বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/প্রাক্-চৈতন্য যুগের অনুবাদ সাহিত্য
অন্য ভাষায় রচিত কোনও গ্রন্থকে আশ্রয় করে ভাষান্তরিত রচনাই হল অনুবাদ সাহিত্য। "অনু" পূর্বপদে ভাবাশ্রিতার ভাবটি খুবই স্পষ্ট। এই শ্রেণীর রচনার লেখক কোনও মৌলিক কাহিনীর স্রষ্টা নন, কেবল অন্যের রচনা ভাষান্তরিত করার মাধ্যমে মূলের গল্প ও রস পরিবেশন করাই তাঁর লক্ষ্য। তা সত্ত্বেও অনুবাদ সাহিত্যকে আদৌ মূলধারার সাহিত্যের বহির্ভূত নিম্নশ্রেণীর রচনা আখ্যা দেওয়া চলে না। উন্নত শ্রেণীর অনুবাদ সাহিত্য একদিকে যেমন সাহিত্যের পরিধির বিস্তার ঘটায়, তেমনই অন্যদিকে ভাষাকেও করে তোলে সমৃদ্ধ।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনুবাদ সাহিত্যের ধারা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে চললেও প্রাক্-চৈতন্য যুগের অনুবাদ সাহিত্যে মূলত তিনটি প্রবাহ দৃশ্যমান হয়: রামায়ণ, ভাগবতপুরাণ ও মহাভারত অনুবাদের ধারা। কৃত্তিবাস ওঝা ও মালাধর বসু যথাক্রমে রামায়ণ ও ভাগবতপুরাণ গ্রন্থ দুটিকে বাংলা ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন। প্রথম মহাভারত অনুবাদকেরা হলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, বিজয় পণ্ডিত ও সঞ্জয়।
প্রাক্-চৈতন্য যুগের অনুবাদ সাহিত্যের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
[সম্পাদনা]আদি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে অনুবাদ সাহিত্যের ধারাটির সূচনা হয় প্রাক্-চৈতন্য যুগের এক বিশেষ ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে। কালক্রমে সেই উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে এই সাহিত্যের গুরুত্ব আরও সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠলেও উক্ত প্রেক্ষাপটটির উল্লেখ সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনায় বিশেষ আবশ্যক।
আদি মধ্যযুগে নবগঠিত বাংলা ভাষার আশ্রয়ে দীর্ঘকাল সংস্কৃত ভাষার গণ্ডীতে আবদ্ধ শাস্ত্রকথা জনসমাজের প্রচারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এক বিশেষ কারণে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের সূচনায় বিদেশী তুর্কি হানাদার ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণ এ-দেশের শান্ত-নিরুদ্বিগ্ন জনজীবনকে হঠাৎ অশান্ত করে তোলে। দেশব্যাপী অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও অত্যাচার মানুষের মনে ভয় ও ত্রাসের সঞ্চার করে। এ-দেশের তথাকথিত নিম্নবর্ণীয় মানুষেরা ভয়ে, লোভে অথবা উচ্চবর্ণীয় সমাজের অত্যাচারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে দলে দলে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করে। সেই সময়েই হিন্দুরা অনুভব করেছিল যে, হিন্দুসমাজকে অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে বাংলা ভাষায় শাস্ত্রের মর্মার্থ অনুধাবনকারী এক ঐক্যবদ্ধ বাঙালি হিন্দুসমাজ। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হিন্দুসমাজ তাই সুপ্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থ ও সংস্কৃত ভাষার সমৃদ্ধ কাব্যসম্ভারকে নির্ভর করে নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত পোক্ত করতে অগ্রসর হয়। এইভাবে পঞ্চদশ শতকে শাস্ত্রকথা বাংলা ভাষায় প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ঐতিহ্যপূর্ণ আর্য-সংস্কৃতির সঙ্গে আপামর বাঙালির যে এক প্রাণের সংযোগ ঘটে, তার ফল আজ এই একুশ শতকেও সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। বিজিত হিন্দুজাতির মানসিক শক্তি, সাহস ও উদ্যম সঞ্চারে এবং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ভূখণ্ডের জনসমাজে হিন্দুধর্ম ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রাধান্য বজায় রাখতে অনুবাদ সাহিত্যের ভূমিকা তাই অপরিসীম। প্রথম দিকে রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতপুরাণের অনুবাদ শুরু হয়, পরবর্তীকালে অন্যান্য পুরাণগ্রন্থ ও সংস্কৃত কাব্যসাহিত্যের অনুবাদের মাধ্যমে অনুবাদক-কবিরা পৌরাণিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটান বাংলার সমাজে।
গবেষকদের একাংশের মতে, অনুবাদ সাহিত্যের প্রাথমিক অভিপ্রকাশ ছিল কথকতা। পুরাণকথার সঙ্গে পরিচিত শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা সর্বসাধারণের কাছে সে-সব উপাখ্যান পাঁচালীর আকারে পরিবেশন করতেন। সেকালের দরিদ্র কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষেরা ছিলেন সংস্কৃত শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। অবতলবর্তী এইসব মানুষের ধর্মজিজ্ঞাসা ও রসপিপাসা চরিতার্থ করতে উচ্চবর্ণীয় সমাজপতিদের মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে আবির্ভাব ঘটে এইসকল শাস্ত্রজ্ঞ পালাগায়ক বা কথকদের। কেউ কেউ বলে থাকেন যে, সংস্কৃত শাস্ত্রকথাকে এভাবে যাঁরা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তাঁদের রক্ষণশীল শাস্ত্রব্যবসায়ীরা বিশেষ সুনজরে দেখতেন না। প্রমাণ হিসেবে একটি লৌকিক ছড়াকেও দাখিল করা হয়:
কৃত্তিবেসে কাশীদেসে বামুনঘেঁসে।
এই তিন সর্বনেশে।।
কিন্তু এই ছড়াটিতেই স্পষ্ট এটি ষোড়শ শতকের কবি কাশীরাম দাসের পরবর্তী সময়ে প্রচলিত হয়। আদি মধ্যযুগের রাজনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় উত্তেজনা যখন স্তিমিত, হিন্দু পণ্ডিতেরা যখন মুসলমান শাসকদের রাজদরবারে ও রাজকার্যে নিজেদের সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম এবং পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুসমাজও স্থিতিশীল, সেই সময়কার এ-হেন উক্তি দ্বারা কৃত্তিবাস-পূর্ববর্তী যুগ-প্রেক্ষাপটটি বিচার করতে গেলে ভুল হবে।
অনুবাদক-কবিরাও তাঁদের কাজের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন ছিলেন। ভাগবতপুরাণের প্রথম অনুবাদক মালাধর বসু লিখেছেন:
ভাগবত অর্থ যত পয়ারে বান্ধিয়া।
লোক-নিস্তারিতে যাই পাঞ্চালী রচিয়া।।
"লোক-নিস্তারণ" অর্থাৎ লোকশিক্ষাই ধর্মগ্রন্থ অনুবাদের মূল কারণ। কবি "লোক" বলতে সেইসব মানুষকেই বুঝিয়েছেন, যাঁরা সংস্কৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন, অথচ অবস্থাবৈগুণ্যে শাস্ত্রকথা যাঁদের অবধানের প্রয়োজন ছিল। ষোড়শ শতকের বৈষ্ণব কবি পীতাম্বর দাস এবং সপ্তদশ শতকের কবি দ্বিজ হরিদাস প্রায় একই কথা বলেছেন। নল-দময়ন্তীর আখ্যান-সূচনায় কামতাপুর রাজসভার কবি পীতাম্বর লেখেন:
পুরাণাদি শাস্ত্রে যেই রহস্য আছয়।
পণ্ডিতে বুঝয়ে মাত্র অন্যে না বুঝয়।।
এ কারণ শ্লোক ভাঙ্গি সবে বুঝিবার।
নিজ দেশভাষা বন্ধে রচিয়ো পয়ার।।
এই কথাই প্রতিধ্বনিত হয় হরিদাসের কলমেও:
সংস্কৃত নাহি বুঝে সাধারণ জনে।
ভাষাকথা কহি আমি তথির কারণে।।
আবার উদ্দেশ্য এক হলেও অনুবাদ করতে গিয়ে সব কবি একই আদর্শ ধরে অগ্রসর হননি। অনুবাদকের নিজস্ব প্রকৃতি অনুযায়ী কাব্যের চরিত্র গড়ে উঠেছে। কবির প্রকৃতিও নির্ধারিত হয়েছে তাঁদের পাণ্ডিত্য, রসজ্ঞান, কবিত্বশক্তি প্রভৃতির দ্বারা। তাছাড়া অনুবাদকের সাহিত্যগত উদ্দেশ্যও অনুবাদকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিশুদ্ধ গল্পরস পরিবেশনের তাগিদে মূলের অতিরিক্ত অনেক অপ্রধান, এমনকি অপ্রয়োজনীয় কাহিনীও কেউ যুক্ত করে দিতে পারেন। এ-সব কারণে অনুবাদের প্রকৃতি বদলে যায় এবং অনুবাদ-কর্মটিও আক্ষরিক অনুবাদ, ভাবানুবাদ, সারানুবাদ, ছায়ানুবাদ ইত্যাদি নানা অভিধায় চিহ্নিত হয়। বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদে তো বটেই, একই গ্রন্থের বিভিন্ন কবির অনুবাদে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বাংলা ধর্মাশ্রয়ী অনুবাদ সাহিত্যের দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখ্য: (১) রচনায় কম-বেশি বাঙালিয়ানার অনুপ্রবেশ এবং (২) ভক্তিবাদের উচ্ছ্বাসময় অভিব্যক্তি। প্রথমটির উৎস অনুবাদক ও উদ্দিষ্ট শ্রোতৃমণ্ডলীর সামাজিক অভিজ্ঞতা ও তাঁদের ব্যক্তিগত রুচি এবং দ্বিতীয়টির নিয়ন্ত্রক ছিল সমকালীন ধর্মভাবনা। বাঙালি অনুবাদক-কবিরা সর্বভারতীয় কাহিনীকে বাংলা-ভাষী শ্রোতৃমণ্ডলীর উপযুক্ত করে প্রকাশ করতে গিয়ে পটভূমি, চরিত্র, রসসৃষ্টি, নিসর্গপ্রকৃতি, কাব্যভাষা, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদি নানা বিষয়ে বাংলার ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও লোকসমাজের নিজস্বতাকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাই এইসব অনুবাদ-কর্মে অনুভূত হয় বাংলার ভৌমসত্তার হৃদস্পন্দন। কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারতের ন্যায় কয়েকটি অনুবাদ কাব্যের কালজয়ী হয়ে ওঠার এটিও একটি প্রধান কারণ। অন্যদিকে কবিদের ব্যক্তিগত ধর্মচেতনায় ভক্তিবাদের অভিপ্রকাশও কাব্যগুলিতে সুস্পষ্ট। মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলনের ব্যাপকতা সেকালের কবিদের কতটা প্রভাবিত করেছিল, এই কাব্যগুলি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
প্রাক্-চৈতন্য যুগের রামায়ণ অনুবাদ
[সম্পাদনা]ভারতের আদিকাব্য রামায়ণ, আদিকবি বাল্মীকি। ভারতীয় জীবন ও ভাবসত্তার সঙ্গে রামায়ণ গভীর আত্মীয়তার সূত্রে অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েও ভারত যে এ-দেশের আদি ও অকৃত্রিম রূপটি ধরে রাখতে পেরেছে, তার মূলে রামায়ণের শিক্ষা ও আদর্শ বিপুলভাবে ক্রিয়াশীল। রামায়ণ জীবনরসের কাব্য। এই গ্রন্থে তাই দার্শনিক চিন্তা থাকলেও তা শুধুমাত্র শুষ্ক তত্ত্বকথাই বিতরণ করে না। নরনারীর চিরায়ত প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখের সঙ্গে মিশে গিয়ে তা হয়ে উঠেছে উপভোগ্য এক রসসাহিত্য। এই মহাকাব্যের সঙ্গে জাতির হৃদয়ের নিগূঢ় সম্পর্কটি রবীন্দ্রনাথ ব্যক্ত করেছেন অননুকরণীয় ভাষায়, “রামায়ণের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, তাহা ঘরের কথাকেই অত্যন্ত বৃহৎ করিয়া দেখাইয়াছে। পিতাপুত্রে, ভ্রাতায় ভ্রাতায়, স্বামী-স্ত্রীতে যে ধর্মের সম্বন্ধ, প্রীতিভক্তির সম্বন্ধ—রামায়ণ তাহাকে এত মহৎ করিয়া তুলিয়াছে যে, তাহা অতি সহজেই মহাকাব্যের উপযুক্ত হইয়াছে।… গৃহাশ্রম ভারতবর্ষীয় সমাজের ভিত্তি। রামায়ণ সেই গৃহাশ্রমের কাব্য।।.. বাহুবল নহে, জিগীষা নহে, রাষ্ট্রগৌরব নহে, শান্ত রসাস্পদ গৃহধর্মকেই রামায়ণ করুণার অশ্রুজলে অভিষিক্ত করিয়া তাহাকে সুমহৎ বীর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে।” (প্রবন্ধ: "রামায়ণ", গ্রন্থ: প্রাচীন সাহিত্য) বস্তুত, বাল্মীকি রামায়ণের রাম বিষ্ণুর অবতার নন, তিনি মনুষ্যকুলের শ্রেষ্ঠ "নরচন্দ্রমা" স্বরূপ। রামচন্দ্রকে বাল্মীকি পুত্র, ভ্রাতা, পিতা, সম্রাট প্রভৃতি সম্পর্কের আদর্শ-স্থানীয় পুরুষ করে তুলেছেন। সর্বস্তরের ভারতবাসীর কাছে রামচন্দ্র অনুসরণযোগ্য এক মহান চরিত্র।
বাল্মীকির রচনাকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে রামায়ণের ৬-৭টি পাঠান্তর এবং ২-৩টি সাহিত্যিক মহাকাব্য রচনার ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষের চিত্তলোকে এই মহাকাব্য কতটা আদরণীয় হয়ে আছে সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে। রামকথা শুধু ভারতেই নয়, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও বিস্তার লাভ করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। দু-এক জন পাশ্চাত্য গবেষক রামায়ণকে মহাভারতের পরবর্তী রচনা বলে মতপ্রকাশ করলেও অন্তর্বর্তী তথ্য থেকেই প্রমাণিত হয় যে, রামায়ণই সর্বাগ্রে রচিত হয়েছিল। এছাড়া কেউ কেউ রামায়ণকে রূপক বিবেচনা করে এই মহাকাব্যে প্রাচীন ভারতে আর্যসভ্যতা বিস্তারের ইতিকথার ইঙ্গিত অনুসন্ধান করেছেন। “সীতা” শব্দের অন্য অর্থ “হল্যা ভূমি”। তাই তাঁদের মতে, রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বধ করে লঙ্কাপুরী থেকে সীতা-উদ্ধারের কাহিনী অনার্যপ্রধান অরণ্যসংকুল প্রাচীন দাক্ষিণাত্যে কৃষিসভ্যতা পতনেরই ইঙ্গিতবাহী।
রামায়ণে অনুসৃত জীবনবোধ যে চিরায়ত, তার উদ্ঘোষণা বাল্মীকি স্বয়ং তাঁর কাব্যে করে গিয়েছেন:
যাবদ্ স্থাস্যন্তি গিরয়ঃ সরিতশ্চ মহীতলে।
তাবদ্ রামায়ণী কথা লোকেষু প্রচরিষ্যতি।।
অর্থাৎ, “যতদিন পৃথিবীতে পর্বত ও সমুদ্র থাকবে, ততদিন লোকমধ্যে প্রচারিত হবে রামায়ণ-কথা।” খ্রিস্টীয় একাদশ শতক থেকে এই মহাকাব্য অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। প্রথমে তামিলে, পরে হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠি প্রভৃতি নব্য ভারতীয় আর্যভাষায় অনূদিত হয় এই মহাকাব্য। পঞ্চদশ শতকে বাংলা ভাষায় এই কাব্য অনুবাদের ধারাটির সূচনা ঘটে। বাংলায় রামায়ণ-অনুবাদের সূত্রপাত ঘটান কবি কৃত্তিবাস ওঝা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁকে প্রণতি জানিয়ে লিখেছেন, “কৃত্তিবাস কীর্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলঙ্কার।”
কৃত্তিবাস ওঝার ব্যক্তিপরিচয় ও আবির্ভাবকাল
[সম্পাদনা]উনিশ শতকে বাঙালি পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাচীন পুথি সংগ্রহের আগ্রহ দেখা দিলে, বাংলার নানা প্রান্ত থেকে যাঁর পুথির অনুলিপি সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল, তিনি হলেন কৃত্তিবাস ওঝা। এই ঘটনা কৃত্তিবাসের বিপুল জনপ্রিয়তারই স্মারক। জনসাধারণের বোধের জগতে নতুন কিছু সংযুক্ত করতেই যে তিনি লেখনী ধারণ করেছিলেন, তার আভাস মেলে তাঁরই উক্তিতে:
সাত কাণ্ড কথা হয় দেবের সৃজিত।
লোক বুঝাইতে কৈল কৃত্তিবাস পণ্ডিত।।
কৃত্তিবাসের কাব্য ধনীর প্রাসাদ থেকে দরিদ্রের কুটির পর্যন্ত সর্বত্র পঠিত হয়ে আসছে। অথত এ-হেন জনপ্রিয় কবির ব্যক্তিপরিচয় আজও পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মধ্যযুগে রচিত দুটি গ্রন্থে কৃত্তিবাস সম্পর্কে স্বল্প কিছু তথ্য পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধ কুলাচার্য ধ্রুবানন্দ মিশ্রের মহাবংশাবলী গ্রন্থে বলা হয়েছে: “কৃত্তিবাস কবির্ধীমান সৌম্যঃশান্ত জনপ্রিয়”। অন্যদিকে জয়ানন্দ মিশ্র তাঁর চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে বলেছেন:
রামায়ণ করিল বাল্মীকি মহাকবি।
পাঁচালী করিল কৃত্তিবাস অনুভবি।।
অর্থাৎ, জনপ্রিয় সুকবি কৃত্তিবাস পাঁচালীর আকারে বাল্মীকির রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন—এই সর্বজনবিদিত তথ্যটুকুর স্বীকৃতি ব্যতীত উক্ত গ্রন্থদ্বয় থেকে আর কোনও সংবাদ আহরণ করা সম্ভব হয় না।
শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকেরা অষ্টাদশ শতকের শেষলগ্নে বাইবেলের পাশাপাশি আর যে-বইটি ছাপিয়ে প্রকাশ করেছিলেন, সেটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ। প্রকাশের সুবাদে কৃত্তিবাস সম্পর্কে গবেষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি তখনও। ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে জয়গোপাল তর্কালঙ্কার কর্তৃক সংশোধিত হয়ে শ্রীরামপুর মিশন থেকে পুনঃপ্রকাশিত কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকেও কবির জীবনকথা কিছু জানা যায়নি। ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় বিডন সোসাইটিতে বাংলা কবিতা বিষয়ে যে-বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন, তাতে কৃত্তিবাসের কাব্য সম্পর্কে অনেক কথা বললেও তাঁর ব্যক্তিপরিচয় উল্লেখ করেননি। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে হরিমোহন চট্টোপাধ্যায় কবিচরিত গ্রন্থে দুটি তথ্য দিয়েছিলেন: (১) কৃত্তিবাস অধুনা নদীয়া জেলার ফুলিয়ার অধিবাসী ছিলেন এবং (২) তিনি ছিলেন মুরারি ওঝার নাতি। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হরিশচন্দ্র মিত্রের কৃত্তিবাস পরিচয় সংগ্রহ গ্রন্থে রামায়ণ-গায়কদের খাতা থেকে কাব্যপংক্তি উদ্ধার করে কৃত্তিবাসের পিতা-মাতার নাম, ভাইদের সংখ্যা ও নাম উল্লেখ করেন। অনেকেই কৃত্তিবাসের জন্মসন কোনও রকম প্রমাণ বা সূত্র ব্যতিরেকে উল্লেখ করেন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে দীনেশচন্দ্র সেন রচিত বঙ্গভাষা ও সাহিত্য গ্রন্থের প্রথম সংস্করণেও কৃত্তিবাসের কাব্য আলোচিত হলেও তাঁর জীবনী নিয়ে কোনও কথা বলা হয়নি। কিন্তু ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে সেই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে বাঁকুড়া ও হুগলী জেলার সীমান্তবর্তী বদনগঞ্জ গ্রামের অধিবাসী হারাধন দত্ত ভক্তিনিধির থেকে প্রাপ্ত কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয় শীর্ষক একটি রচনাংশ তিনি জুড়ে দেন। কিন্তু যে-পুথি দেখে এটি তিনি নকল করেছিলেন, সেটিকে লোকসমক্ষে আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই সকলেরই ধারণা হয়েছিল যে, এটি জালিয়াতির ঘটনা। কিন্তু বহু বছর পরে ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে ভারতবর্ষ পত্রিকায় নগেন্দ্রনাথ বসুর থেকে প্রাপ্ত কৃত্তিবাসের যে আত্মবিবরণী নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রকাশ করেন, তা দেখে বোঝা যায় দীনেশচন্দ্রের প্রকাশিত অংশটি জাল নয়। বরং নলিনীকান্ত সংগৃহীত পুথিতে কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয়টি বিস্তৃততর। উক্ত দুই বিবরণী মিলিয়ে কবি কৃত্তিবাস ওঝার জীবনের একটি রূপরেখা অঙ্কন করা যায়।
কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ ছিলেন নরসিংহ ওঝা। তিনি পূর্ববঙ্গের বেদানুজ রাজার সভাসদ ছিলেন। ওই অঞ্চলে মুসলমানদের আক্রমণ ঘটলে তিনি গঙ্গার পূর্ব তীরে অধুনা নদীয়া জেলার অন্তর্গত ফুলিয়া গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। পূর্বে সেই স্থানে মালীদের বসবাস ছিল এবং ফুলের ব্যাপক চাষ হত বলে জায়গাটির নাম হয় ফুলিয়া। নরসিংহ ওঝার বংশধর ছিলেন মুরারি। মুরারির পুত্র বনমালী এবং বনমালীর পুত্র কৃত্তিবাস। কবির মায়ের নাম ছিল মালিনী। কবিরা ছয় ভাই (মতান্তরে সাত ভাই): কৃত্তিবাস, মৃত্যুঞ্জয়, শান্তিমাধব, শ্রীধর, বলভদ্র ও চতুর্ভূজ। তাঁদের এক বোনও ছিলেন। কৃত্তিবাস তাঁর জন্মের দিনক্ষণ এইভাবে উল্লেখ করেছেন:
আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পূর্ণ মাঘ মাস।
তথি মধ্যে জন্ম লইলাম কৃত্তিবাস।।
কৃত্তিবাস কবির পিতামহ প্রদত্ত নাম। বারো বছর বয়সে উত্তর দেশে পড়তে গিয়েছিলেন তিনি বড়গঙ্গা পেরিয়ে। গুরুগৃহে বিদ্যার্জন সমাপ্ত করে রাজপণ্ডিত হওয়ার আশায় গৌড়েশ্বরকে পাঁচটি শ্লোক লিখে পাঠালেন। দ্বারীর হাতে শ্লোক দিয়ে রাজার অনুমতির অপেক্ষায় রইলেন। সাত ঘটিকা বেলায় রাজার আহ্বানে নয় দেউড়ি পেরিয়ে পৌঁছালেন রাজসভায়। সেখানে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাজাকে ঘিরে রয়েছেন তাঁর পাত্রমিত্রেরা। কৃত্তিবাসের উল্লেখ অনুসারে এঁরা ছিলেন: জগদানন্দ, সুনন্দ, কেদার খাঁ, নারায়ণ, গন্ধর্ব রায়, শ্রীবৎস ও মুকুন্দ। চারিদিকে নৃত্যগীতের সমারোহের মধ্যে রাজা মাঘ মাসের রৌদ্রতাপের আরাম উপভোগ করছিলেন আঙিনায় “রাঙা মাদুরি” বিছিয়ে। রাজার হাতছানি দিয়ে ডাকতে কবি তাঁর কাছে গেলেন। চার হাত দূরে দাঁড়িয়ে সাতটি শ্লোক পড়লেন। দেবী সরস্বতীর প্রসাদে সেই রমণীয় শ্লোকে মুগ্ধ রাজা কবিকে পুষ্পমালা উপহার দিলেন। কেদার খাঁ ছিটোলেন চন্দনের জল। উপহার মিলল পাটের পাছড়া। সভাসদেরা কবিকে রাজার থেকে কিছু চেয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু পার্থিব বিষয়-বিমুখ কবি শুধু এই মাত্র ভিক্ষা করলেন:
যত যত মহাপণ্ডিত আছয়ে সংসারে।
আমার কবিতা কেহ নিন্দিতে না পারে।।
এ-কথায় সন্তুষ্ট রাজা কবিকে রামায়ণ রচনা করতে আদেশ করলেন। কবি রাজসভা থেকে বহির্গত হলেন। সভার সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল। অতঃপর কবি রামায়ণ রচনায় মনোনিবেশ করলেন। আত্মপরিচয়ের শেষাংশে তিনি আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করে লিখছেন:
মুনি মধ্যে বাখানি বাল্মীকি মহামুনি।
পণ্ডিতের মধ্যে কৃত্তিবাস গুণী।।
বাপ মায়ের আশীর্বাদে গুরু আজ্ঞা দান।
রাজাজ্ঞায় রচি গীত সপ্তকাণ্ড গান।।
সাতকাণ্ড কথা হয় দেবের সৃজিত।
লোক বুঝাবার তরে কৃত্তিবাস পণ্ডিত।।
রামায়ণে কিছু বিনোদনমূলক গালগল্প ঠাঁই পাওয়ায় অনেকের ধারণা কৃত্তিবাস তেমন পণ্ডিত ছিলেন না। কিন্তু কবির সাক্ষ্য মেনে নিলে এই ধারণা দূরীভূত হয়। তাছাড়া বিপুল পাণ্ডিত্য না থাকলে বাল্মীকির কবিত্ব অনুভব করে তাঁর প্রাঞ্জল ভাবানুবাদ রচনা করা সত্যিই দুঃসাধ্য কর্ম।
কৃত্তিবাসের প্রাপ্ত আত্মপরিচয়টির সূত্রে পরবর্তীকালের গবেষকগণ তাঁর আবির্ভাবকাল নির্ণয়ে যত্নবান হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল, কবি এই বিবরণে জন্মতিথি, মাস ও বার উল্লেখ করলেও শকাব্দ বা বঙ্গাব্দ কোনও কিছুই উল্লেখ করেননি। তাছাড়া যে গৌড়েশ্বরের সভায় তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন, তাঁর সভাসদদের নাম উল্লিখিত হলেও রাজার নামটি অনুক্তই থেকে গিয়েছে। ফলে গবেষক মহলে সৃষ্টি হয়েছে ধন্দ এবং সেই সূত্রে এসেছে মতান্তর। আমরা সংক্ষেপে সেই বিবাদের পরিচয় দিয়ে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার চেষ্টা করব।
আত্মবিবরণের সূচনাতেই পূর্ববঙ্গের কোনও এক ‘বেদানুজ’ রাজার কথা বলা হয়েছে। দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, এটি হবে দনুজ রাজা। এখন, ‘দনুজ’ নামধারী তিনজন রাজা পূর্ববঙ্গের পৃথক পৃথক স্থানে রাজত্ব করেছেন পৃথক পৃথক সময়ে। দনুজ মাধব বা দনুজ রায় ছিলেন একজন শক্তিশালী রাজা। আর একজন ছিলেন দনুজমর্দন দেব, যাঁর রাজত্বকাল ১৪৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দ। আর একজন ছিলেন অধুনা বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত চন্দ্রদ্বীপের রাজা দনুজ রায়। ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে ইনি বর্তমান ছিলেন। অধিকাংশ পণ্ডিতে অভিমত, কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ নরসিংহ ওঝা এই দনুজ রায়েরই অমাত্য ছিলেন।
এবার কবির জন্মকালের প্রশ্ন। জ্যোতিষশাস্ত্রের গণনানুসারে, যে-বছর মাঘমাসের শুক্লাপঞ্চমী (যেটি হিন্দুরা শ্রীপঞ্চমী তিথি রূপে পালন করে) পড়েছিল, কবির উল্লিখিত ‘পূর্ণ’ শব্দটিকে মাস-সংক্রান্তি ধরে সেই তারিখটি ১৩৯৪ শকাব্দ বা ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি বলে নির্ধারণ করেন যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি। কিন্তু নলিনীকান্ত ভট্টশালী আবিষ্কৃত পুথিতে "পূর্ণ" স্থলে রয়েছে "পূণ্য" শব্দটি, যা মধ্যযুগের সাধারণ লিপি-বিভ্রান্তি বলে অনেকে মনে করেন। নলিনীকান্তের অনুরোধে যোগেশচন্দ্র "পূণ্য" শব্দটিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বিতীয়বারের জ্যোতিষ বিচারে সিদ্ধান্তে পৌঁছান ১৩২০ শকাব্দ বা ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে। এই দুই সালের মধ্যে কোনটি সঠিক, সেই সিদ্ধান্তের জন্য অন্যান্য পরোক্ষ সূত্রের সাহায্য প্রয়োজন:
(১) কুলপঞ্জিকা অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে কৃত্তিবাসের ভ্রাতুষ্পুত্র মালাধর খান ও খুড়তুতো ভাইয়ের পৌত্র গঙ্গাধর ফুলিয়া মেলের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, ততদিনে কৃত্তিবাস প্রয়াত হয়েছেন। নইলে তাঁর মতো খ্যাতিমান মানুষের জীবৎকালে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ বংশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন না।
(২) জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল কাব্যে দেখা যায়, চৈতন্যদেবের আহ্বানে ফুলিয়া-নিবাসী হরিদাস আনুমানিক ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে স্বগ্রাম ত্যাগ করে নীলাচল যাত্রা করেন। তাঁকে বিদায় জানিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু সুষেণ পণ্ডিত। ইনি ফুলিয়ার বিখ্যাত কুলীন মনোহরের পুত্র, কৃত্তিবাসের খুড়তুতো ভাই লক্ষ্মীধরের পৌত্র। তখন তাঁর মধ্যবয়স। অতএব এর থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে যে কৃত্তিবাস জীবিত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত করাই সঙ্গত।
উপরিউক্ত দুই যুক্তির সাহায্যে কৃত্তিবাসের জন্মসন ১৩৯৮ বঙ্গাব্দ বলেই অধিকাংশ পণ্ডিত মেনে নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন কোন রাজার সভায় তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন? কবির বর্ণনায় দেখা যায়, সেই রাজসভার সংবর্ধনায় হিন্দু রীতিনীতিরই প্রাধান্য। সভাসদরা সবাই হিন্দু। ইনি কি কোনও হিন্দু রাজা? তাহলে কবি তাঁর নাম উল্লেখ করেননি কেন? ইতিহাসবিদদের মতে, গৌড়ে সেই সময়ে একজনই হিন্দু রাজা ছিলেন, তিনি গণেশ। যিনি ১৪১৪-১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর সভায় কবি পৌঁছালে, কবির তখন বয়স কুড়ি বছর। তাছাড়া এত বড়ো কাব্য নিশ্চয়ই এক বছরের মধ্যে লেখা হয়নি। ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সূচনা হয়। গণেশের পুত্র যদু জালালউদ্দিন নাম গ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম নিয়ে সমস্ত হিন্দুদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে ওঠেন। কৃত্তিবাসের পক্ষে এমতাবস্থায় রাজানুকূল্যে কাব্যরচনা নিশ্চয়ই সম্ভব হয়নি।
সেজন্য রাজা গণেশ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সবাই গ্রহণ করেননি। বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায় ও অধ্যাপক মণীন্দ্রকুমার বসু কৃত্তিবাসের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণকে নির্দেশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি, কংসনারায়ণের পাত্রমিত্রদের সঙ্গে কৃত্তিবাস-উল্লিখিত গৌড়েশ্বরের পাত্রমিত্রদের নামসাদৃশ্য আছে। কিন্তু অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র ধরে কংসনারায়ণকে ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে স্থাপন করা যায় না। তাই অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় নতুন কিছু তথ্যের সংযোগে দেখাতে প্রয়াসী হয়েছেন যে, এই গৌড়েশ্বর হলেন রুকনুদ্দিন বরবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)। ইনি বিদ্যোৎসাহী, গুণীর প্রশংসাকারী ও বাঙালি কবিদের পৃষ্ঠপোষক, এর রাজসভাতেই মালাধর বসু শ্রীকৃষ্ণবিজয় লিখে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি পেয়েছিলেন। কৃত্তিবাস তাঁর কাব্যে বিধর্মী নামের স্পর্শ রাখবেন না বলেই হয়তো রাজার হিন্দু পাত্রমিত্রদের নাম উল্লেখ করলেও রাজার নামটি উহ্য রেখেছিলেন। তাছাড়া ‘রাঙা মাদুরি’ পেতে রোদ পোহানো এই মুসলমান শাসকের পক্ষেই বেশি সম্ভব। অবশ্য এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনও সম্ভব হয়নি। তবে অধিকাংশ গবেষকই ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দকে কবির জন্মসন হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
কৃত্তিবাস ওঝার কবিত্ব-প্রতিভা
[সম্পাদনা]বাংলা ভাষায় প্রথম রামায়ণ অনুবাদের কৃতিত্ব দাবি করেন কৃত্তিবাস ওঝা। বাল্মীকির কাব্যের হুবহু অনুবাদ তিনি করেননি, করেছেন ভাবানুবাদ। বাঙালির গল্পরসের চাহিদার দিকে তাকিয়ে যেমন মূলের কিছু কিছু অংশ বর্জন করেছেন, তেমনই কিছু শিশুতোষ অথবা নিছক বিনোদনমূলক গালগল্পও সংযোজিত করে দিয়েছেন কাব্য-মধ্যে। এক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ বা উৎস কেবল বাল্মীকি ছিলেন না, জৈমিনী রচিত মহাভারত ও অন্যান্য হিন্দুশাস্ত্র থেকেও কিছু আখ্যান তিনি গ্রহণ করেছিলেন। মূল রামায়ণের আখ্যান-কাঠামো অটুট রেখে এইরকম গ্রহণ-বর্জন কৃত্তিবাসের রচনাকে স্বাদু ও উপভোগ্য করে তুলেছে। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিতে মৌলিক ভাবনার পরিমাণও কম নয়। গল্পের ক্ষেত্রে, চরিত্র-চিত্রণে, রস-পরিবেশনে, প্রবাদ-প্রবচন গ্রন্থনায় কৃত্তিবাস নিজস্ব প্রতিভার সাক্ষর রেখে ছেন। আসলে তিনি উদ্দিষ্ট পাঠক কিংবা শ্রোতার কথা ভেবে অনুবাদে অগ্রসর হয়েছিলেন বলেই এইসব বিশিষ্টতা তাঁর রচনায় ধরা পড়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে তাঁর বিশদ কৃতিত্ব পরিমাপ করতে গিয়ে আমরা আলোচনাটিকে কয়েকটি উপবিভাগে বিভক্ত করে নিতে পারি:
আখ্যান-গ্রন্থনে মৌলিকতা
[সম্পাদনা]আখ্যানধর্মী সাহিত্যে কাহিনীই সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান উপাদান। কৃত্তিবাসের যুগে সাহিত্যকর্মে চরিত্রের তুলনায় আখ্যানবৃত্তের উপরেই গুরুত্ব দেওয়া হত বেশি। কৃত্তিবাসী রামায়ণও সেই রীতির ব্যতিক্রম নয়।
কৃত্তিবাস যখন রামায়ণ অনুবাদে প্রবৃত্ত হচ্ছেন, সেই সময়ে বাংলা তথা সমগ্র ভারতে রাম-ভক্তিবাদের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। রামচন্দ্র যে বিষ্ণুর অবতার, সে বিশ্বাসও সে-যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। তাই বিষ্ণুর চার অংশে বিভক্ত হয়ে দশরথের চার পুত্র রূপে জন্মগ্রহণের কাহিনী দিয়ে সূচনা হয়েছে আদিকাণ্ডের। এরপর রাম ও তাঁর তিন ভাইয়ের সঙ্গে সীতা ও তাঁর তিন বোনের বিবাহ, তাড়কা-বধ ও অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন—এই কাণ্ডের মূল কাহিনী। এর মধ্যেও দু-একটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিষয় সন্নিবেশ করেছেন কৃত্তিবাস। যেমন, চন্দ্র ও সূর্যবংশের বিবরণ। বাল্মীকি সূচনায় যে কাহিনী-সংক্ষেপটি দিয়েছে, সেটি ছেঁটে বাদ দিয়েছেন আমাদের অনুবাদক-কবি।
অযোধ্যাকাণ্ডেও দু-একটি ক্ষেত্রে অভিনবত্ব দেখা গিয়েছে। যেমন, দশরথ কৈকেয়ীকে যে-দুটি বরের কথা জানিয়েছেন, বাল্মীকি রামায়ণে তা একটি বর বলেই কথিত। বনগমনের পূর্বে রামের বনবাসের বিরুদ্ধে লক্ষ্মণ যে-যুক্তি প্রদর্শন করে, বাল্মীকি রামায়ণে তা তেমনভাবে পাওয়া যায় না। এই কাণ্ডের মূল উপজীব্য রামচন্দ্রের বনবাসের পিছনে কৈকেয়ীর দুরভিসন্ধি ও মন্থরার প্ররোচনা। কৃত্তিবাস অন্যভাবে কৈকেয়ীর এই ষড়যন্ত্রকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই ষড়যন্ত্রের ফলেই রামচন্দ্র বনবাসে যেতে বাধ্য হন এবং তাই শেষপর্যন্ত দুরাচারী রাবণকে বধ করা সম্ভব হয়। আসলে ভক্তিবাদী কবি কৃত্তিবাস এইভাবে একটি পারিবারিক ষড়যন্ত্রের ঘটনাকে সুকৌশলে ধর্মতত্ত্বের মোড়কে পরিবেশন করতে সফলকাম হয়েছেন। তাছাড়া বনবাসী রামচন্দ্রকে দেখে ঋষি ভরদ্বাজ যেভাবে তাঁর চরণবন্দনা করেন, তাও বাল্মীকি রামায়ণে দুর্লভ। বলা বাহুল্য, কৃত্তিবাস রামচন্দ্রের উপর দেবত্ব আরোপ করে তাঁকে সকলের পূজ্য করে তুলেছিলেন। নন্দীগ্রামে ভরতের কুস্বপ্ন-দর্শনের ঘটনাও বাল্মীকি উল্লেখ করেননি। দূতের দ্বারা অযোধ্যায় নীত হয়ে ভরত যখন সমস্ত ঘটনা অবগত হলেন, তখন তিনি জননীর উপর চরম আক্রোশে ও আত্মধিক্কারে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করে আত্মহত্যায় উদ্যত হয়েছিলেন। এই ঘটনার বর্ণনা কৃত্তিবাস করলেও মূলে তা নেই। অযোধ্যাকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সীতা কর্তৃক মৃত দশরথের অতৃপ্ত আত্মাকে বালির পিণ্ডদান এবং চারজন সাক্ষীর প্রতি সীতার অভিশাপ বা আশীর্বাদ প্রদান। এটি পুরোপুরি কৃত্তিবাসের কল্পিত। ব্রাহ্মণ, তুলসী, ফল্গু ও বটবৃক্ষ নিয়ে বাঙালি সমাজে দীর্ঘদিন যে-লোকসংস্কার প্রচলিত ছিল, কৃত্তিবাস এই ঘটনায় তার কাব্যিক প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।
অরণ্যকাণ্ডে অত্রিমুনির পত্নী অনসূয়ার কাছে সীতা আপন জন্মবৃত্তান্ত বিবৃত করেছেন—যা আদৌ বাল্মীকি রামায়ণে নেই। মূল রামায়ণে রাম কর্তৃক বিরাধ রাক্ষস বধের পর সুতীক্ষ্ণ মুনির উপাখ্যান আছে, যা কৃত্তিবাস প্রায় পরিত্যাগ করেছেন। অগ্যস্ত কর্তৃক ইল্বল নিধনের কৌশলও পরিবর্তিত হয়েছে কৃত্তিবাসের রামায়ণে।
এইভাবে কাণ্ড ধরে বিচার করতে গেলে কৃত্তিবাসী রামায়ণে অজস্র পরিবর্তন, সংযোজন ও পরিবর্জনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। আসলে বাঙালি পাঠকের উপযোগী করে কাহিনী পরিবেশনের দিকেই কৃত্তিবাসের নজর ছিল, মূল থেকে বিচ্যুতি নিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তায় কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না। তাই কার্তিকের জন্ম, বশিষ্ট-বিশ্বামিত্রের বিরোধ, অম্বরীষ যজ্ঞ প্রভৃতি বিষয়গুলি তিনি বাদ দিয়েছেন, পরিবর্তে যুক্ত করেছেন সৌদাস-দিলীপ-রঘুর কাহিনী, গণেশের জন্ম, গুহকের সঙ্গে রামচন্দ্রের সখ্যতা, হনুমান কর্তৃক সূর্যকে কক্ষতলে ধারণ, রামচন্দ্রের অকালবোধন, বীরবাহু বধ, হনুমান কর্তৃক রাবণের মৃত্যুবাণ হরণ, সীতা কর্তৃক রাবণের চিত্র অঙ্কন ইত্যাদি ঘটনা। এইসব গল্প বলতে কবিকে হাতড়ে ফিরতে হয়েছে নানা হিন্দু ধর্মগ্রন্থ। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, লক্ষ্মণের মূর্ছাভঙ্গ করতে হনুমান কর্তৃক বিশল্যকরণী আনয়ন এবং কুম্ভকর্ণ হত্যার সময় সীতার দেহ থেকে চৌষট্টি যোগিনীর আবির্ভাব অদ্ভুত রামায়ণে কথিত। জৈমিনী ভারত থেকে নিয়েছেন লব-কুশের দ্বারা ভর, শত্রুঘ্ন ও লক্ষণের পরাজিত ও নিহত হওয়া এবং বাল্মীকি কর্তৃক তাঁদের পুনর্জীবন লাভের প্রসঙ্গ। দস্যু রত্নাকরের “মরা, মরা” বলে শাপমুক্ত হওয়ার কাহিনী পাওয়া যায় অধ্যাত্ম রামায়ণে। হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যানটি এসেছে দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ থেকে। ভগীরথের জন্ম-বৃত্তান্তের উৎস যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ ও পদ্মপুরাণ। স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ড থেকে গঙ্গা আনয়নের কাহিনী ও দশরথের রাজ্যে শনির প্রকোপের কথা গৃহীত হয়েছে। এইভাবে কৃত্তিবাসের রামায়ণ হয়ে উঠেছে ভারতীয় পুরাণকথার সমাহার, তবে অবশ্যই বাল্মীকি রামায়ণই ছিল তাঁর মূল আশ্রয়।
চরিত্র-সৃজনে অভিনবত্ব
[সম্পাদনা]যে-কোনও কবির কাব্য গড়ে ওঠে সমকালীন জল-হাওয়ার পরিমণ্ডলে। আখ্যানমূলক কাব্যের চরিত্রও তার অন্তর্গত। যুগের বৈশিষ্ট্যসূচক দাবিগুলিকে বহন করে এই ধরনের কাব্যে চিত্রিত হয় মূল চরিত্রগুলি। সে-চরিত্রে ফুটে ওঠে সেই যুগের ত্রুটি, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাগুলিও।
কৃত্তিবাস ছিলেন তুর্কি-আক্রমনোত্তর পঞ্চদশ শতকের বাঙালি সমাজের প্রতিনিধি। মুসলমান আগ্রাসনের ফলে বাংলা তখন শুধু বৈদেশিক শক্তির অধীনস্থই হয়নি, সেই সঙ্গে ভেঙে পড়েছিল প্রাচীন নীতি-আদর্শের কাঠামো, বিপর্যস্ত হয়েছিল সমগ্র হিন্দুসমাজ। এ-হেন সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রাচীন ভারতের উন্নত চরিত্র আশা করা অন্যায়। তাছাড়া কৃত্তিবাস লিখতে চেয়েছেন বিনোদনমূলক পাঁচালী। মহাকাব্যের মহৎ, বৃহৎ ও সমুন্নত চরিত্রের অবস্থান সে-কাব্যে বড়ো বেমানান। ফলে তাঁর চরিত্রগুলি হয়েছে লোকজীবনানুগ। তাছাড়া বাল্মীকির তুলনায় বাঙালি কবির প্রতিভার আপেক্ষিক হীনতাও এ-প্রসঙ্গে বিবেচ্য। সব মিলিয়ে কৃত্তিবাসী রামায়ণের চরিত্রগুলি মূলের তুলনায় খর্বাকার, তেজোহীন অগৌরবান্বিত হয়ে গিয়েছে। তবুও কৃত্তিবাস এতে আঞ্চলিক বিশিষ্টতা সঞ্চার করে কিছুটা চেহারা দিতে সমর্থ হয়েছেন।
ভক্তিবাদ কৃত্তিবাসের কাব্যে অতিরিক্ত এক উপাদান। মুখ্যত দেশজোড়া রাম-ভক্তির উচ্ছ্বাসের পটভূমিতে এই কাব্যের সৃষ্টি। রাম চরিত্রে তাই নতুন মাত্রা যোজিত হওয়ায় রঘুকুলের শ্রেষ্ঠ বীরের স্বভাব বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়েছে কৃত্তিবাসী রামায়ণে। রামচন্দ্র এখানে যতখানি ক্ষত্রিয় বীর, তার তুলনায় বেশি দেবতা, ভক্তিরসের আশ্রয়, ভক্তবৎসল ভগবান। এই রামচন্দ্র রোদনপ্রবণ বাঙালির ভাবসাযুজ্যে মনের মানুষ। তাঁর চোখে বিরহ-অশ্রুর আবির্ভাব সীতাহরণে, সীতার বনবাসে, সীতার পাতালপ্রবেশে। তিনি রাজকীয় আভিজাত্য ছেড়ে আবেগব্যাকুল হয়ে উঠেছেন কখনও কখনও কোথাও কোথাও নীতিপ্রচারেও যথেষ্ট আগ্রহী।
রামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কৃত্তিবাসের সীতাও হয়ে উঠেছেন অশ্রুমুখী বাংলার কুলবধূ। নিতান্ত দু-একটি বিশিষ্ট জায়গা ছাড়া কৃত্তিবাস সীতাকে সমগ্র বাঙালি সমাজের কুললক্ষ্মীর আদর্শ করে তুলতে চেয়েছেন। পতিভক্তির চূড়ান্ত নিদর্শন গড়ে তীলা হয়েছে সীতার সমস্ত কথাবার্তায় ও আচরণে। নারী পুরুষের ছায়ানুগামিনী—এই জাতীয় সামাজিক ধারণা পোষণ করেন সীতা। অরণ্যকাণ্ডে রাবণ কর্তৃক অপহৃতা হওয়ার আগে স্বামীভক্তিতে অন্ধ হয়ে দেবর লক্ষণকে তিনি ভর্ৎসনা করেছেন, কুটিতে তাঁর স্থিতিকে দুরাত্মার ছল বিবেচনা করে পরুষ-কঠিন ভাষায় তিরস্কার করেছেন লক্ষ্মণকে।
লক্ষ্মণ চরিত্রেও পরিবর্তন সাধন করেছেন কৃত্তিবাস। তাঁর লক্ষ্মণ উদ্ধত, অবিনয়ী। ভরত সম্পর্কে তাঁর মনে সন্দেহ আছে। বনবাস-যাত্রার পূর্বে যে-ভাবে লক্ষ্মণ যুক্তিবিন্যাস করেছেন, তাতে একদিকে পিতার প্রতি অশ্রদ্ধা ও বিমাতা কৈকেয়ীর প্রতি তীব্র ক্রোধ প্রকাশ পেয়েছে।
এছাড়া দশরথের স্ত্রৈণতা ও কৈকেয়ীর স্বার্থপরতা বাল্মীকি রামায়ণ থেকে কৃত্তিবাসের পাঁচালীতে সংক্রমিত হলেও তা যেন বড়োই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। দশরথ কৈকেয়ীর ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হলেও বাল্মীকির দশরথের ন্যায় চরম রূঢ় বাক্য উচ্চারণ করেননি। আবার কৈকেয়ীও যেন নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত নিদর্শন হয়ে উঠেছে বনবাসযাত্ররী রাম-লক্ষ্মকের হাতে কল্বল তুলে দিয়ে। এমনকি যাত্রার পূর্বে রাম বিদায় প্রার্থনা ও আশীর্বাদ ভিক্ষা করলেও কৈকেয়ী বিমুখ হয়েছেন।
হনুমানের চরিত্রও অনেকাংশে অনুগত বাঙালি গৃহভৃত্যেরই অনুরূপ। রাবণ ও ইন্দ্রজিতের যে-পরিচয় ফুটে উঠেছে, তা নিতান্ত রাক্ষস-চরিত্র নয়। রাবণ ছদ্মবেশে রামেরই ভক্ত। তিনি শত্রুভাবে বিষ্ণুর কাছে মুক্তি পেতে চেয়েছেন। তাঁর রাম-বিরুদ্ধতার তেজোদ্দীপ্ত মূর্তি হারিয়ে যায় যখন অন্তিমকালে তিনি বলে ওঠেন:
অনাথের নাথ তুমি পতিত পাবন।
দয়া করি মস্তকেতে দেহ শ্রীচরণ।।
চিরদিন আমি দাস চরণে তোমার।
শাপেতে রাক্ষসকুলে জনম আমার।।
এইভাবে প্রায় সমস্ত চরিত্রের বঙ্গীয়করণে কৃত্তিবাস আপন কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন। মহাকাব্যিক চরিত্রের আদিমতা, গাম্ভীর্য, সমুন্নতি কোনওটিই বাংলা অনুবাদে রক্ষিত হয়নি, অথচ লৌকিক পাঁচালীর উপযোগী চরিত্র হয়ে ওঠায় কৃত্তিবাসের রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, ভরত, কৈকেয়ী, দশরথ, রাবণ, মন্দোদরী সবাই এককভাবে বাঙালি শ্রোতা ও পাঠকবর্গের আদরের সামগ্রী হয়ে উঠেছেন।
রসসৃজনে দক্ষতা
[সম্পাদনা]কাব্য রসের আশ্রয়। কারণ, আলংকারিকদের সিদ্ধান্ত: “রসাত্মকং বাক্যং কাব্যম্” (রসাত্মক বাক্যই হল কাব্য)। মহাকাব্যের ক্ষেত্রে তাঁদের বিধান এখানে নয়টি রসের (শৃঙ্গার, বীর, রৌদ্র, করুণ, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত, শান্ত) মধ্যে প্রধান রসটির উপস্থিতি থাকলেও চারটি রসের মধ্যে যে-কোনও একটি অঙ্গীরস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। উক্ত চারটি রস হল শৃঙ্গার, বীর, করুণ ও শান্ত। বাল্মীকি রামায়ণ করুণরসের কাব্য। অনুবাদক কৃত্তিবাসও মূলের অনুসরণে করুণরসকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বস্তুত, রামায়ণের অধিকাংশ কাহিনীই বেদনাঘন। আখ্যানের সূচনায় কৈকেয়ীর ষড়যন্ত্রে রাজ্যাভিষেক থেকে বঞ্চিত রামের বনগমন, পুত্রশোকে দশরথের মৃত্যু, রামের নির্বাসনে অযোধ্যাবাসীর ক্রন্দন, কৌশল্যার হাহাকার, অরণ্যে রাবণ কর্তৃক সীতাহরণের পর রামের বিলাপ, রাম কর্তৃক বালি-বধের পর বালি-পত্নী তারার ক্রন্দন, লঙ্কার যুদ্ধে কুম্ভকর্ণ, বীরবাহু, ইন্দ্রজিৎ এবং শেষপর্যন্ত রাবণের মৃত্যুতে মন্দোদরীর বিলাপ, সীতার অগ্নিপরীক্ষা, অযোধ্যায় প্রত্যাগমনের পর সীতার বিরুদ্ধে অপবাদ এবং সে-কারণে সীতার বনবাস এবং সবশেষে সীতার পাতালপ্রবেশের ঘটনা যথেষ্ট মর্মান্তিক ও করুণরসের আশ্রয়। কৃত্তিবাস এইসব ঘটনা বর্ণনায় বাল্মীকিকে যথাসম্ভব অনুসরণ করে গিয়েছেন। বাঙালি স্বভাবতই কোমলপ্রাণ। তারই উপযুক্ত করে আখ্যান পরিবেশিত হওয়ায় স্থানে স্থানে করুণরসের প্রবাহ কোথাও কোথাও তরলতায় পর্যবসিত। তবে রামচন্দ্র বিষ্ণুর অবতার বলে বাঙালি পাঠকের কাছে গৃহীত হওয়ায় করুণরসের মানবিক আবেদন কিছু পরিমাণে লঘু হয়ে গিয়েছে।
প্রাচীন মহাকাব্য মাত্রই যুদ্ধবিগ্রহের ঘটনা-সম্বলিত উপাখ্যান। পাশ্চাত্য মহাকাব্যের অঙ্গীরস তাই বীররস। রামায়ণে অনেকগুলি যুদ্ধের (রাম-লক্ষ্মণের তাড়কাবধ, খর-দূষণের সঙ্গে যুদ্ধ, বালিবধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, লব-কুশের যুদ্ধ) প্রসঙ্গ আছে। স্বভাবতই এই স্থানগুলিতে বীররসের প্রয়োগ ঘটেছে। কিন্তু কৃত্তিবাস মূলের অনুসরণ করলেও বিশেষ কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। এর কারণ মুখ্যত দুটি। প্রথমত, ভক্তিরসের অহেতুক অনুপ্রবেশ এবং দ্বিতীয়ত, সে-যুগের পরিমণ্ডলে বীর-আদর্শের অভাব। কাহিনী ও সেটির চরিত্রগুলি ভক্তিরসে দ্রবীভূত হওয়ার ফলে বীররসের গাম্ভীর্য ও সমুন্নতি দুইই নষ্ট হয়েছে। এই ব্যাপারটি বিশেষভালে লক্ষিত হয় লঙ্কা-যুদ্ধে রামের বিপক্ষে সমরে অবতীর্ণ বীরবাহু, তরণীসেন, এমনকি রাবণ চরিত্রেও। তাঁরা ছদ্মবেশী রামভক্ত। ফলে আচরণে, উক্তিতে কোথাও কোনও রৌদ্রস্বভাব ফুটে ওঠেনি। সমকালীন বাংলায় বিজিত হিন্দুজাতির দুর্বলতা, অনন্যোপায় হয়ে বিদেশী শক্তির অধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতে মানসিক দুর্বলতা ও নিয়তিবাদের প্রকোপ ঘটা স্বাভাবিক। এই দুইই বীররসের পরিপন্থী। কৃত্তিবাস তাঁর রচনায় সার্থকভাবে বীররসের ক্ষেত্রে বিফলকাম হয়েছিলেন সে-যুগের মানসিকতায় পুষ্ট হয়ে এবং সেই সঙ্গে রচনা-মধ্যে ভক্তিকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিতে গিয়ে।
অথচ কৃত্তিবাসের খ্যাতি মুখ্যত নির্ভর করছে এমন একটি রসের সিদ্ধির উপর, যার অবস্থান আলংকারিকদের নির্দেশের বাইরে এবং যেটি রামায়ণ মহাকাব্যের অঙ্গীরসের পরিপন্থী। সে-রস হল হাস্যরস। বস্তুত রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও পরিহাস-রসিকতায় কবি সব শ্রেণীর রসসৃষ্টির প্রয়াসকে অতিক্রম করে গিয়েছে। এর কারণগুলিও অনুধাবনযোগ্য। কৃত্তিবাস লোকরুচির অনুগত করে পাঁচালী লিখতে চেয়েছিলেন, এবং সেই কারণেই সম্ভবত বিদগ্ধ শ্রোতা-পাঠকের রসাস্বাদনযোগ্য মহাকাব্য রচনায় তাঁর আগ্রহ বিশেষ ছিল না। সেকালের পল্লীনির্ভর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির রসবোধ লগ্ন হয়েছিল ব্যঙ্গ, বক্রোক্তি ও পরিহাসপ্রবণ চটুলতায়। অন্তত কৃত্তিবাস নানা স্থানে মূল আখ্যানের বাইরে যে-সব স্বাধীন কাব্যপ্রসঙ্গ যোজনা করেছেন, তারই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, তিনি গ্রামীণ বাঙালির রুচিবোধকেই প্রাধান্য দিয়ে লেখনী হাতে এগিয়ে গিয়েছেন, মহাকাব্যিক গাম্ভীর্যরক্ষার দায়বোধ তাঁর ছিল না। এতে করুণরস কিছুটা বিঘ্নিত হলেও তিনি অবলম্বিত আদর্শ থেকে সরে আসতে পারেননি। তবে তাঁর সৃষ্ট হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে সেকালের বাঙালির যথার্থ স্বরূপটি আত্মপ্রকাশ করেছে বলে মনে হয়। তাঁর রচিত দু-একটি প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করা গেল:
কবি লঙ্কেশ্বর রাবণের শক্তিমত্তা নিয়ে উপহাস করেছেন হরধনু উত্তোলনের প্রসঙ্গে। সীতাকে বিবাহ করতে এসে বিপুল ভারের ধনুক তুলতে অসমর্থ রাবণকে বিড়ম্বিত করতে কবি লিখেছেন: <poet>
- কাঁকালেতে হাত দিয়া আকাশ নিরখে।
- মনে ভাবে পাছে আসি ইন্দ্র বেটা দেখে।।
</poet> সীতা অন্বেষণে গিয়ে হনুমান লঙ্কাপুরীতে বন্দী হলে তাঁকে নিয়ে রাক্ষসীরা পরিহাস শুরু করলে তিনিও রসিকতা করে বলেন:
রাবণ শ্বশুর হবে অদ্য বিভাবরী।
সুন্দরী শাশুড়ী পাব রাণী মন্দোদরী।।
ইন্দ্রজিৎ হবে মোর শ্যালক সুন্দর।
আর কি হনুর ভাগ্যে হয় অতঃপর।।
প্রমীলা শালাজ পাব পরমা রূপসী।
রসরঙ্গে তাঁর সঙ্গে রব দিবানিশি।।
লঙ্কাকাণ্ডে "অঙ্গদের রায়বার" একটি বিশিষ্ট অংশ। এতে উতরোল হাস্যরসের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। পরবর্তীকালের অনেক কবি কেবল ওই প্রসঙ্গ নিয়ে লোক-হাসানোর জন্যে কাব্য লিখেছেন। যাই হোক, কৃত্তিবাস এক্ষেত্রে ব্যঙ্গবাণ নিক্ষেপ করেছেন অঙ্গদের বচনে। রাবণ ও অন্যান্য সভাসদেরা যখন রাক্ষসী মায়ায় শত শত রাবণ মূর্তি ধরে অঙ্গদকে বিভ্রান্ত করতে চাইল, তখন ইন্দ্রজিতের প্রতি অঙ্গদের বিদ্রূপপূর্ণ উক্তি:
যে তোর দারুণ পণ তেমন করে কে।
কবে বলবি আমার বধূর স্বামী এনে দে।।
তার গালির মধ্যেও বালি কর্তৃক রাবণের বন্দীত্বের ঘটনারও টিপ্পনী সহকারে উল্লিখিত:
হিতোপদেশ কি বুঝিবি শুন্ রে ব্যাটা গরু।
তুই বাঁচিলে মোর বাপের কীর্তি কল্পতরু।।
নৈলে তোরে বেঁচে থাকতে সাধ করে কি বলি।
লোকে বলবে এই ব্যাটাকে বেঁধেছিল বালি।।
এইসব দৃষ্টান্তের সূত্রে বলা যায় যে, বাঙালির রসরুচি সেকালে খুব উন্নত ছিল না। একদিকে আদিরস, অন্যদিকে হাস্যরস—এই দুইয়ের সীমার মধ্যে দুর্বলশক্তি হীনবীর্য নিরুদ্যমী বাঙালি বসবাস করছিল। কৃত্তিবাস এদেরই জন্য কাব্য লিখতে গিয়ে মূল আদর্শ থেকে স্খলিত হয়েছিলেন। যুগের দাবির কাছে তাঁর এই আত্মসমর্পণ সেকালের কবিদের অনিবার্য ভবিতব্য ছিল।
কাব্যনির্মিতি কৌশলে বিশিষ্টতা
[সম্পাদনা]অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাব্যের আখ্যান-গঠনে অনুবাদকের তেমন কোনও নিজস্বতা থাকে না। দুই ভাষার মধ্যে উৎসগত যোগ থাকলে ভাষার ক্ষেত্রে তিনি কখনও কখনও মূলের ভাষারূপ বজায় রাখতে পারেন। কৃত্তিবাস সংস্কৃত থেকে গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। ভাষার যোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বাল্মীকির কাব্যভাষা অনুসরণ করেননি। প্রাচীন কবির ভাষা উদাত্ত, গম্ভীর ও অলংকৃত। মধ্যযুগীয় শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে গিয়ে কৃত্তিবাস ভাষার সেইসব বৈশিষ্ট্য বর্জন করেছেন। তবে মোটের উপর কৃত্তিবাসের ভাষা সরল ও প্রসাদগুণযুক্ত। হাস্যরসের স্থানগুলিতে তাঁর ভাষা তরল। তিনি পাঁচালীকাব্য লিখতে চেয়েছিলেন। সেই-অনুসারে সেকালের বিখ্যাত দুই ছন্দোবাহন পয়ার ও ত্রিপদী ছিল তাঁর অবলম্বন। অবশ্য সে-সময়ে পয়ার তার নির্দিষ্ট ১৪ মাত্রায় নিয়মিত ছিল না—কোথাও বেশি, কোথাও বা কম মাত্রাও ব্যবহৃত হত। মনে রাখতে হবে, কৃত্তিবাসের রামায়ণ-পাঁচালী লেখা হয়েছিল গেয় আখ্যানকাব্য হিসেবে। গানে অক্ষরের বা মাত্রার ন্যূনাধিক্য থাকতেই পারে। সুরের টানে অক্ষরের বা মাত্রার এই ন্যূনতা পূরণ করা হয়। বর্তমানে যে-সব গ্রন্থ সম্পাদিত হয়েছে, তাতে পয়ারের চালে খুব একটা অসাম্য দেখা যায় না। কারণ, পুথি বার-বার অনুলিপিকরণের ফলে লিপিকরদের হস্তক্ষেপে ছন্দের ত্রুটিও যুগ যুগ ধরে সংশোধিত হয়েছে, বাকিটা পূরণ করে দিয়েছেন আধুনিক কালের কাব্য-সচেতন সম্পাদকগণ। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে পয়ারের ছত্রে এখনও অধিকাক্ষর রয়ে গিয়েছে। যেমন, “টলবল করিয়া উপরে পর্বতের ঘোড়া”, “দূর হইতে দেখে তাকে কুম্ভকর্ণ মহাবলী”, “মুনির গায়ে সোনার টোপর হইল খান খান”, “নখরের চিহ্ন দিল পর্বতের চারিভিতে”, “উলটি পালটি চাহেন রাম গোদাবরীর তীর” ইত্যাদি। ত্রিপদীর ক্ষেত্রে ৮/৮/১০ মাত্রার ত্রিপদীই বেশি লিখেছেন কৃত্তিবাস। মুখ্যত ঘটনা বর্ণনায় পয়ার এবং দৃশ্য বর্ণনায় ত্রিপদী তাঁর অবলম্বন। ছড়ার ছন্দ তখন ‘ধামালী’ নামে পরিচিত। এটি চার মাত্রার দ্রুত লয়ের ছন্দ। কৃত্তিবাসের কাব্যের "অঙ্গদ রায়বার" অংশে তারও আভাস পাওয়া যায়। বিষয়ের লঘুতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই ছন্দ-যোজনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন কৃত্তিবাস।
কাব্যদেহের প্রসাধনে অলংকার প্রাচীনকাল থেকে নিয়োজিত। কবি ব্যবহৃত অলংকারে তাঁর কাব্যের দ্বৈত প্রকৃতি আশ্চর্যভাবে পরিস্ফুট। বাল্মীকির শীলিত কাব্য তাঁর আদর্শ। সেই সূত্রে কয়েকটি সংস্কৃত অলংকার তিনি ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে গ্রামীণ শ্রোতার রসবোধের আবেদনে সাড়া দিতে পারে এমন সাধারণ অভিজ্ঞতাকেও উপমান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে বৈচিত্র্যময় স্বাদ সঞ্চারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কৃত্তিবাস ব্যবহৃত কয়েকটি অলংকারের উদাহরণ দেওয়া যাক:
- সংস্কৃতানুগ অলংকার:
- "নিদ্রায় আকুল রামা হইল অচেতন। চরণ পঙ্কজ ভ্রমে ধায় অলিগণ।।"
- "বুড়ার যুবতী নারী প্রাণ হৈতে বাড়া।"
- "চরণে নূপুর বাজে রুনুঝুনু শুনি। নীলপদ্ম কোলে যেন হংস করে ধ্বনি।।"
- দেশীয় অলংকার:
- "তার পৃষ্ঠে কুঁজ যেন ভরন্ত ডাবরী।"
- "কুম্ভকর্ণ স্কন্ধে চড়ি বীরগণ নাচে। বাদুড় ঝুলিছে যেন তেঁতুলের গাছে।।"
- "জানকী কাঁপেন যেন কলার বাগুড়ি।"
- "কুমারের চাক যেন ঘুরাইয়া ফেলে।"
বলা বাহুল্য, চমৎকারিত্ব সৃষ্টি হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীর অর্থাৎ দেশীয় অলংকারগুলিতেই।
ভক্তিবাদ প্রচারে সাফল্য
[সম্পাদনা]ভারতবর্ষ আধ্যাত্মিক ভাবৈশ্বর্যে পরিপূর্ণ এক দেশ। এদেশের সাহিত্য ও শিল্পকলায় ধর্মীয় অনুভূতিরই প্রাধান্য। আবহাওয়ার গুণে এখানে রক্তমাংসের মানুষও দেবতায় পরিণত হয়। রামায়ণী কথা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মানবকথার সারাৎসার রূপে। বাল্মীকির রাম সমস্ত মানবকুলের আদর্শ বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে পৌরাণিক সংস্কৃতির প্রভাবে তিনি হয়ে ওঠেন বিষ্ণুর অবতার। তখন তাঁকে ঘিরে সমগ্র ভারতে প্রসারিত হয় রাম-ভক্তিবাদ। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের ফলে জানা যায় যে, খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের মধ্যেই রাম দেবালয়াশ্রয়ী দেবতা হিসেবে পূজা পেতে শুরু করেন। বাল্মীকি রামায়ণের আদিকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ডে, অধ্যাত্ম রামায়ণে, অদ্ভুত রামায়ণে ও যোগবাশিষ্ট রামায়ণে রামের দেবত্ব প্রতিষ্ঠিত। বাংলায় একাদশ শতকে সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিত গ্রন্থেও রামকে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়েছে। বাংলায় প্রাপ্ত শিলালিপি, লেখমালা, মূর্তিশিল্প ও মন্দিরগুলিতে রামসীতার একত্র উল্লেখ ও সহাবস্থান এবং তাঁদের পূজার প্রচলন থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাক্-চৈতন্য যুগ থেকেই এদেশের মানুষের কাছে রাম দেবতা রূপে পূজা পেয়ে আসছেন। পঞ্চদশ শতকে কৃত্তিবাস যখন রামায়ণ অনুবাদে প্রবৃত্ত হন, তখন তিনিও এই ধর্মীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য স্বীকার করেই অনুবাদে অগ্রসর হয়েছিলেন।
কৃত্তিবাসী রামায়ণে ভক্তির দুটি স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছেন ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। এ-দুটি যথাক্রমে নামাশ্রয়ী ভক্তিবাদ এবং পরাৎপর আদ্যাশক্তির বাৎসল্যভাব। মনে রাখতে হবে, তখনও বাংলায় চৈতন্যদেবের আবির্ভাব ঘটেনি। তাই কৃত্তিবাসের ভক্তিবাদের উৎস ছিল অধ্যাত্ম রামায়ণ ও অদ্ভুত রামায়ণ। তাঁর রাম ভক্তিতত্ত্বের আকর। এই ভক্তিবাদকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "কৃত্তিবাসের রাম ভক্তবৎসল রাম। তিনি অধম পাপী সকলকেই উদ্ধার করেন। তিনি গুহক-চণ্ডালকে মিত্র বলিয়া আলিঙ্গন করেন। বনের পশু বানরদিগকে তিনি প্রেমের দ্বারা ধন্য করেন। ভক্ত হনুমানের জীবনকে ভক্তিতে আর্দ্র করিয়া তাহার জন্ম সার্থক করিয়াছেন। বিভীষণ তাঁহার ভক্ত। রাবণও শক্র-ভাবে তাঁহার কাছ হইতে বিনাশ পাইয়া উদ্ধার হইয়া গেল। এ রামায়ণে ভক্তিরই লীলা।" (প্রবন্ধ: "সাহিত্যসৃষ্টি", গ্রন্থ: সাহিত্য)
কৃত্তিবাসী রামায়ণের কিছু কিছু কাব্যপ্রসঙ্গ উদ্ধার করে তাঁর প্রচারিত রাম-ভক্তিবাদের স্বরূপ লক্ষ্য করা যাক। দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মীকিতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ বাল্মীকি রামায়ণে নেই, আছে অদ্ভুত রামায়ণে। কবি সেই কাহিনী সংযুক্ত করে দেখালেন, পাপী রত্নাকর কীভাবে “মরা, মরা” বলতে বলতে “রাম” নামে উদ্ধার পেয়ে আদিকবি বাল্মীকিতে পরিণত হলেন। অন্ধমুনির পুত্র সিন্ধুকে বধ করার ফলে দশরথের ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়, মুনিও তাঁকে অভিশাপ দেন। পাপ থেকে নিষ্কৃতি পেতে রাজা বশিষ্টপুত্র বামদেবের নির্দেশে তিনবার রামনাম জপ করেন। বশিষ্ট ক্রুদ্ধ হয়ে পুত্রকে বলেন:
এক রাম নামে কোটি ব্রহ্মহত্যা হরে।
তিনবার রামনাম বলালি রাজারে।।
এমনকি পুত্রকে তিনি চণ্ডাল হওয়ার অভিশাপ দেন। লঙ্কাযুদ্ধে অনেক বানর সৈন্য ও রাক্ষস সৈন্য নিহত হয়। রামের পক্ষাবলম্বন করে বানরদের সদগতি হয়, অথচ মুক্তিলাভ করে শত্রুভাবাপন্ন বিপক্ষদলের রাক্ষসেরাও। এর কারণ ব্যাখ্যা করে ইন্দ্র যে কথা বলেছেন, তাতে স্পষ্টত নাম-ভক্তিবাদের জয় সূচিত হয়েছে। ইন্দ্র বলেছেন:
রাবণেরে মার বলি কপিগণ মরে।
উদ্ধার পাইবে বল কি রামের জোরে।।
রামে মার শব্দ করে মরেছে রাক্ষস।
রাম নাম করে মরে গেছে স্বর্গবাস।।
হনুমান রামচন্দ্রের দাস। তাঁর মধ্যে দিয়ে কবি দাস্যভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। হনুমান তাঁর হৃদয় চিরে রামসীতার যুগলমূর্তি দেখান। দুর্বল হনুমানের শক্তি তো রামচন্দ্রই। তাই হনুমানের উক্তি:
দুর্বল হনুর তুমি একমাত্র বল।
তোমা বিনা নাহি কিছু হনুর সম্বল।।
রামচন্দ্র কৃত্তিবাসী রামায়ণে প্রেমের দেবতা। তাঁর ক্ষত্রিয় পরিচয়, পৌরুষ, বীর্যবত্তা সেভাবে উপস্থাপিত নয়। কবি ভক্তির গঙ্গোদকে শত্রুপক্ষের তরণীসেন, রাবণ প্রমুখ সবাইকে স্থান করিয়ে রণক্ষেত্রে পাঠিয়েছেন। তরণীসেন সমস্ত দেহে রামনাম লিখে যুদ্ধে আসে। এ-হেন ভক্তের দেহে রামচন্দ্র কীভাবে অস্ত্রাঘাত করবেন। সীতা উদ্ধারের ইচ্ছা তাঁর মুহূর্তে উবে যায়। তরণীসেন যুদ্ধে মারা পড়লে তার কাটামুন্ডু রামনাম করতে করতে স্বর্গে উড়ে যায়। রাবণের যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে অশুভ লক্ষণ দেখে মন্দোদরী স্বামীকে নিরস্ত করতে চাইলে রাবণের মন্তব্য:
মরিব রামের হাতে ভাগ্যে যদি আছে।
যমের না হবে সাধ্য ঘনাইতে কাছে।।
বিষ্ণুদূতে লয়ে যাবে তুলিয়া বিমানে।
কবি কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ডের প্রায় সূচনাভাগে রামনামের মাহাত্ম্য জ্ঞাপন করেছেন। নিজে প্রণিপাত করেছেন দেবতার চরণে। ভবসিন্ধু পার হওয়ার ক্ষেত্রে রামনামই যে ভেলা সে-কথা জানাতে ভোলেননি:
রাম নাম লৈতে ভাই না করিও হেলা।
সংসার তরিতে রাম নামে বান্ধ ভেলা।।
রাম নাম স্মরি যেবা মহারণ্যে যায়।
ধনুর্বাণ লয়ে রাম পশ্চাতে গোড়ায়।।
পুরোপুরি ভক্তের দৃষ্টিতে লেখা এ কাব্যে সেকালের ভক্তিভাবাপন্ন বাঙালি আপন অধ্যাত্মজীবনের স্পর্শ খুঁজে পেয়েছিল। বাঙালির জীবনসাধনার সঙ্গে এ পাঁচালীর আত্মিক মিলের জন্যই কৃত্তিবাসী রামায়ণ বাংলার জাতীয় মহাকাব্যে পরিণত হতে পেরেছিল।
বাঙালিয়ানা প্রকাশে অনবদ্যতা
[সম্পাদনা]আধুনিক যুগের সূচনালগ্নে বৃহত্তর ভারতবর্ষে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি দেখা দিয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে সম্রাটেরা সাম্রাজ্যবিস্তারের উদ্দেশ্যে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল বা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকেই একক প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে আনলেও বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও জীবনাচরণ-সংক্রান্ত পার্থক্য রয়েই গিয়েছিল। বাংলা ভারতের পূর্বাঞ্চলের এক ভূখণ্ড। এখানকার জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা বাঙালি জাতির নিজস্ব কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে। সেই জাতিগত লক্ষণগুলিই বাঙালিয়ানা নামে কথিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবন, জন্ম-বিবাহ-মৃত্যু ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নানা আচার-অনুষ্ঠান, বারো মাসের পালা-পার্বণ, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, সুনির্দিষ্ট কর্মধারা, বাগ্-ভঙ্গিমা ইত্যাদি সব-কিছুই বাঙালিয়ানার অন্তর্গত। বাংলার নিসর্গপ্রকৃতি, নদনদী, মাটি, গাছপালা, পশুপাখি ইত্যাদিও বৃহত্তর অর্থে বাঙালির বাঙালিয়ানাকে নির্মিত করে দিয়েছে। তাই যখন কোনও কবির রচনায় এই প্রসঙ্গ উঠে আসে, তখন বুঝতে হবে যে, তাঁর লেখনীতে বাঙালির এই নিভৃত নিজস্ব জীবনভঙ্গিটিরই প্রতিফলন ঘটেছে।
কৃত্তিবাস সর্বভারতীয় রামায়ণী কথাকে বিশিষ্ট আঞ্চলিক রূপের ভিতর দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন, যেমনটি করেছিলেন তুলসীদাস তাঁর রামচরিতমানস কাব্যে। কৃত্তিবাসের পাঁচালীতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের ছায়াপাত খুব স্পষ্ট। সেকালের বাঙালি পরিবার ছিল একান্নবর্তী। পারিবারিক সম্বন্ধের ক্ষেত্রে সেখানে যে নিবিড় টান অনুভূত হত, কৃত্তিবাসের রচনায় তার প্রতিফলন ঘটেছে স্বাভাবিক ভাবেই। রাম-লক্ষ্মণের সৌভ্রাতৃত্ব, দশরথ ও বিমাতাদের প্রতি রামের শ্রদ্ধা, অগ্রজকে ভরতের সম্মানদান, সীতার সর্বংসহ দুঃখময় বধূজীবন, হনুমানের দাস্যভাব সবই যেন বাংলার সমাজজীবনের প্রত্যক্ষ সত্য। সেকালের বহুবিবাহ-জনিত সপত্নীপ্রথাও রূপায়িত হয়েছে দশরথের তিন স্ত্রীর জীবনাচরণে। সর্বভারতীয় চরিত্রগুলির এইভাবে আঞ্চলিক রূপদান একদিকে যেমন কৃত্তিবাসের দক্ষতার পরিচায়ক, তেমনই অন্যদিকে দীর্ঘকাল ধরে কাব্যটির পাঠকসমাজে বেঁচে থাকার গূঢ় রহস্য। মহাকাব্য যদি একটি জাতির সামগ্রিক জীবনচেতনার ফসল হয়, তাহলে কৃত্তিবাসী রামায়ণে বাঙালির সামগ্রিক জীবনবোধ যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তার নিরিখে এটিকে বাংলার জাতীয় মহাকাব্যের সম্মান দেওয়া চলে। জাতির আত্ম-প্রতিবিম্বনই হয়তো কবির লক্ষ্য ছিল এবং সেদিক থেকে তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। এইভাবে স্বকীয়তার উপস্থাপনায় তাঁর রাম-পাঁচালী বাল্মীকির মহৎ সৃষ্টির সমান্তরাল এক স্বতন্ত্র বঙ্গীয় মহাকাব্য হয়ে উঠেছে।
বস্তুত পক্ষে, কৃত্তিবাসী রামায়ণের চরিত্রে, আখ্যানে, পরিবেশ-বর্ণনায়, সামাজিকতায়, নিসর্গ-প্রকৃতিতে, দৈনন্দিন জীবনচর্যায় বাঙালিয়ানার নিবিড় স্পর্শ অনুভব করা যায়। এই বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি উদাহরণ চয়ন করা যায়।
প্রথমত, চরিত্রগুলি সবাই কমবেশি বাঙালির প্রাণের রসে সঞ্জীবিত। ঘরোয়া আদর্শের ছাঁচে এঁরা রূপায়িত হওয়ায় পাঠক রামায়ণের গল্পকে বাইরের কাহিনী বলে মনে করার অবকাশ খুঁজে পায় না। বাঙালি বীরের শৌর্য ও দুর্বলতা উভয়ের মিশেলে রাম চরিত্রটির নির্মাণ। তিনি পত্নীপ্রেমে দুর্বল এবং স্নেহে, মমতায় ও কোমলতায় সজল। বাঙালি গৃহবধূর ন্যায় সীতাও নতমুখী, সহিষ্ণু ও স্বামী-অনুগতা। রাবণকে মনে হতে পারে বাংলারই কোনও দুর্বৃত্ত জমিদার। কবি মুনিঋষিদের নির্মাণেও বাংলার পেটুক বামুনঠাকুরদেরই আদল করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, পারিবারিক চিত্র অঙ্কনে কবির আদর্শ বাংলার সমাজ। বাল্মীকি রামায়ণে নেই, এমন ঘটনাও কৃত্তিবাস বর্ণনা করেছেন কেবল বাঙালি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে। যেমন, বনবাস-যাত্রার প্রাক্কালে রামকে বিমাতা কৈকেয়ীর চরণবন্দনা করে যাত্রার অনুমতি ভিক্ষা করতে দেখা যায়, যা মূলে অনুপস্থিত। অরণ্যকাণ্ডে বিদেহী দশরথের অতৃপ্ত আত্মার উদ্দেশ্যে সীতার বালির পিণ্ডদান সমধর্মী আর-একটি বিষয়। নির্দোষ ভরত রামের বনগমনের পর অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করে জননী কৈকেয়ী ও দুষ্ট পরামর্শদাত্রী মন্থরার প্রতি যে-আচরণ করে, তা অনেকাংশে বাঙালি যুবকের চরিত্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। লক্ষ্মণের ঔদ্ধত্য ও গোঁয়ার্তুমি কবি তাঁর সমাজ থেকেই আহরণ করেছিলেন বলে মনে করা যায়। বাঙালির আবেগপ্রবণতা, কোমলতা, দার্ঢ্য, পরশ্রীকাতরতা সবই তাঁর কাব্যে এভাবে নানা দিক থেকে বাঙালিয়ানার মুদ্রাচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
তৃতীয়ত, বাঙালির দৈনন্দিজ জীবনাচরণের নানা দিক কৃত্তিবাস অবিকল তুলে ধরেছেন। যেমন, রামের জন্ম-কেন্দ্রিক নানা আচার-অনুষ্ঠান (পাঁচুটি, ষষ্ঠীপূজা, অষ্টকলাই, নত্তা, জননাশৌচান্ত, অন্নপ্রাশন), পূজা-পার্বণ, ব্রত-উপবাস ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে এই কাব্যে। রাজ্যাভিষেকের পূর্বরাত্রে রাম ও সীতা সংযম অবলম্বনপূর্বক উপবাসী থাকেন। পুত্রের মঙ্গলকামনায় কৌশল্যা শিবপূজায় রত হন। দশরথ ও রাবণের অন্ত্যেষ্টি-সংস্কার বাঙালি হিন্দুর মতোই।
চতুর্থত, বাংলার বিভিন্ন স্থাননামের ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্তিবাস অযোধ্যার কাহিনীকে সরাসরি বাংলার মাটিতে নামিয়ে এনেছেন। গঙ্গাবতরণের প্রসঙ্গে তিনি নবদ্বীপ, মেড়াতলা, সপ্তগ্রাম, আকনা-মাহেশের কথা লিখেছেন, যে-সব স্থান ছিল তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার মধ্যে।
পঞ্চমত, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাসের পাঁচালীতে। রামের খোঁজে বের হওয়া ভরতকে নারকেল, কলা, আম, কাঁঠাল, দুধ, দই, কইমাছ, চিতলমাছ ইত্যাদি বাঙালির অভ্যস্থ খাদ্যসামগ্রী দিয়ে অভ্যর্থনা করে গুহক চণ্ডাল। ভরতের আহারের জন্য ভরদ্বাজ মুনিও যে-সব পিঠে-পায়েসের ব্যবস্থা করেন, সেগুলি বাঙালি রসনায় চিরাস্বাদিত হয়ে এসেছে। কবির বর্ণনায় পাওয়া যায়:
চন্দ্রাবতী বড়া পীঠে মুগের সামলী।
সুধাময় দুগ্ধে ফেলে নারিকেল পলি।।
কবি বানরবাহিনীকে মানবীয় আকার দিয়েই এঁকেছেন। ফলে তাদের ভোজনসামগ্রীও বাঙালির ন্যায়। তারা খায় লুচি, কচুরি, ছানাবড়া, ছানাভাজা, জিলাপি, মণ্ডা, মতিচূর, রসকরা, সরুচাকুলি, গুড়পিঠা, পাঁপড়, পায়েস ইত্যাদি। বাঙালির পাকশালার বর্ণনা পাওয়া যায় উত্তরকাণ্ডে সীতার রন্ধনে। তিনি দীর্ঘকাল অভুক্ত দেবর লক্ষ্মণকে দুর্দান্ত সব ব্যঞ্জনে পরিতৃপ্ত করেছেন। কবি লিখেছেন:
প্রথমেতে শাক দিয়া ভোজন আরম্ভ।
তার পরে সুপ আদি দিলেন সানন্দ।।
ভাজা ঝোল আদি করি পঞ্চাল ব্যঞ্জন।...
শেষে অম্বলান্তে হল ব্যঞ্জন সমাপ্ত।
সবশেষে নিসর্গ-বর্ণনার কথা উল্লেখ করতেই হয়। বাংলার সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা প্রকৃতি কৃত্তিবাসী রামায়ণে অত্যন্ত সজীব। পশুপাখির বর্ণনাও বাংলার প্রাণীজগতের অনুরূপ। সারস, কাদাখোঁচা, শকুন, কোকিল, চিল, কালপেঁচা, কাকাতুয়া, মাছরাঙা, হরিতাল, পায়রা, বাজপাখি, বাদুড়, বক, টিয়া, চামচিকে, কাঠঠোকরা ইত্যাদির নাম উল্লেখ করেছেন কবি। বোঝা যায়, কবি বাংলার জীবনধর্ম ও পরিবেশের দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়ে এই কাব্য রচনায় অগ্রসর হয়েছিলেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণ সম্বন্ধে যথার্থ মূল্যায়ন করে রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছেন, "মূল রামায়ণকে অবলম্বন করিয়া বাঙালির হাতে রামায়ণ স্বতন্ত্র মহাকাব্য হইয়া উঠিয়াছে। এই বাংলা মহাকাব্যে বাল্মীকির সময়ের সামাজিক আদর্শ রক্ষিত হয় নাই। ইহার মধ্যে প্রাচীন বাঙ্গালী সমাজই আপনাকে ব্যক্ত করিয়াছে।" কৃত্তিবাসী রামায়ণে পরিস্ফুট বাঙালিয়ানা সম্পর্কে এটাই সারকথা।
প্রাক্-চৈতন্য যুগের ভাগবত অনুবাদ
[সম্পাদনা]বেদ-উপনিষদাদির পরে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতিতে যে-ধরনের গ্রন্থের মর্যাদা সর্বাগ্রগণ্য সেগুলি হল পুরাণ। পণ্ডিতদের মতে, পুরাণগুলির উৎপত্তি এক বিশেষ ধর্মসংকটের যুগে। নিরীশ্বরবাদী বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের অভিঘাতে বৈদিক ধর্মের যে রূপান্তর ঘটে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পুরাণশাস্ত্রে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পর একে একে সংস্কৃত ভাষায় ১৮টি মহাপুরাণ ও ১৮টি উপপুরাণ রচিত হয়। এগুলিতে পৌরাণিক দেবতাদেরই প্রাধান্য, তাঁরাই পরবর্তীকালের হিন্দুদের প্রধান উপাস্যে পরিণত। প্রত্যেক পুরাণে পাঁচটি লক্ষণ আবশ্যিকভাবে লক্ষ্য করা যায়: সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে পৌরাণিক সংস্কৃতির আধিপত্য দেখা যায়। বলা বাহুল্য, পুরাণে কাব্যরস কম, তার পরিবর্তে এসেছে বিভিন্ন ধরনের গল্পকথা, পূজার্চনাবিধি, প্রাচীন রাজবংশের ইতিহাস এবং প্রচুর পরিমাণে ধর্মতত্ত্ব ও দার্শনিক মতবাদ। তাই পুরাণের আবেদন রামায়ণ-মহাভারতের ন্যায় রস-পরতান্ত্রিক নয়। পুরাণ থেকে আমাদের দেশের ইতিহাসের অনেক চূর্ণসূত্র পাওয়া যায়। মোট ছত্রিশটি পুরাণের মধ্যে কৃষ্ণকথা-কেন্দ্রিক ভাগবত পুরাণের প্রভাব জনজীবনে সর্বাধিক। কারণ, এই পুরাণে বৈষ্ণবধর্মের আশ্রয়ে বিষ্ণুর অবতারাদি ও কৃষ্ণের জীবনকথা ও বাণী লিপিবদ্ধ রয়েছে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এই পুরাণ প্রধান ধর্মগ্রন্থ রূপে বিবেচিত। ভারতে ভক্তিবাদ প্রচারে ভাগবতের ভূমিকা অসামান্য। চৈতন্য-পরবর্তী যুগে তো বটেই, তাঁর আবির্ভাবের পূর্বেও যে বৈষ্ণবসমাজে ভাগবতের জনপ্রিয়তা ব্যাপক ছিল তার প্রমাণ এই গ্রন্থের অনুবাদেই দৃষ্ট হয়। ভাগবতকে কেন্দ্র করে কবি জয়দেবই প্রথম বৃহদাকার কৃষ্ণকথামূলক গীতিপ্রবন্ধ গীতগোবিন্দম্ রচনা করেন। কিন্তু তাঁর ভাষা ছিল সংস্কৃত। বাংলা ভাষায় কৃষ্ণকথা-কেন্দ্রিক আখ্যান প্রথম রচনার কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন বড়ু চণ্ডীদাস। তবে তাঁর কাব্যের প্রকৃতি বিশুদ্ধভাবে পৌরাণিক ছিল না। তিনি কৃষ্ণের ঐশ্বর্যমূর্তিটিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে তাঁর প্রেমিক তথা কামবিহ্বল মূর্তিটি পাঠকের সামনে উপস্থিত করেছেন। এর পিছনে বোধহয় লোকরুচির আনুগত্যই ছিল প্রধান প্রণোদনা। তিনি ভাগবত ও অন্যান্য পুরাণ থেকে কৃষ্ণের জীবনের কিছু কিছু কাহিনী গ্রহণ করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচনা করলেও সেটিকে অনুবাদগ্রন্থের মর্যাদা দেওয়া চলে না। তা তিনি দাবিও করেননি। তাছাড়া অনুবাদ সাহিত্যের মুখ্য অভিপ্রায় "লোক নিস্তারণ"। বড়ু চণ্ডীদাস সে-আদর্শে ধারে-কাছেও পৌঁছাবার চেষ্টা করেননি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে প্রাক্-চৈতন্য যুগে মালাধর বসুই সর্বপ্রথম ভাগবতকে মূলের অনেকটা আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করে অনুবাদে অগ্রসর হয়েছিলেন। তাঁর শ্রীকৃষ্ণবিজয় সেই কালপর্বের ভাগবতীয় কৃষ্ণকথার শ্রেষ্ঠ অনুবাদ। পরবর্তীকালের কবিরা মালাধরকেই আদর্শ ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন, যদিও অনুবর্তীদের রচনায় চৈতন্য-প্রচারিত প্রেমাভক্তিবাদের ব্যাপক প্রভাব সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছিল।