বাংলা ব্যাকরণ/ভাষা ও ব্যাকরণ/ব্যাকরণ
ব্যাকরণ ভাষাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা। ভাষাকে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করার প্রচেষ্টা থেকেই ব্যাকরণের উদ্ভব। ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, বাগর্থ ইত্যাদি ভাষার মৌলিক উপাদান। আর এই উপাদানগুলোকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষার মধ্যকার সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করা ব্যাকরণের কাজ। ব্যাকরণগ্রন্থে এসব বৈশিষ্ট্যকে সূত্রের আকারে সাজানো হয়ে থাকে। যে ব্যাকরণে বাংলা ভাষাকে বিশ্লেষণ করা হয়, অর্থাৎ বাংলা ভাষার ধ্বনি, শব্দ, বাক্য, বাগর্থ ইত্যাদির গঠন-প্রকৃতি ও স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়, তা-ই বাংলা ভাষার ব্যাকরণ বা বাংলা ব্যাকরণ।
৩.১ প্রথম বাংলা ব্যাকরণ
[সম্পাদনা]বাংলা ভাষার জন্য প্রথম ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ। তাঁরা নানা প্রয়োজনে ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ভাষাসমূহ শিখতে এবং সহগামীদের শেখাতে বাধ্য হয়েই মূলত বাংলাসহ অন্যান্য নব্যভারতীয় ভাষার ব্যাকরণ রচনায় উৎসাহিত হন। এরকম প্রয়োজনের তাগিদেই পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দা আস্সুম্পসাঁউ পর্তুগিজ ভাষায় প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তিনি ভাওয়ালের একটি গির্জায় ধর্মযাজকের দায়িত্ব পালনকালে (১৭৩৪-১৭৪২) Vocabulario em Idioma Bengalla, e Portuguez শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে ১৭৪৩ সালে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। মানোএল মূলত তার এই বাংলা-পর্তুগিজ অভিধানের ভূমিকা হিসেবেই বাংলা ব্যাকরণটি রচনা করেছিলেন। তবে, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ ছিল না।
বাংলা ভাষার দ্বিতীয় ব্যাকরণ (এবং প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ) গ্রন্থ হলো ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হালেদ রচিত A Grammar of the Bengal Language (১৭৭৮)। তিনি এতে বাংলাকে সংস্কৃতের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। হ্যালহেডের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ইংরেজিতে রচিত হলেও এটিতেই প্রথম বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়, তাই বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাসে গ্রন্থটি মূল্যবান। এরপর উনিশ শতকের শুরুতেই রচিত হয় উইলিয়াম কেরির বাংলা ব্যাকরণ A Grammar of the Bengalee Language (১৮০১)।
পরবর্তীকালে, হেলিবেরির তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কলেজের সংস্কৃত ও বাংলার অধ্যাপক জি. সি. হটন লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন তাঁর Rudiments of Bengali Grammar (১৮২১) শীর্ষক বাংলা ব্যাকরণ। তবে, যথার্থ ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ Introduction to the Bengali Language (১৮৪৭) রচনা করেছিলেন রেভারেন্ড ডব্লিউ ইয়েটস। ইয়েটস তাঁর ব্যাকরণের বিষয় বিন্যাসে প্রায় সম্পূর্ণই কেরির ব্যাকরণের ওপর নির্ভর করলেও বাংলা ভাষার শুদ্ধতার ব্যাপারে তিনি কেরির চেয়ে অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিলেন।
১৮২৬ সালে, রামমোহন রায়ের ইংরেজিতে রচিত বাংলা ব্যাকরণ Bengali Grammar in the English Language প্রকাশিত হয়। তিনি কেরি বা হটনের মতো সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে বড় করে দেখেননি; বাংলা ভাষার একটি মূল প্রবণতা লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি তাঁর আলোচনায় কোথাও সর্বজনবিদিত সংস্কৃত ব্যাকরণের সংজ্ঞার্থ ও পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, আবার কোথাও বাংলা ভাষার প্রকৃতির প্রয়োজনে নতুন সংজ্ঞা ও পরিভাষা নির্মাণ করেছেন। ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি তার গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে যে আলোচনা করেছেন, কালের দিক থেকে তা ছিল সম্পূর্ণ বিপ্লবাত্মক।
বাঙালি কর্তৃক বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনার প্রথম প্রচেষ্টা হলো রাধাকান্ত দেবের বাঙ্গালা শিক্ষা (দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮২১)। এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ নয়, এবং সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতি অনুযায়ী এটি রচিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় বাঙালির লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ হচ্ছে রামমোহন রায়ের গৌড়ীয় ব্যাকরণ। তিনি কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটির অনুরোধে ১৮৩০ সালে এটি রচনা করেন, যা ১৮৩৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি কোনো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেননি, তবে ব্যাকরণের পরিভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পূর্ণতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা ব্যাকরণ রচনায় রামমোহনের মৌলিকত্ব এবং ভাষার প্রকৃতি বিচারে তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা অত্যন্ত সঙ্গত ও যথাযথ।