বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/প্রাক্-চৈতন্য যুগের মঙ্গলকাব্য
মঙ্গলকাব্যের ধারাটি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি বলিষ্ঠ ধারা। অনুবাদ সাহিত্যের ন্যায় এগুলিও আখ্যান-নির্ভর কাব্য, তবে এগুলির উৎস সংস্কৃত পুরাণ বা কাব্যসাহিত্যের মধ্যে নিহিত ছিল না। গ্রামবাংলায় প্রচলিত ব্রতকথাগুলি যেমন একদিন লোকসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষার বৃন্তমূল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসারিত হয়েছিল, ঠিক তেমন ভাবেই অগণিত বাঙালির ঐহিক কামনা-বাসনার রূপায়ণ ঘটেছিল মঙ্গলকাব্যের পুথিগুলিতে। বস্তুত, লৌকিক দেবদেবীদের পূজা ও মাহাত্ম্য-প্রচারের এই গল্পগুলির কোনও শিকড়ই প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃত শাস্ত্র বা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই কাব্যধারার কাহিনী, চরিত্র, পটভূমি, মেজাজ ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যেই মাটির কাছাকাছি থাকা বাংলাকে এমনভাবে পাওয়া যায়, যা মধ্যযুগে রচিত অন্য সকল সাহিত্যকর্মেই দুর্লভ। এজন্য মঙ্গলকাব্যকে অনেকেই মধ্যযুগীয় বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ফসল বলে মনে করেন। সেযুগে বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের অপার্থিব প্রেমগাথা বা চৈতন্যজীবনী-কাব্যে প্রেমাভক্তির তত্ত্বকথা বাঙালির রোম্যান্টিক ভাবালুতা বা ভক্তিপিপাসাকে তৃপ্ত করলেও, মঙ্গলকাব্যে দেবতা ও মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-মিল সে-সব ঘটনার বস্তুমুখীর জীবনতৃষ্ণা ফুটিয়ে তুলতে অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেছিল। মনে রাখতে হবে, বৈষ্ণব পদাবলীর শেষ গন্তব্যস্থল ছিল মরমীয়া অতীন্দ্রিয়বাদ, অন্যদিকে মঙ্গলকাব্য উপনীত হয়েছিল বহিরঙ্গে অলৌকিকতা-সম্পৃক্ত এক বস্তুবাদী চেতনায়। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার অঙ্কুর তাই নিহিত ছিল এই মঙ্গলকাব্যেই।
মঙ্গলকাব্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]"মঙ্গলকাব্য" নামকরণের কারণ
[সম্পাদনা]"মঙ্গলকাব্য" নামটির উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মন্তান্তর রয়েছে। একটি মতে, "মঙ্গল" শব্দটি সুভাষণরীতি থেকে আগত। ভয়ংকর ও প্রতিহিংসা-পরায়ণ দেবতাকে তুষ্ট করতে কিংবা তাঁদের অমঙ্গলকারিণী শক্তিকে প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে সমাজ-মন তৈরি করে নিয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীতার্থ এই শব্দটি। আবার শব্দটির দ্রাবিড় উৎসের সম্ভাবনাটিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মলয়ালম ভাষায় "মঙ্গল্যম্" শব্দের অর্থ বিবাহ। তামিল ভাষায় ক্ষৌরকর্মের জন্য ব্যবহৃত ক্ষুরকে "মঙ্গল" ও নাপিতানিকে "মঙ্গলৈ" বলা হয়। তেলেগু ভাষায় ক্ষৌরকারকে বলা হয় "মঙ্গল"। আবার অধুনা কর্ণাটকের কুর্গ অঞ্চলে যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানকেই "মঙ্গল" নামে অভিহিত করা হয়। সংগীতশাস্ত্রেও "মঙ্গল" নামটি অপরিচিত নয়। নারদ রচিত চত্বারিংশচ্ছত-রাগ-নিরূপণম্ গ্রন্থে ভৈরবরাগের পুত্রবধূর নাম "মঙ্গলকৌশীকী"; আবার ক্ষেমঙ্কর পাঠক রচিত রাগমালা গ্রন্থে মঙ্গলরাগকে হিন্দোলরাগের অন্তর্গত একটি উপরাগ (পুত্র) বলা হয়েছে। তবে এই দুই গ্রন্থের পুথিগুলি অর্বাচীন কালের এবং খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের আগে এগুলির প্রচলন ছিল বলে বোধ হয় না। তাছাড়া, মঙ্গলকাব্য সবসময়ে মঙ্গলরাগে গীত হত না। তাই সেকালের অন্য এক রীতিবৈশিষ্ট্যের কথাও এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। "মঙ্গলকাব্য" নামকরণের একটি কারণ হতে পারে, এক মঙ্গলবার থেকে পরবর্তী মঙ্গলবার পর্যন্ত গাওয়ার রীতিটি। সেই হিসেবে আট দিনে গাইবার উপযুক্ত ৮, ১৬ বা ২৪ পালায় কাহিনী বিভাজিত হত। তবে একথাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, এমন পালা-বিভাজন সব মঙ্গলকাব্যে দেখা যায় না। ধর্মমঙ্গল কাব্য সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত "দ্বাদশ আদিত্য" ধারণার অনুরূপে বারো দিনের পালায় বিভাজিত হয়ে দেখা যায়।
উপরিউক্ত তত্ত্বগুলিতে সম্ভবত মঙ্গলকাব্যের প্রকৃতিকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই ভিন্নতর একটি ভাবনারও অবকাশ থেকে যায়। প্রতিটি মঙ্গলকাব্যেরই উপজীব্য বিষয় হল, মর্ত্যভূমিতে বিভিন্ন লৌকিক-পৌরাণিক দেবদেবীদের মাহাত্ম্যপ্রচার ও পূজাপ্রতিষ্ঠা। ভক্তগণের মঙ্গলবিধানের জন্য এইসব দেবদেবীর অলৌকিক মহিমার কথা একদা ব্রতকথা-পাঁচালীর আকারে প্রচারিত হয়েছিল, পরবর্তীকালে সেই কাব্যরূপগুলিই সর্বসাধারণ্যে "মঙ্গলকাব্য" নামে পরিচিত হয়। এর পিছনে যুগপ্লাবী বিশেষ ঘটনা ও বিপন্ন মানবচেতনার তাদিগ যুক্ত থাকার বিষয়টিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মঙ্গলকাব্যের সামাজিক প্রেক্ষাপট
[সম্পাদনা]রবীন্দ্রনাথ সমাজে শৈব প্রভাবের বিরুদ্ধে শক্তিবাদের উত্থানকে মঙ্গলকাব্যের প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করলেও, সব মঙ্গলকাব্যে এই ছকটিকে মিলিয়ে নেওয়া যায় না। এম. এন. শ্রীনিবাসের মতে, আর্যসভ্যতার ক্রমিক বিস্তারের ফলে যে সংস্কৃতায়নের সূচনা ঘটেছিল, মঙ্গলকাব্যের লৌকিক দেবদেবীদের উচ্চবর্ণ-ভুক্তির প্রচেষ্টাও তারই স্মারক। কিন্তু এর বিপরীত ভাবনাটিও সমানভাবে প্রযোজ্য। মঙ্গলকাব্যের কবিরা অধিকাংশই বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ। সেই হিসেবে উচ্চবর্ণের দিক থেকে অবতলবর্তী সমাজে পূজিত দেবদেবীদের জাতে তোলার চেষ্টার ব্যাপারটিও বিচার-সাপেক্ষ।
স্পষ্টতই অন্ধত্ব, অজ্ঞতা, অদৃষ্টবাদ, ভীতিবোধ তথা আত্মশক্তিতে অবিশ্বাস যখন বাঙালি জনমানসে দৃঢ়ভাবে চেপে বসেছিল, তখন সেই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলকাব্যগুলির উদ্ভব। যে প্রয়োজন ও আততির সঙ্গে মঙ্গলকাব্যগুলির যোগ, তা একান্তভাবে সেকালের বাস্তব সমস্যা ছিল। তুর্কি আক্রমণের ফলে বিদেশী শক্তির অত্যাচারের সামনে বাঙালির জাতীয় জীবন বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় উদ্ধত বৈদেশিক শক্তির বিরুদ্ধে হিন্দুদের একত্র সংহতির প্রয়োজন হয়। অথচ সমাজের অন্ত্যেবাসী মানুষের বৃহত্তর হিন্দুসমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েও বর্ণাশ্রমী ব্যবস্থার শাসন-শোষণে কেবল নির্যাতনই ভোগ করেছিল। তাদের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মানুষের মানসিক যোগ আদৌ ছিল না। নতুন রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থায় হিন্দুসমাজে বড়ো ফাটল দেখা দিলে স্বার্থনির্ভর জাতিচেতনায় উদ্বুদ্ধ অভিজাত হিন্দুরা আভিজাত্যের উন্নাসিকতাকে দূরে সরিরে রেখে এতকালের অবহেলিতদের পাশে এসে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। উচ্চবর্ণের কঠোর অনুশাসন এই পরিপ্রেক্ষিতে শিথিল হতে শুরু করে, আর তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে অপৌরাণিক দেবদেবীদের স্বীকৃতিলাভ ঘটে পৌরাণিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বিদগ্ধজনদের হাত ধরে। মঙ্গলকাব্য তারই প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি।
মঙ্গলকাব্যের গঠন ও শ্রেণীবিভাগ
[সম্পাদনা]পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ক্রমাগত মঙ্গলকাব্য অনুশীলিত হওয়ায় এগুলির রচনাভঙ্গিতে কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। যেমন, দেববন্দনা, গ্রন্থোৎপত্তির কারণ, দেবখণ্ড ও নরখণ্ডে প্রায় সব মঙ্গলকাব্যই বিভক্ত। সেই সঙ্গে এতে আছে চৌতিশা, বারোমাস্যা, ফুল-ফল-গাছপালা-পশুপাখির তালিকা, ভোজ্যদ্রব্যের তালিকা, বিবাহের বিশদ বর্ণনা, যুদ্ধের বর্ণনা ইত্যাদি। প্রায় সব মঙ্গলকাব্যেই দেখা যায়, দেবতারা স্বর্গলোককে কাউকে শাপভ্রষ্ট করে পাঠান মর্ত্যভূমিতে। তারপর নানা প্রতিকূলতা জয় করে সেই শাপভ্রষ্টেরা উক্ত দেবতার পূজা প্রচার করে আবার ফিরে যান স্বর্গে। সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা, পৌরাণিক দেবদেবীর বন্দনা, দিগ্বন্দনা, রমণীগণের পতিনিন্দা ইত্যাদি নানা বিষয়ও মঙ্গলকাব্যের আবশ্যক উপাদান হিসেবে গণ্য। রচনার ঐতিহাসিক কালানুক্রম বিচার করলে দেখা যায়, অনার্য দেবদেবীর পূজাপ্রচারের কাহিনী দিয়ে মঙ্গলকাব্য ধারার সূচনা ঘটলেও তা অচিরেই বৈদিক ও পৌরাণিক দেবদেবীদের মাহাত্ম্যপ্রচারের মাধ্যমে পরিণত হয়। অবশ্য সার্বিকভাবে এগুলির সবকটিই "মঙ্গল" নামধেয় হলেও প্রভাব ও প্রাচুর্যের দিক থেকে সমগ্র মঙ্গলকাব্য-সাহিত্যধারাটিকে তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে:
- প্রাথমিক তথা প্রধান স্তরের মঙ্গলকাব্য: মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল।
- মধ্য স্তরের জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য: কালিকামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, রায়মঙ্গল, গৌরীমঙ্গল ও শীতলামঙ্গল।
- গৌণ স্তরের মঙ্গলকাব্য: অনাদিমঙ্গল, কমলামঙ্গল, কিরীটিমঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল, জীমূতমঙ্গল, পঞ্চাননমঙ্গল, লক্ষ্মীমঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, সূর্যমঙ্গল।
মঙ্গলকাব্যের রূপাঙ্গিকটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, লৌকিক, পৌরাণিক ও বৈদিক দেবতাদের পাশাপাশি বৈষ্ণব ধর্মগুরুদের জীবনকথাও "মঙ্গল" নামধেয় কাব্য রূপে রচিত হয়। এর প্রমাণ উপরিউক্ত মধ্য স্তরের জনপ্রিয় মঙ্গলকাব্য ও গৌণ স্তরের মঙ্গলকাব্যগুলি এবং শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল, রসিকমঙ্গল, রাধিকামঙ্গল, গোপালমঙ্গল, গোবিন্দমঙ্গল, ব্রজমঙ্গল, চৈতন্যমঙ্গল, অদ্বৈতমঙ্গল ইত্যাদি কাব্য। প্রাক্-চৈতন্য যুগে প্রধান স্তরের মঙ্গলকাব্যগুলিই কেবল বিকাশ লাভ করেছিল। এই তিনটি বলিষ্ঠ ধারার মধ্যে আবার মনসা ও চণ্ডী-কেন্দ্রিক মঙ্গলকাব্যের নিদর্শনই পাওয়া যায়, ধর্মমঙ্গল কাব্যের আদিকবি ময়ূরভট্ট চৈতন্যপূর্ব যুগের ব্যক্তি বলে বিবেচিত হলেও তাঁর কাব্যের কোনও পুথিও অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। এই ধারার শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলি সবই চৈতন্য-পরবর্তীকালে ষোড়শ শতকের পর থেকে রচিত হয়ে এসেছে। অতএব আলোচ্য পর্বের মনসামঙ্গলকের কবি হরিদত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপলাই ও নারায়ণদেব এবং চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আদিকবি মাণিক দত্তের উপর আলোকপাত করা যেতে পারে।
প্রাক্-চৈতন্য যুগের মনসামঙ্গল
[সম্পাদনা]সর্পদেবী মনসার মাহাত্ম্য ও পূজা-প্রচলনের কাহিনী নিয়ে মনসামঙ্গল কাব্যধারার প্রতিষ্ঠা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই বিষধর সর্পের দংশন ও সর্পবিষে মৃত্যুর ভয় মানুষকে কণ্টকিত করে রেখেছিল। এই আধিভৌতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রাচীনকালে বিভিন্ন জাতির মানুষ সর্পের এক অধিষ্ঠাত্রী দেবীর কল্পনা করে। কালক্রমে এই দেবীই বাংলায় মনসা নামে পরিচিতা হন।
ইতিহাসবিদদের অভিমত, সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভারতে সর্পপূজা প্রচলিত ছিল। তবে সর্প-সংস্কৃতির সূচনা ঘটেছিল প্রায় ছয় হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরে। সেদেশে সর্পদেবী উরিয়াসের কাল্ট খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের বর্তমান ছিল এবং এই দেবী যুক্ত হয়েছিলেন সার্বভৌমত্ব, রাজপদ এবং মিশরের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে। প্রাচীন মেসোপটেমীয় ও সেমেটিক জাতিগুলির মধ্যেও সর্পপূজার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। ভারতে আর্য-আগমনের পূর্বে দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে সাপকে ঘিরে নানারকম ধারণা ও সংস্কার গড়ে উঠেছিল। পৌরাণিক হিন্দুশাস্ত্রেও ক্রমে তার প্রভাব এসে পৌঁছায়। মনসা কোথাও সর্পাভরণ-যুক্তা, কোথাও সর্পাধিষ্ঠাত্রী দেবী, আবার কোথাও নিজেই সর্পরূপিণী। বাংলায় খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের পূর্ববর্তী ভাস্কর্য-শিল্পকলায় মনসার চিহ্ন পাওয়া যায়। চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে বৃন্দাবন দাস পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে নবদ্বীপ অঞ্চলের বাঙালি সমাজে সাড়ম্বরে বিষহরির পূজার কথা উল্লেখ করেছেন।
মনসামঙ্গলের কাহিনীটি বাংলার আদিম লোকসমাজের সর্পপূজা-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বৈদিক আর্যদের সঙ্গে সাপের পরিচয় প্রথমাবধি ছিল না বলেই মনে হয়। যজুর্বেদের কাল থেকে তাঁদের মধ্যে সর্পজ্ঞান প্রথম বিকশিত হয়েছে। ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বৌদ্ধ দেবী জাঙ্গুলীতারাকে মনসার ভিত্তি রূপে গ্রহণ করেছেন। এই জাঙ্গুলীতারা প্রকৃতপক্ষে বিষবিদ্যা। তান্ত্রিক বৌদ্ধশাস্ত্রে আরও এক সর্পাধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম পাওয়া যায়। তিনি হলেন সর্প ও সর্পবিষের নিয়ন্ত্রী কুরুকুল্লা। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় সর্পদেবী "মন্চা আম্মা"। ক্ষিতিমোহন সেনের মতে, এই দেবীই পরে "মনসা মা"-তে পরিণত হয়েছেন। আবার ড. সুকুমার সেন প্রমুখ গবেষকেরা মনে করেন, বৈদিক ইলা, সরস্বতী, বাক, বেদোত্তর যুগের কমলাসনা, নাগলাঞ্ছিতা দেবী এবং লৌকিক বাস্তুদেবতা ইত্যাদি নানা বৈদিক-পৌরাণিক দেবীর ভাবনা ও রূপকল্পনা বিভিন্ন সময়ে মিলেমিশে গিয়ে বর্তমানে পরিচিত মনসার রূপটি দান করেছে। মহাভারতে জরৎকারু ও আস্তিক মুনির গল্পটি পাওয়া যায়, তবে মনসার নাম বা কোনও সর্পাধিষ্ঠাত্রী দেবীর উল্লেখ সেই গ্রন্থে নেই। দশম-একাদশ শতকে রচিত দেবীভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের ন্যায় অর্বাচীন পুরাণগুলিতে মনসার বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও মনসামঙ্গলের প্রচলিত গল্পটি সে-সব পুরাণে পাওয়া যায় না, আবার সে-সব পুরাণে উল্লিখিত মনসার বিবরণের থেকে মনসামঙ্গলের বিবরণের কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও দৃষ্ট হয়। মনসামঙ্গলের গল্পসূত্র থেকে মনে করা যেতে পারে যে, মনসার পূজা প্রথমে অভিজাত হিন্দুসমাজ মেনে নেয়নি। জেলে ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যেই তিনি পূজা পেতেন (বর্তমান কালেও রাঢ় অঞ্চলে উচ্চবর্ণীয় সমাজের পরিবর্তে এইধরনের কৃষিজীবী সম্প্রদায়ে মনসাপূজার চল অধিক পরিদৃষ্ট হয়)। আবার মহিলাদের দ্বারা বন্দিতা হওয়ায় তাঁকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দেবী বলেও ধারণা করা যেতে পারে। আখ্যান-অনুসারে, এই দেবী বৃহত্তর হিন্দুসমাজে পূজা পেয়েছিলেন উচ্চবর্ণীয় চাঁদ সদাগরের বিরুদ্ধাচারণের মাধ্যমে আত্মপ্রতিষ্ঠার এক লড়াইয়ের ফলে।
তাই সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে, সর্পাধিষ্ঠাত্রী এই দেবীর উপাসনা পৃথিবীর আদিমতম ধর্মসংস্কারগুলির অন্যতম। তিনি একই সঙ্গে পশুপূজা, বৃক্ষপূজা, নদী-উপাসনা ও মাতৃকা-উপাসনার ধারাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছেন। পুরাণে তাঁকে কাশ্যপ ঋষির কন্যা ও শিবের শিষ্যা বলে উল্লেখ করলেও, লোকবিশ্বাসে ও মনসামঙ্গল কাব্যে তিনি শিবের দুহিতা। তাঁর জন্ম-সংক্রান্ত দুটি কাহিনীই প্রাগার্য উৎসের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে। বর্তমানে মনসাপূজার মন্ত্রাদি পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির দান হলেও কিছু কিছু প্রয়োজনীয় উপাচারের উপস্থিতি সেই প্রাগার্য ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মনসামঙ্গল গান এই মনসাপূজারই অঙ্গ। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নানা সময়ে আবির্ভূত কবিরা একই কাহিনী নিয়ে কাব্যরচনা করলেও সকলে সমান প্রতিভাসম্পন্ন কবি ছিলেন না। তাঁদের রচনায় আখ্যান, চরিত্র, বক্তব্য ও উপস্থাপনায় বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। সকলের শিল্পচেতনা ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় স্বাদবৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাক-চৈতন্য যুগের মনসামঙ্গল কবিদের মধ্যে হরিদত্ত, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপলাই ও নারায়ণদেব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে একমাত্র বিপ্রদাস পিপলাই রাঢ়ের অধিবাসী, বাকি তিনজনই পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। এঁদের কাব্য সম্পর্কে আলোচনা করলে এই সময়পর্বের মনসামঙ্গল কাব্যধারার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
হরিদত্ত
[সম্পাদনা]পারিপার্শ্বিক বাহ্য প্রমাণসূত্র দৃষ্টে অনুমিত হয় যে, মনসামঙ্গল-কাহিনী প্রথম কাব্যরূপ লাভ করেছিল হরিদত্তের লেখনীতে। পূর্ববঙ্গের কবি বিজয়গুপ্ত পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে কাব্যরচনা করতে গিয়ে আক্রমণাত্মক সুরে হরিদত্তের সমালোচনা করে লিখেছিলেন:
মূর্খে রচিল গীত না জানে মাহাত্ম্য।
প্রথমে রচিল গীত কানা হরিদত্ত।।
হরিদত্তের যত গীত লুপ্ত হৈল কালে।
যোড়া গাঁথা নাহি কিছু ভাবে মোরে ছলে।।
কথার সঙ্গতি নাই নাহিক সুস্বর।
এক গাইতে আর গায় নাহি মিত্রাক্ষর।।
অবশ্য হরিদত্তের রচনা সম্বন্ধে একথা স্বীকার করে নেওয়ার মতো বলিষ্ঠ তথ্য গবেষকদের হাতে নেই। তাঁর কাব্য বর্তমানে লুপ্ত, এমনকি বিজয়গুপ্তের সাক্ষ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগেই তা লুপ্ত হয়েছিল। তাই বিজয়গুপ্ত যদি নিজে সেই কাব্য না পড়ে থাকেন, তাহলে এ-হেন সমালোচনা কতটা যুক্তিগ্রাহ্য তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে এমনও হতে পারে যে, বিজয়গুপ্ত নিজের কাব্যকে গৌরবান্বিত করতে গিয়েই এমন কটাক্ষ করেছিলেন। যাই হোক, বিজয়গুপ্ত একটি খাঁটি খবর দিয়েছেন যে, মনসার গীত প্রথম রচনা করেন হরিদত্ত। নারায়ণদেবের একটি পুথিতেও এই তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায়। পুরুষোত্তম নামে এক গায়েন আর-একটু সংবাদ দিয়ে বলেছেন, বৈষ্ণব কবি হরিদত্ত লাচাড়ী ছন্দে গীতরচনা করেছিলেন। পুরুষোত্তমের ভণিতাটি এইরকম:
কানা হরিদত্ত হরির কিঙ্কর
মনসা হউক সহায়।
তার অনুরুদ্ধ লাচাড়ীর ছন্দ
শ্রীপুরুষোত্তম গায়।।
হরিদত্ত পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন বলেই অনুমান করা হয়। ময়মনসিংহের কাছে দিগ্পাইৎ গ্রাম (অধুনা বাংলাদেশের জামালপুর জেলার অন্তর্গত) থেকে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার একটি প্রাচীন পুথি আবিষ্কার করেছিলেন। পুথিটিতে হরিদত্তের ভণিতাযুক্ত "পদ্মার সর্পসজ্জা" শীর্ষক একটি শিকলি পাওয়া যায়। সেই সূত্রেই গবেষকদের ধারণা হয় যে, কবি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ। তাঁর কালনির্ধারনের চেষ্টাও করা হয়েছে। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, তিনি দ্বাদশ শতকের শেষভাগে বর্তমান ছিলেন এবং সম্ভবত তুর্কি আক্রমণের পূর্বেই কাব্যরচনা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী গবেষকেরা অনেকগুলি কারণে এই মতটিকে স্বীকৃতি দেননি। প্রধানতম কারণটি হল প্রাপ্ত রচনাংশটির ভাষা। দক্ষিণারঞ্জন পুথির যে অংশটি নকল করে দীনেশচন্দ্রকে পাঠান, তার মুদ্রিত রূপ দেখে গবেষক মহলেই সংশয় জাগে। কারণ, সেই ভাষায় আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট। আবার বিজয়গুপ্ত যে হরিদত্তকে "মূর্খ" ও ছন্দজ্ঞানহীন বলে গালি দিয়েছিলেন, তাও আদৌ সমর্থিত হয়নি এই রচনায়। মুদ্রিত কাব্যাংশের কিয়দংশ এইরকম:
দুই হাতের সঙ্খ হইল গরল সঙ্খিনী।
কেশের জাত কৈল এ কাল নাগিনী।।
সুতলিয়া নাগ কৈল গলার সুতলি।
দেবি বিচিত্র নাগে কৈল হৃদয়ে কাঁচুলী।।
সিন্দুরিয়া নাগে কৈল সিত্যের সিন্দুর।
কাজুলিয়া কৈল দেবীর কাজল প্রচুর।।
বিজয়গুপ্তের কাব্যরচনার কালে (১৪৮৪ খ্রিস্টাব্দ) যদি হরিদত্তের গীত সত্যিই লুপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে কবির আবির্ভাব চতুর্দশ শতকের প্রথমভাগে হওয়াই সম্ভব। কারণ, সেই যুগেই যে ব্রতকথার সংকীর্ণ গণ্ডী ছাড়িয়ে মঙ্গলকাব্যের রূপটি গড়ে উঠছিল, তার পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় চৌতিশা-জাতীয় রচনাগুলির সংযুক্তিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চৌতিশার সংস্কৃত অবয়বটি সর্বপ্রথম উপস্থাপিত হয় বৃহদ্ধর্মপুরাণে, যেটি আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের সংকলন বলে অনুমান করা হয়।
বিজয়গুপ্ত
[সম্পাদনা]বিজয়গুপ্ত হলেন পূর্ববঙ্গীয় মনসামঙ্গল কাব্যধারার অন্যতম জনপ্রিয় কবি। তাঁর কাব্য একদা বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে বেশ প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন গায়েনের মুখে মুখে তাঁর রচনা যুগে যুগে এতটাই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে যে, কবির স্বরচিত রূপটি তার থেকে উদ্ধার করা কঠিন। এই রচনায় আধুনিক শব্দ, নতুন পালা, আকর্ষণীয় কিছু বর্ণনা যে পরবর্তীকালের প্রক্ষিপ্তাংশ এবং তা যে কাব্যটির বিপুল জনপ্রিয়তার ফলশ্রুতি, সে-কথা বলাই বাহুল্য। ১৩০৩ বঙ্গাব্দে বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্যারীমোহন দাশগুপ্ত প্রথম বিজয়গুপ্তের পুথি সম্পাদনা করেন। সেই গ্রন্থ থেকে কবির সম্পর্কে অনেক কথা জানা যায়। গ্রন্থারম্ভে কবির দেওয়া আত্মপরিচয় থেকে জানা যায় যে, মুলুক ফতেহাবাদের অন্তর্গত ফুল্লশ্রী গ্রামে এক শিক্ষিত বৈদ্যবংশে কবির জন্ম। তাঁর পিতার নাম সনাতন, মাতার নাম রুক্মিণী। গ্রামের পশ্চিমে ঘাসর ও পূর্বে ঘণ্টেশ্বর নদী। গ্রামটি পরে গৈলা-ফুল্লশ্রী নামে পরিচিত হয়। বিজয়গুপ্তের কাব্যের নাম পদ্মাপুরাণ। এই কাব্যের রচনাকাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একাধিক পুথিতে হেঁয়ালির আকারে উল্লিখিত বিভিন্ন কালনির্ণায়ক উক্তি থেকে গবেষকেরা “ঋতু শশী বেদ শশী পরিমিত শক” অর্থাৎ ১৪৯৪ পাঠটিকে কিছু গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ বিজয়গুপ্তের কাব্যে সুলতান হুসেন শাহের নামোল্লেখ পাওয়া যায়। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন, সুতরাং তাঁর রচনাকালেই এই কাব্য রচিত হওয়া স্বাভাবিক।
বিজয়গুপ্ত তাঁর বিপুলায়তন কাব্যটিকে মোট আটাশটি পালায় বিভক্ত করেছেন। এই রচনাসূত্রে সমগ্র মনসামঙ্গল-আখ্যানের একটি সার্বিক ধারণা পাওয়া যায়: নারদের কৌশলে চণ্ডী রচিত নন্দনকাননে প্রবেশ করে শিব পুষ্পসৌরভে আমোদিত হয়ে মনে মনে কামার্ত হয়ে উঠলেন। সেই অবস্থায় তাঁর বীর্য স্খলিত হলে তা তিনি নিক্ষেপ করলেন পদ্মবনে। পদ্মের মৃণাল বেয়ে সেই বীর্য পাতালে পৌঁছালে জন্ম হল মনসার। একদা শিব তাঁকে লুকিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন। কিন্তু বাদ সাধলেন চণ্ডী। শিবের অনুপস্থিতিতে চণ্ডী প্রচণ্ড রোষে মনসার একটি চোখ কানা করে দিলেন। মনসাও তাঁকে দংশন করে অচৈতন্য করে ফেললেন। অবশেষে শিবের অনুরোধে মনসা বিষ শোধন করলে চণ্ডীর মূর্চ্ছাভঙ্গ হল। তারপর মনসা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে শিব তাঁকে পাত্রস্থ করলেন জরৎকারু মুনির হাতে সমর্পণ করে। মুনিও বিবাহের পরেই কোপনস্বভাবা মনসাকে ত্যাগ করে চলে গেলেন। এরপর মনসার আস্তিক-সহ অষ্টনাগ সন্তানের জন্ম হল। চণ্ডীর পরামর্শে শিব মনসাকে রেখে এলেন সান্তালী পর্বতে। নেতা হলেন তাঁর রক্ষয়িত্রী। এই নেতার পরামর্শে মনসা প্রথমে রাখালদের বিপদে ফেলে পূজা আদায় করলেন। পরে মনসাপূজক রাখালদের সঙ্গে হাসান-হোসেনের বিবাদ বাধলে দেবী হাসানের পুরীর সবাইকে হত্যা করলেন। সেখানেও তাঁর পূজা প্রচলিত হল। অতঃপর জালু-মালুকে অনুগ্রহ করলেন মনসা। তাদের সমৃদ্ধি ঘটল। এবার চাঁদ সদাগরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হলেন তিনি। শৈব চাঁদ মনসাপূজায় সম্মত হলেন না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে চাঁদের গুয়াবাড়ি ধ্বংস করলেন। বন্ধু শঙ্কর গারুড়ির সাহায্যে গুয়াবন বাঁচালে মনসা কৌশলে শঙ্করকে হত্যা করলেন। নটী বেশ ধারণ করে চাঁদের মহাজ্ঞানও হরণ করে নিলেন। চাঁদ চললেন বাণিজ্যে। কিন্তু মনসার চক্রান্তে তাঁর সপ্তডিঙা মধুকর সমুদ্রে ডুবে গেল, ছয় পুত্র নিহত হল, কোনও ক্রমে প্রাণে বাঁচলেন চাঁদ। অনেক দুর্গম পথ পেরিয়ে তিনি ফিরলেন ঘরে। ফিরে শুনলেন সপ্তম পুত্র লখীন্দরের জন্ম হয়েছে। কিছুকাল পরে এই পুত্রের সঙ্গে তিনি বিবাহ দিলেন সায়বেনের কন্যা বেহুলার। মনসা অনুচরী কালনাগিনীকে প্রেরণ করে বাসরঘরে দংশন করিয়ে লখীন্দরকে হত্যা করলেন। মৃত স্বামীর দেহ নিয়ে বেহুলা গাঙুড়ের জলে ভেসে চলল নানা প্রলোভন জয় করে। পরে নেতার সাহায্যে বেহুলা গিয়ে পৌঁছালো স্বর্গলোকে। সেখানে নৃত্যগীতের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট করে মনসার দ্বারা স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হল। শর্ত একটাই—শৈব চাঁদকে মনসার পূজা করতে হবে। স্বর্গলোক থেকে ফিরে বেহুলা সমস্ত বৃত্তান্ত জানিয়ে শ্বশুর চাঁদকে মনসাপূজা করতে অনুরোধ করল। আপ্লুত চাঁদ বাঁহাতে মনসার পূজা করতে সমর্থ হলেন। পূজার ফলে চাঁদের হৃতসম্পদ, মৃত সন্তানেরা প্রাণ ফিরে পেল। সেই থেকে মর্ত্যেও মনসার পূজা ও মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত হল।
যথেষ্ট কাব্যবোধ থাকলেও বিজয়গুপ্ত গভীর ভাবানুভূতির তুলনায় পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধ্যের উপর বেশি নির্ভর করেছিলেন। তাই তাঁর রচনা কিছুটা নীরস হয়ে গিয়েছে। সমগ্র আখ্যানটিকে তিনি একটি সূত্রে বাঁধতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রটি হল নিম্নবর্ণীয় রাখাল, জেলে-মালো, মুসলমান প্রভৃতি সম্প্রদায়ের পূজিতা মনসা কীভাবে উচ্চবর্ণীয় অভিজাত সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও পূজা আদায় করলেন, তার বিবরণ। গল্পে অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও যেভাবে মনসা সমগ্র কাহিনীতে চক্রান্তজাল বিস্তার করেছেন তার উপর প্রাক্-চৈতন্য যুগের পাঠান রাজসভার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রময় পরিস্থিতির ছায়াপাত ঘটেছে। মুসলমান কাজীরা হিন্দু প্রজাদের উপর যে-ধরনের অত্যাচার চালাত, তার আভাস পাওয়া যায় হাসান-হোসেনের পালায়। এছাড়া টুকরো টুকরো আখ্যানে খুঁজে পাওয়া যায় ধনীর বিলাসিতা, ভূস্বামীদের সংঘর্ষ, বাল্যবিবাহ প্রথা, গুপ্ত হত্যা, সমকালীন বিবাহরীতি ইত্যাদির প্রসঙ্গ। বিজয়গুপ্তের প্রধান কৃতিত্ব সম্ভবত এইটিই যে, ধর্মমূলক একটি আখ্যানকাব্যে তিনি সমাজসচেতন প্রখর বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিকে অস্বীকার করেননি। দেবখণ্ড ও নরখণ্ডের উপস্থাপনায় সেযুগের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, পোষাক-পরিচ্ছদ, আহার, রন্ধনপ্রণালী ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র তুলে ধরেছেন। কাব্যে বাস্তবধর্মিতার এতটা প্রভাব থাকায় বিজয়গুপ্তের কাব্য আধুনিক পাঠককে কবির বাস্তব-অভিজ্ঞতার সঙ্গেই বেশি মাত্রায় যুক্ত করে ফেলে। সম্ভবত, সমাকালীন সমাজের এই বাস্তব চিত্রাঙ্কনই তাঁর কাব্যের বিপুল জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
চরিত্রসৃষ্টিতেও বিজয়গুপ্তের নৈপুণ্য যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। দেব ও মানব দুই শ্রেণীর চরিত্র রচনাতেই তিনি সিদ্ধহস্ত, বরং স্বর্গের দেবতাকেও দোষে-গুণে ভরা মানুষের মতো প্রবৃত্তিতাড়িত রক্তমাংসের মর্ত্যমানবের অনুরূপ করে এঁকেছেন তিনি। সেই নিরিখে বিচার করলে বলতেই হয় যে, বিজয়গুপ্ত প্রকৃতপক্ষে মানবজীবনেরই কবি। তাঁর সৃজিত মনসা, শিব ও চণ্ডীর চরিত্র তিনটিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মনসা তাঁর কাব্যে গোত্রপরিচয়ে দেবী বটে, কিন্তু স্বভাবে রাক্ষসী বা দানবী-সদৃশা। বৈদিক বা পৌরাণিক সাহিত্যে কোনও দেবীকেই তাঁর মতো ক্রুর, প্রতিহিংসা-পরায়ণা, খল ও ষড়যন্ত্রকারিণী রূপে চিত্রিত করা হয়নি (এমনকি দেবীভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে মনসাও যোগিনীস্বভাবা ও কৃষ্ণভক্ত বলে প্রকীর্তিতা হয়েছেন)। অথচ বিজয়গুপ্ত ও পরবর্তী মনসামঙ্গল রচয়িতার কাব্যে দেখা যায়, কোনও রকম নীতিবোধ বা বিবেক-দংশন ব্যতিরেকেই মনসা পূজা আদায়ের বাসনায় ছলে-বলে-কৌশলে একের পর এক ষড়যন্ত্র রচনা করে চলেছেন। কবির দেখিয়েছেন যে, মনসার ভাগ্য-বিড়ম্বিত জীবনের নানা ঘটনার মধ্যেই নিহিত ছিল এই ক্রুরতার বীজ। আকস্মিক বীর্যপতনের ফলে অবাঞ্ছিত যাঁর জন্ম, শৈশবে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত, বৈবাহিক জীবনে স্বামী পরিত্যক্তা, দেবসমাজে ধিক্কৃতা এবং নির্জন পর্বতে নির্বাসিত তাঁর জীবনের ক্ষোভ, রোষ, দুঃখ, অভিমান, বেদনাই তাঁকে এক খলস্বভাবা নিষ্ঠুর দেবীতে পরিণত করেছে। মনসা এ-হেন জীবনেতিহাস তাঁর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনা ঘটিয়েছে এবং সেই সংগ্রামে তাঁকে প্ররোচিত করেছে কোনও বৈধ রণনীতি ব্যতিরেকেই অগ্রসর হওয়ার পথে। কবির দেখানো এই ক্রমবিবর্তনের মধ্যে যে অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে, সেটিই এই কাব্যের প্রধান আকর্ষণ। অন্যদিকে তাঁর শিব কামুক, লম্পট ও স্ত্রৈণ, তাঁর চণ্ডীও বাঙালি পরিবারে স্বার্থকুটিল গৃহকর্ত্রীতে পরিণত। দেবতার এমন মর্যাদাহানি শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যতই নিন্দিত হোক, এই মানবায়নে কবির বাস্তব-দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়ই যে সমধিক প্রকাশিত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে আবার কবি চাঁদ চরিত্রটিতে বীর্যবত্তার অভাব না রাখলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। সনকার পুত্রশোক অবশ্য কাব্যে যথেষ্ট করুণরসের জোগান দিয়েছে। তবে এই চরিত্রগুলির সঙ্গে অনেকাংশে উজ্জ্বল তাঁর বেহুলা চরিত্রটি। কবি তাঁকে এঁকেছেন আদর্শ সতী নারী হিসেবে, যে অবিচলিত চিত্তে সমস্ত আঘাত বরণ করে নিজের প্রেমকে করে তুলেছে মৃত্যুঞ্জয়ী।
সংস্কৃত সাহিত্যে সুপণ্ডিত বিজয়গুপ্তের কাব্যে বাগ্বৈদগ্ধ্য ও আলংকারিক কলাকৌশলের প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। তাঁর কয়েকটি বিশিষ্ট বাচনভঙ্গি প্রবাদপ্রতিম। যেমন, "যে মুখে কণ্টক বৈসে সেই মুখ খসে” কিঙ্গা “অতি কোপে করিলে কাজ ঠেকে আথান্তরে। অতি বড় গাঙ্ হইলে ঝাটে পড়ে চরে।।” রসসৃষ্টিতে বিজয়গুপ্ত স্বাদবৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। মনসামঙ্গলের মূল আখ্যানটি করুণরসাত্মক। কবির বর্ণনায় তার উচ্ছ্বাস দেখে গেলেও পাশাপাশি হাস্যরসের একটি প্রবাহও সমগ্র কাব্যশরীরে প্রবহমান। চণ্ডী ও শিবের কপট প্রণয়, ডোমনীর প্রতি শিবের কামাসক্তি, পদ্মার বিবাহ সম্পর্কে শিবদুর্গার রহস্যালাপ, গণকের ছদ্মবেশে নারদের ভূমিকা, ভাসান পালায় মর্মস্পর্শী কারুণ্যের মধ্যেও গোদার আকৃতি, উক্তি ও আচরণ ক্ষেত্রবিশেষে অকারণে হলেও যথেষ্ট হাস্যরসের আমদানি করেছে। কবু রঙ্গরস পরিবেশন করতে গিয়ে কোথাও কোথাও শালীনতার সীমাও অতিক্রম করে গিয়েছেন। যুগরুচির প্রভাবে বিজয়গুপ্তেরও আদিরসের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। তাঁর কাব্যে যদিও এই আদিরসাত্মক বর্ণনাগুলি স্থূল গ্রাম্যতায় পর্যবসিত। গবেষকেরা তাঁর আখ্যান-বিন্যাসেও সামঞ্জস্যের অভাব লক্ষ্য করেছেন। এর কারণ সম্ভবত জীবনের বাস্তব-অভিজ্ঞতা বহির্ভূত খণ্ড খণ্ড কাহিনির উপর তাঁর অধিক নির্ভরতা। এ বিষয়ে ড. ভূদেব চৌধুরী লিখেছেন, "বিজয়গুপ্তের আগাগোড়া কাব্যে সামগ্রিকতাবোধজনিত ভারসাম্যের অভাব রয়েছে বলে মনে করি। আসলে বিজয়গুপ্ত ছিলেন যুগসন্ধির কবি। বিভিন্ন এবং বিচিত্র উপাদানকে একই চরিত্রের মধেয় সংহতি দান করা বা বিভিন্ন চরিত্রকে ভাবৈক্যে নিবিষত সামগ্রিকতা দান করার মতো সংসক্ত জীবনবাণীর সঞ্চয় কবির ছিল না। তাই ঐক্য অপেক্ষা বৈচিত্র্যের প্রতি, সংহত অখণ্ডতার চেয়ে বিচ্ছিন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণতা সৃষ্টির প্রতি তাঁর প্রবণতা ছিল সমধিক। এই জন্যেই দেখি, বিজয়গুপ্তের কাব্যের বিভিন্ন পালা বিভাগের যেন অন্ত নেই—আর প্রতিটি পালাই এক-একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাহিনী।" তবে ছন্দের ক্ষেত্রে বিজয়গুপ্তের কাব্য প্রশংসার দাবি রাখে। দলবৃত্তের চারমাত্রার চাল বজায় রেখে পয়ারের দ্রুত লয়ের কিছু পঙ্ক্তি রচনা করে কবি ছন্দবৈচিত্র্যের আভাস দিয়েছিলেন। যেমন--"প্রেতের সনে/শ্মশানে থাকে/মাথায় ধরে/ নারী। সবাই বলে/ পাগল পাগল/ কত সৈতে/ পারি।।" দেশী শব্দের প্রয়োগেও কবির কুশলতা প্রশ্নাতীত। মনে রাখতে হবে, বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ মঙ্গলকাব্য সাহিত্যের প্রথম সনতারিখযুক্ত রচনা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, তিনি মনসামঙ্গলের যে চেহারা ও চরিত্র বেঁধে দিয়েছিলেন অল্পবিস্তর রূপান্তর সহ সেটাই পরবর্তী চারশো বছর ধরে অনুসৃত হয়ে এসেছে।
বিপ্রদাস পিপলাই
[সম্পাদনা]বিপ্রদাস পিপলাইয়ের কাব্যে সুস্পষ্ট সনতারিখের উল্লেখ পাওয়া যায় বলে বিজয়গুপ্তের ঠিক পরেই মনসামঙ্গল কাব্যধারায় উল্লিখিত হয় এই ব্রাহ্মণ-কবির নাম। বিপ্রদাস তাঁর কাব্যের নামকরণ করেছেন মনসাবিজয়। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “বিপ্রদাসের কাব্য জনপ্রিয়তা লাভ করিতে না পারিলেও নির্ভেজাল সন-তারিখ রক্ষা করিয়াছে বলিয়া উল্লেখযোগ্য।” ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ড. সুকুমার সেন তাঁর কাব্যটি সম্পাদনা করে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশ করেন। ড. সেন বিপ্রদাসকেই “মনসা-পাঞ্চালীর সবচেয়ে পুরানো কবি” বললেও তাঁর কাব্যে স্থাননামে ও ভাষায় আধুনিকতা দৃষ্টে অনেক গবেষকই এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি।
মনসাবিজয় কাব্যে গ্রন্থরচনার কাল নির্দেশ করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
সিন্ধু ইন্দু বেদ মহী শক পরিমাণ।
নৃপতি হোসেন সাহা গৌড়ের সুলতান।।
হেনকালে রচিল পদ্মার ব্রতগীত।
শুনিয়া বিবিধ লোক পরম পীরিত।।
অর্থাৎ, ১৪১৪ বা ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বাস্তবেই সেই সময় ছিলেন বাংলার সুলতান। এই কাব্যের যে-চারটি পুথি পাওয়া গিয়েছে তার সব কটিতেই এই একই সনতারিখ পাওয়া যায়। এ-প্রসঙ্গে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, “সুতরাং এই সনে অবিশ্বাস করা যায় না। তবে যে আদর্শ পুঁথি (যাহার সন্ধান পাওয়া যায় নাই) অবলম্বনে এই চারখানি পুঁথি নকল করা হইয়াছিল, তাহাতে যদি কালজ্ঞাপক চারিছত্র প্রক্ষিপ্ত হইয়া থাকে, তাহা হইলে কবির প্রাচীনত্বের গৌরব ধূলিসাৎ হইয়া যাইবে।” উল্লেখ্য, এই চারটি পুথিরই অনুলিপি নিতান্ত আধুনিক কালে করা হয়েছে এবং একটিতে আবার পাঁচ জনের হস্তাক্ষরও পাওয়া গিয়েছে।
যাই হোক, কবি যে আত্মপরিচয় দিয়েছেন তা থেকে জানা যায় যে, তিনি ছিলেন সামবেদীয় পিপ্পলাদ শাখার বাৎস্যগোত্রীয় ব্রাহ্মণ। তাঁর পিতার নাম মুকুন্দ পণ্ডিত। তাঁদের বাস ছিল অধুনা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার অন্তর্গত নাদুড়্যা বটগ্রামে। কাব্যে ব্যবহৃত বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ দৃষ্টেও উক্ত স্থানটিকে কবির জন্মস্থান বলে শনাক্ত করা সম্ভব।
বিপ্রদাসের আখ্যান বিজয়গুপ্তের তুলনায় বেশ স্বতন্ত্র, বিশেষ করে এই কাব্যের সূচনাংশ। প্রথমেই রয়েছে শিব ও গঙ্গার বিবাহ-প্রসঙ্গ। দৈত্যবধে আনন্দিত দেবতাদের দৈত্যসূয় যজ্ঞে রন্ধনের জন্য শান্তনু ঋষির পত্নী গঙ্গার ডাক পড়ে। শর্ত থাকে যজ্ঞশালায় গঙ্গা রাত্রিবাস করতে পারবেন না। শিব সেই শর্তেই গঙ্গাকে নিয়ে আসেন। কিন্তু কাজকর্মের চাপে শর্ত রক্ষা করা সম্ভব হয় না। শান্তনুও গঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন না। অগত্যা শিবকেই বিবাহ করতে হল গঙ্গাকে। শিবের পিতা ধর্ম। সেই ধর্মের দেখা পাওয়ার জন্য শিব বল্লুকা নদীর তীরে বারো বছর তপস্যা করে পিতার দেখা পেলেন। ধর্ম আদেশ করলেন, শিব যেন পদ্মফুল তুলতে কালীদহে যান। চণ্ডী শিবের সঙ্গে কালীদহে যেতে চাইলে শিব নানা কৌশলে তাঁকে নিরস্ত করেন। ফুল তোলার সময় কামার্ত হয়ে শিবের বীর্যপাত ঘটে যায়। একটি কাক তা উদরস্থ করতে গিয়ে অপারগ হয়ে উগরে দেয়। সেই বীর্য জলে পড়ে পাতাল ভেদ করে পৌঁছায় বাসুকী নাগের জননী নির্মাণির মাথায়। তিনি ওই ক্ষীরের মতো দ্রব্যটি দিয়ে একটু পুতুল গড়ে তাতে জীবন্যাস করে বাসুকীর কাছে দিলে মনসা নাগেদের বিষভাণ্ডারের অধিকারিণী হয়ে ওঠেন। এরপর বাসুকী তাঁকে রেখে আসেন কালীদহে। এখানেই পিতা শিবের সঙ্গে দেখা হল মনসার। শিবকে দেখে মনসা জিদ ধরলেন পিত্রালয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু শিব প্রথমে চণ্ডীর ভয়ে রাজি হলেন না, পরে ফুলের সাজির মধ্যে লুকিয়ে তাঁকে আনলেন বাড়িতে। ফল যা ঘটবার তাই ঘটল। চণ্ডীর সঙ্গে মনসার বিবাদ শুরু হল। এরপর কবি তাঁর কল্পিত এই শাখাকাহিনীটি জুড়ে দিয়েছেন মূল আখ্যানের সঙ্গে। মূল আখ্যানের মধ্যে মধ্যে আরও কিছু নতুন প্রসঙ্গ এসেছে, তবে সেগুলি এতটা অভিনব নয়। সুকুমার সেন তা&র বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সম্পূর্ণ আখ্যানটি উল্লেখ করে লিখেছেন, “মনসার কাহিনী সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিপ্রদাসের কাব্যেই মিলে। অন্য মনসামঙ্গল কাব্যে হয় কোন কোন আখ্যান মোটেই নাই, নয় কোন কোন আখ্যান অপেক্ষাকৃত অল্পতর অথবা বৃহত্তর আয়তন লইয়াছে। বিপ্রদাস ছাড়া সব কবি—যাঁহাদের রচনা পুরা মিলিয়াছে—বেহুলা-লখিন্দরের আখ্যানেই পূর্ণ মনোযোগ দিয়াছেন। তাই তাঁহাদের রচনায় পূর্ণ আখ্যানগুলি অনাদৃত এবং সেগুলির যোগসূত্র অতীব ক্ষীণ।” গল্পে সংগতিবিধানের দিক থেকে বিপ্রদাস যে বিজয়গুপ্তের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন, সে-কথা ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বীকার করেছেন। বর্ণনায় কবি উৎকট আতিশায্যকে বর্জন করেছেন, ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। হাসান-হোসেন পালাটি বিজয়গুপ্তের তুলনায় দীর্ঘতর ও সুপরিকল্পিত। মুকুন্দ চক্রবর্তীর আগে মুসলমান সমাজের চিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কেবল এই কাব্যেই লভ্য। বিপ্রদাস পণ্ডিত কবি হলেও কোথাও পাণ্ডিত্য প্রকাশ করতে গিয়ে কাব্যকে অযথা গুরুভারবিশিষ্ট করে তোলেননি।
তবে চরিত্রসৃষ্টিতে বিপ্রদাস দক্ষতার পরিচয় অল্পই দিয়েছেন। দেবতাকে নিয়ে মানুষ গড়ার চেষ্টা করেননি। তাঁরা আগাগোড়া স্বাভাবিক সুসঙ্গত। মনসার চরিত্রে কঠোরতা ও নির্মমতা থাকলেও স্থানবিশেষে করুণা ও স্নেহমমতার সঞ্চার ঘটিয়েছেন। তবে কবি সমালোচিত হবেন চাঁদ চরিত্রটির জন্য। চাঁদের পৌরুষ সেভাবে দীপ্তিমান নয়। চাঁদের পৌরুষ সেভাবে দীপ্তিমান নয়, বরং কাহিনীর শেষে চাঁদকে অনুতপ্ত করে যেভাবে মাথা নত করিয়ে দেন, তাতে চাঁদ চরিত্রটির সামঞ্জস্য বিঘ্নিত হয়। এমনকি চাঁদ মনসার কাছে শাস্তিপ্রার্থনা করে বলেন, "মস্তক উপরে করো চরণ প্রহার। দোষ নিন্দা এবে শাস্তি হউক আমার।।" বিপ্রদাসের মনসা ছলনা করে বেহুলাকে বাসরঘরে বিধবা হওয়ার অভিশাপ দেয়। বেহুলা ও সনকার চরিত্র অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল। ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টিতে কবির নৈপুণ্য সত্যই প্রশংসাযোগ্য। রসসৃষ্টির ক্ষেত্রে করুণ ও হাস্য দু-প্রকার রসে কবি অনায়াস দক্ষতা দেখিয়েছেন। লখীন্দরের মৃত্যু হলে সনকার শোক কবির কলমে এইরকম:
হায় রে প্রাণের পুত্র দেও সম্বোধন।
পড়িল ধরণীতলে হরিয়া চেতনা।।
উঠ উঠ লখিন্দর সোনার পুতলি।
পূর্ণিমার চন্দ্র পূনি কারে দিনু ডালি।।
বিপ্রদাসের কাব্যের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটি উঠেছে এটির আধুনিকতাকে নিয়ে। ড. সেনের প্রাচীনত্বের দাবি সেইসব কারণে নস্যাৎ হয়ে যায়। কবি চাঁদের বাণিজ্যযাত্রার প্রসঙ্গে যেসব স্থাননামের উল্লেখ করেছেন, তার বেশ কিছু ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের সৃষ্টি। যেমন, ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে রচিত কাব্যে “নিমাইতীর্থ শ্রীপাট” বলে উল্লিখিত খড়দহ। বাকি কয়েকটি স্থাননামেও সংশয়ের বাইরে নয়। যেমন, ভাটপাড়া, কাঁকিনাড়া, ইছাপুর, রিষড়া, কোন্নগর, আড়িয়াদহ, চিৎপুর, কলকাতা। আবার কাব্যের ভাষাতেও কেউ কেউ আধুনিকতার ছাপ দেখেছেন। যেমন:
তপত কাঞ্চন জিনি দেহের বরণ।
পট্টবস্ত্র পরিধান সূর্যের কিরণ।।
চরণে নূপুরধ্বনি বাজে রুণুঝুণু।
নানা রত্নে মণিময় দীপ্ত করে তনু।।
এই ভাষা পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগের হওয়া সম্ভব নয়। কবির কাব্য বিশেষ জনপ্রিয় হয়নি, প্রাপ্ত পুথির স্বল্পতাই তার প্রমাণ। সুতরাং ব্যাপক হারে প্রক্ষিপ্তাংশও এটিতে থাকবে, সে সম্ভাবনাও খারিজ হয়ে যায়। সমস্ত দিক বিবেচনা করে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বিপ্রদাসের মনসাবিজয় কাব্যটিকে ষোড়শ শতকের রচনা বলে গণ্য করেছেন।
নারায়ণদেব
[সম্পাদনা]পূর্ববঙ্গীয় মনসামঙ্গল কাব্যধারায় নারায়ণদেবের সঠিক সময়কাল সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও অধিকাংশ সাহিত্য-ইতিহাসবিদ তাঁকে প্রাক্-চৈতন্য যুগের কবি হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। কবির পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষদের যে বংশলতিকা পাওয়া যায়, তার সূত্রে নারায়ণদেবকে ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধের কবি বলে নির্দেশ করাই সঙ্গত। তাঁর কাব্যের নাম পদ্মাপুরাণ। এই কাব্যের অনেকগুলি পুথি আবিষ্কৃত হয়েছে। অধিকাংশ পুথিতেই কবির যে সংক্ষিপ্ত আত্মপরিচয় পাওয়া গিয়েছে, সেই অনুসারে বলা যায়: কবির পিতামহ উদ্ধারণদেব রাঢ়দেশ ত্যাগ করে অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার বোরগ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কবির পিতার নাম নরসিংহ, মাতার নাম রুক্মিণী এবং মাতামহের নাম প্রভাকর। কবিরা জাতিতে কায়স্থ এবং গোত্রে মৌদ্গল্য। নারায়ণদেবের পদ্মাপুরাণ শ্রীহট্টেও বেশ প্রচলিত ছিল। তাই শ্রীহট্টের অধিবাসীরা কবির জন্মস্থান শ্রীহট্ট বলে দাবি করে থাকেন। আসলে বোরগ্রামের অবস্থান একদা শ্রীহট্টের অন্তর্গতই ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নারায়ণদেবের কাব্য একসময়ে বাংলার সীমা অতিক্রম করে অসমে অসমীয়াদের মধ্যেও পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। সেখানকার সাহিত্য-ইতিহাসবিদরাও নারায়ণদেবকে অসমীয়া কবি বলে দাবি করেন। নারায়ণদেবের কাব্যের বাংলা ও অসমীয়া সংস্করণ পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, একটি অন্যটির ভাষান্তরিত রূপমাত্র। পূর্ববঙ্গ ও অসমে নারায়ণদেব পরিচিত ‘সুকবিবল্লভ’ নামে।
হিন্দুশাস্ত্র ও সংস্কৃত সাহিত্যে নারায়ণ দেবের যে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি ছিল তা তাঁর কাব্য পাঠ করলেই বোঝা যায়। তাঁর মনসামঙ্গলে লৌকিক উপাদানের চেয়ে পৌরাণিক উপকরণই বেশি। কবি কালিকাপুরাণ, শিবপুরাণ, মহাভারত, কুমারসম্ভবম্ ইত্যাদির দ্বারা কল্পনার ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কোথাও কোথাও কালিদাসের বর্ণনাভঙ্গিও অনুসরণে প্রয়াসী হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। তুর্কি-আক্রমণোত্তর বাংলার মুখ্য অভিপ্রায় লৌকিক ও পৌরাণিক সংস্কৃতির সমন্বয়ের প্রয়াস নারায়ণদেবের কাব্যে সার্থকভাবে ধরা পড়েছে। কবির কাব্যে বৈষ্ণব প্রভাবও কম নয়, যার নিদর্শন ধুয়াতে বৈষ্ণব পদের ব্যবহার।
নারায়ণদেবের কাব্য তিন খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে কোনও আখ্যান নেই—কেবল আত্মপরিচয় ও দেববন্দনা। দ্বিতীয় খণ্ডে আখ্যান থাকলেও চাঁদ বণিকের গল্প নেই, রয়েছে বিভিন্ন পুরাণ ও মহাকাব্য থেকে সংগৃহীত নানা পৌরাণিক আখ্যান। তৃতীয় খণ্ডে স্থান পেয়েছে চাঁদ-মনসা-বেহুলা-লখিন্দরের পরিচিত গল্পটি। কবির কাব্য অন্যান্য মনসামঙ্গল কাব্যের তুলনায় বড়ো হলেও দেবখণ্ডের তুলনায় নরখণ্ড সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত। অতিরিক্ত পুরাণনির্ভরতার ফলে কবি মানবচরিত্রগুলির প্রতি যত্নবান হতে পারেননি। তবুও চাঁদ ও বেহুলার চরিত্রায়ণ যথেষ্ট কৃতিত্বের দাবি রাখে। মনসামঙ্গলের অন্যান্য কবিরা চাঁদ চরিত্রে অনমনীয় পৌরুষ ও দেবীর কাছে আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারেননি। সেদিক থেকে নারায়ণদেব খুব সতর্ক ও সম্পন্ন শিল্পচেতনার পরিচয় রেখেছেন। চাঁদ মনসার পূজা করে বটে, কিন্তু দেবীকে জানিয়ে দেয়, "পিচ দিয়া বাম হাতে তোমারে পূজিব।" সাড়ম্বরে পূজার পরিবর্তে বাঁহাতে পিছন ফিরে ফুল দেওয়া চাঁদের মনোভাবের সঙ্গে পূর্বাপর সঙ্গতিপূর্ণ। এখানে চাঁদের মুখে কোনও অনুতাপবাক্য বসাননি কবি। বেহুলার ক্ষেত্রে কবি দেখিয়েছেন যে, সে স্বামীর জীবন ফিরিয়ে আনার পর জননী সুমিত্রার কাছে মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়ে তাঁর চোখের বাইরে চলে গিয়েছে। একটি পত্রে সে আত্মপরিচয় লিখে রেখে স্বামীর সঙ্গে স্বর্গারোহণ করেছে। ড. আশুতোষ ভটতাচার্য এই বিষয়টিকে রূপক হিসেবে দেখার পক্ষপাতী। তিনি লিখেছেন, "যেদিন বেহুলা প্রথম গাঙ্গুরের ভাসানে মৃতের সহযাত্রিনী হইয়াছে, সেইদিন হইতেই সে চিরতরে জীবিতের সমাজের বাইরে চলিয়া গিয়াছে। সেইদিন তাহার সহমরণ হইয়াছে। অতএব তাহার প্রত্যাবর্তন একতা রূপকের মতো। কবি নারায়ণ দেব ইহাই কল্পনা করিয়া প্রত্যাগত বেহুলাকে মুহূর্তের জন্য মাত্র সমাজের কল্পনা চক্ষুর সম্মুখীন করিয়া পুনরায় স্বর্গলোকে নিরুদ্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন।" কবির কাব্যে পাণ্ডিত্যের সঙ্গে মিশেছে সরলতা ও স্বাভাবিকতা। চরিত্রে অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুটনে তিনি ঘটনাবর্ণনার মাঝে মাঝে বিশেষ মুহূর্ত সৃষ্টি করেছেন। করুণরসের উপস্থাপনায় নারায়ণদেব বিশেষ প্রশংসার অধিকারী। মনসা ও বেহুলার অন্তর্ভেদী হাহাকার তাঁর কাব্যে উচ্চ স্বরগ্রামে গিয়ে পৌঁছেছে। তাঁর বেহুলা ব্রীড়াশীলা নারী হয়েও নির্মম দৈবশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামশীলা। মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় তার মর্মস্পর্শী বিলাপ করুণরসে পাঠকের মনকে আর্দ্র করে দেয়। স্বামীর মৃতদেহকে সম্বোধন করে সে বলে:
জাগ প্রভু কালিন্দী নিশাচরে।
ঘুচাও কপট নিদ্রা ভাসি সাগরে।।
তুমি ত আমার প্রভু আমি যে তোমার।
মড়া প্রভু নহ রে তুমি গলার হার।।
ড. ভট্টাচার্যের মতে, "করুণরসের স্বাভাবিক বর্ণনায় নারায়ণদেবের সমকক্ষ বড় কেহ নাই।" কিন্তু কবি করুণরসের সমান দক্ষতায় হাস্যরসও সৃষ্টি করেছেন। রঙ্গব্যঙ্গমূলক বক্রোক্তি রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত। ডোমনী-বেশিনী চণ্ডীর সঙ্গে শিবের রঙ্গ-পরিহাস তো সব কবিরই এক প্রিয় কাব্যপ্রসঙ্গ। নারায়ণদেবের লেখনীও সেখানে হাসির ছটায় ঝিকমিক করে উঠেছে:
ডুমুনি বলে দাড়ি পাকাইলা কি কারণ।
নারীর উপরে এখন হে দেহ মন।।
বানরের মুখে যেন ঝুনা নারিকেল।
কাকের মুখেতে যেন দিব্য পাকা বেল।।
বৃদ্ধ হইলে পাইকের ভাবকী মাত্র সার।
তোমার মুখে চাহ আমাকে বশ করিবার।।
কোনও কোনও সমালোচক কবিকে অভিযুক্ত করেছেন স্থূল আদিরসের উচ্ছ্বাস প্রদর্শনের জন্য। বিবাহবাসরে সমাগতা নারীগণের পতিনিন্দা মঙ্গলকাব্যের এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। এখানেও কবি বেহুলার বিবাহে উপস্থিত বৃদ্ধাদের নির্লজ্জ কামাসক্তি প্রকাশের হাস্যকর বর্ণনা দিয়েছে। এছাড়া কাব্যের অনেক স্থলেও কামাবেশের উপস্থাপনা আছে। নাবালক লখিন্দরের মধ্যেও আদিরসের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। এজন্য কেউ কেউ নারায়ণদেবের রুচির প্রশ্ন তুলেছেন। সম্ভবত সংস্কৃত সাহিত্যের প্রভাবেই কবি আদিরসের উতরোল বর্ণনায় অগ্রসর হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে হার মানতে হয়েছিল যুগরুচির কাছে।
কোনও কোনও সাহিত্য-সমালোচক নারায়ণদেবকেই মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবির শিরোপা দিতে চান। তাঁদের যুক্তি, নারায়ণদেবের কাব্যে আখ্যান, চরিত্র, রস-সৃষ্টি, পাণ্ডিত্য ইত্যাদি বিষয় সুচারুভাবে মিলে মিশে গিয়েছে। সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর কাব্যের অনুলিপি এত বেশি। কিন্তু ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, "নারায়ণদেবের পদ্মাপুরাণে বাস্তবিক মহাকাব্যের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু যুগধর্মের জন্য তা ততটা সার্থকতা লাভ করতে পারেনি।" পরবর্তীকালে যাঁরা মনসামঙ্গল লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নারায়ণদেব কর্তৃক প্রভাবিত হন। দ্বিজ বংশীদাস তাঁদের মধ্যে অন্যতম।