বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশে রচিত বাঙালির সাহিত্য

উইকিবই থেকে

প্রাচীন আর্যসাহিত্য থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও সেখানকার অধিবাসীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পার হয়ে সিন্ধু-সরস্বতী নদী উপত্যকায় প্রথম জনবসতি স্থাপন করেছিল আর্যরা। ক্রমশ তাদের প্রসার ঘটে মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে এবং সবশেষে প্রত্যন্ত পূর্ব ভারতে। এই কারণে পূর্ব ভারত সুদীর্ঘকাল আর্যদের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। প্রাচীন বাংলা এই পূর্ব ভারতেরই অংশ ছিল। আর্য-আগমনের আগেও এখানে জনবসতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এদের অধিকাংশই ছিল অস্ট্রিক জাতির মানুষ, যারা প্রাগার্য বা অনার্য নামেও অভিহিত হত। স্থান হিসেবে বঙ্গের উল্লেখ অবশ্য ঋগ্বেদে নেই। শব্দটি প্রথম পাওয়া যায় ঐতরেয় আরণ্যকে: “যা বৈ তা ইমাঃ প্রজাস্তিস্রো অত্যায়মানয়ংস্তানীমানি বয়াংসি বঙ্গা বগধশ্চের পাদাঃ”। বোঝা যায়, আর্য-বসতির বহিরাঞ্চল ও সেখানকার অধিবাসীদের ‘বয়াংসি’ অর্থাৎ পাখি বলে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। এইসব অঞ্চলে আর্যদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের পূর্বাবধি এইরকম উন্নাসিকতা দেখা যায়। মৌর্যযুগে যখন পূর্ব ভারত আর্যাবর্তের সম্রাটদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আসে, তখনই সম্ভবত এই অঞ্চলে ব্রাহ্মণদের প্রবেশ ঘটে এবং সেই সুবাদে বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্ম ও সংস্কৃতি স্থানীয় প্রাগার্য জাতিগোষ্ঠীর উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। সংস্কৃত রামায়ণ ও মহাভারতের সূত্র থেকে অনুমিত হয়, মহাকাব্যের যুগে পূর্ব ভারতে আর্যপ্রভাব ও ব্রাহ্মণ্য-সংস্কার ক্রমে প্রাধান্য অর্জন করতে শুরু করেছিল। তাই এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সম্পর্কে আর্যদের মনোভাবেও অনেকটা পরিবর্তন এসেছিল। বাংলার আর্যীকরণ সম্ভবত পূর্ণ রূপ লাভ করে গুপ্তযুগে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী গুপ্তসম্রাটগণ এক শক্তিশালী, সুগঠিত ও সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। প্রাচীন বাংলাও তাঁদের অধিকারভুক্ত হয়েছিল। গুপ্তযুগেই ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম ও জীবনযাত্রার সঙ্গে বাংলা অধিবাসীদের সম্যক পরিচয় ঘটে এবং কালক্রমে চর্চার মাধ্যমে তাঁরা বৃহত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির বিপুল উত্তরাধিকার বহনে সমর্থ হয়ে ওঠেন। এরই ফলশ্রুতি বাঙালির সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় সাহিত্যচর্চা।

সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষা

[সম্পাদনা]

ভারতের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ অব্দের মধ্যে এই গ্রন্থ রচিত হয়। এই গ্রন্থের ভাষা বৈদিক বা ছান্দস—যে ভাষাটি উৎসারিত হয়েছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা-পরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখা থেকে। বৈদিক ভাষার লিখিত রূপের পাশাপাশি একটি কথ্য রূপও প্রচলিত ছিল। আর্যাবর্তের নানা স্থানে আঞ্চলিক বিকৃতি সহ কথিত হত সেই ভাষা। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ বৈয়াকরণ পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে প্রায় ৪০০০ সূত্র নির্ধারণ করে এই ভাষার সংস্কার ঘটান। ব্যাকরণ-নিয়ন্ত্রিত এই ভাষা পরিচিত হয় সংস্কৃত ভাষা নামে। তবে সংস্কৃত ভাষা খুব অল্প ক্ষেত্রেই কথিত হত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ছিল কাব্য, নাটক, আখ্যায়িকা ইত্যাদি রসসাহিত্য এবং পুরাণ, ব্যাকরণ, স্মৃতিশাস্ত্র, বিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র, জ্যোতিষ, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি ধর্ম ও জ্ঞানবিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থ রচনার কাজে। সংস্কৃত একটি প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা হলেও গ্রন্থরচনায় এর ব্যবহার বহু পরবর্তী কাল পর্যন্ত হয়ে এসেছে। কালক্রমে সংস্কৃত ভাষার মধ্যে যে শৈথিল্য এবং সেই সূত্রে যে উচ্চারণ-বিকৃতি দেখা দিয়েছিল সেই বিকৃতি ছড়িয়ে পড়েছিল নানা অঞ্চলে। ‘প্রকৃতি’ অর্থাৎ সাধারণ প্রজাপুঞ্জের মুখের ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে এই ভাষার নাম হল ‘প্রাকৃত’। সম্রাট অশোকের বহু লিপি প্রাকৃতে রচিত। আরও পরবর্তীকালে প্রাকৃত ভাষায় সাহিত্যরচনা শুরু হল। তখন এই ভাষা পরিচিত হল ‘সাহিত্যিক প্রাকৃত’ নামে। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত শৌরসেনী, মহারাষ্ট্রী, পৈশাচী, মাগধী ও অর্ধমাগধী প্রাকৃতে অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। কালের নিয়মে প্রাকৃতেও দেখা দিল বিকৃতি। মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যে নতুন ভাষার জন্ম হল তার নাম অপভ্রংশ। খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতক পর্যন্ত এই ভাষাতেও রচিত হল সাহিত্য। অবশেষে অপভ্রংশ রূপান্তরিত হয়ে জন্ম নিল হিন্দি, মরাঠি, গুজরাতি, বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া প্রভৃতি নব্য ভারতীয় আর্যভাষা। বাংলা ভাষার অব্যবহিত উৎসব পূর্বী মাগধী অপভ্রংশ।

বাঙালি ও সংস্কৃত সাহিত্য

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষার উদ্ভবের পূর্বে বাঙালি প্রধানত সংস্কৃত ভাষাতেই রসসাহিত্যের চর্চা করেছিল। গুপ্তযুগ থেকে শুরু করে তুর্কি আক্রমণের পূর্বাবধি এই ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়। এমনকি মুসলমান শাসনকালেও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বাংলার তুলনায় সংস্কৃতে অধিক সংখ্যায় গ্রন্থরচনা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ভাষায় কাব্যরচনার ফলে ‘গৌড়ী রীতি’ নামে পরিচিত একটি বিশিষ্ট আঞ্চলিক রীতিও সর্বভারতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন বাংলা গৌড় নামে পরিচিত ছিল, এই রীতি তারই নামাঙ্কিত। সপ্তম শতকের আলংকারিক ভামহের কাব্যালঙ্কার গ্রন্থে গৌড়ী রীতির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বামন তাঁর কাব্যালঙ্কার সূত্রবৃত্তি গ্রন্থে বৈদর্ভী ও পাঞ্চালী রীতির সঙ্গে ‘গৌড়ীয়া’ রীতিকে যেভাবে উল্লেখ করেছেন, তাতে নিন্দনীয় কিছু নেই। কিন্তু অষ্টম শতকের আলংকারিক দণ্ডী কাব্যাদর্শ গ্রন্থে যেভাবে বৈদর্ভী রীতির বিপরীতে একে স্থাপন করেছেন, তাতে গৌড়ী রীতির অনুপ্রাসবাহুল্য ও সমতাগুণের অভাব ‘দোষ’ বলেই প্রতিভাত হয়। রাজা হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট সম্ভবত ‘অক্ষরডম্বর’ অর্থাৎ শব্দাড়ম্বরের জন্য গৌড়ী রীতির প্রতি বিরূপ ছিলেন। তাছাড়া গৌড়ী রীতির রচনা অপরিচিত শব্দে পরিপূর্ণ। চতুর্দশ শতকের আলংকারিক বিশ্বনাথ কবিরাজ সাহিত্যদর্পণ গ্রন্থেও গৌড়ী রীতির ওজঃগুণ, সমাসবহুলতা ও বিপুল শব্দাড়ম্বরের কথা উল্লেখ করেছেন। অবশ্য শুধু যে বাঙালি সাহিত্যিকেরাই গৌড়ী রীতিতে সাহিত্য রচনা করেছিলেন তা নয়, বহির্বঙ্গের অনেক কবিও তাঁদের রচনায় এই রীতি প্রয়োগ করেন।

সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের সব শ্রেণির রসসাহিত্যই ‘কাব্য’ নামে অভিহিত। নাটক মঞ্চায়ন ও দর্শনসাপেক্ষ বলে ‘দৃশ্যকাব্য’ এবং কাব্য পাঠযোগ্য বলে ‘শ্রব্যকাব্য’ নামে পরিচিত ছিল। শ্রব্যকাব্য আবার ছন্দের ব্যবহার অনুযায়ী গদ্য, পদ্য ও গদ্য-পদ্য মিশ্রিত চম্পূ—এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। বাঙালি কবির গদ্যকাব্যের সন্ধান বিশেষ পাওয়া যায়নি। বরং তাঁরা পদ্যকাব্যের মধ্যে মহাকাব্য, খণ্ডকাব্য ও কোষকাব্য রচনায় পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। এইসব কাব্যের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। রামায়ণ-মহাভারত থেকে সংগৃহীত বিষয় অবলম্বনে রচিত কাব্য ছাড়াও ছিল দূতকাব্য, গীতিকাব্য ও ঐতিহাসিক কাব্যের উপযোগী কিছু বিষয়। আলোচ্য সময়পর্বে চম্পূকাব্যের নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে দুটি কোষকাব্য খুব খ্যাতি অর্জন করেছিল।

সংস্কৃত কাব্যে অভিনন্দ নামে একাধিক কবির উল্লেখ আছে। তার মধ্যে ‘গৌড় অভিনন্দ’ নামে যিনি পরিচিত, তিনি সম্ভবত গৌড়বাসী ছিলেন। নবম শতকের কবি অভিনন্দ রামায়ণ অবলম্বনে রচনা করেন রামচরিত কাব্যটি। তাঁর বেশ কিছু শ্লোক সংকলিত হয়েছে কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়, সদুক্তিকর্ণামৃত, সুক্তিমুক্তাবলী, পদ্যাবলী, সুভাষিতাবলী প্রভৃতি কোষকাব্যে। এইসব শ্লোক রামচরিত-এ নেই। সম্ভবত এগুলি অভিনন্দের অন্যান্য প্রকীর্ণ শ্লোক। রামচরিত কাব্যটি ৪০টি সর্গে রচিত। আখ্যানভাগ গৃহীত হয়েছে বাল্মীকি রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড ও যুদ্ধকাণ্ড থেকে। রামের মাহাত্ম্য বর্ণনার জন্য কবি আখ্যানে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। সম্ভবত বাংলার তন্ত্রপ্রাধান্যের জন্যই এই বৈষ্ণব কাব্যে দেবীমাহাত্ম্যও কীর্তিত হয়েছে। কালিদাস-পরবর্তী যুগে এমন সুললিত সাবলীল রচনা অল্পই পাওয়া যায়। কাব্যটি বৈদর্ভী রীতিতে রচিত। কাদম্বরী কথাসার গ্রন্থটির রচয়িতাও অভিনন্দ। তবে ইনি গৌড়বাসী কিনা তা স্পষ্ট জানা যায় না।

অপর এক রামচরিত কাব্যের কবি সন্ধ্যাকর নন্দী যে বাঙালি ছিলেন তার সাক্ষ্যে কাব্যে কবির আত্মপরিচয় থেকেই জানা যায়। বরেন্দ্রের অন্তর্গত পুণ্ড্রবর্ধনে সন্ধ্যাকরের জন্ম। তাঁর পিতা প্রজাপতির নন্দী ছিলেন পালরাজা মদনদেবপালের সান্ধিবিগ্রহিক মন্ত্রী। কাব্যটি সম্ভবত দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত। কারণ, এতে মদনপালদেবের (রাজত্বকাল ১১৪০—১১৫৫ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। চারটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এই কাব্যের মোট শ্লোকসংখ্যা ২২০। কাব্যটি শ্লেষ-কাব্য, অর্থাৎ দ্ব্যর্থব্যঞ্জক শব্দের সাহায্যে কবি একই সঙ্গে রামায়ণের রামের এবং গৌড়াধিপতি রামপালদেবের কীর্তি যুগপৎ বর্ণনা করেছেন। কবি তাঁর শ্লেষকে ‘অক্লেশন’ বললেও কাব্যটি যত্নকৃত প্রয়াসেই রচিত। কবি নিজেকে ‘কলিকাল বাল্মীকি’ বলে আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করেছেন। যদিও বাল্মীকির কাব্যের প্রসাদগুণ তাঁর কাব্যে অনুপস্থিত। অবশ্য পালযুগের শেষ পর্বের ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান হিসেবে এই কাব্যের কিছুটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

মহাভারত অবলম্বনে রচিত কাব্যের মধ্যে নীতিবর্মার কীচকবধ বিখ্যাত। কবির জন্ম একাদশ শতকের প্রথমার্ধে। তিনি বাঙালি ছিলেন কিনা তার কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। প্রধানত দুটি কারণে তাঁকে বাঙালি বলে অনুমান করা হয়। প্রথমত, তাঁর কাব্যের প্রাপ্ত সকল পুথিই বাংলা লিপিতে লেখা এবং দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটির যতগুলি টীকা এখনও পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির রচয়িতাও বাঙালি। বিরাটপর্ব থেকে আখ্যানবস্তু সংগ্রহ করে পাঁচ সর্গে রচিত এই কাব্যের মোট শ্লোকসংখ্যা ১১৭। কাব্যটির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, তৃতীয় সর্গটি শ্লেষ অলংকারে রচিত এবং বাকি চারটি সর্গে যমক অলংকারের প্রাধান্য। শব্দপ্রয়োগে কবি চাতুর্য দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু তাতে কাব্যটি কিছুটা কৃত্রিমতা দোষেও দুষ্ট হয়ে পড়েছে। অবশ্য এই সংক্ষিপ্ত রচনায় কবি প্রায় বারোটি ছন্দ প্রয়োগ করে নিজের ছন্দনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।

মহাভারতেরই নল-দময়ন্তীর আখ্যান অবলম্বনে শ্রীহর্ষ রচনা করেন নৈষধচরিত। মাত্র দুশো শ্লোকে নিবদ্ধ কাহিনি শ্রীহর্ষের লেখনীতে ২৫০০ শ্লোকবিশিষ্ট মহাকাব্যে রূপান্তরিত। মূল গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে কবি কামশাস্ত্র, অলংকারশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র ও বিভিন্ন দর্শনশাস্ত্রও আলোচনা করেছেন। পদলালিত্য এই রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে আধুনিক রুচির বিচারে কেউ কেউ কাব্যটিতে বিকৃতির অভিযোগ তোলেন। নানারকম দোষও এই কাব্যে দেখা যায়। জনশ্রুতি আছে যে, শ্রীহর্ষের মাতুল ছিলেন প্রসিদ্ধ কাশ্মীরী আলংকারিক তথা কাব্যপ্রকাশ গ্রন্থের রচয়িতা মম্মট ভট্ট। তিনি নাকি ভাগিনেয়ের কাব্য পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘দোষ পরিচ্ছেদ’ লিখতে তিনি বৃথাই অসংখ্য কাব্য অনুসন্ধান করেছেন, শ্রীহর্ষের রচনাটিও আগে হাতে এলে তাঁর পরিশ্রম লাঘব হত। আসলে কাব্যরচনার উচ্ছ্বাসে কবি মাঝে মাঝে মাত্রাবোধ হারিয়ে ফেলেছেন। যেমন, দময়ন্তীর স্বয়ম্বর সভার বর্ণনায় অনর্থক পাঁচটি দীর্ঘ সর্গ জুড়ে কাব্যটিকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছেন। কবির পরিচয় নিয়ে কিছু সংশয় আছে। তাঁর পিতার নাম শ্রীহীর ও মাতার নাম মামল্লদেবী। কাব্যের শেষে কবি জানিয়েছেন যে, তিনি কনৌজরাজ কর্তৃক সম্মানিত হয়েছেন। প্রবন্ধকোষ গ্রন্থের রচয়িতা রাজশেখর সূরির সাক্ষ্যে মনে হয়, কবি দ্বাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কনৌজরাজ বিজয়চন্দ্র ও জয়চন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। তাঁর বাঙালিত্বের বড়ো দাবিদার তাঁর কাব্যটি। এই কাব্যে কয়েকটি বাঙালি আচার ও সংস্কারের উল্লেখ আছে। যেমন, বিবাহিতা নারীর শাঁখা পরা, বিবাহে মাছ-ভাত খাওয়া, উলু দেওয়া, চালের পিটুলি দিয়ে আলপনা আঁকা, বরের মাথায় মুকুট ও হাতে দর্পণ ধরা এবং সেই সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে কিছু বাংলায় প্রচলিত কয়েকটি স্ত্রী-আচারও। ভাষারীতির দিক থেকেও এটি বাংলার রচনা বলে সিদ্ধান্ত করা চলে। ণ/ন, বর্গীয় ব/অন্তঃস্থ ব-এর মধ্যে ভেদ করা হয়নি। সর্বোপরি কাব্যটি গৌড়ী রীতিতে রচিত। বঙ্গীয় কুলজীগ্রন্থে শ্রীহর্ষকে মেধা তিথির পুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য অন্যান্য তথ্যসূত্রে এই সব প্রমাণ খণ্ডন করার চেষ্টাও দেখা যায়।

বাঙালি রচিত সংস্কৃত গীতিকাব্যের মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখনীয় কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দম্‌ কাব্যের নাম। রাজা লক্ষ্মণসেনের সভাকবি জয়দেব ছিলেন সেন রাজসভার পঞ্চরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্ন। কাব্যে প্রদত্ত আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়, তাঁর পিতার নাম ভোজদেব, মাতার নাম রমাদেবী বা বামাদেবী। কেউ কেউ মনে করেন নর্তকী পদ্মাবতী ছিলেন তাঁর পত্নী এবং কবি ছিলেন তাঁর নৃত্যকালীন বাদক। কাব্যের গায়েন পরাশর ছিলেন কবির প্রিয় বন্ধু। কিন্তু জয়দেব তাঁর জন্মস্থান নিয়ে কিছুই বলেননি। তাই গবেষক মহলে তা নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশের মতে, জয়দেব ছিলেন বাঙালি এবং তাঁর জন্মস্থান ছিল বীরভূম জেলার অজয় নদের তীরবর্তী কেন্দুবিল্ব বা কেন্দুলি গ্রাম, মতান্তরে বগুড়া জেলার কেন্দুল গ্রাম। জয়দেবের খ্যাতি তাঁকে বাংলার বাইরেও টেনে নিয়ে গিয়েছে। বহির্বঙ্গের গবেষকদের কেউ কেউ বিহারের তিরহুত বিভাগের ঝেঞ্ঝারপুর শহরের কাছে অবস্থিত কেন্দোলি গ্রামকে অথবা ওড়িশার পুরীর নিকটবর্তী কেন্দুবিল্ব গ্রামকে তাঁর জন্মস্থান বলে দাবি করেছেন।

গীতগোবিন্দম্‌-রচয়িতা জয়দেব সংস্কৃত সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। রাধাকৃষ্ণের বসন্তকালীন রাসলীলা অবলম্বনে কবি বারোটি সর্গে কাব্যরচনা করেছেন। রাধা ভিন্ন অন্যান্য গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণ রাসলীলায় মত্ত হলে ঈর্ষায় রাধা মানিনী হলেন। তখন কৃষ্ণ গোপীদের ছেড়ে রাধার মানভঞ্জন করতে এলেন। অবশেষে অনুতপ্ত কৃষ্ণের অনুনয়-বিনয়ে এবং সখীদের অনুরোধে রাধা কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন হলে উভয়ের মিলন হল। কাব্যবিশারদের মতে, গীতগোবিন্দম্‌ খণ্ডকাব্য ও মহাকাব্য উভয়েরই বৈশিষ্ট্য বহন করছে। কথাবস্তু তুচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও বারোটি সর্গ কাব্যটিকে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি প্রদান করেছে। চরিত্রগুলিও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, রাধাকে একটি কাব্যের একক নায়িকা করে কাব্যরচনার দৃষ্টান্ত এই প্রথম। কৃষ্ণের চরিত্রচিত্রণে কবি ভাগবত বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের আদর্শ অনুসরণ করেছেন কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকলেও এটা স্পষ্ট যে জয়দেব তাঁর নায়ক কৃষ্ণকে ধর্মতৃষ্ণা ও জীবনতৃষ্ণা নিবারণের উপযোগী করার মানসেই চিত্রিত করেছেন। তাই কাব্যের গোড়ায় তিনি বলেছেন:

যদি হরিস্মরণে সরসং মনো / যদি বিলাস কলাসু কুতুহলম্‌।
মধুর কোমল কান্ত পদাবলীম্‌ / শৃণু তদা জয়দেব সরস্বতীম্‌।।
 

বস্তুত পৌরাণিক কাহিনিকে লৌকিক প্রেমগাথায় পরিণত করতে গিয়ে কাব্যের কৃষ্ণের বহুবল্লভ, নাগর রূপটিকেই মুখ্য করে তোলা হয়েছে। মধুর-রসাশ্রিত কৃষ্ণই তার উপজীব্য, যদিও সূচনায় দশাবতার স্তোত্র রচনা করে কৃষ্ণের ঐশ্বর্যময়-রূপটি সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। আবার কবির রাধা চরিত্রের উৎস সম্ভবত কিছু অর্বাচীন পুরাণ, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ কবিতা, সংস্কৃত উদ্ভট শ্লোক, এবং কিছুটা তাঁর নিজস্ব কল্পনা। বিশেষত অষ্টম থেকে দশম সর্গে যে প্রেমিকা রাধার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তা এক রোম্যান্টিক কবির কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্পদ। একাদশ সর্গের অভিসারিকা রাধার মানবী মূর্তিও পরবর্তীকালে খুব কম কবিও আঁকতে পেরেছেন।

গীতগোবিন্দম্‌ কাব্যের সাহিত্যিক গোত্র বিচারে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। কারণ, এতে যেমন মহাকাব্যের লক্ষণ অনুসারে অষ্টাধিক সর্গ, শৃঙ্গার অঙ্গীরস, ধীরোদাত্ত গুণসম্পন্ন নায়ক আছে, তেমনই মহাকাব্যের পক্ষে ক্ষতিকর গীতিধর্মিতাও এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এই কাব্যে যে চব্বিশটি গান সংযোজিত হয়েছে সেগুলির ভাষা সংস্কৃত হলেও অপভ্রংশ কবিতার ছন্দমাধুর্য তাতে সুস্পষ্ট। কিথ, ম্যাকডোনাল্ড, ভিন্টারনিৎসের মতো পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা এই কাব্যকে গীতিকবিতা বলে বিবেচনা করেছেন। তবে এই কাব্যে নাট্যলক্ষণও কম নেই। কৃষ্ণ, রাধা ও সখী এই তিন মুখ্য চরিত্রের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলেছে। তাই স্যার উইলিয়াম জোনস এটিকে বলেছেন Pastoral Drama বা রাখালিয়া নাট্য। লসেনের মতে, এটি Lyrical Drama বা গীতিনাট্য। আবার লেভি ও পিশেলের ধারণায় এই গান ও নাটকের মধ্যবর্তী Opera শ্রেণির রচনা। কবি নিজে তাঁর রচনাকে বলেছেন ‘প্রবন্ধম্‌’। অবশ্য প্রতি সর্গের পুষ্পিকায় ‘মহাকাব্য’ শব্দটিও প্রযুক্ত হয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, গীতগোবিন্দম্‌ একটি অভূতপূর্ব সাহিত্যকীর্তি, যার মধ্যে একাধারে গীতিকাব্যের সুরমুর্চ্ছনা, নাটকীয়তা, আখ্যানকাব্যের বর্ণনাত্মক রূপ এবং নৃত্যোপযোগী উপকরণ উপস্থিত। বড়ু চণ্ডীদাস তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে সম্ভবত এই রূপবন্ধটিই অনুসরণ করেছিলেন। গীতগোবিন্দম্‌ কাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব সেটির ভাষায়। ভাষার বাহ্যিক আবরণে এটি সংস্কৃত, কিন্তু শাব্দিক প্রয়োগকলা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, সমকালীন প্রাকৃত ও অপভ্রংশ কাব্যের কোমলতা ও নব্যসৃজ্যমান বাংলা ভাষার মাধুর্য কবি তাঁর কাব্যভাষায় অনুরণিত করতে সক্ষম হয়েছেন। গানগুলির মধ্যে যে সুখশ্রাব্য অনুপ্রাস লক্ষ্য করা যায়, তাতে স্পষ্টতই নব্য ভারতীয় আর্যভাষার, বিশেষত বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এই কাব্যে যে অপভ্রংশ পাদাকুলক ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা পরবর্তীকালে পয়ার ছন্দে রূপান্তরিত হয়। এছাড়া ত্রিপদীর ভঙ্গিটিও এতে পাওয়া যায়। জয়দেবের পঞ্চমাত্রিক ছন্দ বড়ু চণ্ডীদাস যেমন অনুসরণ করেছেন, তেমনই তা অনুপ্রাণিত করেছে রবীন্দ্রনাথকেও।

গীতগোবিন্দম্‌ জয়দেবকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা এই গ্রন্থকে ভাগবতের কবিত্বময় ভাষ্য মনে করেন। বৈষ্ণব সমাজে জয়দেব আদিকবি বলে বিবেচিত হন। কারণ, তাঁর রাধাকৃষ্ণ-প্রেমগাথাই বৈষ্ণব পদাবলির উৎসমুখ অবারিত করে দিয়েছিল। সহজিয়াপন্থীদের মতে, জয়দেব আদিগুরু, নবরসিকের একজন। গ্রন্থটির বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে ভারতের নানা প্রান্তে এটির অসংখ্য টীকা রচিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে রানা কুম্ভের রসিকপ্রিয়া, শঙ্কর মিশ্রের রসমঞ্জরী ও চৈতন্যদাসের বালবোধিনী টীকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মধ্যযুগের সন্ত সম্প্রদায়গুলি এই গ্রন্থের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। চৈতন্য মহাপ্রভুও এই গ্রন্থের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। তাই জয়দেবও এক ভক্ত বৈষ্ণব ও সাধক-কবি রূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। অথচ এই কাব্য রচিত হয়েছিল একদা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় আদিরসের ঢেউ তোলা বিদগ্ধ কলারসিকদের জন্য। জয়দেব সেই “লৌকিক কামনাবাসনাময় আবহের মধ্যে রাধাকৃষ্ণলীলাকে আশ্রয় করে একই সঙ্গে ইন্দ্রিয়কামনা ও প্রেমভক্তির জয়” ঘোষণা করেন। সম্ভবত পৌরাণিক দেবকথার সঙ্গে লৌকিক প্রেমকথার সমন্বয়ই ছিল জয়দেবের কাব্যাদর্শ। এই আদর্শ পরবর্তীকালে প্রভাবিত করেছিল রাজসভার আর-এক কবি বিদ্যাপতিকে। ভাবে, ভাষায় ও ধ্বনিসম্পদে বিদ্যাপতি এই কাব্যের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজা শিবসিংহ তাঁকে ‘অভিনব জয়দেব’ আখ্যা দিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের প্রবেশক হিসেবে গীতগোবিন্দম্‌-এর স্থান নির্দেশ করতে গিয়ে এক সমালোচক বলেছেন, “একাধারে পদকাব্য এবং মঙ্গলকাব্য হিসেবে পরবর্তী বাংলা পদাবলি সাহিত্য এবং মঙ্গলকাব্য সাহিত্য এই দুই সাহিত্যের ধারায় আদিতে গীতগোবিন্দের স্থান।” তুর্কি আক্রমণের পূর্বে বাঙালি রচিত সংস্কৃত সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিকৃতি গীতগোবিন্দম্‌ আধুনিক কালেও বাঙালি কবিদের প্রেরণার উৎস রূপে বিরাজমান।

সেন রাজসভার অপর বিশিষ্ট কবি আচার্য গোবর্ধন রচনা করেন আর্যাসপ্তশতী। তাঁর পিতা নীলাম্বরও ছিলেন কবি। কাব্যশেষে একটি পুষ্পিকা শ্লোকে কবি তাঁর শিষ্য উদয়ন ও ভ্রাতা বলভদ্রের নামও করেছেন। কাব্যটির শ্লোকসংখ্যা অবশ্য সাতশোরও বেশি। শ্লোকগুলি প্রেমমূলক। অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন, “প্রেম, প্রেমের বহিরঙ্গ বিলাস ও অন্তর্মুখী গভীরতা, প্রেমের ভুজঙ্গ কুটিল গতি ও স্বাভাবিক ঋজুতা এবং সর্বোপরি প্রেমের সূক্ষ্ম গভীর মনস্তত্ত্ব আর্যার শ্লোকাবলীতে বর্ণশাবল্যে চিত্রিত হইয়াছে। জীবন পরিচয়ের নিবিড়তায়, বস্তুদৃষ্টির প্রখরতায় এবং কৌতুকের সস্মিত দীপ্তিতে আচার্যের রচনা বিশিষ্টতার দাবি রাখে।” জয়দেব ও গোবর্ধন একই প্রেমের কথা বলেছেন। কিন্তু জয়দেবের কৃতিত্ব যেখানে ‘কোমল কান্ত পদাবলী’ সৃষ্টিতে, সেখানে গোবর্ধনের দক্ষতা ঘাতগম্ভীর গভীর নাদ সৃজনে। জয়দেবের প্রেম রাধাকৃষ্ণের দেবায়ত সীমায় আবদ্ধ, গোবর্ধন সেই প্রাচীর অতিক্রম করে মানবীয় প্রেমবৈচিত্র্যের বর্ণময় চিত্র অঙ্কন করেছেন। ঋণকৃত আখ্যানের পরিবর্তে গোবর্ধন খণ্ড খণ্ড ভাবের মননপ্রধান প্রকীর্ণ কবিতা দিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর আর্যাসপ্তশতী। কবি হালের প্রাকৃত কবিতা সংকলন গাহাসত্তসঈ গ্রন্থের অনুপ্রেরণায় এই গ্রন্থটি রচিত। নিজের কবিত্বশক্তি নিয়ে গোবর্ধনের একটি পাণ্ডিত্যাভিমান ছিল। এক জায়গায় তিনি নিজেকে কালিদাস ও ভবভূতির সমধর্মী বলে দাবি করেছেন। বাস্তবে ততটা না হলেও কবি যে সর্বশাস্ত্রবিদ ও সুপণ্ডিত ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। সভাবন্ধু জয়দেব তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “শৃঙ্গারোত্তরসৎপ্রমেয়রচনৈরার্যগোবর্ধন স্পর্ধী কোঽপি ন”। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কবির সমকালীন শ্লোক সংগ্রাহক শ্রীধর দাস তাঁর সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে গোবর্ধনের এই কাব্যের কোনও শ্লোক গ্রহণ করেননি।

কোষকাব্য বা কাব্য সংকলন সম্পাদনায় বাঙালি কাব্যরসিকদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। এই ধরনের কাব্যে পরস্পর-নিরপেক্ষ শ্লোক ব্রজ্যা বা প্রকরণ ক্রমে সজ্জিত হয় (অন্যোন্যানপেক্ষকঃ ব্রজ্যাক্রমেণ রচিতঃ)। এতে সংকলকের সৃষ্টিপ্রতিভার তুলনায় আস্বাদন-দক্ষতার মহত্ত্বই অনুভূত হয়। সাহিত্যের নানা শাখা পরিপুষ্ট হয়ে উঠলে তবেই এই ধরনের সংকলন গ্রন্থ সম্পাদিত হয়। প্রাপ্ত কোষকাব্যগুলির মধ্যে বাঙালি সংকলক সম্পাদিত প্রাচীনতম গ্রন্থটি হল বিদ্যাকরের সুভাষিত রত্নকোষ। তিনি সম্ভবত পালরাজত্বের শেষ দিকের ব্যক্তি ছিলেন। গ্রন্থটি সংকলনের কাল স্থিরীকৃত হয়েছে দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধ। গ্রন্থের আরম্ভে ‘সুগত ব্রজ্যা’ সংযুক্তির কারণে অনেকে বিদ্যাধরকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মনে করেন। বুদ্ধাকর গুপ্ত, রত্নকীর্তি, সংঘশ্রী, জিতারি নন্দী প্রমুখ অনেক বৌদ্ধ কবির কবিতাও এতে সংকলিত হয়েছে। এছাড়া এই কোষকাব্যে এমন কয়েকজন কবির শ্লোক সংকলিত হয়েছে, যাঁদের কোনও পরিচয় জানা যায় না কিংবা অন্য কোনও সংকলনে যাঁদের শ্লোক সংকলিত হয়নি। কাব্যরচনা ব্যতীত অন্যান্য পেশায় কীর্তিমান ব্যক্তিদের রচিত কবিতাও বিদ্যাকর তাঁর সংকলনে স্থান দিয়েছিলেন। সংকলনে বিধৃত অঙ্গোক, ডিম্বোক, ললিতোক, সরোক, হিদ্দোক, প্রমুখ ‘-ওক’ অন্তক নামধেয় কবিরা বাঙালি ছিলেন বলেই কোনও কোনও গবেষকের ধারণা। এফ. ডবলিউ. টমাস নেপাল থেকে এই গ্রন্থের একটি খণ্ডিত পুথি আবিষ্কার করেন। ১৯১২ সালে তাঁর সম্পাদনায় বইটি কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় নামে প্রকাশিত হয়। পরে সম্পূর্ণ পুথিটি আবিষ্কৃত হলে সংকলক ও গ্রন্থের আসল নাম জানা যায়।

১২০৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি আক্রমণের ঠিক পরেই যে কোষকাব্যের সংকলন সমাপ্ত হয়েছিল সেটি হল শ্রীধর দাসের সদুক্তিকর্ণামৃত (১২০৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি-মার্চ)। শ্রীধরের পিতা বটু দাস ছিলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের অন্তরঙ্গ বন্ধু ও রাজকর্মচারী। শ্রীধর নিজেও মহামাণ্ডলিক পদে বৃত ছিলেন। এই কোষকাব্যের শ্লোকগুলি মোট পাঁচটি ‘প্রবাহ’-এ সংকলিত। দেবদেবী-বিষয়ক পদগুলি সংকলিত হয়েছে ‘অমরপ্রবাহ’ অংশে। মূলত পৌরাণিক দেবতাদেরই স্তুতি করা হয়েছে এখানে। কৃষ্ণ তথা বিষ্ণু-বিষয়ক পদের আধিক্য দৃষ্টে কেউ কেউ শ্রীধরকে বৈষ্ণব বলে মনে করেন। দ্বিতীয় প্রবাহের নাম ‘শৃঙ্গারপ্রবাহ’। এই অংশে প্রাকৃত প্রেমিকা-প্রেমিকার প্রেমের বিভিন্ন স্তর কাব্যভাষায় রূপলাভ করেছে। রাজপ্রশস্তি-বিষয়ক কবিতাগুলি স্থান পেয়েছে ‘চাটুপ্রবাহ’ অংশে এবং অন্যান্য পদ সন্নিবিষ্ট হয়েছে ‘অপদেশপ্রবাহ’ ও ‘উচ্চাবচপ্রবাহ’ অংশে। প্রতিটি প্রবাহ কয়েকটি ‘বীচি’-তে বিভক্ত এবং পাঁচটি করে শ্লোক নিয়ে গঠিত হয়েছে এক-একটি বীচি। এই গ্রন্থে মোট ৪৮৫ জন কবির কবিতা সংকলিত। অজ্ঞাতনামা কবিদের ক্ষেত্রে ‘কস্যচিৎ’ বলে নির্দেশ করা হয়েছে। শ্রীধর বহু কবিকে বিস্মৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। বাংলার যে-সব কবির ভাগ্যে সর্বভারতীয় অনুমোদন জোটেনি তাঁদেরও অমরত্ব দিয়েছেন তিনি এই সংকলনে। গ্রন্থে স্পষ্টভাবে কবিদের জাতি নির্দেশ করা না হলেও, নাম, গাঁই ইত্যাদি বিবেচনা করে লক্ষ্মণসেন, কেশবসেন, উমাপতি ধর, গোবর্ধন আচার্য, কমল গুপ্ত, যজ্ঞ ঘোষ, তিল চন্দ্র, লড়হ চন্দ্র, প্রভাকর দত্ত, কালিদাস নন্দী, ত্রিপুরারি পাল প্রমুখ কবিকে বাঙালি বলে শনাক্ত করা কঠিন নয়। সবাই যে ব্রাহ্মণ ছিলেন তা নয়, কায়স্থ, বৈদ্য নট, কেওট প্রভৃতি জাতির লোকেরাও প্রকীর্ণ শ্লোক রচনা করেছেন। সুভাষিত রত্নকোষ-এ সংকলিত কিছু পদ এখানেও লভ্য। অপদেশপ্রবাহ ও উচ্চাবচপ্রবাহের শ্লোকগুলি থেকে তুর্কি আক্রমণের পূর্ববর্তী বাংলার জনজীবন, শান্ত গ্রামীণ সমাজ এবং বাঙালির পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, দারিদ্র্য, ধনসম্পদ, ধর্মাচরণ ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক খাঁটি তথ্য পাওয়া যায়।

সংস্কৃত কাব্য-প্রকরণের একটি বিশিষ্ট ভাগ দূতকাব্যের প্রেরণা ও আদর্শ কালিদাসের মেঘদূত কাব্যটি। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় পবনদূত নামে দূতকাব্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন ধোয়ী। কাব্যটি কল্প-ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত এক বিচিত্র প্রেমকাব্য। কবি তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজাকেই করেছেন কাব্যের ধীরললিত নায়ক। কাব্যে দেখে যায়, রাজা দক্ষিণদেশে গিয়েছেন। সেখানে কুবলয়বতী নামে এক গন্ধর্বকন্যা তাঁর প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তারপর রাজা দেশে ফিরে এলে বিরহিনী নায়িকা মলয় বায়ুকে দূত করে প্রিয়তমের কাছে প্রেমবার্তা প্রেরণ করছেন। সেই বার্তাটিই কালিদাসের ভঙ্গিতে মন্দাক্রান্তা ছন্দে বিবৃত করেছেন কবি। বস্তুত কাব্যটিতে মৌলিকতার চিহ্ন বিশেষ নেই। ভাবগভীরতাও তেমন প্রত্যক্ষ করা যায় না। তবে ধোয়ীর অভিনবত্ব এখানেই যে, তিনি সমকালের এক জীবিত রাজাকে গ্রহণ করেছেন কাব্যের নায়ক রূপে। কাব্যটি ১০৪টি শ্লোকে রচিত। এছাড়া ধোয়ীর আরও ২০টি শ্লোক স্থান পেয়েছে সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে। সেখানে অবশ্য ধোই, ধোয়ীক, ধুয়ী ইত্যাদি নাম উল্লিখিত। সেক-শুভোদয়া গ্রন্থে ধোয়ী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন মূর্খ এবং তাঁর জন্ম হয়েছিল তন্তুবায় সম্প্রদায়ে। ধোয়ীর কাব্যে সুহ্মদেশের অন্তরঙ্গ বর্ণনা থেকে মনে হয় তিনি রাঢ় অঞ্চলেরই অধিবাসী ছিলেন।

পল্লবিত কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি উমাপতি ধর জয়দেব গোষ্ঠীর অন্যতম। তাঁর কোনও পূর্ণাঙ্গ কাব্য পাওয়া যায়নি। বস্তুত প্রশস্তি ও প্রকীর্ণ কবিতাগুলির মধ্যেই তাঁর কবিকৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাঁর অনেক শ্লোকই গৃহীত হয়েছে শ্রীধর দাসের সদুক্তিকর্ণামৃত, কলহনের সুক্তিমুক্তাবলী ও রূপ গোস্বামীর পদ্যাবলী সংকলনে। প্রথম কোষকাব্যটিতে কবির ৯০টি শ্লোক সংকলিত। কবি যে পল্লবিত কাব্য রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন, তার প্রমাণ কেবল সংকলনে বিধৃত প্রকীর্ণ শ্লোকগুলিতেই নেই, বিভিন্ন প্রশস্তিপত্রেও পাওয়া যায়। বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপি, লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর তাম্রলিপি প্রভৃতি অনেক প্রশস্তিলিপির লেখক উমাপতি। গৌড়ী রীতির অক্ষরডম্বর বৈশিষ্ট্যটি তাঁর রচনায় প্রকট। কবিত্ব বলতে তিনি সম্ভবত আলংকারিক আতিশায্যকেই বুঝতেন। মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধচিন্তামণি গ্রন্থে উমাপতি সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে। উমাপতি ছিলেন করণ-কায়স্থ। তিনি কেবল রাজসভাকবিই ছিলেন না, ছিলেন লক্ষ্মণসেনের এক যোগ্য মন্ত্রীও। একদা উদ্ধত রাজাকে উপদেশ দেওয়ার ধৃষ্টতায় তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত কবি রাজার উদ্দেশ্যে একটি শ্লোক আবৃত্তি করলে রাজার বোধোদয় হয় এবং তিনি দণ্ডাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়ে কবিকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বৃত করেন।

লক্ষ্মণসেনের রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম কবি শরণ। তাঁর ব্যক্তিপরিচয় বিশেষ জানা যায় না। জয়দেব গীতগোবিন্দম্‌-এ লিখেছেন, “শরণঃ শ্লাঘ্যো দুরুহদ্রুতে”, অর্থাৎ শরণের দক্ষতা ছিল দুরুহ শব্দ দ্বারা দ্রুত বেগে শ্লোক রচনায়। দুর্ঘটবৃত্তি নামক ব্যাকরণের রচয়িতা শরণদেব ইনিই কিনা সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত করা যায়নি। শরণের ২২টি শ্লোক উদ্ধৃত হয়েছে সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে। আরও কিছু পদ সংকলিত হয়েছে রূপ গোস্বামীর পদ্যাবলী-তে। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, শরণের কোনও শ্লোকই বাংলার বাইরে কোনও শ্লোক সংকলনে স্থান পায়নি। এই কারণেই তাঁর বাঙালিত্বের দাবি আরও জোরদার হয়।

সাহিত্যের কোনও কোনও ইতিহাসবিদ দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে আবির্ভূত কবি লক্ষ্মীধরের কথা বলেছেন। ২০ সর্গে রচিত চক্রপাণিবিজয় নামক মহাকাব্যে দেওয়া তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, তিনি গৌড়ের ‘ভট্টাঙ্কিত কোশল’ গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, এটি বগুড়া জেলার কুশৈল গ্রাম। কবি ভোজদেব নামে তাঁর এক পূর্বপুরুষের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। অনেকের মতে, ইনি বঙ্গের রাজা ভোজবর্মদেব। লক্ষ্মীধরের মহাকাব্যে অসুররাজ বানের কন্যা ঊষার পরিণয়ের প্রসঙ্গ আছে। এছাড়া কয়েকটি কোষকাব্যে কবির কিছু প্রকীর্ণ শ্লোকও সংকলিত হয়েছে।

কাব্যরচনায় বাঙালি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করলেও নাট্যরচনায় দৈন্যই প্রকাশ করেছে। সমগ্র মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কোনও নাটক রচিত হয়নি। অবশ্য জনসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য লোকনাট্য, কৃষ্ণযাত্রা বা নাটগীত ধরনের নাট্যশৈলীগুলির উল্লেখ পাওয়া যায়। সাহিত্যের ইতিহাসবিদদের মতে, গীতগোবিন্দম্‌-এও লোকাভিনয়ের ছাপ সুস্পষ্ট। তারই অনুসারী শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-ও সাধারণের নাট্যরসপিপাসা চরিতার্থ করে থাকবে। তবু বিশিষ্ট বাঙালি নাট্যকারের উৎকৃষ্ট রচনার কোনও পরিচয় তুর্কি আক্রমণের পূর্ববর্তী যুগে নেই। অথচ সুবিশাল সংস্কৃত সাহিত্যের বড়ো অংশ দৃশ্যকাব্য, যা রূপক ও উপরূপকে প্রায় ২৮টি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রায় সহস্রাব্দ কাল ধরে ভাস, অশ্বঘোষ, কালিদাস, ভবভূতি, শ্রীহর্ষ প্রমুখ বিশিষ্ট নাট্যকার ভারতীয় নাট্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। সেই ঐতিহ্য যে অল্পবিস্তর বাংলাতেও প্রবেশ করেছিল এবং সংস্কৃত নাট্যকারদের অনুপ্রেরণায় কোনও কোনও অক্ষম লেখক কিছু নাটক রচনাও করেছিলেন, তার কিছু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দে সাগরনন্দী রচিত নাটকলক্ষণরত্নকোষ গ্রন্থে। তিনি বাঙালির লেখা অনেকগুলি নাটকের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেগুলির একটিও বর্তমানে পাওয়া যায় না। এর থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে, সেগুলি কখনই জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি এবং কালের প্রকোপে সেই অকিঞ্চিৎকর রচনাগুলি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

কোনও কোনও গবেষকের মতে, নাট্যকার ভট্টনারায়ণ, মুরারি, বিশাখদত্ত ও ক্ষেমীশ্বর বাঙালি ছিলেন। এই দাবির পিছনে সুস্পষ্ট কোনও যুক্তি বা প্রমাণ নেই। বাংলার একটি সুপ্রাচীন জনশ্রুতিই ভট্টনারায়ণের বাঙালিত্বের দাবিদার। কুলজীগ্রন্থগুলিতে বলা হয়েছে যে, গৌড়াধিপতি আদিশূর কান্যকুব্জ বা কনৌজ থেকে যে পাঁচজন বৈদিক ব্রাহ্মণকে আনয়ন করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ভট্টনারায়ণ। কিন্তু কুলজীগ্রন্থগুলির ঐতিহাসিকত্ব নিয়ে সংশয় আছে এবং কথিত আদিশূরের প্রকৃত পরিচয় আজও অনির্ধারিত। অবশ্য ভট্টনারায়ণের বেণীসংহার নাটকের সাহিত্যরীতিতে ও ভাষার ছাঁদে গৌড়ী রীতির ছাপ আছে। তাই মূলত জনশ্রুতি ও রচনাপদ্ধতির উপর ভিত্তি করে কোনও কোনও পাশ্চাত্য গবেষক তাঁকে বাঙালি বলে উল্লেখ করেছেন। দশম শতকের নাট্যকার মুরারির অনর্ঘরাঘব নায়কের কাহিনি রামায়ণ থেকে গৃহীত। এই নাটকে একদা কলচুরি রাজধানী নর্মদা-তীরবর্তী মাহিষ্মতী নগরীর কথা আছে। তাই বৈদিক ব্রাহ্মণদের আদিপুরুষ মুরারি ও নাট্যকার মুরারি অভিন্ন ব্যক্তি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আনুমানিক দশক শতকের নাট্যকার ক্ষেমীশ্বরের চণ্ডকৌশিক নাটকের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, নাটকটি লেখা হয়েছে রাজা মহীপালের সভায়। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অনুমান, এই মহীপাল পালবংশীয় রাজা মহীপালদেব। অন্যদিকে পিশলের বক্তব্য, ইনি আসলে গুর্জর-প্রতিহার রাজা প্রথম মহীপাল। লক্ষণীয় নাটকটির প্রাচীনতম পুথি পাওয়া গিয়েছে নেপালে। এই নাটকে হরিশ্চন্দ্র ও বিশ্বামিত্রের কাহিনি নাট্যাকারে বর্ণিত। নবম শতকের পূর্ববর্তী নাট্যকার বিশাখদত্তের নাটকে বাঙালিত্বের কোনও চিহ্নই নেই। মুদ্রারাক্ষস-এর বিষয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সিংহাসন লাভ ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চাণক্যের ভূমিকা পর্যালোচনা।

এছাড়া একাদশ-দ্বাদশ শতকের নাট্যকার কৃষ্ণমিশ্রকেও কেউ কেউ বাঙালি মনে করেন। তাঁর প্রবোধচন্দ্রোদয় নাটকের কয়েকটি শ্লোকে গৌড়, রাঢ়াপুরী, ভূরিশ্রেষ্ঠ প্রভৃতি স্থাননামের উল্লেখ আছে, আর প্রস্তাবনায় আছে গোপালের নাম। কিন্তু এগুলির অন্যবিধ ব্যাখ্যায় কৃষ্ণমিশ্রের বাঙালিত্বের দাবি খারিজ হয়ে যেতে পারে।

তুলনায় প্রাচীন বাংলার প্রসিদ্ধ বৈয়াকরণ চন্দ্রগোমীর বাঙালিত্ব নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তিনি বরেন্দ্রভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন। একদা চন্দ্রদ্বীপে নির্বাসিত হয়ে তিনি ‘দ্বৈপ’ নামে পরিচিত হন। এই তথ্য পাওয়া যায় তিব্বতি ঐতিহাসিক তারানাথের গ্রন্থে এবং চন্দ্রগোমীর স্বরচিত মনোহরকল্প স্তোত্র থেকে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চন্দ্রগোমী আর্যতারাদেবীস্তোত্রমুক্তিকামালা ইত্যাদি ৩৬টি তান্ত্রিক বজ্রযান সাধনা-বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লেখা সংস্কৃত নাটকটির নাম লোকানন্দ। বর্তমানে নাটকটির তিব্বতি অনুবাদটিই শুধু পাওয়া যায়। চন্দ্রগোমীর বিখ্যাত কীর্তি চান্দ্র-ব্যাকরণ। এটিতে অষ্টাধ্যায়ী-কে সংক্ষিপ্ত ও সহজ করে ৩১০০ সূত্রে ধরেছেন তিনি। এছাড়া ন্যায়সিদ্ধ্যালোক নামে তর্কশাস্ত্র-বিষয়ক একটি গ্রন্থও তিনি রচনা করেন।

ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার আলোচ্য সময়পর্বে আরও এক নাট্যকারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি পারমাররাজ অর্জুনবর্মার গুরু মদন। জাতিতে বাঙালি মদন যৌবনে মালবে গিয়ে তাঁর কবিত্বশক্তির জন্য ‘বাল সরস্বতী’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর রচিত নাটকের নাম পারিজাতমঞ্জরী বা বিজয়শ্রী। এটি শ্রীহর্ষের রত্নাবলী-র অনুকরণে রচিত। এই নাটকে ধোয়ীর পবনদূত-এর মতো সমকালীন রাজাকেই নায়ক করা হয়েছে। গ্রন্থটির অংশমাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।

বাঙালি ও প্রাকৃত সাহিত্য

[সম্পাদনা]

প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার শেষ পর্বে মধ্য ভারতীয় আর্যভাষা রূপে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের উদ্ভব। এই ভাষাগুলি প্রথমে ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, পরে তা গৃহীত হয় সাহিত্যের মাধ্যম রূপে। খ্রিস্টপূর্ব কালেই প্রাকৃতের আবির্ভাব। সম্রাট অশোকের রাজ্যশাসন-সংক্রান্ত লিপিগুলির অধিকাংশই বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রাকৃতে লেখা। পরে তা থেকে গড়ে ওঠে সাহিত্যিক প্রাকৃত। পূর্ব ভারতে ব্যবহৃত হত মাগধী প্রাকৃত। এই প্রাকৃতে লেখা খুব অল্প রচনাই পাওয়া গিয়েছে। অবশ্য বাংলার কবি ও পণ্ডিতেরা যে অন্য প্রাকৃত জানতেন না তা নয়। তুর্কি আক্রমণের পূর্ববর্তী অনেকগুলি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ গ্রন্থ পাওয়া গিয়েছে। তবে সেগুলি বাঙালির রচনা কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। যেমন, হালের গাহাসত্তসঈ অথবা পিঙ্গলের প্রাকৃত ছন্দশিক্ষার গ্রন্থ প্রাকৃতপৈঙ্গল। মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে রচিত গাহাসত্তসঈ সর্বপ্রাচীন কবিতা সংগ্রহ। অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, সাতবাহন রাজা হালই এই গ্রন্থের সংকলক। সেই হিসেবে এটি খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে সংকলিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সংশয় জাগে যথাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের দুই বিশিষ্ট গ্রন্থকার প্রবরসেন (১/৬৪, ৩/২, ৩/৮, ৩/১৬) ও বাক্‌পতিরাজের (১/১৫) কবিতা এতে সংকলিত হয়েছে বলে। এগুলি অবশ্য প্রক্ষিপ্তও হতে পারে। যাই হোক, গ্রন্থটি কয়েকটি কারণে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সংস্কৃত শ্লোক-সংগ্রহগুলির মূল আদর্শস্বরূপ ছিল এই গ্রন্থ। এখানেই রাধার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। আর মধ্যযুগীয় বাংলা বৈষ্ণব পদের বেশ কয়েকটি এর কোনও না কোনও শ্লোকের প্রত্যক্ষ প্রভাবে রচিত। এই গ্রন্থের দু-একটি শ্লোকে বাংলার জনজীবনও চিত্রিত হয়েছে। সম্ভবত সংশ্লিষ্ট শ্লোকগুলি বাঙালি কবিদের রচনা। প্রাকৃতপৈঙ্গল গ্রন্থটিও একপ্রকার সংকলন গ্রন্থ, তবে এই সংকলনের বিশেষ উদ্দেশ্যটি হল প্রাকৃত ছন্দে পাঠককে অভিজ্ঞ করে তোলা। গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল শৌরসেনী প্রাকৃত ও অপভ্রংশে। সম্ভবত চতুর্দশ শতকে কাশীতে এটির সংকলনকার্য সমাপ্ত হয়েছিল। সংকলনকর্তা হিসেবে বিশিষ্ট ছন্দশাস্ত্রবিদ পিঙ্গলের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তিনি যে বাঙালি ছিলেন না, তা অনুমান করা যায় গ্রন্থে বাঙালির প্রতি তাঁর কয়েকটি কটাক্ষ থেকেই। তবে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় কৃষ্ণকথার কিছু বিশিষ্ট উপাদান এতে নথিবদ্ধ হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু শ্লোকে বাংলার ভাব, বিষয়বস্তু ও ভাষাকৌশলের আভাস পাওয়া যায়। কয়েকটি শ্লোকে বাঙালি জীবনের ছায়াপাতও ঘটেছে।

দুটি প্রাকৃত আখ্যানকাব্যকে কেউ কেউ বাঙালির রচনা বলে নির্দেশ করেছেন: প্রবরসেনের সেতুবন্ধ বা দহমুহবহো এবং বাক্‌পতিরাজের গউড়বহো। দুই লেখকেরই জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। সেতুবন্ধ মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে রচিত ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রন্থ। রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের বিষয় এখানে অনুসৃত হয়েছে। গ্রন্থটি এতই প্রসিদ্ধ ছিল যে দণ্ডী এর প্রশস্তিতে বলেছেন, “সাগরঃ সূক্তিরত্নানাং সেতুবন্ধাদি যন্ময়ম্‌”। অন্যদিকে আনুমানিক সপ্তম শতকে বাক্‌পতিরাজের লেখা গউড়বহো শৌরসেনী প্রাকৃতে লেখা ইতিহাস ও কল্পনার মিশ্রণ। অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী এই রচনায় বাংলা মঙ্গলকাব্যের পূর্বাভাস দেখতে পেয়েছেন। কাব্যের সূচনায় বিভিন্ন দেবদেবীর বন্দনা আছে, গ্রন্থোৎপত্তির কারণ বর্ণনার মতো কবির কৈফিয়ত আছে, এছাড়াও মঙ্গলকাব্যের কিছু আনুষঙ্গিক উপাদানও এখানে পাওয়া যায়। এই সূত্র ধরে বাক্‌পতিরাজকে বাঙালি বলে বিবেচনা করাই যায়।

বাঙালি ও অপভ্রংশ সাহিত্য

[সম্পাদনা]

অপভ্রংশ ভাষার উদ্ভব প্রাকৃত ভাষা থেকে এবং অপভ্রংশের বিকাশ ও বিস্তার খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতক পর্যন্ত। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, প্রত্যেকটি প্রাকৃত বিবর্তিত হয়েছিল সেই ভাষার অব্যবহিত রূপান্তর অপভ্রংশের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু মাগধী প্রাকৃতের সাহিত্যিক নিদর্শন কিছু পাওয়া গেলেও মাগধী অপভ্রংশে লেখা গ্রন্থ কিছুই পাওয়া যায়নি। মাগধী প্রাকৃতের তুলনায় শৌরসেনী প্রাকৃত অনেক পরিশীলিত। সম্ভবত তাই শৌরসেনী অপভ্রংশ মাধ্যমটিকে ব্যবহার করেছিলেন পাল ও সেন যুগের মহাযানী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যেরা। বাংলার তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধকেরা তাঁদের গুহ্য সাধনপদ্ধতির কথা রহস্যময় ভাষায় লিখতে শুরু করেন। সেইসব তত্ত্বপ্রকাশের বাহন কখনও হয়ে ওঠে গান, কখনও বা গদ্যাত্মক টীকা-টিপ্পনী। গানগুলি চর্যা ও দোহা নামে খ্যাত। চর্যাগীতি রচিত হয় সদ্যোজাত বাংলা ভাষায় এবং দোহার ভাষা ছিল শৌরসেনী অপভ্রংশ। দোহাকারেরা অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। এখনও পর্যন্ত যে-সব দোহাকোষ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলির অন্যতম হল সরহপাদের দোহাকোষ (অদ্বয়বজ্রের সহজম্নায় পঞ্জিকা নামক সংস্কৃত টীকা সহ), তিল্লোপাদের দোহাকোষ (সারার্থ পঞ্জিকা নামক সংস্কৃত টীকা সহ) এবং কাহ্নপাদের দোহাকোষ (আচার্যপাদের মেখলা নামক সংস্কৃত টীকা সহ)।