বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের কৃষ্ণকথা ও বৈষ্ণব পদাবলি

উইকিবই থেকে

পৌরাণিক সংস্কৃতির অন্যতম বিশিষ্ট একটি ধারা হল কৃষ্ণকথার ধারা। বৈদিক সাহিত্যেই এই কৃষ্ণকথার বীজ নিহিত ছিল। ক্রমে পুরাণগুলির মধ্যে দিয়ে ক্রমবিকাশের নানা পর্যায় পার হয়ে বিষ্ণু, নারায়ণ, হরি, বাসুদেব ইত্যাদি পৌরাণিক চরিত্র একক পুরুষে একীভূত হয়ে যায়। তখন তিনি হন অংশী, অন্যরা অংশ। আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৮০০ থেকে ১০০০ অব্দের মধ্যবর্তীকালে রচিত ভাগবত পুরাণে সেই অংশী ‘স্বয়ং ভগবান’ কৃষ্ণ নামে কথিত হলেন। এই পুরাণে ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হল কৃষ্ণের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমস্ত কাহিনি। বস্তুত ভাগবতধর্মের বিকাশ ঘটল এই গ্রন্থ রচনার পরে। এরপর একাদশ শতকে দক্ষিণ ভারত থেকে ভক্তি আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ল উত্তর ভারতেও। সেই সূত্রে বাংলাতেও এসে উপস্থিত হল কৃষ্ণভক্তিবাদ। সেন আমলে বাংলায় যে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা ও প্রসার ঘটেছিল, তার অন্যতম অবলম্বন ছিল কৃষ্ণকথা। জয়দেব তাঁর গীতগোবিন্দম্‌ কাব্যে কৃষ্ণকে একই সঙ্গে করে তুললেন পরমারাধ্য বিষ্ণুর অবতার এবং কামকেলিকলার নায়ক।

ঠিক এই সময়েই বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটল, যার সুদূরপ্রসারী ফলে বাঙালি সমাজ, বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি এবং বাঙালি হিন্দুর দৈনিক জীবনে এল এক আমূল পরিবর্তন। ঘটনাটি ইতিহাসে তুর্কি আক্রমণ নামে খ্যাত। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে স্বল্পসংখ্যক যোদ্ধা নিতে তুর্কি সেনানায়ক ইখ্‌তিয়ার-উদ্দিন মহম্মদ বিন বখ্‌তিয়ার খিলজি আক্রমণ করলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজ্য। বৃদ্ধ রাজা পালিয়ে গেলেন পূর্ববঙ্গে। বিদেশি শাসনে সাধারণ হিন্দুরা সমূহ বিপদের সম্মুখীন হল। এই সংকটকালে কোনও সাহিত্য রচিত হয়েছিল কিনা সেই বিষয়ে সঠিক তথ্য আজও পাওয়া যায় না। অনুমান করা হয়, তুর্কি আক্রমণের প্রাথমিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার পর সমাজজীবন সুস্থির হলে বাঙালির সাহিত্যচর্চার অবকাশ তৈরি হয়। এই দু-আড়াইশো বছর সময়টিকে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রস্তুতি পর্ব বলা যায়। এই সময়েই বিদেশি শাসকের ধর্মীয় ও সামাজিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলা সাহিত্যকে অবলম্বন করে বাঙালি হিন্দু এক সাংস্কৃতিক বর্ম গড়ে তোলে।

আসলে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুসমাজের অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য শ্রেণির মানুষেরা উচ্চবর্ণের নিপীড়ন সহ্য করার পর ইসলামের সাম্যবাদী নীতিতে আকৃষ্ট হতে শুরু করেছিল। সেই সঙ্গে শাসকবর্গের প্রলোভন ও দমনপীড়নের নীতি তো ছিলই। ফলে দলে দলে লোক ধর্মান্তরিত হচ্ছিল ভয়ে, লোভে, পীড়নে ও পিরদের কেরামতিতে আকৃষ্ট হয়ে। এতে হিন্দু সমাজপতিদের টনক নড়ে। নিজেদের ধর্মাদর্শকে দেশীয় ভাষায় সকলের কাছে প্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তারা। সমাজের ভাঙন প্রতিরোধে শাস্ত্রকথা শুনিয়ে লোক-নিস্তারণের দায়িত্ব নেন অনুবাদক কবিরা। অন্যদিকে মঙ্গলকাব্যের আখ্যানে উঠে আসে অবনমিত সম্প্রদায়ের উপরে ওঠার ইতিহাস। চণ্ডী, মনসা, ধর্মঠাকুর প্রমুখ লোকদেবতা আর অপাংক্তেয় হয়ে থাকেন না, বরং মন্ত্র ও পূজা ইত্যাদি প্রাপ্তির মাধ্যমে তাঁরাও স্বীকৃত হন উচ্চসমাজে। প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে বাংলায় প্রচারিত কৃষ্ণকথা ও বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য এই প্রেক্ষাপটেই বিবেচ্য।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে কৃষ্ণের নৈষ্ঠিক পূজার্চনার রীতি চালু হয়। তৎকালীন অভিলিখন, ভাস্কর্য ও শাস্ত্রগ্রন্থে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অষ্টম শতকে শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবে বৈদান্তিক মতের প্রাধান্য ঘটে। সম্ভবত এরই প্রতিক্রিয়ায় একাদশ শতকে দক্ষিণ ভারতের বৈষ্ণব ভক্তিবাদী আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ে উত্তর ভারতে। আরও তিন শতক পরে চতুর্দশ শতকের শেষভাগে মাধবেন্দ্র পুরী সারা ভারতে কৃষ্ণভক্তিবাদ প্রচার করেন। শোনা যায় বাংলায় তিনি কৃষ্ণভক্তির সূচনা করেছিলেন অদ্বৈত আচার্য ও ঈশ্বর পুরী নামে দুই শিষ্যের মাধ্যমে। ঈশ্বর পুরীই দশাক্ষর গোপালমন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন নবদ্বীপের বিখ্যাত স্মার্ত নিমাই পণ্ডিতকে—যিনি সন্ন্যাসগ্রহণের পর শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য বা চৈতন্য মহাপ্রভু নামে পরিচিত হন। বস্তুত ভক্তিবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা চৈতন্যের প্রভাবে বাংলায় কৃষ্ণকথা ও বৈষ্ণব পদাবলি এক নতুন মাত্রা লাভ করে। তাঁর রাগানুগা ভক্তি প্রচলিত কৃষ্ণার্চনার ধারায় এক অভিনব সংযোজন। প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের তুলনায় তাই চৈতন্য-পরবর্তী যুগের কৃষ্ণকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার ধারা অনেকটাই আলাদা। প্রথম পর্বে যেখানে বৈধী ভক্তির প্রাধান্য দেখা যায়, চৈতন্য-পরবর্তী পর্বে বৈষ্ণব সাধনায় দেখা যায় রাগানুগা প্রেমাভক্তির প্রাধান্য। পূর্ববর্তী বৈষ্ণব পদাবলিতে গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনতত্ত্বের স্পর্শ অথবা উজ্জ্বলনীলমণি গ্রন্থের ন্যায় বৈষ্ণবীয় অলংকারশাস্ত্রের নিগূঢ় বন্ধন ছিল না; সেই পদ রচিত হয়েছিল কবিদের নিজস্ব প্রাকৃত ও আধ্যাত্মিক চেতনার সংমিশ্রণে, কোথাও আবার সংস্কৃত সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা প্রকরণের ছায়া অবলম্বনে। সাহিত্যের ইতিহাসবিদেরা বিভিন্ন প্রমাণের উপর নির্ভর করে জানিয়েছেন, প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে কৃষ্ণকথা ও বৈষ্ণব পদসাহিত্য দেশীয় ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন তিনজন শক্তিমান কবি। এঁরা হলেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কবি বড়ু চণ্ডীদাস এবং পদাবলির অন্যতম দুই বিশিষ্ট রূপকার বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস। অবশ্য ভাষা ও জাতিগত বিচারে বিদ্যাপতি বাঙালি ছিলেন না। তিনি পদ রচনা করেন ব্রজবুলি ভাষায়। প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের কৃষ্ণকথা ও পদাবলি সাহিত্য আলোচনায় এই তিন বিশিষ্ট কবির সাহিত্যসম্ভারের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা যেতে পারে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য

[সম্পাদনা]

আদি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের দাবি সর্বজনস্বীকৃত। এই কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস আর কোনও বিচ্ছিন্ন পদ রচনা করেছিলেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও তিনি যে বাংলা ভাষায় কৃষ্ণকেন্দ্রিক একটি বৃহদায়তন গাথাকাব্য রচনা করেছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কাব্যটি নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৬ বঙ্গাব্দে) প্রাচীন সাহিত্য-বিশারদ বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহরের নিকটবর্তী কাঁকিল্যা গ্রামে বৈষ্ণব ধর্মগুরু শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র্য-বংশীয় দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়ালঘরের মাচা থেকে অযত্নরক্ষিত এই পুথিটি উদ্ধার করেন। সাত বছর পরে ১৩২৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে পুথিটিকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন তিনি। প্রকাশের পর এই গ্রন্থের নানা বিষয় নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে।

কবি: বড়ু চণ্ডীদাস

[সম্পাদনা]

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। মধ্যযুগে চণ্ডীদাস নামধারী আরও কবি ছিলেন বলে গবেষকদের ধারণা। তবে বড়ু চণ্ডীদাস যে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। কাব্যের ভণিতা থেকে কিছু বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। কবি কোথাও নিজেকে ‘অনন্ত বড়ু’, কোথাও ‘অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস’, আবার কোথাও বা কেবল ‘চণ্ডীদাস’ ভণিতা ব্যবহার করেছেন। তার মধ্যে ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ ভণিতাই পাওয়া যায় সর্বাধিক সংখ্যায়—২৯৮ বার, এবং ‘চণ্ডীদাস’ ভণিতা আছে ১০৭ বার। এই পুথি আবিষ্কারের অনেক আগে থেকেই বাঙালি পাঠক ও বৈষ্ণব সমাজ চণ্ডীদাসের পদের সঙ্গে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকে বৈষ্ণব মহাজনদের রচিত পদগুলির সংকলনও প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ প্রাচ্যতত্ত্ববিদ এইচ. এইচ. উইলসন তাঁর স্কেচ অফ দ্য রিলিজিয়াস সেক্টস অফ হিন্দুজ গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন যে, গোবিন্দদাস ও বিদ্যাপতির যৌথ কর্তৃত্বে সংস্কৃত ভাষায় কৃষ্ণকীর্তন নামে একটি গ্রন্থ প্রণীত হয়েছিল। তথ্যটি বাঙালি লেখকদের কলমে বিকৃত হয়ে এই রূপ নেয় যে, চণ্ডীদাস কৃষ্ণকীর্তন নামে একটি পুথি রচনা করেছিলেন। তাই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুথি আবিষ্কারের পর স্বয়ং আবিষ্কর্তাও বিভ্রান্ত হয়ে কবিকে ‘মহাকবি চণ্ডীদাস’ বলেই উল্লেখ করেন। তাঁর ধারণা ছিল “দীর্ঘকাল যাবৎ চণ্ডীদাস বিরচিত কৃষ্ণকীর্তন”-এর যে অস্তিত্বের কথা তিনি শুনে আসছিলেন, প্রাপ্ত পুথিটি তারই বাস্তব দৃষ্টান্ত। ভণিতায় প্রাপ্ত ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ নামটি তিনি উপেক্ষা করে যান। সেই থেকেই চণ্ডীদাস সমস্যার প্রাথমিক সূত্রপাত। দীনেশচন্দ্র সেনও জানান, “কবি চণ্ডীদাস ও কৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা যে অভিন্ন ব্যক্তি, তৎসম্বন্ধে আমাদের সংশয় নেই।” যে চণ্ডীদাস যৌবনে তীব্র আদিরসাত্মক রচনায় সিদ্ধহস্ত, পরিণত বয়সে তিনিই আধ্যাত্মিক রসে বিহ্বল। মনীন্দ্রমোহন বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথিশালা থেকে দীন চণ্ডীদাসের পদ আবিষ্কার করলে সমস্যা আরও তীব্র হয়। কারণ পুরোনো পুথিপত্রে একক চণ্ডীদাসের উল্লেখই পাওয়া যায়। যেমন, কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত বা সনাতন গোস্বামীর বৈষ্ণবতোষিণী টীকা ইত্যাদিতে কোথাও বড়ু বা দীন চণ্ডীদাসের নামোল্লেখ নেই।

কিন্তু এত জটিলতা সত্ত্বেও কয়েকটি অকাট্য প্রমাণের বলে পদাবলির চণ্ডীদাস থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতাকে পৃথক করা সম্ভব হয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা-র ষষ্টিতম ভাগ, দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করে কোন কোন সূত্রে দুই চণ্ডীদাস স্বতন্ত্র তা দেখিয়েছেন। তাঁর সুচিন্তিত সমাধানগুলি হল:

  1. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কোথাও ‘দ্বিজ চণ্ডীদাস’ বা ‘দীন চণ্ডীদাস’ ভণিতা নেই।
  2. বড়ু চণ্ডীদাস রাধার পিতামাতার নাম সাগর ও পদুমা বলে উল্লেখ করেছেন।
  3. বড়ু চণ্ডীদাস রাধার শাশুড়ি বা ননদের নাম উল্লেখ করেননি। ‘বড়ায়ি’ ছাড়া কোনও সখীকেও সম্বোধন করেননি।
  4. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে চন্দ্রাবলী রাধারই নামান্তর, পৃথক প্রতিনায়িকা নন।
  5. বড়ু চণ্ডীদাস কৃষ্ণের কোনও সখার নাম উল্লেখ করেননি।
  6. বড়ু চণ্ডীদাস সর্বত্র প্রেম অর্থে ‘নেহ’ বা ‘নেহা’ ব্যবহার করেছেন।
  7. বড়ু চণ্ডীদাস কোথাও রাধার বিশেষণে ‘বিনোদিনী’ এবং কৃষ্ণ অর্থে ‘শ্যাম’ ব্যবহার করেননি।
  8. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধা গোয়ালিনী মাত্র, রাজকন্যা নন।
  9. বড়ু চণ্ডীদাস ব্রজবুলি জানতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

উপরিউক্ত তথ্যগুলি বড়ু চণ্ডীদাসের পৃথক অস্তিত্বের প্রমাণ। আসলে মধ্যযুগের অনেক কবির মতোই বড়ু চণ্ডীদাসও নিজের সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। কেবল তিনি যে ‘বাসলী’ নামে এক দেবীর সেবক ছিলেন, সেই কথাই উল্লিখিত হয়েছে ভণিতায়। এই কবিকে নিয়ে লোক-ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, ছড়িয়ে পড়েছে অনেক জনশ্রুতি। কবির জন্মস্থান বাঁকুড়ার ছাতনা না বীরভূমের নানুর তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ, দুই স্থানেই বাসলী দেবীর মন্দির আছে, চণ্ডীদাস ও রামী রজকিনীকে নিয়ে লোকপ্রবাদ প্রচলিত, বছরের নির্দিষ্ট দিনে মেলা ও উৎসব হয়। তবে বাঁকুড়ার দিকেই পাল্লা ভারী। কারণ নানুরের কবি চণ্ডীদাসের ভণিতায় মেলে ‘বাশুলী’ দেবীর নাম এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ আছে ‘বাসলী’ দেবীর উল্লেখ। এছাড়া গুরুতর প্রমাণ এই কাব্যের ভাষা। বাঁকুড়ার লোকভাষার আনুনাসিক ধ্বনির প্রাধান্য এবং এই অঞ্চলে প্রচলিত গড়া, চুক, মাকড়, ঝঁট, ভোক ইত্যাদি আঞ্চলিক শব্দ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যেও পাওয়া যায়। কোনও কোনও গবেষক বাঁকুড়ার উপভাষার রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ তার প্রাচীন প্রয়োগ দেখিয়েছেন। তাছাড়া এই পুথিটিও পাওয়া গিয়েছে বাঁকুড়া থেকেই। এছাড়া তালশিক্ষার যে পুথিতে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কয়েকটি পদের আধুনিক রূপান্তর পাওয়া যায়, সেটিও আবিষ্কৃত হয়েছে এই জেলাতেই।

বড়ু চণ্ডীদাস লোকরীতির কাব্য রচনা করলেও তিনি যে সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। যে অনায়াস দক্ষতায় ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, পদ্মপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এবং গীতগোবিন্দম্‌কুট্টিনীমতম্‌ ইত্যাদি গ্রন্থের তথ্য কাব্যে ব্যবহার করেছেন এবং দেড় শতাধিক সংস্কৃত শ্লোক রচনা করেছেন তাতে সংস্কৃত ভাষা-সাহিত্যে তাঁর প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি প্রমাণিত হয়। ‘বড়ু’ শব্দটি থেকে কেউ কেউ অনুমান করেন, কবি ব্রাহ্মণ ছিলেন। এটি ‘বটু’ শব্দ থেকেই আসতে পারে। বড়ু হলেন শ্রোত্রীয় শ্রেণির ব্রাহ্মণ। রজকিনী-ঘটিত জনশ্রুতিতে তিনি ব্রাহ্মণ বলেই কথিত। ছাতনার বাসলী আসলে খড়্গ-খর্পরধারিণী দক্ষিণাকালী। সেই সূত্রে কবিকে শাক্ত বলে গণ্য করাই সমীচীন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা দেখে ভাষাতাত্ত্বিকেরা একে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের রচনা বলে শনাক্ত করেছেন। সম্ভবত বড়ু চণ্ডীদাস পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধেই আবির্ভূত হন।

কাব্য পরিচয়

[সম্পাদনা]

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়মূলক আখ্যানধর্মী কাব্য। ধ্রুপদি প্রেমকাহিনির মধ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিশেষত্ব-মণ্ডিত। রামসীতা বা হরপার্বতীর ন্যায় এই প্রেম স্বকীয়া বা বিবাহোত্তর প্রেম নয়, এই প্রেমের প্রকৃতি পরকীয়া। বস্তুত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ছাড়া আর কোথাও রাধাকৃষ্ণের স্বামী-স্ত্রী সম্বন্ধ দেখানো হয়নি। লোক-ঐতিহ্যে রাধা কৃষ্ণের মাতুলানী। ফলে এই প্রেম নিয়ে অনেক মুখরোচক গালগল্প তৈরি হয়েছিল এক সময়ে। চৈতন্য-পরবর্তী যুগে অবশ্য রাধা তত্ত্বে পরিণত। তখন তিনি কৃষ্ণের স্বকীয়া অন্তরঙ্গা শক্তি। হ্লাদিনীর সারভূত রূপ মহাভাব থেকে রাধার উৎপত্তি ব্যাখ্যাত। কিন্তু বড়ু চণ্ডীদাস প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের কবি। রাধাকে তিনি চিত্রিত করেছেন প্রাকৃত রমণী রূপেই, কোনও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের আলোকে নয়। স্বীকার করে নিয়েছেন কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর মাতুলানী-ভাগিনেয় সম্পর্ক। ফলে এই কাব্য লোকরঞ্জনকারী এক কাহিনিতে পর্যবসিত হয়েছে। এর ভাব, ভাষা, আঙ্গিক, পরিবেশ সবই গ্রামীণ। গ্রাম্য রুচির কাছে আত্মসমর্পণ করে পণ্ডিত কবি এই কাব্যে পুরাণকথা ও লোকশ্রুতির মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তবে তাঁর মধ্যে প্রতিভার অভাব ছিল না। সেই প্রতিভায় রাধা, কৃষ্ণ ও বড়ায়ির চরিত্র হয়ে উঠেছে সমুজ্জ্বল। ভাগবত পুরাণে রাধার উল্লেখ পাওয়া যায় না। জয়দেবই প্রথম রাধাকে নিয়ে বৃহদায়তন গাথাকাব্য রচনা করেন। বড়ু চণ্ডীদাসের অন্যতম আদর্শ এই রচনা। তবে রাধা চরিত্র চিত্রণে তিনি যে প্রখর সমাজবাস্তবতা ও সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন, তা অনবদ্য। দেশীয় ভাষায় এইপ্রকার বৃহদায়তন প্রথম আখ্যানকাব্য রচনার কৃতিত্ব বড়ু চণ্ডীদাসেরই প্রাপ্য।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কৃত পুথিটির প্রথমাংশ ও শেষাংশ পাওয়া যায়নি। মাঝের কয়েকটি পাতাও অবলুপ্ত। পাওয়া গিয়েছে তেরোটি খণ্ডে বিন্যস্ত মোট ৪১৮টি পদ। কবি প্রথম বারোটি খণ্ডের নাম দিয়েছেন যথাক্রমে (১) জন্মখণ্ড, (২) তাম্বুলখণ্ড, (৩) দানখণ্ড, (৪) নৌকাখণ্ড, (৫) ভারখণ্ড, (৬) ভারখণ্ডান্তর্গত ছত্রখণ্ড, (৭) বৃন্দাবনখণ্ড, (৮) যমুনান্তর্গত কালীয়দমনখণ্ড, (৯) যমুনান্তর্গত বস্ত্রহরণখণ্ড, (১০) যমুনান্তর্গত হারখণ্ড, (১১) বাণখণ্ড ও (১২) বংশীখণ্ড। ত্রয়োদশ খণ্ডটির শেষাংশ পাওয়া যায়নি বলে এই খণ্ডের কবিকৃত নামটি জানা যায় না। সম্পাদক বসন্তরঞ্জন এই খণ্ডের নামকরণ করেছেন ‘রাধাবিরহ’। তেরোটি খণ্ডে অখণ্ড সুস্পষ্ট একটি গল্প বলা হয়েছে। গল্প এগিয়েছে কবির বিবৃতি এবং আখ্যানের মুখ্য তিন চরিত্রের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। গল্পটি সংক্ষেপে এইরকম:

অত্যাচারী কংসের পীড়নে ব্যথিতা বসুন্ধরার আর্তিতে স্বর্গের দেবতারা একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কংসের বিনাশের জন্য নারায়ণ ‘কৃষ্ণ’ নাম নিয়ে বসুদেবের গৃহে দেবকীর উদরে জন্মগ্রহণ করবেন। তাঁর সম্ভোগের জন্য লক্ষ্মীও প্রেরিত হলেন রাধা রূপে। তার পিতা সাগর, মাতা পদুমা বা পদ্মা। দেবগণের ইচ্ছানুসারে রাধার স্বামী হলেন নপুংসক আইহন। বালিকাবধূ রাধার পরিচর্যার জন্য এলেন পদ্মার বুড়ি পিসি বড়ায়ি। গোপরমণী রাধাকে দুধ-দই বেচতে মথুরার হাটে যেতে হয়। একদা রাধা বড়ায়ির দৃষ্টিপথের বাইরে চলে যায়। তার রূপ-গুণ বর্ণনা করে ব্রজের রাখাল নন্দগোপসুত কৃষ্ণের কাছে বড়ায়ি রাধার সন্ধান জানতে চাইল। সেই রূপের কথা শুনে কৃষ্ণের মনে রাধাসঙ্গের বাসনা জেগে উঠল। বড়ায়ির হাতে তাম্বুল অর্থাৎ পান দিয়ে প্রেমের প্রস্তাব জানালেন কৃষ্ণ। কিন্তু বিবাহিতা রাধার মনে তখনও স্বামী-সংস্কার তীব্র। পরপুরুষের প্রতি বিরাগ সে ক্রুদ্ধ হয়ে তাম্বুলে লাথি মেরে বড়ায়িকে অপমান করে তাড়িয়ে দিল। অপমানিতা বড়ায়ি এসে কৃষ্ণের কাছে সব জানিয়ে এর প্রতিবিধান করতে বলল। দুজনে পরামর্শ করল, যমুনার ঘাটে কৃষ্ণ দানী সেজে বসবে এবং দানের ছলে দুধ-দই নষ্ট করবে, হার কেড়ে নেবে, কাঁচুলি ছিঁড়বে। পরামর্শ অনুযায়ী কুতঘাটে বসে রইল কৃষ্ণ। রাধা সখীদের নিয়ে এল সেই ঘাটে। কৃষ্ণ দানী হয়ে মহাদান চেয়ে বসল। শুধু পণ্যদ্রব্য পার করার কড়ি নয়, রাধার অঙ্গের জন্যও ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ কড়ি দাবি করল সে। কড়ি না দিলে দিতে হবে আলিঙ্গন। কিন্তু রাধার পক্ষে তা মেনে নেওয়া কখনই সম্ভব নয়। শুরু হল বাগবিতণ্ডা। রাধা কৃষ্ণকে নিবৃত্ত করতে চায় মাতুলানী সম্পর্কের কথা তুলে। কিন্তু কৃষ্ণের বক্তব্য “নহসি মাউলানী রাধা সম্বন্ধে শালী”। কৃষ্ণ রাধাকে পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেও রাধা সেসব বিস্মৃত। শেষে রাধার বাধাদান সত্ত্বেও কৃষ্ণ তার সঙ্গে বনের মধ্যে মিলিত হল। আবারও বড়ায়িয়ের কৌশলে রাধা এল যমুনার ঘাটে। একাকিনী রাধাকে যমুনা পার করার সময় কৃষ্ণ মাঝ-নদীতে ঝড় তুলে রাধার মনে ভীতি সঞ্চার করল। ভয়ার্ত রাধা বাঁচার জন্য কৃষ্ণকে জড়িয়ে ধরতে বাধ্য হল। সেই সুযোগে নদীমধ্যে দুজনের মিলন ঘটল। এতদিনে রাধা বুঝতে পেরেছে কৃষ্ণের দুর্বলতা কোথায়। তাই সে এবার নিজেই অগ্রণী হয়ে মথুরার হাটের জন্য বড়োসড়ো পসরা সাজালো। মথুরার পথে যেতে কৃষ্ণকে ‘সুরতি’ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে বইয়ে নিল দুধ-দইয়ের ভার। একইভাবে দেহলোভী কৃষ্ণকে দিয়ে প্রচণ্ড রোদে ছাতাও বহন করালো রাধা। অতঃপর বৃন্দাবনে মহাসমারোহে ঘটল বসন্তের আবির্ভাব। রাধা এবার আড়চোখে চেয়ে ও নানা অঙ্গভঙ্গি করে কৃষ্ণের কামনা জাগিয়ে তুলল। ষোলোশো গোপিনী সঙ্গে বিলাস সমাপ্ত করে কৃষ্ণ রাধার কাছে এসে দেখল সে অভিমানাহত হয়ে বিষণ্ণ মনে নীরবে বসে আছে। কৃষ্ণ মধুর বচনে রাধার মান ভাঙিয়ে লিপ্ত হল সঙ্গমে। রাসলীলায় কৃষ্ণের উৎসাহ বৃদ্ধি পেতে জলক্রীড়ার কথা চিন্তা করে কালীদহের বিষাক্ত জল বিষমুক্ত করতে দহে নেমে পড়ল কৃষ্ণ। বিষের তীব্রতায় কৃষ্ণ অচৈতন্য হয়ে পড়লে নন্দ, যশোদা, বলরাম প্রমুখ আত্মীয়েরা বিলাপ করতে লাগলেন। কৃষ্ণের বিপদ অনুমান করে যাবতীয় লোকলজ্জা ত্যাগ করে রাধা এবার সর্বসমক্ষে ‘পরাণপতি’ বলে কেঁদে উঠল। অবশেষে কালীয় নাগকে দমন করে কৃষ্ণ উঠে এল জল থেকে। একদিন রাধা সখীদের নিয়ে যমুনায় জল ভরতে এসে কৃষ্ণের সঙ্গে জলকেলিতে মত্ত হল। সেই সুযোগে কৃষ্ণ গোপিনীদের বস্ত্রহরণ করল। রাধার অনুনয়ে কৃষ্ণ বস্ত্র ফিরিয়ে দিলেও তার বক্ষহারটি লুকিয়ে রাখল। হার না পেয়ে রাধা এবার গিয়ে অনুযোগ জানালো কৃষ্ণজননী যশোদার কাছে। যশোদা কৃষ্ণকে ভর্ৎসনা করলে অপমানিত কৃষ্ণ ফুলধনু দিয়ে রাধাকে বাণাহত করে মূর্চ্ছিত করল। কিন্তু এবার বড়ায়ি কৃষ্ণের আচরণে ক্ষুব্ধ হল। সে তিরস্কার করে রাধার প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বলল। তখন কৃষ্ণের হস্তস্পর্শে রাধার চৈতন্য হল। পরিশেষে বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের পুনর্মিলন ঘটল। এখন আর কৃষ্ণের মনে রাধার প্রতি পূর্বের অদম্য আসক্তি কিছুই নেই। বরং শারীরিক মিলনে রাধার মনে জাগ্রত হয়েছে অপূর্ব সুখোন্মাদনা। সে এখন কৃষ্ণ-অন্তপ্রাণ। তার আর কোনও লজ্জা, ভয় বা সতীত্বের বন্ধন নেই। কৃষ্ণ এবার একটি সুন্দর মোহন বাঁশি গড়িয়ে কদমতলায় বসে একমনে বাজাতে থাকে। তার সেই বাঁশির সুর রাধার চিত্তকে বিপর্যস্ত করে দেয়। সে ঘর-সংসার ভোলে, তার গৃহকর্ম নষ্ট হয়, মনে মনে ভাবে “দাসী হআঁ তোর পাএ নিশিবোঁ আপনা”। বড়ায়িকে সে বারবার বলে কৃষ্ণকে তার কাছে এনে দিতে। বড়ায়ি বিপরীত কথা বলে রাধাকে নিরস্ত করতে চায়। কিন্তু রাধার মন কোনও যুক্তিতেই বশীভূত হয় না। তখন দুজনে মিলে কৃষ্ণের সন্ধানে বৃন্দাবনে যায়। সেখানে কৃষ্ণের দর্শন মেলে না। রাতে শয্যায় শায়িত রাধার কানে কৃষ্ণের বাঁশির শব্দ এসে প্রবেশ করে। সে নিদ্রিত স্বামীকে ফেলে একাকিনী কৃষ্ণমিলনের উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু কোথাও কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে পথেই মূর্চ্ছিত হয়ে পড়ে রাধা। বড়ায়ি তার মূর্চ্ছাভঙ্গ করে পরামর্শ দেয় কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করতে। তাই-ই করে রাধা। বাঁশি বিহনে কৃষ্ণ ব্যাকুলভাবে বিলাপ করতে থাকে। অবশেষে বড়ায়ির মধ্যস্থতায় কৃষ্ণ রাধার কাছে করজোড়ে মিনতি করলে রাধা বাঁশি ফিরিয়ে দেয়। রাধার সকল অপরাধ ক্ষমা করে কৃষ্ণ। বেশ কয়েক মাস কেটে গেলেও শর্ত অনুসারে কৃষ্ণ রাধাকে আর দেখা দেয় না। এবার কৃষ্ণ বিহনে রাধার মনে হতে থাকে “এ ধন যৌবন বড়ায়ি সবই অসার”। সে বারবার বড়ায়িকে কৃষ্ণ এনে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। বড়ায়ি তাকে পরামর্শ দেয় কদমতলায় কিশলয় শয্যা রচনা করে প্রতীক্ষা করতে। কিন্তু তাতেও কৃষ্ণের দর্শন মেলে না। অতঃপর তারা বৃন্দাবনে প্রবেশ করে গোচারণরত কৃষ্ণের দেখা পায়। রাধা তখন কাতরভাবে তার কাছে অতীত অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে। তবুও কৃষ্ণের মন গলে না। অবশেষে বড়ায়ির অনুরোধে কৃষ্ণ রাধার সঙ্গে মিলনে সম্মত হয়। বিহারের পর শ্রান্ত হয়ে কৃষ্ণের উরুতে মাথা রেখে রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ বড়ায়িকে ডেকে তার হাতে রাধার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়ে মথুরায় চলে যায়। নিদ্রাভঙ্গের পর কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে আবার বিষণ্ণ হয়ে পড়ে রাধা। রাধার বিলাপে অস্থির হয়ে বড়ায়ি মথুরায় গিয়ে কৃষ্ণের কাছে রাধার কথা জানায়। কৃষ্ণের বক্তব্য, সে প্রগলভা রাধার কাছে যাবে না। তার মুখদর্শন করতেও সে ইচ্ছুক নয়। আর তাছাড়া সে মথুরায় এসেছে দুরাচারী কংশকে নাশ করতে। তার আর কোনওমতেই বৃন্দাবনে ফিরে যাওয়া চলে না। এরপরই পুথি খণ্ডিত। যতদূর মনে হয়, কবি রাধা ও কৃষ্ণের বিচ্ছেদেই কাব্যটি সমাপ্ত করেছিলেন।

মধ্যযুগীয় কাব্যে প্রক্ষিপ্তি একটি বড়ো সমস্যা। সাহিত্যের সব শাখাতেই কম-বেশি এটি দেখা যায়। যে যুগের লেখকের কর্তৃত্ব সঠিকভাবে চিহ্নিত হত না, সেই যুগে একের রচনায় অন্যের হস্তক্ষেপ স্থান পেয়ে যেত নির্বিরোধে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের প্রক্ষেপ নিয়ে প্রথম সংশয় জ্ঞাপন করেন যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি। ‘বড়ু’ ও ‘বাসলী’-বিহীন ভণিতাগুলিকে তিনি অন্যের রচনা বলে মনে করেন। দানখণ্ডের তিনটি পদে ড. সুকুমার সেন প্রক্ষেপ দেখেছেন। আবার কেউ কেউ গায়েনের প্রক্ষেপ লক্ষ্য করেছেন কাব্যের নানা স্থানে। প্রখ্যাত সমালোচক বিমানবিহারী মজুমদারের মতে, সমগ্র ‘রাধাবিরহ’ অংশটিই প্রক্ষিপ্ত। তিনি মোট ছয়টি যুক্তি উপস্থাপিত করেছেন। কিন্তু যুক্তিগুলি যে ততটা প্রমাণনির্ভর নয়, সে বিষয়ে একাধিক গবেষক প্রতি-যুক্তি দিয়েছেন। বিশেষত ‘রাধাবিরহ’ যে কাব্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ তার প্রমাণ রয়েছে কাহিনির অভ্যন্তরীণ কাল-পরম্পরায়, কাব্যের গঠনে, রাধার বয়সের অগ্রহতির সাক্ষ্যে, চরিত্রের ক্রম-পরিণামে এবং অবশ্যই কবির ক্রমবিকশিত প্রতিভার স্তরোন্নয়নে। কাব্যের সূচনায় ‘এগার-বরিষ’-এর রাধা এখানে পূর্ণ যুবতীতে পরিণত, কামুক কৃষ্ণ এই পর্যায়ে ভোগতৃপ্ত হয়ে ‘গততৃষ্ণ’ কৃষ্ণে পর্যবসিত। কবি যে ক্রমশ ভাবগভীরতার পথে এগিয়ে এসেছেন, তার প্রমাণ আছে বংশীখণ্ডেই। এই খণ্ডেরই প্রত্যাশিত পরিণাম দেখা যায় ‘রাধাবিরহ’ অংশে। যে গীতিকাব্যিক মূর্চ্ছনার সূচনা হয়েছিল “কেনা বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নঈ কূলে” ইত্যাদি পদে, তার সার্থক পরিণতি ঘটল “দিনের সুরুজ পোড়াআঁ মারে রাতিহো এ দুখ চান্দে” ইত্যাদিতে। রাধার চারিত্রিক বিবর্তনে সম্পূর্ণতা দেখানোর সূত্র ‘রাধাবিরহ’ এই কাব্যেরই অবিচ্ছেদ্য এক অঙ্গ। অন্য কোনও কবির হাত থেকে পূর্বের কাহিনি, চরিত্র, ভাষা ইত্যাদির এতখানি সঙ্গতিপূর্ণ ধারাবাহিকতা আশা করা যায় না। অতএব কিছু ক্ষেত্রে মৃদু সংশয় থাকলেও কাব্যের অন্তর্বর্তী প্রমাণে ‘রাধাবিরহ’ যে মূল কাব্যেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ তা স্বীকার করে নেওয়া যায়। এই অংশটি না থাকলে বড়ু চণ্ডীদাসের কবিপ্রতিভার সামগ্রিক মূর্তিটি অনুধাবন করা যেত না।

গ্রন্থনাম বিচার

[সম্পাদনা]

চর্যাপদের পুথির গ্রন্থনাম নিয়ে যেমন বিতর্ক দেখে দিয়েছিল, তেমনই বিতর্ক দেখা দেয় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুথির নামকরণকে কেন্দ্র করেও। তেঙ্গুর তালিকা থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে চর্যাপদ সম্পর্কে একটি যুক্তিসিদ্ধ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ক্ষেত্রে তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ, পরবর্তীকালের কোনও গ্রন্থে এই কাব্যের নামোল্লেখও করা হয়নি। প্রকৃত সমস্যার সূত্রপাত আবিষ্কৃত পুথিটির প্রথমাংশ ও শেষাংশের পাতা না পাওয়ায়। বইয়ের সূচনায় এবং পুথির শেষে সমাপ্তিসূচক পুষ্পিকাতেই গ্রন্থনাম পাওয়া যায়। এই দুই অংশ না থাকায় পুথিটি থেকে আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন কোনও নাম পাননি। গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি সম্পাদিত গ্রন্থের নামকরণ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। পূর্বাপর তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, প্রাচ্যতত্ত্ববিদ উইলসনের দেওয়া একটি ভ্রান্ত তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই নামকরণের বিষয়টি। তিনি গোবিন্দদাস ও বিদ্যাপতি কর্তৃক যৌথভাবে রচিত কৃষ্ণকীর্তন নামে এক সংস্কৃত কাব্যের কথা জানিয়েছিলেন। সেই তথ্য প্রথম বিকৃত হয় জগদ্বন্ধু ভদ্রের ‘গোবিন্দদাস’ প্রবন্ধে (বান্ধব, শ্রাবণ ১২৮২ সংখ্যা)। তিনি লেখেন, “উইলসন সাহেব কৃত উপাসক সম্প্রদায় গ্রন্থে লিখিত আছে যে, চণ্ডীদাস ও গোবিন্দদাস উভয়ে মিলিত হইয়া কৃষ্ণকীর্তন প্রণয়ন করেন।” এই সংবাদই সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করেন রমণীমোহন মল্লিক, ক্ষীরোদচন্দ্র রায়চৌধুরী, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য, ব্রজসুন্দর সান্যাল প্রমুখ প্রাবন্ধিকেরা। ক্রমে কৃষ্ণকীর্তন নামক কাল্পনিক গ্রন্থটির একক রচয়িতায় পরিণত হন চণ্ডীদাস। বড়ু চণ্ডীদাসের পুথি আবিষ্কৃত হওয়ার পর বসন্তরঞ্জনও ভেবেছিলেন যে, তিনি সেই হারিয়ে-যাওয়া বহুশ্রুত গ্রন্থটিই আবিষ্কার করেছেন। তাই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে গ্রন্থটির নাম দেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং লেখকের নাম হিসেবে উল্লেখ করেন ‘মহাকবি চণ্ডীদাস’। গ্রন্থপ্রকাশের এগারো বছর পরে ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে গ্রন্থনাম নিয়ে প্রথম সংশয় প্রকাশ করেন রমেশ বসু। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা-য় প্রকাশিত ‘চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ প্রবন্ধে তিনি এও বলেন যে, “এই গ্রন্থ সংস্কৃত ও লৌকিক পুরাণের সমবায়ে গঠিত বলিয়া ইহাও পুরাণ আখ্যা পাইবার সম্পূর্ণ উপযুক্ত। বাস্তবিকই বাঙ্গালায় কৃষ্ণলীলা বিষয়ক যদি কোন মৌলিক পুরাণ থাকে তাহা এই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।” ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে বিশ্ববাণী পত্রিকায় দক্ষিণারঞ্জন ঘোষ ‘চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামক আর-একটি প্রবন্ধে কৃষ্ণকীর্তন নামের কোনও ভিত্তি পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করে প্রশ্ন তোলেন, “শুধু বসন্তবাবুর ধারণা এবং শোনা কথার মূল্য কি?” চার বছর পরে নলিনীনাথ দাশগুপ্ত বিচিত্রা পত্রিকায় ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সামাজিক তথ্য’ প্রবন্ধে নানা দিক আলোচনা করে পুথিটির কৃষ্ণমঙ্গল নামকরণের পক্ষপাতী হন। ১৩৪২ বঙ্গাব্দের যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি প্রবাসী পত্রিকায় ‘চণ্ডীদাস চরিত’ প্রবন্ধে মন্তব্য করেন, “এক মস্ত ভুলও হয়ে গেছে, রাধাকৃষ্ণলীলার ‘কৃষ্ণকীর্তন’ নাম হয়ে গেছে।” উপরিউক্ত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে ১৩৪২ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসের প্রবাসী পত্রিকায় সম্পাদক বসন্তরঞ্জন লেখেন ‘চণ্ডীদাস চরিতে সংশয়’। সেখানে তিনি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় প্রয়াসী হন। কিন্তু তাঁর মত গবেষকদের মধ্যে ততটা গৃহীত হয়নি।

নামকরণের সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন ১৩৪২ বঙ্গাব্দে বসন্তরঞ্জন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণে পুথির মধ্যে প্রাপ্ত একটি চিরকুট প্রকাশ করেন। তাতে লেখা ছিল: “শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণঃ।। শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্বের ৯৫ পচানই পত্র হইতে একসও দস পত্র পর্য্যন্ত একুন ১৬ শোল পত্র শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চাননে শ্রীশ্রী মহারাজা হুজুরকে লইয়া গেলেন পুনশ্চ আনিয়া দিবেন—সন ১০৮৯”। প্রাচীন পুথির মধ্যে এই ধরনের রসিদ পাওয়ায় এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে, রসিদটি উক্ত গ্রন্থ-সংক্রান্ত। ফলে নামকরণকে কেন্দ্র করে স্পষ্টত দুটি দল তৈরি হয়ে গেল। একদল পুথিটির শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাম রাখার পক্ষপাতী, অন্য দলের মতে এর নাম হওয়া উচিত শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব। দ্বিতীয় দলের মধ্যে ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য। এর পাশাপাশি অধ্যাপক সত্যব্রত দে ১৩৮৬-৮৭ বঙ্গাব্দের রবীন্দ্রভারতী পত্রিকা-য় একটি কূটতর্ক তুললেন, “গ্রন্থটির সঠিক নাম কি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন না কৃষ্ণকীর্তন?... যে চারটি সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করে বসন্তরঞ্জন চণ্ডীদাস-রচিত একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যের অস্তিত্বে দৃঢ়নিশ্চয় হয়েছিলেন তাদের প্রত্যেকটিতেই গ্রন্থনাম কৃষ্ণকীর্তনরূপে লিখিত।”

নামকরণ সমস্যার নিরিখে কয়েকটি যুক্তি গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘কীর্তন’ শব্দটির অর্থ অনেক। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ ‘কীর্তন’ বলতে ঘোষণা, কথন, বর্ণন, বিবরণ, গুণকীর্তন, স্তবন ইত্যাদি অর্থ নির্দেশিত হয়েছে। ‘কীর্তন’ শব্দটির বৈষ্ণবীয় অর্থ-তাৎপর্য থেকে বের করে এনে যদি প্রয়োগ করা যায়, তাহলে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামটি অযোগ্য হয় না। যেহেতু উইলসন তাঁর উল্লিখিত গ্রন্থের নামে ‘শ্রী’ শব্দটি যুক্ত করেননি এবং বাঙালি গবেষকেরাও কৃষ্ণকীর্তন নামটিই উল্লেখ করেছেন, সেহেতু সত্যব্রত দে-র মতে বইটির নাম কৃষ্ণকীর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই যুক্তির গলদ হল এই যে, উইলসন যে সংস্কৃত কৃষ্ণকীর্তন-এর কথা বলেছেন, তার লেখক গোবিন্দদাস ও বিদ্যাপতি—চণ্ডীদাস নন। একটি ভুল ধারণার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে এই মতটিকে অযথা গুরুত্ব দেওয়া অর্থহীন। শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব নামটিও এই প্রসঙ্গে বিচার্য। প্রাপ্ত রসিদটি আবিষ্কৃত পুথির মধ্যে পাওয়া গিয়েছে বটে, কিন্তু সেই রসিদে বর্ণিত তথ্য যে উক্ত পুথি-সংক্রান্ত হবেই এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। রসিদে বলে হয়েছে যে, শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব নামক একটি পুথির ৯৫ থেকে ১১০ পত্র শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চানন নামে এক ব্যক্তি মহারাজের জন্য ধার করে নিয়ে গেলেন ১০৮৯ সালে অর্থাৎ ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দে। তারপর মাস দুয়েকের মধ্যেই পাতাগুলি ফেরৎ এল। ফেরৎ আসার পর খোয়া না যাওয়ার সম্ভাবনা, যেহেতু গ্রন্থাগারটিতে পুথি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতা নেওয়া হত এবং যার প্রমাণ এই রসিদ। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ধার নেওয়া পাতাগুলির মধ্যে ৯৮/১ এবং ১০৪-১১০ পত্র অর্থাৎ মোট সাড়ে সাতটি পাতা নিখোঁজ। তাহলে অনুমান করতে হয়, অন্য কোনও পুথির ওই ১৬টি পত্র ধার নেওয়া হয়েছিল, যার রসিদটি কোনওভাবে চলে এসেছে এই পুথির মধ্যে। অধ্যাপক তারাপদ মুখোপাধ্যায় এই ক্ষেত্রে অকাট্য যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে, জীব গোস্বামী রচিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। এটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের একটি মূল্যবান গ্রন্থ। বিষ্ণুপুরে শ্রীনিবাস আচার্য রাজগুরু হিসেবে প্রভূত সম্মান পেয়েছিলেন ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে। বৃন্দাবনের শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রীনিবাসের সাক্ষাৎ গুরু ছিলেন জীব গোস্বামী। বিষ্ণুপুরে বৃন্দাবনের গোস্বামীদের গ্রন্থ প্রচারে একদা মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন শ্রীনিবাস। ছোটো চিরকুটটির মধ্যে যে ‘আচার্য প্রভু’-র কথা আছে, তিনি এই শ্রীনিবাস আচার্য ছাড়া আর কেউ নন। তাই তারাপদ মুখোপাধ্যায় মনে করেন, বিষ্ণুপুরের রাজা কোনও কারণে জীব গোস্বামীর শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ গ্রন্থেরই ১৬টি পাতা ধার নিয়েছিলেন এবং পরে ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। অতএব বসন্তরঞ্জনের প্রাপ্ত পুথিটির নাম শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব হতে পারে না। তবু এই বিষয়ে কোনও পাথুরে প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামটি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

পৌরাণিক প্রভাব ও মৌলিকতা

[সম্পাদনা]

ভাগবতের কৃষ্ণকে অবলম্বন করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কাহিনি গড়ে উঠলেও এই কাব্যকে কোনও সমালোচকই অনুবাদ কাব্য বলে নির্দেশ করেননি। অথচ অনুবাদের ক্ষেত্রে যেমন সংস্কৃত আদর্শ থেকে আখ্যানভাগ, চরিত্র, ভাষা ইত্যাদি গৃহীত হয়ে থাকে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর কয়েকটি ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। আসলে যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে অনুবাদ সাহিত্যের জন্ম বড়ু চণ্ডীদাস সম্ভবত তার তাগিদ অনুভব করেননি। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষ্ণবধর্মের প্রতি তাঁর তেমন আনুগত্য ছিল না বলেই মনে হয়। ‘বাসুলী-সেবক’ অভিধাটিই চিনিয়ে দেয় তাঁর নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসকে। তাই সেকালের শাক্ত-বৈষ্ণবের দ্বন্দ্বময় প্রেক্ষাপটে এই কাব্যকে উপদলীয় ধর্মবিদ্বেষের উৎসৃষ্টি বলে মনে হতেই পারে। কাব্যের নানা স্থানে তার প্রমাণও আছে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের নায়ক সম্পর্কে সকলেই প্রায় একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এই কৃষ্ণ আদৌ বৈষ্ণবদের আরাধ্য দেবতা নন। পুরাণপুরুষ কৃষ্ণের আবরণে কবি আসলে প্রকাশ করেছেন নারীদেহ-লোলুপ এক ‘কামী’ গ্রাম্য গোপযুবককে, যে ছলনা, প্রতারণা ও বলপ্রয়োগ করে এক অনিচ্ছুক বিবাহিতা নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলে ‘গততৃষ্ণ’ হয়ে নির্দ্বিধায় তাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। এমন অমানবিক পাশবিক চরিত্র দেবতার হতে পারে না। অর্বাচীন পুরাণে বর্ণিত রাধাও যেন রক্তমাংসের নারীতে পরিণত হয়েছেন এই কাব্যে, যার মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন ঘটেছে স্বামী-সংস্কারে আবদ্ধা কুলবধূ থেকে পরপুরুষের প্রেমসন্তপ্তা স্বাধীনভর্তৃকা প্রেমিকাতে। উল্লেখ্য, কবি একবারের জন্যও ‘দেবতা’ কৃষ্ণের কাছে প্রণত হচ্ছেন না, যেমন হয়েছিলেন তাঁর আদর্শ জয়দেব। পাঠক যেন তাঁর অঙ্কিত কৃষ্ণকে সম্পূর্ণ স্ব-কল্পিত মনে না করে, তাই যেন কবি প্রচলিত পুরাণের সঙ্গে কৃষ্ণ চরিত্রের সম্পর্ক দেখিয়ে দিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পুরাণ-বচন উদ্ধৃত করে কবি তাঁর বর্ণিত গল্পের সঙ্গে পৌরাণিকতার একটি প্রচ্ছন্ন যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। সেই সূত্রেই এসেছে ভাগবত পুরাণ, পদ্মপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে সন্নিবেশিত নানা তথ্য। বিশেষ করে জন্মখণ্ড বর্ণনায় অনেকগুলি পুরাণ থেকে যে তিনি আখ্যানবস্তু আহরণ করে নিজের মতো করে সেগুলি বিন্যস্ত করেছেন তার প্রমাণ রয়েছে আখ্যান-বিন্যাসে। জন্মখণ্ডে কবি রচিত প্রথম সংস্কৃত শ্লোকটি হল:

পৃথুভারব্যথাং পৃথ্বী কথয়ামাস নির্জ্জরান্‌।
ততঃ সরভসং দেবাঃ কংসধ্বংসে মনো দধুঃ।।

এই প্রসঙ্গ বিষ্ণুপুরাণ, পদ্মপুরাণ ও ভাগবত পুরাণেও আছে। তবে প্রত্যেকটি কাহিনিই কম-বেশি স্বতন্ত্র। যেমন, বিষ্ণুপুরাণে পৃথিবীকে বহুভারে পীড়িতা হয়ে সুমেরু পর্বতে দেবতাদের কাছে গিয়ে নিজের বেদনার কথা বিবৃত করতে দেখা যায়। পদ্মপুরাণে কংসের নিপীড়নের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে। ভাগবত পুরাণে আছে বসুমতীর গোরূপ ধারণ করে ব্রহ্মার কাছে গিয়ে দুঃখ নিবেদনের সংবাদ। পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে আছে দেবকীর সপ্তম পুত্রকে রোহিণীর গর্ভে মায়া দ্বারা সংক্রামিত করে অষ্টম গর্ভে নারায়ণের নিজে আবির্ভূত হওয়ার অঙ্গীকার। বড়ু চণ্ডীদাসও সেই তথ্য পরিবেশন করেছেন। এছাড়া নারায়ণ কর্তৃক দেবতাদের হস্তে কৃষ্ণ ও শুভ্রবর্ণের কেশ প্রদানের প্রসঙ্গও বিভিন্ন পুরাণ থেকে গৃহীত। অবশ্য এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, রাধার জন্মকাহিনি বর্ণনায় কবি পুরাণের পথ পরিহার করে স্বাধীন কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। নারদের যে রূপ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে অঙ্কিত হয়েছে, তারও উৎস কবির নিজস্ব কল্পনা। জন্মখণ্ড ছাড়া ভাগবতের স্পষ্ট প্রমাণ পড়েছে বৃন্দাবনখণ্ডে। ভাগবতে কথিত হয়েছে যে, ষোলো শত গোপিনী সঙ্গে কৃষ্ণ শরৎকালে একদা বিলাসে মত্ত হয়েছিলেন। এটি রাস নামে কথিত। বড়ু চণ্ডীদাসও এই কাহিনি অনুসরণ করেন। তাঁর রাধা এখন আর মিলনে অনিচ্ছুক নন। বরং বক্রদৃষ্টিতে ও বিচিত্র দেহভঙ্গিতে কৃষ্ণের কামনা উদ্রেক করতে যথেষ্ট পটিয়সী। অন্যান্য গোপিনী থাকা সত্ত্বেও রাধাতেই যেন কৃষ্ণের সফল তৃপ্তি। তবুও রাধার অনুরোধে সব সখীদের তৃপ্ত করার প্রতিশ্রুতির দেন কৃষ্ণ। অতঃপর বনের মধ্যে রাধাকৃষ্ণের মিলন হয়। ভাগবতেও আছে:

অনয়ারাধিতো নূনং ভগবান হরিরীশ্বর।
যন্নো বিহায় গোবিন্দ প্রীত যামনয়দ্রহঃ।।

তবে ভাগবতের ঘটনাক্রম অনুসরণ করেননি বড়ু চণ্ডীদাস। ভাগবতের রাস অনুষ্ঠিত হয়েছিল কংসবধের পরে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ রাস হল কংসবধের পূর্বেই। তাছাড়া ভাগবতের রাস শরৎকালীন এবং নিশাকালে সম্পন্ন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ আছে দিবাকালীন বাসন্তী রাসের বর্ণনা। এক্ষেত্রে বড়ু চণ্ডীদাস সম্ভবত অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জয়দেবের দ্বারা। গীতগোবিন্দম্‌-এর দু-একটি পদের আক্ষরিক গীতানুবাদও রয়েছে বৃন্দাবনখণ্ডে। যেমন, “রতি তোর আশোআশেঁ গেলা অভিসারে” ইত্যাদি। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ কৃষ্ণের বৃন্দাবন-বিলাস একান্তভাবেই ভাগবত-বর্ণিত রাতের অনুকরণজাত। ভাগবতের সঙ্গে এই কাব্যের মিল আছে কালীয়দমনখণ্ডের কাহিনিতেও। দুই গ্রন্থেই কালীদহের জলে নেমে কৃষ্ণ কর্তৃক কালীয়নাগ দমনের প্রসঙ্গ আছে। তবে বড়ু চণ্ডীদাস উদ্দেশ্যের ভিন্নতা দেখিয়েছেন। ভাগবতকার যেখানে কালীদহের বিষাক্ত জল বৃন্দাবনবাসীর ব্যবহারোপযোগী করে তোলার জন্য কৃষ্ণকে নাগদমনে নিয়োজিত করেছেন, সেখানে বড়ু চণ্ডীদাস দেখাতে চেয়েছেন যে, সখীদের নিয়ে জলক্রীড়ার করার জন্য কালীদহ বিষমুক্ত করতে কৃষ্ণ সেই জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। অচৈতন্য কৃষ্ণের আত্মজ্ঞান ফেরানোর জন্য বলরামের দশাবতার স্তবের মধ্যে ক্রম পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে এই কাব্যে। বরাহপুরাণে কৃষ্ণের নাম আছে অষ্টম স্থানে, সেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ কাহিনির প্রয়োজনে তা সবশেষে উল্লিখিত। বস্ত্রহরণের প্রসঙ্গটিও ভাগবত থেকে নেওয়া। তবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ বস্ত্রের সঙ্গে কৃষ্ণ রাধার হারও চুরি করে নেয় এবং সব কিছু ফিরিয়ে দিলেও হারটি নিজের কাছে রেখে দেয়। এই তথ্য ভাগবতে নেই। আখ্যানের বাইরেও পুরাণের প্রভাব আবিষ্কার করা যায় কবি কর্তৃক নানা পৌরাণিক প্রসঙ্গের অবতারণায়। বিভিন্ন চরিত্রের মুখে উপমা ও উৎপ্রেক্ষা স্বরূপ এগুলি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন তিনি। পরদারাসক্তির সমর্থনে কৃষ্ণের উক্তিতে এসেছে কুন্তী, রম্ভা ও গঙ্গার প্রসঙ্গ। এর বিপক্ষে রাধা উদাহরণ দিয়েছেন সোম-তারা, ইন্দ্র-অহল্যা ও চণ্ডী কর্তৃক সুন্দ-উপসুন্দ বধের। পুরাণশাস্ত্রে কবির পাণ্ডিত্যের প্রমাণ এগুলি। কিন্তু এইসব দৃষ্টান্ত সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কৃষ্ণমাহাত্ম্যমূলক কাব্য নয়। পুরাণের পরিচিত গল্পকে আশ্রয় করে কবি এতে লৌকিক জীবনের পরিচয়ই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। মৌলিকতা দেখিয়েছেন রাধা ও কৃষ্ণের চরিত্র চিত্রণে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের তেরোটি খণ্ডের মধ্যে মোট চার-পাঁচটি খণ্ডে পুরাণের প্রভাব বাদ দিলে অবশিষ্ট খণ্ডগুলি কম-বেশি কবির স্ব-কল্পিত। বিশেষত তাম্বুলখণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ছত্রখণ্ড, ভারখণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড পুরোপুরি কবির নিজস্ব উদ্ভাবনা। এগুলির কোনও সাহিত্যিক উৎস নেই। আখ্যান-সূত্রে বোঝা যায়, জন্মখণ্ডের পর কাহিনিকে কবি লোকসমাজের রুচি অনুযায়ী পরিবর্তিত করে নেন। দেবতাদের অনুরোধে কৃষ্ণ পৃথিবীতে আসেন বটে, তবে তাঁর মুখ্য কাজ কংসবধ আপাতত গৌণ হয়ে যায়, পরিবর্তে রাধার দেহসম্ভোগে তিনি মত্ত হয়ে ওঠেন। তার জন্য ছলনা, চাতুরী, কৌশল, বলপ্রয়োগ কোনও কিছুতেই দ্বিধা নেই তাঁর। লম্পট পুরুষের মতোই কৃষ্ণের হাবভাব, গ্রাম্য গোঁয়ারের মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ তাঁর কথাবার্তা। জন্মখণ্ডের কর্তব্যপরায়ণ নারায়ণের সঙ্গে এই কৃষ্ণকে কোথাও মিলিয়ে নেওয়া যায় না। পাশাপাশি এটাও দেখা যায় যে, কবি কৃষ্ণকে পদ্মনাভ, চক্রপাণি, গদাধর ইত্যাদি নামে সম্বোধন করে পুরাণের অনুসরণ করেছেন, আবার অন্যদিকে মগর-খাড়ু পরিয়ে, হাতে লগুড় ধরিয়ে গ্রাম্য যুবকে রূপান্তরিত করেছেন। এই বিষয়ে ড. সত্যবতী গিরি তাঁর বাংলা সাহিত্যে কৃষ্ণকথার ক্রমবিকাশ গ্রন্থে লিখেছেন, “গ্রামীণ সাধারণের রুচিকে পরিতৃপ্ত করার জন্যই কবি কৃষ্ণের এই গ্রাম্যরূপ অঙ্কন করেছেন। নিঃসন্দেহে এটিও কবির লোকমুখিতারই প্রমাণ।” (পৃ. ৬৫)

রাধার ক্ষেত্রে কবি অনেকটাই স্বাধীনতা নিয়েছেন। তার জন্মকাহিনি কোনও পুরাণকে অনুসরণ করে গড়ে ওঠেনি। বস্তুত ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ কিংবা হরিবংশে রাধার উল্লেখও করা হয়নি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে রাধা কৃষ্ণের বিবাহিতা পত্নী, যা অন্য কোনও শাস্ত্রগ্রন্থে দেখা যায় না। এই পুরাণে রাধার পিতামাতার পরিচয়ও আছে। তিনি বৃষভানু ও কলাবতীর কন্যা। আবার পদ্মপুরাণে রাধার মায়ের নাম কীর্তিকা বা কীর্তিদা। বড়ু চণ্ডীদাস এসবের সঙ্গে পরিচিত হয়েও এক নতুন সংবাদ দিলেন—কৃষ্ণের সম্ভোগের জন্য দেবগণের নির্দেশে লক্ষ্মী রাধা হয়ে এলেন। তাঁর পিতা সাগর গোপ, মাতা পদ্মা। রাধাকে কবি প্রথমাবধিই আত্মবিস্মৃত করে রাখলেন। সেই সঙ্গে লৌকিক জনশ্রুতি অনুযায়ী তাঁর বিবাহ দিলেন নপুংসক আইহনের সঙ্গে। ফলে কাহিনির মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টির অবকাশ তৈরি হয়েছে। গড়ে উঠেছে নাটকীয়তা। সতীত্ব-সংস্কারে বাঁধা বিবাহিতা রাধার সঙ্গে দেহলোভী কৃষ্ণের বাগবিতণ্ডা বেশ জমে উঠেছে। রাধার এই কৃষ্ণ-বিমুখতা কবির নিজস্ব কাব্যভাবনার ফসল। তাম্বুলখণ্ডে বড়ায়ির মুখে রাধার রূপবর্ণনা শুনে কৃষ্ণের কামাসক্ত হওয়া এবং বড়ায়িকে দিয়ে তাম্বুল প্রেরণ, রাধা কর্তৃক বড়ায়ির অপমান এবং ক্রুদ্ধ বড়ায়ির কৃষ্ণকে রাধা-লাঞ্ছনার মন্ত্রণা দান কোনও পুরাণেই নেই। আসলে কবি জয়দেবের কাব্য থেকে রাধার পূর্ণায়ত ছবিটি গ্রহণ করলেও তাতে সামাজিকতার রং চড়িয়ে তাঁকে অনেক বেশি বাস্তবের নারী করে তুলেছেন। এই রাধার মধ্যে সংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, কামনা-বাসনা, রিরংসা, লোভ, দুঃখ-বেদনা সবই পুঞ্জীভূত হয়েছে। দানখণ্ডের আখ্যানেও দেখা যায়, কৃষ্ণের দানী সেজে বসা, মথুরার ঘাটে তর্ক করা, রাধার দই-দুধ নষ্ট করা, পরিশেষে তাঁর দেহসম্ভোগ পুরাণ-বহির্ভূত বিষয় হিসেবে কাহিনিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে সাহায্য করেছে। নৌকাখণ্ডে নৌকার মাঝি সেজে ছল করে রাধাকে সম্ভোগ করতে, ছত্রখণ্ড ও ভারখণ্ডে সঙ্গমলোভে দই-দুধের পসরা বহন করতে এবং রাধার মস্তকে ছত্রধারণ করতে দেখা যায় কৃষ্ণকে। হারখণ্ডে কৃষ্ণ কর্তৃক রাধার হার চুরি, ক্ষুব্ধ রাধার যশোদার কাছে নালিশ, তিরষ্কৃত কৃষ্ণের বাণ মেরে রাধাকে মূর্চ্ছিত করা এবং বড়ায়ির ভর্ৎসনায় রাধার চেতনা সম্পাদন করাও কবির নিজস্ব কল্পনা। বংশীখণ্ডে বাঁশির শব্দে গৃহস্থালির কাজ-ভোলা রাধার ছবি অনবদ্য। এর জন্য কবির কোথাও কোনও ঋণ নেই। বড়ায়ির পরামর্শে রাধা যে কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করে আবার ফিরিয়ে দেয় তারও কোনও প্রাচীন উৎস নেই। রাধাবিরহ অংশে বড়ায়িকে বারবার কৃষ্ণ এনে দেওয়ার অনুরোধ, এমনকি শেষ সম্ভোগের পর বড়ায়ির হাতে রাধাকে সমর্পণ করে কৃষ্ণের প্রস্থানও কবির স্ব-কল্পিত। এগুলির একটিও পুরাণ-বর্ণিত ঘটনা নয়। আর এই অংশগুলিতে অশ্লীলতা ও গ্রাম্যতা দোষেরও আধিক্য দেখা যায়।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে অশ্লীলতার প্রসঙ্গটিও একটি বিচার্য বিষয়। মনে রাখতে হবে, এই কাব্য রাজসভার সাহিত্য নয়, গ্রাম্যের অখ্যাত অশিক্ষিত অপরিশীলিত সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যেই এর রচনা। যে পাশ্চাত্য প্রভাবজাত মার্জিত সাহিত্যবোধের আধুনিক পাঠক সাহিত্যকে বিচার করেন, পঞ্চদশ শতকের বাংলায় তার আবির্ভাব ঘটেনি। বরং ভারতীয় সাহিত্যের আদিরসকেই এই কাব্যে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, প্রাচীন ভারতে যৌনতাকে বিশিষ্ট জ্ঞানশৃঙ্খলা হিসেবে পাঠ করার রীতি ছিল, যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ বাৎস্যায়নের কামসূত্রম্‌। তাছাড়া ভারতীয় অলংকারশাস্ত্রের রতিই প্রথম ভাব, রসের আদিতে দাঁড়ায় শৃঙ্গার রস। কৃষ্ণের ন্যায় দেবচরিত্রে কলঙ্কের কথা যদি তোলা হয়, তাহলে বলতে হবে সমান দোষে দুষ্ট পুরাণকারও। তাঁরাও দেবরাজ ইন্দ্রকে অগম্যাগামী লম্পট পুরুষ রূপে চিত্রিত করেছেন। মধ্যযুগের ধর্মীয় প্রতিবেশে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এই কাব্যে ধর্মের আবরণে আসলে কবি শুনিয়েছেন সমকালের জীবনকথা। রাধা ও কৃষ্ণের পৌরাণিক ঐতিহ্যমণ্ডিত নামগুলি সরিয়ে ফেলতে পারলেই সারা কাহিনিতে অনুভব করা যাবে পঞ্চদশ শতকের বাঙালি সমাজকে। তখন কৃষ্ণ আর ঐশী সত্তা থাকেন না, হয়ে পড়েন সামন্ততান্ত্রিক পুরুষ-শাসিত সমাজের ব্যভিচার-দুষ্ট পুরুষ, যে নারীকে লাঞ্ছিত করে কেড়ে নেয় তার নিজস্ব সম্পদ, সামাজিক বলদর্পিতায় পিষ্ট করে নারীর স্বাধীন সত্তা। বুঝতে অসুবিধাই হয় না, বড়ু চণ্ডীদাস আসলে তাঁর কালের ধৃষ্ট কামুক পুরুষ ও লাঞ্ছিতা নারীর কথাই বলতে চেয়েছেন তাঁর কাব্যে, কেবল কালের অনুরোধে তাঁকে গ্রহণ করতে হয়েছে ধর্মের আবরণ। ধর্মের এই অনাবশ্যক অংশটুকু বাদ দিলেই কৃষ্ণকথা পরিণত হতে পারত বিশুদ্ধ মানবকথায়, এবং বাঙালি পাঠক সেদিনই লাভ করতে পারত আধুনিক সাহিত্যের স্বাদ।

চরিত্রবিচার: কৃষ্ণ, রাধা ও বড়ায়ি

[সম্পাদনা]

আখ্যানধর্মী সাহিত্যে চরিত্র এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কাহিনি স্থূল ঘটনামাত্রের বিবরণ নয়, তার পিছনে থাকে পাত্রপাত্রীর সচেতন চিন্তা ও ক্রিয়া। চরিত্র বিবর্তিত হয় ঘটনার মধ্যে দিয়ে। কখনও ঘটনা চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, কখনও চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করে ঘটনাকে। এইভাবে তৈরি হয় দ্বন্দ্বময়তা, আখ্যানে আসে গতি। ঘটনা ও চরিত্রের আপেক্ষিক প্রাধান্য বিচার করলে দেখা যায়, মধ্যযুগের কবিরা ঘটনাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, চরিত্রের অন্তঃরহস্য উদ্‌ঘাটনে ততটা যত্নবান হননি। অথচ চরিত্র-বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তাঁদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হত, যেহেতু তাঁদের কাব্যের আখ্যানবৃত্ত ছিল পূর্বনির্ধারিত। অল্প যে কয়েকজন কবি এর ব্যতিক্রম বড়ু চণ্ডীদাস তাঁদের অন্যতম। আখ্যান-বিন্যাসে যেমন তিনি পুরাণকে অতিক্রম করে মৌলিকতার সাক্ষর রেখেছেন, তেমনই চরিত্রগুলিও তাঁর হাতে পেয়েছে অন্য মাত্রা।

কৃষ্ণ

[সম্পাদনা]

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কৃষ্ণ চরিত্রটি সম্পর্কে শঙ্করীপ্রসাদ বসু তাঁর মধ্যযুগের কবি ও কাব্য গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, “শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের শ্রেষ্ঠত্বের সবটুকু আত্মসাৎ করিয়াছে রাধা। যাহার নাম কীর্তন করিতে কাব্যটির রচনা সেই শ্রীকৃষ্ণই উহার দোষের আশ্রয়। কাব্যটির যত কিছু দুর্নাম কৃষ্ণের জন্যই।” এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে দুটি কথা বলা যায়। প্রথমত, বড়ু চণ্ডীদাস যে কৃষ্ণের মাহাত্ম্যকীর্তনের জন্য কাব্য রচনা করেননি তার প্রমাণ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এই পাওয়া যায়। তাছাড়া এই কাব্যের নামকরণও যে কবিই করেছেন, তার কোনও উপযুক্ত প্রমাণ উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত, কাব্যের দোষ কাব্য-বর্ণিত কোনও চরিত্রের স্বভাব বা প্রকৃতির উপর নির্ভর করে না, করে অলংকারশাস্ত্রে কথিত নানা মানদণ্ডের উপরে। রসাভাসে বা অঙ্গীরসের পরিস্ফুটনে বাধা সৃষ্টি হলে কাব্যে দোষ দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এইসব ত্রুটি থেকে মুক্ত। আসলে এই কাব্যের কৃষ্ণ জয়দেবের ধীরললিত নায়ক কিংবা চৈতন্য-পরবর্তী যুগের গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের তত্ত্বময় কৃষ্ণ নয় বলে পাঠকের অভ্যস্থ রসসিদ্ধ সংস্কারে আঘাত লাগে। এই কৃষ্ণ শাস্ত্রবর্ণিত দেবতা নয়, বরং কবির সমাজবোধ-প্রসূত রক্তমাংসের মানুষ। প্রকৃতপক্ষে দেবত্বের মোড়কে তিনি তাঁর যুগের লম্পট মানবিকতাবোধশূন্য কামুক পুরুষকেই হাজির করেছেন কাব্যের কাঠামোয়। অর্থাৎ কৃষ্ণ চরিত্র চিত্রণে কবিকে দুই দিক সামলে চলতে হয়েছে। একদিকে তাঁকে রক্ষা করতে হয়েছে কৃষ্ণের প্রথাগত দেবতা এবং অনুদিকে তাঁকে ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে তাঁর সমকালের সাধারণ মানুষের বাস্তব আচরণকে। এইভাবে জোড়াতালি দিতে গিয়ে তিনি যে সব দিকে সঙ্গতি রক্ষা করতে পেরেছেন তা নয়, তবে তাঁর চেষ্টার মধ্যে যে আন্তরিকতা ও অভিনবত্ব ছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

জন্মখণ্ড থেকে রাধাবিরহ পর্যন্ত সর্বত্রই কৃষ্ণের উপস্থিতি। তবে প্রথম দিকে সেই উপস্থিতি যতটা সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ, শেষ দিকে তা ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। বংশীখণ্ডে ও রাধাবিরহে কৃষ্ণকে অবলম্বন করে মুখ্যত রাধা চরিত্রেরই বিকাশ দেখিয়েছেন কবি।

জন্মখণ্ডের কৃষ্ণ ঐশী ভাবান্বিত এক পরম সত্তা। পুরাণপুরুষের আবির্ভাব কাহিনি এখানে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে পুরাণের অনুসরণ করেই। কৃষ্ণের প্রথাগত দেবত্ব রক্ষা করা হয়েছে পুতনা-বধ, যমলার্জুন ভঙ্গ ও কেশী দানব বিনাশের পৌরাণিক কাহিনির অবতারণায়।

ভাগবতের এই ঐশ্বর্যময় কৃষ্ণ তাম্বুলখণ্ডে এসে হঠাৎ প্রকৃতি বদল করে ফেলে। এখান থেকেই সে পরিপূর্ণ গ্রাম্য গোপযুবক। সে উদ্ধত, হঠকারী, একগুঁয়ে, হৃদয়হীন ও নারীদেহ-লোলুপ। ভূ-ভার হরণের জন্য যে তার আবির্ভাব সে কথা সে যেন সম্পূর্ণ বিস্মৃত। বড়ায়ির মুখে রাধার রূপবর্ণনা শুনে সে এক লালসাদীপ্ত কামুকে পরিণত। তার সমস্ত প্রচেষ্টার মধ্যে রাধাকে করায়ত্ত করার বাসনাই প্রকট। প্রথমে তাম্বুল প্রেরণ করে সে ভদ্রভাবে মিলনের প্রস্তাব জানায়, রাধা তা অপমান করে প্রত্যাখ্যান করলে সে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। দানখণ্ডে ও নৌকাখণ্ডে সে এই অপমানের প্রতিশোধ নেয় ছলে বলে কৌশলে করে রাধার সঙ্গে মিলিত হয়ে। এই দুটি খণ্ডে তো বটেই, ভারখণ্ডে ও ছত্রখণ্ডেও কৃষ্ণের দেবত্ব তলানিতে এসে ঠেকে যখন সে ‘সুরতি’ লাভের লোভে সমস্ত মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে রাধার দই-দুধের ভার বহন করে এবং তার মাথায় ছত্রধারণ করে।

বৃন্দাবনখণ্ডের কৃষ্ণ কিছুটা জয়দেব-অনুসারী, তবু কবি এখানে কৃষ্ণ চরিত্রে বিশিষ্টতা এনেছেন। জয়দেবের কাব্যভাষার অনুবাদ যেন কৃষ্ণের মুখে, “তোহ্মে সে মোহোর রতন ভূষণ তোহ্মে সে মোহোর জীবন”। আবার জয়দেবের কৃষ্ণ রাধাকে ত্যাগ করে অন্যান্য গোপিনীদের সঙ্গে বিহার করলেও বড়ু চণ্ডীদাসের কৃষ্ণ রাধার অনুরোধে গোপিনীদের সঙ্গে বিহাররত।

কালীয়দমনখণ্ডে কবি কৃষ্ণকে ফিরিয়ে নিয়ে যান পুরাণবৃত্তে। জলক্রীয়ায় ইচ্ছুক কৃষ্ণ বীরত্ব সহকারে বিষাক্ত জলে নেমে দর্পের সঙ্গে কালীয়নাগ দমন করে। ভাগবতের কাহিনি হলেও দুষ্ট কৃষ্ণের আর-এক রূপ পাওয়া যায় বস্ত্রহরণখণ্ডে। কবি গ্রাম্য আচরণে অভ্যস্থ যৌবনলোভী যুবকের ছবি এঁকেছেন এখানে। রাধার আকুতিতে তার বসন ফিরিয়ে দিলেও কৃষ্ণ হার গোপন রাখে। রাধা অভিযোগ জানান যশোদার কাছে। মায়ের কাছে ভর্ৎসিত কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রতিশোধ নিতে সে বাণখণ্ডে হৃদয়হীনতার পরিচয় দিয়ে রাধাকে বাণে সংজ্ঞাহীন করে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের এই পর্যায় থেকে দেখা যায়, রাধার প্রতি কৃষ্ণের পূর্বের আকর্ষণ প্রায় তিরোহিত। এর সঙ্গত কারণ কবি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। যে যৌন-আকাঙ্ক্ষা প্রথমাবধি কৃষ্ণকে চালিত করেছে, এখন তার পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে কৃষ্ণ রাধার প্রতি বিগতস্পৃহ হয়ে পড়েছে। ‘কামী’ কৃষ্ণ এখন ‘গততৃষ্ণ’ কৃষ্ণে পরিণত। তাই রাধার সামান্য অপরাধ সে ক্ষমা করতে পারে না। তুচ্ছ কারণে সে নিজেকে সরিয়ে নিতে চায় সমাজ ও সংসার থেকে বিচ্ছিন্না রাধার কাছ থেকে। কৃষ্ণের এই নির্মমতা সত্যই সমালোচনার যোগ্য। তাই দেখা যায়, যে বড়ায়ি এতদিন কৃষ্ণকে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে রাধার সতীত্বের দর্প চূর্ণ করতে সাহায্য করেছে, এখন সেই বর্ষীয়সী অভিভাবিকাই তিরস্কার করছে ‘দেব বনমালী’ রাধাকে সংজ্ঞাহীন করে দিয়েছে বলে। বড়ায়ি ভর্ৎসনা না করলে কৃষ্ণ রাধার সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনত কিনা সন্দেহ।

রাধা সম্পর্কে কৃষ্ণের এই শীতলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে বংশীখণ্ডে ও রাধাবিরহে। এতক্ষণ কৃষ্ণের আচরণ অভব্য ও অশালীন ছিল বটে, কিন্তু শিশুসুলভ ছিল না। কিন্তু বংশীখণ্ডে দেখা গেল পূর্বাপরসঙ্গতিবিহীন এক কৃষ্ণকে। সে নিস্পৃহ চিত্তে একাকী বৃন্দাবনে বসে বাঁশি বাজায়। সে বাঁশির শব্দে রাধার চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। কৃষ্ণকে না পেয়ে বড়ায়ির পরামর্শে রাধা বাঁশি চুরি করে। বাঁশি না পেয়ে কৃষ্ণ অবোধ বালকের মতো কাঁদতে থাকে। শেষে বড়ায়ির বুদ্ধিতে করজোড়ে রাধা ও গোপীদের কাছে করুণ স্বরে বাঁশি ফেরৎ চায় সে। বলা বাহুল্য, কৃষ্ণ চরিত্রের পূর্বের গাম্ভীর্যটুকু সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে এখানে।

রাধাবিরহেও কৃষ্ণ চরিত্র একই রকম সামঞ্জস্যহীন। রাধার বিষয়ে তার ক্রমবর্ধমান অনীহা খণ্ডটির প্রথম ও শেষ দিকে বজায় থাকলেও মধ্যাংশে, বিশেষত মিলনের পর, কৃষ্ণের আচরণ বিস্ময়করভাবে অন্য রকম। বড়ায়ির অনুরোধেই কৃষ্ণ মথুরা ছেড়ে বৃন্দাবনে এসেছে কেবল রাধার সঙ্গে মিলিত হতে। লক্ষণীয়, কৃষ্ণ এবার নিষ্ঠুর হয়েও পুরোপুরি নির্মম হতে পারেনি। মিলনকালে তো বটেই, মিলনের পরেও কৃষ্ণের কয়েকটি আচরণ বেশ অপ্রত্যাশিত। সে তৎক্ষণাৎ স্থান পরিত্যাগ করে না, রতিক্লান্ত সঙ্গিনীর পরিচর্যা করে:

নব কিশলয়ত শয্যা রচিল।
নিজ উরুতলে তাক নিশ্চলে রাখিল।।

নিদ্রিতা রাধার যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, সেজন্যও কৃষ্ণের কত আয়াস। মথুরায় যাওয়ার আগে বড়ায়ির হাতে রাধাকে অর্পণ করে তার রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিয়ে যায় সে। কামুক কৃষ্ণের এই হঠাৎ জেগে-ওঠা কর্তব্যবোধের কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সমগ্র শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ কেবল এই অংশটুকুতে প্রেমিক কৃষ্ণ এক ঝলক উঁকি দিয়েই চিরতরে হারিয়ে যায়। গ্রন্থ শেষ হয়েছে রাধার প্রতি বিতৃষ্ণ কৃষ্ণের উক্তিতে:

শতকী না কর বড়ায়ি বোঁলো মা তোহ্মরে।
জায়িতেঁ না ফুরে মন নাম শুণী তারে।।
যত দুখ দিল মোরে তোম্ভার গোচরে।
হেন মন কৈলোঁ আর না দেখিবোঁ তারে।।

কৃষ্ণের এই হৃদয়হীন উক্তি ও আচরণ তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কারণ, এ কাব্যে সে স্বর্গের দেবতা নয়, দেবতার খোলসে ঢাকা রক্তমাংসের কামতাড়িত দোষগুণান্বিত পার্থিব মানুষ।

বড়ু চণ্ডীদাসের খ্যাতি মূলত তাঁর রাধা চরিত্রটির জন্য। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধা তত্ত্ব বা পুরাণ-সম্ভূত চরিত্র নয়, একজন সামান্যা নারী। কিন্তু সৃষ্টিকৌশলে সে হয়ে উঠেছে অসামান্যা। প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থে রাধার নাম নেই; অর্বাচীন পুরাণেও তথ্যে নানা পার্থক্য দেখা যায়। বড়ু চণ্ডীদাস রাধার জন্মেতিহাস রচনা করেছেন নিজের মতো করে। বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মী “কাহ্নাঞির সম্ভোগ কারণে” দেবতাদের নির্দেশে রাধা দেহ ধারণ করে মর্ত্যে আবির্ভূতা। কিন্তু স্বাধীন কল্পনার আশ্রয় নিয়ে কাব্যের দ্বন্দ্ব আকর্ষণীয় করতে কবি তাকে করেছেন আত্মবিস্মৃত। লোকশ্রুতিতে রাধা নপুংসক আইহনের পত্নী। সেই লোকশ্রুতি অনুসারেই কবি অল্পবয়সী বিবাহিতা রাধার দাম্পত্যজীবনের ছবি এঁকেছেন। সেই সূত্রে রাধার চারপাশে তৈরি হয়েছে একটি সামাজিক পরিচিতির বলয়, বাস্তব সংসারের রমণীর লৌকিক সুখ-দুঃখ, কামনা-বাসনা, রাগ-দেষ, আবেগ-আর্তি, বিশ্বাস-সংস্কার তার মধ্যে নিহিত। অথচ বড়ু চণ্ডীদাস যাঁর দ্বারা সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত সেই জয়দেবের কাব্যে রাধা কল্পলোকসম্ভব রোম্যান্টিক নায়িকার গণ্ডী অতিক্রম করতে পারেনি। আসলে বাস্তব-সচেতন জীবনশিল্পীর চোখ দিয়েই কাব্যের চরিত্রকে দেখতে চেয়েছিলেন বড়ু চণ্ডীদাস; কোনও তত্ত্ব, আবেগ বা ভাবাতিরেক তাঁকে চালনা করেনি। এইজন্য পদাবলির চণ্ডীদাসের রাধা কেবল কৃষ্ণনাম শ্রবণেই মিলনোৎকণ্ঠায় কালযাপন করেন, কিন্তু বড়ু চণ্ডীদাসের রাধা সতীত্ব-সংস্কারের তাড়নায় প্রথমে কৃষ্ণের কুপ্রস্তাবে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। রাধার এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। কারণ কবি তাকে পঞ্চদশ শতকের বাংলার পুরুষশাসিত সমাজে স্থাপন করে তার সংকট, সীমাবদ্ধতা, আনন্দ, আবেগ, ক্রোধ, মোহ ইত্যাদিকে মূর্ত করে তুলতে প্রয়াসী হয়েছেন। একজন দক্ষ মনস্তাত্ত্বিক শিল্পীর মতো এই চরিত্রের ক্রমিক উন্মোচনেও যত্নবান হয়েছেন তিনি। কৃষ্ণের অনাবৃত কামবাসনার সূত্রে এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে যৌন-মনস্তত্ত্বও। এক রতি-অনভিজ্ঞা নারীর ক্রমশ দেহসুখের মধ্যে দিয়ে প্রেমের অমরাবতীতে উত্তীর্ণ হওয়ার যাত্রাপথ চিত্রিত হয়েছে এখানে। প্রেম শিকড়হীন কল্পলতা বা নিরালম্ব কোনও মানসিক আবেগ নয়, তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে দেহভাবনা—এই বিশ্বাসে ভর করেই কবি রাধাকে রূপ দিয়েছেন, নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন তার সঙ্গতিপূর্ণ বিবর্তন।

বড়ু চণ্ডীদাস রাধার উদ্দেশ্যে যে বিশেষণগুলি ব্যবহার করেছেন, তাতেই রাধার রূপলাবণ্যের কমনীয়তা ধরা পড়েছে। নাবালিকা কুলবধূ এই রাধা ‘শিরীষকুসুম কোঁঅলী’, ‘অদ্ভুত কনকপুতলী’ ও ‘তীনভুবনজন মোহিনী’। কিন্তু সাধারণ গোপরমণী হিসেবে সংসার নির্বাহ করতে মথুরার হাটে তাকে দই-দুধ বেচতে যেতে হয়। তার রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত বড়ায়ির। এই বড়ায়ির মুখে রাধার রূপলাবণ্যের কথা শুনে কৃষ্ণ তাম্বুল দিয়ে মিলনের প্রস্তাব জানালে সতীত্ব-সংস্কারে আবদ্ধা রাধা ক্ষিপ্ত হয়। বড়ায়িকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়:

ঘরের স্বামী মোর সর্বাঙ্গে সুন্দর আছে সুলক্ষণ দেহ।
নান্দের ঘরের গরু রাখোয়াল তা সমে কি মোর নেহা।।

বীরপত্নী হওয়ার গর্বও তার কম নয়। সে বড়ায়িকে প্রহার করে তাম্বুলে লাথি মেরে প্রকারান্তরে কৃষ্ণকেও অপমান করে। বস্তুত দেহ-মনের দুর্বলতাহীন এই সতীত্ববোধ ভারতীয় নারীর চিরকালের সম্পদ। রাধার আত্মমর্যাদাপূর্ণ বলিষ্ঠ ঘোষণা তাকে স্বতন্ত্র নারীব্যক্তিত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। কিন্তু যে সমাজ স্বৈরাচারী পুরুষের অধীনে, সেই সমাজে নারীর এই স্বাধীন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাধার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কৃষ্ণে একে কামাতুর, তার উপর সামান্য নাবালিকা কর্তৃক অপমানিত। লাঞ্ছিতা বড়ায়িও তারই পক্ষে। অতএব দানখণ্ডে প্রবল তর্কাতর্কির পর কৃষ্ণের গায়ের জোরের কাছে সহজেই হার হয় রাধার। মথুরার ঘাটে কপট দানী কৃষ্ণ জোর করে রাধার সঙ্গে মিলিত হয়। মিলনের পূর্বে সে কৃষ্ণকে বারবার সাবধান করে দেয় যেন তার অঙ্গসজ্জা নষ্ট না হয়। অর্থাৎ এই মিলনকে সে গোপন রাখতে চায়। নৌকাখণ্ডে আবার ছলনাময় কৃষ্ণের ফাঁদে ধরা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয় রাধাকে। তবে এবার ভয় ও লজ্জা মিশ্রিত এক আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে তার মনে। অনিচ্ছা ও ক্ষীণ প্রতিরোধ সত্ত্বেও রাধার মনে কোথাও যেন মিলনসুখের অঙ্কুর দেখা দেয়: “রাধার মনত তবেঁ জাগিল মদন”। তাই এবারের মিলনের কথা রাধা গোপন করে বড়ায়ির কাছে, কৃষ্ণের অত্যাচারের কথা চেপে গিয়ে বরং তার উপকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে:

ডুবিআঁ মরিতোঁ যবেঁ না থাকিত কাহ্নে।
আত্মা লআঁ সান্তরিআঁ রাখিল পরাণে।।
এবার কাহ্নাঞিঁ বড় কৈল উপকার।
জরমেঁ সুঝিতেঁ নারোঁ এ গুণ তাহার।।

এখন থেকে রাধা কৃষ্ণের কাছে তার মূল্য বোধে, অনুমান করতে পারে কৃষ্ণের দুর্বলতাও। সেই অভিজ্ঞতাকেই রাধা এবার দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে ভারখণ্ডে ও ছত্রখণ্ডে। ‘সুরতি’ দানের লোভ দেখিয়ে ভার ও ছত্র বহন করায় বটে, কিন্তু কৃষ্ণের প্রত্যাশা পূরণ করে না। আবার এটাও লক্ষণীয় যে, এক নপুংসকের স্ত্রী হিসেবে উদ্ভিন্নযৌবনা রাধার মধ্যে পরপুরুষের দেহসম্বন্ধের ফলে জাত কামবাসনা পরিতৃপ্তির জন্য অন্য কোনও বৈধ পথও খোলা নেই। অতএব নৌকাখণ্ডে অঙ্কুরিত দেহচেতনা এবার বৃন্দাবনখণ্ডে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে। কৃষ্ণ নয়, এবার রাধা নিজেই মিলনাকাঙ্ক্ষী হয়ে বড়ায়ির কাছে ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। এমনকি বৃন্দাবনে যাওয়ার জন্য শাশুড়ির অনুমতি লাভে নতুন কৌশল ফাঁদে। কৃষ্ণ অন্যান্য গোপিনীর সঙ্গে বিহার করলে রাধার মনে মানের উদয় হয়। প্রেমে অধিকারবোধ না জন্মালে তথা প্রেম পরিপক্ক না হলে এই মান বা ঈর্ষা জাগ্রত হওয়া সম্ভব নয়। কালীয়দমনখণ্ডে আরও একধাপ এগিয়ে যায় রাধা। কৃষ্ণ মূর্চ্ছিত হয়ে পড়লে আতঙ্কিত রাধা সর্বসমক্ষে ‘পরাণ পতী’ বলে উল্লেখ করে; কৃষ্ণবিহনে যে তার ধন-জন, জীবন-যৌবন সবই বিফল সে-কথাও জানায় বিলাপের কালে।

পরবর্তী দুই খণ্ডে অবশ্য রাধা চরিত্র একটু খাপছাড়া। কেউ কেউ একে “মানের এক এক পর্যায়” বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু হারখণ্ডে যশোদার কাছে রাধার নালিশ জানানোর ঘটনাটিকে সেভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সম্ভবত কাহিনির প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চরিত্রাঙ্কন করতে গিয়েই এই ত্রুটি ঘটেছে। যাই হোক, যশোদা কর্তৃক তিরস্কৃত কৃষ্ণ এবার নির্মম হয়ে ওঠে এবং পূর্বসম্বন্ধ একপ্রকার বিস্মৃত হয়েই প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ফুলশর দিয়ে রাধাকে মূর্চ্ছিত করে। পরবর্তী দুই খণ্ডে যে মিলন-ব্যাকুল রাধাকে দেখা যায়, সেও এই পুষ্পধনুর অদৃশ্য প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে। কারণ, এর আগে রাধাকে এতটা বিহ্বল হতে দেখা যায়নি। এবার তার দ্বিধা, সংকোচ, জড়তা কিছুই নেই। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বংশীখণ্ডের ও রাধাবিরহের রাধা তীব্রভাবে দেহবাসনাকেই তুলে ধরেছে। কৃষ্ণের মোহনবাঁশির স্বর তাকে উন্মনা করে, মিলনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু কোথাও প্রিয়তমকে না পেয়ে সুযোগ বুঝে বাঁশি লুকিয়ে রেখে মনের যন্ত্রণা লাঘব করতে চায় সে। আবার কৃষ্ণের আকুল অনুরোধে সাড়া দিয়ে বাঁশি ফেরৎ দিতেও সে দ্বিধা করে না।

রাধাবিরহের অধিকাংশ পদেই ক্রন্দনরতা রাধার বিরহের দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত। অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য লিখেছেন, “রাধাবিরহ অংশে রাধার যে বেদনা তাহা নিতান্ত ব্যক্তিগত বেদনা নয়। বেদনার সুর ব্যক্তিকে অতিক্রম করিয়া সর্বকালের সর্বদেশের বিরহ-বেদনার সুরের সহিত মিলিত হইয়াছে।” এই রাধার সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে পদাবলির ভাবতন্ময়া পূর্বরাগাশ্রিতা রাধার। কিন্তু এই পর্যায়েও রাধার আবেগ দেহকে অতিক্রম করে অপার্থিব প্রেমের পথে অগ্রসর হতে পারেনি। প্রমাণ বড়ায়ির উক্তি, কৃষ্ণের বিদ্রূপ এবং রাধার নিজের আক্ষেপ। রাধা যখন বারবার কাতর হয়ে কৃষ্ণকে এনে দেওয়ার অনুরোধ জানায়, তখন অভিজ্ঞা বৃদ্ধা বড়ায়ি তার এই সুগভীর আর্তির পিছনে কিসের উত্তেজনা তা বুঝতে পারে। একদিন যে কৃষ্ণের মিলন-প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে, এখন তাকে আঘাত দিয়ে বড়ায়ি বলে:

এবেঁ ঘুসঘুসাআঁ পোড়ে তোর মন।
পোটলী বান্ধিআঁ রাখ নহুলী যৌবন।।

রাধা বড়ায়ির কাছে যে কথা জানিয়ে কৃষ্ণকে আনার অনুরোধ করেছে সেগুলির মধ্যে কয়েকটি এইরকম: "আয়িস ল বড়ায়ি রাখহ পরাণ সহিতেঁ নারোঁ মনমথবাণ।।", "ঝাঁট করি কাহ্নাঞিঁ আনাওঁ। রতি সুখে রজনী পোহাওঁ।।", "পীন কঠিন উচ তনে কাহ্নাঞি পাইলেঁ দিবোঁ আলিঙ্গনে।।", "উন্নত যৌবন মোর দিনে দিনে শেষ"। এগুলি কামোন্মত্ত বিহ্বল দেহসুখপ্রত্যাশী নারীর কথা, তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। রাধাবিরহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদে ‘যৌবন’, ‘মনমথ’ ও ‘সুরতী’ শব্দ তিনটি বারবার ব্যবহার করে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন নির্জলা দেহকামনা কেমন করে বেষ্টন করে আছে যুবতী রাধাকে। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি গিয়ে কৃষ্ণকে নিয়ে এলে সে যেভাবে রাধার সঙ্গে বাক্যবিনিময় করেছে, তাতে দেখা যায় কৃষ্ণ রাধার মদনপীড়াটি যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে। নইলে সে বিদ্রূপ করে নপুংসক আইহনের কথা তুলে বলত না, “ঘরে গিআঁ সেব তোহ্মে আইহন পতী”।

কিন্তু শেষপর্যন্ত বহু অনুরোধে একবার মিলন এবং চিরজীবনের জন্য নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যান ছাড়া আর কিছুই জোটে না রাধার। এই সমাজের নারীভাগ্যই যেন রাধার এক দুঃখময় জীবনবৃত্তে প্রতিবিম্বিত। ড. সত্যবতী গিরি তাই লিখেছেন, “শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের কামনার বলিমাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।... তার মন যখন পারিবারিক ও সামাজি পরিবেশের প্রথাবদ্ধ নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের অবস্থানে আনন্দিত, তখন নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য এক পুরুষ তার অনিচ্ছুক শরীরের উপর বলাৎকার করেছে। আর সেই কারণেই সরল সুস্থ নারীর মন ও শরীর দুই-ই যখন সেই পুরুষকে পাওয়ার জন্য আকুল, তখন সে নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যাত।... অনিচ্ছুক বা ইচ্ছুক রাধার উভয় প্রান্তই এই সমাজে নারীভাগ্যের সীমানা। কৃষ্ণের হাতে আত্মসমর্পণের অনিচ্ছা প্রকাশে সে বিদ্রোহিনী, আবার আত্মনিবেদনে ইচ্ছুক রাধাও সামাজিক বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহিনী। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তার বিদ্রোহ সফল নয়। সে সামন্ত-শাসিত বাঙালি সমাজের প্রথম নতজানু বিদ্রোহিনী।”

বড়ায়ি

[সম্পাদনা]

রূপ গোস্বামী তাঁর উজ্জ্বলনীলমণি গ্রন্থে রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলায় সহায়িকা সখীর ভূমিকা বিশদে আলোচনা করেছেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর বড়ায়ির আবির্ভাব সেই গ্রন্থের অনেক পূর্বে। অবশ্য গীতগোবিন্দম্‌-এ নাগরিক রুচিসম্পন্না সখীদের দেখা যায়। বড়ু চণ্ডীদাস গ্রামীণ পটভূমির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সখীর বিকল্পে এনেছেন বড়ায়িকে। সে একাধারে দূতী, সখী ও অভিভাবিকা। এই তিন ভূমিকার সমাহারে বড়ায়ি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে এক অদ্বিতীয় চরিত্র। দামোদর গুপ্তের কুট্টিনীমতম্‌ অথবা বাৎস্যায়নের কামসূত্রম্‌-এ নিসৃষ্টার্থা দূতীর ধারণা পাওয়া যায়। বড়ু চণ্ডীদাসের বড়ায়ি অবশ্য কবির দেখা গ্রাম্য কুট্টিনী, যারা সেকালে এই জাতীয় গোপন সম্পর্ক রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিল। বহু পরবর্তীকালে দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকের পদী ময়রাণীর চরিত্রেও এই-জাতীয় চরিত্রের ছায়া দেখা যায়। তাই অনুমান করা যায়, একদা গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বয়স্কা রমণীদের দেখা যেয়, যারা অর্থের বিনিময়ে অথবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন ঘটাতো অথবা কামুক পুরুষের কাছে এনে দিত তার আকাঙ্ক্ষিতা নারীকে।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে বড়ায়ির একটি সামাজিক পরিচয় আছে। সে রাধার মায়ের পিসি। সেই অর্থে সম্পর্কে রাধার দিদিমা বা বড়-আয়ি। সেই থেকেই সম্ভবত ‘বড়ায়ি’ নামটি এসেছে। তার বেশভূষা, চেহারা ও অঙ্গভঙ্গি বর্ণনায় কবি বেশ হাস্যরস সঞ্চারিত করেছেন। রাধার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আইহন-জননী তাকে নিয়ে এসেছে রাধার পিত্রালয় থেকে। তার কাজ নাবালিকা বধূর পরিচর্যা, মথুরার হাটে নিয়ে যাওয়া এবং সর্বক্ষণ তার সঙ্গ দেওয়া। একবার বনপথে রাধা চোখের আড়ালে চলে গেলে ‘গরু রাখোলা’ কৃষ্ণের কাছে রাধার রূপবর্ণনা করে সে তার হদিশ জানতে চায়। সে-কথা শুনে ‘কামী’ কৃষ্ণ রাধার রূপে আকৃষ্ট হয়ে এবং বড়ায়ির হাতে তাম্বুল প্রেরণ করে। বড়ায়ি যে দূতীগিরিতে নিপুণা ও সফল তার উল্লেখ আছে বড়ায়ির নিজের উক্তিতেই। কিন্তু সেই সাফল্যে সম্ভবত প্রথম আঘাত রাধার অস্বীকৃতি। শুধু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নয়, বড়ায়িকে মাটিতে ফেলে প্রহার করে রাধা। বড়ায়ির মনে জ্বলে ওঠে প্রতিহিংসার আগুন। কৃষ্ণই হয়ে ওঠে তার অবলম্বন। পরবর্তী দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ছত্রখণ্ড প্রভৃতি অংশের প্রত্যেকটিতেই তাই বড়ায়ি কৃষ্ণের পক্ষাবলম্বী হয়েছে নাবালিকার দর্পচূর্ণ করতে।

কিন্তু বড়ায়ি কেন এহেন অসামাজিক সম্পর্কের প্রস্তাব নিয়ে আসতে রাজি হয়েছিল সেটিও বিবেচ্য। একজন সমালোচকের মতে, নপুংসক-পত্নী রাধার বিড়ম্বিত জীবনের প্রতি ছিল বড়ায়ির গভীর সমবেদনা। রতিসুখ-বঞ্চিয়া নারীর শুষ্ক জীবনকে পূর্ণ ও সরস করার অভিলাষেই সে সম্মত হয়েছিল কৃষ্ণের অশালীন প্রস্তাবে। তাই দানখণ্ডে ও নৌকাখণ্ডে সে রাধার করা অমপানের প্রতিশোধ নিলেও বৃন্দাবনখণ্ডে এগিয়ে আসে রাধাকে সাহায্য করতে। দেহসুখ-বাসনায় উদ্বেল রাধার শাশুড়ির কাছ থেকে বাক্‌-কৌশলে সে অনুমতি আদায় করে। আবার বাণখণ্ডে কৃষ্ণ রাধাকে বাণের আঘাতে মূর্চ্ছিত করলে বড়ায়ি কৃষ্ণকে ভর্ৎসনা করে। এই ঘটনা থেকে বড়ায়ি চরিত্রের আর-একটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মধ্যে নিরপেক্ষতাবোধও দুর্লভ নয়। রাধা ও কৃষ্ণ দুজনেই তাঁর স্নেহভাজন। ফলে যাকে যখন বঞ্চিত বা পীড়িত বলে মনে হয়েছে বড়ায়ি নির্দ্বিধায় তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বংশীখণ্ডে ও রাধাবিরহে রাধার মনোব্যথা লঘু করার ক্ষেত্রে বড়ায়ির ভূমিকা অনবদ্য। এই পর্যায়ের বড়ায়ি যেন গীতগোবিন্দম্‌-এর সহায়িকা সখী। কখনও সে নানা যুক্তিতর্কে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে, কখন বাঁশি চুরি করার পরামর্শ দেয়, কখনও রাধার আর্তিতে বিগলিত হয়ে কৃষ্ণকে খুঁজতে বের হয়, কখনও মূর্চ্ছিতা রাধার চেতনা ফিরিয়ে আনতে তার সুশ্রুষা করে, আবার কখনও মথুরায় গিয়ে আহ্বান করে কৃষ্ণকে। এখন রাধার যাবতীয় দুঃখ-নিবেদনের আধার হয় বড়ায়ি। কৃষ্ণও তার মনের ক্ষোভ ব্যক্ত করে এই বড়ায়ির কাছেই। সে রাধার দেওয়া অপমান ভুলতে পারছে না, আর তার রাধাতে আসক্তি নেই। কেবল বড়ায়ির অনুরোধেই সে শেষবারের মতো বৃন্দাবনে এসে মিলিত হয় রাধার সঙ্গে। সম্ভোগের পর নিদ্রিতা রাধার প্রতি যত্ন নিতে বলে যায় বড়ায়িকে। বড়ায়ি তাই কেবল দূতী বা সখী নয়, একই সঙ্গে সে কর্তব্যপরায়ণা অভিভাবিকাও।

সমগ্র আখ্যান থেকে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, রাধাকৃষ্ণের প্রেম-সংঘটনের ক্ষেত্রে বড়ায়ির সক্রিয়তাই সর্বাধিক।। দুই পক্ষের মধ্যে যখনই কোনও সংকট, অনীহা, দ্বন্দ্ব, ভুল-বোঝাবুঝি উপস্থিত হয়েছে, বড়ায়ি তখন তার কূটবুদ্ধি, অভিভাবিকা-সুলভ পরামর্শ, সখীসুলভ সহমর্মিতা, পরিজনতুল্য স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে যাবতীয় বিরোধের নিষ্পত্তি করতে চেয়েছে। এই বড়ায়ি যেন রাধাকৃষ্ণের প্রেমের প্রধান পরিচালক। লৌকিক প্রেমের কাব্যে কবির উদ্দেশ্য ছিল বিশুদ্ধ মানবরস পরিবেশন। তাই অলংকারশাস্ত্রে কথিত নিষ্প্রাণ কুট্টিনী চরিত্র নয়, কবি নিজ কল্পনার গুণে বড়ায়িকে করে তুলেছেন রক্তমাংসের এমন এক জীবন্ত মানুষ, যার মধ্যে আত্মগর্ব, প্রতিহিংসা-পরায়ণতা, বুদ্ধির প্রখরতা, বিপুল চরিত্রাভিজ্ঞতা সবই আছে, সেই সঙ্গে আছে পীড়িত ও বঞ্চিতের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধও। গোড়ার দিকে ‘কুটিল’, ‘কপটকুশলা’ বিশেষণে ভূষিতা এই বৃদ্ধা তাই অনায়াসেই হয়ে উঠেছে এক গভীর ব্যঞ্জনাময় চরিত্র। এই অনন্য চরিত্রের অনুকরণ বাংলা সাহিত্যে আর দেখা যায়নি।

প্রকরণ

[সম্পাদনা]

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর সংরূপগত শ্রেণিবিচার সম্বন্ধেও মতানৈক্য আছে। Genre বা সংরূপ হল কোনও নির্দিষ্ট শিল্পাঙ্গিক, যা সাহিত্যকর্মকে একটি শ্রেণি থেকে আর-একটি শ্রেণিতে পৃথক করতে সমর্থ হয়। সব রচনা সমানভাবে রূপপ্রাপ্ত হয় না। তাই ভাবের ক্ষেত্রে ঐক্য থাকলেও কাব্য, নাটক, উপন্যাস, ছোটোগল্প ইত্যাদি সাহিত্যপ্রকরণগুলি ভিন্ন ভিন্ন আস্বাদন অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। প্রত্যেকটি আঙ্গিকেরই স্বতন্ত্র মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলির আবির্ভাবও বিশেষ বিশেষ সময়ে পৃথক পৃথক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ঘটে থাকে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর গোত্রনির্ণয়ে প্রায় সকল সমালোচককেই থমকে যেতে হয়েছে। কারণ, এই রচনা কোনও একটি বিশেষ সংরূপের বৈশিষ্ট্য আত্মীকরণ করে আবির্ভূত হয়নি। বরং এর মধ্যে লক্ষিত হয়েছে মিশ্র রূপের সমাবেশ। এটা খুবই নিশ্চিত যে, মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম আখ্যানমূলক রচনা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। ‘কাব্য’ হিসেবেই এর পরিচিতি সর্বাধিক। কিন্তু বাংলা ভাষায় বড়ু চণ্ডীদাসের কোনও আদর্শ ছিল কিনা, অন্তত পরবর্তীকালের আবিষ্কৃত গ্রন্থাবলির মধ্যে তার কোনও সদর্থক উত্তর পাওয়া যায় না। তবে জয়দেবের গীতগোবিন্দম্‌-এর কাছে তিনি যে বিষয়-ভাবনা ও আঙ্গিক নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেকাংশে ঋণী তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ। বস্তুত শিল্পাঙ্গিক হিসেবে জয়দেবের রচনাটি ছিল অভিনব। যতদূর সম্ভব তিনি লোকনাট্যের রীতি অনুসরণে গীতিনাট্যের পালা রচনা করেছিলেন। এই সংরূপটিকে জয়দেব নির্দেশ করেছিলেন ‘গীতপ্রবন্ধম্‌’ বলে। কিন্তু কেবল গান নয়, সঙ্গে কবির বর্ণনা এবং ঘটনাশ্রিত পাত্রপাত্রীদের উক্তি-প্রত্যুক্তিও গ্রথিত হয়েছে তাঁর কাব্যে। সব মিলিয়ে গীতগোবিন্দম্‌ এক বিচিত্র শ্রেণির গ্রন্থ, যা সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্যেই দুর্লভ। অনুপুঙ্ক্ষ বিচার করলে দেখা যায়, বড়ু চণ্ডীদাসের রচনাতেও সেই আখ্যান-বিবৃতি, নাটকীয়তা ও গীতিধর্মিতার সার্থক সমন্বয় ঘটেছে।

বড়ু চণ্ডীদাস মুখ্যত ভাগবতীয় কাহিনির প্রসিদ্ধ কাঠামোয় তাঁর রাধাকৃষ্ণের প্রণয়-আখ্যানটিকে দাঁড় করিয়েছেন। কৃষ্ণের জন্ম থেকে মথুরাগমন পর্যন্ত বৃন্দাবনের ঘটনাগুলিই এতে বিবৃত। অথচ বিবরণের প্রচলিত বর্ণনাত্মক পদ্ধতিকে একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে না নিয়ে তিনি বৈচিত্র্য এনেছেন নাটকীয়তা সৃষ্টি করে। নাটক সংলাপ-নির্ভর একটি স্বতন্ত্র সংরূপ, যা অখণ্ড সমগ্রতায় বিধৃত হয়। নাটকের প্রাণ হল দ্বন্দ্ব। তীব্র গতিতে তা প্রার্থিত পরিণামের দিকে ছুটে চলে। নাটকের প্রধান গুণ বাস্তবধর্মিতা। এর চরিত্রগুলি যত বেশি রক্তমাংসের হয়, ততই সাহিত্য হিসেবে নাটক দর্শকের কাছে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর তেরোটি খণ্ডে আখ্যান যেভাবে এগিয়েছে তাতে যথেষ্ট নাটকীয় উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যায়। জন্মখণ্ডের বিবরণটিকে ধরা যেতে পারে সংস্কৃত নাটকের সূচক বা প্রস্তাবনার মতো, যেখানে নাটকের মুখ্য কুশীলবদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এরপর দীর্ঘ বারোটি খণ্ড জুড়ে তাদেরই নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মানসিক সংকট, দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম ও বিচিত্র প্রকার ভাব ও আবেগের বিস্তার। প্রতিটি খণ্ড এমনভাবে স্থান ও কালের পরম্পরায় সজ্জিত যে, প্রত্যেকটিকে একটি ঘটমান নাট্যবৃত্তের ক্রমিক দৃশ্যায়ন বলে মনে হওয়াও সম্ভব। ঘটনার সঙ্গে উত্থান-পতনে নাটকীয় চরিত্রগুলির যে বিবর্তন ঘটে এখানে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে সে অপেক্ষিত মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তিটি বড়ু চণ্ডীদাস তুলে ধরেছেন রাধা ও কৃষ্ণ চরিত্রে। মিহির চৌধুরী কামিল্যা তাঁর সম্পাদিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: বড়ু চণ্ডীদাস বিরচিত গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, “একটি নাবালিকা, যে দেহজ মিলন সম্পর্কে অনভিজ্ঞা, পরপুরুষ সম্পর্কে প্রচণ্ড ভীতা, আত্মসম্ভমময়ী এবং নিজের স্বামীকুল, পিতৃকুল সম্পর্কে গর্বিতা, সেই একাদশবর্ষীয়া বালিকা এক নির্লজ্জ, কামাতুর, গ্রাম্য গোপবালকের বারংবার অবৈধ পীড়নে কেমন করে ধীরে ধীরে মর্মদাহী যন্ত্রণার ভিতর দিয়া পীড়নকারীর কাছে আত্মসমর্পণ করলো, বড়ু চণ্ডীদাস তার একটি উপভোগ্য কাহিনী নির্মাণ করেছেন।” (পৃ. ৫৬) তাম্বুলখণ্ডের স্বামী-গর্বিতা যে নারী একদা বলেছিল, “নান্দের ঘরের গরু রাখোয়াল তা সমে কি মোর নেহা”, সেই স্বীয় অবস্থানে সানন্দিতা সুস্থিতা পূর্ণযুবতীকে দিয়ে আখ্যানের শেষে কবি বলিয়ে নেন:

ধরন না জাএ বড়ায়ি আহ্মার যৌবন।
প্রাণ রাখি আনি দেহ নান্দের নন্দন।।

চরিত্রের এই বিবর্তন অনেকগুলি ঘটনার প্রেক্ষিতে ঘটেছে। কবি নাট্যকার-সুলভ দক্ষতায় সমগ্র বৃত্তের মধ্যে সেই কার্য-কারণ সম্পর্ক রক্ষা করে প্রার্থিত পরিণামের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। অন্যদিকে কৃষ্ণ চরিত্রটিকে প্রথম থেকেই করে তুলেছেন নারীসঙ্গলোভী এক কামুক পুরুষ। রাধাকে দৈহিক ভাবে পাওয়ার জন্য সে নানারকম ছলনা, প্রতারণা, অভিনয় ও নীচতার আশ্রয় গ্রহণ করেছে। রাধার সঙ্গে বারবার মিলিত হয়ে অন্তরের তৃষ্ণার উপশম ঘটে তার। অতঃপর ‘গততৃষ্ণ’ কৃষ্ণ তুচ্ছ অজুহাতে মিথ্যা অভিযোগে সমাজ ও সংসার থেকে বিচ্ছিন্না কৃষ্ণসঙ্গাভিলাষী রাধাকে নির্দ্বিধায় পরিত্যাগ করে চলে যায়। আত্যন্তিক আসক্তি থেকে পূর্ণ অনাসক্তি—কৃষ্ণের এই বিপরীতধর্মী অবস্থান নানা নাটকীয় পরিস্থিতিতে অল্প অল্প করে এগিয়েছে। নাটক অভিনয়যোগ্য মঞ্চনির্ভর সাহিত্যধারা। তারও শেষ গন্তব্য সেই রস। বর্ণিত আখ্যানটি আধুনিক দৃষ্টিতে স্থূল, গ্রাম্য ও অমার্জিত ঠেকতে পারে, কিন্তু এর খাঁটি মানবিক রসে কোথাও কোনও সন্দেহ উপস্থিত হয় না। নাটকের উদ্দেশ্যে এই রস সৃষ্টি করা এবং সেই দিক থেকে বড়ু চণ্ডীদাস সম্পূর্ণ সফল। নাটকের মুখ্য অবলম্বন তথা বহিরঙ্গের চিহ্ন হল সংলাপ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এও দেখা যায় ৪১৮টি পদের মধ্যে মাত্র ৪২টি পদ কবির বিবৃবি, অবশিষ্ট পৌনে চারশো পদ কোনও না কোনও চরিত্রের উক্তি বা স্বগতোক্তি। সংলাপের মধ্যেও আছে পাত্রপাত্রী ও পরিস্থিতিগত বৈচিত্র্য। যেমন, দানখণ্ডে কৃষ্ণের উক্তিতে অশালীন প্রস্তাব থাকলেও তার ভাষাগত অভিব্যক্তিটি গ্রাম্যতাদোষ থেকে মুক্ত। অন্যদিকে রাধার সংলাপে যে ধার ও তীক্ষ্ণতা লক্ষ্য করা যায়, তা গ্রাম্য নারীর ভাষা ও প্রবচনে সমৃদ্ধ এবং তার অন্তরের ঘৃণা ও অস্বীকৃতিকে জীবন্ত করে তোলে। আবার বংশীখণ্ডে ও রাধাবিরহে রাধার ভাষায় আবেগধর্মিতা প্রবলভাবে উপস্থিত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মাত্র তিনটি মুখ্য চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা নাটককে অলংকারশাস্ত্রে ‘বীথি’ বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর সঙ্গে এই নাট্যশ্রেণির সাদৃশ্য দেখা যায়। এতে পরিবেশিত শৃঙ্গার রসের আধিক্যের নিরিখে কেউ কেউ একে জাগের গান অথবা ঝুমুর গানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জাগের গান ‘ধামালি’ বলে কথিত। এই গানে সঙ্গমকামনার বিষয়টিই মুখ্য। ঝুমুর গানে থাকে দুটি দল, যারা পারস্পরিক উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে আখ্যানটিকে গতিময় করে তোলে। এই দুইয়ের কিছু কিছু লক্ষণ থাকলেও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সম্পূর্ণত লোকরীতির রচনা নয়। বরং ড. সুকুমার সেন ‘লগনী’, ‘দণ্ডক’, ‘প্রকীণ্ণক’ ইত্যাদি পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগের সূত্রে এটিকে ‘নাটগীত’ শ্রেণির রচনা বলে মনে করেন। তিনি আরও অনুমান করেন, মধ্যযুগে এই পালা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় সম্ভবত পুতুলনাচ হত। ‘পঞ্চালিকা’ অর্থে পুতুল ধরলে এর প্রকৃত অভিধা হয় ‘নাটগীত পঞ্চালিকা’। দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, বৃন্দাবনখণ্ড, বস্ত্রহরণখণ্ড, রাধাবিরহ প্রভৃতি অংশে যেভাবে রাধাকৃষ্ণের দৈহিক সম্ভোগের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে বাস্তব পাত্রপাত্রীর দ্বারা তার অভিনয় নিশ্চয়ই সম্ভব ছিল না। অতএব এর নাট্যধর্মিতা ও মঞ্চযোগ্যতা স্বীকার করে নিলে পুতুলনাচের সম্ভাবনার কথাও অবশ্যই মানতে হয়।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ নাট্যধর্ম ব্যাপক পরিমাণে থাকলেও এটিকে কোনওমতেই বিশুদ্ধ নাটক বলা চলে না। প্রথাসিদ্ধ নাটকের অবয়বে এটি লেখা হয়নি। বরং যে কৌশলে সংলাপগুলিকে গেঁথে দেওয়া হয়েছে, তাতে এর বর্ণনাত্মক স্বভাবটিই ধরা পড়ে। একটি নিটোল গল্প সাজিয়ে-গুছিয়ে বলেছেন কবি। পাত্রপাত্রীর অঙ্গভঙ্গি, ক্রিয়া, মনের কথা ইত্যাদিকে সংলাপের পাশাপাশি নিজের কথার মাধ্যমেও উল্লেখ করেছেন তিনি। এই রীতি নাটকের নয়, কথাসাহিত্যের; আরও নির্দিষ্ট করে বললে উপন্যাসের। এই ভঙ্গিটিই আদ্যন্ত দৃশ্যমান সমগ্র গ্রন্থে। বৃহদায়তন আখ্যানকে যেমন কথাসাহিত্যিক একাধিক অধ্যায়ে বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত করে ঘটনার এক-একটি পর্যায় নির্মাণ করেন, এখানে খণ্ডবিভাগ মোটামুটি তারই অনুকল্পে সাজানো। জন্মখণ্ডে তথ্যমূলক বিবরণই প্রধান। এরপর তাম্বুলখণ্ড থেকে বাণখণ্ড পর্যন্ত গল্প চলেছে নাটকীয় ভঙ্গিতে। তারপর আবার স্তিমিত হয়ে পড়েছে আখ্যানের গতি। পরিসংখ্যান অনুসারে, সমগ্র আখ্যানে মোট ৪২টি পদ কবির উক্তি। এতে পরস্প-বিচ্ছিন্ন ক্রিয়া ও ঘটনাগুলিকে এক সূত্রে গেঁথে তোলার প্রয়াস লক্ষিত। আর আছে ১৬১টি সংস্কৃত শ্লোক। এই শ্লোকগুলির বেশ কয়েকটি কবির উক্তি তথা নির্ভেজাল বিবৃতি। ঘটনার উল্লম্ফনকে ধরার জন্য এই ব্যবস্থা। তাছাড়া এগুলিতে প্রধান তিন চরিত্রের স্বভাব ও আচরণ সম্পর্কে ছোটো ছোটো অথচ তীক্ষ্ণ মন্তব্য করা হয়েছে, যা নাট্যধর্মকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করে কথাসাহিত্যের বিশ্লেষণধর্মিতাকে চিনিয়ে দেয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ বড়ু চণ্ডীদাস যে আলাদা করে বর্ণনাধর্মিতার দিকে দৃষ্টি দিতে চেয়েছেন, তার বিশেষ প্রমাণ এই শ্লোকগুলিই।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ গীতিলক্ষণও খুব স্পষ্ট। নাটকীয়তা ও বর্ণনাধর্মিতার সঙ্গে বেশ খাপ খাইয়ে প্রসঙ্গ অনুসারে গীতিকবিতার সুর অনুরণিত হয়েছে এতে। রচনার প্রথমাংশে লোকসংগীত ঝুমুরের প্রভাব অনেকেই স্বীকার করেন। কিন্তু এর শেষাংশে তা রীতিমতো গীতিকাব্যিক মূচ্ছনার সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে দুটি কথা মনে রাখতে হবে। প্রথম, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সব রচনাই সংগীত-নির্ভর। গেয়ে পরিবেশনের উদ্দেশ্যেই এগুলি রচিত হত। কাব্য হিসেবে তাই এগুলি গেয়কাব্য। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি বলে কবির ব্যক্তিগত স্বকীয় ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটনের কোনও জায়গা ছিল না। তবে নিজের অন্তরঙ্গ অনুভূতি কিংবা উপলব্ধিকে আখ্যান-বিধৃত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে কোনও বাধা ছিল না। বস্তুত তাই লক্ষ্য করা যায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ। বিশেষত বংশীখণ্ডে ও রাধাবিরহে রাধার ব্যক্তিচিত্তের অন্তর্গূঢ় বেদনাই রূপলাভ করেছে গীতকাব্যের ভাষায় ও সুরে। ব্যক্তিগত এই যন্ত্রণা প্রকাশের সূত্রেই হয়তো একসঙ্গে বাঁধা পড়তে পারে বড়ু চণ্ডীদাসের রাধা এবং পদাবলির চণ্ডীদাসের কৃষ্ণপ্রেম-উন্মাদিনী শ্রীরাধিকা। কেউ কেউ বংশীখণ্ডের “কেনা বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নঈ কুলে” পদটিকে গীতিকাব্যিক উচ্ছ্বাসের চূড়ান্ত নিদর্শন বলে মনে করেন। এই পদটির আখ্যাত্মিক ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টাও হয়েছে; যদিও রাধা চরিত্র বিশ্লেষণ করলে অন্য সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে হয়। যাই হোক, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যে একদা আসরে গাইবার জন্যই লেখা হয়েছিল তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ প্রতিটি পদের সূচনায় বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর উল্লেখ। গাইবার সময় সুরের একঘেয়েমি এড়ানোর জন্য বৈচিত্র্যময় রাগ ব্যবহারের নির্দেশ করে বড়ু চণ্ডীদাস তাঁর শিল্পসচেতনতার পরিচয়ই দিয়েছেন। একই সঙ্গে রয়েছে তালের উল্লেখও। রাগ ও তালের এহেন প্রয়োগ দেখে তাঁকে সংগীত-বিশারদও ধরা যেতে পারে। সব মিলিয়ে ৩২টি রাগ-রাগিণীর উল্লেখ করেছেন তিনি। এগুলির মধ্যে পাহাড়িয়া রাগে রচিত পদের সংখ্যাই সর্বাধিক। অন্যগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল রামগিরি, গুজ্জরী, কোড়া, ধানুষী, দেশাগ, মালব, ভাটিয়ালী, মল্লার, দেশবরাড়ী, বেলাবলী, আহের, ভৈরবী, ললিত, মালবশ্রী, বসন্ত, বিভাস ইত্যাদি। তালের মধ্যে আছে যতি, রূপক, ক্রীড়া, একতালী, আঠতালা ইত্যাদি। সংগীতবিদ রাজ্যেশ্বর মিত্র এই গ্রন্থের গীতিমূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “এ গ্রন্থটি কী কাব্য, কী সংগীত, কী গীতিনাট্য সব দিক থেকেই রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের প্রাচীন সংগীত কলার অত্যুৎকৃষ্ট পরিচায়ক।” যাই হোক, উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ কোনও একটি নির্দিষ্ট সংরূপ তার বিশেষ লক্ষণ নিয়ে উপস্থিত নেই। বরং এটি বিবেচনা করা যায় যথেষ্ট লাট্যোপাদান-সমৃদ্ধ গীতিধর্মাশ্রয়ী আদিরসাত্মক আখ্যানকাব্য হিসেবে। এই মিশ্র অথচ গুণান্বিত সংরূপটির অনুসরণ পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে আর কখনও দেখা যায়নি।

কাব্যাঙ্গিক

[সম্পাদনা]

আলংকারিকদের মতে, মানব-সংসারে কবিই দ্বিতীয় প্রজাপতি। আপন কল্পনাশক্তির জাদুদণ্ড বুলিয়ে তিনি সৃষ্টি করেন। তাঁর অন্তরের সৃজনক্ষমতাকে সাহায্য করে তাঁর অধীত বিদ্যা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরিশীলিত মনন। আলংকারিকেরা এক সময়ে মনে করতেন যে, কাব্যের সাহিত্যমূল্য অলংকার ও রীতির উপর নির্ভরশীল। তাঁদের উত্তরসূরিরা সেই ধারণা থেকে সরে এলেও, এই দুই মতের গুরুত্ব কমেনি। বলা বাহুল্য, বাক্যকে রসাত্মক করে তুলতে ছন্দ ও অলংকারের প্রয়োজন। কবির রচনা তখনই কাব্য হয়ে ওঠে যখন তাঁর বক্তব্য অলংকার ও ছন্দময় হয়ে প্রকাশিত হয়।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি অত্যুৎকৃষ্ট আখ্যানকাব্য। এই কাব্যে বড়ু চণ্ডীদাস গ্রামীণ পরিবেশে লোকরুচির অনুগত এমন এক সংরাগের গল্প শোনাতে চেয়েছেন, যাতে স্থূল দেহের উপস্থিতি খুবই চোখে পড়ে। তাই বিষয়ের সঙ্গে ভাষাকে সঙ্গতিসম্পন্ন করে তুলতে তিনি চরিত্রের সংলাপে লোকভাষার আশ্রয় গ্রহণ করেন। এতে একদিকে কাব্যে ফুটে ওঠে বাস্তবতা, অন্যদিকে কাব্যভাষায় সঞ্চারিত হয় আঞ্চলিকতার বিশেষ রং। কিন্তু বড়ু চণ্ডীদাস ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণ এবং অবশ্য জয়দেবের ‘শুদ্ধ সন্দর্ভ’ গীতগোবিন্দম্‌ কাব্যের। এগুলি তাঁর অধীত বিদ্যা। এগুলি দ্বারাও তাঁর কবি-কল্পনা ও কাব্যভাষা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞেরা জয়দেব ও বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের দিকগুলি পরীক্ষা করে দেখেছেন। বাণীর শিল্পিত রূপনির্মাণে বড়ু চণ্ডীদাস জয়দেবের কাছে বহুলাংশে ঋণী, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বড়ু চণ্ডীদাসের কয়েকটি পদ যেন গীতগোবিন্দম্‌-এরই আক্ষরিক অনুবাদ:

গীতগোবিন্দম্‌ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
নিন্দতি চন্দনবিন্দুকিরণমনুবিন্দতি খেদমধীরম্‌।
ব্যালনিলয়মিলনেন গরলমিব কলয়তি মলয়সমীরম্‌।।
নিন্দএ চান্দ চন্দন রাধা সব খনে।
গরল সমান মানে মলয় পবনে।।
অবিরলনিপতিতমদন শরাদিব ভবদবনায় বিশালম্‌।
স্বহৃদয়মর্মণি বর্ম করোতি সজলনলিনীদলজালম।।
অহোনিশি মদন মারে তারে শরে।
হৃদয়ে নলিনী দল সংনাহা করে।।
আবাসো বিপিনায়তে প্রিয়সখীমালাপি জালায়তে।
তপোহপি শ্বসিতেন দাবদহনজ্বলাকলাপাতয়ে।।
ঘন বন ভৈল তার জাল সখিগণে।
নিশাসে বাঢ়ে বিরহ দারুণ দহনে।।
স্তনবিনিহতমপি হারমুদারম্‌।
সা মনুতে কৃশতনুরিব ভারম্‌।।
তনের উপর হারে।
আল মানএ যেহেন ভাবে।।
আতি হৃদয়ে খিনী রাধা চলিতেঁ না পারে।।
রতিসুখসারে গতমভিসারে মদনমনোহরবেশম্‌। তোর রতি আশেপাশেঁ গেলা অভিসারে।
সকল শরীর বেশ করী মনোহারে।।

অলংকারসজ্জায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ব্যতিরেক ইত্যাদি ছাড়াও বড়ু চণ্ডীদাসের মৌলিকতা প্রদর্শনের প্রচেষ্টারও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, রোম্যান্টিক নায়িকা রাধা বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যেই প্রথম পা রাখে বাস্তব সংসারে। এই কাব্যে তাঁর সামাজিক পরিচয় ও সংসার গুরুত্ব অর্জন করে। জয়দেবের বাইরেও বড়ু চণ্ডীদাস অলংকার নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ ব্যবহৃত উপমাগুলির উৎস ও প্রকৃতি এক নয়। কাব্যের বিষয়-গৌরব বৃদ্ধিতে অধিকাংশ উপমা গ্রহণ করা হয়েছে সংস্কৃত কাব্যসাহিত্য থেকে এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর কথা মাথায় রেখে গৃহীত হয়েছে গ্রামজ উপমাও। তবে কবির যা কিছু মৌলিকতা ও কৃতিত্ব, তা পরোক্ষ উপমা নির্মাণে। নায়ক-নায়িকার দেহগত সৌন্দর্য বর্ণনায় কবি সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের শরণাপন্ন হয়েছেন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বর্ণনায় প্রথাসিদ্ধ উপমাই তাঁর আশ্রয়। অবশ্য বারবার একই ধরনের উপমা প্রয়োগ ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে এবং একই উপমা একাধিক অঙ্গের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে উপমানের ধার কমিয়ে দিয়েছে। জয়দেব ছাড়া কবির আদর্শ ছিলেন সম্ভবত কালিদাস। তবে চমৎকারিত্ব ফুটেছে লোকজীবন থেকে আহৃত উপমানে। বড়ায়ির দেহবর্ণনায় যেমন কবি বাস্তব সত্যকে তুলে ধরেছেন নানা লোকজ উপমার সমন্বয়ে:

শেত চামর সম কেশে। কপাল ভাঙ্গিল দুঈ পাশে।।
ভ্রূহি চুররেখ ষেহ্ন দেখি। কোটর বাটুল দুঈ আখি।।...
কাঠী সম বাহুযুগলে। নাভিমূলে দুঈ কুচ লুলে।।

নারদের বর্ণনাতেও লোকজীবনের ছায়া স্পষ্ট। তাঁর ঋষিকল্প ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়েছে। এই গাম্ভীর্যহানি পরবর্তীকালের মঙ্গলকাব্যেও সঞ্চারিত। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধার তর্তাতর্কির স্থানে কবি সংলাপের স্বাভাবিকতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে এনেছেন গ্রাম্য নরনারীর ঝগড়ার আদল। গ্রামের মানুষ যেমন নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়কেই উপমা রূপে প্রয়োগ করে, তেমনই রাধা ও কৃষ্ণের উক্তিতে এর একাধিক উদাহরণ দেখা যায়:

কৃষ্ণের উক্তি: তোমারে যৌবন রাধা কৃপিণের ধন। পোটলি বান্ধিআঁ রাখ নহুলী যৌবন।।
রাধার উক্তি: এ বোল বুলিতেঁ তোর মনে বড় সুখ। পর ঘর পাইসে যেহ্ন চোর পাটাবুক।।
কৃষ্ণের উক্তি: হে স যৌবন রাধা সব আলপাউ। যৌবন গড়িলেঁ তোর তনু হৈবে লাউ।।
রাধার উক্তি: চুন বিহনে যেহ্ন তাম্বল তিতা। আলপ বএসে তেহ্ন তাম্বল তিতা।।
কৃষ্ণের উক্তি: কাটিল ঘাঅত লেম্ব রস দেহ কত। তোহ্মার বিদিত মোরে রাধা বইল যত।।
কৃষ্ণের উক্তি: তিরীর যৌবন রাতির স্পন যেহ্ন নদীকের বাণে।

কাব্যের অন্যতম উপকরণ হল ছন্দ। সাধারণ দৈনন্দিন ভাষায় ছন্দময় হয়ে উঠলে কাব্যভাষায় পরিণত হয়। আদি বাংলার নিদর্শন চর্যাপদে সেকালের পাদাকুলক ও মাত্রাছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যকে বলা হয় “বাংলা ছন্দের বিচিত্র বন্ধের সূতিকাগার”। বড়ু চণ্ডীদাসই বাংলা সাহিত্যের প্রথম ছান্দসিক কবি। জয়দেবের ধ্বনিঝংকার ও ছন্দসুষমা আয়ত্ত করে তিনি লোকরীতির সঙ্গে মিশিয়ে বাংলা ধ্বনির প্রকৃতিকে চিনে বেশ কিছু ঐতিহ্যপূর্ণ ছন্দ আমাদের উপহার দিয়েছেন। এগুলির মধ্যে পয়ারের পরিচিত ৮+৬ ছাঁদটিও রয়েছে। আবার ৬+৬+৮ ছাঁদের লঘু ত্রিপদীর প্রয়োগও প্রচুর। দীর্ঘ ত্রিপদীর চাল বড়ু চণ্ডীদাসের হাতেই ৮+৮+১০-এ পরিণত। তবে চৌপদীতে সব ক্ষেত্রে মাত্রাসমতা রক্ষা করতে পারেননি তিনি। একাদশাক্ষর একাবলী ছন্দ দ্রুততার কারণে শ্রুতিমধুর। এছাড়া ১৮ ও ২০ মাত্রার মহাপয়ার অল্প স্থানে প্রযুক্ত হিলেও ছন্দবৈচিত্র্যের সূচনা করেছে।

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক:

  1. পয়ার:
ভাঁগিল সোনার ঘট/ যুড়ীবাক পারি।
উত্তম জনের নেহা/ তেহেন মুরারী।।
  1. লঘু ত্রিপদী:
একেঁ দহ দহ/ ঘসির আগুন/ আরে কেনা জালে ফুকে।
ভিড়ি আলিঙ্গন/ দিতেঁ না পাইলোঁ/ এ শাল থাকিল বুকে।।
  1. দীর্ঘ ত্রিপদী:
কাহ্নাঞিঁ বিহনে মোর/ সকল সংসার ভৈল/ দশদিগ লাগে মোর শূন।
আঞ্চলের সোনা মোর/ কে না হরি লঞাঁ গেল/ কিবা তার কৈল অগুণ।।
  1. চৌপদী:
সংহরি সকল দেহে/ গোপী এড়ি কুঞ্জ গেহে/ বিকল গোবিন্দ মুরারী/ রাধার নেহ।
  1. একাবলী:
পাকিল দাড়ী মাথার কেশ/ বামন শরীর মাকড় বেশ।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যে লোকজ রীতির কাব্য তার একটি বড়ো প্রমাণ এই কাব্যের বিভিন্ন চরিত্রের উক্তিতে ব্যবহৃত বহু-সংখ্যক প্রবাদ। এগুলি একদিকে যেমন চরিত্রের বাস্তবতা উজ্জ্বল করেছে, অন্যদিকে তেমনই এগুলির মাধ্যমে সর্বভারতীয় আখ্যানে আঞ্চলিক রং ধরার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার লৌকিক ও মৌখিক ভাষায় এইসব প্রবাদ দীর্ঘকাল ধরে চলে এসেছে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এতে মার্জিত রুচির অভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু প্রবাদের ক্ষেত্রে গ্রাম্যতা দোষাবহ নয়, এবং তা অশ্লীলতার দোষ থেকেও মুক্ত। কবি প্রধানত দুটি উদ্দেশ্যে প্রবাদগুলি ব্যবহার করেছেন। প্রথমত, চরিত্রগুলির বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে; দ্বিতীয়ত, বাক্যালংকার তথা কাব্যালংকার নির্মাণ করতে। দুটি উদ্দেশ্যই যে কম-বেশি সফল, তা অনস্বীকার্য। প্রবাদ আসে মুখের কথায় কোনও ব্যাখ্যা আব দৃষ্টান্তের জন্য, আবার অল্প কথায় বৃহৎ তাৎপর্যকে ইঙ্গিতে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও। আবার প্রবাদের মধ্যে দিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, সমালোচনা, নিছক কৌতুক কিংবা জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাও ব্যক্ত হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ ব্যবহৃত অনেক প্রবাদ ইতিপূর্বে চর্যাপদে এবং পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যেও পাওয়া যায়। আসলে সকল কবিই বাঙালির সাধারণ ভাষা ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে প্রবাদ চয়ন করে নিজ নিজ সময়োপযোগী ভাষায় ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে কেই কারও কাছে ঋণী নন। তাঁদের ঋণ বৃহত্তর বাঙালি সমাজের কাছে। বড়ু চণ্ডীদাসের ব্যবহৃত প্রবাদের সংখ্যা চল্লিশটিরও বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক:

  1. দেখিল পাকিল বেল গাছের উপরে। আরতিল কাক তাক ভকিতেঁ না পারে।।
  2. জরুয়া দেখিআঁ যেন রুচক অম্বল।
  3. পরধন দেখিলেঁ কি পাএ বিখারী।
  4. মাকড়ের হাতে যেহ্ন ঝুনা নারীকল।
  5. আপনার মাসেঁ হরিণী জগতের বৈরী।
  6. তপত দুধ নালে না পীএ জুড়ায়িলেঁ সোয়াদ তাএ।
  7. মাকড়ের যোগ্য কভোঁ নহে গজমুতী।
  8. চুন বিহনে যেহ্ন তাম্বল তিতা।
  9. দেখিআঁ সাধুর ধন চোর পুড়ী মরে।

সাহিত্যে যুগলক্ষণের প্রতিফলন অনিবার্য। এই লক্ষণের প্রকাশ দুইভাবে হয়, ভাবে ও রূপে। সামন্ততান্ত্রিক পটভূমিতে সমগ্র মধ্যযুগীয় সাহিত্যের বিকাশ। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর কৃষ্ণ চরিত্রে সামন্তশাসকের স্বেচ্ছাচার ও বলদর্পিতাই পরিস্ফুট। নারীসমাজ এই সময়ে পুরুষের ক্রীড়ানক মাত্র। কাব্যের আখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, সতীত্ব-সংস্কার ও সামাজিক সম্মানে অধিষ্ঠিত রাধাকে তার সুস্থিত পরিবেষ্টনী থেকে উৎখাত করে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। তার আঘাতে রাধার জর্জরিত সত্তার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে সমগ্র রাধাবিরহে। সংবেদনশীল কবি মাত্রেরই অবস্থান সর্বদা নিষ্পেষিতের পক্ষে। এখানেও বড়ু চণ্ডীদাস অসামান্য নিরপেক্ষতায় সমগ্র আখ্যান বর্ণনা করলেও তাঁর আন্তরিকতার গুণে রাধার প্রতি পাঠকের সহানুভূতি জেগে ওঠে।

কবি মধ্যযুগের রচনাবন্ধের প্রকৃতি সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। মঙ্গলকাব্যে, অনুবাদ সাহিত্যে ও প্রণয়কাব্যে বারোমাস্যার ব্যবহার ছিল প্রথাসিদ্ধ ও সুপ্রচুর। এই অংশে গল্পকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে কবিরা একটি চরিত্রের সূত্রে গীতিকাব্যিক আবেগের প্রকাশ ঘটাতেন। বিশেষ করে বারো মাসের বৈচিত্র্যপূর্ণ ঋতুরঙ্গের সূত্রে নারীজীবনের বেদনা, আশা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি রূপ পেয়েছে বারোমাস্যায়। এই বারোমাস্যার আংশিক সূচনা ঘটেছিল বড়ু চণ্ডীদাসের হাতেই। ‘আংশিক’ এই অর্থে যে, রাধাবিরহে তিনি বিরহকাতরা রাধার আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসের যন্ত্রণাময় বিরহদশার বর্ণনা করেছেন। কোনও কোনও সমালোচক এটিকে ‘রাধার চতুর্মাস্যা’ বলেও উল্লেখ করেছেন। কালিদাসের বিরহী যক্ষ যেমন আষাঢ়ের প্রথম মেঘদর্শনে বিরহকাতর হয়ে পড়ে, ঠিক এখানেও তেমনই রাধার বিরহযন্ত্রণার সূত্রপাত আষাঢ়েই। ‘চতুর্মাস্যা’র মধ্যে দিয়ে রাধার প্রেমের গভীরতা উপলব্ধি করার সম্ভব। এই অংশটিকে পরবর্তীকালের বারোমাস্যা ধারার প্রাথমিক সূচনা বলে মনে করা যেতে পারে।

সমাজজীবন

[সম্পাদনা]

কবি সর্বোপরি এক সামাজিক সত্তা। সমাজের প্রবহমান জীবনস্রোতের সঙ্গে তাঁর সংবেদনশীল মনের গভীর সংযোগ। তাই সমাজে সমস্ত ঝাঁকুনির কম্পনও তাঁর রচনাতেই প্রথম ধরা পড়ে। নিতান্ত ফ্যান্টাসি কল্পনা ছাড়া বাকি সকল রচনার সৃষ্টিমূলে থাকে সৃজনশীল বাস্তবানুগ ভাবনা। সমাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত বিষয় যদি কবির অনুশীলনের বিষয় হয়ে থাকে তো কথাই নেই, অন্য প্রকৃতির বিষয়েও লেখকের অজান্তে ঢুকে পড়তে পারে সমাজের নানা দিক। স্রষ্টার সমকালের জীবনের ছাপ মুদ্রিত হয় বেশি এবং সেই কারণেই তা সমকালীন পাঠকের মনের খুব কাছে গিয়ে পৌঁছায়। চর্যাপদে ছিল নবম থেকে একাদশ শতকের বাঙালি জীবনের টুকরো ছবি। সেই আপাত-বিচ্ছিন্ন অংশগুলি জুড়ে জুড়ে একটি প্রায়-অখণ্ড চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ যেহেতু একটি ধারাবাহিক আখ্যান বিধৃত, তাই সেও গল্প রাধাকৃষ্ণ তথা ধর্মবিষয়ক হলেও তার পরিবেশনে কবি বাস্তবোচিত মনোভাব গ্রহণের সুযোগ অনেক বেশি করে পেয়েছেন এবং পৌরাণিক চরিত্র দুটিকে দাঁড় করিয়েছেন পঞ্চদশ শতকের সামন্তশাসিত পুরুষতান্ত্রিক বাংলায়। চরিত্রগুলির মানবিক রূপ পরিগ্রহণ কবির ভিন্নধর্মী স্বভাবের ইঙ্গিত দেয়। কাব্যের পরিবেষ্টনীর মধ্যে কতটা সেকালের সমাজজীবন উঠে এসেছে, তা আরোপিত কোনও তত্ত্বের অপেক্ষা না রেখে শুধুমাত্র প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমেই নিরীক্ষা করে দেখা যায়।

বাংলায় আর্য-সংস্কৃতির সূচনাকাল থেকেই বর্ণ-বিভক্ত হিন্দুসমাজের দেখা পাওয়া যায়। বর্ণাশ্রমের নিয়মানুসারে প্রতিটি বর্ণের মানুষকে তার নিজস্ব মৌলিক বৃত্তির চর্যায় লিপ্ত থাকতে হত। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর মুখ্য দুই চরিত্র কৃষ্ণ ও রাধার সামাজিক পরিচয় খুব স্পষ্ট এখানে। জয়দেবের কাব্যে তারা কেবলই রোম্যান্টিক নায়ক-নায়িকা; কিন্তু বড়ু চণ্ডীদাসের রচনায় তারা রক্তমাংসের সামাজিক সত্তা। এদের অর্থনৈতিক, কৌলিক ও জাতিবর্ণের পরিচয় দিয়েছেন কবি। বৃন্দাবনের নন্দ গোপের পালিত পুত্র কৃষ্ণ। রাধারও জন্ম গোয়ালার ঘরে। তার পিতা সাগর। সেকালের বাল্যবিবাহের প্রথা মেনে খুব অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয় নপুংসক আইহনের সঙ্গে। রাধার শাশুড়ি ও ননদও বর্তমান। আইহনের সংসার সাধারণ দরিদ্র গৃহস্থের সংসার। গোয়ালার বৃত্তি দই-দুধ বিক্রি করা। আইহনের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই ঘরের অভাব মোচনে নবোঢ়া রাধাকেই যেতে হয় মথুরার হাটে। তবে একা নয়। অন্যান্য গোপরমণীরা তার সঙ্গী। তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করে বৃদ্ধা বড়ায়ি, যে সম্পর্কে রাধার মায়ের পিসি। কাব্যটির মূল অবলম্বন গোপসমাজের জীবন। এছাড়া কবি বিভিন্ন খণ্ডে নিজের বিবৃতিতে অথবা চরিত্রের উক্তিতে এমন কিছু চিহ্ন রেখে গিয়েছেন, যাতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে সমাজের অন্যান্য বর্ণের অস্তিত্ব। নাপিত, কুমোর, তেলি, স্বর্ণকার, বেনে, মাঝি ইত্যাদি বৃত্তিজীবীদের পাশাপাশি উল্লিখিত হয়েছে চণ্ডাল, যোগী, মজুর, জাদুকর প্রভৃতি বিচিত্র জনসম্প্রদায়ের কথা। সমাজ-নির্ধারিত কর্মের বাইরে গেলে সমাজপতিদের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়াও বিচিত্র ছিল না। সামাজিক নিয়মভঙ্গ হলে ‘একঘরে’ করে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা যে ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বড়ায়ি কর্তৃক প্ররোচিত গৃহিনীদের আইহন-জননীকে শাসানোয়, “তোহ্মার ঘরত অন্ন পানি না খাইব।” দানখণ্ডের সূত্রে তৎকালীন শুল্ক ব্যবস্থা সম্পর্কে অল্প ধারণা করা যায়। পথ-কর গ্রহণের জন্য রাজারা ঘাটোয়াল নিযুক্ত করতেন নদী-পারাপারের ঘাটগুলিতে। যাত্রীরা কড়ির মাধ্যমে সেই শুল্ক পরিশোধ করত। রাধার উক্তিতে কংশের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে সেই সময়ে দেশে এমন রাজার শাসন বলবৎ ছিল, যে রাজা ছিলেন সকল ন্যায়-অন্যায়ের বিচারক।

বাঙালির সমাজজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি উপহার দিয়েছেন কবি রাধার সামাজিক পরিচিতির সূত্রে। সেযুগে বাল্যবিবাহ প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কাব্যে একাদশ-বর্ষীয়া রাধা বলেছে যে, সে অনেক দিন আইহনের ঘর করছে। রাধার দৃষ্টান্তের সূত্রেই বলা যায়, একটি বাঙালি গৃহবধূর পরিবার গড়ে উঠত স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে। সমাজে নারীর মান-মর্যাদা নির্ভর করত পুরুষের উপর। মেয়েদের আসল কর্মস্থল ছিল গৃহ। গৃহস্থালির কর্মের মধ্যে রন্ধন অন্যতম। বংশীখণ্ডে কবি বিস্তারিতভাবে রাধার রন্ধনশালার ছবি এঁকেছেন। শাক, ভাজা, ঝোল, অম্বলে তখনকার গড়পড়তা বাঙালির আহারপর্ব সমাধা হত। একটি দুর্মোচনীয় কঠিন পরিবেষ্টনীর মধ্যে বিবাহিতা নারীর জীবন কাটত সেযুগে। তবে অর্থনৈতিক কারণে কখনও কখনও দরিদ্র ঘরের বউদের বাইরে বেরোতে হত। যাত্রাকালে শুভাশুভ লক্ষণ মানা ছিল দীর্ঘদিনের সংস্কার। দানখণ্ডে বিপন্না রাধা তাই ভাবতে শুরু করে তার যাত্রাকালীন অশুভ লক্ষণের কথা:

ঘরে বাহির হৈতেঁ
তেলিনি তেল বিচিতেঁ
কাল কাল রএ সুখান গাছের ডালে
আগেঁ সুনা ঘটে নারী
হাঁছী জিঠিহো না বারী
চলিলোঁ তাহার উচিত পাওঁ ফলে।।

বংশীখণ্ডেও এইরকম লোকবিশ্বাসের কথা জানানো হয়েছে:

গুরুর আসন কিবা চাপিআঁ বসিলোঁ।
জলের আখর কিবা ভূমিত লেখিলোঁ।।
খণ্ড বিচনীর কিবা বাঅ তুলী লৈলোঁ গাএ।
তেকারণে কাহ্নঞি বাঁশী চুরী দোষাএ।।

শপথবাক্য উচ্চারণ করে সন্দেহ দূর করার রীতি সেকালের সমাজেও ছিল। রাধাই কৃষ্ণের বাঁশি চুরি করেছে, এই সন্দেহ উঠলে রাধা বলে:

চান্দ সুরজ নাও বরুণ সাখী।
যে তোর বাঁশি নিল সে খাউ দুয়ি আখী।।
যবেঁ মো চুরী কৈলোঁ হআঁ নারী সতী।
তবেঁ কালসাপ খাইঅ আজিকার রাতী।।

সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ একটা ছিলই। পূণ্যের ফলে স্বর্গলাব ও পাপের ফলে নরকবাসের ধারণা এসেছিল সেই নীতিবোধ থেকেই। শুভকাজে হাত দেওয়ার ব্যাপারেও নানা সংস্কার প্রচলিত ছিল। সাধারণ মানুষ সেক্ষেত্রে তিথি-বার-নক্ষত্র ইত্যাদি জ্যোতিষ বিধান মেনে চলত। দানধ্যান, স্নান, জপতপ, ব্রত-পূজার মাধ্যমে অভীষ্ট লাভের আকাঙ্ক্ষা সেকালের ধর্মাচরণকে চিনিয়ে দেয়। এছাড়া এমন বিশ্বাসও ছিল যে, সুতীর্থে স্নান বা তপস্যা করলে প্রণয়িনীর ইচ্ছা ফলবতী হয়। পুণ্যের পাশাপাশি ছিল প্রায়শ্চিত্ত বিধিও। সবচেয়ে নিন্দনীয় পাপ ছিল নারীহত্যা, যাকে শত ব্রহ্মহত্যার সমতুল্য মনে করা হত। পাপ ছিল অগম্যাগমনেও। কৃষ্ণ মাতুলানী রাধার কাছে রতি প্রার্থনা করলে গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ডুবে যাওয়ার পরামর্শ দেয় রাধা। বাণখণ্ডে ক্রুদ্ধ বড়ায়ি তাই স্ত্রীহত্যার জন্য কৃষ্ণকে বলে:

মোরে নাহি ছো কাহ্নাহ্নিঁ বারানসী যা।
আঘোর পাপেঁ তোর বেআপিল গা।।

আসলে এইসব দৃষ্টান্ত সেকালের সমাজের অন্তর্নিহিত চরিত্রটিকে চিনিয়ে দেয়। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হয়। তার সামাজিক অস্তিত্বের চারপাশে ছিল ধর্মের কঠিন আবেষ্টনী। অদৃষ্টের হাতে ক্রীড়ানক মানুষ জন্মান্তরবাদ, কর্মফলবাদ, ভাগ্যতত্ত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেদের অক্ষমতা, অপ্রাপ্তি ও যাবতীয় যন্ত্রণা ভুলতে চেয়েছিল। প্রাকৃতিক অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া তখন মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই জাদুবিদ্যা, মন্ত্রতন্ত্র, অলৌকিকতায় তাদের বিশ্বাস পাকা হয়ে উঠেছিল।

কবি-কল্পনার অতিরঞ্জনকে বাদ দিলে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ সেকালের সাধারণ বাঙালির বেশভূষা, প্রাত্যহিক ব্যবহার্য আসবাবপত্র, আমোদ-প্রমোদ ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। দরিদ্র গোপসমাজের গল্প হওয়ায় তাদের আর্থিক সামর্থের কথা ভেবে পোষাক-পরিচ্ছদ ও গয়নাগাটির কথা এখানে উল্লিখিত। তবু দেখা যায়, দরিদ্র ঘরের বউ রাধা পরেছে সোনার চুড়ি, গজমতি, রত্নকুণ্ডল, সোনা-বাঁধানো বালা, কঙ্কণ ও কেয়ুর এবং হাতে তার রুপোর ঘড়া। এছাড়া সেকালের মেয়েরা পায়ে পরত নূপুর বা মল, পায়ের আঙুলে পাশুলী এবং কোমরে কিঙ্কিণী। সকলের পক্ষে মূল্যবান ধাতুর গয়না পরা সম্ভব হত না। তাই মেয়েরা মনের সাধ মেটাতো ফুলের গয়নায়। বিবাহিতা নারীর সিঁথিতে ছিল সিঁদুর, হাতে লোহা, চোখে কাজল, কপালে চন্দন, মুখ রঞ্জিত থাকত পানে। রাধার পরনে ছিল নেতের বসন বা পাটের কাপড়। বুক ঢাকা ছিল কাঁচুলি দিয়ে। কাব্যের কৃষ্ণ বোধহয় বিলাসী পুরুষের আদলে অঙ্কিত। এই ধরনের পুরুষ মাথায় বাবরি চুল রাখত। তারাও গলায় হার, পায়ে নূপুর, কানে কুণ্ডল ও চোখে কাজল পরত। আসবাবপত্রের উল্লেখ বেশি না থাকলেও দই-দুধ রাখার পাত্র, তেল বহনের কেড়ুয়া ভিক্ষাপাত্র ইত্যাদির কথা জানা যায়। আর আছে ঘটি, ভাঁড়, চুপড়ি, শিকে, বিড়ে, ন্যাতার মতো অতি সাধারণ গৃহস্থালির জিনিসপত্রের উল্লেখ। শয়নের জন্য পালঙ্কের কথাও উল্লিখিত। আমোদ-প্রমোদ ও খেলাধূলার কথাও জানা যায়। কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতো, খেলত বলের মতো দেখতে গেণ্ডুয়া দিয়ে। এছাড়া ‘চাঁচড়ী’ ও ‘খেড়ী’ নামে দুটি খেলার উল্লেখ আছে। প্রমোদকাননের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় বিলাসীরা সকাল-সন্ধ্যা সেখানে অবসরযাপন করত। সেকালের ধর্মাচরণেরও কিছু পরিচয় আছে এই কাব্যে। শাক্তধর্মের ব্যাপক প্রসার লক্ষ্য করা যায়। শক্তিদেবী চণ্ডী পূজিতা হতেন। বড়ায়ি রাধাকে কৃষ্ণলাভের জন্য চণ্ডীপূজা করার পরামর্শ দেয়। আর ছিল বাসলী দেবীর পূজা। বড়ু চণ্ডীদাস এই দেবীর সেবক ছিলেন। রাম বিষ্ণুর অবতার রূপে সমাজে গৃহীত হয়েছিলেন। রামায়ণের একটি প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায়, জনসাধারণ এই মহাকাব্যের গল্পের সঙ্গেও পরিচিত ছিল।

প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের বৈষ্ণব পদাবলি

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগে কৃষ্ণকেন্দ্রিক সাহিত্যের একটি ধারা প্রবাহিত হয় নাটগীতের মাধ্যমে, আর-একটি ধারা পরিপুষ্ট হয় গীতিকবিতার দ্বারা। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর মূল আশ্রয় লোকজ আখ্যান; পুরাণের সঙ্গে সেটির যোগ থাকলেও এটিতে পুরাণের প্রভাব ছিল ক্ষীণ। কিন্তু কৃষ্ণের জীবন ও তত্ত্বাশ্রয়ী পুরাণ ও কাব্যগুলিকে নৈষ্ঠিকভাবে অনুসরণ করে রসিক ভক্তের উপভোগ্য সাহিত্যধারা গঠিত হয় অন্য এক ধরনের গীতিকবিতার মাধ্যমে। এই ধারা পরবর্তীকালে খ্যাতি অর্জন করে ‘মহাজন পদাবলি’ নামে। নাটগীত ও পদাবলি উভয়েরই উৎস জয়দেবের গীতগোবিন্দম্‌। এই কাব্যেই প্রথম বর্তমানে প্রচলিত অর্থে ‘পদাবলী’ শব্দটি পাওয়া যায়। বৈষ্ণব পদ বিশুদ্ধভাবে কৃষ্ণকেন্দ্রিক এবং এই কৃষ্ণ যতটা মধুর রসাশ্রয়ী, ততটা ঐশ্বর্যবান নন। বৈষ্ণবধর্ম ভক্তিরসাশ্রয়ী। এই ভক্তির মধ্যেও রয়েছে উৎকর্ষভিত্তিক স্তরান্তরিত নানা বিভাগ। ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে চৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর অনুগামীরা রাগানুগা প্রেমাভক্তির চর্চা শুরু করেন। বাংলা, পুরী ও বৃন্দাবনে আরও দুই শতক ধরে এই ভক্তির ধারা নানা উপমত ও বিকৃতি সহ অবস্থান করতে থাকে। বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বৈষ্ণবধর্মকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু সেই আন্দোলনের আগেও রচিত হয়েছিল বৈষ্ণব পদ, যেগুলিকে প্রাক্‌-চৈতন্য ধারার বৈষ্ণব পদাবলি নামে অভিহিত করা যায়। সেই ধারার দুই শ্রেষ্ঠ পদকর্তা হলেন বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস।

বিদ্যাপতি

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগে কবির তুলনায় কাব্যের গুরুত্বই ছিল অধিক। তাছাড়া ইতিহাসবোধ ও আত্মসচেতনতার অভাবে সেকালের কবিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিস্তারিত আত্মপরিচয় প্রদান করতেন না। মঙ্গলকাব্যের গ্রন্থোৎপত্তির কারণ বর্ণনায় এবং পদাবলির ভণিতায় কবিদের কিঞ্চিৎ আত্মবিবরণ প্রকাশ পেত। বিদ্যাপতি সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তার কিছুটা এই ভণিতা মারফৎ, আর কিছুটা গ্রন্থিত ইতিহাস ও জনশ্রুতি থেকে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শিক্ষিত বাঙালি বৈষ্ণব পদের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও নিছক রসাস্বাদন ভিন্ন কবিদের বিষয়ে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে বিশেষ আগ্রহী হয়নি। উক্ত শতকেরই মধ্যভাগে বিবিধার্থ সংগ্রহ পত্রিকা এবং সাহিত্যের ইতিহাস-বিষয়ক কিছু গ্রন্থে বিদ্যাপতির পদ উদ্ধৃত ও চর্চিত হলেও তাঁর ব্যক্তিপরিচয় সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। রামগতি ন্যায়রত্ন থেকে মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকের রচনাতেও বিদ্যাপতির পরিচয় যতটুকু তুলে ধরা হয়েছিল, তাতে কল্পনা ও জনশ্রুতির পরিমাণই ছিল সর্বাধিক। ১৮৭৩ সালে ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দি আর্লি বৈষ্ণব পোয়েটস অফ বেঙ্গল’ প্রবন্ধে বিশিষ্ট ভাষাতত্ত্ববিদ জন বিমস প্রথম বিদ্যাপতির তথ্যানুগ জীবনকথা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হন। তবে তাঁর প্রয়াসটিও ত্রুটিমুক্ত ছিল না। ১৮৭৫ সালে রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ‘বিদ্যাপতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে বিদ্যাপতির প্রকৃত ঐতিহাসিক পরিচয় উদ্ঘাটন করেন। এই প্রবন্ধটিকে অনেকেই “বাংলা সাহিত্যের প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ” বলে উল্লেখ করেন। রাজকৃষ্ণ বিহারের মিথিলা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বিদ্যাপতির অসংখ্য পদ বাঙালি পাঠক দীর্ঘদিন করে আস্বাদন করে এলেও তিনি নিজে ছিলেন মৈথিল কবি, বাঙালি নন। মিথিলার কামেশ্বর রাজবংশের একাধিক রাজার সভা অলংকৃত করেন তিনি। এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বসন্ত রায় ও বিদ্যাপতির অভিন্নতা, যশোরের বড়ো নাটোরের ভবানন্দের পুত্র রূপে তাঁর জন্মের ইতিহাস, রানি লছিমার সঙ্গে তাঁর প্রেম এবং সর্বোপরি বিদ্যাপতিকে বাঙালি বলে দাবি করার ক্ষেত্রে বাঙালির জাতিগত আত্মশ্লাঘার ন্যায় অনেক মিথই ভেঙে পড়ল। পরিবর্তে যে তথ্যগুলির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হল সেগুলি এইপ্রকার: বিদ্যাপতির জন্ম উত্তর মিথিলার দ্বারভাঙা জেলার অন্তর্ভুক্ত বিসফি গ্রামে। তাঁর পিতামহ জয়দত্ত ও পিতা গণপতি ঠক্কুর। বিষ্ণুনাথ থেকে গণপতি পর্যন্ত বিদ্যাপতির ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষ মিথিলার রাজসভার সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন। কেউ ছিলেন সান্ধিবিগ্রহিক, কেউ বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী। বিদ্যাপতির প্রপিতামহ ধীরেশ্বর রাজকার্য পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মণের চিরাচরিত বৃত্তি যজন-যাজন ও সংস্কৃত চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। পিতামহ জয়দত্ত সেই পথেই অগ্রসর হন। পিতা গণপতি তাঁর পূর্বপুরুষদের ন্যায় কৃতী না হলেও রাজবংশে তাঁর সম্মান ছিল। পরিবারের এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিদ্যাপতির মনোজীবন গঠনে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল। পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও কামেশ্বর রাজবংশের বিদগ্ধ রাজসভায় প্রবেশ করেন। মিথিলার প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, বিদ্যাপতির দুই স্ত্রী ছিলেন। প্রথমা পত্নীর পুত্র হরপতি ও নরপতি এবং দ্বিতীয়া পত্নীর পুত্র বাচস্পতি। চন্দ্রকলা নামে তাঁর এক কবিখ্যাতিসম্পন্না পুত্রবধূও ছিল। আর ছিল দুল্‌হা নামে এক কন্যা। দীর্ঘজীবী এই কবি অন্তত ছয়-সাতজন রাজা ও রানির শাসনকালে রাজসভাকবির পদ অলংকৃত করেন। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের অভিঘাত এসে পড়েছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনেও। একসময়ে তাঁর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রাজা শিবসিংহ নিরুদ্দিষ্ট হলে ভাগ্য-বিপর্যয়ের ফলে তিনি মিথিলার পার্শ্ববর্তী দ্রোণবারের রাজা পুরাদিত্যের আশ্রয় গ্রহণ করেন। নানা গ্রন্থে প্রদত্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, কীর্তিসিংহ থেকে শুরু করে দেবসিংহ, শিবসিংহ ও রানি লছিমা দেবী, পদ্মসিংহ ও বিশ্বাসদেবী, নরসিংহ ও ধীরমতী, পুরাদিত্য ও ভৈরবসিংহের রাজত্বে তাঁদের নির্দেশে তিনি অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেন। সঙ্গে রচনা করেন প্রায় ৮০০ বৈষ্ণব পদ, যেগুলির অধিকাংশই বাংলায় একদা প্রচারিত হয়েছিল। রাজা শিবসিংহ ও তাঁর পত্নী লছিমা দেবীর সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে ভালো। ২০১টি পদে শিবসিংহের নাম উল্লেখ করেন তিনি। কবির প্রতি প্রীত হয়ে শিবসিংহ ২৯৩ লক্ষ্মণ সংবতে অর্থাৎ ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে ‘বিস্তীর্ণ নদীমাতৃক সারণ্য সরোবর’ নামক গ্রাম প্রদান করেন। গ্রামদানের তাম্রপট্টে রাজা কবিকে ‘অভিনব জয়দেব’ উপাধিতে সম্মানিত করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর এক বিশিষ্ট অভিধায় পরিণত হয়।

পদাবলি ব্যতীত বিদ্যাপতির অন্যান্য রচনাগুলি থেকে মিথিলার হিন্দু সংস্কৃতির পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকাটি অনুধাবন করা সম্ভব হয়। চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ত্রিহুতে ইসলামি অভিযান শুরু হয়। মিথিলার কর্ণাট-বংশীয় রাজা হরিবর্মদেবকে পরাজিত করে দিল্লির তুঘলক-বংশীয় শাসক গিয়াসুদ্দিন তুঘলক ত্রিহুতে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে মিথিলা কখনও স্বাধীন, কখনও করদ, কখনও বা সামন্ত রাজ্য রূপে পরিচালিত হতে থাকে। কামেশ্বর, যোগীশ্বর ও গণেশ্বের রাজত্বকালে মুসলমান শাসকদের বারবার আক্রমণে এখানকার জনজীবন ও সংস্কৃতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিদ্যাপতির শাস্ত্রজ্ঞ পূর্বপুরুষেরা তাই এগিয়ে আসেন হিন্দু সংস্কৃতির পুনর্গঠনে। বিদ্যাপতিও তাঁদের পথ অনুসরণ করে রচনা করেন একাধিক স্মৃতিশাস্ত্র, সংহিতা ও ব্যবহার-বিষয়ক গ্রন্থ: শৈবসর্বস্বহার, গঙ্গাবাক্যাবলী, দানবাক্যাবলী, বিভাগসার, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী, পুরুষপরীক্ষা। সেই সঙ্গে রাজন্যবৃত্তের তথ্য-সম্বলিত কীর্তিলতাকীর্তিপতাকা নামে দুটি ইতিহাসমূলক গ্রন্থও রচনা করেন তিনি। হিন্দুর ধর্মবিশ্বাসের পুনঃস্থাপনার লক্ষ্যে তিনি রচনা করেন তীর্থমাহাত্ম্যমূলক গ্রন্থ ভূ-পরিক্রমা। সব কটি গ্রন্থ একই রাজার অধীনে একসঙ্গে লিখিত হয়নি। গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত সন-তারিখের সূত্রে বিদ্যাপতির কালনির্ণয়ের চেষ্টা করা যেতে পারে। ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দেবসিংহের নির্দেশে তিনি রচনা করেন ভূ-পরিক্রমাকীর্তিলতা গ্রন্থের উপজীব্য, গণেশের পুত্র রাজা কীর্তিসিংহ কর্তৃক অসলন মানে এক মুসলমানের হাত থেকে পিতৃরাজ্য উদ্ধারের ঘটনা। এটি সম্ভবত ১৪০২-০৪ খ্রিস্টাব্দে রচিত। এই সময় কবির বয়সও অনুমান করা যায় ‘খেলন-কবি’ শব্দযুগ্মের ব্যবহারের সূত্রে। ১৪৩০-৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি রচনা করেন শৈবসর্বস্বহারগঙ্গাবাক্যাবলী। রাজা নরসিংহের রাজত্বকালে (১৪৪০-৬০ খ্রিস্টাব্দ) বিদ্যাপতি রচনা করেন বিভাগসার, দানবাক্যাবলীদুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী। ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দের পর কবি জীবিত ছিলেন কিনা তার নিশ্চিত প্রমাণ নেই। আবার তাঁর একটি বৈষ্ণব পদে ‘রাএ নসরদ শাহ’-র উল্লেখ পাওয়া যায়। নসরদ শাহ ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে জৌনপুর জয় করেন এবং মারা যান ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে। অতএব সার্বিক বিচেবনায় এমন ধারণা করা সঙ্গত যে, বিদ্যাপতির আবির্ভাব ১৩৮০-৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনও এক সময়ে হয়েছিল।

বিদ্যাপতির পদাবলি

[সম্পাদনা]

বাঙালি পাঠকসমাজে বিদ্যাপতির খ্যাতি স্মার্ত-পণ্ডিত হিসেবে নয়, বৈষ্ণব পদাবলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে। মিথিলার বিপর্যস্ত হিন্দু সমাজে শাক্ত ও শৈব আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি যে গ্রন্থগুলি রচনা করেন, তার অনেকগুলির খবর মধ্যযুগের বাঙালি রাখত না। অথচ বাংলায় প্রচলিত তাঁর বৈষ্ণব পদ মিথিলায় প্রচলিত পদের তুলনায় যথেষ্ট বেশি ছিল। বিদ্যাপতি রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ রচনার পাশাপাশি হরগৌরী, কালী, গঙ্গা প্রমুখ দেবদেবী-বিষয়ক পদ এবং প্রহেলিকা-জাতীয় পদও রচনা করেন। এগুলির মধ্যে বৈষ্ণব পদের সংখ্যাই অধিক। তবু মিথিলায় তাঁর খ্যাতি হরগৌরী-বিষয়ক পদকর্তা হিসেবে। কবি ধর্মমতে ছিলেন শৈব। তাই মিথিলাবাসী পণ্ডিতেরা মনে করেন, হরগৌরী-সংক্রান্ত পদগুলিতেই কবির নির্ভেজাল ধর্মবোধ প্রকাশিত হয়েছে; অপরপক্ষে রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদগুলির রচনা তিনি করেন শৃঙ্গার রসের চর্চার প্রয়োজনে। অবশ্য বৈষ্ণব পদের অন্তর্ভুক্ত প্রার্থনা-বিষয়ক পদগুলিতে কবি কৃষ্ণের প্রতি সশ্রদ্ধ, ভক্তিমান ও বিনত। তাঁর এই প্রগাঢ় ভক্তিপ্রাণতাই পদগুলিকে প্রেমাভক্তির প্রবক্তা চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রিয় করে তুলেছিল। জীবনের সমাপ্তিপর্বে দিব্যোন্মাদ চৈতন্য কিছুটা শান্ত হতেন বিদ্যাপতির পদ শ্রবণে। আর সেই সূত্রে রসিক বৈষ্ণবসমাজ ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে বিদ্যাপতির অসংখ্য পদ গেয়ে বাংলার নানা প্রান্তে বিদগ্ধ শ্রোতৃমণ্ডলীতে বিদ্যাপতিকে জনপ্রিয় করে তোলে। জনপ্রিয়তা ও ভক্তির আতিশায্যে বিদ্যাপতি হয়ে যান বৈষ্ণব নবরসিকের অন্যতম। বাংলার পাঠকসমাজই বিদ্যাপতির প্রধান প্রচারক। বাংলায় তাঁর অভাবনীয় সমাদর পরে হিন্দিবলয়ের সাহিত্য-গবেষকদেরও প্রভাবিত করে। তাঁরা বিদ্যাপতির সম্পর্কে নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করে এমন অনেক তথ্য সংগ্রহ করেন যা ইতিপূর্বে অজ্ঞাত এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এক মৈথিল কবির বাংলায় এই বিপুল জনপ্রিয়তার প্রকৃত কারণ লুকিয়ে আছে তাঁর পদে এবং সমকালীন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে। মিথিলার সঙ্গে বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির যোগাযোগ বহুদিনের। বাঙালি ছাত্রেরা নব্যন্যায়ের পাঠ নিতে যেত মিথিলায়। সেখানেই তাদের পরিচয় হয় বিদ্যাপতির পদাবলির সঙ্গে। সেইসব পদ তাঁদের রসিক চিত্তকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁরা সেইসব পদ সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে ভক্তিধর্মের তরঙ্গে উত্তাল সমগ্র বাংলায় বিদ্যাপতির পদ সেই ধর্মের সারস্বত ভাষ্যরূপে গৃহীত হয়। মহাপ্রভুর রসাস্বাদনের ভিতর দিয়ে এইসব পদের নবমূল্যায়ন ঘটে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে গদ-সংকলন গ্রন্থে বিদ্যাপতি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেন। বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর ক্ষণদাগীতচিন্তামণি, রাধামোহন ঠাকুরের পদকল্পতরু ও বৈষ্ণব দাসের পদামৃতসমুদ্র এই তিন বিশিষ্ট সংকলনে বিদ্যাপতির প্রায় আড়াইশো পদ সংকলিত হয়েছে। এছাড়া নেপালের পুথি, রাগতরঙ্গিনী, রামভদ্রপুরের পুথি, তরোনির তালপাতার পুথি ইত্যাদিতেও প্রায় পাঁচশো রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ পাওয়া যায়। তাই কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেন, এই বিপুল পরিমাণ রচনার মধ্যে অন্যের রচনাও হয়তো ঢুকে পড়েছে।

বিদ্যাপতির আবির্ভাব প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে। তখনও বাংলাকে কেন্দ্র করে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের বিকাশ বা বিস্তৃতি ঘটেনি। ফলে বিদ্যাপতির পক্ষে চৈতন্যোত্তর যুগে প্রচারিত প্রেমাভক্তির আদর্শে পদরচনা করা ছিল অসম্ভব। এই কারণে পণ্ডিতসমাজ বিদ্যাপতির পদের আশ্রয় ও আদর্শ হিসেবে দেখেন প্রাকৃত নরনারীর জীবনকে। বৈষ্ণবীয় রসশাস্ত্র তখন লিখিত না হলেও সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের আদর্শ বিদ্যমান ছিল। সেই শাস্ত্রে শৃঙ্গার রস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। রাজসভার সংস্কৃতিতে লালিত ও বর্ধিত বিদ্যাপতি যে গীতগোবিন্দম্‌, শৃঙ্গারশতক, গাথাসপ্তশতী, আর্যাসপ্তশতী, শৃঙ্গাররসাষ্টক ইত্যাদি উগ্র আদিরসাত্মক গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অতএব শৃঙ্গার-রসাত্মক রাধাকৃষ্ণের প্রণয়গীতি রচনায় তিনি যে তাঁর পঠিত ও চর্চিত অধিক্ষেত্রগুলি থেকে উপকরণ, ভাব-ভাষা-ভঙ্গি-প্রকরণ ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক। তবে এও সত্য যে, বিদ্যাপতির সব পদকে সাধারণ নরনারীর জীবনকথা-নির্ভর বলে মনে করা সমীচীন নয়। প্রাকৃত জীবনকথার কাঠামোয় তিনি অপ্রাকৃত জীবনসত্যত ও তত্ত্বদর্শনকে প্রতিফলিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। নইলে আধ্যাত্মিক ভাবে বিভোর চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পদ আস্বাদনে এত প্রীত হতেন না, বৈষ্ণব সাধকদের অনুরাগও এত বর্ধিত হত না। কবির মর্ত্যজীবন-চেতনা আদিরসে সিক্ত হওয়া সত্ত্বেও তা এমনই গভীরতা লাভ করেছিল যে, তার সঙ্গে নৈষ্ঠিক বৈষ্ণবধর্মের তত্ত্বকথার অন্তর্গূঢ় যোগ রচিত হয়। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব।

রাজসভার বিলাসিতাপূর্ণ জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আদিরসাত্মক কাব্যধারার ব্যবহারিক যোগ দেখা দিয়েছিল প্রাচীন যুগেই। সেই প্রবণতা মধ্যযুগেও বর্তমান ছিল। বিদ্যাপতির কবি-চরিত্র ছিল তারই অনুগামী। তিনিও রাজা, রানি, রাজকর্মচারীদের মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্যচর্চায় কখনও কান্তিবোধ করেননি। বিশেষত রাজা শিবসিংহের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সখ্যতার সম্পর্ক। সম্ভবত সেই গভীরতার সূত্র ধরেই শিবসিংহের মহিষী লছিমাদেবীর সঙ্গে বিদ্যাপতির গোপণ প্রণয়-সম্পর্কিত কিছু মুখরোচক গল্প প্রচারিত হয়ে থাকবে। যাই হোক, রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কথায় বিদ্যাপতির আদর্শ ছিলেন জয়দেব। গীতগোবিন্দম্‌-এর রাধাকে একটি বিশিষ্ট চরিত্র করে তুলেছেন বিদ্যাপতি। রাধার মনের ক্রমবিকাশ প্রদর্শনই কবির লক্ষ্য ছিল। সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের নায়িকা-প্রকরণ অবলম্বনে তিনি রাধা চরিত্রের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই প্রাকৃত নায়িকার ন্যায় দেহজ প্রেমের নানা স্তর তাঁর পদাবলিতে ফুটে উঠেছে। বিদ্যাপতির অনেক পরে আবির্ভূত রূপ গোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণি গ্রন্থে মধুর রসের মানদণ্ডে কৃষ্ণপ্রেয়সীদের যে প্রকরণ-বিভাগ করা হয়েছে, রাধাকৃষ্ণের প্রেমের নানা স্তরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, বিদ্যাপতির রচনায় যুক্তিসঙ্গত কারণেই তা দুর্লভ। তবু রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পাঁচশোর মতো পদে বয়ঃসন্ধি, পূর্বরাগ, রূপানুরাগ, অভিসার, মিলন, মাথুর, মান ইত্যাদি পর্যায়গুলির ভাব ও রস পরিবেশনে বিদ্যাপতি সমর্থ হয়েছেন। প্রায় সকল সমালোচকই বিদ্যাপতির রাধার মানসিক বিকাশের তিনটি স্তর প্রত্যক্ষ করেছেন: বয়ঃসন্ধি, মিলন ও বিরহ। এই রাধা চণ্ডীদাসের রাধার ন্যায় প্রতীকী কোনও সত্তা নয়, বরং সজীব প্রাণসত্তাবিশিষ্ট এক নারী। এক কিশোরী বয়ঃসন্ধিকালে দেহে ও মনে যে পরিবর্তনগুলি একাকী নির্জনে লক্ষ্য ও অনুভব করে, কবি তাকে ভাষ্যরূপ দিয়েছেন তাঁর পদে। নিজের দেহলাবণ্য প্রত্যক্ষ করে সে প্রথমে আত্মহারা হয়, পরে মিলনের আকুলতায় তার চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। অতঃপর প্রিয়সঙ্গের বাসনায় সে অভিসারিকা হয়। আকাঙ্ক্ষা তৃপ্তিলাভ করে মিলনে। এই প্রেমে সে কোনও অংশীদারকে স্বীকার করতে নারাজ। তাই তার যাবতীয় মান, কলহ ও খণ্ডিতার ঈর্ষাকাতর বেদনা। সবশেষে ভোগের উত্তাল তরঙ্গলীলা পার হয়ে চিরবিরহের রাজ্যে তার পদার্পণ। বিদ্যাপতির প্রধান কৃতিত্ব এই যে, রাধার কৈশোরাবস্থা থেকে প্রেম-প্রগলভা যুবতী হয়ে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি মানসিক স্তরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলি অত্যন্ত দক্ষ শিল্পীর ন্যায় ভাষার রেখাঙ্কনে মূর্ত করে তুলেছেন তিনি। কয়েকটি পদাংশের সাহায্যে বিদ্যাপতির চিত্রাঙ্কন দক্ষতা বিশ্লেষণ করা যায়।

বিদ্যাপতির রাধা আত্মসচেতন মানবী। কৈশোরাবস্থা থেকে ক্রমশ সে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। যে দুই পদ এতদিন হরিণের ক্ষিপ্রতায় সঞ্চরমান ছিল, সেই গতি তার আশ্রয় নিয়েছে চোখে দৃষ্টিতে। সে এখন ‘ভ্রুবিন্যাসে অভিজ্ঞ’। যৌবনের নীরব পদসঞ্চারে তার দেহবল্লরীতে কত না পরিবর্তন এসেছে। পরম কৌতূহলভরে রাধা তা নিরীক্ষণ করে: “নিরজনে উরজ হেরই কত বেরি। হসই সে আপন পয়োধর হেরি।।” নিজের সঙ্গে নিজের চপলতা শুরু হয়ে যায় কলাবতী নায়িকার। সেই চঞ্চল রূপভঙ্গিমা সম্পর্কে কবি লেখেন: “কবহু বান্ধয়ে কচ কবহু বিথারি। কবহু ঝাঁপয় অঙ্গ কবহু উঘারি।।” যৌবন সমাগমে রাধা অন্তরে অন্তরে অস্থির হয়ে ওঠে। ভয়, ভাবনা, পুলক, শঙ্কা সব কিছু জড়িয়ে সে হয়ে পড়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সেই বিভ্রান্ত রাধার মূর্তিই অদ্ভুতভাবে আঁকেন বিদ্যাপতি: “খনে খনে নয়ন কোন অনুসরঈ। খনে খনে বসনে ধূলি তনু ভরঈ।। খনে খনে দশন ছটা ছুটাহাস। খনে খনে অধর আগে করু বাস।।” এমন সময় কৃষ্ণ সুন্দরী রাধার তনুলতাটি দেখে ফেলেন: “নব জলধর তার চমকয়ে রে জনি বিজুরী রেহ।” কৃষ্ণের চোখে রাধার এই রূপ স্বর্গীয় সুষমায় পরিপূর্ণ। রাধার চরণযুগলে ফুটে উঠেছে যুগ্মপদ্ম, তার দেহের জ্যোতিতে বিদ্যুৎ তরঙ্গের আভাস। অন্যদিকে রাধার মনে জাগে কৃষ্ণমিলনের অভিলাষ। যমুনাপুলিনে তরুদলে কৃষ্ণকে দেখে রাধার অন্তরে পূর্বরাগের ঢেউ খেলে যায়। তার জাগ্রত নারীসত্তা আপন মনেই বলে ওঠে, “এতদিন অছলিহু আপন গেয়ানে। আবে মোর চরণ লাগল পাঁচ বাণে।।” প্রথম প্রেমের লজ্জারক্তিম প্রকাশ তার আনত নয়নে। একই সঙ্গে আনন্দ ও লজ্জা উপস্থিত হয় তার আচরণে। সে না পারে কৃষ্ণের মুখের দিকে তাকাতে, না পারে কৃষ্ণের থেকে মুখ সরিয়ে রাখতে। কবি চাঁদ-চকোরের পরিচিত উপমার আড়ালে রাধার এই অদ্ভুত মনোবিকারটিকে তুলে ধরেন: “অবনত আনন কএ হম রহলিহুঁ/বারল লোচন চোর। পিয়া মুখ রুচি পিবএ ধাবল/জনি সে চাঁদ চকোর।।” কৃষ্ণের রূপে যেমন রাধা বিহ্বল, তেমনই রাধার অপূর্ব রূপমাধুরীতে কৃষ্ণ তন্ময়। এই সৌন্দর্য যেন অপার্থিব, যা নবজলধরে বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় আকস্মিক ও বর্ণোজ্জ্বল। কবি রাধার ক্রমবিবর্তনটি খুব ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে দেখিয়েছেন। সেই সঙ্গে এক দক্ষ মনোবিদের মতো দেখিয়েছেন কীভাবে যৌবনসন্ধিতে দাঁড়ানো এই নারী মিলনাকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাপতির রাধা প্রসঙ্গে লিখেছেন, "বিদ্যাপতির রাধা অল্পে অল্পে মুকুলিত বিকশিত হইয়া উঠিতেছে। সৌন্দর্য ঢল ঢল করিতেছে। হৃদয়ের নবীন বাসনা সকল পাখা মেলিয়া উড়িতে চায় কিন্তু এখনো পথ জানে নাই।"

বয়ঃসন্ধি, পূর্বরাগ ও রূপানুরাগের পর অভিসার ও মিলন। এই দুই পর্যায়ে বিদ্যাপতি আরও রূপদক্ষ। কবির দৃষ্টি এখানে অন্তর্মুখী। এখানেই হৃদয়ের অন্তঃস্থলে রাধার অবতরণ। সমাজের কঠোর শাসনবিধি তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে। কিন্তু “নব অনুরাগিনি রাধা। কিছু নাহি মানএ বাধা।।” কৃষ্ণের বাঁশির সুর চিত্তে যে দুর্নিবার ঢেউ তোলে তারই প্রতিক্রিয়ায় অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে একাই বেড়িয়ে পড়ে পথে। বিপদ আসে উজিয়ে, কিন্তু রাধার পথ চলা থামে না। দুর্গমের অভিযাত্রিনী রাধা প্রেমের তপস্যাকেই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য বলে গ্রহণ করেছেন। পথের ক্লান্তি মুছে যায় কৃষ্ণমিলনে। মিলনের পদে বিদ্যাপতির রাজকীয় আভিজাত্য দেদীপ্যমান। এই পর্যায় রচনায় কবির মনোলোকে নিঃশব্দে বিচরণ করে অমরু, জয়দেব ও কালিদাসের সম্ভোগ-শৃঙ্গারের সমৃদ্ধ ঐশ্বর্য। বিদ্যাপতি যে বর্ণনা ও ধ্বনিঝংকারে জয়দেবের ভাবশিষ্য তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই ছত্রগুলিতে: “কিঙ্কিণী কিনিকিনি কঙ্কণ কনকন কলরব নূপুর বাজে। নিজমদে মদন পরাভব মানল জয় জয় ডিণ্ডিম বাজে।।” এই নিবিড় মিলনের অমেয় আনন্দে অতিবাহিত হয় কত মধুময় রাত্রি। কিন্তু সেই মিলনে চিরতৃপ্তির স্থান নেই। হৃদয়ের আতপ্ত সংরাগ কোথাও শান্ত হয় না। রাধা অশান্ত চিত্তে অনুভব করে: “কত মধুযামিনী রভসে গোয়াঁইলু/ না বুঝলুঁ কৈছন কেল। লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখলুঁ/ তবু হিয়া জুড়ন না গেল।।”

মিলনের উচ্চভূমি পার হয়ে বিরহের অবরোহণ পর্ব। এই পর্বেও বিদ্যাপতি অনন্য, অন্তত চণ্ডীদাসের তুলনায় তাঁর আপেক্ষিক শ্রেষ্ঠত্ব। বস্তুত সম্ভোগকে যিনি অভিজাত আড়ম্বরে দেখতে সক্ষম, তাঁর পক্ষেই ভোগবিরহিত জীবনের নির্জলা শূন্যতার ছবি আঁকা সহজ হয়। যিনি পরিপূর্ণতা দেখেছেন, তিনি বুঝেছেন সর্বরিক্ততার তাৎপর্য। কর্তব্যের আহ্বানে কৃষ্ণ চলে গেল মথুরায়। রাধার সমস্ত জগৎ শূন্য হয়ে গেল। বিরহের আগুন জ্বলে উঠল তার দেহে ও মনে। নিদারুণ সন্তাপে মুহ্যমান হল রাধা। সখী বলল, “অব মথুরাপুর মাধব গেল। গোকুল-মানিক কো হরি নেল। গোকুল উছলল করুণাক রোল। নয়ন জলে দেখ বহয়ে হিলোল।। শূন ভেল মন্দির শূন ভেল নগরী। শূন ভেল দশদিশ শূন ভেল সগরী।।” বৃন্দাবনের কুঞ্জ শূন্য, বর্ণহীন। রাধার আশ্রয় কেবল মিলনের মধুময় স্মৃতিটুকু। সেই স্মৃতি-রোমন্থনে তার দুই চোখ বেয়ে নেমে আসে মন্দাকিনীর ধারা, তার নিঃসীম বিরহ-বেদনা পরিব্যাপ্ত হয়ে দিগ্‌দিগন্তরে ছড়িয়ে পড়ে। কবি সেই বিস্রস্তবসনা ধূলি-ধূসরিতা রোদুদ্যমানা রাধার ছবি আঁকেন পরম যত্নে। বর্ষা বিরহের তীব্রতা সঞ্চারে যোগ্য ঋতু। মিলনের দীর্ঘ অবসর সত্ত্বেও প্রিয়তম কাছে নেই। প্রকৃতিতে সম্ভোগের অনুকূল নানা দৃশয় তাই রাধাকে আকুল করে তোলে। সখীকে সম্বোধন করে সে অতলান্ত বিরহের অতি অল্পই জানাতে সমর্থ হয় সে:

এ সখি হমারি দুখক নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন মন্দির মোর।।
ঝঞ্ঝা ঘন গরজন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরি খন্তিয়া।
কান্ত পাহুন কাম দারুণ
সঘনে খরশর হন্তিয়া।।
কুলিশ শত শত পাত মোদিত
ময়ূর নাচত মাতিয়া।
মত্ত দাদুরী ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া।।

কৃষ্ণের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় রাধার দিন কেটে যায়, কিন্তু প্রিয়তম ফেরে না। অসহ যন্ত্রণায় রাধা কাতর হয়, তবু নিষ্ঠুরের হৃদয় গলে না। সখীকে কৃষ্ণের কাছে পাঠিয়েও ব্যর্থ হয় রাধা। উন্নত যৌবন নিয়ে এখন আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিই বা আছে তার জীবনে: “অঙ্কুর তপন তাপে জদি জারব/ কি করব বারিদ মেহে। এ নব যৌবন বিরহে গোরাঁয়ব/ কি করব সো পিয়া লেহে।।” কিন্তু বিদ্যাপতির রাধার অন্তিম অবস্থান বিরহে নয়, ভাবসম্মিলনে। নাস্তিত্বের এ এক অস্তিবাদী দর্শন। যে প্রিয়তম সম্মুখে সশরীরে নেই, তার অতনু আবির্ভাব রাধা অনুভব করে হৃদয়মন্দিরে। সখীকে বলে, “কি কহব রে সখি আনন্দ ওর। চিরদিন মাধব মন্দিরে মোর।।” শয়নে-স্বপনে ঘুমে-জাগরণে রাধা এখন কৃষ্ণসঙ্গ অনুভব করে। এখন আর স্থূল শরীরের প্রয়োজন নেই। এইভাবেই কায়াহীন প্রেম ভিখারিণী রাধাকে বাঁচিয়ে রাখে, দেহজ আসক্তি পরিণত হয় মানসিক সূক্ষ্ম অনুভবে। এই প্রেম নিত্য নবীন, সজীব সুন্দর; এর মধ্যেই রয়েছে ‘তিলে তিলে নূতন’ হয়ে ওঠার সামর্থ্য।

রাধাকৃষ্ণের প্রেমপ্রসঙ্গের বাইরে আর-এক ধরনের বৈষ্ণব পদ লিখেছিলেন বিদ্যাপতি। সেই পদগুলিতে অন্তর্যামী সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের চরণে ভক্তের বিনম্র আত্মসমর্পণের ভাবটি চমৎকার ফুটে উঠেছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলনের পূর্বে ঈশ্বরপ্রীতির অভিপ্রকাশটি ছিল বৈধীভক্তি। তাই বিদ্যাপতি তাঁর কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভক্তি, পূজা সব নিবেদন করেন অনাদির আদি দীনদয়ালের চরণের। পদাবলিতে এই পর্যায় প্রার্থনা নামে পরিচিত। প্রার্থনার পদেও বিদ্যাপতির শ্রেষ্ঠত্ব। তাঁর দুই বিখ্যাত প্রার্থনা-বিষয়ক পদ “মাধব, বহুত মিনতি করি তোয়” এবং “তাতল সৈকতে বারিবিন্দুসম”। দুই পদেই আত্মবিলাপের সুর প্রতিধ্বনিত। জীবনের সায়াহ্নে তাঁর মন ক্লান্ত বিষণ্ণ, কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, ফলহীন ভবিষ্যতের কথা ভেবে নৈরাশ্যপীড়িত। তবুও ঈশ্বরের প্রতি তাঁর যে অগাধ বিশ্বাস, তাই তাঁর মনে জাগিয়ে তুলেছে ক্ষীণ আশা: “দেই তুলসী তিলু/ এ দেহ সমর্পিলুঁ। দয়া জনু ছোড়বি মোয়।।” এমন নিবিড় আন্তরিকতা জয়দেবের বিষ্ণুবন্দনাতেও দুর্লভ। হয়তো সম্ভোগে বীততৃষ্ণ বৃদ্ধ রাজকবির ব্যক্তিচিত্তের মর্মমন্থনেই এই পদগুলির জন্ম।

বিদ্যাপতির কাব্যাঙ্গিক

[সম্পাদনা]

কবির প্রধান উপজীব্য ভাবকে আকার দেয় ভাষা। তবে সাহিত্যের ভাষা সব ক্ষেত্রে আটপৌরে ভাষা নয়। রসযুক্ত বাক্য কাব্যরচনার প্রাথমিক শর্ত। কথার অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা এবং শব্দদেহকে সুসজ্জিত করার রমণীয় প্রচেষ্টা দুই-ই কাব্যরচনায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছল ছন্দ ও সুচারু অলংকার কাব্যকে করে তোলে সুন্দর। প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজসভার কবিরা এই দুই বিষয়কে সর্বদা গুরুত্ব দিতেন। রাজসভার বিদগ্ধ সদস্যদের কাছে ছিল তাঁদের দায়বদ্ধতা; এই সদস্যবর্গের রুচি, প্রবণতা, শিক্ষা, পাণ্ডিত্য ও রসজ্ঞান অনুসারেই কবিদের কাব্যরচনা করতে হত। কারণ কবিরা ‘অপূর্বনির্মাণক্ষমা প্রজ্ঞা’র অধিকারী হলেও তখনও সৃষ্টিকর্মে তেমন করে স্বাধীনতা পাননি। তুর্কি আক্রমণ-পরবর্তী পূর্ব ভারতের কবি-সার্বভৌম বিদ্যাপতিকেও তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজসভার রুচি ও চাহিদার সঙ্গে সাজুয্য রেখে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। সমালোচকেরা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে, তিনি চণ্ডীদাসের ন্যায় সহজ ভাষায় মর্মস্পর্শী কাব্য রচনা করেননি। তাঁর কাব্য স্থানবিশেষে বাক্‌বৈদগ্ধ্যে পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নিষ্প্রাণ ও কৃত্রিম। এই অভিযোগ কিয়দংশে সত্য বটে। তবে তার কারণও স্পষ্টভাবে অনুমান করা যায়। রাজসভার কবিদের সাহিত্যে হৃদয়বোধের তুলনায় বুদ্ধির খেলাই বেশি দেখা যায়। দরবারি সংস্কৃতির প্রধান বিশেষত্ব যে বর্ণাঢ্য আড়ম্বরতা, তাতেই তাঁরা কাব্যের নানা উপকরণে আশ্রয় করে থাকেন। বিদ্যাপতিও এই চিরন্তন নিয়মের ব্যতিক্রম নন। তাঁর রচনাতেও ভাষার ঔজ্জ্বল্য, ছন্দের ঝংকার, অলংকারের জৌলুস প্রত্যক্ষ করা যায়, সেই সঙ্গে তাতে পরিস্ফুট হয় রূপ ও সৌন্দর্যের চরম উৎকর্ষ। সম্ভবত এক্ষেত্রে বিদ্যাপতির আদর্শ ছিলেন আর-এক সভাকবি জয়দেব। যাই হোক, বিদ্যাপতির পদের কয়েকটি ক্ষেত্র বিবেচনা করে আমরা তাঁর কবিকৃতির উৎকর্ষ বিচার করতে পারি।

প্রণয়কাব্যে নায়ক-নায়িকার রূপবর্ণনা একটি গতানুগতিক অথচ প্রিয় প্রসঙ্গ। বিদ্যাপতিও রাধার রূপবর্ণনা করেছেন: স্নান সেরে উঠেছে রাধা। তার এলোচুল থেকে ঝরে পড়ছে জল। কবির মনে হচ্ছে, সে কেবল জল নয়, কালো কেশের অশ্রু। অস্তিত্ব হারানোর ভয়েই তার কান্না। কারণ, রাধার সুন্দর মুখে যে বিমল জ্যোতি প্রস্ফুটিত তাতে কালো অন্ধকারের অস্তিত্ব বিলীনপ্রায়। কবি লিখেছেন: “চিকুরে গলএ জলধারা। মুখ সসি ডরে রোঅএ অন্ধারা।।” পূর্বরাগের একটি পদে পাওয়া যায়: “লোচন জনু থির ভৃঙ্গ আকার। মধুমাতল কি এ উড়ই ন পার।।” পদটিতে কৃষ্ণের রূপে মুগ্ধ রাধার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। তার মুখটি যেন বিকশিত শতদল। তার কালো চোখ দুটি যেন দুটি অনুপম ভ্রমর। কৃষ্ণরূপ সন্দর্শনে সেই দুই চোখ এত স্থির, এত নিস্পন্দ যে কবির মনে হচ্ছে তারা মধুমত্ত ভ্রমর ছাড়া আর কিছুই না। মধ্যযুগীয় কাব্যে যে কয়েকজন বৈষ্ণব পদকর্তা পদ রচনায় গীতিকাব্যিক সুরমূর্চ্ছনা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, বিদ্যাপতি তাঁদের অন্যতম। তিনি ধ্বনির মাধ্যমে চিত্ররূপ সৃজনে তৎপর হন। এই চিত্ররূপ রচনায় সাদৃশ্যমূলক অলংকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যাপতি তাঁর পদাবলিতে প্রয়োগ করেছেন উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, ব্যতিরেক, অতিশয়োক্তি, ভ্রান্তিমান, নিদর্শন, স্বভাবোক্তি প্রভৃতি অলংকার। কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়:

  1. মধুসম বচন, কুলিশসম মানস প্রথমহি জানি না ভেলা।
  2. সুনইতে রসকথা থাপয়ে চিত। যৈসে কুরঙ্গিনী সুনয়ে সঙ্গীত।।
  3. পাখিক পাখ মীনক পানি। জীবন জীবন হাম ঐছে জানি।।
  4. আওল যৌবন শৈশব গেল। চরণকে চপলতা লোচন লেল।
  5. অধর নীরস মঝু করলনি মন্দা। রাহু গরাসি নিসি তেজল চন্দা।।

বস্তুত কাব্যের বহিরঙ্গ প্রসাধনকলায় বিদ্যাপতি দক্ষতা অতুলনীয়। কাব্যরসিকের প্রাণ ও কানকে মাতিতে তুলতে তিনি অর্থালংকারের পাশাপাশি অনুপ্রাস, শ্লেষ, বক্রোক্তির ন্যায় শব্দালংকারও ব্যবহার করেছেন। প্রাকৃত ও অপভ্রংশ সাহিত্যে এই ধ্বনিঝংকার দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিল। বিদ্যাপতি অবহট্ট ভাষাতেও সাহিত্য রচনা করেন। তাঁর পদাবলিতে একই ধ্বনির পৌনঃপুনিক ব্যবহারে একপ্রকার অনুরণন ধ্বনিত হয়েছে। যার উদাহরণ:

  1. ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া।
  2. গেলি কামিনী গজহুগামিনী বিলসি পলটি নেহারি।
  3. চঞ্চল লোচনে বন্ধ নেহারনি অঞ্জন শোভন তায়।

অলংকার ব্যতীত কাব্যের আর-এক প্রসাধনসামগ্রী হল ছন্দ। ছন্দের আবেদন শ্রুতিতে। প্রাচীন যুগ থেকেই কাব্যের বাহন এই ছন্দ। তাই নানা কবির হাতে নানাপ্রকার ছন্দ উৎপন্ন ও ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। বিদ্যাপতির সমকালে বাংলায় পয়ার ও ত্রিপদীর ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। বিদ্যাপতি সেই দুই ছন্দ অল্পস্বল্প প্রয়োগ করেন। তুলনায় প্রাকৃত ছন্দের প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি। পয়ারের পূর্বরূপ পজ্ঝটিকা, চর্চরী, দোহা, অতিশক্করী ছন্দের ব্যবহারে তিনি অধিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। হিন্দি চৌপাঈ ছন্দ দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হন। কবি কালিদাস রায় তাঁর প্রাচীন বঙ্গসাহিত্য গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। বিদ্যাপতি-ব্যবহৃত কয়েকটি ছন্দের নিদর্শন নিচে দেওয়া হল:

  1. পজ্ঝটিকা: সৈসব জৌবন উপজল বাদ। কেও ন মানএ জয় অবসাদ।।
  2. মিশ্র ছন্দ: অরিসম গঞ্জয়ে পুন পুন রঞ্জয়ে আপন মনোরথ আই।
  3. একাবলী: সাজনি মাধব দেখল আজ। মহিমা ছাড়ি পলাএল লাজ।
  4. দিগক্ষরা: জহাঁ জহাঁ কুটিল কটাখ। ততহিঁ মদন শর লাখ।।
  5. ত্রিপদী: চিকুর নিকর/ তম সম পুনু/ আনন পুনিম সসী।
  6. চর্চরী: চরণ জাবক হৃদয় পাবক দহই সব অঙ্গ মোর।
  7. পয়ার: কবহু বান্ধয়ে কচ কবহু বিথারি। কবহু ঝাঁপয় অঙ্গ কবহু উঘারি।।

বিদ্যাপতির পদাবলির ভাষাপ্রসঙ্গও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যাপতি বাঙালি ছিলেন কিনা তা নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন প্রধান সংশয় সৃষ্টি হয় তাঁর ভাষা নিয়ে। এই ভাষা যে পঞ্চদশ শতকের বাংলা নয়, পণ্ডিতেরা তা একবাক্যে স্বীকার করে নেন। পরে বিদ্যাপতির জাতি নির্ধারিত হতে বোঝা যায়, তিনি যে ভাষায় পদরচনা করেন তার নাম ব্রজবুলি। এই ভাষার ধ্বনিস্পন্দন, শব্দ-সমাবেশ ও ছন্দের দোলা এত মনোহারী যে, বাংলায় বিদ্যাপতির পদ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলে অনেক যশোলিপ্সু বাঙালি কবি ব্রজবুলিতে পদরচনায় যত্নবান হন। এককালে এই ব্রজবুলিকে মনে করা হত মথুরা-বৃন্দাবন অর্থাৎ ব্রজমণ্ডলের ভাষা। বৈষ্ণবেরা এই ভাষাকেই রাধা, কৃষ্ণ ও সখীদের মুখের ভাষা মনে করতেন। পরে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় অবশ্য সেই মত খারিজ হয়ে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “ব্রজের ভাষা পশ্চিমা অপভ্রংশের (শৌরসেনী) বংশধর এবং এটি কথ্য ভাষা, মথুরা বৃন্দাবনের জনসাধারণের ভাষায় ব্রজভাষা যা ঐ অঞ্চলের লোকমুখে ‘ব্রজ-ভাখা’ নামে পরিচিত। অপরদিকে বাংলাদেশে ব্রজবুলিতে রচিত যে পদ পাওয়া গেছে, তা পূরবীয়া অপভ্রংশ (মাগধী) থেকে জন্মলাভ করেছে। 'ব্রজ-ভাখা’ জীবন্ত কথ্য ভাষা—আজও প্রচলিত আছে। কিন্তু ‘ব্রজবুলি’ কৃত্রিম ভাষা, বৈষ্ণব পদাবলী বা ঐ শ্রেণীর কাব্য গান ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয়নি, এ ভাষায় কেউ কখনো কথা বলেনি, এখনও বলে না।” বিদ্যাপতি যে ব্রজবুলির জন্ম দিয়েছিলেন, তার প্রধান আশ্রয় ছিল মৈথিলী ভাষা ও তার ব্যাকরণ। পরে অঞ্চল ভেদে একাধিক ব্রজবুলির রূপ গড়ে ওঠে। বাংলায় বাংলা শব্দ, উড়িষ্যাতে ওড়িয়া ও অসমে অসমীয়া শব্দ তার মধ্যে কালক্রমে অনুপ্রবিষ্ট হয়। বিদ্যাপতির বিশুদ্ধ মৈথিলী পদ পাওয়া গিয়েছে মিথিলা ও নেপাল থেকে। ষোড়শ-সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি কবিরা ব্রজবুলিতে পদ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। কীর্তনের আসরে প্রধানত ব্রজবুলির পদই গাওয়া হত তার সাংগীতিক মূল্যের কারণে। বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য বলে কথিত গোবিন্দদাস তাঁর সমস্ত সুচারু পদেই ব্যবহার করেছিলেন ব্রজবুলিকে, অবশ্য দু-একটি বাংলা শব্দ মিশিয়ে। রসাবেদন, ধ্বনিসুষমা ও অলংকারপ্রিয়তার কারণে তিনি বৈষ্ণবসমাজে ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ নামে পরিচিত হন। উনিশ শতকেও রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলিতে রচনা করেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী। এগুলি ব্রজবুলির জনপ্রিয়তা ও অনন্য প্রকাশদক্ষতারই প্রমাণ। একটি কৃত্রিম সাহিত্যভাষা হিসেবে জন্মলাভ করে মধ্যযুগীয় বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছিল যে ব্রজবুলি, তার স্বষ্টা হিসেবেই বিদ্যাপতি এক স্মরণীয় শিল্পী।

বিদ্যাপতি সমস্যা

[সম্পাদনা]

ঐতিহাসিক তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিতে যে-সব সমস্যা দেখে দিয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হল কবি-পরিচিতির সমস্যা। কবিরা নামমাত্র ভণিতা ব্যবহার করে নিজেদের রচনায় নাম মুদ্রাঙ্কিত করতেন। কিন্তু তাতে নকলের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়নি। যশস্বী কবির নামে অনেক যশোলিপ্সু অথচ অক্ষম রচয়িতা গুণমানে দুর্বল রচনাও চালিতে দিতে চাইতেন। পালাগানের কীর্তনীয়ারাও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য অখ্যাত কবির, এমনকি স্বরচিত রচনাও বিখ্যাত কবির ভণিতা-সংযুক্ত করে গাইতেন। এইভাবে নকলের প্রাদুর্ভাবে আসলকে চেনা দুষ্কর হয়ে ওঠে। বিদ্যাপতির ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশ প্রকট, তবে চণ্ডীদাসের ন্যায় অতটা জটিল নয়। মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি ‘মৈথিল কোকিল’ হিসেবে সমগ্র উত্তর ভারতে সম্মানিত। মিথিলার রাজসভাকবি হয়েও সমগ্র পূর্ব ভারতের রসিক পাঠকের প্রাণে তিনি যে রসের হিল্লোল বইয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা কয়েক শতক পেরিয়ে আজও অম্লান হয়ে রয়েছে। মহাপ্রভুর নেতৃত্বে গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন সূচিত হওয়ার পর বিদ্যাপতি প্রভূত পরিমাণে পঠিত, গীত ও শ্রুত হয়েছেন ভক্তিরসার্দ্র বাংলায়। সেই সময়ে অনেকেই তাঁর পদাঙ্কন অনুসরণ করে পদরচনায় আগ্রহী হন। কেউ কেউ ব্যবহার করেন ‘বিদ্যাপতি’ ভণিতাও। পরবর্তীকালের গবেষকেরা সমস্যায় পড়েছেন এখানেই। আসল থেকে নকলকে পৃথক করা সত্যই কঠিন কাজ। তবে কয়েকটি পদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে সেগুলিকে পৃথক করা সম্ভব হয়েছে। কারণ, মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতির রাজকীয় আভিজাত্য, বিপুল বৈদগ্ধ্য, মার্জিত রুচি ও পরিশীলিত কাব্যভাষা এইসব পদে পাওয়া যায় না। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী গ্রন্থে এই ধরনের ব্রজবুলিতে লেখা নকল পদগুলিকে ‘বাঙালি বিদ্যাপতি’র চরনা বলে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। বাঙালি বিদ্যাপতিদের চেনার আর-একটি উপায় তাঁদের ভাষা। বিদ্যাপতির নামে প্রচলিত বাংলা পদগুলি যে শিবসিংহের সভাকবি রচনা করেননি এ বিষয়ে ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তিজাল বিস্তার বাহুল্য। অথচ পদকল্পতরু সংকলনে বিদ্যাপতির ভণিতাযুক্ত ৮টি বাংলা পদ সংকলিত হয়েছে, যেগুলির সঙ্গে মিথিলা ও নেপাল থেকে প্রাপ্ত পদের কোনও মিলই নেই। বিদ্যাপতি নিজের নাম ছাড়া আরও কিছু বিরুদ বা অন্য ভণিতা ব্যবহার করতে। যেমন: অভিনব জয়দেব, নবজয়দেব, কবিকণ্ঠহার, সরস কবিকণ্ঠহার। মিথিলা থেকে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে এগুলির প্রামাণিকতা মোটামুটি স্বীকৃত। কিন্তু গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধকবৃন্দ ও পণ্ডিতেরা নির্বিচারে কতকগুলি ভণিতাকে বিদ্যাপতির বলে নির্দেশ করে ওই নামধেয় পদগুলিকে বিদ্যাপতির বলে চালিয়ে দিয়েছেন। এই বিচারাধীন ভণিতাগুলি হল কবিরঞ্জন, কবিশেখর, শেখর, চম্পতি, বল্লভ, ভূপতিসিংহ ইত্যাদি। সপ্তদশ শতকের কবি রায়শেখর ব্রজবুলিতে পদ লিখেছিলেন। তিনি শেখর ও কবিশেখর ভণিতা দিতেন। চম্পতি ছিলেন উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্রের সভাকবি। তাঁর অনেক পদ আছে বিদ্যাপতির অনুকরণে। অষ্টাদশ শতকের বিশিষ্ট বৈষ্ণব তত্ত্ববিদ ও রসবেত্তা বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বল্লভ ভণিতায় পদ লিখতেন। এক সময়ে বসন্ত রায় ও বিদ্যাপতি অভিন্ন বলে বিবেচিত হতেন। সর্বাধিক গোলযোগ সৃষ্টি হয় কবিরঞ্জনকে নিয়ে। রঘুনন্দনের এক শিষ্য কবিরঞ্জন পদ লিখতেন তিন রকম ভণিতায়—বিদ্যাপতি, ছোটো বিদ্যাপতি ও কবিরঞ্জন। কেউ কেউ বিদ্যাপতির ভণিতাযুক্ত বাংলা পদগুলিকে তাঁর রচনা বলে মনে করেন। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের মিলন সংক্রান্ত যে গল্প দীর্ঘকাল প্রচলিত, তার একটি মীমাংসা সূত্র পাওয়া যায় এই ছোটো বিদ্যাপতির অস্তিত্বের স্বীকৃতিতে। নরোত্তম ঠাকুরের শিষ্য দীন চণ্ডীদাসের সঙ্গে ছোটো বিদ্যাপতির সাক্ষাৎ হওয়ার ঘটনাটি পরবর্তীকালে হয়তো গৌরবমণ্ডিত হয়ে বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়ে থাকবে। এই ধরনের নকল বিদ্যাপতি (Psudo Vidyapati) সম্পর্কে জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন লিখেছেন, "Numbers of imitators sprang up, many of whom wrote in Vidyapati's name so that it is now difficult to separate the genuine from the imitations, especially as the former have been altered in the course of ages to suit the Bengali idiom and metre." তাই আধুনিক নিষ্ঠাবান গবেষকের অন্যতম কাজই হল এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নকল কবি-পরিচয় থেকে প্রকৃত বিদ্যাপতিকে উদ্ধার করে সমস্ত পূর্বসংস্কার ত্যাগ করে বিশুদ্ধ রসজ্ঞানের মাপকাঠিতে মিথিলার সভাকবি তথা নাগরিক মনোভাবের কবি বিদ্যাপতির কবিকৃতি বিচার করা।

চণ্ডীদাস

[সম্পাদনা]

চণ্ডীদাস বাংলার প্রাণের কবি। জীবনবোধ ও কাব্য-পারিপাট্যে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন রাজসভার কবি বিদ্যাপতির প্রায় বিপরীত মেরুতে। তবে বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীদাসের সংখ্যা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। বিদ্যাপতি-সমস্যার চেয়ে আকারে ও প্রকারে অনেক জটিল চণ্ডীদাস-সমস্যা। তবে একটি ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই যে, চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পূর্বে পদাবলির জগতে এক চণ্ডীদাস ছিলেন, যাঁর করুণ, কোমল, মধুর, আবেগাত্মক পদ মহাপ্রভু পাঠ করতেন। এঁকেই সাহিত্যের ইতিহাসকারেরা ‘পদাবলির চণ্ডীদাস’ বলে নির্দেশ করেছেন। বৈষ্ণব পদ-সাহিত্যে চণ্ডীদাস এক অগ্রণী কবি। বিদ্যাপতির ন্যায় তিনিও হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালের আদর্শ। বৈষ্ণব পদাবলির মুখ্য বিষয় হল প্রেম। চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণকে আশ্রয় করে যেন সেই প্রেমের তত্ত্বকথা রচনা করেছেন। অল্প কথায় অনলংকৃত ভাষায় তাঁর পদে প্রেমানুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে। তাঁর রচনায় তত্ত্বপ্রাধান্যের কারণে রাধা পরিচিত সংস্কারের কোনও সজীব মানবী নন, বরং প্রেমের চিরন্তন নায়িকার প্রতীক। পূর্বরাগ থেকে রসোদ্‌গার পর্যন্ত সেই রাধার কোনও বিবর্তনই চোখে পড়ে না। এই সূক্ষ্মভাবাত্মিকা জ্যোতির্ময়ী বিগ্রহ সৃষ্টি করে চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথাকে সাংসারিক তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে সহজ সরল অনাড়ম্বর ভাষায়। প্রসাদগুণ তাঁর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ললিত শব্দের তরল প্রবাহে প্রাঞ্জল অর্থের গৌরবে তাঁর কাব্য ধন্য। অথচ তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও অকথিত বাণীর চমৎকার অনুভব আর কোথাও তেমন পাওয়া যায় না। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পারস্পরিক তুলনা করে রবীন্দ্রনাথ ‘চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমাদের চণ্ডীদাস সহজ ভাষার সহজ ভাবের কবি, এই গুণে তিনি বঙ্গীয় প্রাচীন কবিদের মধ্যে প্রধান কবি। তিনি একছত্র লেখেন ও দশছত্র পাঠকদের দিয়া লিখাইয়া লন।… বিদ্যাপতি সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি। বিদ্যাপতি বিরহে কাতর হইয়া পড়েন, চণ্ডীদাসের মিলনেও সুখ নাই। বিদ্যাপতি জগতের মধ্যে প্রেমকে সার বলিয়া জানিয়াছেন, চণ্ডীদাস প্রেমকেই জগৎ বলিয়া জানিয়াছেন। বিদ্যাপতি ভোগ করিবার কবি, চণ্ডীদাস সহ্য করিবার কবি। চণ্ডীদাস সুখের মধ্যে দুঃখ ও দুঃখের মধ্যে সুখ দেখিতে পাইয়াছেন, তাঁহার সুখের মধ্যেও ভয় ও দুঃখের প্রতিও অনুরাগ।” প্রকৃতপক্ষে বাংলা গীতিকাব্যের যথার্থ প্রস্তাবনা চণ্ডীদাসের পদে। ব্যক্তিগত কোনও বিশেষ ভাব কিংবা আবেগ যদি গীতিকাব্যের প্রণোদনা সঞ্চার করে থাকে, তবে চণ্ডীদাসের পদে তার প্রথম সার্থক প্রকাশ। চণ্ডীদাসের রচনায় যে ব্যাকুলতা, যে আবেগ, যে গভীর মর্মস্পর্শী হৃদয়ঝংকার আছে, তার তুলনা সমগ্র পদাবলি সাহিত্যে দুর্লভ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই কবির জীবনেতিহাস আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে। জনশ্রুতি অনুসারে, চণ্ডীদাসের জন্ম বীরভূমের নানুরে। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। প্রথম জীবনে ‘বাশুলী’ অর্থাৎ চণ্ডীর পূজক, পরে সহজিয়া সাধনমার্গের পন্থা অবলম্বন করেন। রামী নামে এক রজককন্যার প্রতি তিনি আসক্ত হন। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল এক রাজার ক্রোধের শিকার হয়ে মত্ত হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে। বিদ্যাপতির সঙ্গেও গঙ্গাতীরে তাঁর সাক্ষাতের জনশ্রুতি আছে, সেখানে বসে তাঁরা সহজিয়া তত্ত্ব বিষয়ে গভীর আলোচনা করেন। তবে এই সব কিংবদন্তির কোনও বাস্তব প্রমাণ নেই।

চণ্ডীদাস-সমস্যা

[সম্পাদনা]

বিদ্যাপতি-সমস্যা মূলত উনিশ শতকের গবেষকদের চিন্তাজগতে ঢেউ তুলেছিল; বিশ শতকে মধ্যযুগীয় সাহিত্য আলোচনায় দেখা দিল চণ্ডীদাস-সমস্যা। আসলে উনিশ শতকে চণ্ডীদাসের কবিব্যক্তিত্ব নিয়ে কোনও সংশয় উত্থাপনের অবকাশ সৃষ্টি হয়নি। কারণ, চণ্ডীদাস বলতে তখন এক ও অভিন্ন পদকর্তার কথাই জানতেন সকলে, যাঁর মধুর গান মাতিয়ে রেখেছিল বাঙালি শ্রোতৃমণ্ডলীকে। বিদ্যাপতি-চর্চার পাশাপাশি তাই বেশ সাড়ম্বরেই চণ্ডীদাসের পদের ভাবগভীরতা নিয়ে আলোচনা চলত সেই সময়ে। কেউ কেউ বিদ্যাপতির সঙ্গে চণ্ডীদাসের তুলনামূলক আলোচনা করে উভয়ের কবিব্যক্তিত্বের পার্থক্য ও স্বরূপ নির্ণয়েও সচেষ্ট হয়েছিলেন। ১৮৫৮ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ভাষার ভিত্তিতে এই দুই কবির পারস্পরিক তুলনা করেন ‘বঙ্গভাষার উৎপত্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধে। কবিচরিত গ্রন্থের রচয়িতা হরিমোহন মুখোপাধ্যায় বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের মিলন-সংক্রান্ত পদ উদ্ধৃত করে এই সম্পর্কিত কিংবদন্তিটি উল্লেখ করেছিলেন। মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বঙ্গভাষার ইতিহাস গ্রন্থেও চণ্ডীদাস প্রসঙ্গ রয়েছে। ১৮৭৪ সালে জন বিমস কোনও তথ্য-উৎসের উল্লেখ ব্যতিরেকেই উল্লেখ করেন যে, চণ্ডীদাসের জন্ম হয়েছিল ১৪১৭ খ্রিস্টাব্দে এবং ৬২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয় ১৪৭৮ খ্রিস্টাব্দে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম ধারাবাহিক ইতিহাসকার রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব গ্রন্থে চণ্ডীদাস সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত অধিক তথ্য দেন। তাঁর আলোচনায় রামী রজকিনীর প্রসঙ্গ বর্জিত হলেও চণ্ডীদাস যে বাশুলী দেবীর পূজক ছিলেন সেকথা উল্লিখিত হয়। রমেশচন্দ্র দত্ত দ্য লিটারেচার অফ বেঙ্গল গ্রন্থে চণ্ডীদাস নামের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করে কবি যে ‘বাশুলী’ অর্থাৎ চণ্ডীর সেবক ছিলেন, এমন অভিমত প্রকাশ করেন। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থে চণ্ডীদাস প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয় এবং চণ্ডীদাসের মৃত্যু সম্পর্কে নতুন তথ্য সন্নিবেশিত হয় এতে। চণ্ডীদাস সম্পর্কে আলোচনা প্রকাশে পাশাপাশি তাঁর পদ সংগ্রহ ও প্রকাশের চেষ্টাও করেন অনেকে। অষ্টাদশ শতকে ক্ষণদাগীতচিন্তামণি ছাড়াও পদামৃতসমুদ্র-এ চণ্ডীদাসের ১২টি এবং পদকল্পতরু-তে ১১৮টি পদ পাওয়া যায়। উনিশ শতকে চণ্ডীদাসের পদ সংকলনে অগ্রসর হন অক্ষয়চন্দ্র সরকার, রমণীমোহন মল্লিক, নীলরতন মুখোপাধ্যায় প্রমুখেরা। পদ-সংকলনে উত্তরোত্তর পদসংখ্যা বৃদ্ধি পাঠকসমাজে চণ্ডীদাসের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তারই সূচক। এমতাবস্থায় ১৩০৫ বঙ্গাব্দে নগেন্দ্রনাথ বসু রামী ও চণ্ডীদাস-সংক্রান্ত সহজিয়া রাগাত্মিকাশ্রয়ী ১৪টি পদ এবং ১৩২১ বঙ্গাব্দে ব্যোমকেশ মুস্তাফী চণ্ডীদাসের ভণিতাযুক্ত কৃষ্ণের জন্মলীলা ও রাধার কলঙ্কভঞ্জন বিষয়ে দুটি পালাগান প্রকাশ করলে কবির একক ব্যক্তিত্ব নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। এরপর ১৩২৩ বঙ্গাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে বড়ু চণ্ডীদাসের বৃহদায়তন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পুথিটি প্রকাশ করেন। সব শেষে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে মণীন্দ্রমোহন বসু দীন চণ্ডীদাসের ভণিতাযুক্ত বড়ো মাপের একটি পালা আবিষ্কার করে প্রকাশ করেন। এর ফলে প্রচণ্ড জটিল আকার ধারণ করে চণ্ডীদাস-সমস্যা। বাংলা সাহিত্যে মোট কতজন চণ্ডীদাস আবির্ভূত হয়েছেন, প্রাক্‌-চৈতন্যযুগে কোন চণ্ডীদাস পদরচনা করেছেন, এবং কার রচিত পদ চৈতন্য মহাপ্রভু আস্বাদন করতেন—এই প্রশ্নগুলি গবেষকদের বিভ্রান্ত করে তোলে। বলা বাহুল্য, এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কেউই মতৈক্যে পৌঁছাননি। নানা জন নানা যুক্তিতে যে যার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন।

সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা-য় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধে চণ্ডীদাস-সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করেন গবেষকেরা। ১৩১৮ বঙ্গাব্দে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ উক্ত পত্রিকায় ‘চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বড়ু চণ্ডীদাসের কথা জানালেন। ১৩২৬ বঙ্গাব্দে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি লিখলেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে সংশয়’। ১৩২৬ ও ১৩২৯ বঙ্গাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘চণ্ডীদাস’ প্রবন্ধে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর প্রামাণিকতা স্বীকার করে নিয়ে তাঁর মতো করে চণ্ডীদাস-সমস্যার সমাধান করেন। শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে, প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে দুইজন এবং চৈতন্যোত্তর কালে একজন—মোট তিনজন চণ্ডীদাস বিদ্যমান ছিলেন। প্রথম দুইজনের মধ্যে একজন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস এবং অন্যজন পদাবলির চণ্ডীদাস। পদকর্তা চণ্ডীদাস সংখ্যায় কম পদ রচনা করলেও তা কাব্যগুণে অতি উৎকৃষ্ট। অন্যদিকে চৈতন্যোত্তর যুগে আবির্ভূত দীন চণ্ডীদাসের পদ নিকৃষ্ট। শাস্ত্রী মহাশয়ের সঙ্গে একমত হন সতীশচন্দ্র রায়। ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে মণীন্দ্রমোহন বসু ‘দীন চণ্ডীদাস’ প্রবন্ধে তাঁর আবিষ্কৃত পালার পরিচয় দিতে গিয়ে জানালেন, বাংলা সাহিত্যে মাত্র দুইজন চণ্ডীদাস আবির্ভূত হয়েছিলেন—চৈতন্যপূর্ব যুগে বড়ু চণ্ডীদাস এবং চৈতন্যোত্তর যুগে দীন চণ্ডীদাস। দ্বিতীয়জন পালাগানের সঙ্গে পদরচনাও করেছিলেন। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘রসশাস্ত্র ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ প্রবন্ধে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় জানালেন যে, চণ্ডীদাসের সংখ্যা তিন। তার মধ্যে একজন প্রাক্‌চৈতন্য যুগের বড়ু চণ্ডীদাস এবং অপর দুইজন চৈতন্যোত্তর কালের দ্বিজ চণ্ডীদাস ও দীন চণ্ডীদাস। তিনি এও বলেন যে, বড়ু চণ্ডীদাসের কয়েকটি পদ ভাষাগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে উৎকৃষ্ণ পদে পরিণত হয়েছে। সহজিয়া চণ্ডীদাসের অস্তিত্ব তিনি স্বীকার করেননি। তাঁর মতামত সমর্থন করেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ মিত্র দুইজন চণ্ডীদাসের অস্তিত্ব স্বীকার করেন—একজন দ্বিজ চণ্ডীদাস ও অন্যজন দীন চণ্ডীদাস। তাঁর মতে, দ্বিজ চণ্ডীদাস আবির্ভূত হন প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে এবং তিনিই উৎকৃষ্ট পদ-রচয়িতা। অন্যদিকে চৈতন্যোত্তর কালের দীন চণ্ডীদাসের পদ নিকৃষ্ট। বড়ু চণ্ডীদাসের কোনও অস্তিত্ব তিনি মানতে চাননি। অধ্যাপক বিমানবিহারী মজুমদারের মতে, চণ্ডীদাস চারজন। তার মধ্যে পদাবলির চণ্ডীদাস প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে, বড়ু চণ্ডীদাস চৈতন্যের সমকালে এবং দীন ও দ্বিজ চণ্ডীদান চৈতন্যোত্তর কালে আবির্ভূত হন। দীন চণ্ডীদাস ছিলেন পালাগানের রচয়িতা এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস গোস্বামী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উৎকৃষ্ট পদ রচনা করেন। সহজিয়া চণ্ডীদাসকে তিনি স্বীকার করেননি। ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘বড়ু চণ্ডীদাসের পদ’ নামে একটি প্রবন্ধে তিন যুগে তিন চণ্ডীদাসের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বড়ু চণ্ডীদাস প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে, দ্বিজ চণ্ডীদাস চৈতন্য সমকালীন যুগে এবং দীন চণ্ডীদাস চৈতন্যোত্তর কালে আবির্ভূত হন। সুকুমার সেন ১৩৪০ বঙ্গাব্দে সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা-য় ‘শ্রীখণ্ডের সম্প্রদায় ও চণ্ডীদাস’ এবং ১৩৪৭ বঙ্গাব্দে আনন্দবাজার পত্রিকা-য় ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ প্রবন্ধে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে দুইজন চণ্ডীদাসের কথা বলেন—একজন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস এবং অন্যজন চণ্ডীদাস, তিনি দীন বা দ্বিজ যে নামেই পরিচিত হন না কেন। এই দ্বিতীয় চণ্ডীদাসই সুবৃহৎ কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক কাব্য প্রণয়ন করেন এবং বৈষ্ণব মহান্তদের রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন ইনিই। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য চারজন চণ্ডীদাসের অস্তিত্বে বিশ্বাসী—প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে বড়ু চণ্ডীদাস ও পদাবলির চণ্ডীদাস এবং চৈতন্যোত্তর যুগে সহজিয়া চণ্ডীদাস ও দীন চণ্ডীদাস। চৈতন্য মহাপ্রভু পদাবলির চণ্ডীদাসের পদের রসাস্বাদন করতেন বলে তিনি মনে করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্বের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ দীনেশচন্দ্র সেন আবার একক চণ্ডীদাসের অস্তিত্বে আস্থাবান ছিলেন। কোনওরূপ বিচার-বিবেচনা না করেই কেবল আবেগতাড়িত হয়ে তিনি লিখেছিলেন, “আমার নিকট চণ্ডীদাস এক ভিন্ন অভিন্ন নহে।… অপরিণত বয়সের চাপল্যে চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ন্যায় অতি অশ্লীল কাব্য রচনা করেন, পরে শিল্পীস্বভাবের ক্রম-বিবর্তনের ফলে পরিণত বয়সে অতি অপূর্ব প্রেমভাব-সমৃদ্ধ পদসাহিত্য রচনা করেন।” বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ তাঁর এই মত সমর্থন করেন। পরবর্তীকালে জনার্দন চক্রবর্তী ও ক্ষুদিরাম দাসও তাঁকে সমর্থন জানান। বস্তুত চণ্ডীদাসের সংখ্যা, আবির্ভাবকাল, রচনার স্বরূপ এবং মহাপ্রভুর রসাস্বাদন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এভাবে প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল ধরে বিবাদ-বিতর্ক চলেছে, কিন্তু কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানসূত্র বেরোয়নি। অবশ্য প্রাপ্ত রচনার প্রকৃতি ও প্রকরণ বিচার করে চারজন চণ্ডীদাসের অস্তিত্বে বিশ্বাসী হওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। এঁদের দুইজনের আবির্ভাব প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে, অপর দুইজন পদ রচনা করেন চৈতন্যোত্তর কালে। অবশ্য সকলের পিতৃদত্ত নাম চণ্ডীদাস ছিল কিনা তাতে সন্দেহ আছে। প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের কোনও এক চণ্ডীদাসের খ্যাতিতে প্রলুব্ধ হয়ে পরবর্তীকালে তাঁর নাম যে ব্যবহার করা হয়নি, একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

চণ্ডীদাসের পদাবলি

[সম্পাদনা]

কবিত্ব যে বৈদগ্ধ্য কিংবা ভূয়োদর্শিতার উপর নির্ভরশীল নয়, চণ্ডীদাসের পদাবলি তার উজ্জ্বল প্রমাণ। বিদ্যাপতির রাজকীয় আভিজাত্য, বাহ্যিক চাকচিক্য ও সচেতন বাক্‌পটুত্বের কাছে চণ্ডীদাসকে আপাতভাবে বিবর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁর দৃষ্টি জীবনের উপরিতলের কোলাহল থেকে নিঃশব্দে নেমে গিয়েছে নিস্তব্ধ চিত্তের গহনে, তাঁর পক্ষে বাইরের জাঁকজমকের আর প্রয়োজনীয়তা নেই। চণ্ডীদাস নেমেছিলেন প্রেমতত্ত্বের গভীরে, দেহ ছেড়ে আত্মার অনুসন্ধানে। তাই আত্মার রহস্য-শিখার দীপ্তি তাঁর কাব্যে উজ্জ্বল। তাঁর পদাবলি অনুভূতির অতলস্পর্শী সমুদ্রের তলদেশ থেকে আহরিত অশ্রুবিন্দুর গ্রন্থনে সৃজিত মুক্তাহার। সেই গান কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে বাঙালিকে আকুল করে তুলেছে যুগে যুগে। তিনি বাঙালির জীবনের বেদনার কেন্দ্রে আপন বাণীর স্পর্শ দিয়েছিলেন। এই বেদনার যোগেই চণ্ডীদাসের পদাবলি এত আপন হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ যে চণ্ডীদাসকে “দুঃখের কবি” বলেন, তার কারণ তাঁর রাধা কখনই সুখী নয়, এমনকি পূর্বরাগের পদেও রাধা দুঃখসমুদ্রে ভাসমান। এই দুঃখ লৌকিক কোনও দুঃখ নয়, তা অনাদিকালের অজ্ঞাত কারণ ও অনির্ণেয়ের বিরহ-বিষাদ।

বিদ্যাপতির রাধার সঙ্গে চণ্ডীদাসের রাধার প্রধান পার্থক্য এই যে, বিদ্যাপতির রাধা ক্রমবিবর্তনশীল এক সত্তা, তার যাত্রাপথের আদি-অন্ত আছে। কিন্তু চণ্ডীদাসের রাধায় এই বিবর্তন নেই বললেই চলে; পূর্বরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহে কোনও বিষম দৃষ্টিগ্রাহ্য পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। বেদনাকাতরা এই রাধার জন্ম কবির ব্যথিত জীবনবোধ থেকেই হওয়া সম্ভব। যাঁরা চণ্ডীদাসের সঙ্গে রামীর সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন, তাঁরা বলেন যে এই অসামাজিক প্রেম তাঁর ব্যক্তিজীবনে নানা জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। সমাজের কঠোর নিয়মের যূপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত হয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা। তাঁর সেই সারাজীবনের বেদনা ও ক্রন্দন আর্তির আকারে রাধাচিত্তে তিনি বীজস্বরূপ বুনে দিয়েছিলেন। তিনি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে কবি-প্রত্যয় লাভ করেন, সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনদর্শন, যা বেদনার স্বরূপের মধ্যে নিহিত। একটি পদে কবি লিখেছেন, “কহে চণ্ডীদাস/ শুন বিনোদিনী/ সুখদুখ দুটি ভাই। সুখের লাগিয়া/ যে করে পিরীতি/ দুখ যায় তারি ঠাঁই।।” দুঃখদহনের পরিমাপনীতে কবি ও তাঁর সৃষ্ট রাধা যেন অভিন্ন। চণ্ডীদাস আত্মপ্রতিকৃতি গড়েছেন দীর্ণ ব্যাকুলচিত্ত রাধার উপস্থাপনায়।

চণ্ডীদাসের রাধার কোনও বয়ঃসন্ধি পর্ব নেই, তাই নেই নিজেকে ঘিরে তাঁর কোনও কৌতূহল বা মুগ্ধতা। অপ্রাকৃত নারী নন বলেই জাগতিক কামনা-বাসনার হাতে বন্দিনী নন তিনি। পূর্বরাগের রাধাকে চণ্ডীদাস বৈরাগ্যময়ী তপস্বিনীতে পরিণত করেছেন, যিনি কৃষ্ণকে চাক্ষুষ করার পূর্বে কেবল নামশ্রবণেই আকুল হন। রাধার তদ্‌গত চিত্তটি প্রকাশ পায় কবির সহজ ভাষায়: “সই কেবা শুনাইল শ্যামনাম। কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো/ আকুল করিল মোর প্রাণ।” কৃষ্ণনামের মাধুর্য রাধাকে আবিষ্ট করে, কেবল তাঁর শঙ্কা: “নাম পরতাপে যার ঐছন করল গো/ অঙ্গের পরশে কিবা হয়।” কৃষ্ণচিন্তা এমনভাবে তাঁর হৃদয়গত হয়েছে যে চাইলেও তিনি তা বিস্মৃত হতে পারেন না। বিহ্বলা রাধা যোগিনী বেশ ধারণ করে বিরলে বসে অনুক্ষণ কৃষ্ণধ্যানে কালাতিপান করেন, যেখানে যেখানে কৃষ্ণ-অনুষঙ্গ খুঁজে পান, সেইদিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে থাকেন। সখীরা এসে সংবাদ দেয়, নবজলধরশ্যাম কালিন্দীর কূলে আনাগোনা করছেন। সেকথায় রাধার মনে জাগে প্রিয়দর্শনের ইচ্ছা: “নিশাস সঘন মন উচাটন কদম্ব কাননে চায়।” যে প্রাণনাথের সঙ্গে এখনও মিলন হয়নি, তিনিই রাধার গৃহকর্ম ভুলিয়ে দিয়েছেন। যমুনায় জল আনতে গিয়ে কালো জলে কালার রূপ অনুভব করেন রাধা। তাঁর শ্যামময় ভুবনে গুরুগঞ্জনা তুচ্ছ। তবুও কৃষ্ণের প্রতি তাঁর অনুরাগ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় প্রতি মুহূর্তে। একটি পদে চণ্ডীদাস গৃহবন্দিনী রাধার গোপন ভালোবাসাকে অভিনব কৌশলে ব্যক্ত করেন। রাধা তাঁর চোখের কাজলে কৃষ্ণের ছবি আঁকেন, কপালের সিঁদুর দিয়ে আঁকেন তাঁর চোখ; কৃষ্ণের বর্ণসাদৃশ্যে কালো কাপড় পরেন, আর হাতে রাখেন কৃষ্ণের চোখের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কুবলয় পুষ্প। পূর্বরাগের পদগুলিতে চণ্ডীদাস পারস্পরিক অনুরাগের এমন চিত্র অঙ্কন করেন যে, তাতে রাধাকৃষ্ণের মিলনব্যকুলতা তীব্র হয়ে ওঠে। অথচ এই মিলনকামনা যে দেহের আসক্তিজনিত নয়, তারও নানাবিধ প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর পদে।

অভিসারের পদে চণ্ডীদাসের রাধা বাংলার ভীরু কুলবধূ। শাশুড়ি-ননদিনীর কড়া পাহারা এড়িয়ে অভিসারে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। অন্তরে তাঁর তীব্র হয় বেদনা। প্রেমের প্রগাঢ়তায় কৃষ্ণ অভিসারে আসেন রাধার আঙিনায়। কিন্তু রাধা প্রিয়তমকে আহ্বান জানাতে পারেন না। বর্ষণমুখর রাতে প্রবল বারিধারার মাঝে কৃষ্ণ এসে আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকলেও উপায়ান্তরহীন রাধার “দেখিয়া পরাণ ফাটে”। প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে, রাধার কোমল হৃদয়ের উপযোগী করে চণ্ডীদাস তাঁর কৃষ্ণকে অঙ্কন করেছেন। এই কৃষ্ণ প্রেমে বিশ্বস্ত ও একনিষ্ঠ। তিনি দেহকামনায় জর্জরিত নন, বরং রাধার দুঃখে দুঃখী। বোধহয় তাই চণ্ডীদাসের ভণিতায় রাধাকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ মিলনের কোনও পদ নেই। স্থূল ইন্দ্রিয়নির্ভর দৈহিক মিলন বোধহয় কবির স্বভাববিরোধী ছিল। তবে মিলনের আনন্দ কাব্যরূপ লাগ করেছে রসোদ্‌গারের পদে। মিলনের পর বড়ু চণ্ডীদাস বা বিদ্যাপতির কৃষ্ণ যেখানে প্রস্থান করতে বিলম্ব করে না, সেখানে চণ্ডীদাসের কৃষ্ণ বারবার গমনোদ্যত হয়েও ফিরে আসেন, রাধার মুখ চুম্বন করেন, বারবার ফিরে তাকান। এর মধ্য দিয়েও চণ্ডীদাসের কবিচরিত্র বোঝা যায়।

আক্ষেপানুরাগে চণ্ডীদাসের শ্রেষ্ঠত্ব। কবি বাংলার গ্রামীণ সমাজের পটভূমিতে প্রেমবিহ্বলা রাধার মানসিক যন্ত্রণার নানা দিক এই পর্যায়ের পদগুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। এগুলিতে কবির ব্যক্তিগত প্রবণতা ও ধর্মবোধ উজ্জ্বলভাবে পরিস্ফুট। ড. সত্যবতী গিরি তাঁর বাংলা সাহিত্যে কৃষ্ণকথার ক্রমবিকাশ গ্রন্থে লিখেছেন, “পল্লীবাংলার একটি পরিবারের বধূরূপে সমাজভীতি ও সতীত্ববোধের দৃঢ়মূল সংস্কারে বন্দিনী রাধার বেদনা বড় মর্মস্পর্শী। একদিকে অনিবারণীয় কৃষ্ণপ্রেমের বহির্মুখী আকর্ষণ আর অন্যদিকে অন্তঃপুরের পরিজনভীতি ও সংস্কার—এই উভয়ের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত রাধার বেদনাই ফুটে উঠেছে চণ্ডীদাসের আক্ষেপানুরাগের পদে।” সংসারে থেকেও গৃহস্থালির কিছুই ভালো লাগে না রাধার। কাজে মন বসাতে গিয়েও হঠাৎ কৃষ্ণের অশরীরী উপস্থিতি টের পায় তাঁর অবচেতন মন। কৃষ্ণের কথা ভুলতে চেয়েও পারেন না—এও এক বিষম জ্বালা। তাই নিরুপায় ক্ষোভে রাধা হতে চান যোগিনী। যারা পিরিতি গঞ্জনা দেয়, তাদের সঙ্গ পরিত্যাগের কথাও বলেন তিনি। এই বিদ্রোহ তার নারীহৃদয়ের অসহায়তাকে প্রকট করে তোলে। অনির্বাপিত এই প্রেমের যন্ত্রণা রাধার কাছে দুঃসহ। লোকনিন্দার ভয়ে তিনি ঔদাসিন্যের ভান করেন বটে, কিন্তু তাঁর অন্তরটি নিঃশব্দে কেঁদে চলে। যে পিরিতির জন্য তার এত কষ্ট, লাঞ্ছনা, সেই পিরিতিকেও তিনি তীব্র গঞ্জনা দিয়ে বলেন: “এ দেশে না রহিব সই দূর দেশে যাব। এ পাপ পিরিতের কথা শুনিতে না পাব।” সখীকে তিনি একথাও জানান, যে কৃষ্ণের জন্য তিনি অপবাদ ও তিরস্কার পান, সেই কৃষ্ণ যদি সত্যই তাঁর হতেন তাহলে এই অপবাদের বেদনা তাঁকে স্পর্শ করত না। কিন্তু নিষ্ঠুর কৃষ্ণ যে অন্যকে ভালোবাসেন। রাধার সেই যন্ত্রণাকে কবি সার্থক উপমায় মণ্ডিত করে বলেন: “শঙ্খ বণীকের করাত যেমন আইতে যাইতে কাটে।”

চণ্ডীদাসের প্রেমবৈচিত্ত্যের পদও কাব্যগুণে অনন্য। অনেকের ধারণা প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে প্রেমবৈচিত্ত্য পর্যায় ছিল না। কিন্তু চণ্ডীদাসের প্রেমভাবনার সঙ্গে এই বিষয়টির এত সাজুয্য যে প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে চণ্ডীদাসের আবির্ভাব মেনে নিলে এই পর্যায়ের অস্তিত্বও স্বীকার করতে হয়। রাধা কৃষ্ণের সামনেই বসে আছেন, তবু সামান্য মুখ ফেরালেই তিনি বিচ্ছেদের আশঙ্কায় কাঁপেন। দেহমিলনের চরম সুখে তাঁদের রাত্রিযাপন, অথচ প্রভাতকালে সাময়িক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় দুইজনেই কাতর। কৃষ্ণের প্রস্থান রাধার বুখে শেল হানে। দুইজনের এই অন্যোন্যনির্ভরতা কবি একাধিক উপমায় স্পষ্ট করেছেন।

চণ্ডীদাসেও খণ্ডিতা ও কলহান্তরিতা রাধাকে পাওয়া যায়। তিনি কৃষ্ণকে ব্যঙ্গবাণে বিদ্ধ করেন। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয় রাধার মানসিক বেদনাও। খণ্ডিতা রাধা প্রিয়তমের প্রতি দুঃখে ক্রোধে অভিসম্পাত বাক্য উচ্চারণ করেন: “সে হেন কহিয়া/ না চাহে ফিরিয়া/ এমতি করিল যে। আমার অন্তর/ যেমতি করিছে/ তেমতি হউক সে।” প্রকৃতপক্ষে চণ্ডীদাস খণ্ডিতা পর্বে কৃষ্ণকে অবিশ্বস্ত নায়ক করে তুলেছেন। একটি পদে কৃষ্ণের অন্য নায়িকা-সম্ভোগকে তীব্র ব্যঙ্গ করেন রাধা কৃষ্ণের দেহে প্রতিনায়িকার প্রসাধনচিহ্ন দেখে। অপমানিত বোধ করেন তিনি। ব্যর্থ রাত্রিযাপনের গ্নানি, ক্ষোভ, বিদ্রুপ একসঙ্গে ঝরে পড়ে তাঁর উক্তিতে: “ছি ছি পুরুষ হৈয়া এমন করহ, নারী হৈয়া সহি মোরা”—এই ধিক্কারবর্ষণে রাধা তাঁর ব্যক্তিসত্তা ছাড়িয়ে মধ্যযুগের পুরুষ-প্রবঞ্চিত সমগ্র নারীসমাজের প্রতিনিধি হয়ে দেখা দেন। তবুও চণ্ডীদাসের রাধাকে বড়ু চণ্ডীদাসের রাধার ন্যায় বিদ্রোহিনী নারী বলে নির্দেশ করা যায় না, কারণ তাঁর সাময়িক ক্রোধ শান্ত হলে আবার তিনি ফিরে যান কৃষ্ণেরই কাছে। আত্মনিবেদনেই চণ্ডীদাসের রাধার পরিসমাপ্তি। এই পর্যায়ে এসে তাঁর মনে আরও কোনও দ্বিধা-সংশয় নেই, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনাও করেন না তিনি। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সুর: “বঁধু, কি আর বলিব আমি। জীবনে মরণে জনমে জনমে প্রাণনাথ হৈও তুমি।” তাঁর এই তদ্‌গত চিত্তের সাধনাই পরে মহাপ্রভুর সাধকজীবনের একান্ত আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চণ্ডীদাসের কাব্যাঙ্গিক

[সম্পাদনা]

চণ্ডীদাসের কবিহৃদয়ের আদি ও অন্তকথাটি হল প্রেম। নিজের প্রেমিক-সত্তাকে কাব্যের ভাষায় সমর্পিত করেছেন তিনি। তাই বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে তাঁর পদেই গীতিকবিতার অনুরণন সবচেয়ে বেশি। প্রেমই তাঁর পদের প্রাণ, সৌন্দর্য ও সৌরভ। প্রেমের সুখস্বরূপ, গতি ও তার নানাবিধ বৈচিত্র্য চণ্ডীদাসের পদে সর্বাধিক ভাবগভীরতায় মণ্ডিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। গীতিকবিতায় যেমন একটি বিশেষ ভাব সুললিত ঝংকার, সাংগীতিক মূর্চ্ছনা ও সুরের আলাপে বাঁধা থাকে, চণ্ডীদাসের পদে তারই বহিপ্রকাশ। এই পদাবলিতে যে আত্মানুভূতি বিচরণ করে ফিরেছে, তা প্রেমিকহৃদয়েরই প্রগাঢ় মর্মকথা। তাঁর পদে যে ব্যাকুলতা, যে আবেগ, যে গভীর মর্মস্পর্শী হৃদয়-ঝংকার আছে তার তুলনা পাওয়া দুর্লভ। বাঙালির স্বভাব-কোমলতার সঙ্গে তা দারুণভাবে খাপ খেয়ে গিয়েছে। এইজন্যই বাংলার প্রাণের কবি চণ্ডীদাস।

রাজসভার কবি জয়দেব কিংবা বিদ্যাপতির রচনায় গ্রামবাংলার প্রায়-নিরক্ষর অর্ধশিক্ষিত সাহিত্য-ভোক্তা সমাজের কোনও গুরুত্ব তেমনভাবে স্বীকৃত হয়নি। অথচ গ্রামনির্ভর বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্থ লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ। চণ্ডীদাস এসে তাঁদের হৃদয় জয় করে নিলেন এক লহমায়। তাঁর পদাবলির সহজ মেঠো সুর, সরল ভাষার বাঁধনে মর্মস্পর্শী হৃদয়-সংবাদ পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্রামীণ বাঙালির রসতৃষ্ণা নিবারণ করতে সমর্থ হয়েছে। তাঁর রাধা সুচতুর নগরবাসিনী নন, লাস্যে-ভাষ্যে, সাজে-সজ্জায় রাজানুগ্রহজীবী পণ্ডিতমণ্ডলীর বিস্ময় উৎপাদন করেন না; বরং এই রাধার মধ্যে বাংলার সমাজে ও সংস্কারে আবদ্ধ ভীরু কুলবধূর লজ্জা, ভয়, অনুরাগ ও ক্ষোভ স্পন্দিত। বিদ্যাপতি তাঁর রাধার মধ্যে বিপুল পরিমাণে দেহবোধ সঞ্চারিত করেছেন, কিন্তু চণ্ডীদাস তাঁকে করে তুলেছেন পরমতত্ত্বের আশ্রয়। চরিত্রবিকাশের সচেতন বৌদ্ধিক ক্রিয়ার সঙ্গে চণ্ডীদাস যদি তাঁর অনুপম কবিত্বকে মেশাতে পারতেন, তাহলে পদাবলির জগতে তিনিই হতেন একমেবাদ্বিতীয়ম্‌। সৃষ্টিশক্তির কল্পনা-বৈচিত্র্যে কোলরিজ যেভাবে ওয়ার্ডসওয়ার্থকে অতিক্রম করে যান, অনেকটা সেইরকমই ঘটেছে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের ক্ষেত্রে। চণ্ডীদাসের রাধা বিবর্তনহীন চরিত্র হওয়ায় সব পর্যায়েই একই ভাবনা ফিরে ফিরে আসে, স্বাদবৈচিত্র্যের অবকাশ তৈরি হয় না। অবশ্য যিনি নিভৃত সাধক এবং সাধ্য বিষয়ে অতন্দ্র, তাঁর পক্ষে অন্যত্র পদচারণার প্রয়োজন হয় না। তাঁর লক্ষ্য কেবল স্বীয় সাধনার চরম উৎকর্ষের প্রতি। চণ্ডীদাস কবিতাপস, তাই তপস্বিনী রাধাকেও সেই উৎকর্ষের অভিযাত্রিনী করে এক-একটি স্তর পেরিয়ে এনেছেন। সূচনায় থাকে দ্বিধা-দুর্বলতা, গুরু-গঞ্জনার ভয়; ক্রমশ সেসব বাধা পেরিয়ে রাধা পৌঁছান দ্বন্দ্বহীন চরম আত্মসমর্পণে। চৈতন্য-পরবর্তী কালে যে তত্ত্ব বৈষ্ণবসাধনায় স্বীকৃতি লাভ করেছিল, তারই নিরিখে চণ্ডীদাসের পদের রসভাষ্য নির্দেশ করা সম্ভব। মায়াবদ্ধ জীবের কাছে ঈশ্বরের সংবাদ এসে পৌঁছালেও সঙ্গে সঙ্গে জীবাত্মা তাতে দ্বিধাহীন সাড়া দিতে পারে না। তার আকাঙ্ক্ষা জাগে, মর্ত্য আসক্তির বেদনাও প্রবলতর হয়, তারপর চিৎ-স্বভাব অনুযায়ী ক্রমশ বাড়তে থাকে ইষ্টের প্রতি ঐকান্তিক টান এবং শেষপর্যন্ত দ্বিধাহীন আত্মসমর্পণে সেই অভিযাত্রা সার্থকতা পায়। এটিই চণ্ডীদাসের পদের আধ্যাত্মিক ভাষ্য। অবশ্য চণ্ডীদাস এই জাতীয় ধর্মীয় অনুভূতির প্রগাঢ় চিন্তনে নিজেকে অবগাহন করিয়ে এই পদগুলি রচনা করেছিলেন কিনা তা নিঃসন্দেহে বলা যায় না। তবে তাঁর পদের ভাবগভীরতা ও আবেগ-ব্যাকুলতা অস্বীকার করাও সম্ভব নয়। প্রেম, মিলন, বিরহকে নিয়ে পদরচনা করলেও স্থূল দেহের সীমার মধ্যে সে-সবের অস্তিত্ব সীমিত করেননি তিনি, হৃদয়ধর্মের যোগে সেগুলির প্রসারতা বিধানই ছিল কবি চণ্ডীদাসের অন্যতম কৃতিত্ব এবং সেই লক্ষ্যে অনেকাংশে সাহায্য করেছে তাঁর ভাষা, ছন্দ ও অলংকার।

ভাবের প্রতীকী রূপ হল ভাষা। সাহিত্যের ভাষা সামাজিক, যেহেতু সাহিত্য ও ভাষা দুই-ই সমাজবদ্ধ মানুষের সৃষ্টি। বৃহত্তর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে অন্বিত হয়েই ব্যক্তিমানসের স্বাতন্ত্র্য তার যাথার্থ্য রক্ষা করে। ব্যক্তি ও সমাজের এই মৌলিক দ্বন্দ্ব, পরস্পরের বিরুদ্ধাচারণ ও নির্ভরতা শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই দ্বন্দ্বের সাম্য রচনা যিনি করতে পারেন, তিনিই শিল্পী। তবে সব কবি শিল্পীর ন্যায় শিল্পসচেতন হতে পারেন না। মহৎ কবির রচনাতেই ভাব ও আঙ্গিকের মেলবন্ধন সার্থক হয়। বিশ্বস্রষ্টার ন্যায় কবিও যে স্রষ্টা, এই প্রতীতী জাগাতে সাহায্য করে কবির নির্মাণকলা। কবিকৃত সেই অলৌকিক মায়ার জগৎ তখন পাঠকের সামনে দ্বিতীয় ভুবনের দ্বার উন্মোচিত করে দেয়। সচরাচর সাধক প্রকৃতির মানুষের মধ্যে শিল্পসৌন্দর্য বিষয়ে প্রখর সচেতনতা দেখা যায় না। কারণ, তাঁরা ভাবের গরিমায় ও তন্ময়তায় আত্মবিভোর হয়ে রূপসৃষ্টির চমকানিতে দৃষ্টিবিভ্রম ঘটাবার কলাকৌশল থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের ভাষা স্বতঃস্ফূর্ত, ভাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং বাহ্যিক অলংকরণে তাঁদের অযত্নের আভাস। তাঁদের কবিত্ব উচ্ছ্বসিত, কিন্তু শিল্পরীতি-নিয়ন্ত্রিত নয়। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে অবিন্যস্ত বাণীসজ্জার, অনিয়মিত ছন্দের এবং পারিপাট্যহীন ধ্বনিসম্ভারের। কবিতাপস চণ্ডীদাস ছিলেন ভাবুক কবি, তিনি ছিলেন দেহাতিচারী প্রেমের একনিষ্ঠ সাধক। ফলে তাঁর রচনায় পরিপাটি রমণীয়তার যে অভাব থাকবে তা কোনও বিচিত্র ব্যাপার নয়। তবু নিরপেক্ষ বিচারে চণ্ডীদাসের পদ ভাষার লালিত্যে ও উজ্জ্বল কবিত্বে অনুপম। হৃদয়োত্থিত ভাবের সার্থক ভাষা-রূপায়ণে তাঁর সর্বাত্মক সিদ্ধি। কবি অনেক ক্ষেত্রে আনকোরা আবেগকেই ভাষারূপ দান করে পদের চরণে বসিয়ে দিয়েছেন। শব্দ ঝাড়াই-বাছাই কিংবা সুসজ্জিত করার দিকে তেমন নজর দেননি। অথচ তাঁর পদ “কানের ভিতর দিয়া মরমে” পশে এবং মস্তিষ্কের মধ্যবর্তিতায় অন্তরে আসতে হয় না বলে তা অনায়াসে হৃদয়ের গভীর তন্ত্রীতে আঘাত করে যায়। ‘

কাব্যের অন্যতম প্রসাধন অলংকার। এর মধ্যে আবার সাদৃশ্যমূলক অর্থালংকারের ব্যবহারই প্রধান। বিদ্যাপতি অলংকার ব্যবহারে সংস্কৃতি সাহিত্যের অনুগামী। কিন্তু চণ্ডীদাস গ্রামবাংলার মানুষের উপযুক্ত বিষয় সন্ধান করেছেন। তিনি সহজ সুরে গভীর কথা বলবেন বলে চিরাচরিত কোনও অলংকার নির্মাণে অনাগ্রহী। অথচ তাঁর পদে রমণীয় প্রসাদগুণের অভাব নেই। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়:

  1. পরাণ বাঁধিয়া আছি যে বঁধুর সনে।
  2. ঘষিয়া আনিয়া হিয়ায় লইতে দহন দ্বিগুণ হয়।
  3. অন্তর-বেদনা যে-জন জানয়ে পরাণ বাঁটিয়া দি।
  4. চলে নীল শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি পরাণ সহিত মোর।

উপরিউক্ত উদাহরণগুলিতে ক্রিয়াপদের বিপর্যয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আপাত অসচেতনতার আড়ালে এগুলির পিছনে একপ্রকার প্রখর শিল্পবোধ ক্রিয়াশীল। এই ধরনের অলংকার প্রয়োগে এক দুরুহ প্রসাধিত কবিত্বের আকর হয়ে উঠেছে তাঁর পদাবলি। চণ্ডীদাসের প্রেম বাহ্যজগতের দর্শন-স্পর্শনের ঊর্ধ্বে, তার স্থিতি অতীন্দ্রিয় ভাবলোকে। সেই প্রেমের অনির্বচনীয় স্বরূপ প্রকাশে কবি যত্নশীল। চণ্ডীদাস যখন লেখেন “নয়নিয়া পাখী” কিংবা “নবীণ কিশোর মেয়ের বিজুরী চমকি চলিয়া গেল”, তখন প্রথম দৃষ্টান্তে কেবল পাখির চঞ্চলতাকেই চোখের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হল না, নীল আকাশের অসীমে সেই দৃষ্টি-বিহঙ্গের উধাও হওয়ার ইঙ্গিতটিও দেওয়া রইল গোপনে। দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে মেঘের বিদ্যুতের ন্যায় নবীন কিশোরীর আভা ও দ্যুতি তার শরীরকে ছাড়িয়ে অন্তর্লোকেও প্রসারিত হল। চণ্ডীদাস-ব্যবহৃত অলংকারে দৈনন্দিন জীবনের ছাপও খুব স্পষ্ট। কবি হিসেবে সহজের সাধনা তাঁর লক্ষ্য। বলা হয়, সহজ কথা সহজে বলা শক্ত। অথচ সেই শক্ত কাজেই চণ্ডীদাসের ন্যায় ভাবুক কবির অনায়াস দক্ষতা প্রমাণিত। কবি রাধার মানসিক সংকট, দ্বন্দ্ব, সংশয়, জিজ্ঞাসা, আর্তি ইত্যাদি ভাব ফুটিয়ে তুলতে এমন কয়েকটি অলংকার ব্যবহার করেছেন, যা সুভাষিত পংক্তির ন্যায় উজ্জ্বল ও স্মরণীয়। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক:

  1. শঙ্খ বণিকের করাত যেমন আইতে যাইতে কাটে।
  2. কানুর পিরীতি চন্দনের রীতি ঘসিতে সৌরভময়।
  3. ক্ষুরের উপর রাধার বসতি নড়িতে কাটয়ে দেহ।
  4. কলসে কলসে সিঁচ না ঘুচে পাথার।
  5. মধুর বলিয়া যতনে খাইলু, তিতায় তিতিল দেহ।
  6. জল বিনে মীন জনু কবহুঁ না জীয়ে।

শব্দ ব্যবহারেও চণ্ডীদাসের বৈশিষ্ট্য দু-একটি ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। একই শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারে তিনি আগ্রহী ছিলেন। এক্ষেত্রেও আবার দ্বিবিধ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। প্রথমত, কয়েকটি পদে সংশ্লিষ্ট দু-তিনটি পংক্তিতে শব্দটি বারবার আবৃত্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন পদে কোনও একটি শব্দ বারবার ফিরে এসেছে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে প্রাপ্ত শব্দাবলিকে কবির ভাবনার বীজ বলেও শনাক্ত করা সম্ভব। যেমন, পিরীতি, কলঙ্ক ইত্যাদি। প্রথম পদ্ধতির উদাহরণে ‘কিশোরী’ শব্দটির উল্লেখও কবির মনোভাবের দ্যোতক হয়ে ওঠে: “উঠিতে কিশোরী/ বসিতে কিশোরী/ কিশোরী নয়ন তারা। কিশোরী ভজন/ কিশোরী পূজন/ কিশোরী গলার হারা।।” যুক্তাক্ষর বর্জন ও তার স্থলে বিপ্রকর্ষকে গ্রহণ করার জন্যও চণ্ডীদাসের ভাষা ললিত হয়ে উঠেছিল। কবি স্বরভক্তিকে আশ্রয় করে সংযুক্ত ধ্বনিগুলিকে বিশ্লিষ্ট করে তার ভিতরে নিহিত কোমল ভাবটিকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন।

ছন্দনির্মাণেও কবি কিছুটা ভিন্ন পন্থাবলম্বী। পয়ার তখন বাংলা কাব্যের অন্যতম প্রধান ছন্দ। চণ্ডীদাসের অল্প কয়েকটি পদে পয়ার প্রযুক্ত হলেও তাঁর মুখ্য আশ্রয় ছিল ত্রিপদী। এই ত্রিপদী প্রধানত মধ্যমিলযুক্ত। ফলে শাব্দিক অনুপ্রাসজনিত যে সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা গীতিকাব্যের আবেদন জাগিয়ে তোলার পক্ষে খুবই উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। চণ্ডীদাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ষন্মাত্রিক পর্ব ব্যবহার করেছেন। প্রতিটি পর্ব ত্রিপার্বিক এবং মোটামুটি ৬+৬+৮ বিন্যাসে রূপপ্রাপ্ত। পদ সাধারণত দশ চরণে নির্মিত, কখনও আট বা বারো চরণেও নির্মিত হয়েছে। প্রারম্ভিক চরণটি প্রায়শ নিঃসঙ্গ। যেমন, “সই, কেবা শুনাইল শ্যামনাম”, কিংবা “রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যথা”, অথবা “বঁধু, তুমি যে আমার প্রাণ”। ষন্মাত্রিক পর্বে তিনি প্রধানত তিনমাত্রামূলক দুটি পদ ব্যবহার করতে চেয়েছেন, অল্প ক্ষেত্রে ১+২+৩ বা ২+২+২ মাত্রায় শব্দকে নিয়েছেন। আবার যুক্তাক্ষর ভাঙার ফলে সাংগীতিক অবকাশ বেড়ে গিয়েছে। ভাষায় ব্রজবুলি শব্দ ও ছন্দে প্রত্নমাত্রাবৃত্ত চণ্ডীদাস আদৌ ব্যবহার করেননি, যা বিদ্যাপতির কাব্যাঙ্গিকের মুখ্য দুই উপকরণ ছিল। এইভাবে চণ্ডীদাস নিজেকে সাধনায়, ভাবে, চরিত্রচিত্রণে, কাব্যপ্রসাধনকলায় বাংলার তৎকালীন খ্যাতনামা কবি বিদ্যাপতির তুলনায় সম্পূর্ণ পার্থক্য অবলম্বন করেও অসংখ্য পাঠককুলের কাছে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তাঁর সেই প্রতিভার দ্যুতি ও কবিত্বের বিভা আজও কোমলহৃদয় বাঙালি পাঠকের চিত্তমন্দির আলোকিত করে রেখেছে।