বিষয়বস্তুতে চলুন

বিশ্বের ইতিহাস/আবিষ্কারের যুগ ও সাম্রাজ্যবাদ

উইকিবই থেকে

মানচিত্র | উৎস | অবদানকারীদের কর্নার


চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা নতুন দেশ আবিষ্কার ও বিজয়ের উদ্দেশ্যে একের পর এক অভিযান শুরু করেন। তাদের অনেকের অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচ্য বা ওরিয়েন্টের চমৎকার সব গল্প যেখানে সোনা-রূপা আর ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কথা বলা হতো। আবার কেউ কেউ আগ্রহী ছিলেন ইতালীয় বণিকদের ব্যবহৃত সেই রেশম পথ নিয়ে। মূলত মশলা ও রেশমের মতো মূল্যবান বিদেশি পণ্যের বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনাই ছিল তাদের অধিকাংশের মূল লক্ষ্য।

পর্তুগাল ও নৌ-অভিযানের সূচনা

[সম্পাদনা]

পর্তুগালের এই সমুদ্রযাত্রার পেছনে কোনো দেশ দখল বা সাম্রাজ্য বিস্তারের চেয়েও বড় কারণ ছিল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, নতুনকে জানার কৌতূহল ও বাণিজ্যের উন্নতি করা। আইবেরীয় উপদ্বীপের এই অঞ্চলে নৌ-চালনায় দক্ষতা আগে থেকেই অনেক বেশি ছিল। রোমানরা এই অঞ্চল দখল করার আগে থেকেই এখানকার মানুষ মাছ ধরা, লবণ উৎপাদন এবং সেই লবণ দিয়ে মাছ সংরক্ষণের মাধ্যমে সমুদ্রের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল। এছাড়া ভৌগোলিকভাবে একটি উপদ্বীপ হওয়ার কারণে পর্তুগালের অধিকাংশ ব্যবসাই চলত সমুদ্রপথে।

অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে স্পেনের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর থেকেই অঞ্চল দখল বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আভিজ রাজবংশের উত্থানের পর এটি পর্তুগালের একটি সক্রিয় নীতিতে পরিণত হয়। পর্তুগালের প্রথম জন ছিলেন স্পেনের (কাস্টিল) হাত থেকে পর্তুগালের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। রাজবংশীয় সম্পর্ক ও উত্তরাধিকারের মারপ্যাঁচে পর্তুগাল কার্যত কাস্টিলের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। স্পেনের নিয়ন্ত্রণ থেকে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাই অ্যাংলো-পর্তুগিজ জোটের পথ প্রশস্ত করে, যা আজও টিকে আছে। এরপর থেকেই পর্তুগিজ রাজপরিবারের কাছে বাণিজ্য বিস্তার ও নিরাপদ নৌপথ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই উদ্দেশ্যেই তারা ১৪১৫ সালে সেউটা শহরটি আক্রমণ ও জয় করে, যদিও লাভজনক একটি বাণিজ্যিক পথ তৈরির সেই চেষ্টাটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

পর্তুগালের রাজকুমার হেনরি দ্য নেভিগেটর আরবদের উদ্ভাবিত পাল তোলা ও জাহাজ চালনার কৌশলগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, যখন তিনি পর্তুগালকে উত্তর মরক্কো জয় করতে সাহায্য করছিলেন। পরবর্তীতে রাজকুমার হেনরি একটি নৌ-চালনা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে এই কৌশলগুলো দ্রুত পর্তুগিজ জাহাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়।

রাজকুমার হেনরির স্বপ্ন ছিল আফ্রিকার পাশ দিয়ে ভারতের একটি সমুদ্রপথ খুঁজে বের করা। এর ফলে পর্তুগিজ বণিকরা ইতালীয় দালালদের এড়িয়ে সরাসরি ব্যবসা করতে পারত, কারণ তৎকালীন প্রাচ্যের বিলাসপণ্যের বাজার ইতালীয়দের একচেটিয়া দখলে ছিল। তাঁর নির্দেশে পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা আফ্রিকার উপকূলের একটি বড় অংশ ঘুরে দেখেন এবং নাইজার ডেল্টা ও আরও দক্ষিণে অ্যাঙ্গোলায় লাভজনক বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পরই পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে দক্ষিণ ভারতের বাণিজ্যিক শহরগুলোতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

ভাস্কো দা গামার এই সাফল্যের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই পর্তুগাল কার্যত ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা এডেন, হরমুজ ও মালাক্কায় কৌশলগত বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করে। পর্তুগিজ জাহাজগুলো মিশরের নৌবাহিনীকে পরাজিত করার পর এমনকি ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যও পর্তুগিজদের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়। বিনিময়ে মুসলিম মুঘলদের প্রতি বছর একটি হজ্জযাত্রী জাহাজ পর্তুগিজদের কোনো কর না দিয়েই মক্কায় পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

স্পেনও পিছিয়ে নেই

[সম্পাদনা]

আমেরিকা মহাদেশে আসা স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের লক্ষ্যকে সংক্ষেপে "সোনা, সম্মান ও ঈশ্বর"—এই তিনটি শব্দে প্রকাশ করা যায়। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় আদিবাসীদের জয় করে প্রচুর ধন-সম্পদ গড়ে তোলা, নিজেদের দুঃসাহসিক অভিযানের মাধ্যমে নিজেদের ও রাজপরিবারের নাম উজ্জ্বল করা এবং যেসব অঞ্চলে তাঁরা অনুসন্ধান ও শোষণ চালিয়েছিলেন সেখানে খ্রিস্টধর্মের বাণী ছড়িয়ে দেওয়া।


Clipboard

কর্ম তালিকা:
স্পেনের এই অনুসন্ধান ও সাম্রাজ্য বিস্তারের পেছনের মূল কারণগুলো বুঝতে হলে তৎকালীন প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। এটি একদিকে যেমন রানীর গভীর ধর্মভক্তি দ্বারা প্রভাবিত ছিল, তেমনি অন্যদিকে অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও চাপের মুখে টিকে থাকার একটি চেষ্টাও ছিল বড় কারণ।



নতুন বিশ্ব নিয়ে স্পেনের লড়াই

[সম্পাদনা]
ক্রিস্টোফার কলম্বাস

পর্তুগাল যখন ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের দিকে মনোনিবেশ করেছিল, তখন তাদের প্রতিবেশী দেশ স্পেনও নতুন দেশ ও উপনিবেশের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। স্পেনের নতুন শাসকরা যখন তাঁদের শাসনের অধীনে গ্রানাডার দক্ষিণ রাজ্যকে যুক্ত করার আশা করছিলেন, তখনই কলম্বাস নামক এক উদ্যোগী ইতালীয় বণিক স্প্যানিশ রাজদরবারে পৌঁছান। ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ বাণিজ্যিক জাহাজে তাঁর কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছানোর জন্য একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন, যাতে পর্তুগিজদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক আধিপত্য ভেঙে দেওয়া যায়। প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে, কলম্বাসের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়নি কারণ মানুষ পৃথিবী সমতল মনে করত, বরং অধিকাংশের ধারণা ছিল যে ভারত এতটাই দূরে যে পথে খাবার ফুরিয়ে যাবে অথবা শান্ত বাতাসের অঞ্চলে জাহাজ আটকা পড়বে। যাই হোক, স্প্যানিশ বাহিনী গ্রানাডা জয় করার পর রানী ইসাবেলা বুদ্ধিমত্তার সাথে এই অভিযানে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেন।

দীর্ঘ বিলম্বের পর কলম্বাস তিনটি জাহাজ-নিনা, পিন্টা ও সান্তা মারিয়া নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেন। এই জাহাজের নাবিকদের অধিকাংশই ছিল স্পেনের কারাগার থেকে আসা কয়েদি। কলম্বাস বাহামা দ্বীপপুঞ্জের কোনো এক জায়গায় অবতরণ করেন। তিনি এই দ্বীপের শ্যামলা বর্ণের বাসিন্দাদের নাম দেন "ইন্ডিয়ান", কারণ তাঁর ধারণা ছিল তিনি ভারতে পৌঁছে গেছেন। কলম্বাস ক্যারিবীয় অঞ্চলে আরও বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছিলেন, যদিও তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত চিনে কখনও পৌঁছাতে পারেননি। পরবর্তীকালে আমেরিকা মহাদেশের নাম রাখা হয় আমেরিকো ভেসপুচির নামে, যিনি একজন ইতালীয় অভিযাত্রী ছিলেন এবং সঠিকভাবে দাবি করেছিলেন যে কলম্বাস আসলে একটি নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কার করেছেন।

পনেরো শতকের শুরুর দিকে (মূল পাঠ অনুযায়ী), স্পেন কিউবা, পুয়ের্তো রিকো ও হিস্পানিওলা সহ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের বড় বড় দ্বীপগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তবে স্থানীয় ক্যারিব ও আরাওয়াক উপজাতিদের কাছে স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেই ধন-সম্পদ ছিল না। যদিও তারা মূল ভূখণ্ডে একটি বিশাল রাজ্য ও বিপুল গুপ্তধনের কথা বলেছিল। হার্নান্দো কোর্তেস নামের একজন অভিযাত্রী, যিনি স্প্যানিশ গভর্নরের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন, এই গল্পগুলো বিশ্বাস করেন এবং সেই রাজ্যের খোঁজে একটি ছোটখাটো অভিযান পরিচালনা করেন। কোর্তেস মেক্সিকোতে অবতরণ করেন এবং দ্রুত স্থানীয় উপজাতিদের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলেন, যারা তাঁকে মূল ভূখণ্ডের ভেতরে অ্যাজটেক রাজধানী তেনোচতিৎলানের পথ দেখিয়ে দেয়।

অ্যাজটেক সম্রাট মন্টেজুমা কোর্তেসের আগমনের সংবাদ পান, কিন্তু তিনি আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল কোর্তেস হয়তো অ্যাজটেক দেবতা কোয়েতজালকোয়াতল, যাঁকে অনেক বছর আগে যুদ্ধদেবতা হুইৎজিলোপোচৎলি তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মন্টেজুমার এই দ্বিধাই কোর্তেসকে অ্যাজটেক রাজধানীতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয় এবং তিনি অ্যাজটেকদের বিরোধী উপজাতিদের সমর্থন লাভ করেন। যখন অ্যাজটেকরা বুঝতে পারল যে কোর্তেস আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ততক্ষণে মন্টেজুমাকে জিম্মি করা হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময় মন্টেজুমা ও অভিযানের অনেক স্প্যানিশ সদস্য নিহত হন। কোর্তেস যখন তেনোচতিৎলান শহরটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেন, তখনই এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

কোর্তেসের সাফল্য ও ধন-সম্পদের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও অনেকেই তাঁর এই সাফল্য অনুকরণ করার জন্য অভিযানে নামেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সফলদের তালিকায় ছিলেন জন ক্যাবট, জিওভান্নি দা ভেরাজানো, ফ্রান্সিস ড্রেক, ফ্রান্সিসকো ভাসকেজ দে করোনাডো, ফ্রান্সিসকো পিজারো ও ডেভিড ওয়াং।

টর্ডেসিলাস চুক্তি

[সম্পাদনা]

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ স্পেন ও পর্তুগাল এশিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের বাণিজ্য ও ভূখণ্ডে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। পর্তুগালের নিয়ন্ত্রণে ছিল ভারত মহাসাগরের অধিকাংশ বাণিজ্য এবং ইন্দোনেশিয়ার মশলা বাগানগুলো। অন্যদিকে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল অংশ ছিল স্পেনের দখলে। এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কায় পোপ টর্ডেসিলাস চুক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করেন। এই চুক্তি কার্যত বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়, যেখানে দুই দেশই নিজ নিজ গোলার্ধে একচেটিয়া অধিকার লাভ করে।

অন্যান্য ইউরোপীয় অভিযান

[সম্পাদনা]

ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস টর্ডেসিলাস চুক্তি মানতে অস্বীকার করে এবং তারাও আমেরিকা মহাদেশে অনুসন্ধান ও উপনিবেশ স্থাপনের কাজ শুরু করে।

ইংরেজ উপনিবেশ

[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Expand

ফরাসি উপনিবেশ

[সম্পাদনা]

নতুন ফ্রান্স

[সম্পাদনা]
উত্তর আমেরিকায় নতুন ফ্রান্সের দাবিকৃত ভূখণ্ডের মানচিত্র। বিশাল এলাকা দাবি করলেও, প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ছিল অনেক ছোট।

উত্তর আমেরিকার পূর্বদিকের বিশাল অংশ, ক্যারিবীয় অঞ্চলের বেশ কিছু দ্বীপ, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ফ্রান্স তাদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। মূলত মাছ, চিনি ও পশমের মতো পণ্য রপ্তানি করার জন্যই এসব উপনিবেশ গড়ে তোলা হয়েছিল।

ফরাসিরা প্রথমে নতুন বিশ্বে এসেছিল অভিযাত্রী হিসেবে; তাদের লক্ষ্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়ার পথ এবং প্রচুর ধন-সম্পদ খুঁজে বের করা। রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের আমলে উত্তর আমেরিকায় বড় ধরনের ফরাসি অভিযান শুরু হয়। ১৫২৪ সালে তিনি ইতালীয় বংশোদ্ভূত জিওভান্নি দা ভেরাজানোকে প্রশান্ত মহাসাগরে যাওয়ার পথ খুঁজতে ফ্লোরিডা ও নিউফাউন্ডল্যান্ডের মধ্যবর্তী অঞ্চলে পাঠান। যদিও তিনি এমন কোনো পথ খুঁজে পাননি, তবে ভেরাজানোই প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আটলান্টিক উপকূলের অনেকটা অংশ ঘুরে দেখেন। পরে ১৫৩৪ সালে, রাজা প্রথম ফ্রান্সিস জ্যাক কার্টিয়ারকে নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূল এবং সেন্ট লরেন্স নদী অনুসন্ধানের জন্য প্রথম তিনটি অভিযানের একটিতে পাঠান।

১৫৪১ সালে কার্টিয়ার আরেকটি অভিযানে বের হন এবং বর্তমান কুইবেকের ক্যাপ-রুজে চার্লসবুর্গ-রয়্যাল নামে একটি উপনিবেশ স্থাপন করেন। কার্টিয়ার ওই অঞ্চলে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকেন। পরে তিনি চার্লসবুর্গ-রয়্যালে ফিরে এসে দেখেন যে উপনিবেশটি টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। একটি কঠিন শীত কাটানোর পর ১৫৪২ সালের জুন মাসে তিনি ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরের বছরই চার্লসবুর্গ-রয়্যাল পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের দ্বিতীয় ফরাসি প্রচেষ্টা আসে ১৫৬২ সালে, যখন রাজা নবম চার্লস জঁ রিবো এবং একদল হুগুনট বসতি স্থাপনকারীকে সেখানে পাঠান। তাঁরা বর্তমান ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলে সেন্ট জন্স নদী এলাকাটি ঘুরে দেখেন এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্যারিস দ্বীপে একটি উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। অবশেষে তাঁরা সেন্ট জন্স নদীতে ফিরে আসেন, যেখানে রিবোর সহকারী রনে গুলাইন দ্য লডোনিয়ের ১৫৬৪ সালের ২২ জুন ফোর্ট ক্যারোলিন স্থাপন করেন। ১৫৬৫ সালে স্প্যানিশরা এই দুর্গ আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়।

১৬০৩ সালে স্যামুয়েল দ্য শ্যাম্পলেইন পশম বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে প্রথমবার উত্তর আমেরিকা সফর করেন। নতুন ফ্রান্স গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শ্যাম্পলেইনের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৬০৮ সালে তিনি একটি পশম বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে কুইবেক শহরে পরিণত হয়। ফরাসিদের সাথে ইরোকুয়েস কনফেডারেসির বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। যদিও ফরাসিরা কানাডা এবং গ্রেট লেক অঞ্চলের বিশাল এলাকা নিজেদের বলে দাবি করত, তবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে মানুষের বসতি ছিল বেশ সীমিত।

১৬৭৩ সালের পর গ্রেট লেকের দক্ষিণ ও পশ্চিমে 'নতুন ফ্রান্স' আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। ফাদার জ্যাক মার্কেট এবং লুই জোলিয়েট বর্তমান উইসকনসিনের ফক্স-উইসকনসিন নৌপথ হয়ে ক্যানো চালিয়ে মিসিসিপি নদী আবিষ্কার করেন। সেখান থেকে তাঁরা নদী ধরে দক্ষিণে আরকানসাস নদীর মোহনা পর্যন্ত যান। স্প্যানিশদের প্রভাবে থাকা এলাকার খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ার ভয়ে অভিযাত্রীরা আরকানসাস থেকে আবার উত্তরের দিকে ফিরে আসেন। এবার তাঁরা বর্তমান শিকাগো হয়ে ইলিনয় ও শিকাগো নদীর মাধ্যমে গ্রেট লেক অঞ্চলে পৌঁছান।

মার্কেট ও জোলিয়েটের সেই সফরের পথ ধরে রনে-রবার্ট ক্যাভেলিয়ার (সিয়ার দ্য লা সাল) মিসিসিপি নদী দিয়ে এর মোহনা পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। ১৬৮২ সালে তিনি এই নদীর পুরো অববাহিকাকে ফ্রান্সের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করেন এবং রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সম্মানে এই অঞ্চলের নাম দেন লুইজিয়ানা। এর ফলে গ্রেট লেক ও কানাডার পাশাপাশি মিসিসিপি উপত্যকা এবং গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলেও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬৯৯ সালে প্রথম স্থায়ী বসতি এবং ১৭১৮ সালে নিউ অরলিন্স শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফরাসি ও ভারতীয় যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয়ের পর ১৭৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের ফরাসি ভূখণ্ডগুলো ব্রিটিশ ও স্প্যানিশদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল কানাডীয় উপকূলের কাছে সেন্ট পিয়েরে এবং মিকেলন দ্বীপপুঞ্জ, যা মাছ ধরার ঘাঁটি হিসেবে ফরাসিদের কাছেই থেকে যায়। সেন্ট পিয়েরে ও মিকেলন দ্বীপপুঞ্জই ছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের উত্তরে ফ্রান্সের শেষ সম্বল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জ

[সম্পাদনা]

১৫৩৮ সালে ফরাসিদের উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা শুরু হয়, যখন একদল ফরাসি জেসুইট শরণার্থী সেন্ট কিটসে ডিয়েপ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এক বছরের মধ্যেই স্প্যানিশরা এই উপনিবেশের খোঁজ পায় এবং সেটি ধ্বংস করে দেয়। ষোড়শ শতাব্দীতে ফ্রান্স ক্যারিবীয় অঞ্চলে আর কোনো উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেনি, তবে পরবর্তী শতাব্দীতে তারা বেশ কয়েকটি উপনিবেশ গড়ে তোলে।

ফরাসিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশটি ছিল হিস্পানিওলা দ্বীপে, যা বর্তমানে হাইতি নামে পরিচিত।

দক্ষিণ আমেরিকা

[সম্পাদনা]

১৫৫৫ থেকে ১৫৬৭ সাল পর্যন্ত ভাইস-অ্যাডমিরাল নিকোলাস ডুরান্ড দ্য ভিলেগেননের নেতৃত্বে ফরাসি হুগুনটরা বর্তমান ব্রাজিলে ফ্রান্স অ্যান্টার্কটিক নামে একটি উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়। ১৬১২ থেকে ১৬১৫ সালের মধ্যে বর্তমান ব্রাজিলের সাঁউ লুইসে দ্বিতীয়বার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালানো হয়।

১৬০৪ সালে ফরাসিরা প্রথম ফ্রেঞ্চ গায়ানাতে বসতি স্থাপন করে, যদিও আদিবাসী আমেরিকানদের শত্রুতা এবং ক্রান্তীয় রোগের প্রকোপে শুরুর দিকের বসতিগুলো পরিত্যক্ত হয়ে যায়। ১৬৪৩ সালে কায়েন বসতিটি স্থাপিত হলেও পরে তা পরিত্যক্ত হয়। ১৬৬০-এর দশকে এটি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংরেজ ও ওলন্দাজদের সংক্ষিপ্ত দখলদারিত্ব ছাড়া গায়ানা সেই থেকে আজ পর্যন্ত ফরাসি শাসনের অধীনেই রয়েছে।

ওলন্দাজ উপনিবেশ

[সম্পাদনা]

উত্তর আমেরিকা

[সম্পাদনা]

১৬০২ সালে সেভেন সংযুক্ত নেদারল্যান্ডস প্রজাতন্ত্রের সরকার ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ভিওসি) গঠন করে। কোম্পানিটির লক্ষ্য ছিল পূর্ব দেশগুলোতে (ইন্ডিজ) যাওয়ার পথ খুঁজে বের করা এবং নতুন কোনো এলাকা আবিষ্কৃত হলে তা নিজেদের দখলে নেওয়া।

কোম্পানির অভিযাত্রীরা খুব দ্রুতই বেশ কিছু বড় অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। ১৬০৯ সালে ব্রিটিশ অভিযাত্রী হেনরি হাডসন ভিওসি-র হয়ে ইন্ডিজে যাওয়ার এক উত্তর-পশ্চিম পথ খোঁজার চেষ্টা করেন। যদিও তিনি সেই পথ খুঁজে পাননি, তবে তার বদলে তিনি বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কিছু অংশ আবিষ্কার করেন এবং সেগুলো ভিওসি-র এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন। তার নামেই হাডসন নদী এবং হাডসন উপসাগরের নামকরণ করা হয়েছে। ১৬১৪ সালে আদ্রিয়ান ব্লক টাইগার নামের জাহাজে করে হাডসন নদীর নিচের দিকে একটি অভিযান চালান। এরপর তিনি অনরাস্ট জাহাজে করে ইস্ট রিভার এলাকাটি ঘুরে দেখেন। তিনিই প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে হেলগেট পাড়ি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

শুরুর দিকে কিছু বাণিজ্যিক অভিযানের পর ১৬১৫ সালে আমেরিকায় ওলন্দাজদের প্রথম স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। বর্তমান আলবেনির কাছে হাডসন নদীর ক্যাসেল আইল্যান্ডে তারা নাসাউ দূর্গ তৈরি করে। এটি মূলত স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে পশুর পশম ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে এর বদলে বর্তমান আলবেনি এলাকাতেই অরেঞ্জ দূর্গ তৈরি করা হয়। ওলন্দাজ রাজপরিবার হাউস অফ অরেঞ্জ-নাসাউয়ের সম্মানে এই দুটি দুর্গের নাম রাখা হয়েছিল।

১৬২১ সালে ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ডব্লিউআইসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৬২৬ সালে ডব্লিউআইসির ডিরেক্টর-জেনারেল পিটার মিনুইট স্থানীয় আদিবাসীদের কাছ থেকে ম্যানহাটন দ্বীপটি কিনে নেন এবং সেখানে নিউ আমস্টারডাম দুর্গ তৈরির কাজ শুরু করেন। এভাবেই নিউ নেদারল্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়। একই বছরে নিউ জার্সি এলাকায় আরও একটি ফোর্ট নাসাউ তৈরি করা হয় (এটি আলবেনির কাছের দুর্গটি ছিল না)। এই এলাকায় আরও বেশ কিছু বসতি গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৬৪৭ সালে পিটার স্টুইভেসেন্ট নিউ নেদারল্যান্ডের ডিরেক্টর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৬৫৫ সালে ওলন্দাজরা নিউ সুইডেন দখল করে নেয় এবং ইংল্যান্ডের সাথে তাদের সীমানা নিয়ে যে দীর্ঘদিনের বিবাদ ছিল তার মীমাংসা হয়।

১৬৬৪ সালে ডিউক অফ ইয়র্ক অ্যান্ড আলবেনির নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা নিউ নেদারল্যান্ড উপনিবেশ আক্রমণ করে। ব্রিটিশদের তুলনায় ওলন্দাজদের সৈন্য সংখ্যা অনেক কম ছিল, এমনকি তাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদও ছিল না। ফলে ডিরেক্টর-জেনারেল পিটার স্টুইভেসেন্ট নিউ আমস্টারডাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং এর অল্প সময় পর ফোর্ট অরেঞ্জও ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। দখল করার পর ব্রিটিশরা নিউ আমস্টারডামের নাম বদলে রাখে নিউ ইয়র্ক আর অরেঞ্জ দূর্গের নাম রাখা হয় আলবেনি দূর্গ। নিউ নেদারল্যান্ড হাতছাড়া হওয়ার জের ধরেই ১৬৬৫ থেকে ১৬৬৭ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় ইঙ্গ-ওলন্দাজ যুদ্ধ চলে।

১৬৭৩ থেকে ১৬৭৪ সালে তৃতীয় ইঙ্গ-ওলন্দাজ যুদ্ধের সময় ওলন্দাজরা আবারও এই এলাকাগুলো সাময়িকভাবে দখল করতে পেরেছিল। তবে পরে ওয়েস্টমিনিস্টার চুক্তির মাধ্যমে এগুলো ইংল্যান্ডকে ফেরত দেওয়া হয়। ১৬৭৪ সালে ওলন্দাজ নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন জুরিয়ান অ্যারনাউটজ ফরাসি উপনিবেশ একাডিয়ার দুটি দুর্গও দখল করেন এবং এই এলাকাটিকে ওলন্দাজদের অংশ হিসেবে নিউ হল্যান্ড নাম দেন। কিন্তু অ্যারনাউটজ নতুন বসতি স্থাপনকারীদের খোঁজে কুরাকাও চলে যাওয়ার পরই তার নিযুক্ত প্রশাসক জন রোডস ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত একাডিয়ার নিয়ন্ত্রণ আবারও ফরাসিদের হাতেই ফিরে যায়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ

[সম্পাদনা]

১৬২৫ সালে ব্রিটিশদের ঠিক একই বছর ওলন্দাজরাও সেন্ট ক্রিক্স দ্বীপে একটি ঘাঁটি তৈরি করে। ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্টরা ওলন্দাজদের সাথে যোগ দিলেও ব্রিটিশ উপনিবেশের সাথে বিরোধের জেরে ১৬৫০ সালের আগেই তারা এই এলাকাটি ছেড়ে চলে যায়। ১৬৪৮ সালে ওলন্দাজরা টরটোলাতে একটি বসতি গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে আনেগাডা ও ভার্জিন গর্ডাতেও নিজেদের বিস্তার ঘটায়। তবে ১৬৭২ সালে ব্রিটিশরা টরটোলা এবং ১৬৮০ সালে আনেগাডা ও ভার্জিন গর্ডা দখল করে নেয়।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ওলন্দাজদের উপনিবেশ গড়ার কাজ শুরু হয় ১৬২০ সালে। যদিও ১৬৪৮ সালের আগ পর্যন্ত এই দ্বীপটির মালিকানা বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত এটি ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে স্থায়ীভাবে ভাগ হয়ে যায়। ১৮১৬ সালে চূড়ান্তভাবে সীমানা নির্ধারিত হওয়ার আগে পর্যন্ত এই দ্বীপের দুই অংশের সীমান্ত বারবার পরিবর্তন করা হয়েছিল।

স্পেনের হাত থেকে ওলন্দাজদের স্বাধীনতার লড়াই চলাকালীন স্পেনীয় আক্রমণ ঠেকাতে এবং কাঠ ও লবণের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য আরও কিছু দ্বীপ দখল করে সেখানে দুর্গ নির্মাণ করা হয়। এই দ্বীপগুলোর মধ্যে ছিল: কুরাসাও, সাবা, সিন্ট ইউস্টাটিয়াস, আরুবা এবং বোনেয়ার।

সপ্তদশ শতাব্দীতে ওলন্দাজরা টোবাগো দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপনের জন্য বারবার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের সেই বসতিগুলো ধ্বংস করে দেয়। এখানে ওলন্দাজদের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসন ছিল ১৬২৮ থেকে ১৬৩৭ সাল পর্যন্ত, যেটির সমাপ্তি ঘটে স্পেনীয়দের ধ্বংসলীলার মাধ্যমে।

দক্ষিণ আমেরিকা

[সম্পাদনা]

১৬৫০-এর দশকে বার্বাডোসের গভর্নর লর্ড উইলোবি সুরিনামে প্রথম ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন করেন। দ্বিতীয় ইঙ্গ-ওলন্দাজ যুদ্ধের সময় ওলন্দাজ সেনাপতি আব্রাহাম ক্রিজনসেন এই উপনিবেশটি দখল করে নেন। ১৬৬৭ সালের ৩১শে জুলাই ব্রেডা চুক্তির মাধ্যমে ওলন্দাজদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যদি সুরিনামের উপকূলের চিনির কারখানাগুলো ব্রিটিশদের দিয়ে দেয়, তবে বিনিময়ে তারা নিউ নেদারল্যান্ড (বর্তমান নিউ ইয়র্ক) ফেরত পাবে। কিন্তু ওলন্দাজরা এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ১৬৮৩ সালে সুরিনামকে ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং এলাকাটি ওলন্দাজ গায়ানা নামে পরিচিতি পায়। এই উপনিবেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি মূলত আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

১৬১৬ সালে ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গায়ানার এসেকুইবো নদীর তীরে একটি দুর্গ নির্মাণ করে। সুরিনামের মতো এখানেও ওলন্দাজরা স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে ব্যবসা করত এবং আফ্রিকান দাসদের খাটিয়ে চিনির বাগান তৈরি করেছিল। উপকূলীয় এলাকা ওলন্দাজদের অধীনে থাকলেও ব্রিটিশরা সুরিনাম নদীর পশ্চিম দিকে তাদের নিজস্ব বাগান গড়ে তোলে। দুই দেশের এই রেষারেষির কারণে এই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ বারবার হাতবদল হয়েছে। তবে ১৭৯৬ সালের মধ্যে ব্রিটেন পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অবশেষে ১৮১৪ সালে নেদারল্যান্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে এসেকুইবো, ডেমেরারা এবং বারবিস উপনিবেশগুলো ব্রিটেনের হাতে তুলে দেয়।

১৬৩০ সাল থেকে ওলন্দাজ প্রজাতন্ত্র ব্রাজিলের একটি ছোট অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, যার রাজধানী ছিল রেসিফে। ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে তাদের সদর দপ্তর স্থাপন করেছিল। তৎকালীন গভর্নর জোহান মরিস এই উপনিবেশের প্রচার এবং অভিবাসন বাড়ানোর জন্য অনেক শিল্পী ও বিজ্ঞানীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে ১৬৪৯ সালে গুয়ারারাপেসের দ্বিতীয় যুদ্ধে পর্তুগিজরা বড় ধরনের জয় লাভ করে। ১৬৫৪ সালের মধ্যে ওলন্দাজ প্রজাতন্ত্র আত্মসমর্পণ করে এবং ব্রাজিলের সমস্ত জমি পর্তুগিজদের হাতে ফিরিয়ে দেয়। ১৬৫৪ সালের মে মাসে প্রথম ইঙ্গ-ওলন্দাজ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওলন্দাজরা তাদের নিউ হল্যান্ড (ওলন্দাজ ব্রাজিল) ফেরত চায়। এমনকি লিসবন দখল এবং উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল পুনর্দখলের হুমকি দিলে পর্তুগিজরা তাদের দাবি মেনে নিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ওলন্দাজ নেতা জোহান ডি উইট এতে সম্মত হননি। ফলে ১৬৬১ সালের ৬ই আগস্ট হেগ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ হল্যান্ড পর্তুগালকে দিয়ে দেওয়া হয়।

১৬০০ সালে সেবাস্টিয়ান ডি কর্ডেস নামের এক ওলন্দাজ জলদস্যু চিলির ভালদিভিয়া শহরটি দখল করেন। যদিও কয়েক মাস পরেই তিনি শহরটি ছেড়ে চলে যান। এরপর ১৬৪২ সালে ওলন্দাজ কোম্পানিগুলো স্পেনীয়দের হাত থেকে ভালদিভিয়া শহর এবং সোনার খনিগুলো দখলের জন্য একটি নৌবহর পাঠায়। ওলন্দাজ জেনারেল হেন্ডরিক ব্রাউয়ার এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন। ১৬৪৩ সালে ব্রাউয়ার চিলোয়ে দ্বীপ এবং ভালদিভিয়া শহর জয় করেন। তবে পরবর্তীকালে নাবিকদের বিদ্রোহের কারণে তারা আবারও ব্রাজিলে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এশিয়া

[সম্পাদনা]

১৬০২ সাল থেকে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (ভিওসি) পূর্ব দেশগুলোতে (ইন্ডিজ) থাকা পর্তুগিজ এলাকাগুলো দখল করতে শুরু করে। পর্তুগিজদের ঘাঁটিগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন, তাই সেগুলোতে আক্রমণ হলে অন্য জায়গা থেকে সাহায্য আসা কঠিন ছিল। ১৬০৫ সালে ওলন্দাজরা পর্তুগিজদের কাছ থেকে আম্বোয়না দখল করে। তবে পরের বছর মালাক্কা দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ওলন্দাজরা তাদের বাণিজ্যের জন্য একটি আদর্শ কেন্দ্র খুঁজছিল, যা তারা ১৬১৯ সালে জাকার্তায় খুঁজে পায়। জান কোয়েন জাকার্তা জয় করেন এবং এর নাম বদলে রাখেন বাটাভিয়া। এটিই পরে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজের রাজধানীতে পরিণত হয়। এর পাশাপাশি ওলন্দাজরা এশিয়ার অন্যান্য পর্তুগিজ ঘাঁটিগুলো থেকেও তাদের বিতাড়িত করতে থাকে। অবশেষে ১৬৪১ সালে মালাক্কার পতন ঘটে এবং এর ফলে পূর্ব দেশগুলোতে মসলা ও রেশম বাণিজ্যের ওপর ওলন্দাজদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারত ও সিলনেও ওলন্দাজরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তারা ১৬৫৬ সালে কলম্বো, ১৬৫৮ সালে সিলন, ১৬৬২ সালে নাগাপট্টিনাম এবং একই বছর ক্রাঙ্গানুর ও কোচিন দখল করে নেয়। পর্তুগিজদের প্রাচ্যের রাজধানী গোয়াতে ১৬০৩ এবং ১৬১০ সালে ওলন্দাজরা দুবার আক্রমণ করলেও সফল হতে পারেনি। ম্যাকাও শহরটি দখলের জন্য তারা চারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, যেখান থেকে পর্তুগিজরা চীন ও জাপানের সাথে লাভজনক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। তবে ক্যাথলিক পর্তুগিজদের উদ্দেশ্য নিয়ে জাপানি শোগুনদের মনে সন্দেহ তৈরি হলে ১৬৩৯ সালে তাদের জাপান থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর জাপানের সাকোকু নীতির অধীনে প্রায় দুশো বছর ধরে ওলন্দাজরাই ছিল একমাত্র ইউরোপীয় শক্তি যারা জাপানে ব্যবসা করার অনুমতি পেয়েছিল। তবে তাদের কর্মকাণ্ড প্রথমে হিরাদো এবং পরে ১৬৪১ সাল থেকে দেশিমা দ্বীপে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।

আফ্রিকা

[সম্পাদনা]

১৬৫২ সালে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উত্তমাশা অন্তরীপে প্রথম ওলন্দাজ বসতি স্থাপন করে। এটি মূলত নেদারল্যান্ডস এবং এশিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর জন্য একটি রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে এই কেন্দ্রটি একটি স্থায়ী বসতিতে রূপ নেয়। এই বসতি স্থাপনকারীরাই দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠী 'আফ্রিকানার'দের পূর্বপুরুষ।

কোম্পানি স্টেশনের চারপাশে যখন প্রথম বসতিগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন ট্রেকবোর নামে পরিচিত যাযাবর শ্বেতাঙ্গ খামারিরা আরও ভেতরের দিকে চলে যেতে থাকে। তারা উপকূলের উর্বর কিন্তু সীমিত জমি ছেড়ে ভেতরের শুষ্ক মালভূমি অঞ্চলে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে। সেখানে চারণভূমির দখল নিয়ে স্থানীয় খোইখোই গবাদি পশু পালনকারীদের সাথে তাদের বিরোধ বাধে। ১৭০০ সালের মধ্যে খোইখোইদের ঐতিহ্যবাহী পশুপালন ভিত্তিক জীবনধারা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।

পরবর্তী কয়েক দশকে এই উপনিবেশ আরও বড় হতে থাকে এবং ওলন্দাজরা স্থানীয় আফ্রিকান আদিবাসীদের এলাকাগুলো দখল করে নেয়। ১৭৯৫ সালে ফ্রান্স নেদারল্যান্ডস দখল করলে ব্রিটিশরা এই উপনিবেশটি ফরাসিদের হাতে চলে যাওয়ার ভয়ে এটি দখল করে নেয়। ১৮০৩ সালে উপনিবেশটি ফরাসি সমর্থিত বাটাভিয়ান প্রজাতন্ত্রকে ফেরত দেওয়া হয়। তবে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে ১৮০৬ সালে ব্রিটেন এটি আবারও দখল করে নেয়। এরপর এই এলাকাটি আর কখনোই ওলন্দাজদের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসেনি।

১৫৯৮ সাল থেকে ওলন্দাজরা আফ্রিকার গোল্ড কোস্টে তাদের দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। পরবর্তী ২৭০ বছর ধরে ওলন্দাজরা এই উপনিবেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ, সুইডিশ এবং পর্তুগিজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যায়। তারা পর্তুগিজ এবং সুইডিশদের এই এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। তবে ১৮৭২ সালে ওলন্দাজ ও ব্রিটিশ সরকার একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যার মাধ্যমে ব্রিটিশরা গোল্ড কোস্টে থাকা ওলন্দাজ বসতিগুলো কিনে নেয়।

আমেরিকা মহাদেশের ভূখণ্ড এবং সোনার খনিসমূহ

[সম্পাদনা]