বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের ইতিহাস/আমেরিকার প্রাক-কলম্বিয়ান ইতিহাস

উইকিবই থেকে

মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার


মেক্সিকো ও মেসোঅ্যামেরিকার আদি সভ্যতা

[সম্পাদনা]

ওলমেক সভ্যতা

[সম্পাদনা]
ওলমেক শিল্পকর্ম।

মেক্সিকোর জলাভূমিপূর্ণ নিম্নভূমি অঞ্চলে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ওলমেক শাসন স্থায়ী ছিল। এই জলবায়ুর সাথে মানিয়ে নিতে ওলমেকরা সান লরেঞ্জো, তেনোচতিতলান, লা ভেন্তা, ত্রেস জাপোতস, চালকাতজিঙ্গো এবং লা মোজারার মতো স্থানগুলোতে স্থায়ী শহর-মন্দির চত্বর গড়ে তুলেছিল। ওলমেক সংস্কৃতির উৎপত্তি হয়েছিল সান লরেঞ্জোতে, যেখানে প্রায় ১১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ওলমেকদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। মেসোপটেমিয়া, প্রাচীন মিশর এবং অন্যান্য আদি সভ্যতার মতো ওলমেক সভ্যতার উত্থানেও উর্বর ও পলিমাটিপূর্ণ ভূমি বিশেষ সহায়তা করেছিল।

ওলমেকরা তাদের শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত ছিল, যা মূলত তাদের ধর্মকেই প্রতিফলিত করত। তারা সিরামিক পাত্র, ছোট মূর্তি এবং বিশালাকৃতির পাথুরে মাথার ভাস্কর্য তৈরি করেছিল, যার রহস্য আজও অমীমাংসিত। ওলমেক শিল্পকলায় 'জাগুয়ার' একটি গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

প্রায় ৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সান লরেঞ্জো প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং লা ভেন্তা প্রধান শহরে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনের কারণ অজানা, তবে এটি পরিবেশগত পরিবর্তন বা বহিঃশত্রুর আক্রমণের কারণে হয়ে থাকতে পারে। ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে লা ভেন্তা সভ্যতারও সমাপ্তি ঘটে।

তিওতিউয়াকান

[সম্পাদনা]

মিক্সটেক সভ্যতা

[সম্পাদনা]

জাপোটেক সভ্যতা

[সম্পাদনা]

তোলতেক সভ্যতা

[সম্পাদনা]

মায়া সভ্যতার উত্থান ও পতন

[সম্পাদনা]
মায়া শিল্পকলার একটি অংশ।

প্রাক-কলম্বীয় যুগে বিকশিত হওয়া তিনটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় সংস্কৃতির একটি ছিল মায়া সভ্যতা। এটি গুয়াতেমালার পিতেন অঞ্চলের তিকাল শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যদিও এর আগে থেকেই মায়াদের অস্তিত্ব ছিল, তবে ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে মায়া সংস্কৃতির শিখর হিসেবে ধরা হয়। ৫০০ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে মায়াদের সুবর্ণ যুগ বলা যেতে পারে, যে সময়ে তাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে জটিল ও আকর্ষণীয় অংশগুলো আবিষ্কৃত বা নির্মিত হয়েছিল। অন্যান্য আদি সভ্যতার মতো মায়া রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও নগর-রাষ্ট্র প্রথা বিদ্যমান ছিল। তবে একজন নির্দিষ্ট রাজা সবকটি ক্ষুদ্র রাজ্যের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতেন। মায়া ধর্ম এবং দৈনন্দিন জীবন একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল। তাদের জীবনে ভুট্টার গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় তারা বিশ্বাস করত যে দেবতারা তাদের ভুট্টার কান্ড ও জল দিয়ে তৈরি করেছেন। দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে তারা নাচ, উৎসর্গ এবং রক্তদানের মতো জটিল আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। তাদের ধর্মতত্ত্ব স্বর্গ, পৃথিবী (মাঝখানে) এবং পাতাল বা নরকের ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

চিচেন ইৎজা

মায়া জীবন ছিল কৃষিভিত্তিক। ভুট্টা খুব সহজে চাষ করা যেত বলে তারা প্রধান খাদ্য হিসেবে এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এছাড়া প্রচুর পরিমাণে তুলা চাষ করা হতো এবং মায়ারা তাদের সুতি বস্ত্রের জন্য পরিচিত ছিল। যেহেতু মায়াদের কোনো বড় গৃহপালিত পশু ছিল না, তাই পশুর অভাবজনিত শ্রমঘাটতি মেটাতে দাসপ্রথা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। মায়ারা যথেষ্ট উন্নত ছিল এবং তাদের সমাজে দক্ষ কারিগর ও যাজক শ্রেণি ছিল। সামাজিক কাঠামোর শীর্ষে থাকতেন রাজা ও অভিজাতরা, এরপর যথাক্রমে যাজক, বণিক শ্রেণি, কৃষক এবং সবশেষে দাসদের অবস্থান ছিল। অন্যান্য প্রাচীন সংস্কৃতির মতো কৃষক ও দাসরাই ছিল মায়া জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। তিকাল এবং চিচেন ইৎজার মতো বিশাল শহরগুলো নির্মাণে দাসদের ব্যবহার করা হতো। চিচেন ইৎজার (ইৎজা বা যাজকদের স্থান) ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যাওয়া মন্দিরটি মায়াদের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যা অনেকটা মিশরের ধাপে ধাপে নির্মিত পিরামিডের মতো। ২২শে সেপ্টেম্বর শরতকালীন বিষুব (এবং ২১শে মার্চ বসন্তকালীন বিষুব) চলাকালীন স্থাপত্যের সাথে একীভূত হওয়া মায়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য নির্ভুলতা প্রত্যক্ষ করা যায়। চিচেন ইৎজার এল কাস্তিলো পিরামিডে এই বিষুবকালীন ঘটনা চার দিন পর্যন্ত দেখা যায়। বিষুবের সময় সূর্যরশ্মি পিরামিডের ওপর এমনভাবে পড়ে যা সাতটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ গঠন করে। এটি দেখতে ৩৭ গজ লম্বা একটি বিশাল সাপের মতো মনে হয় যা পিরামিডের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে নিচে পাথরে খোদাই করা সাপের মাথার সাথে মিশে যায়। বলা হয় যে এই সাপটি পবিত্র সেনোতে নামক উৎসর্গের কূয়োর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে যা পিরামিড থেকে একদম সোজা রেখায় অবস্থিত। এছাড়া নিকটবর্তী জিবিলচালতুন নামক স্থানে ২২শে সেপ্টেম্বর ভোর ৫টায় বিষুবের সঠিক সময়ে সপ্ত পুতুল মন্দিরের দুটি জানলার ভেতর দিয়ে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করে, যা মায়াদের গাণিতিক নির্ভুলতার এক চমৎকার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে।


পাথরে খোদাই করা মায়া ক্যালেন্ডারের সংস্করণ।

মায়ারা তাদের অস্তিত্বকাল জুড়ে একটি জটিল বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক জ্ঞান গড়ে তুলেছিল। তাদের নির্ভুল জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণের ফলে তারা এমন একটি ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা তৈরি করতে পেরেছিল যা বর্তমান সময়ের ক্যালেন্ডারের মতোই নিখুঁত। গণিতে তারা ডট বা বিন্দু এবং বারের ওপর ভিত্তি করে একটি সংখ্যা পদ্ধতি তৈরি করেছিল এবং গুণ ও ভাগের প্রচলন করেছিল। তারাই ছিল নতুন বিশ্বে প্রথম যারা শূন্য (যা কেবল কিছুই না এমন নয়, বরং স্থানধারক বা প্লেসহোল্ডার হিসেবেও কাজ করে) এর ধারণা নিয়ে এসেছিল। তাদের সংখ্যা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত নির্ভুল। একটি চমৎকার বর্ণমালার মাধ্যমে তারা তাদের স্মৃতিস্তম্ভ ও মন্দিরে তথ্য সংরক্ষণ করত, যা নৃবিজ্ঞানীদের জন্য মায়া জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার এক অনন্য সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের লিখন পদ্ধতি ছিল চিত্রলিপিভিত্তিক। আধুনিক বিজ্ঞান এই বর্ণমালার অনেকটা অংশই পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রায় ৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মায়া সভ্যতার পতন শুরু হয় এবং একসময় তারা দৃশ্যমান ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। যদিও এর সঠিক কারণ জানা যায়নি, তবে রোগব্যাধি, খরা, দুর্ভিক্ষ বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে এর কারণ হিসেবে ধরা হয়। নতুন কিছু তথ্যপ্রমাণ খরা ও দুর্ভিক্ষের মধ্যে একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, তবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। কারণ যাই হোক না কেন, মায়ারা তাদের শহরগুলো ছেড়ে চলে যেতে থাকে যা পরবর্তীতে জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায় এবং আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে। মজার ব্যাপার হলো, একদল জাতিগত উত্তরসূরি এখনও ইউকাতানের জঙ্গলে বাস করে, যেখানে তারা খ্রিস্টধর্ম ও তাদের সনাতন ধর্মের মিশ্রণ পালন করে এবং তাদের পূর্বপুরুষদের ভাষাতেই কথা বলে।

পুতান মায়া

[সম্পাদনা]

মায়া সভ্যতার পতন ও অস্থিরতার পর ইউকাতানের উত্তরে চিচেন ইৎজা শহর-রাষ্ট্রটি একটি মিত্রজোট গড়ে তোলে। এই জোটটি ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল এবং পরবর্তীতে মায়াপান প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়, যার শাসনকাল ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।

আরও দক্ষিণে পুতান মায়া নামক একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী ইউকাতান উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। জিকাল্যাঙ্গো শহরটি উত্তর-ধ্রুপদী যুগের একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্পেনীয় বিজেতাদের আগমন পর্যন্ত টিকে ছিল। পুতান মায়ারা তোলতেকদের সাথে যোগাযোগের জন্য কাকাস্তলা ও জোচিকালকোতে বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছিল। তারা তোলতেক সংস্কৃতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। পুতান মায়া ছাড়াও মেসোঅ্যামেরিকা ও মেক্সিকোজুড়ে মায়া নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু ছোট রাজ্য বিদ্যমান ছিল, যার ফলে স্পেনীয়রা যখন তেনোচতিতলান জয় করে, তখন এই অঞ্চলটি তাদের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

অ্যাজটেক সভ্যতা

[সম্পাদনা]
অ্যাজটেকদের রাজধানী তেনোচতিতলানের চিত্রকর্ম।

প্রাচীন মেসোঅ্যামেরিকার সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে অ্যাজটেকরা ছিল অন্যতম স্মরণীয়। তারা মধ্য মেক্সিকোতে অবস্থিত ছিল যেখানে বর্তমানে মেক্সিকো সিটি অবস্থিত।

দক্ষিণ আমেরিকার আদি সভ্যতা ও ইনকা সভ্যতা

[সম্পাদনা]

মোচে সভ্যতা

[সম্পাদনা]

নাজকা সভ্যতা

[সম্পাদনা]

সিকান ও চিমু সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

ইনকা সভ্যতা

[সম্পাদনা]

রিও গ্র্যান্ডের উত্তরের আদিবাসী আমেরিকান সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]
কাহোকিয়ার মঙ্ক'স মাউন্ড।

উত্তর আমেরিকার আদিবাসী সংস্কৃতিগুলো মেসোঅ্যামেরিকা বা আন্দিয়ান সভ্যতার মতো অতটা উন্নত ছিল না। এমনকি বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রাক-কলম্বীয় জনপদ কাহোকিয়ার জনসংখ্যা তিওতিউয়াকান বা কুজকোর মতো শহরের জনসংখ্যার একটি সামান্য অংশ মাত্র ছিল। মেক্সিকোর উত্তরে কোনো লিখন পদ্ধতির অস্তিত্ব ছিল না এবং ইউরোপীয়দের সাথে উল্লেখযোগ্য যোগাযোগের অনেক আগেই মিসিসিপি ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতাগুলো ভেঙে পড়েছিল। তাই উত্তর আমেরিকার ইতিহাস চর্চায় প্রত্নতত্ত্বের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হয়।