে এবং নিজেদের সাম্যবাদের বিরুদ্ধে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা হিসেবে জাহির করেছিল। ১৯২২ সালে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের প্রথম ইউরোপীয় ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

অক্ষ জোট গঠন

[সম্পাদনা]

জার্মান ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট (নাৎসি) দলের নেতা অ্যাডলফ হিটলার ফ্যাসিবাদের একটি বর্ণবাদী রূপ প্রচার করতে শুরু করেন। হিটলার ভার্সাই চুক্তি বাতিল করার এবং জার্মান জনগণের জন্য অতিরিক্ত লেবেনসব্রাউম (বসবাসের জায়গা) দখল করার প্রতিশ্রুতি দেন। তার যুক্তি ছিল যে, একটি শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে জার্মানরা আরও বেশি জায়গার দাবিদার। ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে জার্মানিতে 'মহামন্দা' আঘাত হানে। তৎকালীন মধ্যপন্থী দলগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একমত হতে পারেনি, যার ফলে বিশাল সংখ্যক ভোটার নাৎসি এবং কমিউনিস্টদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হন এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিজেকে একনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাসিবাদ গ্রহণ না করলেও সরকারের ওপর সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী প্রভাব সেখানে একই ধরণের সর্বাত্মকবাদী শাসন চাপিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে জাপানিরা হিটলারের চেয়েও এগিয়ে ছিল। ১৯৩১ সালে মুকদেন (বা মাঞ্চুরিয়া সংকট) নামক স্থানে চীনা সৈন্যদের সাথে একটি ছোটখাটো সংঘর্ষকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তারা পুরো মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয় এবং ১৯৩২ সালে সেখানে মাঞ্চুকুয়ো নামে একটি পুতুল রাষ্ট্র ঘোষণা করে। ১৯৩৭-৩৮ সালের মধ্যে তারা চীনের প্রধান বন্দরগুলোও দখল করে নেয়। ভার্সাই চুক্তির নিরস্ত্রীকরণ শর্তগুলো প্রত্যাখ্যান করে হিটলার নতুন বিমানবাহিনী গঠন করেন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করেন। ১৯৩৬-৩৯ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধে ডানপন্থী সামরিক বিদ্রোহীদের পক্ষ নিয়ে তিনি তাঁর নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মুসোলিনির সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। মুসোলিনিও ১৯৩৫-৩৬ সালে একটি ছোট যুদ্ধের মাধ্যমে ইথিওপিয়া দখল করার পর স্পেনের বিদ্রোহকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। ১৯৩৬-৩৭ সালে জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে 'রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি' গড়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩৬ সালে জাপান ও জার্মানি অ্যান্টি-কমিন্টার্ন চুক্তিতে সই করে এবং ১৯৩৭ সালে ইতালি তাতে যোগ দেয়। এই চুক্তিটি সাম্যবাদের নিন্দা জানায় এবং এই বিষয়ে দেশগুলোর ঐক্য প্রদর্শন করে। এরপর থেকে অক্ষশক্তি শব্দটি এই দেশগুলো এবং তাদের মিত্রদের সম্মিলিত নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

ইউরোপে জার্মানির আগ্রাসন

[সম্পাদনা]

১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে অস্ট্রিয়া দখলের মাধ্যমে হিটলার তাঁর রাজ্য বিস্তারের অভিযান শুরু করেন। সে সময় পথ ছিল একদম পরিষ্কার: মুসোলিনি তাঁকে সমর্থন দিচ্ছিলেন এবং ব্রিটিশ ও ফরাসিরা জার্মানির সামরিক শক্তিতে ভীত হয়ে হিটলারের এই দাবি মেনে নেয় যে—অস্ট্রিয়ার বিষয়টি জার্মানির একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষতা আইন পাস করে তাদের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা সীমিত করে ফেলেছিল, যা বিদেশের কোনো দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষকেই সাহায্য করতে বাধা দিচ্ছিল। ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল 'সুডেটেনল্যান্ড' দখলের জন্য যুদ্ধের হুমকি দেন, যেখানে প্রায় ৩৫ লক্ষ জাতিগত জার্মান বসবাস করত। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন এই পরিস্থিতি সামলাতে আলোচনার উদ্যোগ নেন যা মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের চাপে চেক সরকার সুডেটেনল্যান্ড ছেড়ে দিতে রাজি হয় এবং বিনিময়ে হিটলার প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি আর কোনো চেক এলাকা দখল করবেন না। চেম্বারলেইন বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি "আমাদের সময়ের জন্য শান্তি" নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু শীঘ্রই মিউনিখ শব্দটি চরম এবং ব্যর্থ তোষণ নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশও দখল করে নেন। জার্মানির এই নতুন আগ্রাসন এবং পোল্যান্ডের প্রতি হিটলারের হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় যে পোল্যান্ডের স্বাধীনতা হুমকিতে পড়লে তারা তাদের সাহায্য করবে। সে সময় একটি কৌতুক প্রচলিত ছিল: "দিনে একটি গ্যারান্টি হিটলারকে দূরে রাখে"। ফ্রান্সের সাথে পোল্যান্ডের আগে থেকেই একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল। তোষণ নীতি থেকে সরে আসার এই সিদ্ধান্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সোভিয়েত একনায়ক জোসেফ স্টালিন ১৯৩৮ সালের সংকটের সময় চেকোস্লোভাকিয়াকে সামরিক সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু মিউনিখ চুক্তির সাথে জড়িত পক্ষগুলো তখন তাঁকে গুরুত্ব দেয়নি। এখন যখন যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হলো, তখন উভয় পক্ষই স্টালিনকে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করতে লাগল। তবে হিটলারের প্রস্তাবই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে মিত্রতা করলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে যুদ্ধে নামতে হতো, কিন্তু জার্মানি চেয়েছিল কেবল তাদের নিরপেক্ষতা। ১৯৩৯ সালের ২৩শে আগস্ট রাতে মস্কোতে নাৎসি-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরের দিন প্রকাশিত অংশে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে স্টালিন ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, পূর্ব পোল্যান্ড এবং পূর্ব রোমানিয়ায় নিজের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পান।

বিশ্বব্যাপী মহামন্দা

[সম্পাদনা]
মহামন্দার ফলে বিশ্বজুড়ে যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খরচ এবং বছরের পর বছর যুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপ পুনর্গঠনের ব্যয়ের ফলে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশাল ঋণে জড়িয়ে পড়ে। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ওপর যে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ঋণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেয়। এর সাথে ইউরোপের অনেক দেশে অকার্যকর সরকার (বিশেষ করে ভাইমার প্রজাতন্ত্র, মুসোলিনি-পূর্ব ইতালি এবং সমাজতান্ত্রিক ফ্রান্স) থাকায় দেশগুলোর পুনর্গঠন ধীর হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ে।

১৯২৯ সালের ২৯শে অক্টোবর নিউইয়র্ক শেয়ার বাজারে ধস নামলে পরবর্তী দিনগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সমস্ত বিদেশি ঋণ ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়। এই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং শুরু হয় 'মহামন্দা'।

ইউরোপে যুদ্ধ

[সম্পাদনা]
জার্মান আক্রমণের পর জ্বলন্ত ওয়ারশ শহর।

১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিপুঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য ছিল, কিন্তু বাস্তবে তারা শুরুর দিকে তেমন কিছুই করেনি, যা মেকি যুদ্ধ নামে পরিচিত। তবে পোল্যান্ডে লড়াই পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল। জার্মানি তাদের নতুন যুদ্ধকৌশল ব্লিৎসক্রিগের ("বিদ্যুৎগতিতে যুদ্ধ") কারণে অত্যন্ত সফল হয়। এই কৌশলে ট্যাংক যা সে সময়ে তুলনামূলক নতুন প্রযুক্তি ছিল ব্যবহার করে কোনো দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুছিয়ে নেওয়ার আগেই দ্রুত তাদের দখল করে নেওয়া হতো। জার্মানির জন্য এই কৌশল চমৎকারভাবে কাজ করে এবং মাত্র ৭ দিনের মধ্যেই জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আক্রমণের কয়েকদিন আগে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অনাগ্রমণ চুক্তি করেছিল, যা মূলত পূর্ব ইউরোপকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার একটি সমঝোতা ছিল। এই চুক্তিটি বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল কারণ এই দুটি দেশের শাসনব্যবস্থা ও আদর্শ ছিল একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে এই ভঙ্গুর চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এর আগেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাল্টিক দেশসমূহ এবং রোমানিয়ার কিছু অংশ দখল করে নেয়। তারা ফিনল্যান্ডের জমিও দখলের চেষ্টা করেছিল, যা শীতকালীন যুদ্ধ নামে পরিচিত এবং এতে রুশদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এরপর জার্মানি উত্তর সাগরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ডেনমার্ক এবং নরওয়ে দখল করে নেয়। এরপর তারা ফ্রান্সের দিকে নজর দেয়। ফরাসিদের প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল ম্যাজিনো লাইন —জার্মানি সীমান্তের পুরোটা জুড়ে তৈরি করা দুর্গের এক বিশাল সারি। এর ফলে তারা সীমান্তে অল্প সৈন্য রেখে বেলজিয়াম সীমান্তে সেরা সৈন্যদের মোতায়েন করতে পেরেছিল, কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি বেলজিয়ামের ভেতর দিয়েই আক্রমণ করেছিল। তবে তারা আরদেনে জঙ্গল এলাকাটি অরক্ষিত রেখেছিল কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল ঘন জঙ্গল পার হয়ে আসা অসম্ভব। এটি জানতে পেরে জার্মানি একটি দুঃসাহসিক আক্রমণ চালায় এবং আরদেনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ৫০টি ট্যাংক ডিভিশন পাঠিয়ে দেয়। জার্মানরা ফরাসিদের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলে এবং মিত্র বাহিনীকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। সেখানে ফরাসি বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেলেও তারা ব্রিটিশ সৈন্যদের ডানকার্ক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্সের জন্য সব শেষ হয়ে যায়। তাদের সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফ্রান্স আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তবে ফরাসি প্রতিরোধ তখনো শেষ হয়ে যায়নি। সাধারণ মানুষের লড়াই ছাড়াও "মুক্ত ফ্রান্স"-এর ব্যানারে লড়াই করা বাহিনীগুলো পরবর্তী বছরগুলোতে উত্তর আফ্রিকা রণাঙ্গনে বড় ভূমিকা পালন করেছিল। তবে ইউরোপে জার্মানি দক্ষিণ অংশে ভিশি ফ্রান্স নামে একটি পুতুল রাষ্ট্র গঠন করে এবং উত্তর অংশটি প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে পুরোপুরি নিজেদের দখলে রাখে। জার্মানি চেষ্টা করছিল ব্রিটেনকে শান্তি চুক্তিতে রাজি করাতে, কিন্তু নতুন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল হার মানতে অস্বীকার করেন। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ দখল করতে হলে জার্মানিকে প্রথমে আকাশ ও সমুদ্রপথে ইংলিশ চ্যানেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে হতো যাতে তারা সৈন্য নামাতে পারে। ইংল্যান্ডের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা এবং প্রধান শহরগুলোতে বোমাবর্ষণের পরও ব্রিটেন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং জার্মানির নৌ-আক্রমণের সম্ভাবনা রুখে দেয়।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ

[সম্পাদনা]
  • এটি কেবল একটি খসড়া রূপরেখা। প্রয়োজন অনুযায়ী এটি পরিবর্তন করা যেতে পারে।

মুকদেন ঘটনা এবং মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ (১৯৩১)

[সম্পাদনা]
আক্রমণের সময় জাপানি সৈন্যদল।

১৯০৫ সালে রুশো-জাপানি যুদ্ধে জেতার পর জাপান খুব দ্রুত ওই অঞ্চলের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। রাশিয়া কোরিয়াকে জাপানের প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং সেখান থেকে ও মাঞ্চুরিয়া থেকে তাদের সব সৈন্য সরিয়ে নেয়। মাঞ্চুরিয়া ছিল চীনের উত্তর-পূর্ব দিকের একটি জনবিরল অঞ্চল। ১৯১০ সালে কোনো বড় ধরণের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ ছাড়াই জাপান কোরিয়াকে নিজেদের অংশ করে নেয়। জাপান তখন জনসংখ্যা ও অর্থনীতি উভয় দিক থেকেই দ্রুত বড় হচ্ছিল। ১৯০৬ সালে তারা মাঞ্চুরিয়ায় সাউথ মাঞ্চুরিয়া রেলওয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে এবং এই কোম্পানির মাধ্যমে তারা ওই এলাকায় অনেকটা সরকারের মতো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

১৯৩১ সাল নাগাদ অর্থনৈতিক মন্দা জাপানে বড় আঘাত হানে। জাপানি সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশেষ কিছু করতে পারেনি, যা জনগণের চোখে তাদের দুর্বল ও ক্ষমতাহীন করে তোলে। এর বদলে সাধারণ মানুষ সামরিক বাহিনীর ওপর বেশি ভরসা করতে শুরু করে এবং শীঘ্রই বেসামরিক সরকার সামরিক বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সামরিক বাহিনীর কাছে জাপানের অনেক সমস্যার সমাধান হিসেবে মাঞ্চুরিয়াকে একটি আদর্শ জায়গা মনে হয়েছিল। বিশাল এবং জনবিরল এই অঞ্চলটি অতিরিক্ত জনবহুল জাপানের জন্য বাড়তি জায়গা হিসেবে কাজ করত। এছাড়া মনে করা হতো যে মাঞ্চুরিয়া বনজ সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং উর্বর জমিতে সমৃদ্ধ। জাপানিরা নিজেদের চীনাদের চেয়ে অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ মনে করত, যা জাপানকে সংঘাতের দিকে আরও দ্রুত ঠেলে দেয়। এছাড়া মাঞ্চুরিয়ার তৎকালীন শাসক জাপানের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে চীনের একটি ক্রমবর্ধমান সামরিক আন্দোলনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাই ১৯৩১ সালে মাঞ্চুরিয়ার মুকদেন শহরের কাছে একটি রেলপথে সামরিক বাহিনী নিজেই একটি বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে চীন আক্রমণের অজুহাত পাওয়া যায়। জাপানি সরকার এই অভিযানের পক্ষে না থাকলেও জাপানি বাহিনী সেখানে খুব একটা বাধার মুখে পড়েনি এবং বছরের শেষ নাগাদ পুরো মাঞ্চুরিয়া তাদের দখলে চলে আসে। এরপর জাপান সেখানে মাঞ্চুকুয়ো নামে একটি পুতুল রাষ্ট্র গঠন করে নবজিত অঞ্চলটি দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়। লিগ অফ নেশনস জাপানের এই আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানালে জাপান সংস্থাটি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।

জাপানের চীন আক্রমণ (১৯৩৭)

[সম্পাদনা]
উহান যুদ্ধের একটি দৃশ্য।

১৯২০-এর দশকে চীন ছিল বেশ দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে বিশৃঙ্খল। বিভিন্ন প্রদেশের শাসকরা একে অপরের সাথে লড়াই করত এবং কেন্দ্রীয় সরকার ছিল খুব দুর্বল, যারা এসব সংঘাত থামাতে অক্ষম ছিল। ১৯২৭ সালে চিয়াং কাই-শেক কুওমিনতাং বা চীনা সরকার এবং তাদের জাতীয় বিপ্লবী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নেন। চিয়াং দক্ষিণ ও মধ্য চীনের শাসকদের পরাজিত করার জন্য এবং উত্তর অঞ্চলের শাসকদের সমর্থন পাওয়ার জন্য একটি অভিযান চালান। তিনি সফল হয়েছিলেন এবং শীঘ্রই তিনি জাপানের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে সাম্যবাদকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। কিন্তু ১৯৩৭ সালে মাঞ্চুরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত শাসক চিয়াংকে অপহরণ করেন এবং জাপানি হুমকির বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে হলেও কমিউনিস্টদের সাথে ঐক্যবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করেন। জাপানি বাহিনী এর জবাবে লুগৌ সেতুতে যুদ্ধের আয়োজন করে, যা ছিল চীন ও জাপানের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ বাধানোর একটি কৌশল। এটি সফল হয় এবং সিনো-জাপানি যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতে চীন জমি ছেড়ে দিয়ে জাপানিদের আটকে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। এটি মনে রাখা জরুরি যে জাপানিদের লক্ষ্য পুরো চীন দখল করা ছিল না; বরং তারা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে পুতুল সরকার বসাতে চেয়েছিল যারা জাপানি স্বার্থ রক্ষা করবে। এই যুদ্ধের শুরুর দিকে নানজিং শহরের পতনের পর জাপানিরা যুদ্ধাপরাধ শুরু করে। নানজিং দখলের পরের ছয় সপ্তাহে প্রায় ১ থেকে ৩ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটানো হয়েছিল।

কমিন্টার্ন-বিরোধী চুক্তি এবং ত্রিপক্ষীয় চুক্তি

[সম্পাদনা]

এগুলো ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের মধ্যে সম্পাদিত কিছু চুক্তি। অ্যান্টি-কমিন্টার্ন চুক্তি ছিল সাম্যবাদের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান, যা শুরুতে জাপান ও জার্মানি সই করেছিল। তবে পরবর্তীতে জার্মানি ও ইতালির সম্পর্কের উন্নতি হলে ইতালিও এতে সই করে এবং ১৯৩৮ সালে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তির মাধ্যমে এটি আরও শক্তিশালী হয়। ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এই জোটকে আরও সুসংহত করে এবং এটি মূলত রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল।

পার্ল হারবার এবং একই সাথে বিভিন্ন আক্রমণ (ডিসেম্বর ১৯৪১-এর শুরু)

[সম্পাদনা]
আক্রমণের সময় পার্ল হারবার।

১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর ভাইস অ্যাডমিরাল চুয়িচি নাগুমোর নেতৃত্বে জাপানি যুদ্ধবিমানগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৌ-ঘাঁটি হাওয়াইয়ের পার্ল হারবারে আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। জাপানি বাহিনী বিশেষ কোনো বাধার মুখে পড়েনি এবং বন্দরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এই আক্রমণে ৮টি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ৩টি হালকা ক্রুজার ও ৩টি ডেস্ট্রয়ার ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি ৩৪৩টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। এই হামলায় ৬৮ জন বেসামরিক মানুষসহ মোট ২৪০৮ জন মার্কিনী প্রাণ হারান এবং ১১৭৮ জন আহত হন। জাপানের পক্ষ থেকে মাত্র ২৯টি বিমান এবং তাদের চালক ও পাঁচটি ছোট সাবমেরিন হারানো হয়েছিল। তবে এই আক্রমণটি এমন কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছিল যা ধ্বংস হলে মার্কিন নৌ-বহরের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারত। যেমন—আক্রমণের সময় মার্কিন বিমানবাহী জাহাজগুলো সমুদ্রে থাকায় সেগুলো রক্ষা পায় এবং ঘাঁটির জ্বালানি ভাণ্ডার ও মেরামত কেন্দ্রগুলোও অক্ষত ছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো টিকে যাওয়ার কারণে অনেক ইতিহাসবিদ এই আক্রমণকে জাপানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে একটি ভয়াবহ কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচনা করেন।

পরের দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পার্ল হারবারে হামলার সাথে সাথেই জাপান ফিলিপাইনে থাকা মার্কিন বিমান ঘাঁটিগুলোতেও আক্রমণ চালায়। এই হামলার পরপরই জাপান ফিলিপাইন এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং, মালয়, বোর্নিও ও বার্মা আক্রমণ করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজের তেল খনিগুলো দখল করা।

পার্ল হারবারে জাপানি হামলার পর ১৯৪১ সালের ১১ই ডিসেম্বর জার্মানিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যদিও ১৯৪০ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী তারা এটি করতে বাধ্য ছিল না। হিটলার এই আশায় যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন যে জাপান হয়তো এর বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণে তাঁকে সাহায্য করবে। কিন্তু জাপান তাতে রাজি হয়নি এবং এই কূটনৈতিক পদক্ষেপটি হিটলারের জন্য একটি ভয়াবহ ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কংগ্রেসের কোনো বড় ধরণের বিরোধিতা ছাড়াই পূর্ণ শক্তি নিয়ে ইউরোপের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন এটি যুদ্ধের আরেকটি বড় মোড় ছিল কারণ হিটলারের কারণে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো বিশেষ করে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বিশাল জোটে আবদ্ধ হয় এবং তারা একযোগে পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে শক্তিশালী আক্রমণ চালাতে শুরু করে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং এশিয়ায় মিত্রশক্তির পরাজয় (ডিসেম্বর ১৯৪১-এর শেষ থেকে ১৯৪২)

[সম্পাদনা]

পার্ল হারবারে ভোরের সেই হামলার সাথেই জাপানিরা মালয় আক্রমণ শুরু করে। তারা ভিয়েতনাম এবং তাইওয়ানের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা বিমানবাহিনীর সহায়তায় মালয়ের পূর্ব উপকূলে কোটা ভারুতে সৈন্য নামায়। ব্রিটিশরা এই আক্রমণ ঠেকাতে সিঙ্গাপুরের নৌ-ঘাঁটি থেকে ফোর্স জেড পাঠায়, যার মধ্যে ছিল রণতরী এইচএমএস প্রিন্স অফ ওয়েলস এবং যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস রিপালস। কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই জাপানি বোমারু বিমানগুলো সেগুলোকে মাঝপথে ধরে ফেলে এবং ধ্বংস করে দেয়।

জাপানিরা খুব দ্রুত মালয় উপদ্বীপের দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ব্রিটিশরা ভেবেছিল এত উত্তর থেকে আক্রমণ করে নিচে নেমে আসা "অসম্ভব", কিন্তু জাপানিরা জানুয়ারি ১৯৪২-এর মধ্যে উপদ্বীপের একদম দক্ষিণ প্রান্তে জোহোর প্রণালীতে পৌঁছে যায়। তারা এমনকি সেখানে ট্যাংকও ব্যবহার করেছিল, যা ব্রিটিশদের ধারণার বাইরে ছিল; তারা ভুলবশত ভেবেছিল জঙ্গল ভেদ করে ট্যাংক আসতে পারবে না।

মাত্র দুই সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত অভিযানে জাপানিরা জোহোর প্রণালী পার হয়ে বেশ কয়েকটি তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে কেন্ট রিজের যুদ্ধে রয়্যাল মালয় রেজিমেন্ট বীরত্বের সাথে লড়াই করলেও জাপানিদের অগ্রযাত্রা থামাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের পতন ঘটে। এর ফলে ভারত মহাসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী হয়ে সমুদ্রপথে যাতায়াতের পথ জাপানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মালয় উপদ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে রাবার বাগান এবং টিনের খনিগুলো তখন জাপানিদের দখলে চলে যায়।

মিত্রশক্তির অন্যান্য এলাকাগুলোও, বিশেষ করে খনিজ তেল সমৃদ্ধ ইস্ট ইন্ডিজ (ইন্দোনেশিয়া) খুব দ্রুত জাপানিরা দখল করে নেয়। এর ফলে সংগঠিত সব প্রতিরোধ কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং সবার নজর তখন মিডওয়ে, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, বিসমার্ক সাগর এবং নিউ গিনির দিকে চলে যায়।

ফিলিপাইনে প্রতিরোধ এবং বাথান ডেথ মার্চ

[সম্পাদনা]

যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন: কোরাল সাগর

[সম্পাদনা]

মিত্রশক্তির পুনরায় সংগঠিত হওয়া এবং মিডওয়ের যুদ্ধ (১৯৪২)

[সম্পাদনা]

পার্ল হারবারে হামলার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী জাপানে পাল্টা আঘাত হানার সুযোগ খুঁজছিল এবং টোকিওতে বোমা ফেলার একটি পরিকল্পনা করা হয়। টোকিওতে পৌঁছানোর মতো কোনো স্থল ঘাঁটি না থাকায় বিমানবাহী জাহাজ ব্যবহার করে জাপানের উপকূলের কাছ থেকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেমস এইচ ডুলিটল এবং তাঁর বি-২৫ মাঝারি বোমারু বিমানের একটি স্কোয়াড্রন ইউএসএস হর্নেট থেকে উড্ডয়ন করে এই অভিযান চালায়। কৌশলগতভাবে এই রেইড খুব একটা সফল না হলেও ১৯৪২-এর সেই অন্ধকার সময়ে এটি মার্কিনদের মনোবল দারুণভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর ফলেই জাপানি সামরিক বাহিনী তাদের আক্রমণকারীদের একমাত্র সম্ভাব্য ঘাঁটি মিডওয়ে নামক ছোট্ট দ্বীপটি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

আকাগি, কাগা, হিরিউ এবং সোরিউয়ের চারটি বড় বিমানবাহী জাহাজ নিয়ে একটি শক্তিশালী নৌ-বহর মিডওয়ে আক্রমণ করে। কিন্তু জাপানিদের গোপন সংকেত উদ্ধার করে ফেলায় মার্কিন নৌ-বাহিনী আগে থেকেই সতর্ক ছিল। তারা ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ এবং ইউএসএস ইয়র্কটাউন নামক বিমানবাহী জাহাজ ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং জাপানের চারটি জাহাজই ধ্বংস করে দেয়। এটি ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের একটি যুগান্তকারী মোড়। এর আগে পর্যন্ত জাপানিরা প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালী এবং ভারত মহাসাগরে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়াত এবং এই চারটি জাহাজ ব্যবহার করে ডারউইন, কলম্বো এবং ভারতের পূর্ব উপকূলের মিত্রশক্তির ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ চালাত। এই জাহাজগুলো এবং সেই সাথে তাদের অত্যন্ত দক্ষ নৌ-বৈমানিকদের হারানোর ফলে জাপানিরা তাদের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং এরপর থেকে তারা মূলত আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যায়।

বুনা, গনা এবং রাবাউল (১৯৪৩)

[সম্পাদনা]

আইল্যান্ড হপিং (১৯৪৩- ১৯৪৪-এর শেষ)

[সম্পাদনা]

আইল্যান্ড হপিং ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলো দখল করার একটি বিশেষ অভিযান। এর লক্ষ্য ছিল জাপানিদের অধীনে থাকা প্রতিটি দ্বীপ দখল করার চেষ্টা না করে কেবল নির্দিষ্ট কিছু দ্বীপকে জাপানে পৌঁছানোর ধাপ হিসেবে ব্যবহার করা। মিত্রবাহিনী সাধারণত দুর্বল দ্বীপগুলোতে আগে আক্রমণ করত এবং জাপানিদের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোকে অবরুদ্ধ করে রেখে সেগুলোকে অকেজো করে দিত।

পারমাণবিক বোমা (আগস্ট ১৯৪৫)

[সম্পাদনা]
প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার বিস্ফোরণ - ট্রিনিটি।

১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট এনোল গে নামক একটি একক বি-২৯ বোমারু বিমান হিরোশিমার আকাশে দেখা দেয়। শহরে বিপদের সংকেত বেজে ওঠে এবং মানুষ আশ্রয়ের জন্য ছুটতে থাকে। তবে কিছুক্ষণ পরই বিপদ কেটে গেছে বলে সংকেত দেওয়া হয়। যদিও বিমানটিকে ক্ষতিকর মনে হয়নি, কিন্তু সেটি আসলে লিটল বয় নামক একটি একক বোমা ফেলেছিল। এই বোমাটি হিরোশিমার প্রায় ১,৯০০ ফুট উঁচুতে বিস্ফোরিত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে শহরের বিশাল অংশ মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। কয়েক হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মারা যান এবং পরবর্তীতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে আরও অনেকের মৃত্যু হয়।

তবে এরপরও জাপান আত্মসমর্পণ না করায় তিন দিন পর ১৯৪৫ সালের ৯ই আগস্ট বক্সকার নামক আরেকটি বি-২৯ বিমান থেকে নাগাসাকি শহরে একটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয় যার নাম ছিল ফ্যাট ম্যান। যদিও এই বোমাটি হিরোশিমার বোমার চেয়েও শক্তিশালী ছিল, কিন্তু নাগাসাকির কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি শহরটির একটি অংশকে চরম ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছিল।

যুদ্ধের অন্যান্য পরিস্থিতির সাথে এই ঘটনাগুলো জাপানের সাথে যুদ্ধবিরতি এবং এক মাস পর তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।

দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি

[সম্পাদনা]

আমেরিকা

[সম্পাদনা]

জাপান

[সম্পাদনা]

গ্রেট ব্রিটেন

[সম্পাদনা]

জার্মানি

[সম্পাদনা]

ইতালি

[সম্পাদনা]