বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্যযুগ)/আদি মধ্যযুগীয় ইসলামি প্রণয়কাব্য
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রতিস্রোত হল মুসলমান কবি রচিত বাংলা রোম্যান্টিক কাব্যের ধারা। এই ধারায় রচিত সাহিত্যে পূর্বাগত ধর্ম-সংস্কার অনেকটা বর্জন করে প্রধান উপজীব্য করে তোলা হয়েছিল মানুষকে। ইতিপূর্বে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও হিন্দু কবিদের রচনাবলিতে ওতোপ্রতোভাবে মিশে ছিল তাঁদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু ধর্মকে অনেকটা পাশে সরিয়ে রেখে মানবাশ্রিত কাব্য রচনা করলেন মুসলমান কবিরা। এর পিছনে সুফিবাদের আত্যন্তিক মানবপ্রীতির সদর্থক ভূমিকা ছিল। শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে হিন্দু কবিরা মুসলমান কবিদের থেকে এগিয়ে থাকলেও তাঁদের রচনায় মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান তেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। চর্যাপদে সমকালীন সমাজজীবনের অনেক টুকরো ছবি পাওয়া যায় এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটিও গভীরতর অর্থে মানবজীবনেরই ইতিকথা। তবু চর্যাকারদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের গুহ্য সাধনতত্ত্বকে রূপকের অন্তরালে প্রকাশ করা এবং বড়ু চণ্ডীদাসকেও যুগধর্মের নিয়ম মেনে তাঁর কাব্যকে আবরিত করতে হয়েছিল রাধাকৃষ্ণ প্রেমকথার আবরণে। কিন্তু মুসলমান কবিরা কাব্যরচনা করলেন মানুষকে নিয়েই। যে মানুষ দেহ ও মনের ক্ষুধায় কাতর, যার প্রবৃত্তি, আসক্তি, বিবেক, নৈতিকতা, দয়া, ক্ষমা, লোভ, মোহ রয়েছে, যার কাছে প্রেম-মিলন-বিরহ কোনও তত্ত্বের বিষয় নয়, বরং জীবনের জ্বলন্ত বাস্তব, সেই মানুষকেই তার নিজ স্বরূপে তাঁরা স্থান দিলেন তাঁদের কাব্যে। মনে রাখতে হবে, হিন্দুধর্মের ন্যায় ইসলামেও নানাবিধ কৃত্য, সংস্কার ও শাস্ত্রবিধি আছে। কিন্তু সেই ধর্মের অনুশাসনে ঈশ্বর মর্ত্যবিহারী নন, বরং মানুষের ভৌমচেতনার বিষয়টি সেখানে বেশ স্পষ্ট। মুহাম্মাদ কোথাও নিজেকে ঈশ্বরকল্প বা অবতারপুরুষ বলে দাবি করেননি, বরং তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা: “আনা বাশারুম মিস্লুকুম্”, অর্থাৎ “আমি তোমার মতোই একজন মানুষ”। সম্ভবত সেই কারণেই মুসলমান কবিদের রচনায় ঈশ্বরের পরিবর্তে মানুষের আনাগোনা বেশি। পাশাপাশি এও সত্য যে, যাকে আশ্রয় করে এই কবিরা রোম্যান্স কাব্য সাধনার একটি স্বতন্ত্র ধারার জন্ম সেই মরমিয়া সুফিবাদ ঈশ্বরবিশ্বাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তবে সুফি সাধকেরা শরিয়তের বিধানকে শেষ গন্তব্য হিসেবে না দেখে মারিফতের মাধ্যমে আল্লাহ্-এর নৈকট্য লাভ করতে এবং আত্মলীণ হতে চেয়েছিলেন। তাঁদের দৃষ্টিতে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর প্রেমময়। তাঁর প্রেম ও করুণা লাভই সাধকজীবনের লক্ষ্য। আল্লাহ্-এর সঙ্গে তাঁর সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণে তাঁরা যে আধ্যাত্মিক মার্গের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সেই তত্ত্বের ভিত্তিতে আরব ও ইরানে রোম্যান্স কাব্যধারা গড়ে ওঠে। সেই অর্থে মানবমানবীর প্রেমকাহিনি ছিল সুফি সাধকদের কাছে রূপক। জালালুদ্দিন রুমি, আবদুর রহমান জামি, ফেরদৌসি তুসি প্রমুখ সুফি কবিরা বাদশাহ, আমির ও বণিক শ্রেণির প্রচলিত প্রেমকাহিনিকে আধ্যাত্মিক প্রেমকাহিনিতে রূপান্তরিত করেন। অনেকের ধারণা, সামন্ত সমাজব্যবস্থায় ধার্মিকতা ও নৈতিকতার সঙ্গে আপোস করতে কবিদের এই পথ বেছে নিতে হয়েছিল। সে যাই হোক, পরবর্তীকালে ভারতে সুফিদের আগমন ক্রমাগত বাড়তে শুরু করলে তাঁদের মাধ্যমে বাংলায় এইসব প্রণয়বৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার মুসলমান কবিরা নিজস্ব সংস্কৃতির রসে নিজেদের জারিত করার তাগিদে আরবি ও ফারসিতে লেখা এইসব কিস্সার শরণাপন্ন হন। তবে তাঁদের কাব্যে এই কাব্যধারার ধর্মীয় সুর ও তাত্ত্বিক নিহিতার্থটি খানিকটা উপেক্ষিত হয়েছিল। তাঁরা খাঁটি মানুষকেই তার যাবতীয় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা সহ সাহিত্যে উপস্থিত করেন। সাহিত্যের উপজীব্য যে মানুষ হতে পারে এবং ভক্তিরস ব্যতীত সাহিত্য যে বিশুদ্ধ জীবনরসের উপর নির্ভরশীল হতে পারে, মধ্যযুগের বাংলায় এই ধারণা বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত করে এই বিশেষ কাব্যধারা। এই ধারার প্রথম সাহিত্যিক বলে যাঁকে দাবি করা হয়, তিনি হলেন পঞ্চদশ শতকের কবি শাহ মুহম্মদ সগীর।
বাংলা প্রণয়কাব্যের উৎস
[সম্পাদনা]বাংলা রোম্যান্টিক কাব্যের ধারাটি অনুবাদ সাহিত্যের অন্তর্গত। কারণ, এই আখ্যানগুলি কবিদের নিজস্ব উদ্ভাবনা নয়, এগুলির উৎস নিহিত অন্যত্র। সমালোচকেরা ভাষা, চরিত্র ও আখ্যানের পটভূমির প্রেক্ষিতে সেই উৎসকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটি হিন্দি-অবধিতে লেখা ভারতীয় প্রেমকাব্যের ধারা, অন্যটি আরবি-ফারসিতে লেখা মধ্যপ্রাচ্যের প্রণয়োপাখ্যানের ধারা। তবে এই দুই ধারাতেই লেখক হিসেবে যাঁদের পাওয়া যায়, তাঁরা ধর্মে মুসলমান এবং কম-বেশি সুফিতত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত। দ্বাদশ শতক থেকে হিন্দি-অবধিতে যে রোম্যান্টিক কাব্যের আখ্যান চলে এসেছে, তার প্রমাণ আবদুর রহমানের সংনেহয়-রায়স, চন্দ বরদাইয়ের পৃথ্বীরাজ রাসো, আমির খসরুর দুবল রানি খিজির খাঁ, মুল্লা দাউদের চান্দায়ন, মিঞা সাধনের মৈনাসৎ, জায়সির পদুমাবৎ প্রভৃতি কাব্য। ভারতীয় ভাষায় ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে মুখ্যত হিন্দু চরিত্রের আশ্রয়ে মুসলমান কবিরা এই ধরনের ১৪-১৫টি বিশিষ্ট কাব্য রচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে ফারসিতে লেখা হয় ইউসুফ-ওয়া-জোলায়খা, লায়লীমজনু, খসরু-শিরিন, সয়ফলমুলুক-বদিউজ্জমাল, হফ্ত পয়কর, সলমন-অবসাল, হানিফা-কয়রাপরী, জেব্লমুলুক-শামারোখ প্রভৃতি গ্রন্থ। কথিত আছে, একাদশ শতকের কবি ফেরদৌসি তুসি ইউসুফ-ওয়া-জোলায়খা কাব্য রচনা করে এই শ্রেণির কাব্যের দ্বার উন্মোচন করেন। যদিও এই কাব্যের ক্ষেত্রে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন পঞ্চদশ শতকের কবি আবদুর রহমান জামি। এই কাহিনিটিরই বঙ্গানুবাদ করেন শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর কাব্য ইউসুফ জোলেখা ছিল বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ মানবপ্রেমের আখ্যান। তাঁর পথ ধরে ক্রমে সাহিত্যের জগতে এগিয়ে আসেন মুহম্মদ কবীর, শা বিরিদ খান, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ, দৌলত কাজি, সৈয়দ আলাওল, আবদুল হাকিম, নওয়াজিশ খান, মুহম্মদ মুকীম, শেখ সাদীর ন্যায় খ্যাত ও অখ্যাত মুসলমান কবিবৃন্দ।
শাহ মুহম্মদ সগীর: ব্যক্তিপরিচয়
[সম্পাদনা]মধ্যযুগের অন্যান্য অনেক কবির ন্যায় শাহ মুহম্মদ সগীরের আবির্ভাবকাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তিনি তাঁর কাব্যে কোনও সাল-তারিখ উল্লেখ করেননি। পরিবর্তে ‘রাজ্যক ঈশ্বর’ কোনও এক ‘মহা নরপতি গ্যেছ’-র কথা বলেছেন, যিনি কবির মতে: “রাজরাজেশ্বর মধ্যে ধার্মিক পণ্ডিত। দেব অবতার নৃপ জগৎ বিদিত।। মনুষ্যের মধ্যে জেহ্ন ধর্ম অবতার।” এই ‘গ্যেছ’ শব্দটি গিয়াসউদ্দিন নামের সংক্ষিপ্ত কাব্যরূপ। সমস্যা হল, মধ্যযুগের বাংলার সিংহাসনে একাধিক গিয়াসউদ্দিনকে দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যের কথা গ্রন্থে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জানিয়েছেন যে, ষোড়শ শতকে একই নামধারী তিনজন সুলতান বাংলায় রাজত্ব করেন। এঁরা হলেন গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৫০-৬০), গিয়াসউদ্দিন জালাল শাহ (১৫৬০-৬৩) ও তৃতীয় গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ (১৫৬৩-৬৪)। কিন্তু এঁদেরও পূর্বে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ রাজত্ব করেন ১৩৮৯-১৪১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। অধিকাংশ গবেষক গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালকেই সগীরের আবির্ভাবকাল বলে নির্দেশ করেছেন। কারণ, রাজনৈতিক বিচক্ষণতার বাইরে এই ন্যায়পরায়ণ সুলতান ছিলেন বিদ্যোৎসাহী, গুণীর পৃষ্ঠপোষক, ধার্মিক ও সজ্জন—যে তথ্যের সঙ্গে মিলে যায় কবির বর্ণনা। তাছাড়া সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী এই সুলতানের গুণকীর্তন করেছেন পারস্যের কবি হাফিজ ও মিথিলার কবি বিদ্যাপতিও। এইসব যুক্তির অবতারণা করে শহীদুল্লাহ কাল-পরম্পরায় সহীরের স্থান নির্দেশ করতে গিয়ে লিখেছেন, “মধ্যযুগের আদি লেখক বড়ু চণ্ডীদাস, তৎপরে শাহ মুহম্মদ সগীর এবং তৃতীয় লেখক কৃত্তিবাস।”
ইউসুফ জোলেখা
[সম্পাদনা]শাহ মুহম্মদ সগীরের রচিত কাব্য ইউসুফ জোলেখা। এটির উৎস নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, শাহনামা-র রচয়িতা ফেরদৌসি তুসির (৯৩৭—১০২০ খ্রিস্টাব্দ) লেখা ফারসি কাব্য ইউসুফ-জোলেখা এই কাব্যের উৎস। ফেরদৌসি একাদশ শতকে উক্ত কাব্যটি রচনা করেছিলেন। আবার কেউ কেউ আবদুর রহমান জামির ইউসুফ-ওয়া-জোলয়খা কাব্যটিকে সগীরের কাব্যের আদর্শ মনে করেন। কিন্তু জামির কাব্যটির রচনাকাল ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দ। সগীর যদি গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৩৮৯—১৪১০ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর কাব্য রচনা করে থাকেন, সেক্ষেত্রে এই কাব্যের উপর জামির কাব্যের প্রভাবের তত্ত্ব খাটে না। কাব্যের সূচনায় কবি স্বয়ং অন্য একটি উৎসের কথা জানিয়েছেন। সম্ভবত সেটি ফেরদৌসি ও জামি উভয়েরই কাব্যের উৎস। সেটি হল কুরআনের ‘সুরা ইউসুফ’ অধ্যায়ে মোট ১১১টি আয়াতে বর্ণিত একটি আখ্যান, যার মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মোপদেশ দান। ধার্মিক ও চরিত্রবান ব্যক্তিরা আল্লাহ্ কর্তৃক পুরস্কৃত হন—এইরকম একটি নীতিকথা প্রকাশিত হয়েছে আখ্যানটিতে। সগীর ভক্তজনের “শ্রুতি-ঘট” পরিপূরণের জন্য সেই কাহিনিকেই আশ্রয় করেছেন। কবির স্বীকারোক্তি: “কিতাব কোরাণ মধ্যে দেখিলুঁ বিশেষ। ইউসুফ জলিখা কথা অমৃত অশেষ।। কহিব কেতাব চাহি সুধারস পূরি।” ড. ওয়াকিল আহমেদ তাঁর বাংলা রোম্যান্টিক প্রণয়োপাখ্যান গ্রন্থে সগীরের কাব্যাদর্শ প্রসঙ্গে আর-একটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন, সেটি কুরআনের তফসিল বা ব্যাখ্যাপুস্তক, যার রচয়িতা ইমাম গজ্জালি। এতে দেখা যায়, জোলেখা পশ্চিম দেশের রাজা তাউমুসের কন্যা। সগীরও একই কথা লিখেছেন। তাছাড়া আরও অনেক প্রসঙ্গে তফসিলের সঙ্গে সগীরের কাব্যের মিল আছে। অবশ্য তুলনামূলকভাবে সগীরের বর্ণনা বর্ণাঢ্য, পল্লবিত, নাটকীয়, পারম্পর্যযুক্ত ও আবেগময়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, বাইবেলের পুরাতন নিয়মের অন্তর্গত জেনেসিস বা আদিপুস্তকে জোসেফের যে কাহিনি আছে তার সঙ্গেও কাঠামোগত মিল পাওয়া যায় কুরআনের ইউসুফ-আখ্যানের। আবার কবি নিজের প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত গল্পের খণ্ডাংশগুলি জুড়ে নিয়েছেন; এমনকি একটি গোটা স্বকল্পিত আখ্যানও জুড়ে দিয়েছেন গল্পের শেষাংশে। সেটি হল ইউসুফের ভাই ইবিন আমিনের সঙ্গে গন্ধর্বরাজ শাহাবালের কন্যা বিধুপ্রভার প্রণয়বৃত্তান্ত। ইসলামীয় আখ্যানে হঠাৎ হিন্দু চরিত্রের উপস্থিতি প্রসঙ্গে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে একটি প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেছেন, "এই বর্ণনাতে বুঝা যাইতেছে, ধর্মান্তরিত বাঙালি মুসলমান কবি পূর্বতন হিন্দু সংস্কার ভুলিতে পারেন নাই।"
সগীর তাঁর কাব্য শুরু করেছেন আল্লাহ্ ও রসুলের বন্দনা, তারপরে পিতামাতা ও গুরুজনের প্রশংসা এবং রাজস্তুতি দিয়ে। কেউ কেউ অনুমান করেন, তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের দরবারের কর্মচারী ছিলেন বলেই তাঁর রাজস্তুতি এত প্রগাঢ় হয়েছে। আখ্যানের সূচনায় আছে বাদশাহ তাউমুসের কন্যা জোলেখার জন্ম, বয়ঃপ্রাপ্তি এবং স্বপ্নে এক রূপবান পুরুষের প্রতি রূপাসক্তি। কিন্তু ভুলক্রমে তাঁর সঙ্গে আজিজ-মিশরের বিবাহ হয় এবং আজিজ সেই স্বপ্নদৃষ্ট পুরুষ নন জেনে জোলেখা হতাশ হয়ে পড়েন। এরপরে কুরআন ও ফেরদৌসির বর্ণনানুসারে ইউসুফের জন্ম, ভ্রাতৃদ্রোহ ও বিড়ম্বনার কথা বর্ণিত হয়েছে। ইউসুফের বৈমাত্রেয় ভ্রাতাগণ তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করেন। মনিরু নামে এক বণিক তাঁকে উদ্ধার করেন এবং পরে তাম্রমুদ্রার বিনিময়ে তাঁকে বিক্রিও করে দেন। নীল নদের জলে স্নান করার পর ইউসুফের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায় এবং তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দলে দলে লোক ভিড় করে। জোলেখা অপূর্ব রূপবান ইউসুফকে দেখে মূর্চ্ছা যান এবং পরে নিজের ধনরত্ন দিয়ে ইউসুফকে কিনে অন্তঃপুরে নিয়ে যান। পরের ঘটনা বর্ণনায় তফসিলের অনুসরণ করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সগীর উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। যেমন, বৃদ্ধা জোলেখার যৌবনপ্রাপ্তি এবং ইউসুফের সঙ্গে তাঁর ঘটনাবহুল বিবাহ ও বাসরযাপনের বর্ণনা। ফারসি কাব্যের আখ্যানভাগে ইউসুফ-জোলেখার মিলন ও পরিশেষে মৃত্যু দেখানো হয়েছে। কিন্তু সগীরের কাব্যে ইউসুফের ভাই ইবিন আমিনের সঙ্গে মধুপুরের রাজকন্যা বিধুপ্রভার পরিণয়কে কেন্দ্র করে কাহিনি পল্লবিত ও প্রলম্বিত হয়েছে। এই অংশটি কবির নিজস্ব কল্পনা। দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে ইউসুফ একটি অদ্ভুত জন্তুর পিছনে অশ্বচালনা করে একা বিজন বনে এসে পড়েন। বনের এক সরোবরের তীরে সুরম্য এক পুরীর মধ্যে অপূর্ব সুন্দরী কন্যা বিধুপ্রভার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। বিধুপ্রভার পিতা শাহাবাল গন্ধর্বদের রাজা। বিধুপ্রভা স্বপ্নদৃষ্ট এক নবিপুত্রের প্রতি তাঁর প্রণয়াসক্তির কথা জানালেন। ইউসুফ স্বপ্নতত্ত্ব ভেদ করে জানালেন যে, স্বপ্নদৃষ্ট ব্যক্তিটি তাঁর ভাই ইবিন আমিন। তারপর বিধুপ্রভার পালিত ও সুশিক্ষিত শুকপাখিকে দূত করে পাঠানো হল এবং ইউসুফ ভ্রাতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র দিলেন। শুকের কাছে গন্ধর্ব-রাজকন্যার কথা শুনে আমিন প্রেমবেদনা অনুভব করলেন এবং খগচর বা পাখির রূপ নিয়ে রাজকন্যার কাছে এলেন। স্বয়ম্বর সভায় বিধুপ্রভা বরমাল্য অর্পণ করলেন আমিনকে। গন্ধর্বরাজ শাহাবাল নিজ রাজ্যের রাজপদে জামাতা আমিনকে অভিষিক্ত করলেন। ভাইকে মধুপুরে রেখে ইউসুফ ফিরে এলেন মিশরে। আমিন স্বজনবিরহে কাতর হলে স্বামীর মনোভাব বুঝে বিধুপ্রভা মিশরে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন এবং তাঁরা যথাসময়ে মিশরে উপস্থিত হলে আনন্দের রোল পড়ে গেল।
সগীর মূলত মানবীয় প্রেমোপাখ্যানের কবি। তাঁর কাব্যে যে প্রেমের কিস্সা অনুসরণ করা হয়েছে, তার প্রকৃতি রূপজ ও মোহজ। জোলেখার ভালোবাসা সম্পূর্ণ দেহগত। স্বামীর নপুংসকত্ব তার অতৃপ্ত জৈবিক কামনাবহ্নিকে শত শিখায় উদ্দীপ্ত করে তুলেছে। হৃদয়ের অপরিসীম জ্বালা নিয়ে সে প্রণয়াস্পদকে কামনা করে। সমাক-সংসার, ধনসম্পদ, ইহলোক-পরলোক, পাপ-পুণ্য সব কিছু তুচ্ছ করে সে এক কূলপ্লাবিত নদীর ন্যায় সমুদ্রের পানে ছুটে চলেছে। জোলেখার প্রেমের তিনটি স্তর অতি স্পষ্ট। সে প্রথমে রূপ দেখে শিহরিত হয়, মূর্চ্ছা যায়। পরে কামোন্মত্ত হয়ে পড়ে। সবশেষে প্রেমসাগরে সব কিছু ভুলে ভেসে যায়। তবে জোলেখা কলঙ্কিনী হলেও কলুষিতা নয়। সে কামোন্মত্তা হলে অন্য উপায়ে ভোগবাসনা নিবৃত্ত করতে পারত। রূপতৃষ্ণা তার কামবোধের ইন্ধন জুগিয়েছে সত্য, তবে তার আত্মরতি একমুখী হয়েছে। বিগতযৌবনা জোলেখা প্রেমাস্পদকে এক পলক দেখার জন্য রাজপথের ধারে প্রতীক্ষার প্রহর গোনে, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও সাধনা করে চিরঞ্জীব শাশ্বত প্রেমের। কাম ব্যর্থ হলে প্রেমিককে কারাগারে পাঠিয়ে প্রতিশোধ নেয় সে, কিন্তু প্রেম ব্যর্থ হলে জোলেখার মনে আত্মক্ষোভ জাগে। কবি জোলেখাকে রক্তমাংসের এক বাস্তব চরিত্র করে এঁকেছেন। অন্যদিকে ইউসুফ চরিত্রটিকে নীতিধর্মের শুষ্ক কাষ্ঠপুত্তলিকা মনে হয়। সংযমশীলতায় তিনি এক আদর্শবাদী পুরুষ। তাঁর হৃদয়ে প্রেমের কোনও আসক্তি বা দ্বন্দ্ব নেই। জোলেখা চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীতে ইউসুফের অবস্থান।
সগীরের কাব্যে ধর্মীয় অনুষঙ্গের প্রসঙ্গটিও বিবেচ্য। কাব্যের সূচনায় “পোথার কথন” অংশে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কবি প্রেমোপাখ্যান বর্ণনা করতে চেয়েছেন “ধর্মবাণী” প্রকাশের উদ্দেশ্যে। তাঁর পূর্ববর্তী ইরানি কবিরা এই কাহিনিকে দেখেছিলেন ধর্মতত্ত্বের আলোয়। তাঁরা ইউসুফকে ‘মাশুক’ তথা পরমাত্মা এবং জোলেখাকে ‘আশিক’ তথা জীবাত্মা হিসেবে গ্রহণ করে কাব্য রচনা করেন। ইউসুফের প্রতি জোলেখার রূপাসক্তি এই দৃষ্টিতে হয়ে দাঁড়ায় আশিক-মাশুকের মিলনকামনা। ইন্দ্রিয়ের সম্ভোগবাসনার দ্বারা যে অতীন্দ্রিয় পরমাত্মাকে পাওয়া যায় না, অন্তরের প্রেম দ্বারা তাঁকে পেতে হয়—এমন এক গভীর দর্শন এই গল্পের রূপকে বর্ণিত হয়েছে। সগীর এই তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কারণ, সুফিবাদে তাঁর বিশ্বাস ছিল বলেই অনেকে মনে করেন। ‘শাহ’ উপাধিটি পীরের প্রতিনিধিত্বের দ্যোতক। তিনি যে সুফি ধর্মাদর্শের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কাব্য রচনা করেন, তার প্রমাণ কাব্যে তাঁর এই উক্তি থেকেই বোঝা যায়: “শুনিয়াছি মহাজনে কহিতে কথন। রতন ভাণ্ডার মধ্যে বচন সে ধন।।… ভাবক ভাবিনী হৈল ইছুফ জলিখা। ধর্মভাবে করে প্রেম কিতাবেত লেখা।” ভাবক-ভাবিনী অর্থাৎ আত্মা-পরমাত্না। এই স্বীকারোক্তির পর এই কাহিনি যে ধর্মীয় প্রেমোপাখ্যায়ন তা নিয়ে আর কোনও সংশয় থাকে না।
রোম্যান্স কাব্যের বৈশিষ্ট রচনাটির মধ্যে সগীর যথাযথভাবে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছেন। প্রণয়োপাখ্যানের কবিদের লক্ষ্য ছিল গল্পের ঘনঘটায় চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করা। সগীরও সেই পথের পথিক। গল্প শোনানো লক্ষ্য ছিল বলে ঘটনার গ্রহণ-বর্জনের কোনও বাছবিচার করেননি কবি। কুরআন ও অন্য গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত ঘটনার মৌলিকতা না থাকলেও একটি গতি লক্ষিত হয়। পাঠককে গল্প শোনানোর নেশায় তিনি আমিন-বিধুপ্রভার প্রসঙ্গ উপস্থিত করেন। অনেক সমালোচকের মতে, এতে ধর্মগ্রন্থের কাহিনির ঐতিহ্য নষ্ট হয়েছে। তবে তাতে যে রসাবেদন ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা বলা চলে না। রোম্যান্স কাব্যের বিশিষ্ট লক্ষণ হল অলৌকিক উপাদানের বাহুল্য। কারণ, এই ধরনের কাব্যে কল্পনার (imagination) তুলনায় অলীক কল্পনার (fantasy) প্রাধান্য বেশি। এখানেও স্বপ্ন, দৈববাণী, অবোলা শিশুর মুখে বাক্ক্ষমতা, মূক পশুর মুখে মানববাণীর প্রয়োগ আছে। স্বপ্ন তো ইউসুফ, জোলেখা, বণিক, মিশররাজ, ইবিন আমিন, বিধুপ্রভা সবাই দেখেছেন। জোলেখার স্বপ্ন তার জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত বলে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার যৌবনের ভোগাকাঙ্ক্ষাই স্বপ্নের মধ্যে রূপময় হয়ে উঠেছে। কাব্যে ছয়-সাতটি দৈববাণীও উচ্চারিত হয়েছে। এতে কাহিনির বাস্তব রস বিঘ্নিত হলেও কবির রোম্যান্সসুলভ খেয়ালি কল্পনাকে ডানা মেলার সুযোগ করে দিয়েছে। বিধুপ্রভার সমগ্র আখ্যানটি রূপকথাধর্মী। তার শুক মন্ত্রসিদ্ধ পাখি। শুকের মন্ত্রবলে আমিন খগচরে রূপান্তরিত হয়ে মধুপুরে গমন করে। এতেও বাস্তবের লেশমাত্র নেই। রয়েছে বারোমাস্যা গীতও। ইউসুফের প্রতি জোলেখার প্রেমের আর্তির প্রকাশে বারোমাস্যার করুণরস নিঃসৃত হয়েছে। সর্বোপরি কাম ও প্রেমের রূপচিত্রণে সগীরের কৃতিত্ব স্বীকার্য। তাঁর বর্ণিত প্রেম বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে অলৌকিক ব্যঞ্জনায় ঠুনকো হয়ে পড়েনি। প্রেমের মাহাত্ম্যও ওই বাস্তবতার মধ্যেই ফুটে উঠেছে।
অনুবাদক হিসেবে সগীরের আরও একটি মনোভাব প্রশংসনীয়। মুসলমান কবিরাও সম্ভবত শাস্ত্রকথাকে ধর্মের বন্ধনমুক্ত করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে দ্বিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সগীর গোঁড়া মুসলমানদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলায় লিখতে খুবই উৎসাহী ছিলেন। মাতৃভাষার প্রতি বাংলা সাহিত্যের আদি মুসলমান কবির এই মমতার জন্যও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি লিখেছেন: “না লেখে কিতাব কথা মনে ভয় পায়। দূষিত সকল তাক ইহা না জুয়ায়। গুণিয়া দেখিলুঁ আহ্মি ইহা হয় মিছা। না হয় ভাষায় কিছু হয় কথা সাঁচা।” কাব্যকলার নিরিখে সগীর ছিলেন এক মরমী কবি, আবার মাতৃভাষার প্রতি দরদি কবি হিসেবে তাঁকে ভাষাপ্রেমিক হিসেবেও গণ্য করা যায়।
শাহ মুহম্মদ সগীরের পরে ইউসুফ-জোলেখা কাব্য আরও পাঁচজন কবি অনুবাদ করেন। এঁরা হলেন আবদুল হাকিম, ফকির গরীবুল্লাহ, গোলাম সফাতউল্লাহ, সাদের আলী ও ফকির মহম্মদ। এঁদের মধ্যে আবদুল হাকিম ও গরীবুল্লাহের রচনা কিছুটা উৎকৃষ্ট। কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই পরবর্তীকালের রচয়িতা।