বিষয়বস্তুতে চলুন

বাংলা ব্যাকরণ/মুদ্রণ সংস্করণ

উইকিবই থেকে
বাংলা ব্যাকরণ
উইকিবই, মুক্ত বিশ্বের জন্য মুক্ত বইয়ে এই বইটির সাম্প্রতিক, সম্পাদনযোগ্য সংস্করণের ইউআরএল:
http://bn.wikibooks.org/wiki/বাংলা_ব্যাকরণ.

প্রথম অধ্যায়
ভাষা ও ব্যাকরণ

[সম্পাদনা]
বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার বিস্তৃতি।

ভাষা (Language) মানুষের মস্তিষ্কজাত একটি মানসিক ক্ষমতা, যা অর্থবাহী বাকসংকেতে (বাগযন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বনি রূপে) রূপায়িত হয়ে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করতে এবং একই সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে। মানুষ্য ভাষাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা, বিশ্লেষণ ও আলোচনা করাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভাষাবিজ্ঞান (Linguistics)। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্যাকরণ (Grammar) বলতে সাধারণত ভাষার কাঠামোর, বিশেষত শব্দ ও বাক্য কাঠামোর গবেষণাকে বোঝায়। অর্থাৎ, ব্যাকরণ হলো কোনো ভাষার রূপমূলতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বের আলোচনা। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে ব্যাকরণ পরিভাষাটি দিয়ে কোন ভাষার কাঠামোর সমস্ত নিয়মকানুনের বর্ণনাকেও বোঝানো হয়; এই ব্যাপকতর সংজ্ঞার ভেতরে ঐ ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব ও প্রয়োগতত্ত্বের আলোচনাও চলে আসে।

পাঠ ১: বাংলা ভাষা

[সম্পাদনা]

বাংলা একটি ধ্রুপদি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা দক্ষিণ এশিয়ার বাঙালি জাতির ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। পৃথিবীর হাজারো ভাষার ভিড়েও এটি স্বকীয়-অনন্য-গৌরবোজ্জ্বল স্থানের অধিকারী। এটি কেবল বাঙালির যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং রক্তস্নাত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এক পরম সম্পদ। ২০২৫ সালের হিসেব অনুসারে বাংলা ভাষা প্রায় ২৪.২ কোটি মানুষের মাতৃভাষা (প্রথম ভাষা) এবং আরও প্রায় ৪.৩ কোটি মানুষের দ্বিতীয় ভাষা। এটি মাতৃভাষীর সংখ্যায় বিশ্বে ষষ্ঠ এবং মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যায় বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ভাষা।

বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারি ভাষা বাংলা এবং ভারতের একটি তফসিলি (বা সংবিধান স্বীকৃত) ভাষা। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষা বাংলা। এছাড়া, ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাভাষী জনগণ রয়েছেন। ভারত সরকার ২০২৪ সালের ৩রা অক্টোবরে বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেয়।

১.১ বাংলা ভাষার পূর্বসূরি

[সম্পাদনা]

ভাষা পরিবার বিভাজনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার অবস্থান দেখানো হলো। এটি বাংলা ভাষার সাথে অন্যান্য নিকটাত্মীয় ভাষার সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের একটি ভাষা। আনুমানিক এক হাজার বছর পূর্বে পূর্ব-ভারতীয় আর্য ভাষা বা পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য ভাষার প্রাকৃত রূপ, তথা 'মাগধী প্রাকৃত' থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। বাংলা ভাষার নিকটতম আত্মীয় অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষা। বাংলা ভাষার পূর্বসূরী ভাষাগুলোর হলো:

  • মাগধী প্রাকৃত (Māgadhī Prākrīt): মাগধী প্রাকৃত (পালি-প্রাকৃত) হলো পালি ভাষার বিলোপের পর প্রাচীন ভারতের সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠা তিনটি নাট্য প্রাকৃত ভাষার একটি। এটি একটি মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষা, যেটি বৈদিক সংস্কৃত ভাষাকে প্রতিস্থাপিত করেছিল।
    • মাগধী অপভ্রংশ (Māgadhī Apabhraṃśa): মাগধী অপভ্রংশ বলতে মাগধী প্রাকৃত বা পালি প্রাকৃতের পরবর্তী ঐতিহাসিক ধাপকে বোঝানো হয়।
      • অবহট্‌ঠ (Avahaṭṭha): অবহট্‌ঠ হলো মধ্য ইন্দো-আর্যভাষা তথা প্রাকৃত পরবর্তী ঐতিহাসিক ধাপ অপভ্রংশ ভাষার পরবর্তী স্তর বা শেষ পরিণতি। এই ভাষা থেকেই নব্য ভারতীয় আর্যভাষাসমূহের উৎপত্তি। বাংলা ভাষা পূর্ব ভারতীয় মাগধী ভাষা অবহট্‌ঠের পরিণত রূপ। ষষ্ঠ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত অবহট্‌ঠ ভাষার প্রচলন ছিলো। মাগধী অবহট্‌ঠ থেকে প্রাচীন বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে।

১.১.২ প্রাপ্ত নিদর্শনের ভিত্তিতে বাংলা ভাষার কালক্রম ও নিদর্শন

[সম্পাদনা]
  • প্রাচীন বাংলা (Old Bengali): দশম শতাব্দী থেকে ১৩৫০ সাধারণ অব্দ।
নিদর্শন—
চর্যাপদ বা বৌদ্ধগান ও দোহা - লুইপা, কাহ্নপা ও অন্যান্য।
  • মধ্য বাংলা (Medieval Bengali):
আদি-মধ্যযুগের বাংলা: ১৩৫০ অব্দ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী।
নিদর্শন —
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন - বড়ু চণ্ডীদাস, চতুর্দশ শতাব্দী;
শ্রীকৃষ্ণবিজয় - মালাধর বসু, পঞ্চদশ শতাব্দী;
রামায়ণ - কৃত্তিবাস, পঞ্চদশ শতাব্দী;
মনসাবিজয় - বিপ্রদাস পিপিলাই, পঞ্চদশ শতাব্দী;
চণ্ডীমঙ্গল - মানিক দত্ত, পঞ্চদশ শতাব্দী;
ইউসুফ জোলেখা - শাহ মুহম্মদ সগীর, আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দী;
পদ্মাপুরাণ (মনসামঙ্গল) - বিজয়গুপ্ত, পঞ্চদশ শতাব্দী।
অন্ত্য-মধ্যযুগের বাংলা: ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী।
নিদর্শন —
চণ্ডীমঙ্গল - মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, ষোড়শ শতাব্দী;
লাইলী মজনু - দৌলত উজির বাহরাম খান, ষোড়শ শতাব্দী;
পদ্মাবতী - আলাওল, সপ্তদশ শতাব্দী;
সতীময়না ও লোরচন্দ্রাণী- দৌলত কাজী, সপ্তদশ শতাব্দী;
মহাভারত - কাশীরাম দাস, সপ্তদশ শতাব্দী;
অন্নদামঙ্গল - ভারতচন্দ্র, অষ্টাদশ শতাব্দী।
  • আধুনিক বাংলা (Modern Bengali): ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান।
নিদর্শন —
গীতাঞ্জলি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ;
অগ্নিবীণা - কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ;
এবং অন্যান্য।

১.২ বাংলা শব্দভাণ্ডার

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় মোট শব্দের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। উৎস বিবেচনায় বাংলা ভাষার এ শব্দভাণ্ডারকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা: তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। আবার, তৎসম ও তদ্ভবকে নিজস্ব এবং দেশি ও বিদেশি শব্দকে আগন্তুক উৎসের শব্দ বলা হয়। বাংলা শব্দের সঙ্গে অসমীয়া শব্দের সাদৃশ্য রয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে অসমীয়াই বাংলার সবচেয়ে নিকটবর্তী স্বীকৃত ভাষা। আবার নেপালি ভাষার সঙ্গে বাংলা শব্দভাণ্ডারের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

১.২.১ তৎসম শব্দ

[সম্পাদনা]
তৎসম [সংস্কৃত] = তদ্ + সম
অর্থ: তার সমান, তদ্রূপ, তৎসদৃশ; সংস্কৃত থেকে গৃহীত ও বাংলায় অবিকৃতরূপে প্রচলিত; সংস্কৃতের অনুরূপ বাংলা শব্দ।

প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (বা প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষা) থেকে বিবর্তিত যেসকল বাংলা শব্দের লিখিত চেহারা সংস্কৃত শব্দের অনুরূপ সেসকল শব্দকে তৎসম শব্দ বলা হয়। বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার আছে। রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, বিদ্যাসাগর এবং বঙ্কিমের মতো শক্তিমান লেখকরা বাংলা ভাষার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে তৎসম শব্দের পরিচয় করিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, বাংলার প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের সাধারণ লেখায় ব্যবহৃত শব্দের ২৫ শতাংশই ছিল তৎসম।

বাংলা অভিধানের প্রায় ৪০ শতাংশ শব্দই তৎসম এবং বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় চল্লিশ হাজার (৪০ শতাংশ) শব্দই তৎসম। এগুলো সরাসরি সংস্কৃত ভাষা থেকে গৃহীত এবং বানান একই হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উচ্চারণ সংস্কৃত থেকে খানিকটা ভিন্ন। আবার, সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে নির্মিত পারিভাষিক শব্দও তৎসম শব্দ হিসেবে গণ্য।

উদাহরণ —
সাধারণ: অগ্নি, পৃথিবী, চন্দ্র, গ্রহ, আকাশ, গুরু, বৃক্ষ, মিত্র, মাতা, বন্ধু, বৎস, সন্তান, স্নেহ, পর্বত, নূতন, সঞ্চয়, পথ, বণিক, প্রশ্ন, ভৃত্য, জল, রাত্রি, নদী, গ্রাম, বর্ষা, নৌকা, বন, পত্র, দিক, ভূমি, সভা, ঋণ, স্ত্রী, ব্যক্তি, ছাত্র, শিক্ষা, সাগর, মানব, বজ্র, মধু, বৎসর, ভক্তি, প্রান্ত, স্থল প্রভৃতি।
পারিভাষিক: অধ্যাদেশ, মহাপরিচালক, সচিবালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী প্রভৃতি।

১.২.২ তদ্ভব শব্দ

[সম্পাদনা]
তদ্ভব [সংস্কৃত] = তদ্ + √ভূ + অ
অর্থ: তা থেকে উৎপন্ন, সংস্কৃত থেকে জাত (উদ্ভূত); সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত ও ক্রমশ পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত ও প্রচলিত; প্রাকৃত শব্দ– প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষা থেকে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে রূপান্তরিত শব্দ।
(যেমন: চন্দ্র→চন্দ→চাঁদ, কৃষ্ণ→কহ্ন→কণহ→কানাই।)

তদ্ভব বলতে সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত শব্দকে বোঝানো হলেও, মূলত প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে বিবর্তিত যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র, সেগুলোকেই তদ্ভব শব্দ বলা হয়। তদ্ভব শব্দগুলি বাংলা ভাষার মূল উপাদান, তাই এর আরেক নাম খাঁটি বাংলা শব্দ। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত শব্দের অধিকাংশই তদ্ভব। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও খ্যাতনামা লেখকদের রচনার ৬০ শতাংশ শব্দই তদ্ভব। বাংলা শব্দভাণ্ডারে প্রায় ষোলো হাজার (১৬ শতাংশ) তদ্ভব শব্দ রয়েছে।

প্রাকৃতভাষা থেকে জাত (উৎপন্ন) বলে তদ্ভব শব্দকে প্রাকৃতজ শব্দও বলা হয়। এই শব্দগুলির মাঝে ভাষার পরিবর্তনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে বলে ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে এই শব্দগুলির গুরুত্ব অনেক বেশি। এসকল সাধারণ তদ্ভব ছাড়াও আরেকধরনের তদ্ভব শব্দ আছে, যাদের বলা যায় রূপান্তরিত তদ্ভব শব্দ। এগুলো অন্য ভাষা থেকে সংস্কৃত ভাষায় আগত শব্দ ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়মে অন্যান্য তদ্ভবের মতোই রূপান্তরিত হয়ে বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে।

উদাহরণ —
সাধারণ: হাতি, গরু, ঘোড়া, সাপ, পাখি, কুমির, গা, হাত, পা, কান, নাক, জিভ, দাঁত, পানি, মাছ, চাঁদ, ভাত, কাঠ, কাজ, বাঁক, মেয়ে, ঘা, দুধ, সোনা, খাজা, ভুল, উট, তেতো, পাহাড়, ঘড়ি, ঘাড়, নেবু, ধাম, আজ, সাঁতার, দিয়াশলাই, হালকা, দুপুর, বোন, পিসি, কানাই, পাতা, উঁচু, চাকা, বেয়াই, ব্যাটা প্রভৃতি।
রূপান্তরিত: দাম, সুড়ঙ্গ, ঠাকুর, তুরুক, পুথি প্রভৃতি।

১.২.৩ দেশি শব্দ

[সম্পাদনা]

পূর্বভারত কিংবা বঙ্গদেশে আর্যদের আগমন ঘটেছে গুপ্তযুগে। তাঁরা আসার আগেও এদেশে অন্য মানুষজন ছিলেন, তাদের আলাদা ভাষাও ছিল। ইন্দো-আর্য ভাষার (ভারতীয় আর্য ভাষা) আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলে বাসিন্দা তথা আদিবাসীদের ভাষা থেকে আগত শব্দগুলোকে বলা হয় দেশি শব্দ। এসব অনার্য ভাষার বেশিরভাগই এখন স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছে। তবু তার মধ্যে কিছু শব্দ বাংলার মতো নব্য-ভারতীয় আর্য ভাষায় রয়ে গেছে।

বাংলা ভাষায় প্রায় ষোলো হাজার (১৬ শতাংশ) দেশি শব্দ রয়েছে। অনেক সময় এসব শব্দের মূল নির্ধারণ করা যায় না। শিকড়ের দিক থেকে কোনো শব্দ অস্ট্রিক (মুন্ডারি, কোল, ভিল), কিছু দ্রাবিড় (তামিল, তেলুগু, কন্নড), কিছুবা মঙ্গোলয়েড (তিব্বতি-বর্মী)। এই শব্দগুলিই বাংলা শব্দভান্ডারের সবচেয়ে প্রাচীন শব্দ। তাই খাঁটি দেশি শব্দ একমাত্র এগুলিকেই বলা চলে।

উদাহরণ —
অস্ট্রিক: কুড়ি, কুলা, কানা (অন্ধ), কালা (বধির), ঢেঁকি, গাদা, পাল, লাঙল, জোয়াল, খড়, চাটাই, ছাঁচ, ছোট, ঝাড়, ধামা, চাল, শিকড়, লেবু, ডাব, ঢং, তেঁতুল, কলা (<কদলি), খোঁচা, খোঁজ, খোঁপা, মাঠ, নেড়া (কচি), টোপর, ঠ্যাং, ডাগর, ঢোল, ঢাক, ঘুড়ি, ঝিনুক, কাঁটা প্রভৃতি।
দ্রাবিড়: পেট, চুলা, গাড়ু, ঝোল, মুড়ি, চিংড়ি, কাতলা, বাদুড়, গঞ্জ, দর, খুকি, খোকন, পিলে (ছেলেপিলে), মোট, কালা (কালো রং), মুণ্ডু, হাঁড়ি, কুঁড়ে (ঘর), টক, আড়ত, নারিকেল, ওল, গাড়ি, প্যান্ডেল প্রভৃতি।
তিব্বতি-বর্মী: দোয়েল, ফিঙে, চট, ঘ্যাঁট (তরকারি), ঝিলিক, শোল (মাছ), কচি, ল্যাংড়া, ঝোপ প্রভৃতি।

১.২.৪ বিদেশি শব্দ

[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক তথা নানান ঐতিহাসিক কারণে বাংলা অঞ্চলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও জাতির আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয় এবং সেসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভাষা থেকে বহু শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে, এই শব্দগুলিকে বিদেশি শব্দ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রভাব অনেক বেশি, যার সংখ্যা প্রায় আটাশ হাজার (২৮ শতাংশ)। এই সংখ্যা বাংলার সুদীর্ঘ ইতিহাসে নানা জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গভীরতা স্পষ্ট করে। বিদেশি শব্দের মধ্যে ফারসি, আরবি, ইংরেজি, পোর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, তুর্কি ইত্যাদি ভাষার শব্দের আধিক্য রয়েছে।

উদাহরণ —
ফারসি: আওয়াজ, আঙ্গুর, আদমি, আবহাওয়া, আমদানি, আয়না, আরাম, আস্তে, কম, কাগজ, কারখানা, খারাপ, খোদা, খুব, খুন, গরম, গুনাহ, চশম, চশমা, চাকর, চাদর, চাকরি, জবানবন্দি, জান, জানোয়ার, জায়গা, জিন্দা, ডেগচি, তারিখ, তোশক, দফতর, দম, দরবার, দস্তখত, দের, দোজখ, দোকান, দৌলত, নমুনা, নামাজ, নালিশ, পছন্দ, পর্দা, পয়গম্বর, ফেরেশতা, বদ, বাগান, বকশিশ, বদমাশ, বাদশাহ, বান্দা, বেগম, বেহেশত, মুসলমান, মেথর, রসদ, রফতানি, রাস্তা, রোজ, রোজা, হাঙ্গামা, হিন্দু প্রভৃতি।
আরবি: আল্লাহ্, আদালত, আলেম, আসল, ইনসান, ইসলাম, ঈমান, ঈদ, উকিল, ওজন, ওজর, ওজু, এজলাস, এলাকা, এলেম, কলম, কানুন, কিতাব, কিসমত, কিয়ামত, কুরআন, কেচ্ছা, কোরবানি, খবর, খারিজ, খালি, খালাস, খেয়াল, গরিব, গায়েব, গোসল, জমা, জাকাত, জান্নাত, জাহান্নাম, তওবা, তসবি, তারিখ, দুনিয়া, দোয়াত, নগদ, নকল, ফকির, বদল, বাকি, মহকুমা, মুন্সেফ, মোক্তার, রায়, শয়তান, সাহেব, সনদ, সন, হজ, হাদিস, হারাম, হালাল, হিসাব, হেকিম প্রভৃতি।
ইংরেজি: অফিস, আফিম, ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, জেল, ডাক্তার, পুলিশ, ব্যাংক, ভোট, নোট, ইস্কুল, স্কুল, হাসপাতাল, কাপ, গ্লাস, চেয়ার, টেবিল, বাক্স, বোতল, ব্যাগ, লণ্ঠন, লাইব্রেরি, পাউডার, পেনসিল, প্লাস্টিক, ফুটবল, মাস্টার, কলেজ, আস্তাবল, সাইকেল, টাউট, টিন, ইঞ্জিন, ক্যাঙারু, বুমেরাং প্রভৃতি।
পোর্তুগিজ: আলমারি, আয়া, ইস্ত্রি, ইস্পাত, কামিজ, গামলা, চাবি, জানালা, তামাক, পেরেক, ফিতা, বারান্দা, বালতি, বেহালা, বোতাম, মেজ, সাবান, কেদারা, আতা, আনারস, কাজু, কপি, পাঁউ, পেঁপে, নিলাম, পেয়ারা, সালাদ, ক্রুশ, গির্জা, যিশু, পাদ্রি, ইংরেজ প্রভৃতি।
ফরাসি বা ফ্রেন্স: ওলন্দাজ, কার্তুজ, রেস্তোরাঁ, শেমিজ, পাতি, ডিপো, কুপন প্রভৃতি।
তুর্কি: আপা, কোরমা, খান, খাতুন, বেগম, চকমক, ক্যাচি (কাঁচি) প্রভৃতি।
ওলন্দাজ বা ডাচ: ইস্কাবন, ইশকাপন, রুইতন, হরতন, চিড়িতন, টেক্কা, তুরুপ, ইস্ক্রুপ প্রভৃতি।
ইতালীয়: ফ্যাসিস্ট, স্টুডিও, ম্যালেরিয়া, মাফিয়া প্রভৃতি।
হিন্দি: পানি, ধোলাই, লাগাতার, ঘুগনি, সমঝোতা প্রভৃতি।
জাপানি: মাঙ্গা, অ্যানিমে, সুনামি, সুডোকু, রামেন, রিকশা, হারাকিরি প্রভৃতি।
চীনা: চা, চিনি, সাম্পান।
বর্মী: লুঙ্গি, ফুঙ্গি প্রভৃতি।
জার্মান: নাৎসি, কিন্ডারগার্টেন প্রভৃতি।

পাঠ ২: বাংলা ভাষার রীতি

[সম্পাদনা]

সকল সুপ্রতিষ্ঠিত ভাষার মতো বাংলা ভাষারও মৌখিক রূপ বা কথ্য রীতি এবং লৈখিক রূপ বা লেখ্য রীতি এই দুই ধরনের রূপ বা রীতি রয়েছে। আবার, বাংলাতে এই কথ্য ও লেখ্য ভাষা রীতির মধ্যেও একাধিক বিভাজন রয়েছে। কথ্য রীতির মধ্যে আছে আঞ্চলিক কথ্য রীতি ও প্রমিত কথ্য রীতি; লেখ্য রীতির মধ্যে চলিত রীতি, সাধু রীতি এবং কাব্য রীতি। নিচে এসব রীতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

২.১ কথ্য ভাষা রীতি

[সম্পাদনা]

কথ্য ভাষা রীতি যেকোনো ভাষারই মূল রূপ। কথ্য রীতির উপর ভিত্তি করে লেখ্য ভাষা রীতির রূপ তৈরি হয়। স্থান ও কালভেদে ভাষার যে পরিবর্তন ঘটে তাতে মূলত কথ্য ভাষা রীতিরই পরিবর্তন হয়। আর, এভাবেই কথ্য ভাষা রীতির পরিবর্তনের ফলেই নতুন নতুন ভাষা ও উপভাষার জন্ম হয়।

২.১.১ আঞ্চলিক কথ্য রীতি

[সম্পাদনা]

কথ্য ভাষা রীতির আঞ্চলিক রূপভেদ সহজে বোঝা যায়। এই আঞ্চলিক রূপের ভিন্নতা সাধারণত অঞ্চলের নামে পরিচিতি পায়। যেমন মুর্শিদাবাদের ভাষা, নোয়াখালীর ভাষা, কিংবা ময়মনসিংহের ভাষা। ভাষার এই আঞ্চলিকতাকে উপভাষা নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এই পাঠের পরিচ্ছেদ ২.৩-এ বাংলা ভাষার উপভাষাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২.১.২ আদর্শ কথ্য রীতি

[সম্পাদনা]

প্রমিত বা আদর্শ কথ্য রীতি হলো সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর সর্বজনীন কথ্য ভাষা। বাংলাদেশ ও ভারতের রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে বাংলা ভাষায় প্রচারিত নানা ধরনের অডিও-ভিডিও বক্তব্য, আলোচনা, নাটক, সংগীত ও অনুষ্ঠানাদিতে এই রীতির প্রয়োগ দেখা যায়। এই রীতিই প্রমিত লেখ্য রীতির ভিত্তি। তবে বক্তার সামাজিক অবস্থান, জীবিকা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ভেদে আদর্শ কথ্য রীতিতে কমবেশি তফাত থাকে। কথ্য প্রমিত ও লেখ্য প্রমিত রীতির সমন্বয়েই প্রমিত বাংলা ভাষা গড়ে ওঠেছে।

২.২ লেখ্য ভাষা রীতি

[সম্পাদনা]

কথ্য ভাষা রীতির ওপর ভিত্তি করে লেখ্য ভাষা রীতি গড়ে ওঠে। তবে এতে লিপির বিবর্তনের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ, যা আনুমানিক দশম শতাব্দীর দিকে বাংলা কাব্য রীতিতে রচিত হয়েছে। এরপর প্রয়োজনের তাগিদে সাধু রীতি এবং পরে চলিত রীতির প্রচলন ঘটে।

২.২.১ কাব্য রীতি

[সম্পাদনা]
চর্যাপদ

কবিতার ভাষার বাক্যগঠন ও অর্থ প্রায়শই সাধারণ ভাষা রীতি থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। গদ্য কাব্য রীতি ও পদ্য কাব্য রীতি নামে এর দুটি বিভাগও আছে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগে পদ্যই ছিল ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। বাংলা সাহিত্যের এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন চর্যাপদ, পদ্যে রচিত হয়েছিল। মধ্যযুগে এই ভাষা রীতি আরও বিস্তৃত হতে থাকে। আধুনিক কালেও এর গুরুত্ব কমেনি। তথাপি আধুনিক যুগেই বাংলা সাহিত্য তার উচ্চতার শিখরে আরোহন করেছিল বাংলার প্রখ্যাত কবিদের হাতে। অর্থাৎ, বাংলা ভাষার কাব্য রীতি সুদূর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সবসময়ের জন্য অন্যসব রীতির সাথে থেকেও স্বতন্ত্রভাবে টিকে আছে। বর্তমানে এই ভাষা রীতি সাহিত্যিক ভাষা রীতি হিসেবেও সুপরিচিত।

২.২.২ সাধু রীতি

[সম্পাদনা]
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

সাধু ভাষা বা প্রমিত সাহিত্যিক বাংলা হলো বাংলা ভাষার লেখ্য গদ্য সাহিত্যের অপেক্ষাকৃত প্রাচীন ও সংস্কৃতঘেঁষা রূপ। এতে ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গের পূর্ণাঙ্গরূপ বিদ্যমান এবং সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ, সাধিত শব্দ ও কাঠামোবদ্ধ-জটিল বাক্যগঠন দেখা যায়। এটি অনেকটা ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্যের। অনেক সাহিত্যিকের অসীম প্রচেষ্টায় এটি বাংলা লেখ্য ভাষারীতির আদর্শ রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে এ স্থানে বজায় থাকে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে কতিপয় চিঠিপত্র ও দলিল-দস্তাবেজে গদ্যের ব্যবহার দেখা গেলেও তা ছিল খুব সীমিত। আধুনিক কালে, ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পরপরই গদ্যরীতিতে বাংলা গ্রন্থ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৮০০ সালে (উনিশ শতকের শুরুতে) কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কেন্দ্রিক গদ্যচর্চা আরম্ভ হয়। সেখানকার লেখকরা সাধুজনদের ব্যবহৃত সংস্কৃত ভাষার ওপর নির্ভর করে বাংলা ভাষার এই গদ্যরীতিটি তৈরি করেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সংস্কৃতের পণ্ডিত ছিলেন এবং বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্যতা স্বীকার করতেন না।

সংস্কৃত ভাষার বেশি উপাদান থাকায় সাধু ভাষা ছিল আড়ষ্ট, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং মৌখিক ও বক্তৃতার অনুপযোগী। সাধুজনদের ব্যবহৃত ভাষা হওয়ার দরুন এই ভাষা রীতির নাম হয় সাধু ভাষা। "সাধু" শব্দটি রাজা রামমোহন রায় তাঁর বেদান্ত গ্রন্থ রচনাটিতে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। তবে, এই ভাষাকে প্রথম প্রাঞ্জল করে তোলেন বলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা সাধু ভাষারীতির জনক বলা হয়।

২.২.৩ চলিত রীতি

[সম্পাদনা]
প্রমথ চৌধুরী

চলিত রীতি (অধুনা লেখ্য প্রমিত বাংলা) হলো আধুনিক ও সহজ বাংলা রীতি; সাধু রীতির তুলনায় খুবই নবীন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী-হুগলী নদীর তীরবর্তী অঞ্চল এবং কলকাতার শিক্ষিত জনসমাজের কথ্য ভাষাকে অল্প-বিস্তর পরিমার্জিত করে একটি সর্বজনবোধ্য আদর্শ লেখ্য রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। তখন সেটি 'চলিত ভাষা' বা 'চলিত রীতি' নামে পরিচিতি পায়।

প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত সবুজপত্র (১৯১৪) নামক পত্রিকা বা সাময়িকীটি বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষারীতি প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মূলত তাঁরই নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্যের নতুন গদ্যধারা সূচিত হয়; তাই প্রমথ চৌধুরীকে বাংলা চলিত ভাষারীতির জনক বলা হয়।

লিখিত বাংলা ভাষাকে সকল প্রকার কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা চলিত রীতি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ সাধু রীতির জায়গা দখল করে নেয়। এবং সমগ্র বংলায় শিক্ষিত সমাজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ভাষারীতি হিসেবে গৃহিত হয়ে ক্রমান্বয়ে বাংলার প্রমিত ভাষারীতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে চলিত ভাষা। তাই চলিত রীতির বর্তমান নাম হয়েছে লেখ্য প্রমিত বাংলা।

সাধু ভাষার সঙ্গে চলিত ভাষার মিশ্রণকে দূষণীয় গণ্য করা হয়। লেখার সময় যেকোনো একটি রীতিকে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। নচেৎ একে "গুরুচণ্ডালী" দোষে দুষ্ট আখ্যা দেওয়া হয়।

২.৩ বাংলার উপভাষা

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষার প্রধান উপভাষাগুলি ও তাদের উপভাষা-গুচ্ছের একটি মানচিত্র।

বাংলা ভাষায় অঞ্চলভেদে ভিন্ন উচ্চারণ হয়ে থাকে। ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষার শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলা ভাষা উচ্চারণগতভাবে আলাদা। বাংলা উপভাষা ছয়টি উপভাষাগুচ্ছে ভাগ করা যায়, যথা: রাঢ়ী, বঙ্গালী, বরেন্দ্রী, মানভূমী, রংপুরী এবং সুন্দরবনী উপভাষা। নিচে এসকল উপভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

২.৩.১ রাঢ়ী উপভাষা

[সম্পাদনা]

কেন্দ্রীয় বাংলা বা রাঢ়ী উপভাষা বাংলা ভাষার একটি প্রধান উপভাষাগুচ্ছ। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে প্রচলিত। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়াসহ ভাগীরথী নদী (হুগলি নদী) অববাহিকা সংলগ্ন অন্যান্য জেলা এবং বাংলাদেশের কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাঙালিদের কথ্য ভাষায় এই উপভাষার প্রভাব লক্ষ্যণীয়। এই উপভাষাটিই আধুনিক প্রমিত বাংলা ভাষার মূল ভিত্তি।

রাঢ়ী বাংলার উপভাষাগুলো হলো: নদীয়া-কুষ্টিয়া উপভাষা, বর্ধমানী উপভাষা, হুগলি-হাওড়া উপভাষা এবং কলকাতা উপভাষা।

বিস্তৃতি —
ভারত (পশ্চিমবঙ্গ): নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া, কলকাতা এবং মেদিনীপুর (অংশবিশেষ)।
বাংলাদেশ: কুষ্টিয়া, মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা।
উদাহরণ —
...

২.৩.২ বঙ্গালী উপভাষা

[সম্পাদনা]

বঙ্গ উপভাষা, বঙ্গালী উপভাষা বা পূর্ববঙ্গীয় বাংলা হলো উপভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলা ভাষার সবচেয়ে বৃহৎ উপভাষা। অধুনা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এই উপভাষায় কথা বলে থাকেন। প্রচলিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঘটিদের সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালদের ঐতিহাসিক সংযুক্তির কারণে পশ্চিমবঙ্গে বাঙাল ভাষা নামে সুপরিচিত। এটিকে কখনো কখনো খাইছি-গেছি বাংলাও বলা হয়, যা দ্বারা উপভাষাগত দিক থেকে প্রমিত বাংলার সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষাগুলোর উচ্চারণের পার্থক্যকে তুলে ধরে।

বঙ্গালী উপভাষাগুচ্ছের প্রধান উপভাষাগুলো হলো: ময়মনসিংহী (মমিনসিঙ্গা) বাংলা, ঢাকাইয়া উপভাষা, ঢাকাইয়া কুট্টি, চন্দ্রদ্বীপী (বরিশাইল্লা) বাংলা, নোয়াখাইল্লা উপভাষা, কুমিল্লাইয়া উপভাষা, খুলনা-যশোর উপভাষা, ফরিদপুরী বাংলা, সিলেটি বাংলা এবং চাটগাঁইয়া বাংলা।

বিস্তৃতি —
বাংলাদেশ: বরিশাল বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, খুলনা বিভাগ (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর এবং খুলনা জেলার অংশবিশেষ ব্যাতিত) এবং সিলেট বিভাগ।
ভারত: ত্রিপুরা, বরাক উপত্যকা, হোজাই জেলা, জিরিবাম জেলা এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগ্রাম উপজেলা।
মায়ানমার: মংড়ু জেলার অংশবিশেষ।
উদাহরণ —
...

২.৩.৩ বরেন্দ্রী উপভাষা

[সম্পাদনা]

বরেন্দ্রী উপভাষা বা উত্তর-মধ্য বাংলা হচ্ছে বাংলাদেশ এবং ভারতের পদ্মা ও মহানন্দা উপত্যকা অঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষার একটি উপভাষাগুচ্ছ। এটি উত্তরবঙ্গীয় বা উদীচ্য নামেও পরিচিত। এই উপভাষাটি মূলত বরেন্দ্র অঞ্চলে (প্রধানত বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগ এবং গাইবান্ধা ও দিনাজপুর জেলার কিছু অংশ এবং ভারতের মালদহ বিভাগ) প্রচলিত। এটি পার্শ্ববর্তী বিহার ও ঝাড়খণ্ডের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেও ব্যবহৃত হয়। বরেন্দ্রী উপভাষায় প্রতিবেশী মৈথিলি এবং অন্যান্য বিহারি ভাষার কিছুটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই উপভাষার একটি বিশেষ সুর আছে। যার কারণে এটি সমগ্র বঙ্গে বেশ জনপ্রিয়। ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানে এই উপভাষা ব্যবহার হয়।

বরেন্দ্রী বাংলার উপভাষাগুলো হলো: রাজশাহীয় উপভাষা, মালদা বাংলা, দিনাজপুরী বাংলা, মুর্শিদাবাদী বাংলা, পাবনাইয়া বাংলা, বগুড়াইয় বাংলা এবং শেরশাবাদীয় বাংলা।

বিস্তৃতি —
বাংলাদেশ: রাজশাহী বিভাগ, দিনাজপুর এবং গাইবান্ধা জেলার অংশবিশেষ।
ভারত: পশ্চিমবঙ্গের মালদহ বিভাগ (ইসলামপুর উপজেলা ব্যতীত), ঝাড়খণ্ড এবং বিহারের অংশবিশেষ।
উদাহরণ —
...

২.৩.৪ মানভূমী উপভাষা

[সম্পাদনা]

ঝাড়খণ্ডী বাংলা, পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলা বা মানভূমী বাংলা হলো পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশার কিছু জেলায় প্রচলিত বাংলা ভাষার একটি উপভাষাগুচ্ছ। এটির ওপর প্রতিবেশী হিন্দি এবং ওড়িয়া ভাষার কিছুটা প্রভাব রয়েছে। মানভূমী বাংলার একটি সমৃদ্ধ লোকসংগীতের ঐতিহ্য রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও বীরভূম জেলার কিছু অংশে এবং ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম, সরাইকেলা খড়সাওয়াাঁ, বোকারো, ধানবাদ ও রাঁচি জেলার গ্রামগুলোতে মাসব্যাপী টুসু উৎসব পালনকালে গ্রাম্য মেয়েরা টুসু গান গেয়ে থাকেন। এছাড়া ভাদু গান, করম গান, বাউল গান এবং ঝুমুর গানও মানভূমী বাংলায় রচিত হয়।

মানভূমী বাংলার উপভাষাগুলো হলো: বাঁকুড়া-মানভূমী বাংলা, মেদিনীপুরী বাংলা, বীরভূমী বাংলা, সিংভূমী বাংলা এবং কাঁথি উপভাষা।

বিস্তৃতি —
ভারত: পশ্চিমবঙ্গ (মেদিনীপুর বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিভাগ এবং বর্ধমান বিভাগের অংশবিশেষ), ঝাড়খন্ড (কোলহান বিভাগ, সাঁওতাল পরগনা বিভাগ, রাঁচি জেলা এবং উত্তর ছোটনাগপুর বিভাগের অংশবিশেষ), ওড়িশা (ময়ুরগঞ্জ জেলা এবং বলসোর জেলা)
উদাহরণ —
...

২.৩.৫ রংপুরী উপভাষা

[সম্পাদনা]

রংপুরী বাংলা, কামতাপুরী বাংলা বা রাজবংশী ভাষা বাংলা ভাষার একটি উপভাষাগুচ্ছ; স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবেই এটি বেশি পরিচিত। নেপালে তাজপুরীয় নামেও পরিচিত। এ ভাষায় বাংলাদেশের রংপুরের রাজবংশী সম্প্রদায়, ভারতের রাজবংশী, নস্যশেখ, নাথ-যোগী, খেন সম্প্রদায়ের লোকেরা কথা বলে। বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির ভিত্তি নদীয়াভিত্তিক হওয়ায় বাংলা ভাষার প্রমিত রীতির সাথে এটির কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে এই ভাষাভাষী জনগণ কার্যত দ্বিভাষী। ভারত এবং বাংলাদেশে তারা রাজবংশীর পাশাপাশি প্রমিত বাংলা অথবা অসমীয়া ভাষায় কথা বলে থাকেন।

রাজবংশী ভাষার উপভাষাগুলো হলো: রংপুরী উপভাষা, দিনাজপুরী উপভাষা, গোয়ালপাড়ীয উপভাষা, কুচবিহারী উপভাষা, জলপাইগুড়ীয উপভাষা এবং তরাই-শিলিগুড়ি উপভাষা।

বিস্তৃতি —
বাংলাদেশ: রংপুর বিভাগ (দিনাজপুর ও গাইবান্ধা জেলার কিছু অংশ ব্যতীত)।
ভারত: পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি বিভাগ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর; বিহারের পূর্ণিয়া বিভাগ এবং অসমের ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাঁও ও কোকড়াঝাড় জেলা।
নেপাল: ঝাপা এবং মোরঙ জেলা।
উদাহরণ —
...

২.৩.৬ সুন্দরবনী উপভাষা

[সম্পাদনা]

সুন্দরবনী উপভাষা বা দক্ষিণী বাংলা হলো বাংলা ভাষার একটি উপভাষাগুচ্ছ। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে এই উপভাষায় কথা বলা হয়। এই উপভাষায় গান, কবিতা এবং গল্প আছে। সাধারণত এটিকে ভাষাবিদগণ রাঢ়ী এবং বঙ্গালীর মধ্যবর্তী উপভাষা হিসেবে গণ্য করেন। কারণ, এটি একইসঙ্গে রাঢ়ী এবং বঙ্গালী উভয়ের বৈশিষ্ট্যই বহন করে।

সুন্দরবনী উপভাষাগুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত উপভাষাগুলো হলো: বসিরহাট-সাতক্ষীরাইয়া উপভাষা, বারুইপুরী উপভাষা এবং সুন্দরবনী বাংলা।

বিস্তৃতি —
ভারত: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা (বনগ্রাম ও কাকদ্বীপ উপজেলা ব্যতীত)।
বাংলাদেশ: সাতক্ষীরা জেলা এবং খুলনা জেলার অংশবিশেষ।
উদাহরণ —
...

২.৪ প্রমিত বাংলা ভাষা

[সম্পাদনা]

প্রতিটি বাঙালি শিশুর মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা হলো তার আঞ্চলিক ভাষা— সেই ভাষাতেই তারা কথা বলা শুরু করে। কোনো কোনো শব্দ অঞ্চলভেদে ভিন্নভাবে উচ্চারিত হতে পারে; একই অর্থ বোঝাতে আলাদা শব্দের প্রয়োগ হতে পারে; এবং অনেক সময় বাক্যের গঠন পর্যন্ত আলাদা হয়। ফলে ভাষার এই আঞ্চলিক রূপ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগে অনেক সমস্যা তৈরি করে।

সেই সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে ভাষার একটি রূপকে আদর্শ, প্রমিত বা মান হিসেবে গ্রহণ করা হয়; যাতে সেই ভাষাভাষী সকল অঞ্চলের মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে। ভাষার হয় এই রূপকে বলা হয় প্রমিত ভাষা। যাবতীয় আনুষ্ঠানিক ও দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষাকার্যক্রম, গমমাধ্যম ও সাহিত্যকর্মে ভাষার এই প্রমিত রূপ ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষার মান রীতির নাম: প্রমিত বাংলা ভাষা (Standard Bengali Language)।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাধু ভাষার জন্ম হলে সেটি পরবর্তী প্রায় দেড়শত বছর পর্যন্ত লেখ্য বাংলা ভাষার আদর্শ রীতি হিসেবে চালু ছিল। তাই এর আরেক নাম 'প্রমিত সাহিত্যিক ভাষা'। তবে এটি কখনোই মান কথ্য রীতি হয়ে উঠতে পারেনি।

বিংশ শতাব্দীতে চলিত রীতি চালু হয়, যার কথ্য রূপটি সমগ্র শিক্ষিত বাঙালী সমাজে প্রচলিত ছিল। ফলে একই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই সেটি সাধুরীতির জায়গা দখল করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ, ক্রমে চলিত রীতি আদর্শ লেখ্য রীতির জায়গা দখল করে নেয়। ফলে, বাংলা ভাষার প্রমিত রীতি হিসেবে চলিত রীতি গৃহিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার যাবতীয় দাপ্তরিক কাজ, বিদ্যাচর্চা, গণমাধ্যম ও যোগাযোগে প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়।

২.৪.১ কথ্য ও লেখ্য প্রমিত বাংলা

[সম্পাদনা]

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রমিত বাংলা ভাষার দুটি রূপ হলো: কথ্য প্রমিত বাংলা ও লেখ্য প্রমিত বাংলা। কথ্য প্রমিত ব্যবহৃত হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলার সময়; অন্যদিকে লেখ্য প্রমিত লিখিত যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়। কবিতা, গল্প, উপন্যাসে কখনো কখনো শব্দের কথ্য প্রমিত রূপ দেখা যায়; তবে, আনুষ্ঠানিক গদ্যে শুধুমাত্র লেখ্য প্রমিত রূপ ব্যবহার করতে হয়।

পাঠ ৩: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ

[সম্পাদনা]

ব্যাকরণ ভাষাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা। ভাষাকে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করার প্রচেষ্টা থেকেই ব্যাকরণের উদ্ভব। ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, বাগর্থ ইত্যাদি ভাষার মৌলিক উপাদান। আর এই উপাদানগুলোকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষার মধ্যকার সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করা ব্যাকরণের কাজ। ব্যাকরণগ্রন্থে এসব বৈশিষ্ট্যকে সূত্রের আকারে সাজানো হয়ে থাকে। যে ব্যাকরণে বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণ করা হয়, অর্থাৎ বাংলা ভাষার ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, বাগর্থ ইত্যাদির গঠন-প্রকৃতি ও স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়, তা-ই বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বা বাংলা ব্যাকরণ।

৩.১ প্রথম বাংলা ব্যাকরণ

[সম্পাদনা]
বাংলা ব্যাকরণ রচনার সম্পূর্ণ ইতিহাস জানতে উইকিপিডিয়ায় দেখুন।

বাংলা ভাষার জন্য প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ। তাঁরা নানা প্রয়োজনে ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষাসমূহ শিখতে এবং সহগামীদের শেখাতে বাধ্য হয়েই মূলত বাংলাসহ অন্যান্য নব্যভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনায় উৎসাহিত হন। এরকম প্রয়োজনের তাগিদেই পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দা আস্‌সুম্পসাঁউ পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তিনি ভাওয়ালের একটি গির্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনকালে (১৭৩৪-১৭৪২) Vocabulario em Idioma Bengalla, e Portuguez শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে ১৭৪৩ সালে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। মানোএল মূলত তার এই বাংলা-পর্তুগিজ অভিধানের ভূমিকা হিসেবেই বাংলা ব্যাকরণটি রচনা করেছিলেন। তবে, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ ছিল না।

বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণ (এবং প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ) গ্রন্থ হলো ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হালেদ রচিত A Grammar of the Bengal Language (১৭৭৮)। তিনি এতে বাংলাকে সংস্কৃতের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। হ্যালহেডের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে রচিত হলেও এটিতেই প্রথম বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়, তাই বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে গ্রন্থটি মূল্যবান। এরপর উনিশ শতকের শুরুতেই রচিত হয় উইলিয়াম কেরির বাংলা ব্যাকরণ A Grammar of the Bengalee Language (১৮০১)।

পরবর্তীকালে, হেলিবেরির তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কলেজের সংস্কৃত ও বাংলার অধ্যাপক জি. সি. হটন লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন তাঁর Rudiments of Bengali Grammar (১৮২১) শীর্ষক বাংলা ব্যাকরণ। তবে, যথার্থ ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ Introduction to the Bengali Language (১৮৪৭) রচনা করেছিলেন রেভারেন্ড ডব্লিউ ইয়েটস। ইয়েটস তাঁর ব্যাকরণের বিষয় বিন্যাসে প্রায় সম্পূর্ণই কেরির ব্যাকরণের ওপর নির্ভর করলেও বাংলা ভাষার শুদ্ধতার ব্যাপারে তিনি কেরির চেয়ে অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন।

১৮২৬ সালে, রামমোহন রায়ের ইংরেজিতে রচিত বাংলা ব্যাকরণ Bengali Grammar in the English Language প্রকাশিত হয়। তিনি কেরি বা হটনের মতো সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে বড় করে দেখেননি; বাংলা ভাষার একটি মূল প্রবণতা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি তাঁর আলোচনায় কোথাও সর্বজনবিদিত সংস্কৃত ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ ও পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, আবার কোথাও বাংলা ভাষার প্রকৃতির প্রয়োজনে নতুন সংজ্ঞা ও পরিভাষা নির্মাণ করেছেন। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি তার গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে যে আলোচনা করেছেন, কালের দিক থেকে তা ছিল সম্পূর্ণ বিপ্লবাত্মক।

বাঙালি কর্তৃক বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনার প্রথম প্রচেষ্টা হলো রাধাকান্ত দেবের বাঙ্গালা শিক্ষা (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮২১)। এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ নয়, এবং সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী এটি রচিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় বাঙালির লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ হচ্ছে রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ। তিনি কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটির অনুরোধে ১৮৩০ সালে এটি রচনা করেন, যা ১৮৩৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি কোনো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি, তবে ব্যাকরণের পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পূর্ণতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা ব্যাকরণ রচনায় রামমোহনের মৌলিকত্ব এবং ভাষার প্রকৃতি বিচারে তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা অত্যন্ত সঙ্গত ও যথাযথ।

৩.২ বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়

[সম্পাদনা]

৩.২.১ ধ্বনিতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

৩.২.২ রূপতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

৩.২.৩ বাক্যতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

৩.২.৪ বাগর্থতত্ত্ব

[সম্পাদনা]

৩.৩ ব্যাকরণ অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা

[সম্পাদনা]

ভাষাকে বিশ্লেষণ করার জন্য ব্যাকরণের উৎপত্তি। অর্থাৎ, আগে ভাষার জন্ম হয়েছে এবং পরবর্তীতে ভাষার বিশ্লেষণশাস্ত্র হিসেবে ব্যাকরণ রচিত হয়। ব্যাকরণকে ভাষার সংবিধান বলা হলেও এটি ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তবুও ভাষা ও ব্যাকরণের সম্পর্ক অতিঘনিষ্ঠ।

ভাষা প্রবহমান নদীর মতো আপন খেয়াল খুশিমতো আপন গতিতে এগিয়ে চলে। অর্থাৎ, সময়ের সাথে সাথে কোনো ভাষার ব্যাবহারকারীদের মুখে মুখে ভাষার রূপের পরিবর্তন সাধিত হয়। আর ব্যাকরণের কাজ হলো ভাষার গতিবিধি লক্ষ করা এবং ভাষাকে বিশ্লেষকর করা। তাই, ভাষার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যকে জানার জন্য ব্যাকরণ অধ্যয়নের বিকল্প নেই।

ব্যাকরণ পড়ে ভাষার বিবিধ উপাদানের গঠন ও প্রকৃতি এবং যেসব বিষয়ের সঠিক ব্যবহার-বিধি সম্পর্কে জানা যায়; ভাষার প্রয়োগে শুদ্ধতা রক্ষিত হয় এবং ভাষার সৌন্দর্য অনুধাবন করা যায়। সর্বোপরি, ভাষার বিবর্তনের ধারা, নিয়ম-শৃঙ্খঙ্খলা বর্ণনা ও বিশ্লেষণ প্রভৃতির ব্যাপারে অবহিত হতে ব্যাকরণ পাঠ একান্ত প্রয়োজন।

প্রতিটি বাঙালির মাতৃভাষা (প্রথম ভাষা) হলো তার অঞ্চলিক ভাষা তথা উপভাষা; যা শিশুকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে অর্জিত হয়। অন্যদিকে প্রমিত ভাষা চর্চা করে শিখতে হয়। তাই প্রমিত বাংলা ভাষা শিখতে ব্যাকরণ পড়ার বিকন্যা নেই; ব্যাকরণ ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রির মাধ্যমে একটি বাঙালি শিশু মার্জিত ও প্রমিত বাংলা শিখতে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়
ধ্বনিবিজ্ঞান

[সম্পাদনা]
আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালা (আধ্বব)-তে ধ্বনিবিজ্ঞান বা Phonetics এর উচ্চারণ।

ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics), মানুষের উচ্চারিত ধ্বনিসমূহের বিশ্লেষণশাস্ত্র। ভাষী মুখে যা উচ্চারণ করে মূলত তা-ই ধ্বনি বা বাকধ্বনি। ভাষাবিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখায় ধ্বনির উচ্চারণের পদ্ধতি, ভৌত তরঙ্গধর্মের প্রকৃতি, এর উৎপাদন, শ্রবণ ও অনুধাবন নিয়ে গবেষণা করা হয়। ধ্বনিবিজ্ঞান ভাষানিরপেক্ষ; এখানে সকল ভাষার ধ্বনি-বিশ্লেষণ করা হয়। এর প্রধান শাখা তিনটি: উচ্চারণ ধ্বনিবিজ্ঞান (Articulatory Phonetics), ধ্বনিতরঙ্গবিজ্ঞান (Acoustic Phonetics) এবং শ্রুতি ধ্বনিবিজ্ঞান (Auditory Phonetics)। ধ্বনিবিজ্ঞান যেহেতু ব্যাকরণের কোনো অংশ নয়, সেহেতু এখানে এ শাখা সম্পর্কে সম্পূর্ণ আলোচনা করা হবে না। বাংলা ব্যাকরণের ধ্বনিতত্ত্ব অংশে ধ্বনিবিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো রয়েছে, এখানে মূলত সেগুলো-ই আলোচনা করা হবে।

পাঠ ১: বাগযন্ত্র

[সম্পাদনা]

ধ্বনির উচ্চারণে মানবশরীরের যেসব প্রত্যঙ্গ জড়িত সেগুলোকে একত্রে বাগযন্ত্র বা বাকপ্রত্যঙ্গ (Vocal Organ বা Speech Organ) বলে। ফুসফুস থেকে ঠোঁট পর্যন্ত প্রতিটি প্রত্যঙ্গ-ই বাকযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত।

মধ্যচ্ছদা (Diaphragm)

[সম্পাদনা]

ফুসফুস (Lungs)

[সম্পাদনা]

শ্বাসনালি (Trachea)

[সম্পাদনা]

বায়ুনালি (Bronchus)

[সম্পাদনা]

স্বরযন্ত্র (Larynx)

[সম্পাদনা]

ধ্বনিদ্বার (Vocal folds)

[সম্পাদনা]

স্বররন্ধ্র (Glottis)

[সম্পাদনা]

অধিজিহ্বা (Epiglottis)

[সম্পাদনা]

গলবিল (Pharynx)

[সম্পাদনা]

জিভ বা জিহ্বা (Tongue)

[সম্পাদনা]

দাঁত বা দন্ত (Teeth)

[সম্পাদনা]

দন্তমূল (Alveoli)

[সম্পাদনা]

মুর্ধা (Cerebrum)

[সম্পাদনা]

তালু (Palate)

[সম্পাদনা]

শক্ততালু

[সম্পাদনা]

কোমল তালু

[সম্পাদনা]

আলজিভ (Uvula)

[সম্পাদনা]

ঠোঁট বা ওষ্ঠ (Lips)

[সম্পাদনা]

নাক (Nose)

[সম্পাদনা]

নাসিকা গহ্বর (Nasal cavity)

[সম্পাদনা]

নাসিকা রন্ধ্র (Nasal folds)

[সম্পাদনা]

চোয়াল (Jaw)

[সম্পাদনা]

পাঠ ২: স্বরধ্বনি ও এর উচ্চারণ প্রক্রিয়া

[সম্পাদনা]

বাংলা ব্যাকরণ/ধ্বনিবিজ্ঞান/স্বরধ্বনি

পাঠ ৩: ব্যঞ্জনধ্বনি ও এর উচ্চারণ প্রক্রিয়া

[সম্পাদনা]

বাংলা ব্যাকরণ/ধ্বনিবিজ্ঞান/ব্যঞ্জনধ্বনি