বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/চৈতন্য যুগ

উইকিবই থেকে

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে খ্রিস্টীয় ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়কাল ‘চৈতন্য যুগ’ নামে পরিচিত। এই যুগের বাংলা সাহিত্যে বহু বৈচিত্র্যময়। মঙ্গলকাব্য ধারায় এই যুগে মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গলের পাশাপাশি বিকাশ লাভ ঘটেছিল ধর্মমঙ্গল, শিবায়ন (শিবমঙ্গল) ও কালিকামঙ্গল (বিদ্যাসুন্দর) উপশাখাগুলির। বৈষ্ণব সাহিত্যের ইতিহাসে এই যুগপর্যায়টি একাধারে বৈষ্ণব পদাবলীর সমৃদ্ধির যুগ এবং সেই সঙ্গে চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকাহিনী অবলম্বনে রচিত চৈতন্যজীবনীকাব্যের যুগও বটে। প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের অনুবাদ কাব্যের ধারাটি এই যুগেও অব্যাহত ছিল। রামায়ণ ও মহাভারত অনুবাদের পাশাপাশি চৈতন্যদেব-প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তি-আন্দোলনের প্রভাবে এই সময়পর্বে বিশেষভাবে প্রসারিত হয়েছিল ভাগবত অনুবাদের ধারাটিও। তবে এই যুগের সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনার পূর্বে এই সময়পর্বের বাংলার রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও আলোকপাত করা আবশ্যক।

ষোড়শ–মধ্য সপ্তদশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে রয়েছে সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থাও। সুলতানি আমলে এদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছিল দেশের অর্থনীতিতেও। সুলতানদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তাঁদের দেশের অর্থনীতির দিকে বিশেষ মনোনিবেশ করার অবকাশ দিত না। অধিকৃত অঞ্চলের রাজস্ব আদায় ও সম্পদ ভোগ করাই ছিল তাঁদের একমাত্র কাব্য। সেনানায়কদের জায়গিরের নির্দেশ দিয়ে ভূস্বামীদের নিজেদের জায়গায় বহাল রাখাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। এর কারণ ছিল নদী, খাল-বিল, জঙ্গলে ঘেরা বাংলার দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ। সেকালের রায়তদের অধিকারের কথা বিশেষ জানা যায় না। কিন্তু সুলতানের অনুগৃহীত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী সমাজে গড়ে উঠেছিল। এঁদের নাম ছিল চৌধুরী বা ক্রোড়ী। সেকালের বাংলায় সর্বত্রই প্রচুর কার্পাস চাষ হত। নদীমাতৃক বাংলায় কার্পাস উৎপাদনে উপযুক্ত জমি ছিল। এছাড়া ধান ও আখের চাষও হত প্রচুর পরিমাণে। সুলতানি আমলে বাংলায় স্বর্ণমুদ্রা অত্যন্ত বিরল ছিল।

১৪৯৩ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ও তাঁর বংশধরেরা বাংলায় রাজত্ব করেন। তারপর বাংলা শাসিত হয় শের শাহ ও তাঁর বংশধরদের দ্বারা। শের শাহের আগে বাংলার মুদ্রানীতিতে কিছু ত্রুটি ছিল। এর কারণ বাংলায় ধাতুর দুষ্প্রাপ্যতা, মিশ্রিত ধাতু-নির্মিত মুদ্রার প্রচলন এবং সোনার সঙ্গে অন্যান্য ধাতুর অনুপাতের অনির্দিষ্টতা। শের শাহ সম্রাট হয়ে কৃষি ও মুদ্রানীতি দুইয়েরই সংস্কার করেন। স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা ছাড়াও তিনি এক নতুন ধরনের তাম্রমুদ্রার প্রচলন করেন। সেকালের বাংলার বহির্বাণিজ্যের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে। ইতালীয় পর্যটক লুদোভিকো দি বার্থেমা ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাংলায় আসেন। তিনি গঙ্গার মোহনায় ‘বেঙ্ঘালা’ নামে এক বর্ধিষ্ণু বন্দরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। এই বন্দরের প্রকৃত পরিচয় স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও এটি সপ্তগ্রাম বন্দর হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন পর্তুগিজ পর্যটক বার্বোসা। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে প্রথম পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপিত হয়। এরপর আরব, পারস্য, আবিসিনিয়া এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বণিকেরাও বাংলার সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রাম বন্দর দুটিতে এসে সমবেত হন। শের শাহ বাণিজ্যের দিকেও নজর দিয়েছিলেন। বাংলায় উৎপাদিত বস্ত্র, সুগন্ধি আতর, জাহাজ ও লবণ বাইরে পাঠানো হত। তাঁর সময়ে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও অনেকটা অবাধ হয়ে গিয়েছিল। আবার শের শাহের রাজত্বকালেই পর্তুগিজ বণিকেরা বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। ভারত মহাসাগরে মুসলমানদের বাণিজ্যশক্তিকে ধ্বংস করার জন্য তাঁরা প্রায় ধ্বংসাত্মক এক নীতি গ্রহণ করে। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে সপ্তগ্রামে পর্তুগিজদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়।

আকবরের শাসনকালে (১৫৫৬-১৬০৫) বাংলার রাজনৈতিক স্থিরতা ফিরে আসে। এই সময় সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটি প্রদেশকে (সুবাহ্‌) ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করে এক-একজন ফৌজদারকে শান্তিরক্ষার ভার দেওয়া হয়েছিল। এক-একজন কাজী নিযুক্ত হয়েছিলেন বিচারের কাজে এবং বড়ো শহরে এক-একজন কোতুয়ালকে পুলিশের কাজে রাখা হয়েছিল। সারা দেশে কৃষি, বাণিজ্য, শিল্পসামগ্রী নির্মাণ ও পাঠাভ্যাস নির্বিঘ্নে চলতে শুরু করেছিল।

মধ্যযুগের এই পর্বে বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোতে আন্তর্জাতিক শক্তির ক্রমবিকাশও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও ইংরেজ বণিকেরা এই সময়েই এদেশে তাঁদের বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাতে শুরু করে। আকবর টোডরমল প্রমুখের সাহায্যে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজস্ব নির্ধারণ করেন। এই রাজস্ব দেওয়ার পরেও বাংলার সুবেদারেরা প্রজাদের শোষণ করে প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করতেন। শায়েস্তা খাঁ আঠারো বছর সুবেদারি করে ন কোটি টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বাংলায় দ্রব্যমূল্য অত্যন্ত কম ছিল। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে ভারতে আসা ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ে বাংলায় ফল ও ফসলের প্রাচুর্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

এই বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিন্যাসের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন। সমাজে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কারুশিল্প, চারুশিল্প ও দারুশিল্পের বিভিন্ন বৃত্তিজীবীগোষ্ঠী ছিল। কামার, কুমোর, ছুতোর, নাপিত, তাঁতি, ধোপা, পুরোহিত প্রভৃতিকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল সেকালের বাঙালি সমাজ। এই সমাজে দাশশ্রেণীর ও নিম্নবর্ণীয় বৃত্তিজীবীর শিক্ষার অধিকার ছিল না। নবদ্বীপ এই যুগের বিদ্যা ও সংস্কৃতি চর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছিল টোল-চতুষ্পাঠী। ব্যতিক্রমী হলেও দু-একজন মহিলাও মধ্যযুগে লেখাপড়া শিখেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

সেযুগের বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, ডাল, মাছ, শাক ও তরকারি। চণ্ডীমঙ্গলে ও অন্য কয়েকটি কাব্যে রান্নার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এছাড়াও চালভাজা, মুড়ি, মোয়া, চিড়ে, বাতাসা প্রভৃতিরও প্রচলন ছিল। নিরামিষাশী বৈষ্ণবদের প্রভাবে নানারকমের মিষ্টান্নও মধ্যযুগে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির খাদ্যতালিকায় স্থান করে নেয়।

সেযুগের সাহিত্য থেকে মেয়েদের নানা ধরনের অলংকারের বিবরণের পাশাপাশি হিন্দুসমাজে গৌরীদান ও কৌলীন্য প্রথার ফলে মেয়েদের কী দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হত, তার পরিচয়ও পাওয়া যায়।

আদি মধ্যযুগে হিন্দুদের শাস্ত্র ও বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র ছিল মিথিলা। মধ্যযুগের মধ্যপর্বে নবদ্বীপই হয়ে ওঠে বাংলার প্রধান বিদ্যা ও সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চাকরি পাওয়ার জন্য সংস্কৃত ছাড়াও অন্যান্য ভাষাও শিখতে হত। সেকালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত সুবাহ্‌ বাংলায় জানতে হত বাংলা, ওড়িয়া, নাগরী (হিন্দুস্তানী) ও ফারসি – এই চারটি ভাষা। ধর্মমঙ্গল-রচয়িতা নরসিংহ বসুর (১৭১৪ খ্রিস্টাব্দ) পিতামহী তাঁকে “বাঙ্গালা পারসী উড়্যা পড়্যাল্যা নাগরী”। অপর কবি প্রভুরাম (অষ্টাদশ শতক) বলেন:

কাছেতে কায়স্থ কত করে লেখাপড়া
বাঙ্গালা সভার শোভে কাগজের গড়া।
বাঙ্গালা পড়ায়ে উড়্যা নাগরী সুন্দর
লেখায় উত্তম সব যার যে দপ্তর।

এই সময়ে বাংলার চট্টগ্রাম, তমলুক, সপ্তগ্রাম প্রভৃতি বন্দরে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে বাণিজ্যতরী এসে ভিড়ত। ধানই ছিল প্রধান সম্পদ। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে তুলার চাষ হত, কাঠও পাওয়া যেত। পণ্যদ্রব্যের মধ্যে প্রধান ছিল গুড়, চিনি, বস্ত্র ও লবণ। নৌকা ও জাহাজ নির্মাণ করা হত।

সেকালের সামন্তশাসিত সমাজে গোমস্তা বেনে অর্থাৎ বণিক জাতিই ছিল মধ্যবিত্ত ও মধ্যশ্রেণীর মানুষ। তার নীচে ছিল প্রান্তিক চাষি, খেতমজুর ও দাসশ্রেণীর লোকেরা। কামার, কুমোর, তাঁতি, ধোপা, নাপিত, ডোম, বাগদি, কৈবর্ত প্রভৃতি নিম্নবর্ণের নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যাই সমাজে ছিল বেশি। সামাজিক শ্রেণীবিভাজন ছিল কৃষিভিত্তিক। চৈতন্য-পরবর্তী যুগে দেশীয় মুসলমান সমাজের মধ্যেও পেশাভিত্তিক বিভাজন দেখা যায়। যেমন, জোলা, বেদে, বারুই, হাজাম, নিকেরি ইত্যাদি।

মধ্যযুগের শহরের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামেই বাস করত। সেইসব গ্রামে গোষ্ঠীপতির নির্দেশে ও পরামর্শে এক-এক গোষ্ঠীর লোক পরিচালিত হত। এক-একটি পাড়ায় বা গ্রামে যে-সব সর্দার বা মাতব্বরেরা থাকতেন, তাঁরাই গ্রামের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করতেন। বিচার করে শাস্তিও তাঁরাই দিতেন। বিবাহ, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি পারিবারিক অনুষ্ঠানও তাঁদেরই কর্তৃত্বে বা নেতৃত্বে সম্পাদিত হত। শাস্ত্রীয় নিয়মভঙ্গকারীর ধোপা-নাপিত বন্ধ করে সমাজে পতিত বা একঘরে করে রাখা হত। মধ্যযুগীয় গ্রামীণ সমাজে সেটাই ছিল চূড়ান্ত অপমানজনক ও অসুবিধাজনক শাস্তি। পতিত বা একঘরে লোকের সহযোগিতা কেউই করত না। তার পক্ষে কোথাও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা অসম্ভব হত। নাপিত, ধোপা, বাদ্যকার, কামার, স্বর্ণকার প্রভৃতিরা ছিল হিন্দু ও মুসলমান সমাজের যোগসূত্র স্বরূপ। এদের মধ্যে নাপিতের ভূমিকা ছিল বৈচিত্র্যময়। সে একদিকে নানা রোগের চিকিৎসাও করত, আবার নানা খবর জোগাতো নানা জনকে। ধোপা-নাপিত ও মোল্লা-পুরোহিতদের বার্ষিক ধান্যদানের বিনিময়ে নিযুক্ত রাখা হত।

তবে একথাও ঠিক যে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে যথার্থ কিংবা পূর্ণাঙ্গ বাস্তব সমাজচিত্র পাওয়া যায় না। অনেক সময়েই আদর্শায়িত, পক্ষপাতদুষ্ট বা অতিকথনদুষ্ট অথবা কল্পনাপুষ্ট ছবি এঁকেছেন কবিরা।

চৈতন্য যুগের মঙ্গলকাব্য

[সম্পাদনা]

চৈতন্য যুগের মনসামঙ্গল

[সম্পাদনা]

মনসামঙ্গল কাব্যের বিষয়বস্তু লৌকিক দেবী মনসার পূজা-প্রচলনের আখ্যান এবং তাঁর মাহাত্ম্যকীর্তন। পঞ্চদশ শতক থেকেই এই কাহিনী সুপরিচিত। মূলত পূর্ববঙ্গের কবিরা প্রাক্‌-চৈতন্য যুগেই এই কাব্যধারায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ষোড়শ শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত যাঁরা মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাঢ়ের কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ এবং পূর্ববঙ্গের কবি দ্বিজ বংশীদাস। তাঁদের কবিপ্রতিভার বৈশিষ্ট্য এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ

[সম্পাদনা]

চৈতন্য-পরবর্তী যুগের মনসামঙ্গল কাব্যধারায় কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাঢ়দেশে (মধ্য-পশ্চিমবঙ্গ) আবির্ভূত এই কবিই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মনসামঙ্গল-রচয়িতা। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর বাঙ্গালাভাষা ও বাঙ্গালাসাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব-এ মনসামঙ্গল-রচয়িতাদের মধ্যে একমাত্র ক্ষেমানন্দেরই উল্লেখ করেন। পূর্ববঙ্গেও ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল পুথি প্রচলিত ছিল।

ক্ষেমানন্দের কাব্যের মার্জিত ভাষা, পরিশুদ্ধ রুচি, উন্নত নৈতিক ভাব ও উচ্চ চারিত্রিক আদর্শ চৈতন্য-প্রভাবের ফলশ্রুতি। তাছাড়া মঙ্গলকাব্য ধারার শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দ চক্রবর্তীর প্রভাবও পড়েছে ক্ষেমানন্দের কাব্যে। কবিকঙ্কণ মুকুন্দের প্রায় অর্ধ-শতাব্দী পরে মনসামঙ্গল রচনা করতে গিয়ে ক্ষেমানন্দ মুকুন্দের ভাষা ও চিত্র বহুলাংশে অনুকরণ করেছেন। ক্ষেমানন্দ জাতিতে কায়স্থ ছিলেন। তিনি তাঁর কাব্যে দেবীর কাছে প্রার্থনায় সমগ্র কায়স্থ জাতির মঙ্গলকামনা করেছেন:

কেতকার বাণী রক্ষ ঠাকুরাণী
কায়স্থ যতেক আছে।

কবির বর্ণনানুসারে, দেবী মনসা প্রথমে মুচিনীর বেশে ও পরে ভূজঙ্গভূষিতা ব্রাহ্মণীর বেশে দেখা দিয়ে ক্ষেমানন্দকে কাব্যরচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কবির আত্মপরিচয় থেকে দু-জন ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়—বারা খাঁ ও ভারমল্ল রায়। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বারা খাঁ মুকুন্দের পুত্র শিবরামকে কুড়ি বিঘা জমি দানপত্র করেছিলেন। ভারমল্লও সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগেই বর্তমান ছিলেন। সুতরাং কেতকাদাস ক্ষেমানন্দকে সপ্তদশ শতকের শেষপাদের কবি ধরে নেওয়া যায়।

ক্ষেমানন্দের কাব্যকাহিনী বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, তিনি তাঁর প্রতিভার তুলনায় বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। দেবখণ্ড বর্ণনায় কবি খিল হরিবংশ, ভাগবতপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ প্রভৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন। নৌ-যাত্রাপথের বর্ণনায় তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও তার চারপাশের অঞ্চলের গ্রাম ও নদনদীর নাম যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাব্যে জুঝাটি, গোবিন্দপুর, বর্ধমান, গাঙ্গপুর, কেজ্যা, মণ্ডলগ্রাম, দেপুর, জেয়াদা, আদমপুর (বা আমদপুর), হাসনহাটি, নারিকেলডাঙ্গা, বৈদ্যপুর, পিড়তলী (বা পিরতলী), গহরপুর, ত্রিবেণী ইত্যাদি স্থানের নাম পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জীবনের ছবিও তাঁর কাব্যের বর্ণনায় ধরা পড়ে।

ক্ষেমানন্দের বর্ণনায় সারল্য ও সহৃদয়তা বিশেষ মাধুর্যের সঞ্চার করেছে। যেমন বেহুলা ছদ্মবেশে পিতৃগৃহে পৌঁছালে যোগিনীর শিঙ্গাধ্বনি শুনে ভিক্ষা দিতে এসে যোগিনী-বেশী বেহুলাকে দেখে তাঁর মায়ের মনে পড়ল হারানো মেয়ের কথা:

তোমা দেখিয়া শোকে কান্দে মোর প্রাণ
মোর কন্যা এক ছিল তোমার সমান।
না বলিয়া কোথা গেল মড়া লৈয়া কোলে
যোগিনী জাগালে শোক বেহুলা বদলে।

তাঁর কাব্যে বেহুলার স্নিগ্ধ করুণ কোমলতা ও পাতিব্রাত্যের দৃঢ়তা বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। আবার পূর্ববঙ্গীয় মাঝিদের বিলাপের বর্ণনায় ক্ষেমানন্দ প্রায় অবিকল মুকুন্দের অনুকরণ করেছেন। বর্ণনকুশলী কবি ক্ষেমানন্দ চাঁদের দুর্গতি বর্ণনায় অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তবে চাঁদ চরিত্রটিকে প্রথমে একটি সুদৃঢ় পুরুষ হিসেবে গড়ে তুললেও কবি শেষরক্ষা করতে পারেননি, তাঁর চাঁদ শেষপর্যন্ত মনসার কাছে সম্পূর্ণভাবে নতিস্বীকার করেছে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অতিশয়োক্তি, নির্দেশনা প্রভৃতি অলংকার ব্যবহারেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বৈষ্ণব কবিদের প্রেরণাই তাঁর কাব্য-মধ্যে বিশেষ সহায়ক হয়েছে বলা যায়।

দ্বিজ বংশীদাস

[সম্পাদনা]

চৈতন্য-পরবর্তীযুগের কবি দ্বিজ বংশীদাস অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কাব্যের মুদ্রিত পুথিতে প্রাপ্ত কালনির্ণায়ক পদ দুটি দৃষ্টে বোঝা যায় যে, ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদ্মাপুরাণ রচনা করেন। কিন্তু কাব্যের ভাষা ও উপাদান তা সমর্থন করে না। কাব্যের ভাষা আধুনিক। কাব্য-মধ্যে মগ-ফিরিঙ্গিদের হাঙ্গামার বিবরণও পাওয়া যায়। পর্তুগিজ (ফিরিঙ্গি) ও মগ জলদস্যুদের সঙ্গে মুঘল সৈন্যদের বিরোধ ঘটেছিল সপ্তদশ শতকে। দ্বিজ বংশীদাসের কাব্যে সেই ঘটনার বিবরণ দৃষ্টে বোঝা যায়, এই কাব্য সপ্তদশ শতকের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ের রচনা। কাব্যে উল্লিখিত কাল-নির্ণায়ক পদ দুটি সম্ভবত প্রক্ষিপ্ত। তাছাড়া মনসামঙ্গলের অন্যান্য কবির ক্ষেত্রে কালনির্ণায়ক পদ পাওয়া যায় একাধিক পুথিতে, কিন্তু দ্বিজ বংশীদাসের মুদ্রিত পুথি ছাড়া অন্যত্র উক্ত পদ দুটি পাওয়া যায়নি।

দ্বিজ বংশীদাসের পদ্মাপুরাণ মনসামঙ্গলের গতানুগতিক ধারা থেকে একটু ভিন্নতর। সাম্প্রদায়িকতার গণ্ডী অতিক্রম করে অসাম্প্রদায়িকতার উচ্চ আদর্শের ক্ষেত্রে তাঁর কাব্য সুপ্রতিষ্ঠিত। পূর্ববর্তী কবিরা চাঁদকে পরম শৈব হিসেবে চিত্রিত করেছেন; কিন্তু দ্বিজ বংশীদাসের কাব্যে চাঁদ শিব নয়, চণ্ডীর উপাসক। আর এই চণ্ডী ও মনসাকে তিনি অভেদরূপে দেখিয়েছেন—যা মঙ্গলকাব্যের একেবারে ঐতিহ্যবিরোধী। চাঁদ উত্তরদেশ থেকে বাণিজ্য সেরে ঘরে ফিরে সনকাকে মনসাপূজা করতে দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়েছেন। পরে আবার গল্পের খাতিরে চণ্ডীকে দিয়ে মনসার বিরুদ্ধে উত্তেজিতও করিয়েছেন চাঁদকে।

মনসামঙ্গল কাব্য করুণরসের আকর। করুণরস সৃষ্টিতে দ্বিজ বংশীদাস চমৎকারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বিপদসংকুল জলপথ বেয়ে স্বর্গগমন কালে অভাগিনী খণ্ডকপালিনী বেহুলার সকরুণ উক্তিগুলি তাঁর কাব্যে বড়োই বেদনাদায়ক। সেই সঙ্গে দ্বিজ বংশীদাসের কাব্যে যুক্ত হয়েছে বীররসও। কবি চাঁদকে সৃষ্টি করেছেন কঠোরে-কোমলে মিশিয়ে। তাঁর কাব্যরচনা ও চরিত্র-চিত্রণের অভিনবত্ব এখানেই। সনকাকে মনসাপূজা করতে দেখে যে চাঁদ ভক্তিতে গলে গিয়েছেন, তিনিই আবার লখিন্দরকে হারিয়ে মনসার প্রতি মারমুখী হয়ে উঠেছেন। সাত পুত্র ও সাত বাণিজ্যতরী হারিয়েও চাঁদ কাতর হয়ে পড়েননি। বীরদর্পে পুরবাসীদের শোকপ্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন, পাছে “কানী” মনসা ভাবেন যে তিনি কাতর হয়েছেন। যে পুত্রশোক মহাশোক, তাকে তুচ্ছ করে চাঁদের অভ্রভেদী পুরুষকার সগর্বে ঘোষণা করেছে: “শতেক লখাই যদি যায় এই মতে।/ তেও না পূজিব কানী পরাণ থাকিতে।।/ কানীর উচ্ছিষ্ট পুত্র গাঙ্গে ভাসাও নিয়া।/ ঢোল মৃদঙ্গ কাড়া আন ডাক দিয়া।।”

দ্বিজ বংশীদাসের পদ্মাপুরাণ পূর্ববঙ্গে অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আসলে ভক্ত-কবি দ্বিজ বংশীদাসের স্বাভাবিক ভক্তিবোধের সঙ্গে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল স্বভাবকবির বিস্ময়-বিমুগ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির। সুগভীর আন্তরিকতা ও ভাষার সারল্য জনতার চিত্তকে চমৎকৃত করে দিয়েছিল। সর্বোপরি তিনি গ্রামে গ্রামে কীর্তনের দিল নিয়ে মনসার গান গেয়ে বেড়াতেন। তাঁর জনপ্রিয়তার মূলে সেটিও অন্যতম প্রধান কারণ। ময়মনসিংহের প্রসিদ্ধ গীতিকা-সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে ময়মনসিংহের কবিকথা গ্রন্থে লিখেছেন, “কবি দ্বিজবংশী ছিলেন পূর্ব ময়মনসিংহের প্রাণের কবি। প্রায় তিনশত বৎসর অতীত হইতে চলিয়াছে, আজও ময়মনসিংহবাসী তাহাদের প্রাণের কবিকে ভুলে নাই। ঘরে বাহিরে, মনের মধ্যে, আজও তাঁহাকে দেবতার পাশে ঠাঁই দিয়া রাখিয়াছে।”

চৈতন্য যুগের চণ্ডীমঙ্গল

[সম্পাদনা]

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকের শেষার্ধে রচিত বৃহদ্ধর্মপুরাণের একটি শ্লোকে কালকেতু ও শ্রীমন্ত সদাগরের কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে। তবে বাংলা ভাষায় চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারার সূত্রপাত পঞ্চদশ শতকে মাণিক দত্তের হাত ধরে। ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই ধারায় কাব্যরচনা করেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিরা হলেন দ্বিজ মাধব, কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী ও দ্বিজ রামদেব।

দ্বিজ মাধবের সারদাচরিত বা সারদামঙ্গল

[সম্পাদনা]

দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্য (মাধব আচার্য) নামে এক কবির চণ্ডীমঙ্গল উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামে সুপরিচিত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তাঁর কাব্যের প্রচলন নেই। ভোলা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সন্দীপ প্রভৃতি অঞ্চলে তাঁর কাব্যের পুথি পাওয়া গিয়েছে। দ্বিজ মাধব তাঁর কাব্যকে কোথাও সারদাচরিত, কোথাও সারদামঙ্গল নামে অভিহিত করেছেন।

অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, দ্বিজ মাধবের কাব্যটিই প্রথম সুস্পষ্ট সনতারিখ-যুক্ত চণ্ডীমঙ্গল। পুথিতে রচনাকাল-জ্ঞাপক শ্লোক ও আকবরের নাম পাওয়া যায়। সেই শ্লোক থেকে জানা যায়, ১৫০১ শকাব্দ অর্থাৎ ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে এই কাব্য রচিত। কিন্তু আকবরের প্রভাব ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ বাংলার সুবেদার হয়ে আসার আগে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রসারিত হয়নি। তবু অন্যান্য বিরুদ্ধ প্রমাণের অভাবে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ধরে নিয়েছেন যে, কাব্যটি ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই রচিত হয়েছিল।

হস্তলিখিত পুথির গোড়ার দিকে বন্দনা-ভাগে কবি যে আত্মপরিচয় প্রদান করেছেন, তা থেকে বোঝা যায় যে, দ্বিজ মাধব ছিলেন পঞ্চগৌড়ের অধীন সপ্তগ্রাম বা নবদ্বীপের অধিবাসী পরাশরের পুত্র। উক্ত অঞ্চলের অধিবাসী পরাশর-পুত্র কবি মাধবাচার্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল প্রভৃতি কাব্য মাধব আচার্য-সমস্যা জটিলতর করে তুলেছে। উভয় কবির নাম, পিতৃপরিচয়, চণ্ডীমঙ্গল ও শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল-এ প্রদত্ত আত্মপরিচয়ের ভঙ্গিমার সাদৃশ্য ও অন্যান্য কয়েকটি আনুষঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিকে কেউ কেউ উভয়কে একই ব্যক্তি বলে মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কবি ছিলেন ময়মনসিংহের বাসিন্দা; কারণ মাধব আচার্যের বংশধরেরা বিশ শতকেও সেখানে বর্তমান ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন যুক্তি খতিয়ে দেখে অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য এইসব মত সমর্থন করেননি। আবার চট্টগ্রামে প্রচারিত ও সেই অঞ্চলে জনপ্রিয় এই কাব্যে চট্টগ্রামের কোনও জনপদের নাম পাওয়া যায় না। তাই বিভিন্ন কারণ খতিয়ে দেখে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাননি।

কাব্যের সূচনায় রয়েছে মঙ্গলদৈত্য বধের কাহিনী এবং তারপরে রয়েছে গণেশবন্দনা। সম্ভবত, মঙ্গলদৈত্য বধের প্রসঙ্গটি পরে সংযোজিত হয়। তাছাড়া চণ্ডী মঙ্গলদৈত্য নামে কোনও অসুরকে বধ করেছিলেন, এমন প্রসঙ্গ কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে নেই, এমনকি কোনও পরিচিত পুরাণ বা তন্ত্রেও এই প্রসঙ্গ পাওয়া যায় না। সম্ভবত কালিকাপুরাণের নরকাসুরকে এই কাব্যে মঙ্গলদৈত্য বলা হয়েছে।

সম্ভবত, সৃষ্টিপত্তন বর্ণনা থেকে দ্বিজ মাধবের প্রকৃত রচনাংশের সূত্রপাত। এই অংশটি ধর্মমঙ্গল কাব্যের অনুরূপ: “না আছিল রবি শশী/ সন্নাসী তপস্বী ঋষি/ না আছিল সুমেরু মন্দার।/ না আছিল সুরাসুর/ রাক্ষস কিন্নর নর/ আছিল কেবল শূন্যাকার।।” শিবের বরে ক্ষমতাবান মঙ্গলদৈত্যের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করার জন্য দেবীর নাম হল মঙ্গলচণ্ডী। এরপর মর্ত্যে পূজা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সখী পদ্মাবতীর উপদেশে বিশ্বকর্মাকে দিয়ে কলিঙ্গদেশে দেউল নির্মাণ করিয়ে রাজাকে স্বপ্ন দিলেন তিনি। এরপরই কাব্যে আরম্ভ হয়েছে কালকেতুর প্রসঙ্গ। তবে তাঁর কাব্যে কালকেতুর প্রজাস্থাপন বা ধনপতির উপাখ্যান খুবই সংক্ষিপ্ত। কাব্যের শেষাংশে অপ্রাসঙ্গিকভাবে তন্ত্রের তত্ত্বও কিছু ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

দ্বিজ মাধব তাঁর কাব্যকে ১৪টি পালায় বিভক্ত করেছেন। চট্টগ্রামে দ্বিজ মাধবের পালা ‘জাগরণ’ নামে পরিচিত; আটদিন ধরে রাত জেগে সেই পালা শুনত মানুষ। এই অঞ্চলে তাঁর লেখা পূর্ণাঙ্গ চণ্ডীমঙ্গল ও ব্রতকথা ধরনের সংক্ষিপ্ত পুথি দুইই পাওয়া গিয়েছে। দুটি রচনার মধ্যে সাদৃশ্য দেখে মনে হয় যে, একটি পরটিরই বর্ধিত পাঠ।

মুকুন্দের কাব্যে চণ্ডী মঙ্গলদাত্রী। অনুগৃহীত কালকেতুকে নিজেরই দেওয়া ঐশ্বর্য নিজেই বহন করে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু দ্বিজ মাধবের কাব্যে কালকেতুর কুটিরে ছদ্মবেশিনী চণ্ডী নিতান্তই কলহকুশলা মধ্যযুগীয় নারী। ফুল্লরা তাঁকে কোনওমতেই বোঝাতে না পেরে তীব্র ক্রোধে বলে যে, দেবীর মাথায় সে মাংসের পসরা তুলে দেবে আর তাঁর গায়ে যত অলংকার আছে, সমস্ত বিক্রি করে সে খাবার জোগাড় করবে। দেবীও সমান তেজে উত্তর দেন, “কি বোলিলা বোল আরবার। কেশেতে ধরিয়া লাঘব করিমু তোমার।।” দ্বিজ মাধবের প্রধান গুণ এই যে, তাঁর রচনা সংক্ষিপ্ত হলেও তিনি প্রত্যক্ষ-দৃষ্ট বাঙালি জীবনের বিচিত্র বাস্তব পটভূমির উপর একটি পূর্ণাঙ্গ গার্হস্থ্য চিত্র অঙ্কন করেছেন।

দ্বিজ মাধবের ভাঁড়ুদত্ত মুকুন্দের ভাঁড়ুদত্তের ন্যায় অভিজাত কুলীন নয়, ইদিলপুর থেকে আসা ষোলোশো প্রজার অন্যতম। এরা লোক ঠকিয়ে খায় এবং এদের “জাতির উদ্দেশ” না থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কুলীন বলে। ভাঁড়ুর পরিচয় দিতে গিয়ে দ্বিজ মাধব মধ্যযুগের সামাজিক গতিশীলতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। শাস্ত্র দৃষ্টে সমাজে বর্ণপ্রথাকে যতটা স্থাণু বলে মনে হয়, মধ্যযুগীয় সমাজ আসলে তেমনটা ছিল না। গোষ্ঠীগত বৃত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণ-কাঠামোয় স্থান পরিবর্তন ঘটত। নিম্নবর্ণীয়রা উচ্চবর্ণীয়ের গোষ্ঠীতে প্রবেশ করতে পারতেন। এইভাবে মৌলিকেরা কুলীন সমাজে প্রবেশ করে। তাছাড়া ভূমিহীন কৃষকেরা অনাবাদী জমি চাষ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ক্ষত্রিয়ত্ব দাবি করতেন। কিন্তু দ্বিজ মাধবের মন্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে, এঁরা ব্রাহ্মণ বা অন্যান্য উচ্চবর্ণীয়দের কাছ থেকে খুব একটা মর্যাদা পেতেন না।

দ্বিজ মাধব মুকুন্দের ন্যায় চৈতন্যবন্দনা করেননি। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্য অনুসারে রচিত চণ্ডীমঙ্গলগুলির মধ্যে বৈষ্ণব পদাবলীর অনুরূপ ঘোষা বা ধুয়ার ন্যায় কয়েকটি গীতি তাঁর কাব্যে স্থান পেয়েছে। দ্বিজ মাধব এগুলিকে ‘বিষ্ণুপদ’ বলে উল্লেখ করেন। সম্ভবত, তিনিই এই রীতির প্রবর্তক। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরবর্তী কবিরাও তাঁর অনুসরণে বিষ্ণুপদ রচনা করেছেন। রাঢ় বা উত্তরবঙ্গের চণ্ডীমঙ্গল-রচয়িতাদের মধ্যে এই রীতির প্রচলন হয়নি, এমনকি এই বিষ্ণুপদগুলি সর্বতোভাবে বৈষ্ণব পদাবলীর আদর্শে রচিত হলেও সপ্তদশ শতকের কোনও বৈষ্ণব পদসংকলেই তা গৃহীত হয়নি।

গবেষকেরা অনুমান করেন যে, মুকুন্দের কাব্য সম্পর্কে দ্বিজ মাধব কিছুই জানতেন না। হয়তো তাঁর কাব্য কবিকঙ্কণ চণ্ডীর কিছু আগে রচিত হয়ে থাকবে, অথবা সুদূর চট্টগ্রামে সেই সময়ে মুকুন্দের কাব্য গিয়ে পৌঁছায়নি। ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিজ মাধব মুকুন্দের তুলনায় অধিক বাস্তবতাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। যেমন, কালকেতুর পিতা ধর্মকেতুর পরিণাম মুকুন্দের ব্রাহ্মণ্য-সংস্কারে তাকে কাশীবাসী করে তুলেছে। কিন্তু দ্বিজ মাধব এখানে স্বাভাবিক ও সঙ্গত একটি পরিণামের চিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, ব্যাধ ধর্মকেতু শিকার করতে গিয়ে সিংহের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হয়। বৃদ্ধ ও জরাতুর ধর্মকেতুর খেদোক্তি দ্বিজ মাধবের কাব্যে তাই এই অপ্রধান চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা প্রদান করেছে: “দুখিত কলি হলি/ তিনজন পুষিতে নারি/ কেমনে পুষিব চারিজন।।/তুহ্মি জান ভালে ভাল/ দুঃখে গেল সর্বকাল/ আর দুঃখ শরীরে না সয়।।” কয়েকটি স্থানে তিনি হাসরস সৃষ্টিতেও যথেষ্ট সফল হয়েছেন। পূর্ববঙ্গের কোনও কোনও বৈশিষ্ট্যও তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। আশুতোষ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীর কবি বলিতে কেবল মুকুন্দরাম এবং ভারতচন্দ্রকেই বুঝায়। দ্বিজ মাধবকে যদিও একজন প্রথম শ্রেণীর কবি বলিয়া স্বীকার করিতে পারা যায় না, তথাপি আনুপূর্বিক সঙ্গিতি রক্ষা করিয়া পূর্ণাঙ্গ চরিত্রসৃষ্টির এমন মৌলিক প্রয়াস তাঁহার পূর্বে আর খুব বেশি কবি দেখাইতে পারেন না।” ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাব্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন, “দ্বিজ মাধবের চণ্ডীমঙ্গল খুব অল্প স্থানেই কাব্যের সীমায় উঠতে পেরেছে, এর থেকে ব্রত-পাঁচালীর লক্ষণ মুছে যায়নি।… মুকুন্দরাম শিল্পী, কবি, কাহিনীকার ও চরিত্রস্রষ্টা; মাধব আচার্য ব্রত-পাঁচালীর কৃতি কবি—এইটুকুই তাঁর গৌরব। তার বেশি প্রশংসা তাঁর প্রাপ্য নয়।”

কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর অভয়ামঙ্গল (কবিকঙ্কণ চণ্ডী)

[সম্পাদনা]

কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর রচিত চণ্ডীমঙ্গলের নাম অভয়ামঙ্গল, অবশ্য কবি ভণিতায় চণ্ডিকামঙ্গল নামটিও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ্যে এই গ্রন্থ কবিকঙ্কণ চণ্ডী নামেও পরিচিত।

মধ্যযুগীয় কবিদের মধ্যে মুকুন্দ চক্রবর্তীই সর্বপ্রথম তাঁর কাব্যে বিস্তারিত আত্মপরিচয় প্রদান করেছেন। তাঁর কাব্য থেকে সমকালীন বাংলা ও বাঙালি সমাজের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। আত্মপরিচয়ে কবি আসরের শ্রোতাদের সম্বোধন করে জানিয়েছেন যে, স্বয়ং চণ্ডীর আদেশে তিনি এই কাব্য রচনা করেছেন। কবি ছিলেন গোপীনাথ নন্দীর তালুক সেলিমাবাজের (সেলিমাবাদের) দামুন্যা গ্রামের বাসিন্দা। এই গ্রাম বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত। প্রজার পাপের ফলে বিধর্মী মামুদ সরিফের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল তাঁর গ্রামে। খাজনার চাপে প্রজারা দেশ ছেড়ে পালানোর উপক্রম করল। মুকুন্দও দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্বগ্রাম ছেড়ে তিনি প্রথমে পৌঁছালেন ভালিঞা গ্রামে। সেখানে রূপ রায় তাঁর সমস্ত সম্বল কেড়ে নিল। মুকুন্দ আশ্রয় পেলেন যদু কুণ্ডু তিলির বাড়িতে। তারপর আবার যাত্রা। গোচড়িয়া গ্রামে পৌঁছানোর সময় মুকুন্দ নিঃসম্বল ও দুর্দশাগ্রস্থ ব্যক্তি। সেখানে পুকুরপাড়ে কবি “শালুক পোড়া” নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করলেন। পূজার পূর্বে তাঁর অবস্থার বিবরণ—“তৈল বিনা কৈলুঁ স্নান/ করিলুঁ উদক পান/ শিশু কান্দে ওদনের তরে”—মুকুন্দের কাব্যের আর সকল আবেদনের সঙ্গে এই রচনাকে করে তুলেছে এক ভাগ্যবিপর্যস্ত পিতার আর্ত-অসহায়তার দলিলও। পূজার পরে পুকুর পাড়েই তিনি স্বপ্নে দর্শন পেলেন চণ্ডীর: "আসন পুষ্কর্ণি আড়া/ নৈবেদ্য শালুক পোড়া/ পূজা কৈলুঁ কুমুদ প্রসূনে।/ ক্ষুধা ভয় পরিশ্রমে/ নিদ্রা যাই সেই ধামে/ চণ্ডী দেখা দিলেন স্বপনে।।/ মা কৈলা পরম দয়া/ দিলা চরণের ছায়া/ আজ্ঞা কৈলা রচিতে কবিত্ব।" দেবীর কাছ থেকে স্বপ্নে মন্ত্রদীক্ষা ও কাব্যরচনার আজ্ঞা লাভ করে শিলাই নদী পেরিয়ে ব্রাহ্মণভূমির রাজা বাঁকুড়া রায়ের আড়রা গ্রামে উপস্থিত হলেন। এই গ্রাম বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুরের কাছে অবস্থিত। এখানে কবি রাজপুত্র রঘুনাথ রায়ের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হলেন। পরে রঘুনাথ রায়ের রাজত্বকালে তাঁর সভাকবি হয়ে মুকুন্দ রচনা করেন তাঁর চণ্ডীমঙ্গল।

কাব্য-মধ্যে কবি নিজের পরিবার সম্পর্কেও অনেক কথাই জানিয়েছেন। কবির পরিবার ছিল ছিলেন পঞ্চোপাসক রাঢ়ীয় শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ। তাঁর পিতামহ জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন দশাক্ষর গোপাল মন্ত্রের উপাসক, সাত্ত্বিক বৈষ্ণবাচারী ও কবিত্বপ্রতিভাসম্পন্ন। কবির পিতা হৃদয় মিশ্রের উপাধি সম্ভবত ছিল ‘গুণরাজ’। কবি নিজের জ্যেষ্ঠভ্রাতার নাম বলেছেন কবিচন্দ্র, এটিও সম্ভবত তাঁর উপাধি। কবির একমাত্র পুত্রের নাম শিবরাম, কন্যার নাম যশোদা, পুত্রবধূর নাম চিত্রলেখা ও জামাতার নাম মহেশ।

কবিকঙ্কণ চণ্ডী-র কোনও কোনও পুথিতে রচনাকাল সম্পর্কে বলা হয়েছে: “শাকে রস রসে বেদ শশাঙ্ক গণিতা। কত দিনে দিলা গীত হরের বণিতা।।” অর্থাৎ ১৪৯৯ শকাব্দের (১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দ) পর মুকুন্দ তাঁর কাব্য রচনা করেন। সমস্যা হল, আত্মবিবরণীতে কবি মানসিংহকে তাঁর সমসাময়িক কালে “গৌড়-বঙ্গ-উৎকল-অধিপ” বলেছেন। বাংলার ইতিহাস থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ১৫৯৪ থেকে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মানসিংহ ছিলেন বাংলার সুবাদার। আবার ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা অঞ্চলে মানসিংহের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। আবার ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে কবিপুত্র শিবরাম বাংলার তৎকালীন সুবাদার কুতুব খাঁর থেকে এক জায়গিরের সনদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই সময় সম্ভবত মুকুন্দ জীবিত ছিলেন না। আশুতোষ ভট্টাচার্য কালজ্ঞাপক ছত্রগুলির পরবর্তী ছত্রগুলিতে মুকুন্দের উচ্চ কাব্যপ্রতিভার অভাব দৃষ্টে এই অংশটিকে পরবর্তীকালের গায়েনদের দ্বারা প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেন। তাঁর মতে, মানসিংহ বাংলার শাসনভার গ্রহণের অব্যবহিত পরে কিংবা অন্তত তাঁর সমসাময়িক কালে বৃদ্ধ বয়সে কবি তাঁর কাব্য রচনা করেন এবং ষোড়শ শতকের শেষ দশকেই তাঁর মৃত্যু হয়। মুকুন্দের জন্ম তিনি ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কোনও এক সময়ে বলে মত প্রকাশ করেছেন।

মূলত মাণিক দত্তের মঙ্গলচণ্ডীর গীত অবলম্বনেই মুকুন্দ তাঁর কাব্য রচনা করেছিলেন। তিনি নিজেও মাণিক দত্তের ঋণ স্বীকার করেছেন। ইতিপূর্বেই সমাজে মঙ্গলকাব্য রচনার বিশিষ্ট একটি রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। তাই কাব্যের বহিরঙ্গ গঠনের মধ্যে তাঁর মৌলিক কোনও কৃতিত্ব নেই। তবে তিনি সংস্কৃত সাহিত্য ও পুরাণাদি থেক নানা কথাবস্তু আহরণ করে তাঁর কাব্যকে যেভাবে সৌষ্ঠবমণ্ডিত করে তুলেছিলেন, ভারতচন্দ্র ব্যতীত অপর কোনও মঙ্গলকাব্য-রচয়িতা সেই কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি।

কবিকঙ্কণ চণ্ডী তিন খণ্ডে বিভক্ত: দেবখণ্ড, আখেটিক খণ্ড ও নরখণ্ড। দেবখণ্ডে আছে দক্ষকন্যা সতী ও হিমালয়-দুহিতা উমার পরিচিত পৌরাণিক আখ্যান। আখেটিক খণ্ডে দেখা যায়, দেবী চণ্ডী নিজের পূজাপ্রচারের জন্য শিবভক্ত নীলাম্বরকে শাপ দিয়ে মর্ত্যে প্রেরণ করছেন। নীলাম্বর ধর্মকেতু ব্যাধের পুত্র কালকেতু হয়ে জন্ম নিল। সেই কালকেতুর সঙ্গে বিবাহ হল ফুল্লরার। কালকেতুর পিতামাতা বৃদ্ধ বয়সে কাশীবাসী হল। এক সময়ে দেবী চণ্ডীর কৃপায় কালকেতু রাজা হল। এই উপাখ্যানে নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে দেবী চণ্ডীর স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠার বিবরণ পাওয়া যায়। এরপর বণিক খণ্ডে স্বর্গভ্রষ্ট নর্তকী রত্নমালা ও তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত দেবীর পূজাপ্রচারের মাধ্যম হয়েছেন। এই অংশে দেবী ব্রাহ্মণ্যসমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জন করছেন।

আখেটিক খণ্ডে কালকেতুর গুজরাট নগরপত্তন উপলক্ষ্যে কবি এক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার ছবি এঁকেছেন। এই নগরে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ছবি উজ্জ্বল। সেখানে মুসলমানেরাও হিন্দুদের অন্যান্য বর্ণের ন্যায় স্থান পেয়েছে স্বতন্ত্র একটি পল্লীতে। নগরের পশ্চিমদিকে এই পাড়ার নাম হাসনহাটি। কালকেতুর মুসলমান প্রজারা শান্ত ও ধর্মনিষ্ঠ। তারা “ফজর সময়ে উঠি/ বিছায়্যা লোহিত পাটি/ পাঁচ বেড়ি করয়ে নমাজ।/ ছিলিমিলি মালা ধরে/ জপে পীর পেগাম্বরে/ পীরের মোকামে দেই সাঁজ।।” এছাড়া এই প্রসঙ্গে সমাজে কোন কোন বর্ণ কোন কোন কর্মে নিযুক্ত থাকত, তারও সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।

সংস্কৃত সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্রে মুকুন্দ চক্রবর্তীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় যেমন তাঁর কাব্যের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে, তেমনই লোকব্যবহার, ছেলেভুলানো ছড়া, শিশুদের খেলাধূলা, মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠান, ঘর-গৃহস্থালি, রান্নাবান্না ইত্যাদি সামাজিক ও সাংসারিক বিষয়েও তিনি আশ্চর্য জ্ঞান ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। নিপুণ পর্যবেক্ষণ, সহৃদয়তা, জীবনের প্রতি আস্থা, ব্যাপক অভিজ্ঞতা ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্য মুকুন্দের রচনাকে সমৃদ্ধ করেছে। নারীর সামাজিক অবস্থানটিকেও তিনি যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন। সপত্নী-সমস্যা কবিকঙ্কণ চণ্ডী-র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। সমগ্র কাব্যে সপত্নী-সংক্রান্ত চারটি পৃথক প্রসঙ্গ পাওয়া যায়: (১) গঙ্গা ও চণ্ডীর কলহ, (২) ফুল্লরার সপত্নী-আশঙ্কা, (৩) লহনা ও খুল্লনার সপত্নী-দ্বন্দ্ব এবং (৪) শ্রীমন্তের দ্বিতীয় বিবাহে খুল্লনার প্রতিবাদ। চার প্রসঙ্গেই কবি ফুল্লরা, খুল্লনা, দুর্বলা প্রভৃতি নারী চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তুলতে পেরেছেন। এছাড়াও তাঁর কাব্যে ভাঁড়ুদত্ত, মুরারি শীল, মুরারি শীলের স্ত্রী, বুলান মণ্ডল, কালকেতুর অত্যাচারে বিপন্ন পশুকুল ইত্যাদি অপ্রধান চরিত্রগুলিও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যযুগীয় বাঙালি সমাজের এমন পরিপূর্ণ চিত্র বাংলা সাহিত্যের আর কোথাও পাওয়া যায় না। ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এ-প্রসঙ্গে লিখেছেন, “বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জীবনের প্রতি প্রসন্নতা তাঁকে অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন চরিত্রস্রষ্টায় পরিণত করেছে। কালকেতু-ফুল্লরা-ভাঁড়ু দত্ত, লহনা-খুল্লনা-দুর্বলা-শ্রীমন্ত প্রভৃতি চরিত্র এখনও যেন আমাদের প্রতিবেশী ও অতিপরিচিত চরিত্র বলে মনে হয়। এদের পাঁচাপাঁচি সাধারণ জীবন প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তববোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবার ফলে এরা বিরাট কোনো আদর্শের জন্য নয়, সহজ মানবিক গুণেই আমাদের কালে এসে পৌঁছেছে। বাস্তবতাবোধ ও মানবধর্ম মধ্যযুগীয় এই ব্রাহ্মণ-কবিকে একেবারে আধুনিক সাহিত্যিকদের পাশে স্থাপন করেছে।… দেবদেবীর মঙ্গলকথা লিখলেও তিনি মানবমঙ্গলেরই কবি—মুকুন্দরামের কাব্যে তার প্রচুর নিদর্শন আছে।”

ধর্মবিষয়েও মুকুন্দের উদার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে উল্লেখনীয়। ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়েও তিনি নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান সম্পর্কে সশ্রদ্ধ মন্তব্য করেছেন। আবার বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত না হয়েও তাঁর কাব্যে বৈষ্ণব ভাব স্নিগ্ধ করুণরস ও মাধুর্যের সঞ্চার ঘটিয়েছে। শাক্ত দেবীর মাহাত্ম্যকীর্তন করতে গিয়ে কবি চৈতন্যবন্দনা করে লিখেছেন, “অবনীতে অবতরি/ চৈতন্যরূপেতে হরি/ বন্দিব সন্ন্যাসিশিরোমণি।” আবার অনেক দুর্গতি ভোগ করে সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে সেই ফেলে আসা দেশ, গৃহদেবতার জন্য এক করুণ ভক্তিনম্র স্নিগ্ধ ব্যাকুলতার পরিচয়ও তাঁর কাব্যে পাওয়া যায়: “দামুন্যা নগরে প্রভু রামচক্রাদিত্য/ শিশুকাল হৈতে যার সেবা কৈল নিত্য।/ সে প্রভু-চরণ মনে ভাবি অনুক্ষণ/ চণ্ডিকামঙ্গল রচে শ্রীকবিকঙ্কণ।।” আবার আড়রা গ্রামে তাঁর বাসস্থান সম্পর্কেও কবির যথেষ্ট প্রীতি ও মমতার পরিচয় পাওয়া যায়। আশুতোষ ভট্টাচার্য মুকুন্দ চক্রবর্তী ও ভারতচন্দ্রের তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃত কবি বলিতে মাত্র দুইজন,—এক মুকুন্দরাম ও দ্বিতীয় ভারতচন্দ্র। মুকুন্দরাম বাঙ্গালীর ঘরের কবি, ভারতচন্দ্র রাজসভার কবি। ঘরের মধ্যে জীবনের ভালমন্দ সকল উপকরণই বিশৃঙ্খল হইয়া থাকে, রাজসভায় কেবলমাত্র মনোরম বস্তুগুলিই সাজাইয়া গুছাইয়া রাখা হয়; ঘরের মধ্যে প্রয়োজনের কাজ, রাজসভায় শোভাবর্ধনের কাজ। ঘরের মধ্যে মনের বিকাশ হইয়া থাকে, রাজসভার মধ্যে ঐশ্বর্যের পরিচয় প্রকাশ পায়। গার্হস্থ্য পরিবেশের মধ্যেই বাঙ্গালী জীবনের যথার্থ পরিচয় প্রকাশ পাইয়াছে, রাজসভার মধ্যে তাহার ঐশ্বর্যের দিকটাই ক্ষণে ক্ষণে চোখ ঝল্‌সাইয়া দিয়াছে। একটি অন্তরের জিনিস, অপরটি বাহিরের জিনিস। মুকুন্দরামের দৃষ্টি অন্তর্মুখী, অন্তরের বিচিত্র সৌন্দর্য উদ্ধার করিয়া লইয়া তাহা দিয়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ জীবনালেখ্য রচনা করিয়াছেন, ভারতচন্দ্র বাহিরের জগৎ হইতে উপাদান সংগ্রহ করিয়া একটি শব্দের তাজমহল রচনা করিয়াছেন। ইহাকেই রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, "রাজকণ্ঠের মণিমালা—যেমন তাহার উজ্জ্বলতা, তেমনই তাহার কারুকার্য।" ভারতচন্দ্রের রচনা মণিমালা, মুকুন্দরামের রচনা বনমালা—একটি রাজকণ্ঠে শোভা পাইবার যোগ্য, আর একটি ব্রীড়ানতা পল্লীবালার কণ্ঠশোভা। একটি অনুভূতিসাপেক্ষ, আর একটি দৃষ্টিসাপেক্ষ। মুকুন্দরাম প্রাণের ক্ষুধা মিটাইবার কবি, ভারতচন্দ্র দেহের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবা কবি;—একজন লোকালয়ের ভক্তিশ্রদ্ধায় আপ্লুত, আর একজন রাজসভার অভিনন্দন লাভ করিয়া গৌরবান্বিত।"

দ্বিজ রামদেবের সারদাচরিত

[সম্পাদনা]

চৈতন্য-পরবর্তী চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারায় একটি কাব্য আবিষ্কার ও সম্পাদনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করেন ড. আশুতোষ দাস। এই কাব্যটি হল দ্বিজ রামদেব রচিত সারদাচরিত। তাঁর পিতার নাম ছিল বিধু অথবা কবীন্দ্র (সম্ভবত উপাধি)। চট্টগ্রাম বা ত্রিপুরা অঞ্চলে কবির নিবাস ছিল বলে বোধ হয়। ত্রিপুরায় দ্বিজ রামদেবের ভণিতাযুক্ত দুটি পুথি পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু কাব্যটির ভাষায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রচলিত শব্দ ও বাগধারার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। দ্বিজ মাধবের কাব্যের সঙ্গে রামদেবের কাব্যের সাদৃশ্য আছে। বিষয়-বিন্যাস, আখ্যানভাগের পালাবিভাগ, শ্লোকে শ্লোকে শব্দ ও রচনাভঙ্গির দিক থেকে অনুকরণ লক্ষ্য করা যায়। এ-বিষয়ে আশুতোষ ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, "মঙ্গলকাব্য রচনায় পুচ্ছগ্রাহিতা কিংবা পরানুবর্তনের যে নিদর্শনই পাওয়া যাক না কেন, এই প্রকার অনুকরণের দৃষ্টান্ত আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না।"

দ্বিজ রামদেবের একটি মুখ্য সম্পদ তাঁর বৈষ্ণব আবেগ। কাব্যটি প্রকাশের আগে পুথির অনুলিপি পড়ে ক্ষুদিরাম দাস লিখেছিলেন, "রামদেবের গ্রন্থে শতাধিক উৎকৃষ্ট পদের সংস্পর্শে আসিতে হয়। ইহার অধিকাংশ রাধাকৃষ্ণ সম্পর্কে রচিত।" অধ্যাপক দাস তখন অন্যরকম অনুমান করলেও আসলে রামদেব দ্বিজ মাধবের দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলেন। দ্বিজ মাধবের কাব্যে বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণার পূর্বে একই ভাবপ্রকাশক ‘বিষ্ণুপদ’ রচনার পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। অনেক স্থানেই মূল কাব্যপ্রসঙ্গের বদলে রাধাকৃষ্ণ-প্রণয়কথা অধিকতর রস-নিবিড়তা লাভ করেছে। কবির রচনায় মৌলিকতা খুবই কম, বেশিরভাগই দ্বিজ মাধবের কাব্যের অন্ধ অনুকরণ। গ্রন্থশেষে রচনার পুষ্পিকা থেকে জানা যায় যে, ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে কবির কাব্যরচনা সমাপ্ত হয়।

চৈতন্য যুগের ধর্মমঙ্গল

[সম্পাদনা]

রামাই পণ্ডিত

[সম্পাদনা]

রামাই পণ্ডিতের ভণিতাযুক্ত তিনটি পুথি পাওয়া গিয়েছে: (১) আগমপুরাণ, (২) অনাদ্যের পুঁথি এবং (৩) একটি খণ্ডিত অজ্ঞাতনামা পুথি। আগমপুরাণ পুথিটি আবিষ্কার ও সম্পাদনা করেন নগেন্দ্রনাথ বসু। পুথি-মধ্যে স্থানে স্থানে ‘শূন্য’ শব্দটির প্রয়োগ দেখে সম্পাদক গ্রন্থনাম শূন্যপুরাণ রাখলেও ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ভণিতা দৃষ্টে এটির নাম আগমপুরাণ-ই ধার্য করেছেন। তবে ভণিতায় রামাই পণ্ডিতের নাম থাকলেও এটিতে নানা জনের হস্তক্ষেপ সহজেই লক্ষ্য করা যায়। অনাদ্যের পুঁথি-তে কোনও কবির নাম নেই। ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এই রামাই পণ্ডিতের রচনা নয়। বিশ্বভারতী গবেষণাকেন্দ্র থেকে অষ্টাদশ শতকের একটি খণ্ডিত পুথি অবলম্বনে ড. পঞ্চানন মণ্ডল আর-একটি নামবিহীন পুথি (সম্পাদক প্রদত্ত গ্রন্থনাম অনাদ্যের পুথি) সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। এটিতে রামাই পণ্ডিতের জীবন-সংক্রান্ত কিংবদন্তী ও ধর্মপূজা-প্রচার বিষয়ে কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। মুসলমান শাসকবর্গের সঙ্গে ধর্মপূজকদের বিরোধকে অবলম্বন করে রচিত এই গ্রন্থে কিছুটা ঐতিহাসিক তথ্য প্রচ্ছন্ন থাকলেও থাকতে পারে বলে ড. বন্দ্যোপাধ্যায় মতপ্রকাশ করেছেন।

রামাই পণ্ডিতের প্রকৃত পরিচয় কিংবদন্তী দ্বারা এমনভাবে আবৃত যে, তার থেকে প্রকৃত তথ্য খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বোঝা যায় যে, এই নামে একজন ধর্ম-উপাসক ও ডোমযাজী পণ্ডিত বর্তমান ছিলেন। কারণ, ধর্মমঙ্গলের কবিরা রামাই পণ্ডিতকে ধর্মপূজার প্রবর্তক বলে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন।

ধর্মের গাজনে ব্যবহৃত ছড়া, সেগুলির আনুষঙ্গিক নানা বিষয়, ধর্ম কর্তৃক বিশ্বসৃষ্টির বিবরণ, ধর্মপূজার বিধি, ভোগরন্ধন ইত্যাদি সম্পর্কে নানা খুঁটিনাটি তথ্য এবং প্রসঙ্গক্রমে ধর্মমঙ্গলের সুপ্রসিদ্ধ হরিশ্চন্দ্র ও লাউসেনের কাহিনীও এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। একটি স্থানে শিবের কৃষিকার্যের যে-বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে অনুমান করা হয় যে একদা ধর্মঠাকুর ও শিব লোকবিশ্বাসে এক হয়ে গিয়েছিলেন।

ধর্মের গাজন উপলক্ষ্যে শিবের চাষ-বিষয়ক যে অনুষ্ঠান পালিত হয়, তার একটি ছড়া শূন্যপুরাণ-এ পাওয়া যায়। এই ছড়াটি সম্ভবত প্রাচীন শিবগীতিকার (শিবের গীত) একটি অংশ।:

যখন আছেন গোসাঞি হয়া দিগম্বর।
ঘরে ঘরে ভিখা মাগিয়া বলেন ঈশ্বর।।
রজনী পরভাতে ভিঙ্ক্‌খার লাগি যাই।
কুথাএ পাই কুথাএ না পাই।।
হর্তুকী বএড়া তাহে করি দিন পাত।
কত হরস গোসাঞি ভিঙ্ক্‌খাএ ভাত।।
আহ্মার বচনে গোসাঞি পুক্ষি চষ চাষ।
কখন অন্ন হএ গোসাঞি কখন উপবাস।।
পুখরি কাদাএ লইস্ব ভূমখানি।
আরসা হইলে ছিচএ দিব পানি।।
আর সব কিষাণ কাঁদিব মাথায় দিয়া হাত।
পরম ইচ্ছায় ধান্য আনিব দাইআ।।
ঘরে অন্ন থাকিলেক পরভু সুখে অন্ন খাব।
অন্ন বিহনে পরভু কত দুঃখ পাব।।
কাপাস চষহ পরভু পরিব কাপড়।
কত না পরিব গোঁসাই কেওদা বাঘের ছড়।।
তিলষ সরিষা চাষ কর গোসাঞি বলিতব পাত্র।
কত না মাখিব গোসাঞি বিভূতিগুলা গাত্র।।
মুগ বাটলা আর চষিহ ইখু চাষ।
তব্র হবেক গোসাঞি পঞ্চামর্ত্তর আশ।।
সকল চাষ চস পরভু আর রুই কলা।
সকল দব্ব পাই যেন ধর্মপূজার বেলা।।
এতেক সুবিধা হর মনেতে ভাবিল।
মনপবস দুই হেলএ সিজন করিল।।
সুনার যে লাঙল কৈল রূপার যে ফাল।
আগে পিছু লাহলেতে এ তিন গোজাল।।
আগে জোতি পাশজোতি আভদর বড় চিন্তা।
দুদিকে দুসলিদিআ কুআলে কৈল বিন্ধা।।
সকলসাজ হইল পরভুর আর সাজ চাই।
গটাদশ কুআ দিয়া সাজাইল মই।।
তাকর দুভিতে চাই দুগাছি সলি দড়ি।
চাষ চষিতে চাই সুনার পাচন বাড়ি।।
সাঠ মাসে গোঁসাই পিথিবি মইলিল।
যতগুলি ভূম পরভূ সকলি চষিল।।

এটির সঙ্গে মৈথিল কবি বিদ্যাপতি রচিত "বেরি বেরি অরে শিব/ মোঞে তোকেঁ বোলঞে/ কিরিষি করিয় মন লাই" পদটির তুলনা করা যেতে পারে। অনুমান করা যেতে পারে, শিব-সম্পর্কিত এই বিশ্বাস মিথিলা থেকে উত্তরবঙ্গ হয়ে বাংলার সর্বত্র প্রচার লাভ করেছিল কিংবা প্রাচীন বাংলা থেকে প্রসার লাভ করেছিল মিথিলা অঞ্চলে।

শূন্যপুরাণ-এর আর-একটি বৈশিষ্ট্য হল নিরঞ্জনের রুষ্মা (অর্থাৎ উষ্মা) শীর্ষক কয়েকটি ছড়া। এগুলির কয়েকটি পরবর্তী ধর্মমঙ্গলেও পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে জর্জরিত উড়িষ্যার ধর্মোপাসকেরা ধর্মঠাকুরের কাছে পরিত্রাণের প্রার্থনা জানালে ধর্মঠাকুর স্বর্গের দেবদেবীদের নিয়ে ব্রাহ্মণদের শাস্তি দিতে মর্ত্যে আসেন মুসলমানের ছদ্মবেশে। প্রাক্‌-মুসলমান যুগে বৌদ্ধদের উপর হিন্দুদের অত্যাচার এবং মুসলমান-বিজয়ের অব্যবহিত পরে হিন্দুদের উপর মুসলমানদের অত্যাচারের বিবরণের ইতিহাস এই ছড়াগুলিতে সুস্পষ্ট।

শূন্যপুরাণ-এর দু-একটি জায়গায় গদ্যের সুর আছে। এগুলি আসলে ভাঙা পয়ার। অশিক্ষিত লিপিকরদের হাতে পড়ে পয়ারের শুদ্ধ পঙ্‌ক্তিগুলির ওই হাল হয়েছে। এই গ্রন্থের লিখিত অংশের ভাষা সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের হওয়াই সম্ভব। ছড়াগুলি তার পূর্বে মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল, পরে এক বা একাধিক ধর্মপূজক সেগুলিকে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। ধর্মঠাকুর ও ধর্ম-উপাসক সম্প্রদায় সম্পর্কে এই গ্রন্থে অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া গেলেও এই গ্রন্থের মূল্য একান্তভাবেই ঐতিহাসিক; এর সাহিত্যিক মূল্য কিছুই নেই।

খেলারাম চক্রবর্তী

[সম্পাদনা]

খেলারাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গলের একজন প্রাচীন কবি। পরবর্তীকালের কোনও কবিই তাঁর কথা উল্লেখ করেননি। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে মাত্র একজন তাঁর পুথি দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি খেলারামের কাব্য থেকে যে-কটি পদ উদ্ধৃত করেছেন, সেগুলিই খেলারাম-সম্পর্কিত আলোচনার ভিত্তি। তাঁর কাব্যের কালজ্ঞাপক শ্লোকটি নিম্নরূপ:

ভুবন শকে বায়ু মাস শরের বাহন।
খেলারাম করিলেন গ্রন্থ আরম্ভন।।
হে ধর্ম এ দাসের পূরাও মনস্কাম।
গৌড়কাব্য প্রকাশিতে বাঞ্ছে খেলারাম।।

ভুবনের সংখ্যা চতুর্দশ ও বায়ু ঊনপঞ্চাশ প্রকার। অর্থাৎ, ১৪৪৯ শকাব্দে (১৫৭২ খ্রিস্টাব্দ) খেলারাম তাঁর কাব্যরচনা শুরু করেন। কাব্যের একস্থানে তিনি লিখেছেন:

তোমার কৃপায় যদি গ্রন্থ সাঙ্গ হয়।
অহী মঙ্গলময় দিব আত্মপরিচয়।।

কিন্তু তাঁর কাব্যের এই শেষাংশ অর্থাৎ "অহীমঙ্গল" (অষ্টমঙ্গলা) পাওয়া যায়নি। গ্রন্থটি সমাপ্ত হয়েছিল কিনা তাও জানা যায় না।

রূপরাম চক্রবর্তী

[সম্পাদনা]

চৈতন্য যুগের শিবায়ন

[সম্পাদনা]

রামকৃষ্ণ রায়

[সম্পাদনা]

চৈতন্য যুগের কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর

[সম্পাদনা]

কালিকামঙ্গল কাব্য বিদ্যাসুন্দর নামেও পরিচিত। এতে কাঞ্চীর রাজকুমার তথা কালী-উপাসক সুন্দরের সঙ্গে বর্ধমান রাজকন্যা বিদ্যার প্রেম ও বিবাহের বর্ণনা আছে। তবে অন্যান্য মঙ্গলকাব্যের ন্যায় এই কাব্যে দেবী কালীর প্রাধান্য নেই। বিদ্যা-সুন্দরের প্রেমই এর মূল বিষয়।

বিদ্যা-সুন্দরের এই প্রেম নিয়ে সংস্কৃতেও অনেক কাব্য, উদ্ভট কবিতা ও শৃঙ্গাররসাত্মক শ্লোক রচিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে কাশ্মীরের কবি বিল্‌হনের চৌরপঞ্চাশৎ নামে পঞ্চাশ শ্লোকে গ্রথিত সুন্দরের বিদ্যার রূপবর্ণনা ও তীব্র প্রেমতৃষ্ণার কাব্যটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মধ্যযুগের মধ্যপর্বে বাংলা সাহিত্যে এই ধারায় উল্লেখযোগ্য দুই কবি হলেন দ্বিজ শ্রীধর ও সা বিরিদ খাঁ।

দ্বিজ শ্রীধর

[সম্পাদনা]

গবেষকদের মতে, কবি দ্বিজ শ্রীধরের ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধের ব্যক্তি। মুন্সী আবদুল করীম কাব্যবিশারদ তাঁর কালিকামঙ্গলের কয়েকটি মাত্র পৃষ্ঠা আবিষ্কার করেন। প্রাপ্ত অংশটুকুতে কালিকার কোনও উল্লেখ নেই। তবে কাব্যমধ্যে কবি হুসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহ্‌ ও তাঁর পুত্র যুবরাজ ফিরুজ শাহের নাম করেছেন। ফিরুজ শাহের নির্দেশেই কাব্যটি রচনা করেন দ্বিজ শ্রীধর। কাব্যরচনা ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই রচিত হয়েছিল বলে মনে হয়। কাব্যটি সম্ভবত পুরোপুরিই রোম্যান্টিক কাব্য। কারণ, পাঠান শাসকের প্রীতির উদ্দেশ্যে রচিত এই কাব্যে হিন্দু দেবীর মাহাত্ম্যকীর্তন না থাকাই স্বাভাবিক।

সা বিরিদ খাঁ

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগের আখ্যানকবি সা বিরিদ খাঁ বা শাহ বারিদ খানের তিনটি আখ্যানকাব্য পাওয়া যায়: বিদ্যাসুন্দুর, রসুল বিজয়হানিফা-কয়রাপরী। কাব্যের প্রাপ্ত পুথিগুলি খণ্ডিত হওয়ায় কবির ব্যক্তিগত পরিচয় বিশেষ জানা যায় না। শুধু ভণিতার সামান্য থেকে বলা যায়, কবি চট্টগ্রামের নানুপুরের অধিবাসী ছিলেন।

বিদ্যাসুন্দর কাহিনীটি সংক্ষেপে এইরকম:

রত্নাবতীর রাজা গুণসার সুখে প্রজাপালন, পূজানুষ্ঠান ও দানধ্যান করেন। রানি কলাবতী ধর্মপ্রাণা ও পতিব্রতা নারী। তাঁর একমাত্র দুঃখ সন্তানহীনতা। "বিষবৎ ভবসুখ ভাবে নরপতি। বিষাদে বিকল পুত্রকন্যা হেতু নিতি।।" কলাবতী রাজাকে যাগযজ্ঞ ও ধর্মকর্ম করতে বললেন, রাজা তাই করলেন। দেবী পার্বতী কলাবতীকে পুত্রসন্তানের বর দিলেন। কলাবতী গর্ভবতী হলেন এবং যথাসময়ে পুত্রসন্তান লাভ করলেন। তার নাম রাখা হল সুন্দর। ছেলেবেলা থেকে রাজা তাকে লেখাপড়া শেখালেন। দেবীর আশীর্বাদে সুন্দর বারো বছরের মধ্যেই সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে উঠল। নানা দেশের পণ্ডিতের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে সুন্দরই জয়লাভ করল। বিদ্যাজয়ী সুন্দরের নাম হল বিদ্যাপতি। এরপর সে "মহেশ অম্বিকা সেবা করএ সতত। মহাকাব্যে বিরচিল শ্লোক পঞ্চাশত।।"

কাঞ্চীপুরের রাজা বীরসিংহ ও রানি শীলার একমাত্র কন্যা বিদ্যাবতীর পাঁচ বছর বয়সে হাতেখড়ি হয়েছিল। সেও অল্পকালেই বিদূষী হয়ে উঠল। রাজা কন্যার স্বয়ংবর সভার ব্যবস্থা করলেন। বিদ্যা বলল: "প্রতিজ্ঞা মোহর হৃদে/ যে জিনত্র শাস্ত্রবাদে/ সেই যোগ্য পতিক ভজিমু।" রাজা কন্যার প্রতিজ্ঞা শুনে দিকে দিকে ভাট পাঠালেন। মাধব ভাট রত্নাবতীতে এলে সুন্দর বিদ্যার রূপ ও পাণ্ডিত্যের কথা শুনল। তাকে পাওয়ার জন্য সুন্দর "কক্ষে দুই পুথি/ কান্ধে লই ছাতি/ রিয়া বৈদেহি বেশ।।/ বিদ্যা অন্বেষণ/ করিল গ্মন/ নগরে কৈলা পরবেশ।।" সেখানে এক মালিনীর গৃহে সে আশ্রয় নিল। মালিনী বিদ্যাকে মালা জোগায়। সে প্রথমে রাজভয়ে সুন্দুরকে আশ্রয় দিতে নারাজ হয়, কিন্তু সুন্দর তাকে অর্থে বশীভূত করে। মালিনীর কাছে সুন্দর বিদ্যার তত্ত্বতালাশ করে। মালিনী বলে, বিদ্যা নানা শাস্ত্র, কাব্য ও অলংকার গ্রন্থ পাঠ করে বিদ্যার্জন করেছে। এই অংশের পরেই পুথি খণ্ডিত, তাই বাকি অংশ জানা যায় না।

লক্ষণীয়, এখানে বিদ্যা কাঞ্চীপুরের রাজকন্যা। কাশ্মীরী সংস্করণে মহিলাপত্তনের বীরসিংহ-তনয়া বিদ্যা বররুচির কাব্যে উজ্জয়িনী, বারিদ খাঁর কাব্যে কাঞ্চীপুর ইত্যাদি পথ পেরিয়ে অবশেষে ভারতচন্দ্রের কাব্যে বর্ধমানের রাজকন্যা হয়েছিলেন।

কবি স্বয়ং বিদ্যাসুন্দর কাব্যকে বলেছেন নাটগীত। এই শ্রেণীর রচনায় অভিনয়-ধর্ম বিদ্যমান। সংলাপ ও ক্রিয়ার দ্বারা তা প্রকটিত হয়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের অনেক পদে এই গুণ আছে। সা বিরিদ খাঁর কাব্যে মঞ্চ-নির্দেশ পর্যন্ত আছে। কবি প্রতিটি ঘটনার সূচনায় সংস্কৃত দৃশ্যসংকেত ও রূপসজ্জার বর্ণনা দিয়েছেন। কাব্যে উক্তি-প্রত্যুক্তিও আছে। সুন্দর-মাধব ভাট ও সুন্দর-মালিনীর সংলাপ বেশ উজ্জ্বল। বিশেষত সুন্দর-মালিনীর নাতিদীর্ঘ সংহত সংলাপ নাটকোচিত হয়েছে। অবশ্য এতে নাট্যক্রিয়ার অভাব আছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর সংলাপে নাটকীয়তা পূর্ণমাত্রায় বর্তমান। সংলাপের সংগীত-ধর্ম সম্পর্কে সা বিরিদ খাঁর জ্ঞান ছিল। কয়েকটি স্থলে তিনি রাগ ও ছন্দের উল্লেখ করেছেন। মালিনী-সুন্দর আলাপের অংশটি "দেশাগ" রাগে রচিত। "সুন্দরের কাঞ্চিপুরে যাত্রা" অংশটি পঞ্চালি ছন্দে লেখা। নাট্যগত ও সাংগীতিক সংলাপ থাকা সত্ত্বেও বিবৃতিধর্মী আখ্যানকাব্যের স্বাদ নষ্ট হয়নি। কবি নাট্যকাব্য রচনা করেছেন, নাটক রচনা করেননি। কাব্যের শুরুতে আখ্যানের মতো সাধারণ বর্ণনা আছে। সংলাপের মধ্যে মধ্যে কবি নিজের কথা দিয়ে ঘটনা প্রসারিত করেছেন। মাধব ভাট ও সুন্দরের বাক্যালাপ শেষে কবি লেখেন: "বিদ্বান কুমার বোলে তুষ্ট ভেল ভাট। বৃষ্টি যেহেন পবিত্র হত্র বাট।। সুন্দরের বাক্য লেশ অমৃত সমাজ। শুনিয়া মাধব ভাট শান্ত হৈল প্রাণ।।" কবির এই বর্ণনা-পদ্ধতি বিবৃতিধর্মী, যেখানে পুরোদস্তুর নাটকে সংলাপ দ্বারাই কাহিনীর বিস্তার ও বিবর্তন ঘটে।

সা বিরিদ খাঁ ও দ্বিজ শ্রীধর একই উৎস থেকে আক্ষরিক অনুবাদ করেন, উভয়ের রচনা পাশাপাশি পাঠ করলে তা বোঝা যায়। সংস্কৃত ভাষায় কোনও এক কাব্য তাঁদের রচনার উৎস, চরিত্র ও ঘটনাজ্ঞাপক। সংস্কৃত উদ্ধৃতিগুলিতেও যথেষ্ট মিল আছে। সা বিরিদ খাঁর ভাষা সংস্কৃতানুগ, বিশুদ্ধ ও পরিমার্জিত। স্থানবিশেষে তাতে বিশেষ ভাষার আবেগও দৃশ্যমান। কিন্তু গতি ও ব্যঞ্জনা তেমন নেই। খণ্ডিত পুথি দিয়ে প্রতিভার পূর্ণ পরিচয় নির্ণয় করা যায় না। তবে প্রান্ত অংশের নিদর্শন বিচার করে বলা যায়, সা বিরিদ খাঁর কবিত্বে কৃত্রিমতা ছিল না।

চৈতন্য যুগের বৈষ্ণব পদাবলী

[সম্পাদনা]

ষোড়শ শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অসংখ্য বৈষ্ণব ভক্ত-কবি রাধাকৃষ্ণ ও গৌরাঙ্গলীলা-বিষয়ক পদ রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন চৈতন্য-পার্ষদ ও চৈতন্য-সমসাময়িক পদকর্তাগণ, তেমনই রয়েছেন চৈতন্যদেবের অব্যবহিত পরবর্তীকালে আবির্ভূত পদকর্তাবৃন্দ। এই সময়পর্বের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য পদকর্তা ও তাঁদের রচিত পদাবলী-সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা যেতে পারে।

নরহরি সরকার

[সম্পাদনা]

নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের প্রিয় পার্ষদদের অন্যতম নরহরি সরকারের জন্ম চৈতন্যদেবের জন্মের চার-পাঁচ বছর আগেই হয়েছিল। তাঁর পিতা নরনারায়ণ, মাতা গোয়ী দেবী এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মুকুন্দ। নবদ্বীপের টোলে পড়ার সময় চৈতন্যদেবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। চৈতন্যদেবের প্রিয় সহচর গদাধরও ছিলেন তাঁর বন্ধু। নরহরি যে শ্রীখণ্ড সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন সে-কথা কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মধ্যে সুপরিচিত এই সম্প্রদায় গোপালমন্ত্রের পরিবর্তে গোবিন্দমন্ত্রে শিষ্যদের দীক্ষা দিত। চৈতন্যদেবের নরভাববৈশিষ্ট্যও এঁদের সৃষ্টি। নরহরি সরকার ছিলেন চৈতন্য-কেন্দ্রিক গৌরনাগরী সাধনার এক বিশেষ ধারার প্রবর্তক এবং চৈতন্যমঙ্গল-রচয়িতা লোচনদাসের গুরু। রাধাকৃষ্ণের লীলাবিষয়ক অল্প কিছু পদ রচনা করলেও নরহরি গৌরাঙ্গলীলা-বিষয়ক পদেই অধিকতর কৃতিত্ব দিয়েছেন। তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ হল:

গৌরাঙ্গ ঠেকিলা পাকে
ভাবের আবেশে বাধা রাধা বলি ডাকে
সুরধনী হেরি গোরা যমুনা ভণে
ফুলবন দেখি বৃন্দাবন পড়ে মনে।

নিত্যানন্দের বর্ণনা করেও নরহরি কয়েকটি পদ রচনা করেন। তাঁর এই চৈতন্য ও নিত্যানন্দ লীলাবিষয়ক পদগুলির ঐতিহাসিক মূল্য অসীম।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২৫ সংখ্যক পুথিতে নরহরির একটি পদের সন্ধান পাওয়া যায়। পদটি খণ্ডিতা নায়িকা রাধার উক্তি। “শ্যামধন যার হিয়ায় জাগে” তাদের সাবধান করে রাধা এই পদে বলছেন—কেউ যদি প্রেম করতে চায়, তাহলে সুজন-কুজন বুঝে যেন প্রেম করে। কারণ, কৃষ্ণের প্রেম হল বিষে-ভরা সোনার কলস, অথচ মুখটি তার দুধে পরিপূর্ণ। বিচার না করে যদি কেউ তা পান করে—তাহলে পরিণামে তাকে দুঃখই পেতে হবে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ৯৬৮ সংখ্যক পুথিতে আর একটি পদ পাওয়া যায়। আক্ষেপানুরাগের এই পদটিতে রাধার আক্ষেপবাণী উচ্চারিত হয়েছে বিধাতার প্রতি—বিধাতার এমনই বিধান যে পৃথিবীতে কৃষ্ণকে নিয়ে বসার মতো একটু নিভৃত স্থান, একটি নিভৃত রজনীও রাধার ভাগ্যে জোটে না। নরহরির রাধা তাই বিধাতাকে বেরসিক বলে তিরস্কার করে বলেছেন:

বিধি যদি রসের রসিত হত্য।
এসব কখন করিতে দিত।।

পদকল্পতরু সংকলনের ৮৩৩ সংখ্যক বাসকসজ্জিকার পদটি পদটি নরহরি সরকারের। এই পদে কৃষ্ণের জন্য প্রতীক্ষমানা বাসকসজ্জিকা রাধা নারীর যৌবনকে ধিক্কার জানিয়েছেন। কারণ, তিনি প্রেম করেছেন শঠ ব্যক্তির সঙ্গে। রাধা এই বলে দুঃখ করছেন যে, যার জন্য তাঁর প্রাণ সর্বদাই পীড়িত হয়, সে কিন্তু তাঁর দিকে ফিরেও তাকায় না। নিজেই নিজের প্রেম বাড়িয়ে তিনি পিতৃকুল ও শ্বশুরকুলে কলঙ্ক লেপন করেছেন। নরহরির আর একটি পদ মাথুর পর্যায়ের। বিরহিণী রাধার করুণ অবস্থার কথা শুনে রসিকশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ গদগদভাবে তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করছেন। তারপর তিনি নিজেই গৃহত্যাগ করে চলেছেন রাধার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। দ্রুতবেগে যাওয়ার জন্য জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে তাঁর। চরণের মণিনূপুরের কথাও তিনি ভুলে গিয়েছেন। তাঁর অলংকার, মাথার চূড়াও খুলে খুলে পড়ছে। গভীর রাত্রে রাধার গৃহে চন্দনের গন্ধে দশদিশ আমোদিত হল এবং

লালস দরশ
পরশে দুহুঁ আকুল
চিরদিনে মিলন কুঞ্জে।।

কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রসাধন ও গৃহকর্ম অসমাপ্ত রেখে ভাগবতের গোপিনীরা পথে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু চৈতন্য-সমসাময়িক এই কবির পদে কৃষ্ণই ব্যাকুল হয়ে রাধার জন্য পথে নামলেন।

পদকল্পতরু গ্রন্থে নরহরির ভণিতায় ৩৬টি পদ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ছটি পদ রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক—পাঁচটি ঝুলনের এবং একটি খণ্ডিতার পদ। সতীশচন্দ্র রায় এগুলিকে নরহরি চক্রবর্তীর রচনা বলে মনে করেন। গৌরপদতরঙ্গিনী সংকলনে নরহরি ভণিতায় ৩৮২টি পদ পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে কোনটি নরহরি সরকারের রচনা তা নিশ্চিতরূপে নিরূপণ করা যায়নি। কারণ, পরবর্তীকালের কবি তথা ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থের রচয়িতা নরহরি চক্রবর্তীর পদের সঙ্গে নরহরি সরকারের পদ মিশে গিয়েছে। পদামৃতসমুদ্র সংকলনের ২৭ পৃষ্ঠায় নরহরির একটি আক্ষেপানুরাগের পদও সংকলিত হয়েছে। এই পদে কৃষ্ণপ্রেমে ব্যাকুলা রাধা সখীকে বলছেন, “নিরবধি প্রাণ মোর কাহ্নু লাগি ঝুরে”। রাধার মতে, প্রেমের এই রস যে জানে না সে ভালোই করেছে। কারণ, রাধার হৃদয়ে কানুর প্রেম যেন শেলের মতো বিঁধে আছে। শ্যাম-অনুরাগে রাধার চিত্ত আর কোনও মতেই ধৈর্য মানছে না। অবশ্য এই পদটির রচয়িতা নরহরি সরকার কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ, পদামৃতসমুদ্র এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ৯৮২ সংখ্যক পুথিতে পদটি নরহরির ভণিতায় পাওয়া গেলেও কীর্তনানন্দ গ্রন্থে ভণিতা চণ্ডীদাসের। ড. হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় পদটিকে কোথাও দেখেছেন বড়ু চণ্ডীদাসের ভণিতায়, কোথাও চণ্ডীদাসের ভণিতায়, কোথাও বা জ্ঞানদাস ঠাকুরের ভণিতায়। সম্ভবত, নরহরি কৃষ্ণকথা নিয়ে অতি অল্পই পদ লিখেছেন। শ্রীগৌরাঙ্গকেই তিনি শ্রীকৃষ্ণ মনে করে গৌরনাগরী ভাবের উপাসনা-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। অতএব নিছক কৃষ্ণকথা নিয়ে তাঁর পদরচনার তেমন প্রয়োজন নাও হতে পারে।

মুরারি গুপ্ত

[সম্পাদনা]

মুরারি গুপ্ত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃত রচনা করেন। সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই গ্রন্থটি প্রথম চৈতন্যজীবনী। সেই সঙ্গে তিনি চৈতন্যলীলা-বিষয়ক অন্তত দুটি বাংলা পদও রচনা করেন। গৌরপদতরঙ্গিনী সংকলনে মুরারি গুপ্ত রচিত একটি বিখ্যাত গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদে পাওয়া যায়: "সখী হে, কেন গোরা নিঠুরাই মোহে/ জগতে করিল দয়া দিয়া সেই পছায়া/ বঞ্চল এ অভাগিরে কাহে।।" প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মুরারি গুপ্ত চৈতন্যদেবের থেকে বয়সে সামান্য বড়ো এবং পাঠশালায় তাঁর সহপাঠী ছিলেন। শ্রীহট্টের বৈদ্যবংশে জাত মুরারি ধর্মীয় সূত্রে ছিলেন রামমন্ত্রের উপাসক। তবে তাঁর রচিত অল্প কয়েকটি রাধাকৃষ্ণলীলা-বিষয়ক পদও পাওয়া যায়। বিশেষত তাঁর রচিত আক্ষেপানুরাগের একটি পদ অবিস্মরণীয়। কৃষ্ণপ্রেম-উন্মাদিনী রাধা ঘরের বাইরে পা বাড়িয়েছেন কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। সখী এসেছেন তাঁকে ফেরাতে। কিন্তু রাধা তাঁকে বললেন, তিনি আর ঘরে ফিরবেন না। তাঁকে ফিরে যাওয়ার যুক্ত দেওয়া বৃথা। প্রেম করে তিনি যে সব বিসর্জন দিয়েছেন, এমনকি নিজের অহংবোধ পর্যন্ত পরিত্যাগ করেছেন। কৃষ্ণের মোহন রূপ তাঁর নয়নের পুতুল, তাঁর হৃদয়ের মাঝখানে সযত্নে রাখা প্রাণ। আর রাধা তাঁর প্রেমের আগুনে জাতি, কুল, শীল এবং অভিমান সব পুড়িয়ে ফেলেছেন। যারা মূঢ়, জীবনে যারা প্রেমের আস্বাদ পায়নি, তারা নানা কথা বলে, কিন্তু রাধা তাদের কথা কানেও তোলেন না। "স্রোত বিথার" প্রেমের নদীতে রাধা তাঁর শরীর ভাসিয়েছেন, সুতরাং "কি করিবে কুলের কুকুরে?" কবি মুরারি গুপ্ত পদের শেষে এই অনন্যসাধারণ প্রেম সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেছেন: "পিরিত এমতি হৈলে/ তাঁর গুণ তিনলোকে গায়।" মুরারি গুপ্তের রাধা চণ্ডীদাসের রাধার মতোই "জাতিকুল শীল অভিমান" বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু চণ্ডীদাসের রাধা যেখানে লোকগঞ্জনার দায় এড়ানোর জন্য মৃত্যুবরণ করতে চান, সেখানে মুরারি গুপ্তের রাধা কুলাচার ও লোকাচারকে দৃপ্তভাবে তুচ্ছ করেছেন। জীবনেই মৃত্যুকে আহ্বান করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছেন তিনি এবং তাঁর প্রেমের অনির্বাণ শিখাকে কালজয়ী করে তুলেছেন।

গোবিন্দ ঘোষ, মাধব ঘোষ ও বাসুদেব ঘোষ

[সম্পাদনা]

গোবিন্দ ঘোষ, মাধব ঘোষ ও বাসুদেব ঘোষ—এই তিন ভ্রাতাই চৈতন্যদেবের নবদ্বীপলীলার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনজনেই ছিলেন কীর্তনীয়া ও কবি। কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখেছেন, চৈতন্যদেব এঁদের কীর্তন শুনে নৃত্য করতেন।

গোবিন্দ ঘোষ

গোবিন্দ ঘোষের কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক পদ এখনও পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাঁর গৌরাঙ্গলীলা-বিষয়ক পদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চৈতন্যদেব প্রথমবার বিবাহের পর যখন পূর্ববঙ্গে যান, তাঁর অনুপস্থিতিতে ক্লিষ্ট গোবিন্দ ঘোষ লিখেছিলেন, "গোরা গেল পূর্ব্বদেশ/ নিজগান পাই ক্লেশ/ বিল পয়ে কত পরকার।/ কান্দে দেবী লক্ষ্মী প্রিয়া/ শুনিতে হিয়া/ দিবসে মানয়ে অন্ধকার/ পুন সেই গোরামুখ/ দেখিয়া ঘুচিবে দুখ/ এখন পরান যদি রহে।।" চৈতন্য-জননী শচী দেবী ও তাঁর সখী শ্রীবাস-পত্নী মালিনী দেবীর সঙ্গে কবির পরিচয় ছিল। গোবিন্দ ঘোষের মোট সাতটি গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ পাওয়া গিয়েছে। তার মধ্যে সন্ন্যাসের ঘটনা নিয়ে লেখা পদের সংখ্যা দুই। এই দুটি পদের একটি মর্মস্পর্শী অথচ গভীর আন্তরিকতায় যথার্থ কবিতা হয়ে উঠেছে: "হেদে রে নদীয়াবাসী কার মুখ চাও। বাহু পাসরিয়া গোরাচাঁদেরে ফিরাও।। তো সভারে কে আর করিবে নিজ কোরে। কে যাচিয়া দিবে প্রেম দেখিয়া কাতরে।।"

মাধব ঘোষ

মাধব ঘোষেরও সাতটি পদ পদকল্পতরু সংকলনে আছে। তার মধ্যে চারটি নিমাইসন্ন্যাস-বিষয়ক আর তিনটি শ্রীকৃষ্ণলীলা-বিষয়ক। শেষ তিনটির মধ্যে একটি হল শ্রীকৃষ্ণের স্নানযাত্রার পদ। গ্রীষ্মের দারুণ উত্তাপেও মাতা যশোমতীর আনন্দ বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ, এখন তিনি মনের আনন্দে শ্রীকৃষ্ণকে স্নান করাতে পারবেন। যশোমতীর জননী-হৃদয়ের স্নেহ এবং তারই সঙ্গে সম্পন্ন গোপগৃহের সন্তানের জন্য স্নানের আয়োজন যেন চোখের সামনেই ঘটে যাচ্ছে বলে মনে হয়। মাধব ঘোষের এই চিত্ররচনার কৃতিত্ব অন্য একটি পদেও প্রকাশিত হয়েছে। পদটি রাধাকৃষ্ণের মিলনান্তিক রসালসের। মাথুরের পদে দূতী শ্রীকৃষ্ণের কাছে গিয়ে দশম দশায় উপনীতা বিরহাতুরা রাধার করুণ বর্ণনা দিয়েছে। রাধা এত ক্ষীণ হয়ে গিয়েছেন যে ওঠার চেষ্টা করে উঠতে না পেরে তিনি কাতর হয়ে সখীর মুখের দিকে তাকান। আবার কখনও কৃষ্ণের মুখ মনে করে দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেন। কখনও মথুরাগামী পথিকের চরণ ধরে ক্রন্দন করতে থাকেন। এখন কোনও মতে রাধার শ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে। তাই দূতী কৃষ্ণকে সকাতরে অনুরোধ করেছেন: "একবেরি বিরহ/ বেয়াধি নিবারহ/ এদুহু পদ দরশাই।।" মাধব ঘোষের এই অল্পসংখ্যক পদেরও মূল বৈশিষ্ট্য নিরাভরণ আন্তরিকতা।

বাসুদেব ঘোষ

বাসুদেব ঘোষ ছিলেন নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের মুখ্য কীর্তনীয়া বা প্রধান গায়েন। গৌরাঙ্গবিষয়ক পদকর্তা হিসেবেও তিনি তিন ভ্রাতার মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। চৈতন্যলীলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর পদের ঐতিহাসিক মূল্য প্রচুর। কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত-এ লিখেছেন, "বাসুদেব গীতে করে প্রভুর বর্ণনে। কাষ্ঠ পাষাণ দ্রবে যাহার শ্রবণে।।"

বাসুদেব নিতান্ত দু-একটি কথায় যেভাবে শচীমাতা ও বিষ্ণুপ্রিয়ার অপরিসীম দুঃখের বর্ণনা দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁর কবিত্বশক্তির পরিচায়ক। নিমাই গৃহত্যাগ করেছেন শুনে শচীদেবী "আউদড় কেশে ধায়/ বসন না রহে গায়/ শুনিয়া বধূর মুখের কথা।" অন্যদিকে তরুণী বিষ্ণুপ্রিয়া একটি মাত্র কথায় তাঁর গভীর বেদনার কথা জানান, "শয়ন মন্দিরে ছিলা/ নিশিভাগে কোথা গেলা/ মোর মুণ্ডে বজর পাড়িয়া।।" বাসুদেব এরপর তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে লেখেন, "গৌরাঙ্গ গিয়েছে ছাড়ি/ বিষ্ণুপ্রিয়া আছে পড়ি/ শচী কান্দে বাহির দুয়ারে।" নদীয়ার নারীরা মন্তব্য করেছেন, "আমরা পরের নারী/ পরান ধরিতে নারি/ কেমনে বাঁচিবে বিষ্ণুপ্রিয়া।"

রাধাকৃষ্ণলীলা-বিষয়ক কয়েকটি পদও তিনি রচনা করেন। আক্ষেপানুরাগের একটি পদে তিনি রাধার প্রেমের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। রাধা বলেছেন, না জেনে শুনে কৃষ্ণের সঙ্গে প্রেম বাড়িয়ে এখন আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের মেঘবর্ষণের মতো তাঁর চোখ দিয়ে অনর্গল জল পড়ছে। পাকানো পাটের দড়ি আগুনে পুড়ে গেলে তার বাইরের আকার ঠিক থাকে, আর ছুঁলেই ঝরে যায়। আজ মনের আগুনের পুড়ে রাধারও সেই অবস্থাই হয়েছে। এঁদো পুকুরে মাছ নিঃশ্বাস নিতে জায়গা পায় না, তেমন করেই কৃষ্ণহীন বৃন্দাবনও রাধার জীবনধারণের পক্ষে দুঃসহ। কৃষ্ণপ্রেম যেন ডাকাতের প্রেম। সবলে সমস্ত লুণ্ঠন করে নিয়ে রাধাকে নিঃস্ব রিক্ত করে ফেলে গিয়েছে। পদটি অনুভূতির আন্তরিকতায় উজ্জ্বল। অনুভূতির অকৃত্রিম উত্তাপকে রূপ দিতে গিয়ে গ্রামজীবনের কয়েকটি বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কবি অলংকার ও চিত্রকল্প-নির্মিতিতে কাজে লাগিয়েছেন। পাকানো পাটের দড়ি, এঁদো পুকুরের মাছ ও ডাকাতিয়া পিরিতি কবির বাস্তব জীবন-অভিজ্ঞতার সঞ্জাত রূপনির্মিতি।

বর্ষাভিসারিকা রাধার অনুভবে কৃষ্ণমিলনের ঔৎসুক্য বর্ণিত হয়েছে এই কবির পদে। আকাশে নবীন মেঘ দেখে রাধার চিত্ত আনন্দে নেচে উঠেছে। মেঘকে সম্বোধন করে তিনি বলেছেন, মেঘ যেন বর্ষণ করে, তাহলে কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর মিলন হবে। বৃষ্টি যেন অল্প অল্প অথচ দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় ("বরিষ মন্দ ঝিমানি")। তাহলে রাধা সুখে রাত্রিযাপন করবেন। দাদুরী দুন্দুভি বাজাবে আর ময়ূরীর সুর শোনা যাবে। এই পদটি যেন বিদ্যাপতির বিখ্যাত বিরহের পদের পরিপূরক। সেখানে রাধা প্রকৃতির উতরোলমত্ত আনন্দের মধ্যে নিজের বিরহবেদনাকে স্থাপিত করেছেন, আর এখানে একই পরিবেশে রাধা ভাবী মিলনের আনন্দে অধীর। পদটির পরিবেশ বিদ্যাপতিরই। কিন্তু "মন্দ ঝিমানি" বৃষ্টির জন্য রাধার বাসনা তাঁকে যেন বাংলারই একটি মেয়ের গূঢ় আকাঙ্ক্ষার গভীরে ডুবিয়ে দিয়েছে।

অনুমান করা হয়, দানলীলা নিয়েও বাসুদেব ঘোষ পদ বা পালা রচনা করেছিলেন। কিন্তু অখণ্ড পালাটি পাওয়া যায় না। পদকল্পতরু সংকলনে একটি মাত্র ছিন্ন পদ (পদসংখ্যা ১৩৬৯) পাওয়া যায়। এই পদেও বাসুদেব কৃষ্ণকথাকার রূপে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। রাধা দাসীদের মাথায় চাপিয়ে মথুরার হাটে দই, দুধ বিক্রি করতে চলেছেন। রূপগোস্বামী ও রঘুনাথ গোস্বামীর দানকেলিকৌমুদীদানকেলিচিন্তামণি নামে দুই নাটকে এই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু বাসুদেবের কাব্যরচনার কালে বাংলায় বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীর পুস্তকাদি এসে পৌঁছায়নি।

বাসুদেবের একটি পদে রাধা কৃষ্ণের কথা বলতে বলতে এবং কৃষ্ণের প্রেমে আকুল হয়েই পথ চলেছেন। আর তখনই সামনে কৃষ্ণকে দেখে অবাক হয়ে বলেছেন, "কি দেখিয়ে বড়াই কদম্বের তলে। তড়িতে জড়িত যেন নব জলধরে।।" রাধার এই মুগ্ধতাজড়িত বিস্ময়টুকু পরম উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই পদগুলি ছাড়াও বাসুদেবের ভণিতায় একটি পুথিও পাওয়া যায়। পুথিটিতে পরপর কয়েকটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এই কাহিনীগুলি হল: (১) সুবল সংবাদ, (২) ননী চুরি, (৩) ভান পূজা, (৪) মান, (৫) নৌকালীলার (পুথিতে অবশ্য লেখা "দানখণ্ড), (৬) দূতী সংবাদ। নৌকালীলার কাহিনীটি গতানুগতিক।

শিবানন্দ সেন

[সম্পাদনা]

বৈদ্যকুলজাত শিবানন্দ সেন একজন সম্পন্ন গৃহস্থ ছিলেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে শিবানন্দের প্রসঙ্গে বলেছেন: "শিবানন্দ সেন প্রভুর ভৃত্য অন্তরঙ্গ। প্রভুস্থানে যাইতে সবে লয় যার সঙ্গ।। প্রতি বর্ষে প্রভুর গণ সঙ্গেতে লইয়া। নীলাচলে চলেন পথে পালন করিয়া।।" এই শিবানন্দ সেনেরই কনিষ্ঠপুত্র কবিকর্ণপূর। পদকল্পতরু গ্রন্থের সম্পাদক সতীশচন্দ্র রায়ের মতে, 'শিবাই' নামের কবি আসলে পৃথক কেউ নন, শিবানন্দেরই সংক্ষিপ্ত নাম শিবাই।

শিবানন্দ সেনের তিনটি পদ পদকল্পতরু সংকলনে পাওয়া যায়। দুটি পদ গৌরাঙ্গলীলা-বিষয়ক, একটি মাথুরের। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২০৪ সংখ্যক পুথিতে শ্রীরাধার বংশীশিক্ষার একটি চমৎকার পদ আছে। রাধা কৃষ্ণেরই অনুকরণে ত্রিভঙ্গ হয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন। অনভিজ্ঞা রাধার হাতে কখনও বাঁশি বাজে, কখনও বাজে না। কৃষ্ণই রাধার অধরে বাঁশিটি ধরে রয়েছেন। কৃষ্ণ কর্তৃক রাধাকে বংশী শিক্ষাদান রাধাকৃষ্ণ প্রেমেরই কৌতুকতরল একটি দিক। এছাড়াও শিবানন্দ রচিত রাধার আক্ষেপানুরাগ এবং বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের পুনর্মিলনের একটি পদ পাওয়া যায়। কৃষ্ণপ্রেমে সমর্পিতা রাধার লোকনিন্দা-জনিত বেদনা এবং বৃন্দাবনে মিলনে ব্যাকুল আনন্দ এই দুই পদে ফুটে উঠেছে। শিবানন্দ ও শিবাইকে যদি অভিন্ন ব্যক্তি ধরা হয়, তাহলে আরও কয়েকটি কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক পদ এই কবির রচনা বলা যায়। কৃষ্ণের জন্মলীলার তিনটি পদ এই কবির রচনা হিসেবে পাওয়া যায়। একটি পদে নন্দের জননীর উল্লেখ আছে: "নন্দের জননী নাচে বুঢ়িয়ারে"। অন্য একটি পদে পৌর্ণমাসীর প্রসঙ্গ রূপগোস্বামী রচিত সাহিত্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবজাত। তাঁর গোষ্ঠলীলা-বিষয়ক পদগুলি গতানুগতিক।

রামানন্দ বসু

[সম্পাদনা]

পদাবলীকার রামানন্দ বসুর পিতামহ (মতান্তরে পিতা) ছিলেন শ্রীকৃষ্ণবিজয় রচয়িতা মালাধর বসু। চৈতন্যদেব নবদ্বীপে থাকাকালীন তাঁর অন্যতম প্রিয় সহচর ছিলেন রামানন্দ। তাঁর পূর্বপুরুষ মালাধর বসু শ্রীকৃষ্ণবিজয়-এ "বসুদেবসুত কৃষ্ণ মোর প্রাণনাথ" ছত্রটি লিখেছিলেন। চৈতন্যদেব তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "এই বাক্যে বিকাইনু তার বংশের হাত।। তোমার কা কথা তোমার গ্রামের কুক্কুর। সেহো মোর প্রিয় অন্য জন বহু দূর।।" চৈতন্যদেবের নবদ্বীপলীলার প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন রামানন্দ বসু।

রামানন্দ বসুর ভণিতায় পদকল্পতরু সংকলনে সাতটি পদ আছে। এর মধ্যে একটি নবদ্বীপলীলায় চৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণ-বিরহের, একটি সন্ন্যাসী চৈতন্যদেবের ভাব বর্ণনা, একটি নিত্যানন্দের নৃত্যবর্ণনা এবং চারটি রাধাকৃষ্ণলীলার পূর্বরাগ, রূপানুরাগ, কুঞ্জভঙ্গ ও যুগলমিলন-বিষয়ক। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা ও সখ্যরসের পদরচনাতেও রামানন্দ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

রামানন্দ রচিত শ্রীরাধার পূর্বরাগের একটি পদে রাধা স্বপ্নে শ্রীকৃষ্ণের দেখা পেয়েছেন। শ্রাবণরাতের বর্ষণসজল মোহময় অন্ধকারের পটভূমিতে বিস্রস্তবসনা রাধার কাছে স্বপ্নে এসেছেন এক শ্যামল পুরুষ। রাধার অবচেতন মনে কৃষ্ণের সঙ্গ পাওয়ার বাসনা এইভাবেই স্বপ্নে মূর্ত হয়ে উঠেছে। পদটিতে রাধার মধুর স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গে হতাশাজড়িত বেদনা বড়ো চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। শ্যামল পুরুষ স্বপ্নে রাধাকে চুম্বন করে প্রেমধন ভিক্ষা করেন। জেগে উঠে রাধা কাঁপতে কাঁপতে দেখেন, তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই, সত্য নয়। তখন "আকুল পরাণ মোর/ দুনয়নে বহে লোর/ কহিলে কে যায় পরতীতি।।"

স্বপ্নের মধ্যেই রাধার প্রতি শ্রীকৃষ্ণের প্রেম-নিবেদনে বিশেষত্ব রয়েছে: "আপনা করয়ে পণ/ সবে মাগে প্রেমধন/ বলে কিনা যাচিয়া বিকাই।" রাধার স্বপ্নে দেখা এই শ্রীকৃষ্ণ রামানন্দের চোখে দেখা চৈতন্যদেব। তিনিও প্রেমধন মেগে বেড়ান সবার কাছে, আর তার বিনিময়ে নিজেকে সেধে সেধে বেচে দেন।

স্বপ্নে নায়কের দেখা পাওয়ার দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী সংস্কৃত সাহিত্যে কিছু পাওয়া যায়। কবি বসুকল্প রচিত একটি শ্লোকে নায়কের প্রতি নায়িকার অনুরাগ বর্ণনা করতে গিয়ে দূতী বলেছে, স্বপ্নে তাঁকে দেখতে পেলে হরিণ-নয়না নায়িকার শরীর ঘন রোমাঞ্চে কণ্টকিত হয়ে ওঠে আর প্রচুর ঘর্মজল যেন তাকে স্নান করিয়ে দেয়। (নায়ককে) জোরে টানতে গিয়ে স্খলিত বলয়ের ঝংকারে ঘুম ভেঙে যায়, তারপর অনবরত চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে।

রামানন্দ রচিত মান ও মাথুর পর্যায়ের পদগুলি গতানুগতিক। তবুও সব মিলিয়ে বলা যায়, চৈতন্য-সমসাময়িক ভক্ত-কবি হিসেবে রামানন্দ বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও তাঁর পদাবলীতে কৃষ্ণকথা গতানুগতিকতার মধ্যেও কিছুটা বৈচিত্র্য লাভ করেছে।

বংশীবদন

[সম্পাদনা]

বংশীবদন জন্মগ্রহণ করেছিলেন নবদ্বীপের নিকটবর্তী কুলিয়া পাহাড় গ্রামে। ১৪৯৬ খ্রিস্টাব্দের চৈত্র পূর্ণিমার দিন কবির জন্ম। নরহরি চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসগ্রহণের পর তিনি কিছুকাল শচী দেবী ও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর রক্ষকরূপে তাঁর বাড়িতে থাকতেন। গৌরাঙ্গলীলা ও কৃষ্ণলীলা উভয়-বিষয়ক পদই তিনি রচনা করেছিলেন। তাঁর গৌরাঙ্গলীলার বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, প্রত্যক্ষ দর্শনের অভিজ্ঞতাকে কবি তাঁর পদগুলিতে রূপ দিতে পেরেছেন। অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণলীলা-বিষয়ক পদগুলিতেও কখনও কখনও কবি মৌলিকত্ব দেখাতে পেরেছেন এবং কথা অংশেও বৈচিত্র্য এনেছেন। সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর এই তিন প্রকারের পদই তিনি সমান কৃতিত্বের সঙ্গে রচনা করেছেন।

চৈতন্য-পরিকর এই কবি গৌরাঙ্গলীলা প্রত্যক্ষ করে যে পদ রচনা করেন, তা তাঁর ভণিতা থেকেই বোঝা যায়। চৈতন্যজীবনের উপাদান হিসেবেও তাঁর গৌরাঙ্গ-বিষয়ক পদ খুবই মূল্যবান: "নির্দ্দয় কেশব/ ভারতী আসিয়া/ মাথায় পাড়িল বাজ।/ গৌরাঙ্গ সুন্দর/ না দেখি কেমনে/ বাহির নদীয়া মাঝ।/ কেবা হেন জন/ আনিবে এখন/ আমার গৌর রায়।/ শাশুড়ী বধুর/ রোদন শুনিতে/ বংশী গড়াগড়ি যায়।"

বংশীবদন কৃষ্ণের বাল্যলীলা, গোষ্ঠলীলা এবং গোষ্ঠলীলা-পূর্ব অনুরূপ পর্যায়ের পদ রচনা করেন। তাঁর নৌকাবিলাসের কয়েকটি পদও পাওয়া যায়। এছাড়া শ্রীরাধার আক্ষেপানুরাগ, অভিসার, মান ও মানভঞ্জনের জন্য কৃষ্ণকর্তৃক নারীবেশধারণ ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ক পদও বংশীবদনের নামে পাওয়া যায়।

বলরাম দাস

[সম্পাদনা]

বৈষ্ণব পদসাহিত্যে বহু-সংখ্যক পদকর্তা ‘বলরাম দাস’ ভণিতায় পদরচনা করলেও নিত্যানন্দ-ভক্ত ও তৎপত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য বলরাম দাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সম্ভবত ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী দোগাছিয়া গ্রামে বৈদিক ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করেন। কবি বালগোপালের উপাসক ছিলেন।

কবি বলরাম দাস বাংলা ও ব্রজবুলি দুই ভাষাতেই পদরচনা করেছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নিত্যানন্দ-বিষয়ে এবং অন্যের মুখ থেকে শুনে “কল্পনায় অনুমানে” চৈতন্যলীলা-কীর্তন প্রচার করেছেন তিনি। তাঁর নামে প্রচলিত অসংখ্য পদের মধ্যে প্রায় একশোটি পদকে জাহ্নবা-শিষ্য বলরাম দাসের পদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যেগুলির সহক কবিত্ব ও সরল আন্তরিকতার গুণে। এগুলি বৈষ্ণব পদশাখায় প্রথম শ্রেণীর বৈষ্ণব পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। ভক্ত-কবি বলরাম দাসের অন্তরের আত্যন্তিক ভক্তির আবেগেই এই আশ্চর্য সুন্দর পদগুলির উদ্ভব। এই ভাব-নবনীত পেলবতাই তাঁর কাব্যদেহের স্বাভাবিক গঠনের উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

জ্ঞানদাস

[সম্পাদনা]

ষোড়শ শতকের বৈষ্ণব পদাবলী-সাহিত্যে জ্ঞানদাস অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদকর্তা হিসেবে স্বীকৃত। আনুমানিক ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত কাঁদড়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ বংশে তাঁর জন্ম। তিনি নিত্যানন্দ-শাখাভুক্ত ও তৎপত্নী জাহ্নবাদেবীর শিষ্য। খেতুরীর মহোৎসবে তাঁর উপস্থিতি দৃষ্টে তাঁকে গোবিন্দদাস ও বলরামদাসের সমসাময়িক বলেই মনে হয়।

জ্ঞানদাস বাংলা ও ব্রজবুলি দুই ভাষাতেই পদরচনা করেছেন। প্রায় সকল সমালোচকই জ্ঞানদাসের কবিপ্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কেউ তাঁকে বলেছেন আত্মগত ভাবগীতোচ্ছ্বাসময় লিরিক কবি, কেউ বা বলেছেন রোম্যান্টিক কবি। আসলে জ্ঞানদাস নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ও ভক্ত-কবি হলেও তাঁর কাব্যে আত্যন্তিক আবেগের বেদনাময় উচ্ছ্বাস অনায়াসে ধর্মীয় গণ্ডীকে ভেদ করে মানবহৃদয়ের অন্তর্লীন সুরটিকে স্পর্শ করতে পেরেছে। তাঁর পদগুলি একান্ত সহজ, অনতিমার্জিত ও রাখালিয়া সুরে ধ্বনিত হয় পাঠকের হৃদয়ে। তিনি শব্দের জাল ফেলে ফেলে তাঁর কবি-হৃদয়ের উপাস্যকে ধরার চেষ্টা করেছেন সেখানে। হৃদয়ের আকুলতা, অন্তরমথিত আবেগ ও ভাব-তন্ময়তা তাঁর ভাষা-ব্যবহারের বাঁধ ভেঙে দিয়ে বাংলা ও ব্রজবুলিকে যেন একাকার করে দিয়েছে এই পদগুলিতে।

পূর্বরাগ ও অনুরা—বিশেষত রূপানুরাগ ও আক্ষেপানুরাগের পদে জ্ঞানদা বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তাঁর ভাবসম্মিলনের পদও স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও আন্তরিক মাধুর্যে পরিপূর্ণ।

অনেকে জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। যথার্থ বিচারে, রূপনির্মাণ ও ভাবের বিশিষ্টতার দিক থেকে উভয়ের মধ্যে বেশ মিল আছে। তাই জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলে অত্যুক্তি করা হয় না।

অনন্ত দাস

[সম্পাদনা]

অদ্বৈত শাখার অন্তর্ভুক্ত কবি অনন্ত দাস গৌরচন্দ্রিকা, গৌরাঙ্গলীলা-বিষয়ক ও রাধাকৃষ্ণলীলা-বিষয়ক কয়েকটি পদ রচনা করেন। তাঁর রচিত গোষ্ঠলীলার দুটি পদ পাওয়া গিয়েছে। একটিতে গোষ্ঠবেশে সজ্জিত কৃষ্ণের জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে। অন্যটিতে কৃষ্ণ ও তাঁর সখাগণের নানাবিধ ক্রীড়ার যে বর্ণনা রয়েছে তা ভাগবতের বর্ণনার অনুরূপ।

শ্রীরাধার পূর্বরাগ ও শ্রীকৃষ্ণের রূপবর্ণনায় কবির দক্ষতা অনস্বীকার্য। শ্রীরাধার অপরিচিত কৃষ্ণকে প্রথম দিন দেখেই বলেন: "কি হেরুলুঁ কদম্বতলাতে।/ বিনি পরিচয়ে মোর/ পরাণ কেমন করে/ জিতে কি পারিয়ে পাসরিতে।।" পূর্বরাগ-বর্ণনায় কবিকল্পনা বৈচিত্র্য লাভ করেছে। যখন রাধা বলেছেন, "হাসির হিল্লোলে মোর পরাণপুতলী দোলে", তখন কৃষ্ণের মধুর হাসি যেন তরল হয়ে রাধার অস্তিত্বকে চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হয়ে যায়। আর সেই হাসির তরঙ্গদোলায় নব-অনুরাগিণী রাধার হৃদয় দুলে ওঠে। কৃষ্ণের রূপবর্ণনায় প্রথানুগত্যের মধ্যেই কবি একসময়ে বলে ওঠেন: "নীরে নিরখি রূপ সুখের নাহি ওর। আপনার রূপে নাগর আপনি বিভোর।।" তখন নিজ রূপের মাধুর্যে বিভোর এই কৃষ্ণের সঙ্গে ললিতমাধব নাটকের কৃষ্ণের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। তবে অনন্ত দাসের রাধারূপ বর্ণনা অত জীবন্ত নয়। তার কারণ হয়ত রাধাভাবে ভাবিত চৈতন্যদেবের প্রতি কবির অধিকতর আকর্ষণ।

অনন্ত দাসের অভিসারের পদগুলির মধ্যে অনুরাগিণী নায়িকার আর্তি ও ব্যাকুলতাও ফুটে ওঠেনি। কবি রাধার রূপ ও চলনভঙ্গিমার বর্ণনার দিকেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছেন। অন্ধকার বর্ষামুখর রাতে, বহু কষ্ট স্বীকার করে রাধা যখন দেখেন কৃষ্ণ নেই, তখন বিপ্রলব্ধা নায়িকার বেদনা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এরপর কৃষ্ণ এসে রাধার কাছে মিনতি করলে খণ্ডিতা রাধা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে তিরস্কার করেন। এখানে রাধার মান সহেতু। প্রিয়জনের গাত্রে রতিচিহ্ন দেখে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। স্পষ্টই বোঝা যায় কবি রূপগোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণি অনুসরণ করেছেন। কবি মহারাস, রাসান্তে জলবিহার ও বসন্তরাস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁর বসন্তরাসে জয়দেবের প্রভাব পড়েনি। কবি একটি পদে মিলনান্তে রাধাকৃষ্ণের নৃত্যের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা ভাবোন্মত্ত সপার্ষদ চৈতন্যদেবের কীর্তনলীলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনন্ত দাসের শীতকালীন মাথুরে রাধার বিরহবেদনা শীতল বাতাসের সঙ্গে মিশে তাঁর হৃদয়কে কাঁপিয়ে তুলেছে। ভাবোল্লাসের পদে রাধার ভাবী মিলনের চিত্রকল্পনা বড়ো করুণ। তারপর সখী যখন আবার রাধাকে মিলনানন্দের কথা জিজ্ঞাসা করেন, তখন রাধার আনন্দ, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নির্ভরতা ও ঐকান্তিক ভালোবাসা প্রকাশিত হয় প্রকৃতিজগৎ থেকে সংগৃহীত একটি উপমায়: "দারুণ শিশিরে পদুমিনী জনু/ জীবনে মরিয়াছিল।/ প্রবল রবির কিরণ পাইয়া/ জনু বিকশিত ভেল।।"

যদুনন্দন দাস

[সম্পাদনা]

যদুনন্দন দাস হলেন সপ্তদশ শতকের অনুবাদাশ্রয়ী কবিদের মধ্যে প্রধান। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে মালিহাটির এক বৈদ্য পরিবারে তাঁর জন্ম। শ্রীনিবাস আচার্যের জ্যেষ্ঠা কন্যা হেমলতা দেবীর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করলেও তিনি শ্রীনিবাসকেই গুরু বলে মনে করতেন। যদুনন্দন রূপগোস্বামীর বিদগ্ধমাধব নাটকের, দানকেলীকৌমুদী নামক ভাণিকার, কৃষ্ণদাস কবিরাজের গোবিন্দলীলামৃত মহাকাব্যের এবং বিল্বমঙ্গলের কৃষ্ণকর্ণামৃত কাব্যের অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদে এগুলির নাম ছিল যথাক্রমে রসকদম্ব, দানলীলা চন্দ্রামৃত, গোবিন্দবিলাসকৃষ্ণকর্ণামৃত। এছাড়াও তিনি কৃষ্ণকর্ণামৃত নামে একটি বিখ্যাত জীবনীজাতীয় কাব্য রচনা করেছিলেন। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলনে তাঁর কয়েকটি পদ সংকলিত হয়।

যদুনন্দন দাস রচিত শ্রীরাধার পূর্বরাগের পদে ললিতা রাধার বিষণ্নমুখ, ম্লান শরীর ও অন্যমনস্কতা দেখে জিজ্ঞাসা করেন: "এমন হইলা কি লাগিয়া। ন কহিলে ফাটি যায় হিয়া।।" বৈষ্ণবসাহিত্যে সখীদের যে ভূমিকা, এখানে তারই প্রকাশ ঘতেছে। সখীরা নিছক সাহায্যকারিণী নন। রাধার প্রতি সখীর ভালোবাসাও সুগভীর ও আন্তরিক। ললিতার প্রশ্নের উত্তরে রাধা কদম্ববন থেকে আসা মধুর শব্দের কথা বললে ললিতা বলেন যে, এটি মোহনবাঁশির শব্দ। এতে এত বিমোহিত হওয়ার কারণ কি? উত্তরে রাধা বংশীধ্বনির প্রতিক্রিয়ার যে বর্ণনা দেন, তা কবির গভীরতম অনুভূতি ও উচ্চতর কাব্যপ্রতিভার পরিচায়ক: রাই কহে কেবা হন/ মুরলী বাজায় যেন/ বিষামৃতে একত্র করিয়া।/ জল নহে হিমে জনু/ কাঁপাইয়া সব তনু/ প্রতি তনু শীতল করিয়া।।/ অস্ত্র নহে মনে ফুটে/ কাটারিতে যেন কাটে/ ছেদন না করে হিয়া মোর।/ তাপ নহে উষ্ণ অতি/ পোড়ায় আমার মতি/ বিচারিতে না পাইয়ে ওর।।" বংশীধ্বনি শ্রবণে পূর্বরাগ একটি পুরাতন বিষয়। এটিকে অবলম্বন করে বহু শক্তিশালী কবি পদরচনা করেছেন। কিন্তু তীক্ষ্ণ শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে রাধার মানসিক অনুভূতির সমত্ব ও রাধার বিভ্রান্ত ব্যাকুলতার বর্ণনায় কবি মৌলিক। এইভাবে বৈষ্ণব কবিরা অনেকেই প্রথানুগ উপকরণের গণ্ডীরে আবদ্ধ হয়েও কৃষ্ণকথায় নানাভাবে বৈচিত্র্য সঞ্চার করেছেন।

এছাড়াও যদুনন্দন কৃষ্ণের নাম শ্রবণে ও চিত্রপট দর্শনে শ্রীরাধার পূর্বরাগের কথা বর্ণনা করেছেন। কৃষ্ণের রূপ বর্ণনার একটি পদে রূপগোস্বামী সংকলিত পদাবলির একটি শ্লোকের ভাব বিস্তৃত হয়েছে।

শ্রীরাধার পূর্বরাগের পদে সখী কৃষ্ণের কাছে গিয়ে রাধার অবস্থা বর্ণনা করেন। কৃষ্ণানুরাগিণী রাধা কখনও হাসেন, কখনও কাঁদেন। আবার কখনও কৃষ্ণের জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ করেন। কখনও সহচরীকে জড়িয়ে ধরে "হরি, হরি" বলেন। রাধার এই অবস্থা কিছুটা গীতগোবিন্দম্‌-এর ষষ্ঠ সর্গের বিরহিনী রাধার অনুরূপ। বিশেষত "দিশি দিশী হেরই তোয়" পঙ্‌ক্তিটি "পশ্যতি দিশি দিশি রহমি ভবন্তম্‌"-এরই অনুবাদ।

যদুনন্দনের পদে রাধা যেমন কৃষ্ণের নামটুকু শুনে তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবেই কৃষ্ণ ও রাধার নাম শুনেই তাঁর প্রতি অনুরক্ত। প্রেমের আর-এক স্তর উত্তীর্ণ হয়ে কৃষ্ণ তাঁর সম্মুখে, পশ্চাতে, দক্ষিণে, বামে, সারা পৃথিবীতে এমনকি আকাশেও সর্বত্রই কেবল রাধামুখ প্রত্যক্ষ করেছেন। কৃষ্ণের রাধাপ্রেম চৈতন্য-সমসাময়িক ও পরবর্তীযুগে বিশিষ্টতা লাভ করেছে। কিন্তু কৃষ্ণের এই সর্বত্র রাধাকে দেখতে পাওয়া যদুনন্দনের মৌলিক সৃষ্টি। যদুনন্দনের পদে রাধার প্রতিপক্ষ নায়িকা চন্দ্রাবলীর উল্লেখ আছে। উৎকণ্ঠিতা, মলিনমুখী রাধা বসে বসে কৃষ্ণবিরহে চোখের জল ফেলছেন। সেখানে গিয়ে দূতে বলেন, যার নাম রাধা সহ্য করতে পারেন না, সেই চন্দ্রাবলীর সঙ্গে কৃষ্ণ বিহার করছেন। শ্রীরাধার মান ও শ্রীকৃষ্ণ-কর্তৃক তাঁর মানভঞ্জন যদুনন্দনের পদে গতানুগতিক। তবে গোষ্ঠলীলার একটি পদে কবির যমুনা-বর্ণনা বড়োই মনোরম ও গতানুগতিকতা-মুক্ত: "ভাগ্যবতী যমুনা মাঈ। যার এ কূলে ও কূলে ধাওয়া ধাই।। শ্বেত লাঙল দোন ভাই। যার জলে দেখে আপন ছাই।।"

যদুনন্দন দানকেলীকৌমুদী গ্রন্থের কিছু বিষয় নিয়েও পদরচনা করেছেন। রূপগোস্বামী সৃষ্ট পৌর্ণমাসী চরিত্রটিকে নিয়ে যদুনন্দন একটি পদ রচনা করেছেন। পদটিতে বর্ষীয়সী স্নেহময়ী দেব পৌর্ণমাসীর চরিত্রটি বড়ো সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বড়াই-র ছায়ানুসরণে চরিত্রটি সৃষ্ট হলেও স্বরূপত কতখানি পৃথক তা যদুনন্দনের পদ থেকেই বোঝা যায়।

যদুনন্দনের অন্য একটি পদে দেখা যায়, জটিলার গৃহে পূজা হবে বলে জটিলা পুরোহিত আনতে বললেন। কৃষ্ণের জ্ঞাতিভ্রাতা সুভদ্রের স্ত্রী কুন্দলতা ছদ্মবেশী কৃষ্ণকে পুরোহিত সাজিয়ে আনলেন। কৃষ্ণ পূজা করার পর জটিলা দক্ষিণা দিতে চাইলেন। কিন্তু কৃষ্ণ "তেহোঁ কহে কার্য্য নাই/ তোমা সভার প্রীতি চাই/ এই মোর দক্ষিণা হইল।।" এই কাহিনীতে অভিনবত্ব কিছু নেই। এটিও রূপগোস্বামীর নাটকে ও গোবিন্দলীলামৃত গ্রন্থে রয়েছে। যদুনন্দন একটি পদে রাধাকৃষ্ণের বসন্তলীলা বর্ণনা করেছেন এবং ঝুলনলীলা নিয়েও কয়েকটি পদরচনা করেছেন। তবে তাঁর মাথুর পর্যায়ের পদগুলিতে অভিনবত্ব কিছু নেই। তবে একটি পদে দেখা যায় যে, কৃষ্ণ তাঁর প্রিয়তম দাম, শ্রীদাম ও হলধরের সঙ্গে মথুরা যাবেন। সম্ভবত রূপগোস্বামীর নাটক ও গোবিন্দলীলামৃত অনুবাদ করার জন্য তাঁর পদাবলীতে এগুলির প্রভাব বেশি পরিমাণে পড়েছে।

মাধবাচার্য

[সম্পাদনা]

শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা মাধবাচার্যের কতেকটি বৈষ্ণব পদও পাওয়া গিয়েছে। এঁকে কেউ চৈতন্যদেবের শ্যালক, কেউ বা খুড়তুতো শালা বলেছেন। তবে মাধবাচার্য স্বয়ং লিখেছেন: "সব অতবার শেষ করিল পরবেশ। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য চন্দ্র গুপ্ত যতিবেশ।। প্রেমভক্তিরস করেন প্রকাশ। কহে দ্বিজ মাধব তাহার দাসের দাস।।" এই বক্তব্যটিকে ধরে তাঁকে চৈতন্যদেবের "দাসের দাস" অর্থাৎ কোনও পরিকরের শিষ্য মনে করা হয়। দৈবকীনন্দন তাঁর বৈষ্ণববন্দনায় এঁর উল্লেখ করে লিখেছেন, "মাধব আচার্য বন্দো কবিত্ব শীতল। যাহার রচিত গীত শ্রীকৃষ্ণ মঙ্গল।।" বঙ্গবাসী সংস্করণে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের মধ্যে রঘুনাথ ভাগবতাচার্যের শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী ও পরমানন্দ নামে এক কবির রচনাও ঢুকে গিয়েছে।

চৈতন্য যুগের চরিতকাব্য

[সম্পাদনা]

চৈতন্যদেব নিজের জীবন, ধর্মভাব ও রাধাকৃষ্ণ-প্রেমলীলার আস্বাদনকে যেভাবে দেশের সামনে উপস্থিত করেছিলেন, তাতে তৎকালীন বাংলা ধর্মভীরু, দৈব-নির্ভর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাঁকে অবতার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেবত্বে উন্নীত করতে দ্বিধা করেনি। তাই তাঁর জীবন-পর্যালোচনা ও কীর্তন করা ঈশ্বরারাধনার ন্যায় পবিত্র কর্ম বলে বিবেচিত হয়েছিল। চৈতন্যদেবের জীবদ্দশাতেই তাঁকে নিয়ে সাহিত্যরচনার প্রারম্ভ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম চৈতন্যজীবনী-সাহিত্য রচিত হয় সংস্কৃত ভাষায়। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যেও চৈতন্যজীবনী-কাব্য একটি বিশিষ্ট সাহিত্যধারা হিসেবে পরিগণিত হয়। সেক্ষেত্রে সূত্র-উপাদান হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আলোচনায় সংস্কৃতে রচিত চৈতন্যজীবনীগুলির কিছু মূল্য রয়েছে। এই রচনাগুলির পরিচয় নিম্নরূপ:

স্তোত্রসাহিত্য
সর্বপ্রথম রঘুনাথ দাস ও রূপ গোস্বামী সংস্কৃত ভাষায় কয়েকটি স্তবস্তোত্র রচনা করেন, যেগুলিতে রাধাকৃষ্ণ-লীলার সঙ্গে চৈতন্যদেবের কথাও পাওয়া যায়।
মুরারি গুপ্তের কড়চা
এরপর চৈতন্যজীবন অবলম্বনে সংস্কৃত ভাষায় যে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থটি রচিত হয় সেটি হল মুরারি গুপ্তের শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতম্‌ বা সংক্ষেপে মুরারি গুপ্তের কড়চা। বিশ শতকের গোড়ায় মুদ্রিত এই বইটিতে ৭৮টি সর্গ, ১৯০৬টি শ্লোক ও ৪টি প্রক্রম রয়েছে। বৃহদায়তন এই মহাকাব্যিক গ্রন্থের অনেক অংশকেই আধুনিক গবেষকেরা প্রক্ষিপ্ত মনে করেন। কারণ, কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে বলা হয়েছে:

আদি লীলা মধ্য যত প্রভুর চরিত
সূত্ররূপে মুরারি গুপ্ত করিল গ্রন্থিত।
মধ্য শেষ প্রভুলীলা স্বরূপ দামোদর
সূত্র করি গাঁথিলেন গ্রন্থের ভিতর।। (১.৩)

এই বর্ণনানুসারে, চৈতন্যজীবনের আদি ও মধ্যলীলা অর্থাৎ গয়ায় বিষ্ণুপদচিহ্ন দেখে গৃহে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত মুরারি গুপ্ত বর্ণনা করেছেন; বাকি অংশ স্বরূপ দামোদরের সংযোজন।

মুরারি গুপ্ত চৈতন্যদেবের থেকে বয়সে কিছু বড়ো, সতীর্থ ও ভক্ত-বন্ধু ছিলেন। তিনি চৈতন্যদেবকে রাম বা কৃষ্ণ-সদৃশ জ্ঞান করতেন। আনুমানিক ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত এই গ্রন্থের রচনাভঙ্গি সরল এবং বর্ণনীয় বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি নিজে চৈতন্যজীবনের অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক মূল্য বিশেষভাবে স্বীকৃত। তাছাড়া মুরারি গুপ্তের পরবর্তী প্রায় সকল চৈতন্য-জীবনীকারই এই কড়চাকে কোনও না কোনও ভাবে ব্যবহার করেছেন।

লুপ্ত প্রথম নাটক
চৈতন্যজীবন অবলম্বনে সংস্কৃতে যে দুটি নাটক লেখা হয় তার প্রথমটি চৈতন্যদেবের জীবদ্দশাতেই রচিত হয়েছিল। এই নাটকটির কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। কেবল জানা যায়, “বঙ্গদেশের এক বিপ্র” এর লেখক। তিনি তাঁর নাটক নিয়ে পুরীতে চৈতন্যদেবকে শোনাতে গিয়েছিলেন। অন্য সকলে খুশি হলেও, স্বরূপ দামোদর এটিতে তত্ত্বগত ত্রুটি লক্ষ্য করে নাটকটি চৈতন্যদেবকে শোনানোর অযোগ্য হিসেবে বাতিল করে দেন। এতেই সম্ভবত নাটকটি লুপ্ত হয়েছে।
কবিকর্ণপূরের গ্রন্থাবলী
সংস্কৃতে লেখা অনেকগুলি গ্রন্থ ‘কবিকর্ণপূর’ উপাধিক পরমানন্দ সেনের নামাঙ্কিত হলেও প্রধানত চৈতন্যচরিতামৃতমহাকাব্যম্‌ নামক কাব্য, চৈতন্যচন্দ্রোদয়নাট্যম্‌ নামক নাটক ও গৌরগণোদ্দেশদীপিকা নামক চৈতন্য-পরিকরবর্গের বিবরণ-সম্বলিত একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা তিনটিই বিশেষভাবে পরিচিত।

পরমানন্দের পিতা ছিলেন বিশিষ্ট চৈতন্য-ভক্ত শিবানন্দ সেন। তিনি চৈতন্যদেবের নির্দেশেই নিজের কনিষ্ঠ পুত্রের নাম রাখেন পরমানন্দ পুরীদাস। কাব্যকৃতিত্বের জন্য পরমানন্দ ‘কবিকর্ণপূর’ উপাধি পান। চৈতন্য-অন্তর্ধানের অল্পকাল পরে দশ অঙ্কের চৈতন্যচন্দ্রোদয়নাট্যম্‌ পুরীর রাজা প্রতাপরুদ্রের অনুরোধে রচনা করতে শুরু করেন তিনি; ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে রাজার মৃত্যুর পর কিছুকাল রচনাকার্য স্থগিত থাকে এবং পরে ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রচনা শেষ হয়। নাটকে তাঁর প্রতিভা পূর্ণবিকশিত। চৈতন্যদেবের দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণ ও গম্ভীরা-লীলা পর্যন্ত সময়কালের প্রামাণ্য ইতিহাস এতে পাওয়া যায়।

পরমানন্দের মহাকাব্যটি তাঁর অপরিণত বয়সের (১৬ থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে) রচনা। মুরারি গুপ্তের কড়চা-র ১১শ সর্গ পর্যন্ত অনুসরণ এতে করা হয়েছে এবং সকৃতজ্ঞ-চিত্তে তার স্বীকৃতিও গ্রন্থ-মধ্যে পাওয়া যায়। আনুমানিক ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে রচিত ক্ষুদ্র গ্রন্থ গৌরগণোদ্দেশদীপিকা-য় চৈতন্য-পরিকরবৃন্দের পরিচয় আছে বলে বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার্য। এটির মধ্যে তাঁর লেখা অন্য দুই গ্রন্থ, নাটক ও মহাকাব্যের উদ্ধৃতি এবং মুরারি গুপ্তের কড়চার প্রসঙ্গও আছে।

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় চৈতন্য-জীবনীকাব্য রচনার সূত্রপাত করেন বৃন্দাবন দাস। গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজে “চৈতন্যলীলার ব্যাস” আখ্যায় ভূষিত এই কবির প্রকৃত জীবন-পরিচয় অবশ্য এখনও অজ্ঞাত। কবি নিজেও তাঁর কাব্যে আত্মকাহিনী বর্ণনা করেননি; এই মৌনতার প্রশ্রয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা লৌকিক-অলৌকিক কিংবদন্তীর। যতটুকু নিশ্চিতভাবে জানা যায় তা হল, তিনি চৈতন্য-পার্ষদ শ্রীবাসের ভাইঝি নারায়ণীর পুত্র এবং নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্য। গ্রন্থমধ্যে তিনি সখেদে বলেছেন যে, চৈতন্যদেবের নবদ্বীপ-লীলা তিনি চাক্ষুষ করতে পারেননি। নানা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে স্থিরীকৃত হয়েছে চৈতন্য-অন্তর্ধানের অল্পকাল পরে ১৫৪০-এর দশকের মধ্যভাগে বৃন্দাবন দাস তাঁর গ্রন্থ চৈতন্যভাগবত রচনা করেন। অর্থাৎ, ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকেই তাঁর জন্ম বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

মা নারায়ণী ও গুরু নিত্যানন্দের আশীর্বাদ, নির্দেশ ও অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতায় বৃন্দাবন তাঁর কাব্য রচনা করেন। তাঁর কাব্যের প্রাথমিক নাম ছিল চৈতন্যমঙ্গল , পরে ভাগবতপুরাণের নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে তিনি গ্রন্থের নামকরণ করেন চৈতন্যভাগবত । গ্রন্থটি তিন খণ্ডে বিভক্ত: আদি, মধ্য ও অন্ত্য। আদিখণ্ডে চৈতন্যদেবের জন্ম থেকে গয়া-গমন, মধ্যখণ্ডে সন্ন্যাসগ্রহণ এবং অন্ত্যখণ্ডে নীলাচল গমন ও সেখানকার কিছু কিছু ঘটনার বর্ণনার পরেই যেন আকস্মিকভাবে গ্রন্থটি শেষ হয়ে গিয়েছে। বৃন্দাবন দাসের কাব্য সহজ-সরল, সুললিত ও পাঁচালীর ঢঙে রচিত। তাই ভক্তসমাজে এই কাব্যটি বিশেষ সমাদর লাভ করেছিল। গভীর বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের ভার এতে নেই, তথ্য ও জীবনের সহজ বর্ণনায় তরতর করে এগিয়ে গিয়েছে কাব্যটি।

চৈতন্যদেবের প্রধান পার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভু কবির গুরু হওয়ায় এবং চৈতন্য-অন্তর্ধানের কিছুকালের মধ্যেই তাঁর কাব্য রচিত হওয়ায়, বৃন্দাবন দাস প্রায় প্রত্যক্ষ ক্ষেত্র থেকে নিজের কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। ঐকান্তিকভাবে তথ্যনিষ্ঠ, অসংখ্য সংবাদের উৎস এই গ্রন্থ একাধারে সুখপাঠ্য ও বৈষ্ণবসমাজে সমাদৃত। অধিকন্তু নিকট-দর্শনের ফলে চৈতন্যদেবের মানবিক গুণাবলী ও স্বভাববৈশিষ্ট্য তিনি বেশ স্পষ্টভাবে আঁকতে পেরেছেন—যার ফলে অবতারবাদের আড়ালে লুকানো মানুষ চৈতন্যদেবকে চিনতে ইতিহাসবিদদের বিশেষ কষ্ট করতে হয় না। সেই সঙ্গে বৃন্দাবন দাস আর-একটি মূল্যবান কাজ করেছেন—সমকালীন নবদ্বীপের সমাজ, ইতিহাস ও বাঙালিদের দৈনন্দিন জীবনচর্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ-প্রদান। অবশ্য এই কাজের ক্ষেত্রে অবৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলিকে তিনি ক্ষেত্রবিশেষে বেশ অশালীনভাবে আক্রমণ করেছেন। অনেক সমালোচকই এই বিষয়টিকে কবির অবৈষ্ণবসুলভ যৌবনের দম্ভ বলে মন্তব্য করেছেন। সে যাই হোক, সমস্ত গুণ ও ত্রুটি গ্রহণ-বর্জন করে আজকের যুক্তিনিষ্ঠ ইতিহাসবিদ যে এই গ্রন্থটির থেকে চৈতন্য-জীবন ও সমকালীন সমাজ সম্পর্কে প্রচুর সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেন, সেখানেই এই গ্রন্থের প্রধান সাফল্য। তাছাড়া, বাংলা ভাষায় চরিত-সাহিত্যের আদিতম গ্রন্থ ও অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি হিসেবেও এটির মূল্য কম নয়।

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত

[সম্পাদনা]

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত কেবলমাত্র চৈতন্য-জীবনীকাব্যেই নয়, সমগ্র মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে একটি অনবদ্য সংযোজন। বিনয়ী ভক্ত-বৈষ্ণব কবি তাঁর কাব্যমধ্যে আত্মপরিচয় খুব কমই দিয়েছেন। সেটুকু থেকেই জানা যায় যে, অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকটবর্তী ঝামটপুর গ্রামে আনুমানিক ১৫২০-এর দশকে তাঁর জন্ম। অবিবাহিত কবি যৌবনে নিত্যানন্দ প্রভুর স্বপ্নাদেশে বৃন্দাবনে গমন করলেও চৈতন্যজীবনী করেছিলেন নিতান্তই বৃদ্ধ বয়সে।

পূর্বসূরি বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে আকস্মিকভাবে সমাপ্ত চৈতন্যজীবনের শেষভাগ বর্ণনার উদ্দেশ্যে এবং তারই পটভূমিকায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবতত্ত্ব, সাধ্য ও সীমাকে ব্যাখ্যা করার ইচ্ছায় কৃষ্ণদাস নিজের অতলান্ত প্রজ্ঞা ও শক্তিশালী কবি-প্রতিভাবে অবলম্বন করে চৈতন্যজীবনী রচনাকার্যে ব্রতী হন এবং সেই-কার্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে যান। কাব্যামোদী, ইতিহাসবিদ, সমালোচক ও ভক্ত প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিরুচি অনুযায়ী এই গ্রন্থ থেকে কাব্যরস, ইতিহাস, দর্শন অথবা বৈষ্ণবতত্ত্বের অনুসন্ধান করে থাকেন। তাই সকল সমালোচকই কৃষ্ণদাসকে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন।

কৃষ্ণদাসের কবি-প্রতিভার প্রথম বৈশিষ্ট্য তাঁর বিষয়-নির্বাচন। “অতিবৃদ্ধ জরাতুর” কৃষ্ণদাস সুবৃহৎ চৈতন্যজীবনকথা সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করতে পারবেন কিনা সে-ব্যাপারে সংশয়ান্বিত ছিলেন। তাছাড়া চৈতন্যদেবের জীবন-মাহাত্ম্য বর্ণনায় যে গতানুগতিকতার স্পর্শ লেগেছিল, তা অতিক্রমের স্পৃহাও তাঁর মনে জেগে থাকতে পারে। তাছাড়া চৈতন্যদেবকে তিনি চাক্ষুষ করেননি; এমতাবস্থায় পূর্বসূরিদের সূত্রে জ্ঞাত তথ্যকে ভাবীকালের বৈষ্ণবদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও অনুকরণীয় পথে উপস্থাপনার তাগিদও তাঁর মধ্যে ছিল। সব-দিক বিবেচনা করে পূর্বসূরিরা যে-প্রসঙ্গগুলির উপর সম্যক আলোকপাত করেননি, চৈতন্যজীবনের সেই দিকটিকেই তিনি প্রাধান্য দিলেন বেশি। এই কারণেই চৈতন্যদেবের নীলাচল-লীলার বর্ণনাই তাঁর গ্রন্থে মুখ্য হয়ে উঠল।

কৃষ্ণদাস-প্রতিভার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই বহুলাংশে নতুন বিষয়বস্তুর সঙ্গে বৈষ্ণবতত্ত্বের সংমিশ্রণ। বৃন্দাবনের পণ্ডিত-সাধক ও দার্শনিক ভক্তদের দ্বারা প্রথা-নির্দিষ্ট কঠিন বৈষ্ণবীয় তত্ত্বকে কবি সরস কাব্যভাষায় ব্যাখ্যা করলেন। এভাবে চৈতন্যজীবন-বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গেই বেশ সহজ ভাষা ও সরল উপমা-উপমানের মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণবতত্ত্বকে বুঝে বা জেনে নেওয়ার সুযোগ করে দিল এই কাব্য। খাঁটি প্রাবন্ধিকের ন্যায় যুক্তিক্রম, উদাহরণ ও প্রমাণ সহ চৈতন্যজীবনের শেষ লীলা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গৌড়ীয় অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব, গৌরাঙ্গ-আবির্ভাবের কারণ, বৈষ্ণব রসতত্ত্বের স্বরূপ, রাগানুগা ভক্তি ও সাধ্যসাধন তত্ত্বের ব্যাখ্যা, রাধাতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্বের স্বরূপ, অবতারতত্ত্ব, গোপীতত্ত্ব ইত্যাদির পরিচয় দিয়ে দিলেন। এই কারণেই আচার্য সুকুমার সেন কৃষ্ণদাসকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ গ্রন্থকারের মর্যাদা দিয়েছেন।

কৃষ্ণদাসের প্রতিভার তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর ইতিহাসবোধ ও তথ্যনিষ্ঠা। চৈতন্যলীলা চাক্ষুষ না করলেও এই লীলাবর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি মুরারি গুপ্তের কড়চা, কবি কর্ণপূরের গ্রন্থদ্বয়, স্বরূপ দামোদরের কড়চা, বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থের সাহায্য গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও চৈতন্যজীবনের শেষ পর্যায়ের অনেক সংবাদ পেয়েছেন বৃন্দাবনের রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, জীব গোস্বামী, লোকনাথ গোস্বামী প্রমুখের থেকে। স্বীয় প্রতিভা ও বুদ্ধির সাহায্যে চৈতন্যজীবনের অনেক নতুন তথ্যের সমাবেশ তিনি ঘটিয়েছেন, তেমনই ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বপোষিত ভুলগুলি ভেঙে আগের ফাঁকগুলিও পূরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু সবকিছুই তিনি করেছেন প্রাপ্ত তথ্যকে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের কষ্টিপাথরে ও সম্ভাব্যতার যুক্তিতে যাচাই করে। বৃন্দাবন দাসের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেও তিনি চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসপূর্ব এক স্বতন্ত্র জীবনকথা বর্ণনা করেছেন। নীলাচল-লীলাতেও তাঁর দিব্যোন্মাদ আচরণের সঙ্গে তার কারণ ও তত্ত্বকে মিশিকে এক বোধগম্য বাস্তবোচিত বিবরণ উপস্থাপনা করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

চৈতন্যচরিতামৃত এক সুবৃহৎ গ্রন্থ। ১৫৯০-এর দশোকে রচিত এই কাব্যে চৈতন্যদেবের পূর্ণ সাতচল্লিশ বছরের জীবনকাহিনী আদি, মধ্য ও অন্ত্য—এই তিন লীলায় বিন্যস্ত হয়েছে। আদিলীলায় ১৭টি, মধ্যলীলায় ২৫টি ও অন্ত্যলীলায় ২০টি অধ্যায় রয়েছে। চৈতন্যদেবের মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত অলৌকিক গালগল্পকে প্রশ্রয় না দিয়ে সত্যসন্ধ কৃষ্ণদাস সেই সম্পর্কে নীরব থেকেছেন।

কবির ভাষাজ্ঞান, ছন্দ-বোধ, উপমা-অলংকারের সাহায্যে বক্তব্যকে মর্মগ্রাহ্য করে তোলার ক্ষমতা প্রশংসনীয়। সেই সঙ্গে কবির স্বধর্ম-নিষ্ঠা ও সবিনয় ভক্তিও যুক্ত হয়েছিল কাব্যের আত্মায়। সমগ্র কাব্যে কবির প্রজ্ঞা, তথ্যনিষ্ঠা ও বিদ্যাবত্তার পরিস্ফুরণ আজও গবেষকদের সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে আনত করে।

লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গল

[সম্পাদনা]

বিষয়ের অভিনবত্বে ও মর্যাদায় লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গল মধ্যযুগীয় চৈতন্য-জীবনীসাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কোগ্রামের অভিজাত বৈদ্যবংশীয় কমলাকর দাস ও সদানন্দীর একমাত্র সন্তান লোচনদাস বাল্যকালে পিতৃ ও মাতৃকুলের প্রচুর আদর পেয়ে উৎসন্নে গিয়েছিলেন। শেষে মাতামহ পুরুষোত্তম “মারিয়া ধরিয়া” তাঁকে অক্ষর-জ্ঞান দান করেন। শ্রীখণ্ড-নিবাসী চৈতন্য-পার্ষদ নরহরি সরকার ছিলেন কবির গুরু। তাঁরই নির্দেশে লোচনদাস চৈতন্যজীবনী রচনা করেন।

লোচনদাসের কাব্য ছিল জনতাসেব্য। তাই তাঁর কাব্যে রয়েছে পাঁচালীর ঢঙ, গায়নের সুবিধানুসারে বহুল সুর-নির্দেশ এবং মঙ্গলকাব্যের অনন্য বিশিষ্টতা। জয়ানন্দের সঙ্গে তাঁর কিছু মিল থাকলেও তিনি একেবারে কবিত্বশূন্য বা হীনপ্রতিভা ছিলেন না। কাব্যে কিছু নতুন তথ্য পরিবেশনের চেষ্টাও তিনি করেছেন, এবং তা এসেছে মুরারি গুপ্তের কড়চা অনুসরণের ফলে। তবু যে জীবনবোধ ও নতুন উদ্ভাবনী শক্তিবলে তথ্যকে কাব্যরসে নিষিক্ত করা যায়, লোচনদাসের তা ছিল না। তাঁর গুরুদেব প্রবর্তিত গৌরনাগরী ভাবের প্রচারকারী হিসেবে যে রস ও ভাবের উদ্বোধন ঘটাতে চেয়েছেন, তাতে তিনি অবশ্য একান্তভাবে সার্থক হয়েছেন। বিষ্ণুপ্রিয়ার বিলাপ ইত্যাদি কিছু অংশে করুণরসের বর্ণনাতেও তিনি বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

লোচনদাসের কাব্যটি মোটামুটিভাবে ১৫৬০ থেকে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত বলে ধরা হয়। এতে মোট চারটি খণ্ড: সূত্র, আদি, মধ্য ও অন্ত্য। সূত্রখণ্ডে মঙ্গলকাব্যের ন্যায় গণেশ-বন্দনা থেকে স্বর্গের কাহিনী এবং চৈতন্যাবতারের কারণ বর্ণিত হয়েছে। আদিখণ্ডে চৈতন্যদেবের জন্ম থেকে গয়ায় পিতৃ-পিণ্ডদান করে ঘরে ফেরা; মধ্যখণ্ডে চৈতন্যদেবের নবদ্বীপ ও নীলাচল লীলা এবং সবশেষে অন্ত্যখণ্ডে দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণ থেকে আরম্ভ করে চৈতন্যদেবের অলৌকিক অন্তর্ধান-কাহিনীর (জগন্নাথ-বিগ্রহে লীন হয়ে যাওয়া) মধ্যে দিয়ে গ্রন্থ সমাপ্ত হয়েছে।

লোচনদাসের কাব্য সম্পর্কে ভক্ত ও সমালোচক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ তাঁকে বিশিষ্ট ও সহক কবিত্ব-প্রতিভার অধিকারী মনে করেন; আবার কেউ বা তাঁকে গৌরনাগরী ভাবের ব্যাখ্যাতা রূপে অসংযত আদিরসের পরিবেশক হিসেবে নিন্দা করেন। উভয় বক্তব্যেই কিছু সত্য রয়েছে। আসলে, যেখানে কবি তাঁর গুরু নরহরি সরকারের গৌরনাগরী ভাব চৈতন্যদেবের জীবনের উপর আরোপ করেছেন, সেখানে তাঁর বর্ণনা হয়ে উঠেছে চটুল ও নির্লজ্জভাবে আদিরসাত্মক। আর যেখানে তিনি নিজস্ব ভাব-কল্পনার রাজ্যে আপন খেয়ালে বিচরণ করেছেন, সেখানেই স্বভাবকবির ন্যায় হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে তাঁর রচনা।

জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল

[সম্পাদনা]

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত (১৫৪০-এর দশক) রচনার পর জয়ানন্দ নামে জনৈক বৈষ্ণব ভক্ত চৈতন্যমঙ্গল নামে আরেকটি চৈতন্য-জীবনীকাব্য রচনা করেছিলেন। জয়ানন্দ বা তাঁর কাব্য বিশ শতকের প্রথম ভাগেও বৈষ্ণব সমাজে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। পূর্ববর্তী কোনও সূত্র থেকেই এঁর সম্বন্ধে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে আবিষ্কৃত তথ্য থেকে জানা যায়, কবির পিতার নাম সুবুদ্ধি মিশ্র, মাতার নাম রোদিনী দেবী। অনেকগুলি সন্তান মারা যাওয়ার পর জয়ানন্দের জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর নাম রাখা হয় ‘গুইয়া’। পরে তাঁদের বাড়িতে আতিথ্য-গ্রহণকারী চৈতন্যদেব এই নাম পরিবর্তন করে রাখেন জয়ানন্দ। অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার সাতগেছে থানার অন্তর্গত আমাইপুর গ্রামে কবির নিবাস ছিল। কবিরা ছিলেন বন্দ্য-ঘটী ব্রাহ্মণ। কবি বৈষ্ণব ও চৈতন্যভক্ত হলেও সমগ্র পরিবারের মধ্যে বৈষ্ণবনিষ্ঠা ও ভক্তিতন্ময়তা ছিল বলে মনে হয় না। অনুমান করা হয় যে, বৃন্দাবন দাসের পরে এবং ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দের আগেই জয়ানন্দ তাঁর কাব্য রচনা করেন। তখন কবির বয়স পঞ্চাশ বছর। নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্য অভিরাম অথবা গদাধর, ঠিক কে কবির গুরু ছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

জয়ানন্দ উচ্চমানের কবি-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না। তাঁর কাব্যদেহে প্রসাধনের চিহ্নও বেশ অল্প। তবু তাঁর সরল বর্ণনার আয়োজনহীন স্বাভাবিকতার প্রশংসা করতেই হয়। আসলে সেকালের বৃহত্তর জনরুচির তারল্য ও লোকবিশ্বাসকে তিনি অতিক্রম করতে পারেননি। ফলে তাঁর কাব্যে এমন সব বিষয় ও ঘটনার অবতারণা ঘটেছে যা রক্ষণশীল বৈষ্ণবীয় রুচির রীতিমতো পরিপন্থী। যেমন, তিনি তাঁর কাব্যে শাক্তদেবী আদ্যাশক্তির বন্দনা করেছেন। মঙ্গলকাব্যের ধাঁচে চৈতন্যজীবনকে বিভক্ত করেছেন নয়টি পালায়। এছাড়া গ্রন্থের প্রারম্ভে বন্দনাখণ্ড, মধ্যে-মধ্যে বারোমাস্যা ইত্যাদি ব্যবহার করে স্পষ্টতই অনুসরণ করেছেন প্রচলিত মঙ্গলকাব্যের ধারাটিকে। চৈতন্যদেবের মৃত্যুরও একটি লৌকিক কারণ তিনি দেখিয়েছেন—উল্টোরথের সময় রথাগ্রে সংকীর্তন-নৃত্যকালে ইঁটের টুকরোর আঘাতে পা বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু ঘটেছিল তাঁর। এইসব ঘটনা বা বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায় চমক থাকলেও তা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতাদর্শের সঙ্গে মেলে না, ফলে এই গ্রন্থ কোনও দিনই বৈষ্ণবসমাজে সমাদর লাভ করেনি। আসলে জয়ানন্দের মধ্যে একটি সহজাত আবেগ ছিল, পরিবারে পিতার অনুসরণে চৈতন্যভক্তি ও বৈষ্ণবীয়ানার স্পর্শও একটু লেগেছিল। একদিকে মূলধারার ধর্মবিশ্বাস ও লোকবিশ্বাসজাত দেবদেবীর প্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে চৈতন্য-প্রভাবিত ভক্তি-আন্দোলনের প্লাবনের বিপরীতমুখী টানের মাঝখানে পড়ে জয়ানন্দ উক্ত আবেগ ও স্বল্প কবিত্বশক্তিকে অবলম্বন করে রচনা করেছিলেন তাঁর ‘চৈতন্যমঙ্গল’। ফলে তাঁর কাব্য না পেরেছে জনরুচির দাবি মেটাতে, না পেয়েছে মূলধারার বৈষ্ণবসমাজে সমাদর।

চূড়ামণিদাসের গৌরাঙ্গবিজয়

[সম্পাদনা]

আচার্য সুকুমার সেনের সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে চূড়ামণি দাসের গৌরাঙ্গবিজয় (১৯৫৭) প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকসমাজ আর-একটি প্রাচীন চৈতন্যজীবনী-কাব্যের পরিচয় লাভ করেন। এটির মাত্র একটি খণ্ডিত পুথি পাওয়া গিয়েছে এবং প্রাচীন কোনও গ্রন্থে এটির উল্লেখ না থাকায় পাঠকসমাজে এই গ্রন্থ পূর্বে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল। অবশ্য বৈষ্ণব পদসাহিত্যে চূড়ামণি দাস নিতান্ত অপরিচিত নন। বিভিন্ন পদসংকলনে ‘চূড়ামণি’ ভণিতা-যুক্ত মোট ৯টি পদ পাওয়া যায় এবং তাঁর চৈতন্যজীবনী-কাব্যের কথাও ড. দীনেশচন্দ্র সেন উল্লেখ করেছিলেন।

কাব্য-মধ্যে দু-এক স্থলে ‘ভুবনমঙ্গল’ শব্দটি দৃষ্টে আচার্য সুকুমার সেন প্রথমে সেটিকেই গ্রন্থনাম ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু খণ্ডিত পুথির শেষ পৃষ্ঠায় “গৌরাঙ্গবিজয় তিন খণ্ড পূর্ণ হৈব” চরণটি থাকায় পরে তিনি মত পরিবর্তন করেন এবং প্রকাশিত গ্রন্থনাম হিসেবে ‘গৌরাঙ্গবিজয়’ নামটিকেই গ্রহণ করেন।

চূড়ামণি দাস ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে এই কাব্য রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। তাঁর গুরু ছিলেন ‘দ্বাদশ গোপাল’ নামে পরিচিত বারো জন নিত্যানন্দ-ভক্তের অন্যতম ধনঞ্জয় পণ্ডিত। কবি তাঁর গুরুর নিকট চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দের জীবন-বিষয়ক উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন, সম্ভবত নিত্যানন্দ-সেবক গদাধর দাস ও রামদাসও তাঁকে এ-বিষয়ে সাহায্য করে থাকবেন। নিত্যানন্দের তিরোধানের পর তাঁর স্বপ্নাদেশের ফলে চূড়ামণি গৌরাঙ্গবিজয় রচনা করেন।

কাব্যটির যে সামান্য অংশ পাওয়া গিয়েছে তাতে তথ্যের দিক থেকে দু-চারটি নতুন কথা পাওয়া যায়। এটির প্রথমাংশে বেশ বৃহদাকারে মাধবেন্দ্র পুরীর কাহিনী, মাধবেন্দ্রের সঙ্গে চৈতন্যদেবের সাক্ষাৎ, মাধ্যবেন্দ্র কর্তৃক চৈতন্যদেবের উপনয়ন সংস্কারের অলীক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। নিত্যানন্দ সম্পর্কেও তাঁর পরিবেশিত তথ্যের অনেকটাই এইরকম গালগল্পের সমাহার মাত্র। চৈতন্যদেবের বাল্য-কৈশোর লীলায় এবং তাঁর পিতা জগন্নাথ (পুরন্দর) মিশ্রের গৃহস্থালী বর্ণনায় তিনি মিশ্র-পরিবারের যে ঐশ্বর্য ও বিলাসব্যসনের বিবরণ দিয়েছেন, তাও অন্যান্য চৈতন্যজীবনী-গ্রন্থের সম্পূর্ণ বিপরীত।

কবি তিন খণ্ডে কাব্যরচনার সংকল্প গ্রহণ করলেও (“আদি খণ্ড মধ্য খণ্ড শেষ খণ্ড কহিব”) প্রথম খণ্ডেই কাব্যটি খণ্ডিত হয়েছে; এটির সামান্য রক্ষা পেয়েছে। সুতরাং কবির কবিত্ব বা বর্ণনাশক্তি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলার নেই। কবি মাঝে মাঝে ব্রজবুলি ব্যবহার করলেও প্রায় কোথাও কবিত্বের পরিচয় দিতে পারেননি। নিছক বিবৃতিধর্মী ভাষায় কোনও রকমে কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে মাত্র। এক মুহূর্তের জন্য আখণ্ডল আচার্যের আবির্ভাব নীরস গদ্যাত্মক বর্ণনার মধ্যে কিঞ্চিৎ লঘু বৈচিত্র্য সঞ্চার করেছে। কাব্য বা তথ্যগ্রন্থ হিসেবে গৌরাঙ্গবিজয় বৈষ্ণবসমাজে কিছুমাত্র প্রচার লাভ করতে পারেনি, কেউ এটির নামও জানত না। তথ্যের অসঙ্গতি, বাস্তবতার অভাব ইত্যাদির কারণে বিদগ্ধসমাজেও মূল্যবান চৈতন্যজীবনী-কাব্য হিসেবে এটির মূল্য বিশেষ নেই।

গোবিন্দদাসের কড়চা

[সম্পাদনা]

১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে শান্তিপুর মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুলের হেড-পণ্ডিত তথা অদ্বৈতাচার্যের বংশধর জয়গোপাল গোস্বামী গোবিন্দদাসের কড়চা নামে একটি চৈতন্যজীবনী প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, চৈতন্যদেবের দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণকালে গোবিন্দদাস কর্মকার নামে জনৈক ভৃত্য তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। তিনিই চৈতন্যজীবনের অন্তিমকালে বা তাঁর অন্তর্ধানের পর ষোড়শ শতকের কোনও এক সময়ে ‘কড়চা’ অর্থাৎ দিনলিপির ধাঁচে এই পুথিটি রচনা করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ প্রথম যুগের সাহিত্য-ইতিহাসকার এই কড়চাটিকে চৈতন্যজীবনের একটি মূল্যবান অপ্রকাশিত দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কারণ, চৈতন্যদেবের সন্ন্যাসজীবনের সূচনালগ্নে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণ সম্পর্কে কোথাও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তাই গোবিন্দদাসের কড়চার প্রথম প্রকাশে অনুসন্ধিৎসু মহলে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

পুথিতে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, কবির বাস ছিল বর্ধমান জেলার কাঞ্চনপুরে। তাঁর পিতার নাম শ্যামাদাস, মাতা মাধবী। পত্নী শশিমুখীর হাতে লাঞ্ছিত কবি গৃহত্যাগ করে চৈতন্যদেবের ভৃত্যের বৃত্তি গ্রহণ করেন এবং তাঁর দাক্ষিণাত্য-ভ্রমণের সঙ্গী হন।

অবশ্য প্রকাশের কিছুকাল পরেই নিপুণ বিশ্লেষক, সতর্ক ইতিহাসকার ও যুক্তি ও তথ্যনিষ্ঠ সমালোচকেরা গ্রন্থটিকে নকল, অর্বাচীন ও জালিয়াতিপূর্ণ চৈতন্যজীবনী হিসেবে চিহ্নিত করেন। সমগ্র চৈতন্যজীবনী-সাহিত্যে কোথাও গোবিন্দদাস কর্মকারের অস্তিত্ব নেই। তাছাড়া পুথিটির ভাষাবিচার করেও তার মধ্যে আধুনিকতার স্পষ্ট ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। তাই নতুন কোনও প্রমাণ পাওয়া না গেলেও, বিশ্বাসের উপরে যুক্তি ও তথ্যকে স্থান দিলে গোবিন্দদাসের কড়চা ও গ্রন্থকার গোবিন্দদাস কর্মকারের অস্তিত্বকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করা চলে না।

চৈতন্য যুগের অনুবাদ কাব্য

[সম্পাদনা]

চৈতন্য যুগের রামায়ণ অনুবাদ

[সম্পাদনা]

অদ্ভুতাচার্যের রামায়ণ

[সম্পাদনা]

রামায়ণ-অনুবাদক নিত্যানন্দ আচার্য বা ‘বড়ু’ নিত্যানন্দ স্বয়ং রামচন্দ্র কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে অল্প বয়সেই রামায়ণ অনুবাদ সম্পূর্ণ করেন বলে কথিত আছে। এই অদ্ভুত কাজের জন্যই তাঁর নাম হয় ‘অদ্ভুতাচার্য’। অন্য মতে, তাঁর কাব্যের অদ্ভুত আশ্চর্য-রামায়ণ নামটি বিকৃত হয়ে দাঁড়িয়েছে অদ্ভুতাচার্যের রামায়ণ। যতদূর জানা যায়, কবির পিতার নাম শ্রীনিবাস (অথবা কাশী), মাতার নাম মেনকা। জাতিতে ব্রাহ্মণ অদ্ভুতাচার্যের নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলায় আত্রেয়ী নদীর উত্তরে ও করতোয়ার পশ্চিমে সোনাবাজু পরগনার বড়বাড়ি বা অমৃতকুণ্ডা গ্রামে। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী ও অধ্যাপক মণীন্দ্রমোহন বসুর সিদ্ধান্ত অনুসারে, কবির জন্ম আনুমানিক ১৫৪৭ খ্রিস্টাব্দ এবং ষোড়শ শতকের শেষে বা সপ্তদশ শতকের গোড়ায় তিনি রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন।

অদ্ভুতাচার্যের জন্মকাল ও জীবন-পরিচয় নিয়ে সংশয় থাকলেও তাঁর কাব্য নিঃসন্দেহে বাঙালি সমাজে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাঁর কাব্যশৈলী ও আখ্যান-নির্বাচনে অভিনবত্ব অথবা পূর্বসূরি কৃত্তিবাসের অনুসরণ যত না মুখ্য, তদপেক্ষা লোকজীবন চর্যা এবং সেখান থেকে রস-সংগ্রহে তাঁর কৃতিত্ব অনেক বেশি। একটি আর্য মহাকাব্যের দেহে তিনি এমন সুন্দরভাবে লৌকিক বোধ, রুচি ও রস অনুপ্রবিষ্ট করিয়েছেন, যে সাধারণ বাঙালি অচিরেই তাঁকে আপন করে নিয়েছে এবং সেখানেই তাঁর সার্থকতা। যেমন, দশরথ মৃগয়ার ছলে তৃতীয়া পত্নী সুমিত্রাকে বিবাহ করতে গেলে কৌশল্যা ও কৈকেয়ী দেবতার কাছে কামনা করেছেন: “নিরবধি পূজে দোঁহে পার্বতী শঙ্কর। সুমিত্রা দুর্ভাগা হৌক মাগে এই বর।।” সতীন সম্পর্কে ঠিক এমন মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় বাংলার লৌকিক ছড়াগুলিতে। আবার রাম-জননী কৌশল্যার চরিত্রে পড়েছে স্নেহময়ী বাঙালি মায়ের ছায়া। কৃত্তিবাসের গৌরব-কিরণ প্রতিপক্ষ হয়ে না দাঁড়ালে, অদ্ভুতাচার্যের রামায়ণ বাঙালির হৃদি-সিংহাসনে চিরস্থায়ী আসন জয় করে নিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

চন্দ্রাবতীর রামায়ণ

[সম্পাদনা]

মনসামঙ্গল-রচয়িতা দ্বিজবংশী বা বংশীদাস চক্রবর্তীর কন্যা চন্দ্রাবতী রামায়ণ রচনা করে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একমাত্র নারী-কবির গৌরব অর্জন করেছেন। তাঁর কাব্যের রচনাকাল সঠিক জানা না গেলেও, দ্বিজবংশী যেহেতু সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগের লোক ছিলেন, সেহেতু তাঁর কন্যা ঐ শতকের শেষভাগেই রামায়ণ রচনা করে থাকবেন বলে মনে করা যেতে পারে।

চন্দ্রাবতীর জীবনকথা কিছুই জানা যায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত মৈমনসিংহ গীতিকার একটি পালায় চন্দ্রাবতীর যে বিয়োগান্তক জীবনকাহিনী রয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি প্রথম জীবনে এক পুরুষের প্রেমে পড়েছিলেন এবং সেই ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতায় পরবর্তীকালে নিদারুণ দুঃখভোগ করেন। কোনও কোনও ইতিহাসবিদ এই লোককাব্যের ঐতিহাসিকতা স্বীকার করেন না। তবে চন্দ্রাবতী রচিত দুটি সাহিত্যকীর্তির নিরিখে তাঁর কবিসত্তাকে একেবারে কাল্পনিক ব্যাপার বলে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

চন্দ্রাবতী-রামায়ণের কোনও পুথি পাওয়া যায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথি-সংগ্রাহক ময়মনসিংহের অধিবাসী চন্দ্রকুমার দে স্থানীয় মহিলাদের গলায় এই রামায়ণ-গান শুনে তা সংগ্রহ করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, এই গানের গায়ক ও শ্রোতারা অধিকাংশই স্ত্রীলোক। সংগ্রাহক এই গানের গ্রাম্য ভাব-ভাষাভঙ্গি পরমার্জনা করতে গিয়ে এটির গ্রাম্য চেহারাটিকে ধরে রাখতে পারেননি। তবু এই কাব্যের নারীসুলভ কোমলতাটুকু বেশ অনুভব করা যায়।

সংগ্রাহক পালাটিকে তিনটি পরিচ্ছেদে ভাগ করেছেন। প্রথম পরিচ্ছেদে রাবণের স্বর্গমর্ত্যাদি অভিযান ও রামের জন্ম, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে সীতার বারোমাস্যা এবং তৃতীয় পরিচ্ছেদে সীতার বনবাসের পূর্বসূচনায় আখ্যান খণ্ডিত। অনুমান, পালাটিতে সীতার পাতালপ্রবেশ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। মেয়েলি ছড়ার আকারে রচিত এই পালায় ধারাবাহিক আখ্যানবিন্যাস নেই, দু-একটি ঘটনা অবলম্বনে পালার পৃথক পৃথক পর্ব বিন্যস্ত। তারই মধ্যে নারী-কবির চোখে দেখা নারীজীবনের বেদনাবিধুর চিত্র এই কাব্যের উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য।

চন্দ্রাবতী রচিত দস্যু কেনারামের পালা নামে একটি পালায় তাঁর পিতা এক দস্যুকে মনসার ভাসান শুনিয়ে কীভাবে তাঁর শিষ্যে পরিণত করেছিলেন, তার বর্ণনা আছে। এই পালায় ‘দ্বিজবংশী সুতা’ ভণিতা দৃষ্টে মনে হয় এটিও চন্দ্রাবতীর রচনা।

চৈতন্য যুগের মহাভারত অনুবাদ

[সম্পাদনা]

কাশীরাম দাসের মহাভারত

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় মহাভারত অনুবাদকদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন কবি কাশীরাম দাস। যদিও তিনি অষ্টাদশ পর্ব-বিশিষ্ট মহাভারতের মাত্র সাড়ে তিনটি পর্বের স্বাধীন অনুবাদ করেছিলেন, তবু কথক, গায়েন ও লিপিকরদের আনুকুল্যে তিনি সমগ্র মহাভারতের রচয়িতা হিসেবেই বিগত চার শতক ধরে সাধারণ বাঙালির ঘরে ঘরে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছেন। উনিশ শতকের গোড়ায় শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের ধর্মপ্রচারকেরা কাশীরাম দাসের কাব্য হিসেবেই প্রথম বাংলা মহাভারত মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করেন।

কাশীরাম দাস কৃত্তিবাসের পরবর্তীকালের কবি হলেও তাঁর কাল ও পরিচয় নিয়ে কৃত্তিবাসের মতোই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। কবি তাঁর অনুবাদের দু-একটি জায়গায় নিজের সম্পর্কে যে অতি সংক্ষিপ্ত উক্তিগুলি করেছেন, তা থেকে বোঝা যায় তাঁর অগ্রজ ও অনুজেরাও ছিলেন কবিত্বপ্রতিভার অধিকারী। তাঁদের কাব্য থেকেও কাশীরাম সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য পাওয়া যায়। কবিরা ছিলেন তিন ভাই: কৃষ্ণরাম, কাশীরাম ও গদাধর। অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কাটোয়া মহকুমার সিঙ্গি গ্রামে কবির জন্ম হয়। কেউ কেউ এই সিঙ্গি গ্রামকে সিদ্ধি গ্রাম নামেও উল্লেখ করেছেন। কবির পিতার নাম কমলাকান্ত, কনিষ্ঠ ভ্রাতা গদাধরের পুত্রের নাম নন্দরাম দাস। কাশীরামের দু-একটি পুথিকে কালনির্ণায়ক যে পয়ারের নির্দেশ আছে, তা থেকে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ১৬০৪ ও ১৬০২-০৩ খ্রিস্টাব্দের ইঙ্গিত পেয়েছেন। ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে লিখিত একটি পুথিও পাওয়া গিয়েছে। সুতরাং মনে করা যেতে পারে, ষোড়শ শতকের একেবারে শেষে অথবা সপ্তদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকেই কাশীরাম তাঁর মহাভারত রচনা করতে আরম্ভ করেছিলেন।

কাশীরাম যখনই কাব্যানুবাদ শুরু করুন না কেন, সম্ভবত সমগ্র মহাভারত তিনি অনুবাদ করেননি। কারণ, কোনও কোনও পুথিতে বলা হয়েছে: "আদি সভা বন বিরাটের কতদূর। ইহা রচি কাশীদাস গেলা স্বর্গপুর।।" সেখানে আরও বলা হয়েছে যে, কাশীরাম তাঁর কাব্য সম্পূর্ণ করার ভার দিয়ে যান ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দরামের হাতে। কাশীরাম যে অংশটুকু রচনা করেছেন, তার মধ্যে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য থাকলেও পরের দিকে অন্যেরা লিখেছেন বলে অনুবাদের মধ্যে নানা অসঙ্গতি দেখা যায়। তা সত্ত্বেও কাশীরামের মহাভারত কৃত্তিবাসের রামায়ণের মতোই খ্যাতি লাভ করে।

কারও কারও মতে, কাশীরামের সংস্কৃত জ্ঞান ছিল না। তাই তিনি মূল মহাভারত পড়েননি। কেবল কথকদের মুখ থেকে মহাভারতের গল্প শুনে সেই গল্পই পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু এই অভিযোগ একান্তই অসঙ্গত মনে হয়। কবির অনুবাদের সঙ্গে মূল মহাভারত মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, তিনি সংস্কৃত ভালোই জানতেন। তাছাড়া মহাভারতের সংস্কৃত শ্লোক যেভাবে তিনি বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রূপায়িত করেছেন, তাতে তাঁকে সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পারদর্শী বলেই মনে হয়। তবে বড় বেশি সংস্কৃতের প্রভাব পড়েছে বলে তাঁর কাব্যে কয়েকটি জায়গায় বেশ কৃত্রিমতার ছাপও পড়ে গিয়েছে।

কাশীরাম দাস তাঁর মহাভারতের প্রথম চার পর্বে খুব সংক্ষেপে কাহিনী অনুসরণ করেছেন। কখনও কখনও নিজেও দু-চারটি গল্প উদ্ভাবব করেছেন। যেমন, শ্রীবৎসচিন্তার গল্প মধ্যযুগের অন্যান্য অনুবাদকদের মতো কাশীরামের মহাভারতে মূলের আক্ষরিক অনুবাদ নয়, ভাবানুবাদ বলা যেতে পারে। কবি প্রসন্ন ভঙ্গিতে পরিচ্ছন্নভাবে কাহিনীটি বিবৃত করেছেন। তবে তাঁর ভাষায় কখনও কখনও সংস্কৃত রীতির আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। সপ্তদশ শতকের এই অনুবাদকের মহাভারত অনুবাদেও মধ্যযুগের সর্বব্যাপ্ত চৈতন্য-প্রভাব অনুভব করা যায়। কায়স্থ দেব পদবিধারী পরিবারে জাত কাশীরাম নিজেকে "দাস" অর্থাৎ কৃষ্ণভক্ত দাসানুদাস রূপে উল্লেখ করেছেন। তাঁর হৃদয়ের রাগানুগা ভক্তির শ্রেষ্ঠ পরিচয় সবিনয় আত্মনিবেদনে, সমগ্র কাব্যে কবিপ্রাণের এই প্রেমানুরক্তি স্পর্শ বিকীর্ণ হওয়ায় মহাভারতের বীরগাথা সকরুণ মূর্চ্ছনায় নবীন মধুর রূপ লাভ করেছে। কাশীরামের রচনা চৈতন্য-পরবর্তী বাংলার প্রেমাভক্তিরসের অনুকূল বলেই বাঙালির আনন্দ-বেদনা হাসি-অশ্রুকে একসূত্রে গ্রন্থিত করেছে এই কাব্য। কাশীরামের ভাষাভঙ্গিতে ধ্রুপদী তৎসম শব্দ গ্রন্থনের নৈপুণ্যও বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। যেমন, অর্জুনের রূপবর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: "অনুপম তনুশ্যাম নীলোৎপল আভা। মুখরুচি কত শুচি করিয়াছে শোভা।। সিংহগ্রীব বন্ধুজীব অধরের তুল। খগরাজ পায় লাজ নাসিকা অতুল।। দেখ চারু যুগ্ম ভুরু ললাট প্রসর। কি আনন্দ গতি মন্দ মত্ত করীবর।।"

এছাড়াও তাঁর কাব্যের দু-একটি জায়গায় বাঙালির ঘরের কথা যেন দু-একটি রেখার টানে ফুটে উঠেছে। সভাপর্বে দ্রৌপদী ও হিড়িম্বার যে কলহ বর্ণিত হয়েছে, তা সপ্তদশ শতকের বাঙালি সমাজের দুই সতীনের ঝগড়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

চৈতন্য যুগের ভাগবত অনুবাদ

[সম্পাদনা]

রঘুনাথ ভাগবতাচার্যের শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী

[সম্পাদনা]

প্রাক্‌-চৈতন্য যুগে মালাধর বসু একমাত্র ভাগবত অনুবাদক। আর চৈতন্য-সমসাময়িক যুগে ভাগবত অনুবাদকদের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী কাব্যের রচয়িতা রঘুনাথ ভাগবতাচার্য সর্বাগ্রগণ্য।

কাব্যমধ্যে রঘুনাথ আত্মপরিচয় বিশেষভাবে কোথাও দেননি। ভণিতায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছেন "ভাগবতাচার্য" উপাধি, মাঝে মাঝে দু-একটি জায়গায় দিয়েছেন নিজের "রঘুপণ্ডিত" নামটি। বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত থেকে জানা যায়, চৈতন্যদেব গৌড় থেকে পুরীধামে প্রত্যাবর্তনের সময় বরাহনগরে রঘুনাথ নামে এক বৈষ্ণব বিপ্রের গৃহে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। তাঁর মুখে ভাগবত পাঠ শুনে চৈতন্যদেব নিজেই তাঁকে ভাগবতাচার্য উপাধি দেন। এই রঘুনাথ ছিলেন গদাধরের শিষ্য। সম্ভবত চৈতন্যদেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই তিনি ভাগবত অনুবাদের কাজ শুরু করেন।

শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী সম্পর্কে বৈষ্ণব মহাজনদের সশ্রদ্ধ উক্তি রয়েছে। কবিকর্ণপূর তাঁর গৌরগণোদ্দেশদীপিকা গ্রন্থে বলেছেন: "নির্মিত পুস্তিকা যেন কৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী। শ্রীমদ্ভাগবতাচার্য্যে গৌরাঙ্গাত্যন্ত বল্লভঃ।।" যদুনন্দন দাসের শাখনির্ণয়ামৃত গ্রন্থে রয়েছে: "বন্দে ভাবগতাচার্য্যং গৌরাঙ্গ প্রিয় পাত্রকম্‌। যেনাকারি মহাগ্রন্থো নাম্না প্রেমতরঙ্গিনী।।"

শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী অন্যান্য ভাগবত অনুবাদের মতোই পয়ার ও ত্রিপদীতে লেখা কাব্য। বিষয়সূচি বিন্যাসে ও অনুবাদে কর্মের পারিপাট্যে এই গ্রন্থে কবি যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বারোটি স্কন্ধে তিনশো বত্রিশ অধ্যায়ে আঠারো হাজার শ্লোকে নিবদ্ধ ভাগবতের যথাযথ আক্ষরিক অনুবাদ সাধারণ মানুষের পক্ষে আয়ত্ত করা যে বেশ কঠিন হবে, তা বুঝেই রঘুনাথ ভাগবতকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করার সুপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তাই ভাগবতের প্রথম নটি স্কন্ধকে সংক্ষেপিত করে তিনি শুধু মর্মানুবাদই করেছেন।

ভাগবতের এই কাহিনী অনুবাদের বিশ্বস্ততার মধ্যেই চৈতন্যদেবের প্রত্যক্ষ প্রভাবের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ষষ্ঠ স্কন্ধের অজামিল-উপাখ্যানের উপক্রমণিকা রূপে মঙ্গলাচরণে কবি পদ্যাবলির নামমাহাত্ম্যমূলক ২০ সংখ্যক যে শ্লোকটি উদ্ধৃত করেছেন, সেটি চৈতন্য-প্রচারিত ভক্তিধর্মেরই নিদর্শন। এছাড়া চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে ভাগবতের দশম স্কন্ধের অসামান্য গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কবি এই স্কন্ধের প্রারম্ভে নতুনভাবে মঙ্গলাচরণ করেছেন।

ভাগবতীয় কৃষ্ণকথার অনুবাদক হিসেবে রঘুনাথ ভাগবতাচার্য বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। দশম স্কন্ধে কৃষ্ণের জন্মলগ্ন বর্ণনায় মূল গ্রন্থে শান্ত সুন্দর স্নিগ্ধতা সঞ্চারিত হয়েছে: "নদ্যঃ প্রস্নন সলিনী হ্রদা জলরুহশ্রিয়ঃ। দ্বিজালিকুলসন্নাদস্তবকা বনরাজয়ঃ।। রবৌ বায়ুঃ সুখস্পর্শঃ পুণ্যগন্ধবহঃ শুচিঃ। অগ্নয়শ্চ দ্বজাতীনাং শান্তস্তত্র সমিন্ধত।।" রঘুনাথের অনুবাদে তা হয়েছে: "নদনদী সরোবর বিমলিত জল। বিকশিত উতপল কুমুদ কমল। খগভৃঙ্গ নিনাদিত স্তবাকিত বল।। সুললিত পুণ্যগন্ধ সুমন্দ পবন। শান্ত হৈয়া জ্বলিল দ্বিজের হুতাশন।।" মূলানুগত্য সত্ত্বেও মাঝে মাঝে ভাষাকে কবি নিজের মতো করে ব্যবহার করেছেন। যেমন প্রসন্নসলিলা তাঁর অনুবাদে "বিমলিত জল" হয়ে বাংলা ভাষার প্রবহমানতাকে রক্ষা করেছে। আবার "জলরহুশ্রিয়ঃ" শব্দকে বিস্তৃত করে তিনি করেছেন "বিকশিত উতপল কুমুদ কমল।" আবার কখনও কখনও ভাগবতের কাব্যসৌন্দর্য সুরভিত পদ থেকে কবি কেবলমাত্র ভক্তিরসাত্মক আখ্যানটুকু ছেঁকে নিয়ে অনুবাদের যথার্থতাকে বজায় রাখতে চেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে ভাগবতের দশম স্কন্ধের ৩০শ অধ্যায়ে গোপীযুগল গীতের একাংশের তুলনা করা যেতে পারে।

মূলের কাব্যসৌন্দর্য ও ধ্বনিমাধুর্য তাঁর অনুবাদে কিছুই সঞ্চারিত হয়নি। কিন্তু কথা-অংশে অবিকৃতভাবে পরিবেশিত হয়েছে। আবার কখনও কখনও অনূদিত কাহিনীকে অবিকৃত রেখেও মূল কাব্যের সৌন্দর্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছে।

তবে ভাগবতীয় কৃষ্ণকথার বিশ্বস্ত অনুবাদক হয়েও রঘুনাথ ভাগবতাচার্য এই কাব্যে তাঁর মৌলিক কবিপ্রতিভার পরিচয়ও রেখেছেন। তাঁর সময়ে পৌরাণিক কৃষ্ণকথার সঙ্গে লোকায়ত কৃষ্ণকথার মিশ্রণ বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বয়ং চৈতন্যদেব দানলীলা, নৌকালীলার গভীর অন্তরঙ্গ জীবনরসকে আধ্যাত্মিক মহিমায় মণ্ডিত করে গ্রহণ করেছেন। তার প্রমাণ চৈতন্যদেব ও তাঁর পার্ষদগণ কর্তৃক এর অভিনয়। কিন্তু এরই মাঝখানে রঘুনাথ চেষ্টা করেছেন বিশুদ্ধ ভাগবতীয় কৃষ্ণকথা প্রচারের এবং তাঁরও উদ্দেশ্য ছিল লোকসাধারণের "অশেষ দূরিত" হরণ। অর্থাৎ, এর থেকে আমরা স্পষ্টতই এই সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, লৌকিক কৃষ্ণকথার মধ্যে অনাবৃত গ্রাম্যতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার যে প্রবণতা, তাকে সব বৈষ্ণব মনে প্রাণে সেদিনও গ্রহণ করতে পারেননি।

দ্বিজ মাধবের (মাধবাচার্য) শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল

[সম্পাদনা]

দ্বিজ মাধব বা মাধবাচার্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যটির স্বীকৃতি রয়েছে বিভিন্ন বৈষ্ণব মনীষীর রচনায়। চৈতন্য-সমকালীন কবি রেবতীনন্দন মাধবাচার্যের বন্দনা করে লিখেছেন: "মাধব আচার্য্য বন্দি কবিত্ব শীতল। যাঁহার রচিত গীত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল।।" বৃন্দাবনদাস তাঁর চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: "তবে তা বন্দনা কৈল মাধব আচার্য্য। কৃষ্ণ গুণ বর্ণন সদাই যাঁর কার্য্য।। যে কৃষ্ণমঙ্গল কৈল ভাগবতামৃতে। সে গীত বিদিত হইল সকল জগতে।।" কয়েকটি বৈষ্ণব গ্রন্থে এই মাধবাচার্যকে চৈতন্য-জায়া বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর ভ্রাতা বলা হয়েছে। তবে এর বিরুদ্ধে অন্য গ্রন্থের সাক্ষ্য থেকেই শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল-রচয়িতা মাধবাচার্যকে পৃথক ব্যক্তি বলে ধরে নিতে হয়। আবার এই শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল রচয়িতা মাধবাচার্য এবং চণ্ডীমঙ্গল-রচয়িতা দ্বিজ মাধব একই ব্যক্তি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে, দ্বিজ মাধবের নামের প্রচলিত চণ্ডীমঙ্গল, গঙ্গামঙ্গল ও শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল একই ব্যক্তির রচনা। আধুনিক গবেষকদের মধ্যে এই মতটি মান্যতা পেয়েছে। শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের বিভিন্ন মুদ্রিত সংস্করণে ও পুথিতে দুটি ছত্র পাওয়া যায়: "পরাশর নামে দ্বিজকুলে অবতার। মাধব তাহার পুত্র বিদিত সংসার।।" বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ২৭৭ সংখ্যক পুথিতেও এই ছত্র দুটি রয়েছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদকে দেওয়া গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুথিতেও (পুথি সংখ্যা ১৯৫৯, লিপিকাল ১২০৪ বঙ্গাব্দ) পরাশরের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "পরাশর নামেতে আছিল দ্বিজবর। নানা গুণে পরিপূর্ণ তার কলেবর।। কবিবল্লভ বলি খ্যাতি হইল তাহার। তাঁর দুই চরণে হইলুঁ নমস্কার।।"আবার চণ্ডীমঙ্গলের সমস্ত পুথির উপক্রমে পাওয়া যায়: "পরাশর সুত হয় মাধব তার নাম। কলিযুগে ব্যাসতুল্য গুণ অনুপাম।।" গঙ্গামঙ্গলের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল-এর ভণিতার মিল খুব বেশি। গঙ্গামঙ্গলে আছে: "চিন্তিয়া চৈতন্যচন্দ্র চরণকমল। দ্বিজমাধব করে শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল।।" সুতরাং এসব প্রমাণ দৃষ্টে অনুমিত হয় তিনটি কাব্য একই ব্যক্তির রচনা। দ্বিজ মাধব রচিত চণ্ডীমঙ্গলে কবি কালজ্ঞাপন করে জানিয়েছেন: "ইন্দু বিন্দু বাণধাতা শিক নিয়োজিত। দ্বিজ মাধবে গায় সারদা চরিত।।" অর্থাৎ ১৫০১ শকাব্দ বা ১৫৭৯-৮০ খ্রিস্টাব্দ। অন্যদিকে দৈবকীনন্দনের বৈষ্ণব বন্দনায় মাধবাচার্যের উল্লেখ আছে। দৈবকীনন্দন নিত্যানন্দের প্রিয়পাত্র পুরুষোত্তমের শিষ্য। তাই তাঁর বৈষ্ণববন্দনার কাল ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্ববর্তী নয়। সুতরাং দ্বিজ মাধব অনেক আগেই কাব্যরচনা করেছিলেন বলে ধরে নিতে হয়। তাহলে উপরিউক্ত তারিখটির সঙ্গে আর বিরোধ থাকে না। অতএব এই তারিখটিকেই মাধবাচার্যের কাল বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধই কবির প্রধান অবলম্বন। তবে ভাগবতের অন্যান্য স্কন্ধ থেকে অন্যান্য কয়েকটি পুরাণ থেকেও যে তিনি উপাদান সংগ্রহ করেছেন, তা তাঁর নিজের স্বীকৃতি থেকেই জানা যায়:

  1. "রাজ রাজ অভিষেক নাহি ভাগবতে। বিস্তারি কহিব তাহা হরিবংশ মতে।।"
  2. "পারিজাত হরণ ঈষৎ ভাগবতে। বিস্তারি কহিব বিষ্ণু পুরাণের মতে।।"

এছাড়াও দানখণ্ড, নৌকাখণ্ডের মতো কিছু লোক-প্রচলিত কাহিনীও স্থান পেয়েছে মাধবাচার্যের রচনায়। তাঁর শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কেবল পয়ার-ত্রিপদীতে বদ্ধ একটি আখ্যানকাব্যই নয়, রঘুনাথ ভাগবতাচার্যের ন্যায় তাঁর কাব্যেও মাঝে মাঝে পদ সংযোজিত হয়েছে। পদগুলিতে রাগরাগিণীর উল্লেখও করেছেন কবি। শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যের প্রথম অংশে গণেশ-বন্দনায় কবি গণেশকে পরম বৈষ্ণব বলে অভিহিত করেছেন এবং চৈতন্যদেবের বন্দনা করেছেন। মঙ্গলাচরণে কবি দ্বাবিংশ অবতারের বর্ণনা করেছেন, এঁদের মধ্যে একজন গৌরাঙ্গ অবতার। চৈতন্য-পরবর্তী ভাগবত অনুবাদের বিশিষ্ট প্রবণতাই এই কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে। কবি কাব্যরচনার উদ্দেশ্য হিসেবে সর্বসাধারণের মধ্যে ভাগবতের প্রচারকেই গুরুত্ব দিয়েছেন: "ভাগবত সংস্কৃতে না বুঝে সর্বজনে। লোকভাষা রূপেতে কহিব পরমাণে।।"

কংসের অত্যাচারে পীড়িতা পৃথিবীর দেব-সন্নিধানে কাতর-আবেদন থেকে অর্থাৎ দশম স্কন্ধের একেবারে গোড়া থেকে কাহিনীর সূচনা। ভাগবতের মধ্যে শিশু কৃষ্ণ-বলরামের চাপল্যময় বাল্যলীলার নানা বর্ণনার সঙ্গে কখনও কখনও মাধবাচার্য বাঙালি মায়ের বাৎসল্য সঞ্চার করতে পেরেছেন। এগুলি তাঁর মৌলিক সৃষ্টি। যেমন, মা যশোদার কৃষ্ণ-বলরামকে স্নান করানো, ঘুমপাড়ানোর দৃশ্যগুলি এতটাই পরিচিত ও জীবন্ত যে তা পাঠকের চোখের সামনেই যেন ভেসে ওঠে।

মাধবাচার্যের অনুবাদ যেখানে সম্পূর্ণ মূলানুগ, সেখানেও কাহিনীর যথার্থতা বজায় রেখে তা স্বচ্ছন্দ ও স্পষ্টার্থক। ভাগবতের কবি ঐশ্বর্যময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিপুল বিভূতি প্রদর্শন করেছেন, আর কবি মাধবাচার্য সেই ঐশ্বর্যময় কৃষ্ণকথাকে বাঙালি লোকসাধারনের ভক্তিভাবুকতা জাগানোর উদ্দেশ্যে তুলে ধরতে গিয়ে বাংলার সজল মৃত্তিকার রং তার উপর আরোপ করেছেন। এইভাবে ভাগবতের ন্যায় বিশুদ্ধ পৌরাণিক কৃষ্ণকথা ধীরে ধীরে বাঙালির প্রানের কথা হয়ে উঠেছে। তবে কবি তাঁর কাব্যে প্রথমে রাধাকৃষ্ণের বর্ণনা করলেও কালীয়দমন লীলায় শোকার্ত গোপিনীদের মধ্যে রাধার নাম করেননি, যদিও বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে এই প্রসঙ্গে রাধার নাম রয়েছে। ভাগবতের বস্ত্রহরণ লীলা প্রসঙ্গেও কবি রাধার নাম করেননি। কিন্তু এর পরেই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর অনুরূপে দানলীলার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যের দানখণ্ডের সঙ্গে এই কাহিনীর হুবহু মিল নেই। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর বড়ায়ি রাধার শাশুড়িকে বলেছেন রাধাকে দিয়ে দই-দুধ বিক্রি করানোর কথা। কিন্তু এই কাব্যে গোপিনীরা নিজেরাই শাশুড়ি ও স্বামীর কাছে এই প্রসঙ্গ তুলেছে এবং তাদের মধ্যে রাধাও রয়েছেন। এছাড়া কবি তাঁর কাব্যে রাধাকে প্রধানা গোপিনী বলে অভিহিত করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ চন্দ্রাবলী রাধারই আর এক নাম। কিন্তু মাধবাচার্যের কাব্যে চন্দ্রাবলী রাধার একজন সখী। এখানেও বড়াই চরিত্রটি উপস্থিত। তবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর মতো তাঁর ভূমিকা এখানে সক্রিয় নয়, যেটুকু ভূমিকা রয়েছে তাও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর বিপরীত। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধা ও গোপীদের মিলনের সময় বড়াই বাধা দিয়েছে। কোনও প্রকার সহায়তা করেনি। দানলীলার সঙ্গে নৌকালীলাও এই কাব্যে বর্ণিত হয়েছে। তবে নৌকালীলার কাহিনীতে একটু অভিনবত্ব আছে। ঝড়ের সময় গোপিনীরা নৌকার ভার হাল্কা করার জন্য কৃষ্ণের পরামর্শে বস্ত্রালংকার জলে ফেলে দিলেন। কিন্তু তারপর গোপিনীরা কৃষ্ণের কাছে বস্ত্র ও অলংকার ফেরত চাইলে তিনি যমুনাকে সমস্ত বস্ত্র ও অলংকার ফিরিয়ে দেওয়ার দেশ করলেন, যমুনাও সেই আদেশ পালন করে গোপিনীদের সব ফিরিয়ে দিলেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর নৌকাখণ্ডে এই প্রসঙ্গ নেই। নৌকালীলা বর্ণনার পর কবি আবার ফিরে গিয়েছেন ভাগবতীয় কৃষ্ণলীলা বর্ণনায়।

ভাগবতকার রাসলীলার তীব্র আদিরসকে সমুচ্চ আধ্যাত্মিক মহিমায় মণ্ডিত করেছেন এবং এর মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বর্যেরও চরম প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু দ্বিজ মাধব তাঁর কাব্যে নিজেই বিবৃতিকার। তাই রাসলীলা যে লৌকিক দৃষ্টিতে বিচার করলে চলবে না, তা তিনি নিজেই বলেছেন। শুকদেবের মুখ দিয়ে বিবৃত করেননি।

কৃষ্ণের কাছে রুক্মিনীর বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে প্রেরণ ও কৃষ্ণের রুম্নিনী হরণের বিবরণে মাধবাচার্য বিস্তস্তভাবেই ভাগবতকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু ভাগবতের দশম স্কন্ধের ৫৪শ অধ্যায়ের শেষদিকে কৃষ্ণ-রুক্মিনীর বিবাহ প্রসঙ্গ অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ দ্বিজ মাধবের কাব্যে এর সুবিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। বাঙালি হিন্দু বিবাহের একটি চমৎকার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এই উপলক্ষ্যে কবি দিয়ে ফেলেছেন। ভাগবতানুসারী কৃষ্ণকথা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি তারই মধ্যে বাঙালি পরিবারের একটি অপরিহার্য বিষয়কে অবলম্বন করে গার্হস্থ্যরস পরিবেশন করেছেন। তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তার মূলে এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী উপাদান।

বাৎসল্যরস সৃষ্টিতে, বিশেষত পুত্রহারা জননীর বেদনা প্রকাশে কবি বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য অংশেও, যেমন হরিবংশের বজ্রনাভ প্রসঙ্গ বর্ণনায় কবি নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

মাধবাচার্যের ভণিতায় চৈতন্যদেবের উল্লেখ বহুবার রয়েছে। যেমন:

  1. "কলিযুগে শ্রীচৈতন্য/ প্রেমরসে ধন্য/ দ্বিজ মাধব কহে সার।।"
  2. "চৈতন্য চরণ ধন/ শিরে করি আভরণ/ ভূদেব মাধব ভাসে।।"
  3. "চৈতন্য চরণে মাধব গান"
  4. "অবতার শেষ/ চৈতন্য প্রকাশ/ মাধব কহে সঙ্গীতি।।
  5. "শেষ অবতার শ্রীচৈতন্য শ্রীপাদে। অনন্ত মূরতি গোসাঞি হয় যুগবেদে।। যাহার প্রসাদে নৃত্য কীর্তন প্রচার। কহে দ্বিজ মাধব সেই জগতনিস্তার।।"
  6. "কলিযুগে চৈতন্য সেই অবতার। দ্বিজ মাধব কহে বিষ্কর তাহার।।"

রঘুনাথ ভাগবতাচার্যের শ্রীকৃষ্ণপ্রেমতরঙ্গিনী গ্রন্থে ভাগবতের যে অবিকল বিশুদ্ধি রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে, তা মাধবাচার্যের শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্যে রক্ষিত হয়নি। অন্যান্য পুরাণ থেকে যেমন কবি আখ্যান সংগ্রহ করেছেন, তেমনই লৌকিক উপাদান থেকেও তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তু আহরিত হয়েছে। অর্থাৎ, কবি কৃষ্ণকথাকে সর্বতোভাবে লোকসাধারণের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবে।

দুঃখী শ্যামদাসের গোবিন্দমঙ্গল

[সম্পাদনা]

দুঃখী শ্যামদাসের গোবিন্দমঙ্গল কাব্যটি ভাগবত পুরাণেরই অনুবাদ। দ্বিজ মাধবের ন্যায় তিনিও প্রধানত ভাগবতের দশম স্কন্ধ অবলম্বন করেছেন এবং প্রথম দুই স্কন্ধ ও শেষ স্কন্ধ থেকেও প্রয়োজন অনুসারে কথাবস্তু সংগ্রহ করেছেন। দ্বিজ মাধব যেমন অল্প হলেও তাঁর কাব্যে হরিবংশ ও বিষ্ণুপুরাণের কথা গ্রহণ করেছেন, তেমনই দুঃখী শ্যামদাসও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে কোনও কোনও কাহিনী গ্রহণ করে তাঁর কাব্যে বিবৃত কৃষ্ণকথায় বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছেন।

দুঃখী শ্যামদাসের জন্ম অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত কেদারকুণ্ড পরগনার হরিপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন দে পদবীধারী কায়স্থ-বংশীয়। অবশ্য কাব্যে তিনি সর্বত্রই দাস উপাধিটি ব্যবহার করেছেন। সম্পাদক ঈশানচন্দ্র বসু কাব্যের মুদ্রিত সংস্করণের ভূমিকায় বলেছেন যে, উনিশ শতকের শেষদিকেও কবির বাস্তুভিটেতে তাঁর অধস্থন একাদশ পুরুষ সীতানাথ অধিকারী বাস করতেন। প্রতি তিন পুরুষে একশো বছর ধরা হলে কবির আবির্ভাবকাল হয় ষোড়শ শতকের মধ্যভাগ। ড. সুকুমার সেনের মতে, কবির পিতা শ্রীসুখ ছিলেন কাশীরাম দাসের খুল্ল-পিতামহ। তিন পুরুষে একশো বছরের হিসাব অনুসরণ করে তিনিও কবিকে ষোড়শ শতকের মধ্যভাগেই স্থাপন করতে চেয়েছেন। সুতরাং একথা বলা যায় যে, দুঃখী শ্যামদাস ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কিংবা শেষদিকে গোবিন্দমঙ্গল রচনা করেছিলেন।

কাব্যের গোড়ায় কবি ভাগবতের প্রথম স্কন্ধ থেকে পরীক্ষিতের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। পরে ভাগবতের অনুসরণে শুকদেবের মুখ দিয়ে কৃষ্ণকথা উচ্চারিত হয়েছে পরীক্ষিতকে শোনানোর জন্য। এখানেই দ্বিজ মাধবের সঙ্গে দুঃখী শ্যামদাসের পার্থক্য। দ্বিজ মাধব তাঁর বক্তব্য শুকদেবের মুখ দিয়ে বর্ণনা না করে সরাসরি বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, তিনি ভাগবত থেকে শুধুমাত্র কৃষ্ণকথার সারটুকুই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে দুঃখী শ্যামদাস কৃষ্ণকথা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে ভাগবতীয় আবহওটিকেও তাঁর কাব্যে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। তবে পুরাণকথার আক্ষরিক অনুবাদ না করে নিজস্ব প্রবণতা অনুযায়ী সেগুলি সংক্ষেপিত, বিস্তৃত বা পরিবর্তিত করে নিয়েছেন তিনি। যেমন, কলি ও ধর্মের সঙ্গে রাজার সাক্ষাৎ এবং কলিদমনের আখ্যান ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের সপ্তদশ অধ্যায় থেকে গৃহীত। ভাগবতে আছে, কলির হাতে নিগৃহীত একপদধারী বৃষরূপী ধর্মকে পরীক্ষিত তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে ধর্ম প্রত্যক্ষভাবে পরিচয় না দিয়ে রাধাকে বুঝে নিতে বলেছেন। কিন্তু দুঃখী শ্যামদাসের কাব্যে ধর্ম নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছেন:

শুন রাজা বিবরণ
আমি ধর্ম নিরঞ্জন
কলিভয়ে পাইল তাড়না।

পুতনা-বধ প্রসঙ্গেও কবি ভাগবতের হুবহু অনুকরণ না করে নিজস্ব কল্পনার প্রয়োগে কাহিনীটিকে বাস্তবানুগ করে তুলেছেন। ভাগবতে আছে, পুতনাকে দেখে যশোদা ও রোহিণী এতই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, সে কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিলে তাঁরা নিবারণ করতে পারেননি। কিন্তু শ্যামদাসের কাহিনীতে আছে পুতনা “যশোদার কাছে কহে সকরুণ হেয়া”:

আমার দুঃখের কথা না যায় কথন।
পুত্রশোকে তেয়াগিনু আপনা ভবন।।...
শুন গো সুন্দরী তব আছয়ে কুমার।
স্তনপান দিয়া থাকি যদি দেহ ভার।।

পুতনার এই কথা শুনে যশোদা রোহিণীর সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করলেন, “যাদুয়ার ধাত্রী করি রাখিব ইহারে।” এই কাহিনী অনেক বেশি মানবিক ও বাস্তবসম্মত। নিঃসন্দেহে এই কবিরও বৈশিষ্ট্য বাঙালি প্রবণতার পরিচায়ক। ভাগবতের অনুসারী কৃষ্ণমঙ্গল কাব্যগুলির অবলম্বিত কৃষ্ণকথা যে ধীরে ধীরে বাঙালির নিজস্ব প্রবণতায় অনুরঞ্জিত হয়ে উঠছিল, উদাহরণটি তারই সাক্ষ্য দেয়।

কৃষ্ণের বাল্যলীলার বর্ণনায় কবি রাধার প্রতি বালক কৃষ্ণের আদিরসাত্মক আচরণের ভাগবত-বহির্ভূত চিত্র অঙ্কন করেছেন:

কবরী খসায় কৃষ্ণ পাইল কৌতুকে।
কাঁচলি চিরিয়া নখে কুচযুগ দেখে।।
রাধার বলে না জানিয়া কোলে কৈনু কেনে।
শিশু মূর্তি দেখিতে এমন কেরা জানে।।

রাধা ও কৃষ্ণের প্রথম মিলনের চিত্রটি অবশ্য তাঁর কাব্যে মনোরম:

রাধা কানু আঁখি আঁখি হৈল দরশন।
মুখে মৃদু হাসি রাধা ঝাঁপিল বসন।।

দুঃখী শ্যামদাসের কাব্যে বড়াই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর বড়ায়ির মতোই রাধা-কৃষ্ণের প্রেমে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। তার বর্ণনাও বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যের অনুরূপ। এখানেও বড়াই কৃষ্ণের দূতী হয়ে রাধার কাছে গিয়েছে, তবে রাধা বড়াইকে প্রত্যাখ্যান করলেও অপমান করে তাড়িয়ে দেয়নি এবং অবশেষে বড়াইর প্ররোচনাতেই তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হতে রাজি হয়েছেন। দুঃখী শ্যামদাসের কাব্যেও রাধা-কৃষ্ণের মামী-ভাগিনেয় সম্পর্কটি বজায় আছে। তবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর রাধার মতো তাঁর রাধা সাগর গোয়ালার মেয়ে নয়, বরং “বৃষভানু রাজার নন্দিনী”। নৌকালীলার বর্ণনাও কবি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এর অনুসরণেই করেছেন। তবে বড়ু চণ্ডীদাসের কাব্যে নৌকাখণ্ডে গোপিনীরা কৃষ্ণানুরক্তা ছিলেন না। কিন্তু এখানে কৃষ্ণ রাধাকে নিয়ে জলে ডুবে গেলে গোপিনীদের এই বলে আক্ষেপ করতে শোনা গিয়েছে:

কামনা করিয়া পূর্বে গোপিকা হয়েছি এবে
সাধ আছে ভক্তির মুরারি।
আমা সবা ভাগ্যে নাই সৌভাগ্যে সুন্দরী রাই
সেই সে নিদানে পাইল হরি।।

কবি রাধাকৃষ্ণ-লীলাকথার এই লোকরঞ্জক অংশটিকে সুকৌশলে ভাগবতের মধ্যে টেনে এনেছেন। তাঁর কাব্যে এই অংশটিরও শ্রোতা পরীক্ষিত ও বক্তা শুকদেব।

রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনার ক্ষেত্রে কবি পদ্মপুরাণের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন। কবি যে যোগপীঠের বর্ণনা দিয়েছেন, তা পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের অনুকরণে রচিত।

দ্বিজ মাধবের ভণিতায় বারবার চৈতন্যপ্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু দুঃখী শ্যামদাসের কাব্যে তা না থাকলেও আখ্যানবর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে পদরচনা নিঃসন্দেহে চৈতন্য-পরবর্তী সাহিত্যের প্রভাব। ভাগবতীয় কৃষ্ণকথা আপামর বাঙালির কাছে পরিবেশন করতে গিয়ে তিনি ভাগবতের সরল বঙ্গানুবাদের সঙ্গে মিশিয়েছেন লোকপ্রচলিত রাধাকৃষ্ণ-প্রেমকথা, আর সেই যঙ্গে যুক্ত করেছেন পদাবলীর গীতিরস ও ভাবগভীরতা। এইভাবে কেবলমাত্র বিবৃতিধর্মিতা পরিহার করে কৃষ্ণকথা হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের আস্বাদনীয় মাধুর্যময় এক কাব্যসাহিত্য।