বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/চর্যাপদ
বিশ শতকের গোড়ায় চর্যাপদের আবিষ্কার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চর্যাপদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রাচীন বাংলার এক অমূল্য লুপ্ত সম্পদের খোঁজ পাওয়া যায়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রাচ্যবিদ্যার বিশিষ্ট গবেষক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর। কিন্তু তাঁর চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় পুথি আবিষ্কারের পিছনে বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতি চর্চার একটি ইতিহাস আছে। উনিশ শতকে বাংলায় যে নবজাগরণ ঘটেছিল, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই ছিল দেশের অতীত ইতিহাসের ভাবসম্পদ পুনরুদ্ধার ও তার নবমূল্যায়ন। এর সূচনা ঘটেছিল ১৭৮৪ সালে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। প্রথম দিকে কেবল ইউরোপীয় গবেষকেরাই প্রাচীন ভারতের লুপ্ত সম্পদ উদ্ধারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। যেমন, বি. এইচ. হজসন ও ড্যানিয়েল রাইট উনিশ শতকের প্রথমার্ধে নেপাল থেকে কিছু প্রাচীন পুথি উদ্ধার করে ইউরোপের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেরণ করেন, যার ফলে ইউরোপীয় গবেষকেরা ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চায় উৎসাহী হয়ে উঠতে শুরু করেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি গবেষকেরাও এই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গবেষক রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপালে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কিছু পুথি উদ্ধার করে আনেন এবং দ্য সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার ইন নেপাল (১৮৮২) শীর্ষক পুস্তিকায় সেগুলির নাম প্রকাশ করেন। ১৮৯২ সালে শরৎচন্দ্র দাসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় বুদ্ধিস্ট টেক্সট সোসাইটি। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর প্রাচীন পুথি উদ্ধারের ভার গ্রহণ করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে নেপালে গিয়ে বৌদ্ধধর্ম-বিষয়ক কয়েকটি সংস্কৃত পুথি তিনি কলকাতায় নিয়ে আসেন। এরপর ১৯০৭ সালে তৃতীয়বার নেপাল যাত্রা করে তিনি নেপালের রাজদরবারের পুথিশালা থেকে আবিষ্কার করেন চর্যাপদের প্রাচীন পুথি চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, সরহপাদের দোহাকোষ ও কাহ্নপাদের দোহাকোষ। এই তিনটি পুথির সঙ্গে পূর্বাবিষ্কৃত ডাকার্ণব পুথিটিকে যুক্ত করে শাস্ত্রী মহাশয় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে নিজের সম্পাদনায় প্রকাশ করেন হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা গ্রন্থটি। ভূমিকায় তিনি চারটি পুথির ভাষাকেই বাংলা বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ভাষাতাত্ত্বিকেরা কেবল চর্যাগীতিগুলির ভাষাকেই বাংলা বলে স্বীকৃতি দেন। সেই দিক থেকে প্রাচীনতম বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন হল এই চর্যাপদ।
চর্যাপদের পুথি তালপাতায় লেখা হয়েছিল। নেপাল থেকে আনা পুথি আবার রাজদরবারে ফেরত দেওয়ার আগে শাস্ত্রী মহাশয় সেটির অনেকগুলি ফোটোকপি করে নিয়েছিলেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, তালপাতার উভয় পৃষ্ঠাতেই পদগুলি লেখা হয়েছে। প্রতি পৃষ্ঠায় আছে পাঁচটি করে টানা লাইন। মাঝখানে সামান্য একটু ফাঁক, সম্ভবত সেখানে ফুটো করে সুতো বা ওই জাতীয় কিছু পরাবার জন্য। পাতাগুলি সংখ্যাযুক্ত এবং সংখ্যাটি লিখিত পাতার শেষ পৃষ্ঠায়। এইভাবে প্রাপ্ত পুথির শেষ পাতার অঙ্ক ৬৯। কিন্তু তার পরেও যে পুথি বাকি ছিল তার প্রমাণ ওই পাতার পদটি অসমাপ্ত থেকে যাওয়ায়। শুধু শেষ পাতা নয়, মাঝের ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ ও ৬৬ সংখ্যক পাতাগুলিও পাওয়া যায়নি। লুপ্ত পাতা বাদে প্রাপ্ত পুথিটি মোট ৬৪ পৃষ্ঠার। পুথিটিতে আরও একধরনের ক্রমিক সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে, যেটি মোট পদের সংখ্যা নির্দেশক। বলা বাহুল্য, লুপ্ত পাতার পদগুলি পাওয়া যায়নি। এই রকম অপ্রাপ্ত পদের সংখ্যা সাড়ে তিনটি। শেষ পাতার যে পদসংখ্যা পাওয়া যায় সেটি ৪৯। সেখানেই শুরু হয়েছে ৫০ সংখ্যক পদটি, যার বাকি অংশ লুপ্ত পাতার সঙ্গেই হারিয়ে গিয়েছে। মুনিদত্তের টীকার সূত্রে জানা যায়, কোনও একটি শতপদী সংকলন থেকে অর্ধেক সংখ্যক পদ নিয়ে সেটির টীকা রচনার উদ্দেশ্যে এই গ্রন্থের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ চর্যার পুথিটি ছিল মোট ৫০টি পদের সংকলন। সাড়ে তিনটি পদ না পাওয়ায় প্রাপ্ত পদের সংখ্যা এখানে সাড়ে ছেচল্লিশ। অবশ্য পরবর্তীকালে এই গ্রন্থের তিব্বতি অনুবাদ পাওয়া গিয়েছে। অনুবাদক ছিলেন কীর্তিচন্দ্র। সেই পুথিটি অক্ষত। তার থেকে লুপ্ত সাড়ে তিনটি পদের বিষয় ও তার ব্যাখ্যা জানা গিয়েছে।
টীকার পুথিটি সংকলনে একটি বিশেষ রীতি অবলম্বিত হয়েছে। এখানে একই সঙ্গে মূল গান ও তার টীকা দেওয়া হয়েছে। সাধারণত টীকার পুথিতে মূল গান সম্পূর্ণ উদ্ধৃত হয় না। কিন্তু এখানে তার ব্যতিক্রম দেখা যায়। সমগ্র পদ উদ্ধৃত করে টীকাকার পরে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পদগুলি বাংলা ভাষায় লেখা, টীকার ভাষা সংস্কৃত। টীকার নাম নির্মলগিরা টীকা। টীকাকারের নাম মুনিদত্ত। গানগুলি একক পদকর্তার নয়, বিভিন্ন জনের রচনা। প্রত্যেকটি পদের সূচনায় রাগের উল্লেখ ও পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। তারপর দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ পদটি। সব শেষে রয়েছে তার ব্যাখ্যা বা টীকা। টীকার পরে আছে গানের ক্রমিক সংখ্যা। অবশ্য গ্রন্থসূচনার পদটিতে একটু ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োগ লক্ষিত হয়। প্রথমে নমস্ক্রিয়ার পর সদ্গুরু বন্দনা ও বস্তুনির্দেশ, তারপর “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল” পদটির দ্বারা মূল চর্যাগীতির আরম্ভ। তারপর গানটির রাগের উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য ধরনের ব্যতিক্রমও দেখা যায়। যেমন, ৯ সংখ্যক পদে চর্যাকারের নাম উল্লিখিত হয়নি, যদিও গানের মাঝে ভণিতা থেকে জানা যায় এটি কাহ্নপাদের রচনা। ১০ সংখ্যক চর্যার পরে টীকাকার বা লিপিকর লিখে রেখেছেন, “লাড়ীডোম্বীপাদানাম্ সূনেত্যাদি। চর্য্যায়া ব্যাখ্যা নাস্তি।” অর্থাৎ এখানে অপেক্ষিত ব্যাখ্যাটি নেই। তাছাড়া মূল গানগুলির পাঠ ও টীকায় উদ্ধৃত অংশগুলির পাঠে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। তাই কোনও কোনও গবেষক মনে করেন, মূল গান সংকলন ও তার টীকা রচনা দুই স্বতন্ত্র ব্যক্তির কাজ। আবার কেউ কেউ অনুমান করেন, মুনিদত্তের টীকা পরে কারও দ্বারা পরিমার্জিত হয়েছিল। সেই পরবর্তী সংস্কার-কর্তাও অন্য কোনও গীতিসংগ্রহ থেকে মূল গানগুলিকে নিয়ে ব্যাখ্যার আগে সংযোজিত করে থাকতে পারেন। টীকারম্ভের প্রথম বাক্যটি রচনা এবং গানের সূচনায় কবি ও রাগরাগিণীর নামের উল্লেখ সম্ভবত এই সংস্কার-কর্তারই কাজ। পুথির পাঁচটি পাতা হারিয়ে যাওয়ায় ২৩ সংখ্যক গানের ছটি চরণ এবং ২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক গান সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে ২৩ ও ২৪ সংখ্যক গানের সম্পূর্ণ টীকা এবং ২৫ সংখ্যক গানের টীকার প্রথমাংশটিও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে ৪৭ সংখ্যক গানের ব্যাখ্যার সামান্য অংশ হারিয়ে গিয়েছে এবং ৪৮ সংখ্যক গানের শেষ পদটির ব্যাখ্যা ছাড়া গান সহ সমগ্র টীকাটিই লুপ্ত। তিব্বতি অনুবাদটির আবিষ্কারক ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী গানগুলি সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। পরে তিব্বতি অনুবাদের ছায়া অনুসরণে ড. সুকুমার সেন লুপ্ত গানগুলির সম্ভাব্য রূপ পুনর্গঠন করে তাঁর সম্পাদিত চর্যাগীতি পদাবলী গ্রন্থে প্রকাশ করেন।
রচনাকাল ও গ্রন্থনাম বিচার
[সম্পাদনা]১৯১৬ সালে হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর নানা বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। ফলে অনেক রকম বিতর্ক সৃষ্টি হয়। চর্যাগীতির ভাষা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যেমন মতান্তর ছিল, তেমনই এগুলির রচনাকাল ও প্রাপ্ত পুথির প্রকৃত নাম নিয়েও ছিল নানা সংশয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দাবি করেছিলেন, গানগুলির রচনাকাল খ্রিস্টীয় দশম শতক এবং সেই কারণেই সম্পাদিত গ্রন্থের নামে তিনি ‘হাজার বছরের পুরাণ’ এই সময়-জ্ঞাপক বিশেষণটি জুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সকলে সেই কথা নিঃসন্দিগ্ধভাবে মেনে নিতে চাননি। সামগ্রিক দৃষ্টিতে চর্যাপদের রচনাকাল নিয়ে দুটি প্রশ্ন ওঠে। প্রথম প্রশ্ন, চর্যার মূল গানগুলি কোন সময়ে লেখা হয়েছিল? এবং দ্বিতীয় প্রশ্ন, টীকা-সম্বলিত যে সংগ্রহটি পাওয়া গিয়েছে, সেটিই বা কোন সময়ে লেখা হয়? মুনিদত্তের টীকা অনুসারে বলা যায়, গানগুলি আগে লেখা হয়েছিল এবং পরে তার থেকে কয়েকটি গান বেছে নিয়ে সেগুলির ব্যাখ্যা রচিত হয়। তাই প্রথম প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হবে দুটি প্রশ্নের নিরিখে। প্রথমত, চর্যাকারেরা কবে আবির্ভূত হন? এবং দ্বিতীয়ত, ভাষাতত্ত্বের নিরিখে চর্যায় প্রাপ্ত ভাষার জন্ম কোন সময়ে? বিভিন্ন গবেষক এই দুই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করেছেন।
ইতিহাস-বিস্মৃত জাতির বাস্তব ঐতিহাসিক সকল ঘটনারই লিখিত ইতিহাস পাওয়া সম্ভব নয়। এই কারণেই চর্যাপদ, চর্যাপদের কবিগণ, তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু এবং সেই সংক্রান্ত তারিখ-যুক্ত কোনও তথ্য পাওয়া কঠিন। তাই জনশ্রুতি, কল্পকাহিনি ও লোকপরম্পরাগত ঐতিহ্য সত্যাসত্য নির্বিশেষে সেই শূন্যস্থান ভরিয়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে। চর্যাকারেরা নিছক কবি বা গীতিকার ছিলেন না, ছিলেন বৌদ্ধধর্মের এক বিশেষ ধারার সাধক। সেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে তাঁর খ্যাত হয়েছিলেন সিদ্ধাচার্য নামে। তাঁদের নিয়ে তাই নানা অলৌকিক জনশ্রুতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সেগুলি সংগ্রহ করে পরবর্তীকালে কিছু গ্রন্থও রচিত হয়। সুম্পাখন্পো-র Pag Sam Jon Zang ও লামা তারানাথের Khabad Dun Dan হল তিব্বতি ভাষায় লেখা এই সংক্রান্ত দুটি গ্রন্থ। ভারতেও সিদ্ধাচার্যদের নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত ছিল। ভারতে যোগী সিদ্ধসাধকদের আবির্ভাব ঘটে। নাথপন্থা ও সহজযান বৌদ্ধধর্মের মধ্যে যে তাত্ত্বিক এবং দেহসাধনা ও যোগাচারকেন্দ্রিক ক্রিয়াকাণ্ডগুলির আদান-প্রদান ঘটেছিল তার অজস্র প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দেহসাধনা এই উভয় মতেরই ভিত্তিস্বরূপ। নাথপন্থীদের সাধন-সংক্রান্ত গ্রন্থে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের নাম পাওয়া যায়। ‘চৌরাসী সিদ্ধ’ অর্থাৎ চুরাশিজন সিদ্ধাচার্যেরা মধ্যে ছিয়াত্তর জনের নাম পাওয়া যায় চতুর্দশ শতকের মৈথিল কবি জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের বর্ণনরত্নাকর গ্রন্থে। এছাড়া তন্ত্রগ্রন্থ কৌলজ্ঞাননির্ণয় এবং নাথপন্থীদের গুরুশিষ্য-পরম্পরা সম্পর্কিত গ্রন্থাদিতেও সিদ্ধাচার্যেরা কথা অল্পবিস্তর বর্ণিত হয়েছে। ড. জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী তাঁর চর্যাগীতির ভূমিকা গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, জনশ্রুতিগুলি যে সব ক্ষেত্রে কল্পনাপ্রসূত নয়, তার একাধিক প্রমাণ রয়েছে। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে এই লোকপরম্পরাগত ঐতিহ্যের মিল যথেষ্টই আছে।
চর্যাগীতির রচনাকাল বিষয়ে তিনজন বিশিষ্ট গবেষক তিনটি পৃথক মত প্রকাশ করেছেন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ গ্রন্থে বিভিন্ন সম্ভাব্য যুক্তি প্রদর্শন করে মন্তব্য করেছেন, “The period 950-1200 A.D. would thus seem to be a reasonable date to give to these poems.” অর্থাৎ তাঁর মতে দশম শতকের মধ্যভাগ থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সময়কালে চর্যাগীতিগুলি রচিত হয়েছিল। সময় নির্ধারণে তিনি আদি সিদ্ধাচার্য লুইপাদ ও শেষ সিদ্ধাচার্য কাহ্নপাদের জীবৎকালকে প্রমাণস্বরূপ ধরেছেন। এই দুই কবির জীবনেতিহাস স্পষ্ট নয়। কিংবদন্তিই এক্ষেত্রে মুখ্য আশ্রয়। সিদ্ধাচার্যদের একটি গুরুশিষ্য-পরম্পরা ছিল। তিব্বতি ঐতিহ্যে লুইপাদ প্রথম গুরু বা আদি সিদ্ধাচার্য। মুনিদত্তের টীকাতেও লুইপাদকে সেই সম্মান জানিয়ে বলা হয়েছে “শ্রীলূয়ীচরণাদিসুদ্ধ রচিতেঽপ্যাশ্চর্য্যচর্য্যাচয়ে…” এবং তাঁর পদ দিয়েই গ্রন্থারম্ভ করা হয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন যে, বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান লুইপাদের অভিসময়বিহঙ্গ গ্রন্থ রচনায় সাহায্য করেছিলেন। দীপঙ্কর ১০৩৮ সালে বিক্রমশীলা বিহার থেকে তিব্বতি যাত্রা করেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৫৮। সেই হিসেবে লুইপাদের আবির্ভাবকাল তাঁর মতে দশম শতকের মাঝামাঝি। অন্যদিকে ঐতিহ্য অনুসারে কাহ্নপাদ ছিলেন জালন্ধরীপাদের শিষ্য। কাহ্নপাদ রচিত ৩৬ সংখ্যক চর্যাগীতিটিতেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কাহ্নপাদ চর্যাগীতি ছাড়াও আরও অনেক গ্রন্থ রচনা করেন, যেগুলির মধ্যে অন্যতম হেবজ্রপঞ্জিকাযোগরত্নমালা। এই গ্রন্থটির অনুলিপির কাল জানা গিয়েছে। রাজা গোবিন্দপালের ৩৯ রাজ্যাঙ্ক অর্থাৎ ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটির অনুলিপি করা হয়। তাই সুনীতিকুমার দ্বাদশ শতককেই চর্যাগীতির সময়সীমা ধরতে চান। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই গবেষকেরা বিরুদ্ধ যুক্তি দিয়েছেন। তাঁদের মতে, দীপঙ্কর সম্পর্কে শাস্ত্রী মহাশকের উক্ত তথ্যের তেমন কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। পি. কর্ডিয়ার তেঙ্গুর গ্রন্থমালার যে তালিকা দিয়েছেন, তাতে লুইপাদ ও দীপঙ্কর উভয়ের নামেই অভিসময়বিহঙ্গ গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। আসলে লুইপাদের এই গ্রন্থটি এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ রচনা, যা অন্যান্য বৌদ্ধ পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তেঙ্গুর তালিকা থেকে জানা যায় যে, কম্বলাম্বরপাদ, প্রজ্ঞারক্ষিত, সুমতিকীর্তি, প্রভাকরগুপ্ত, রত্নবজ্র, দানশীল, বিভূতিচন্দ্রের ন্যায় অসংখ্য বৌদ্ধ পণ্ডিত এই গ্রন্থটির উপর নানা সময়ে বৃত্তি, ক্রম, মঞ্জরী, টীকা ইত্যাদি রচনা করেন। দীপঙ্করের নাম এভাবেই উল্লিখিত হতে পারে। তিনি লুইপাদকে সরাসরি গ্রন্থরচনায় সাহায্য করেননি, বরং লুইপাদের গ্রন্থটির অনুবাদ করেছিলেন মাত্র। অন্যদিকে কাহ্নপাদের গ্রন্থটির অনুলিপির কাল ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দ স্থিরীকৃত হলেও অনুলিপির সময় যে লেখকের জীবৎকালের কাছাকাছি হবেই এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। ষোড়শ শতকের কোনও গ্রন্থের অনুলিপি অষ্টাদশ শতকেও হতে দেখা গিয়েছে। এইসব বিরুদ্ধ যুক্তির বলে সুনীতিকুমারের সিদ্ধান্ত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় মতের প্রবক্তা হিন্দিভাষী পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন। তিনি দোহাকোষ-এর ভূমিকায় লিখেছেন যে, সিদ্ধাচার্যেরা আবির্ভূত হয়েছিলেন অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে। তিনি আরও মনে করেন যে, লুইপাদ নন, আদি সিদ্ধাচার্য ছিলেন রাহুলভদ্র সরহপাদ, যিনি বৌদ্ধ আচার্য শান্তরক্ষিতের সমসাময়িক ছিলেন। শান্তরক্ষিত ভোট সম্রাট খি স্রোঙ দে চন্-এর রাজত্বকালে (৭৫৫—৭৮০ খ্রিস্টাব্দ) রাজার আহ্বানে তিব্বতে গিয়েছিলেন। আর-একটি প্রমাণ হল, সরহপাদের শিক্ষক ছিলেন নালন্দার পণ্ডিত ধর্মকীর্তি, যিনি শান্তরক্ষিতের শিষ্য এবং গৌড়াধিপতি ধর্মপালের (রাজত্বকাল ৭৭০—৮১৫ খ্রিস্টাব্দ) বন্ধু। এইসব তথ্যের ভিত্তিতে সরহপাদকে অষ্টম শতকের ব্যক্তি বলে গণ্য করা চলে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, লুইপাদ ছিলেন সরহপাদের প্রশিষ্য—সরহপাদের শিষ্য শবরপাদ, তাঁর শিষ্য লুইপাদ। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী কর্তৃক ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত জার্নাল অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট অফ লেটারস (২৮শ খণ্ড) থেকে জানা যায় যে, সরহপাদের দোহাগুলি ‘বিনষ্ট-প্রণষ্ট’ (‘বিণট্ঠা-পণট্ঠা-পউ’) হতে দেখে দিবাকর চন্দ নামে এক পণ্ডিত ২২১ নেপাল সম্বৎ অর্থাৎ ১১০১ খ্রিস্টাব্দে সেগুলি একটি পুথিতে সংকলিত করেন: “সমস্তো জহালব্ধা দোহাকোসো এসো সংহহিত্ত… পণ্ডিত সিরি দিবাকর চন্দেনেত্তি। সম্বৎ ২২১ শ্রাবণ শুক্লপূর্ণমাস্যাং।” এই বিষয়টিও পরোক্ষে প্রমাণ করে যে সরহপাদ খুব প্রাচীন সময়ের কবি; নইলে দ্বাদশ শতকের সূচনাতেই তাঁর দোহাকোষ বিনষ্ট হতে পারে না।
তৃতীয় মতটি দিয়েছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁর মতে চর্যাপদ রচনার সূচনা সপ্তম শতকে। এই মতের ব্যাখ্যায় তিনি ২১ সংখ্যক গানের টীকায় মুনিদত্ত মীননাথের লেখা একটি গানের কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন: “কহন্তি গুরু পরমার্থের বাট।/ কর্মকূরঙ্গ সমাধিকপট।।” মীননাথ নাথগুরুদের অন্যতম এবং উদ্ধৃত অংশটি লেখা হয়েছে আদি স্তরের বাংলা ভাষায়। মীননাথই মৎস্যেন্দ্রনাথ নামে পরিচিত। ড. শহীদুল্লাহ এঁকেই লুইপাদ বলে ধরেছেন। ফারসি গবেষক সিলভ্যাঁ লেভি লে নেপাল (১ম খণ্ড) গ্রন্থে বলেছেন, মৎস্যেন্দ্রনাথ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে রাজা নরেন্দ্রদেবের রাজত্বকালে নেপালে গিয়েছিলেন। ড. শহীদুল্লাহ এই তথ্যের ভিত্তিতে চর্যাগীতির সূচনাকাল ধরেছেন সপ্তম শতককে। তবে এই মত মানতে গেলে ভাষাতাত্ত্বিকদের ভাষার বিবর্তন-সংক্রান্ত আলোচনাকে অগ্রাহ্য করতে হয়। সপ্তম শতক অপভ্রংশ ভাষারই কাল। খ্রিস্টীয় নবম শতক নাগাদ এই ভাষা থেকেই বাংলার মতো নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির উদ্ভব ঘটেছিল।
চর্যাপদের কালনির্ণয়ে গৌড়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটিও বিবেচ্য। এমনকি যে সময়ে মহাযানী বৌদ্ধধর্ম তন্ত্রের প্রভাবে মন্ত্রনয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বজ্রযান, কালচক্রযান ও সহজযানে পরিণত হল, সেটিও আলোচনা করা কর্তব্য। সেই সঙ্গে কেউ কেউ আর-একটি বাহ্য প্রমাণ উপস্থিত করেছেন। সেটি হল প্রাচীন বাংলা সংগীত-বিষয়ক গ্রন্থের সাক্ষ্য। বিষয়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। চর্যাপদ বৌদ্ধধর্মের সাধন-সংক্রান্ত গীতিগুচ্ছ হলেও তাতে বিশুদ্ধ বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব উপস্থাপিত হয়নি। চর্যাগীতির মূল অবলম্বন মহাযানী বৌদ্ধধর্মের এক বিশেষ বিকারগ্রস্থ রূপ। এই বিকৃতি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের। গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর চারটি বৌদ্ধসংগীতি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মতান্তর সূচিত করেন। পরিণামে বৌদ্ধসমাজ হীনযান ও মহাযান নামে দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। হীনযানীরা পরে সৌত্রান্তিক ও বৈভাষিক উপদলে বিভক্ত হয়ে যান। দার্শনিক মতভেদের কারণে মহাযানীরাও মাধ্যমিক ও যোগাচার শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। এই যোগাচার মতের উদ্ভব খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম শতকে। সপ্তম শতক পর্যন্ত উত্তর ভারতে বৌদ্ধ দার্শনিকদের মধ্যে মাধ্যমিক ও যোগাচার মত বিশেষ জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিল। এরপর অষ্টম শতকে শঙ্করাচার্য ও কুমারিল ভট্ট বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে বৈদিক তথা পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করতে সচেষ্ট হলেন। শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত ও কুমারিল ভট্টের পূর্ব মীমাংসা দর্শনের চাপে বৌদ্ধধর্ম কোণঠাসা হয়ে পড়ল। অবস্থার সঙ্গে সামাল দিতে গিয়ে মহাযানী বৌদ্ধধর্মে হিন্দু পুরাণের দেবদেবীদের অনুরূপ নানা দেবদেবীর আবির্ভাব ঘটল এবং ব্রাহ্মণ্য তান্ত্রিক রহস্যাচার গ্রাস করে ফেলল যোগাচারীদের। তন্ত্রের প্রভাবে দেহসাধনা-নির্ভর বৌদ্ধধর্ম কথিত হল ‘মন্ত্রযান’ নামে, যার শেষ পরিণতি বজ্রযান, কালচক্রযান ও সহজযান। চর্যাগীতিতে এই শেষোক্ত তিনটি মতেরই ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এসব ঘটতে কমপক্ষে এক শতাব্দীর কেটে যাওয়ার কথা। তাই বলা চলে, নবম শতকের আগে মহাযানী বৌদ্ধধর্মে এই বিকৃতি ঘটেনি। নতুন তত্ত্ব ও সেই অনুযায়ী আচার-সংস্কার গড়ে উঠলে নবদীক্ষিতদের কাছে এর রহস্যময়তা তথা গূঢ় তাৎপর্য ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন সিদ্ধাচার্যেরা। তাঁদের রচনার ভাষা আলো-আঁধারি সন্ধ্যাভাষা বা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট অভিপ্রায়কেই ব্যক্ত করার জন্য বিশেষ প্রযত্নে নির্মিত ভাষা। যৌনাচার-ভিত্তিক এই যোগসাধনপ্রণালী অন্যের কাছে প্রকাশ করতে সম্ভবত তাঁরা কুণ্ঠিত ছিলেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দিক থেকেও এই সময়টি ছিল বেশ অনুকূল। বাংলার সিংহাসনে তখন আসীন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল সম্রাটেরা। এই অনুকূল পরিবেশে বসে বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা অসংখ্য গ্রন্থ ও পদ রচনা করেন। তাঁদের রচিত অধিকাংশ পদের ভাষা নবসৃজ্যমান বাংলা ভাষা এবং টীকা ও ভাষ্যের মাধ্যম ছিল সংস্কৃত বা বৌদ্ধ-সংস্কৃত। অতএব সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত করা যায় যে, খ্রিস্টীয় নবম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়কালে চর্যার মূল গানগুলি রচিত হয়েছিল।
এবার মুনিদত্তের টীকাগ্রন্থটির কাল অনুসন্ধান করা যাক। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুথিটি যে বেশ পরবর্তীকালে লিখিত, তা গ্রন্থের বিষয় ও লিপির আদর্শ থেকেই স্পষ্ট। চর্যাগীতিগুলি তত্ত্বের বাহক। কিন্তু সেগুলি এমনই আভিপ্রায়িক বচনে পরিপূর্ণ যে, দীক্ষিত ব্যক্তিদের কাছেও তা দুর্বোধ্য ছিল। তত্ত্ব ও সাংকেতিকতার দুরূহতার জন্য এগুলির ব্যাখ্যার প্রয়োজন দিল। মুনিদত্তই সেই অগ্রণী বৌদ্ধ পণ্ডিত যিনি একশোটি চর্যার একটি গীতিগুচ্ছ থেকে অর্ধেক পদ নিয়ে সেগুলির ব্যাখ্যায় অগ্রসর হলেন। বিশ্বভারতী প্রকাশিত চর্যাগীতিকোষ গ্রন্থে আছে: “তত্রাহৃতানাং চ বিচারিতানাং চর্যাশতেনাহৃত গীতিকানাম্। সত্ত্বৈস্তু সংবোধি বিচারাণার্থং কোষং বুধাঃ সংরচয়াংবভূবঃ।।” মূল গানগুলি রচিত হওয়ার অনেক পরে যে মুনিদত্তের টীকা লিখিত হয়েছিল, তার প্রমাণ পুথিতে উদ্ধৃত গীতিগুলির পাঠভেদ। এই বিষয়ে ড. সত্যব্রত দেব লিখেছেন, “মূল গীতিরচনার যুগ হইতে টীকা বা অনুলিপি রচনার যুগ পর্যন্ত মধ্যবর্তীকালে এই জনপ্রিয় গীতিগুলি নিশ্চয়ই গায়কদের মুখে মুখে এবং/অথবা লিপিকরদের অনুলিপির মাধ্যমে প্রচারিত ছিল। সুতরাং মূল রচনার সময়কার রূপ হইতে চর্যাগীতিগুলির ভাষা পরিবর্তিত হওয়াই স্বাভাবিক, যেমনভাবে মধ্যযুগের অনেক জনপ্রিয় সাহিত্যকৃতির ভাষা বিকৃত হইয়া গিয়াছে।” লিপির আদর্শ বিচার করে পুথির কালনির্দেশের ক্ষেত্রে লিপিবিশারদদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা যায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে পুথির লিপিকাল দ্বাদশ শতক, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে চতুর্দশ শতকের পরবর্তী সময়, ড. সুকুমার সেনের মতে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক এবং তারাদাস মুখোপাধ্যায়ের মতে দ্বাদশ শতকের শেষার্ধ। মুনিদত্তের আবির্ভাবকাল জানা যায়নি। অতএব এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমান-নির্ভর হতে বাধ্য। খুব সম্ভবত, চতুর্দশ শতকের কিছু আগে বা পরে কোনও এক সময়ে মুনিদত্তের মূল গ্রন্থটির অনুলিপি করা হয়েছিল। প্রাপ্ত পুথিটি যে টীকাকারের স্বহস্তে লিখিত তারও কোনও উপযুক্ত প্রমাণ নেই। বরং গানগুলির পাঠভেদ থেকে অনুমিত হয় যে, গানগুলি গায়কদের মুখে মুখে কম-বেশি পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পরে অন্য কোনও ব্যক্তি মূল পুথির অনুলিপি করেছিলেন।
চর্যাপদের রচনাকালের ন্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুথিটির গ্রন্থ নিয়েও গবেষকেরা আজ পর্যন্ত কোনও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেননি। প্রাপ্ত পুথিটির মলাটের পাতা ও শেষে পুষ্পিকার পাতা পাওয়া যায়নি বলে প্রকৃত তথ্য অজ্ঞাতে থেকে গিয়েছে। শাস্ত্রী মহাশয় তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের যে নামকরণ করেছেন তা স্পষ্টতই বিষয়-নির্দেশক অভিধা, যা একই সঙ্গে সময়কেও ইঙ্গিত করছে। নাম মাত্রেই বিশেষ্য, সেখানে এই ধরনের বিশেষণের প্রয়োগ অর্থ-ব্যঞ্জনার সূক্ষ্মতার পক্ষে ক্ষতিকারক। শাস্ত্রী মহাশয় অবশ্য বিকল্প একটি নাম দিয়েছিলেন চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। এই নামটির উৎস জানা যায়নি। পুথির কোথাও এই নামটি নেই। এটি সম্পাদকের স্ব-নির্ধারিত নাম হতে পারে, তবে একান্তই যে তাঁর স্ব-উদ্ভাবিত নাম নয়, তার প্রমাণ অদ্বয়বজ্রের প্রজ্ঞোপায়বিনিশ্চয়সিদ্ধ নামের গ্রন্থটি। টীকাগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত বৌদ্ধ গ্রন্থগুলির নামের সঙ্গে এই ‘বিনিশ্চয়’ শব্দটি যুক্ত থাকত। প্রাপ্ত পুথিটিও একটি টীকাগ্রন্থ। মুনিদত্ত বাংলা ভাষায় লেখা পঞ্চাশটি চর্যাগীতির টীকা লিখেছিলেন সংস্কৃত ভাষায়। নাম দিয়েছিলেন নির্মলগিরা টীকা। সেদিক থেকে শাস্ত্রী মহাশয়ের দেওয়া নামটি সংগতিপূর্ণ। অথচ এই নামটি নিয়েও গবেষকদের মধ্যে অনেক বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
চর্যাগীতিগুচ্ছের প্রথম পদের সংস্কৃত টীকায় বলা হয়েছে: “শ্রীলূয়ীচরণাদিসিদ্ধরচিতেঽপ্যাশ্চর্য্যচর্য্যাচয়ে। সদ্বর্ত্মাবগমায় নির্ম্মলগিরাং টীকাং বিধাস্যে স্ফুটনম।।” ১৯২৮ সালে বিধুশেখর শাস্ত্রী ইন্ডিয়ান হিস্টোরিক্যাল কোয়ার্টারলি পত্রিকার চতুর্থ খণ্ডে এই শ্লোকটির নিরিখে দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, এখানে উক্ত ‘আশ্চর্য্যচর্য্যাচয়’ শব্দবন্ধটিই প্রকৃত গ্রন্থনাম, যার অর্থ হল ‘আশ্চর্য চর্যাসমূহের সংকলন’। কিন্তু এটিকে ঠিক গ্রন্থনাম হিসেবে স্বীকার করা যায় না। বরং উপরিউক্ত বাক্য থেকে টীকাকার এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই আশ্চর্য বা অদ্ভুত চর্যাসমূহে প্রবেশের ‘সদ্বর্ত্ম’ নির্দেশের জন্য তিনি টীকা রচনা করেছেন। ‘আশ্চর্য’ শব্দটি গানগুলির প্রকৃতি নির্দেশক, যা অবশ্যই বিশেষণ। অন্যদিকে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী তাঁর স্টাডিজ ইন তন্ত্রজ (১ম খণ্ড) গ্রন্থে তিব্বতি অনুবাদটির প্রেক্ষিতে মন্তব্য করেছেন যে, শাস্ত্রী মহাশয় একটি ভুল পাঠের উপর ভিত্তি করে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নাম দিয়েছেন; গ্রন্থটির আসল নাম হবে চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। অবশ্য ড. বাগচী নেপাল রাজদরবারে রক্ষিত পুথিতে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নামটি আছে বলেও উল্লেখ করেছেন। ড. সুকুমার সেনও মনে করেন যে, গ্রন্থটির মূল নাম চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়, কিন্তু লিপিকরের ভুলে তা হয়েছে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। কিন্তু ড. বাগচী ও ড. সেন সমর্থিত চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয় নামটি প্রাপ্ত পুথিতে তো নেই-ই, এমনকি তেঙ্গুর গ্রন্থমালার পি. কর্ডিয়ার কৃত তালিকাতেও পাওয়া যায় না। এই নামটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মুনিদত্তের যে শ্লোকটি উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাতে ‘আশ্চর্য’ শব্দটি থাকলেও চর্যার ‘আশ্চর্য বিনিশ্চয়’ অর্থাৎ অপূর্ব অর্থনির্ধারণের ব্যাপারটি কষ্টকল্পিত বলেই মনে হয়। বরং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দেওয়ার নামটির পিছনে কিছু যুক্তি আছে। ‘চর্য্যাচর্য্য’ শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ পদ, যার পূর্বপদ ‘চর্য্য’, অর্থাৎ আচরণীয় এবং উত্তরপদ ‘অচর্য্য’ অর্থাৎ যা আচরণীয় নয়। যে গ্রন্থ আচরণীয় ও অনাচরণীয় তত্ত্বকে বিশেষরূপে নিশ্চয়ই করে তার নাম দেওয়া যেতে পারে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। এই কারণে বিশ্বভারতী প্রকাশিত চর্যাগীতিকোষ গ্রন্থের ভূমিকায় বৌদ্ধ পণ্ডিত শান্তি ভিক্ষু শাস্ত্রী মন্তব্য করেছেন, “I see no justification to invent a new name when the old one conveys the better meaning, that is, Viniscaya ‘Determination’ of carya ‘that to be practiced’ and acarya ‘that not to be practiced’.”
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পর চর্যাপদের পুথি আরও কয়েকজন বিদগ্ধ গবেষক কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছিল। যেমন, মনীন্দ্রমোহন বসুর চর্য্যাপদ, ড. সুকুমার সেনের চর্যাগীতি পদাবলী, ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও শান্তি ভিক্ষু শাস্ত্রীর যুগ্ম সম্পাদনায় চর্যাগীতিকোষ এবং ড. নীলরতন সেনের চর্যাগীতিকোষ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ)। লক্ষণীয়, সকলেই সম্পাদিত গ্রন্থের নামকরণে গানের দিকেই লক্ষ্য রেখেছেন এবং শাস্ত্রী মহাশয়ের দেওয়া নামটি বর্জন করেছেন। এই বিষয়ে জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বলেন, “কিন্তু গ্রন্থনাম বিচারে প্রথম বিচার্য গ্রন্থের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং গ্রন্থের উদ্দেশ্য। যে গ্রন্থখানি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা চর্যাগীতির সঙ্কলন মাত্র নহে, গীতিগুলির অর্থ বা টীকা। গ্রন্থখানির আরম্ভ টীকাকারের বন্দনা ও বস্তুনির্দেশক শ্লোক লইয়া। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী তিব্বতী অনুবাদের যে সংস্কৃত ছায়া দিয়াছেন, তাহাতে দেখা যায়, তাহাও টীকাকার মুনিদত্তের উক্তি লইয়াই পরিসমাপ্ত।” অথচ সম্পাদিত সব কটি গ্রন্থেই এই ব্যাপারটি অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং নামকরণে গানের ভূমিকাকেই দেওয়া হয়েছে প্রাধান্য। প্রাপ্ত পুথিটিতে গানগুলির উপস্থিতি যে একটি বিশিষ্ট ঘটনা তা অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু টীকাকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল গানগুলির সূত্রে সহজযান বৌদ্ধধর্মের তত্ত্ব ও আচরণ ব্যাখ্যা করা। মূল পুথিতে গান আদৌ যুক্ত ছিল কিনা তা নিয়েও কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। যেভাবে সাহিত্যের অর্থপুস্তক লেখা হয় সেইভাবে, অর্থাৎ প্রতিটি পদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পদের প্রথম শব্দটি উল্লেখ করে এখানে ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। এই রীতি বৌদ্ধসাহিত্যে যে সুপ্রচলিত ছিল তার প্রমাণ কাহ্নপাদ রচিত যোগরত্নমালা টীকা, অদ্বয়বজ্রের দোহাকোষপঞ্জিকা এবং নারোপা রচিত সেকোদ্দেশ টীকা। মুনিদত্তও সেই ধারাতে অর্থবোধের জন্য নির্মলগিরা টীকা রচনা করেছিলেন। সূচনায় “বিধাস্যে স্ফুটম্” ও অন্তে “কোষস্য চার্থঃ প্রকটিকৃতোঽএ” প্রভৃতি উক্তিই তার প্রমাণ। অতএব টীকাকারের উদ্দেশ্য বিচার করলে পূর্বোক্ত সমস্ত নামই অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর মনে হবে। তিনি যে এর ভিন্ন একটি নামকরণ বৌদ্ধধর্মের গূঢ় তত্ত্বসমূহের ভাষ্য তথা ব্যাখ্যা-সংক্রান্ত তাঞ্জুর গ্রন্থমালার তালিকা থেকে পাওয়া যায়। সেখানে মুনিদত্তের নামে চর্যাগীতিকোষবৃত্তি গ্রন্থটির উল্লেখ আছে। মুনিদত্তের গ্রন্থটির তিব্বতি অনুবাদক কীর্তিচন্দ্রের নামেও একই নামে একটি গ্রন্থের উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। পি. কর্ডিয়ার কৃত তালিকাও এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। অতএব সিদ্ধান্ত করা যায় যে, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত গ্রন্থটির প্রকৃত নাম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি। উল্লেখ্য যে, তিব্বতি ভাষান্তরেও গ্রন্থের নাম দেওয়া হয়েছিল চর্যাগীতিকোষবৃত্তি। আশ্চর্যের বিষয়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯১৬ সালে তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের পরিশিষ্টে যে তাঞ্জুর তালিকা সন্নিবিষ্ট করেছিলেন, তাতেও মুনিদত্তের নামের পাশে চর্যাগীতিকোষবৃত্তি গ্রন্থের উল্লেখ আছে।
কবি
[সম্পাদনা]চর্যাগীতিগুলির ভণিতায় যেমন পদকর্তাদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে, তেমনই টীকাগ্রন্থটিতে ব্যাখ্যার সঙ্গে রচয়িতাদের নামও দেওয়া হয়েছে। মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি গানের তেইশজন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। এঁরা সবাই ছিলেন মহাযানী বৌদ্ধধর্মের যোগাচার শাখার সাধক-কবি। সম্ভবত তন্ত্রযোগ সাধনায় এঁরা সকলেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, তাই প্রত্যেকেই সিদ্ধাচার্য নামে খ্যাত ছিলেন। মুখ্যত বজ্রযান ও সহজযানের গুরুরাই এই অভিধায় ভূষিত হতেন। তিব্বতি ইতিহাসে চুরাশি জন সিদ্ধাচার্যের নাম সুপ্রসিদ্ধ। লামা তারানাথের গ্রন্থ, মৈথিল কবি জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের বর্ণনরত্নাকর ও বিনয়শ্রীর সিদ্ধনামানুসরণ গ্রন্থে এই সব সিদ্ধাচার্যের নাম ও তাঁদের সম্পর্কে কিছু জনশ্রুতি উল্লিখিত হয়েছে।
লুইপাদ
[সম্পাদনা]টীকাকার মুনিদত্ত লুইপাদকে আদি সিদ্ধাচার্য বলেছেন। তিব্বতি তালিকায় তাঁর নামই সর্বাগ্রে পাওয়া যায়। অবশ্য তারানাথ বলেছেন, লুইপাদ চতুর্থ সিদ্ধাচার্য। তিনি উড্ডীয়ান-রাজ উদয়নের করণিক ছিলেন। পরে মহাসিদ্ধ শবরীপাদের কাছে তন্ত্রাভিষেক লাভ করেন এবং নির্বিঘ্নে ধ্যান করার জন্য বাংলার গঙ্গাতীরে আসেন। সাধনরত অবস্থায় তিনি মৎস্যের অন্ত্র ছাড়া আর কিছুই খেতেন না। এইজন্য নাথধর্মের অন্যতম গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়। ‘মৎস্যেন্দ্র’ শব্দের অর্থ হল মাছেদের রাজা অর্থাৎ রুই। পাণিনির “ন র লয়োর্ভেদঃ” সূত্র অনুযায়ী বলা যায়, রুই ও লুইয়ের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। এইভাবে মীননাথ ও লুইপাদ অভিন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। অবশ্য সেটি বাস্তব সত্য কিনা সে নিয়ে সংশয় আছে। লুইপাদ বজ্রযান মতে বজ্রবারাহীর ধ্যান করতেন। তাঞ্জুর তালিকা অবশ্য লুইপাদকে ‘বাঙালি’ বলে ঘোষণা করেছে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, লুইপাদ ছিলেন পাল সম্রাট ধর্মপালের কায়স্থ বা মুখ্য করণিক। সরহপাদ রচিত দোহাকোষের অদ্বয়বজ্র কৃত পঞ্জিকায় লুইপাদকে ‘কৈবর্ত’ বলা হয়েছে। চর্যাগীতি ও তত্ত্বস্বভাবদোহাকোষগীতিকাদৃষ্টি নামক দোহাকোষ ছাড়া লুইপাদ রচনা করেন শ্রীভগবদভিসময়, অভিসময়বিভঙ্গ, বুদ্ধোদয় ও বজ্রসত্ত্বসাধন। প্রথম দুটি গ্রন্থ খুবই বিখ্যাত। বিশেষত দ্বিতীয় গ্রন্থটির উপর পরবর্তীকালে অনেক টীকা, ব্যাখ্যা, বৃত্তি, পঞ্জিকা ইত্যাদি রচিত হয়। চর্যার পুথিতে তাঁর দুটি গান (১ ও ২৯ সংখ্যক চর্যা) সংকলিত।
শবরীপাদ
[সম্পাদনা]মহাসিদ্ধ শবরীপাদ ছিলেন লুইপাদের গুরু। শবরীপাদের গুরু ছিলেন রসসিদ্ধ নাগার্জুন। তারানাথের বিবরণে পাওয়া যায়, প্রথম জীবনে শবরীপাদ ছিলেন বঙ্গের এক নটাচার্য। নাগার্জুন তাঁকে শ্রীপর্বতে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেখানে তিনি শবরসুলভ জীবন যাপন করে ‘শবরীশ্বর’ বা ‘সিদ্ধ শবর’ উপাধি লাভ করেন। তন্ত্রমতে, শবর বা সবর শব্দের অর্থ বজ্রধর। তিনি কনিষ্ঠ সরোহ নামেও পরিচিত। তাঞ্জুর তালিকা অনুসারে, তিনি বজ্রযোগিনী সাধন-বিষয়ক কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এছাড়া ষড়ঙ্গ যোগের উপরেও তাঁর অধিকার বিভিন্ন রচনায় প্রমাণিত। তিনি ‘আচার্য’ ও ‘মহাচার্য’ বিশেষণেও ভূষিত। মহামুদ্রাবজ্রগীতি, চিত্তগুহ্যগম্ভীরার্থগীতি প্রভৃতি তাঁর রচিত তত্ত্বগ্রন্থ। বৌদ্ধ সাধনমালায় সিতকুরুকুল্লাসাধন ও বজ্রযোগিনী আরাধনাবিধি নামে দুটি রচনায় তাঁর ভণিতা পাওয়া যায়। চর্যাপদের পুথিতে তাঁর দুটি গান (২৮ ও ৫০ সংখ্যক চর্যা) সংকলিত।
ভুসুকুপাদ
[সম্পাদনা]অন্যতম শ্রেষ্ঠ চর্যাকার ভুসুকুপাদের ব্যক্তিগত ও প্রাচীনত্ব নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। মহাযান মধ্যমক শূন্যবাদের প্রবক্তা শান্তিদেব ও চর্যাকার ভুসুকুপাদ অভিন্ন ব্যক্তি কিনা তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কিছু মতান্তর আছে। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম শিক্ষাসমুচ্চয় ও বোধিচর্যাবতার। তারানাথ এই সকল গ্রন্থের রচয়িতাকে সৌরাষ্ট্রের অধিবাসী বলেছেন। কিন্তু হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘বাঙালি’ বলে স্বীকার করেছেন। শাস্ত্রী মহাশয় এশিয়াটিক সোসাইটির ৯৯৯০ সংখ্যক তালপাতার পুথি থেকে শান্তিদেবের যে জীবনী উদ্ধার করেছেন, সেটি এইরকম: শান্তিদেব ছিলেন রাজপুত্র। যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হওয়ার প্রাক্কালে তাঁর মা তাঁকে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুবজ্রের নিকট উপদেশ নিতে বলেন। শান্তিদেব ঘোড়ায় চড়ে মঞ্জুবজ্রের নিকট যাত্রা করলেন। পথে মঞ্জুবজ্রের এক শিষ্যের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হল এবং তারপর বারো বছর মঞ্জুবজ্রের কাছে থেকে তিনি মঞ্জুশ্রী মন্ত্রে সিদ্ধ হলেন। তারপরে তিনি ‘রাউত’ বা অশ্বারোহীর বেশে মগধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মগধরাজের নিকট ‘অচল সেন’ নামে নিজের পরিচয় দিলেন। মগধরাজ অশ্বারোহী তরবারিধারী অচলকে সেনাপতি পদে বরণ করলেন। তরবারিকে আশ্রয় করে তাঁর অদ্ভুত সিদ্ধি প্রকাশ পেল। তখন তিনি রাজকার্য ত্যাগ করে ভিক্ষুর বেশে নালন্দায় প্রবেশ করলেন। এখানেই তিনি তাঁর গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন। ভোজনকালে, সুপ্ত অবস্থায় ও কুটি গমনে অর্থাৎ বিশ্রামকালে ‘প্রভাস্বর’ বা সমাধি সমাপন্ন থাকতেন বলে তিনি ‘ভুসুকু’ নামে খ্যাতি লাভ করেন। এই নামেই তিনি চর্যাগীতি রচনা করেন। পদকর্তা ভুসুকুর গানে আছে “রাউতু ভনই কট”। এই ভণিতাই দুই ব্যক্তিত্বকে এক করে দিয়েছে। তাছাড়া নারোপা রচিত সেকোদ্দেশ টীকা গ্রন্থে শান্তিদেব ও ভুসুকুপাদকে একই ব্যক্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিধুশেখর শাস্ত্রী ও ড. সুকুমার সেন এই দুজনকে পৃথক ব্যক্তি বলে মনে করেন। ড. সেনের মতে, ভুসুকুপাদ শান্তিদেবের তুলনায় অনেক পরবর্তীকালের ব্যক্তি। তিনি সহজযানী সিদ্ধাচার্য। তাঁর রচিত চতুরাভরণ গ্রন্থের লিপিকাল ১২৯৫ খ্রিস্টাব্দ ধরে ড. সেন তাঁকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধের ব্যক্তি মনে করেছেন। কিন্তু এই ধারণা সম্ভবত সঠিক নয়। ভুসুকুপাদ ত্রয়োদশ শতকের কবি হলে দ্বাদশ শতকের পূর্বে রচিত কোনও গ্রন্থে তাঁর পদ স্থান লাভ করতে পারে না। তাছাড়া ভুসুকুপাদ যে রাজপুত্র ও রাউত ছিলেন, তার প্রমাণ তাঁর পদেই পাওয়া যায়। “আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী” ভণিতার সূত্রে তাঁকে বাঙালি মনে করা হয়। তাঁর পদে দু-একটি বঙ্গীয় বাগ্বিধিও লক্ষণীয়। চর্যার পুথিতে ভুসুকুপাদের ৮টি গান সংকলিত হয়েছে: ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩ ও ৪৯ সংখ্যক চর্যা।
সরহপাদ
[সম্পাদনা]লামা তারানাথ সরহপাদকে আদি সিদ্ধাচার্য বলে উল্লেখ করেছেন। তাঞ্জুর তালিকায় সরহপাদকে বলা হয়েছে ‘আচার্য’, ‘মহাচার্য’, ‘সিদ্ধ মহাচার্য’, ‘মহাব্রাহ্মণ’, ‘যোগী’, ‘মহাযোগী’, ‘যোগীশ্বর’ ও ‘মহাশবর’ (‘শবর’ শব্দটি বজ্রযানে বজ্রধরের প্রতীক)। সরহপাদ উড়িষ্যায় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং বেদাদি শাস্ত্রে পারঙ্গম ছিলেন। নালন্দায় তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন ধর্মকীর্তি হরিভদ্র। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, হরিভদ্র ছিলেন গৌড়াধিপতি ধর্মপালের (রাজত্বকাল ৭৭০—৮১৫ খ্রিস্টাব্দ) সমসাময়িক। সেই হিসেবে সরহপাদ অষ্টম শতাব্দীর ব্যক্তি ছিলেন এবং সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয় ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। আচার্য স্থবিরকালের নিকট সরহপাদ অভিষিক্ত হন। দাক্ষিণাত্যে এক শরকারের (arrow-smith) কন্যাকে মুদ্রা রূপে গ্রহণ করায় তাঁর নাম হয় শরহ বা সরহ। তাঁর অপর নাম রাহুলভদ্র, সরোরুহবজ্র ও সরোজবজ্র। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, সরহপাদের ভিক্ষুনাম রাহুলভদ্র। বজ্রযানের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে সরোরুহবজ্র বা সরোজবজ্র নাম ব্যবহার করা হয়েছে। রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন বলেছেন, ‘পূর্বদিশা’ অঞ্চলের অন্তর্গত ‘রাজ্ঞী’ (বর্তমান বিহারের ভাগলপুর) নামক স্থানে তাঁর জন্ম। অবশ্য অনেকেই মনে করেন, সরহপাদ ছিলেন বরেন্দ্রভূমির ব্যক্তি। তাঁর লেখা ৩৯ সংখ্যক চর্যাটির বাহ্য অর্থ থেকে জানা যায় যে, তিনি বঙ্গে জায়া গ্রহণ করেছিলেন: “বঙ্গে জাআ নিলেসি”। তাঁর পদে ব্যবহৃত প্রবাদ-প্রবচন ও বাগ্বিধির বিচারেও তাঁকে গৌড়ের অধিবাসী মনে হয়। রসসিদ্ধ নাগার্জুনকে তিনি সহজ মতে অভিষিক্ত করেন। সংস্কৃত, অপভ্রংশ ও প্রত্ন বাংলা তিন ভাষাতেই সরহপাদ গ্রন্থাদি রচনা করেন। সংস্কৃতে তিনি রচনা করেন বুদ্ধকপালসাধন, হেবজ্রতন্ত্রপঞ্জিকাপদ্মিনীনাম প্রভৃতি গ্রন্থ। অপভ্রংশে রচিত তাঁর সহজতত্ত্ব ও সহজ-সাধনা বিষয়ক দোহা ও দোহাজাতীয় গীতি সংকলনগুলির মধ্যে দোহাকোষগীতি, ক-খ দোহা (ক-কারাদি বর্ণকে আদ্যক্ষর করে বর্ণার্থমূলক দোহা), মহামুদ্রোপদেশবজ্রগুহ্যগীতি, কায়বাক্চিত্তঅমনসিকার, ডাকিনীগুহ্যগীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চর্যাগীতির পুথিতে তাঁর ৪টি পদ (২২, ৩২, ৩৮ ও ৩৯ সংখ্যক পদ) সংকলিত।
কাহ্নপাদ
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির পুথিতে সংকলিত ৫০টি পদের মধ্যে ১৩টি পদই (৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২ ও ৪৫ সংখ্যক চর্যা; এবং টীকা অনুসারে, মূল পুথিতে লুপ্ত ২৪ সংখ্যক চর্যাটি) কাহ্নপাদের রচনা। তিব্বতি ইতিহাস, তাঞ্জুর তালিকা, চর্যাগীতি ও বাংলা সিদ্ধাচার্য-গীতিকায় (নাথগীতিকা) কাহ্নপাদ একটি বিশিষ্ট নাম। টীকাকার তাঁকে ‘কাহ্নপাদ’, ‘কৃষ্ণপাদ’, ‘কৃষ্ণাচার্যপাদ’, ‘কৃষ্ণবজ্রপাদ’, ‘কৃষ্ণাচার্য’, ‘কৃষ্ণাচার্য চরণ’ ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেছেন। তিনি সিদ্ধ সাধক, মহাপণ্ডিত ও মণ্ডলাচার্যদের ভিতর সিদ্ধাচার্য। তবে কাহ্নপাদ দুই জন কবির নাম কিনা এবং তাঁর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে। ড. সুকুমার সেনের মতে, ১০, ১১, ১৮, ১৯, ৩৬ ও ৪২ সংখ্যক পদগুলি জালন্ধরীপাদের শিষ্য তান্ত্রিক যোগী কাহ্নপাদের এবং ৭, ৯, ১২, ১৩, ৪০ ও ৪৫ সংখ্যক পদগুলি অপর এক কাহ্নপাদের রচনা। কয়েকটি গানে ‘জ্ঞান উপদেশের প্রবণতা’ এবং অন্য গানগুলিতে ডোম্বী-বিবাহের সন্ধ্যা-সংকেতের ভিত্তিতে দুই কাহ্নের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও, একই সাধক-কবি দুই ভিন্ন শ্রেণির গান রচনা করেছেন—এই যুক্তিতে কেউ কেউ দুই কাহ্নের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। কাহ্নপাদের পরিচয় নিয়েও অনেকগুলি জনশ্রুতি আছে। তাঞ্জুর তালিকায় তাঁকে ভারতবাসী ও উড়িষ্যা থেকে আগত বলা হয়েছে। তিব্বতের ইতিহাস অনুসারে, তাঁর জন্মস্থান কর্ণ-নগর। জনশ্রুতিতে বলা হয়েছে তাঁর জন্ম পদ্মনগর বা বিদ্যানগর বা বিজয়নগরে। এই স্থানগুলির অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। নাথগীতিকায় তাঁর একটি কীর্তিস্থল হিসেবে বঙ্গ মেহারকুলের উল্লেখ আছে। কাহ্নপাদের পদে বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রাচুর্যও লক্ষণীয়। কাহ্নপাদের জীবনকাহিনিও বিচিত্র। প্রথম জীবনে বিরূপপাদ বা বিরুআপাদের শিষ্য কাহ্নপাদ ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে চারটি পাপ করার পর জালন্ধরীপাদের শরণ নেন। জালন্ধরীপাদের নির্দেশে বজ্রবারাহীর উপাসনার করে তিনি শাপমুক্ত হন। বিরূপপাদের সঙ্গে কাহ্নপাদের যোগের ইঙ্গিত তাঁর পদেই পাওয়া যায়। তবে জালন্ধরীপাদের সঙ্গেই তাঁর যোগ বেশি। চর্যাগীতিতে কাহ্নপাদ জালন্ধরীপাদকে সাক্ষী মেনে মেনেছেন: “শাখি করিব জালন্ধরী পাএ”। তিব্বতি ইতিহাসে আছে, জালন্ধরীর শ্রেষ্ঠ শিষ্য কৃষ্ণ অঙ্গে হাড়ের মালা ও হস্তে ডমরু ধারণ করবেন। চর্যাগানে কাহ্নপাদ তাই করেছেন বলে উল্লিখিত। আবার নাথগীতিকায় বলা হয়েছে হাড়িফাকে (জালন্ধরীপাদ) নিত্য সেবা করেন কানফা যোগাই (কাহ্নপাদ)। কাহ্নপাদ দোহাকোষপঞ্জিকা সহ অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। হেবজ্রতন্ত্র গ্রন্থের উপর একটি গ্রন্থও তাঁর নামে পাওয়া যায়।
বিরূপপাদ
[সম্পাদনা]বিরূপপাদ বা বিরুআপাদ ছিলেন বজ্রযোগিনীর সাধক। তাঞ্জুর তালিকায় তাঁকে ‘আচার্য’, ‘মহাচার্য’, ‘যোগীশ্বর’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। সিদ্ধ সাধক হিসেবে তিনি এত বিখ্যাত ছিলেন যে, পরবর্তীকালে অনেকেই তাঁর নাম করেছেন। তাঁর কোনও গুরু ছিল না। জনশ্রুতি অনুসারে, তিনি ছিলেন সিদ্ধাচার্য কাহ্নপাদের প্রথম জীবনের গুরু। তাঁর নামে গীতিকা, কর্মচণ্ডালিকাদোহাকোষগীতি প্রভৃতি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। লামা তারানাথের গ্রন্থে তাঁর মদ্যপানে আসক্তি ও শুণ্ডিনী সাহচর্যের কথা পাওয়া যায়। চর্যাগীতির পুথিতে সংকলিত তাঁর একমাত্র চর্যাটিতে (৩ সংখ্যক পদ) সেই শুণ্ডিনীর মদ চোলাইয়ের একটি বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
শান্তিপাদ
[সম্পাদনা]শান্তিপাদ প্রাচীন সিদ্ধাচার্য। ড. সুকুমার সেনও তাঁকে প্রাচীন চর্যাকার বলে স্বীকার করেছেন। তাঞ্জুর তালিকা মতে, রত্নাকর শান্তিই শান্তিপাদ। তিব্বতি তালিকায় রত্নাকর শান্তি ‘আচার্য’, ‘আচার্যপাদ’ ও ‘মহাপণ্ডিত’ বিশেষণে ভূষিত। লামা তারানাথের বিবরণ অনুসারে, তিনি শবরীপাদের সমসাময়িক, অর্থাৎ অষ্টম শতকের মধ্যভাগের ব্যক্তিত্ব। তাঞ্জুর তালিকায় তাঁর নামে মুক্তাবলী নামি হেবজ্র পঞ্জিকা ও কুসুমাঞ্জলি নাম গুহ্যসমাজ নিবন্ধ নামে দুই গ্রন্থ উল্লিখিত হয়েছে। এগুলি সহজ-সাধনার ভিত্তি হেবজ্রতন্ত্র ও গুহ্যসমাজ তন্ত্র গ্রন্থদ্বয়ের টীকা। সহজযানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগের সাক্ষর বহন করছে সহজরতিসংযোগ ও সহজ যোগক্রম গ্রন্থ দুটি। তাঁর অপর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সুখদুঃখপরিত্যাগদৃষ্টি। এছাড়া তিনি বজ্রতারা ও মহামায়ার সাধন-সংক্রান্ত গ্রন্থও রচনা করেন। শান্তিদেব ও শান্তিপাদকে কেউ কেউ অভিন্ন মনে করেন। কিন্তু এঁরা যে পৃথক ব্যক্তি তা নানা সূত্র থেকে জানা যায়। শান্তিদেবের দুটি পদ (১৫ ও ২৬ সংখ্যক চর্যা) সংকলিত হয়েছে চর্যাগীতির পুথিতে।
দারিকপাদ
[সম্পাদনা]দারিকপাদকে অভিষিক্ত করেন লুইপাদ। গানের ভণিতাতেও দারিকপাদ বলেছেন, “লুইপাঅ পসাএঁ দারিক”। লামা তারানাথের মতে, দারিকপাদ ছিলেন উড়িষ্যার রাজা। তিনি সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। তাঞ্জুর তালিকায় দারিকপাদের নামে শ্রীচক্রতন্ত্ররাজ গ্রন্থের সেকপ্রক্রিয়াবৃত্তি ও শ্রীচক্রসম্বরসাধন গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। চর্যাগীতির পুথিতে তাঁর একটি মাত্র পদই (৩৪ সংখ্যক চর্যা) পাওয়া গিয়েছে।
ডোম্বীপাদ
[সম্পাদনা]তাঞ্জুর তালিকায় আচার্য ডোম্বী, আচার্য ডোম্বীপাদ এবং আচার্য বা মহাচার্য ডোম্বী-হেরুকের নামে একাধিক গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। লামা তারানাথের মতে, এঁরা সবাই একই ব্যক্তি এবং এই ডোম্বী-হেরুক ছিলেন বিরূপপাদের শিষ্য কাল বিরূপ বা কাহ্নপাদের শিষ্য। তিব্বতি তালিকায় সিদ্ধ ডোম্বী-হেরুককে সন্ন্যাসী ও মগধের রাজা বলা হয়েছে। তারানাথ অবশ্য বলেন, ডোম্বী-হেরুক ছিলেন ত্রিপুরার রাজপুত্র। মুদ্রিকা নিয়ে সাধনা করতেন বলে রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। কিন্তু রাজ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ডোম্বী-হেরুক আশ্চর্য সিদ্ধাই দেখিয়ে দুর্ভিক্ষ নিবারণ করেন। তখন লোকে তাঁর সিদ্ধির কথা বুঝতে পারে। ডোম্বী-হেরুকের শিষ্যবর্গ ছিলেন ডোম্বী (আধ্যাত্মিক অর্থে বায়ুরূপা অবধূতিকা) ধরার সাধক। তারানাথ আরও বলেছেন যে, ডোম্বী-হেরুক রাঢ়ের রাজাকেও অভিষিক্ত করেন, ফলে রাঢ় অঞ্চল থেকে তীর্থিক ধর্ম লোপ পায়। মুনিদত্তও ডোম্বীপাদকে ‘লাড়ী’ বলে অভিহিত করেছেন। তাই ড. সুকুমার সেন তাঁর রাঢ় অঞ্চলের মানুষ মনে করেন। ড. বিনয়তোষ ভট্টাচার্যের মতে, তিনি ছিলেন অষ্টম শতকের লোক। চর্যাগীতির পুথিতে ডোম্বীপাদের মাত্র একটি পদ (১৪ সংখ্যক চর্যা) সংকলিত হয়েছে। টীকাকার এটির ব্যাখ্যা দেননি। তবে কাহ্নপাদের অনেক পদে ডোম্বীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
কুক্কুরীপাদ
[সম্পাদনা]তাঞ্জুর তালিকায় আচার্য কুক্কুরীপাদ কুকুরাজ বা কুক্কুররাজ নামে অভিহিত হয়েছেন। তাঁর নামে অনেকগুলি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। গুহ্যার্থধর ব্যুহ নামে তিনি বজ্রসত্ত্ব, বজ্রহেরুক, পদ্মরত্নেশ্বর প্রমুখের সাধন-সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারানাথের ভাষ্য অনুসারে, সর্বদা সঙ্গে একটি কুক্কুরী থাকত বলে তিনি কুক্কুরীপাদ নামে পরিচিত হয়েছেন। ড. সুকুমার সেন অবশ্য কুক্কুটিকপাদ থেকে কুক্কুরীপাদ শব্দটি নিষ্পন্ন করতে চান। চর্যাপদের পুথিতে তাঁর তিনটি চর্যা সংকলিত হয়েছিল; তার মধ্যে ২ ও ২০ সংখ্যক চর্যাটি পাওয়া গিয়েছে এবং ৪৮ সংখ্যক চর্যাটি লুপ্ত।
চাটিলপাদ
[সম্পাদনা]পদকর্তা চাটিলপাদের অস্তিত্ব তাঁর একটি পদের (৫ সংখ্যক চর্যা) উপর নির্ভরশীল। কারণ তারানাথের বর্ণনায় বা তাঞ্জুর তালিকায় তাঁর নাম দেখা যায় না। কেবল জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের বর্ণনরত্নাকর গ্রন্থের সিদ্ধা-বর্ণনায় ‘চাটল’ এবং বিনয়শ্রীর সিদ্ধনামানুসরণ গ্রন্থে ‘চাটলা’ নাম পাওয়া যায়। ৫ সংখ্যক পদে তিনি নিজেকে ‘অনুত্তর সামী’ বলে আত্মপ্রশংসা করেছেন বলে, ড. সুকুমার সেন এটিকে চাটিলপাদের কোনও শিষ্যের রচনা বলে মনে করেন। কিন্তু প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় সাহিত্যে কবির আত্মপ্রশংসা বিরল নয় বলেই ড. সেনের মত অনেকে গ্রহণ করতে পারেননি।
আর্যদেব
[সম্পাদনা]তাঞ্জুর তালিকায় আর্যদেব বা আজদেবকে ‘আচার্য’ ও ‘মহাচার্য’ বলা হয়েছে। তিনি সংস্কৃতে সুপণ্ডিত ছিলেন। চতুষ্পীঠ যোগতন্ত্র সাধন সম্পর্কে তিনি গ্রন্থ রচনা করেন। সহজ-সাধনায় চিত্তশোধন-বিষয়ক মূল্যবান গ্রন্থ চিত্তাবরণবিশোধন নামপ্রকরণ তাঁর রচনা। অপভ্রংশ ভাষায় তিনি রচনা করেন কাণেরি গীতিকা। প্রভুভাই প্যাটেলের মতে, আর্যদেব অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি ছিলেন উড়িষ্যারাজ ইন্দ্রভূতি এবং সরহপাদের শিষ্য নাগার্জুনের সমসাময়িক। আর্যদেবের একটি মাত্র চর্যা (৩১ সংখ্যক পদ) সংকলিত হয়েছে চর্যাগীতির পুথিতে।
কম্বলাম্বরপাদ
[সম্পাদনা]তাঞ্জুর তালিকায় আচার্য বা মহাচার্য কম্বলের নাম পাওয়া যায়; সেই সঙ্গে প্রজ্ঞারক্ষিতের গুরু মহাসিদ্ধ কম্বলাম্বরপাদের নামও উল্লিখিত হয়েছে এখানে। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম অভিসময়নামপঞ্জিকা। লামা তারানাথের বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় যে, লুইপাদের শিষ্য দারিকপাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল এবং সেই সূত্রে লুইপাদের গ্রন্থটির পঞ্জিকা রচনা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব নয়। তারানাথ কম্বলাম্বরপাদকে বজ্রঘণ্টের শিষ্য বলেছেন। ডোম্বী-হেরুক, জালন্ধরীপাদ প্রমুখের সঙ্গে কম্বলাম্বরপাদের যোগাযোগ ছিল। একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, কম্বলাম্বরপাদ ছিলেন ঊড়িষ্যার এক রাজকুমার। শ্মশানে সাধনা করে তিনি মন্ত্রসিদ্ধ হয়েছিলেন। মন্ত্রবতী শ্মশান-ডাকিনী তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হলে শ্মশানে একটি কম্বল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পান না। তাতেই তিনি ‘কম্বল’ নামে খ্যাত হন। তাঁর কিছু সংস্কৃত রচনার অংশ উদ্ধৃত হয়েছে সরহপাদ রচিত দোহার অদ্বয়বজ্র কৃত টীকায়। সেখানে তিনি শাস্ত্রের শব্দাক্ষরের অসারতা প্রতিপন্ন করেছেন। চর্যাগীতির পুথিতে ৮ সংখ্যক পদটি কম্বলাম্বরপাদের রচনা। এটিতে তিনি ‘কামলি’ নামে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। পদটি সাধনতত্ত্বের রূপক। নৌকা বাওয়ার রূপকে কবি মহাসুখচক্রের উদ্দেশ্যে বোধিচিত্তের যাত্রা বর্ণনা করেছেন। বিভিন্ন পংক্তিতে নৌকা বাওয়ার বাস্তব চিত্র এই বিষয়ে কবির বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিচায়ক। সন্ধ্যা-সংকেতে ও উৎপ্রেক্ষায় পদটি বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
বীণাপাদ
[সম্পাদনা]তাঞ্জুর তালিকায় বিরুআপাদের বংশধর রূপে বীণাপাদের নাম উল্লিখিত হয়েছে। অবশ্য লামা তারানাথের মতে, তিনি ছিলেন অশ্বপাদের শিষ্য। ডোম্বী-হেরুকের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। সেই হিসেবে তিনি অষ্টম শতকের শেষার্ধের ব্যক্তি। ড. সুকুমার সেন বলেছেন, “টীকাকারের অনুকরণে একটি চর্যা (১৭) অকারণে বীণাপাদের রচিত বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে। কিন্তু ভণিতা বলিয়া নির্দেশ করিতে পারি এমন কোন নাম চর্যাটিতে নাই।” কিন্তু অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তীর মতে, “চর্যাগানে অনেক ক্ষেত্রে লেখক রূপকের আবরণে আত্মগোপন করিয়াছেন, কোথায়ও বা সরাসরি ভণিতা না দিয়া নিজেই গীতিকবিতার নায়ক সাজিয়াছেন। কাহ্নপাদের ১০ সংখ্যক চর্যায় ও শবরপাদের ২৮ ও ৫০ সংখ্যক চর্যায় এই রীতিই অবলম্বিত হইয়াছে। কাজেই বীণাপাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না।” গুহ্যাভিষেক, মহাভিষেক ও বজ্রডাকিনী নিষ্পন্নক্রম বিষয়ে বীণাপাদ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৭ সংখ্যক চর্যাটিও নিষ্পন্নক্রমের সাধন-সংক্রান্ত চর্যা। সেকমণ্ডলে আলি-কালির দ্বার রুদ্ধ হয়ে চিত্ত অবধূতী মার্গে প্রবিষ্ট হলে কীভাবে হেরুক-বীণায় শূন্যতার ধ্বনি ওঠে এবং কীভাবে যোগিনী-অভিষঙ্গে যোগী বজ্রনৃত্যে ও বজ্রগীতে তন্ময় হন, তারই একটি ছবি ধরা পড়েছে ১৭ সংখ্যক চর্যাটিতে। সাধকসত্ত্বাই এখানে বীণাযন্ত্র-স্বরূপ। বীণার রূপকল্পনায় নীরস দেহতত্ত্ব এই পদে সরস হয়ে উঠেছে। গানটি শুধু তত্ত্ববাহীই নয়, নানা তথ্যে সমৃদ্ধ এবং কবির বস্তুদৃষ্টির পরিচায়ক।
ভাদেপাদ
[সম্পাদনা]কাহ্নপাদের যে ছয়জন শিষ্যের একটি করে গান চর্যাগীতির পুথিতে সংকলিত হয়েছে, তাঁদের অন্যতম ভাদেপাদ বা ভদ্রপাদ। অন্যত্র তিনি ভদ্রচন্দ্র বা ভদ্রদত্ত বা ভদ্রোক নামেও পরিচিত। লামা তারানাথ তাঁর ‘গুহ্য’ নামটির কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলা গোপীচন্দ্রের গানে উল্লিখিত কৃষ্ণাচার্যের শিষ্য ‘বাইল ভাদাই’ সম্ভবত ভদ্রপাদ। কানফা গোপীচন্দ্রকে উদ্ধার করতে সোনার গোপীচন্দ্র মূর্তি ক্রুদ্ধ হাড়িপার সম্মুখে স্থাপনের উপদেশ দেন। হাড়িপার ক্রোধে সেই স্বর্ণমূর্তি ভস্ম হয়ে যায়। গুরু জালন্ধরী এই কথা জানতে পেরে কানফাকে শাপ দেন। শেষে ময়নামতীর অনুনয়ে সিদ্ধ হাড়িপা বলেন যে, ‘বাইল ভাদাই’ শাপমুক্ত করবেন কানফাকে। সিদ্ধাচার্যদের অনেকেই শিষ্য কর্তৃক উদ্ধার লাভ করেছিলেন। গোরক্ষনাথ যেমন গুরু মীননাথকে কামবাসনায় ঘেরা কদলীরাজ্য থেকে মুক্ত করেছিলেন, তেমনই হয়তো গুরু কানফা বা কাহ্নপাদকে শাপমুক্ত করে থাকবেন ‘বাইল ভাদাই’ বা ভদ্রপাদ। নাথপন্থার সঙ্গে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের যোগ এই কাহিনির মাধ্যমে বোঝা গিয়েছে। কিন্তু ভাদেপাদের গানে তান্ত্রিকতার ছাপ স্পষ্ট নয়, পারিভাষিক শব্দের ব্যবহারও কম। তাঞ্জুর তালিকায় ভাদেপাদকে বলা হয়েছে ‘ভাণ্ডারিন্’ (আচার্য)। তাঁর রচিত গ্রন্থটির নাম সহজানন্দদোহাকোষগীতিকাদৃষ্টি। ৩৫ সংখ্যক চর্যাগীতিটি ভাদেপাদের রচনা। গুরু উপদেশে কীভাবে তিনি সহজচিত্ত লাভ করেছিলেন, তা উল্লিখিত হয়েছে এই পদে। টীকাকার বলেছেন, ভদ্রপাদ ‘জ্ঞানানন্দপ্রমোদ’-যুক্ত সিদ্ধাচার্য। পদটিতেও সর্বধর্ম-অনুপলম্ভরূপ চরম জ্ঞানের স্বরূপ বিধৃত হয়েছে। পদটিতে ‘বাজুল’ (বজ্রকুল) শব্দটির প্রয়োগ দেখে মনে হয়, ভাদেপাদ বজ্রকুলের সাধক ছিলেন।
মহীধরপাদ
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির পুথিতে প্রাপ্ত ১৬ সংখ্যক পদটির রচয়িতা মহিণ্ডা। ভণিতায় ‘মহিণ্ডা’ নামটি পাওয়া গেলেও টীকায় তাঁর নাম মহীধরপাদ। লামা তারানাথ তাঁকে ‘মহিল’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঞ্জুর তালিকা বলা হয়েছে যে, ‘মহিপাদ’ ছিলেন আচার্য কৃষ্ণের অর্থাৎ কাহ্নপাদের বংশধর (শিষ্য)। বায়ুতত্ত্ব দোহাগীতিকা গ্রন্থটি মহীধরপাদের রচনা। তাঁর রচিত চর্যাগীতিটি ধ্বনিগাম্ভীর্যে, ২৬ মাত্রার দীর্ঘায়িত ছন্দের গজগতিতে এবং রূপক-কল্পনার সৌন্দর্যে বেশ উপভোগ্য। টীকাকার বলেছেন, "জ্ঞানপানপ্রমত্তো হি সিদ্ধাচার্য মহীধর”। এই জ্ঞানদৃষ্টির সঙ্গে কবির শিল্পদৃষ্টিও প্রশংসনীয়। পদটির সঙ্গে কাহ্নপাদ রচিত ৯ সংখ্যক পদের ভাব ও চিত্র-সাদৃশ্য কাহ্নপাদের সঙ্গে মহীধরপাদের নিকট সম্পর্কেরই সূচক। তবে ড. নির্মল দাশ এই পদের ভণিতায় ক্রিয়াপদে বহুবচন দেখে অনুমান করেন যে, পদটি মহীধরপাদের “শিষ্যানুশিষ্যদেরও” রচনা হতে পারে।
ধামপাদ
[সম্পাদনা]লামা তারানাথের মতে, ধম্মপাদ বা ধামপাদ ছিলেন কাহ্নপাদের শিষ্য। কাহ্নপাদ যখন গুরুকে উদ্ধার করতে শিষ্যদের নিয়ে গোবিন্দচন্দ্রের রাজ্যে আসেন, তখন রাজা তাঁদের উদ্দেশ্যে এক ভোজের আয়োজন করেন। কাহ্নপাদ বলেন, শিষ্য ধম্ম ও ধূমকে ভোজনে তৃপ্ত করলেই সকলে পরিতৃপ্ত হবেন। রাজার সংগৃহীত সমস্ত ভোজ্যদ্রব্য ধম্ম ও ধূম নিঃশেষ করেন। এতে সবাই তাঁদের সিদ্ধি বুঝতে পারেন। তাঞ্জুর তালিকায় আচার্য ধর্মপাদকে কৃষ্ণ অর্থাৎ কাহ্নপাদের বংশধর বলা হয়েছে। ধামপাদ সুগত দৃষ্টি গীতিকা, মহাযান নিষ্পন্নক্রম, হুঙ্কার চিত্তবিন্দু ভাবনাক্রম প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। চর্যাগীতির পুথিতে সংকলিত ৪৭ সংখ্যক পদটি তাঁর রচনা। এই পদেও নিষ্পন্নক্রম সাধনের কথাই বিবৃত হয়েছে: প্রজ্ঞোপায় সমতাযোগে চণ্ডালী প্রজ্বলিত হয়, অপরিশুদ্ধা নাড়ী দগ্ধ হয় এবং তখন নাড়ীর অধিদেবতা ও চিত্ত বিশ্রাম লাভ করে মহাসুখচক্রে। প্রকারান্তরে কাহ্নপাদ কথিত ‘কামচণ্ডালী’ সাধনার কথাই এখানে পুনর্কথিত হয়েছে। গানটি হেবজ্রতন্ত্র-এর ‘চণ্ডালী জ্বলিতা নাভৌ’ শ্লোকটির ভাষা-অনুবাদ।
কঙ্কণ
[সম্পাদনা]চর্যাগীতির পুথিতে ৪৪ সংখ্যক পদটি কঙ্কণের রচনা। পুথিতে তাঁর নাম কোঙ্কণ বলে উল্লিখিত। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও তাঁকে সেই নামেই অভিহিত করেছেন। কিন্তু ড. সুকুমার সেনের মতে, তাঁর নাম কৌঙ্কণ। ড. নির্মল দাশের মতে, কঙ্কণ কবির ছদ্মনাম। সম্ভবত কঙ্কণ ছিল তাঁর লব্ধ-উপঢৌকন। সেকালে কবিরা এভাবে প্রাপ্ত উপঢৌকনের নামে ছদ্মনাম গ্রহণ করতেন। কথিত আছে, তিনি আচার্য কম্বলের বংশধর। তাঞ্জুর তালিকায় তাঁকে সিদ্ধ সাধক বলা হয়েছে। টীকাকার তাঁকে পরম করুণাসব পানে প্রমুদিত ‘কঙ্কণ সিদ্ধাচার্য’ বলেছেন। কঙ্কণের পদটিতে মধ্যমা নিরোধের যুগনদ্ধ ফলোদয়ের অবস্থাটির বর্ণনা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র মাপের মাত্রা ছন্দ (১১ মাত্রার রসিকা) কঙ্কণই ব্যবহার করেছেন। ছন্দে বৈচিত্র্য এনেছে ষোড়শ-মাত্রিক বন্ধনের সঙ্গে ১১ মাত্রার চরণ: “সুনে সুন মিলিআ জবেঁ। সঅল ধাম উইআ তবেঁ।।” চর্যাদোহাকোষগীতিকা তাঁর রচনা। সম্ভবত আর কোনও গ্রন্থ তিনি রচনা করেননি।
গুণ্ডরীপাদ
[সম্পাদনা]৪ সংখ্যক চর্যাগীতিটি গুণ্ডরীপাদের রচনা। গানটিতে ‘গুড়রী’ ভণিতা দেওয়া হয়েছে। অ্যালবার্ট গ্রানওয়েডেল সিদ্ধাচার্যদের যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন, তাতে গুণ্ডরী নামটি আছে। বিনয়শ্রীর সিদ্ধবন্দনা গ্রন্থেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। কিন্তু তাঞ্জুর তালিকায় এই নামের কোনও লেখকের কথা উল্লিখিত হয়নি। ড. সুকুমার সেনের মতে, গুণ্ডরী সম্ভবত ব্যক্তিনাম নয়, কবির জাতি বা পেশাবাচক নামক এবং সম্ভবত মশলা ইত্যাদি গুঁড়ো করা ছিল কবির পেশা। পুথিতে সংকলিত চর্যাটিতে কুন্দুরু যোগের একটি সংকেত পাওয়া যায়। পদটিতে নরনারীর প্রেম-মিলনের স্থূল বর্ণনা আছে। ড. সেন গানটিতে যৌন-তান্ত্রিকতার স্পষ্ট ইঙ্গিত ও পারিভাষিক শব্দের আধিক্যের কারণে পদকর্তাকে অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন বলে বিবেচনা করেছেন। পদের শেষে কবির আত্মপ্রশংসা লক্ষণীয়।
তাড়কপাদ
[সম্পাদনা]৩৭ সংখ্যক চর্যাগীতির রচয়িতা হিসেবে তাড়কের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তাঞ্জুর তালিকায় যে মহাপণ্ডিত তারশ্রী ও উপাধ্যায় তারপাদের নাম পাওয়া যায়, তাড়ক তাঁদেরই মধ্যে কেউ হতে পারেন। টীকাকার তাঁকে সিদ্ধাচার্য বলেছেন: “সিদ্ধাচার্য হি তাড়ক।” পদটিতে সহজজ্ঞানের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। কবির বস্তুদৃষ্টির পরিচয়ও পাওয়া যায় এতে। নৌকা-পারাপার ও পারানির কড়ি খোঁজার ছবিটি মনোজ্ঞ।
জয়নন্দী
[সম্পাদনা]৪৬ সংখ্যক চর্যাগীতিটি জয়নন্দীর রচনা। তিনি ‘জঅনন্দি’ নামেও পরিচিত। লামা তারানাথের গ্রন্থে জয়নন্দীর নাম পাওয়া যায় না। গ্রানওয়েডেল কৃত সিদ্ধাচার্যদের নামের তালিকায় ‘জয়নন্দ’ নামটি পাওয়া যায়। টীকাকার তাঁকে পরম করুণা অর্জনের নিমিত্ত ‘অভিজ্ঞালাভী’ বলেছেন। প্রাপ্ত পদটিতে পরমার্থ চিত্তের অদাহ্য অপ্লাব্য অচ্ছেদ্য রূপের বর্ণনা এবং পরমার্থতত্ত্বে লক্ষণ কথিত হয়েছে। পদটি অলংকার-বর্জিত ও সোজাসুজি তত্ত্ববাহী।
ঢেণ্ঢণপাদ
[সম্পাদনা]৩৩ সংখ্যক পদটি ঢেণ্ঢণপাদের রচনা। তিনি চেণ্ঢনপা বা টেণ্টনপা নামেও পরিচিত। তিব্বতি ইতিহাসে ঢেণ্ঢণপাদের নাম নেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, ভোট উচ্চারণে যিনি ধেতন, তিনিই ঢেণ্ঢণ। আবার ড. নির্মল দাশের মতে, টেণ্টনপা নামটি ছদ্মনাম। তাঁর পদটিতে যে ‘টেণ্টন’ অর্থাৎ ধূর্ত-সুলভ চাতুর্যের পরিচয় আছে, সেটিকে ড. দাশ কবির ব্যক্তিচরিত্রের নয়, বরং রীতিচরিত্রের পরিচায়ক বলেছেন। আগাগোড়া সন্ধ্যাভাষায় রচিত ঢেণ্ঢণপাদের চর্যাগীতিটিতে সন্ধ্যা-সংকেতে সংসারচিত্ত ও সহজচিত্তের স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে। পদে পদে পরস্পর-বিরোধী উক্তি এবং বিরোধালংকারের সমাবেশে পদটি দুরূহ হলেও উপভোগ্য। সাধক-কবির সূক্ষ্ম বস্তুদৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ শক্তিও প্রশংসনীয়। পদটিতে গৌড়ের দরিদ্র পরিবারের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবীরের একটি কবিতায় এবং সহদেব চক্রবর্তী ও লক্ষ্মণের অনিলপুরাণ ও গোর্খবিজয় কাব্যেও ঢেণ্ঢণপাদের পদটির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।
তন্ত্রীপাদ
[সম্পাদনা]তন্ত্রীপাদ রচিত ২৫ সংখ্যক চর্যাগীতিটি লুপ্ত। টীকা থেকে গানের শেষাংশের কিছু আভাস পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে, নৈরাত্মা যোগিনীর অভিষঙ্গে জাতিধর্ম লুপ্ত হয়ে যায়—হীন বৃত্তিধারী তন্ত্রী হন বজ্রধর। তিব্বতি অনুবাদ থেকে বোঝা যায় যে, গানটির বিষয় তাঁত বোনা। ‘তন্ত্রী’ নামটি জাতি-বৃত্তির স্মারক। ড. নির্মল দাশের মতে ‘তন্ত্রী’ ব্যক্তিনাম নয়, জাতিবাচক নাম। সিদ্ধাচার্যদের তালিকা ‘তান্তি’ শব্দটি আছে। জ্যোতিরীশ্বর ঠাকুরের বর্ণনরত্নাকর গ্রন্থে ‘তান্তিপা’ নামটি পাওয়া যায়।
ধর্মতত্ত্ব ও সাধনতত্ত্ব
[সম্পাদনা]সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ ছিল অসহায়। তখন থেকেই সাহিত্যের সঙ্গে ধর্মের একটি গভীর সম্পর্ক সূচিত হয়। বিশ্বের সকল ভাষার সাহিত্যেই তাই দেখা যায়, মানবীয় অনুভূতিগুলি প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাত্মচেতনার আবরণে। প্রাচীন ভারতে বেদ, উপনিষদ্, মহাকাব্য, পুরাণ সর্বত্রই এই দৃষ্টান্ত দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদও ছিল এক বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের সাধনসংগীত। পদগুলি রচনার ক্ষেত্রে পদকর্তারা বিশুদ্ধ সাহিত্যবোধের দ্বারা চালিত না হয়ে যে অন্যরকম সাধ্য ও সাধনপ্রণালীর কথাই বলতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যদিও তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, “যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সেই কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই”, তবু প্রাচীন বাংলার ধর্মসাধনার অঙ্গ হিসেবে রচিত এই সংগীতের অর্থবোধ ব্যতীত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সংগীত বা কাব্য ছিল সেযুগের ধর্মসাধনার অন্যতম সোপান। মঙ্গলকাব্য, নাথসাহিত্য, বৈষ্ণব পদাবলি, বাউল গান, শাক্ত পদাবলি প্রভৃতি মধ্যযুগের বিভিন্ন সাহিত্যধারাতেও এই একই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। চর্যার সাহিত্যমূল্য যেমন পরিমাপযোগ্য, তেমনই এই গানগুলিতে অবলম্বিত ধর্মের গূঢ় তত্ত্বও প্রণিধানযোগ্য। আধুনিক গবেষকেরা বৌদ্ধধর্মের নানা পুথি অনুসন্ধান করে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম ও সহজ-সাধনার স্বরূপ নির্ণয়ে প্রয়াসী হয়েছেন। এই বিষয়ে বিদেশি গবেষকদের পাশাপাশি ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও ড. শশিভূষণ দাশগুপ্তের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ড. বাগচী বাংলায় বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য এবং ইংরেজিতে স্টাডিজ ইন তন্ত্রজ এবং ড. দাশগুপ্ত ইংরেজিতে অবস্কিওর রিলিজিয়াস কাল্টস অ্যাজ ব্যাকগ্রাউন্ড অফ বেঙ্গলি লিটারেচার ও ইন্ট্রোডাকশন টু তান্ত্রিক বুদ্ধিজম গ্রন্থের রচয়িতা। পরবর্তীকালে সকল গবেষক এঁদের প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হয়ে সিদ্ধাচার্যদের নির্দেশিত ও অনুশীলিত ধর্মাচারের বিস্তৃত পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছেন।
গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগের পর তাঁর অনুগামীদের মধ্যে নানা মতভেদের কারণে বৌদ্ধধর্মে ভাঙন দেখা দেয়। ধর্মীয় আদর্শ পর্যালোচনার জন্য পরপর চারটি বৌদ্ধ মহাসংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রবল মতবিরোধের প্রেক্ষিতে বৌদ্ধসমাজ হীনযান ও মহাযান নামে দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রাচীনপন্থী হীনযানীদের ভাবনা তুলনামূলকভাবে কিছুটা সংকীর্ণ ছিল। তাঁরা ‘অর্হৎ’ অর্থাৎ নিজেদের মুক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। এঁদের মধ্যে পদ্ধতির ভিন্নতা অনুযায়ী শ্রাবকযান ও প্রত্যেকবুদ্ধযান নামে দুটি উপদল গড়ে ওঠে। শ্রাবকযানীরা বুদ্ধত্বলাভের দুরাশা পোষণ করতেন না, কেবল নির্ধারিত আচার-আচরণ পালন করে ধর্মের পথে পুণ্য অর্জনে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। যাঁরা বুদ্ধত্বলাভের উচ্চাশা পোষণ করতেন, তাঁরা প্রত্যেকবুদ্ধযানী নামে পরিচিত ছিলেন। এঁদের নিরিখে মহাযানীদের আদর্শ ছিল অনেক উদার। তাঁরা গৌতম বুদ্ধের ন্যায় পরোপকারে জীবন উৎসর্গ করে বোধিসত্ত্বাবস্থা লাভ এবং তার মধ্যে দিয়ে বুদ্ধত্ব অর্জনকেই আদর্শ বলে মনে করতেন। বোধিসত্ত্বাবস্থা লাভের উপায় হল শূন্যতা ও করুণার অভিন্নতায় বোধিচিত্তের জাগরণ ঘটানো। বোধিপ্রাপ্ত ব্যক্তির পক্ষে বুদ্ধত্বলাভের একমাত্র সোপান বোধিসত্ত্বাবস্থায় উন্নীত হওয়া সহজ হত। বোধিচিত্ত কী এবং কীভাবে তাকে জাগরিত করা যায়, সে আলোচনা আবশ্যক। মহাযানীদের মতে, জাগতিক কোনও বস্তুরই নিজস্ব কোনও ধর্ম বা স্বরূপ নেই। অথচ প্রত্যেকের যে প্রাতিভাসিক স্বরূপ দেখা যায়, তা অন্য কোনও স্বরূপের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং পার্থিব সকল বস্তুই প্রকৃত অস্তিত্বহীন। বস্তু সম্পর্কে এই জাতীয় জ্ঞানই শূন্যতাজ্ঞান। যখন সাধক জগৎ-সংসারে উক্ত শূন্যতাজ্ঞান এবং বিশ্বব্যাপী করুণাকে একত্র সংযুক্ত করেন, তখন যে মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় সেটিই হল বোধিচিত্ত (“শূন্যতা করুণাভিন্নং বোধিচিত্তম্”)। সাধকের মনে বিশ্বব্যাপী করুণার উদয় ঘটলে তিনি কেবল নিজের মুক্তিপ্রয়াসী হন না, পরোপকারের মধ্যে দিয়ে জগতের সকলের মুক্তিপ্রয়াসী হয়ে ওঠেন। বস্তুত মহাযানী মতের জনপ্রিয়তার কারণ নিহিত হয়ে রয়েছে তাঁর আদর্শে, সকল জীবের মধ্যে বুদ্ধত্ব কল্পনায় এবং সদাচারী পন্থায়। বিশ্বের সকল জীবের মুক্তির জন্য এভাবে পরোপকারে আত্মোৎসর্গ করার কথা অন্য কোনও ধর্মমতে বিশেষ দেখা যায় না। মৈত্রী, করুণা, অহিংসা প্রভৃতি মানবিক সদ্বৃত্তির অনুশীলনও মহাযানকে সকলের কাছে গ্রহণীয় করে তুলেছিল। বৌদ্ধ পরিভাষায় উক্ত সদ্বৃত্তিগুলিকে বলা হয় ‘পারমিতা’। জগতের শূন্যস্বভাবে বিশ্বাস হেতু মহাযানীরা ‘শূন্যবাদী’ নামে পরিচিত হন। দার্শনিক মত বিচারের সূক্ষ্মতায় মহাযানীদের মধ্যেও দুটি উপদল ছিল। যাঁরা প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির মধ্যবর্তী পথ ধরে চলতে চাইলেন, তাঁরা ‘মধ্যমক’ শাখার অন্তর্গত ছিলেন। অন্যদিকে যাঁরা বস্তুসত্তাকে চিৎসত্তায় পরিণত করে চৈতন্যরূপী জ্ঞানের মধ্যেই সমস্ত জগৎকে ধারণ করতে চাইলেন, তাঁরা গণ্য হতেন যোগাচার শাখার দার্শনিক হিসেবে। মধ্যমক মতের প্রবর্তক নাগার্জুন। যোগাচার মতের সাধন-পথের দিকটিতে অসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব দিলেও এটির দার্শনিক দিকটি গড়ে ওঠে বসুবন্ধুর নেতৃত্বে। যোগাচারবাদীরা বলতেন, “সর্বং বুদ্ধিময়ং জগৎ”। এই কারণে এই মতটি ‘বিজ্ঞানবাদ’ নামেও পরিচিত ছিল।
মহাযান বৌদ্ধধর্মের যোগাচার তথা বিজ্ঞানবাদ থেকে সহজযানে এই মতের রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পদক্ষেপ। এর পিছনে বৈদিক ও পৌরাণিক হিন্দুধর্মের প্রভাব ছিল বলেই গবেষকদের ধারণা। অষ্টম শতকে শঙ্করাচার্য ও কুমারিল ভট্টের দ্বারা ভারতীয় সমাজে ব্রাহ্মণ্য সংস্কার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে নাস্তিক্যবাদী বৌদ্ধধর্মেও দেবদেবীদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়। এই দুর্বলতার সুযোগে হিন্দু তন্ত্রের দেহকেন্দ্রিক যোগসাধনার প্রক্রিয়াটি যোগাচার মতে গ্রাস করে। ইতিপূর্বে যাঁরা ‘পারমিতা’ অর্থাৎ দান, শীল, ক্ষান্তি, বীর্য প্রভৃতি পরম গুণের অনুশীলনের মাধ্যমে বোধিসত্ত্বাবস্থা লাভের কথা বলতেন, তন্ত্রের প্রভাবে তাঁরাই মন্ত্রশক্তির প্রয়োগে আকাঙ্ক্ষিত বোধিসত্ত্বাবস্থাকে স্থায়ী করার কথা বললেন। এভাবে মন্ত্রের সংযোগে যোগাচার মত প্রথমে ‘মন্ত্রনয়’-এ পরিণত হল, তারপর এই পথেই নানাপ্রকার তান্ত্রিক গুহ্যাচার প্রবেশ করল এই মতে। বলা বাহুল্য, ভারতের বিভিন্ন শ্রেণির ধর্মসাধনার মধ্যে তন্ত্রের আচারনিষ্ঠা প্রশ্নাতীত এবং এই মত বুদ্ধিগ্রাহ্য আলোচনা অপেক্ষা অধিক প্রাধান্য দেয় কার্যকরী আচার-পদ্ধতিকেই। তন্ত্রের হাত ধরে মন্ত্র, মণ্ডল ও মুদ্রা এভাবেই ঢুকে পড়ল শীল ও সদাচার-নির্ভর বৌদ্ধধর্মে। যৌনযোগাচার-কেন্দ্রিক সাধনপদ্ধতিও বাদ গেল না। মন্ত্রনয় বা মন্ত্রযান পরিচিত হল বজ্রযান নামে। কালক্রমে বজ্রযানেও সাধনার তারতম্যে কিছু উপবিভাগ গড়ে উঠল: ক্রিয়াতন্ত্র, যোগতন্ত্র, চর্যাতন্ত্র, অনুত্তরতন্ত্র। বজ্রযানের পরবর্তী পরিণতি কালচক্রযান ও সহজযান। চর্যাপদের প্রাপ্ত পুথিতে উক্ত তিন যানের প্রভাব থাকলেও বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সহজযানী বৌদ্ধ মত। তাই এই সহজযান মতটি আলোচনা করা প্রয়োজন।
মহাযানী মতের শূন্যের ধারণাটি পূর্বেই বজ্রে পরিণত হয়েছিল। এবার বজ্র পরিণত হল ‘সহজ’-এ। হেবজ্রতন্ত্র মতে, জন্মের সঙ্গেই যা উৎপন্ন হয় তাই ‘সহজ’ (“সহজাত্যং যদুৎপন্নং সহজং তৎ প্রকীর্তিতম্।”)। দেহ হল সেই সহ-জ উপাদান, যা জীব জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাপ্ত হয়। হিন্দু তন্ত্রেও দেহের প্রাধান্য স্বীকার করে বলা হয়েছে, “যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে”। মহাযান মতে, শূন্যতা ও করুণার মিলনে যে বোধিচিত্তের উদ্ভব ঘটত, সহজযানে তা হল প্রজ্ঞা ও উপায়ের সংযুক্তিতে। প্রজ্ঞা ‘প্রকৃতি’ রূপে এবং উপায় ‘পুরুষ’ রূপে বিবেচিত হল এই মতে। তন্ত্র মতে, পরমার্থ সত্য দুই রূপে প্রতিভাত—নিবৃত্তিরূপ পুরুষ বা শিব এবং প্রবৃত্তিরূপ প্রকৃতি বা শক্তি। যখন শিব ও শক্তি অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতি অদ্বয়স্বরূপে মিলিত হয় তখন পরমার্থ সত্য লাভ করা যায়। এই মিথুন বা মিলিতাবস্থাই জীবের কাম্য। কারণ এই মিলন বিশ্বের সৃষ্টিপ্রবাহের কারণ। হঠযোগপ্রদীপিকা গ্রন্থে বলা হয়েছে, কায়াসাধনায় দেহস্থ বামগা নাড়ী ঈড়া ও দক্ষিণগা নাড়ী পিঙ্গলা যথাক্রমে শক্তি ও শিবের প্রতীক। এই দুই নাড়ীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত প্রাণ ও অপান বায়ুকে দেহমধ্যস্থিত নাড়ী সুষুম্নার পথে চালিত করে মস্তকে স্থিত সহস্রারে প্রেরণ করতে পারলেই অদ্বয় সিদ্ধি ঘটে। এই বিশুদ্ধ দার্শনিক বিষয়টির সঙ্গে পার্থিব নরনারীর যৌনমিলনকে এক করে ফেলা হয়েছে তন্ত্রের আর-একটি অপার্থ (malicious) ধারণায়। সেটি হল, প্রতিটি নারী ও পুরুষের মধ্যে শক্তি ও শিব বিদ্যমান থাকলেও শিব-প্রাধান্যে যে-কোনও পুরুষই শিব এবং শক্তি-প্রাধান্যে নারীমাত্রেই শক্তি। অতএব শিব-শক্তির মিলন বলতে প্রাকৃত নরনারীর যৌনসংযোগকেই বোঝায়। চর্যার সাধকেরা যে সাধনসঙ্গিনী নিয়ে সাধনায় অগ্রসর হতেন, তার পিছনে তন্ত্রের এই প্ররোচনা বিপুলভাবে কাজ করেছে।
সহজযানের পরম লক্ষ্য অদ্বয় মহাসুখের উপলব্ধি। মহাসুখের অপর নাম সহজ বা সহজানন্দ। নির্বাণ ও মহাসুখ এক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন। তাই সহজযানী সিদ্ধাচার্যেরা তাঁদের গানে বারবার মহাসুখের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। চর্যাকার লুইপাদ চিত্তকে দৃঢ় করে মহাসুখ পরিমাণ করতে নির্দেশ দেন। ভুসুকুপাদ বলেন, তিনি মিলনলীলার মধ্যেই সহজানন্দ মহাসুখকে উপলব্ধি করেছেন। কম্বলাম্বরপাদ জানান, বাম ও দক্ষিণকে চেপে সুষুম্নার সঙ্গে মিলিয়ে দিতেই মহাসুখ মিলন। এইভাবে কাহ্নপাদ, শবরীপাদ, দারিকপাদ প্রমুখ কবিদের রচনায় মহাসুখের স্বরূপ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাতে বোঝা যায়, মহাসুখ বা সহজানন্দ একটি অচিন্ত্যনীয় মহাসুখকর অনুভব। এই সহজসুখ উৎপন্ন হয় যে স্থানে, সেই চরমকেন্দ্রটিকে কেউ জিনপুর, কেউ বা কামরূপ, আবার কেউ অনুত্তরধাম, পারিমকুল, কিংবা জোহ্নাবাড়ি ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করেছেন। মহাসুখের লক্ষ্যে পৌঁছাতে শাস্ত্রপাঠ, জপতপ, প্রব্রজ্যা বা সন্ন্যাসগ্রহণের মতো বাহ্যানুষ্ঠান ত্যাগ করার কথাও বলে হয়েছে। প্রজ্ঞা ও উপায়ের মিলিত রূপই যুগনদ্ধ বলে কথিত। এই অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে ও ক্ষণে ভিন্ন ভিন্ন আনন্দের উদ্ভব ঘটে। সহজ মহাসুখের অপর লক্ষণ হল শূন্যতা। সাধকের অবস্থানভেদেও শূন্যতার প্রকারভেদ আছে। কায়, বাক্ ও চিত্তের সমবায়ে জীবের সত্তাবোধ। যখন এগুলির অস্তিত্ব শূন্য হয়ে পড়ে তখনই বোধিচিত্তের সর্বশূন্যতার প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই অবস্থাকে চর্যাকারেরা নানা ভাবে প্রতীকায়িত করেছেন। কখনও বলেছেন শূন্য প্রান্তর, কখনও বা প্রতিবেশীহীন পর্বতের টিলা। বর্ণচিহ্নরূপহীন চরম শূন্যস্বভাব এই মহাসুখ। এর সর্বরিক্ত রূপ ভুসুকুপাদের ৪৯ সংখ্যক চর্যাটিতে প্রতীকী উপস্থাপনায় উজ্জ্বল। নির্দয় বঙ্গাল দেশ লুণ্ঠন করে সেখানে। পঞ্চপাটন, ইন্দ্রের মতো বিষয়-আশয় সব বিনষ্ট হয়, সোনা-রুপো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। চর্যার মহাসুখের ধারণাকে নানা মাত্রায় দেখা সম্ভব। কখনও তা মিলনজনিত একটি সহজ আনন্দঘন অবস্থা, আবার কখনও তা সর্বশূন্যের সার্থক পরিণাম। যেহেতু বিজ্ঞানবাদ থেকেই এর সূচনা, তাই এর মধ্যে নিরালম্ব বিশুদ্ধ বিজ্ঞানকেও পাওয়া যায়। এবং এই মহাসুখবৃক্ষের ফল হল মহাকরুণা। দেহের মধ্যে চারটি অবস্থান কল্পনা করে চক্র, ক্ষণ, আনন্দ, শূন্যতা ইত্যাদি ভেদে মহাসুখের ক্রমোৎকর্ষের বিভিন্ন অভিধা কল্পনা করা হয়েছে। নিচের ছকটিতে তারই আভাস দেওয়া হল:
| মস্তক | মহাসুখচক্র | সহজানন্দ | বিলক্ষণ | সর্বশূন্য | নৈরাত্মা | চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত |
| হৃদয় | ধর্মচক্র | বিরমানন্দ | বিমর্দ | মহাশূন্য | চিত্ত | গ্রাহ্য ও গ্রাহক শূন্য |
| কণ্ঠ | সম্ভোগচক্র | পরমানন্দ | বিপাক | অতিশূন্য | বাক্ | গ্রাহক শূন্য |
| নাভি | নির্মাণচক্র | প্রথমানন্দ | বিচিত্র | শূন্য | কায় | গ্রাহ্যশূন্য |
সাধ্য এই মহাসুখকে সাধক কীভাবে লাভ করেন অর্থাৎ চতুষ্কোটি বিনির্মুক্ত সাধনার পথটি কী তাও আলোচনা করা হয়েছে। চর্যার হেঁয়ালিপূর্ণ রহস্যময় ভাষা ভেদ করে যেটুকু বোঝা গিয়েছে তা হল, এই ঈড়া ও পিঙ্গলা নাড়ী যখন মুক্ত অবস্থায় থাকে তখন যাবতীয় সুখদুঃখের অনুভূতি জীবের অস্তিত্বকে মথিত করে। আর যখন পরস্পর সংযুক্ত হয় এবং মধ্যনাড়ী সুষুম্নার পথে চালিত হয়, তখন বাহ্যেন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ হয়ে অন্তর্লোক উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সাংবৃতিক বোধিচিত্ত এইভাবে পারমার্থিক বোধিচিত্তে পরিণত হওয়ার অবস্থায় পৌঁছায়। সম্পূর্ণ মননপ্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল এই সাধনপথটি কবিরা রূপকের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। এই রূপক কোথাও নৌকা বাওয়ার, কোথাও ইঁদুর মারার, কোথাও মত্ত হাতির পদ্মবন বিনষ্ট করার, আবার কোথাও তুলো ধোনা কিংবা মদ চোলাইয়ের। পুদ্গলচিত্তকে নিঃস্বভাবীকৃত করতে পারলেই জিনপুরে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। ডোম্বীপাদ তাঁর একটি পদে এই নাড়ীদ্বয় ও মধ্যপথে তাদের প্রবেশ করানোর বিষয়টি প্রতীকী আভাসে ব্যঞ্জিত করে তুলেছেন:
গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ।
তঁহি বুড়িলী মাতঙ্গী পোইআ লীলেঁ পার করেই।।...
চন্দ সূজ্জ দুই চকা সিঠি সংহার পুলিন্দা।
বাম দাহিন দুই মাগ ন রেবই বাহতু ছন্দা।।
এমন বহু পদেই কায়াসাধনার তত্ত্বটি সুন্দরভাবে প্রকাশিত। কাহ্নপাদের একটি পদে কাপালিক যোগীর সাধনায় দেহপ্রাধান্য সরাসরি উচ্চারিত: “দেহ নঅরী বিহরই একাকারেঁ”। চর্যাগীতিগুলিতে গুরুবাদের প্রসঙ্গও এসেছে। গুহ্য সাধনপ্রক্রিয়া মাত্রেই গুরুগম্য জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। বিশেষত তান্ত্রিক আচারে অনভিজ্ঞ বালযোগীকে দেহকেন্দ্রিক কৃত্যাদিতে সাহায্য করেন গুরু। তাই চর্যাকারেরা বলেছেন: “বাহতু কামলি সদ্গুরু পুচ্ছি”, কিংবা “সদ্গুরু বোহেঁ জিতেল ভববল”, অথবা “সদ্গুরু পাঅপএঁ জাইব পুনু জিনউরা” ইত্যাদি। কোথাও আবার গুরুর অপ্রয়োজনীতা ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে “গুরু বোব সিসা কাল”। আসলে বিশুদ্ধ তত্ত্বকথায় গুরুর ভূমিকা ন্যূনতম, কিন্তু তান্ত্রিক গুহ্যাচার পালনে গুরুই পথনির্দেশক। চর্যায় সাধকের নানা অবস্থার বর্ণনা আছে। যখন তিনি বিষয়বদ্ধ তখন একরকম, সাধনার প্রাথমিক স্তরে অন্যরকম, ক্রমশ প্রবৃত্তিনাশে তাঁর স্বভাব পরিবর্তিত, মস্তক বা উষ্ণীষকমলে যখন তাঁর চিত্তের অবস্থান তখন সে অনুভূতি ভিন্ন ধরনের, আবার সহজানন্দ লাভের পর সিদ্ধ সাধকের অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। প্রতিটি স্তরে সাধক এক-একজন শক্তি বা সাধনসঙ্গিনীর অস্তিত্ব অনুভব করেন। এঁরাই সংকলিত পদগুলিতে শবরী, ডোম্বী, চণ্ডালী, যোগিনী, নৈরামণি ইত্যাদি নামে খ্যাত। সম্ভোগচক্রের নৈরামণি মহাসুখচক্রে উন্নীত হয়ে সহজসুন্দরীতে পরিণত হন। এইভাবে প্রেমের রূপকে সাধনকথা পরিবেশিত হয়েছে এখানে। বস্তুত এই পথ ধরেই সহজিয়া বৌদ্ধধর্মের অবশ্যম্ভাবী পতনের বীজও অঙ্কুরিত হয়েছিল। মূলত ব্যভিচারের কারণে বৃহত্তর সমাজ সেই আমলে এদের বর্জন করতে চেয়েছিল। তুর্কি আক্রমণের পর মুণ্ডিতমস্তক বৌদ্ধ সহজিয়ারা ‘নেড়া-নেড়ী’ নামে অভিহিত হয়ে সমাজবিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিনযাপন করতে থাকেন। পরবর্তীকালে নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র এঁদের বৈষ্ণবধর্মের দীক্ষিত করে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। বীরভদ্রের বৈষ্ণব সাধনায় কিছুটা সহজিয়া প্রভাব পড়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা।
ভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাপদের ভাষাপ্রসঙ্গটি বিতর্কিত। বিশেষত চর্যাপদ কোন ভাষায় রচিত তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সম্পাদিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পরই। উক্ত বইটি ছিল চারটি পুথির সংকলন: মুনিদত্তের সংস্কৃত টীকা সহ চর্যাপদের পুথি, সরহপাদ ও কাহ্নপাদের দোহাকোষ পুথিদ্বয় এবং ডাকার্ণব। শাস্ত্রী মহাশয় চারটি পুথিই হাজার বছরের পুরোনো বাংলা ভাষার লেখা বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এই মত সবাই মেনে নেননি। বিতর্কের সূচনা সেই থেকেই। আসলে চর্যাপদ যে সময়ে রচিত হয়েছে, ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের বিচারে সেই সময়টি নব্য ভারতীয় আর্যভাষাগুলির উদ্ভবকাল। সবে তখন অপভ্রংশের গর্ভ থেকে বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া, মগহি, অওধি, ভোজপুরি প্রভৃতি ভাষা ভূমিষ্ঠ হতে শুরু করেছে। একই জঠরে বেড়ে ওঠার ফলে এগুলির মধ্যে ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক ও শব্দভাণ্ডারগত পার্থক্য খুবই কম। গবেষকদের বিভ্রান্তির কারণ সেটাই। ভাষা সাবালক হলে তার এমন কিছু নিজস্ব চিহ্ন প্রকাশিত হয়, যেগুলি ভাষার প্রভেদকারী বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু বাংলা ভাষায় তা ঘটার আগেই চর্যাপদ রচিত হয়েছে, ফলে সংশয়ের জাল সহজেই বিস্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ১৯২০ সালে ভাষাতাত্ত্বিক বিজয়চন্দ্র মজুমদার বঙ্গবাণী মাসিক পত্রিকায় কয়েকটি প্রবন্ধে এবং হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল ল্যাংগুয়েজ গ্রন্থে বলেন যে, চর্যাগীতিগুলি পুরনো বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি, এতে দু-চারটি বাংলা, ওড়িয়া ও অসমিয়া পদ থাকলেও মূল ভাষাছাঁদ হিন্দির। ১৯২১ সালে জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ হারমান জেকবি তাঁর সম্পাদিত সনৎকুমারচিতম্ গ্রন্থের ভূমিকায় চর্যাপদের ভাষাকে “All Bengalishch” বা প্রত্ন-বাংলা বলে নির্দেশ করেন, কিন্তু কোনও খাঁটি যুক্তি তিনি দিতে পারেননি। ১৯২৬ সালে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দ্য বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ গবেষণাগ্রন্থে চর্যাগীতির ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ, ছন্দ, বাগ্বিধি ইত্যাদি বিচার করে প্রথম একটি সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। তিনি স্পষ্ট জানালেন যে, দোহাকোষ দুটির ও ডাকার্ণব পুথির ভাষা শৌরসেনী অপভ্রংশ, কিন্তু চর্যাগানের ভাষা আদিতম বাংলা। অবশ্য এই বাংলায় কিছু পশ্চিমা অপভ্রংশ এবং দু-চারটি ওড়িয়া-মৈথিলী শব্দ মিশে আছে। তাঁর তীক্ষ্ণ, শক্তিশালী ও বাস্তবসিদ্ধ যুক্তিগুলি মেনে নিতে কোনও অসুবিধাই হল না। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও তাঁর Les Chants Mystique de Saraha et de Kanha গবেষণাগ্রন্থে সুনীতিকুমারের মতটি মেনে নেন।
অন্যান্য ভাষার গবেষকেরাও অবশ্য চর্যাপদ তাঁদের ভাষায় রচিত বলে দাবি করেছিলেন। রাহুল সাংকৃত্যায়ন, জয়কান্ত মিশ্র ও কাশীপ্রসাদ জয়সওয়াল বলেন, চর্যাপদের ভাষা বিহারি এবং সিদ্ধাচার্যদের অধিকাংশই মগধ অঞ্চলের বাসিন্দা। ১৯৩৫ সালে বরোদায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ওরিয়েন্টাল কনফারেন্সের সপ্তম অধিবেশনে উক্ত তিন হিন্দিভাষী পণ্ডিত চর্যাপদের উপর বাংলা ভাষার দাবিকে অস্বীকার করেন। চর্যায় ‘জো’, ‘সো’, ‘তো’, ‘মই’ প্রভৃতি সর্বনাম, ‘অইসন’, ‘জইসন’, ‘ঐছে’, ‘তৈছে’, ‘জিস’, ‘তিস’, ‘জসু’, ‘তসু’ প্রভৃতি সর্বনামীয় ক্রিয়াবিশেষণ, ‘রাতি পোহাইলী’-র ন্যায় ক্রিয়াপদের স্ত্রীলিঙ্গীকরণে হিন্দি ও মৈথিলীর বিশেষত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও দেখার যে এই দুই ভাষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ‘-ক’, ‘-কো’ বিভক্তি যোগে ষষ্ঠীর পদগঠন এবং ‘-অল’, ‘-অব’ বিভক্তি যোগে যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াপদ গঠনের দৃষ্টান্ত চর্যাপদে নেই। ভাষাগত সাদৃশ্যের কারণে ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষার দাবিও চর্যাপদের উপর আছে। যেমন, ওড়িয়াতে সংস্কৃত প্রভাবজাত বর্তমান কালবাচক ক্রিয়াপদে ‘-অন্তি’ বিভক্তির ব্যবহার চর্যায় দেখা যায়: “নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী” কিংবা “ভনন্তি মহিণ্ডা”। কিন্তু এটাও লক্ষণীয় যে, ‘-রু’ দিয়ে অপাদানের পদগঠন, সর্বত্র ‘-র’ বিভক্তি দ্বারা ষষ্ঠীর পদগঠন, ‘-মানে’ পরসর্গ যোগে বহুবচনের পদনির্মাণ, যা ওড়িয়া ভাষার বিশিষ্ট লক্ষণ, তার একটি দৃষ্টান্তও চর্যাগানে পাওয়া যায় না। অসমিয়া ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দু-একটি ক্ষেত্রে অসমিয়া ভাষার ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য দেখা গেলেও কয়েকটি বিশিষ্ট ও প্রধান ক্ষেত্রে চর্যাগীতির বাক্যগঠন রীতি অসমিয়া ভাষার তুলনায় পৃথক। চর্যার ভাষায় শৌরসেনী অপভ্রংশের লক্ষণ ও শব্দের ব্যবহারও স্বাভাবিক। কারণ, মাগধী প্রাকৃত থেকে জাত মাগধী অপভ্রংশ প্রাত্যহিক ব্যবহারে প্রচলিত থাকলেও শিষ্ট সাহিত্যের ভাষা হিসেবে অষ্টম-নবম শতকে ব্যবহৃত হত শৌরসেনী অপভ্রংশ। চর্যাকারেরা যে যুগের মানুষ ছিলেন সেই যুগের বাংলার ভৌগোলিক সীমা আজকের তুলনায় অনেক বেশি প্রসারিত ছিল। সেযুগের বাংলা-বিহারের বৌদ্ধ সংঘগুলিতে ভারতের নানা প্রান্তের মানুষ একত্র হতেন শিক্ষা ও ধর্মলাভের উদ্দেশ্যে। ভাষা হিসেবে শৌরসেনী অপভ্রংশের গ্রহণযোগ্যতা সেযুগে ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু চর্যাপদে বাংলা ভাষার লক্ষণ, যা ত্রিস্তরীয় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এসেও আধুনিক যুগেও সমানভাবে উপস্থিত, তা এমনভাবে সেঁটে রয়েছে যে তার পরিমাণগত প্রাচুর্যে একে অবশ্যই প্রাচীন বাংলা ভাষা বলে চিহ্নিত করা যায়। বিশিষ্ট গবেষকদের আলোচনার সারাৎসারটুকু উপস্থিত করে বাংলার এই বিশিষ্ট লক্ষণগুলিকে বুঝে নেওয়া যেতে পারে:
- (ক) ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- সংস্কৃত বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঋ, ৯ প্রভৃতি বর্ণ বাংলা বর্ণমালায় এলেও বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনির উচ্চারণে হ্রস্ব-দীর্ঘ পার্থক্য রক্ষিত হয় না। চর্যার বানানেও এই বিশেষ লক্ষণটি দেখা যায়। যেমন, চিএ, চিঅ; হোহী, হোহি; লুই, লূই; বোহী, বোহি ইত্যাদি।
- স্বরবর্ণের মতো ব্যঞ্জনবর্ণের ক্ষেত্রেও দেখা যায় স্বতন্ত্র ধ্বনিজ্ঞাপক চিহ্ন থাকলেও বাংলায় সেগুলির উচ্চারণে বিশেষ পার্থক্য নেই। জ-য, ণ-ন, শ-ষ-স ইত্যাদি ক্ষেত্রে উচ্চারণে কোনও পার্থক্য দেখা যায় না। চর্যাতেও স্বভাবতই এইসব বর্ণের লিপি-বিপর্যয় লক্ষ্য করা গিয়েছে। যেমন, জোইনি, যোইনী; যাই, জাই; নাবী, ণাবী; শবর, সবর; শূন, সূণ; ষিআলা, শিয়ালী ইত্যাদি।
- অর্থপার্থক্য সৃষ্টি কিংবা বিশেষ কোনও আবেগ প্রকাশের জন্য বাংলায় ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব উচ্চারণ করা হয়। চর্যার ভাষায় তার ছাপ সুস্পষ্ট। যেমন, ফাড্ডিঅ, নিঅড্ডী, চ্ছাড়ী ইত্যাদি।
- (খ) রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- বাংলা ভাষার সমস্ত কারকে ‘-এ’ বিভক্তির প্রয়োগ লক্ষিত হয়। চর্যার ভাষাতেও ‘-এ’ বা ‘-এঁ’ বিভক্তির এইরকম প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন, কর্তৃকারকে—কুম্ভীরে খাঅ; কর্মকারকে—গঅবরেঁ তোলিআ; করণকারকে—কুঠারে ছিজঅ; সম্প্রদান কারকে—ধামার্থে চাটিল; অপাদান কারকে—জামে কাম কি কামে জাম; অধিকরণ কারকে—ঘরে সান্ধঅ।
- আধুনিক বাংলায় যেমন কর্ম-কর্তৃ বাচ্য গঠন করা হয়ে থাকে, চর্যাতেও অবিকল তারই প্রতিরূপ দেখা যায়। যেমন, নানা তরুবর মৌলিল রে, ডমরু বাজএ বীরনাদে।
- বাংলা ভাষার বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ চর্যাতেও বিভিন্ন কারকে দেখা যায়। যেমন, তৃতীয়াতে ‘-তেঁ’ বিভক্তি (সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই); চতুর্থীতে ‘-রেঁ’ বিভক্তি (সো করউ রস রসানেরে কংখা); ষষ্ঠীতে ‘-র’/‘এর’ বিভক্তি (সাঙ্কমত চড়িলে; দুধিল দুধ কি বেণ্টে ধামায়) ইত্যাদি।
- বাংলার নিজস্ব কিছু অনুসর্গ (মাঝে, অন্তরে, সঙ্গে ইত্যাদি) আছে। চর্যায় এগুলির প্রয়োগও অপ্রতুল নয়। যেমন, কোড়ি মাঝেঁ একু; তোহার অন্তরে; দুজ্জন সাঙ্গে অবসরি জাই ইত্যাদি।
- স্বাধীন অব্যয় রূপে উপসর্গের প্রয়োগেও বাংলার বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। উপসর্গগুলি অব্যয় হিসেবে বিশেষ্যের পূর্বে বসে বিচিত্র অর্থপ্রকাশে সাহায্য করে। চর্যাপদেও এই লক্ষণ দৃশ্যমান। যেমন, নিসারা, বিআলী, সচ্চড়ে, বিমনা ইত্যাদি।
- আধুনিক বাংলায় ‘সে’ শব্দটি মুখ্যত সর্বনাম হিসেবে, আবার কখনও বা বাক্যালংকার অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্য ভাষায় শব্দটি বসে বিশেষণ ও সর্বনাম হিসেবেই। বাক্যকে অলংকৃত করার উদ্দেশ্যে বাংলা ছাড়া আর কোথাও ‘সে’ বসে না। চর্যায় ‘সে’ ও একই অর্থে ‘সো’-এর ব্যবহার দেখা যায় যত্রতত্র। যেমন, এক সে শুণ্ডিনী, এক সো পদুমা, গুরু বোস সে সীসা কাল ইত্যাদি।
- (গ) ক্রিয়াপদের বৈশিষ্ট্য
- বিভিন্ন ক্রিয়ার কাল গঠনে ধাতুরূপে বিশিষ্ট বিভক্তির প্রয়োগ করা হয় বাংলায়। পুরুষ ও বচন ভেদেও তা পৃথক। ভবিষৎকালে ‘-ইব’ বিভক্তি প্রযুক্ত হয় উত্তম পুরুষে, অতীতকালে প্রথম পুরুষে বসে ‘-ইল’ বিভক্তি এবং অসমাপিকায় ‘-ইয়া’ বা ‘-ইলে’ ইত্যাদি প্রযুক্ত হয়। এইসব লক্ষণ চর্যার ভাষাতেও পাওয়া যায়। যেমন, জই তুম্হে লোঅ হে হেইব পারগামী; কাহ্নু কহি গই করিব নিবাস; কানেট চৌরি নিল অধরাতি; সসুরা নিদ গেল; মাঅ মারিআ কাহ্ন ভইঅ কবালী; সাঙ্কমত চড়িলে ইত্যাদি।
- বাংলা ক্রিয়াপদের অপর বিশেষত্ব হল যৌগিক বা সংযোগমূলক ক্রিয়াপদ গঠন। দুভাবে এই পদ গঠিত হয়। অসমাপিকার সঙ্গে সমাপিকার সংযোগে অথবা বিশেষ্য বা বিশেষণ পদের সঙ্গে সমাপিকার সংযোগে। কেউ কেউ এই জাতীয় ক্রিয়াপদকে বাংলা ভাষার দুর্বলতা বলেও নির্দেশ করেছেন। চর্যাপদেও আছে—গুণিআ লেহুঁ; টুটি গেল, ধরণ ন জাই; নিদ গেল; কহন ন জাই; ভান্তি ন বাসসি; ছই ছোই যাই ইত্যাদি।
- বাংলা ভাষায় বিশিষ্ট ভঙ্গির জন্ম হয়েছে বাক্যে ক্রিয়াপদের বাহ্যিক অনুপস্থিতি থেকে। এই লক্ষণ বাংলা গদ্যের সূচনাতেই লক্ষ্য করা যায়। চর্যাপদের ভাষাতেও এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন, কায়া তরুবর পঞ্চ বি ডাল; ছড়গই সঅল সহাবে সুধ; গন্ধ পরস রস জইসো তইসো।
- বাংলার বিভিন্ন বাগ্বিধির ব্যবহারেও চর্যাপদের ভাষা সহজে অলংকৃত। এইসব বিশিষ্টার্থক বাক্যরীতি পরে কালবাহিত হয়ে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। যেমন, আপনা মাংসে হরিণা বৈরী, হাথেরে কাঙ্কন মা লেউ দাপন, ভান্তি ন বাসসি জাংতে, তু লো ডোম্বী হাঁউ কপালী, বর-সুণ গোহালী কিমো দুঠ বলন্দেঁ ইত্যাদি।
এইসব বাস্তব প্রমাণের ভিত্তিতে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, “The language of the charyas is the genuine vernacular of Bengal at its basis.” চর্যাপদের উপর অন্যান্য ভাষার দাবি নিরপেক্ষভাবে বিচার করে এটুকুই বলা যায় যে, চর্যাগীতিতে বিক্ষিপ্তভাবে ওড়িয়া, অসমিয়া, হিন্দি ও মৈথিলী শব্দ ছড়িয়ে থাকলেও এর মূল প্রকাশ্য ছাঁদটিই ছিল মাগধী অপভ্রংশের গুটি কেটে বেরিয়ে আসা সদ্যোজাত বাংলা ভাষার। তখনও তার পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত না হলেও তার নিজস্বতার অস্ফুট চিহ্নগুলি চর্যাপদের শারীরিক গড়নে ঠিকই ধরা পড়ে।
সন্ধ্যাভাষা
[সম্পাদনা]চর্যাপদের ভাষার আরও একটি দিক রয়েছে। ভাষা ভাবপ্রকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলেও সব ভাষা একইভাবে সংযোগ স্থাপন করে না। যে ভাষা ইঙ্গিতপ্রধান তার চালচলন আলাদা, আবার যে ভাষা ধ্বনিনির্ভর ও বাচ্যার্থপ্রধান তার আবেদন ভিন্ন প্রকার। ভাষাতাত্ত্বিকেরা ভাষার দেহময় রূপের কথাও বলেছেন, আবার প্রায়-ভাষার (para-language) কথাও বলেছেন। চর্যাপদের ভাষা-সংক্রান্ত আলোচনায় এইসব ভাবনা এই কারণেই প্রাসঙ্গিক যে, এখানে কোনও বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থিত করার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত জটিল পথ অবলম্বন করা হয়েছে। ফলে চর্যাকার ও পাঠকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে একটি প্রাচীর। এটা বোধহয় চর্যাকারদের অভিপ্রায়সিদ্ধ ধরন। কারণ, তাঁরাও কোনও কারণে চাইতেন এইসব গানে পরিবেশিত তত্ত্ব ও তথ্য অল্পসংখ্যক লোকের কাছেই পৌঁছাক। ঢেণ্ঢণপাদ যেমন বলেন, “ঢেণ্ডনপাএর গীত বিরলে বুঝঅ”। কুক্কুরীপাদও তাঁর চর্যার ভণিতার শেষ চরণে স্বীকার করেছেন যে, কোটির মধ্যে গুটিকতক লোকই তাঁর বক্তব্য বুঝবেন: “কোড়ি মাঝেঁ একু হিঅহিঁ সমাইউ”। এইভাবে মুষ্টিমেয় পাঠক নির্বাচনের কারণ অনুসন্ধান করতে হলে চর্যাপদের নিগূঢ় তত্ত্ব ও রহস্যময় আচারের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়। তন্ত্রও এমনই ‘শাম্ভবী বিদ্যা’, যা ‘গোপ্যা কুলবধূরিব’। সহজযানীরা তন্ত্রের কায়াসাধনাকে প্রাধান্য দেওয়ায় সকলের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তাঁদের সাধনতত্ত্বটিকে। কেবল দীক্ষিত ব্যক্তিদের কাছেই তাঁরা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন সেই সাধনার প্রণালী ও অধ্যাত্মচেতনার প্রকৃত রহস্যকে। তাই তাঁরা এমন একপ্রকার সাংকেতিক ভাষা অবলম্বন করেছিলেন, যে ভাষার সংকেত শুধু সংশ্লিষ্ট ধর্মের সাধকেরাই বুঝবেন, অন্যরা নয়। এই সংকেতপূর্ণ ভাষার তাঁর অন্য নামও দিয়েছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলিতে এই ভাষার নাম ‘সন্ধ্যাভাষা’। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকায় সন্ধ্যাভাষার উল্লেখ করে এই ভাষার প্রকৃতি সম্পর্কে লিখেছিলেন, “আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না।” ফারসি গবেষক ইউজিন বুর্নফ সদ্ধর্ম্পুণ্ডরীকসূত্র গ্রন্থের অনুবাদের ভূমিকায় সন্ধ্যাভাষাকে বলেছেন “Language Enigmatique” বা প্রহেলিকাময় ভাষা। আসলে রহস্যময় হেঁয়ালির ভাষাতে তত্ত্বপ্রকাশের রীতি খুবই প্রাচীন। বেদ-উপনিষদেও স্থানে স্থানে হেঁয়ালি ব্যবহার করা হয়েছে। গোপনীয়তার কারণে এবং গুহ্য তত্ত্ব বহন করার জন্য এই ভাষাকে এইচ. কার্ন মন্ত্রের সগোত্র বলে মনে করেছেন। অবশ্য প্রকৃতি অনুসারে সন্ধ্যাভাষাকে ঠিক মন্ত্র বলা চলে না। কারণ অলৌকিক শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা এই ভাষার আছে, এমন দাবি কোথাও করা হয়নি।
চর্যার আভিপ্রায়িক সাংকেতিক বচনের নাম সন্ধ্যাভাষা। এর উল্লেখ প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। শব্দটির বানান, ব্যুৎপত্তি ও অর্থ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। মহাযানী ধর্মগ্রন্থে ও সেগুলির ভাষ্যে সর্বত্র ‘সন্ধ্যা’ বানানই দেখা যায়। কিন্তু বিধুশেখর শাস্ত্রী এই বানানকে লিপিকরের প্রমাদ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, যথার্থ বানানটি হল ‘সন্ধা’। ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, চর্যাপদের ভাষার মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন অর্থ রয়ে গিয়েছে। সেই লুক্কায়িত তাৎপর্যই আভিপ্রায়িক বচন (Intentional language)। এটি শব্দের বাচ্যার্থ থেকে পৃথক। তাঁর কথায়, “Abhiprayika means that it is intended to imply or suggest something different from what is expressed by the words.” অর্থাৎ এই ভাষাতে রয়েছে কোনও নিগূঢ় ব্যঞ্জনা বা ভিন্ন অর্থের অভিসন্ধি। যে শব্দের মূল ব্যুৎপত্তি ছিল ‘সম্-✓ধৈ+আ’, সেটি বিধুশেখরের ভাষ্যে পরিবর্তিত হয়ে হল ‘সম্-[]✓ধা+ঙ’। এই মত সমর্থন করেন ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচীও। এঁদের দুজনেরই মতে, সন্ধ্যাভাষা অবশ্যই সাংকেতিক ভাষা, যা শব্দগুলির নিজস্ব আভিধানিক অর্থ পরিহার করে ভিন্নতর অর্থের ব্যঞ্জনা এনে দেয় এবং সেই অর্থ কোটির মধ্যে গুটিকতকের হৃদয়েই প্রবেশ করে। চর্যায় গুরুর ভূমিকা এখানেই। তিনি সেই শ্লিষ্ট অর্থটি শিষ্যের কাছে পরিস্ফুট করে তোলেন।
বিধুশেখর শাস্ত্রী ও ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচীর বক্তব্য কিছুটা সঠিক হলেও সমস্যা অন্যত্র। তাঁরা বলেছেন, লিপিকরের প্রমাদে ‘সন্ধা’ শব্দটি ‘সন্ধ্যা’ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রাচীন পুথিগুলি লক্ষ্য করলে প্রায় সর্বত্রই ‘সন্ধ্যা’ বানানই পাওয়া যায়। একটি বিশেষ বানানে সমস্ত লিপিকর প্রমাদগ্রস্থ হবেন, এটা নিতান্তই কষ্ট-কল্পনা। তাছাড়া মুনিদত্ত তাঁর টীকায় বারবার 'সন্ধ্যাবচন’-এর কথা বলেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রাকৃতিক সন্ধ্যার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে অর্থের ক্ষেত্রে যে আলো-আঁধারি প্রেক্ষাপটের কথা বলেছেন, তার গুরুত্ব এখানেই। শ্লিষ্ট শব্দে একটি জানা অর্থ বা বাচ্যার্থ সংযুক্ত থাকে, অন্যটি হয় লক্ষণার্থ বা ব্যঞ্জনার্থ। হয়তো সিদ্ধাচার্যগণ তাঁদের ব্যবহৃত ভাষার এই দ্বিবিধ স্বভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং সেই তাৎপর্যে ‘সন্ধ্যা’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। কেউ কেউ ‘সম্-✓ধা+আ’ থেকে নিষ্পন্ন শব্দটির “সম্যক ধ্যায়তে অস্যাম্ ধ্যায়তে ইতি সন্ধ্যা” সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন। অর্থাৎ, যে অর্থ অনুধ্যান করে বুঝতে হয়, তাই-ই সন্ধ্যা। এটিও সত্য হতে পারে। তবে সাহিত্যিক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে অর্ধকল্পিত এক সন্ধি অঞ্চলের (আর্যাবর্ত ও পূর্ব ভারতের সন্ধিস্থল বীরভূম-সাঁওতাল পরগনার পশ্চিমাঞ্চল) ভাষা বলে সন্ধ্যাভাষাকে নির্দেশ করেছেন, তার পিছনে কোনও বলিষ্ঠ যুক্তি নেই।
চর্যাগানে সন্ধ্যাভাষার প্রয়োগকৌশল পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সব গানেই যে আগাগোড়া এই হেঁয়ালিপূর্ণ আভিপ্রায়িক বচন ব্যবহার করা হয়েছে তা নয়। কয়েকটি গান আদ্যোপান্ত সন্ধ্যা শব্দে রচিত। যেমন, ২ ও ৩৩ সংখ্যক চর্যা। আবার কয়েকটি গানের অংশবিশেষ সন্ধ্যাভাষিত, কোনও বিচ্ছিন্ন শব্দ হয়তো সন্ধ্যা অর্থে প্রযুক্ত। আবার এমন গানও দুর্লভ নয়, যেখানে সন্ধ্যাশব্দের ব্যবহার একেবারেই নেই। যেমন, ৪০ ও ৪২ সংখ্যক চর্যা। নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, যে সমস্ত গানে দার্শনিকতার বাহুল্য, সেখানে সন্ধ্যাভাষা তেমন প্রযুক্ত হয়নি। কিন্তু তান্ত্রিক কৃত্যের নির্দেশ সমৃদ্ধ পদগুলিতে সন্ধ্যাবচনের বাহুল্য লক্ষিত হয়। হয়তো আপাতদৃষ্টিতে আপত্তিকর বা কুরুচিপূর্ণ কয়েকটি বিষয় গোপন করার জন্যই সন্ধ্যাভাষার আড়াল খুঁজেছিলেন চর্যাকারেরা। মুনিদত্তের টীকা রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই লুকানো অর্থটিকে পরিস্ফুট করা। তাই তিনি বারবার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ‘সন্ধ্যাভাষয়া’, সন্ধ্যাবচনেন’, ‘সন্ধ্যাসংকেতম্’, ‘সন্ধ্যাজ্ঞানেন’, ‘সন্ধ্যয়া’ ইত্যাদি বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। মধ্যযুগের সন্তসাধকদের গানেও ভাষার এই হেঁয়ালিপূর্ণ ভাব লক্ষ্য করা যায়। আসলে সিদ্ধাচার্য কিংবা সন্তসাধক সকলেই ছিলেন বাক্পথাতীত এক অ-কথনবেদ্য ভাবানুভূতির শরিক। তাঁর কথা বলেছেন রূপক-প্রতীকের ঘেরাটোপে। মরমিয়া সাধক মাত্রেরই স্বভাবধর্ম এই। এঁদের সম্পর্কে সেন্ট মার্টিন যথার্থ বলেছেন, “All mystics speak the same language for they come from the same country.” সন্ধ্যাভাষা এই বিশেষ ‘দেশ’-এরই ভাষা। স্বসংবেদ্য, অচিন্ত্য তত্ত্বের রূপময়তা ফুটিয়ে তোলার জন্য রূপক-প্রতীকের আয়োজন, তেমনই মহাসুখের স্বরূপ, মহাসুখ লাভের পথ, লাভের পর যোগীর মানসিক অবস্থা, পারমার্থিক ও সাংবৃতিক বোধিচিত্তের প্রকৃতি ইত্যাদি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রায় প্রতি পদে সন্ধ্যাভাষার আশ্রয় নিয়েছেন চর্যাকারেরা। অধ্যাপক জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী তাঁর চর্যাগীতির ভূমিকা গ্রন্থে চর্যায় ব্যবহৃত শব্দগুলির উৎসগত শ্রেণিবিন্যাস করে একটি সামগ্রিক পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাতে দেখা যায়, জিনপুর, মাঙ্গ, নিবান, দশবল, তিশরণ, তথাগত ইত্যাদি শব্দগুলি প্রাচীন বৌদ্ধশাস্ত্র থেকে সংগৃহীত। আবার চন্দ্রসূর্য, দশমী দুয়ার, অণহা, বিণানা, তথতা, গগণ, কমলকুলিশ, ধমনচমন, কামরু, জোইনি, আলিকালি ইত্যাদি শব্দ গৃহীত হয়েছে হিন্দু যোগতন্ত্র এবং বৌদ্ধ মহাযানের অন্তর্গত মধ্যমক দর্শন, যোগাচার, বজ্রযান ইত্যাদি থেকে। এছাড়া চর্যাগানের ব্যবহৃত শুণ্ডিনী, বিআলী, সাঙ্কম, কোঞ্জাতালা, রূপা, খুণ্টি, কাচ্ছি, কেড়ুয়াল, তান্তি, ঠাকুর, কণ্ঠ কমলিনী, সবরসবরী, বঙ্গাল, গুঞ্জামালী ইত্যাদি কিছু পরিচিত শব্দ নেওয়া হয়েছে পরিচিত গৃহস্থালি ও লোকজীবনের প্রেক্ষাপট থেকে। বলা বাহুল্য, এইসব শব্দপ্রয়োগের ফলে চর্যাপদ সকল শ্রেণির পাঠকের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠেনি। তবে তাতে একদিকে যেমন নিজেদের আচরিত কায়াসাধনার গুহ্য রহস্যকে অতি সহজে ঢাকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে প্রাচীন বাঙালির কাব্যসৃষ্টির অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। মুনিদত্তের টীকাটি পাওয়া না গেলে গানগুলির অর্থোদ্ধারের জন্য পরবর্তীকালের গবেষকদের যে অন্ধকারে হাতড়ে ফিরতে হত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সাহিত্যমূল্য
[সম্পাদনা]সাহিত্যের অঙ্কুরোদ্গম ধর্মের আশ্রয়ের ঘটলেও উভয়ের উদ্দেশ্য পৃথক। অনির্বচনীয় অনুভূতির ক্রিয়া হয়তো উভয়ের মূলেই উপস্থিত; তবু ধর্মের লক্ষ্য পরমার্থ তত্ত্ব, যার আশ্রয় পরলোক এবং সাহিত্যের উদ্দেশ্য জীবনরসের আস্বাদন, যার লীলাভূমি ইহলোক। ধর্মের প্রবক্তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবনবিবিক্তার কথা বলেছেন, যেখানে মুক্তি বৈরাগ্যসাধনে। কিন্তু সাহিত্যিক বলেছেন জীবনের প্রতি আসক্তির কথা, জীবন-সংগ্রাম ও জয়-পরাজয়ের মধ্যে দিয়েছেন জীবন-মাধুর্যের সন্ধান। আনন্দই সাহিত্যের পরম লক্ষ্য। যে-কোনও রস সেই আনন্দেরই বাহক মাত্র।
সিদ্ধাচার্যদের লেখা চর্যাগীতিগুলি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। কিন্তু একই সঙ্গে সেগুলি বাংলা সাহিত্যেরও আদিতম নিদর্শন কিনা এবং এগুলির সত্যই কোনও কাব্যমূল্য আছে কিনা, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, বৌদ্ধ সাধকেরা তাঁদের ধর্মতত্ত্বকে গানের ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছেন, তা নিয়ে আলাদা করে রসসাহিত্য নির্মাণের কথা কখনও ভাবেননি। অথচ দেখা যায়, তাঁদের অজ্ঞাতসারেই চর্যাগীতিতে সঞ্চারিত হয়েছে সাহিত্যধর্ম। কাব্যের কাব্যত্ব নির্ভর করে যে দুই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের উপর, সেই সৌন্দর্যব্যঞ্জনা ও রসদৃষ্টি সিদ্ধাচার্যদের অধ্যাত্ম-অনুভূতির সমান্তরালে কোথাও কোথাও উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। আসলে অধ্যাত্মসংগীত মাত্রেই নীরস তত্ত্বের কচকচি নয়। ঋগ্বেদের সূক্তগুলিও কবিত্বের আকর। চর্যাপদ কেবল সিদ্ধসাধকের ধর্মীয় অনুভবের ঘনিষ্ঠ রূপায়ণ নয়, একই সঙ্গে তা সাধক-কবির মন্ময় অনুভূতির অলংকৃত প্রকাশও বটে। কাব্যের প্রকাশরীতি বিশ্লেষণ করার যে প্রথা দীর্ঘকাল এদেশে প্রচলিত, তারই ফলে এককালে গড়ে উঠেছিল নানা কাব্যপ্রস্থান। তার ভাববস্তুর বিচার চলেছে দুটি মাত্রায়—ধ্বনি ও রসের মানদণ্ডে। বিশেষ সাধনপদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে সিদ্ধাচার্যেরা নিছক তত্ত্বকথা লিখলেও তাকে ভাষাময় রূপ দিতে গিয়ে এই ভাব ও প্রকাশকলার গুরুত্ব সৃষ্টিতেও যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁরা তত্ত্বের এক কাব্যরস-সমন্বিত মূর্তিই অঙ্কন করতে চেয়েছেন, রচনাকে নিছক দার্শনিক পরিভাষা-কণ্টকিত করে ধর্মানুশাসনের কঠিন দুষ্প্রবেশ্য আবেষ্টনীর মধ্যে ধরে রাখতে চাননি। সাধনতত্ত্ব বলতে গিয়ে গোপনীয়তা রক্ষা কিংবা অন্য যে-কোনও কারণেই হোক তাঁরা কয়েকটি চিত্রপ্রতীকের সাহায্য নেন। এইসব রূপক-প্রতীক তাঁদের দুরুহ তত্ত্বপ্রকাশ যেমন সহজ করেছেন, তেমনই আকর হয়ে উঠেছে কবিত্বেরও। অবশ্য এও সত্য যে, সব পদেই কবিত্বের স্পর্শ নেই, কোথাও কোথাও রয়েছে দার্শনিক প্রত্যয়ের নিরাবরণ উচ্চারণও। সে যাই হোক, সাধনতত্ত্ব কতটা শিল্পশ্রীমণ্ডিত করে সাধকেরা প্রকাশ করতে পেয়েছেন, সেটাই এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয়।
প্রথমেই আসা যাক রূপকর্মের আলোচনায়। অলংকৃত বাক্যই যে কাব্য সেকথার প্রমাণই চর্যার কবিরা রেখেছেন তাঁদের পদে। উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, বিরোধ, বক্রভাষণ, বিপরীত বাচন, চিত্রকল্প ইত্যাদি প্রয়োগে তাঁরা ছিলেন সিদ্ধহস্ত। গোপনীয়তা রক্ষার জন্যই তাঁদের এই পথ বেছে নিতে হয়েছিল। সাদৃশ্যমূলক অলংকারের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ উপমাই প্রথাসিদ্ধ ও গতানুগতিক। জগতের মিথ্যাত্ব বোঝাতে ৪১ সংখ্যক চর্যায় ভুসুকুপাদ মরু-মরীচিকা, গন্ধর্বনগরী, দর্শন-প্রতিবিম্ব, বন্ধ্যাপুত্র, বালুকাতৈল, শশকশৃঙ্গ, আকাশকুসুমের উপমা টেনে এনেছেন। অন্যত্র চঞ্চল চিত্তের প্রতীক হয়ে উঠেছে হরিণ ও মূষিক। অবধূতীকে বোঝাতে আনা হয়েছে ডোম্বী ও কমলিনীকে এবং জিনপুর প্রতীকায়িত হয়েছে পদ্মবন ও জ্যোৎস্নাবাড়ির দ্বারা। সহজানন্দে পরিপূর্ণ সহজচিত্তকে তুলনা করা হয়েছে গজেন্দ্রের সঙ্গে। চিত্তচালনা ও নৌচালনা অগ্রগমনের সূত্রে কবিদৃষ্টিতে অভিন্ন হয়ে উঠেছে। তুলো ধোনা, মদ চোলাই আসলে সংবৃতি বোধিচিত্তকে নিঃস্বভাবীকৃত করার রূপক। একই অর্থ প্রকাশ করছে মাদী কচ্ছপের দোহনের রূপকটিও। এইসব অলংকারের প্রয়োগে বক্তব্য সরস হয়েছে, তত্ত্বের শুষ্কতা ঘুচে গিয়ে আস্বাদ্যমান সাহিত্যের বস্তুতে পরিণত হয়েছে চর্যার দেহকেন্দ্রিক যৌনযোগতান্ত্রিক ধর্মাচার।
এছাড়া চর্যার অধিকাংশ পদেই আছে জীবনের টুকরো টুকরো ছবি। যেমন, ৩ সংখ্যক পদে শুণ্ডিনীর মদ চোলাই, ৫ সংখ্যক পদে নদী পারাপারের দৃশ্য, ৬ সংখ্যক পদে হরিণ শিকারের আরণ্যক পরিবেশ, ১০ ও ২৮ সংখ্যক পদে ডোম্বী ও শবরীর অনুসষঙ্গ, ১২ সংখ্যক পদে দাবা খেলা, ২০ সংখ্যক পদে ‘খমন ভতারী’ নারীর গর্ভযন্ত্রণা ও মনোবেদনা, ২১ সংখ্যক পদে ইঁদুরের আনাগোনা, ২৬ সংখ্যক পদে ধুনুরির তুলো ধোনা, ৩৩ সংখ্যক পদে পর্বতশিখরে প্রতিবেশীহীন মানুষের একাকীত্ব, ৪৯ সংখ্যক পদে জলদস্যুর অত্যাচারে সাধারণ মানুষের হৃতসর্বস্ব হওয়া, ৫০ সংখ্যক পদে শবর-শবরীর মদমত্ত উল্লাস ইত্যাদি। কাব্যের কাব্যত্ব যদি স্বভাবোক্ত অলংকারের উপর কিছু অংশে নির্ভর করে থাকে, তবে চর্যাপদে তার সুপ্রচুর প্রয়োগ দৃষ্টে চর্যাকারদের কবি বলে অভিনন্দিত করতে দ্বিধা হওয়ার কোনও কারণ নেই। ৫ সংখ্যক চর্যাটির কথাই ধরা যাক। ভবনদীর আধ্যাত্মিক অর্থ যাই হোক না কেন, সেই নদীর বাস্তব রূপটি সব কিছু ছাপিয়ে পাঠকহৃদয়ে অন্য এক অনুভূতি সঞ্চারিত করে। দু-কূল হারানো বর্ষার নদী আর তার বেগবান উন্মত্ত স্রোত পাঠকের বাসনালোক আলোড়িত করে আতঙ্ক-মিশ্রিত আনন্দ জাগিয়ে তোলে। পদকর্তা চাটিলপাদ লেখেন:
ভবণই গহন গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দু আন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী।।
৬ সংখ্যক পদে নিশ্চিন্তভাবে তৃণভোজনে রত এক হরিণের প্রসঙ্গ এসেছে। কোনও দিকে তার দৃষ্টি নেই। এমন সময় ব্যাধ হাঁক পাড়ল। হরিণ যে তার সুস্বাদু মাংসের জন্য নিজেই নিজের শত্রু। হাঁক শুনে হরিণের প্রাণ উড়ে যায়। তৃণ আর স্পর্শ করে না, পানীয়ে অরুচি ধরে। এমন সময়ে অকুস্থলে হরিণীর আবির্ভাব। সে পরামর্শ দেয়, “এ বন চ্ছাড়ী হোহু ভান্তে।” সেই কথা শুনে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায় হরিণ, এত দ্রুত যে তার ক্ষুরও দৃশ্যমান হয় না। এর মধ্যে নিগূঢ় সাধনতত্ত্ব যাই থাকুক, অরণ্যের চিত্র হিসেবে এটি অনবদ্য। তত্ত্বনিরপেক্ষভাবে এই পদের রসাবেদন যে-কোনও পাঠককেই মুগ্ধ করবে।
সাহিত্যের অন্যতম উপজীব্য হল প্রেম। এটি দেশকাল-নিরপেক্ষ যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর দেহবাসনা-সঞ্জাত একপ্রকার মানসিক অবস্থা। আলংকারিকদের ভাষ্য অনুসারে, রতিভারের পরিপুষ্টি ঘটে শৃঙ্গার রসে, যা সাধারণ্যে প্রেম বলে কথিত। এই শৃঙ্গারকে আবার সম্ভোগ ও অভিলাস এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। চর্যার কবিরা শৃঙ্গার-রসাত্মক পদে সিদ্ধহস্ত। বিশেষত কায়াসাধনার প্রসঙ্গ থাকায় নারীপুরুষের শারীরিক মিলনের প্রসঙ্গ অনেকবার এসেছে চর্যায়। স্থানে স্থানে আধুনিক রুচির নিরিখে তা অশ্লীল মনে হতে পারে। যেমন, ৪ সংখ্যক পদে চুম্বনের বিবরণ খুব স্বল্পকথায় বর্ণিত। পদকর্তা গুণ্ডরীপাদ যোগিনীকে ছাড়া এক মুহূর্তও প্রাণধারণে অক্ষম। তাঁর আকাঙ্ক্ষা প্রেমিকার মুখচুম্বন করে কমলরস পান করেন। তিনি যে সুরতক্রিয়ায় পারদর্শী সেকথা স্বীকার করেন মুক্তকণ্ঠে, “ভনই গুণ্ডরী অহ্মে কুন্দুরে বীরা”। ১০ সংখ্যক পদে পদকর্তা কাহ্নপাদ প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করেন সরাসরি। ডোম্বীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। নির্ঘৃণ কাপালীর বলতে বাধে না, “আলো ডোম্বী তোএ সম করিব ম সঙ্গ”। অন্তেবাসী এই ডোম-রমণীকে পাওয়ার জন্য তাঁর ত্যাগস্বীকারও কম নয়, “তোহোর অন্তরে ছাড়ি নড় এড়া।… তোহোর অন্তরে মোএ ঘলিলি হাড়েরি মালা।” এসব কথার মধ্যে যথেষ্ট নাটকীয় উপাদান সংগুপ্ত রয়েছে। আবার দেখা যায়, এরই অনুবৃত্তিস্বরূপ ১৯ সংখ্যক পদে কাহ্নপাদ চলেছেন ডোম্বীকে বিবাহ করতে। বাজছে মাদল, পটহ, দুন্দুভি। পালকিতে বরবেশী কাহ্ন। জাত খুইয়ে পাত্রের যৌতুক মিল অনুত্তর ধাম। তারপর দিনরাত কাটতে লাগল ‘সুরঅ পসংগে’। তত্ত্ব ছাড়াই এই আখ্যান পাঠকের কাছে পরমরমণীয়। আবার ২৮ সংখ্যক পদে শবরীপাদ বেশ বিস্তারিতভাবেই সঙ্গিনীমিলনের আনন্দ ব্যক্ত করেছেন। দুই মিলনকাতর নরনারীর পরিশ্লেষ এক মনোহর প্রাকৃতিক পরিবেশে চিত্রিত। তখন তরুশাখাগুলি মঞ্জরিত, তার পুষ্পিত ডালগুলি স্পর্শ করছে গগন, সেই অনুপম পরিবেশে ফুল্ল কাননে ময়ূরপুচ্ছ পরিহিতা, কণ্ঠে গুঞ্জামালাধারিণী ও কর্ণকুণ্ডলে সজ্জিতা শবরী একা বিচরণ করছে বনমধ্যে। ত্রিধাতুর খাট পেতে শয্যারচনা করে শবর। অবশেষে ভুজঙ্গ নায়ক শবর নৈরামণি শবরীকে নিয়ে কেলিরসে রাত্রিযাপন করে। সিদ্ধাচার্যের এই পদে জ্ঞানমুদ্রা সাধনতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্যই সন্ধ্যাভাষায় কথিত, কিন্তু সেসব অতিক্রম করে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে লৌকিক শবর-শবরীর আরণ্যক জীবনযাত্রা, তাদের নিবিড় আশ্লেষ, উপগূঢ়ের অব্যক্ত আনন্দ। শবরীপাদের একটি চর্যা আছে গ্রন্থশেষে (৫০ সংখ্যক চর্যা), যেখানে তিনি পরমার্থ সত্যের সাক্ষাৎ লাভ করে অন্যের উপকারার্থে সেই সংবেদনের কথা জানাচ্ছেন শূন্যতাসম্বোধি চর্যায়। তাঁর সব ভারী তত্ত্বই চিত্রসৌন্দর্যে বিগলিত হয়ে যায়, যখন দেখা যায় কবি বাক্যজাল বুনে বুনে এক অপূর্ব মায়াময় রাত্রির দৃশ্য নির্মাণ করছেন। বাড়ির পাশে কাপাস ফুল ফুটেছে, সারা আকাশ ভরে গেছে অসংখ্য তারা ফুলে, অন্ধকার দ্রবীভূত হয়েছে প্লাবিত মেদুর জ্যোৎস্নায়। আর মাঠে ভবিষৎ প্রাচুর্যের ইঙ্গিত বহন করে স্বর্ণশীর্ষে আন্দোলিত হচ্ছে পাকা ধানের মঞ্চরী। এই ধরনের রোম্যান্টিক কাব্যকথার কাছে অন্য কোনও ভাবের কথা পৌঁছাতে পারেনি।
কিন্তু কেবল সুখের কথাতেই নয়, দুঃখ বর্ণনাতেও চর্যাকারেরা দক্ষ। যন্ত্রণার মহিমাময় উপলব্ধি থেকেই উৎসারিত হয় মধুরতম সংগীত। সেই বেদনা মানুষকে যেমন মুহ্যমান করেন, তেমনই দেয় এক অব্যক্ত আনন্দ। চর্যাকারেরা সিদ্ধাচার্য। তাঁদের নির্দিষ্ট ধর্মসাধনার বাইরে কোনও গার্হস্থ্যজীবন না থাকলেও ছিল বহুল ব্যাপ্ত সামাজিক অভিজ্ঞতা। মানুষের সংসারে অভাব, দারিদ্র্য, দুঃখ ও বঞ্চনা তাই তাঁদের দৃষ্টি এড়ায় না। রচিত পদেও পাওয়া যায় এইসব ভাবনারই বহিপ্রকাশ। ৪৯ সংখ্যক চর্যায় ভুসুকুপাদ নির্দয় দস্যু কর্তৃক লুণ্ঠিত এক ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের কথা লিখেছেন। ৩৩ সংখ্যক পদে ঢেণ্ঢণপাদ লোকালয় থেকে দূরে টিলায় বাস করা আর-এক দরিদ্র সংসারের ক্লিন্ন ছবি আঁকেন। সেখানে তার কোনও পড়শি নেই, নেই কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছলতাও। গৃহে নিত্য অন্নাভাব, তবু অতিথির বিরাম নেই; সংসারও বেড়ে চলেছে দিনে দিনে। ২০ সংখ্যক চর্যায় কবি এক হতভাগিনী নারীর কথা বলেছেন। তার স্বামী উদাসীন বিবাগী। এতটুকু জীবনে সে নারীর কত দুঃখ। সেই দুঃখের কথা সে কাকে বলবে, আর বলবেই বা কোন মুখে। এই তার প্রথম সন্তানপ্রসব। কিন্তু কোথায় আঁতুড়, কোথায় সাহায্য। এই পদের আধ্যাত্মিক অর্থ যাই হোক না কেন, স্বামীবঞ্চিতা নারীজীবনের এই দুঃখানুভূতির তীব্রতা কবিতাটিকে প্রাণ দিয়েছে। কবিত্বের বিচারে সমগ্র পদসংকলনে এই পদটির স্থান অনেক উঁচুতে।
চর্যাপদে সামাজিক জীবনের ছবিও পাওয়া যায়। ২ সংখ্যক পদে তত্ত্ব অতিক্রান্ত হয় একটি আখ্যানের আভাসে। চোরে বধূর কর্ণভূষণ চুরি করে, সে অলংকার সে কোথায় খুঁজবে ভেবে পায় না। শ্বশুর নিদ্রামগ্ন কিন্তু বধূটি জেগে আছে। ৩ সংখ্যক পদে আছে সেকালের শুঁড়িখানার বর্ণনা। শুঁড়ি-বউ চিকন বাকলে মদ বানায়। তার দোকানের সাংকেতিক চিহ্ন দেখে খদ্দের এসে ভিড় করে। সার দেওয়া চৌষট্টি ঘড়াতে মদ রাখা আছে। দোকানে ঢুকে খদ্দের মদ খেতে শুরু করে আর বাইরে বের হয় না। ছোটো ঘড়ায় সরু নল দিয়ে মদ্যপান করে তারা। বলা বাহুল্য, এইসব কথা ব্যঞ্জনাবিহীনভাবে বলার জন্য চর্যার কবিরা কাব্যরচনার আয়োজন করেননি। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অন্য। কিন্তু সে উদ্দেশ্য ছাপিয়ে মানুষের লৌকিক জীবনের মর্মমূলে পৌঁছে গিয়েছে সিদ্ধাচার্যদের গান। তাঁদের পদ নন্দিত করে আজকের পাঠকের চিত্ত। এর ছন্দ, এর অলংকার, এর অজস্র বাক্প্রতিমা সাজিয়ে দেয় কথাগুলি, আর সে অলংকৃত কথা পাঠককে টেনে নিয়ে চলে বিশুদ্ধ রসের জগতে। চর্যাপদ তাই একই আধারে ধর্মকথা ও কাব্যকথা।
সমাজচিত্র
[সম্পাদনা]সাহিত্য সমাজের দর্পণ। কবির সৃষ্টি তাঁর অনুভূতিলোকের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল হলেও ভুলে গেলে চলবে না যে, কবিও সামাজিক সত্তা। সামাজিক সমস্ত বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমৃদ্ধ করে। যে সাহিত্য তিনি রচনা করেন সেও এই সমাজের পাঠকের জন্য। ফলে তাঁর চেনা গণ্ডীর বাইরে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন নেই। অন্যান্যরা সমাজকে হয়তো দেখেন খণ্ডিত ভাবে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই দেখা তাৎক্ষণিক, তার কোনও স্থায়িত্ব থাকে না। কিন্তু কবির দেখা সমাজ আকারে বড়ো, সাহিত্য রূপে আবদ্ধ হওয়ায় কালান্তরে স্থানান্তরে সঞ্চারিত হওয়ার সুযোগ থাকে তার। চর্যাকারেরা এক বিশেষ ধর্মের সাধক ছিলেন, কিন্তু সামাজিক অভিজ্ঞতাও তাঁদের ছিল। অনেকেরই সাধনপূর্ব গার্হস্থ্য জীবনেতিহাস সম্পর্কে অস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। ফলে তাঁদের রচনায় সমাজ-প্রসঙ্গ যে উঠে আসবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এক আশ্চর্য বিরোধাভাস আছে তাঁদের রচনায় ও বিশ্বাসগত দর্শনে। সহজযানী সিদ্ধাচার্যেরা জগৎকে মনে করতেন শূন্যস্বভাব (“আইএ অনুঅনাএ জগরে ভাংতিএঁ সো গড়িহাই”), অথচ জগতের সেই মিথ্যাস্বরূপ প্রমাণের জন্য যেসব রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ব্যতিরেকের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন তার অধিকাংশেরই অবস্থান পরিদৃশ্যমান সৎ-স্বভাব জগতেরই। যাকে তাঁরা আধ্যাত্মিক তত্ত্বে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, তাকেই প্রকারান্তরে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন সাহিত্যের রূপসৃষ্টিতে। যাই হোক, সিদ্ধাচার্যেরা চোখ-কান খোলা রেখে সামাজিক অভিজ্ঞতাগুলি লাভ করেছিলেন বলেই যে গানে সেগুলি বারবার ব্যবহার করতে পেরেছেন, তা নিয়ে কোনও মতান্তর নেই। এই দর্পণেই ধরা পড়ে নবম থেকে দ্বাদশ শতকের বৃহত্তর বাংলার সামাজিক চিত্র। বৃহত্তর বাংলাই যে চর্যাগুলিকে লালন করেছে এ বিষয়ে অনেক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্য পাওয়া যায়। যেমন, চর্যার ভাষা প্রত্ন-বাংলা, চর্যার কবিরা কম-বেশি বাঙালি, প্রাচীন বাংলার অনেক তথ্যের সঙ্গে তাঁদের পরিবেশিত তথ্য ঐক্য রক্ষা করে চলে। সামাজিক ইতিহাসের যে-সব উপকরণ বাংলার তাম্রপট্টলিপি ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত-এ পাওয়া যায়, চর্যাগানের ঐতিহাসিক ও সামাজিক চিত্রের সঙ্গে তার মিল রয়েছে।
চর্যাগানের উৎপত্তির ভিত্তিমূলে একটি সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি আছে, যার সঙ্গে তার সামাজিক বাস্তবতাও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নবম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত রচিত গানগুলিতে সেই সময়পর্বের জনজীবনই প্রতিফলিত হয়েছে। রাজনৈতিক ইতিবৃত্তের সূত্রে বলা যায়, ওই সময়ে বাংলায় পাল ও সেন বংশের রাজত্বকাল। ধর্মবিশ্বাসে এই দুই রাজবংশ বিপ্রতীপ। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক, অন্যদিকে সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্যধর্মের। অবশ্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজন্যবর্গ ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও সামাজিক জাতিবিভাজনকে কোথাও অস্বীকার করেননি। চতুর্বর্ণে বিন্যস্ত বৈদিক সমাজব্যবস্থার তাঁরাও যে পরোক্ষ সমর্থক ছিলেন তা বোঝা যায় তাঁদের খোদিত শিলালিপি, দানকর্মের প্রকৃতি ইত্যাদি দেখে। বস্তুত বাংলার আর্যীকরণের পথ প্রশস্ত হলে আর্য-অনার্য মিলনের ফলে সমাজে বর্ণসংকরত্ব দেখা দেয়। তখন বর্ণবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন ব্রাহ্মণ্য সমাজপতিরা। সেন আমলে এই বর্ণব্যবস্থা আরও প্রখরতা লাভ করে কৌলীন্য প্রথার প্রবর্তনে। সর্বভারতীয় স্বীকৃত চতুর্বর্ণ বাংলায় এসে বর্ণসাংকর্যের কারণে মাত্র দুটি বর্ণে পরিণত হয়—ব্রাহ্মণ ও শূদ্র। সংকরত্বের অনুপাত ও ব্রাহ্মণ্যবিধি গ্রহণের মাত্রা অনুযায়ী শূদ্রেরও সৎ-অসৎ বিভাগ গড়ে ওঠে। তাছাড়া ছিল বর্ণপ্রথার বাইরে পড়ে থাকা অসংখ্য অন্ত্যজ অস্পৃশ্যেরাও। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামসমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রত্যেকটি বর্ণের জন্য স্মৃতিশাস্ত্র-বিহিত ভিন্ন ভিন্ন বৃত্তি নির্ধারিত হয়। সমাজে বর্ণবৈষম্যের কারণে ঘৃণা, অবজ্ঞা ইত্যাদিরও সূচনা হয়। চর্যাগানে অন্ত্যজ বলে কথিত ডোম, শবর, চণ্ডালদের প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। এরাই সেকালের সামাজিক স্তরবিন্যাসে শেষ ধাপে অবস্থান করছিল। এরা অস্পৃশ্য। সিদ্ধাচার্যেরা সাধারণ চিত্তের পক্ষের অস্পর্শযোগ্য সহজসুন্দরীকে চণ্ডালী, ডোম্বী, শবরী ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছেন এইজন্য। সামাজিক ভাবনার রূপকে আধ্যাত্মিক সত্যকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তৎকালীন সমাজের বাস্তব দিকটি এভাবেই উদ্ঘাটিত হয়েছে। নিম্নকোটির সমাজশ্রমিক এরা, আর্থিক দিক থেকেও অনগ্রসর। উচ্চবর্ণের বসতির বাইরে এইসব জল-অচল অন্ত্যজ গোষ্ঠীর অবস্থান। সমাজের তথাকথিত উচ্চকোটির মানুষ এদের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলে। গ্রামপ্রান্তে টিলার উপরে শবরেরা যে বসবাস করত তার পরিচয় ধরা আছে ২৮ সংখ্যক চর্যায়। এদের জীবিকার পরিচয়ও পাওয়া যায় গানগুলিতে। কোনওটাই তেমন সম্মানজনক বা অর্থকরী নয়। তাঁত বোনা, চাঙারি প্রস্তুত করা, মাছ ধরা, নৌকা চালনা ইত্যাদি ছিল ডোম, শবরদের পেশা। নদনদীবেষ্টিত বাংলায় সেকালেও নৌযানের বহুল ব্যবহার ছিল। পণ্য পরিবহণ, যাত্রীবহন, মাছ ধরা ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হত নৌকা। পূর্ববঙ্গে মৎস্যশিকারে দড়াজাল ব্যবহৃত হত এক সময়ে। ৮ সংখ্যক চর্যায় তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ‘কামালি’ শব্দে। যে সমস্ত জেলে-শ্রমিক ওই জাল টেনে নিয়ে চলে, তারা এখনও ‘কামলা’ নামে পরিচিত। খুঁটি, কাছি, কেড়ুয়াল, পতবাল, দুখোল ইত্যাদির উল্লেখ থেকে বোঝা যায় কবি এসবের সঙ্গে বাস্তবে পরিচিত ছিলেন। চর্যায় অন্যান্য বৃত্তির কথাও এসেছে। যেমন, ব্যাধ কর্তৃক পশুশিকার, ধুনুরির তুলো ধোনা, কাঠুরের গাছ কাটা, শুঁড়ির মদ চোলাই, নটের নটবৃত্তি, ডোম-রমণীদের নৃত্যগীত ইত্যাদি। চণ্ডালেরা শবদাহ করত। ৫০ সংখ্যক পদে শবরের মৃত্যু হলে চণ্ডালীকে দিয়ে শবদাহের কথা জানানো হয়েছে।
কেবল অন্ত্যজ বর্ণ ও তাদের দারিদ্র্যই কথাই চর্যাপদে নেই, আছে ডোমনীর কুঁড়ে স্পর্শ করে চলা ব্রাহ্মণ বটুর প্রসঙ্গও। এতে ধরা পড়ে বটুর চারিত্রিক শিথিলতা। সেকালের বহির্বাণিজ্য ছিল নৌ-নির্ভর। নানা দ্রব্যে পরিপূর্ণ বাণিজ্যসম্ভার নিয়ে দূর দেশে যেত বণিকেরা, নিয়ে আসত মূল্যবান বিনিময়ে-সামগ্রী। বজরা নৌকায় পাড়ি দেওয়ার কথা জানা যায় ৪৯ সংখ্যক চর্যায়। নদীপথে সমৃদ্ধিশালী বণিকদের নৌকা যে মাঝে মাঝে দস্যুর হাতে আক্রান্ত হত সেই খবরই পাওয়া যায় এই গানে। সমৃদ্ধ বাণিজ্যের কারণে গড়ে উঠেছিল সম্পন্ন নগরীও। সেই নগরে বাস করত নানা শ্রেণির মানুষ। ছিল ধনবান লোক, যারা পঞ্চপাটনের মালিক, কারও বা সঞ্চয় চতুষ্কোটি মুদ্রার ভাণ্ডার। সে সময় দেশে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। রাজারা নাগরিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য নগরপাল বা কোতোয়াল নিয়োগ করতেন। কিন্তু অনেক সময় প্রহরীরা নিজেই হত চোর। একটি লুপ্ত গানের সংস্কৃত ছায়া থেকে বোঝা যায় যে, রাজ্য আক্রমণ, দুর্গজয়, তূর্যধ্বনি, নগরী লুণ্ঠন ইত্যাদিও হত সেকালে।
চর্যাপদে সবচেয়ে সার্থকভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে সেকালের সাধারণ গৃহস্থজীবনের ছবি। মোটা ভাত-কাপড়েই সন্তুষ্ট ছিল সবাই। শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ ইত্যাদি নিয়ে বাঙালি গৃহবধূর একান্নবর্তী সংসার। কারও স্বামী বিবাগী, উদাসী; দারিদ্র্য সত্ত্বেও জন্ম হচ্ছে সন্তানের। চর্যায় কৃষির কথা সরাসরি না এলেও বলদের প্রসঙ্গ উত্থাপনে কৃষি-সমৃদ্ধির কথা অনুমান করা যায়। গোয়ালে ছিল গোরুও। পাত্রে ভরে তিনবার দুধ দোহন করা হত তার। বধূরা ভয় করে চলত বয়স্ক গুরুজনেদের। সমাজে নৈতিক মান সব ক্ষেত্রে উঁচুতে ছিল না। চোর-ডাকাতে পথে ঘাটে লুটপাট করত, রাতে সুযোগ বুঝে গৃহস্থের ঘরে চুরিও করত। এর জন্য থানা-কাছারিরও যে প্রচলন ছিল তা বোঝা যায় ‘উআরি’ ও ‘দুষাধি’ শব্দ দুটির প্রয়োগ থেকে। ব্যভিচারের ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্রাহ্মণের ডোম্বী-আসক্তিতে। দুশ্চরিত্রা নারীও ছিল সমাজে। ২ সংখ্যক চর্যায় কবি লেখেন, যে বধূটি দিনের বেলায় কাক দেখলে ডরায়, সেই রাতে কামনা-তাড়িত হয়ে পরপুরুষের সন্ধানে বাইরে যায়। চর্যাগানে বিধৃত কিছু খণ্ডচিত্র থেকে সেকালের অনেক আচার-ব্যবহার, রীতিনীতির আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিবাহের বর্ণনা সংক্ষিপ্ত হলেও বেশ উজ্জ্বল। বাদ্য সহকারে বর বিবাহ করতে চলেছে, বিবাহে রয়েছে যৌতুকদানের প্রথা, বিবাহের পর মহিলাদের বাসর জাগার প্রসঙ্গও আছে চর্যায়। নরনারীর শারীরিক মিলনের আনন্দঘন শাশ্বত চিত্র অনেকগুলি পদে উপস্থিত। রয়েছে সৎকার প্রথারও বর্ণনা। সেকালেও চারটি বাঁশে চেঁচাড়ি দিয়ে শবের খাট নির্মাণ করা হত। দাবা খেলা ছিল অবসর বিনোদনের একটি উপায়। আর ছিল মদ্যপানের চল। মদের দোকানে চিহ্ন দেওয়া থাকত, যা দেখে ক্রেতারা হাজির হত সেখানে। কর্পূর দিয়ে পান খাওয়াও ছিল এক ধরনের বিলাসিতা। এছাড়া গৃহস্থালির নিত্য-ব্যবহার্য অনেক সামগ্রীর নাম পাওয়া যায় চর্যাপদে। যেমন, হাঁড়ি, ঘড়া, ঘড়ুলি বা গাড়ু, কানেট, কঙ্কণ, মুক্তাহার, কুণ্ডল, আরশি, পটহ, মাদল, করণ্ড, কসাল, ডমরু, বীণা, বাঁশি, কুঠার, তালাচাবি, টাঙ্গি, পিঁড়ি, সোনা, রুপো ইত্যাদি। ১৩ সংখ্যক চর্যায় ‘শূন মেহেরী’ শব্দটি থেকে কেউ কেউ অনুমান করেন, সেকালে মেয়েদের জন্য স্থানবিশেষে মহিলামহলও থাকত। চর্যাগানে আর আছে সমকালীন সমাজের ধর্মীয় রূপের চিত্র। সমাজে তখন কাপালিক, যোগী, ক্ষপণকদের অবস্থান। তত্ত্ব ও আচার-অনুষ্ঠানের দিক দিয়ে এদের মধ্যে বেশ কিছু মিল ছিল। উলঙ্গ হয়ে হাড়ের মালা পরে সাধনসঙ্গিনী নিয়ে কাপালিকেরা যে সাধনভজনে রত থাকতেন, তার উল্লেখ চর্যাপদে পাওয়া যায়। চর্যাপদের ভূগোল স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও বঙ্গ ও কামরূপ অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। গঙ্গা ও যমুনা নদীর সঙ্গে সেই সময়ের মানুষ পরিচিত ছিল। পদ্মার উল্লেখ থাকলেও তাকে ‘খাল’ বলে নির্দেশ করা হয়েছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মনে করেন যে, চর্যাপদ লেখা হয়েছে নগরজীবনের পটভূমিতে। তাই এই পদগুলিতে কৃষির তেমন উল্লেখ নেই, বা গ্রামজীবনের সুস্পষ্ট পরিচয়ও নেই। তাঁর মতে, “টিলায় বসবাসকারী ব্যাধদের জীবনচিত্র বাদ দিলে চর্যাগীতির সবটাই নগরজীবনের চিত্র। অন্ত্যজ অস্পৃশ্য ডোমদের বাস নগরের বাইরে হলেও নগর-সন্নিহিত স্থানেই। নগর বলেই এখানে ধনোৎপাদক বিভিন্ন শ্রেণীর কথা তেমন নেই। নগর বলেই এখানে নানা ধর্মের লোকের বাস, তাই নানা ধর্মোপজীবীর কথা আছে। নগর বলেই এখানে নৈতিক জীবন শিথিল এবং সেই শিথিলতা এত প্রকাশ্য। অলংকারের যে বর্ণনা আছে, তাও নাগরিক।” এই মত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা নিশ্চিত যে, চর্যার সিদ্ধাচার্যেরা আধ্যাত্মিক সাধনসংগীত রচনা করতে গিয়ে অবচেতন মনে তুলে ধরেছেন একটি বিশেষ যুগের বাংলার সমাজজীবনের লুপ্তপ্রায় ইতিহাস। আজও ওই সব রীতিনীতি, প্রথা ও সংস্কারের কিছু অংশ লক্ষিত হয় বাঙালির জীবনচর্যায়। ঐতিহ্যের সেই প্রাচীনতাকে পরিমাপ করতে গিয়ে হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো চর্যাপদ হয়ে উঠতে পারে একটি নির্ভুল কালজ্ঞাপক তুলাদণ্ড।